ত্রিপুরারাজ্যের পুরাকাহিনি, ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চার ধারা
১) ত্রিপুরা রাজ্যের পরিচয় : অতীত থেকে বর্তমান
ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের একটি ক্ষুদ্র রাজ্য হল ত্রিপুরা। এই রাজ্যের বর্তমান আযতন হল১০৪৯১'৬৯ বর্গ কিলোমিটার । ২০১১ সালের লোক গণনা অনুযায়ী ছিল মোট ৩৬ লক্ষ ৭১ হাজার ৩২ জন । তারপর রাজ্যের অনেক পরিবর্তন হয়েছে । লোকসংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে । ত্রিপুরা বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠীর আদিভূমি । প্রাচীনকাল থেকেই এরা এখানে বসবাস করে আসছে । ১৯৪৯ সালে স্বাধীনোত্তরকালে ত্রিপুরা ভারতভুক্তির পরে এটি পৃথক প্রদেশরূপে স্বীকৃত হয় ত্রিপুরার মূল আদিবাসীদের ত্রিপুরী বা 'বরক' বলা হয় । ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সন্নিহিত অঞ্চল বা দেশ থেকে এরাজ্যে প্রবেশ করেছে দলে দলে অউপজাতীয় মানুষ । এর ফলে এখানে পরবর্তীকালে মিশ্র সংস্কৃতি বা কৃষ্টির সৃষ্টি হয় । ত্রিপুরা নামকরণের পশ্চাতে সত্যিই মিথ্যে মিলিয়ে নানা পৌরাণিক উপাখ্যান ও জনশ্রুতি রয়েছে ।
এ রাজ্যের ইতিবৃত্ত রাজমালায় উল্লেখিত হয়েছে যে, মহাভারতে বর্ণিত চন্দ্রবংশীয় রাজা যযাতি ছিলেন প্রচণ্ড প্রতাপশালী শাসক । তার বংশে জন্ম নেয় দ্রুহ্য নামে এক মহাশক্তিশালী রাজা । তিনি রাজা হলেন কিরাত দেশের । দ্রুহ্য তার রাজ্যপাট আসামের ত্রিবেগ নামক স্থানে স্থাপন করেন । রাজমালায় আছে–
'ত্রিবেগস্থলেতে রুদ্র নগর করিল
কপিল নদীর তীরে রাজ্যপাট ছিল' ।
ভারতের মানচিত্রে প্রাচীন ত্রিবেগ রাজ্যের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না । প্রাচীনকালের ত্রিবেগ বর্তমান যুগে কি নাম ধারণ করেছে সে নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে এখনো মতভেদ আছে । সে যুগে ত্রিবেগের সীমানা ছিল পূর্বে মেখলি, পশ্চিমে কোচবঙ্গ, উত্তরে তৈরঙ্গ নদী এবং দক্ষিণে আচরঙ্গ । সংস্কৃত রাজমালায় আছে–
'যস্য রাজস্য পূর্ব্বাস্যাং মেখলিঃ সীমতাং গতঃ ।
পশ্চিমস্যাং কোচবঙ্গোদেশঃ সীমতি সুন্দরঃ ।
উত্তরে তৈরঙ্গ নদী সীমতাং যস্য সঙ্গতা ।
আচরঙ্গ নাম রাজ্যে যস্য দক্ষিণ সীমতি ।
এতন্মধ্যে ত্রিবেকাখ্যাং দ্রুহ্য সুশাসিত ।
ত্রিবেগ রাজ্য আজ আর নেই । বহুকাল পূর্বেই তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে । সে সম্পর্কে শ্রদ্ধেয় অচ্যুতচরণ তত্ত্বনিধি তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ 'শ্রীহট্টের ইতিহাসে' লিখেছেন– "রুদ্র বংশের ত্রিপুর নামে এক নৃপতি কিরাত ভূমে রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করেন । পার্শ্ববর্তী রাজাদের অপেক্ষা তিনি ক্ষমতায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন । তাহার রাজধানী পূর্বকালে কামরূপের সন্নিকটে 'কোপিল' নদীর তীরে অবস্থিত ছিল । সে প্রাচীন রাজ্যের রাজধানীর নাম ত্রিবেগ । পরে কালের ক্ষয়ে এই নগরী বিলুপ্তি প্রাপ্ত হয়ে যায় । এবং কালক্রমে বর্তমান কাছাড় ও শ্রীহট্টের ভিন্ন ভিন্ন অংশে রাজধানী স্থাপিত হয় "
পরবর্তীকালে এই ত্রিবেগেই ত্রিপুরা নামে পরিচিত হয় । একটি মত বলছে, মহাভারতের যুগে মহারাজ দৈত্যের পুত্র ত্রিপুরা অঞ্চলের রাজা ছিলেন তখন এই রাজ্যের নাম ছিল কিরাত । মহারাজ ত্রিপুর কিরাত নামের বিলোপসাধন করে এই অঞ্চলের নাম রাখেন ত্রিপুরা এবং স্বজাতীয় লোকজনদের নাম রাখেন ত্রিপুরা জাতি । প্রাচীন রাজমালা লেখকগণ উল্লেখ করেন যে, মহারাজ যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের সময় সহদেব ত্রিপুরার রাজ্য জয় করেছিলেন । মহাভারতের সভা পর্বে মহাদেবের দ্বিগবিজয় অধ্যায়ে উল্লেখ আছে–
'মাদ্রী সুতন্ততঃ প্রায়াদ্বিজয়ী দক্ষিণাং দিশং ।
ত্রৈপুরং স্ববশে কৃত্বা রাজানমমিতৌজনম ।।'
কিন্তু এখানে 'দক্ষিণাং দিশং' শব্দটি নিয়ে এবং পরবর্তী অংশে সহদেব ত্রিপুরা রাজ ও গৌড়েশ্বরকে পরাজিত করে ঔরাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে এগিয়েছেন বলে বর্ণিত হওয়া ত্রিপুরার অবস্থান নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় অনেকে বলেছেন এটি মধ্য ভারতের অন্তর্গত জব্বলপুরের নিকটবর্তী কোনও অঞ্চল হতে পারে । কথিত আছে, ত্রিপুর ছিলেন এক প্রজাপীড়ক রাজা । কথিত আছে রাজা ত্রিপুরের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে প্রজাবর্গ দেবাদিদেব এর কাছে আকুল প্রার্থনা নিবেদন করলে স্বয়ং মহাদেব তার অমোঘ অস্ত্র ত্রিশূলের আঘাতে রাজা ত্রিপুরকে নিধন করে প্রজাগণকে রক্ষা করেন । বলা হয় এই ত্রিপুর রাজার নাম অনুসারে এই স্থানের নাম হয় 'ত্রিপুরা' । আবার কেউ কেউ মনে করেন ত্রিপুরা রাজ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ত্রিপুরেশ্বরী বা ত্রিপুরাসুন্দরীর আবাসভূমি বলে এই রাজ্যের নাম 'ত্রিপুরা' । প্রসঙ্গত, হিন্দু পুরাণে উল্লিখিত ত্রিপুরার পুরাতন রাজধানী উদয়পুরে অবস্থিত ত্রিপুরাসুন্দরীর মন্দিরে বা ত্রিপুরেশ্বরী মায়ের মন্দির দেবী সতীর ৫১ পীঠের এক পীঠ । এই পীঠস্থানে দেবীর ডান পায়ের গোড়ালি পড়েছিল বলে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে । পিঠ মালা গ্রন্থে উল্লেখ আছে–
'ত্রিপুরায়াং দক্ষিণপাদো দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী ।
ভৈরবস্ত্রিপুরশশ্চ সর্বাভীষ্ট ফলপ্রদঃ ।।'
অর্থাৎ ত্রিপুরা রাজ্যে সতীর দক্ষিণ চরণ পতিত হওয়ায় এখানে পিঠ দেবী ত্রিপুরা সুন্দরী এবং ত্রিপুরেশ ভৈরব অবতীর্ণ হয়েছেন । এটি ভারতের অন্যতম দেবীতীর্থ ।
যাইহোক, ত্রিপুরা নামের উৎপত্তি সংক্রান্ত যে মতবাদ গুলি রয়েছে সেগুলি ঐতিহাসিক যুক্তি নির্ভর নয় বা ঐতিহাসিক সত্যতার অনুকূলে নয়। কেননা প্রাচীন রাজা ত্রিপুরার কাহিনি নিছকই পৌরাণিক ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করার মত কোন উৎস নেই । তাছাড়া অধিষ্ঠাত্রী দেবী ত্রিপুরাসুন্দরীর নামানুসারে এই রাজ্যের নাম ত্রিপুরা এর স্বপক্ষে সত্যতা মেনে নেয়া যায় না । কারণ উদয়পুরে দেবী প্রতিষ্ঠিত হন ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে । এর অনেক পূর্বেই এই রাজ্যের নাম ত্রিপুরা ছিল বলে তথ্য রয়েছে ।
তাছাড়া মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্যের (১৮৬২-১৮৯৬) সময়ে রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত গ্রন্থের লেখক কৈলাসচন্দ্র সিংহ (১৩০৩ বঙ্গাব্দ ) মহাশয় ত্রিপুরা নামের উৎপত্তির বিষয়ে পূর্ববর্তী মতবাদের প্রতি সাড়া না দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নমত পোষণ করেন । তাঁর মতানুসারে'যে অনার্য কিরাতদিগকে আমরা তিপ্রা ( ত্রিপুরা ) আখ্যায় পরিচিত করিয়া থাকি, তাহাদের জাতীয় ভাষায় জলকে 'ত্যুই' বলে । এই ত্যুই শব্দের সহিত প্রা সংযুক্ত করিয়া ত্যুইপ্রা শব্দ নিষ্পন্ন হইয়াছে । সেই ত্যুইপ্রা হইতে তিপ্রা এবং তৃপুরা, ত্রীপুরা এবং ত্রিপুরা শব্দের উৎপত্তি । 'ত্যুই' এবং 'প্রা' এই দুই শব্দ মিলে তৈরি হয় 'ত্যুইপ্রা' । কিরাত জনজাতির ভাষায় ত্যুই শব্দের অর্থ জল এবং প্রা শব্দের অর্থ নিকটে বা কাছে । দুই জলধারা বা নদীর মিলনের স্থল । অতীতে কোন এক সময়ে ত্রিপুরার প্রাচীন কোন রাজা হয়তো মেঘনা বা ব্রহ্মপুত্র বা তার শাখা নদীর মোহনার তীরবর্তী জায়গায় রাজ্যপাট স্থাপন করেন । তাই সেই স্থানের নাম হয়ে যায় ত্যুইপ্রা । অর্থাৎ একসময় ত্রিপুরা রাজ্য সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তিনি তাঁর আলোচনায় প্রাচীন কুকিপ্রদেশ, মিতাই ( মনিপুর ) রাজ্য, কাছাড়, শিলহট্ট ( শ্রীহট্ট ), চট্টগ্রাম ও নোয়াখালি ত্রিপুরার অন্তর্ভুক্ত ছিল বলেও উল্লেখ করেন। কৈলাসচন্দ্র সিংহ মহাশয়ের এই মতবাদকে আজকের ইতিহাসকারগণ স্বীকার করেন । প্রাচীন রাজমালা গ্রন্থেও এই তথ্যের সত্যতা মেলে মহারাজ ধর্ম মানে কে রাজত্বকালে ( ১৪৩০খ্রি.-১৪৬২ ) তাঁর দুই সভা পন্ডিত শুক্রেশ্বর ও বানেশ্বর রচিত রাজমালা গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে–
কিরাত নগরের রাজা বিবিধ গঠন ।
রাজ্যের সীমানা কহি শুনহ বচন ।।
উত্তরে তৈরঙ্গ নদী, দক্ষিণের রসাঙ্গ ।
পূর্বেতে মেখলি সীমা পশ্চিমে কাচরঙ্গ ।।
ত্রিবেগ স্থানেতে রাজা করিল এক পুরী । নানা মত নির্মাইল পুরীর চত্তারি ।।
এই বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সমগ্র লুসাই প্রদেশ, মণিপুর রাজ্যের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকের কিছু পার্বত্য অঞ্চল, মধ্য ও দক্ষিণ কাছাড়, শ্রীহট্টের দক্ষিণাংশ, ঢাকার পূর্বাংশ, সমগ্র নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলার সমগ্র অঞ্চল এককালে ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল ।
