Wednesday, June 24, 2026

ত্রিপুরারাজ্যের পুরাকাহিনি, ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চার ধারা

ত্রিপুরারাজ্যের পুরাকাহিনি, ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চার ধারা

১) ত্রিপুরা রাজ্যের পরিচয় : অতীত থেকে বর্তমান

ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের একটি ক্ষুদ্র রাজ্য হল ত্রিপুরা। এই রাজ্যের বর্তমান আযতন হল১০৪৯১'৬৯ বর্গ কিলোমিটার । ২০১১ সালের লোক গণনা অনুযায়ী ছিল মোট ৩৬ লক্ষ ৭১ হাজার ৩২ জন  । তারপর রাজ্যের অনেক পরিবর্তন হয়েছে । লোকসংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে । ত্রিপুরা বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠীর আদিভূমি । প্রাচীনকাল থেকেই এরা এখানে বসবাস করে আসছে । ১৯৪৯ সালে স্বাধীনোত্তরকালে ত্রিপুরা ভারতভুক্তির পরে এটি পৃথক প্রদেশরূপে স্বীকৃত হয় ত্রিপুরার মূল আদিবাসীদের ত্রিপুরী বা 'বরক' বলা হয় । ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সন্নিহিত অঞ্চল বা দেশ থেকে এরাজ্যে প্রবেশ করেছে দলে দলে অউপজাতীয় মানুষ । এর ফলে এখানে পরবর্তীকালে মিশ্র সংস্কৃতি বা কৃষ্টির সৃষ্টি হয় । ত্রিপুরা নামকরণের পশ্চাতে সত্যিই মিথ্যে মিলিয়ে নানা পৌরাণিক উপাখ্যান ও জনশ্রুতি রয়েছে । 

এ রাজ্যের ইতিবৃত্ত রাজমালায় উল্লেখিত হয়েছে যে, মহাভারতে বর্ণিত চন্দ্রবংশীয় রাজা যযাতি ছিলেন প্রচণ্ড প্রতাপশালী শাসক । তার বংশে জন্ম নেয় দ্রুহ্য নামে এক মহাশক্তিশালী রাজা । তিনি রাজা হলেন কিরাত দেশের । দ্রুহ্য তার রাজ্যপাট আসামের ত্রিবেগ নামক স্থানে স্থাপন করেন । রাজমালায় আছে–

'ত্রিবেগস্থলেতে রুদ্র নগর করিল 
কপিল নদীর তীরে রাজ্যপাট ছিল' ।

ভারতের মানচিত্রে প্রাচীন ত্রিবেগ রাজ্যের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না । প্রাচীনকালের ত্রিবেগ বর্তমান যুগে কি নাম ধারণ করেছে সে নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে এখনো মতভেদ আছে । সে যুগে ত্রিবেগের সীমানা ছিল পূর্বে মেখলি, পশ্চিমে কোচবঙ্গ, উত্তরে তৈরঙ্গ নদী এবং দক্ষিণে আচরঙ্গ । সংস্কৃত রাজমালায় আছে–
'যস্য  রাজস্য পূর্ব্বাস্যাং মেখলিঃ সীমতাং গতঃ ।
 পশ্চিমস্যাং কোচবঙ্গোদেশঃ সীমতি সুন্দরঃ । 
উত্তরে তৈরঙ্গ নদী সীমতাং যস্য সঙ্গতা ।
 আচরঙ্গ নাম রাজ্যে যস্য দক্ষিণ সীমতি । 
এতন্মধ্যে ত্রিবেকাখ্যাং দ্রুহ্য সুশাসিত ।

ত্রিবেগ রাজ্য আজ আর নেই । বহুকাল পূর্বেই তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে । সে সম্পর্কে শ্রদ্ধেয় অচ্যুতচরণ তত্ত্বনিধি তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ 'শ্রীহট্টের ইতিহাসে' লিখেছেন– "রুদ্র বংশের ত্রিপুর নামে এক নৃপতি কিরাত  ভূমে রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করেন । পার্শ্ববর্তী রাজাদের অপেক্ষা তিনি ক্ষমতায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন । তাহার রাজধানী পূর্বকালে কামরূপের সন্নিকটে 'কোপিল' নদীর তীরে অবস্থিত ছিল । সে প্রাচীন রাজ্যের রাজধানীর নাম ত্রিবেগ । পরে কালের ক্ষয়ে এই নগরী বিলুপ্তি প্রাপ্ত হয়ে যায় । এবং কালক্রমে বর্তমান কাছাড় ও শ্রীহট্টের ভিন্ন ভিন্ন অংশে রাজধানী স্থাপিত হয় "

 পরবর্তীকালে এই ত্রিবেগেই ত্রিপুরা নামে পরিচিত হয় । একটি মত বলছে, মহাভারতের যুগে মহারাজ দৈত্যের পুত্র ত্রিপুরা অঞ্চলের রাজা ছিলেন তখন এই রাজ্যের নাম ছিল কিরাত । মহারাজ ত্রিপুর কিরাত নামের বিলোপসাধন করে এই অঞ্চলের নাম রাখেন ত্রিপুরা এবং স্বজাতীয় লোকজনদের নাম রাখেন ত্রিপুরা জাতি । প্রাচীন রাজমালা লেখকগণ উল্লেখ করেন যে, মহারাজ যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের সময় সহদেব ত্রিপুরার রাজ্য জয় করেছিলেন । মহাভারতের সভা পর্বে মহাদেবের দ্বিগবিজয় অধ্যায়ে উল্লেখ আছে–

'মাদ্রী সুতন্ততঃ প্রায়াদ্বিজয়ী দক্ষিণাং দিশং ।
ত্রৈপুরং স্ববশে কৃত্বা  রাজানমমিতৌজনম ।।'

কিন্তু এখানে 'দক্ষিণাং দিশং' শব্দটি নিয়ে এবং পরবর্তী অংশে সহদেব ত্রিপুরা রাজ ও গৌড়েশ্বরকে পরাজিত করে ঔরাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে এগিয়েছেন বলে বর্ণিত হওয়া ত্রিপুরার অবস্থান নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় অনেকে বলেছেন এটি মধ্য ভারতের অন্তর্গত জব্বলপুরের নিকটবর্তী কোনও অঞ্চল হতে পারে । কথিত আছে, ত্রিপুর  ছিলেন এক প্রজাপীড়ক রাজা । কথিত আছে রাজা ত্রিপুরের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে প্রজাবর্গ দেবাদিদেব এর কাছে আকুল প্রার্থনা নিবেদন করলে স্বয়ং মহাদেব তার অমোঘ অস্ত্র ত্রিশূলের আঘাতে রাজা ত্রিপুরকে নিধন করে প্রজাগণকে রক্ষা করেন । বলা হয় এই ত্রিপুর রাজার নাম অনুসারে এই স্থানের নাম হয় 'ত্রিপুরা' ।  আবার কেউ কেউ মনে করেন ত্রিপুরা রাজ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ত্রিপুরেশ্বরী বা ত্রিপুরাসুন্দরীর আবাসভূমি বলে এই রাজ্যের নাম 'ত্রিপুরা' । প্রসঙ্গত, হিন্দু পুরাণে উল্লিখিত ত্রিপুরার পুরাতন রাজধানী উদয়পুরে অবস্থিত ত্রিপুরাসুন্দরীর মন্দিরে বা ত্রিপুরেশ্বরী মায়ের মন্দির দেবী সতীর ৫১ পীঠের এক পীঠ । এই পীঠস্থানে দেবীর ডান পায়ের গোড়ালি পড়েছিল বলে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে । পিঠ মালা গ্রন্থে উল্লেখ আছে–

'ত্রিপুরায়াং দক্ষিণপাদো দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী ।
ভৈরবস্ত্রিপুরশশ্চ সর্বাভীষ্ট ফলপ্রদঃ ।।'

অর্থাৎ ত্রিপুরা রাজ্যে সতীর দক্ষিণ চরণ পতিত হওয়ায় এখানে পিঠ দেবী ত্রিপুরা সুন্দরী এবং ত্রিপুরেশ ভৈরব অবতীর্ণ হয়েছেন । এটি ভারতের অন্যতম দেবীতীর্থ । 

যাইহোক, ত্রিপুরা নামের উৎপত্তি সংক্রান্ত যে মতবাদ গুলি রয়েছে সেগুলি ঐতিহাসিক যুক্তি নির্ভর নয় বা ঐতিহাসিক সত্যতার অনুকূলে নয়। কেননা প্রাচীন রাজা ত্রিপুরার কাহিনি নিছকই পৌরাণিক ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করার মত কোন উৎস নেই । তাছাড়া অধিষ্ঠাত্রী দেবী ত্রিপুরাসুন্দরীর নামানুসারে এই রাজ্যের নাম ত্রিপুরা এর স্বপক্ষে সত্যতা মেনে নেয়া যায় না । কারণ উদয়পুরে দেবী প্রতিষ্ঠিত হন ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে । এর অনেক পূর্বেই এই রাজ্যের নাম ত্রিপুরা ছিল বলে তথ্য রয়েছে । 

তাছাড়া মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্যের (১৮৬২-১৮৯৬) সময়ে রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত গ্রন্থের লেখক কৈলাসচন্দ্র সিংহ (১৩০৩ বঙ্গাব্দ ) মহাশয় ত্রিপুরা নামের উৎপত্তির বিষয়ে  পূর্ববর্তী মতবাদের প্রতি সাড়া না দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নমত পোষণ করেন । তাঁর মতানুসারে'যে অনার্য কিরাতদিগকে আমরা তিপ্রা ( ত্রিপুরা ) আখ্যায় পরিচিত করিয়া থাকি, তাহাদের জাতীয় ভাষায় জলকে 'ত্যুই' বলে । এই ত্যুই শব্দের সহিত প্রা সংযুক্ত করিয়া ত্যুইপ্রা শব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে । সেই ত্যুইপ্রা হইতে তিপ্রা এবং তৃপুরা, ত্রীপুরা এবং ত্রিপুরা শব্দের উৎপত্তি । 'ত্যুই' এবং 'প্রা' এই দুই শব্দ মিলে তৈরি হয় 'ত্যুইপ্রা' । কিরাত জনজাতির ভাষায়  ত্যুই শব্দের অর্থ জল এবং প্রা শব্দের অর্থ নিকটে বা কাছে । দুই জলধারা বা নদীর মিলনের স্থল । অতীতে কোন এক সময়ে ত্রিপুরার প্রাচীন কোন রাজা হয়তো মেঘনা বা ব্রহ্মপুত্র বা তার শাখা নদীর মোহনার তীরবর্তী জায়গায় রাজ্যপাট স্থাপন করেন । তাই সেই স্থানের নাম হয়ে যায় ত্যুইপ্রা । অর্থাৎ একসময় ত্রিপুরা রাজ্য সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তিনি তাঁর আলোচনায় প্রাচীন কুকিপ্রদেশ, মিতাই ( মনিপুর ) রাজ্য, কাছাড়, শিলহট্ট ( শ্রীহট্ট ), চট্টগ্রাম ও নোয়াখালি ত্রিপুরার অন্তর্ভুক্ত ছিল বলেও উল্লেখ করেন। কৈলাসচন্দ্র সিংহ মহাশয়ের এই মতবাদকে আজকের ইতিহাসকারগণ স্বীকার করেন । প্রাচীন রাজমালা গ্রন্থেও এই তথ্যের সত্যতা মেলে মহারাজ ধর্ম মানে কে রাজত্বকালে ( ১৪৩০খ্রি.-১৪৬২ ) তাঁর দুই সভা পন্ডিত শুক্রেশ্বর ও বানেশ্বর রচিত রাজমালা গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে–

কিরাত নগরের রাজা বিবিধ গঠন ।
 রাজ্যের সীমানা কহি শুনহ বচন ।।
উত্তরে তৈরঙ্গ নদী, দক্ষিণের রসাঙ্গ ।
 পূর্বেতে মেখলি সীমা পশ্চিমে কাচরঙ্গ ।। 
ত্রিবেগ স্থানেতে রাজা করিল এক পুরী । নানা মত নির্মাইল পুরীর চত্তারি ।। 

এই বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সমগ্র লুসাই প্রদেশ, মণিপুর রাজ্যের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকের কিছু পার্বত্য অঞ্চল, মধ্য ও দক্ষিণ কাছাড়, শ্রীহট্টের দক্ষিণাংশ, ঢাকার পূর্বাংশ, সমগ্র নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলার সমগ্র অঞ্চল এককালে ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল ।


ব্রহ্মের প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থে ত্রিপুরা রাজ্য 'পাটিকারা' নামে পরিচিত । খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে পূর্ববঙ্গের ত্রিপুরা জেলায় পাটিকারা নামে ছোটো একটি রাজ্যের অস্তিত্বের কথা জানা যায় । ব্রম্ভ দেশের সঙ্গে এই রাজ্যের যোগাযোগ ছিল । পাটিকারা রাজ্যের মুদ্রায় ষাঁড় ও ত্রিশূলের চিহ্ন  লক্ষ্য করা গেছে । আরাকান রাজ্যের প্রাচীন ইতিহাসে ত্রিপুরা রাজ্যকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়েছে । আবার প্রাচীন মনিপুর রাজ্যে ত্রিপুরা রাজ্য 'একলেঙ' রাজ্য নামে পরিচিত ছিল । ভারতের প্রাচীন ইতিহাস লেখকগণ ত্রিপুরা রাজ্যকে 'জাজনগর' বা 'জাজিনগর' বলে বর্ণনা করেছেন । পূর্ববঙ্গে চন্দ্রবংশ নামে কোন এক বংশের কয়েকজন রাজা ৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন । এই চন্দ্রবংশীয় রাজাদের রাজধানী কুমিল্লার নিকট লালমাই পাহাড় অঞ্চলে ছিল বলে জানা যায় । তাঁরা বৌদ্ধধর্মের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন । চন্দ্র রাজাদের পতনের পর পূর্ববঙ্গে বর্মন রাজারা ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন তাদের রাজধানী ছিল ঢাকার বিক্রমপুর অঞ্চলে । এই বর্মন রাজাদের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজবংশের কোন প্রকার সম্পর্ক ছিল কিনা জানা যায় না ।

 আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন মহোদয় তাঁর 'বৃহৎ বঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন– "ভারতবর্ষে বর্তমান কালে যত রাজ্য বিদ্যমান আছে তাহাদের মধ্যে ত্রিপুরার রাজবংশই প্রাচীনতম । আদিকাল হইতে ১৮৪জন রাজপুরুষের নাম আর কোন বংশে একাধারে পাই না । এই বংশের আদিপুরুষ দ্রুহ্যু কপিল নদীর তীরে ত্রিবেগনগরী স্থাপন করেন । লৌকিক বিশ্বাসে এই বংশ কিরাত বলিয়া অখ্যাত হইতেন । ত্রিপুরা রাজ্যের  আর্য ও অনার্য শ্রেণীতে বিবাহাদির জন্য এই বংশে কিরাতও ঢুকিয়া ছিল । এই কপিল আশ্রম 'সাগর' নামক স্থানে অবস্থিত ছিল । সাগর সন্নিহিত বিস্তৃত ভূখণ্ড পাঁচটি সমৃদ্ধ নগরী ও দুই লক্ষ লোকসহ ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে জলপ্লাবনে ডুবিয়া গিয়াছে ।"

ত্রিপুরী সম্প্রদায় ও রাজ্যের মূল আদিবাসী নয় বলে পরিগণিত  হলেও শুধু প্রাচীনকাল থেকে অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সন্নিহিত অঞ্চল বা রাজ্যসমূহ থেকে এই রাজ্যের প্রবেশ করেছে । ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব ও  নৃবিজ্ঞানীগণ অভিমত প্রকাশ করে থাকেন যে, রাজ্যের সকল আদিবাসী সম্প্রদায়গোষ্ঠী সহস্রাবদের পূর্বে চীন দেশ পরিত্যাগ করে তিব্বত ও ব্রহ্মদের অতিক্রম করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে অনুপ্রবেশ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে । কালক্রমে ত্রিপুরা রাজ্যে প্রবেশ করে ত্রিপুরার আদিবাসী হিসেবে পরিগণিত হয় । 

অতীত ত্রিপুরা আদিবাসীদের বাসভূমি হলেও বর্তমান ত্রিপুরারাজ্য মিশ্র জনগোষ্ঠীর বাসভূমি । দেশ স্বাধীন হওয়ার  আগে ও পরে বছরের পর বছর হিন্দু মুসলমানগণের সম্প্রদায়িক কলহের কারণে পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তান থেকে কাতারে কাতারে হিন্দু জনগণ ত্রিপুরা রাজ্যে প্রবেশ করার ফলে এখানকার আদিবাসীরা সংখ্যাগুরু থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে পরিণত হয় । তবে সুদূর ত্রিপুরা প্রাচীনকালেও, যখন এই রাজ্যের অধিবাসীরা সংখ্যাগুরু তদানীন্তন পূর্ববাংলার পূর্ব সীমান্ত সবটাই সবুজ বনানী ঘেরা অরণ্যকুন্তলার ছোট্ট পাহাড়ি রাজ্য ত্রিপুরা বর্তমানে উত্তর পূর্ব ভারতের সাত বোনের এক বোন । অর্থাৎ উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যের ( আসাম, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশ, মনিপুর, মেঘালয় ও ত্রিপুরা ) অন্যতম হচ্ছে ত্রিপুরা । আয়তনের দিক থেকে ছোটো হলেও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে সে স্বকীয় মহিমায় উজ্জ্বল এবং সারা ভারতেই বিশেষভাবে আলোচিত একটি নাম । 

তদানীন্তন ব্রিটিশ শাসনকালে ত্রিপুরার অবস্থান ছিল একটি দেশীয় রাজ্য হিসেবে । ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে ।  ইংরেজের বর্বর শাসন সমাপ্ত হওয়ার পর রাজন্য ত্রিপুরা ভারত ডোমিনিয়ন এ যোগ দেয় । ত্রিপুরা ভারতের সঙ্গে কার্যকরীভাবে যুক্ত হয় ১৫ অক্টোবর ১৯৪৯ সালে । সেইসঙ্গে অবসান ঘটে ৫ শতকের মানিক্য রাজবংশের ধারাবাহিক শাসনক্রম । ১৯৫০ সালের ২৬ শে জানুয়ারি ভারতের নিজস্ব সংবিধান রচিত হয় । এবং ত্রিপুরা সেসময় 'গ' শ্রেনিভুক্ত রাজ্য হিসেবে তার যাত্রা শুরু করে । ১৯৫৬ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের সংবিধানের সপ্তম সংশোধন করা হয় ।এই সংশোধনীতে ভারতের রাজ্যগুলির পুনর্ববিন্যাস ঘটানো হয় । নতুন পুনর্বিন্যাসে ত্রিপুরা রাজ্যকে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয় । ১৯৭১ সালে উত্তর-পূর্ব এলাকাসমূহ পুনর্গঠন আইন প্রবর্তন করা হয় ।এ আইন অনুসারে ত্রিপুরা পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে 1972 সালের একুশে জানুয়ারি ।

রাজতন্ত্রের অবসান ও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা

দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনের পর লক্ষ লক্ষ ভারতীয় মহাত্মার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে অর্থাৎ ১৫ই আগস্ট ভারত ব্রিটিশের দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে । এর ঠিক আগে ত্রিপুরার মহারাজা ছিলেন মহারাজ বীরবিক্রমকিশোর মানিক্য বাহাদুর । মহারাজা পরিকল্পনা করেছিলেন ত্রিপুরাকে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্তির । কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ভারতের স্বাধীনতার প্রাক লগ্নে ১৯৪৭ সালের ১৭ মে রাত আটটা চল্লিশ মিনিটে মহারাজ বীরবিক্রমকিশোর মানিক্য বাহাদুর পরলোক গমন করেন ।  বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুরের মৃত্যুর পর যুবরাজ কিরীটবিক্রম রাজ্যের রাজা হবার অধিকারী হলেও নাবালক হেতু রাজা হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি । তখন ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহারানী কাঞ্চনপ্রভা দেবীকে সভাপতি বানিয়ে কাউন্সিল অফ রিজেন্সি গঠন করা হয় ত্রিপুরার শাসনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ১৯৪৭ সালের ৮ই আগস্ট এই ঘোষণার দ্বারা কাউন্সিল অফ রিজেন্সি ত্রিপুরা শাসনভার গ্রহণ করে । উক্ত কাউন্সিল যাদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল তারা হলেন
১) মহারানী কাঞ্চন প্রভা দেবী–সভাপতি ২) মহারাজ কুমার ব্রজেন্দ্রকিশোর দেববর্মণ–সদস্য
৩) মেজর বঙ্কিম বিহারী দেববর্মন–সদস্য
৪) সত্যব্রত মুখোপাধ্যায়–সদস্য

