Monday, May 4, 2026

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক ও দুই নম্বর সেক্টরের সম্মিলিত লড়াই

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক ও দুই  নম্বর সেক্টরের সম্মিলিত লড়াই

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

-সেক্টর কমান্ডার: ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা বাচ্চু

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: পরশুরাম, দেবপুর, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, অনন্তপুর, সোনাপুর, কোলাপাড়া, মনতলা, মোহাম্মদপুর, আমজাদহাট, মুন্সীরহাট, পূর্বদেবপুর, পূর্বমধুগ্রাম, দক্ষিণ যশপুর, মহামায়া, মোকামিয়াম, রাধানগর, শুভপুর, গুতুমা, গোপাল, কাশীপুর ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: গুতুমা রেইড (১৬ জুলাই), বাগার বাজার রাজাকার ক্যাম্প ও দেবপুর অ্যামবুশ (৩১ জুলাই), করেরহাট-ফেনী-ছাগলনাইয়া অপারেশন (৪-৬ আগস্ট), চাঁদগাজী বাজার এলাকা অ্যামবুশ (১৮ আগস্ট), চম্পকনগর বিওপি আক্রমণ (২০ সেপ্টেম্বর), চম্পকনগর বিওপি আক্রমণ (২২ সেপ্টেম্বর), ফেনী-বিলোনিয়া সড়কে রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস (২৫ সেপ্টেম্বর), মুহুরী নদীসকাশে রণাঙ্গন (৩ অক্টোবর), মদুনাঘাট বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ধ্বংস (৬ অক্টোবর), ছাগলনাইয়া-বিলোনিয়া সড়কে ব্রিজ ধ্বংস (৭ অক্টোবর), সলিয়াদীঘি যুদ্ধ (৭ নভেম্বর), দক্ষিণ বিলোনিয়া মুক্তকরণ (২১ নভেম্বর), করিমাটিলায় সংঘর্ষ (৩ ডিসেম্বর)।

শ্রীনগর সাব-সেক্টর: 

আয়তনে ছোট হলেও এই সাব-সেক্টরটি বেশ গুরুত্ববহ ছিল। কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রেলসড়ক এই সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়েই প্রবেশ করেছে। এর কেবল উত্তরাংশ ভারতের সাথে যুক্ত। এখানে প্রাথমিক প্রতিরোধ যুদ্ধ ও সর্বপ্রথম ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। ফেনী নদী এই সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে।

আয়তন: ৫টি সাব-সেক্টরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ছোট ছিল; প্রায় ২০০ বর্গ কিলোমিটার।

সাব-সেক্টর কমান্ডার: প্রথমে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, পরে কিছুদিন ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং শেষে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: করেরহাট, জোরারগঞ্জ, হিঙ্গুলী, ধুম, কাটাছড়া, ওসমানপুর ও দুর্গাপুর।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: এখানে সংঘর্ষ তেমন একটা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রটি ছিল করেরহাট (নভেম্বর)।

তবলছড়ি সাব-সেক্টর

অবস্থানগত দিক বিশ্লেষণপূর্বক দেখা যায় যে, এই অঞ্চলে একইসাথে পাহাড় ও সমতল ভূমি রয়েছে। ’৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর ১নং সেক্টরে প্রবেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নাজুক করতে এই সাব-সেক্টরের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। উত্তাল মার্চের শেষলগ্নে কুমিরায় এক দুর্ধর্ষ প্রতিরোধযুদ্ধ হয় যা কিনা এই সাব-সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। তবে চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই ও সীতাকুণ্ড থানার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত এই এলাকাটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেকটা বিপদজনক ছিল, কারণ ভারত সীমান্তে খুব তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না এখানে। এই অঞ্চলের একদিক ছিল সন্দ্বীপ প্রণালীর সাথে যুক্ত।

আয়তন: ৭০০ বর্গ কিলোমিটার

সাব-সেক্টর কমান্ডার: সুবেদার আলী হোসেন।

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা, মীরসরাই, পানছড়ি ও লক্ষ্মীছড়ি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা ও মীরসরাই।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: কুমিরার প্রতিরোধ যুদ্ধ (২৬-২৮ মার্চ), বড়তাকিয়া ও মীরসরাই অপারেশন (২৩ জুলাই), পাতাকোট অ্যামবুশ (১০ আগস্ট), সুফিয়া রোডের যুদ্ধ (১০ আগস্ট), মীরসরাই রেললাইন অপারেশন (২৮ আগস্ট), ওসমানপুর-লোহারপুলের যুদ্ধ (১৭ অক্টোবর), চামলাশিয়া অ্যামবুশ (১২ নভেম্বর), মীরসরাই রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ (২৪ নভেম্বর), কাটিরহাটে যুদ্ধ (৪ ডিসেম্বর)।

ডিমাগিরি সাব-সেক্টর

৫টি সাব-সেক্টরের ভিতর যে তিনটি চট্টগ্রামের মধ্যে ছিল তার অন্যতম ছিল উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই ডিমাগিরি সাব-সেক্টর। এখানের বাগানবাজার ও অন্যান্য দু’একটি স্থানে বিওপির ঘাঁটি ছিল। ফলে এর বাগানবাজার অংশটি (উত্তরাংশ) কেবল ভারত সংলগ্ন ছিল।

আয়তন: ১,০০০ বর্গ কিলোমিটার।

সাব-সেক্টর কমান্ডার: জনৈক সুবেদার।

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: ফটিকছড়ি, নাজিরহাট, রাউজান, বাগানবাজার ও হাটহাজারী।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: সুলতানপুর, রাউজান, ফটিকছড়ি, সোয়াবিল, বাগানবাজার ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: মদনঘাটের বিদ্যুৎ স্টেশন ধ্বংস (১১ সেপ্টেম্বর), বাগানবাজার রেইড (১১ অক্টোবর), আন্ধারমানিক রেইড (৫ নভেম্বর), ফটিকছড়ি পুলিশ স্টেশন রেইড (১৭ নভেম্বর), নাজিরহাট যুদ্ধ (৯ ডিসেম্বর) ইত্যাদি।

মনুঘাট সাব-সেক্টর :

বাংলাদেশের সর্ব পূর্বে অবস্থিত এই সাব-সেক্টরের সমগ্র পশ্চিমাংশ ভারত লাগোয়া ছিল । ফলে মুক্তিযোদ্ধারা সুযোগ বুঝে ভারতীয় ভূখণ্ডে চলে যেতে পারত । এ অঞ্চলটি পাহাড়-পর্বতের আধিক্যহেতু গেরিলা যুদ্ধের উপযোগী ছিল । এছাড়া চেঙ্গী নদীর অবস্থানের কারণে মুক্তিযোদ্ধারা বেশ সুবিধা পেত । 
আয়তন :-পাঁচটি সাব-সেক্টরের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়ো । প্রায় ১২০০বর্গ কিলোমিটার । 
সাব-সেক্টর কমান্ডার :- যথাক্রমে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান, ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট ফজলুর রহমান 
দায়িত্বপূর্ণ এলাকা :-  রামগড়, হেঁয়াকো, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি, মানিকছড়ি ও মাটিরাঙ্গা । 
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ :- রামগড়, হেঁয়াকো, মহালছড়ি, মানিকছড়ি, ভাইবোনছড়া, পানছড়ি ইত্যাদি।
 উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ :- হেঁয়াকোর যুদ্ধ ( ২৭ জুলাই ), রামগড় আক্রমণ ( ১৩- 15 আগস্ট ), বিলাইছড়ি ও পানছড়ি এম্বুস যথাক্রমে ( ১–২নভেম্বর ), ভাইবোনছড়া ও পানছড়ি মুক্তকরণ ( ১০ ডিসেম্বর )
 এক নম্বর সেক্টরে মাত্র ৫ টি সাব সেক্টর গঠন করা হলেও এ অঞ্চলের কিছু এলাকা সাবসেক্টর বহির্ভূত ছিল । এসব এলাকাতেও কিন্তু যুদ্ধ হয়েছে। এ সকল এলাকায় যুদ্ধ করেছেন মূলত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাগণ এবং পরবর্তীতে কিছু বিএলএফ-এর সদস্যরা। যেসব এলাকা এমন ছিল সেগুলো হল- কক্সবাজার ও রাঙামাটি জেলার প্রায় সমস্ত এলাকা, চট্টগ্রাম জেলার ১৪টির মধ্যে প্রায় ৯টি থানা।" ( বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক–মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত, বাংলাদেশ )


মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের পাশেই ছিল দুই নম্বর সেক্টর  । "এই ২ নম্বর সেক্টর বৃহত্তর ঢাকা ( প্রধানত ঢাকা শহরসহ ঢাকা জেলার দক্ষিণাংশ )-কুমিল্লা ( আখাউড়া-আশুগঞ্জ রেললাইনের উত্তরাংশ বাদে ) ফরিদপুরের পূর্বাংশ ও নোয়াখালীর অংশবিশেষ ( মুহুরী নদীর পূর্বাংশ ) নিয়ে গঠিত হয় । ২ নম্বর সেক্টরের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী এলাকা, দক্ষিণ-পূর্বে ১ নম্বর সেক্টর, পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্য, উত্তরে ৩ নম্বর সেক্টর, উত্তর-পশ্চিমে যমুনা নদী ও ৭ নম্বর সেক্টর, পশ্চিমে ৮ নম্বর সেক্টর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ৯নম্বর সেক্টরের সীমানা । দুই নম্বর সেক্টরের আয়তন প্রায় ১৮,৫২৬ বর্গ কিলোমিটার । কোথাও কোথাও এই সেক্টরের আয়তনকে ১৭৬৫৮ বর্গ কিলোমিটার বলে অনুমান করা হয়েছে । ২ নম্বর সেক্টর ৪-ইস্ট বেঙ্গল, কুমিল্লা-নোয়াখালী ইপিয়ার বাহিনী নিয়ে গঠিত হয় এই সেক্টরটি । সদর দপ্তর ছিল মেলাঘরে । মেজর খালেদ মোশাররফ ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমান্ডার পদে নিযুক্ত ছিলেন । পরে মেজর এটিএম হায়দার সে বছর ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন ।

দুই নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর ও কমান্ডার 

১. গঙ্গাসাগর, আখাউড়া ও কসবা– কমান্ডারদের নাম :-  লেফটেন্যান্ট মাহবুব, লেফটেন্যান্ট ফারুক ও লেফটেন্যান্ট হুমায়ুন কবির  উল্লেখ্য ।

 ২.মন্দাভাগ– 
কমান্ডার:- ক্যাপ্টেন গফফার 

৩. শালদা নদী-
কমান্ডার:- মেজর আব্দুস সালেক চৌধুরী 

৪.মতিনগর–
কমান্ডার:-  লেফটেন্যান্ট দিদারুল আলম 
৫. নির্ভয়পুর–
কমান্ডার:-  ক্যাপ্টেন আকবর হোসেন, লেফটেন্যান্ট মাহবুব 
৬. রাজনগর–
কমান্ডার:- ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম, ক্যাপ্টেন শহীদ লেফটেন্যান্ট ইমামুজ্জামান ।

এই সেক্টরের উল্লেখযোগ্য হাসপাতালটির নাম ছিল বাংলাদেশ হাসপাতাল । এটি প্রথমে ছিল সোনামুড়ায় । পরবর্তী সময়ে বিশ্রামগঞ্জস্থিত হাবুল ব্যানার্জীর বাগানে সরিয়ে নেওয়া হয় । দুশো শয্যার এই হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার ছিলেন ক্যাপটেন আকতার আহমেদ,ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. মবিন প্রমুখ । সেইসময়ে চিকিৎসাবিদ্যায় পাঠরত বহু ছাত্রছাত্রী আহত ও অসুস্থ মুক্তযোদ্ধাদের অক্লান্ত সেবা দিয়ে গিয়েছিলেন ।

এক নম্বর ও দুই নম্বর সেক্টরের যৌথ লড়াই :-

ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক  ৬ নম্বর সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়ে চলে গেছে । অন্যদিকে ঢাকার সাথে চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগের একমাত্র পথটিও এই অঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করেছে । ত্রিপুরা রাজ‍্যের দক্ষিণ জেলার উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত এই এলাকা ।এই এলাকায় ৪-ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্রাভো তথা 'বি' কোম্পানি, ইপিআর এর 'এক্স' কোম্পানি গণবাহানীর সদস‍্যরা যুদ্ধ করেছিলেন । এই সাবসেক্টরের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ।
সাব-সেক্টর কমান্ডার :-ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম । তাঁকে সহায়তার জন্য ছিলেন ক‍্যাপ্টেন শহিদ ও লেফটেন্যান্ট ইমাম-উজ-জামান ।
 দায়িত্বপূর্ণ এলাকা :- বিলোনিয়ার পশ্চিমাঞ্চল লাকসামের দক্ষিণাঞ্চল, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট, ফেনীর আংশিক অঞ্চল ও নোয়াখালীর কিছু অংশ।
উল্লেখযোগ্য আক্রমণ, অ্যাম্বুশ ও যুদ্ধসমূহ :- নবাবপুরের যুদ্ধ ( ২৮ জুলাই ) গোপালপুর যুদ্ধ (১০আগস্ট ) সোনাপুর যুদ্ধ (৮ সেপ্টেম্বর ) কল‍্যাণদীর অপারেশন  (১৮ সেপ্টেম্বর )রাজগঞ্জের যুদ্ধ ( ২১সেপ্টেম্বর ) বিলোনিয়ার যুদ্ধ ও বিজয় ( অক্টোবর-নভেম্বর ) ওদারহাটের যুদ্ধ (৩০ অক্টোবর )শালধর ও লেমুয়ার যুদ্ধ  ( ১০ নভেম্বর )বেতিয়ারা গ্রামের যুদ্ধ ( ১১ নভেম্বর ) নোয়াপুর এর যুদ্ধ ( ডিসেম্বর ) ইত্যাদি ।"( তথ‍্য : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই– মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত, বাংলাদেশ )।

স্বাধীনতা যুদ্ধে ফেনীর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফেনী বিলোনিয়া সীমান্তের যুদ্ধ ছিল  মুক্তিবাহিনী ও পাক হানাদার বাহিনীর জন‍্যে সামরিক দিক থেকে অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উভয়ের জন‍্যে ছিল মর্যাদার লড়াই । কারণ ফেনীর উপর দিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের যোগাযোগ রক্ষা হত । বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের উপর কর্তৃত্ব রাখতে হলেও ফেনী ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । আর দক্ষিণ দিক ছাড়া পরশুরাম ও বিলোনিয়ার তিনদিকেই ভারতীয় সীমান্ত হওয়ায় স্থানটিতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের কৌশল নেয় পাকিস্তানি বাহিনী ।‌ তাদের প্রতিহত করার জন্যই এক নম্বর ও দুই নম্বর সেক্টর থেকেও সম্মিলিতভাবে এই অঞ্চল দখলের লড়াই চালানো হয় । এক নম্বর সেক্টরের ঋষ‍্যমুখ সাব-সেক্টর, শ্রীনগর সাব-সেক্টর এবং দুই নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টর পাশাপাশি  ছিল । ফলে এই তিনটি সাব-সেক্টরের  আওতাধীন পুরো নোয়াখালী এলাকা ছিল অর্থাৎ ফেনীর উত্তরাংশ ছিল রাজনগর সেক্টরের আওতাধীন এবং দক্ষিণাংশ ছিল ঋষ‍্যমুখ ও শ্রীনগর সেক্টরের আওতাধীন । ফলে ফেনী এলাকায় সেসময় তিন দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ  সংঘটিত হয়েছিল । এখানে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আক্রমণ এম্বুস ও যুদ্ধ সংঘটিত হয় ।
মুক্তিযুদ্ধে ফেনী সীমান্তে যে কয়টি লড়াই হয় তার মধ্যে শুভপুর ও বিলোনিয়া যুদ্ধ অন‍্যতম । এই যুদ্ধে এক নম্বর সেক্টরের ঋষ‍্যমুখ ও শ্রীনগর এই দুটি সাব-সেক্টর এবং দুই নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব্-সেক্টরের মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনী যৌথভাবে আক্রমণ শানিয়ে ফেনী জেলাকে মুক্ত করেন ।

