লোকজীবন ও সাহিত্যে মাতৃভাবনা থেকে দেশভাবনা : জাতীয়তাবাদের উত্তরণ বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দেমাতরম'
অশোকানন্দ রায়বর্ধন
মানবসভ্যতার সৃষ্টিকাল থেকেই মাতৃকামূর্তি জীবনধারিনী, উর্বরতাকৃষ্টি ও পৃথিবীর প্রতীক হিসেবে মনুষ্য সমাজে মান্য হয়ে আসছেন । সেজন্যই প্রাচীন বিশ্বে মাতৃকা বা Mother Goddess এর মূর্তি মানবধর্ম ও সংস্কৃতির প্রধানতম প্রতীকগুলির অন্যতম । প্রাচীন প্রস্তরযুগ থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশে মাতৃকা আরাধনার প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায় । প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বিভিন্ন স্থানে মাটির বা পাথরের নারীমূর্তি পাওয়া গেছে । এই মূর্তিগুলি উর্বরতা ও মাতৃত্বের ভাবনা নির্দেশ করে । প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করেন, এগুলি গ্রামদেবী, ভূমিদেবী বা প্রাকশাক্ত আরাধনার আগের রূপ । তারপর পরবর্তীতে হরপ্পা সভ্যতায় শস্য উৎপাদনকারী পৃথিবীমাতার মূর্তি থেকে 'সপ্তমাতৃকা' ও ও 'মহিষাসুরমর্দিনী' দুর্গার মত দেবীরূপ ধারণ করে বিবর্তিত হতে দেখা গেছে । বৈদিক যুগে ঊষা, অদিতি, বিশ্বমাতা ও পরবর্তী যুগের ষোড়শ মাতৃকা, দুর্গা, অম্বা, প্রতিমাদেবী মাতৃকা সংস্কৃতির বিকশিত রূপ । আবার লোকায়ত দেবীরূপে গ্রামদেবী, শীতলা, মনসা এসবেতেই প্রাচীন মাতৃকাচিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে । পরবর্তীকালে যা হিন্দু ধর্মের শাক্ত ধারায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে ।
লোকসংস্কৃতি হল সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি । আদিম মানুষের জীবন, বিশ্বাস, আচার-আচরণ, শিল্পকলা ও বিনোদন থেকে সৃষ্ট সংস্কৃতি যা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতিনীতি, জীবনযাপন প্রণালী তাদের মুখে মুখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ে এবং লোকজীবনকে প্রতিফলিত করে । মাতৃভাবনা বা মাতৃতান্ত্রিকতা হল এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা যেখানে নারী বা মাতাকে কেন্দ্র করে সমাজ পরিচালিত হয় । লোকসংস্কৃতির নানা উপাদানে, যেমন লোকগীতি, লোককথা, প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা, মিথ,নাটক, গান, নৃত্য এবং প্রথাগত বিশ্বাসে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয় মাতৃভাবনা । লোকসংস্কৃতি ও মাতৃভাবনা পরস্পর গভীরভাবে সম্পৃক্ত । প্রাচীন সমাজে নারীর ভূমিকা প্রধান ছিল বলে তাকে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বলা হত । নারীর সামাজিক ভূমিকা, প্রজনন, খাদ্য সংগ্রহ, গৃহরক্ষা প্রভৃতি মাতৃতান্ত্রিক ধারণা সৃষ্টির দরুণ মাতৃভাবনা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে । তাছাড়া কৃষিনির্ভর সভ্যতায় পৃথিবীকে 'মা'-রূপে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও সমাজে মাতৃভাবনার সৃষ্টি হয়েছে । লোকজীবন তো মাটিতে ঘিরেই কৃষিজ পণ্য উৎপাদনের মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে । তাই লোকজীবনে মাটির প্রতি এক গভীর মায়া এবং মাটিকে মায়ের মত মনে করা হয়েছে । সেই থেকে সৃষ্ট মাতৃভাবনা মানুষের আদিচেতনা । লোকসঙ্গীতে দেখি–'মোর মা বলে, ধান রে সোনার ধান /তোর গন্ধে ভরা মন প্রাণ ।' লোকসংস্কৃতিতে মা মানে যিনি দুধ দেন, যিনি ফসল ফলান, যিনি নদীর জলে আশীর্বাদ দেন, আর যিনি বিপদে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখেন । গ্রাম বাংলার লোকজীবনে মা শুধু সংসারের নয়, প্রকৃতিরও প্রতিমূর্তি । তিনি ধানের দেবী লক্ষ্মী, পৃথিবীমাতা বা বসুমাতা, নদীমাতা, গঙ্গামাতা ও গোমাতা । এসব নিয়েই বাংলার লোকবিশ্বাস । মাতৃরূপে পুজিতা লোকমাতা ।