ভারতের স্বাধীনতার সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ত্রিপুরার রাজতন্ত্রের সূর্য অস্তমিত হয় । ১৯৪৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নতুন দিল্লিতে ত্রিপুরার রিজেন্ট মহারানী কাঞ্চন প্রভা দেবী, তার নাবালক পুত্র কিরীটবিক্রমকিশোর মানিক্য বাহাদুরের পক্ষে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করে ত্রিপুরাকে ভারত সরকারের হাতে অর্পণ করে । এই সময় থেকে ত্রিপুরা ভারত সরকারের 'গ' শ্রেণি ভুক্ত রাজ্যের মর্যাদা পায় । মুখ্য প্রশাসক বা চিফ কমিশনার প্রশাসনিক পদে বৃত হন । ত্রিপুরার প্রথম চিফ কমিশনার পদে শ্রী রঞ্জিত কুমার রায় ১৯৪৭ সালের ১৫ অক্টোবর নিযুক্ত হন । প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর চিফ কমিশনারের উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন শ্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ, শ্রী সুখময় সেনগুপ্ত এবং জিতেন্দ্র দেববর্মা । ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠিত হয় । ফলে ত্রিপুরা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয় । ১৯৫৬ সালে নতুন করে আঞ্চলিক পরিষদীয় আইন অনুযায়ী ত্রিপুরায় আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হয় । মোট ৩২ জন সদস্যবিশিষ্ট আঞ্চলিক পরিষদের দুজন সদস্য সরকার কর্তৃক মনোনীত হয় । বাকি ৩০জন সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয় । ১৯৬৩ সালের মে মাসে ভারতের রাষ্ট্রপতির সম্মতিক্রমে কেন্দ্রের অধীনস্থ আইন আঞ্চলিক আইন কার্যকরী হয় এবং আইন মোতাবেক সংবিধানের ২৩৯ ধারা বলে কেন্দ্রশাসিত রাজ্যসমূহের জন্য রাষ্ট্রপতি একজন প্রশাসক নিযুক্তির প্রচলন করেন ।

আঞ্চলিক আইন বলবৎ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্রিপুরায় আঞ্চলিক পরিষদীয় ব্যবস্থার অবসান হয় এবং সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ১৯৬৩ সালের পয়লা জুলাই ত্রিপুরায় জনপ্রিয় মন্ত্রিসভা গঠিত হয় শ্রীশচীন্দ্রলাল সিংহের নেতৃত্বে । গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও পরিবর্তিত হয় । এবং এই কাঠামো চলতে থাকে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত । এইভাবে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয় ।

ত্রিপুরা রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষের গণতান্ত্রিক আশা ও অধিকার কে পূর্ণ মর্যাদা দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের পার্লামেন্ট আইন মোতাবেক ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের একুশে জানুয়ারি ত্রিপুরাকে পূর্ণরাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয় । ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস বিপুল ভোটে জয়ী হয় এবং সেই সুখময় সেনগুপ্তের নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা গঠিত হয় । ত্রিপুরা পূর্ণ রাজ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের প্রথম রাজ্যপাল নিযুক্ত হন শ্রীযুক্ত ব্রজকুমার নেহেরু, আইএএস । এভাবে প্রাচীন রাজন্যশাসিত ত্রিপুরা একটি গণতান্ত্রিক পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা প্রাপ্ত হয় ।

সীমানা ও আয়তন

ত্রিপুরার ভৌগোলিক অবস্থান একটি নির্জন দ্বীপের মত । প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেন পাকস্থলীর মত ঢুকে রয়েছে । কারণ উত্তর, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম এই তিন দিক দিয়ে বাংলাদেশ ত্রিপুরাকে ঘিরে রেখেছে । উত্তরে আসাম ও পূর্বে মিজোরাম রাজ্যের সামান্য কয়েক কিলোমিটার সীমানা ত্রিপুরাকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে । উত্তর পশ্চিমে আসাম রাজ্যের কাছাড় জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার সঙ্গে ত্রিপুরার সীমানা মাত্র ৫৩ কিলোমিটার এবং পূর্বে মিজোরাম রাজ্যের সঙ্গে এর সীমানা মাত্র ১০৯ কিলোমিটার । প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে এর আন্তর্জাতিক সীমানা ৮৩৯ কিলোমিটার । বাংলাদেশের সিলেট জেলা কুমিল্লা জেলা পূর্ব দিক ঘিরে রেখেছে । ত্রিপুরার বর্তমান আয়তন ১০৪৯১ বর্গ কিলোমিটার । সর্বাধিক বিস্তৃতি ১৮৪ কিলোমিটার । ত্রিপুরা রাজ্য ২৪'৫৬ ও ২৪'৩ ২ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১'১০ ও ৯২'২১ পূর্ব দ্রাঘিমা রেখায় অবস্থিত । প্রসঙ্গত, উত্তর পূর্বাঞ্চলের ৭ রাজ্যের মধ্যে ক্ষুদ্রতম রাজ্য এই ত্রিপুরা । 

নদ-নদী 

 ত্রিপুরা রাজ্যে অগণিত ছোট ছোট পাহাড়ি নদী দেখা যায় । নদীগুলি প্রধানত উত্তর দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত উত্তরবাহিনী নদী গুলির মধ্যে প্রধান হচ্ছে খোয়াই, ধলাই, মনু,দেও,লঙ্গাই ও জুড়ি । দক্ষিণ বাহিনী নদী গুলির মধ্যে আছে মুহুরী ও ফেনী । এছাড়াও রয়েছে গোমতী, হাওড়া ইত্যাদি । পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট বড় ছড়া ত্রিপুরা নদীকে স্রোতস্বিনী করে রেখেছে তবে সবগুলো নদী সারা বছর নৌ চলাচলের উপযোগী নয় । কারণ সব ঋতুতে জলসীমা সমান থাকে না । ত্রিপুরার প্রধান নদীর নাম গোমতী । এর দুটি উপনদী রয়েছে রাইমা ও সরমা । এ দুটির সঙ্গমস্থল হল দুচারিবাড়ি । ওখানে রাইমা ও সরমা এক হয়ে গোমতী নামে আত্মপ্রকাশ করেছে । তীর্থমুখের কাছে ডম্বুর জলপ্রপাত সৃষ্টি করে গোমতী সমভূমিতে নেমে এসেছে । প্রতিবছর মকর সংক্রান্তিতে তীর্থ মুখে বিরাট মেলা বসে । গোমতী ত্রিপুরার পবিত্র নদী । ওইদিন পূণ্যার্থীরা গোমতী নদীর জলে অবগাহন করে গঙ্গাস্নানের তৃপ্তি লাভ করে থাকেন । প্রসঙ্গত,  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'বিসর্জন' নাটকে বর্ণিত উদয়পুরের ভুবনেশ্বরী মন্দির এই গোমতীর পাড়ে অবস্থিত । রাজর্ষি উপন্যাসে হাসি ও তাতা যে ঘাটের সোপানে রক্তের দাগ দেখে রাজাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, 'এত রক্ত কেন ?' দুই ভাই বোনের কচি কচি হাত দিয়ে যে ঘাটের রক্তের দাগ মোছার চেষ্টা করেছিল সেই ঘাট বা সোপান এই গোমতীর তীরে অবস্থিত যার চিহ্ন আজও বর্তমান ।

পাহাড়-পর্বত

ত্রিপুরার ভূমিভাগ উঁচু-নিচু অগভীর এবং প্রশস্ত উপত্যকা সংকুল । তরঙ্গায়িত পাহাড়ের অভ্যন্তরে রয়েছে বালি পাথর আর এঁটেল স্তরিভূত মাটি । ত্রিপুরার প্রায় ৭০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে এই তরঙ্গায়িত পাহাড় শ্রেণী । আছে টিলাভূমি এবং অবশিষ্ট অংশে রয়েছে টিলা ভূমির পাদদেশ বা উর্বর নিম্নভূমি বা লুঙ্গাভূমি । আর আছে নদী উপত্যকায় অবস্থিত কিছু সমভূমি ।  ত্রিপুরার পাহাড়গুলি মূলত উত্তর দক্ষিণের প্রসারিত রয়েছে । এই পাহাড়শ্রেণীতে প্রধানত পাঁচটি রেঞ্জ আছে । পাহাড় শ্রেণীর গুলির মধ্যে প্রধান হল বড়মুড়া, আঠারো মুড়া, লংতরাই, জম্পুই এবং শাখানটাং । রাজ্যের উচ্চতম পাহাড় হচ্ছে জম্পুই রেঞ্জ । এর দৈর্ঘ্য ৭৪ কিলোমিটার । উচ্চতা ৯৩৯মিটার  । এই পাহাড়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম বেতলিং শিপ । দ্বিতীয় স্থানে আছে আঠারোমুড়া । এর দৈর্ঘ্য ১০৬ কিলোমিটার । এর উচ্চতম শৃঙ্গ হল জারিমুড়া এবং এর উচ্চতা ৪৮১মিটার ।

কৃষিজ, ও প্রাকৃতিক সম্পদ :-

উত্তরপূর্ব ভারতের কোলে তার ছোট্ট সন্তান । ত্রিপুরা কৃষিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ । পাহাড় পর্বতময় এই রাজ্যটির অধিকাংশ সবুজ বনানীতে ঘেরা ।এখানে সমতল ও পাহাড়ে জাতি-উপজাতি জনগোষ্ঠীর অনাদিকাল থেকে বসবাস করে আসছে । ত্রিপুরার সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে জীবিকা নির্বাহের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ । এই সম্পদসমূহ ত্রিপুরার অধিবাসীদের প্রাণধারা কে সমৃদ্ধ করে রেখেছে ।

পার্বত্য ত্রিপুরার প্রায় ৬৯ শতাংশ বনাঞ্চল এবং প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ । ত্রিপুরার অধিবাসীরা কৃষি ও অরণ্য নির্ভর জীবনজীবিকা নির্বাহ করে থাকেন । ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে বন বনানীতে, পাহাড়ে পর্বতে, নদ-নদীতে । বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আধুনিক ত্রিপুরায় গ্যাস ও তেলের খনির সন্ধান পাওয়া গেছে । মাটির নিচে প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে আছে এই খনিজ সম্পদসমূহ । ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সম্পদকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় । একটি হচ্ছে জৈব ও আন্যটি অজৈব । জৈব প্রাকৃতিক সম্পদ গুলি হল- বাঁশ, কাঠ, বিভিন্ন ধরনের পশু, পাখি ইত্যাদি । অজৈব প্রাকৃতিক সম্পদ হল খনিজতৈল ও প্রাকৃতিক গ্যাস । কৃষিজাত দ্রব্যের মধ্যে চা ও রাবার ত্রিপুরার প্রধান শিল্পদ্রব্য । এছাড়া ত্রিপুরার মাটিতে গম, ধান, পাট, তিল, সরিষা, মেস্তা, আলু এবং বিভিন্ন ফল প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয় । ত্রিপুরার বনাঞ্চলে কড়ই,জাম, শাল, সেগুন, গামাই, জারুল, আউয়াল, কনক, গর্জন,চামল মেহগনি ইত্যাদি মূল্যবান গাছ পাওয়া যায় । এই গাছগুলির গৃহনির্মাণ, আসবাবপত্র, জ্বালানি কাঠ, এবং পারিবারিক ও সামাজিক চাহিদা পূরণ করে । ত্রিপুরার অরণ্যে নানারকম ভেষজ গাছগাছালিও রয়েছে । ত্রিপুরার বাঁশ বেতের কুটির শিল্প দেশ-বিদেশে সমাদৃত । ত্রিপুরার বাঁশ বেত দিয়ে তৈরি হয় সৌখিন আসবাবপত্র, আইসক্রিমের কাঠি, টুকরি,ধারী, ধূপকাঠির শলাকা, খেলনা, মোড়া, ঘরের বেড়া, ঘরের খুঁটি ইত্যাদি । এগুলো ত্রিপুরার অর্থকরী ফসল । ত্রিপুরার বন্যপ্রাণীর মধ্যে হাতি, নেকড়ে, হরিণ, শূকর, ভাল্লুক, চিতাবাঘ বনমোষ, শিয়াল, সজারু, বন বিড়াল, রামছাগল, বাইসন, বনরুই, বানর, হনুমান  বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । ত্রিপুরার বনাঞ্চলে টিয়া, কাকাতুয়া, ধনেশ, ময়না, ফিঙে, কবুতর, ডাহুক, হাঁস, মোরগ, চিল, শকুন, সারস,বুলবুল, বাবুই,  চড়াই ইত্যাদি নানা রকমের পাখি দেখতে পাওয়া যায় । ত্রিপুরায় প্রচুর দিঘি, নদনদী, জলাশয় ও হ্রদ রয়েছে । এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যায় ।


ত্রিপুরার বাংলা কাব্যের হাজার বছর 

ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে আজও তেমন গবেষণা হয়নি । মোটামুটি ভাবে এই রাজ্যের ইতিহাসের শুরুর প্রামাণ্য প্রমাণ পাওয়া যায় ১৪৬৪ খ্রিস্টাব্দের প্রথম রত্ন মানিকের সময় থেকে । তার পূর্বের কোন ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে শিলালিপি, তাম্রলিপি, মুদ্রা, স্থাপত্যকীর্তি, দলিল-দস্তাবেজ ইত্যাদির নিদর্শন পাওয়া যায় না । শুধুমাত্র ইতিহাস সূত্র থেকে জানা যায় বাংলার সুলতান রুকুন-উদ্দিন-বার-বাক-শা-র (১৪৫৯-১৪৭৪খ্রি. ) কাছ থেকে রত্নফা প্রথম মানিক্য উপাধি পেয়েছিলেন । এর কাছাকাছি সময়ে বঙ্গের আরেক সুলতান ছিলেন নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৩৯-১৪৫৯ খ্রি. ) কিন্তু তার আগেও যে এই অঞ্চলে জনবসতি ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় । যেমন বক্সনগর এর বৌদ্ধসভ্যতা (পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী ) পিলাকের বৌদ্ধ সভ্যতা ( নবম থেকে দশম শতাব্দী ) এবং সন্নিহিত অঞ্চল ময়নামতি বা লালমাইয়ের প্রাচীন সভ্যতা ইত্যাদি । তবে বহু প্রাচীনকাল থেকে যে এখানে অন্য জাতি গোষ্ঠীর লোক ছিল তার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ রাজমালায় পাওয়া যায় । রাজমালার যুঝার খন্ডে উল্লেখ আছে–

রাঙ্গামাটি দেশেতে যে লিকারাজা ছিল 
 সহস্র দশেক শূন্য তাহার আছিল ।
ত্রিপুর সৈন্য যুদ্ধ করে পরিপাটি 
ভঙ্গ দিয়া সব লিখা গেল রাঙ্গামাটি ।

এই দুটি শ্লোক থেকে জানা যায় যে, একসময় এই অঞ্চলে লিকা নামে একটা জাতি গোষ্ঠী বাস করত । আনুমানিক ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা হিমতিফা বা যুঝারফা রাঙ্গামাটি জয় করে দেশ বিজয়ের স্মৃতিস্বরূপ তার পূর্বপুরুষের নামানুসারে ত্রিপুরাব্দ প্রচলন করেন । জানা যায় যে, এই লিকা জাতি হল ত্রিপুরার জনপদের আদি পুরুষ । অনেকে এই লিকা জাতিকে মগজাতি নামে চিহ্নিত করেন । তাহলে এটা বোঝা যায় যে, ত্রিপুরায় অতি প্রাচীনকালে মগ জাতির লোকেরা বসবাস করতেন ।

ত্রিপুরার ইতিহাস চর্চা করলে দেখা যায় যে পিলাক বৌদ্ধ সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শন । পিলাক এবং লিকা শব্দ দুটির সঙ্গে মগ ভাষার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে । মগদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও জানা যায় যে, তারা আরাকানের অধিবাসী ছিলেন । আরাকানের রাজা ধর্ম বিজয় (৬৬৫-৭০১ খ্রি. ) চট্টগ্রাম ও সমতটসহ বর্তমান ত্রিপুরা অঞ্চল দখল করেছিলেন । মগজাতির মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তাদের পূর্বপুরুষেরা পাকাপাকিভাবে ত্রিপুরায় এসেছিলেন ৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে ।

এছাড়া ত্রিপুরা রাজ্যে প্রাচীনকাল থেকে চাকমা জাতি অবস্থান করার কথাও কোথাও কোথাও উল্লেখ রয়েছে । রাধামন ধনপুদি ও চাদিগাঙ ছারা পালা এই পুরাকাহিনি দুটিতে চাকমা জাতির আদি উৎস সম্পর্কে জানা যায় যে, চাকমারা একসময় চম্পক নগরে বাস করতেন । আবার চাকমা সমাজের প্রচলিত একটি গানে জানা যায় যে চাকমারা চম্পকনগর নয়, নুরনগরে বাস করতেন ।
ডোমে বাজায় ঢোল ডগর 
ফেনী যেইয়ুম নুরনগর ।

এই নুরনগর ত্রিপুরায় অবস্থিত । ত্রিপুরায় গোমতী নদীর উৎস সম্বন্ধে যে আখ্যান প্রচলিত আছে তা চাকমা সমাজ এখনো পবিত্র বলে মনে করেন । পার্বত্য ত্রিপুরার সাথে চাকমাদের যোগসুত্র রয়েছে অতি প্রাচীনকাল থেকেই । ধরে নেওয়া হয় প্রাচীন ত্রিপুরায় মগ ও চাকমা জাতি সমসাময়িককালে পাশাপাশি অবস্থান করতেন । উভয় সম্প্রদায়ের লোকই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন । রাজমালার আরেকটি পদে লিকাদের সহযোগী হিসেবে জানা যায়–

ধামাই জাতি পুরোহিত আছিল তাহার ।
 অভক্ষ্য না খায়ে তারা সুভক্ষ্য ব্যভার ।।
 আকাশেতে ধৌত বস্ত্র তারা হ শুকায় ।
 শুকাইলে সেই বস্ত্র আপনে নামায় ।।
বছরে বছরে তারা নদী পূজা করে ।

এখানে উল্লেখ্য যে, চাকমাদের একটা গোজার গোষ্ঠীর নাম ধামেই গোঝা ।  লিকার সঙ্গে তারাও যে বসবাস করত, এখানে প্রকারান্তরে তা বোঝা যায় । আর চাকমাদের সংস্কৃতিতে নদী পূজার প্রচলনও রয়েছে ।  বৌদ্ধ শ্রমণরা এক বস্ত্র ব্যবহার করতেন এবং ধৌত করার পর তা রৌদ্রে শুকানোর জন্য মেলে দিতেন । এইসব তথ্য থেকেও অনুমান করা যায় যে, সেকালে চাকমারাও এখানে বসবাস করতেন । তাহলে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ত্রিপুরা রাজ্যে যে সমস্ত প্রাচীন বৌদ্ধ সংস্কৃতি নিদর্শন পাওয়া যায় তা এই দুই জাতিগোষ্ঠীর দ্বারা সৃষ্ট । যেহেতু পরবর্তী সময়ে তাঁরা ত্রিপুরার রাজের হাতে পরাজিত হন সেকারণে বিজিত জাতির চিহ্নিত নিদর্শন এর উপর থেকে পরবর্তী রাজকুল দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন এবং ইতিহাসের তার কোনও উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না ।

২) বাংলা সাহিত্যের আদি যুগ ও ত্রিপুরার বাংলা কাব্য 

ত্রিপুরার বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সমকালীন বা উভয়েই একই ইতিহাসের সূত্র থেকে সৃষ্ট তা অবশ্যই বলা যেতে পারে । বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে যে গ্রন্থটি প্রামাণ্য বলে গবেষকদের স্বীকৃতি লাভ করেছে সেটি হল চর্যাপদ । চর্যাপদের পদ সমূহ সম্পর্কে জানা যায় যে, সেগুলি বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণের সাধনার গুঢ় তত্ত্বসমূহের ব্যাখ্যা সম্বলিত যা গানের মাধ্যমে পরিবেশিত হত । এই সমস্ত পদের বহিরঙ্গে সাধারণ জনজীবনের চিত্র ফুটে উঠত এবং তার গভীরে সাধনার নিগূঢ় তত্ত্বকথাকেই এক আলো-আঁধারি ভাষায় ব্যাখ্যা করা হত । যার পাঠোদ্ধার শুধুমাত্র বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের দ্বারাই সম্ভব ছিল এবং তা তাদের সাধনার বিষয় ছিল ।

চর্যার পদসমূহে সমকালীন জনপদ জীবনের যে চিত্র পাওয়া যায় তা প্রাচীন বঙ্গ জনপদের চিত্রকেই নির্দেশ করে । প্রাচীন ত্রিপুরা ভূখণ্ড শুধুমাত্র পার্বত্য ত্রিপুরাকে কেন্দ্র করেছিল না ত্রিপুরা রাজ্যের সীমা একসময় সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । এই জনপদ একসময় 'হরিকেল মন্ডল' নামেও পরিচিত ছিল । পরবর্তী সময়ে ত্রিপুরা রাজ্যের সৃষ্টি হয় । আধুনিক গবেষণা কর্ম থেকে জানা যায় যে, বর্তমান ত্রিপুরার বেশিরভাগ অঞ্চলসহ কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম অঞ্চল চতুর্থ শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত 'সমতট' রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । পরবর্তী সময়ে হরিকেল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় । এই ভূখণ্ড 'বঙ্গাল' নামেও পরিচিতি লাভ করে । এই বঙ্গাল ভূখণ্ডের একাংশ প্রাচীন ত্রিপুরার অন্তর্গত ছিল । চর্যার পদসমূহে বঙ্গাল এবং এই ভূখণ্ডের অধিবাসী বাঙালির উল্লেখযোগ্য পাওয়া যায় যেমন–

আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভৈলী ।
নিঅ নারী ছাড়ি চন্ডালী লেলী
কিংবা 'অদ্বয় বঙ্গালে ক্লেশ লুড়িউই', –ইত্যাদি পদ তারই  নিদর্শন ।

চর্যার জীবনচিত্রসমূহকে বিশ্লেষণ করলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা ত্রিপুরার আদিবাসী জীবনপ্রণালীর সঙ্গে হুবহু মিলে যায় । নিচে এই বিষয়ে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হল–

১. তাঁতবোনা ও চাঙ্গাড়ী তৈরি করা :-
         'তান্তি বিকণঅ ডোম্বি অবর না চঙ্গেড়া  ( চর্যা-১০ )

   ২. মদ চোলাই করা :-
       এক সুন্ডিনি দুই ঘরে সান্ধঅ
       চিঅন বাকলঅ বারুণি বান্ধঅ ( চর্যা-৩ )

  ৩. ধান, কার্পাস বোনা :-
      ক) ধুকড় এসে রে কপাসু ফুটিলা
      খ) কঙ্গুচিনা পাকেলা রে শবরাশবরি মাতেলা ( চর্যা-৫ )

    ৪. তুলো ধুনা ও মোটা কাপড় বোনা :-
      ক) তুলা ধুনি ধুনি আঁসু রে আঁসু ( চর্যা-২৬ )
      খ)  আঁসু ধুনি ধুনি নিরবর সেসু
( ঐ )

    ৫) গাছ কেটে কাঠের কাজ করা :-
      ক) কাড্ডিঅ মোহতরু পাটি জোড়িঅ ( চর্যা-৫ )
      খ) ছেবহ সো তরু মূল ন ডাল ( চর্যা-৪৫ )

এছাড়া চর্যাপদের আরো কিছু উদাহরণ তুলে দেওয়া যায় যার পারিপার্শ্বিক ব্যাখ্যা করলে এই প্রত্যয়ও জন্মে যে, ত্রিপুরার সাহিত্যের আদিমতম নির্ভর নিদর্শন হিসেবে চর্যাকে মান্য করতেই হয় । চর্যার কিছু কিছু পদে যেমন পাই–

১. টালত ঘর মোর নাহি পরিবেষী ( চর্যা-৩৩ )

    ২. উঞ্চা উঞ্চা পাবত তঁহি বস ই শবরী বালী 
মৌরঙ্গী পিচ্ছ পিরহিন গীবত গুঞ্জরী মালী ( চর্যা-২৮ )

   ৩. কাহেরে ঘিনি মেলি অচ্ছহু কীস
        বেড়িল হাঁক পড়অ চৌদিস ( চর্যা-৬ )

প্রথম পদটির ব্যাখ্যায় পাই যে, টিলার উপর আমার ঘর প্রতিবেশী নেই । এই পদটিকে অনুধাবন করলে আমরা দেখি যে টিলার উপরে বিচ্ছিন্নভাবে বসতি স্থাপন করে আমাদের এই রাজ্যের আদিম অধিবাসীরা বহুকাল আগে থেকেই বসবাস করে আসছেন । দ্বিতীয় উদাহরণ থেকে পাই যে, উঁচু উঁচু পর্বতে শবর বালিকা বাস করে । পার্বত্য ত্রিপুরার ভূখণ্ডও এইরূপ উঁচু উঁচু পর্বত বেষ্টিত এছাড়া এই ভূখণ্ডে যে প্রাচীন জনজাতি বাস করত তার মধ্যে সবর হো মুন্ডা বীরহোড় এরা তো ছিলই । এই পদে তো তাদেরই একটি জনগোষ্ঠীর বালিকার অবস্থানের কথা বলা হচ্ছে । বনমোরগের পালক চুলে গোঁজা কিংবা গলায় গুঞ্জা জাতীয় ফুলের মালা পরিধান করা ত্রিপুরা রাজ্যের জনজাতীয় গোষ্ঠীর মহিলাদের অঙ্গরাগের একটি স্বীকৃত নিদর্শন । নৃতত্ত্বের বিশেষজ্ঞগণ এই অঞ্চলের প্রাচীন অধিবাসীদের কিরাত নামেও অভিহিত করেছেন এই কিরাতরা মূলত ছিল শিকারজীবী । উদ্ধৃত তৃতীয় পদটিতে বনভূমিকে ঘিরে ধরে ধাওয়া করে পশুশিকার করার আদিম পদ্ধতির বর্ণনা করা হয়েছে । এখানে বর্ণিত হয়েছে কিভাবে শিকারীরা দলবদ্ধভাবে বনের হরিণ শিকার করে । চর্যাপদ থেকে এ ধরনের আরও বহু উদাহরণ ধরে ধরে ব্যাখ্যা করা যায় যে, এর মধ্যে এমন বহু স্থানিকচিত্র ও যাপনচিত্র পাওয়া যায় যা চর্যাপদের পটভূমি এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই প্রতীয়মান হয়েছিল বলে সিদ্ধান্তে আসা যায় ।

ত্রিপুরা রাজ্যের জনজাতিদের একটি জনগোষ্ঠীর নাম চাকমা । এই চাকমা জাতি একসময় ত্রিপুরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়েই বসবাস করতেন । বর্তমানে এই জাতিগোষ্ঠীর বৃহদংশই পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং বিচ্ছিন্নভাবে ত্রিপুরার বিভিন্ন স্থানে, মিজোরাম ও মনিপুরে বসবাস করে আসছেন । এই চাকমা জাতিদের ভাষা চাকমাভাষা নামে পরিচিত । আপাত দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলে এই ভাষা বাংলা ভাষার অপভ্রংশ বলে মনে হয় । বিশেষত চট্টগ্রামের যে বাংলা উপভাষা প্রচলিত আছে তার সঙ্গে চাকমা ভাষার বেশ একটা নৈকট্য রয়েছে । চর্যাপদের ব্যবহৃত বহু শব্দ হুবহু চাকমা ভাষায়ও ব্যবহৃত হয় । যেমন খুন্,টি সিয়াল, বাঞ্ঝা, ছিনাল ইত্যাদি বহু শব্দ এমনকি বাক্যগঠনের ক্ষেত্রেও প্রকরণগত মিল পাওয়া যায় চর্যাপদ ও চাকমা ভাষার মধ্যে ।

পূর্বাহ্নেই  উল্লেখ করা হয়েছে যে, বংগাল ভূখণ্ডের একটা অংশ একসময় ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । চর্যার পদকর্তাগণের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন বংগালের অধিবাসী । এই বঙ্গাল ভূখণ্ডের একাংশ একসময় ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । চর্যার সিদ্ধাচার্যদের অন্যতম ডোম্বি ( চর্যাপদ-১৪ রচয়িতা ) ত্রিপুরার রাজা বলে গবেষকরা অনুমান করছেন । চর্যাকরদের কেউ কেউ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন । এক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিবাচক বা জাতিবাচক ছদ্মনাম ব্যবহার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় । যেমন কাঞ্চন, তাড়ক, তান্তি, তাপ্ত, গুণ্ডরী ইত্যাদি। ডোম্বি ও সম্ভবত ছদ্মনাম বা উপাধি ।

উপর্যুক্ত বিষয়গুলি বিচার-বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, ত্রিপুরার বাংলাকাব্য চর্চার ইতিহাস বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সমকালীন । পাশাপাশি একথাও জোরালোভাবে বলা যায় যে, ত্রিপুরার সাহিত্যচর্চার বোধন হয়েছিল বাংলা সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়েই । সেই হিসেবে চর্যাপদকে ত্রিপুরা রাজ্যের সাহিত্য চর্চার আদি নিদর্শন হিসেবে মেনে নিতেই হয় ।

খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীকাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের আদিযুগ বলে গবেষকরা বিচার করে থাকেন । এই যুগেই চর্যাপদ রচিত হয় । চর্যাপদ ছাড়া এই সময়ে আরও একটি ধর্মকেন্দ্রিক সাহিত্যের নিদর্শন পাওয়া যায় অনুমান করা হয় এটি চ 😘র্যার পরে পরেই রচিত হয় এবং তার উপর চরযার প্রভাব রয়েছে । এই সময়ে নাথ ধর্মচর্চা বাংলা বিশেষত পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিকাশ লাভ করে । বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সাধনপ্রণালীর প্রভাব নাথধর্মের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয় । গবেষকদের সিদ্ধান্ত, যখন বৌদ্ধধর্ম বাংলাদেশে প্রায় বিলুপ্তির পথে বা হুমকির সম্মুখীন হয় ব্রাহ্মণ্যবাদের আক্রমণে, সেই সময়েই বুদ্ধের ধ্যানী প্রতিমূর্তিটি শিব প্রতিকৃতিতে রূপান্তরিত হয় । বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ শৈব যোগীতে রূপান্তরিত হয়ে আত্মগোপন করেন । ফলে বৌদ্ধদের যোগসাধনার প্রণালী শৈববদের মধ্যেও প্রবাহিত হয় । নাথ যোগীগণ শৈব ধর্মের অনুসারী নাথগুরু হলেন গোরক্ষনাথ এবং তাঁর গুরু মীননাথ নাথ ধর্মতত্ত্বের বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে আদিযুগের শেষার্ধে রচিত হয় গোরক্ষবিজয়, মীনচেতন, গোপীচন্দ্র সন্ন্যাস ইত্যাদি কাব্য চর্যাগীতির সঙ্গে নাথসাহিত্যের অনেক বিষয়ে সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায় । চর্যাপদে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তাকে বলা হয় সন্ধ্যাভাষা । নাথসাহিত্যেও এই সন্ধ্যা ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় । এছাড়া চর্যাপদের মধ্যে কিছুটা হেরফের ঘটিয়ে নাথসাহিত্যে তার ব্যবহার হতে দেখা গেছে । যেমন–

১. গুরু বোব সে সীসা কাল ( চর্যা ৪০ সংখ্যক )
 অনুরূপ– কালা ভাইএ গীত গাহে বোবা ভাইএ রহি সুনে ( গোরক্ষবিজয় )

    ২. বলদ বিআঅল গবিআ বাঁঝে
         পিটা দুহিঅই এ তীনা সাঁঝে
        নিতি নিতি সিআলা সিহে সম জুঝই
        ঢেন্ঢন পাএর গীত বিরলে বুঝই ।
অনুরূপ– বলদ প্রসব হইল গাই হইল বাঞ্ঝা 
বাছুরেক দোহাএ তাহার দিন তিন সাজা
 শৃগাল হইয়া সিংহের সঙ্গে যুঝে কুটিকের মধ্যে গুটিকে তাহা বুঝে ( গোপিচন্দ্রের সন্ন্যাস )

নাথথধর্মকে বিশেষভাবে বাংলার ধর্ম মনে করার কারণ নাথসাহিত্যে যেসব স্থানের নাম পাওয়া যায় তাদের অনেকগুলি এদেশের মীননাথ, জালন্ধরী পা ও কানুপা চর্যাগীতির লেখক বলে তাঁদের এই অঞ্চলের লোক বলে গ্রহণ করতে হয় । বঙ্গের রাজা গোবিন্দচন্দ্র (গোপীচাঁদ ) রাজেন্দ্র চোলের তিরুমলয় শিলালিপির ( একাদশ শতক ) সমসাময়িক মঙ্গল দেশের রাজা গোপীচন্দ্রের সঙ্গে অভিন্ন বলে পন্ডিতেরা মনে করেন । তাঁর সময় চর্যাগীতির রচনাকালের মধ্যেই পড়েছে ।

এখানে উল্লেখ্য যে, নাথসাহিত্যের নিদর্শন গোপীচন্দ্রের গানের পটভূমি ময়নামতি অঞ্চল পূর্বতন জেলা ত্রিপুরা বাস সমতল ত্রিপুরার কুমিল্লা সন্নিহিত স্থান যা আজও বর্তমান । সমতল ত্রিপুরা সহ চাকলা রোসনাবাদ এক সময় ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । চর্যাগীতির টিকায় মীননাথের লেখা একটি চর্যাগীতির কিছু অংশ উদ্ধৃত আছে । এই মীননাথ হলেন গোরক্ষনাথের গুরু । গোপীচন্দ্রের গুরু হাড়ি পা । মানিক চন্দ্রের স্ত্রী গোপীচন্দ্রের মা সিদ্ধা ময়নামতির নামে স্থাননাম হয়েছে ময়নামতি । চর্যাপদের অনেক পরে এই কাব্যগ্রন্থ দুটি রচিত হলেও এই দুটি কাব্যগ্রন্থ যে ত্রিপুরার নিজস্ব কাব্যসম্পদ তা বলার অপেক্ষা রাখে না । চর্যার পদকর্তাগণ এবং গোপীচন্দ্রের গুরুর নামের শেষে যুক্ত 'পা' পদবীটি ত্রিপুরার আদি রাজাগণের নামের শেশেও যুক্ত থাকতে দেখা যায় কিঞ্চি পরিবর্তিত হয়ে 'ফা' হিসেবে । ত্রিপুরার রাজা রত্নফা পরবর্তী সময়ে রত্ন মানিক্য নাম ধারণ করেন ।

মহারাজা ধন্য মানিক্যের ১৪৯০-১৫২২ ) আমলে স্বয়ং মহারাজ স্বীয় উদ্যোগে সংস্কৃত ভাষার কয়েকটি গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন । সেগুলো হল 'রামায়ণ' ও 'প্রেত চতুর্দশীর গীত' । এছাড়া দুটি জ্যোতিষ বিষয়ক গ্রন্থ ও ছিল যথাক্রমে 'উৎকল খণ্ড পাঁচালী' ও 'যাত্রা করনিধি' ।

এই পর্যায়ে ত্রিপুরায় সাহিত্যচর্চা বলতে সংস্কৃত সাহিত্য থেকে অনুবাদ কর্মই বেশি লক্ষ্য করা যায় । এই সময় মহারাজ জগৎ মানিক্য, মহারাজ কৃষ্ণ মানিক্যের মহিষী জাহ্নবী দেবী প্রমুখগণ সংস্কৃত গ্রন্থ অনুসারী কিছু বচনাদি রচনা করেন ।

ত্রিপুরার ইতিহাসগ্রন্থ লেখক কৈলাসচন্দ্র সিংহ উল্লেখ করেছেন যে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মহারাজ প্রথম রত্ন মানিকের সময়ে মুসলমানদের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজাদের সম্পর্ক শুরু হয় । তখন থেকে ত্রিপুরার বিভিন্ন প্রান্তে প্রজাস্বত্বের অধিকার লাভ করে মুসলমানগনও এখানে তাদের বসতির বিস্তার লাভ ঘটাতে থাকে । পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে থেকে কাব্যচর্চার প্রতিনিধিত্ব লক্ষ করা যায় ।

আনুমানিক (১৫৬০-১৬২৫খ্রি.) সময়কালে শেখ চাঁদ নামে একজন কবির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় । তিনি পাঁচখানা পুঁথি রচনা করেছিলেন । এই পুঁথিগুলি হল–১. রসুল বিজয় ২. শাহদৌলা ৩. কিয়ামতনামা ৪. হরগৌরী সংবাদ ৫. তালিবনামা । তিনি যে ত্রিপুরা জেলার অধিবাসী ছিলেন তা তাঁর কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় পাওয়া যায় তিনি উল্লেখ করেছেন 'পরগণে পাইটকারাস্থানে গোঞাঞ সাল' যার অর্থ তিনি পাটিকারা পরগনায় বাস করতেন ।

৩) বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ ও সমকালীন ত্রিপুরার বাংলাকাব্য 

মহারাজ দ্বিতীয় রত্ন মানিক্যের (১৬৮৫-১৭১০) রাজত্বকালের সময়ে পিতৃব্য নরেন্দ্র ঠাকুরের বিদ্রোহ সংঘটিত হয় ।  নরেন্দ্র ঠাকুরের নরেন্দ্র মানিক্য নাম ধারণ করে ত্রিপুরার সিংহাসন আরোহন এবং মহারাজ রত্ন মানিক্যের সাময়িক সিংহাসনচ্যুতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে চর্যাপরবর্তীকাল থেকে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ সচিত হয় । মাঝখানের ১২০০ থেকে ১৩০০ সালের শেষ দশক পর্যন্ত এদেশে তুর্কিবিজয় ও ধ্বংসের কবলে পড়ে কোনরকম নিদর্শন আর অবশিষ্ট থাকে না । আশঙ্কা করা হয় এই সময়ে সমকালীন সাহিত্যের বহু নিদর্শন ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে । ফলে এই সময়কালটা বাংলা সাহিত্যের 'অন্ধকার যুগ' হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে । এরপরের সময় অর্থাৎ আনুমানিক ১৪০০ সাল থেকে ১৮০০ সালের শেষ অবধি বাংলাসাহিত্যের মধ্যযুগ । সেই সময়ের স্মরণীয় বাঙালি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মেধাবী ব্যক্তিত্ব চৈতন্যদেবের জীবতকাল ও তার পূর্বাপর সময়কালকে চিহ্নিত করে মধ্যযুগকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে । আনুমানিক ১৪০০ থেকে ১৫০০ সাল প্রাক চৈতন্য যুগ । ১৫০১ থেকে ১৬০০ চৈতন্য যুগ । ১৬০১ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত চৈতন্যোত্তর যুগ । বাংলা সাহিত্যের এই মধ্যযুগেও ত্রিপুরা বাংলা কাব্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিল । মহারাজ রত্ন মানিকের আমলে ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয় । রত্ন মানিক্য তিনজন বাঙালিকে ত্রিপুরা রাজ্যে আনিয়ে জায়গির ও নিষ্কর ভূমি দান করেছিলেন । এঁরা হলেন বড়ো খান্ডব ঘোষ, পণ্ডিত রাজ এবং জয় নারায়ন সেন । জয় নারায়ন সেন ছিলেন একজন চিকিৎসক । রত্ন মানিক্যের পর মহারাজা ধর্ম মানিকের আমলে ১৪০৭ খ্রিস্টাব্দে শ্রীহট্ট জেলার অন্তর্গত দক্ষিণ পরগনার ঠাকুরবাড়ি গ্রামের অধিবাসী দুজন পুরোহিত শুক্রেশ্বর ও বানেশ্বর বাংলা পয়ার ছন্দে রাজমালা লেখেন । রাজমালার সার সংকলনে রেফারেন্ড লং উল্লেখ করেন, এই গ্রন্থটি পঞ্চদশ শতকে রচিত হয় । এটি প্রাচীন বাংলা কাব্যের একটি অন্যতম নিদর্শন বলেও তিনি উল্লেখ করেন । মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্যের আমলে রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতায় এই গ্রন্থটি প্রকাশ করা হয়েছিল । এই গ্রন্থের সম্পাদক কালীপ্রসন্ন সেন উল্লেখ করেন,  'মহারাজ ধর্ম মানিক্যের শাসনকালে রাজমালা রচিত হয়েছিল । দুর্গামণি উজিরের রাজমালায়ও ( এটি পরবর্তীকালে ১২৩৮ ত্রিপুরাব্দে অর্থাৎ ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয় ) উল্লেখ রয়েছে 'সুভাষেতে ধর্মরাজে রাজমালা কৈল / রাজমালা বলিয়া লোকেতে নাম হৈল ।' পরবর্তীকালে দীনেশচন্দ্র সেন কৈলাসচন্দ্র সিংহ প্রমূখগণ এই অভিমতকে সমর্থন করেন । শেখ মহদ্দিন 'চম্পক বিজয়' নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন । ড. সুপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর 'ইতিহাসাশ্রিত বাংলা কবিতা' গ্রন্থে চম্পক বিজয় সম্পর্কে বলেছেন, 'ঐতিহাসিক রচনা হিসেবে চম্পক বিজয়ের অসামান্যতা স্বীকার করিতে হয় । রাজমালাবর্ণিত ঘটনার সীমাকাল সুদূরপ্রসারী । বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যক্তি কর্তৃক ইহা রচিত । গ্রন্থের মধ্যে স্থানে স্থানে ভাষা অতিরঞ্জিত । কিন্তু চম্পক বিজয়ের ঘটনাকাল মাত্র একটি দশকে সীমান্বিত হওয়ায় ঘটনাবলী যতদূর সম্ভব যথাযথ বিবৃত হইয়াছে ।'