শুভপুর যুদ্ধ :

ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার অন্তর্গত শুভপুর মধুগ্রাম অংশটি শুভ পূর্ব রাধানগর ইউনিয়ন এর অন্তর্গত শুভপুর-মধুগ্রাম মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর তীরে অবস্থিত এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে গুরুত্বপূর্ণ শুভপুর রেলওয়ে ও সড়ক ব্রিজটি এখানে অবস্থিত। শুভপুর ব্রিজকে নিজেদের  দখলে রাখার তাগিদে  মুক্তিবাহিনী এবং পাক হানাদার বাহিনীর মধ‍্যে দফায় দফায় যুদ্ধ হয়েছিল । মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাই এই স্থানের গুরুত্ব । চট্টগ্রামে অবস্থিত একমাত্র সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তান বাহিনীর অস্ত্র-সরঞ্জামাদি ঢাকা চট্টগ্রাম রোড ধরে এবং পরবর্তী সময়ে সারাদেশে সরবরাহ করা হত । তাই এর রণকৌশলগত গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত বেশি । তৎকালীন সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রামে যাতায়াতের এবং যোগাযোগের পথ ছিল ছাগলনাইয়ার শুভপুর হয়ে । মুক্তিযোদ্ধারা স্থির করলেন শুভপুর ব্রিজ ভেঙে দেওয়া গেলে পাকিস্তানি বাহিনী ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এ ব্রিজ অতিক্রম করে ঢাকা-চট্টগ্রামে প্রবেশ ও যোগাযোগ করতে পারবে না । সেজন্য মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজটি ধ্বংসের চেষ্টা চালায় । তেমনি ব্রিজটিও দখলে রাখার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয় হানাদার বাহিনী । শুভপুর ব্রিজ এর যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বলে স্বীকৃত । চট্টগ্রামের যত মুক্তিযোদ্ধা ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণও আশ্রয় নেন তারা এই শুভপুর ব্রিজ অতিক্রম করে গিয়েছিলেন । ভারতীয় বি এস এফের সহযোগিতায় ব্রিজের ১০ নম্বর পিলারের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলে এ অংশ হানাদার মুক্ত হয় । এপ্রিল ও মে মাসে বাংলাদেশ বাহিনী শুভপুর ব্রিজ শক্ত ঘাঁটি গেড়ে ছিল পাকিস্তান বাহিনী রামগড় দখল নেওয়ার পর শুভপুর ব্রিজ এর দক্ষিণ তীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতছাড়া হয়ে যায় । ৩ মে ১৯৭১ হরিনায় এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয় । তারপরেই এখানে স্যাটেলাইট ট্রেনিং সেন্টারও খোলা হয় । চট্টগ্রামের হাজার হাজার মানুষ যুদ্ধ করার জন্য শ্রীনগর, আমলিঘাট, সাব্রুম সীমান্তসহ অন‍্যান‍্য সীমান্ত দিয়ে হরিনা আসেন । এসব ভলান্টিয়ারদের দুসপ্তাহের ট্রেনিং দেওয়া হয় ত্রিপুরার হরিনা ইয়ুথ ক‍্যাম্পে, বগাফা ও অম্পিনগর সেনানিবাসে, আসামের হাফলং, তেজপুরে ও লায়লাপুরে, মেঘালয়ের তুরাসহ আরো কয়েকটি স্থানে । মুক্তিযোদ্ধারা শর্ট কোর্সে অটোমেটিক রাইফেল এল এম জি, এস এম জি, গ্রেনেড ও ২ ইঞ্চ মর্টার চালনা ও বিস্ফোরক ট্রেনিং নিয়ে জুন মাসে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন । জুন মাস থেকে মেজর রফিক গেরিলাদের দায়িত্ব নেন ও ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হন । তাঁকে সাহায্য করেন ক্যাপ্টেন এনাম, ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক‍্যাপ্টেন এম সুবিদ আলী ভুঁইয়া  (যিনি পরবর্তীকালে 'মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন )। সেসময় মেজর জিয়ার দায়িত্বে ছিল সম্মুখযুদ্ধের কোম্পানি জেড ফোর্স । জেড ফোর্সে ছিলেন শওকত আলী,ক‍্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন ওলি,ক‍্যাপ্টেন হামিদ ,ক্যাপটেন শামসুর রহমান, ল‍্যাফটেনান্ট খালিদ, ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট মিলে ৩০০ এর কাছাকাছি সৈনিক একটি স্টুডেন্ট প্ল‍্যাটুন ( ছাত্রলীগের বিএলএফ বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট ) জেড ফোর্স এর নিজস্ব হাইড-আউট ( হেডকোয়ার্টার ) ছিল  ত্রিপুরার এক রাজার পরিত্যক্ত বাড়ি 'পোয়াংবাড়ি'তে ।
১৯৭১সালের ২০ এপ্রিল ক্যাপ্টেন অলি আহমদের নেতৃত্বে শুভপুর ব্রিজ এর পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকবাহিনীর প্রচন্ড লড়াই হয় যুদ্ধে পাক বাহিনীর প্রায় ১০০ জন সৈন্য নিহত হয় ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান অবস্থান ছিল কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট । তারা বিভিন্ন ছোট ছোট উপদলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হত । তাদের পরিকল্পনা ছিল শুভপুর ব্রিজ পার হয়ে সামনে কোথাও তারা অবস্থান নেবে । মুক্তিবাহিনী ও স্থির করে রেখেছিল পাকিস্তানি বাহিনী যখন ব্রিজ অতিক্রম করবে তখনই তাদের বাধা দেওয়া হবে । তারা ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে কয়েকটি স্থানে অবস্থান নেয় । চারটে খন্ড খন্ড দলের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন এনাম, সুবেদার জালাল ও সুবেদার আবুল হোসেন । ১৮ জুলাই পাকিস্তানি বাহিনী ২টি কোম্পানি ও বেশকিছু যানবাহনসহ শুভপুর ব্রিজ পার হয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকে । সকাল ১০ টার দিকে তারা শুভপুর ব্রিজ অতিক্রম করে যখনই  ব্রিজের কাছে পৌঁছায় মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে তাদের আক্রমণ করে । হঠাৎ আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ১০ থেকে ১২ জন সদস্য নিহত হয় । ভয়ে তারা পালিয়ে যায় । পরদিন তারা পুনরায় অধিক শক্তি নিয়ে ফিরে আসে । মুক্তিবাহিনী পুরো রাস্তা জুড়ে মাইন পেতে রেখেছিল । মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের সামনে পড়ে তারা ব্যাপক ধ্বংসের সম্মুখীন হয় । তবুও তারা এগোতে থাকে । এক সময় পাকিস্তানী বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর দূরত্ব দাঁড়ায় মাত্র ৫০০ গজ । এই অবস্থায় ২০ দিন পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই চলে । যুদ্ধে পাকবাহিনীর ৬০ জন সদস্য নিহত হয় । তাদের ১০ টি যানবাহন ধ্বংস হয় । যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনী অধিকৃত গাড়ি থেকে প্রচুর খাদ্য সামগ্রী অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য মালামাল দখল করে । মুক্তি বাহিনীর পক্ষে ৫-৬ জন শহিদ হন । যুদ্ধের ফলে পাকিস্তানি বাহিনী ওই অঞ্চলে তাদের অবস্থান সুসংহত করতে পারেনি । ১৬ ডিসেম্বরও মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী শুভপুর ব্রিজের উপর দিয়ে লড়াই করে এগিয়ে চট্টগ্রাম দখলে নেন ।