বাঙালির লোকজীবনে প্রবাহিত মাতৃকাকৃষ্টি বা মাতৃভাবনা বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন পর্যায়েও তার স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে । বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ । চর্যাপদের কবিতায় সরাসরি মাতৃভাবনার রূপ তেমন দেখা যায় না । কারণ এর মূল বিষয়বস্তু ছিল বৌদ্ধধর্মের আধ্যাত্মিক সাধনা ও গুহ্যতত্ত্ব । তবে চর্যার কিছু কিছু পদে পরোক্ষভাবে নারী ও জননীর প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়, যা সাধনা ও জীবনযাত্রা সম্পর্কিত । এখানে নারীরূপকে সাধনার প্রতিমূর্তি বা 'মাতৃআজ্ঞা' বা মাতৃধারণার মাধ্যমে সন্তান-জননী সম্পর্কে সাধনসঙ্গিনী হিসেবে ভক্তি-শ্রদ্ধার ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়েছে । এখানে জ্ঞানমুদ্রা অর্থে 'হরিণী' বা শবরী অর্থে 'দেবী নৈরাত্মাকে' বোঝানো হয়েছে । জীবন ও জীবিকার নানা ক্ষেত্রে নারীসত্ত্বা দৃঢ়তা, কর্তৃত্ববোধ, স্বাধীন চিন্তা ও মননের পরিচয় বহন করে । মেয়েরা এখানে প্রান্তিক সমাজের জনজীবন ও চেতনার অংশ । ২০ নং চর্যায় কুক্কুরীপাদ নারীর প্রসব যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করেছেন । প্রসবের সময় সন্তানের প্রাণ বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনায় মাতৃহৃদয়ের যন্ত্রণার ছবি এখানে ফুটে উঠেছে । 'পহিল বিয়াণ মোর বাসনয়ুড়া/ নাড়ি বিআরন্তে সেব বায়ুড়া ।।/ জান জৌবন মোর ভইলেসি পুরা / মূল নখলি বাপ সংঘারা ।।/ ভনথি কুক্কুরীপা এ ভব থিরা ।/ জো এথু বুঝই সো হেথু বীরা ।। (চর্যা-২০)
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মাতৃভাবনার দৃষ্টান্ত মূলত, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি ও শাক্ত পদাবলিতে পাওয়া যায় । মনসামঙ্গলের দেবী মনসা ও বেহুলাকে নিয়ে মা-মায়ের সম্পর্ক, অন্নদামঙ্গলে দেবী অন্নপূর্ণা ও উমাকে কেন্দ্র করে মাতৃস্নেহ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও অন্যান্য পদাবলীতে যশোদা ও শ্রীরাধার মতো মাতৃপ্রতিম চরিত্রগুলির মাধ্যমে স্নেহ, মমতা ও ত্যাগের আদর্শ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যা তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক চিত্র তুলে ধরে । বৃন্দাবনদাসের চৈতন্য ভাগবত ও লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গলে শচীমাতার মাতৃত্ব, বাৎসল্য ও ত্যাগ বৈষ্ণব সাহিত্যে মাতৃ ভাবনার এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত । শচীমায়ের পুত্রকে নিয়ে উদ্বেগ, স্নেহ ও ভক্তি এখানে অতুলনীয় । কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতে শচীমাতা ও অন্যান্য মায়ের বর্ণনা বিশেষত পুত্র-মাতৃ সম্পর্ক ও ভক্তি প্রেমের ধারায় মাতৃভাবনার গভীরতা ফুটে উঠেছে ।
শাক্ত পদাবলীতে মাতৃভাবনা বলতে মূলত জগজ্জননী (দেবী দুর্গা) ও তাঁর লীলারূপের বর্ণনাকে বোঝানো হয়েছে । সেখানে মাকে একদিকে যেমন সর্বশক্তিমান ব্রহ্মময়ীরূপে দেখা যায় তেমনি বাৎসল্যরসের মাধ্যমে এক সাধারণ মাতৃস্নেহের প্রতিমূর্তি (যেমন মেনকা, উমা ) রূপেও চিত্রিত করা হয় । আগমনী ও বিজয়া পদের মূল বিষয়ও তাই যেখানে ভক্তের আকুতি, জগত ও জীবনের দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রার্থনা মিশে আছে । শক্তিসাধনা থেকে দেশপ্রেম ও শাক্তসাহিত্যের বিবর্তনের ধারাটিতে দেখা যায়, কিভাবে মাতৃশক্তির উপাসনা (শক্তি) থেকে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটেছে । রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের মত সাধক কবিগণ শ্যামাসঙ্গীত ও শাক্ত পদাবলির মাধ্যমে এই মাতৃভাবনাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যেখানে গীতার বর্ণিত জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির দর্শন ও সামাজিক চেতনার সমন্বয় ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তি স্থাপন করে । 'মা' বা 'মাতৃকা' ধারণার গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা শুধু দেবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাতৃভূমির ধারণায় প্রসারিত হয়েছে । শাক্ত পদাবলীর 'মা' বা 'মাতৃদেবী' (যেমন কালি বা দুর্গা)-র রূপটি ধীরে ধীরে দেশের প্রতীক হয়ে ওঠে । দেবীর পূজা ও সাধনা দেশের পূজা ও দেশপ্রেমের রূপ নেয় । শাক্তসাহিত্য ও শক্তিসাধনার এই লোকায়ত ধারা উনিশ শতকের নবজাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে যেখানে দেশমাতার পূজার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ জাগ্রত হয়ে দেশপ্রেমের গভীর চেতনায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং বাংলাসাহিত্য ও জাতীয়তাবাদের এক অবিচ্ছেদ অংশ হয়ে উঠেছে।
উনিশ শতকের নবজাগরণে সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে দেশপ্রেম ছিল এক প্রধান ধারা, যা ভারতীয় সমাজকে আত্মমর্যাদা ও জাতীয় চেতনার পথে চালিত করে । বাংলা কবিগান ও নবনাট্য আন্দোলন বিশেষত স্বদেশী যুগ থেকে দেশমাতৃকার বন্দনা বা দেশাত্মবোধক গান ও নাটকের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামকে তীব্রতা দিয়েছিল । কবিগান ছিল গ্রামীণ ও লোকায়ত ধারার গান । এই গানের মাধ্যমে দেশপ্রেমের বার্তা সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা হত । এই ধারায় দেশমাতৃকাকে মা-রূপে কল্পনা করে তার বন্দনার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হত । কবিগানে 'মালসি গান' নামে এক বিশেষ বন্দনাগীতি পরিবেশন করা হত যার মাধ্যমে দেশমাতৃকাকে বন্দনার পাশাপাশি তার শৃংখলমুক্তির বার্তাটিও নিহিত থাকত । বাংলার নবনাট্য আন্দোলন স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার ঘটায় । নাটকের মাধ্যমে দেশমাতৃকার বন্দনা, শোষণ ও বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা হত । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রমেশ চন্দ্র দত্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ সাহিত্যিকগণ তাঁদের লেখায় স্বদেশ, স্বজাতীয় ভাষার প্রতি অনুরাগ ফুটিয়ে তোলেন । প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে এক নতুন জাতীয়তাবাদী ভাবধারা তৈরি করে এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিক আন্দোলনকে উদ্বুদ্ধ করে । রামমোহন থেকে শুরু করে পরবর্তী লেখকরা ভারতের ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতিকে নতুন আলোয় দেখতে শুরু করেন যা ছিল আত্মপরিচয়ের সন্ধান । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দের মতো ব্যক্তিত্বরা সমাজ সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশের মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করেন তেমনি ধর্মীয় ও সামাজিক গোড়ামি দূর করে সামগ্রিক উন্নয়নের পথ দেখান যা পরোক্ষভাবে দেশপ্রেমের জন্ম দেয় ।শিবাজী, রানা প্রতাপ এর মত ঐতিহাসিক চরিত্রদের নিয়ে রচনায় দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা যোগানো হয় । চিত্রকলায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা গানে রজনীকান্ত সেনের মতো শিল্পীদের কাজও দেশীয় ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলে দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটানো হয় । বাংলাভাষাকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়কে দৃঢ় করা হয় । বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরানীর মতো উপন্যাস কেবল সাহিত্য হয়ে থাকেনি । এগুলি লক্ষ লক্ষ ভারতবাসীকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছিল এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আদর্শগত ভিত্তি স্থাপন করেছিল ।
উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন একজন বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব যাকে জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু পুনর্জাগরণের বা নবজাগরণের অন্যতম দূত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় । তাঁর লেখনীতে ধর্ম ও জাতীয়তাবোধ ছিল দেশপ্রেম ও শক্তিসাধনার এক অনন্য মিশ্রণ । জাতীয়তাবাদ শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন নয় । তাকে ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তির উপর তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তিনি দেশকে মাতৃভূমিরূপে কল্পনা করে 'বন্দেমাতরম' স্লোগানকে জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন । তাঁর আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরানী উপন্যাসের মাধ্যমে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে স্বদেশপ্রেমের ধারণার উন্মেষ ঘটে এবং তা পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে । বঙ্কিমচন্দ্র দেশকে শুধু একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড হিসেবে দেখেননি । তাঁর আনন্দমঠে মাতৃভূমি দেবীরূপে পূজিত হয়েছেন । এখানে দেশকে এক জীবন্ত দেবী 'মা' রূপে ব্যক্ত করা হয়েছে । আর সন্ন্যাসীগণ হলেন তাঁর সন্তান। সন্তানের কাছে যেমন মা দেবীরূপে পূজ্য তেমনি সন্ন্যাসী বিদ্রোহে ব্রতী বিদ্রোহীদের কাছে দেশমাতৃকাও সমান পূজ্য । এই উপন্যাসের ভবানন্দের কথায় আমরা পাই,–
'আমরা অন্য মা মানি না–জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী । আমরা বলি জন্মভূমিই জননী । আমাদের মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, বন্ধু নাই,– স্ত্রী নাই, পুত্র নাই, ঘর নাই, বাড়ী নাই, আমাদের কাছে আছে কেবল সেই সুজলা, সুফলা, মলয়জসমীরণশীতলা, শস্য শ্যামলা ।'
–এই ধারণাই 'বন্দেমাতরম' এর মূল ভিত্তি যা দেশকে পূজা করার ডাক দেয় । ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ও সামরিক রূপের বিপরীতে বঙ্কিমের জাতীয়তাবাদ ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার গভীরে প্রোথিত । তিনি মাতৃভূমির পূজা করার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয়চেতনার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমকে একীভূত করেছেন । তিনি অনুশীলন সমিতির মতো সংগঠনকে প্রভাবিত করে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং রজোগুণ-র অনুশীলনের মাধ্যমে জাতিকে শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আহ্বান জানান । 'আনন্দমঠ' উপন্যাস ও 'বন্দেমাতরম' সংগীত ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে তাঁর সবচেয়ে বড়ো অবদান । সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে লেখা এই উপন্যাস আনন্দমঠে বঙ্কিমচন্দ্র দেশপ্রেম ও ধর্মকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন । ফলে দেশপ্রেম এক আধ্যাত্মিক ভিত্তি ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় । 'বন্দেমাতরম' কেবল একটি স্লোগান ছিল না । এটি ছিল একটি মন্ত্র যা দেশবাসীকে মাতৃভূমির প্রতি ভক্তি ও দেশপ্রেমের এক নতুন চেতনায় দীক্ষিত করে এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবীদের প্রেরণা জুগিয়েছিল । এই গানটি একটি কবিতামাত্র নয় । এটি ভারতমাতার স্বরূপ বর্ণনার মাধ্যমে দেশকে মা দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী ও অন্যান্য দেবীর রূপক দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে যা ভারতের সমৃদ্ধি সৌন্দর্য ও শক্তির প্রতীক । দেশমাতৃকার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে মায়ের বিভিন্ন রূপের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে ।
বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে তাঁর অমর সৃষ্টি যে 'বন্দেমাতরম' ধ্বনিত হয়েছিল তা ছিল দেশ মাতৃকার প্রতি গভীর ভক্তি ও জাতীয়তাবাদী চেতনার এক মহামন্ত্র । বন্দে মাতরম স্তোত্র আজও প্রতিটি দেশবাসীর হৃদয়ে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের স্পৃহা জাগিয়ে তোলে । এই মহামন্ত্র ভারতের সকল মানুষের মধ্যে জাতীয় গর্ব ও ঐক্যের অনুভূতি তৈরি করেছে যারা সাহিত্য ও ইতিহাস পেরিয়ে জাতীয় পরিচয় এর চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছে ।
No comments:
Post a Comment