সপ্তদশ অষ্টাদশ শতাব্দীতে ত্রিপুরা বঙ্গভূমিসহ সংলগ্ন চট্টগ্রাম, কাছাড়, কোচবিহার, আরাকান প্রভৃতি দেশীয় রাজ্যসমূহেও সাহিত্যচর্চার জোয়ার এসেছিল । বিশেষ করে রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতায় এইসব অঞ্চলে বাংলা সাহিত্যচর্চার এক বিশেষ বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল, যা আজ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে । আরাকান রাজসভায় দৌলত কাজী-আলাওল সতীময়না, লোরচন্দ্রানী, পদ্মাবতী, হোসেন সাহের লস্কর চট্টগ্রামের শাসনকর্তা পরাগল খাঁর পরাগলী মহাভারত, ছুটি খাঁর মহাভারত, কাছাড়ের ডিমাসা রানী চন্দ্রপ্রভা দেবীর নির্দেশে অনুবাদকৃত বিহন্নারদীয় পুরাণ, রাজ পরিবারের সদস্যদের সৃষ্ট বাংলা কাব্য । কোচবিহারের রাজসভায় বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা ধর্মগ্রন্থের অনুবাদ সমগ্র বাংলা সাহিত্যকেই সমৃদ্ধ করেছিল ।

ত্রিপুরায়ও রাজা গোবিন্দ মানিক্যের শাসনামলে (১৬৬৫-৭৫) বৃহ পুরাণ পুঁথিটির রচিত হয় । এই পুঁথিটির রচয়িতার নাম জানা যায় না । চন্দ্রজয় ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় এই পুঁথি টি ১৩১৩ বঙ্গাব্দে (১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ ) কলকাতা থেকে মুদ্রিত হয় ।

সপ্তদশ শতকে শের বাজ নামে একজন কবি ১) 'ফক্করনামা' বা 'মালিকার হাজার ছাওয়াল' ২) 'কাশেমের লড়াই' এবং ৩) ফাতিমার সুরত নামা নামে তিন খানি কাব্য রচনা করেন । এক ধরনের হেঁয়ালির প্রশ্ন-উত্তর ধর্মীয় রচনা হল 'ফক্করনামা' । 'কাশেমের লড়াই' কারবালার ময়দানের ঐতিহাসিক যুদ্ধ অবলম্বনে রচিত । 'সুরতনামা' অভিব্যক্তি মূলক রচনা ।

সৈয়দ মুহম্মদ আকবর (১৬৫৭-১৭২০)-এর 'জেবল্ মূলক্—শামারুখ' নামে একখানা পুঁথি পাওয়া গেছে । পুঁথিখানি প্রণয়োপাখ্যানমূলক এবং আনুমানিক ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দের রচিত কবি শেখ সাদী মহারাজ দ্বিতীয় রত্ন মানিক্যের রাজত্বকাল (১৬৮২-১৭১২) 'গদ্যমালিকা সম্বাদি' নামে একখানে পুঁথি রচনা করেন । তার পুঁথিতে চম্পক রায়ের উল্লেখ পাওয়া যায় । অনুমান করা হয় তিনি চম্পক রায়ের কর্মচারী ছিলেন । ১১২২ ত্রিপুরাতে যে এই পুঁথিটি রচিত হয়েছিল তা পুঁথির ভূমিকাতে স্পষ্ট–

'পড়িয়া বুঝিয়া সব শাস্ত্রের উদ্দেশ একাদশ বিংশ দুই পুস্তক বিশেষ ।' 
মূলত এটি একটি ফারসি পুঁথির অনুবাদ ।

মুহম্মদ রফিউদ্দিন নামে আরেকজন কবি ও 'জেবল্ মূলক্–শামারুখ' নামে একখানে পুঁথি রচনা করেন । তিনি কুমিল্লার নারানঞা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । এই পুঁথি টি সপ্তদশ শতাব্দীর শেষপাদে রচিত বলে গবেষক মহলের ধারণা । রফিউদ্দিন এই পুঁথিটি পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে রচনা করেন ।

 আনুমানিক ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ শিক পরগনার গ্রামে শমসের গাজীর জন্ম হয় । ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী শমসের গাজীর অধিকারভুক্ত হয় । তখন থেকে ১২ বছর তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের সর্বময় কর্তা ছিলেন । শমসের গাজীর জীবনের আকস্মিক উত্থান পতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর মৃত্যুর পর শেখ মনোহর গাজী নামে এক পল্লী কবি রচনা করেন গাজীনামা । ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে নোয়াখালীর সেরেস্তাদার মৌলবি খবির মুদ্রিত করেন এই গাজী নামা ।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সে সময়ে মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা অনুবাদ সাহিত্য সৃষ্টি হতে থাকে । এসব অনুবাদের ক্ষেত্রে যেমন হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থাদি ও পুরাণ রয়েছে তেমনি মুসলিম ধর্ম ও সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট অনেক আরবি ও ফারসি গ্রন্থেরও অনুবাদ করা হয়েছে । সেসময়ের শাসক বর্গের ধর্মীয় সহাবস্থান ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের সৃষ্ট সাহিত্য পৃষ্ঠপোষকতায়ও একটা ইতিবাচক চিহ্ন রেখে গেছে  বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে । এসব অনুবাদ সাহিত্যে ধর্মীয় ভক্তিরসের সৃষ্টি যেমন রয়েছে তেমনি বীররস ও পারিবারিক জীবন ঘনিষ্ঠ প্রণয়রসেরও উপলব্ধি করা যায় ।

মহারাজা রাজধর মানিক্য ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরার সিংহাসনে বসেন । তার সময়েই ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সঙ্গে মণিপুরের রাজ পরিবারের সম্পর্ক সৃষ্টি হয় । তিনি মণিপুর রাজা জয়সিংহের কন্যার পাণিগ্রহণ করেছিলেন । এরপরে মহারাজা কাশীচন্দ্র ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে মণিপুরের রাজকন্যাকে বিবাহ করেন। এরপর মহারাজা কৃষ্ণকিশোর মানিক্যও মণিপুর কন্যা বিবাহ করেন । মণিপুর রাজপরিবারের সঙ্গে বিবাহের সম্পর্কের সূত্র ধরেই ত্রিপুরার রাজপরিবারের মধ্যে বৈষ্ণবধর্ম প্রসার লাভ করে । কৃষ্ণকিশোর মানিক্য থেকে শুরু করে বীর বিক্রম মানিক্যের কাল পর্যন্ত সকলেই বৈষ্ণবধর্মের অনুসারী ছিলেন । ফলে রাজন্য সদস্যদের মধ্যে বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায় । বৈষ্ণব সাহিত্যের চর্চা এই সময় থেকে শুরু হয় ।

 মহারাজা রাজধর মানিক্যের নির্দেশে ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রামগঙ্গা বিশারদ কৃষ্ণমালা রচনা করেন । পন্ডিত দ্বিজ রামগঙ্গা শর্মার লিখিত 'কৃষ্ণমালা' কাব্যগ্রন্থটি মধ্যযুগের রচিত ত্রিপুরার বাংলা কাব্যের এখানে উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থ । মহারাজা কৃষ্ণ মানিক্যের (১৭৬০-১৭৮৩) ভ্রাতুষ্পুত্র দ্বিতীয় রাজধর মানিক্য সিংহাসনে বসার পর জয়ন্ত চন্তাইর মুখে তাঁর জ্যেষ্ঠতাতের বীরত্বের কাহিনি শুনে তা লিপিবদ্ধ করে রাখার আগ্রহের সঞ্চার হয় । তাঁর নির্দেশে ব্রাহ্মণ রামগঙ্গা শর্মা কৃষ্ণ মানিক্যের সংঘাতপূর্ণ জীবনী অবলম্বনে 'কৃষ্ণমালা' রচনা করেন । রাজন্যপ্রভাবের কারণে গ্রন্থটিতে বৈষ্ণবীয় চিন্তাচেতনা ও পদাবলি সাহিত্যের আঙ্গিকের ছাপ পড়ে । 

এই কাব্য রচনাকাল সম্বন্ধে কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না । তবে রাজধর মানিক্যের রাজত্বকালের মধ্যে কোনো এক সময়ে তা রচনা হয়েছিল বলে অনুমান করা যায় । কবি তাঁর পাণ্ডিত্যের দুর্বলতার কথা কাব্যের শুরুতেই উপস্থাপন করেছেন ।

পন্ডিত জনেরে কহি বিনয় বচন ।
অশুদ্ধ দেখলে পদ করিবা শোধন ।।
 সাধুয়ে পাইলে গ্রন্থ সদ অর্থ করয় ।
 যদি দোষ দেখে তাহে উদ্ধারিয়া নয় ।।
গুণ না দেখিয়া দোষ দেখে খল জনে ।
 তাহার দৃষ্টান্ত এই দেখ বিদ্যমানে ।। 
 কৃষ্ণমালা কাহিনি রাজা কৃষ্ণমানিক্যের জীবনকাহিনি অবলম্বনে রচিত হওয়ার ফলে সমকালীন ঐতিহাসিক ঘটনার অবতারণা ও রয়েছে কাব্যটিতে ।

ত্রিপুরার রাজা দ্বিতীয় রত্নমানিক্যের রাজত্বকাল ছিল (১৬৮২-১৭১২) খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত । তাঁর রাজত্বকালে তাঁর পিতৃব্য দ্বারিকা ঠাকুর বিদ্রোহ ঘোষণা করার ফলে সাময়িক কালের জন্য (১৬৯৩-৯৪) খ্রিস্টাব্দ রত্নমানিক্যের রাজ্যচ্যুতি ঘটে সাময়িককালের জন্য । 'চম্পকবিজয়' কাব্যে এই ঘটনাকে সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে । 'চম্পকবিজয়' কাব্যের কবির নাম শেখ মহদ্দিন । এছাড়া কবির আর কোনো পরিচয় এই কাব্যগ্রন্থে উল্লেখ নেই । এই কাব্যের প্রধান চরিত্র মীর খাঁ । বিদ্রোহী নরেন্দ্র মানিক্যের তাড়া খেয়ে চম্পক রায় চট্টগ্রামে পালিয়ে গিয়ে মীর খাঁর সাহায্যে প্রার্থনা করেন । মীর খাঁর প্রচেষ্টায় চম্পক রায় পুনরায় ত্রিপুরার রাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন । মীর খাঁর আদেশেই নাকি এই চম্পক বিজয় কাব্য রচনা করেছেন কবি । একথা তিনি কাব্যের বহু স্থানে উল্লেখ করেছেন ।
      
       ১. মীর খাঁ যে ভূবনে পুজিত 
তাহান আদেশ ধরি শিরস্ত্রাণ মান্য করি 
              মহদ্দিয়ে করিল রচিত। 
      ২. শ্রীযুক্ত মীর খাঁন প্রতাপ এ ভাস্কর 
          কহে হীন মুহাদ্দিয়ে তান আজ্ঞা পর ।

নুরনগর পরগনার অন্তর্গত বিদ্যাকুট নিবাসী রামনারায়ণ দেব ১২০৬ সালের ১৮ বৈশাখ 'চম্পক বিজয়' কাব্যটি নকল করেন । এই কাব্যটির নকল পুঁথি ব্যতীত মূল পুঁথি খুঁজে পাওয়া যায় না ।

উনবিংশ শতাব্দীর বৃহত্তর বঙ্গের সাহিত্যে ইতিহাসাশ্রিত কাব্য রচনার যে প্রবণতা ত্রিপুরার বাংলা কাব্যসমূহে পরিলক্ষিত হয়েছিল গাজীনামা, কৃষ্ণমালা, চম্পক বিজয় প্রভৃতির মাধ্যমে, সেই ধারাটিই অল্প কিছুকাল পরেই আধুনিক বাংলা কাব্যের পথিকৃৎ রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন প্রমুখর কাব্যে পরিপুষ্টি লাভ করে ।

উনবিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য রেনেসাঁর প্রভাবে বাংলাদেশের বুকেও লাগে তার দোলা । এই শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আমেরিকায় এই পরিবর্তন শুরু হয় । শুরুতে গতি কিছুটা মন্থর হলেও সহসাই তা গতিসঞ্চারিত হয়ে শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে দ্রুততর হতে থাকে ।

রেনেসাঁর ফলে ইউরোপীয় সাহিত্য-সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তন সূচিত হল তা বাংলা কবিতার বিষয়কেও পাল্টে দেয় । সে সময়ের পরাধীন ভারতবর্ষের উত্তাল ইতিহাসের প্রভাব ও বাংলা কাব্যে পড়ে । সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭), নীল বিদ্রোহ (১৮৫৭-৫৯), সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৬), প্রভৃতি ঘটনা বাংলা কাব্যের ভাষাকেও পাল্টে দেয় । নতুন চেতনার কাব্য রচনা হাত দেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন ও! হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কবিগণ ।



৪) বাংলার নবজাগরণের উত্তরকাল ও ত্রিপুরার কাব্য চর্চা 

বাংলা রেনেসাঁ পর্বের একপর্যায়ের অর্থাৎ উন্মেষ পর্বের সমাপ্তি ঘটে যখন রাজা রামমোহন রায়ের তিরোধান হয় । তাঁর মৃত্যুর পাঁচ বছর পরে জন্মগ্রহণ করেন ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য (১৮৩৯-১৮৯৬) । তাঁর দীর্ঘ ৫৭ বছরের জীবনে তিনি বাংলার রেনেসাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাল মধ্যপর্যায়, জাতীয় চেতনার উন্মেষের পরিপূর্ণতা পর্যন্ত দেখে যান । মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্যের সময়েই বাংলা কাব্যসাহিত্যে গীতিকবিতার উন্মেষ ঘটে । কবির একান্ত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই গীতিকবিতা মধ্য দিয়ে । তার সাথে কল্পনা ও সৌন্দর্যের যুগলবন্দীতে কবিতায় এক সংগীতময় রসমূর্তি রূপ ধারণ করে ।  এই সময়ে বাংলাকাব্যে আত্মপ্রকাশ ঘটে অনুভূতিপ্রবণ সৌন্দর্যপিয়াসী কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর । বিহারীলাল কলকাতার মতো নাগরিক পরিমন্ডলে থেকে নিসর্গসৌন্দর্য ও প্রেমের মধ্যে আনন্দের অন্বেষণ করে গেছেন । বীরচন্দ্র যে বছর সিংহাসন লাভ করেন (১৮৬২) সে বছর বিহারীলাল চক্রবর্তীর সংগীত শতক প্রকাশিত হয়েছে । এই সময়ের মধ্যে একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে কবির কাব্যগ্রন্থসমূহ— বঙ্গ সুন্দরী (১৮৭০), নিসর্গ সন্দর্শন (১৮৭০), বন্ধু বিয়োগ (১৮৭০), প্রেম প্রবাহিনী (১৮৭১), সারদামঙ্গল (১৮৭৯) সাধের আসন (১২৯৫-৯৬ বঙ্গাব্দে মাসিক পত্রে প্রকাশিত ), বাউল বিংশতি (১২৯৪), কবির শ্রেষ্ঠ ও সার্থক কীর্তি হলো সারদামঙ্গল (১৮৭৯) । কাব্যটি আখ্যান কাব্যের আকারে লেখা । কাব্যটিতে দেবী সারদা বা সরস্বতীর সাথে কবির আনন্দ,বেদনা,বিরহ,মিলনের মুহূর্তগুলি অনির্বাচনীয় প্রকাশের ব্যঞ্জনায় অনন্য রূপে ফুটে উঠেছে । বিহারীলাল যে নতুন ধারার সূত্রপাত করেন, পরবর্তীকালে বেশ কিছু কবি তাকে অনুসরণ করেন । এই ধারার অন্যান্য কবিদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন, কবি সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, অক্ষয় কুমার বড়াল প্রমূখ ও প্রসিদ্ধ । গীতিকবিতার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল নারীপ্রেম । তাঁদের কবিতায় নারীর বিচিত্র রূপ প্রকাশ পেয়েছে। 

মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্যের জীবন ও মননের উপর যে বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের প্রভাব পড়েছিল তা বলাই বাহুল্য । কারণ রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার ফলে বহির্ত্রিপুরার সঙ্গে অর্থাৎ বৃহত্তর বঙ্গের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ অসম্ভব ছিল না । তাছাড়া তিনি ছিলেন বিদ্বান ও বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত । তিনি ইংরেজি, বাংলা, উর্দু, মনিপুরি এবং ত্রিপুরি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন । ছিলেন বিজ্ঞানমনস্কও । এ ছাড়া তিনি ছিলেন সুকবি ও উচ্চাঙ্গ সংগীতে নিপুণ ও কলা রসিক । তাঁর আমলেই তাঁর উদ্যোগে ত্রিপুরার সঙ্গে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের যোগাযোগ নিবিড় হয় । তাঁর সময়ে ত্রিপুরার রাজদরবারে বহু জ্ঞানী গুণীজনের সমাবেশ ঘটেছিল । বীরচন্দ্র মানিক্য সম্বন্ধে তৎকালীন ত্রিপুরার বিখ্যাত কর্নেল মহিমচন্দ্র দেববর্মা বলেছেন–
'স্বর্গীয় মহারাজা বীরচন্দ্র ছিলেন বাংলার বিক্রমাদিত্য । তিনি একাধারে বৈষ্ণব কাব্যরসিক কবি এবং সংগীত ও ললিতকলাবিদ ছিলেন । এহেন রসিক চুড়ামণি, সাহিত্যের পাকা জহুরী মহারাজ বীরচন্দ্রের দরবার বহু গুণী ব্যক্তির সমাবেশে ভরপুর ছিল ।' (দেশীয় রাজ্য) 

রবীন্দ্রস্নেহধন্য ত্রিপুরা রাজপরিবারের সন্তান ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মন তাঁর সম্বন্ধে বলেছেন–
           'নবযুগের প্রবর্তক গুণী মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য তাঁর বাংলাভাষায় বিশেষ বুৎপন্ন, সুকবি, বৈষ্ণব সাহিত্যে সুপন্ডিত, সঙ্গীতজ্ঞ, শাস্ত্রজ্ঞ, সংগীত রচয়িতা, সুরস্রষ্টা, উর্দু ভাষায় মাতৃভাষার ন্যায় আলাপে সক্ষম, কূটনীতিপরায়ণ, বাক্পটু ও সর্বোপরি তিনি একজন সুনিপুণ চিত্রকর ও ফটোগ্রাফার ।'

মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য ছিলেন একজন কবি ও কাব্যরসিক । বৈষ্ণব সাহিত্য ছিল তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য । তিনি তাঁর অগ্রজ মহারাজা ইশানচন্দ্র মানিক্যের (১৮৫০, ১৮৬১) বৈষ্ণবপদ সংকলনে সেসময়ের বিখ্যাত চিত্রকর আলম কারিগরকে দিয়ে কয়েকটি ছবি করিয়ে সংযোজন করিয়েছিলেন । এছাড়া তিনি রাজদরবারের গ্রন্থাগারে অনেক বৈষ্ণবগ্রন্থ সংগ্রহ করেছিলেন । তাঁর অভিপ্রায় ছিল একটি সুবৃহৎ বৈষ্ণবপদাবলীসংকলন করার । এজন্য তিনি এক লক্ষ টাকা ব্যয়ের সংকল্প করেছিলেন । কিন্তু তাঁর অকাল মৃত্যুতে সমগ্র পরিকল্পনা অঙ্কুর এই বিনষ্ট হয় । কবি নরহরি চক্রবর্তী কর্তৃক সংকলিত 'গীতচন্দ্রোদয়' পদাবলী গ্রন্থটির অষ্টকাল-রাগানুরাগ খণ্ড পর্যন্ত তার পৃষ্ঠপোষকতায় মুদ্রিত হয়েছিল । মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য বঙ্কিমচন্দ্রের 'দুর্গেশ নন্দিনী', মাইকেল মধুসূদন দত্তর 'ব্রজাঙ্গনা' এবং 'মেঘনাদ বধ' কাব্যদুটি পাঠ করে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন । তিনি বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ লিখে গেছেন । এর মধ্যে কয়েকটি রয়েছে গীতিকাব্য । এগুলোর ভাষা ও কাব্য সৌন্দর্য যথেষ্ট রয়েছে । তাঁর রচিত কাব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—

        ১. সোহাগ (১২৯৩ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ ১৮৮৩ ইং) ।  মহারানী মনমোহিনী দেবীকে উদ্দেশ্য করে লেখা কবিতা সংকলন এটি । আগরতলার বীরযন্ত্রে ইশানচন্দ্র ভট্টাচার্যের দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয় । কাব্যটিতে আখ্যানপদে বৈষ্ণব কবি জ্ঞানদাসের একটি পদের আংশিক উদ্ধৃতি রয়েছে–

          রূপের সায়রে আঁখি ডুবিয়া রহিল
          যৌবন বনের মাঝে মন হারাইল ।।

কাব্যটিতে মোট ২২টি দীর্ঘ কবিতা রয়েছে । প্রত্যেকটি কবিতার আলাদা শিরোনামও রয়েছে । আবার প্রতিটি কবিতা একাধিক স্তবকে বিন্যস্ত । কাব্যটিতে পত্নীপ্রেমজনিত হৃদয়ের আবেগ নানাভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে । এখানে প্রেমের বিচিত্র প্রকাশভঙ্গি ঘটেছে । দ্বিতীয় পত্নী আগমনে তাঁর হৃদয়াবেগ শান্ত হয়েছে সত্য, কিন্তু তিনি তার প্রথমার প্রেমের স্মৃতিকে মুছে ফেলতে পারেননি–

