Saturday, February 21, 2026

বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি : সাব্রুমের মৈত্রীসেতু চালু হওয়া নিয়ে আশার আলো দেখছেন দুপারের জনগণ

বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি : সাব্রুমের মৈত্রীসেতু চালু হওয়া নিয়ে আশার আলো দেখছেন দুপারের জনগণ 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন


 বিএনপি দল বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার পর সাব্রুমে আবার উঠে আসছে মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রসঙ্গ । ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়াউর রহমান পর্যায়ক্রমে ১ নম্বর ও ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন । ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস থেকে জুন পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা নিয়ে গঠিত ১ নম্বর সেক্টরের এবং জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ময়মনসিংহ টাঙ্গাইল (কিশোরগঞ্জ বাদে) এলাকা নিয়ে গঠিত ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন । এছাড়া তিনি জেড ফোর্সেরও সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির উপর বর্বর আক্রমণ চালায় তখন জিয়াউর রহমান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাঁর বাহিনী নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন । ২৬ শে মার্চ রাতে প্রায় আড়াইশো বাঙালির সেনা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মেজর জিয়া । ২৭ শে মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে সকাল ১১ টায় মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি পাঠ করেন । জীবন মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে এই অকুতোভয় সেনানায়ক সেদিন স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে নামেন । আর সেসময় তার স্ত্রী ও সন্তানগণ ছিল ঢাকা সেনানিবাসে বন্দী । তা সত্ত্বেও তিনি জেড ফোর্স গঠন করে মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধকে বেগবান করেন । স্বাধীনতা লাভের পর তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের ও নেতৃত্বের জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করেন । ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষে এবং এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তান বাহিনী চট্টগ্রাম দখল করলে মেজর জিয়াউর রহমান অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের নিয়ে সীমান্ত এলাকার রামগড়ে ঘাঁটি গাড়েন । সেখান থেকে রামগড় স্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং পরিচালনা করেন । এপ্রিলের শুরুর দিকে তিনি তাঁর বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ফেনী নদী পেরিয়ে সাব্রুমের হরিণাতে চলে আসেন এবং সেখান থেকে ভারতের সীমান্ত ব্যবহার করে যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকেন । এ সময় ভারতের বিএসএফের লে. কর্নেল ঘোষ, মেজর প্রধান, ক্যাপ্টেন ঘোষ এবং সাব্রুম পুলিশ স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বীরেন মুখার্জি মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করেন । ২৫ শে জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, মিরসরাই, রামগড়, ফেনী ও নোয়াখালিতে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে একাধিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ।

স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে একসময় মেজর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৮১ সালের ৩০ শে মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক  উত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একনম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পালনের সুবাদে জিয়াউর রহমান সাব্রুমের প্রত্যন্ত অঞ্চল শিলাছড়ি, ঘোড়াকাঁপা, বৈষ্ণবপুর, মনুঘাট, আমলিঘাট শ্রীনগর থেকে শুরু করে বিলোনিয়ার নলুয়া, ঋষ্যমুখ, মতাই ইত্যাদি অঞ্চল চষে বেরিয়েছিলেন সেদিন । এই সীমান্ত অঞ্চলগুলি দিয়েই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে আক্রমণ শানাতেন । ফলে এখানকার জনগণের সঙ্গে তার একটা নিবিড় সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল, ৭১এর সে দিনে সাব্রুমের এক সাধারণ ব্যবসায়ী মাখন দের হোটেলে তিনি খাওয়া-দাওয়া করতেন । নিছক ব্যবসায়িক সম্পর্ক হয়েও জিয়াসাহেব না ফেরা পর্যন্ত তিনি খাওয়াদাওয়া করতেন । এছাড়া এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সেসময়ের সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল ।

গত ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের বিএনপি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করায় বহুবছর পরে আবার জিয়াউর রহমানের নাম সাব্রুম তথা দক্ষিণ ত্রিপুরার পুরনো নাগরিকদের র মুখে মুখে প্রকাশ পাচ্ছে । অনেক বয়স্ক জনেরা তার স্মৃতিচারণ করছেন । অন্যদিকে বিগত সরকারের আমলে সাব্রুমের ফেনী নদীর উপরে মৈত্রীসেতু তৈরি হয়েছিল এবং এই মৈত্রীসেতুকে কেন্দ্র করে দুপাড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাতায়াতের একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল । কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে একেবারে মৈত্রীসেতুর দ্বারদঘাটনের মুখে সেদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাক্রমের পরিণতিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কিছু মানুষ ভারতবিদ্বেষী প্রচারে মেতে ওঠে । ফলে দু দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল । তারা মৈত্রী সেতুকেন্দ্রিক সমগ্র কর্মকান্ডের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় । ফলে প্রকল্পটি সাময়িকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে । এবং এই প্রকল্প প্রায় অন্ধকারে চলে যাচ্ছিল । ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই প্রকল্পের সলিল সমাধি ঘটাতে সচেষ্ট ছিলেন । পাশাপাশি রামগড় ও সাব্রুম এর স্থলবন্দরসহ মীরসরাইয়ের এস ই জেড প্রকল্প তাঁরা স্তব্ধ করে দেন । মীরসরাইয়ের প্রকল্পটি বাতিল করে সেখানে বিদেশের সহায়তায় সমরাস্ত্র প্রস্তুত এর কারখানা গড়ার পরিকল্পনা নেন তাঁরা । সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে বাংলাদেশে বিএনপি দল ভূমিধ্বস জয়লাভ করায় ড. ইউনুস এখন ইতিহাসের পাতায় । ইতোমধ্যে সেদিনের এক নম্বর সেক্টরের সেনানায়ক বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার গঠন করার ফলে সে প্রকল্পে আবার আসার আলো দেখা যাচ্ছে । এই দলটি ক্ষমতায় এসেই ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবন ও গতিশীল রাখার বার্তা দেয় । ভারত সরকারও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ।  দুদেশের ভিসার প্রদানের ব্যাপারে নিয়মকানুন শিথিল কড়ার প্রয়াসও নেওয়া হচ্ছে ।ফেনীনদীর উপর নির্মিত মৈত্রীসেতু যদি চালু হয় তাহলে অতি সহজে চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করে এই অঞ্চলে বাণিজ্যবিস্তারের বিপুল সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে । এর ফলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নও প্রবলভাবে সাধিত হবে । পাল্টে যাবে জীবনযাত্রার মান ও অর্থনৈতিক চিত্র ।  নতুন সরকার আসার ফলে দক্ষিণ ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অর্থাৎ ফেনীনদীর দুই তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ আবার নতুন করে আশার আলো দেখছেন । যদি এখানে মৈত্রী সেতুকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সচল হয়ে ওঠে তাহলে এখানকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র একেবারেই পাল্টে যাবে বলে দুপারের মানুষজনই আশা প্রকাশ করছেন । অনেকে জিয়াউর রহমানের লড়াইয়ের কেন্দ্র একনম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার সাব্রুমের হরিনা পরিদর্শনের ও আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়াকে ।এখন দেখার বিষয় নতুন সরকার ও বিএনপি দলের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা তারেক জিয়া ও তার মন্ত্রিপরিষদ কতটা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন ।

রবীন্দ্রসৃষ্টিতে পূর্ববাংলার ভাষা, জীবন ও কৃষ্টিসংস্কৃতির প্রভাব

রবীন্দ্রসৃষ্টিতে পূর্ববাংলার ভাষা, জীবন ও কৃষ্টিসংস্কৃতির প্রভাব

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

রবীন্দ্রনাথ ১৮৮৯–১৯০১ সাল পর্যন্ত শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ও কালিগঞ্জ অঞ্চলে কবির জীবনের ২৮ থেকে ৪০ বছর সময়কালের ১২ বছর অতিবাহিত করেন । পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথকে বিয়ের দুদিন আগে ২২ অগ্রাহায়ন ১২৯০ বঙ্গাব্দে একটি চিঠিতে তার পূর্ববঙ্গের জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব অর্পণ করেন । সেই চিঠিতে তিনি লেখেন–'এইক্ষণে তুমি জমিদারীর কার্য পর্যবেক্ষণ করবার জন্য প্রস্তুত হও; প্রথমে সদর কাছারিতে নিয়মিত রূপে বসিয়া সদর আমিনের নিকট হইতে জমাওয়াশিল বাকি ও জমাখরচ দেখিতে থাক এবং প্রতিদিনের আমদানি রপ্তানি পত্র সকল দেখিয়া তাহার সারমর্ম নোট করিয়া রাখ ।' ( রবিজীবনী, তৃতীয় খন্ড, কলকাতা : আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. ২০০৯ । পৃষ্ঠা ১১৯ ) । তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স মাত্র ২২ বৎসর সেই থেকে ক্রমে রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতার জমিদারি সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে থাকেন । রবীন্দ্রনাথের জীবনপঞ্জি অনুযায়ী দেখা যায় যে আরও প্রায় ছয় বছর পরে তার আঠাশ বছর বয়সে ১৮৮৯ সালের ২৮শে নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের জমিদারির দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন । ( তদেব ) ।

রবীন্দ্রনাথের জীবনে শিলাইদহপর্ব তাঁর কল্পনার জগতকে সমৃদ্ধিদানের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করেছে । শিলাইদহ, পতিসর, শাহজাদপুর ও কালীগঞ্জে রবীন্দ্রনাথ লেখালেখির উৎকর্ষতার সুযোগ পান । রবীন্দ্রনাথের এই পর্বের সৃষ্টিকে গবেষকগণ শিলাইদহপর্ব বলে আখ্যায়িত করেন । এখানে এসে তিনি পরিচিত হন গ্রাম বাংলার উদার শ্যামল প্রকৃতির সঙ্গে । এখানকার পদ্মা, গড়াই, আত্রাই, নাগর, বড়াল ও ইছামতি নদী তাঁকে প্রতিনিয়ত হাতছানি দিয়ে ডেকেছে । সর্বোপরি এখানকার দরিদ্র চাষি জনগণের জীবন দেখেছেন তিনি খুব কাছে থেকে । তাদের চিরক্রন্দনময় জীবন দেখে তিনি চঞ্চল হয়ে উঠেছেন । তিনি লিখেছেন–'কেবলই ভাবছি আমাদের দেশজোড়া চাষীদের দুঃখের কথা । আমার যৌবনের আরম্ভ কাল থেকেই বাংলাদেশের পল্লীগ্রামের সঙ্গে আমার নিকট পরিচয় হয়েছে । তখন চাষীদের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ ছিল দেখাশোনা–ওদের সব নালিশ উঠেছে আমার কানে । আমি জানি ওদের মতো নিঃসহায় জীব অল্পই আছে, ওরা সমাজের যে তলায় তলিয়ে সেখানে জ্ঞানের আলো অল্পই পৌছয়, প্রাণের হাওয়া বয় না বললেই হয় ।' ( রাশিয়ার চিঠি, রবীন্দ্ররচনাবলী, পৃষ্ঠা ৬৮৩ ) ।

পূর্ববঙ্গের সঙ্গে কবির সম্পর্ক ছিল অবিনাশী । পদ্মার তরঙ্গ-বিভঙ্গে নৌকায় ভেসে ভেসে তিনি নিবিড়ভাবে অবলোকন করেছেন এ অঞ্চলের শান্ত শ্যামল পল্লীপ্রকৃতি ও সহজ সরল প্রজাসাধারণ ও তাদের জীবনযাত্রা । রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ পর্বে সৃষ্টি হয়েছে সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কথা, কাহিনী, কল্পনা, কণিকা, ক্ষণিকা, নৈবেদ্য ইত্যাদি ঐশ্বর্যময় কাব্য সম্ভার । 'সোনার তরী' কাব্যে পদ্মার তীর, বর্ষার বন্যা, নৌকা, চর ক্ষেতের ফসল, চাষির জীবন, নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি । 'সোনার তরী' কবিতায় ১) গান গেয়ে তুলিবে কে আসে পারে দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে ২ ) রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা ৩ ) পরপারে দেখি আঁকা তরু-ছায়া মুসলিম মাখা, গ্রামখানি মেঘে ঢাকা প্রভাতবেলায় ৪ ) ভরা নদী ক্ষুরধারা খর পরশা  ইত্যাদি পংক্তিতে পদ্মাতীরের নয়নমুগ্ধকর চিত্র ফুটে উঠে ।

'চিত্রা' কাব্যের বিষয়বস্তু সৌন্দর্যবোধ হলেও গ্রামীন চাষিজীবনের সংকট ফুটে উঠেছে 'এবার ফেরাও মোরে' কবিতায় । দরিদ্র চাষিদের সংকটমোচনের জন্য তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন–'এইসব মূঢ় ম্লান মুখ মুখে / দিতে হবে ভাষা–এইসব শান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা–' । 'চৈতালি' কাব্যে পদ্মাকে নিয়ে রয়েছে কবিতা, 'হে পদ্মা আমার /তোমায় আমায় দেখা শত শত বার ।' 'কথা' ও 'কাহিনী' কাব্যে বারবার এসেছে পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের কথা । 'দুই বিঘা জমি'র উপেন মিথ হয়ে আছে । এর কাহিনি নাকি রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফল । এই কবিতায় তিনি পূববাংলার পল্লীপ্রকৃতির একটি চিত্র তুলে ধরেন–'ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি / পল্লব ঘন আম্রকানন রাখালের খেলা গেহ / স্তব্ধ অতল দিঘি কালো জল নিশীথ শীতল স্নেহ / বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে / মা বলিতে প্রাণ করে আনচান চোখে আসে জল ভরে ।' ক্ষণিকা কাব্যেও রয়েছে নিসর্গ ও মানুষ । 'আষাঢ়' ও 'নববর্ষা' কবিতায় বর্ষার গুরুগম্ভীর রূপ প্রকাশ পেয়েছে । 'নৈবেদ্য' কাব্য প্রকাশের সময় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে বসবাস শুরু করেন । নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থে ঈশ্বরোপলব্ধির ভূমিকা প্রধান থাকলেও বাংলার দিগন্তপ্রসারী উদার প্রকৃতির প্রভাবও রয়ে গেছে তাঁর সৃষ্টিতে ।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের ৯৪টি গল্পের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি গল্প তিনি রচনা করেছেন শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে অবস্থানকালে । গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনের অন্তর্নিহিত সুখদুঃখ, আশানিরাশা, কৃষ্টিসংস্কৃতির জীবন্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় তাঁর ছোটোগল্পসমূহে । পূর্ববাংলায় বসে লেখা তাঁর গল্পগুলোতে বাংলাদেশের শ্যামল সুন্দর প্রকৃতি, অজ্ঞ, অসহায়, অশিক্ষিত ও দরিদ্র জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি জমিদারি শাসনের নেতিবাচক শৃংখলে পর্যুদস্ত জীবনচিত্র ও প্রতিফলিত হয়েছে । তাঁর রচিত 'ছুটি', 'পোস্টমাস্টার', 'সমাপ্তি', 'দেনা পাওনা' 'রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা', 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন' ইত্যাদি গল্পে কৃষক, গৃহিণী, দরিদ্র প্রজা, জমিদারের কর্মচারী, এমনকি গ্রামীন বালকের জীবন সংগ্রাম দুঃখ-কষ্ট নিঃসঙ্গতা ও নীরব অভিমান অত্যন্ত সুনিপুণভাবে উঠে এসেছে । 'পোস্টমাস্টার' গল্পে গ্রামীন জনপদের নিঃসঙ্গ পোস্টমাস্টার ও ছোটো রতনের মধ্যে আবেগময় সম্পর্কের মানবিকতা, 'ছুটি' গল্পে ফটিক চরিত্রের মাধ্যমে গ্রামীণ বালকের জীবনযুদ্ধ, 'দেনা পাওনা'য় পণপ্রথা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীর অসহায়ত্ব,  'সমাপ্তি' গল্পে গ্রামীন শিক্ষকের সহজ জীবন ও স্বাভাবিক প্রেমের বিকাশ এগুলো শুধু শিল্প সুষমায় সমৃদ্ধ নয় বরং গ্রামবাংলার ইতিহাস, জীবনপ্রবাহ ও সংস্কৃতির অনন্য দলিল ।

পূর্ববাংলার নদীমাতৃক প্রকৃতি লোকজ  জীবনধারা, নদী, নৌকা, কৃষিজীবন ও লোকসংগীত রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে । তিনি বাংলার লোকসংস্কৃতি ও লোকগানের সহজ সরল আবেগপ্রবণ ধারাকে আধুনিক সাহিত্যে ও সঙ্গীতে ব্যবহার করে নতুন মাত্রা দিয়েছেন । নদী ও নৌকার সঙ্গে সম্পর্কিত ভাটিয়ালি গানের সুর ও ছন্দ রবীন্দ্রসংগীতে অনেকবার ব্যবহৃত হয়েছে । 'এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে জয় মা বলে ভাসা তরী' এই জাতীয় গানের উদাহরণ । লোকগানে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দ, সহজ, সরল, ভাষাব্যবহার ও চিত্রকল্প রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায় সাবলীলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে । ফলে তাঁর সৃষ্টি সর্বজনগ্রাহ্য আবেদন এনে দিয়েছে । তিনি লোকসংগীতের ঢঙে নতুন নতুন সুর সৃষ্টি করেছেন । আবার কখনো সরাসরি লোকসুর ব্যবহার করেও গান রচনা করেছেন । রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালের শ্রাবণ ( ৭ই আগস্ট ) রচনা করেছিলেন 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' গানটি । এই গানটি গগন হরকরার 'আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে' গানটির সুরে রচিত । এই গানটি এতটা জনপ্রিয় হয়েছিল যে ৭১এ বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে মুখে ফিরত । পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রূপে গানটি গৃহীত হয় । লোকসংগীতের মধ্যে যে আধ্যাত্মিক আবেদন রয়েছে তেমনি রবীন্দ্রনাথের অনেক গান ও কবিতার মধ্যে ঈশ্বরোপলব্ধি বা জীবনের গভীর সত্যের অনুসন্ধান লক্ষ্য করা যায় । 'রূপ সাগরে ডুব দিয়েছি অরূপ রতন আশা করে',  'তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি',  'তাই তোমার আনন্দ আমার পর তুমি তাই এসেছ নিচে /তোমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর আমার প্রেম হতো যে মিছে' গানগুলো এ প্হঙ্গে উল্লেখ করা যায় ।' শিলাইদহে বাউলদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিবিড় পরিচয় ঘটে । এখানে অবস্থানকালে গগন হরকরা, কাঙাল হরিনাথ, গোঁসাই রামলাল, গোসাই গোপাল, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী, লালনের শিষ্যসামন্তদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখাসাক্ষাৎ ও আলোচনা হত । শিলাইদহ ও ছেঁউড়িয়া থেকে তিনি লালন ফকির ও গগন হরকরার গান সংগ্রহ করে বিদগ্ধ মহলে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন । রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত গানগুলো 'বাউল' নামে গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়েছিল । তিনি তাঁর কয়েকটি নাটকেও বাউল গান ব্যবহার করেছেন । 'মানুষের ধর্ম' গ্রন্থে ঔপনিষদীয় আত্মতত্ত্ব ও বাউল দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা তিনি করেছেন । তাঁর চিত্রাঙ্গদা ও চন্ডালিকা নাটকে লোকজ আঙ্গিক এবং নারীচেতনার দেশজ স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে । এই নাটক দুটিতে সমাজের নারী, জাতপাত ও মূল্যবোধের জটিলতাকে শিল্পিত ও মানবিক রূপে উপস্থাপন করেছেন ।

রবীন্দ্রনাথের গদ্য ও পদ্যে বহুবার পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক শব্দ, ধ্বনি ও বাক্যবন্ধ ব্যবহৃত হয়েছে । যেমন সাজু, লাউ, চাষা, নাও, মাঝি, ডিঙি, পাল, গাঙ, জোয়াল, তালগাছ ইত্যাদি শব্দ তাঁর রচনায় দেখা যায় । শিলাইদহে থাকাকালীন তাঁর ভ্রাতুস্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে লেখা পত্রসমূহ 'ছিন্নপত্রে' যেমন পূর্ববঙ্গের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের বর্ণনা রয়েছে তেমনি সেখানকার মানুষের মুখের ভাষা ও উচ্চারণের ছাপ স্পষ্ট । তার উদাহরণ, 'চাষার ভাষায়, মহারাজ ফসল ভালো হয় নাই, তবে আল্লার কৃপা হইলে বাঁচুম ।' এই জাতীয় সংলাপ তাঁর জীবন ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের উদাহরণ ।

তাঁর বিসর্জন, ডাকঘর, মালিনী নাটকে সহজিয়া ভাষাব্যবহারের ছাপ রয়েছে । সংলাপে গানে আঞ্চলিক শব্দ ও লোকজ ভাষাভঙ্গের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় । যেমন–রে !ওরে !হে দাদা ! বাপু তুমি না কেমন করো না রে ! তুই বড় গেঁয়ো জাতীয় শব্দ নাটকের চরিত্রদের সংলাপে ব্যবহৃত হয়েছে । 'চন্ডালিকা' নাটকের একটি সংলাপে দেখি–'তুমি তো জাতের লোক, আমি তো চন্ডালের মেয়ে ' জাতপাতের লোকজ দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব । 'মুকুট' নাটকে 'ওগো রে ! মুকুট যে মাথার উপর বসে সেই জানে ওটা কত ভারী ।' প্রবাদপ্রতিম বাক্যে একদিকে দার্শনিকতা আবার অন্যদিকে লোকজবোধের প্রকাশ ঘটে ।

১৯০১ সালের পর রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ থেকে গিয়ে শান্তিনিকেতনে বসবাস করলেও পরবর্তী সময়ে বহুবার শিলাইদহ এসেছেন । এখান থেকেই তিনি সংগ্রহ করেছেন তাঁর সারাজীবনের সৃজনের সঞ্চয় । এ প্রসঙ্গে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ তাঁর 'পিতৃস্মৃতি' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন–'আমার ধারণা বাবার গদ্য ও পদ্য দু'রকম লেখারই উৎস যেমন খুলে গিয়েছিল শিলাইদহে, একদিনের জন্য কলম বন্ধ হয়নি । শিলাইদহের যে রূপবৈচিত্র তার মধ্যেই পেয়েছিলেন তিনি লেখার অনুকূল পরিবেশ ' । এই পূর্ববাংলার জল, মাটি, হাওয়া, নদী ও মানুষের মধ্যেই রবীন্দ্রমানসের, রবীন্দ্রমননের সূচনা হয় । রবীন্দ্রনাথের পরবর্তীজীবনে আঁকা চিত্রসম্ভারেও শিলাইদহ তথা পূর্ব বাংলার প্রভাব নিহিত ছিল । রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতরণি একদিন পূর্ববঙ্গেরই সোনার ধানে ভরে গিয়েছিল ।

মানভূমের ভাষা আন্দোলনের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও সাফল্য

মানভূমের ভাষা আন্দোলনের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও সাফল্য 


অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

বাংলা ভাষা বাঙালির প্রাণের ভাষা । সারা পৃথিবী জুড়ে বাংলা ভাষা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত । সারা বিশ্ব জুড়ে বাংলা ভাষার জয়গান প্রচারিত । বাংলার মাটিতেই একদিন জন্মেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সৈয়দ মুজতবা আলী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সমরেশ বসু জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, প্রমুখগণের মত বিশ্ববিশ্রুত ব্যক্তিত্ব যারা তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের বাংলা ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন । এই বাংলাভাষার সঙ্গে বাঙালির আবেগ জড়িত । বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে এই উপমহাদেশে বহুবার ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে । তারমধ্যে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা রাজপথের রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলন বিশ্বের কাছে এক বিস্তৃত পরিচিতি এনে দিয়েছে । বরকত, সালাম, জব্বার, রফিক, সফিদের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতিও পেয়েছে । বাংলাদেশের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি আমাদের দেশেও ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল ১৯৬১ সালের ১৯শে মে । আসামের শিলচরে অনুষ্ঠিত এই ভাষা আন্দোলনে ১১ জন শহিদ হয়েছিলেন সেদিন । সেদিনের সেই শহিদদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে । 

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা । এ ভাষা আমাদের আত্মা আমাদের জীবনধারণের মূল চাবিকাঠি । মাতৃস্তন্য  পুষ্ট করে মানব শরীরকে । কিন্তু মাতৃ শরীর থেকে বিচ্যুত হয়েও থেকে যায় নাড়ির টান । মাতৃভাষাই মানুষ এবং মাটিকে বেঁধে রাখে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে । যখন কেউ জোর করে মাতৃভাষার অধিকারকে কেড়ে নিতে চায় তখনই মানুষের বনভূমিতে আলোড়ন সৃষ্টি হয় । বাংলাভাষার জন্য বিভিন্ন সময়ে যে আন্দোলন তা এই সংঘাতেরই ফলশ্রুতি । বাংলা ভাষার মর্যাদার জন্য ঢাকা কিংবা শিলচরে যে আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে তার কথা অনেকেই জানেন । কিন্তু তার পাশাপাশি মাতৃভাষার জন্য মানভুমের বাঙালিদের যে দীর্ঘ আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল সেই আন্দোলনের কথা অনেক বাঙালি জানেন না । মনে রাখা দরকার যে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যতগুলো ভাষা আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলনও এই বাংলার মাটিতেই সংঘটিত হয়েছে এবং সেই আন্দোলন হল মানভূমের ভাষা আন্দোলন। মাতৃভাষা বাংলার জন্য বাংলার একটি অঞ্চলের বাঙালিদের প্রথম ও সুদীর্ঘ লড়াইয়ের কাহিনি শুধুমাত্র ভাষার অধিকারের জন্যে । সেই জেলাটি হল মানভূম । যেখানে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালিদের লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯১২ সালের পহেলা এপ্রিল । আর সুদীর্ঘ ৪৪ বছর পরে তার আংশিক সফলতা এসেছিল আন্দোলন শেষে ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর । 

এই সুদীর্ঘ সময়ের আন্দোলনের পেছনে কিছু ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম রয়ে গিয়েছিল যার পরিপ্রেক্ষিতে এই অঞ্চলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ধীরে ধীরে বিস্তৃত রূপ ধারণ করে । এই আন্দোলনের পশ্চাদপট জানতে হলে আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয় । ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দিল্লির বাদশাহের কাছ থেকে সুবা বাংলার দেওয়ানি পায় । জরিপের পর ১৭৬৭ থেকে খাজনা আদায় শুরু হয় । দক্ষিণ-পশ্চিমবাংলার চারটি রাজ্য শিখরভূম, মানভূম, বরাহভূম আর ধল ভূম ও সামন্তভূমের কিছু অংশ মিলে মানভূম রাজ্য । যার সরকার নিয়ন্ত্রিত হত কামারপুকুর সংলগ্ন মান্দারণ থেকে । তবে রাজ্যের অধিকাংশই পঞ্চকোট রাজার অধীন ছিল । ১৭৬৫ পর্যন্ত পঞ্চকোট রাজা খাজনা দিতেন দিল্লিশ্বরকে । এই রাজ্যের জনজাতি আদিবাসী সম্প্রদায় কিন্তু 'কোম্পানি' নামের এই বিদেশী মালিকানাকে মেনে নিতে পারল না । তারা খাজনা দিতে অস্বীকার করল । এই নিয়ে শুরু হল বিরোধ । চলতে থাকল এক দীর্ঘকাল ব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম যা 'চুয়াড় বিদ্রোহ' নামে প্রসিদ্ধ । বরাহভূমের রাজা বিবেকনারায়ণের প্রচ্ছন্ন মদতে ১৭৬৭ থেকে ১৮৩২ পর্যন্ত চলে এই বিদ্রোহ । কোম্পানি অঞ্চলগুলিকে ভাঙাগড়া করে ১৮০৫ সালে 'জঙ্গলমহল' জেলা গঠন করেও এই বিদ্রোহ থামাতে পারেনি । চুয়াড় বিদ্রোহের শেষ পর্বে ১৮৩২ সালে নেতা বরাভূমের রাজবংশজাত গঙ্গানারায়ণ সিংয়ের পরাজয় ও মৃত্যু হয় । এই বিদ্রোহের ফলশ্রুতিতে ১৮৩৩ সালে গঠিত হয় মানভূম জেলা, বর্তমান পুরুলিয়া, ধানবাদ আর সিংভূমের সরাইকেলা অঞ্চলের মোট ৭৮ ৯৬ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে । ১৮৩৭ সালে ব্রিটিশ সরকার অকারণে ফারসির বদলে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যার ফলে দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠনের দাবি উঠে । ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে খানিকটা ভিন্ন খাতে ঘুরিয়ে দিতে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ বলে অনেকে মনে করেন । তারা উর্দুর বদলে হিন্দি আর আরবির বদলে সংস্কৃত ভাষা চালু করার ফরমান জারি করে । এখান থেকে বিভিন্ন ভাষাভাষী বিশেষত বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বাংলা প্রদেশের প্রতি এক নিবিড় যোগ ধরে রাখার স্বপ্ন দেখে । এদিকে মানভূমের জন্য আরও বড় শাস্তি অপেক্ষা করছিল ১৮৮৯ সালে কোম্পানি জেলাটিকে ভেঙে টুকরো করে মাত্র ৪১০০ বর্গমাইলে সীমিত করে দেয় । ভাষা ও ভূমি বিভাজনের এই নীতিকে কেন্দ্র করে চলতে থাকা ধিকি ধিকি আগুনে ঘৃতাহূতি লাভ করে ব্রিটিশের বাংলা ভাঙার চক্রান্তে । ১৯০৫ সালে উনিশে জুলাই সরকারিভাবে বাংলা প্রেসিডেন্সি ভাগের বিজ্ঞপ্তি জারি করেন লর্ড কার্জন । ভাগ হয়ে যায় বাংলা । ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, মালদহ, পার্বত্য ত্রিপুরা ও অসমকে নিয়ে গঠিত হয় পূর্ববঙ্গ ও অসম । যার রাজধানী হয় ঢাকা । অবশিষ্ট বাংলা, বিহার, উড়িষ্যাকে নিয়ে গঠিত হয় বাংলা প্রদেশ । যার রাজধানী হয় কলকাতা । ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সেদিন কলকাতাসহ সংলগ্ন অঞ্চলের বাঙালি মধ্যবিত্ত ও একাংশ প্রতিবাদে উত্তাল হয় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলমে সেদিন উঠে আসে 'বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল, পুণ্য হউক পুণ্য হউক পুণ্য হউক হে ভগবান' । রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে পালিত হয় রাখিবন্ধন উৎসব। হিন্দু মুসলিম বাঙালি জাতিসত্তা ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের বার্তা দেয় । সেদিনের উত্তাল আন্দোলনের তরঙ্গে  বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে হয় ইংরেজকে । তীব্র আন্দোলনের ফলে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবার উৎসবে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ বাংলাভূমিকে ভাগের যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছিল তা বাতিল করেন । কিন্তু একই দিনে তিনি এও ঘোষণা করেন বাংলা প্রেসিডেন্সিকে দুই ভাগে বিভাজন করে এক অংশ হবে পূর্ববঙ্গ । যার রাজধানী হবে কলকাতা । এবং অপর অংশ হবে বিহার ও উড়িষ্যা প্রদেশ । যার রাজধানী হবে পাটনা । এবং এই বিহার উড়িষ্যা প্রদেশের সঙ্গেই যুক্ত করে দেওয়া হয় বাংলাভাষী সমগ্র মানভূম ও ধলভূম অঞ্চলকে (৭০০০ বর্গ কিলোমিটারের অধিক অঞ্চল ) । বাংলা ভাষাভাষী এলাকাকে কেন বিহার উড়িষ্যার সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হবে সে নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে । তখন থেকে শুরু হয় মানভুমের ভাষা আন্দোলন । কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের সাফল্যের আনন্দ এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সামনে থাকায় মানভূমের ভাষা আন্দোলন তখনও জমে ওঠেনি । এসময় আন্দোলনের ব্যাপক প্রসার না হলেও বাংলা ভাষার উপর হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলতে থাকে । বিহার সরকার যখন অফিস আদালত শিক্ষার মাধ্যমে তথা দাপ্তরিক কাজে হিন্দি ভাষাকে চালু করেন এবং মানভূমের বাংলা ভাষাভাষীকেও হিন্দি ব্যবহার করতে নির্দেশ দেন তখন মানভূমের সচেতন ও ভাষাপ্রেমী বাঙালি জনগণ প্রিয় বাংলাভাষার উপর হিন্দির আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন ।

১৯১২ সালের ১লা এপ্রিল থেকে মানভূমের শুরু হয় সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি আন্দোলন । এই আন্দোলন মাতৃভাষা বাংলার জন্যে । বঙ্গভূমিতে প্রত্যাবর্তনের জন্যে । মানুষ এ পর্যন্ত আন্দোলন করেছে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-সুরক্ষা-সার্বভৌমত্ব-স্বাধীনতার জন্যে । ভারতের মানুষ এই প্রথম দেখলেন মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ভূখণ্ডকে আন্দোলন করতে । মানভূমকে বিহার উড়িষ্যা থেকে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় পুরুলিয়া কোর্টের আইনজীবী রজনীকান্ত সরকার শরৎচন্দ্র সেন প্রমুখদের নেতৃত্বে । তবে ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের আঁচ লাগে মানভুমের জনমনেও । ১৯২১ সালে পুরুলিয়ায় তৈরি হয় মানভূম জেলা কংগ্রেস কমিটি । মানভূমকেশরী শ্রীঅতুলচন্দ্র ঘোষ সম্পাদক নির্বাচিত হন । পুরুলিয়া ইতিহাস গবেষক দিলীপ কুমার গোস্বামীর মতে, "প্রতিবাদের স্বর উঠলেও সে সময় স্বাধীনতার আন্দোলনেই ছিল মুখ্য তাই ভাষা আন্দোলন তত্ত্বটা প্রচার পায়নি তবে তলে তলে আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি হচ্ছিল ।"

এই আন্দোলনের যুক্তিসংগত কারণ হল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে বিহার সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ । ১৯৩১ এর আদমশুমারিতে এই প্রদেশে বাংলা ভাষাভাষী জনগণের সংখ্যায় বেশি দেখা যায় অর্থাৎ ১৮ লাখ ১০ হাজার ৮৯০ জনের মধ্যে ১২ লাখ ২২ হাজার ৮৮৯ জন বাংলা ভাষাভাষী১৯৪১এর আদমশুমারি হিসাব অনুযায়ী ২০,৩২,১৪৬ জনের মধ্যে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ২৮৪ বাংলা ভাষাভাষী অর্থাৎ ১০ বছরে বাঙালি জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ লাখ৩৪,৩৯৫ জন । বাকিদের মধ্যে সাঁওতাল হিন্দি আর কিছু আদিবাসী ভাষাভাষী মানুষ ছিলেন । তাদের মাথাব্যথার কারণ ছিল ১৯৩৬ সালে ওড়িশা পৃথক রাজ্য হলে বিহার প্রদেশের কংগ্রেস নেতাদের বড় অংশ মনে করতে থাকেন যে মানভূম ও ভাষার কারণে বিহার থেকে আলাদা হয়ে যাবে । এতে ধানবাদ বিস্তীর্ণ খনি ও শিল্পাঞ্চল হাতছাড়া হয়ে যাবে । এই পরিপ্রেক্ষিতে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের (১৮৮৪-১৯৬৩) সভাপতিত্বে মানভূম বিহারী সমিতি গঠিত হয় । হিন্দি ভাষা প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে স্কুল তৈরির কাজ শুরু হয় । তখন হিন্দি ভাষা আগ্রাসনের যে কৌশলগত অবস্থান তার প্রতিরোধ নির্মাণে পুরুলিয়ার ব্যারিস্টার দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ভাই পি আর দাসের সভাপতিত্বে  হিন্দিভাষী নেতৃবৃন্দের পাল্টা জবাব এবং বাংলা ভাষার উপর হিন্দি ভাষার আধিপত্যকে ঠেকাতে গিয়ে বাংলা ভাষা প্রচার ও প্রসার এবং স্কুল নির্মাণের জন্য গড়ে ওঠে মানভূম বাঙালি সমিতি । বিহার সরকার আদিবাসী ও জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রাথমিক স্তরের বিদ্যালয় খুলতে শুরু করলে বাঙালিরা ও বাংলা স্কুল খুলতে তৎপর হয়ে পড়েন । এই সময় সতীশচন্দ্র সিংহ রাঁচি, পালামৌ, সিংভূম, হাজারিবাগ ও মানভূম জেলা নিয়ে ছোটনাগপুর নামক এক নতুন প্রদেশ গঠন বা বাংলা সঙ্গে পুনরায় সংযুক্তির প্রস্তাব করেন । চলতে থাকে টানা পোড়েন ।  তার মুখপাত্র হিসেবে ১৯৩৫ সালে 'মানভূম বাঙালি সমিতির ' 'মুক্তি' নামে একটি পত্রিকা চালু করা হয় । রাজ্যস্তরে গঠিত হয় 'বিহার বাঙালি সমিতি' ।এভাবে চলতে থাকে বাংলা ভাষা আন্দোলন । ক্ষিতিমোহন সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানভূমবাসীর এই ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন করেন । ১৯৩৭ সালে বিহারের কংগ্রেস মন্ত্রিসভা ডোমিসাইল সার্টিফিকেট প্রথার মাধ্যমে বাংলাভাষীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিককে পরিণত করলে ভাষা আন্দোলন আরও জোরালো হয় । ভাষা আন্দোলন তখনকার মতো ভাষার জন্য লড়াই রূপে থেকে গেলেও স্বাধীনতার পরে তা জোরদার মাতৃভাষা আন্দোলনের রূপ নেয় । ১৯৩৮-এ কংগ্রেসের রঘুনাথপুর অধিবেশনে বাঙালি নেতৃত্ব মানভূমকে বঙ্গপ্রদেশে যুক্ত করার দাবি তোলে ।

৪৭ এর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে শুরু হল মানভূমের ভাষা সংক্রান্ত দ্বিতীয় আন্দোলন । দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই অখিল ভারতীয় কংগ্রেস কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ গ্রহণ করা হবে । স্বাধীনতার পরে সেই বিষয়টিকে সামনে রেখে শুরু হয় দ্বিতীয় আন্দোলন । এই অঞ্চল বাংলা ভাষাভাষী হলেও বিহারের হিন্দি আগ্রাসনের শিকার হচ্ছিলেন এই এলাকার মানুষজন । যেসব দাবিকে ঘিরে মানভূম ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধে সেগুলো হল বাংলা ভাষায় কথা বলা, বাংলা ভাষায় লেখা, স্কুল কলেজে হিন্দি ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করা ।

১৯৪৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জয়পুর অধিবেশনে ভাষানীতির উপরে আলোচনা হলেও মানভূমের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়নি । কারণ, স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারত বিভাজনের সময় বিহার প্রদেশের বাংলাভাষী অঞ্চলকে পশ্চিমবঙ্গে আনার দাবিকে জাতীয় নেতারা 'সেপারেশন মুভমেন্ট' হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন । স্বাধীনতার চারদিনের মাথায় জামশেদপুরে 'বিহার বাঙালি সমিতি'র বাৎসরিক সভা হয় । সেখানে উদ্বোধনী ভাষণে নগেন্দ্রনাথ রক্ষিত ছিন্নবিচ্ছিন্ন বাংলার বাঙালি জাতিকে তার গৌরবময় ঐতিহ্য নিয়ে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলতে সিংভূম, মানভূম, সাঁওতাল পরগনা ও ভাগলপুরের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল ও পূর্ণিয়া জেলাকে বাংলার অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান । ওই সভায় প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘোষসহ বহু ভাষাকর্মী বিহারীদের দ্বারা আক্রান্ত হন । এর সঙ্গে শুরু হয় সরকারি দমন পীড়নও । ১৯৪৮ সালে বিহার বিধানসভা হিন্দি ভাষার পক্ষে সুপারিশ করে এবং মানভূম জেলা শিক্ষা দপ্তর বিদ্যালয়গুলিতে দুটি সার্কুলার জারি করে যা কালাকানুন ছাড়া আর কিছু ছিল না বলে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বিদ্রোহ করেন । হিন্দি ভাষা বাধ্যতামূলকভাবে চালু করার লক্ষ্যে স্কুলগুলিতে হিন্দিশিক্ষা না দিলে স্কুলের অনুদান বন্ধের নোটিশ জারি হয় । আদিবাসী স্কুলগুলিকে হিন্দি স্কুলের পরিণত করতে নির্দেশ দেওয়া হয় । ৭২ টি আদিবাসী স্কুলে হিন্দি ভাষায় পঠন-পাঠন শুরু না হলে সরকারি অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে সার্কুলার পাঠানো হয় । ১৯৪৮-এ এমন ৩০০টি স্কুল পরিবর্তিত হয় । ২৩টি স্কুলের অনুমোদন বাতিল হয় । বাংলা মাধ্যমে পড়ালে শিক্ষকদের শাস্তির বিধান দেওয়া হয়। বাঙালির মানভূমে তখন থেকেই শুরু হল একরকম 'হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ' । একের পর এক বাংলা স্কুল পরিণত হল হিন্দি স্কুলে । মানভূম অঞ্চলের সমস্ত বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকে বাংলা ভাষায় পরিদর্শকদের সরিয়ে দেওয়া হয় । প্রতিটি স্কুলে হিন্দিতে স্কুলের নাম লেখা সাইনবোর্ড টাঙাতে হবে এবং রামধুন গীত বাধ্যতামূলক করা এই মর্মে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় । ১৯৪৮ থেকে মাধ্যমিক স্তরের সমস্ত বই পত্র বাংলায় ছাপা বন্ধ করে দেয় সরকারের শিক্ষা বিভাগ । আদিবাসী সাঁওতাল ছেলেমেয়েরা যাদের দ্বিতীয়ভাষা বাংলা হঠাৎ করে হিন্দিতে পড়াশোনা চালাতে ব্যর্থ হয়। এবং স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয় । মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পরীক্ষার খাতাপত্র হিন্দিতে লেখা না হলে সরকারি অনুমোদন স্থগিত বা বাতিল করে দেওয়া হতে থাকে । হিন্দিভাষী পরিদর্শকরা মানভূমের স্কুলগুলির পরিদর্শনে এসে স্কুলগুলিকে 'ভাটিখানা' এবং শিক্ষকদের 'অযোগ্য' ও 'মিথ্যাবাদী' বলে অপমান করতে থাকেন । হিন্দিতে কথা বলতেও লিখতে না পারা শিক্ষকদের তারা অশিক্ষিত বলে হেনস্থা করতেন । বিহার সরকার শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক হিন্দি শিখতে হবে এই মর্মে ফতোয়া জারি করে । পোস্ট-অফিসসহ সমস্ত সরকারি দপ্তরে হিন্দি বাধ্যতামূলক করা হল । সমস্ত আবেদন পত্র দলিল দস্তাবেজ এবং সরকারী আদেশ শুধুমাত্র হিন্দিতে লিখলেই গ্রাহ্য হবে বলে ফরমান জারি হয় । এমনকি ঘোষণা করা হয় উনিশে আগস্ট ১৯৪৮ থেকে বাংলায় লেখা জমির বা সম্পত্তির দলিল সরকারি দপ্তরের গৃহীত হবে না । মানভূমের মহকুমা শহর ধানবাদে বাংলাভাষায় কথা বলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করাও সমস্যার জনক হয়ে ওঠে । বিহারীরা বাঙালিদের মানভূমে বহিরাগত বলে অপপ্রচার চালাতে শুরু করেন । মানুষকে বিভ্রান্ত করতে তারা মানভূমের আদি ভাষা 'খোট্টা ভাষা' বলে প্রচার চালান । আদিবাসী ভূমিজ, মাহাতোদের ভাষিক পরিচয় বাংলা থেকে বের করে আনার চেষ্টাও করে বিহারী সমিতি । এর বিরুদ্ধে মানভূমের ভাষা আন্দোলন গর্জে উঠে । লক্ষ লক্ষ বাঙালি শিক্ষা ও প্রশাসনিক স্তরে তাদের মাতৃভাষা বাংলাকে স্বীকৃতির জন্য শুরু করে আন্দোলন । বিহার সরকার মানভূমে বাংলার ব্যবহার সীমিত করার জন্য কঠোর হতে শুরু করে । এক সময় পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় যে ভাষা আন্দোলনকারীরা বুঝতে পারেন কংগ্রেসের থেকে ভাষা স্বাধিকারের দাবি অর্জন করা সম্ভব নয় । ১৯৪৮ এর ৩০ শে এপ্রিল থেকে ৫ই মে মানভূম কংগ্রেসের বান্দোয়ান অধিবেশনে মানভূম সভাপতি ভাষাগত অত্যাচার নিয়ে আলোচনা করলেন, নিষ্ফল হল সে আলোচনা । অথচ কোন মন্ত্রবলে তার এক মাসের মধ্যেই পুরুলিয়ার শিল্পাশ্রমে একটি বৈঠকে 'মানভূমের ভাষা বাংলা' এই প্রস্তাব ৪৩-৫৫ ভোটে পরাস্ত হল । মূলত এই কারণে অতুলচন্দ্র ঘোষ, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, অরুণচন্দ্র ঘোষ, বিভূতিভূষণ দাশগুপ্তসহ ৩৭ জন নেতা কংগ্রেসের জেলা কমিটি থেকে পদত্যাগ করে 'লোক সেবক সংঘ' গঠন করেন । এই সংঘ বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করে । অগত্যা ব্রিটিশরা যা করেনি স্বাধীন ভারতের সরকার এই বর্ষিয়ান স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাকে গ্রেফতার করে ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের দণ্ডিত করে । তারপর চক্রান্ত করে শীতের রাত্রে খোলা ট্রাকে চাপিয়ে হাজারীবাগের জেলে পাঠায় এটা জেনেও যে, তিনি তখন প্লুরিসিতে ভুগছিলেন । ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে লড়াইয়ে ফিরে আসেন । এরপর রাষ্ট্রপতি ডাক্তার রাজেন্দ্র প্রসাদ তাকে রাজ্যপাল পদের প্রস্তাব দেন । শর্ত–যদি তিনি এই আন্দোলন পরিত্যাগ করেন । বলাবাহুল্য তিনি সে ফাঁদে পা দেন নি ।

মানভূমের ভাষা আন্দোলন প্রকৃত অর্থেই ছিল বাংলা ভাষার আন্দোলন । তার সাথে ঝাড়খণ্ডে বাংলাভাষী মানুষ যুক্ত ছিলেন সামনের সারিতে । কেননা এই আন্দোলনে লোকসংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম যে টুসু গান তার ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল  সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মাধ্যমে । বিশেষভাবে বঙ্গ সত্যাগ্রহ, কৃষক সংগ্রাম, খাদ্য সত্যাগ্রহ বা হাল জোয়াল সত্যাগ্রহের মাধ্যমে মানভূমের ভাষা আন্দোলন চলতে থাকে । যার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে টুসু গান । বিহার সরকারের অরাজকতার বিরুদ্ধে ১১ ডিসেম্বর ১৯৪৯ সালে ভাষা আন্দোলনের বীজ অঙ্কুরিত হল ছাত্র ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে । ফলস্বরূপ আন্দোলনকারীদের উপর নানারকম নিপীড়ন নির্যাতন চালানো হতে থাকে । ১৯৫৪-তে মানভূমে মাতৃভাষা অধিকার রক্ষার দাবিতে শুরু হয় 'টুসু সত্যাগ্রহ'। একমাস ধরে চলা এই সত্যাগ্রহ এক জনজাগরণের রূপ নেয় । লোকগান, লোকনৃত্যে মাতৃভাষা বাংলাকে দমন করার চক্রান্তের কথা উঠে আসে । মুখে মুখে সেই গান ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র । টুসু গান বিহার সরকারের ঘুম কেড়ে নেয় । টুসু গান গাইলে দলে দলে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করা হয় । পুলিশ একজন টুসুগায়ক ১০ বছরের অন্ধ বালক বাবুলালকে গ্রেফতার করে ভাগলপুর জেলে পাঠায় । 

মানভূম ভাষা আন্দোলনে নারীবাহিনীর ভূমিকা ছিল অপ্রতিরোধ্য । জননেত্রী লাবণ্যপ্রভা দেবীকে পুলিশ ও রাজনৈতিক গুন্ডারা চুলের মুঠি ধরে ঘর থেকে বের করে, সঙ্গে চলে অকথ্য নির্যাতন ও সম্ভ্রমহানি । শবর নেত্রী রেবতী ভট্টাচার্যকে পিটিয়ে জঙ্গলের মধ্যে মৃতপ্রায় অবস্থায় ফেলে রেখে যায় বিহারী পুলিশ । জননেত্রী ভাবিনী মাহাতোর উপর অকথ্য নির্যাতন করা হয় । এই সময় বিহারের জননিরাপত্তা আইনের ধারায় লোকসভা সংঘের কর্ণধার অতুলচন্দ্র ঘোষ, লোকসভা সদস্য ভজহরি মাহাতো, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, অরুণচন্দ্র ঘোষ, অশোক চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয় । এই সময় ভজহরি মাহাতোর লেখা– "শুন বিহারী ভাই /তোরা রাখতে লারবি ডাং দেখাই /তোরা আপন তোরে ভেদ বাড়ালি /বাংলা ভাষায় দিলি ছাই । ভাইকে ভুল্যে করলি বড় /বাংলা বিহার বুদ্ধিটাই ।।/বাঙালী বিহারী সবাই /এক ভারতের আপন তাই ।/বাঙ্গালীকে মারলি তবু /বিষ ছড়ালি হিন্দি চাই /বাংলা ভাষার দাবিতে ভাই"– মানভূমের বাংলাভাষীদের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয়েছিল । ইতোমধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করে টুসু সত্যাগ্রহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ।

এরই মধ্যে শুরু হয় সীমা কমিশনের কাজ । সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের তৎকালীন দুই মুখ্যমন্ত্রীর ( বিধানচন্দ্র রায় ও শ্রীকৃষ্ণ সিংহ ) তরফে বঙ্গবিহার যুক্ত প্রদেশ গঠন করার প্রস্তাব আসে । মানভূমবাসী বাংলা বিহার সংযুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে মিছিলে শামিল হয় । তাঁরা অনুভব করেন এই পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেলে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে । ১৯৫৬-র ২০শে এপ্রিল মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদার দাবি নিয়ে পুরুলিয়ার পুঞ্চার পাকবিড়রা থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে ৩০০ নারীসহ ১০০৫ জন ভাষা আন্দোলনকারীর দশটি দল । নারীদের বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন বাসন্তী রায় । পদযাত্রা বাঁকুড়া, বেলিয়াতোড়, সোনামুখী, পাত্রসায়র, খণ্ডঘোষ, বর্ধমান, রসুলপুর, মেমারি, পান্ডুয়া, মগরা, চুঁচুড়া, চন্দননগর, গোদোলপাড়া, শ্রীরামপুর, উত্তরপাড়া, হাওড়া পেরিয়ে ১৬ দিন পর ৬ই মে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ পায়ে পায়ে অতিক্রম করে তারা এসে পৌঁছান কলকাতায় । কন্ঠে ছিল 'বন্দেমাতরম' ধ্বনি আর 'বাংলার মাটি বাংলার জল', 'বাংলা ভাষা প্রানের ভাষা রে' ইত্যাদি গান ধলভূমকে বাংলার অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে গড়া মুক্তি পরিষদের ১৭৫ জন আন্দোলনকারী বঙ্কিমচন্দ্র চক্রবর্তী ও কিশোরী মোহন উপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ধলভূম থেকে পদযাত্রা শুরু করে ৫ই মে কলকাতা পৌঁছে হাজরা পার্কে সভা করেন । নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ীর সভাপতিত্বে ঐ সভায় সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, সাতকড়ি রায় বক্তব্য রাখেন । ডালহৌসী স্কয়ারে পা রাখতেই তাঁদের গ্রেপ্তার করে বাংলার কংগ্রেস সরকার। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরিশ্রমে অসুস্থ হয়ে পড়েন অনেকে । 

মানভূমবাসীর এই লং মার্চ ব্যর্থ হয়নি । ব্যর্থ হয়নি ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষা স্বাধিকারের লড়াই । কলকাতাতেও মানভূম ভাষা আন্দোলনের সংহতিতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে । কলকাতাবাসীর পক্ষ থেকে হেমন্ত কুমার, জ্যোতি বসু, মোহিত মৈত্র, সুরেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত বিশিষ্ট নাগরিকগণসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন । সমাবেশ যেন না হতে পারে এজন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার আগে থেকে ১৪৪ ধারা জারি করে রেখেছিল ফলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দায়ে পুলিশ ৯৬৫ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করে বন্দীদের পাঠানো হয় কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেল আলিপুর সেন্ট্রাল জেল ও আলিপুর স্পেশাল জেলে । ১২ দিন পর তারা মুক্তি পান । একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য স্থানে প্রায় ৩৩০০ আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করা হয় যারা প্রধানত লোকসেবক সংঘ অথবা বাম দলগুলোর কর্মী ছিলেন । পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে একপ্রকার বাধ্য হয়েই বাংলা-বিহার সংযুক্তির প্রস্তাব রদ করে সরকার । দ্রুত পাশ হয় "বঙ্গ বিহার ভূমি হস্তান্তর আইন" । তারপর সীমা কমিশনের রিপোর্টে সরকারি নানা স্তরের ফাঁস, ষড়যন্ত্র পেরিয়ে ১৯৫৬ সালের মানভূমকে তিন টুকরো করে বাংলা অধ্যুসিত ১৬ টি থানা অঞ্চল জুড়ে জন্ম নেয় পুরুলিয়া জেলা । অন্তর্ভুক্ত হল পশ্চিমবঙ্গের । দিনটা ছিল ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর । সীমা কমিশনের রিপোর্ট লোকসভা হয়ে সিলেক্ট কমিটির ও আরো নানা স্তর পেরিয়ে ২৪০৭ বর্গমাইল এলাকার ১১ লক্ষ ৬৯ হাজার ৯৭ জন মানুষকে নিয়ে জন্ম নেয় আজকের পুরুলিয়া । সম্পূর্ণ ধানবাদ মহাকুমা বিহার রাজ্যে রয়ে যায় । মানভূমবাসীরা কয়েক দশক পরে আবার অন্তর্ভুক্ত হন পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলায় । বাংলা ভাষায় কথা বলা, ভাব প্রকাশ, শিক্ষালাভ, এককথায় বৃহত্তর জীবনচর্চার ভাষিক অধিকার পেলেন মানভূমবাসী । টুসু গান নিয়ে আবারো আনন্দে মাতোয়ারা হলেন তাঁরা । এ যেন মানভূমের স্বাধীনতা দিবস ।

আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ে লাখ লাখ মানুষকে নানা প্রকার অন্যায় অবিচার বঞ্চনা অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে জেল জুলুম আর পুলিশি নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে । মানভূমের ভাষা আন্দোলন মানভূমবাসীর জন্য যেমন গৌরবের বিষয় তেমনি সারা পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী মানুষও এই গৌরবের অংশীদার । সময়ের মাপকাঠিতে ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন মানভূমের মাতৃভাষা অধিকার আন্দোলন । টুসু গায়কদের সেই ভাষা আন্দোলন আজ জনমানসে বিস্মৃতপ্রায় হলেও ইতিহাসের দলিলে তা উজ্জ্বল হয়ে আছে । সময়ের বিবর্তনে মানভূমের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস মোটামুটি সাধারণের জানার বাইরে চলে গেছে । বাংলাদেশ তো দূরে থাক, পুরুলিয়ার বাইরে খোদ পশ্চিমবঙ্গেও সরকারি বা বেসরকারিভাবে মানভূমের ভাষা আন্দোলন নিয়ে বার্ষিক কোনো অনুষ্ঠান বা আলোচনা হয় না । পুরুলিয়ার সিধো -কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে মানভূমের ভাষা আন্দোলন অন্তর্ভুক্ত হলেও সেটা গোটা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষায়তন গুলির পাঠ্য পুস্তকের স্থান পায়নি । অতুলচন্দ্র ঘোষ, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, অরুণচন্দ্র ঘোষ, বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত, ভজহরি মাহাতো, ভাবিনি মাহাতোদের মতো শত শত ভাষা সৈনিক তাদের প্রাপ্য মর্যাদা পাননি । পরবর্তীকালে যে ভাষা আন্দোলনসমূহ সংঘটিত হয়েছে তার বীজ এই মানভূম ভাষা আন্দোলনের মধ্যে নিহিত ছিল । মানভূম ভাষা অধিকার সংগ্রামের এক আলোক উজ্জ্বল নাম । জানিনা পৃথিবীতে আর কোন ভাষার জন্য এমন বারবার নানা জায়গায় নানা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়তে হয়েছে কিনা । আজ যখন এক ভিন্ন বাস্তবতায় নিজেদের ঘরে ও বাইরে কোনঠাসা হচ্ছে বাংলা ভাষা তখন এই আন্দোলন আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তার দৃঢ় সংগ্রাম মানসিকতার কথা নতুন প্রজন্মের কাছে । ঐতিহাসিক মানভূম ভাষা আন্দোলনের কথা প্রচার করতে হবে বাঙালি ভাষার জন্য প্রাণ দিতে পারে বাংলা ভাষা বড় প্রিয় আমাদের বাংলা ভাষা বাঁচাতে ও বাঙালির অধিকার আদায় করতে মানভূম ভাষা আন্দোলনের কথা বারবার স্মরণ করতে হবে ।

Monday, February 16, 2026

শিক্ষাক্ষেত্রে ও সাংবাদিকতায় গণমাধ্যম সাক্ষরতা

শিক্ষাক্ষেত্রে ও সাংবাদিকতায় গণমাধ্যম সাক্ষরতা 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

বাংলা মাধ্যম শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ মিডিয়াম (medium) । গণমাধ্যম শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ মাস মিডিয়া (mass media) ।  অধিকাংশ ক্ষেত্রে বর্তমানে  গণমাধ্যম বোঝাতে মাস মিডিয়ার (mass media) পরিবর্তে মিডিয়া (media) শব্দটি ব্যবহার করা হয় । গণমাধ্যমের আধুনিক ক্রমোন্নয়নের ফলে এখন তথ্য আমাদের মুঠোবন্দী । বিশেষ করে প্রযুক্তিক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবস্থা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংযুক্তির ফলে শিল্পক্ষেত্রে চতুর্থ বিপ্লব ঘটে গেছে । এখন প্রযুক্তি যার সংবাদমাধ্যম তার ।  ইন্টারনেট প্রযুক্তি তথ্যের ক্ষেত্রে মানুষের প্রবেশযোগ্যতা (access) অনেক গুণ বেড়ে গেছে । তথ্যে প্রবেশযোগ্যতার সঙ্গে সঙ্গে বার্তা তৈরির ক্ষেত্রেও মানুষ নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে । ফলে নির্ভরযোগ্য বার তার পাশাপাশি অনির্ভর বা ভুয়া বার্তাও ছড়িয়ে পড়ছে । এছাড়া গণমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ ও নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তথ্যের সম্প্রচারে প্রভাব বিস্তার করছে । যার কারনে সঠিক তথ্য যাচাই-বাছাই করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে । প্রতিদিন গণমাধ্যমের কারিগরি কুশলতা বেড়েই চলেছে ।  তার সাথে পাল্লা দিতে গেলে গণমাধ্যম কর্মীকেও কুশলতা অর্জন করতে হবে । এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলকে এবং জনসাধারণকে সক্রিয় করে তোলার লক্ষ্যে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতার প্রয়োজন ।

গণমাধ্যম সাক্ষরতা (Media Literacy) হল বিভিন্ন গণমাধ্যমের বার্তা প্রবেশগম্যতা (access), বিশ্লেষণ (analysis), মূল্যায়ন (evauation) ও সৃজন (creation) এর মাধ্যমে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার একটি দক্ষতা, যা কেবল পঠন-পাঠনের বাইরে গিয়ে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়ার প্রভাব, উদ্দেশ্য ও কাঠামো বোঝার মাধ্যমে ডিজিটাল সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে সাহায্য করে । এর মূল লক্ষ্য হল ভুল তথ্য সনাক্তকরণ এবং দায়িত্বশীলভাবে মিডিয়া ব্যবহার ও তৈরি করতে পারা । এটি প্রচলিত সাক্ষরতার ধারণাকে প্রসারিত করে, যেখানে কেবল পাঠ ও লেখার ক্ষমতা নয় বরং বিভিন্ন ফরমেট এর (টেক্সট, অডিও ভিস্যুয়াল) বার্তা বোঝা ও তৈরি করার ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত । গণমাধ্যম কিভাবে কাজ করে এর অন্তর্নিহিত বার্তা কি এবং কিভাবে পক্ষপাতগ্রস্থ ও ভুল তথ্য প্রচার করা হয় তা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তৈরি করা এর অন্যতম প্রধান দিক । এটি কেবল দর্শক হিসেবে মিডিয়া গ্রহণ নয় বরং একটি সক্রিয় অবস্থানে থেকে মিডিয়া ব্যবহার ও নিজস্ব বার্তা তৈরি করার প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করে । এটি সংবাদপত্র, চলচ্চিত্র, সোশ্যাল মিডিয়া, স্ট্রিমিং সার্ভিসসহ সকল ধরনের মিডিয়ার (প্রিন্ট, ডিজিটাল, তারবিহীন) জ্ঞান প্রদান করে । ডিজিটাল পরিবেশে নিজেকে রক্ষা করতে এবং সুস্থভাবে যুক্ত থাকতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সচেতনতা প্রদান করে । গণমাধ্যম সাক্ষরতার মূল উপাদান হল বিভিন্ন গণমাধ্যম ও তার আধেয়(content) খুঁজে বের করার ক্ষমতা অর্জন এবং সেখানে প্রবেশগম্যতা (access), বার্তা গঠন, উদ্দেশ্য ও প্রভাব বিশ্লেষণ (analysis) করা সেইসঙ্গে বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভুলতা যাচাই করা পক্ষপাত সনাক্ত করা ও মূল্যায়ন (evaluation) এবং কার্যকর ভাবে বার্তা তৈরি ও প্রকাশ করা(creation) । গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা হল ডিজিটাল বিশ্বের একজন সচেতন, সমালোচনামূলক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার একটি অপরিহার্য দক্ষতা ।

উদ্দেশ্যমূলক, পক্ষপাতমূলক, ভ্রান্ত তথ্য সাধারণের আচরণ পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় অথবা প্রচার করা হয় । রাজনৈতিক নেতা, ধর্মপ্রচারক, নিম্নমানের বাভেজাল প্রোডাক্ট বিক্রেতা কিংবা ভিন্ন আদর্শের প্রচারক বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে প্রচারণা (Propaganda) করে থাকে । এই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাকে সাধারণ মানুষ গভীরভাবে ভেবে দেখেন না । ডিজিটাল বিশ্বের ভুয়া খবর ও ভুল তথ্য সনাক্ত করা অপরিহার্য । কারণ ভুয়া খবরও ভুল তথ্যের প্রভাব সুদূরপ্রসারী, যা সমাজে বিভ্রান্তি,  অবিশ্বাস, মেরুকরণ এমনকি সহিংসতার সৃষ্টি করে । এটি গণতন্ত্রের ক্ষতি করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে ভোটারকে বিভ্রান্ত করে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ায় যা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর আস্থা হীনতা তৈরি করে । ভুল তথ্য সমাজে বিভেদ সন্দেহ ও শত্রুতা বাড়াতে পারে যা দাঙ্গা বা সংঘাতের ইন্ধন যোগায় । ভুল তথ্যের প্রভাবে বিরক্ত মানুষ মূলধারার সংবাদমাধ্যমকেও অবিশ্বাস করতে শুরু করে কারণ ভুয়া খবর প্রায়শই যাচাই না করে প্রচার করা হয় । ভুয়া খবর ও ভুল তথ্য মানুষের স্মৃতিকে বিকৃত করে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে ভুলপথে চালিত করে । শিশু ও তরুণদের মধ্যে ভুল তথ্য উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং বিভ্রান্তি তৈরি করে মানসিক বিকাশ ও তাদের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যা তাদের মধ্যে উদ্যোগ ও ভুল বিশ্বাস তৈরি করতে পারে । এর ফলে মানুষের বিদ্যমান বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে এবং তাদের (biases) বা পক্ষপাতিত্বকে উসকে দেয় যা সমাজকেও বিভ্রান্ত করে তোলে । ভুল তথ্যের কারণে মানুষ স্ক্যামের শিকার হতে পারে । যার ফলে আর্থিক ক্ষতি বা ডেটা চুরির মত ঘটনা ঘটে । ভুল স্বাস্থ্যতথ্য বা 'লাইফ হ্যাকস' অনুসরণ করে বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ বা ভুল চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে ।

গণমাধ্যম সাক্ষরতা সাংবাদিকদের সঠিক, নিরপেক্ষ ও নৈতিক সাংবাদিকতা করতে এবং সাধারণ মানুষকে ভুল তথ্য থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে । সাংবাদিকতা গণমাধ্যম সাক্ষরতার ভিত্তি স্থাপন করে, জনগণকে তথ্য সরবরাহ করে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করে । তাই এই দুটিকে একে অপরের পরিপূরক এবং একটি সচেতন সমাজ গঠনে দুটি অপরিহার্য । সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে জনগণের মধ্যে সঠিক জনমত গঠনের সাহায্য করেন, যা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য । সরকার ও তার ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য প্রকাশ করে সাংবাদিকরা জবাবদিহিতা নিশ্চিন্ত করেন এবং সমাজের সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন । গণমাধ্যম সাক্ষরতা বাড়াতে সাংবাদিকরা নিজেরাই সহায়ক ভূমিকা পালন করেন । তারা তথ্যের উৎস যাচাই করার কৌশল দেখান এবং ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করেন । সংকটকালে সাংবাদিকতা জাতির বিবেক হিসেবে কাজ করে এবং জনগণের সম্মিলিত কন্ঠস্বর তুলে ধরে । গণমাধ্যম সাক্ষরতা যেমন সাংবাদিকদের উন্নত ও দায়িত্বশীল হতে সাহায্য করে তেমনি সাংবাদিকরাও সাক্ষরতা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন । গণমাধ্যম সাক্ষরতা ও সাংবাদিকতা উভয়ে একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য । কারণ এটি একটি সুস্থ ও সচেতন নাগরিক সমাজ তৈরি করে । 

গণমাধ্যম সাক্ষরতাকে বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে তার সামনে অনেকগুলি চ্যালেঞ্জও এসে দাঁড়ায় । তার মধ্যে হল ভুল তথ্যের বিস্তার অর্থাৎ ভুয়া খবর, প্রোপাগান্ডা এবং ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়াএকটি বড় সমস্যা যা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে । সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম কিভাবে তথ্য ফিল্টার করে এবং ব্যবহারকারীর কাছে উপস্থাপন করে তা বোঝা কঠিন । ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি (cyber harassment), ডিজিটাল সহিংসতা(cyber bulling), অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন (cyber intimidation), অনলাইন ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ সংগঠিত করা (cyber terrorism), অনলাইন ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ (cyber stalking) ইত্যাদির শিকার হওয়া এবং এর প্রতিরোধে অক্ষমতা, প্রযুক্তি ও তথ্যে সবার সমান প্রবেশাধিকার না থাকা যা সাক্ষরতার সুযোগকে সীমিত করে, নতুন নতুন অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল টুলস এর সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য ক্রমাগত শেখার সীমিত সুযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং অনলাইন পরিচিতি (Digital Identity) রক্ষা করা বিষয়ে জ্ঞানের অভাব, শিক্ষক গণমাধ্যম কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রমের অভাব, তথ্যের ভিড়ে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য তা বেছে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, অতিরিক্ত মিডিয়ার ব্যবহার এবং এর নেতিবাচক মানসিক প্রভাব আসক্তি ও ভুল ধারণার সৃষ্টি করে ।

শিক্ষাক্ষেত্রে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে গণমাধ্যম ব্যবহার সম্বন্ধে সচেতন ও অভিজ্ঞ করে তোলা যায় । স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে গণমাধ্যম সাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যেখানে বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন এবং বার্তা তৈরির দক্ষতা শেখানো হবে । শিক্ষকদের গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যাতে তাঁরা শিক্ষার্থীদের কার্যকর ভাবে শেখাতে পারেন । শেখানোর পদ্ধতি ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শিক্ষাদান পদ্ধতি (যেমন দলগত কাজ আলোচনা ইত্যাদি) গ্রহণ করা যেতে পারে । শিক্ষার্থীদের যদি গণমাধ্যম সাক্ষরতা জ্ঞান দেওয়া হয় তাহলে তারা গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা বৃদ্ধি করে তাদের তথ্যসমৃদ্ধ ডিজিটাল সমাজে অংশগ্রহণ করতে সমৃদ্ধ করে এবং নিজস্ব সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করে সচেতন ও সক্রিয় পাঠক ও নির্মাতা (creator) হিসেবে গড়ে তোলে । শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের গণমাধ্যম বার্তা সংবাদ বিজ্ঞাপন সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে শেখাবেন বার্তার উদ্দেশ্য পক্ষপাতিত্ব এবং বার্তা কিভাবে তৈরি হয়েছে তা বুঝতে সাহায্য করবেন এবং স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারিং সিস্টেমের ব্যবহারে উৎসাহিত করবেন । নিজের মিডিয়া পছন্দ নিয়ে চিন্তা করতে এবং স্পন্সর করা বিষয়বস্তু (sponsored content) চিহ্নিত করতে শেখাবেন । গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো স্বচ্ছ করার দাবি জানানো যাতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে সে বিষয়ে শিক্ষা দান করবেন । শিক্ষার্থীদের কেবল ভোক্তা নয় বরং দায়িত্বশীল নির্মাতা হিসেবে গড়ে তোলা যাতে তারা নিজেরাই মানসম্মত মিডিয়া কন্টেন্ট তৈরি করতে পারে । গণমাধ্যম বার্তা থেকে নিজস্ব অর্থ বের করে আনার এবং দায়িত্বশীলভাবে অংশগ্রহণের দক্ষতা বৃদ্ধি করা শেখানোও শিক্ষকের দায়িত্ব ।

গণমাধ্যম সাক্ষরতা শিক্ষার্থীদের শেখায় কিভাবে সংবাদ বিজ্ঞাপন বা সোশ্যাল মিডিয়ার বার্তাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়, তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে হয় এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হয়, যা তাদের ভুল তথ্য থেকে রক্ষা করে । গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা শিক্ষার্থীদের গণমাধ্যম বার্তাগুলোর অন্তর্নিহিত পক্ষপাতিত্ব ও এজেন্ডা বুঝতে সাহায্য করে । তাদের প্রশ্ন করতে এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো বিবেচনা করতে উৎসাহিত করে । সাক্ষরতা শুধু নয় এই শিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে বার্তা তৈরির দক্ষতাও শেখায় । যার ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের চিন্তাভাবনা ও ধারণাগুলো কার্যকর ভাবে প্রকাশ করতে পারে এবং নিজস্ব মিডিয়া সামগ্রী তৈরি করতে পারে (যেমন ভিডিও ব্লগ বডকাস্ট পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন ইত্যাদি) । আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্য অনুসন্ধান, সৃষ্টি, যোগাযোগ এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে । সংবাদপত্র, টেলিভিশন ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি গণমাধ্যম শিক্ষার পরিধি বাড়িয়ে শিক্ষার প্রসারে সহায়তা করতে পারে । বিশেষ করে দূরবর্তী ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষের কাছে জ্ঞান পৌঁছে দিতে এই মাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । গণমাধ্যম সাক্ষরতা শিক্ষার্থীদের সমাজের বিভিন্ন সমস্যা  ও অসংগতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে এবং তাদের ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে । গণমাধ্যম সাক্ষরতা শিক্ষার্থীদের কেবল তথ্যের ভোক্তা নয় বরং তথ্য যাচাইকারী, সমালোচনাকারী এবং সৃজনশীল উৎপাদক হিসেবে প্রস্তুত করে তোলে যা তাদের আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অপরিহার্য ।

শিক্ষাক্ষেত্রে ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতার বিস্তার ঘটালে দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে মানুষ প্রযুক্তি ও প্লাটফর্মের সঙ্গে তাল মেলাতে, নানারকম ডিজিটাল প্রতিবন্ধকতা ও হয়রানি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত  রাখতে পারবে । পাশাপাশি গণমাধ্যম সম্বন্ধে কৌতুহলের ও নিবৃত্তি ঘটবে । সেইহঙ্গে গণমাধ্যমে কাজ করার দক্ষতা দ্রুত আয়ত্বে আসবে ও বিভিন্ন বিষয়কে অত্যাধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করতে পারবে । ফলে ডিজিটাল সমাজে আরও সচেতন, সমালোচনামূলক এবং সক্রিয় নাগরিক হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারবে ।

সহায়ক গ্রন্থ :

১. জার্নালিজমের সহজ পাঠ–কৌশিক ভট্টাচার্য, পারুল প্রকাশনী, আগরতলা ।
২. সংবাদ সাংবাদিক সাংবাদিকতা–সুজিত রায়, দে পাবলিকেশন, কলকাতা 
৩. সংবাদ ও সাংবাদিকতা–অনুপম অধিকারী, পাত্র বুক হাউজ, কলকাতা 
৪. সাংবাদিকতা ও সংবাদ পাঠ–সন্তোষ দেবনাথ, দীপ প্রকাশন, কলকাতা 
৫. গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা সহজপাঠ–শুভ কর্মকার, পিআইবি, বাংলাদেশ 
     ৬.  ইন্টারনেট থেকে নেওয়া তথ্য

চাকলা রোশনাবাদ ও পরগনা বামুটিয়ার অতীত ইতিহাস : ক্ষীণ অবলোকন

চাকলা রোশনাবাদ ও পরগনা বামুটিয়ার অতীত ইতিহাস : ক্ষীণ অবলোকন

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আমরা বর্তমানে যে ত্রিপুরারাজ্যকে দেখি, একসময় এর বিস্তৃতি আরও বিশাল ছিল । বর্তমান ত্রিপুরারাজ্যের (পূর্বতন পার্বত্য ত্রিপুরা বা স্বাধীন ত্রিপুরা) পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের অভ্যন্তরে প্রায় ৬০০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে এ অঞ্চল ছিল 'চাকলা রোশনাবাদ' নামে পরিচিত । প্রাচীনকালের এই বিস্তীর্ণ সমভূমি ত্রিপুরার রাজাদের জমিদারির অধীনে ছিল । 'সমতল ত্রিপুরা' বা 'জিলা ত্রিপুরা' ছিল এই অঞ্চলের তখনকার নাম । মুঘল সম্রাট মোহাম্মদ শাহর আমলে ১১৪২ ত্রিপুরাব্দে (১৭৩২ খ্রি.) মহারাজা ছত্রমানিক্যের (১৬৬১-১৬৬৬) প্রপৌত্র জগতরাম ঠাকুর বলদাখালের জমিদার আকা সাদেকের সহায়তায় ঢাকা নেজারত এর সুবিখ্যাত দেওয়ান মীর হাবিবের সাথে মিলিত হন । মীর হাবিব এই সময়টার  গুরুত্ব বিবেচনা করে সুযোগ গ্রহণের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রভু বাংলার নবাব সুজাউদ্দিনের (১৭২৭-১৭৩৯ খ্রি.) অনুমতি নিয়ে বিরাটসংখ্যক সৈন্যসহ জগতরাম ঠাকুরের সাহায্যের জন্য ত্রিপুরায় এসে হাজির হন । কুমিল্লার সন্নিকটস্থ স্থানে ত্রিপুরা সৈন্যদলের সাথে তাদের যুদ্ধ হয় । যুদ্ধে দ্বিতীয় ধর্মমানিক্য পরাজিত হন । আর মীর হাবিব জগতরামকে 'জগতমানিক্য' আখ্যা দিয়ে ত্রিপুরার রাজা বলে ঘোষণা করেন । এসময় নবাব সুজাউদ্দিন ত্রিপুরার এই সমতলভূমিকে 'চাকলা রোশনাবাদ' নাম দেন । রোশনাবাদ মানে 'আলোর ভূমি' । মুঘলদের অধিকৃত পূর্বপ্রান্তের ভূমি যেখানে প্রথম সূর্যের আলো এসে পড়ে । কৈলাস চন্দ্র সিংহের মতে বার্ষিক ৯২ হাজার ৯৯৩ টাকা নির্দিষ্ট করের বিনিময়ে জগতরাম এই সমতল ক্ষেত্রে ইজারা নেন । কিন্তু আর একটি গ্রন্থে অন্য তথ্য পাই, 'The Manikya kings of Tippera held the Chakla Roshnabad as zamindar under the Mughals paying an annual revenue of rupees 40,000 to the imperial treasury'.¹ এই অঞ্চলে মুঘলদের ফৌজদার নিযুক্ত হন আকা সাদেক । এভাবেই সমতট অর্থাৎ সিলেট, কুমিল্লা ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নোয়াখালির কিয়দংশ নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলটি 'চাকলা রোশনাবাদ' বা 'রোশনাবাদ' নামে মোগলদের হস্তগত হয় এবং ত্রিপুরার রাজারা এই অঞ্চলের জমিদারি পান । এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চাকলা রোশনাবাদ প্রথমে ২৪টিপরগনায় বিভক্ত ছিল । দাউদপুর পরগনা তার মধ্যে অন্যতম । কিছুদিন পরে দাউদপুরের মুসলমান জমিদারগণ তাদের রোশনাবাদ থেকে খারিজ করে নেন । সুতরাং মীর হাবিবের ত্রিপুরা বিজয়ের পর ত্রিপুরেশ্বর ২৩টি পরগনা মাত্র জমিদারী স্বরূপ পেয়েছিলেন । ক্রমে রোশনাবাদ ৫৩ টি পরগনায় বিভক্ত হয় । প্রধানত রাজপরিবারের 'জুলাই' দ্বারা এবং ত্রিপুরেশ্বরের প্রাচীন কর্মচারীগণ কর্তৃক ( স্ব স্ব  নাম চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য ) এক একটি বৃহৎ পরগনার কিয়দংশ (স্বয়ং তালুকস্বরূপ নিয়ে স্ব স্ব নামে ) ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এক একটি পরগনা সৃষ্টি করেছিলেন । যুবরাজ চম্পক রায় মহারাজ রত্নমানিক্যের সময় নুরনগরের শাসনকর্তা নিযুক্ত ছিলেন । তিনি নূরনগরের কিয়দংশ দ্বারা চম্পকনগর সৃষ্টি করেন । মহারাজ কৃষ্ণমানিকের উজির জয়দেব নুরনগরের কিয়দংশ দ্বারা জয়দেবনগর নামক পরগনার সৃষ্টি করেছিলেন । প্রকৃতপক্ষে রোশনবাদের মধ্যে নুরনগর, মেহেরকুল, বগাসাইর, তিষ্ণা ও খন্ডল এই পাঁচটি মৌল বৃহৎ পরগনা ছিল । এই পাঁচটিসহ মীর হাবিবের সময় ২৪টি পরগনা গণনা করা হয় । এই চব্বিশটি থেকে দাউদপুর খারিজ হয়ে ২৩টি ছিল । ১৮৬১ থেকে ৬৪ খ্রিস্টাব্দের রেভিনিউ সার্ভেকালে রোশনাবাদের মধ্যে ৫৩টি পরগনা পাওয়া গেছে । সেগুলি ত্রিপুরার রাজাদের নিয়োজিত ব্যক্তিরা তাদের জমিদারিতে সহায়তা করতেন । Tripura Gazetteer থেকে জানা যায় যে,
'The economic background of the Tippera state was the Roshnabad estate, the revenue of which sustained the administrative and cultural reforms of Manikya rulers.'
'Chakla Roshnabad continued to be the richest state in the possession of the Manikya kings. Its revenues maintain the Tripura state administration till the merger with the Indian union.² অর্থাৎ চাকলা রোশনাবাদ পরগণার আয়ই তদানিন্তন ত্রিপুরার রাজাদের অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে শক্ত করে রাখত এবং এর আয় থেকে মানিক্যরাজসরকারের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনে সহায়তা করত ।

চাকলা রোশনাবাদ পররগনার মধ্যে বামুটিয়া বিশেষ পরিচিত । ১৮৬১-৬৪ সালে সার্ভেকৃত পরগনার তালিকায় বামুটিয়া পরগনার নাম পাওয়া যায় ।১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণমানিক্য (১৭৬০-১৭৮৩) উদয়পুর থেকে রাজধানী স্থানান্তর করেন আগরতলায় অর্থাৎ বর্তমান পুরাতন আগরতলায় । সম্ভবত সেই সময়ই উজির জয়দেব মানিক্যের মতো অন্য কোন উজির এই বামুটিয়া পরগনার সৃষ্টি করেন ।

 বামুটিয়ার পূর্ব নাম ছিল লক্ষ্মীপুর । এই সমতল শস্যক্ষেত্র প্রতিবছর লোহর নদীর সঙ্গে আসা পলি মাটিতে পুষ্ট । ফলে যুগ যুগ ধরে এখানকার নদীতীরবর্তী অঞ্চল বেশ উর্বর । প্রাচীন জনশ্রুতি, এই ভূমি স্বয়ং মা লক্ষ্মীর বরদান প্রাপ্ত । সংবৎসর ভরপুর ফসলের কারণে এই স্থানের নাম হয়েছে লক্ষ্মীপুর । "বামুটিয়া নামের সৃষ্টির সঙ্গে একটি লোকশ্রুতি জড়িত রয়েছে । মহারাজা কৃষ্ণ মানিক্য একদিন এই অঞ্চলে লোহর নদীর তীরের অবস্থিত আমলকীবনে হরিণ শিকার করতে এসে স্থানীয় জনসাধারণের সাক্ষাৎ প্রার্থনা করলেন । রাজার আমন্ত্রণে আগ্রহান্বিত হয়ে সকল গ্রামবাসী রাজার সঙ্গে দেখা করতে এলেন । তখন রাজা কথাপ্রসঙ্গে তাদের পেশার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেন । তারা নিজেদের চাষাভুষো বা 'মুইট্যা' শ্রেণির বলে পরিচয় দেন । রাজা আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলে উঠেন, 'বা,  মুইট্যা' । রাজার শব্দটি খুব পছন্দ হয় এবং তিনি তখনই এই অঞ্চলটির নাম দেন বামুইট্যা>বামুটিয়া । সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলটিকে একটি পরগনায় পরিণত করে গড়ে তোলার জন্য তাঁর কর্মচারীদের নির্দেশ দেন । তাঁর নির্দেশে গড়ে ওঠে তহশীল কাছারি, নায়েবের আদালত, ডাকঘর, হাটবাজার, স্কুল, বনদপ্তরের অফিস ইত্যাদি । সিমনা থেকে খোয়াই সীমান্ত হয়ে বড়কাঁঠাল, অভিরাম, গামছাকোবরা, দেবেন্দ্রনগর, জমিরঘাট, গজলঘাট, ছেচুুরিয়া, হরিনাখলা, তারানগর, সিধাই, কালাছড়া, কলকলিয়া, তালতলা, বেড়িমুড়া, ভোগজুড়, তেবাড়িয়া, জলিলপুর, মুকুন্দপুর ইত্যাদি বিশাল এলাকার গ্রামসমূহ নিয়ে সৃষ্টি হয় বামুটিয়া পরগনার । প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী বামুটিয়া বাজারে এখনো দুর্গা/কালী মন্ডপ রয়েছে । কথিত আছে ১৯০২ সালে মহারাজা রাধাকিশোর মানিক্যের আমলে এখানে প্রথম ঘটস্থাপন করে দুর্গাপূজা শুরু হয় । কারণ সেসময় রাজার তালুকে প্রতিমা দিয়ে দুর্গাপূজায় নিষেধাজ্ঞা ছিল । পরে রাজা বীরবিক্রমকিশোর মানিক্যের অনুমতিক্রমে ১৯৩২ সাল থেকে ঘটপূজার পরিবর্তে  মূর্তিপূজার প্রচলন ঘটে ।" (উদ্ধৃত অংশটি তথ্যস্বরূপ সরবরাহ করে প্রাবন্ধিককে সমৃদ্ধ করেছেন ও কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন দীর্ঘদিনের বামুটিয়াবাসী ও এলাকার শুভাকাঙ্ক্ষী বিশিষ্ট লেখক অশোককুমার দেব) ।

বামুটিয়া কেবল অর্থনৈতিক কেন্দ্র নয় বরং সামাজিক মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসবের স্থান  । সমকালীন গ্রন্থের মধ্যে হান্টারের Statistical  Accounts of Bengal গ্রন্থে তিনি লিখেছেন 'Bamutia is one of the noted markets in the porganas of Roshnabad.  It is chiefly resorted to buy the cultivators for the sale of paddy, salt, fish and molasses. The crowd is large and the fair becomes in occasion of much social gathering.'³  বামুটিয়া পরগনা সম্বন্ধে দীনেশচন্দ্র সেনের Collected Notes on the Ballads of Mymensingh এ পাই, 'Among the Marts of Roshnabad, the fair of Bamutia is renowned.  It is not only a Mart but a festival ground, where songs are sung, plays are acted and disputes are settled.'⁴  অর্থাৎ তদানীন্তন চাকলা রোশনাবাদের বামুটিয়া পরগনা বাজারটি ছিল খুবই বিখ্যাত । এটা শুধু বাজার নয় তখনকার সময়ে একটি উৎসবের স্থান ছিল । এখানে সংগীত ও নাট্যাঅভিনয় এমনকি, সামাজিক ঝগড়াঝাঁটির মীমাংসাও হত । কৈলাসচন্দ্র সিংহ তাঁর Tripura Rajmala গ্রন্থে লিখেছেন, 'Bamutiya pargana... has always been a fertile tract. The markets here are frequented by both the local cultivators and traders from the hilly tract of Tripura'.
'The trade route connecting Tripura hill to the Plains past through Bamutia, making it an essential market town for exchange of hill produce and plain grains'.⁵ বামুটিয়া পরগনার প্রধান উৎপন্ন ফসল ছিল ধান আর পাট সরিষার তিল,গুড় ইত্যাদি । লোহর নদীপথ ধরে পণ্য আদান-প্রদান চলত । বামুটিয়ায় লোহর নদীর তীরে একসময় বিড়ির পাতার সমৃদ্ধ বাজার ছিল । ত্রিপুরার পার্বত্য অঞ্চল থেকে বিড়ির পাতা সংগ্রহ করে এই বাজারে নিয়ে আসা হত । ভাটি অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা এখানে এসে বিড়ির পাতা সংগ্রহ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে যেতেন । এখন আর সেই ব্যবসা নেই । শুধু এখানকার জঙ্গলমহলে পাতাবাজার নামে একটি স্থান তার সাক্ষ্য বহন করছে । সেকালের লোহর নদী অত্যন্ত খরস্রোতা ছিল । বর্ষাকালে নদীতে উত্তাল তরঙ্গস্রোত প্রবাহিত হত । সম্ভবত 'লহর' অর্থাৎ ঢেউ শব্দটি থেকেই লোহর শব্দের উৎপত্তি । একটি তথ্যে জানা যায়, সেকালে বামুটিয়া পরগনার বার্ষিক রাজস্ব আয় ছিল নব্বই হাজার টাকা থেকে এক লাখ দশ হাজার টাকা পর্যন্ত । রাজস্বের দিক থেকে এটি দ্বিতীয়স্থানে ছিল । রাজস্ব আয়ের প্রথমস্থানে ছিল ফেনী । ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকেও অধিক । বামুটিয়ার সাপ্তাহিক হাট জমজমাট থাকত । হাটে কৃষক, বণিক, শিল্পী ও জাতি-জনজাতির মিলন মেলা বসে যেত । জনজাতি অংশের মানুষেরা পাহাড় থেকে বাঁশ, বেত ও ফলমূল নিয়ে আসতেন । বাইরের ব্যবসায়ীরা লবণ ও শুকনো মাছ আনতেন । স্থানীয় তাঁতিরা বাজারে তুলতেন তাঁতের কাপড় ।রাজস্ব ও হাট উভয়দিকেই বামুটিয়া প্রসিদ্ধ ছিল ।

কৈলাস চন্দ্র সিংহের রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস গ্রন্থে বামুটিয়া পরগনার বর্ণনা রয়েছে নিম্নরূপ:
পরগণা : বামুটিয়া
ভূমির পরিমান :
একর-৭৮০ রুড-২ পোল-১৩
স্মার্ট লিখিত পরিমান :
একর-৭৮০ ডিসিমেল-৩৩

বামুটিয়া জনপদ এখন মিশ্র বসতিপূর্ণ এলাকা । বাঙালি, মনিপুরি ও সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষ এখানে পাশাপাশি বাস করছেন । বাঙালিরা বহু প্রাচীনকাল থেকে এখানে আছেন । মনিপুরিরা রাজআমলে পুনর্বাসন পেয়ে এখানে আছেন । সাঁওতালরা চাবাগানে কর্মী হিসাবে গত শতাব্দীর শুরুর দিকে এখানে এসে বংশপরম্পরাক্রমে বসবাস করছেন । বাংলাদেশের মেঘনা তিতাস নদীবিধৌত সমৃদ্ধ জনপদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রাচীন নূরনগর ও বলদাখাল পরগনার পূর্বদিকে এই বামুটিয়া পরগনা । যেহেতু ব্রাহ্মণবাড়িয়া অতি প্রাচীনকাল থেকেই শিল্পসাহিত্যসংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ ছিল । আজ থেকে একশো তেত্রিশ বছর আগে ১৩০০ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনমাসে (১৮৯৩ খ্রি.) ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে প্রকাশিত হয়েছিল 'ঊষা'  নামে একটি সাময়িকপত্র । সেই ঐতিহ্য অনুসরণ করে একসময় এই জনপদেও তার ছোঁয়া লেগেছিল । একসময় নানা দিক দিয়ে যে উন্নত ছিল এই জনপদ । তার ধারা বর্তমানেও বহমান । আজও  বামুটিয়ার সাহিত্যসংস্কৃতিপ্রাণ মানুষেরা নিজস্ব উদ্যোগে প্রতিবছর পুজোর সময় সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করেন জঙ্গলমহলে । বেশ কটি সাহিত্যপত্র ও বের হয় এখান থেকে । ১৯৪৯ সালের ত্রিপুরা রাজ্যের ভারতভুক্তির পর এই বামুটিয়াও ত্রিপুরার অন্তর্ভুক্ত হয় । ১৯৫২ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে বামুটিয়া সীমান্তে যুদ্ধ হয় । এই যুদ্ধটি 'লক্ষ্মীপুর যুদ্ধ' নামে পরিচিত । সেসময় প্রাচীন বামুটিয়া গ্রামের বিরাট অংশ পাকিস্তান দখল করে নেয়, যা আজও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি । সেই থেকেই বামুটিয়াবাসীর কপালে দুঃখ শুরু হয় । এই জনপদ একসময় উপহার দিয়েছে ত্রিপুরা রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ ও প্রথম জোট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল দাসকে । কিন্তু পরবর্তীকালে প্রশাসনের অনীহা ও যথাযথ দৃষ্টিদানের সদিচ্ছার অভাবে  আজ বামুটিয়া তার পুরনো গৌরব হারিয়ে কেরোসিন কুপির আলোর মত টিমটিম করে জ্বলছে । একে একে অধিকাংশ সরকারি কার্যালয় এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । এক সময় 'বামুটিয়া বাঁচাও কমিটি' তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তুলেও ব্যর্থকাম হয়েছে । অতীতের বর্ধিষ্ণু পরগনা বামুটিয়া আজ শুধু ইতিহাসের বিষন্নবাহক ।


সহায়ক তথ্য :
1. J. W. Edgar : Bengal District Gazetteer : Sylhet 1872
2. S N Guha, Economic History of Tripura p. 62
3. Hunter, W W : A Statistical Accounts of Bengal
4. Dinesh Chandra Sen : Collected Notes on Ballads of Mymensingh p. 45, C U Press 1923
5. Kailash Chandra Shingh : Tripura Rajmala, Bamutiya reference, Tripurar Itihas pp 102-103
6. কৈলাসচন্দ্র সিংহ, রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস

ইতিহাসের ঘাট : আমলিঘাট ও মনুঘাট

ইতিহাসের ঘাট : আমলিঘাট ও মনুঘাট

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

গতবছর দ্বিতীয় আমলীঘাট ফেনী ভিউ কবিতা উৎসব ২০২৫ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা 'মেরুকুম'-এ আমি আমলিঘাট সম্বন্ধে একটা চিত্র তুলে ধরেছিলাম । এবারে এই প্রসঙ্গেই একটি অন্য বিষয়ের অবতারণা করছি ।

ফেনী নদীপ্রবাহের ভারত ভূখণ্ডের শেষ প্রান্তিক জনপদ আমলিঘাট সাবরুম মহকুমার প্রত্যন্ত গ্রাম । একসময় আমলিঘাট বর্ধিষ্ণু জনপদ ছিল । ত্রিপুরার প্রায় প্রতিটি নদীপ্রবাহের সীমান্ত অঞ্চলে রাজআমলে গড়ে উঠেছিল বনকর ঘাট । ফেনীনদীর ঘাটের ইজারার সুবাদে আমলিঘাটে গড়ে উঠেছিল ফেনীঘাট নামে বনকর ঘাট । আর তাকে কেন্দ্র করে তহশীল অফিস ও বনদপ্তরের অফিস । ১৮৮৮ সালের আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ ও ত্রিপুরার যৌথ সরকারের তরফে একজন অফিসার এই ঘাটের তদারকি করতেন । বনজ সম্পদ আহরণের উপর ত্রিপুরার রাজা ও ব্রিটিশ সরকার ১০ আনা : ৬ আনা হারে কর আদায় করতেন । ১৮৭১ সালে ফেনীঘাটের ইজারা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব ২০০০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১২০০০ টাকা হয়েছিল ।

 রিয়াং ও চাকমা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা প্রাচীনকালে 'কোন্দা' এবং 'লং' নামে বিশেষ ধরনের নৌকা দিয়ে ফেনী, মনু ও গোমতী দিয়ে সমতল ত্রিপুরায় পণ্য পাঠাতেন । এই নৌকাগুলোর বৈশিষ্ট্য হল এগুলো এক কাঠের তৈরি । অর্থাৎ বিশাল বেড়সম্পন্ন বড়ো গাছকে কেটে সাইজ মত করে তার অভ্যন্তরে ছেনি বাটালি দিয়ে খোদাই করে নৌকার খোল তৈরি করা হত । ফলে এই জাতীয় নৌকায় কোন জোড়া ছিল না । মোটা গাছ কুঁদে এই নৌকা তৈরি করা হত বলে এইজাতীয় নৌকার নাম 'কোন্দা'  । অত্যন্ত টেকসই কাঠ দিয়ে এই নৌকা তৈরি হত ।

 অতীতকালে ত্রিপুরার এই অঞ্চলের অরণ্যে বিশাল আকৃতির শাল, সেগুন গর্জন, করই, গামাই, চামল ইত্যাদি মূল্যবান গাছ পাওয়া যেত । এই গাছের কাঠ দিয়ে নৌকা ও অন্যান্য মূল্যবান গৃহসামগ্রী বানানো হত । অনেক বাড়িও নির্মাণ হত বনের এই মূল্যবান গাছ দিয়ে । রাজন্য আমলে আমলিঘাটে বনবিভাগের যে ডাকবাংলাটি ছিল তাও সম্পূর্ণ দামি কাঠের খুঁটি ও কাঠামোর উপর তৈরি করা হয়েছিল । বাংলোটির গড়ন অনেকটা জনজাতিদের টংঘরের মতো ছিল । মোটা মোটা মূল্যবান গাছ দিয়ে ঘরের খুঁটি তৈরি করা হয়েছিল । কাঠের মাচার উপর ঘরটি প্রায় দোতলা সমান উঁচু ছিল । গত শতাব্দীর সাতের দশক পর্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় এই ডাকবাংলাটি দৃশ্যমান ছিল । 

ফেনীনদীর পাড়ে আমলিঘাট বাজারের পাশেই এই ফরেস্ট বাংলোটি ছিল রাজপুরুষদের আশ্রয়স্থল । রাজন্য আমলাদের ঘাট বলেই হয়তো এই ঘাটের নাম হয়েছে 'আমলিঘাট' । রাজধানী আগরতলা থেকে আখাউড়া রেলস্টেশনে পৌঁছে, ট্রেনে চড়ে মুহুরীগঞ্জে এসে নামতেন তাঁরা । সেখান থেকে আমলিঘাট । এই একই পথে সেকালে আগরতলা থেকে সরকারি ডাকব্যবস্থাও পরিচালিত হত । আমলিঘাট পর্যন্ত আসার পর ডাক হরকরার মাধ্যমে তা মনুঘাট হয়ে সাব্রুম শহরে পৌঁছাত । সেখানে থেকে সাবরুম, বিষ্ণুপুর, শিলাছড়ি পর্যন্ত বেশ কয়েকজন ডাক হরকরা ছিলেন একজন ডাক হরকরার নাম ছিল প্রকাশ বিশ্বাস । তিনি রাজন্য আমল থেকে ডাক হরকরার দায়িত্বে ছিলেন । গত শতাব্দীর আটের দশক থেকে তাঁর ছেলে নিতাই বিশ্বাস এই দায়িত্ব পালন করে ।  রাজন্য আমলে একবার ডাকাতদল আমলিঘাট-মনুঘাট পথে ডাক হরকরাকে কেটে ফেলে ডাকের ব্যাগ চুরি করে নিয়ে যায় । এই ডাকাতদলের সর্দার ছিলেন ছোটখিলে বসবাসকারী প্রাচীন বাঙালি এক নামকরা পরিবারের সন্তান । ডাকাতির পর ডাকাতদলের নামে রাজার হুলিয়া বেরুলে দলের সর্দার বর্মায় পালিয়ে যান । ভারতভুক্তির পর তিনি ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন । তাঁর এক সন্তান এখনও বর্তমান আছেন । পরিবারে মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রেখে সেই ডাকাতসর্দারের নামোল্লেখ থেকে বিরত থাকলাম ।

আমলিঘাটে রাজন্য আমলের শেষ দিকে ফরেস্ট গার্ড ছিলেন সতীশ শীল । তাঁকে সতীশগার্ড নামেই সবাই চিনত । তিনি এলাকার প্রতাপশালী ব্যক্তি ছিলেন । তাঁর ছেলে হীরালাল শীলশর্মা আগরতলাস্থিত বি এড কলেজের অধ্যাপক ছিলেন । আমলিঘাটের পুরনো পোস্টমাস্টার ছিলেন শশাঙ্ক চৌধুরী । তাঁর পূর্বপুরুষরা একসময় এই এলাকার জমিদার ছিলেন । এই গ্রামেরই আর একজন মেধাবী সন্তান হারাধন মল্ল আগরতলাসহ ত্রিপূরার বিভিন্ন মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন । অল্প কিছুদিন আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন ।

সেকালে আমলিঘাট বাঁশ ও ছনের কারবারের জন্য বিখ্যাত ছিল । স্বাধীনতার পর ওপার থেকে উঠে আসা অনেক ছিন্নমূল মানুষের সেদিনের বেঁচে থাকার একমাত্র মাধ্যম ছিল বাঁশব্যবসা । এই বাঁশব্যবসায় ফেনীনদী সন্নিহিত দুপারের মানুষই জড়িত ছিল ।

১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে সংযুক্তির পর থেকে ত্রিপুরারাজ্যের সর্ব দক্ষিণের শহর সাব্রুম এখন মহকুমা শহর ও এই অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র । কিন্তু অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, সাব্রুম মহকুমার যে জনপদটি আজকের নাগরিক রূপ নিতে পারত সেটি আজও রহস্যের অবগুন্ঠনে নিজেকে ঢেকে রেখে নীরবে সাব্রুম শহর সৃষ্টিতে লালন করে চলেছে । তার নাম ছোটখিল । শহর থেকে পশ্চিম দিকে ৬–৭ কিলোমিটার দূরে বর্ধিষ্ণু গ্রাম এটি । একসময় এই জনপদ ছিল কর্মচঞ্চল, ব্যস্ততায় ঘেরা । রাজন্যআমলে ছোটখিল ছিল 'গেট ওয়ে টু চিটাগাং হিল ট্র্যাক্ট' ।

সে আমলে রাজপুরুষরা আখাউড়া থেকে ট্রেনে চড়ে তদানিন্তন চাকলা রোশনাবাদের নোয়াখালির মুহুরিগঞ্জ স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে, হাতির পিঠে চড়ে, কিংবা নৌকাযোগে ছয় মাইল পূর্বে আমলিঘাটে পৌঁছে নিজেদের রাজত্বে পা রাখতেন । তারপর সেখান থেকে ফেনীনদীর উজান ধরে অনেকটা এগিয়ে রমেন্দ্রনগরের শেষপ্রান্তে ফেনী-মনুর সঙ্গমস্থল থেকে অভ্যন্তর দিকে আসতেন । সঙ্গমস্থল থেকে মনুনদীর উজান বেয়ে কিছুটা এগোলে একটা জায়গার নাম মনুঘাট । মনুনদীর তীরবর্তী ঘাট । তাই মনুঘাট । এখানে রাজন্যআমল থেকে বনদপ্তরের একটি বিট অফিস ছিল । এই মনুনদী বেয়ে উজান থেকে আসত বাঁশ, ছন, কাঠ, বেত ইত্যাদি বনজ সম্পদ ও ধান, তিল, তিসি, পাট, সরিষা, কার্পাস ইত্যাদি নানারকম কৃষি সামগ্রী । বনজসম্পদগুলি ভাটি অঞ্চলে পরিবহন করে নেওয়ার জন্য এখান থেকে বনদপ্তরের অনুমতিপত্র বা 'উজান টুকা' নেওয়া হত । ফলে এই পণ্য রপ্তানি ও পরিবহনকে কেন্দ্র করে এখানে একটা ছোটো বাজারের মতো গড়ে ওঠে । এই বাজারের নাম মনুঘাট বাজার । 

এই বাজারে ক্রেতাবিক্রেতা আসাযাওয়ার জন্য নদীতে নৌকার ব্যবস্থা থাকত । রাজআমলে রাজার নিয়োজিত কর্মচারী মাঝির দায়িত্বে থাকতেন । জনসাধারণ, সরকারি কর্মী ও রাজপুরুষদের পারাপারের জন্য । ভারতভুক্তির পর এই নৌকাঘাটটি নিলাম ডাকের মাধ্যমে কেউ নৌ পরিবহনের দায়িত্ব নিতেন । রাজন্য আমলের শেষ দিকে ফেনীনদী ও মনুনদীর এই অঞ্চলের জন্য দুজন দক্ষ মাঝি ছিলেন । তাঁদের নাম নগেন্দ্র মাঝি ও বেনু মাঝি । রাজার নৌকা চালনা করার দায়িত্ব প্রাপ্তির কারণে তাঁরা নিজেদের গর্বিত অনুভব করতেন । রাজার শাসন শেষ হওয়ার পরও অনেকদিন তারা নিলাম ডাকের মাধ্যমে এই ঘাটের ইজারা নিয়ে রোজগারের পথ বেছে নেন । পরবর্তীকালে মনুনদীর উপর সেতু হয়ে গেলে ইজারা প্রথা উঠে যায় । 

এই মনুঘাটের উপর দিয়ে একসময় সারাবছর নানা বনজ সম্পদ পরিবহন করা হত । উজান থেকে মনুনদীপথে বনজ পণ্য এনে ফেনীনদীতে নিয়ে তারপর ভাটির দিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হত । বাঁশ সরবরাহকারী শ্রমিকদের মনুঘাট বাজারবার শনি ও মঙ্গলবারে মহাজনরা বেতন প্রদান করতেন । সে কারণেই এই দুদিন মনুঘাট বাজার খুব জমজমাট থাকত । এখন আর সেই বাঁশ ও বনজ সম্পদের কারবার নেই । সেই কর্মীরাও নেই । এখন মনুঘাট বাজার আগের চেয়ে অনেক জমজমাট হয়েছে । পরিবহনব্যবস্থা ভালো হয়েছে । বাজারসংলগ্ন স্থানে একটা গাড়ির স্ট্যান্ডও রয়েছে । আধুনিকতার ছোঁয়া সর্বত্র । নৌকাঘাট না থাকলেও মনুঘাট নামটি আজ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে ।

প্রত্নকথার পুনরুচ্চারণ

প্রত্নকথার পুনরুচ্চারণ

 ফেলে আসা আঁধারকালের উদ্ধৃতির নাম ইতিহাস । এক একটা নির্জন প্রকোষ্ঠ পেরিয়ে পৃথিবী তার ইতিহাস লেখে । সেই ইতিহাসের অবিনশ্বর আলপনার নাম ঐতিহ্য । প্রবাহমান প্রজন্মের উত্তরপুরুষ মাটির প্রদীপ নিয়ে ঐতিহ্য খোঁজে ।  আপ্রাণ খুঁজে ফেরে পাহাড়ের চূড়ায়, বনভূমির নির্জনে, নদীর উজানজোয়ারে, নিঃস্ব ও ক্লান্ত শস্যখেতে আর গেরস্তের উতলপৈঠায় । আলপনার আয়ুরেখায় ফুটে ওঠে সুরচিত মঙ্গলকাব্যের ভাসানগান । অতিক্রান্ত জীবনের চারুছন্দের ধ্বনি কিংবা লৌকিকপ্রণয়কথার বেহাগসুর । সে গানের চারণিক সুরে একদল পাগল হয় । তাদের বুকের পরিভাষা কবিতা হয়ে ওঠে । সময়ের তালুপৃষ্ঠায় উঠে আসে অতীতের নৈসর্গিক ঘ্রাণ । বেজে ওঠে অরণ্যমাদল । অবহেলার রক্তক্ষরণে পান্ডুর হয়ে যাওয়া সময়কে ভরিয়ে দিতে চায়  স্বরবৃন্দের সৃজনে ও শুশ্রূষায় । যান্ত্রিক বাস্তবতা আর ধাতব সম্পর্কে কংক্রিট রাস্তা পেরিয়ে এই উত্তরবাউলেরা পা রাখে অরণ্যদীর্ণ মেঠোপথে । এইসব অতিজীবিত মানুষেরা শীতরাতের সিক্তশিশির মাড়িয়ে ভোরের রাঙাপথ বেয়ে এই মেরুকুমে আসে । তাদের সন্ধানী রক্ত কণিকায় নির্মাণ হয় আলোকিত প্রত্নভূমির শৌর্যসড়ক ।

উচ্চকন্ঠ দোহারগণের সম্মিলিত শ্রমকোরাসে প্রতি ঋতুচক্রে জেগে ওঠে সীমান্তঘেঁষা এই সৃজনপাহাড়ের স্পন্দন আর মায়াবি তরঙ্গের আড়ালে শুয়ে থাকা  বিভাজনবিষণ্ন নদীটির গহিনতন্ত্রী । তাদের সন্ততিদের জন্যে এই সম্মিলিত সামগীত । 'মেরুকুম' সৃজনকল্পে একদল অমৃতাভিলাষী পরিব্রাজকের স্বপ্ন ও শব্দশিল্প বেড়ে ওঠে  ইতিহাসের নির্মম ক্ষতরেখার কূটকৌশলের বিপরীতে। বহুধারার বিশুদ্ধ সৃজনবিস্তার আরও আরও বহুকাল এখানে শব্দশিল্পের উজ্জ্বল উদ্যান নির্মাণ হোক । ইতিকথার অরণ্যে লেখা হোক প্রাণের আখ্যান । ব্যর্থতা যেমন অগ্রবর্তী পদাতিকের দায় তেমনি সমূহ সফলতাই সকল আশার সুরক্ষাকবচ ।


                                           বিনীত
                            অশোকানন্দ রায়বর্ধন
                  মেরুকুম সম্পাদকমন্ডলীর পক্ষে
৩য় আমলিঘাট ফেনীভিউ কবিতা উৎসব ২০২৬