বিলোনিয়ার প্রথম  যুদ্ধ :

১৯৭১ এর ১ জুন ১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের তিনটি কোম্পানির সমন্বয়ে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে  ত্রিপুরার মতাই এলাকা দিয়ে বাংলাদেশের বিলোনিয়াতে প্রবেশ করে  সীমান্ত থেকে মুহুরী নদী পর্যন্ত দক্ষিণ মুখী হয়ে অবস্থান গ্রহণ করে । এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ ( মুহুরী নদী সংলগ্ন এলাকায় ), ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান ( মাঝখানে ) এবং ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান ( ভারত সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ) । একই সময়ে ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারাও চারটি কোম্পানিতে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তে নোয়াপুর-জাম্বুরা হয়ে বিলোনিয়ায় প্রবেশ করে । এখানে মুহুরী নদীর তীর থেকে সীমান্ত পর্যন্ত বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমে মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান, ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম, ক্যাপ্টেন গফফার হালদার এবং লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম চৌধুরী । দুই নম্বর সেক্টরের সার্বিক নেতৃত্বে ছিলেন মেজর এম আমিনুল হক । ১৯৭১ সালের ৩ জূনের মধ্যে ১ও ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা বিলোনিয়া অবস্থানের সমস্ত প্রস্তুতি শেষ করেন । পাকিস্তানি বাহিনী বন্দুয়া-দৌলতপুর ও ছাগলনাইয়া থেকে অগ্রসর হলে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পড়ে । এতে ৬০-৭০ জন পাকসেনা নিহত হয় । ফলে তারা পিছু হটে যায় । ১৯৭১ সালের ৭ জুন ভোরে আবারো পাকবাহিনী অগ্রসর হতে থাকে । কিছুদুর এগোবার পর তারা আবার মুক্তি বাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়ে । এই আক্রমণে পাকিস্তানি সৈন্যদের ৫০-৬০ জন নিহত হয় । ৯ জুন পাকিস্তানী বাহিনী তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে এগোনোর চেষ্টা করে । মুক্তি বাহিনী তাদের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় । পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালালে মুক্তিবাহিনী পাল্টা জবাব দেয় । এভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২১ জুন পর্যন্ত দফায় দফায় মুক্তিবাহিনীর উপর ১১ বার ব‍্যর্থ আক্রমন চালায় । কিন্তু তারা মুক্তিবাহিনীর হাতে পর্যুদস্ত  হয় বারবার । এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ১৫ বেলুচ রেজিমেন্ট, ২৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স এবং ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সের বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে এককভাবে লড়াই করে মুক্তিবাহিনী ।
পরবর্তীতে ২১ জুন সন্ধ্যায় পাকবাহিনী তিনটি এসআই-৮ হ‍্যালিকপ্টার দিয়ে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানের প্রায় পাঁচশো গজ পেছনে দুই দফায় সৈন‍্য অবতরণ করায় । ফলে মুক্তিবাহিনী কিছুটা বেকায়দায় পড়ে যায় । মেজর খালেদ মোশাররফ রণাঙ্গনে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেন বাহিনীকে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে অবস্থান নেওয়ার । ফলে ২৪ জুন রাতে মুক্তিযোদ্ধারা ভারতে আশ্রয় নেয় । এভাবে বিলোনিয়া প্রথম যুদ্ধের অবসান ঘটে ।

বিলোনিয়া দ্বিতীয় যুদ্ধ :

বিলোনিয়ার দ্বিতীয় যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি মাইলফলক । বিশ্বের সামরিক কলেজের 'ব্যাটেল অফ বিলোনিয়া বালজ' অর্থাৎ 'বিলোনিয়ার যুদ্ধ' পড়ানো হয় ।
এই যুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টর থেকে মেজর মাহফুজুর রহমান ও ২ নম্বর সেক্টর থেকে ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম দায়িত্ব নিয়ে মুহুরী নদী বরাবর পূর্ব পশ্চিম দিকে ২ টি সেক্টরে ভাগ করে বাহিনী নিয়ে অবস্থান নেন। ৫ নভেম্বর ৫.৩০ মিনিটে এ তারা বিলোনিয়াতে প্রবেশ করেন । ২ রাজপুতের একটি প্ল‍্যাটুন ও আর্টিলারি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ছিল ৫, ৬ ও ৭ তারিখ উভয়পক্ষে তুমুল লড়াই হয় । ৮ তারিখ পরশুরাম ও বিলোনিয়া   মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে ‌। ৯ নভেম্বর বিকাল ৩.৩০ মিনিটে তিনটি পাক বিমান মুক্তিবাহিনীর উপর বোমাবর্ষণ করে । একজন মুক্তিযোদ্ধা ঘটনাস্থলেই মারা যান । ১০ নভেম্বর শত্রুপক্ষ চিতলিয়া ও কাপ্তান বাজার থেকে আক্রমণ চালায় । এ দিন বিকাল ৩.৩০ এ পাক বাহিনীর চারটি বিমান দিয়ে আবারও আক্রমণ চালানো হয়  মুক্তিবাহিনীর উপর । মুক্তিযোদ্ধারা সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ প্রতিহত করে । ১২ নভেম্বর  পাকিস্তানী সেনারা।ওই এলাকা ত্যাগ করে । ২ রাজপুতের লেফটেনান্ট কর্নেল দত্ত ও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিক মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন । এই যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ৬ জাঠ, ৩২ মাহার, ৮ বিহার, ৩ ডোগরা  রেজিমেন্ট, ১১ পঞ্জাব রেজিমেন্ট এর জওয়ানগণ, ব্রিগেডিয়ার আনন্দস্বরূপ, ব্রিগেডিয়ার সান্ধু, লে. কর্নেল বিশলা, ক‍্যাপ্টেন বাজওয়া, ল‍্যাফ. কর্নেল ওমপ্রকাশ শর্মা, ল‍্যাফ. কর্নেল হিম্মৎ সিং, ল‍্যাফ. কর্নেল ভিড়ক, ল‍্যাফ. জেনারেল সাগাত সিং, ল‍্যাফ. কর্নেল হরগোবিন্দ সিং, মেজর জেনারেল হীরা, ক‍্যাপ্টেন পি কে ঘোষ ও মেজর গুরুং প্রত‍্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন ।
এরপর মুক্তিবাহিনী দ্রুত ফেনীর দিকে অগ্রসর হতে থাকে । পথে পথে পাক বাহিনীর ছোটো ছোটো দলের সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকে । ক্রমশ তাদের মনোবল ভেঙে পড়তে থাকে ।
একসময় ফেনীও হানাদারমুক্ত হয়ে পড়ে । মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টরের কমান্ডার যুদ্ধের প্রত‍্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন–
'ফেনী পাক হানাদারমুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর। ’৭১-এর এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ সমরে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ফেনীর মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ে । ফেনী অঞ্চলের মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত আমি তৎকালীন ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম (পরবর্তীতে লে. কর্নেল) ভারতের বিলোনিয়া ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল থেকে ১০ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অভিযান চালিয়ে বিলোনিয়া, পরশুরাম, মুন্সীরহাট, ফুলগাজী হয়ে যুদ্ধ করতে করতে এগোতে থাকলে পর্যুদস্ত হয়ে ফেনীর পাক হানাদার বাহিনীর একটি অংশ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী হয়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের রাস্তায় এবং অন্য অংশ শুভপুর ব্রিজের ওপর দিয়ে চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধে ফেনীর অনেক রণাঙ্গনের মধ্যে মুন্সীরহাটের মুক্তারবাড়ি ও বন্ধুয়ার প্রতিরোধের যুদ্ধ ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছে। প্রথম বিলোনিয়া যুদ্ধে মুন্সীরহাটে পাক বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে প্রথম শহীদ হন হাবিলদার নূরুল ইসলাম। এ যুদ্ধে পাকিস্তানের প্রায় ৩০০ সেনা হতাহত হয়েছিল। হাবিলদার নূরুল ইসলাম বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। বিধ্বস্ত নূরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা দেখে যেতে পারলাম না। স্যার, আপনারা চালিয়ে যান। আমাদের রক্ত যেন বৃথা না যায়। ’ কালিমা পড়ে জয় বাংলা বলে আমাদের থেকে বিদায় নেন নূরুল ইসলাম । { দেখেছি আনন্দাশ্রু, স্বজন হারানোর বেদনা–কর্নেল জাফর ইমাম ( অব. )বীরবিক্রম– Feni Online, Dec. 6.2018 } 