          সেই বিদায়ের সেই সজল নয়ন 
                    উছলিছে হৃদি সিন্ধু,
                     অনন্ত মুকুতা বিন্দু,
         প্রতি হৃদে গ্রন্থি সূত্রে করেছি গ্রন্থন । 

২. প্রেম মরীচিকা (১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে কোন এক সময় রচিত ) । প্রয়াত মহারানী ভানুমতীকে উদ্দেশ্য করে লেখা বিরহের কবিতা রয়েছে এই গ্রন্থে । কাব্যটিতে কবির প্রিয়বিরহজনিত মনোবেদনা প্রকাশ পেয়েছে ।

     ৩. উচ্ছাস (১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে কোন এক সময় রচিত ) কাব্যটির প্রেম ও পূর্ণ জীবনের মধুর অনুভবকে কেন্দ্র করে রচিত । মহিষী ভানুমতী দেবীর মৃত্যুর পর যে হাহাকার তাঁর হৃদয়ে অবস্থান করছিল, দ্বিতীয়া মহিষী মনমোহিনী দেবীর সান্নিধ্যে এসে সান্ত্বনা লাভ করেছিল । জীবনে এক নতুন উপলব্ধি লাভ করেন তিনি । 'উচ্ছ্বাস' কাব্যগ্রন্থের কবিতা গুলি তাঁর এই নবজীবন লাভের ছাপ বহন করে । প্রেমের উচ্ছ্বাসকেই ব্যক্ত করে ।

    ৪. অকাল কুসুম (১৮৮৬)– এই কাব্যটি মহারানী মনমোহিনী দেবীকে উদ্দেশ্য করে লিখিত । অধিকাংশ কবিতাই প্রেম পর্যায়ের ।

    ৫. হোরি ( কোন সন উল্লেখ নেই ) । ১৩০২ ত্রিং-এর পূর্বে কোন এক সময় দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে লিখিত গীতিকাব্য । এই গ্রন্থটিতে শাস্ত্রনীতি মেনে ৩৪ টি সংগীত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে । 'হোরি' কাব্যে ভক্তিভাবের প্রকাশ ঘটেছে । বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যে যেমন বিভিন্ন পর্যায়ে থাকে সেরকম এই কাব্যেও বন্দনা, পূর্বরাগ, অভিসার, মিলন, বিরহ, উৎকণ্ঠা জাতীয় বিবিধ পর্যায়ের পদ রয়েছে । তাঁর একটি অভিসার বিষয়ক পদে পাই–

      চরণে চালনে দোলিছে গগনে 
      হেমপৃষ্ঠ বেণী সঘনে ঘন 
      কর্ণে কুন্তল মণি ঝলমল 
      যেমন সৌদামিনী ঝলকে ঘন ।

    ৬. শ্রীশ্রী ঝুলনগীতি (১২৮৮ ত্রিং অর্থাৎ ১৮৭৮ ইং রচিত এবং ১৩০২ ত্রিং অর্থাৎ ১৮৯২ ঈশান চন্দ্র ঘোষ এর তত্ত্বাবধানে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয় ) । উৎসর্গপত্রে রয়েছে–'রাজবাড়ী নতুন হাবেলি, ২৮ বৈশাখ ১৩০২ ত্রিপুরা । উৎসর্গ স্বর্গীয়া ভানুমতী দেবীর করপঙ্কজে । শ্রীশ্রীঝুলনগীতিতে ৫০ টি সংগীত রয়েছে । যার মধ্যে ৮টি সংস্কৃত ভাষায় রচিত । মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য গ্রন্থের সূচনায় লিখেছেন–

     "ঝুলনগীতি মহাজন পদাবলীর ছায়া লইয়া লিখিত । পদের ভাষা অপ্রচলিত ও দুরূহ তাহাতে অধিকার জন্মান সুকঠিন, গানগুলি যে তত সুবিধার হয়েছে আশা করা যায় না । ইহা আমার প্রথম জীবনের স্মৃতি চিহ্নমাত্র এবং শোকসন্তপ্ত হৃদয়ের শান্তিদায়ক বলিয়াই যেভাবে লিখিত হইয়াছিল তাহার কোন অংশ সংশোধন না করিয়া প্রকাশ করিলাম ।" 

কাব্যটি তিনি মহারানী ভানুমতী দেবীকে উৎসর্গ করেছেন–
         রাইকানু বিলাসন প্রেমলীলা রসায়ন 
            তব স্মৃতিময় এই কবিতা আমার 
হৃদি সিক্ত আঁখি নীরে  উদ্দেশ্যে তোমার করে 
সঁপিলাম সমাদরে গীতি উপহার ।

বীরচন্দ্র মানিক্যের কাব্যে পদাবলি সাহিত্যের ধারাটি বিশেষ করে অনুসৃত হয় । এছাড়া সমকালীন বাংলা গীতিকবিতার সৃষ্টিকালের প্রভাবও তাঁর কবিতায় পড়েছিল । মানব জীবনে ভালোবাসা যে গভীর অনুভবের বিষয় বিচ্ছিন্নতার বেদনায় যে অন্তর দীর্ণ হয়, নিঃসঙ্গতা এসে ঢেকে দেয় কবির সুকুমার হৃদয় তারই ব্যথাতুর প্রকাশ ঘটে কবির কাব্যে । এছাড়া রবীন্দ্রকাব্যেরও কিন্তু প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তাঁর কবিতায় ।

মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্যের মহিষী ভানুমতী দেবী ১৮৮২ সালে অকালে পরলোকগমন করেন । এর কিছুদিন পরেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিলাত থেকে এসে 'ভগ্নহৃদয়' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন । স্ত্রী বিয়োগে ব্যথাতুর কবি মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য এই কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করে গভীরভাবে আপ্লুত হয়েছিলেন । ভবিষ্যৎ কবিপ্রতিভার স্ফুরণ যে এই কবির মধ্যে রয়েছে তা তিনি অনুভব করেন । তিনি তার প্রাইভেট সেক্রেটারি রাধারমন ঘোষকে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে পাঠিয়েছিলেন কবিকে অভিনন্দন জানানোর জন্য । সম্ভাবনাময় তরুণ কবিকে সেদিন সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল বীরচন্দ্র মানিকের উদ্যোগে । ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ১২ই ফাল্গুন কিশোরসমাজের পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথকে সম্মাননা জানানোর সঙ্গে সঙ্গেই ত্রিপুরা রাজ পরিবারের সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনের সম্পর্কসেতু তৈরি হয়েছিল সেদিন ।

ত্রিপুরার আধুনিক যুগের প্রবর্তক বীরচন্দ্র মানিক্য ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় পরলোকগমন করেন । তাঁর মৃত্যুর পরে কৈলাশহরে যে শোকসভা হয়েছিল সেখানে কুকিনেতা বানখাম্পুই একটি স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছিলেন । এতেই অনুমান করা যায়, বীরচন্দ্র মানিক্যের কাব্যপ্রতিভা সেদিন ত্রিপুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিকশিত হয়েছিল । বাংলাসাহিত্য যখন আধুনিকতার দ্বারপ্রান্তে তখন বিহারীলাল গীতিকবিতার ধারাকে বিশাল ঐশ্বর্য দান করেছিলেন । এজন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ভোরের পাখি' আখ্যায়িত করেছিলেন । সেই যুগসন্ধিক্ষণে অবস্থান করে এই আরণ্যজনপদে কুয়াশার সামিয়ানার নিচে অবস্থিত পাহাড়ের চূড়ায় উষাকালীন সূর্যোদয়ের রক্তিম আভা দেখে ত্রিপুরার কাব্য চর্চার আধুনিক যুগকে আহবান করার লক্ষ্যে যে অরণ্যদোয়েলের শিস দিয়ে গেছেন বীরচন্দ্র তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে, তারই ধ্বনিসুষমা পরবর্তী কবিদের বাংলা কবিতাঙ্গনে সমানভাবে সাহসে সঙ্গে চলার জন্য রসদ ও সাহস জুগিয়েছে।

৫) রাজ অন্তঃপুর : ত্রিপুরার আধুনিক যুগের সূচনা


 মহারাজা বীরচন্দ্র যে আধুনিকতার সূচনা করে গিয়েছিলেন সমগ্র ত্রিপুরার শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ও প্রশাসনে তার ঢেউ সেদিন রাজত্ব করেও আছড়ে পড়েছিল ।

শিক্ষার্থীর কল্পনার বিকাশে সাহিত্যের ভূমিকা তাত্ত্বিক ভিত্তি পদ্ধতি ও সক্রিয়তা ভিত্তিক শিক্ষণ

শিক্ষার্থীর কল্পনার বিকাশে সাহিত্যের ভূমিকা: তাত্ত্বিক ভিত্তি, পদ্ধতি ও সক্রিয়তা-ভিত্তিক শিক্ষণ

অশোকানন্দ রায়বর্ধন, অবসরপ্রাপ্ত বিদ্যালয় পরিদর্শক ( বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক )

Abstract—Imagination is a foundational cognitive ability that shapes creativity, empathy, and flexible thinking, and literature offers one of its most effective training grounds. This study explores how literary forms—poetry, stories, drama, and travel writing—nurture imaginative growth among learners. Literature stimulates creative imagination by encouraging students to visualize alternative possibilities beyond lived experience. Through metaphor and symbol, it expands abstract thinking and the capacity to interpret multilayered meanings. Literary narratives initiate cognitive simulation, enabling readers to mentally experience emotions, actions, and perspectives of fictional characters. Moreover, rhythmic poetry and stories strengthen sensory imagery and narrative awareness, while travel literature broadens spatial imagination and cultural understanding. The paper argues that activity-based literary pedagogy—creative writing, dramatic enactment, and imaginative mapping—significantly deepens learners’ imaginative capacity and promotes holistic intellectual growth.

Keywords: কল্পনার প্রসার (Imagination Development), সাহিত্য(Literature), রূপক ও প্রতীক (Metaphor and Symbol), জ্ঞানগত প্রতিরূপ (Cognitive Simulation), সক্রিয়তা-ভিত্তিক শিক্ষা (Activity-Based Learning).


ভূমিকা:-

সাহিত্যের প্রধান ভূমিকা হল মানুষের কল্পনার শক্তিকে প্রসারিত করা । সাহিত্যচর্চা মানুষের সংবেদনশীলতা, আবেগ, চিন্তা-প্রক্রিয়া এবং কল্পনার শক্তিকে গঠনমূলকভাবে বিকশিত করার এক অসীম শক্তিধর সরঞ্জাম ।  সাহিত্যপাঠ মানুষের অভ্যন্তরীণ মানসিক কাঠামোকে পুনর্গঠিত করে এবং সৃজনশীলতাকে উদ্দীপ্ত করে । তাতে নতুন চিন্তার দিগন্ত খুলে দেয় । অ্যাকাডেমিক, মানসিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত–সব ক্ষেত্রেই সাহিত্য একটি কার্যকরী জ্ঞান-মাধ্যম । আধুনিক মনোবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান, কগনিটিভ লিঙ্গুয়িস্টিক্স ও ন্যারেটিভ স্টাডিজ–সব ক্ষেত্রেই সাহিত্যকে মানবচেতনা বিকাশে অপরিহার্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় । শিক্ষাব্যবস্থায় সাহিত্যকে কৌশলগতভাবে যুক্ত করলে শিক্ষার্থীদের আবেগ, বুদ্ধিমত্তা, গভীর চিন্তা, মননশীলতা, সহমর্মিতা ও সৃজনশীল কল্পনা সমস্ত বৃদ্ধি পায় যা কেবল বিনোদন নয় বরং মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অপরিহার্য অঙ্গ । 

কল্পনা মানুষের মানসিক বিকাশের অন্যতম মৌলিক শক্তি । সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন, সমস্যার সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভাষা-আয়ত্ত এমনকি সামাজিক দক্ষতাও মূলত কল্পনাশক্তির উপর নির্ভরশীল । সাহিত্য হল এই কল্পনাশক্তি বিকাশের প্রাচীনতম পরীক্ষিত ও সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম । গল্প, কবিতা, নাটক, রূপক, প্রতীক কিংবা ভ্রমণ সাহিত্য সবই পাঠকের মনোজগতে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন চিত্র, নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে । সাহিত্য পাঠককে এমন এক জগতে নিয়ে যায় যা হয়তো বাস্তবে নেই এটি পাঠকের নতুন পরিস্থিতি চরিত্র ও ধারণা নিয়ে ভাবতে সাহায্য করে । জ্ঞান অভিজ্ঞতার সঙ্গে সৃজনশীল চিন্তার জন্ম দেয় । বাস্তব জীবনের জ্ঞান অভিজ্ঞতা কে নতুনভাবে সাজাতেও বুঝতে সাহায্য করে । সাহিত্যপাঠ–বিশেষ করে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক ও ভ্রমণ সাহিত্য মানুষকে এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে যায় যা বাস্তবে আছে বা নেই, কিন্তু মানসিকভাবে কার্যকর । কল্পনার মনোপ্রক্রিয়ায় চরিত্র, দৃশ্য, সময়-পরিসর তৈরি হয় (internal visualisation) । সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা জায়গায় (future thinking) । রূপক ও প্রতীককে মানসিক চিত্রে রূপান্তরিত করে (symbolic processing) । 'হঠাৎ যদি আমায় কোন ছলে'– অবাস্তব  চিন্তার সৃষ্টি করে (counterfactual thinking) ।

মানবজ্ঞান গঠনে কল্পনা :-
 (Imagination) একটি মৌলিক ক্ষমতা। দার্শনিক কান্ট, মনোবিজ্ঞানী ভিগোৎস্কি এবং সাহিত্যতাত্ত্বিক উইলিয়াম এম্পসন– সকলেই কল্পনাকে মানবচিন্তার কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কল্পনা ব্যক্তি-মানুষের সৃজনশীলতা, সমস্যা-বুঝতে পারা, সামাজিক সংবেদনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বোধকে সমৃদ্ধ করে। সাহিত্য—গল্প, কবিতা, নাটক, ছড়া কিংবা ভ্রমণবৃত্তান্ত—এই কল্পনাশক্তির অনুশীলনের জন্য সবচেয়ে সক্রিয় ও প্রাকৃতিক পরিসর। সাহিত্য পাঠের মধ্য দিয়ে পাঠক একদিকে নিজের অভিজ্ঞতার সীমানা ভাঙেন, অন্যদিকে চরিত্র, প্রতীক, রূপক, সংগীতবোধ, নাট্য-ক্রিয়াশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার মনের ভেতর জ্ঞানগত প্রতিরূপ (cognitive simulation) প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সাহিত্যভিত্তিক অনুশীলন, প্রজেক্ট ও সৃজনধর্মী কাজ কল্পনার বিকাশে বিশেষ সহায়ক।

শিক্ষার্থীর কল্পনার বিকাশে সাহিত্য এমন একটি সেতু হিসেবে কাজ করে যা তাকে বাস্তবে সীমানা ছাড়িয়ে অসীমের পানে নিয়ে যায় এবং তাকে আরও সংবেদনশীল ও সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে । এখানে  শিক্ষার্থীর উপযোগী কিছু সক্রিয়তা-ভিত্তিক শিখন(Activity-based) পদ্ধতির উল্লেখ করা হল।

১. সৃজনশীল কল্পনা (Creative Imagination) ও সাহিত্য

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা– সাহিত্য সামাজিক সাংস্কৃতিক সংকেতের মাধ্যম, যা শিশুর চিন্তার উচ্চতর স্তর তৈরি করে। সৃজনশীল কল্পনা সক্রিয় হয় যখন ব্যক্তি বাস্তব অভিজ্ঞতার বাইরেও সম্ভাব্যতা, ভবিষ্যৎ  কল্পনা করে ( যেমন কল্পবিজ্ঞান ), আবার কখনো সম্পূর্ণ অবাস্তব ও রূপকথার জগত সৃষ্টি করে উভয়ই কল্পনার ভিন্ন ভিন্ন দিককে বিকশিত করে । বিকল্প পরিণতি বা নতুন রূপ কল্পনা করতে শেখে। বৈজ্ঞানিক গল্প কাহিনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী ধারণা সম্পর্কে ভাবতে অনুপ্রাণিত করে যা সৃজনশীল চিন্তা কে উদ্দীপিত করে । এক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায়ের 'প্রফেসর শঙ্কু' সিরিজ শিক্ষার্থীর পাঠের বিষয় হতে পারে ।
সাহিত্য এই ‘সম্ভাব্যতার অঞ্চল’ তৈরির চর্চা করায়—কখনও অবাস্তব ও ফ্যান্টাসিকে বাস্তবের সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা–“একটি বাক্য থেকে গল্প”
শিক্ষার্থীদের একটি সাধারণ বাক্য দিন ।

যেমন: “আগামীকাল তুমি স্কুলে আসবে না।” অথবা 'আগামী শতাব্দীতে মানুষ কোন গ্রহে বাস করবে'
এই  দুটি বাক্যের যে কোনো একটি নিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের কল্পনায় গল্প তৈরি করবে।
এতে divergent thinking, narrative imagination উভয়ই বিকশিত হয়।

২. রূপক (Metaphor) ও প্রতীকের (Symbol) ভূমিকা:-

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা–সাহিত্য বিমূর্ত ধারণা গুলিকে মৌখিক উপস্থাপনার মাধ্যমে বোধগম্য করে তোলে যা শিক্ষার্থীদের কে রূপক ও প্রতি কিভাবে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে । রূপক শুধু ভাষার অলংকার নয়—এটি ভাবনার সংগঠক। প্রতীক মানুষের অচেতন চিন্তাকে ভাষা দেয় । সাহিত্যে রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার পাঠকের মনকে একাধিক স্তরে ভাবতে শেখায়। পরোক্ষ অর্থ ধরে নেওয়ার ক্ষমতা কল্পনাকে তীক্ষ্ণ করে।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা—“রূপক খোঁজা ও তৈরি”

একটি কবিতা—যেমন যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের “হাট”—দিয়ে শিক্ষার্থীদের রূপক চিহ্নিত করতে বলা।
তারপর তাদের নিজস্ব প্রতীক তৈরি করতে বলা—
যেমন “হাট” = 'বিকালবেলা', “গাঁটের কড়ি”  ইত্যাদি। অথবা কালিদাস রায়ের 'ছাত্রধারা' কবিতার মতো জীবনের বহমান ধারার মতো চিরন্তন কিছু বিষয় চিহ্নিত করা ।

৩. কগনিটিভ সিমুলেশন (Cognitive Simulation)

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা–সাহিত্য পাঠের সময় পাঠকের মস্তিষ্ক চরিত্র, স্থান, অনুভূতি ও দৃশ্যকে ‘simulate’ করে—অর্থাৎ নিজের ভেতরে ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা তৈরি করে। এটি নিউরোসায়েন্সে “embodied simulation” নামে পরিচিত ( Gallese & Wojciehowski, 2011)। বিভিন্ন চরিত্রের জীবন তাদের সুখ দুঃখ সংগ্রাম ইত্যাদি পাঠ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থী অন্যের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে পারে । বই পড়ার পর শিক্ষার্থী গল্পের চরিত্র এবং পরিবেশের মানসিক চিত্র তৈরি করে যা তাদের কল্পনার জন্য একটি অনুশীলন ।
এতে সহানুভূতি, সামাজিক কল্পনা ও মানসিক নমনীয়তা বৃদ্ধি পায়। মানবিক সম্পর্ক বোঝার ক্ষমতা বাড়ায় ।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা—“চরিত্র-হয়ে ওঠা”

গল্পের চরিত্র হয়ে শিক্ষার্থীদের ছোটো নাট্য-উপস্থাপনা করতে বলা।ধ
যেমন—“ক্ষুধিত পাষাণ” এর মেহের আলী,  “কাবুলিওয়ালা”র রহমৎ বা মিনি, বিভূতিভূষণের “অপু, দুর্গা”—কোন চরিত্র কী ভাবছে, কী সিদ্ধান্ত নেবে, তারা enact করবে।

৪. ছড়া ও কবিতার ভূমিকা:-

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা—ছড়া ও কবিতা
শিশুমনে ছন্দ, শব্দচিত্র, অর্ধেক-অসমাপ্ত চিত্র—সব মিলিয়ে কল্পনার ভুবন নির্মাণ করে। গবেষণা দেখায়—rhyme & rhythm auditory imagination উন্নত করে; চিত্রকল্প visual imagination জাগায়। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে সৃজনশীল চিন্তার জন্ম দেয় । শিক্ষার্থীদের কল্পনার শক্তি এবং আত্মবিশ্বাস বিকাশের সাহায্য করে ।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা–“নিজের ছড়া লেখা”

যেখানে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ দেওয়া হবে—যেমন “ফুল”, “পাখি”, “চাঁদ”—ইত্যাদি শব্দ বা বিষয় দিয়ে ছড়া রচনা। অথবা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'পাল্কির গান' কবিতার বিভিন্ন দৃশ্যগুলোর বর্ণনা করা । এটি ভাষাবোধ, চিত্রকল্পবোধ ও সংবেদনশীল কল্পনাকে বাড়ায়।

