Monday, February 16, 2026

শিক্ষাক্ষেত্রে ও সাংবাদিকতায় গণমাধ্যম সাক্ষরতা

শিক্ষাক্ষেত্রে ও সাংবাদিকতায় গণমাধ্যম সাক্ষরতা 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

বাংলা মাধ্যম শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ মিডিয়াম (medium) । গণমাধ্যম শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ মাস মিডিয়া (mass media) ।  অধিকাংশ ক্ষেত্রে বর্তমানে  গণমাধ্যম বোঝাতে মাস মিডিয়ার (mass media) পরিবর্তে মিডিয়া (media) শব্দটি ব্যবহার করা হয় । গণমাধ্যমের আধুনিক ক্রমোন্নয়নের ফলে এখন তথ্য আমাদের মুঠোবন্দী । বিশেষ করে প্রযুক্তিক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবস্থা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংযুক্তির ফলে শিল্পক্ষেত্রে চতুর্থ বিপ্লব ঘটে গেছে । এখন প্রযুক্তি যার সংবাদমাধ্যম তার ।  ইন্টারনেট প্রযুক্তি তথ্যের ক্ষেত্রে মানুষের প্রবেশযোগ্যতা (access) অনেক গুণ বেড়ে গেছে । তথ্যে প্রবেশযোগ্যতার সঙ্গে সঙ্গে বার্তা তৈরির ক্ষেত্রেও মানুষ নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে । ফলে নির্ভরযোগ্য বার তার পাশাপাশি অনির্ভর বা ভুয়া বার্তাও ছড়িয়ে পড়ছে । এছাড়া গণমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ ও নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তথ্যের সম্প্রচারে প্রভাব বিস্তার করছে । যার কারনে সঠিক তথ্য যাচাই-বাছাই করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে । প্রতিদিন গণমাধ্যমের কারিগরি কুশলতা বেড়েই চলেছে ।  তার সাথে পাল্লা দিতে গেলে গণমাধ্যম কর্মীকেও কুশলতা অর্জন করতে হবে । এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলকে এবং জনসাধারণকে সক্রিয় করে তোলার লক্ষ্যে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতার প্রয়োজন ।

গণমাধ্যম সাক্ষরতা (Media Literacy) হল বিভিন্ন গণমাধ্যমের বার্তা প্রবেশগম্যতা (access), বিশ্লেষণ (analysis), মূল্যায়ন (evauation) ও সৃজন (creation) এর মাধ্যমে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার একটি দক্ষতা, যা কেবল পঠন-পাঠনের বাইরে গিয়ে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়ার প্রভাব, উদ্দেশ্য ও কাঠামো বোঝার মাধ্যমে ডিজিটাল সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে সাহায্য করে । এর মূল লক্ষ্য হল ভুল তথ্য সনাক্তকরণ এবং দায়িত্বশীলভাবে মিডিয়া ব্যবহার ও তৈরি করতে পারা । এটি প্রচলিত সাক্ষরতার ধারণাকে প্রসারিত করে, যেখানে কেবল পাঠ ও লেখার ক্ষমতা নয় বরং বিভিন্ন ফরমেট এর (টেক্সট, অডিও ভিস্যুয়াল) বার্তা বোঝা ও তৈরি করার ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত । গণমাধ্যম কিভাবে কাজ করে এর অন্তর্নিহিত বার্তা কি এবং কিভাবে পক্ষপাতগ্রস্থ ও ভুল তথ্য প্রচার করা হয় তা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তৈরি করা এর অন্যতম প্রধান দিক । এটি কেবল দর্শক হিসেবে মিডিয়া গ্রহণ নয় বরং একটি সক্রিয় অবস্থানে থেকে মিডিয়া ব্যবহার ও নিজস্ব বার্তা তৈরি করার প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করে । এটি সংবাদপত্র, চলচ্চিত্র, সোশ্যাল মিডিয়া, স্ট্রিমিং সার্ভিসসহ সকল ধরনের মিডিয়ার (প্রিন্ট, ডিজিটাল, তারবিহীন) জ্ঞান প্রদান করে । ডিজিটাল পরিবেশে নিজেকে রক্ষা করতে এবং সুস্থভাবে যুক্ত থাকতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সচেতনতা প্রদান করে । গণমাধ্যম সাক্ষরতার মূল উপাদান হল বিভিন্ন গণমাধ্যম ও তার আধেয়(content) খুঁজে বের করার ক্ষমতা অর্জন এবং সেখানে প্রবেশগম্যতা (access), বার্তা গঠন, উদ্দেশ্য ও প্রভাব বিশ্লেষণ (analysis) করা সেইসঙ্গে বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভুলতা যাচাই করা পক্ষপাত সনাক্ত করা ও মূল্যায়ন (evaluation) এবং কার্যকর ভাবে বার্তা তৈরি ও প্রকাশ করা(creation) । গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা হল ডিজিটাল বিশ্বের একজন সচেতন, সমালোচনামূলক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার একটি অপরিহার্য দক্ষতা ।

উদ্দেশ্যমূলক, পক্ষপাতমূলক, ভ্রান্ত তথ্য সাধারণের আচরণ পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় অথবা প্রচার করা হয় । রাজনৈতিক নেতা, ধর্মপ্রচারক, নিম্নমানের বাভেজাল প্রোডাক্ট বিক্রেতা কিংবা ভিন্ন আদর্শের প্রচারক বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে প্রচারণা (Propaganda) করে থাকে । এই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাকে সাধারণ মানুষ গভীরভাবে ভেবে দেখেন না । ডিজিটাল বিশ্বের ভুয়া খবর ও ভুল তথ্য সনাক্ত করা অপরিহার্য । কারণ ভুয়া খবরও ভুল তথ্যের প্রভাব সুদূরপ্রসারী, যা সমাজে বিভ্রান্তি,  অবিশ্বাস, মেরুকরণ এমনকি সহিংসতার সৃষ্টি করে । এটি গণতন্ত্রের ক্ষতি করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে ভোটারকে বিভ্রান্ত করে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ায় যা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর আস্থা হীনতা তৈরি করে । ভুল তথ্য সমাজে বিভেদ সন্দেহ ও শত্রুতা বাড়াতে পারে যা দাঙ্গা বা সংঘাতের ইন্ধন যোগায় । ভুল তথ্যের প্রভাবে বিরক্ত মানুষ মূলধারার সংবাদমাধ্যমকেও অবিশ্বাস করতে শুরু করে কারণ ভুয়া খবর প্রায়শই যাচাই না করে প্রচার করা হয় । ভুয়া খবর ও ভুল তথ্য মানুষের স্মৃতিকে বিকৃত করে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে ভুলপথে চালিত করে । শিশু ও তরুণদের মধ্যে ভুল তথ্য উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং বিভ্রান্তি তৈরি করে মানসিক বিকাশ ও তাদের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যা তাদের মধ্যে উদ্যোগ ও ভুল বিশ্বাস তৈরি করতে পারে । এর ফলে মানুষের বিদ্যমান বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে এবং তাদের (biases) বা পক্ষপাতিত্বকে উসকে দেয় যা সমাজকেও বিভ্রান্ত করে তোলে । ভুল তথ্যের কারণে মানুষ স্ক্যামের শিকার হতে পারে । যার ফলে আর্থিক ক্ষতি বা ডেটা চুরির মত ঘটনা ঘটে । ভুল স্বাস্থ্যতথ্য বা 'লাইফ হ্যাকস' অনুসরণ করে বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ বা ভুল চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে ।

গণমাধ্যম সাক্ষরতা সাংবাদিকদের সঠিক, নিরপেক্ষ ও নৈতিক সাংবাদিকতা করতে এবং সাধারণ মানুষকে ভুল তথ্য থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে । সাংবাদিকতা গণমাধ্যম সাক্ষরতার ভিত্তি স্থাপন করে, জনগণকে তথ্য সরবরাহ করে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করে । তাই এই দুটিকে একে অপরের পরিপূরক এবং একটি সচেতন সমাজ গঠনে দুটি অপরিহার্য । সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে জনগণের মধ্যে সঠিক জনমত গঠনের সাহায্য করেন, যা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য । সরকার ও তার ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য প্রকাশ করে সাংবাদিকরা জবাবদিহিতা নিশ্চিন্ত করেন এবং সমাজের সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন । গণমাধ্যম সাক্ষরতা বাড়াতে সাংবাদিকরা নিজেরাই সহায়ক ভূমিকা পালন করেন । তারা তথ্যের উৎস যাচাই করার কৌশল দেখান এবং ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করেন । সংকটকালে সাংবাদিকতা জাতির বিবেক হিসেবে কাজ করে এবং জনগণের সম্মিলিত কন্ঠস্বর তুলে ধরে । গণমাধ্যম সাক্ষরতা যেমন সাংবাদিকদের উন্নত ও দায়িত্বশীল হতে সাহায্য করে তেমনি সাংবাদিকরাও সাক্ষরতা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন । গণমাধ্যম সাক্ষরতা ও সাংবাদিকতা উভয়ে একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য । কারণ এটি একটি সুস্থ ও সচেতন নাগরিক সমাজ তৈরি করে । 

গণমাধ্যম সাক্ষরতাকে বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে তার সামনে অনেকগুলি চ্যালেঞ্জও এসে দাঁড়ায় । তার মধ্যে হল ভুল তথ্যের বিস্তার অর্থাৎ ভুয়া খবর, প্রোপাগান্ডা এবং ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়াএকটি বড় সমস্যা যা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে । সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম কিভাবে তথ্য ফিল্টার করে এবং ব্যবহারকারীর কাছে উপস্থাপন করে তা বোঝা কঠিন । ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি (cyber harassment), ডিজিটাল সহিংসতা(cyber bulling), অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন (cyber intimidation), অনলাইন ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ সংগঠিত করা (cyber terrorism), অনলাইন ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ (cyber stalking) ইত্যাদির শিকার হওয়া এবং এর প্রতিরোধে অক্ষমতা, প্রযুক্তি ও তথ্যে সবার সমান প্রবেশাধিকার না থাকা যা সাক্ষরতার সুযোগকে সীমিত করে, নতুন নতুন অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল টুলস এর সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য ক্রমাগত শেখার সীমিত সুযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং অনলাইন পরিচিতি (Digital Identity) রক্ষা করা বিষয়ে জ্ঞানের অভাব, শিক্ষক গণমাধ্যম কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রমের অভাব, তথ্যের ভিড়ে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য তা বেছে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, অতিরিক্ত মিডিয়ার ব্যবহার এবং এর নেতিবাচক মানসিক প্রভাব আসক্তি ও ভুল ধারণার সৃষ্টি করে ।

শিক্ষাক্ষেত্রে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে গণমাধ্যম ব্যবহার সম্বন্ধে সচেতন ও অভিজ্ঞ করে তোলা যায় । স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে গণমাধ্যম সাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যেখানে বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন এবং বার্তা তৈরির দক্ষতা শেখানো হবে । শিক্ষকদের গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যাতে তাঁরা শিক্ষার্থীদের কার্যকর ভাবে শেখাতে পারেন । শেখানোর পদ্ধতি ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শিক্ষাদান পদ্ধতি (যেমন দলগত কাজ আলোচনা ইত্যাদি) গ্রহণ করা যেতে পারে । শিক্ষার্থীদের যদি গণমাধ্যম সাক্ষরতা জ্ঞান দেওয়া হয় তাহলে তারা গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা বৃদ্ধি করে তাদের তথ্যসমৃদ্ধ ডিজিটাল সমাজে অংশগ্রহণ করতে সমৃদ্ধ করে এবং নিজস্ব সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করে সচেতন ও সক্রিয় পাঠক ও নির্মাতা (creator) হিসেবে গড়ে তোলে । শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের গণমাধ্যম বার্তা সংবাদ বিজ্ঞাপন সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে শেখাবেন বার্তার উদ্দেশ্য পক্ষপাতিত্ব এবং বার্তা কিভাবে তৈরি হয়েছে তা বুঝতে সাহায্য করবেন এবং স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারিং সিস্টেমের ব্যবহারে উৎসাহিত করবেন । নিজের মিডিয়া পছন্দ নিয়ে চিন্তা করতে এবং স্পন্সর করা বিষয়বস্তু (sponsored content) চিহ্নিত করতে শেখাবেন । গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো স্বচ্ছ করার দাবি জানানো যাতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে সে বিষয়ে শিক্ষা দান করবেন । শিক্ষার্থীদের কেবল ভোক্তা নয় বরং দায়িত্বশীল নির্মাতা হিসেবে গড়ে তোলা যাতে তারা নিজেরাই মানসম্মত মিডিয়া কন্টেন্ট তৈরি করতে পারে । গণমাধ্যম বার্তা থেকে নিজস্ব অর্থ বের করে আনার এবং দায়িত্বশীলভাবে অংশগ্রহণের দক্ষতা বৃদ্ধি করা শেখানোও শিক্ষকের দায়িত্ব ।