ফেনী ও নোয়াখালির এমন  বহু যুদ্ধেই ১ নম্বর সেক্টরের সৈন‍্যগণ, সীমান্তসংলগ্ন বি এস এফ পোস্টে কর্মরত সৈনিকগণ, বগাফা বি এস এফ ক‍্যাম্পের সৈনিকগণ  প্রত‍্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন । সেসময়ের বিলোনিয়ার ও সাব্রুমের ছাত্র যুব নেতারাও বিভিন্ন ভাবে ছাত্রলীগের বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টকে সাহায্য করেছিলেন ।

দুংখের বিষয় মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ও মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণকেন্দ্র আজ বিস্মৃতির অতলতলে হারিয়ে গেছে । এখানকার কবরে শায়িত মুক্তিযোদ্ধারা সামান‍্য একটু স্বীকৃতির জন‍্যে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন ।

Saturday, May 2, 2026

'এসো হে বৈশাখ' : নববর্ষের ভাবনা

'এসো হে বৈশাখ' : নববর্ষের ভাবনা

চৈত্রসংক্রান্তির পর দিনেই আসে পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ নববর্ষের প্রথম দিন । এটি কেবল বর্ষপঞ্জির একটি পরিবর্তন নয় । বরং বাঙালির চিরন্তন সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ । এই দিনে মানুষ নতুন পোশাক পরে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটান, দেখা-সাক্ষাৎ করেন  এবং আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন ।সেইসঙ্গে নানাধরনের উপাদেয় খাওয়াদাওয়ায় মেতে ওঠেন ।  ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা শুরু করেন ।‌ যার নাম 'হালখাতা' । মহাজনের গদিতে এদিন সিদ্ধিদাতা গণেশ, গন্ধেশ্বরী কিংবা লক্ষ্মীপূজা দেওয়া হয় । পুরোনো দেনাপাওনা চুকিয়ে নতুন সূচনার প্রতীক এই 'হালখাতা' । সারা বছরের ক্রেতারা এদিন ব্যবসায়ীর দোকানে বা গদিতে আসেন এবং মিষ্টিমুখে আপ্যায়িত হন । সেই সঙ্গে খদ্দের পুরনো বকেয়ার আংশিক বা সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি ঘটান । গৃহস্থবাড়িতে হয় গৃহদেবতার পূজা । অনেকে মন্দিরে গিয়ে পূজা দিয়ে পারিবারিক সুখ সমৃদ্ধি জন্য প্রার্থনা করেন । গুরুজনদের প্রণাম জানান । ছোটোদের স্নেহাশীর্বাদ করেন । মুসলিমদের মধ্যেও এদিন নামাজ আদায়ের রীতিনীতি প্রচলিত রয়েছে । ত্রিপুরার জনজাতিদের মধ্যেও চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষের শুরুতে 'বিজু', 'বুইসু', বিসিকাতাল ও 'সাংগ্রেই' উৎসব পালনের রীতি রয়েছে ।

এক সময় বাঙালি জীবনঅর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর । সেকারণে কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতি ছিল জীবনের কেন্দ্রে । এই বর্ষগণনা পদ্ধতি ও কৃষিকে নির্ভর করেই নিরূপণ করা হয় । 'মেষোদয়ো দ্বদশৈতে মাসাস্তৈরেব বৎসরঃ' । অর্থাৎ বৈশাখ থেকে চৈত্রমাস মেষাদিক্রমে দ্বাদশ রাশির বসতি । পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জি উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত । কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ কমই । মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন । পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা পাওনার হিসাব মেটানো । বিশ্বের বড়ো বড়ো উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক বা জাতিকেন্দ্রিক । এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম বাঙালির পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজন । বাংলা সনে প্রথম দিন সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) কর আদায়ের সুবিধার্থে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এই 'ফসলি সন' প্রবর্তন করেছিলেন, যা কাল ক্রমে 'বাংলা সন' নামে পরিচিতি লাভ করে । মূলত জমিদার ও কৃষকদের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয় ।

বাংলা নববর্ষকে আবেগপূর্ণ করে তোলার ক্ষেত্রে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল অসীম । উনিশ শতকে তিনি এই পহেলা বৈশাখকে আনুষ্ঠানিকতায় রূপদান করেছিলেন, । রবীন্দ্রনাথও তাঁর জমিদারিতে 'পুণ্যাহ' বা খাজনা আদায়ের উৎসব হিসেবে নববর্ষের সূচনা করেছিলেন । রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন–'সেদিন ছিল যাকে বলে জমিদারি সেরেস্তার 'পুণ্যাহ', হোক খাজনা আদায়ের প্রথম দিন । কাজটা নিতান্তই বিষয়-কাজ । কিন্তু জমিদারি মহলে সেটা হয়ে উঠেছে একটি পার্বণ ।  সবাই খুশি । যে খাজনা দেয় সেও, আর যে খাজনা বাক্সতে ভর্তি করে সেও । এর মধ্যে হিসেব মিলিয়ে দেখার গন্ধ ছিল না । যে যা দিতে পারে তাই দেয়, প্রাপ্য নিয়ে কোন তকরার হয় না । খুব ধুমধাম পাড়াগেঁয়ে সানাই অত্যন্ত বেসুরে আকাশ মাতিয়ে তোলে । নতুন কাপড় পরে প্রজারা কাছারিতে সেলাম দিতে আসে ।' সেকালে জমিদারি মহলে এই পুণ্যাহ একটা পার্বণে পর্যবসিত হত । এই উপলক্ষে জমিদারদের ব্যয়ের বহরও ছিল বিশাল । যতটা না আয় হত অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি ব্যয় হতো তবুও তাঁরা এবং প্রজারা খুশি থাকতেন । সে কারণেই 'খাজনা থেকে বাজনা বেশি' প্রবাদটির উৎপত্তি ।

আজ বিশ্বায়নের কালে বাঙালির কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বনিয়াদ পরিবর্তিত হয়ে গেছে । গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহর মুখে হচ্ছেন । রোজগার এবং কর্মের কারণে বাঙালি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে । তারপরও আজও বাঙালি যেখানে গেছে সেখানেই এই দুদিনের উৎসবকে ঘটা করে পালন করার প্রচেষ্টা দেখা যায় । এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ঐতিহ্য ও জীবন দর্শনের এক অনন্য প্রতিফলন পুরনো কে বিদায় জানিয়ে নতুনকে বরণ করার এই চিরন্তন প্রক্রিয়ায় বাঙালি জীবনের গতিশীলতাকে ধরে রেখেছে । অর্থনৈতিক কারণেই এখন আর রাত জেগে বাড়ি বাড়ি গাজন নৃত্য দেখা যায় না । পাশাপাশি একান্নবর্তী পরিবারগুলোও ভেঙে যাওয়ার ফলে অনেক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও এখন কমে গেছে । ফলে আজকের বাঙালি সমাজ অনেকটা শেকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন । আর শেকড় থেকে ছিন্ন হলে একটা জাতি তার অস্তিত্বের সংকটে পড়ে । সে কারণেই বাঙালি আজ সংকটাপন্ন জাতি । বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের সংস্কৃতির উত্তরাধিকার পুনরায় অর্জন করতে হলে তাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে । লালন করতে হবে নিজস্ব সংস্কৃতিকে । রবীন্দ্রনাথ বাঙালির এই সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিলেন । তিনি শুরু করেছিলেন বর্ষবরণ, হলকর্ষণ, বর্ষাবরণ, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি নানা অনুষ্ঠান । তাঁর সাহিত্যে, গানে, কবিতায় বর্ষশেষ এবং নতুন বর্ষকে নিয়ে অনেক কথা তিনি বলেছেন । আজীবন তিনি বিশ্ব প্রকৃতির অখন্ডতাকে অনুভব করেছেন । রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'চৈতালি' কাব্যগ্রন্থের 'বর্ষশেষ' কবিতার এক জায়গায় লিখেছেন–

'পাখিরা জানে না কেহ আজি বর্ষ শেষ,
বকবৃদ্ধ কাছে নাহি শুনে উপদেশ ।
যতদিন এ আকাশে এ জীবন আছে,
বরষের শেষ নাহি তাহাদের কাছে ।
মানুষ আনন্দহীন নিশিদিন ধরি, 
আপনার এই ভাগ করে শতভাগ করি ।'

কবিতায় নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশ করেছেন তিনি । সত্য রূপকে শিল্পরূপ দান করেছেন এই কবিতায় এক অনবদ্য ভাষায় । মানুষ খন্ড, বিশ্বপ্রকৃতি অখন্ড–এই বোধ, এই চেতনায় বর্ষশেষের ভাবনাকে অভিনব শিল্পরূপ প্রদান করেছেন রবীন্দ্রনাথ । বর্ষশেষ এবং নববর্ষের মধ্যে রয়েছে এক অদ্ভুত মিল সে মিল হল মানুষের কল্যাণচেতনা এবং মানুষের মঙ্গলভাবনার যুগলবন্দী ।

শুভ নববর্ষ । প্রীতি ও শুভেচ্ছা সকলের জন্যে ।

Friday, May 1, 2026

পূর্ববাংলা : রবীন্দ্রসৃজনের ভূগোল, জীবন ও জল-হাওয়া

পূর্ববাংলা : রবীন্দ্রসৃজনের ভূগোল, জীবন ও জল-হাওয়া

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

রবীন্দ্রনাথ ১৮৮৯–১৯০১ সাল পর্যন্ত শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ও কালিগঞ্জ অঞ্চলে কবির জীবনের ২৮ থেকে ৪০ বছর সময়কালের ১২ বছর অতিবাহিত করেন । পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথকে বিয়ের দুদিন আগে ২২ অগ্রাহায়ন ১২৯০ বঙ্গাব্দে একটি চিঠিতে তার পূর্ববঙ্গের জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব অর্পণ করেন । সেই চিঠিতে তিনি লেখেন–'এইক্ষণে তুমি জমিদারীর কার্য পর্যবেক্ষণ করবার জন্য প্রস্তুত হও; প্রথমে সদর কাছারিতে নিয়মিত রূপে বসিয়া সদর আমিনের নিকট হইতে জমা ওয়াশিল বাকি ও জমাখরচ দেখিতে থাক এবং প্রতিদিনের আমদানি রপ্তানি পত্র সকল দেখিয়া তাহার সারমর্ম নোট করিয়া রাখ ।' ( রবিজীবনী, তৃতীয় খন্ড, কলকাতা : আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. ২০০৯ । পৃষ্ঠা ১১৯ ) । তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স মাত্র ২২ বৎসর সেই থেকে ক্রমে রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতার জমিদারি সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে থাকেন । রবীন্দ্রনাথের জীবনপঞ্জি অনুযায়ী দেখা যায় যে আরও প্রায় ছয় বছর পরে তার আঠাশ বছর বয়সে ১৮৮৯ সালের ২৮শে নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের জমিদারির দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন । ( তদেব ) ।

রবীন্দ্রনাথের জীবনে শিলাইদহপর্ব তাঁর কল্পনার জগতকে সমৃদ্ধিদানের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করেছে । এই পর্ব রবীন্দ্র সাহিত্যের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল সময় । কলকাতার নাগরিক পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে পূর্ববঙ্গের খোলা প্রকৃতি ও সহজ মানুষের সংস্পর্শে এসে তার ভাষা সহজ হয়েছে দৃষ্টি মানবিক হয়েছে সুর লোকায়ত হয়েছে । শিলাইদহ, পতিসর, শাহজাদপুর ও কালীগঞ্জে রবীন্দ্রনাথ লেখালেখির উৎকর্ষতার সুযোগ পান । রবীন্দ্রনাথের এই পর্বের সৃষ্টিকে গবেষকগণ শিলাইদহপর্ব বলে আখ্যায়িত করেন । এখানে এসে তিনি পরিচিত হন গ্রাম বাংলার উদার শ্যামল প্রকৃতির সঙ্গে । জমিদারি দেখাশোনার সূত্রে তিনি গ্রাম বাংলার নদী মাঠ মানুষ ও ভাষার একেবারে ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলেন সেই অভিজ্ঞতাই তার সাহিত্য গান ও চিন্তায় গভীর ছাপ ফেলেছে । এখানকার পদ্মা, গড়াই, আত্রাই, নাগর, বড়াল ও ইছামতি নদী তাঁকে প্রতিনিয়ত হাতছানি দিয়ে ডেকেছে । সর্বোপরি এখানকার দরিদ্র চাষি জনগণের জীবন দেখেছেন তিনি খুব কাছে থেকে । তাদের চিরক্রন্দনময় জীবন দেখে তিনি চঞ্চল হয়ে উঠেছেন । তিনি লিখেছেন–'কেবলই ভাবছি আমাদের দেশজোড়া চাষীদের দুঃখের কথা । আমার যৌবনের আরম্ভ কাল থেকেই বাংলাদেশের পল্লীগ্রামের সঙ্গে আমার নিকট পরিচয় হয়েছে । তখন চাষীদের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ ছিল দেখাশোনা–ওদের সব নালিশ উঠেছে আমার কানে । আমি জানি ওদের মতো নিঃসহায় জীব অল্পই আছে, ওরা সমাজের যে তলায় তলিয়ে সেখানে জ্ঞানের আলো অল্পই পৌছয়, প্রাণের হাওয়া বয় না বললেই হয় ।' ( রাশিয়ার চিঠি, রবীন্দ্ররচনাবলী, পৃষ্ঠা ৬৮৩ ) । জমিদার হয়েও তিনি প্রজাদের দুঃখ, খাজনার চাপ, মহাজনের শোষণ সম্বন্ধে লিখেছেন । দুই বিঘা জমি, সমাপ্তি, হৈমন্তী গল্পে পূর্ববঙ্গের কৃষি জীবনের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে ।

পূর্ববঙ্গের সঙ্গে কবির সম্পর্ক ছিল অবিনাশী । পদ্মা, ইছামতি, গড়াই এই নদীগুলো তার সাহিত্যে বারবার ফিরে আসে । পদ্মার তরঙ্গ-বিভঙ্গে নৌকায় ভেসে ভেসে তিনি নিবিড়ভাবে অবলোকন করেছেন এ অঞ্চলের শান্ত শ্যামল পল্লীপ্রকৃতি ও সহজ সরল প্রজাসাধারণ ও তাদের জীবনযাত্রা । রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ পর্বে সৃষ্টি হয়েছে সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কথা, কাহিনী, কল্পনা, কণিকা, ক্ষণিকা, নৈবেদ্য ইত্যাদি ঐশ্বর্যময় কাব্য সম্ভার । 'সোনার তরী' কাব্যে পদ্মার তীর, বর্ষার বন্যা, নৌকা, চর ক্ষেতের ফসল, চাষির জীবন, নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি । 'সোনার তরী' কবিতায় ১) গান গেয়ে তুলিবে কে আসে পারে দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে ২ ) রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা ৩ ) পরপারে দেখি আঁকা তরু-ছায়া মুসলিম মাখা, গ্রামখানি মেঘে ঢাকা প্রভাতবেলায় ৪ ) ভরা নদী ক্ষুরধারা খর পরশা  ইত্যাদি পংক্তিতে ঔপদ্মাতীরের নয়নমুগ্ধকর চিত্র ফুটে উঠে । তাঁর 'নৌকাডুবি' উপন্যাসে নদী শুধু পটভূমি নয় । চরিত্রের মতো । নদীর ভাঙাগড়া, বন্যা, মাঝি-জেলের জীবন সবই তিনি কাছে থেকে দেখেছেন । 

'চিত্রা' কাব্যের বিষয়বস্তু সৌন্দর্যবোধ হলেও গ্রামীন চাষিজীবনের সংকট ফুটে উঠেছে 'এবার ফেরাও মোরে' কবিতায় । দরিদ্র চাষিদের সংকটমোচনের জন্য তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন–'এইসব মূঢ় ম্লান মুখ মুখে / দিতে হবে ভাষা–এইসব শান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা–' । 'চৈতালি' কাব্যে পদ্মাকে নিয়ে রয়েছে কবিতা, 'হে পদ্মা আমার /তোমায় আমায় দেখা শত শত বার ।' 'কথা' ও 'কাহিনী' কাব্যে বারবার এসেছে পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের কথা । 'দুই বিঘা জমি'র উপেন মিথ হয়ে আছে । এর কাহিনি নাকি রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফল । এই কবিতায় তিনি পূববাংলার পল্লীপ্রকৃতির একটি চিত্র তুলে ধরেন–'ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি / পল্লব ঘন আম্রকানন রাখালের খেলা গেহ / স্তব্ধ অতল দিঘি কালো জল নিশীথ শীতল স্নেহ / বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে / মা বলিতে প্রাণ করে আনচান চোখে আসে জল ভরে ।' ক্ষণিকা কাব্যেও রয়েছে নিসর্গ ও মানুষ । পূর্ববঙ্গের বর্ষা শরৎ কাশফুল শালিক দোয়েল তার গানে কবিতায় অজস্রবার এসেছে । 'আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে' ও 'ও আমার দেশের মাটি' এই গানগুলো পূর্ববঙ্গের মাটির গন্ধ মাখা । 'আষাঢ়' ও 'নববর্ষা' কবিতায় বর্ষার গুরুগম্ভীর রূপ প্রকাশ পেয়েছে । 'নৈবেদ্য' কাব্য প্রকাশের সময় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে বসবাস শুরু করেন । নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থে ঈশ্বরোপলব্ধির ভূমিকা প্রধান থাকলেও বাংলার দিগন্তপ্রসারী উদার প্রকৃতির প্রভাবও রয়ে গেছে তাঁর সৃষ্টিতে ।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের ৯৪টি গল্পের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি গল্প তিনি রচনা করেছেন শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে অবস্থানকালে । গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনের অন্তর্নিহিত সুখদুঃখ, আশানিরাশা, কৃষ্টিসংস্কৃতির জীবন্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় তাঁর ছোটোগল্পসমূহে । আঞ্চলিক শব্দ ও বাগধারা, পূর্ববঙ্গের লোকমুখের শব্দ রবীন্দ্রনাথের গদ্য ও কবিতায় উঠে এসেছে । শিলাইদহপর্বের ছোটোগল্প পোস্টমাস্টার, সমাপ্তি, ছুটি, অতিথি এসবে পূর্ববঙ্গের গ্রামের মানুষের মুখের ভাষার স্বাভাবিক ছন্দ পাওয়া যায় । অতিরিক্ত সংস্কৃত ভাষা শব্দের বদলে সহজ সরল প্রাণবন্ত গদ্য উঠে এসেছে তাঁর লেখায় । পূর্ববাংলায় বসে লেখা তাঁর গল্পগুলোতে বাংলাদেশের শ্যামল সুন্দর প্রকৃতি, অজ্ঞ, অসহায়, অশিক্ষিত ও দরিদ্র জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি জমিদারি শাসনের নেতিবাচক শৃংখলে পর্যুদস্ত জীবনচিত্র ও প্রতিফলিত হয়েছে । তাঁর রচিত 'ছুটি', 'পোস্টমাস্টার', 'সমাপ্তি', 'দেনা পাওনা' 'রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা', 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন' ইত্যাদি গল্পে কৃষক, গৃহিণী, দরিদ্র প্রজা, জমিদারের কর্মচারী, এমনকি গ্রামীন বালকের জীবন সংগ্রাম দুঃখ-কষ্ট নিঃসঙ্গতা ও নীরব অভিমান অত্যন্ত সুনিপুণভাবে উঠে এসেছে । পূর্ববঙ্গের গৃহবধূ, কিশোরী, বিধবার যে অবরুদ্ধ জীবন তিনি দেখেছেন তা স্ত্রীর পত্র, নষ্টনীড় ও যোগাযোগ উপন্যাসে উঠে এসেছে । 'পোস্টমাস্টার' গল্পে গ্রামীন জনপদের নিঃসঙ্গ পোস্টমাস্টার ও ছোটো রতনের মধ্যে আবেগময় সম্পর্কের মানবিকতা, 'ছুটি' গল্পে ফটিক চরিত্রের মাধ্যমে গ্রামীণ বালকের জীবনযুদ্ধ, 'দেনা পাওনা'য় পণপ্রথা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীর অসহায়ত্ব,  'সমাপ্তি' গল্পে গ্রামীন শিক্ষকের সহজ জীবন ও স্বাভাবিক প্রেমের বিকাশ এগুলো শুধু শিল্প সুষমায় সমৃদ্ধ নয় বরং গ্রামবাংলার ইতিহাস, জীবনপ্রবাহ ও সংস্কৃতির অনন্য দলিল ।

পূর্ববাংলার নদীমাতৃক প্রকৃতি লোকজ  জীবনধারা, নদী, নৌকা, কৃষিজীবন ও লোকসংগীত রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে । তিনি বাংলার লোকসংস্কৃতি ও লোকগানের সহজ সরল আবেগপ্রবণ ধারাকে আধুনিক সাহিত্যে ও সঙ্গীতে ব্যবহার করে নতুন মাত্রা দিয়েছেন । বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তনের সুর ও শব্দবন্ধ তার গানে মিশে গেছে । 'গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ', 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে'– এসব গানের দেহতত্ত্ব ও সুরের শিকড় পূর্ববঙ্গের লোকজীবনে ।  নদী ও নৌকার সঙ্গে সম্পর্কিত ভাটিয়ালি গানের সুর ও ছন্দ রবীন্দ্রসংগীতে অনেকবার ব্যবহৃত হয়েছে । 'এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে জয় মা বলে ভাসা তরী' এই জাতীয় গানের উদাহরণ । লোকগানে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দ, সহজ, সরল, ভাষাব্যবহার ও চিত্রকল্প রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায় সাবলীলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে । ফলে তাঁর সৃষ্টি সর্বজনগ্রাহ্য আবেদন এনে দিয়েছে । তিনি লোকসংগীতের ঢঙে নতুন নতুন সুর সৃষ্টি করেছেন । আবার কখনো সরাসরি লোকসুর ব্যবহার করেও গান রচনা করেছেন । রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালের শ্রাবণ ( ৭ই আগস্ট ) রচনা করেছিলেন 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' গানটি । এই গানটি গগন হরকরার 'আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে' গানটির সুরে রচিত । এই গানটি এতটা জনপ্রিয় হয়েছিল যে ৭১এ বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে মুখে ফিরত । পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রূপে গানটি গৃহীত হয় । লোকসংগীতের মধ্যে যে আধ্যাত্মিক আবেদন রয়েছে তেমনি রবীন্দ্রনাথের অনেক গান ও কবিতার মধ্যে ঈশ্বরোপলব্ধি বা জীবনের গভীর সত্যের অনুসন্ধান লক্ষ্য করা যায় । 'রূপ সাগরে ডুব দিয়েছি অরূপ রতন আশা করে',  'তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি',  'তাই তোমার আনন্দ আমার পর তুমি তাই এসেছ নিচে /তোমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর আমার প্রেম হতো যে মিছে' গানগুলো এ প্হঙ্গে উল্লেখ করা যায় ।' শিলাইদহে বাউলদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিবিড় পরিচয় ঘটে । এখানে অবস্থানকালে গগন হরকরা, কাঙাল হরিনাথ, গোঁসাই রামলাল, গোসাই গোপাল, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী, লালনের শিষ্যসামন্তদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখাসাক্ষাৎ ও আলোচনা হত । শিলাইদহ ও ছেঁউড়িয়া থেকে তিনি লালন ফকির ও গগন হরকরার গান সংগ্রহ করে বিদগ্ধ মহলে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন । রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত গানগুলো 'বাউল' নামে গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়েছিল । তিনি তাঁর কয়েকটি নাটকেও বাউল গান ব্যবহার করেছেন । 'মানুষের ধর্ম' গ্রন্থে ঔপনিষদীয় আত্মতত্ত্ব ও বাউল দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা তিনি করেছেন । তাঁর চিত্রাঙ্গদা ও চন্ডালিকা নাটকে লোকজ আঙ্গিক এবং নারীচেতনার দেশজ স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে । এই নাটক দুটিতে সমাজের নারী, জাতপাত ও মূল্যবোধের জটিলতাকে শিল্পিত ও মানবিক রূপে উপস্থাপন করেছেন ।

রবীন্দ্রনাথের গদ্য ও পদ্যে বহুবার পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক শব্দ, ধ্বনি ও বাক্যবন্ধ ব্যবহৃত হয়েছে । যেমন সাজু, লাউ, চাষা, নাও, মাঝি, ডিঙি, পাল, খাল, বিল, ডাঙা, গাঙ, জোয়াল, তালগাছ ইত্যাদি শব্দ তাঁর রচনায় দেখা যায় । শিলাইদহে থাকাকালীন তাঁর ভ্রাতুস্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে লেখা পত্রসমূহ 'ছিন্নপত্রে' যেমন পূর্ববঙ্গের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের বর্ণনা রয়েছে তেমনি সেখানকার মানুষের মুখের ভাষা ও উচ্চারণের ছাপ স্পষ্ট । তার উদাহরণ, 'চাষার ভাষায়, মহারাজ ফসল ভালো হয় নাই, তবে আল্লার কৃপা হইলে বাঁচুম ।' এই জাতীয় সংলাপ তাঁর জীবন ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের উদাহরণ ।

তাঁর বিসর্জন, ডাকঘর, মালিনী নাটকে সহজিয়া ভাষাব্যবহারের ছাপ রয়েছে । সংলাপে গানে আঞ্চলিক শব্দ ও লোকজ ভাষাভঙ্গের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় । যেমন–রে !ওরে !হে দাদা ! বাপু তুমি না কেমন করো না রে ! তুই বড় গেঁয়ো জাতীয় শব্দ নাটকের চরিত্রদের সংলাপে ব্যবহৃত হয়েছে । 'চন্ডালিকা' নাটকের একটি সংলাপে দেখি–'তুমি তো জাতের লোক, আমি তো চন্ডালের মেয়ে ' জাতপাতের লোকজ দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব । 'মুকুট' নাটকে 'ওগো রে ! মুকুট যে মাথার উপর বসে সেই জানে ওটা কত ভারী ।' প্রবাদপ্রতিম বাক্যে একদিকে দার্শনিকতা আবার অন্যদিকে লোকজবোধের প্রকাশ ঘটে । নবান্ন, পৌষমেলা, নৌকাবাইচ, বারোয়ারি পুজো, এসবের বর্ণনা তাঁর ছিন্নপত্র ও প্রবন্ধ সমূহে রয়েছে । শান্তিনিকেতনের পৌষমেলার ধারণাও এসেছে পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ মেলা থেকে । রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী গড়ার পেছনেও এই গ্রামজীবনের শিক্ষা কাজ করেছে । 'যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন'– এই বোধ তিনি পদ্মারপাড় থেকেই পেয়েছিলেন । ভূত-প্রেত, পির, ফকির, ব্রতকথা এসব তিনি কুসংস্কার হিসেবে না দেখে মানুষের মনোজগতের অংশ হিসেবে ধরেছেন । কঙ্কাল, ক্ষুধিত পাষাণ গল্পে এর ছায়া রয়েছে ।

১৯০১ সালের পর রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ থেকে গিয়ে শান্তিনিকেতনে বসবাস করলেও পরবর্তী সময়ে বহুবার শিলাইদহ এসেছেন । এখান থেকেই তিনি সংগ্রহ করেছেন তাঁর সারাজীবনের সৃজনের সঞ্চয় । এ প্রসঙ্গে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ তাঁর 'পিতৃস্মৃতি' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন–'আমার ধারণা বাবার গদ্য ও পদ্য দু'রকম লেখারই উৎস যেমন খুলে গিয়েছিল শিলাইদহে, একদিনের জন্য কলম বন্ধ হয়নি । শিলাইদহের যে রূপবৈচিত্র তার মধ্যেই পেয়েছিলেন তিনি লেখার অনুকূল পরিবেশ ' । এই পূর্ববাংলার জল, মাটি, হাওয়া, নদী ও মানুষের মধ্যেই রবীন্দ্রমানসের, রবীন্দ্রমননের সূচনা হয় । রবীন্দ্রনাথের পরবর্তীজীবনে আঁকা চিত্রসম্ভারেও শিলাইদহ তথা পূর্ব বাংলার প্রভাব নিহিত ছিল । রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতরণি একদিন পূর্ববঙ্গেরই সোনার ধানে ভরে গিয়েছিল ।