৫. গল্প ও নাটকের ভূমিকা:-

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা–গল্প মানুষের মানসিক কাঠামো গঠনের প্রধান মাধ্যম। নাটক এতে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়—কারণ এতে কল্পনা ও শরীরী অভিজ্ঞতা এক সঙ্গে কাজ করে। চরিত্র-নির্মাণ, সংলাপ, মঞ্চস্থকরণ—সবকিছু শিক্ষার্থীদের কল্পনাপদ্ধতিকে বহুমাত্রিক করে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক চরিত্র, অতীত সম্পর্কে ধারনা এবং কল্পনা প্রসূতভাবে সেই সময়ের ঘটনাগুলো উপলব্ধি করতে সাহায্য করে । নাটকের উল্লেখিত দূরবর্তী স্থান সংস্কৃতি এবং ভিন্ন জীবনধারা সম্পর্কে জানতে শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করে ।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা–"গল্প-রূপান্তর”

একটি গল্প দিয়ে সেটিকে নাটকে রূপান্তর করতে বলা। যেমন—রবীন্দ্রনাথের “ছুটি” গল্পকে কিংবা শরৎচন্দ্রের 'অভাগীর স্বর্গ' গল্প অবলম্বনে ছোটো নাটিকা বানানো ।

৬. ভ্রমণসাহিত্যের ভূমিকা:-

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা—ভ্রমণসাহিত্য পাঠকের মনের সামনে ভূগোল, ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষ—সব মিলিয়ে এক বিস্তৃত ‘অন্য জগত’ খুলে দেয়। unfamiliarity → curiosity → imaginative mapping: এটাই এর মূল প্রক্রিয়া।
শিক্ষার্থীরা মানচিত্র, ছবি, শব্দচিত্র, অতীত-বর্তমান মিলিয়ে একটি নতুন অভিজ্ঞতা গড়ে তোলে। বিভূতিভূষণের 'আরণ্যক' পাঠ করানো যেতে পারে । প্রবোধকুমার সান্যালের মহাপ্রস্থানের পথে, শঙ্কু মহারাজের 'বিগলিত করুণা জাহ্নবি যমুনা' ইত্যাদি ভ্রমণসাহিত্য পাঠের মাধ্যমে  স্থানিক সংস্কৃতি, প্রকৃতি, জীবনযাত্রা শিক্ষার্থীর মনকে এমন ভাবে প্রভাবিত করে যা তার কল্পনার জগতকে সমৃদ্ধ করে । পাশাপাশি ভাষার নান্দনিকতাও উপলব্ধি করতে শেখে ।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা–“কাল্পনিক ভ্রমণবৃত্তান্ত”

বিভূতিভূষণের 'চাঁদের পাহাড়' পড়ানোর পর শিক্ষার্থীদের বলা—
“তোমরা এমন একটি জায়গায় ভ্রমণ করতে গেলে  যা আদৌ নেই—এমন একটি ভ্রমণের বিবরণ দাও।”
এতে শিক্ষার্থীর ভুবননির্মাণ (world-building) দক্ষতা বৃদ্ধি পায় ।

৭. উপসংহার:-

সাহিত্য মানুষের ‘সম্ভাবনামূলক চেতনা’ (potential consciousness) গঠনের অন্যতম শক্তি। সৃজনশীল কল্পনা, প্রতীকী ধারণা, কগনিটিভ সিমুলেশন, ছন্দ-সংগীত, কাহিনি কিংবা ভ্রমণের মানসিক বিস্তার—সব মিলিয়ে সাহিত্য পাঠ এক গভীর মানবিক, বৌদ্ধিক ও সৃজনশীল অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। সক্রিয়তা-ভিত্তিক শিক্ষণ (Activity-based) পদ্ধতি কার্যকর করে তুলতে পারে। ফলে সাহিত্য হয় শুধু পাঠ্যবস্তু নয়—মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া । সাহিত্য কখনো শুধু লেখা নয়—এটি চিন্তার দরজা। শিক্ষার্থীদের কল্পনা, সৃজনশীলতা, মানবিকতা—সবই এই সাহিত্যের অনুশীলনের মাধ্যমে গঠিত হয়। সক্রিয়তা-ভিত্তিক সাহিত্য-শিক্ষা তাদের মনের মধ্যে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তি দেয়। কেবল পাঠ নয়—সাহিত্য আমাদের মানুষ হতে শেখায়, স্বপ্ন দেখতে শেখায় । জীবন গঠনেও সহায়ক ।


সহায়ক গ্রন্থ:-

১. শিক্ষাশ্রয়ী মনোবিজ্ঞান– সুশীল রায়।
২.  শিক্ষা মনোবিদ্যা– অধ্যাপক সার্থক     মন্ডল
৩. ভাষা শিক্ষণ পদ্ধতি, বাংলা–ড. সুবিমল মিশ্র, শুচিস্মিতা বিশ্বাস
৪. বাংলা শিক্ষা পদ্ধতি : তত্ত্ব ও প্রয়োগ– ড. মহুয়া বন্ধু চ্যাটার্জী
৫. প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষণে বাংলা শিক্ষণ পদ্ধতি–ড. সুবিমল মিশ্র 
৬. প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষণে বাংলা ভাষা বিষয় ও পদ্ধতি–ড. কৌশিক চট্টোপাধ্যায়

Thursday, June 18, 2026

কর্নাটকের নৃত্যশৈলী ও বৈশিষ্ট্য

 কর্নাটকের নৃত্যশৈলী ও বৈচিত্র্য 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রদেশ তাদের নানারকম প্রাদেশিক লোকনৃত্যের জন্য বিখ্যাত । সেরকম কর্নাটকেরও বেশ কিছু লোকনৃত্য রয়েছে । তার মধ্যে ইয়াকষাগানা ( যক্ষগণ ), হাটারি ও কুনিথা ইত্যাদি প্রধান । ব্যাঙ্গালোরে যে জায়গাটায় ছেলের বাসায় আছি তার কাছাকাছি একটা গণেশ মন্দির আছে ।গণেশ পূজাকে কেন্দ্র করে এই চত্বরটা জমজমাট । লোকে লোকারণ্য । রাস্তা ব্লক করে চলছে নাচ-গান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান । পুজোর দিন সন্ধ্যায় প্রসাদ পেলাম । তার স্থানীয় নাম 'পোঙ্গল' । গতকাল সন্ধ্যায় দেখলাম দেওয়ালির মতো বাজি ফুটছে । সান্ধৃভ্রমণে বেরিয়ে গণেশ মন্দিরের কাছাকাছি গিয়ে দেখি আলোর মালা । রাস্তা জুড়ে । বাজি পুড়ছে অঝোরে । আর উল্টোদিকের ফাঁকা একটা জায়গায় দেখলাম লোকে লোকারণ্য । সেখানে বিকট শব্দে ঢাকজাতীয় কিছু বাজছে । কাছে গিয়ে দেখলাম চারদিকে ঘেরা মানুষের মাঝখানে নানারকম পোষাক ও মুখোশ পড়ে কিছু লোক ঘুরে ঘুরে নাচছে । পোষাকের কারণে  তাদের বপু আর উচ্চতা সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু বেশি । আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না । ভিড় ঠেলে এগুতে গিয়ে অচেনা ভাষায় গালাগালি শুনলাম । তাতে কি হল । অর্থ যখন বুঝছি না তখন আর আমার চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করলেও গায়ে লাগবে না । যাই হোক, হেসেটেসে এগিয়ে গিয়ে নাচের ভিডিও করলাম । একটু পরেই নাচ শেষ হয়ে গেল । 

নাচ তো দেখলাম । কিন্তু কি নাম এই নাচের ? কেন নাচল ? ইত্যাদি জানার জন্যে মন উশখুশ করতে লাগল ।  ফেরার পথে রাস্তার উল্টোদিকে দেখলাম একজন নানারকম ফল কুচি কুচি করে বাটিতে সাজিয়ে বিক্রি করছেন । তাঁরা একে বলেন 'ফ্রুটবল' । এটা বুঝতেও আমার বেগ পেতে হয়েছিল । প্রথমদিন শব্দটা আমার কানে লেগেছিল 'ফুটবল' । পরে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় আমার কাছে । ব্যাঙ্গালোরে এরকম কুচো ফলের বাটি এবং ফলের রস রাস্তার মোড়ে মোড়েই পাওয়া যায় । আমি দোকানটাতে গিয়ে একবাটি কুচো ফল নিলাম । ওর পাশেই একটা খালি টুল পেয়ে বসে ফল খেতে খেতে ওর সঙ্গে গল্প জুড়লাম । দুজনেরই মাধ্যম হিন্দি পান্ডিত্যের কথা আর উল্লেখ করলাম না । ওকে বললাম, ভাই উধার এক বড়িয়া ডান্স দেখা ম্যায়নে । বলে ওদিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলাম । ও বলল,  ডাল্লু কুনিথা ডানছো ?  কেন জানি মনে হল তাঁর কাছ থেকে কিছু জানা যাবে । আমি বললাম, হাঁ হাঁ ভাইয়া, কিঁউ ইতনা ডান্স কিয়া ? বাজা বাজায়া ? তিনি তখন আমাকে টুকটাক যা বললেন সেটাই এই অর্বাচীনের কাছে বড়ো পাওনা হল । কথায় কথায় জানালেন তিনি কলেজ পর্যন্ত পড়েছেন । অর্থাভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেননি । অল্প কিছুক্ষণ সময়ে তিনি যা বললেন তা আমি মনে গেঁথে দ্রুত বাসায় ফিরে এসে প্যাডে নোট করে নিলাম । কিছু কিছু ব্যাখ্যা কন্নড়ি অ্যাকসেন্টে হিন্দি বলায় কিছুই বুঝতে পারিনি । এখানকার ভাষা জানিনা বুঝিনা । তাই যাচাই করার সুযোগ নেই । তাই ফুটপাথের ওই হকারের মুখে যা শুনেছি তাই গুছিয়ে আজই লেখাটা তৈরি করলাম । তথ্যের চাইতে একটা প্রাদেশিক নৃত্যের দর্শনটাই আমার কাছে বিরল প্রাপ্তি । আমার আবেগটাকে প্রাধান্য দিয়ে অভিজ্ঞ পাঠক আমার তথ্যগত ভুলটাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি । 

কর্নাটকে বিশেষ পূজা-পার্বণ উপলক্ষে অনুষ্ঠানমূলক নৃত্যের আয়োজন করা হয়ে থাকে । 'ডল্লু কুনিথা' সেই ধরনের এক বিশেষ নৃত্য । 'ডল্লু কুনিথা' নৃত্যের সঙ্গে শিব-পার্বতীর মিথ জড়িত । বুঝলাম, শিবপরিবারের সদস্য গণেশের পুজো উপলক্ষেই তাহলে এই নৃত্যের আয়োজন । ডল্লু কুনিথা নৃত্যে বিকট শব্দে ড্রাম বাজানো হয় । তার সঙ্গে তালে তালে নানারকম মুখোশ পরে নৃত্যশিল্পীরা ঘুরে ঘুরে দলবদ্ধভাবে নৃত্য করে । শৈব ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এই নৃত্য বিশেষভাবে প্রচলিত । ধর্মীয় অনুষ্ঠানমূলক কুনিথা নৃত্যের আরো প্রকারভেদ আছে । যেমন 'দেবারি থাট্টে কুনিথা', 'ইয়ালেম্মানা কুনিথা', 'সুগ্গি কুনিথা', 'পাটা কুনিথা', 'গৌরাভা কুনিথা' ( উচ্চারণ আমি যতটা বুঝেছি সেই অনুযায়ী লিখলাম ) ইত্যাদি এক একটি দেবদেবীর নামানুসারে প্রচলিত অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক নৃত্য । নৃত্যরত শিল্পীদের পোষাক-মুখোশ দেখে আমার মনে হল, এরা বোধহয় শৈব মিথকল্পের সদস্য ইতর প্রাণী নন্দী, ভৃঙ্গী, বৃষ, মোষ ইত্যাদি চরিত্র রূপায়িত করেছে ।

বিশাল ভারতবর্ষের বহু বৈচিত্র্যের ধারাটি নৃত্যের মধ্যেও বিরাজমান ।  নানা প্রদেশের নানারকম ধ্রুপদী নৃত্য ও লোকনৃত্যে জড়িয়ে রয়েছে বহু বর্ণময়  উপকরণ, আঙ্গিক । যা আমাদের  জাতীয় সংস্কৃতিকে নিরন্তর সমৃদ্ধ করে চলেছে ।বহন  করে চলেছে সম্প্রীতির বার্তা ফল্গুধারার মতো ।
ব্যাঙ্গালুরু, ২৫সেপ্টেম্বর,২০২৩

আমাদের বংশলতিকা

আমাদের বংশ লতিকা 
অশোকানন্দ রায়বর্ধন

 গোবিন্দরাম ( চাম্পারাম) —> ভৈরবচন্দ্র ( স্ত্রী-মঙ্গলা )

ভৈরবচন্দ্র+মঙ্গলা ( পুত্রগণ )—>বৈদ্যনাথ,কামিনীকুমার ( স্ত্রী-সরলা ), গগণচন্দ্র, সতীশচন্দ্র

কামিনীকুমার+,সরলার ( পুত্রগণ )—>মহিমচন্দ্র ( স্ত্রী ঊষারানী, প্রমিলা ), মনোরঞ্জন ( স্ত্রী ঊষারানি ), অনিলচন্দ্র ( স্ত্রী......), দুলাল

বাঙালি সত্তা, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতিরঅনুষ্ঠান

বাঙালিসত্তা, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির অনুষ্ঠান

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

গত ২০ এপ্রিল বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকায় বিশ্ব বাঙালি সংসদের উদ্যোগে ৪৯ নিউ ইস্কাটনস্থ আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হল বিশ্ব বাঙালি সম্মেলন–২০২৪ । সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের জাতিসত্তার কবি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মুহম্মদ নুরুল হুদা । উদ্বোধক ছিলেন উপসচিব উপ-পরিচালক আঞ্চলিক লোক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ঢাকা, ডঃ শফিকুল ইসলাম । পুরো অনুষ্ঠানটি তিনটি পর্যায়ে  ভাগ করা হয় । প্রথম পর্যায়ে 'বাঙালির সম্প্রীতি বাঙালির সংস্কৃতি' শীর্ষক আলোচনার শুরুতে প্রধান অতিথি দুইদেশের বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিকদের এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা প্রদান করে তাঁর আলোচনার সূত্রপাত করেন । তাঁর আলোচনায় সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে নান্দনিক সৌন্দর্য ও মনের শান্তির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন । বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালির অবদান, লড়াই, তার যাত্রাপথ, তার বিশ্বময় ব্যপ্তির কথা তুলে ধরেন । সবশেষে তিনি পাঠ করেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা 'যতদূর বাংলা ভাষা ততদূর এই বাংলাদেশ' কবিতাটি । এরপর আলোচনার শীর্ষককে অনুসরণ করে বক্তব্য রাখেন ত্রিপুরার লোকগবেষক ও প্রাবন্ধিক অশোকানন্দ রায়বর্ধন । তিনি তাঁর আলোচনায় বাঙালি জাতির অতীত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সূত্র ধরে বর্তমান সময় ও সেই সংস্কৃতিকে লালন করার ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরেন । সীমান্তের বিভাজন থাকলেও বাঙালি জাতিসত্তার অভিন্নতার কথা উল্লেখ করেন তিনি । আসামের সাময়িক প্রসঙ্গ পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক মিলন লস্কর তাঁর আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধে বরাক অঞ্চলের মানুষের অবদানের অনালোকিত অধ্যায় তুলে ধরেন । এছাড়াও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন কথাসাহিত্যিক চেয়ারম্যান প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র,
মিজ রোকেয়া ইসলাম । বাংলাদেশ জাতীয় কবিতা পরিষদের দপ্তর সম্পাদক বিজ্ঞানকবি বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদি । বাঙালি জাতিসত্তার মেলবন্ধন ও সম্প্রীতির কথা তাঁর আলোচনায় তুলে ধরেন । বিশ্ব বাঙালি সংসদের সভাপতি কবি লোকমান হোসেন পলা এই সংগঠনের ভূমিকা ও কর্ম প্রণালী সভার সামনে তুলে ধরেন এবং উপস্থিত সকলকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন । অনুষ্ঠানের সভাপতি ডঃ শাহাদাত হোসেন নিপু কবি ও বাচিক শিল্পী, পরিচালক বাংলা একাডেমি তাঁর আলোচনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আলোকে ভারত বাংলাদেশের মৈত্রী সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন । সম্প্রীতির স্বার্থে এই বিষয়গুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি ।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ছিল 'হাসনাইন সাজ্জাদীর বিজ্ঞান কবিতার ধারনা' শীর্ষক সেমিনার । এই পর্যায়ে আলোচনাকালে অধ্যাপক মাহবুবা বেগম, আবু সাঈদ তুলু, নাভেদ আফ্রিদী প্রমুখগণ বাংলাকবিতার এই বিশেষ প্রবণতাটি সম্পর্কে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তৃত বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করেন । এই পর্বের প্রধান অতিথি পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কবি অধ্যাপক ড. চন্দন বাঙ্গাল বাংলাকবিতার বিভিন্ন আন্দোলনের ধারাবাহিকতার ইতিহাস তুলে ধরেন । পাশাপাশি হাসনাইন সাজ্জাদীর এই নতুন ভাবনা বাংলাকবিতায় নতুনতর আলোকসম্পাতের কথা স্পষ্ট করে দেন । বিজ্ঞান কবিতার ধারনার স্থায়িত্বের বিষয়টি তিনি সময়ের উপর ছেড়ে দেন । সবশেষে 'কবিতা ও কথামালা'য় দুইদেশের পঞ্চাশজনের অধিক কবি কবিতা পাঠ করেন ।
ঢাকা, ২২এপ্রিল, ২০২৪

বাংলা লোকগানের উদ্ভব ও ভাটিয়ালি গানের সৃষ্টি

বাংলা লোকগানের উদ্ভব ও ভাটিয়ালি গানের সৃষ্টি 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

চর্যাপদ শুধু বাংলাসাহিত্যের নিদর্শন নয়, প্রাচীন বাংলাগানেরও সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে  । চর্যাপদগুলি প্রকৃতপক্ষে গানই । সেকারণেই অনিবার্যভাবে প্রতিটি পদের শুরুতে রাগ, তাল ও প্রতি জোড়পদে 'ধ্রুব' শব্দের উল্লেখ রয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, এগুলো তখন গাওয়া হত । চর্চা গীতিগুলো পটমঞ্জরী, মাল্লারী, গুর্জরী, কামোদ, বরাড়ী, ভৈরবী, গবরা, দেশাখ, রামক্রী, শবরী, অরু, ইন্দ্রতাল, দেবক্রী, ধানশ্রী, মালসী, মালসী-গবড়া ও বঙ্গাল রাগে দেখতে পাওয়া যায় । চর্যার কবিরা ছিলেন পূর্বভারত ও নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী। কেউ পূর্ববঙ্গ, কেউ উত্তরবঙ্গ, কেউবা রাড়ের অধিবাসী ছিলেন । কেউ কেউ মিথিলা ( বিহার ), কেউ উড়িষ্যা, কেউ আবার অসম বা কামরূপের বাসিন্দাও ছিলেন । 

চর্যাপদের তিনজন বাঙালি কবি ছিলেন । তাঁরা হলেন লুইপা, শবরপা ও ভুসুকুপা । ভুসুকুপা নিজেও তাঁর পদে 'আজি ভুসুকু বঙ্গালি ভৈলি' বলে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন । ভুসুকু নিজেকে 'রাউতু ভুসুকু' অর্থাৎ 'রাজপুত ভুসুকু' বা 'অশ্বারোহী যুদ্ধ ব্যবসায়ী' বংশের সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন । ভুসুকুপা যোগী সাধক ছিলেন । তিনি জয়দেবের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন । তিনি নিজের কুটিরে সর্বক্ষণ গোপনে অধ্যয়ন করতেন । ভিক্ষুরা মনে করত যে, তিনি সর্বদা আহার ও নিদ্রায় সময় কাটান । এজন্য ভিক্ষুরা তাঁকে ভুসুকু ( ভু = ভক্ষণ, সু = সুপ্তি, কু = কুটির ) নামে ডাকতেন । চর্যাপদে ভুসুকুপার পদ আটটি ( ৬, ২১, ২৩, ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩, ৪৯ ) । শক্তিমান চর্যাকার ভুসুকুর গানে পদ্মাখালে নৌযাত্রার যে চিত্র ( ৪৯ নং ) দেখি তাতে তিনি  বঙ্গদেশের বলেই মনে হয় ।

 'আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভৈলী / নিঅ ঘরিণী চন্ডালী লেলী' ( ৪৯ নং ) বর্ণিত চন্ডাল/ চন্ডালী  নামটি বাঙালিদের আদি পরিচয় । একটি বল-বীর্য সমন্বিত অর্থদ্যোতক শব্দ । চন্ডের সঙ্গে জাতিসূচক 'আল' প্রত্যয় যোগ করে হয়ন চন্ডাল । অনুরূপভাবে লাঙ্গল, জোঙ্গাল ( জোয়াল ), জঙ্গল, জাঙ্গাল, বহাল, খেড়ওয়াল, সাঁওতাল, বঙ্গাল প্রভৃতি আদি অস্ট্রাল শব্দগুলির ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ করলেই শব্দগুলোর গুণগত ও অর্থগত অভিব্যক্তিটি যথার্থ প্রতিভাত হয়ে ওঠে । চন্ডাল, বঙ্গাল প্রভৃতি সেযুগের কঠোর পরিশ্রমী, সর্বকর্মে পারদর্শী । তারা নৌচালনা, মৎস্যশিকার, যুদ্ধবিদ্যা, কৃষিবাণিজ্য, বাস্তুবিদ্যা ও চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী ছিল ।  ভুসুকুর 'সহজ মহাতরু ফরিঅ এ  তৈলোএ / খসমসভাবে রে বা ণ মুকা কোএ ( ৪৩ নং ) পদটি 'বঙ্গাল' রাগে গীত । সেকালে 'বঙ্গাল', 'চন্ডাল' প্রভৃতি শ্রেণির মানুষেরা অভিজাতদের কাছে অন্ত্যজ বলে চিহ্নিত ছিলেন । এইসব ভূমিপুত্র অন্ত্যজ শ্রেণির শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গীতের রাগও তাদের নামেই হওয়া স্বাভাবিক ।

প্রাচীন বাংলার সাংগীতিক ঐতিহ্য চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন হয়ে সাম্প্রতিক সময়ের বহমান ধারার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত । 'ভাটি' বলতে নিম্নাঞ্চল, নিম্নপ্রবাহ, নিম্নমুখ ইত্যাদি বোঝায় । সাধারণত নদীর স্রোতের শেষপ্রান্তের ভাগকে বোঝায় । সেই 'ভাটি'র সঙ্গে বিশেষণ বাচক তদ্ধিত প্রত্যয় 'আল' বা 'আলি' প্রত্যয় যুক্ত হয়ে 'ভাটিয়াল' বা 'ভাটিয়ালি' শব্দ সৃষ্টি হয়েছে । 'উজান বাঁকে যায় রে ভাইটাল বাঁকে ঘর' । হলায়ুধ মিশ্র রচিত 'সেক সুভোদয়া' সংস্কৃত গ্রন্থে 'ভাটিয়ালি রাগেন গীয়তে' বলে একটি ছড়া সংগীতের উল্লেখ আছে । নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের গানই ভাটিয়ালি গান । ভাটির দিকে নৌকা ছেড়ে দিয়ে মাঝিরা অবসর সময়ে নৌকায় বসে যে গান গায় তাই ভাটিয়ালি গান এটা শ্রমজীবী মানুষেরই গান ।

ভাটিয়ালি গান কবে কিভাবে রচিত হয়েছিল তার ইতিহাস জানা না গেলেও বাংলাদেশের সংগীতের প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে আমরা চর্যাপদকেই মান্য করি । খ্রিস্টীয় নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশে চর্যার পদগুলি রচিত হয়েছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন । এই চর্যাপদের আলোচনায় গবেষকগণ চর্যাপদের কবি ভুসুকুপার রচিত ৪৩ সংখ্যক পদের বঙ্গাল রাগটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন । এই রাগটির সূত্র ধরেই গবেষকগণ ভুসুকুপাকে 'বঙ্গাল' বা বাংলাদেশের লোক বলে চিহ্নিত করেন । সেই সঙ্গে চর্যাপদে উল্লেখিত 'বঙ্গাল' রাগকে ভাটিয়ালি বলে মনে করেন ।

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ নদীর সাথে এদেশের মানুষের যুগসূত্র নিবিড় তাই ভাটিয়ালি গানও এদেশের মানুষের প্রাণের গভীর চেতনা থেকে উৎসারিত একটি বিশেষ ধারা । নদীর মাঝি বা নদী পাড়ের মানুষের জীবনে এই গানের অধিক প্রচলন দেখা যায় । নদীর ধারা যেভাবে ক্রমাগত প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায় তেমনি মানবজীবনও ক্রমাগত অতিক্রান্ত হয়ে একসময় মৃত্যুতে তার সমাপ্তি ঘটে । নদীর গতির সঙ্গে মানুষের জীবনের গতির এই অদ্ভুত মিলকে উপজীব্য করে লোকো কবিরা যে গান গেয়ে থাকেন তাই ভাটিয়ালি নদী যেমন উজান থেকে মাটির দিকে যায় মানুষের জীবনের শুরু সে রকম ক্রমান্বয়ে সমাপ্তির দিকে অগ্রসর হয় । চর্যাপদের বিভিন্ন গানের পদগুলিতে সেই সময়ের মানুষের জীবনধারাই প্রতিফলিত হয়ে উঠত । সেসময়েও মানুষ নদীকেন্দ্রিক জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল । তাই চর্যায় বঙ্গাল রাগে গীত ৪৩ সংখ্যক পদ ছাড়াও আরো কিছু কিছু পদের কথায় ভাটিয়ালি গানের আভাস পাওয়া যায় চর্যাপদের যে সকল গানে ভাটিয়ালির বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায় সেগুলো হল– ৫,৮,১০, ১৩,১৪,৩৮, ও ৪৯ সংখ্যক পদ । এই সমস্ত পদে নদী তীরবর্তী মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিরহ, বেদনা, নৈরাশ্য ও অন্তহীন জীবনজিজ্ঞাসার কথা বর্ণনা করা হয়েছে । চর্যাপদে ৫সংখ্যক পদে চাটিলপা বলছেন– 'ভব নঈ গহণ গম্ভীর বেগেঁ বাহী /  দূআন্তে চিখিল মাঝেঁ না থাহী । ( ভবনদী গহন এবং গম্ভীর বেগে তা প্রবাহিত হচ্ছে । দুই ধারে তার কাদা মাঝখানে থই পাওয়া যায় না ) ।৮সংখ্যক পদে কম্বলাম্বরপা বলছেন–'সোনে ভরিলী করুণা ণাবী ।/  রূপা থোই নাহিক ঠাবী । ( সোনায় পরিপূর্ণ আমার করুণা নৌকা রুপাদের রাখব তার জায়গা নেই ) । ১৪সংখ্যক পদে ডোম্বীপা লিখেছেন–'গঙ্গা জঊনা মাঝেঁ রে বহই নাঈ /  তহি বুড়িলী মাতঙ্গ যোইয়া লীলে পার করেই । ( গঙ্গা যমুনার মাঝখানে ওরে নৌকা বাওয়া হয়, তাতে নিমজ্জিত মাতঙ্গী যোগীকে অবহেলায় পার করে নেয় ) । ৩৮সংখ্যক পদে সরহপা বলেছেন–'কাঅ ণাবড়ী খান্ডি-মন কেড়ুআল / সদগুরু বঅনে ধর পতবাল ( কায়ারূপ নৌকা, মন রূপ বৈঠা, সদগুরুর বচনেতে হাল ধরে থাকো, পরপারে যেতে ) । ৪৯সংখ্যক পদে ভুসুকুপা উল্লেখ করেছেন–'বাজ ণাব পাড়ি, পঁউআ খালে বাহিউ / অদঅ বঙ্গালে দেশ লুড়িউ । ( বজ্র নৌকা পাড়ি দিয়ে পদ্মা খেলে বাওয়া হল । নির্দয় বঙ্গালে দেশ লুট করে নিয়ে গেল ) ।

মধ্যযুগীয় বাংলাকবিতায় গীতিসাহিত্যের অপূর্ব নিদর্শন বড়ু চন্ডিদাসের 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্যেও 'ভাটিয়ালি' নামের একটি রাগের উল্লেখ পাওয়া যায় । শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটি চর্যাপদের পর তথা ১৩০০ থেকে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়েছিল । শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ভাটিয়ালি রাগ অনেকগুলি গানের শিরোদেশে নির্দেশিত ছিল । এই গানগুলির প্রত্যেকটির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভাটিয়ালি গানের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে । পূর্ব বাংলার ভাটিয়ালি গানে যেমন বিরহ বিচ্ছেদ ও বেদনার আবহ থাকে তেমনি শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেও 'রাধাবিরহ' খন্ডে অধিকসংখ্যক ভাটিয়ালি রাগের উল্লেখ রয়েছে । শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের প্রায় ১৮টি গান ভাটিয়ালি রাগের অন্তর্গত ।

 চর্যাপদের গানগুলোতে যেমন জীবনযাত্রার চিত্রের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক সাধনার বার্তা রয়ে গেছে তেমনি ভাটিয়াল গানেও দেখি নদী জীবনের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক জীবনে অপূর্ণতার কথাই পক্ষান্তরে উল্লিখিত হয়ে থাকে । যেমন–'মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না / সারা জনম উজান বাইলাম ভাটির নাগাল পাইলাম না ।' অর্থাৎ, সারাজীবন ধরে সংসারধর্মই করা হয়েছে । অন্তিমে যাঁর শরণ নেওয়ার কথা তাঁকে ভাবার সুযোগ হল না ।  কালের বিবর্তনের নিয়মে বহু পরিবর্তন এলেও বাংলা ভাটিয়ালি সংগীতের মূল সূত্রটি যে চর্যাপদেই নিহিত তা অনায়াসেই বোঝা যায় । এছাড়া চর্যায় উল্লিখিত অনেক রাগ পরবর্তীসময়েও বাংলাগানে স্থান করে নিয়েছে।

Monday, May 4, 2026

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক ও দুই নম্বর সেক্টরের সম্মিলিত লড়াই

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক ও দুই  নম্বর সেক্টরের সম্মিলিত লড়াই

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

-সেক্টর কমান্ডার: ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা বাচ্চু

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: পরশুরাম, দেবপুর, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, অনন্তপুর, সোনাপুর, কোলাপাড়া, মনতলা, মোহাম্মদপুর, আমজাদহাট, মুন্সীরহাট, পূর্বদেবপুর, পূর্বমধুগ্রাম, দক্ষিণ যশপুর, মহামায়া, মোকামিয়াম, রাধানগর, শুভপুর, গুতুমা, গোপাল, কাশীপুর ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: গুতুমা রেইড (১৬ জুলাই), বাগার বাজার রাজাকার ক্যাম্প ও দেবপুর অ্যামবুশ (৩১ জুলাই), করেরহাট-ফেনী-ছাগলনাইয়া অপারেশন (৪-৬ আগস্ট), চাঁদগাজী বাজার এলাকা অ্যামবুশ (১৮ আগস্ট), চম্পকনগর বিওপি আক্রমণ (২০ সেপ্টেম্বর), চম্পকনগর বিওপি আক্রমণ (২২ সেপ্টেম্বর), ফেনী-বিলোনিয়া সড়কে রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস (২৫ সেপ্টেম্বর), মুহুরী নদীসকাশে রণাঙ্গন (৩ অক্টোবর), মদুনাঘাট বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ধ্বংস (৬ অক্টোবর), ছাগলনাইয়া-বিলোনিয়া সড়কে ব্রিজ ধ্বংস (৭ অক্টোবর), সলিয়াদীঘি যুদ্ধ (৭ নভেম্বর), দক্ষিণ বিলোনিয়া মুক্তকরণ (২১ নভেম্বর), করিমাটিলায় সংঘর্ষ (৩ ডিসেম্বর)।

শ্রীনগর সাব-সেক্টর: 

আয়তনে ছোট হলেও এই সাব-সেক্টরটি বেশ গুরুত্ববহ ছিল। কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রেলসড়ক এই সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়েই প্রবেশ করেছে। এর কেবল উত্তরাংশ ভারতের সাথে যুক্ত। এখানে প্রাথমিক প্রতিরোধ যুদ্ধ ও সর্বপ্রথম ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। ফেনী নদী এই সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে।

আয়তন: ৫টি সাব-সেক্টরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ছোট ছিল; প্রায় ২০০ বর্গ কিলোমিটার।

সাব-সেক্টর কমান্ডার: প্রথমে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, পরে কিছুদিন ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং শেষে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: করেরহাট, জোরারগঞ্জ, হিঙ্গুলী, ধুম, কাটাছড়া, ওসমানপুর ও দুর্গাপুর।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: এখানে সংঘর্ষ তেমন একটা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রটি ছিল করেরহাট (নভেম্বর)।

তবলছড়ি সাব-সেক্টর

অবস্থানগত দিক বিশ্লেষণপূর্বক দেখা যায় যে, এই অঞ্চলে একইসাথে পাহাড় ও সমতল ভূমি রয়েছে। ’৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর ১নং সেক্টরে প্রবেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নাজুক করতে এই সাব-সেক্টরের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। উত্তাল মার্চের শেষলগ্নে কুমিরায় এক দুর্ধর্ষ প্রতিরোধযুদ্ধ হয় যা কিনা এই সাব-সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। তবে চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই ও সীতাকুণ্ড থানার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত এই এলাকাটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেকটা বিপদজনক ছিল, কারণ ভারত সীমান্তে খুব তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না এখানে। এই অঞ্চলের একদিক ছিল সন্দ্বীপ প্রণালীর সাথে যুক্ত।

আয়তন: ৭০০ বর্গ কিলোমিটার

সাব-সেক্টর কমান্ডার: সুবেদার আলী হোসেন।

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা, মীরসরাই, পানছড়ি ও লক্ষ্মীছড়ি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা ও মীরসরাই।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: কুমিরার প্রতিরোধ যুদ্ধ (২৬-২৮ মার্চ), বড়তাকিয়া ও মীরসরাই অপারেশন (২৩ জুলাই), পাতাকোট অ্যামবুশ (১০ আগস্ট), সুফিয়া রোডের যুদ্ধ (১০ আগস্ট), মীরসরাই রেললাইন অপারেশন (২৮ আগস্ট), ওসমানপুর-লোহারপুলের যুদ্ধ (১৭ অক্টোবর), চামলাশিয়া অ্যামবুশ (১২ নভেম্বর), মীরসরাই রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ (২৪ নভেম্বর), কাটিরহাটে যুদ্ধ (৪ ডিসেম্বর)।

ডিমাগিরি সাব-সেক্টর

৫টি সাব-সেক্টরের ভিতর যে তিনটি চট্টগ্রামের মধ্যে ছিল তার অন্যতম ছিল উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই ডিমাগিরি সাব-সেক্টর। এখানের বাগানবাজার ও অন্যান্য দু’একটি স্থানে বিওপির ঘাঁটি ছিল। ফলে এর বাগানবাজার অংশটি (উত্তরাংশ) কেবল ভারত সংলগ্ন ছিল।

আয়তন: ১,০০০ বর্গ কিলোমিটার।

সাব-সেক্টর কমান্ডার: জনৈক সুবেদার।

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: ফটিকছড়ি, নাজিরহাট, রাউজান, বাগানবাজার ও হাটহাজারী।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: সুলতানপুর, রাউজান, ফটিকছড়ি, সোয়াবিল, বাগানবাজার ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: মদনঘাটের বিদ্যুৎ স্টেশন ধ্বংস (১১ সেপ্টেম্বর), বাগানবাজার রেইড (১১ অক্টোবর), আন্ধারমানিক রেইড (৫ নভেম্বর), ফটিকছড়ি পুলিশ স্টেশন রেইড (১৭ নভেম্বর), নাজিরহাট যুদ্ধ (৯ ডিসেম্বর) ইত্যাদি।

মনুঘাট সাব-সেক্টর :

বাংলাদেশের সর্ব পূর্বে অবস্থিত এই সাব-সেক্টরের সমগ্র পশ্চিমাংশ ভারত লাগোয়া ছিল । ফলে মুক্তিযোদ্ধারা সুযোগ বুঝে ভারতীয় ভূখণ্ডে চলে যেতে পারত । এ অঞ্চলটি পাহাড়-পর্বতের আধিক্যহেতু গেরিলা যুদ্ধের উপযোগী ছিল । এছাড়া চেঙ্গী নদীর অবস্থানের কারণে মুক্তিযোদ্ধারা বেশ সুবিধা পেত । 
আয়তন :-পাঁচটি সাব-সেক্টরের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়ো । প্রায় ১২০০বর্গ কিলোমিটার । 
সাব-সেক্টর কমান্ডার :- যথাক্রমে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান, ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট ফজলুর রহমান 
দায়িত্বপূর্ণ এলাকা :-  রামগড়, হেঁয়াকো, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি, মানিকছড়ি ও মাটিরাঙ্গা । 
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ :- রামগড়, হেঁয়াকো, মহালছড়ি, মানিকছড়ি, ভাইবোনছড়া, পানছড়ি ইত্যাদি।
 উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ :- হেঁয়াকোর যুদ্ধ ( ২৭ জুলাই ), রামগড় আক্রমণ ( ১৩- 15 আগস্ট ), বিলাইছড়ি ও পানছড়ি এম্বুস যথাক্রমে ( ১–২নভেম্বর ), ভাইবোনছড়া ও পানছড়ি মুক্তকরণ ( ১০ ডিসেম্বর )
 এক নম্বর সেক্টরে মাত্র ৫ টি সাব সেক্টর গঠন করা হলেও এ অঞ্চলের কিছু এলাকা সাবসেক্টর বহির্ভূত ছিল । এসব এলাকাতেও কিন্তু যুদ্ধ হয়েছে। এ সকল এলাকায় যুদ্ধ করেছেন মূলত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাগণ এবং পরবর্তীতে কিছু বিএলএফ-এর সদস্যরা। যেসব এলাকা এমন ছিল সেগুলো হল- কক্সবাজার ও রাঙামাটি জেলার প্রায় সমস্ত এলাকা, চট্টগ্রাম জেলার ১৪টির মধ্যে প্রায় ৯টি থানা।" ( বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক–মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত, বাংলাদেশ )


মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের পাশেই ছিল দুই নম্বর সেক্টর  । "এই ২ নম্বর সেক্টর বৃহত্তর ঢাকা ( প্রধানত ঢাকা শহরসহ ঢাকা জেলার দক্ষিণাংশ )-কুমিল্লা ( আখাউড়া-আশুগঞ্জ রেললাইনের উত্তরাংশ বাদে ) ফরিদপুরের পূর্বাংশ ও নোয়াখালীর অংশবিশেষ ( মুহুরী নদীর পূর্বাংশ ) নিয়ে গঠিত হয় । ২ নম্বর সেক্টরের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী এলাকা, দক্ষিণ-পূর্বে ১ নম্বর সেক্টর, পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্য, উত্তরে ৩ নম্বর সেক্টর, উত্তর-পশ্চিমে যমুনা নদী ও ৭ নম্বর সেক্টর, পশ্চিমে ৮ নম্বর সেক্টর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ৯নম্বর সেক্টরের সীমানা । দুই নম্বর সেক্টরের আয়তন প্রায় ১৮,৫২৬ বর্গ কিলোমিটার । কোথাও কোথাও এই সেক্টরের আয়তনকে ১৭৬৫৮ বর্গ কিলোমিটার বলে অনুমান করা হয়েছে । ২ নম্বর সেক্টর ৪-ইস্ট বেঙ্গল, কুমিল্লা-নোয়াখালী ইপিয়ার বাহিনী নিয়ে গঠিত হয় এই সেক্টরটি । সদর দপ্তর ছিল মেলাঘরে । মেজর খালেদ মোশাররফ ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমান্ডার পদে নিযুক্ত ছিলেন । পরে মেজর এটিএম হায়দার সে বছর ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন ।

দুই নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর ও কমান্ডার 

১. গঙ্গাসাগর, আখাউড়া ও কসবা– কমান্ডারদের নাম :-  লেফটেন্যান্ট মাহবুব, লেফটেন্যান্ট ফারুক ও লেফটেন্যান্ট হুমায়ুন কবির  উল্লেখ্য ।

 ২.মন্দাভাগ– 
কমান্ডার:- ক্যাপ্টেন গফফার 

৩. শালদা নদী-
কমান্ডার:- মেজর আব্দুস সালেক চৌধুরী 

৪.মতিনগর–
কমান্ডার:-  লেফটেন্যান্ট দিদারুল আলম 
৫. নির্ভয়পুর–
কমান্ডার:-  ক্যাপ্টেন আকবর হোসেন, লেফটেন্যান্ট মাহবুব 
৬. রাজনগর–
কমান্ডার:- ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম, ক্যাপ্টেন শহীদ লেফটেন্যান্ট ইমামুজ্জামান ।

এই সেক্টরের উল্লেখযোগ্য হাসপাতালটির নাম ছিল বাংলাদেশ হাসপাতাল । এটি প্রথমে ছিল সোনামুড়ায় । পরবর্তী সময়ে বিশ্রামগঞ্জস্থিত হাবুল ব্যানার্জীর বাগানে সরিয়ে নেওয়া হয় । দুশো শয্যার এই হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার ছিলেন ক্যাপটেন আকতার আহমেদ,ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. মবিন প্রমুখ । সেইসময়ে চিকিৎসাবিদ্যায় পাঠরত বহু ছাত্রছাত্রী আহত ও অসুস্থ মুক্তযোদ্ধাদের অক্লান্ত সেবা দিয়ে গিয়েছিলেন ।