ব্রহ্মের প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থে ত্রিপুরা রাজ্য 'পাটিকারা' নামে পরিচিত । খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে পূর্ববঙ্গের ত্রিপুরা জেলায় পাটিকারা নামে ছোটো একটি রাজ্যের অস্তিত্বের কথা জানা যায় । ব্রম্ভ দেশের সঙ্গে এই রাজ্যের যোগাযোগ ছিল । পাটিকারা রাজ্যের মুদ্রায় ষাঁড় ও ত্রিশূলের চিহ্ন লক্ষ্য করা গেছে । আরাকান রাজ্যের প্রাচীন ইতিহাসে ত্রিপুরা রাজ্যকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়েছে । আবার প্রাচীন মনিপুর রাজ্যে ত্রিপুরা রাজ্য 'একলেঙ' রাজ্য নামে পরিচিত ছিল । ভারতের প্রাচীন ইতিহাস লেখকগণ ত্রিপুরা রাজ্যকে 'জাজনগর' বা 'জাজিনগর' বলে বর্ণনা করেছেন । পূর্ববঙ্গে চন্দ্রবংশ নামে কোন এক বংশের কয়েকজন রাজা ৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন । এই চন্দ্রবংশীয় রাজাদের রাজধানী কুমিল্লার নিকট লালমাই পাহাড় অঞ্চলে ছিল বলে জানা যায় । তাঁরা বৌদ্ধধর্মের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন । চন্দ্র রাজাদের পতনের পর পূর্ববঙ্গে বর্মন রাজারা ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন তাদের রাজধানী ছিল ঢাকার বিক্রমপুর অঞ্চলে । এই বর্মন রাজাদের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজবংশের কোন প্রকার সম্পর্ক ছিল কিনা জানা যায় না ।
আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন মহোদয় তাঁর 'বৃহৎ বঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন– "ভারতবর্ষে বর্তমান কালে যত রাজ্য বিদ্যমান আছে তাহাদের মধ্যে ত্রিপুরার রাজবংশই প্রাচীনতম । আদিকাল হইতে ১৮৪জন রাজপুরুষের নাম আর কোন বংশে একাধারে পাই না । এই বংশের আদিপুরুষ দ্রুহ্যু কপিল নদীর তীরে ত্রিবেগনগরী স্থাপন করেন । লৌকিক বিশ্বাসে এই বংশ কিরাত বলিয়া অখ্যাত হইতেন । ত্রিপুরা রাজ্যের আর্য ও অনার্য শ্রেণীতে বিবাহাদির জন্য এই বংশে কিরাতও ঢুকিয়া ছিল । এই কপিল আশ্রম 'সাগর' নামক স্থানে অবস্থিত ছিল । সাগর সন্নিহিত বিস্তৃত ভূখণ্ড পাঁচটি সমৃদ্ধ নগরী ও দুই লক্ষ লোকসহ ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে জলপ্লাবনে ডুবিয়া গিয়াছে ।"
ত্রিপুরী সম্প্রদায় ও রাজ্যের মূল আদিবাসী নয় বলে পরিগণিত হলেও শুধু প্রাচীনকাল থেকে অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সন্নিহিত অঞ্চল বা রাজ্যসমূহ থেকে এই রাজ্যের প্রবেশ করেছে । ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব ও নৃবিজ্ঞানীগণ অভিমত প্রকাশ করে থাকেন যে, রাজ্যের সকল আদিবাসী সম্প্রদায়গোষ্ঠী সহস্রাবদের পূর্বে চীন দেশ পরিত্যাগ করে তিব্বত ও ব্রহ্মদের অতিক্রম করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে অনুপ্রবেশ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে । কালক্রমে ত্রিপুরা রাজ্যে প্রবেশ করে ত্রিপুরার আদিবাসী হিসেবে পরিগণিত হয় ।
অতীত ত্রিপুরা আদিবাসীদের বাসভূমি হলেও বর্তমান ত্রিপুরারাজ্য মিশ্র জনগোষ্ঠীর বাসভূমি । দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ও পরে বছরের পর বছর হিন্দু মুসলমানগণের সম্প্রদায়িক কলহের কারণে পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তান থেকে কাতারে কাতারে হিন্দু জনগণ ত্রিপুরা রাজ্যে প্রবেশ করার ফলে এখানকার আদিবাসীরা সংখ্যাগুরু থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে পরিণত হয় । তবে সুদূর ত্রিপুরা প্রাচীনকালেও, যখন এই রাজ্যের অধিবাসীরা সংখ্যাগুরু তদানীন্তন পূর্ববাংলার পূর্ব সীমান্ত সবটাই সবুজ বনানী ঘেরা অরণ্যকুন্তলার ছোট্ট পাহাড়ি রাজ্য ত্রিপুরা বর্তমানে উত্তর পূর্ব ভারতের সাত বোনের এক বোন । অর্থাৎ উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যের ( আসাম, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশ, মনিপুর, মেঘালয় ও ত্রিপুরা ) অন্যতম হচ্ছে ত্রিপুরা । আয়তনের দিক থেকে ছোটো হলেও শিক্ষা-সংস্কৃতিতে সে স্বকীয় মহিমায় উজ্জ্বল এবং সারা ভারতেই বিশেষভাবে আলোচিত একটি নাম ।
তদানীন্তন ব্রিটিশ শাসনকালে ত্রিপুরার অবস্থান ছিল একটি দেশীয় রাজ্য হিসেবে । ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে । ইংরেজের বর্বর শাসন সমাপ্ত হওয়ার পর রাজন্য ত্রিপুরা ভারত ডোমিনিয়ন এ যোগ দেয় । ত্রিপুরা ভারতের সঙ্গে কার্যকরীভাবে যুক্ত হয় ১৫ অক্টোবর ১৯৪৯ সালে । সেইসঙ্গে অবসান ঘটে ৫ শতকের মানিক্য রাজবংশের ধারাবাহিক শাসনক্রম । ১৯৫০ সালের ২৬ শে জানুয়ারি ভারতের নিজস্ব সংবিধান রচিত হয় । এবং ত্রিপুরা সেসময় 'গ' শ্রেনিভুক্ত রাজ্য হিসেবে তার যাত্রা শুরু করে । ১৯৫৬ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের সংবিধানের সপ্তম সংশোধন করা হয় ।এই সংশোধনীতে ভারতের রাজ্যগুলির পুনর্ববিন্যাস ঘটানো হয় । নতুন পুনর্বিন্যাসে ত্রিপুরা রাজ্যকে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয় । ১৯৭১ সালে উত্তর-পূর্ব এলাকাসমূহ পুনর্গঠন আইন প্রবর্তন করা হয় ।এ আইন অনুসারে ত্রিপুরা পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে 1972 সালের একুশে জানুয়ারি ।
রাজতন্ত্রের অবসান ও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা
দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনের পর লক্ষ লক্ষ ভারতীয় মহাত্মার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে অর্থাৎ ১৫ই আগস্ট ভারত ব্রিটিশের দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করে । এর ঠিক আগে ত্রিপুরার মহারাজা ছিলেন মহারাজ বীরবিক্রমকিশোর মানিক্য বাহাদুর । মহারাজা পরিকল্পনা করেছিলেন ত্রিপুরাকে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্তির । কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ভারতের স্বাধীনতার প্রাক লগ্নে ১৯৪৭ সালের ১৭ মে রাত আটটা চল্লিশ মিনিটে মহারাজ বীরবিক্রমকিশোর মানিক্য বাহাদুর পরলোক গমন করেন । বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুরের মৃত্যুর পর যুবরাজ কিরীটবিক্রম রাজ্যের রাজা হবার অধিকারী হলেও নাবালক হেতু রাজা হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি । তখন ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহারানী কাঞ্চনপ্রভা দেবীকে সভাপতি বানিয়ে কাউন্সিল অফ রিজেন্সি গঠন করা হয় ত্রিপুরার শাসনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ১৯৪৭ সালের ৮ই আগস্ট এই ঘোষণার দ্বারা কাউন্সিল অফ রিজেন্সি ত্রিপুরা শাসনভার গ্রহণ করে । উক্ত কাউন্সিল যাদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল তারা হলেন
১) মহারানী কাঞ্চন প্রভা দেবী–সভাপতি ২) মহারাজ কুমার ব্রজেন্দ্রকিশোর দেববর্মণ–সদস্য
৩) মেজর বঙ্কিম বিহারী দেববর্মন–সদস্য
৪) সত্যব্রত মুখোপাধ্যায়–সদস্য
ভারতের স্বাধীনতার সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ত্রিপুরার রাজতন্ত্রের সূর্য অস্তমিত হয় । ১৯৪৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নতুন দিল্লিতে ত্রিপুরার রিজেন্ট মহারানী কাঞ্চন প্রভা দেবী, তার নাবালক পুত্র কিরীটবিক্রমকিশোর মানিক্য বাহাদুরের পক্ষে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করে ত্রিপুরাকে ভারত সরকারের হাতে অর্পণ করে । এই সময় থেকে ত্রিপুরা ভারত সরকারের 'গ' শ্রেণি ভুক্ত রাজ্যের মর্যাদা পায় । মুখ্য প্রশাসক বা চিফ কমিশনার প্রশাসনিক পদে বৃত হন । ত্রিপুরার প্রথম চিফ কমিশনার পদে শ্রী রঞ্জিত কুমার রায় ১৯৪৭ সালের ১৫ অক্টোবর নিযুক্ত হন । প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর চিফ কমিশনারের উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন শ্রী শচীন্দ্রলাল সিংহ, শ্রী সুখময় সেনগুপ্ত এবং জিতেন্দ্র দেববর্মা । ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠিত হয় । ফলে ত্রিপুরা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয় । ১৯৫৬ সালে নতুন করে আঞ্চলিক পরিষদীয় আইন অনুযায়ী ত্রিপুরায় আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হয় । মোট ৩২ জন সদস্যবিশিষ্ট আঞ্চলিক পরিষদের দুজন সদস্য সরকার কর্তৃক মনোনীত হয় । বাকি ৩০জন সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয় । ১৯৬৩ সালের মে মাসে ভারতের রাষ্ট্রপতির সম্মতিক্রমে কেন্দ্রের অধীনস্থ আইন আঞ্চলিক আইন কার্যকরী হয় এবং আইন মোতাবেক সংবিধানের ২৩৯ ধারা বলে কেন্দ্রশাসিত রাজ্যসমূহের জন্য রাষ্ট্রপতি একজন প্রশাসক নিযুক্তির প্রচলন করেন ।
আঞ্চলিক আইন বলবৎ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্রিপুরায় আঞ্চলিক পরিষদীয় ব্যবস্থার অবসান হয় এবং সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ১৯৬৩ সালের পয়লা জুলাই ত্রিপুরায় জনপ্রিয় মন্ত্রিসভা গঠিত হয় শ্রীশচীন্দ্রলাল সিংহের নেতৃত্বে । গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও পরিবর্তিত হয় । এবং এই কাঠামো চলতে থাকে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত । এইভাবে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয় ।
ত্রিপুরা রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষের গণতান্ত্রিক আশা ও অধিকার কে পূর্ণ মর্যাদা দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের পার্লামেন্ট আইন মোতাবেক ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের একুশে জানুয়ারি ত্রিপুরাকে পূর্ণরাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয় । ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস বিপুল ভোটে জয়ী হয় এবং সেই সুখময় সেনগুপ্তের নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা গঠিত হয় । ত্রিপুরা পূর্ণ রাজ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের প্রথম রাজ্যপাল নিযুক্ত হন শ্রীযুক্ত ব্রজকুমার নেহেরু, আইএএস । এভাবে প্রাচীন রাজন্যশাসিত ত্রিপুরা একটি গণতান্ত্রিক পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা প্রাপ্ত হয় ।
সীমানা ও আয়তন
ত্রিপুরার ভৌগোলিক অবস্থান একটি নির্জন দ্বীপের মত । প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেন পাকস্থলীর মত ঢুকে রয়েছে । কারণ উত্তর, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম এই তিন দিক দিয়ে বাংলাদেশ ত্রিপুরাকে ঘিরে রেখেছে । উত্তরে আসাম ও পূর্বে মিজোরাম রাজ্যের সামান্য কয়েক কিলোমিটার সীমানা ত্রিপুরাকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে । উত্তর পশ্চিমে আসাম রাজ্যের কাছাড় জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার সঙ্গে ত্রিপুরার সীমানা মাত্র ৫৩ কিলোমিটার এবং পূর্বে মিজোরাম রাজ্যের সঙ্গে এর সীমানা মাত্র ১০৯ কিলোমিটার । প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে এর আন্তর্জাতিক সীমানা ৮৩৯ কিলোমিটার । বাংলাদেশের সিলেট জেলা কুমিল্লা জেলা পূর্ব দিক ঘিরে রেখেছে । ত্রিপুরার বর্তমান আয়তন ১০৪৯১ বর্গ কিলোমিটার । সর্বাধিক বিস্তৃতি ১৮৪ কিলোমিটার । ত্রিপুরা রাজ্য ২৪'৫৬ ও ২৪'৩ ২ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১'১০ ও ৯২'২১ পূর্ব দ্রাঘিমা রেখায় অবস্থিত । প্রসঙ্গত, উত্তর পূর্বাঞ্চলের ৭ রাজ্যের মধ্যে ক্ষুদ্রতম রাজ্য এই ত্রিপুরা ।
নদ-নদী
ত্রিপুরা রাজ্যে অগণিত ছোট ছোট পাহাড়ি নদী দেখা যায় । নদীগুলি প্রধানত উত্তর দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত উত্তরবাহিনী নদী গুলির মধ্যে প্রধান হচ্ছে খোয়াই, ধলাই, মনু,দেও,লঙ্গাই ও জুড়ি । দক্ষিণ বাহিনী নদী গুলির মধ্যে আছে মুহুরী ও ফেনী । এছাড়াও রয়েছে গোমতী, হাওড়া ইত্যাদি । পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট বড় ছড়া ত্রিপুরা নদীকে স্রোতস্বিনী করে রেখেছে তবে সবগুলো নদী সারা বছর নৌ চলাচলের উপযোগী নয় । কারণ সব ঋতুতে জলসীমা সমান থাকে না । ত্রিপুরার প্রধান নদীর নাম গোমতী । এর দুটি উপনদী রয়েছে রাইমা ও সরমা । এ দুটির সঙ্গমস্থল হল দুচারিবাড়ি । ওখানে রাইমা ও সরমা এক হয়ে গোমতী নামে আত্মপ্রকাশ করেছে । তীর্থমুখের কাছে ডম্বুর জলপ্রপাত সৃষ্টি করে গোমতী সমভূমিতে নেমে এসেছে । প্রতিবছর মকর সংক্রান্তিতে তীর্থ মুখে বিরাট মেলা বসে । গোমতী ত্রিপুরার পবিত্র নদী । ওইদিন পূণ্যার্থীরা গোমতী নদীর জলে অবগাহন করে গঙ্গাস্নানের তৃপ্তি লাভ করে থাকেন । প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'বিসর্জন' নাটকে বর্ণিত উদয়পুরের ভুবনেশ্বরী মন্দির এই গোমতীর পাড়ে অবস্থিত । রাজর্ষি উপন্যাসে হাসি ও তাতা যে ঘাটের সোপানে রক্তের দাগ দেখে রাজাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, 'এত রক্ত কেন ?' দুই ভাই বোনের কচি কচি হাত দিয়ে যে ঘাটের রক্তের দাগ মোছার চেষ্টা করেছিল সেই ঘাট বা সোপান এই গোমতীর তীরে অবস্থিত যার চিহ্ন আজও বর্তমান ।
পাহাড়-পর্বত
ত্রিপুরার ভূমিভাগ উঁচু-নিচু অগভীর এবং প্রশস্ত উপত্যকা সংকুল । তরঙ্গায়িত পাহাড়ের অভ্যন্তরে রয়েছে বালি পাথর আর এঁটেল স্তরিভূত মাটি । ত্রিপুরার প্রায় ৭০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে এই তরঙ্গায়িত পাহাড় শ্রেণী । আছে টিলাভূমি এবং অবশিষ্ট অংশে রয়েছে টিলা ভূমির পাদদেশ বা উর্বর নিম্নভূমি বা লুঙ্গাভূমি । আর আছে নদী উপত্যকায় অবস্থিত কিছু সমভূমি । ত্রিপুরার পাহাড়গুলি মূলত উত্তর দক্ষিণের প্রসারিত রয়েছে । এই পাহাড়শ্রেণীতে প্রধানত পাঁচটি রেঞ্জ আছে । পাহাড় শ্রেণীর গুলির মধ্যে প্রধান হল বড়মুড়া, আঠারো মুড়া, লংতরাই, জম্পুই এবং শাখানটাং । রাজ্যের উচ্চতম পাহাড় হচ্ছে জম্পুই রেঞ্জ । এর দৈর্ঘ্য ৭৪ কিলোমিটার । উচ্চতা ৯৩৯মিটার । এই পাহাড়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম বেতলিং শিপ । দ্বিতীয় স্থানে আছে আঠারোমুড়া । এর দৈর্ঘ্য ১০৬ কিলোমিটার । এর উচ্চতম শৃঙ্গ হল জারিমুড়া এবং এর উচ্চতা ৪৮১মিটার ।
কৃষিজ, ও প্রাকৃতিক সম্পদ :-
উত্তরপূর্ব ভারতের কোলে তার ছোট্ট সন্তান । ত্রিপুরা কৃষিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ । পাহাড় পর্বতময় এই রাজ্যটির অধিকাংশ সবুজ বনানীতে ঘেরা ।এখানে সমতল ও পাহাড়ে জাতি-উপজাতি জনগোষ্ঠীর অনাদিকাল থেকে বসবাস করে আসছে । ত্রিপুরার সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে জীবিকা নির্বাহের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ । এই সম্পদসমূহ ত্রিপুরার অধিবাসীদের প্রাণধারা কে সমৃদ্ধ করে রেখেছে ।
পার্বত্য ত্রিপুরার প্রায় ৬৯ শতাংশ বনাঞ্চল এবং প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ । ত্রিপুরার অধিবাসীরা কৃষি ও অরণ্য নির্ভর জীবনজীবিকা নির্বাহ করে থাকেন । ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে বন বনানীতে, পাহাড়ে পর্বতে, নদ-নদীতে । বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আধুনিক ত্রিপুরায় গ্যাস ও তেলের খনির সন্ধান পাওয়া গেছে । মাটির নিচে প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে আছে এই খনিজ সম্পদসমূহ । ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সম্পদকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় । একটি হচ্ছে জৈব ও আন্যটি অজৈব । জৈব প্রাকৃতিক সম্পদ গুলি হল- বাঁশ, কাঠ, বিভিন্ন ধরনের পশু, পাখি ইত্যাদি । অজৈব প্রাকৃতিক সম্পদ হল খনিজতৈল ও প্রাকৃতিক গ্যাস । কৃষিজাত দ্রব্যের মধ্যে চা ও রাবার ত্রিপুরার প্রধান শিল্পদ্রব্য । এছাড়া ত্রিপুরার মাটিতে গম, ধান, পাট, তিল, সরিষা, মেস্তা, আলু এবং বিভিন্ন ফল প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয় । ত্রিপুরার বনাঞ্চলে কড়ই,জাম, শাল, সেগুন, গামাই, জারুল, আউয়াল, কনক, গর্জন,চামল মেহগনি ইত্যাদি মূল্যবান গাছ পাওয়া যায় । এই গাছগুলির গৃহনির্মাণ, আসবাবপত্র, জ্বালানি কাঠ, এবং পারিবারিক ও সামাজিক চাহিদা পূরণ করে । ত্রিপুরার অরণ্যে নানারকম ভেষজ গাছগাছালিও রয়েছে । ত্রিপুরার বাঁশ বেতের কুটির শিল্প দেশ-বিদেশে সমাদৃত । ত্রিপুরার বাঁশ বেত দিয়ে তৈরি হয় সৌখিন আসবাবপত্র, আইসক্রিমের কাঠি, টুকরি,ধারী, ধূপকাঠির শলাকা, খেলনা, মোড়া, ঘরের বেড়া, ঘরের খুঁটি ইত্যাদি । এগুলো ত্রিপুরার অর্থকরী ফসল । ত্রিপুরার বন্যপ্রাণীর মধ্যে হাতি, নেকড়ে, হরিণ, শূকর, ভাল্লুক, চিতাবাঘ বনমোষ, শিয়াল, সজারু, বন বিড়াল, রামছাগল, বাইসন, বনরুই, বানর, হনুমান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । ত্রিপুরার বনাঞ্চলে টিয়া, কাকাতুয়া, ধনেশ, ময়না, ফিঙে, কবুতর, ডাহুক, হাঁস, মোরগ, চিল, শকুন, সারস,বুলবুল, বাবুই, চড়াই ইত্যাদি নানা রকমের পাখি দেখতে পাওয়া যায় । ত্রিপুরায় প্রচুর দিঘি, নদনদী, জলাশয় ও হ্রদ রয়েছে । এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যায় ।
ত্রিপুরার বাংলা কাব্যের হাজার বছর
ত্রিপুরা রাজ্যের প্রাচীন ইতিহাস সম্বন্ধে আজও তেমন গবেষণা হয়নি । মোটামুটি ভাবে এই রাজ্যের ইতিহাসের শুরুর প্রামাণ্য প্রমাণ পাওয়া যায় ১৪৬৪ খ্রিস্টাব্দের প্রথম রত্ন মানিকের সময় থেকে । তার পূর্বের কোন ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে শিলালিপি, তাম্রলিপি, মুদ্রা, স্থাপত্যকীর্তি, দলিল-দস্তাবেজ ইত্যাদির নিদর্শন পাওয়া যায় না । শুধুমাত্র ইতিহাস সূত্র থেকে জানা যায় বাংলার সুলতান রুকুন-উদ্দিন-বার-বাক-শা-র (১৪৫৯-১৪৭৪খ্রি. ) কাছ থেকে রত্নফা প্রথম মানিক্য উপাধি পেয়েছিলেন । এর কাছাকাছি সময়ে বঙ্গের আরেক সুলতান ছিলেন নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৩৯-১৪৫৯ খ্রি. ) কিন্তু তার আগেও যে এই অঞ্চলে জনবসতি ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় । যেমন বক্সনগর এর বৌদ্ধসভ্যতা (পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী ) পিলাকের বৌদ্ধ সভ্যতা ( নবম থেকে দশম শতাব্দী ) এবং সন্নিহিত অঞ্চল ময়নামতি বা লালমাইয়ের প্রাচীন সভ্যতা ইত্যাদি । তবে বহু প্রাচীনকাল থেকে যে এখানে অন্য জাতি গোষ্ঠীর লোক ছিল তার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ রাজমালায় পাওয়া যায় । রাজমালার যুঝার খন্ডে উল্লেখ আছে–
রাঙ্গামাটি দেশেতে যে লিকারাজা ছিল
সহস্র দশেক শূন্য তাহার আছিল ।
ত্রিপুর সৈন্য যুদ্ধ করে পরিপাটি
ভঙ্গ দিয়া সব লিখা গেল রাঙ্গামাটি ।
এই দুটি শ্লোক থেকে জানা যায় যে, একসময় এই অঞ্চলে লিকা নামে একটা জাতি গোষ্ঠী বাস করত । আনুমানিক ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা হিমতিফা বা যুঝারফা রাঙ্গামাটি জয় করে দেশ বিজয়ের স্মৃতিস্বরূপ তার পূর্বপুরুষের নামানুসারে ত্রিপুরাব্দ প্রচলন করেন । জানা যায় যে, এই লিকা জাতি হল ত্রিপুরার জনপদের আদি পুরুষ । অনেকে এই লিকা জাতিকে মগজাতি নামে চিহ্নিত করেন । তাহলে এটা বোঝা যায় যে, ত্রিপুরায় অতি প্রাচীনকালে মগ জাতির লোকেরা বসবাস করতেন ।
ত্রিপুরার ইতিহাস চর্চা করলে দেখা যায় যে পিলাক বৌদ্ধ সভ্যতার প্রাচীন নিদর্শন । পিলাক এবং লিকা শব্দ দুটির সঙ্গে মগ ভাষার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে । মগদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও জানা যায় যে, তারা আরাকানের অধিবাসী ছিলেন । আরাকানের রাজা ধর্ম বিজয় (৬৬৫-৭০১ খ্রি. ) চট্টগ্রাম ও সমতটসহ বর্তমান ত্রিপুরা অঞ্চল দখল করেছিলেন । মগজাতির মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তাদের পূর্বপুরুষেরা পাকাপাকিভাবে ত্রিপুরায় এসেছিলেন ৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে ।
এছাড়া ত্রিপুরা রাজ্যে প্রাচীনকাল থেকে চাকমা জাতি অবস্থান করার কথাও কোথাও কোথাও উল্লেখ রয়েছে । রাধামন ধনপুদি ও চাদিগাঙ ছারা পালা এই পুরাকাহিনি দুটিতে চাকমা জাতির আদি উৎস সম্পর্কে জানা যায় যে, চাকমারা একসময় চম্পক নগরে বাস করতেন । আবার চাকমা সমাজের প্রচলিত একটি গানে জানা যায় যে চাকমারা চম্পকনগর নয়, নুরনগরে বাস করতেন ।
ডোমে বাজায় ঢোল ডগর
ফেনী যেইয়ুম নুরনগর ।
এই নুরনগর ত্রিপুরায় অবস্থিত । ত্রিপুরায় গোমতী নদীর উৎস সম্বন্ধে যে আখ্যান প্রচলিত আছে তা চাকমা সমাজ এখনো পবিত্র বলে মনে করেন । পার্বত্য ত্রিপুরার সাথে চাকমাদের যোগসুত্র রয়েছে অতি প্রাচীনকাল থেকেই । ধরে নেওয়া হয় প্রাচীন ত্রিপুরায় মগ ও চাকমা জাতি সমসাময়িককালে পাশাপাশি অবস্থান করতেন । উভয় সম্প্রদায়ের লোকই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন । রাজমালার আরেকটি পদে লিকাদের সহযোগী হিসেবে জানা যায়–
ধামাই জাতি পুরোহিত আছিল তাহার ।
অভক্ষ্য না খায়ে তারা সুভক্ষ্য ব্যভার ।।
আকাশেতে ধৌত বস্ত্র তারা হ শুকায় ।
শুকাইলে সেই বস্ত্র আপনে নামায় ।।
বছরে বছরে তারা নদী পূজা করে ।
এখানে উল্লেখ্য যে, চাকমাদের একটা গোজার গোষ্ঠীর নাম ধামেই গোঝা । লিকার সঙ্গে তারাও যে বসবাস করত, এখানে প্রকারান্তরে তা বোঝা যায় । আর চাকমাদের সংস্কৃতিতে নদী পূজার প্রচলনও রয়েছে । বৌদ্ধ শ্রমণরা এক বস্ত্র ব্যবহার করতেন এবং ধৌত করার পর তা রৌদ্রে শুকানোর জন্য মেলে দিতেন । এইসব তথ্য থেকেও অনুমান করা যায় যে, সেকালে চাকমারাও এখানে বসবাস করতেন । তাহলে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ত্রিপুরা রাজ্যে যে সমস্ত প্রাচীন বৌদ্ধ সংস্কৃতি নিদর্শন পাওয়া যায় তা এই দুই জাতিগোষ্ঠীর দ্বারা সৃষ্ট । যেহেতু পরবর্তী সময়ে তাঁরা ত্রিপুরার রাজের হাতে পরাজিত হন সেকারণে বিজিত জাতির চিহ্নিত নিদর্শন এর উপর থেকে পরবর্তী রাজকুল দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন এবং ইতিহাসের তার কোনও উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না ।
২) বাংলা সাহিত্যের আদি যুগ ও ত্রিপুরার বাংলা কাব্য
ত্রিপুরার বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সমকালীন বা উভয়েই একই ইতিহাসের সূত্র থেকে সৃষ্ট তা অবশ্যই বলা যেতে পারে । বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে যে গ্রন্থটি প্রামাণ্য বলে গবেষকদের স্বীকৃতি লাভ করেছে সেটি হল চর্যাপদ । চর্যাপদের পদ সমূহ সম্পর্কে জানা যায় যে, সেগুলি বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণের সাধনার গুঢ় তত্ত্বসমূহের ব্যাখ্যা সম্বলিত যা গানের মাধ্যমে পরিবেশিত হত । এই সমস্ত পদের বহিরঙ্গে সাধারণ জনজীবনের চিত্র ফুটে উঠত এবং তার গভীরে সাধনার নিগূঢ় তত্ত্বকথাকেই এক আলো-আঁধারি ভাষায় ব্যাখ্যা করা হত । যার পাঠোদ্ধার শুধুমাত্র বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের দ্বারাই সম্ভব ছিল এবং তা তাদের সাধনার বিষয় ছিল ।
চর্যার পদসমূহে সমকালীন জনপদ জীবনের যে চিত্র পাওয়া যায় তা প্রাচীন বঙ্গ জনপদের চিত্রকেই নির্দেশ করে । প্রাচীন ত্রিপুরা ভূখণ্ড শুধুমাত্র পার্বত্য ত্রিপুরাকে কেন্দ্র করেছিল না ত্রিপুরা রাজ্যের সীমা একসময় সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । এই জনপদ একসময় 'হরিকেল মন্ডল' নামেও পরিচিত ছিল । পরবর্তী সময়ে ত্রিপুরা রাজ্যের সৃষ্টি হয় । আধুনিক গবেষণা কর্ম থেকে জানা যায় যে, বর্তমান ত্রিপুরার বেশিরভাগ অঞ্চলসহ কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম অঞ্চল চতুর্থ শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত 'সমতট' রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । পরবর্তী সময়ে হরিকেল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় । এই ভূখণ্ড 'বঙ্গাল' নামেও পরিচিতি লাভ করে । এই বঙ্গাল ভূখণ্ডের একাংশ প্রাচীন ত্রিপুরার অন্তর্গত ছিল । চর্যার পদসমূহে বঙ্গাল এবং এই ভূখণ্ডের অধিবাসী বাঙালির উল্লেখযোগ্য পাওয়া যায় যেমন–
আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভৈলী ।
নিঅ নারী ছাড়ি চন্ডালী লেলী
কিংবা 'অদ্বয় বঙ্গালে ক্লেশ লুড়িউই', –ইত্যাদি পদ তারই নিদর্শন ।
চর্যার জীবনচিত্রসমূহকে বিশ্লেষণ করলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা ত্রিপুরার আদিবাসী জীবনপ্রণালীর সঙ্গে হুবহু মিলে যায় । নিচে এই বিষয়ে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হল–
১. তাঁতবোনা ও চাঙ্গাড়ী তৈরি করা :-
'তান্তি বিকণঅ ডোম্বি অবর না চঙ্গেড়া ( চর্যা-১০ )
২. মদ চোলাই করা :-
এক সুন্ডিনি দুই ঘরে সান্ধঅ
চিঅন বাকলঅ বারুণি বান্ধঅ ( চর্যা-৩ )
৩. ধান, কার্পাস বোনা :-
ক) ধুকড় এসে রে কপাসু ফুটিলা
খ) কঙ্গুচিনা পাকেলা রে শবরাশবরি মাতেলা ( চর্যা-৫ )
৪. তুলো ধুনা ও মোটা কাপড় বোনা :-
ক) তুলা ধুনি ধুনি আঁসু রে আঁসু ( চর্যা-২৬ )
খ) আঁসু ধুনি ধুনি নিরবর সেসু
( ঐ )
৫) গাছ কেটে কাঠের কাজ করা :-
ক) কাড্ডিঅ মোহতরু পাটি জোড়িঅ ( চর্যা-৫ )
খ) ছেবহ সো তরু মূল ন ডাল ( চর্যা-৪৫ )
এছাড়া চর্যাপদের আরো কিছু উদাহরণ তুলে দেওয়া যায় যার পারিপার্শ্বিক ব্যাখ্যা করলে এই প্রত্যয়ও জন্মে যে, ত্রিপুরার সাহিত্যের আদিমতম নির্ভর নিদর্শন হিসেবে চর্যাকে মান্য করতেই হয় । চর্যার কিছু কিছু পদে যেমন পাই–
১. টালত ঘর মোর নাহি পরিবেষী ( চর্যা-৩৩ )
২. উঞ্চা উঞ্চা পাবত তঁহি বস ই শবরী বালী
মৌরঙ্গী পিচ্ছ পিরহিন গীবত গুঞ্জরী মালী ( চর্যা-২৮ )
৩. কাহেরে ঘিনি মেলি অচ্ছহু কীস
বেড়িল হাঁক পড়অ চৌদিস ( চর্যা-৬ )
প্রথম পদটির ব্যাখ্যায় পাই যে, টিলার উপর আমার ঘর প্রতিবেশী নেই । এই পদটিকে অনুধাবন করলে আমরা দেখি যে টিলার উপরে বিচ্ছিন্নভাবে বসতি স্থাপন করে আমাদের এই রাজ্যের আদিম অধিবাসীরা বহুকাল আগে থেকেই বসবাস করে আসছেন । দ্বিতীয় উদাহরণ থেকে পাই যে, উঁচু উঁচু পর্বতে শবর বালিকা বাস করে । পার্বত্য ত্রিপুরার ভূখণ্ডও এইরূপ উঁচু উঁচু পর্বত বেষ্টিত এছাড়া এই ভূখণ্ডে যে প্রাচীন জনজাতি বাস করত তার মধ্যে সবর হো মুন্ডা বীরহোড় এরা তো ছিলই । এই পদে তো তাদেরই একটি জনগোষ্ঠীর বালিকার অবস্থানের কথা বলা হচ্ছে । বনমোরগের পালক চুলে গোঁজা কিংবা গলায় গুঞ্জা জাতীয় ফুলের মালা পরিধান করা ত্রিপুরা রাজ্যের জনজাতীয় গোষ্ঠীর মহিলাদের অঙ্গরাগের একটি স্বীকৃত নিদর্শন । নৃতত্ত্বের বিশেষজ্ঞগণ এই অঞ্চলের প্রাচীন অধিবাসীদের কিরাত নামেও অভিহিত করেছেন এই কিরাতরা মূলত ছিল শিকারজীবী । উদ্ধৃত তৃতীয় পদটিতে বনভূমিকে ঘিরে ধরে ধাওয়া করে পশুশিকার করার আদিম পদ্ধতির বর্ণনা করা হয়েছে । এখানে বর্ণিত হয়েছে কিভাবে শিকারীরা দলবদ্ধভাবে বনের হরিণ শিকার করে । চর্যাপদ থেকে এ ধরনের আরও বহু উদাহরণ ধরে ধরে ব্যাখ্যা করা যায় যে, এর মধ্যে এমন বহু স্থানিকচিত্র ও যাপনচিত্র পাওয়া যায় যা চর্যাপদের পটভূমি এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই প্রতীয়মান হয়েছিল বলে সিদ্ধান্তে আসা যায় ।
ত্রিপুরা রাজ্যের জনজাতিদের একটি জনগোষ্ঠীর নাম চাকমা । এই চাকমা জাতি একসময় ত্রিপুরা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়েই বসবাস করতেন । বর্তমানে এই জাতিগোষ্ঠীর বৃহদংশই পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং বিচ্ছিন্নভাবে ত্রিপুরার বিভিন্ন স্থানে, মিজোরাম ও মনিপুরে বসবাস করে আসছেন । এই চাকমা জাতিদের ভাষা চাকমাভাষা নামে পরিচিত । আপাত দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলে এই ভাষা বাংলা ভাষার অপভ্রংশ বলে মনে হয় । বিশেষত চট্টগ্রামের যে বাংলা উপভাষা প্রচলিত আছে তার সঙ্গে চাকমা ভাষার বেশ একটা নৈকট্য রয়েছে । চর্যাপদের ব্যবহৃত বহু শব্দ হুবহু চাকমা ভাষায়ও ব্যবহৃত হয় । যেমন খুন্,টি সিয়াল, বাঞ্ঝা, ছিনাল ইত্যাদি বহু শব্দ এমনকি বাক্যগঠনের ক্ষেত্রেও প্রকরণগত মিল পাওয়া যায় চর্যাপদ ও চাকমা ভাষার মধ্যে ।
পূর্বাহ্নেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বংগাল ভূখণ্ডের একটা অংশ একসময় ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । চর্যার পদকর্তাগণের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন বংগালের অধিবাসী । এই বঙ্গাল ভূখণ্ডের একাংশ একসময় ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । চর্যার সিদ্ধাচার্যদের অন্যতম ডোম্বি ( চর্যাপদ-১৪ রচয়িতা ) ত্রিপুরার রাজা বলে গবেষকরা অনুমান করছেন । চর্যাকরদের কেউ কেউ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন । এক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিবাচক বা জাতিবাচক ছদ্মনাম ব্যবহার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় । যেমন কাঞ্চন, তাড়ক, তান্তি, তাপ্ত, গুণ্ডরী ইত্যাদি। ডোম্বি ও সম্ভবত ছদ্মনাম বা উপাধি ।
উপর্যুক্ত বিষয়গুলি বিচার-বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, ত্রিপুরার বাংলাকাব্য চর্চার ইতিহাস বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সমকালীন । পাশাপাশি একথাও জোরালোভাবে বলা যায় যে, ত্রিপুরার সাহিত্যচর্চার বোধন হয়েছিল বাংলা সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়েই । সেই হিসেবে চর্যাপদকে ত্রিপুরা রাজ্যের সাহিত্য চর্চার আদি নিদর্শন হিসেবে মেনে নিতেই হয় ।
খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীকাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের আদিযুগ বলে গবেষকরা বিচার করে থাকেন । এই যুগেই চর্যাপদ রচিত হয় । চর্যাপদ ছাড়া এই সময়ে আরও একটি ধর্মকেন্দ্রিক সাহিত্যের নিদর্শন পাওয়া যায় অনুমান করা হয় এটি চ 😘র্যার পরে পরেই রচিত হয় এবং তার উপর চরযার প্রভাব রয়েছে । এই সময়ে নাথ ধর্মচর্চা বাংলা বিশেষত পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিকাশ লাভ করে । বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের সাধনপ্রণালীর প্রভাব নাথধর্মের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয় । গবেষকদের সিদ্ধান্ত, যখন বৌদ্ধধর্ম বাংলাদেশে প্রায় বিলুপ্তির পথে বা হুমকির সম্মুখীন হয় ব্রাহ্মণ্যবাদের আক্রমণে, সেই সময়েই বুদ্ধের ধ্যানী প্রতিমূর্তিটি শিব প্রতিকৃতিতে রূপান্তরিত হয় । বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ শৈব যোগীতে রূপান্তরিত হয়ে আত্মগোপন করেন । ফলে বৌদ্ধদের যোগসাধনার প্রণালী শৈববদের মধ্যেও প্রবাহিত হয় । নাথ যোগীগণ শৈব ধর্মের অনুসারী নাথগুরু হলেন গোরক্ষনাথ এবং তাঁর গুরু মীননাথ নাথ ধর্মতত্ত্বের বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে আদিযুগের শেষার্ধে রচিত হয় গোরক্ষবিজয়, মীনচেতন, গোপীচন্দ্র সন্ন্যাস ইত্যাদি কাব্য চর্যাগীতির সঙ্গে নাথসাহিত্যের অনেক বিষয়ে সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায় । চর্যাপদে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তাকে বলা হয় সন্ধ্যাভাষা । নাথসাহিত্যেও এই সন্ধ্যা ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় । এছাড়া চর্যাপদের মধ্যে কিছুটা হেরফের ঘটিয়ে নাথসাহিত্যে তার ব্যবহার হতে দেখা গেছে । যেমন–
১. গুরু বোব সে সীসা কাল ( চর্যা ৪০ সংখ্যক )
অনুরূপ– কালা ভাইএ গীত গাহে বোবা ভাইএ রহি সুনে ( গোরক্ষবিজয় )
২. বলদ বিআঅল গবিআ বাঁঝে
পিটা দুহিঅই এ তীনা সাঁঝে
নিতি নিতি সিআলা সিহে সম জুঝই
ঢেন্ঢন পাএর গীত বিরলে বুঝই ।
অনুরূপ– বলদ প্রসব হইল গাই হইল বাঞ্ঝা
বাছুরেক দোহাএ তাহার দিন তিন সাজা
শৃগাল হইয়া সিংহের সঙ্গে যুঝে কুটিকের মধ্যে গুটিকে তাহা বুঝে ( গোপিচন্দ্রের সন্ন্যাস )
নাথথধর্মকে বিশেষভাবে বাংলার ধর্ম মনে করার কারণ নাথসাহিত্যে যেসব স্থানের নাম পাওয়া যায় তাদের অনেকগুলি এদেশের মীননাথ, জালন্ধরী পা ও কানুপা চর্যাগীতির লেখক বলে তাঁদের এই অঞ্চলের লোক বলে গ্রহণ করতে হয় । বঙ্গের রাজা গোবিন্দচন্দ্র (গোপীচাঁদ ) রাজেন্দ্র চোলের তিরুমলয় শিলালিপির ( একাদশ শতক ) সমসাময়িক মঙ্গল দেশের রাজা গোপীচন্দ্রের সঙ্গে অভিন্ন বলে পন্ডিতেরা মনে করেন । তাঁর সময় চর্যাগীতির রচনাকালের মধ্যেই পড়েছে ।
এখানে উল্লেখ্য যে, নাথসাহিত্যের নিদর্শন গোপীচন্দ্রের গানের পটভূমি ময়নামতি অঞ্চল পূর্বতন জেলা ত্রিপুরা বাস সমতল ত্রিপুরার কুমিল্লা সন্নিহিত স্থান যা আজও বর্তমান । সমতল ত্রিপুরা সহ চাকলা রোসনাবাদ এক সময় ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । চর্যাগীতির টিকায় মীননাথের লেখা একটি চর্যাগীতির কিছু অংশ উদ্ধৃত আছে । এই মীননাথ হলেন গোরক্ষনাথের গুরু । গোপীচন্দ্রের গুরু হাড়ি পা । মানিক চন্দ্রের স্ত্রী গোপীচন্দ্রের মা সিদ্ধা ময়নামতির নামে স্থাননাম হয়েছে ময়নামতি । চর্যাপদের অনেক পরে এই কাব্যগ্রন্থ দুটি রচিত হলেও এই দুটি কাব্যগ্রন্থ যে ত্রিপুরার নিজস্ব কাব্যসম্পদ তা বলার অপেক্ষা রাখে না । চর্যার পদকর্তাগণ এবং গোপীচন্দ্রের গুরুর নামের শেষে যুক্ত 'পা' পদবীটি ত্রিপুরার আদি রাজাগণের নামের শেশেও যুক্ত থাকতে দেখা যায় কিঞ্চি পরিবর্তিত হয়ে 'ফা' হিসেবে । ত্রিপুরার রাজা রত্নফা পরবর্তী সময়ে রত্ন মানিক্য নাম ধারণ করেন ।
মহারাজা ধন্য মানিক্যের ১৪৯০-১৫২২ ) আমলে স্বয়ং মহারাজ স্বীয় উদ্যোগে সংস্কৃত ভাষার কয়েকটি গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন । সেগুলো হল 'রামায়ণ' ও 'প্রেত চতুর্দশীর গীত' । এছাড়া দুটি জ্যোতিষ বিষয়ক গ্রন্থ ও ছিল যথাক্রমে 'উৎকল খণ্ড পাঁচালী' ও 'যাত্রা করনিধি' ।
এই পর্যায়ে ত্রিপুরায় সাহিত্যচর্চা বলতে সংস্কৃত সাহিত্য থেকে অনুবাদ কর্মই বেশি লক্ষ্য করা যায় । এই সময় মহারাজ জগৎ মানিক্য, মহারাজ কৃষ্ণ মানিক্যের মহিষী জাহ্নবী দেবী প্রমুখগণ সংস্কৃত গ্রন্থ অনুসারী কিছু বচনাদি রচনা করেন ।
ত্রিপুরার ইতিহাসগ্রন্থ লেখক কৈলাসচন্দ্র সিংহ উল্লেখ করেছেন যে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মহারাজ প্রথম রত্ন মানিকের সময়ে মুসলমানদের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজাদের সম্পর্ক শুরু হয় । তখন থেকে ত্রিপুরার বিভিন্ন প্রান্তে প্রজাস্বত্বের অধিকার লাভ করে মুসলমানগনও এখানে তাদের বসতির বিস্তার লাভ ঘটাতে থাকে । পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে থেকে কাব্যচর্চার প্রতিনিধিত্ব লক্ষ করা যায় ।
আনুমানিক (১৫৬০-১৬২৫খ্রি.) সময়কালে শেখ চাঁদ নামে একজন কবির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় । তিনি পাঁচখানা পুঁথি রচনা করেছিলেন । এই পুঁথিগুলি হল–১. রসুল বিজয় ২. শাহদৌলা ৩. কিয়ামতনামা ৪. হরগৌরী সংবাদ ৫. তালিবনামা । তিনি যে ত্রিপুরা জেলার অধিবাসী ছিলেন তা তাঁর কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় পাওয়া যায় তিনি উল্লেখ করেছেন 'পরগণে পাইটকারাস্থানে গোঞাঞ সাল' যার অর্থ তিনি পাটিকারা পরগনায় বাস করতেন ।
৩) বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ ও সমকালীন ত্রিপুরার বাংলাকাব্য
মহারাজ দ্বিতীয় রত্ন মানিক্যের (১৬৮৫-১৭১০) রাজত্বকালের সময়ে পিতৃব্য নরেন্দ্র ঠাকুরের বিদ্রোহ সংঘটিত হয় । নরেন্দ্র ঠাকুরের নরেন্দ্র মানিক্য নাম ধারণ করে ত্রিপুরার সিংহাসন আরোহন এবং মহারাজ রত্ন মানিক্যের সাময়িক সিংহাসনচ্যুতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে চর্যাপরবর্তীকাল থেকে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ সচিত হয় । মাঝখানের ১২০০ থেকে ১৩০০ সালের শেষ দশক পর্যন্ত এদেশে তুর্কিবিজয় ও ধ্বংসের কবলে পড়ে কোনরকম নিদর্শন আর অবশিষ্ট থাকে না । আশঙ্কা করা হয় এই সময়ে সমকালীন সাহিত্যের বহু নিদর্শন ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে । ফলে এই সময়কালটা বাংলা সাহিত্যের 'অন্ধকার যুগ' হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে । এরপরের সময় অর্থাৎ আনুমানিক ১৪০০ সাল থেকে ১৮০০ সালের শেষ অবধি বাংলাসাহিত্যের মধ্যযুগ । সেই সময়ের স্মরণীয় বাঙালি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মেধাবী ব্যক্তিত্ব চৈতন্যদেবের জীবতকাল ও তার পূর্বাপর সময়কালকে চিহ্নিত করে মধ্যযুগকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে । আনুমানিক ১৪০০ থেকে ১৫০০ সাল প্রাক চৈতন্য যুগ । ১৫০১ থেকে ১৬০০ চৈতন্য যুগ । ১৬০১ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত চৈতন্যোত্তর যুগ । বাংলা সাহিত্যের এই মধ্যযুগেও ত্রিপুরা বাংলা কাব্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিল । মহারাজ রত্ন মানিকের আমলে ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয় । রত্ন মানিক্য তিনজন বাঙালিকে ত্রিপুরা রাজ্যে আনিয়ে জায়গির ও নিষ্কর ভূমি দান করেছিলেন । এঁরা হলেন বড়ো খান্ডব ঘোষ, পণ্ডিত রাজ এবং জয় নারায়ন সেন । জয় নারায়ন সেন ছিলেন একজন চিকিৎসক । রত্ন মানিক্যের পর মহারাজা ধর্ম মানিকের আমলে ১৪০৭ খ্রিস্টাব্দে শ্রীহট্ট জেলার অন্তর্গত দক্ষিণ পরগনার ঠাকুরবাড়ি গ্রামের অধিবাসী দুজন পুরোহিত শুক্রেশ্বর ও বানেশ্বর বাংলা পয়ার ছন্দে রাজমালা লেখেন । রাজমালার সার সংকলনে রেফারেন্ড লং উল্লেখ করেন, এই গ্রন্থটি পঞ্চদশ শতকে রচিত হয় । এটি প্রাচীন বাংলা কাব্যের একটি অন্যতম নিদর্শন বলেও তিনি উল্লেখ করেন । মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্যের আমলে রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতায় এই গ্রন্থটি প্রকাশ করা হয়েছিল । এই গ্রন্থের সম্পাদক কালীপ্রসন্ন সেন উল্লেখ করেন, 'মহারাজ ধর্ম মানিক্যের শাসনকালে রাজমালা রচিত হয়েছিল । দুর্গামণি উজিরের রাজমালায়ও ( এটি পরবর্তীকালে ১২৩৮ ত্রিপুরাব্দে অর্থাৎ ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয় ) উল্লেখ রয়েছে 'সুভাষেতে ধর্মরাজে রাজমালা কৈল / রাজমালা বলিয়া লোকেতে নাম হৈল ।' পরবর্তীকালে দীনেশচন্দ্র সেন কৈলাসচন্দ্র সিংহ প্রমূখগণ এই অভিমতকে সমর্থন করেন । শেখ মহদ্দিন 'চম্পক বিজয়' নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন । ড. সুপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর 'ইতিহাসাশ্রিত বাংলা কবিতা' গ্রন্থে চম্পক বিজয় সম্পর্কে বলেছেন, 'ঐতিহাসিক রচনা হিসেবে চম্পক বিজয়ের অসামান্যতা স্বীকার করিতে হয় । রাজমালাবর্ণিত ঘটনার সীমাকাল সুদূরপ্রসারী । বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যক্তি কর্তৃক ইহা রচিত । গ্রন্থের মধ্যে স্থানে স্থানে ভাষা অতিরঞ্জিত । কিন্তু চম্পক বিজয়ের ঘটনাকাল মাত্র একটি দশকে সীমান্বিত হওয়ায় ঘটনাবলী যতদূর সম্ভব যথাযথ বিবৃত হইয়াছে ।'
সপ্তদশ অষ্টাদশ শতাব্দীতে ত্রিপুরা বঙ্গভূমিসহ সংলগ্ন চট্টগ্রাম, কাছাড়, কোচবিহার, আরাকান প্রভৃতি দেশীয় রাজ্যসমূহেও সাহিত্যচর্চার জোয়ার এসেছিল । বিশেষ করে রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতায় এইসব অঞ্চলে বাংলা সাহিত্যচর্চার এক বিশেষ বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল, যা আজ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে । আরাকান রাজসভায় দৌলত কাজী-আলাওল সতীময়না, লোরচন্দ্রানী, পদ্মাবতী, হোসেন সাহের লস্কর চট্টগ্রামের শাসনকর্তা পরাগল খাঁর পরাগলী মহাভারত, ছুটি খাঁর মহাভারত, কাছাড়ের ডিমাসা রানী চন্দ্রপ্রভা দেবীর নির্দেশে অনুবাদকৃত বিহন্নারদীয় পুরাণ, রাজ পরিবারের সদস্যদের সৃষ্ট বাংলা কাব্য । কোচবিহারের রাজসভায় বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা ধর্মগ্রন্থের অনুবাদ সমগ্র বাংলা সাহিত্যকেই সমৃদ্ধ করেছিল ।
ত্রিপুরায়ও রাজা গোবিন্দ মানিক্যের শাসনামলে (১৬৬৫-৭৫) বৃহ পুরাণ পুঁথিটির রচিত হয় । এই পুঁথিটির রচয়িতার নাম জানা যায় না । চন্দ্রজয় ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় এই পুঁথি টি ১৩১৩ বঙ্গাব্দে (১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ ) কলকাতা থেকে মুদ্রিত হয় ।
সপ্তদশ শতকে শের বাজ নামে একজন কবি ১) 'ফক্করনামা' বা 'মালিকার হাজার ছাওয়াল' ২) 'কাশেমের লড়াই' এবং ৩) ফাতিমার সুরত নামা নামে তিন খানি কাব্য রচনা করেন । এক ধরনের হেঁয়ালির প্রশ্ন-উত্তর ধর্মীয় রচনা হল 'ফক্করনামা' । 'কাশেমের লড়াই' কারবালার ময়দানের ঐতিহাসিক যুদ্ধ অবলম্বনে রচিত । 'সুরতনামা' অভিব্যক্তি মূলক রচনা ।
সৈয়দ মুহম্মদ আকবর (১৬৫৭-১৭২০)-এর 'জেবল্ মূলক্—শামারুখ' নামে একখানা পুঁথি পাওয়া গেছে । পুঁথিখানি প্রণয়োপাখ্যানমূলক এবং আনুমানিক ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দের রচিত কবি শেখ সাদী মহারাজ দ্বিতীয় রত্ন মানিক্যের রাজত্বকাল (১৬৮২-১৭১২) 'গদ্যমালিকা সম্বাদি' নামে একখানে পুঁথি রচনা করেন । তার পুঁথিতে চম্পক রায়ের উল্লেখ পাওয়া যায় । অনুমান করা হয় তিনি চম্পক রায়ের কর্মচারী ছিলেন । ১১২২ ত্রিপুরাতে যে এই পুঁথিটি রচিত হয়েছিল তা পুঁথির ভূমিকাতে স্পষ্ট–
'পড়িয়া বুঝিয়া সব শাস্ত্রের উদ্দেশ একাদশ বিংশ দুই পুস্তক বিশেষ ।'
মূলত এটি একটি ফারসি পুঁথির অনুবাদ ।
মুহম্মদ রফিউদ্দিন নামে আরেকজন কবি ও 'জেবল্ মূলক্–শামারুখ' নামে একখানে পুঁথি রচনা করেন । তিনি কুমিল্লার নারানঞা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । এই পুঁথি টি সপ্তদশ শতাব্দীর শেষপাদে রচিত বলে গবেষক মহলের ধারণা । রফিউদ্দিন এই পুঁথিটি পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে রচনা করেন ।
আনুমানিক ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ শিক পরগনার গ্রামে শমসের গাজীর জন্ম হয় । ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী শমসের গাজীর অধিকারভুক্ত হয় । তখন থেকে ১২ বছর তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের সর্বময় কর্তা ছিলেন । শমসের গাজীর জীবনের আকস্মিক উত্থান পতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর মৃত্যুর পর শেখ মনোহর গাজী নামে এক পল্লী কবি রচনা করেন গাজীনামা । ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে নোয়াখালীর সেরেস্তাদার মৌলবি খবির মুদ্রিত করেন এই গাজী নামা ।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সে সময়ে মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা অনুবাদ সাহিত্য সৃষ্টি হতে থাকে । এসব অনুবাদের ক্ষেত্রে যেমন হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থাদি ও পুরাণ রয়েছে তেমনি মুসলিম ধর্ম ও সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট অনেক আরবি ও ফারসি গ্রন্থেরও অনুবাদ করা হয়েছে । সেসময়ের শাসক বর্গের ধর্মীয় সহাবস্থান ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের সৃষ্ট সাহিত্য পৃষ্ঠপোষকতায়ও একটা ইতিবাচক চিহ্ন রেখে গেছে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে । এসব অনুবাদ সাহিত্যে ধর্মীয় ভক্তিরসের সৃষ্টি যেমন রয়েছে তেমনি বীররস ও পারিবারিক জীবন ঘনিষ্ঠ প্রণয়রসেরও উপলব্ধি করা যায় ।
মহারাজা রাজধর মানিক্য ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরার সিংহাসনে বসেন । তার সময়েই ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সঙ্গে মণিপুরের রাজ পরিবারের সম্পর্ক সৃষ্টি হয় । তিনি মণিপুর রাজা জয়সিংহের কন্যার পাণিগ্রহণ করেছিলেন । এরপরে মহারাজা কাশীচন্দ্র ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে মণিপুরের রাজকন্যাকে বিবাহ করেন। এরপর মহারাজা কৃষ্ণকিশোর মানিক্যও মণিপুর কন্যা বিবাহ করেন । মণিপুর রাজপরিবারের সঙ্গে বিবাহের সম্পর্কের সূত্র ধরেই ত্রিপুরার রাজপরিবারের মধ্যে বৈষ্ণবধর্ম প্রসার লাভ করে । কৃষ্ণকিশোর মানিক্য থেকে শুরু করে বীর বিক্রম মানিক্যের কাল পর্যন্ত সকলেই বৈষ্ণবধর্মের অনুসারী ছিলেন । ফলে রাজন্য সদস্যদের মধ্যে বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায় । বৈষ্ণব সাহিত্যের চর্চা এই সময় থেকে শুরু হয় ।
মহারাজা রাজধর মানিক্যের নির্দেশে ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রামগঙ্গা বিশারদ কৃষ্ণমালা রচনা করেন । পন্ডিত দ্বিজ রামগঙ্গা শর্মার লিখিত 'কৃষ্ণমালা' কাব্যগ্রন্থটি মধ্যযুগের রচিত ত্রিপুরার বাংলা কাব্যের এখানে উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থ । মহারাজা কৃষ্ণ মানিক্যের (১৭৬০-১৭৮৩) ভ্রাতুষ্পুত্র দ্বিতীয় রাজধর মানিক্য সিংহাসনে বসার পর জয়ন্ত চন্তাইর মুখে তাঁর জ্যেষ্ঠতাতের বীরত্বের কাহিনি শুনে তা লিপিবদ্ধ করে রাখার আগ্রহের সঞ্চার হয় । তাঁর নির্দেশে ব্রাহ্মণ রামগঙ্গা শর্মা কৃষ্ণ মানিক্যের সংঘাতপূর্ণ জীবনী অবলম্বনে 'কৃষ্ণমালা' রচনা করেন । রাজন্যপ্রভাবের কারণে গ্রন্থটিতে বৈষ্ণবীয় চিন্তাচেতনা ও পদাবলি সাহিত্যের আঙ্গিকের ছাপ পড়ে ।
এই কাব্য রচনাকাল সম্বন্ধে কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না । তবে রাজধর মানিক্যের রাজত্বকালের মধ্যে কোনো এক সময়ে তা রচনা হয়েছিল বলে অনুমান করা যায় । কবি তাঁর পাণ্ডিত্যের দুর্বলতার কথা কাব্যের শুরুতেই উপস্থাপন করেছেন ।
পন্ডিত জনেরে কহি বিনয় বচন ।
অশুদ্ধ দেখলে পদ করিবা শোধন ।।
সাধুয়ে পাইলে গ্রন্থ সদ অর্থ করয় ।
যদি দোষ দেখে তাহে উদ্ধারিয়া নয় ।।
গুণ না দেখিয়া দোষ দেখে খল জনে ।
তাহার দৃষ্টান্ত এই দেখ বিদ্যমানে ।।
কৃষ্ণমালা কাহিনি রাজা কৃষ্ণমানিক্যের জীবনকাহিনি অবলম্বনে রচিত হওয়ার ফলে সমকালীন ঐতিহাসিক ঘটনার অবতারণা ও রয়েছে কাব্যটিতে ।
ত্রিপুরার রাজা দ্বিতীয় রত্নমানিক্যের রাজত্বকাল ছিল (১৬৮২-১৭১২) খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত । তাঁর রাজত্বকালে তাঁর পিতৃব্য দ্বারিকা ঠাকুর বিদ্রোহ ঘোষণা করার ফলে সাময়িক কালের জন্য (১৬৯৩-৯৪) খ্রিস্টাব্দ রত্নমানিক্যের রাজ্যচ্যুতি ঘটে সাময়িককালের জন্য । 'চম্পকবিজয়' কাব্যে এই ঘটনাকে সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে । 'চম্পকবিজয়' কাব্যের কবির নাম শেখ মহদ্দিন । এছাড়া কবির আর কোনো পরিচয় এই কাব্যগ্রন্থে উল্লেখ নেই । এই কাব্যের প্রধান চরিত্র মীর খাঁ । বিদ্রোহী নরেন্দ্র মানিক্যের তাড়া খেয়ে চম্পক রায় চট্টগ্রামে পালিয়ে গিয়ে মীর খাঁর সাহায্যে প্রার্থনা করেন । মীর খাঁর প্রচেষ্টায় চম্পক রায় পুনরায় ত্রিপুরার রাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন । মীর খাঁর আদেশেই নাকি এই চম্পক বিজয় কাব্য রচনা করেছেন কবি । একথা তিনি কাব্যের বহু স্থানে উল্লেখ করেছেন ।
১. মীর খাঁ যে ভূবনে পুজিত
তাহান আদেশ ধরি শিরস্ত্রাণ মান্য করি
মহদ্দিয়ে করিল রচিত।
২. শ্রীযুক্ত মীর খাঁন প্রতাপ এ ভাস্কর
কহে হীন মুহাদ্দিয়ে তান আজ্ঞা পর ।
নুরনগর পরগনার অন্তর্গত বিদ্যাকুট নিবাসী রামনারায়ণ দেব ১২০৬ সালের ১৮ বৈশাখ 'চম্পক বিজয়' কাব্যটি নকল করেন । এই কাব্যটির নকল পুঁথি ব্যতীত মূল পুঁথি খুঁজে পাওয়া যায় না ।
উনবিংশ শতাব্দীর বৃহত্তর বঙ্গের সাহিত্যে ইতিহাসাশ্রিত কাব্য রচনার যে প্রবণতা ত্রিপুরার বাংলা কাব্যসমূহে পরিলক্ষিত হয়েছিল গাজীনামা, কৃষ্ণমালা, চম্পক বিজয় প্রভৃতির মাধ্যমে, সেই ধারাটিই অল্প কিছুকাল পরেই আধুনিক বাংলা কাব্যের পথিকৃৎ রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন প্রমুখর কাব্যে পরিপুষ্টি লাভ করে ।
উনবিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য রেনেসাঁর প্রভাবে বাংলাদেশের বুকেও লাগে তার দোলা । এই শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আমেরিকায় এই পরিবর্তন শুরু হয় । শুরুতে গতি কিছুটা মন্থর হলেও সহসাই তা গতিসঞ্চারিত হয়ে শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে দ্রুততর হতে থাকে ।
রেনেসাঁর ফলে ইউরোপীয় সাহিত্য-সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তন সূচিত হল তা বাংলা কবিতার বিষয়কেও পাল্টে দেয় । সে সময়ের পরাধীন ভারতবর্ষের উত্তাল ইতিহাসের প্রভাব ও বাংলা কাব্যে পড়ে । সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭), নীল বিদ্রোহ (১৮৫৭-৫৯), সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-৫৬), প্রভৃতি ঘটনা বাংলা কাব্যের ভাষাকেও পাল্টে দেয় । নতুন চেতনার কাব্য রচনা হাত দেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন ও! হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কবিগণ ।
৪) বাংলার নবজাগরণের উত্তরকাল ও ত্রিপুরার কাব্য চর্চা
বাংলা রেনেসাঁ পর্বের একপর্যায়ের অর্থাৎ উন্মেষ পর্বের সমাপ্তি ঘটে যখন রাজা রামমোহন রায়ের তিরোধান হয় । তাঁর মৃত্যুর পাঁচ বছর পরে জন্মগ্রহণ করেন ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য (১৮৩৯-১৮৯৬) । তাঁর দীর্ঘ ৫৭ বছরের জীবনে তিনি বাংলার রেনেসাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাল মধ্যপর্যায়, জাতীয় চেতনার উন্মেষের পরিপূর্ণতা পর্যন্ত দেখে যান । মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্যের সময়েই বাংলা কাব্যসাহিত্যে গীতিকবিতার উন্মেষ ঘটে । কবির একান্ত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই গীতিকবিতা মধ্য দিয়ে । তার সাথে কল্পনা ও সৌন্দর্যের যুগলবন্দীতে কবিতায় এক সংগীতময় রসমূর্তি রূপ ধারণ করে । এই সময়ে বাংলাকাব্যে আত্মপ্রকাশ ঘটে অনুভূতিপ্রবণ সৌন্দর্যপিয়াসী কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর । বিহারীলাল কলকাতার মতো নাগরিক পরিমন্ডলে থেকে নিসর্গসৌন্দর্য ও প্রেমের মধ্যে আনন্দের অন্বেষণ করে গেছেন । বীরচন্দ্র যে বছর সিংহাসন লাভ করেন (১৮৬২) সে বছর বিহারীলাল চক্রবর্তীর সংগীত শতক প্রকাশিত হয়েছে । এই সময়ের মধ্যে একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে কবির কাব্যগ্রন্থসমূহ— বঙ্গ সুন্দরী (১৮৭০), নিসর্গ সন্দর্শন (১৮৭০), বন্ধু বিয়োগ (১৮৭০), প্রেম প্রবাহিনী (১৮৭১), সারদামঙ্গল (১৮৭৯) সাধের আসন (১২৯৫-৯৬ বঙ্গাব্দে মাসিক পত্রে প্রকাশিত ), বাউল বিংশতি (১২৯৪), কবির শ্রেষ্ঠ ও সার্থক কীর্তি হলো সারদামঙ্গল (১৮৭৯) । কাব্যটি আখ্যান কাব্যের আকারে লেখা । কাব্যটিতে দেবী সারদা বা সরস্বতীর সাথে কবির আনন্দ,বেদনা,বিরহ,মিলনের মুহূর্তগুলি অনির্বাচনীয় প্রকাশের ব্যঞ্জনায় অনন্য রূপে ফুটে উঠেছে । বিহারীলাল যে নতুন ধারার সূত্রপাত করেন, পরবর্তীকালে বেশ কিছু কবি তাকে অনুসরণ করেন । এই ধারার অন্যান্য কবিদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন, কবি সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, অক্ষয় কুমার বড়াল প্রমূখ ও প্রসিদ্ধ । গীতিকবিতার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল নারীপ্রেম । তাঁদের কবিতায় নারীর বিচিত্র রূপ প্রকাশ পেয়েছে।
মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্যের জীবন ও মননের উপর যে বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের প্রভাব পড়েছিল তা বলাই বাহুল্য । কারণ রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার ফলে বহির্ত্রিপুরার সঙ্গে অর্থাৎ বৃহত্তর বঙ্গের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ অসম্ভব ছিল না । তাছাড়া তিনি ছিলেন বিদ্বান ও বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত । তিনি ইংরেজি, বাংলা, উর্দু, মনিপুরি এবং ত্রিপুরি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন । ছিলেন বিজ্ঞানমনস্কও । এ ছাড়া তিনি ছিলেন সুকবি ও উচ্চাঙ্গ সংগীতে নিপুণ ও কলা রসিক । তাঁর আমলেই তাঁর উদ্যোগে ত্রিপুরার সঙ্গে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের যোগাযোগ নিবিড় হয় । তাঁর সময়ে ত্রিপুরার রাজদরবারে বহু জ্ঞানী গুণীজনের সমাবেশ ঘটেছিল । বীরচন্দ্র মানিক্য সম্বন্ধে তৎকালীন ত্রিপুরার বিখ্যাত কর্নেল মহিমচন্দ্র দেববর্মা বলেছেন–
'স্বর্গীয় মহারাজা বীরচন্দ্র ছিলেন বাংলার বিক্রমাদিত্য । তিনি একাধারে বৈষ্ণব কাব্যরসিক কবি এবং সংগীত ও ললিতকলাবিদ ছিলেন । এহেন রসিক চুড়ামণি, সাহিত্যের পাকা জহুরী মহারাজ বীরচন্দ্রের দরবার বহু গুণী ব্যক্তির সমাবেশে ভরপুর ছিল ।' (দেশীয় রাজ্য)
রবীন্দ্রস্নেহধন্য ত্রিপুরা রাজপরিবারের সন্তান ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মন তাঁর সম্বন্ধে বলেছেন–
'নবযুগের প্রবর্তক গুণী মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য তাঁর বাংলাভাষায় বিশেষ বুৎপন্ন, সুকবি, বৈষ্ণব সাহিত্যে সুপন্ডিত, সঙ্গীতজ্ঞ, শাস্ত্রজ্ঞ, সংগীত রচয়িতা, সুরস্রষ্টা, উর্দু ভাষায় মাতৃভাষার ন্যায় আলাপে সক্ষম, কূটনীতিপরায়ণ, বাক্পটু ও সর্বোপরি তিনি একজন সুনিপুণ চিত্রকর ও ফটোগ্রাফার ।'
মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য ছিলেন একজন কবি ও কাব্যরসিক । বৈষ্ণব সাহিত্য ছিল তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য । তিনি তাঁর অগ্রজ মহারাজা ইশানচন্দ্র মানিক্যের (১৮৫০, ১৮৬১) বৈষ্ণবপদ সংকলনে সেসময়ের বিখ্যাত চিত্রকর আলম কারিগরকে দিয়ে কয়েকটি ছবি করিয়ে সংযোজন করিয়েছিলেন । এছাড়া তিনি রাজদরবারের গ্রন্থাগারে অনেক বৈষ্ণবগ্রন্থ সংগ্রহ করেছিলেন । তাঁর অভিপ্রায় ছিল একটি সুবৃহৎ বৈষ্ণবপদাবলীসংকলন করার । এজন্য তিনি এক লক্ষ টাকা ব্যয়ের সংকল্প করেছিলেন । কিন্তু তাঁর অকাল মৃত্যুতে সমগ্র পরিকল্পনা অঙ্কুর এই বিনষ্ট হয় । কবি নরহরি চক্রবর্তী কর্তৃক সংকলিত 'গীতচন্দ্রোদয়' পদাবলী গ্রন্থটির অষ্টকাল-রাগানুরাগ খণ্ড পর্যন্ত তার পৃষ্ঠপোষকতায় মুদ্রিত হয়েছিল । মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য বঙ্কিমচন্দ্রের 'দুর্গেশ নন্দিনী', মাইকেল মধুসূদন দত্তর 'ব্রজাঙ্গনা' এবং 'মেঘনাদ বধ' কাব্যদুটি পাঠ করে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন । তিনি বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ লিখে গেছেন । এর মধ্যে কয়েকটি রয়েছে গীতিকাব্য । এগুলোর ভাষা ও কাব্য সৌন্দর্য যথেষ্ট রয়েছে । তাঁর রচিত কাব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. সোহাগ (১২৯৩ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ ১৮৮৩ ইং) । মহারানী মনমোহিনী দেবীকে উদ্দেশ্য করে লেখা কবিতা সংকলন এটি । আগরতলার বীরযন্ত্রে ইশানচন্দ্র ভট্টাচার্যের দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয় । কাব্যটিতে আখ্যানপদে বৈষ্ণব কবি জ্ঞানদাসের একটি পদের আংশিক উদ্ধৃতি রয়েছে–
রূপের সায়রে আঁখি ডুবিয়া রহিল
যৌবন বনের মাঝে মন হারাইল ।।
কাব্যটিতে মোট ২২টি দীর্ঘ কবিতা রয়েছে । প্রত্যেকটি কবিতার আলাদা শিরোনামও রয়েছে । আবার প্রতিটি কবিতা একাধিক স্তবকে বিন্যস্ত । কাব্যটিতে পত্নীপ্রেমজনিত হৃদয়ের আবেগ নানাভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে । এখানে প্রেমের বিচিত্র প্রকাশভঙ্গি ঘটেছে । দ্বিতীয় পত্নী আগমনে তাঁর হৃদয়াবেগ শান্ত হয়েছে সত্য, কিন্তু তিনি তার প্রথমার প্রেমের স্মৃতিকে মুছে ফেলতে পারেননি–
সেই বিদায়ের সেই সজল নয়ন
উছলিছে হৃদি সিন্ধু,
অনন্ত মুকুতা বিন্দু,
প্রতি হৃদে গ্রন্থি সূত্রে করেছি গ্রন্থন ।
২. প্রেম মরীচিকা (১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে কোন এক সময় রচিত ) । প্রয়াত মহারানী ভানুমতীকে উদ্দেশ্য করে লেখা বিরহের কবিতা রয়েছে এই গ্রন্থে । কাব্যটিতে কবির প্রিয়বিরহজনিত মনোবেদনা প্রকাশ পেয়েছে ।
৩. উচ্ছাস (১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে কোন এক সময় রচিত ) কাব্যটির প্রেম ও পূর্ণ জীবনের মধুর অনুভবকে কেন্দ্র করে রচিত । মহিষী ভানুমতী দেবীর মৃত্যুর পর যে হাহাকার তাঁর হৃদয়ে অবস্থান করছিল, দ্বিতীয়া মহিষী মনমোহিনী দেবীর সান্নিধ্যে এসে সান্ত্বনা লাভ করেছিল । জীবনে এক নতুন উপলব্ধি লাভ করেন তিনি । 'উচ্ছ্বাস' কাব্যগ্রন্থের কবিতা গুলি তাঁর এই নবজীবন লাভের ছাপ বহন করে । প্রেমের উচ্ছ্বাসকেই ব্যক্ত করে ।
৪. অকাল কুসুম (১৮৮৬)– এই কাব্যটি মহারানী মনমোহিনী দেবীকে উদ্দেশ্য করে লিখিত । অধিকাংশ কবিতাই প্রেম পর্যায়ের ।
৫. হোরি ( কোন সন উল্লেখ নেই ) । ১৩০২ ত্রিং-এর পূর্বে কোন এক সময় দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে লিখিত গীতিকাব্য । এই গ্রন্থটিতে শাস্ত্রনীতি মেনে ৩৪ টি সংগীত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে । 'হোরি' কাব্যে ভক্তিভাবের প্রকাশ ঘটেছে । বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্যে যেমন বিভিন্ন পর্যায়ে থাকে সেরকম এই কাব্যেও বন্দনা, পূর্বরাগ, অভিসার, মিলন, বিরহ, উৎকণ্ঠা জাতীয় বিবিধ পর্যায়ের পদ রয়েছে । তাঁর একটি অভিসার বিষয়ক পদে পাই–
চরণে চালনে দোলিছে গগনে
হেমপৃষ্ঠ বেণী সঘনে ঘন
কর্ণে কুন্তল মণি ঝলমল
যেমন সৌদামিনী ঝলকে ঘন ।
৬. শ্রীশ্রী ঝুলনগীতি (১২৮৮ ত্রিং অর্থাৎ ১৮৭৮ ইং রচিত এবং ১৩০২ ত্রিং অর্থাৎ ১৮৯২ ঈশান চন্দ্র ঘোষ এর তত্ত্বাবধানে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয় ) । উৎসর্গপত্রে রয়েছে–'রাজবাড়ী নতুন হাবেলি, ২৮ বৈশাখ ১৩০২ ত্রিপুরা । উৎসর্গ স্বর্গীয়া ভানুমতী দেবীর করপঙ্কজে । শ্রীশ্রীঝুলনগীতিতে ৫০ টি সংগীত রয়েছে । যার মধ্যে ৮টি সংস্কৃত ভাষায় রচিত । মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য গ্রন্থের সূচনায় লিখেছেন–
"ঝুলনগীতি মহাজন পদাবলীর ছায়া লইয়া লিখিত । পদের ভাষা অপ্রচলিত ও দুরূহ তাহাতে অধিকার জন্মান সুকঠিন, গানগুলি যে তত সুবিধার হয়েছে আশা করা যায় না । ইহা আমার প্রথম জীবনের স্মৃতি চিহ্নমাত্র এবং শোকসন্তপ্ত হৃদয়ের শান্তিদায়ক বলিয়াই যেভাবে লিখিত হইয়াছিল তাহার কোন অংশ সংশোধন না করিয়া প্রকাশ করিলাম ।"
কাব্যটি তিনি মহারানী ভানুমতী দেবীকে উৎসর্গ করেছেন–
রাইকানু বিলাসন প্রেমলীলা রসায়ন
তব স্মৃতিময় এই কবিতা আমার
হৃদি সিক্ত আঁখি নীরে উদ্দেশ্যে তোমার করে
সঁপিলাম সমাদরে গীতি উপহার ।
বীরচন্দ্র মানিক্যের কাব্যে পদাবলি সাহিত্যের ধারাটি বিশেষ করে অনুসৃত হয় । এছাড়া সমকালীন বাংলা গীতিকবিতার সৃষ্টিকালের প্রভাবও তাঁর কবিতায় পড়েছিল । মানব জীবনে ভালোবাসা যে গভীর অনুভবের বিষয় বিচ্ছিন্নতার বেদনায় যে অন্তর দীর্ণ হয়, নিঃসঙ্গতা এসে ঢেকে দেয় কবির সুকুমার হৃদয় তারই ব্যথাতুর প্রকাশ ঘটে কবির কাব্যে । এছাড়া রবীন্দ্রকাব্যেরও কিন্তু প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তাঁর কবিতায় ।
মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্যের মহিষী ভানুমতী দেবী ১৮৮২ সালে অকালে পরলোকগমন করেন । এর কিছুদিন পরেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিলাত থেকে এসে 'ভগ্নহৃদয়' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন । স্ত্রী বিয়োগে ব্যথাতুর কবি মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য এই কাব্যগ্রন্থটি পাঠ করে গভীরভাবে আপ্লুত হয়েছিলেন । ভবিষ্যৎ কবিপ্রতিভার স্ফুরণ যে এই কবির মধ্যে রয়েছে তা তিনি অনুভব করেন । তিনি তার প্রাইভেট সেক্রেটারি রাধারমন ঘোষকে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে পাঠিয়েছিলেন কবিকে অভিনন্দন জানানোর জন্য । সম্ভাবনাময় তরুণ কবিকে সেদিন সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল বীরচন্দ্র মানিকের উদ্যোগে । ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ১২ই ফাল্গুন কিশোরসমাজের পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথকে সম্মাননা জানানোর সঙ্গে সঙ্গেই ত্রিপুরা রাজ পরিবারের সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনের সম্পর্কসেতু তৈরি হয়েছিল সেদিন ।
ত্রিপুরার আধুনিক যুগের প্রবর্তক বীরচন্দ্র মানিক্য ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় পরলোকগমন করেন । তাঁর মৃত্যুর পরে কৈলাশহরে যে শোকসভা হয়েছিল সেখানে কুকিনেতা বানখাম্পুই একটি স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছিলেন । এতেই অনুমান করা যায়, বীরচন্দ্র মানিক্যের কাব্যপ্রতিভা সেদিন ত্রিপুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিকশিত হয়েছিল । বাংলাসাহিত্য যখন আধুনিকতার দ্বারপ্রান্তে তখন বিহারীলাল গীতিকবিতার ধারাকে বিশাল ঐশ্বর্য দান করেছিলেন । এজন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ভোরের পাখি' আখ্যায়িত করেছিলেন । সেই যুগসন্ধিক্ষণে অবস্থান করে এই আরণ্যজনপদে কুয়াশার সামিয়ানার নিচে অবস্থিত পাহাড়ের চূড়ায় উষাকালীন সূর্যোদয়ের রক্তিম আভা দেখে ত্রিপুরার কাব্য চর্চার আধুনিক যুগকে আহবান করার লক্ষ্যে যে অরণ্যদোয়েলের শিস দিয়ে গেছেন বীরচন্দ্র তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে, তারই ধ্বনিসুষমা পরবর্তী কবিদের বাংলা কবিতাঙ্গনে সমানভাবে সাহসে সঙ্গে চলার জন্য রসদ ও সাহস জুগিয়েছে।
৫) রাজ অন্তঃপুর : ত্রিপুরার আধুনিক যুগের সূচনা
মহারাজা বীরচন্দ্র যে আধুনিকতার সূচনা করে গিয়েছিলেন সমগ্র ত্রিপুরার শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ও প্রশাসনে তার ঢেউ সেদিন রাজত্ব করেও আছড়ে পড়েছিল ।