গণমাধ্যম সাক্ষরতা শিক্ষার্থীদের শেখায় কিভাবে সংবাদ বিজ্ঞাপন বা সোশ্যাল মিডিয়ার বার্তাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়, তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে হয় এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হয়, যা তাদের ভুল তথ্য থেকে রক্ষা করে । গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা শিক্ষার্থীদের গণমাধ্যম বার্তাগুলোর অন্তর্নিহিত পক্ষপাতিত্ব ও এজেন্ডা বুঝতে সাহায্য করে । তাদের প্রশ্ন করতে এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো বিবেচনা করতে উৎসাহিত করে । সাক্ষরতা শুধু নয় এই শিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে বার্তা তৈরির দক্ষতাও শেখায় । যার ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের চিন্তাভাবনা ও ধারণাগুলো কার্যকর ভাবে প্রকাশ করতে পারে এবং নিজস্ব মিডিয়া সামগ্রী তৈরি করতে পারে (যেমন ভিডিও ব্লগ বডকাস্ট পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন ইত্যাদি) । আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্য অনুসন্ধান, সৃষ্টি, যোগাযোগ এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে । সংবাদপত্র, টেলিভিশন ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি গণমাধ্যম শিক্ষার পরিধি বাড়িয়ে শিক্ষার প্রসারে সহায়তা করতে পারে । বিশেষ করে দূরবর্তী ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষের কাছে জ্ঞান পৌঁছে দিতে এই মাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । গণমাধ্যম সাক্ষরতা শিক্ষার্থীদের সমাজের বিভিন্ন সমস্যা  ও অসংগতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে এবং তাদের ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে । গণমাধ্যম সাক্ষরতা শিক্ষার্থীদের কেবল তথ্যের ভোক্তা নয় বরং তথ্য যাচাইকারী, সমালোচনাকারী এবং সৃজনশীল উৎপাদক হিসেবে প্রস্তুত করে তোলে যা তাদের আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অপরিহার্য ।

শিক্ষাক্ষেত্রে ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতার বিস্তার ঘটালে দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে মানুষ প্রযুক্তি ও প্লাটফর্মের সঙ্গে তাল মেলাতে, নানারকম ডিজিটাল প্রতিবন্ধকতা ও হয়রানি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত  রাখতে পারবে । পাশাপাশি গণমাধ্যম সম্বন্ধে কৌতুহলের ও নিবৃত্তি ঘটবে । সেইহঙ্গে গণমাধ্যমে কাজ করার দক্ষতা দ্রুত আয়ত্বে আসবে ও বিভিন্ন বিষয়কে অত্যাধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করতে পারবে । ফলে ডিজিটাল সমাজে আরও সচেতন, সমালোচনামূলক এবং সক্রিয় নাগরিক হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারবে ।

সহায়ক গ্রন্থ :

১. জার্নালিজমের সহজ পাঠ–কৌশিক ভট্টাচার্য, পারুল প্রকাশনী, আগরতলা ।
২. সংবাদ সাংবাদিক সাংবাদিকতা–সুজিত রায়, দে পাবলিকেশন, কলকাতা 
৩. সংবাদ ও সাংবাদিকতা–অনুপম অধিকারী, পাত্র বুক হাউজ, কলকাতা 
৪. সাংবাদিকতা ও সংবাদ পাঠ–সন্তোষ দেবনাথ, দীপ প্রকাশন, কলকাতা 
৫. গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা সহজপাঠ–শুভ কর্মকার, পিআইবি, বাংলাদেশ 
     ৬.  ইন্টারনেট থেকে নেওয়া তথ্য

চাকলা রোশনাবাদ ও পরগনা বামুটিয়ার অতীত ইতিহাস : ক্ষীণ অবলোকন

চাকলা রোশনাবাদ ও পরগনা বামুটিয়ার অতীত ইতিহাস : ক্ষীণ অবলোকন

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আমরা বর্তমানে যে ত্রিপুরারাজ্যকে দেখি, একসময় এর বিস্তৃতি আরও বিশাল ছিল । বর্তমান ত্রিপুরারাজ্যের (পূর্বতন পার্বত্য ত্রিপুরা বা স্বাধীন ত্রিপুরা) পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের অভ্যন্তরে প্রায় ৬০০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে এ অঞ্চল ছিল 'চাকলা রোশনাবাদ' নামে পরিচিত । প্রাচীনকালের এই বিস্তীর্ণ সমভূমি ত্রিপুরার রাজাদের জমিদারির অধীনে ছিল । 'সমতল ত্রিপুরা' বা 'জিলা ত্রিপুরা' ছিল এই অঞ্চলের তখনকার নাম । মুঘল সম্রাট মোহাম্মদ শাহর আমলে ১১৪২ ত্রিপুরাব্দে (১৭৩২ খ্রি.) মহারাজা ছত্রমানিক্যের (১৬৬১-১৬৬৬) প্রপৌত্র জগতরাম ঠাকুর বলদাখালের জমিদার আকা সাদেকের সহায়তায় ঢাকা নেজারত এর সুবিখ্যাত দেওয়ান মীর হাবিবের সাথে মিলিত হন । মীর হাবিব এই সময়টার  গুরুত্ব বিবেচনা করে সুযোগ গ্রহণের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রভু বাংলার নবাব সুজাউদ্দিনের (১৭২৭-১৭৩৯ খ্রি.) অনুমতি নিয়ে বিরাটসংখ্যক সৈন্যসহ জগতরাম ঠাকুরের সাহায্যের জন্য ত্রিপুরায় এসে হাজির হন । কুমিল্লার সন্নিকটস্থ স্থানে ত্রিপুরা সৈন্যদলের সাথে তাদের যুদ্ধ হয় । যুদ্ধে দ্বিতীয় ধর্মমানিক্য পরাজিত হন । আর মীর হাবিব জগতরামকে 'জগতমানিক্য' আখ্যা দিয়ে ত্রিপুরার রাজা বলে ঘোষণা করেন । এসময় নবাব সুজাউদ্দিন ত্রিপুরার এই সমতলভূমিকে 'চাকলা রোশনাবাদ' নাম দেন । রোশনাবাদ মানে 'আলোর ভূমি' । মুঘলদের অধিকৃত পূর্বপ্রান্তের ভূমি যেখানে প্রথম সূর্যের আলো এসে পড়ে । কৈলাস চন্দ্র সিংহের মতে বার্ষিক ৯২ হাজার ৯৯৩ টাকা নির্দিষ্ট করের বিনিময়ে জগতরাম এই সমতল ক্ষেত্রে ইজারা নেন । কিন্তু আর একটি গ্রন্থে অন্য তথ্য পাই, 'The Manikya kings of Tippera held the Chakla Roshnabad as zamindar under the Mughals paying an annual revenue of rupees 40,000 to the imperial treasury'.¹ এই অঞ্চলে মুঘলদের ফৌজদার নিযুক্ত হন আকা সাদেক । এভাবেই সমতট অর্থাৎ সিলেট, কুমিল্লা ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নোয়াখালির কিয়দংশ নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলটি 'চাকলা রোশনাবাদ' বা 'রোশনাবাদ' নামে মোগলদের হস্তগত হয় এবং ত্রিপুরার রাজারা এই অঞ্চলের জমিদারি পান । এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চাকলা রোশনাবাদ প্রথমে ২৪টিপরগনায় বিভক্ত ছিল । দাউদপুর পরগনা তার মধ্যে অন্যতম । কিছুদিন পরে দাউদপুরের মুসলমান জমিদারগণ তাদের রোশনাবাদ থেকে খারিজ করে নেন । সুতরাং মীর হাবিবের ত্রিপুরা বিজয়ের পর ত্রিপুরেশ্বর ২৩টি পরগনা মাত্র জমিদারী স্বরূপ পেয়েছিলেন । ক্রমে রোশনাবাদ ৫৩ টি পরগনায় বিভক্ত হয় । প্রধানত রাজপরিবারের 'জুলাই' দ্বারা এবং ত্রিপুরেশ্বরের প্রাচীন কর্মচারীগণ কর্তৃক ( স্ব স্ব  নাম চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য ) এক একটি বৃহৎ পরগনার কিয়দংশ (স্বয়ং তালুকস্বরূপ নিয়ে স্ব স্ব নামে ) ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এক একটি পরগনা সৃষ্টি করেছিলেন । যুবরাজ চম্পক রায় মহারাজ রত্নমানিক্যের সময় নুরনগরের শাসনকর্তা নিযুক্ত ছিলেন । তিনি নূরনগরের কিয়দংশ দ্বারা চম্পকনগর সৃষ্টি করেন । মহারাজ কৃষ্ণমানিকের উজির জয়দেব নুরনগরের কিয়দংশ দ্বারা জয়দেবনগর নামক পরগনার সৃষ্টি করেছিলেন । প্রকৃতপক্ষে রোশনবাদের মধ্যে নুরনগর, মেহেরকুল, বগাসাইর, তিষ্ণা ও খন্ডল এই পাঁচটি মৌল বৃহৎ পরগনা ছিল । এই পাঁচটিসহ মীর হাবিবের সময় ২৪টি পরগনা গণনা করা হয় । এই চব্বিশটি থেকে দাউদপুর খারিজ হয়ে ২৩টি ছিল । ১৮৬১ থেকে ৬৪ খ্রিস্টাব্দের রেভিনিউ সার্ভেকালে রোশনাবাদের মধ্যে ৫৩টি পরগনা পাওয়া গেছে । সেগুলি ত্রিপুরার রাজাদের নিয়োজিত ব্যক্তিরা তাদের জমিদারিতে সহায়তা করতেন । Tripura Gazetteer থেকে জানা যায় যে,
'The economic background of the Tippera state was the Roshnabad estate, the revenue of which sustained the administrative and cultural reforms of Manikya rulers.'
'Chakla Roshnabad continued to be the richest state in the possession of the Manikya kings. Its revenues maintain the Tripura state administration till the merger with the Indian union.² অর্থাৎ চাকলা রোশনাবাদ পরগণার আয়ই তদানিন্তন ত্রিপুরার রাজাদের অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে শক্ত করে রাখত এবং এর আয় থেকে মানিক্যরাজসরকারের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনে সহায়তা করত ।

চাকলা রোশনাবাদ পররগনার মধ্যে বামুটিয়া বিশেষ পরিচিত । ১৮৬১-৬৪ সালে সার্ভেকৃত পরগনার তালিকায় বামুটিয়া পরগনার নাম পাওয়া যায় ।১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণমানিক্য (১৭৬০-১৭৮৩) উদয়পুর থেকে রাজধানী স্থানান্তর করেন আগরতলায় অর্থাৎ বর্তমান পুরাতন আগরতলায় । সম্ভবত সেই সময়ই উজির জয়দেব মানিক্যের মতো অন্য কোন উজির এই বামুটিয়া পরগনার সৃষ্টি করেন ।

 বামুটিয়ার পূর্ব নাম ছিল লক্ষ্মীপুর । এই সমতল শস্যক্ষেত্র প্রতিবছর লোহর নদীর সঙ্গে আসা পলি মাটিতে পুষ্ট । ফলে যুগ যুগ ধরে এখানকার নদীতীরবর্তী অঞ্চল বেশ উর্বর । প্রাচীন জনশ্রুতি, এই ভূমি স্বয়ং মা লক্ষ্মীর বরদান প্রাপ্ত । সংবৎসর ভরপুর ফসলের কারণে এই স্থানের নাম হয়েছে লক্ষ্মীপুর । "বামুটিয়া নামের সৃষ্টির সঙ্গে একটি লোকশ্রুতি জড়িত রয়েছে । মহারাজা কৃষ্ণ মানিক্য একদিন এই অঞ্চলে লোহর নদীর তীরের অবস্থিত আমলকীবনে হরিণ শিকার করতে এসে স্থানীয় জনসাধারণের সাক্ষাৎ প্রার্থনা করলেন । রাজার আমন্ত্রণে আগ্রহান্বিত হয়ে সকল গ্রামবাসী রাজার সঙ্গে দেখা করতে এলেন । তখন রাজা কথাপ্রসঙ্গে তাদের পেশার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেন । তারা নিজেদের চাষাভুষো বা 'মুইট্যা' শ্রেণির বলে পরিচয় দেন । রাজা আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলে উঠেন, 'বা,  মুইট্যা' । রাজার শব্দটি খুব পছন্দ হয় এবং তিনি তখনই এই অঞ্চলটির নাম দেন বামুইট্যা>বামুটিয়া । সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলটিকে একটি পরগনায় পরিণত করে গড়ে তোলার জন্য তাঁর কর্মচারীদের নির্দেশ দেন । তাঁর নির্দেশে গড়ে ওঠে তহশীল কাছারি, নায়েবের আদালত, ডাকঘর, হাটবাজার, স্কুল, বনদপ্তরের অফিস ইত্যাদি । সিমনা থেকে খোয়াই সীমান্ত হয়ে বড়কাঁঠাল, অভিরাম, গামছাকোবরা, দেবেন্দ্রনগর, জমিরঘাট, গজলঘাট, ছেচুুরিয়া, হরিনাখলা, তারানগর, সিধাই, কালাছড়া, কলকলিয়া, তালতলা, বেড়িমুড়া, ভোগজুড়, তেবাড়িয়া, জলিলপুর, মুকুন্দপুর ইত্যাদি বিশাল এলাকার গ্রামসমূহ নিয়ে সৃষ্টি হয় বামুটিয়া পরগনার । প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী বামুটিয়া বাজারে এখনো দুর্গা/কালী মন্ডপ রয়েছে । কথিত আছে ১৯০২ সালে মহারাজা রাধাকিশোর মানিক্যের আমলে এখানে প্রথম ঘটস্থাপন করে দুর্গাপূজা শুরু হয় । কারণ সেসময় রাজার তালুকে প্রতিমা দিয়ে দুর্গাপূজায় নিষেধাজ্ঞা ছিল । পরে রাজা বীরবিক্রমকিশোর মানিক্যের অনুমতিক্রমে ১৯৩২ সাল থেকে ঘটপূজার পরিবর্তে  মূর্তিপূজার প্রচলন ঘটে ।" (উদ্ধৃত অংশটি তথ্যস্বরূপ সরবরাহ করে প্রাবন্ধিককে সমৃদ্ধ করেছেন ও কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন দীর্ঘদিনের বামুটিয়াবাসী ও এলাকার শুভাকাঙ্ক্ষী বিশিষ্ট লেখক অশোককুমার দেব) ।

বামুটিয়া কেবল অর্থনৈতিক কেন্দ্র নয় বরং সামাজিক মিলনমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসবের স্থান  । সমকালীন গ্রন্থের মধ্যে হান্টারের Statistical  Accounts of Bengal গ্রন্থে তিনি লিখেছেন 'Bamutia is one of the noted markets in the porganas of Roshnabad.  It is chiefly resorted to buy the cultivators for the sale of paddy, salt, fish and molasses. The crowd is large and the fair becomes in occasion of much social gathering.'³  বামুটিয়া পরগনা সম্বন্ধে দীনেশচন্দ্র সেনের Collected Notes on the Ballads of Mymensingh এ পাই, 'Among the Marts of Roshnabad, the fair of Bamutia is renowned.  It is not only a Mart but a festival ground, where songs are sung, plays are acted and disputes are settled.'⁴  অর্থাৎ তদানীন্তন চাকলা রোশনাবাদের বামুটিয়া পরগনা বাজারটি ছিল খুবই বিখ্যাত । এটা শুধু বাজার নয় তখনকার সময়ে একটি উৎসবের স্থান ছিল । এখানে সংগীত ও নাট্যাঅভিনয় এমনকি, সামাজিক ঝগড়াঝাঁটির মীমাংসাও হত । কৈলাসচন্দ্র সিংহ তাঁর Tripura Rajmala গ্রন্থে লিখেছেন, 'Bamutiya pargana... has always been a fertile tract. The markets here are frequented by both the local cultivators and traders from the hilly tract of Tripura'.
'The trade route connecting Tripura hill to the Plains past through Bamutia, making it an essential market town for exchange of hill produce and plain grains'.⁵ বামুটিয়া পরগনার প্রধান উৎপন্ন ফসল ছিল ধান আর পাট সরিষার তিল,গুড় ইত্যাদি । লোহর নদীপথ ধরে পণ্য আদান-প্রদান চলত । বামুটিয়ায় লোহর নদীর তীরে একসময় বিড়ির পাতার সমৃদ্ধ বাজার ছিল । ত্রিপুরার পার্বত্য অঞ্চল থেকে বিড়ির পাতা সংগ্রহ করে এই বাজারে নিয়ে আসা হত । ভাটি অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা এখানে এসে বিড়ির পাতা সংগ্রহ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে যেতেন । এখন আর সেই ব্যবসা নেই । শুধু এখানকার জঙ্গলমহলে পাতাবাজার নামে একটি স্থান তার সাক্ষ্য বহন করছে । সেকালের লোহর নদী অত্যন্ত খরস্রোতা ছিল । বর্ষাকালে নদীতে উত্তাল তরঙ্গস্রোত প্রবাহিত হত । সম্ভবত 'লহর' অর্থাৎ ঢেউ শব্দটি থেকেই লোহর শব্দের উৎপত্তি । একটি তথ্যে জানা যায়, সেকালে বামুটিয়া পরগনার বার্ষিক রাজস্ব আয় ছিল নব্বই হাজার টাকা থেকে এক লাখ দশ হাজার টাকা পর্যন্ত । রাজস্বের দিক থেকে এটি দ্বিতীয়স্থানে ছিল । রাজস্ব আয়ের প্রথমস্থানে ছিল ফেনী । ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকেও অধিক । বামুটিয়ার সাপ্তাহিক হাট জমজমাট থাকত । হাটে কৃষক, বণিক, শিল্পী ও জাতি-জনজাতির মিলন মেলা বসে যেত । জনজাতি অংশের মানুষেরা পাহাড় থেকে বাঁশ, বেত ও ফলমূল নিয়ে আসতেন । বাইরের ব্যবসায়ীরা লবণ ও শুকনো মাছ আনতেন । স্থানীয় তাঁতিরা বাজারে তুলতেন তাঁতের কাপড় ।রাজস্ব ও হাট উভয়দিকেই বামুটিয়া প্রসিদ্ধ ছিল ।

কৈলাস চন্দ্র সিংহের রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস গ্রন্থে বামুটিয়া পরগনার বর্ণনা রয়েছে নিম্নরূপ:
পরগণা : বামুটিয়া
ভূমির পরিমান :
একর-৭৮০ রুড-২ পোল-১৩
স্মার্ট লিখিত পরিমান :
একর-৭৮০ ডিসিমেল-৩৩

বামুটিয়া জনপদ এখন মিশ্র বসতিপূর্ণ এলাকা । বাঙালি, মনিপুরি ও সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষ এখানে পাশাপাশি বাস করছেন । বাঙালিরা বহু প্রাচীনকাল থেকে এখানে আছেন । মনিপুরিরা রাজআমলে পুনর্বাসন পেয়ে এখানে আছেন । সাঁওতালরা চাবাগানে কর্মী হিসাবে গত শতাব্দীর শুরুর দিকে এখানে এসে বংশপরম্পরাক্রমে বসবাস করছেন । বাংলাদেশের মেঘনা তিতাস নদীবিধৌত সমৃদ্ধ জনপদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রাচীন নূরনগর ও বলদাখাল পরগনার পূর্বদিকে এই বামুটিয়া পরগনা । যেহেতু ব্রাহ্মণবাড়িয়া অতি প্রাচীনকাল থেকেই শিল্পসাহিত্যসংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ ছিল । আজ থেকে একশো তেত্রিশ বছর আগে ১৩০০ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনমাসে (১৮৯৩ খ্রি.) ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে প্রকাশিত হয়েছিল 'ঊষা'  নামে একটি সাময়িকপত্র । সেই ঐতিহ্য অনুসরণ করে একসময় এই জনপদেও তার ছোঁয়া লেগেছিল । একসময় নানা দিক দিয়ে যে উন্নত ছিল এই জনপদ । তার ধারা বর্তমানেও বহমান । আজও  বামুটিয়ার সাহিত্যসংস্কৃতিপ্রাণ মানুষেরা নিজস্ব উদ্যোগে প্রতিবছর পুজোর সময় সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করেন জঙ্গলমহলে । বেশ কটি সাহিত্যপত্র ও বের হয় এখান থেকে । ১৯৪৯ সালের ত্রিপুরা রাজ্যের ভারতভুক্তির পর এই বামুটিয়াও ত্রিপুরার অন্তর্ভুক্ত হয় । ১৯৫২ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে বামুটিয়া সীমান্তে যুদ্ধ হয় । এই যুদ্ধটি 'লক্ষ্মীপুর যুদ্ধ' নামে পরিচিত । সেসময় প্রাচীন বামুটিয়া গ্রামের বিরাট অংশ পাকিস্তান দখল করে নেয়, যা আজও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি । সেই থেকেই বামুটিয়াবাসীর কপালে দুঃখ শুরু হয় । এই জনপদ একসময় উপহার দিয়েছে ত্রিপুরা রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ ও প্রথম জোট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল দাসকে । কিন্তু পরবর্তীকালে প্রশাসনের অনীহা ও যথাযথ দৃষ্টিদানের সদিচ্ছার অভাবে  আজ বামুটিয়া তার পুরনো গৌরব হারিয়ে কেরোসিন কুপির আলোর মত টিমটিম করে জ্বলছে । একে একে অধিকাংশ সরকারি কার্যালয় এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । এক সময় 'বামুটিয়া বাঁচাও কমিটি' তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তুলেও ব্যর্থকাম হয়েছে । অতীতের বর্ধিষ্ণু পরগনা বামুটিয়া আজ শুধু ইতিহাসের বিষন্নবাহক ।


সহায়ক তথ্য :
1. J. W. Edgar : Bengal District Gazetteer : Sylhet 1872
2. S N Guha, Economic History of Tripura p. 62
3. Hunter, W W : A Statistical Accounts of Bengal
4. Dinesh Chandra Sen : Collected Notes on Ballads of Mymensingh p. 45, C U Press 1923
5. Kailash Chandra Shingh : Tripura Rajmala, Bamutiya reference, Tripurar Itihas pp 102-103
6. কৈলাসচন্দ্র সিংহ, রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস

ইতিহাসের ঘাট : আমলিঘাট ও মনুঘাট

ইতিহাসের ঘাট : আমলিঘাট ও মনুঘাট

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

গতবছর দ্বিতীয় আমলীঘাট ফেনী ভিউ কবিতা উৎসব ২০২৫ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা 'মেরুকুম'-এ আমি আমলিঘাট সম্বন্ধে একটা চিত্র তুলে ধরেছিলাম । এবারে এই প্রসঙ্গেই একটি অন্য বিষয়ের অবতারণা করছি ।

ফেনী নদীপ্রবাহের ভারত ভূখণ্ডের শেষ প্রান্তিক জনপদ আমলিঘাট সাবরুম মহকুমার প্রত্যন্ত গ্রাম । একসময় আমলিঘাট বর্ধিষ্ণু জনপদ ছিল । ত্রিপুরার প্রায় প্রতিটি নদীপ্রবাহের সীমান্ত অঞ্চলে রাজআমলে গড়ে উঠেছিল বনকর ঘাট । ফেনীনদীর ঘাটের ইজারার সুবাদে আমলিঘাটে গড়ে উঠেছিল ফেনীঘাট নামে বনকর ঘাট । আর তাকে কেন্দ্র করে তহশীল অফিস ও বনদপ্তরের অফিস । ১৮৮৮ সালের আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ ও ত্রিপুরার যৌথ সরকারের তরফে একজন অফিসার এই ঘাটের তদারকি করতেন । বনজ সম্পদ আহরণের উপর ত্রিপুরার রাজা ও ব্রিটিশ সরকার ১০ আনা : ৬ আনা হারে কর আদায় করতেন । ১৮৭১ সালে ফেনীঘাটের ইজারা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব ২০০০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১২০০০ টাকা হয়েছিল ।

 রিয়াং ও চাকমা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা প্রাচীনকালে 'কোন্দা' এবং 'লং' নামে বিশেষ ধরনের নৌকা দিয়ে ফেনী, মনু ও গোমতী দিয়ে সমতল ত্রিপুরায় পণ্য পাঠাতেন । এই নৌকাগুলোর বৈশিষ্ট্য হল এগুলো এক কাঠের তৈরি । অর্থাৎ বিশাল বেড়সম্পন্ন বড়ো গাছকে কেটে সাইজ মত করে তার অভ্যন্তরে ছেনি বাটালি দিয়ে খোদাই করে নৌকার খোল তৈরি করা হত । ফলে এই জাতীয় নৌকায় কোন জোড়া ছিল না । মোটা গাছ কুঁদে এই নৌকা তৈরি করা হত বলে এইজাতীয় নৌকার নাম 'কোন্দা'  । অত্যন্ত টেকসই কাঠ দিয়ে এই নৌকা তৈরি হত ।

 অতীতকালে ত্রিপুরার এই অঞ্চলের অরণ্যে বিশাল আকৃতির শাল, সেগুন গর্জন, করই, গামাই, চামল ইত্যাদি মূল্যবান গাছ পাওয়া যেত । এই গাছের কাঠ দিয়ে নৌকা ও অন্যান্য মূল্যবান গৃহসামগ্রী বানানো হত । অনেক বাড়িও নির্মাণ হত বনের এই মূল্যবান গাছ দিয়ে । রাজন্য আমলে আমলিঘাটে বনবিভাগের যে ডাকবাংলাটি ছিল তাও সম্পূর্ণ দামি কাঠের খুঁটি ও কাঠামোর উপর তৈরি করা হয়েছিল । বাংলোটির গড়ন অনেকটা জনজাতিদের টংঘরের মতো ছিল । মোটা মোটা মূল্যবান গাছ দিয়ে ঘরের খুঁটি তৈরি করা হয়েছিল । কাঠের মাচার উপর ঘরটি প্রায় দোতলা সমান উঁচু ছিল । গত শতাব্দীর সাতের দশক পর্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় এই ডাকবাংলাটি দৃশ্যমান ছিল । 

ফেনীনদীর পাড়ে আমলিঘাট বাজারের পাশেই এই ফরেস্ট বাংলোটি ছিল রাজপুরুষদের আশ্রয়স্থল । রাজন্য আমলাদের ঘাট বলেই হয়তো এই ঘাটের নাম হয়েছে 'আমলিঘাট' । রাজধানী আগরতলা থেকে আখাউড়া রেলস্টেশনে পৌঁছে, ট্রেনে চড়ে মুহুরীগঞ্জে এসে নামতেন তাঁরা । সেখান থেকে আমলিঘাট । এই একই পথে সেকালে আগরতলা থেকে সরকারি ডাকব্যবস্থাও পরিচালিত হত । আমলিঘাট পর্যন্ত আসার পর ডাক হরকরার মাধ্যমে তা মনুঘাট হয়ে সাব্রুম শহরে পৌঁছাত । সেখানে থেকে সাবরুম, বিষ্ণুপুর, শিলাছড়ি পর্যন্ত বেশ কয়েকজন ডাক হরকরা ছিলেন একজন ডাক হরকরার নাম ছিল প্রকাশ বিশ্বাস । তিনি রাজন্য আমল থেকে ডাক হরকরার দায়িত্বে ছিলেন । গত শতাব্দীর আটের দশক থেকে তাঁর ছেলে নিতাই বিশ্বাস এই দায়িত্ব পালন করে ।  রাজন্য আমলে একবার ডাকাতদল আমলিঘাট-মনুঘাট পথে ডাক হরকরাকে কেটে ফেলে ডাকের ব্যাগ চুরি করে নিয়ে যায় । এই ডাকাতদলের সর্দার ছিলেন ছোটখিলে বসবাসকারী প্রাচীন বাঙালি এক নামকরা পরিবারের সন্তান । ডাকাতির পর ডাকাতদলের নামে রাজার হুলিয়া বেরুলে দলের সর্দার বর্মায় পালিয়ে যান । ভারতভুক্তির পর তিনি ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন । তাঁর এক সন্তান এখনও বর্তমান আছেন । পরিবারে মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রেখে সেই ডাকাতসর্দারের নামোল্লেখ থেকে বিরত থাকলাম ।

আমলিঘাটে রাজন্য আমলের শেষ দিকে ফরেস্ট গার্ড ছিলেন সতীশ শীল । তাঁকে সতীশগার্ড নামেই সবাই চিনত । তিনি এলাকার প্রতাপশালী ব্যক্তি ছিলেন । তাঁর ছেলে হীরালাল শীলশর্মা আগরতলাস্থিত বি এড কলেজের অধ্যাপক ছিলেন । আমলিঘাটের পুরনো পোস্টমাস্টার ছিলেন শশাঙ্ক চৌধুরী । তাঁর পূর্বপুরুষরা একসময় এই এলাকার জমিদার ছিলেন । এই গ্রামেরই আর একজন মেধাবী সন্তান হারাধন মল্ল আগরতলাসহ ত্রিপূরার বিভিন্ন মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন । অল্প কিছুদিন আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন ।

সেকালে আমলিঘাট বাঁশ ও ছনের কারবারের জন্য বিখ্যাত ছিল । স্বাধীনতার পর ওপার থেকে উঠে আসা অনেক ছিন্নমূল মানুষের সেদিনের বেঁচে থাকার একমাত্র মাধ্যম ছিল বাঁশব্যবসা । এই বাঁশব্যবসায় ফেনীনদী সন্নিহিত দুপারের মানুষই জড়িত ছিল ।

১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে সংযুক্তির পর থেকে ত্রিপুরারাজ্যের সর্ব দক্ষিণের শহর সাব্রুম এখন মহকুমা শহর ও এই অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র । কিন্তু অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, সাব্রুম মহকুমার যে জনপদটি আজকের নাগরিক রূপ নিতে পারত সেটি আজও রহস্যের অবগুন্ঠনে নিজেকে ঢেকে রেখে নীরবে সাব্রুম শহর সৃষ্টিতে লালন করে চলেছে । তার নাম ছোটখিল । শহর থেকে পশ্চিম দিকে ৬–৭ কিলোমিটার দূরে বর্ধিষ্ণু গ্রাম এটি । একসময় এই জনপদ ছিল কর্মচঞ্চল, ব্যস্ততায় ঘেরা । রাজন্যআমলে ছোটখিল ছিল 'গেট ওয়ে টু চিটাগাং হিল ট্র্যাক্ট' ।

সে আমলে রাজপুরুষরা আখাউড়া থেকে ট্রেনে চড়ে তদানিন্তন চাকলা রোশনাবাদের নোয়াখালির মুহুরিগঞ্জ স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে, হাতির পিঠে চড়ে, কিংবা নৌকাযোগে ছয় মাইল পূর্বে আমলিঘাটে পৌঁছে নিজেদের রাজত্বে পা রাখতেন । তারপর সেখান থেকে ফেনীনদীর উজান ধরে অনেকটা এগিয়ে রমেন্দ্রনগরের শেষপ্রান্তে ফেনী-মনুর সঙ্গমস্থল থেকে অভ্যন্তর দিকে আসতেন । সঙ্গমস্থল থেকে মনুনদীর উজান বেয়ে কিছুটা এগোলে একটা জায়গার নাম মনুঘাট । মনুনদীর তীরবর্তী ঘাট । তাই মনুঘাট । এখানে রাজন্যআমল থেকে বনদপ্তরের একটি বিট অফিস ছিল । এই মনুনদী বেয়ে উজান থেকে আসত বাঁশ, ছন, কাঠ, বেত ইত্যাদি বনজ সম্পদ ও ধান, তিল, তিসি, পাট, সরিষা, কার্পাস ইত্যাদি নানারকম কৃষি সামগ্রী । বনজসম্পদগুলি ভাটি অঞ্চলে পরিবহন করে নেওয়ার জন্য এখান থেকে বনদপ্তরের অনুমতিপত্র বা 'উজান টুকা' নেওয়া হত । ফলে এই পণ্য রপ্তানি ও পরিবহনকে কেন্দ্র করে এখানে একটা ছোটো বাজারের মতো গড়ে ওঠে । এই বাজারের নাম মনুঘাট বাজার । 

এই বাজারে ক্রেতাবিক্রেতা আসাযাওয়ার জন্য নদীতে নৌকার ব্যবস্থা থাকত । রাজআমলে রাজার নিয়োজিত কর্মচারী মাঝির দায়িত্বে থাকতেন । জনসাধারণ, সরকারি কর্মী ও রাজপুরুষদের পারাপারের জন্য । ভারতভুক্তির পর এই নৌকাঘাটটি নিলাম ডাকের মাধ্যমে কেউ নৌ পরিবহনের দায়িত্ব নিতেন । রাজন্য আমলের শেষ দিকে ফেনীনদী ও মনুনদীর এই অঞ্চলের জন্য দুজন দক্ষ মাঝি ছিলেন । তাঁদের নাম নগেন্দ্র মাঝি ও বেনু মাঝি । রাজার নৌকা চালনা করার দায়িত্ব প্রাপ্তির কারণে তাঁরা নিজেদের গর্বিত অনুভব করতেন । রাজার শাসন শেষ হওয়ার পরও অনেকদিন তারা নিলাম ডাকের মাধ্যমে এই ঘাটের ইজারা নিয়ে রোজগারের পথ বেছে নেন । পরবর্তীকালে মনুনদীর উপর সেতু হয়ে গেলে ইজারা প্রথা উঠে যায় । 

এই মনুঘাটের উপর দিয়ে একসময় সারাবছর নানা বনজ সম্পদ পরিবহন করা হত । উজান থেকে মনুনদীপথে বনজ পণ্য এনে ফেনীনদীতে নিয়ে তারপর ভাটির দিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হত । বাঁশ সরবরাহকারী শ্রমিকদের মনুঘাট বাজারবার শনি ও মঙ্গলবারে মহাজনরা বেতন প্রদান করতেন । সে কারণেই এই দুদিন মনুঘাট বাজার খুব জমজমাট থাকত । এখন আর সেই বাঁশ ও বনজ সম্পদের কারবার নেই । সেই কর্মীরাও নেই । এখন মনুঘাট বাজার আগের চেয়ে অনেক জমজমাট হয়েছে । পরিবহনব্যবস্থা ভালো হয়েছে । বাজারসংলগ্ন স্থানে একটা গাড়ির স্ট্যান্ডও রয়েছে । আধুনিকতার ছোঁয়া সর্বত্র । নৌকাঘাট না থাকলেও মনুঘাট নামটি আজ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে ।

প্রত্নকথার পুনরুচ্চারণ

প্রত্নকথার পুনরুচ্চারণ

 ফেলে আসা আঁধারকালের উদ্ধৃতির নাম ইতিহাস । এক একটা নির্জন প্রকোষ্ঠ পেরিয়ে পৃথিবী তার ইতিহাস লেখে । সেই ইতিহাসের অবিনশ্বর আলপনার নাম ঐতিহ্য । প্রবাহমান প্রজন্মের উত্তরপুরুষ মাটির প্রদীপ নিয়ে ঐতিহ্য খোঁজে ।  আপ্রাণ খুঁজে ফেরে পাহাড়ের চূড়ায়, বনভূমির নির্জনে, নদীর উজানজোয়ারে, নিঃস্ব ও ক্লান্ত শস্যখেতে আর গেরস্তের উতলপৈঠায় । আলপনার আয়ুরেখায় ফুটে ওঠে সুরচিত মঙ্গলকাব্যের ভাসানগান । অতিক্রান্ত জীবনের চারুছন্দের ধ্বনি কিংবা লৌকিকপ্রণয়কথার বেহাগসুর । সে গানের চারণিক সুরে একদল পাগল হয় । তাদের বুকের পরিভাষা কবিতা হয়ে ওঠে । সময়ের তালুপৃষ্ঠায় উঠে আসে অতীতের নৈসর্গিক ঘ্রাণ । বেজে ওঠে অরণ্যমাদল । অবহেলার রক্তক্ষরণে পান্ডুর হয়ে যাওয়া সময়কে ভরিয়ে দিতে চায়  স্বরবৃন্দের সৃজনে ও শুশ্রূষায় । যান্ত্রিক বাস্তবতা আর ধাতব সম্পর্কে কংক্রিট রাস্তা পেরিয়ে এই উত্তরবাউলেরা পা রাখে অরণ্যদীর্ণ মেঠোপথে । এইসব অতিজীবিত মানুষেরা শীতরাতের সিক্তশিশির মাড়িয়ে ভোরের রাঙাপথ বেয়ে এই মেরুকুমে আসে । তাদের সন্ধানী রক্ত কণিকায় নির্মাণ হয় আলোকিত প্রত্নভূমির শৌর্যসড়ক ।

উচ্চকন্ঠ দোহারগণের সম্মিলিত শ্রমকোরাসে প্রতি ঋতুচক্রে জেগে ওঠে সীমান্তঘেঁষা এই সৃজনপাহাড়ের স্পন্দন আর মায়াবি তরঙ্গের আড়ালে শুয়ে থাকা  বিভাজনবিষণ্ন নদীটির গহিনতন্ত্রী । তাদের সন্ততিদের জন্যে এই সম্মিলিত সামগীত । 'মেরুকুম' সৃজনকল্পে একদল অমৃতাভিলাষী পরিব্রাজকের স্বপ্ন ও শব্দশিল্প বেড়ে ওঠে  ইতিহাসের নির্মম ক্ষতরেখার কূটকৌশলের বিপরীতে। বহুধারার বিশুদ্ধ সৃজনবিস্তার আরও আরও বহুকাল এখানে শব্দশিল্পের উজ্জ্বল উদ্যান নির্মাণ হোক । ইতিকথার অরণ্যে লেখা হোক প্রাণের আখ্যান । ব্যর্থতা যেমন অগ্রবর্তী পদাতিকের দায় তেমনি সমূহ সফলতাই সকল আশার সুরক্ষাকবচ ।


                                           বিনীত
                            অশোকানন্দ রায়বর্ধন
                  মেরুকুম সম্পাদকমন্ডলীর পক্ষে
৩য় আমলিঘাট ফেনীভিউ কবিতা উৎসব ২০২৬

Sunday, February 15, 2026

ভিটেমাটি

ভিটেমাটি

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

সীমানার গাছগুলো কাটা হয়ে গেছে । সারা তল্লাটে আর গাছ নেই । এখানেই রাজ্যের পাখিরা বাসা বেঁধেছিল । আজ থেকে আর ওদের বসতঘর নেই । দল বেঁধে উড়ে উড়ে পাড়াময় অসহায় চক্কর দিচ্ছে । আর নানা শব্দে কলকাকলি করছে । বাড়িটা একসময় বিশাল ছিল । অনেকটা জায়গা জুড়ে উঠোন, বাড়িঘর, পুকুর, বাগান, নানা রকমের গাছগাছালি । ধীরে ধীরে পুকুর ভরাট হয়েছে । বাগানের গাছগাছালি কেটে ফেলা হয়েছে । যে বাড়ির নাম ছিল বাগানবাড়ি একটা সময় তার বাগানটাই হারিয়ে গেছে । দেখতে দেখতে ছোটো ছোটো প্লটে ভাগ হয়ে কিছুটা শরিকী ভাগ বাটোয়ারায় গেছে । আর কিছু জমি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে । পুকুরটা বুজিয়ে ফেলার পর অনেকটা জায়গা বেরিয়েছে । বহু পুরনো এই ভুবন ঠাকুরের বাড়ি । এখন ইতিহাস ।

ভুবনঠাকুর কোন ঠাকুর দেবতার নাম নয় । ভুবনমোহন চক্রবর্তী এই অঞ্চলের প্রাচীন বাসিন্দা । ছেচল্লিশের নোয়াখালির দাঙ্গার পর পরই তাঁরা চলে এসেছিলেন এখানে । দেশের বাড়ির বিশাল সম্পদ সব ফেলে রেখে । সেদেশে তাদের মহল্লাটাও ছিল রাজার তালুক । জমিদারি । ঘুরেফিরে সেই রাজার তালুকেই উঠে আসা । প্রায় আশি বছরে ভুবনঠাকুরের তিনপুরুষের বসত হল এখানে । অতীতের ক্ষতগুলো ধীরে ধীরে তাঁরা সারিয়ে তুলে থিতু হয়ে বসেছিলেন এখানে । এই গাঁয়ের অধিকাংশই ভুবনঠাকুরের জ্ঞাতিগোষ্ঠী বা দেশগাঁয়ের প্রতিবেশী । ফলে একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে সবার মধ্যে । পুরনো সব পরিবারের সঙ্গে ।

এখন ভুবনঠাকুরের গ্রামটা আর গ্রাম নেই । অনেক বড়ো হয়েছে । নগর পঞ্চায়েত  হয়েছে পুরনো বিষ্ণুপুর গ্রাম । এখন এ গাঁয়ের অনেক নাম । ভুবনঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিষ্ণু মন্দিরের কারণে । এই মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম । আর তাঁর পুরনো বসতবাড়িটি টুকরো টুকরো হয়ে পঁচিশ-ত্রিশ পরিবারের একটি পাড়া হয়েছে । দুএকটা দালানবাড়িতে দোতলা তিনতলায় ভাড়াটিয়াও রয়েছে । একসময় যে বাড়িতে সবমিলিয়ে ত্রিশজন মানুষ ছিল এখন সেখানে দুশো মানুষের বাস । বনেদি এলাকা । এই মানুষেরাই ইতিহাসকে মনে রেখে পাড়াটার নাম রেখেছে ভুবনপল্লি ।

পাড়ার মুখেই ভুবন ঠাকুরের নাতি বিশ্বরূপের বাড়ি । দু'গন্ডার মধ্যে চারতলা বাড়ি । বাড়ির চারপাশে সীমানা ঘেঁষে কিছু পুরনো গাছ রয়েছে । আর ছাদে বাগান । কিছুটা শান্ত সৌম্য পরিবেশ । এখানে মানুষ এখন এই বাড়িটাকেই ভুবনঠাকুরের বাড়ি হিসেবে চেনে । বিশ্বরূপবাবু অধ্যাপনা করতেন । রিটায়ার করেছেন ছবছর হল । বাড়িতে গিন্নিসহ একা থাকেন । দুজনেই অসুস্থ ও বয়সের ভারে দুর্বল । এক ছেলে এক মেয়ে । মেয়ে বড়ো । বিয়ে হয়ে গেছে । বরসহ অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে থাকে । ছেলে ছোটো । সেও রোবোটিক্স নিয়ে মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্পেশালাইজেশন করেছে । এ রাজ্যে তার চাকরি নেই । ব্যাঙালোরে মনিপাল হাসপাতালে জব করে । বাড়ি আসার একদম সুযোগ নেই । প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি । মালিক যতটা পারে নিংড়ে নেয় । বছরে একবার মা-বাবাকে নিয়ে যায় । ডাক্তার দেখানো, ঘোরাঘুরি, মন্দির দর্শন এসব করে দু-তিন মাস কাছে রেখে দেয় । এবার সে বাবাকে প্রস্তাব দেয় বাড়িটা বেচে দিতে । ব্যাঙালোরে সে একটা ফ্ল্যাট খুঁজছে ।  থ্রি বিএইচকে হলে বাবা মাকে এনে রাখতে পারবে । এই কবছর চাকরি করে যা জমিয়েছে তাতে বাড়ি কেনা দুঃসাধ্য । কিছু টাকা লোন নিলে আর বাড়িটা বিক্রি করে বাকি টাকা জোগাড় করলে শহর থেকে দূরে হলেও ভালো জায়গাতে একটা ফ্ল্যাট হয়ে যাবে । দিন দিন দাম তো বেড়েই চলেছে ফ্ল্যাটের । পরে আর হাত দেওয়া যাবে না । অন্যদিকে এই শহরের পরিধিও বাড়ছে ।

নতুন মালিক বাড়িটা বুঝে নিয়েছেন কদিন আগে । বিশ্বরূপবাবুরা চলে যাবেন ছেলের কাছে । এ কদিন নিচতলায় দুটো ঘর নিয়ে থাকছেন । নতুন মালিক সীমানার সব গাছ কেটে ফেলেছে । বলছে, প্রতিবেশীর সঙ্গে যাতে দুকথা না হয় তার জন্য এই ব্যবস্থা । বিশ্বরূপবাবুর অতি পরিচিত গাছগুলোর নিধনযজ্ঞে বুক ভেঙে গেলেও কিছু করার নেই । বাড়ি তো এখন আর তাঁর নয়। । কদিন ধরেই পরিচিতরা এসে দেখা করে যাচ্ছেন । কাউকে কাউকে ঘরের আসবাবপত্রের কিছু কিছু স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিলিয়ে দিয়েছেন । 

পাড়ার রাস্তার বা প্রতিবেশীর কারো একটা কুকুর আর একটা বিড়াল রোজই আসত বাড়িতে । এসে হাঁকডাক করত । বিশ্বরূপবাবু বা তাঁর গিন্নি কিছু খেতে দিলে তা খেয়েই উধাও হয়ে যেত । ও দুটোও আজ কদিন মনমরা । গেটের সামনে বসে বাড়িটার দিকে চেয়ে থাকে । কিছু শব্দ না করে । নতুন মালিক উপরতলাগুলোতে রং করাচ্ছে । গেটের সামনে গাড়ি এসে পড়েছে । দুপুর দুটোয় ফ্লাইট । এখান থেকে অনেকটা পথ । একটু সময় হাতে নিয়ে বের হতে চাইছেন তিনি ।

জিনিসপত্র তেমন নেই । দুটো বড়ো লাগেজ আর দুটো হাতব্যাগ । গাড়িতে উঠানো হল । যারা বিদায় জানাতে এসেছিলেন সবার সঙ্গে কথা বলে নিলেন শেষবারের মতো । কর্তা গিন্নি দুজনের চোখেই জল । কুকুর আর বিড়াল দুটো আজ তাঁদের পায়ের কাছে এসে অজানা ভাষায় চিৎকার করতে লাগল । বিশ্বরূপবাবু কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন । গিন্নি বেড়ালটাকে কোলে তুলে একটুক্ষণ আদর করলেন । বিশ্বরূপবাবুরা গাড়িতে উঠে বসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চিৎকার আরো বেড়ে গেল । গাড়ি ছেড়ে দিল । বিশ্বরূপ বাবু ও তাঁর গিন্নি সবার দিকে শেষবারের মতো হাত নাড়লেন । কুকুরটা আর বেড়ালটা চিৎকার করতে করতে গাড়ির পেছন পেছন ছুটতে লাগল । বিশ্বরূপবাবু, তাদের দিকেও হাত নাড়তে লাগলেন । একসময় ও দুটোও দৃষ্টির অগোচরে চলে গেল ।

Wednesday, December 31, 2025

বেগম খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে দেশের কর্ণধার

বেগম খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে দেশের কর্ণধার

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

মনে পড়ছে একাত্তরের ঝড়ো দিনগুলোর কথা । ওপার বাংলায় তখন নতুন দিগন্তরেখা । ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হচ্ছে রক্তিম আলোকচ্ছটায় । স্বাধীনতাকামী আকিশোর-বৃদ্ধ-বণিতা নেমে পড়েছে রাজপথে । ২৫ শে মার্চের পর থেকে সে আন্দোলন আরো সংগঠিত রূপ নেয় । সেদিন আমাদের এই সাব্রুমের অপর প্রান্তে ফেনীনদীর দক্ষিণ পাড়ে রামগড় হাইস্কুলের মাঠে চলেছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ । প্রশিক্ষণের নেতৃত্বে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান । এক দীর্ঘ সময় রামগড়কে পাক হানাদারমুক্ত রেখে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন । 

একসময় পাকবাহিনী রামগড় দখল করে নিলে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী চলে আসেন সাব্রুম ।সাব্রুমের হরিনা গ্রামসংলগ্ন গরিফা অরণ্যভূমিতে । করা হয় মুক্তিফৌজের ক্যাম্প ও একনম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার । প্রথমদিকে দায়িত্বে ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান । এখানেও তিনি যুবকদের একত্রিত করে ট্রেনিং পরিচালনা করতেন । তারপর মুক্তিবাহিনীকে পাঠাতেন দেশের অভ্যন্তরের লড়াই করার জন্য । এক নম্বর সেক্টরের সবগুলো সাব-সেক্টরের মধ্যে সাব্রুমের শিলাছড়ি, ঘোড়াকাঁপা থেকে শুরু করে ঋষ্যমুখ, মতাই পর্যন্ত তিনি চরকির মতো ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহিত করতেন । রণকৌশল নির্মান করতেন । রণাঙ্গনের নেতৃত্ব দিতেন । কখনো দিনে বা রাতে খেতে আসতেন সাব্রুম-ছোটখিল রোডের মুখে বাঁ-পাশে মাখন দে-র হোটেলে ।

সারাক্ষণ বাংলাদেশকে স্বাধীন করার চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন এই উচ্চপদস্থ সেনানায়ক । এতকিছুর মধ্যেও তাঁর মনে সুখ ছিল না এতোটুকু । তিনি সংবাদ পেয়েছেন তাঁর সহধর্মিনী বেগম জিয়া ও দুই প্রাণপ্রিয় সন্তান ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বন্দি অবস্থায় আছেন । তিনি চঞ্চল হয়ে উঠলেন । নানাভাবে তিনি খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন । খবর পেলেন ২রা জুলাই ঢাকা সিদ্ধেশ্বরীর এক বাসা থেকে পাক সেনারা বেগম জিয়াকে তার দুই সন্তান সহ ধরে নিয়ে গেছে । ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট ২৪ বছর বয়সে যখন তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন ছিলেন । তখন মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী খালেদাকে বিয়ে করেন । এর মধ্যে তাঁদের দুটি সন্তান আসে । মাত্র ১০-১১ বছরের দাম্পত্যজীবন  সেসময় । স্ত্রী ও পুত্রগণের বন্দী হওয়ার সংবাদে তিনি আরো মারমুখী হয়ে উঠেছিলেন । ধ্বংস করছিলেন একের পর এক পাকঘাঁটি । বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণাঞ্চল মুক্ত রাখা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা এনে দিয়েছিল ।

 ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন । ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি পান । বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ১৯৮১ সালে যখন হত্যা করা হয় সেই প্রেক্ষাপটে বিপর্যস্ত বিএনপিকে টিকিয়ে রাখতে বেগম খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেছিলেন । রাজনীতিতে আসার আগ পর্যন্ত তিনি একজন সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন । দলের সাধারণ সদস্যপদও তাঁর ছিল না । গৃহবধূ থেকে পরবর্তী সময়ে আপোসহীন নেত্রী ও তারপরে দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হন তিনি । ১৯৯১–৯৬ এবং ২০০১–২০০৬ এই দুই মেয়াদে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক পরিপূর্ণতা আসে । তাঁর গৃহীত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গতি দিয়েছে । তিনি বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে থেকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন । তাঁর সময়েই  পোশাক তৈরি ও রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতির বিস্তার লাভ ঘটে ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অবদান রাখে । শিক্ষা ও গবেষণামূলক কার্যক্রমের প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে । বিশ্বরাজনীতিমহলেও তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।  আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাফল্য আসে । বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব ফেলেছিল তাঁর সরকার অর্থনীতিতে উদারীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করায়,  যার ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন সুযোগ উন্মোচিত হয়েছিল । প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছিল । ভারতের সাথে সাম্যতা রেখে সবার সাথে কানেক্টিভিটি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল । যদিও ভারতের সাথে বিএনপি সরকারের কতটা সুসম্পর্ক ছিল তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে । কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে চলতে থাকা দীর্ঘকালীন সংকট তিন বিঘা করিডোর পালাক্রমে ৬ ঘন্টা করে দুই দেশের জন্য উন্মুক্ত হয়েছিল তাঁর আমলেই ১৯৯২ সালের জুন মাসে । তবে তার সময়ে সুশাসনে ঘাটতিও ছিল প্রচুর । তিনি সবসময় একদল স্তাবক পরিবৃত থাকতেন

তাঁর বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার উত্থান-পতন, মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব, মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা, জুলুম, নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন তিনি । স্বামী ও কনিষ্ঠপুত্র আরাফাত রহমানকে হারানোর গভীর শোকজনিত ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও দীর্ঘ শারীরিক জটিলতা ও রোগযন্ত্রণা বয়ে বয়ে তাঁর জীবনের যবনিক নেমে আসে । 

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়ানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে । বর্তমান বাংলাদেশের অস্থির ও অনিশ্চিত সময়ে তাঁর চিরপ্রস্থান সেদেশের সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে ।

Monday, December 22, 2025

পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেই দিন–বক্সনগরে

পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেই দিন–বক্সনগরে

অশোকানন্দ রায়বর্ধন


বাবার সরকারি চাকুরির সুবাদে শৈশব থেকেই শুরু আমাদের পরিযায়ী জীবন । তা থেকে আজও মুক্তি পাইনি । আজ এখানে তো কাল সেখানে । কোথাও থিতু হয়ে বসতে পারলাম না । জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে অতীতের সেই ভাসমান দিনগুলোর কথা প্রায়শই মনে পড়ে । বাবার ছিল বদলির চাকরি । তাই তিনি যেখানে যেতেন সঙ্গে তাঁর পরিবারবর্গকেও নিয়ে যেতেন । ফলে আমাদের সেই দিনগুলোতে ঘরের আসবাব বলতে কিছুই ছিল না । চাকরিতে বদলির সরকারি নির্দেশ আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের রওনা হতে হত পোটলাপুটুলি বেঁধে । একেকবার বদলি হয়ে নতুন জায়গায় গেলেই পেছনে ফেলে আসা সেই ভূমিকে এবং আমার শৈশবের বন্ধু-বান্ধবের কথা বেশ কিছুদিন মনকে খুব নাড়া দিয়ে যেত । যদিও এই অভিজ্ঞতাটা আমার পরবর্তী জীবনের অনেক অমূল্য সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে । আমার সৃষ্টিতেও সেইসব বিষয়গুলো এসেছে । আর এখন জীবন সায়াহ্নে এসে সেই দিনগুলোকে মনে করে এক স্বর্গীয় তৃপ্তি অনুভব করি ।

১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে আমার বাবা পেচারথল পি এইস সি থেকে বদলি হয়ে বক্সনগর দাতব্য চিকিৎসালয় জয়েন করেন । তখনকার দিনে ছোটো আকারের বাসে চড়ে আমরা প্রথম দিন আগরতলায় আসি । সেখানে একরাত্রি বাসের পর পরদিন সকালে আমরা প্রথমে এসে নামি বিশালগড় বাজারে । সেকালের বিশালগড় বাজার এখনকার মতো এত জমজমাট বা ঝাঁ চকচকে ছিল না । রাস্তার দুপাশে ছোটো ছোটো ছন বাঁশের বেড়ার ঘর ছিল । কোনো কোনো দোকানের গদিটা ছিল বাঁশের মাচার । এমনই একটা তরজার ঝাঁপ ফেলা ঘরে ছিল তখনকার সময়ের বাস সিন্ডিকেটের অফিস । আমাদের বাস এসে সেখানে থামে । আমার মনে আছে বাসটার নাম ছিল 'লাকি দুলু' । বাবা আমাদের বাস থেকে নামিয়ে সিন্ডিকেট অফিসে বসিয়ে রাখলেন । তারপর খোঁজ নিয়ে জানলেন বক্সনগরের রাস্তা কতদূর । একটু এগিয়ে গিয়ে ডান দিক ধরে বাজারের ভেতর দিয়ে বক্সনগরের রাস্তাটা গেছে । তখনকার হিসেবে সিন্ডিকেটের মাস্টার জানালেন বক্সনগরের দূরত্ব প্রায় ১২ মাইল । বাবা ভদ্রলোককে তাঁর পরিচয় দিলেন এবং এই ১২ কিলোমিটার রাস্তা তিন শিশুসন্তানকে নিয়ে কিভাবে যাবেন সে বিষয়ে দুশ্চিন্তার কথা তাঁকে জানালেন । সেই ভদ্রলোক তখন দৌড়ঝাঁপ করে খোঁজখবর করতে লাগলেন বক্সনগর থেকে মালামাল নিয়ে কেউ এদিকে এসেছে কিনা । তাহলে তাঁদের ফিরে যাবার সময় আমাদেরকে তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেবেন এবং জিনিসপত্রগুলো তাঁরা বয়ে নিয়ে যাবেন । যাই হোক ভদ্রলোকের সহৃদয় প্রচেষ্টার পরে দুজন লোককে পাওয়া গেল । তাঁরা বক্সনগর থেকে মালামাল নিয়ে এখানে এক ব্যবসায়ীর দোকানে এসেছিলেন । কিছুক্ষণ পরে তাঁরা ফিরে যাবেন । সিন্ডিকেট মাস্টার ভদ্রলোকের নির্দেশ মতো প্রায় দশটার দিকে দুই ভদ্রলোক তাদের হাতে মাল বয়ে নিয়ে যাবার বাঁশের বাঁক ও দড়ি নিয়ে অফিসে এলেন । আমাদের কাছে মালপত্র তেমন কিছু নেই । সামান্য যা কিছু ছিল একজন তাঁর হাতের দড়ি দিয়ে বেঁধে বাঁকের দুপাশে ঝুলিয়ে নিলেন । বাবা ও মা হেঁটেই যাবেন । তাঁদের কোলে থাকবে আমাদের ছোটোভাইটি । সমস্যা হল আমরা বড়ো দুইভাইকে নিয়ে । একজনের বয়স ৮ এবং অন্যজন ৬ বছর মাত্র । কিছুতেই ১২ কিলোমিটার পথ আমাদের পক্ষে হেঁটে পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয় । এ নিয়ে সবাই ভাবনায় পড়লেন । সে সময় আমাদের নিতে আসা দুজনের একজন একটা উপায় বার করলেন । তিনি আমাদের দুই ভাইকে তাঁর বাকের দু'পাশে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারলে আমাদের বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন বলে জানালেন । আমাদের পোটলাপুটলির মধ্যে সম্বল ছিল দুটো কাঁঠালকাঠের পিঁড়ি । মা বস্তার ভেতরে রাখা পিঁড়ি দুটো বের করে তাদের দিলেন । ভদ্রলোক আমাদের দুজনকে দুটো পিঁড়িতে বসিয়ে তাঁর কাঁধের বাঁকে ঝুলিয়ে রওনা দিলেন । এভাবেই আমরা দুই বিচ্ছু ভাই 'পালকি চলে পালকি চলে / গগন তলে আগুন জ্বলে' ছড়াটি বলতে বলতে বাকের দুলনির সঙ্গে দুলতে দুলতে বক্সনগর চললাম । কিন্তু আমাদের চঞ্চল নড়াচড়ায় বাহক ভদ্রলোকের ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল । তিনি মাঝে মাঝে আমাদের ধমক দিচ্ছিলেন ।

 এভাবে পথে বেশ কয়েকবার জিরিয়ে নিয়ে আমরা বিকেল চারটার দিকে বক্স নগরে এসে পৌঁছাই । সে সময় বক্সনগর দাতব্য হাসপাতালটি বাজারের একেবারে শেষপ্রান্তে নিবারণ সাহার বাড়ি ও দোকানের লাগোয়া ছিল । নিবারণবাবুর বাড়ির পরেই টিলাটা শেষ এবং ঢালু বেয়ে ছরার দিকে চলে গেছে । ওপারে বক্সনগর স্কুল মাঠ ও পুণ্যমতি গ্রাম । হাসপাতালের পেছনে একটি তরজার ছাউনি ও বেড়ার ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হল । পাশের নিবারণবাবুর বাড়ির সদস্যরা এসে আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গেলেন এদিন আর রান্নাবান্না না করার জন্য মাকে অনুরোধ করে গেলেন এবং রাত্রিতে তাদের ঘরে অন্নগ্রহণের আমন্ত্রণ করলেন । সেই থেকে এই পরিবারটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় শুরু এবং যতদিন আমরা বক্সনগর ছিলাম ততদিন তাঁদের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা ছিল । এই পরিবারের বড় দাদাটির নাম ছিল সম্ভবত বিভূতি । তারপরে কানুদা তারপরে সম্ভবত নারায়ণ ও বিজয় । আমার ভুলও হতে পারে । সবার নাম এখন আর মনে পড়ছে না । কানু সাহা অর্থাৎ কানুদা আমাদের চেয়ে বড়ো । তিনি আমাদের ছোটো ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন । এই দিনেই কিছুক্ষণ পরে এসে দেখা করে যান ডাক্তারবাবু হরেন্দ্র চক্রবর্তী । প্রায় আমার বাবার বয়সী তিনিও সপরিবারেই বক্সনগরেই থাকেন । পরদিন এই কানুদার সঙ্গেই আমি ও আমার ভাই অসীমানন্দ বক্সনগর স্কুলে যাই ভর্তি হওয়ার জন্য । ছোটোভাই বিবেকানন্দ তখন কোলের শিশু । দেড় বা দুবছর বয়স । বাবার ডিসপেনসারির সময় থাকায় আমাদের সঙ্গে যেতে পারেননি । তবে সকালবেলায় স্কুলের শিক্ষক মহাশয়দের সঙ্গে তাঁর এক প্রস্থ পরিচয় হয়ে গিয়েছিল । তাঁরাই আমাদের স্কুলে যেতে বলেছিলেন । ধীরে ধীরে স্কুলে আমরা সবার সঙ্গে মানিয়ে নিতে থাকি । যেহেতু আমরা উত্তর ত্রিপুরা থেকে এসেছিলাম তাই আমাদের কথায় একটা সিলেটি টান থাকত । এখানকার মানুষের মুখের ভাষায় ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার টান । ফলে ছোটো বয়সে যা হয়, আমাদের দুই ভাইয়ের কথাবার্তা নিয়ে সহপাঠীরা মশকরা করত । ধীরে ধীরে আমরা তা কাটিয়ে উঠি । আমার সঙ্গে যারা পড়ত তার মধ্যে যতটুকু মনে পড়ে কানুদাদের কোনো এক ভাই নারায়ন বা বিজয়, বিভীষণ বণিক, নিখিল দাস, আবু তাহের, মোখলেসুর রহমান, আব্দুল মোনাফ, সুবোধ নাথ, অমূল্যরতন পাল, ফটিক মজুমদার এবং ডাক্তারবাবুর ছেলে অজিত চক্রবর্তী । ডাক্তারবাবুর বড়ো ছেলে রঞ্জিত আমার একক্লাশ উপরে ছিল । এর মধ্যে আবার ফটিক ভৌমিক ওরা আমাদের পারিবারিক আত্মীয় । ফটিকের বাবা বক্সনগর তহশীল অফিসের তহসিলদার ছিলেন ।  ফটিকের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার সূত্র হলো রাজ্যের একসময়ের বিশিষ্ট সাঁতারু রতনমণি রায়চৌধুরী ছিল তার মাসি এবং রতনমণি রায়চৌধুরী সম্পর্কে আমাদের পিসি হন । এই পিসিদের বড় ভগ্নিপতি ফটিকের মা । ফটিকরা তহশীল অফিসের পিছনে সরকারি কাঁচাঘরে থাকত । সুবোধের বাবা ছিলেন চিকিৎসক । বক্সনগর বাজারে তার ওষুধের দোকান ছিল । বিভীষণের পরিবার সদ্য পাকিস্তান থেকে উঠে আসে । তার দাদা নারায়ণ বণিক বাজারে একটি বাজে মালের দোকান শুরু করেন । আবু তাহেরের বড়ো ভাই বক্সনগর স্কুলের শিক্ষক ছিলেন (তাঁর নামটা এখন আমার আর মনে নেই) । তবে তাঁদের সম্পর্কে একটা ঘটনা এখনো আমার মনকে নাড়া দেয় । অমূল্যরতনরা পরে এখান থেকে চলে গিয়ে আমবাসা বাড়ি করে । কুলাই থাকাকালীন তার পঙ্গে আমার দেখা হত ।

শিক্ষক মহাশয়গণ ছিলেন খুব আন্তরিক । স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন থেকেই তাঁরা আমাদের প্রতি খুব যত্ন নিতেন । প্রধানশিক্ষক ছিলেন নলিনীকান্ত আচার্য । এছাড়া অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বর্ষীয়ান প্রফুল্ল কুমার আচার্য, গৌরাঙ্গ চন্দ্র দাস, তাজুল ইসলাম স্যর, চিত্ত রায়, গুপ্ত স্যর, শাজাহান স্যার এবং রমেশ দাস । আমরা বিদ্যালয়ে পাঠকালীন সময়ে রমেশ দাস স্যার ট্রেনিং নেওয়ার জন্য কাঁকড়াবন চলে যান । কিন্তু কিছুদিন পরেই তাঁর বোধহয় কোনো মানসিক সমস্যা হয় এবং তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন বলে জানা যায় । শৈশবের সেই ঘটনাটি আমার মনে খুব নাড়া দিয়েছিল । এরকম আরো একটি প্রশ্নবোধক ঘটনা আজও আমার মনে মাঝে মাঝে জেগে ওঠে । আমাদের বন্ধু আবু তাহেরের দাদা (তার নামটা আমার মনে নেই) আমাদের শিক্ষক ছিলেন । তিনি এবং শাহজাহান স্যার একসঙ্গে চলাফেরা করতেন । হঠাৎ একদিন আমরা শুনতে পাই এই দুজন স্যারের চাকরি চলে গেছে কোন এক অজ্ঞাত কারণে । দুজন শিক্ষকই ভীষণ ছাত্রবৎসল ছিলেন । তাছাড়া শাজাহান স্যারের বড় মেয়ে সম্ভবত বিউটি নাম আমাদের একক্লাশের সিনিয়র ছিল এবং আমাকে খুব স্নেহ করত । একেবারে সীমান্ত সংলগ্ন তাদের বাড়িতে গিয়ে শৈশবে আমি বড়ই গাছ থেকে বড়ই পেড়ে খেয়েছি । তাঁদের হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া ব্যাপারটা আজও আমার মনে প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ঘোরাফেরা করে ।

বক্সনগরে সে আমল থেকেই হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত বসবাস । গ্রামবাসীদের প্রত্যেকের সঙ্গেই ছিল আন্তরিক সম্পর্ক । চিকিৎসায় সুফল পাওয়ার সুবাদে অনেক মুসলমান বয়স্ক মহিলা ও পুরুষ আমার বাবাকে আব্বা এবং মাকে আম্মা বলতে দেখেছি । তারা বয়স্ক হলেও আমাদের ভাইদের ভীষণ আদর করতেন । তাঁদের কেউ কেউ বাড়ি থেকে দুধ, খেতের ফসল, খেজুরের গুড় ইত্যাদি নিয়ে আসতেন । বাবা বকাঝকা করলেও গোপনে মার কাছে গছিয়ে দিয়ে যেতেন ভাইদের খাওয়ানোর জন্য । আজ কারোর নাম মনে নেই । চেহারাও মনে নেই কিন্তু সেদিনের কথাগুলো মনে পড়লে আজও হৃদয়ের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে । তখনকার মানুষের মধ্যে কোনরকম ভেদাভেদ ছিল না আন্তরিকতা ছিল প্রচুর । 

ছোট্ট বক্সনগরে সে সময়ে দুর্গাপূজা করতেন ধীরেন্দ্র সাহা নামে এক তরুণ ব্যবসায়ী ।  তাঁরা অল্প কিছুদিন আগে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে এখানে এসে বসতি ঘরে ছিলেন । সেখানকার বর্ধিষ্ণু পরিবার এখানে জমিজমা বদল করে আসায় তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল খুবই । তাঁদের সঙ্গে তাঁদের গ্রামের এবং আত্মীয়স্বজন অনেকেই বক্সনগর এসে এভাবে বসতি করেছিলেন । ফলে দেশ বাড়ির সম্পর্কের বাঁধনটা রয়ে গিয়েছিল । ধীরেন্দ্রবাবুর ভাই  সুনীল সাহা শিক্ষক ছিলেন । বড় ভাই তাঁকে পড়াশোনা করিয়ে বিয়েথা করিয়েছিলেন । আমরা সেই বিয়ের নিমন্তন্ন খেয়েছিলাম । পুজোর সময় ধীরেন্দ্র সাহার বাড়িতে গ্রামের সব মানুষ অংশগ্রহণ করতেন । একবার পুজোর সময় ধীরেন্দ্র সাহার বাড়িতে কোন একটা অশৌচকালীন সংস্কার পালনন চলছিল । অশৌচের মধ্যে দুর্গাপুজো করার নিয়ম নেই । তখন তাঁর প্রতিমা তৈরি প্রায় শেষ । সে অবস্থায় তিনি আমার বাবার উপর পুজোর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন । ধীরেন্দ্র সাহা নিজেই প্রতিমা গড়তেন । তাঁর প্রতিমা ছিল সাবেকি ধরনের । একবার তিনি বড়ো কাঠামের পাশাপাশি ছোটো আকারের একটি দুর্গামূর্তি গড়েন এবং সেই মূর্তির সামনে পূজারত রামচন্দ্রেরও একটি মূর্তি করেছিলেন । বাজারের উপরে বাচাই ঘরেই তিনি মূর্তি করতেন আমরা স্কুলে যাওয়া আসার সময় বেশ কিছুটা সময় তার মূর্তি নির্মাণকৌশল অবাক হয়ে দেখতাম । বাজারের একপাশে সবসময় একটি রথ দাঁড়ানো থাকত । রথের সময় এটা টানা হত । তারও উদ্যোক্তা ধীরেন্দ্র সাহাই । পুজো করার পাশাপাশি ধীরেন্দ্র সাহা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও জড়িত ছিলেন । পুজোর সময় তাঁর উদ্যোগে যাত্রা অনুষ্ঠান হত । সেই যাত্রাপালায় তখনকার সময়ে বক্সনগরের থানা তহসিল, স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য সরকারি অফিসের কর্মচারীগণসহ বক্সনগরের বিশিষ্ট হিন্দু-মুসলমানগণ অংশগ্রহণ করতেন । তখনকার সময়ে প্রায় সারারাত ধরেই যাত্রাপালা হত । 'শেষ নামাজ' নামে একটা যাত্রাপালার কথা আমার এখনো মনে আছে । এছাড়া পৌরাণিক যাত্রাপালাও তাঁরা করতেন । সেই যাত্রাপালায় আমার বাবা একবার সূর্যদেবের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছিলেন । বক্সনগরে শ্রাবণমাস জুড়ে মনসামংগলের গান বা পদ্মাপুরাণ পাঠ হত প্রায় প্রতি বাড়িতে । এ গ্রামে দু তিনটে মনসামঙ্গল পাঠের দল ছিল । পাঁচনাইল্লা থেকে একটা মনসামঙ্গলের দল আসত । পৌষ সংক্রান্তির আগের রাত্রে হত বেড়ার ঘর তৈরি এবং সেখানে রাত্রিবাস ও বনভোজন । ভোরবেলা স্নান করে সেই ঘরে আগুন দেওয়া হত এবং সুর করে ছেলেরা নানারকম ছড়া আওড়াত । বাজারের টিলাটার এক প্রান্তে থানা অবস্থিত হওয়ায় এর নাম ছিল থানার টিলা । আর উল্টোদিকে ছড়ার ওপারে গ্রাম হল পুণ্যমতি । সংক্রান্তির দিন ভোরবেলা দুই পাড়ের ছেলেরা একে অন্যকে উক্তি করে ছড়া কাটত  এই বেড়ার ঘর পোড়ানোর সময় । তেমন একটি ছড়া এখনো আমার মনে আছে । যেমন থানা টিলার ছেলেরা বলত, 'গাঙ্গে দিয়া ভাইস্যা গেল আইট্টা কলার থুর, / হগল গাঁইয়ায় সাক্ষী আছে পুণ্যমতি চুর' । সেরকম পুণ্যমতির ছেলেরাও ছড়া কেটে উল্টো থানার টিলার দোষারোপ করত ।  বসন্তে দোলপূর্ণিমায় হত দোল উৎসব । ধীরেন্দ্র সাহার বাড়িতে দোল ও ঝুলন দুটোই পালিত হত । দোলের সময় হোলির গান গেয়ে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে সবাই রঙের উৎসবে মাততেন । সেকালে থানার একজন দারোগা ছিলেন যিনি নাকি ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সদস্য । তাকে সবাই কর্তা বলে ডাকতেন । তিনি খুব সুন্দর হোলির গান গাইতে পারতেন । গানের দলে তিনি ছিলেন মধ্যমণি । চৈত্র সংক্রান্তিতে বাজারের উল্টোদিকে হরিমঙ্গল ছরার ওপারে ধান খেতে হত চড়ক গাছঘুরানি । একে কেন্দ্র করে হত প্রচুর লোকসমাগম ও মেলা বসত । তখনকার সময়ে বাজারের আশেপাশে বসতির মানুষের স্নানের ও পানীয়জলের উৎস ছিল এই হরিমংগল ছরা । কিছুদূর গিয়ে ছরাটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে । ছরাটিতে সেকালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত । ছোটোদের সাঁতার ও জলকেলির স্থান ছিল এই ছরা । বর্ষাকালে স্রোতের বেগও ভীষণ বেড়ে যেত ।

 বক্সনগর দাতব্য হাসপাতালে আমার বাবার সহকর্মী একজন ছিলেন শচীন্দ্র চক্রবর্তী । সে সময়ে বয়সে তরুণ শচীন্দ্র মামা এলাকার সবার প্রিয়পাত্র ছিলেন । তিনি তাঁর কারিগরি জ্ঞানের সহায়তায় পুরোনো রেডিওর স্পিকার খুলে মাইক্রোফোন বানিয়ে সেসময়ের নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পর্কে বাজারে ঘোষণা দিতেন এবং তিনি নিজেও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন । বক্সনগর স্কুলেও ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হত । গোডাউনটি তখন খোলামেলা ছিল । নাট্যানুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সেখানে হত ।শিক্ষকদের মধ্যে গৌরাঙ্গ স্যার এসব ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিতেন । অন্য শিক্ষকরা তাঁকে সহায়তা করতেন । ছোটো ছেলেরা খেলাধূলার মধ্যে লাডুমখেলা, গুল্লি খেলা, দাগ্গি খেলা, পিছলাগুটি দিয়ে বন্দুকবাজিসহ কাবাডি, ফুটবল, দাইরাবান্দা ইত্যাদি নিয়ে মেতে উঠত । বক্সনগর মাঠে বড় ফুটবল খেলার ম্যাচ হত । এই ম ঠের পাশে একবার একটি বাঘ মারা পড়েছিল । আমরা গিয়ে দেখি কিছু মানুষ তার চামড়া সংগ্রহ করছে । 

সেকালে সবার মধ্যে একটা মধুর সম্পর্ক ছিল ।  মাঝে মাঝে বনভোজন হত সবাই মিলে । ১৯৬৪ সালের মে মাসে গরমের ছুটিতে সবাই মিলে বনভোজনের আয়োজন হয় । উদ্যোক্তা ছিলেন অলরাউন্ডার শচীন্দ্র মামা । সবাই মিলে জিনিসপত্র নিয়ে রওনা হই ভেলুয়ার চর । সঙ্গে বিনোদনের সরঞ্জাম হল রেডিও এবং গ্রামোফোন । রান্নাবান্নার উদ্যোগ চলছে । হঠাৎ রেডিওতে ভেসে এল দুঃসংবাদ । প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রয়াত হয়েছেন । কিসের বনভোজন কিসের কি ! সবাই শোকাহত । স্থগিত হয়ে গেল বনভোজন । সবাইকে ফিরে আসতে হল । দিনটি ছিল ২৭শে মে । সেটাও আমার মনে থাকবে চিরদিন ।

বক্সনগরের চারদিকে সে সময়ে প্রচুর খালি জায়গা ছিল । এই থানার টিলার উপরে যেখানে একটি বড়ো গোডাউন আছে তার পাশের লুঙ্গাটি লম্বালম্বি অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত । একদিকে ছরা ও তার পাশের রাস্তা আর অন্যদিকে থানার কোয়ার্টার্স পর্যন্ত ছিল তার বিস্তৃতি । গোডাউনটার ঠিক পাশেই এই লুঙ্গার মধ্যে বন কেটে এখান থেকে ছনবাঁশ সংগ্রহ করে আমরা এবং ডাক্তারবাবুর পরিবার দুটি ছনের বেড়া ও ছনের ছাউনি দেওয়া ঘর তৈরি করে পাশাপাশি বসবাস করতাম । ছনের বেড়া গোবর মাটি দিয়ে লেপে দেওয়া হত । তাতে আর ফাঁকফোঁকর থাকত না এবং শীতকালে ঠান্ডাও লাগত না । ঘরের পাশেই ছিল দুটি বড়ো বড়ো কাঁঠালগাছ । প্রচুর কাঁঠাল ধরত । খুব সুস্বাদু কাঁঠালগুলি আমরা খেয়ে শেষ করতে পারতাম না । বাড়ির আশেপাশে খেতকৃষি করার মতো প্রচুর খালি জায়গা ছিল । আমাদের দুই পরিবার সেখানে যার যার প্রয়োজনীয় ক্ষেতের ফসল ফলাতাম । ফলে কাঁচা তরিতরকারি আমাদের কিনতে হত না । সেসময় এ অঞ্চলে ছিল প্রচুর খেজুরগাছ । আমাদের বাসস্থানের পাশেই ছিল বেশ কিছুটা জমি । সেখানে স্থানীয়রা চাষ করতেন । জমি পেরোলেই টিলা । সেখানে ছিল প্রচুর আম, জাম ইত্যাদি ফলের গাছ । জমিতে চাষ দেওয়ার সময় জমির মালিকরা আমাদের ডাকতেন । কারণ তাঁদের হালের বা মইয়ের পেছনে হাঁটলে সেসময় প্রচুর নানা ধরনের ছোটোমাছ, কাঁকড়া ও ছোটো কচ্ছপ পাওয়া যেত । আমরা সেই মাছ সংগ্রহ করে আনলে মা রান্না করে দিতেন । তখনকার সময়ে খেতে পাওয়া সেই মাছের কি অপূর্ব স্বাদ ছিল । 

বক্সনগরের অধিকাংশ হিন্দুরা সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান থেকে উঠে এসে এখানে বসতি গড়ছেন । কেউ কেউ দেশের জমিজমা বদল করে এসেছেন । কেউবা কপর্দকশূন্য অবস্থায় উঠে এসে নতুনভাবে জীবন গড়ার প্রয়াস নিচ্ছেন । মুসলমানরা ছিলেন প্রাচীন বাসিন্দা এবং তাঁরা বর্ধিষ্ণু ও সম্পদশালী ছিলেন । কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করার জন্য আনতেন । তখনকার সময়ের জিনিসপত্রের দর ছিল খুবই কম । মেট্রিক পদ্ধতিতে পরিমাপ তখনো সেই বাজারে চালু হয়নি । চালের সের ছিল চার আনা । তাও অনেকের কেনার সাধ্য ছিল না । এই চালের সের যেবার চার আনা থেকে পাঁচ আনা হল সেবার বাবা ও অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠরা বলাবলি করতে শুরু করলেন যে ছেলেমেয়েদের আর বাঁচাতে পারবেন না । ছোটোমাছ বড়জোর আট আনা সের । রুই, কাতলা, কালিবাউশ ২ টাকা সের । শিং-মাগুরের দর আট আনা বেশি থাকত । যে কোনো শুঁটকি ১ টাকা সের । তবে নোনা ইলিশ চোরাই পথে পাকিস্তান থেকে আসত । তার সের ছিল ২ টাকা । ডিমের হালি দু আনা । কাঁচা সবজির মধ্যে আলু, মূলো, ঝিঙে, ধুন্দুল, ঢেঁড়স ইত্যাদির সের চার পাঁচ পয়সার বেশি ছিল না । আম জাম কাঁঠাল পেয়ারা কলা বেল ইত্যাদি কোন ফলই বাজারে বিক্রির চল ছিল না । প্রতি বাড়িতেই নানা ফলের গাছ ছিল । কারো বাড়িতে না থাকলেও অসুবিধে ছিল না । একে অন্যের বাড়ি থেকে চেয়ে চিনতে নেওয়া যেত । শীতকালে আট আনা সের প্রচুর খেজুরের রাব বা লালি পাওয়া যেত । খেজুরের রস ছিল পাঁচ পয়সা সের । বাজে মালের মধ্যে ডাল আট আনা/দশ আনা, দেশলাই বাক্স ৫ পয়সা চারমিনার সিগারেট ১২ পয়সা প্যাকেট, কেরোসিন তেল কুড়ি পয়সা, সাদা কাগজ চার আনা দিস্তা, ব্রিটানিয়া থিন এরারুট ১০ পয়সা প্যাকেট, ছোটো বিস্কিটের প্যাকেট ৫ পয়সা, চকলেট প্রতিটি এক পয়সা ।

এত সুখ, স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেও রাত নেমে এলেই বক্সনগরের বুকে ছড়িয়ে পড়ত অজানা আতঙ্ক । সেসময়ে প্রতিরাতেই বক্সনগরে ডাকাতি হত । পাকিস্তান থেকে সশস্ত্র ডাকাতদল এসে এপারের জনপদে ডাকাতি করত । পেছনে ইপিআরের ইন্ধন থাকত । রাত নামলেই গৃহস্থরা ঘরের দরজা জানালা শক্তপোক্ত করে বেঁধে রাখত । অনেকসময় গোয়ালঘরের গোরুগুলিকেও নিজেদের থাকার ঘরে নিয়ে আসত । তারপরেও রেহাই ছিল না । ডাকাতদল সঙ্ঘবদ্ধভাবে ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গৃহস্থের বাড়ি আক্রমণ করত এবং তাদের ধনসম্পদ ও গবাদি পশু লুঠ করে নিয়ে যেত । টের পেলে গ্রামবাসীদের মধ্যে প্রতিরোধও হত এবং ঢাকার দলের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটত প্রায়শই । গ্রামবাসীর হাতে একবার এক ডাকাত মারা পড়েছিল । তার লাশ বাজারের বাচাইতে এনে ফেলে রাখা হয় ।  তখনকার সময় ঝড়ের খুব তান্ডব হত । পাকিস্তান থেকে উঠে আসা মানুষজন আর্থিক দুরবস্থার কারণে তেমন মজবুত ঘর করতে পারতেন না । চৌষট্টি সালে পুজোর আগে বিধ্বংসী ঝড়ে গ্রামে বহু বাড়িঘর বিধ্বংসী ঝড়ে ভূপতিত হয়ে গিয়েছিল । আমরাও অন্যান্যদের সঙ্গে তখনকার তহশিল কাছারির দালানে আশ্রয় নিয়েছিলাম । সারারাত তান্ডবের পর ভোরের দিকে ঝড় থামে । বাইরে বেরিয়ে মনে হয় যেন প্রলয় হয়ে গেছে চারদিকে । এছাড়া সাপের ও বিষাক্ত কীটের ভীষণ প্রাদুর্ভাব ছিল । এখন যেখানটায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য হয়েছে সেটা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এবং সাপ, গুইল, বনরুই আর সজারুর আড্ডা । সেইসঙ্গে মনসমঙ্গলবিষয়ক কিংবদন্তী জড়িয়ে থাকায় মানুষ ভয়ে সেদিকে যেতই না ।বাড়িঘরে প্রায়ই সাপ ঢুকে পড়ত । খেলার সময় আমরো ছোটোরা একবার একটা কেউটে সাপ মেরেছিলাম ।

৬৫ সালে আবার বাবার বদলির কাগজ আসে । বাবা বক্সনগরে থাকাকালীন সময়ে যে সুনাম অর্জন করেছিলেন তার দরুন এলাকার মানুষ তাঁকে ছাড়তে চাইছিল না । ফটিকের বাবা তহশীলদার হওয়ার সুবাদে আমরা যে জায়গাটায় ঘর করে থাকতাম তা বাবার নামে বন্দোবস্ত করে দেওয়ারও প্রস্তাব দেন তিনি । গ্রামের বিশিষ্টজনেরা দরবার করে বাবার বদলি রদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবা যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিকূলতার কারণে এবং অনবরত ডাকাতির ভয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার চিন্তায় এই বদলি মেনে নেন । কিন্তু পরবর্তীকালে বাবা কোনো সংকটপূর্ণকালে বক্সনগরের দিনগুলোর কথা প্রায়ই স্মৃতিচারণ করতেন । বলতেন, বক্সনগর ছাড়া তাঁর ভুল হয়েছিল । আমরা তখন তো নেহাতই ছোটো । ভালোমন্দের কিইবা বুঝি । আমরা যেদিন হাঁটাপথে বক্সনগর ছাড়ি সেদিন বহু অশ্রুসজল মানুষ আমাদের পেছনে পেছনে অনেকদূর এসেছিলেন । বাবা তাঁদের বারবার আর না আসার জন্যে অনুরোধ করছিলেন । আগেরদিন আমরা দুভাই স্কুলে গিয়ে সব ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করি ও শিক্ষকমহাশয়দের প্রণাম করি । ক্লাসে আমার সব বন্ধুদের দেখা পাই । তাদের একটি করে কলম উপহার দিয়েছিলাম সেদিন । তবে সেদিন আমার প্রিয়বন্ধু ক্লাসের প্রতিদ্বন্দ্বী নিখিল স্কুলে আসেনি । তারপর সারাজীবন তাকে খুঁজে ফিরেছিলাম । বক্সনগরের কাউকে পেলেই তার কথা বলতাম । একবার জানলাম রাজ্যের এক গুণী ব্যক্তিত্ব স্বপনকুমার দাসকে । বক্সনগরের সন্তান জেনে তাঁকে কথাটা জানিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় লিখতেই নিখিলের আবির্ভাব ঘটে । তারপর দুজনে বহু কথা হয় অনলাইনে। কদিন আগে সন্ধ্যায় বটতলায় ও আমাকে দেখে চিনে ফেলে ।  নিখিল ওর বাড়িতে যাওয়ার আমন্ত্রণ দেয় । আমি বারবার কথার খেলাপ করি । আমার এই স্মৃতিচারণমূলক লেখা নিখিলের ক্রমাগত চাপেই লেখা ।