এক নম্বর ও দুই নম্বর সেক্টরের যৌথ লড়াই :-

ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক  ৬ নম্বর সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়ে চলে গেছে । অন্যদিকে ঢাকার সাথে চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগের একমাত্র পথটিও এই অঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করেছে । ত্রিপুরা রাজ‍্যের দক্ষিণ জেলার উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত এই এলাকা ।এই এলাকায় ৪-ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্রাভো তথা 'বি' কোম্পানি, ইপিআর এর 'এক্স' কোম্পানি গণবাহানীর সদস‍্যরা যুদ্ধ করেছিলেন । এই সাবসেক্টরের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ।
সাব-সেক্টর কমান্ডার :-ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম । তাঁকে সহায়তার জন্য ছিলেন ক‍্যাপ্টেন শহিদ ও লেফটেন্যান্ট ইমাম-উজ-জামান ।
 দায়িত্বপূর্ণ এলাকা :- বিলোনিয়ার পশ্চিমাঞ্চল লাকসামের দক্ষিণাঞ্চল, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট, ফেনীর আংশিক অঞ্চল ও নোয়াখালীর কিছু অংশ।
উল্লেখযোগ্য আক্রমণ, অ্যাম্বুশ ও যুদ্ধসমূহ :- নবাবপুরের যুদ্ধ ( ২৮ জুলাই ) গোপালপুর যুদ্ধ (১০আগস্ট ) সোনাপুর যুদ্ধ (৮ সেপ্টেম্বর ) কল‍্যাণদীর অপারেশন  (১৮ সেপ্টেম্বর )রাজগঞ্জের যুদ্ধ ( ২১সেপ্টেম্বর ) বিলোনিয়ার যুদ্ধ ও বিজয় ( অক্টোবর-নভেম্বর ) ওদারহাটের যুদ্ধ (৩০ অক্টোবর )শালধর ও লেমুয়ার যুদ্ধ  ( ১০ নভেম্বর )বেতিয়ারা গ্রামের যুদ্ধ ( ১১ নভেম্বর ) নোয়াপুর এর যুদ্ধ ( ডিসেম্বর ) ইত্যাদি ।"( তথ‍্য : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই– মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত, বাংলাদেশ )।

স্বাধীনতা যুদ্ধে ফেনীর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফেনী বিলোনিয়া সীমান্তের যুদ্ধ ছিল  মুক্তিবাহিনী ও পাক হানাদার বাহিনীর জন‍্যে সামরিক দিক থেকে অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উভয়ের জন‍্যে ছিল মর্যাদার লড়াই । কারণ ফেনীর উপর দিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের যোগাযোগ রক্ষা হত । বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের উপর কর্তৃত্ব রাখতে হলেও ফেনী ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । আর দক্ষিণ দিক ছাড়া পরশুরাম ও বিলোনিয়ার তিনদিকেই ভারতীয় সীমান্ত হওয়ায় স্থানটিতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের কৌশল নেয় পাকিস্তানি বাহিনী ।‌ তাদের প্রতিহত করার জন্যই এক নম্বর ও দুই নম্বর সেক্টর থেকেও সম্মিলিতভাবে এই অঞ্চল দখলের লড়াই চালানো হয় । এক নম্বর সেক্টরের ঋষ‍্যমুখ সাব-সেক্টর, শ্রীনগর সাব-সেক্টর এবং দুই নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টর পাশাপাশি  ছিল । ফলে এই তিনটি সাব-সেক্টরের  আওতাধীন পুরো নোয়াখালী এলাকা ছিল অর্থাৎ ফেনীর উত্তরাংশ ছিল রাজনগর সেক্টরের আওতাধীন এবং দক্ষিণাংশ ছিল ঋষ‍্যমুখ ও শ্রীনগর সেক্টরের আওতাধীন । ফলে ফেনী এলাকায় সেসময় তিন দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ  সংঘটিত হয়েছিল । এখানে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আক্রমণ এম্বুস ও যুদ্ধ সংঘটিত হয় ।
মুক্তিযুদ্ধে ফেনী সীমান্তে যে কয়টি লড়াই হয় তার মধ্যে শুভপুর ও বিলোনিয়া যুদ্ধ অন‍্যতম । এই যুদ্ধে এক নম্বর সেক্টরের ঋষ‍্যমুখ ও শ্রীনগর এই দুটি সাব-সেক্টর এবং দুই নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব্-সেক্টরের মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনী যৌথভাবে আক্রমণ শানিয়ে ফেনী জেলাকে মুক্ত করেন ।

শুভপুর যুদ্ধ :

ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার অন্তর্গত শুভপুর মধুগ্রাম অংশটি শুভ পূর্ব রাধানগর ইউনিয়ন এর অন্তর্গত শুভপুর-মধুগ্রাম মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর তীরে অবস্থিত এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে গুরুত্বপূর্ণ শুভপুর রেলওয়ে ও সড়ক ব্রিজটি এখানে অবস্থিত। শুভপুর ব্রিজকে নিজেদের  দখলে রাখার তাগিদে  মুক্তিবাহিনী এবং পাক হানাদার বাহিনীর মধ‍্যে দফায় দফায় যুদ্ধ হয়েছিল । মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাই এই স্থানের গুরুত্ব । চট্টগ্রামে অবস্থিত একমাত্র সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তান বাহিনীর অস্ত্র-সরঞ্জামাদি ঢাকা চট্টগ্রাম রোড ধরে এবং পরবর্তী সময়ে সারাদেশে সরবরাহ করা হত । তাই এর রণকৌশলগত গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত বেশি । তৎকালীন সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রামে যাতায়াতের এবং যোগাযোগের পথ ছিল ছাগলনাইয়ার শুভপুর হয়ে । মুক্তিযোদ্ধারা স্থির করলেন শুভপুর ব্রিজ ভেঙে দেওয়া গেলে পাকিস্তানি বাহিনী ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এ ব্রিজ অতিক্রম করে ঢাকা-চট্টগ্রামে প্রবেশ ও যোগাযোগ করতে পারবে না । সেজন্য মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজটি ধ্বংসের চেষ্টা চালায় । তেমনি ব্রিজটিও দখলে রাখার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয় হানাদার বাহিনী । শুভপুর ব্রিজ এর যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বলে স্বীকৃত । চট্টগ্রামের যত মুক্তিযোদ্ধা ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণও আশ্রয় নেন তারা এই শুভপুর ব্রিজ অতিক্রম করে গিয়েছিলেন । ভারতীয় বি এস এফের সহযোগিতায় ব্রিজের ১০ নম্বর পিলারের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলে এ অংশ হানাদার মুক্ত হয় । এপ্রিল ও মে মাসে বাংলাদেশ বাহিনী শুভপুর ব্রিজ শক্ত ঘাঁটি গেড়ে ছিল পাকিস্তান বাহিনী রামগড় দখল নেওয়ার পর শুভপুর ব্রিজ এর দক্ষিণ তীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতছাড়া হয়ে যায় । ৩ মে ১৯৭১ হরিনায় এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয় । তারপরেই এখানে স্যাটেলাইট ট্রেনিং সেন্টারও খোলা হয় । চট্টগ্রামের হাজার হাজার মানুষ যুদ্ধ করার জন্য শ্রীনগর, আমলিঘাট, সাব্রুম সীমান্তসহ অন‍্যান‍্য সীমান্ত দিয়ে হরিনা আসেন । এসব ভলান্টিয়ারদের দুসপ্তাহের ট্রেনিং দেওয়া হয় ত্রিপুরার হরিনা ইয়ুথ ক‍্যাম্পে, বগাফা ও অম্পিনগর সেনানিবাসে, আসামের হাফলং, তেজপুরে ও লায়লাপুরে, মেঘালয়ের তুরাসহ আরো কয়েকটি স্থানে । মুক্তিযোদ্ধারা শর্ট কোর্সে অটোমেটিক রাইফেল এল এম জি, এস এম জি, গ্রেনেড ও ২ ইঞ্চ মর্টার চালনা ও বিস্ফোরক ট্রেনিং নিয়ে জুন মাসে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন । জুন মাস থেকে মেজর রফিক গেরিলাদের দায়িত্ব নেন ও ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হন । তাঁকে সাহায্য করেন ক্যাপ্টেন এনাম, ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক‍্যাপ্টেন এম সুবিদ আলী ভুঁইয়া  (যিনি পরবর্তীকালে 'মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন )। সেসময় মেজর জিয়ার দায়িত্বে ছিল সম্মুখযুদ্ধের কোম্পানি জেড ফোর্স । জেড ফোর্সে ছিলেন শওকত আলী,ক‍্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন ওলি,ক‍্যাপ্টেন হামিদ ,ক্যাপটেন শামসুর রহমান, ল‍্যাফটেনান্ট খালিদ, ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট মিলে ৩০০ এর কাছাকাছি সৈনিক একটি স্টুডেন্ট প্ল‍্যাটুন ( ছাত্রলীগের বিএলএফ বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট ) জেড ফোর্স এর নিজস্ব হাইড-আউট ( হেডকোয়ার্টার ) ছিল  ত্রিপুরার এক রাজার পরিত্যক্ত বাড়ি 'পোয়াংবাড়ি'তে ।
১৯৭১সালের ২০ এপ্রিল ক্যাপ্টেন অলি আহমদের নেতৃত্বে শুভপুর ব্রিজ এর পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকবাহিনীর প্রচন্ড লড়াই হয় যুদ্ধে পাক বাহিনীর প্রায় ১০০ জন সৈন্য নিহত হয় ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান অবস্থান ছিল কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট । তারা বিভিন্ন ছোট ছোট উপদলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হত । তাদের পরিকল্পনা ছিল শুভপুর ব্রিজ পার হয়ে সামনে কোথাও তারা অবস্থান নেবে । মুক্তিবাহিনী ও স্থির করে রেখেছিল পাকিস্তানি বাহিনী যখন ব্রিজ অতিক্রম করবে তখনই তাদের বাধা দেওয়া হবে । তারা ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে কয়েকটি স্থানে অবস্থান নেয় । চারটে খন্ড খন্ড দলের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন এনাম, সুবেদার জালাল ও সুবেদার আবুল হোসেন । ১৮ জুলাই পাকিস্তানি বাহিনী ২টি কোম্পানি ও বেশকিছু যানবাহনসহ শুভপুর ব্রিজ পার হয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকে । সকাল ১০ টার দিকে তারা শুভপুর ব্রিজ অতিক্রম করে যখনই  ব্রিজের কাছে পৌঁছায় মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে তাদের আক্রমণ করে । হঠাৎ আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ১০ থেকে ১২ জন সদস্য নিহত হয় । ভয়ে তারা পালিয়ে যায় । পরদিন তারা পুনরায় অধিক শক্তি নিয়ে ফিরে আসে । মুক্তিবাহিনী পুরো রাস্তা জুড়ে মাইন পেতে রেখেছিল । মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের সামনে পড়ে তারা ব্যাপক ধ্বংসের সম্মুখীন হয় । তবুও তারা এগোতে থাকে । এক সময় পাকিস্তানী বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর দূরত্ব দাঁড়ায় মাত্র ৫০০ গজ । এই অবস্থায় ২০ দিন পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই চলে । যুদ্ধে পাকবাহিনীর ৬০ জন সদস্য নিহত হয় । তাদের ১০ টি যানবাহন ধ্বংস হয় । যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনী অধিকৃত গাড়ি থেকে প্রচুর খাদ্য সামগ্রী অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য মালামাল দখল করে । মুক্তি বাহিনীর পক্ষে ৫-৬ জন শহিদ হন । যুদ্ধের ফলে পাকিস্তানি বাহিনী ওই অঞ্চলে তাদের অবস্থান সুসংহত করতে পারেনি । ১৬ ডিসেম্বরও মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী শুভপুর ব্রিজের উপর দিয়ে লড়াই করে এগিয়ে চট্টগ্রাম দখলে নেন ।

বিলোনিয়ার প্রথম  যুদ্ধ :

১৯৭১ এর ১ জুন ১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের তিনটি কোম্পানির সমন্বয়ে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে  ত্রিপুরার মতাই এলাকা দিয়ে বাংলাদেশের বিলোনিয়াতে প্রবেশ করে  সীমান্ত থেকে মুহুরী নদী পর্যন্ত দক্ষিণ মুখী হয়ে অবস্থান গ্রহণ করে । এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ ( মুহুরী নদী সংলগ্ন এলাকায় ), ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান ( মাঝখানে ) এবং ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান ( ভারত সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ) । একই সময়ে ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারাও চারটি কোম্পানিতে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তে নোয়াপুর-জাম্বুরা হয়ে বিলোনিয়ায় প্রবেশ করে । এখানে মুহুরী নদীর তীর থেকে সীমান্ত পর্যন্ত বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমে মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান, ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম, ক্যাপ্টেন গফফার হালদার এবং লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম চৌধুরী । দুই নম্বর সেক্টরের সার্বিক নেতৃত্বে ছিলেন মেজর এম আমিনুল হক । ১৯৭১ সালের ৩ জূনের মধ্যে ১ও ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা বিলোনিয়া অবস্থানের সমস্ত প্রস্তুতি শেষ করেন । পাকিস্তানি বাহিনী বন্দুয়া-দৌলতপুর ও ছাগলনাইয়া থেকে অগ্রসর হলে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পড়ে । এতে ৬০-৭০ জন পাকসেনা নিহত হয় । ফলে তারা পিছু হটে যায় । ১৯৭১ সালের ৭ জুন ভোরে আবারো পাকবাহিনী অগ্রসর হতে থাকে । কিছুদুর এগোবার পর তারা আবার মুক্তি বাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়ে । এই আক্রমণে পাকিস্তানি সৈন্যদের ৫০-৬০ জন নিহত হয় । ৯ জুন পাকিস্তানী বাহিনী তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে এগোনোর চেষ্টা করে । মুক্তি বাহিনী তাদের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় । পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালালে মুক্তিবাহিনী পাল্টা জবাব দেয় । এভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২১ জুন পর্যন্ত দফায় দফায় মুক্তিবাহিনীর উপর ১১ বার ব‍্যর্থ আক্রমন চালায় । কিন্তু তারা মুক্তিবাহিনীর হাতে পর্যুদস্ত  হয় বারবার । এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ১৫ বেলুচ রেজিমেন্ট, ২৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স এবং ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সের বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে এককভাবে লড়াই করে মুক্তিবাহিনী ।
পরবর্তীতে ২১ জুন সন্ধ্যায় পাকবাহিনী তিনটি এসআই-৮ হ‍্যালিকপ্টার দিয়ে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানের প্রায় পাঁচশো গজ পেছনে দুই দফায় সৈন‍্য অবতরণ করায় । ফলে মুক্তিবাহিনী কিছুটা বেকায়দায় পড়ে যায় । মেজর খালেদ মোশাররফ রণাঙ্গনে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেন বাহিনীকে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে অবস্থান নেওয়ার । ফলে ২৪ জুন রাতে মুক্তিযোদ্ধারা ভারতে আশ্রয় নেয় । এভাবে বিলোনিয়া প্রথম যুদ্ধের অবসান ঘটে ।

বিলোনিয়া দ্বিতীয় যুদ্ধ :

বিলোনিয়ার দ্বিতীয় যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি মাইলফলক । বিশ্বের সামরিক কলেজের 'ব্যাটেল অফ বিলোনিয়া বালজ' অর্থাৎ 'বিলোনিয়ার যুদ্ধ' পড়ানো হয় ।
এই যুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টর থেকে মেজর মাহফুজুর রহমান ও ২ নম্বর সেক্টর থেকে ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম দায়িত্ব নিয়ে মুহুরী নদী বরাবর পূর্ব পশ্চিম দিকে ২ টি সেক্টরে ভাগ করে বাহিনী নিয়ে অবস্থান নেন। ৫ নভেম্বর ৫.৩০ মিনিটে এ তারা বিলোনিয়াতে প্রবেশ করেন । ২ রাজপুতের একটি প্ল‍্যাটুন ও আর্টিলারি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ছিল ৫, ৬ ও ৭ তারিখ উভয়পক্ষে তুমুল লড়াই হয় । ৮ তারিখ পরশুরাম ও বিলোনিয়া   মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে ‌। ৯ নভেম্বর বিকাল ৩.৩০ মিনিটে তিনটি পাক বিমান মুক্তিবাহিনীর উপর বোমাবর্ষণ করে । একজন মুক্তিযোদ্ধা ঘটনাস্থলেই মারা যান । ১০ নভেম্বর শত্রুপক্ষ চিতলিয়া ও কাপ্তান বাজার থেকে আক্রমণ চালায় । এ দিন বিকাল ৩.৩০ এ পাক বাহিনীর চারটি বিমান দিয়ে আবারও আক্রমণ চালানো হয়  মুক্তিবাহিনীর উপর । মুক্তিযোদ্ধারা সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ প্রতিহত করে । ১২ নভেম্বর  পাকিস্তানী সেনারা।ওই এলাকা ত্যাগ করে । ২ রাজপুতের লেফটেনান্ট কর্নেল দত্ত ও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিক মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন । এই যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ৬ জাঠ, ৩২ মাহার, ৮ বিহার, ৩ ডোগরা  রেজিমেন্ট, ১১ পঞ্জাব রেজিমেন্ট এর জওয়ানগণ, ব্রিগেডিয়ার আনন্দস্বরূপ, ব্রিগেডিয়ার সান্ধু, লে. কর্নেল বিশলা, ক‍্যাপ্টেন বাজওয়া, ল‍্যাফ. কর্নেল ওমপ্রকাশ শর্মা, ল‍্যাফ. কর্নেল হিম্মৎ সিং, ল‍্যাফ. কর্নেল ভিড়ক, ল‍্যাফ. জেনারেল সাগাত সিং, ল‍্যাফ. কর্নেল হরগোবিন্দ সিং, মেজর জেনারেল হীরা, ক‍্যাপ্টেন পি কে ঘোষ ও মেজর গুরুং প্রত‍্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন ।
এরপর মুক্তিবাহিনী দ্রুত ফেনীর দিকে অগ্রসর হতে থাকে । পথে পথে পাক বাহিনীর ছোটো ছোটো দলের সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকে । ক্রমশ তাদের মনোবল ভেঙে পড়তে থাকে ।
একসময় ফেনীও হানাদারমুক্ত হয়ে পড়ে । মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টরের কমান্ডার যুদ্ধের প্রত‍্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন–
'ফেনী পাক হানাদারমুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর। ’৭১-এর এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ সমরে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ফেনীর মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ে । ফেনী অঞ্চলের মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত আমি তৎকালীন ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম (পরবর্তীতে লে. কর্নেল) ভারতের বিলোনিয়া ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল থেকে ১০ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অভিযান চালিয়ে বিলোনিয়া, পরশুরাম, মুন্সীরহাট, ফুলগাজী হয়ে যুদ্ধ করতে করতে এগোতে থাকলে পর্যুদস্ত হয়ে ফেনীর পাক হানাদার বাহিনীর একটি অংশ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী হয়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের রাস্তায় এবং অন্য অংশ শুভপুর ব্রিজের ওপর দিয়ে চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধে ফেনীর অনেক রণাঙ্গনের মধ্যে মুন্সীরহাটের মুক্তারবাড়ি ও বন্ধুয়ার প্রতিরোধের যুদ্ধ ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছে। প্রথম বিলোনিয়া যুদ্ধে মুন্সীরহাটে পাক বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে প্রথম শহীদ হন হাবিলদার নূরুল ইসলাম। এ যুদ্ধে পাকিস্তানের প্রায় ৩০০ সেনা হতাহত হয়েছিল। হাবিলদার নূরুল ইসলাম বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। বিধ্বস্ত নূরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা দেখে যেতে পারলাম না। স্যার, আপনারা চালিয়ে যান। আমাদের রক্ত যেন বৃথা না যায়। ’ কালিমা পড়ে জয় বাংলা বলে আমাদের থেকে বিদায় নেন নূরুল ইসলাম । { দেখেছি আনন্দাশ্রু, স্বজন হারানোর বেদনা–কর্নেল জাফর ইমাম ( অব. )বীরবিক্রম– Feni Online, Dec. 6.2018 } 

ফেনী ও নোয়াখালির এমন  বহু যুদ্ধেই ১ নম্বর সেক্টরের সৈন‍্যগণ, সীমান্তসংলগ্ন বি এস এফ পোস্টে কর্মরত সৈনিকগণ, বগাফা বি এস এফ ক‍্যাম্পের সৈনিকগণ  প্রত‍্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন । সেসময়ের বিলোনিয়ার ও সাব্রুমের ছাত্র যুব নেতারাও বিভিন্ন ভাবে ছাত্রলীগের বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টকে সাহায্য করেছিলেন ।

দুংখের বিষয় মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ও মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণকেন্দ্র আজ বিস্মৃতির অতলতলে হারিয়ে গেছে । এখানকার কবরে শায়িত মুক্তিযোদ্ধারা সামান‍্য একটু স্বীকৃতির জন‍্যে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন ।