Saturday, May 2, 2026

'এসো হে বৈশাখ' : নববর্ষের ভাবনা

'এসো হে বৈশাখ' : নববর্ষের ভাবনা

চৈত্রসংক্রান্তির পর দিনেই আসে পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ নববর্ষের প্রথম দিন । এটি কেবল বর্ষপঞ্জির একটি পরিবর্তন নয় । বরং বাঙালির চিরন্তন সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ । এই দিনে মানুষ নতুন পোশাক পরে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটান, দেখা-সাক্ষাৎ করেন  এবং আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন ।সেইসঙ্গে নানাধরনের উপাদেয় খাওয়াদাওয়ায় মেতে ওঠেন ।  ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা শুরু করেন ।‌ যার নাম 'হালখাতা' । মহাজনের গদিতে এদিন সিদ্ধিদাতা গণেশ, গন্ধেশ্বরী কিংবা লক্ষ্মীপূজা দেওয়া হয় । পুরোনো দেনাপাওনা চুকিয়ে নতুন সূচনার প্রতীক এই 'হালখাতা' । সারা বছরের ক্রেতারা এদিন ব্যবসায়ীর দোকানে বা গদিতে আসেন এবং মিষ্টিমুখে আপ্যায়িত হন । সেই সঙ্গে খদ্দের পুরনো বকেয়ার আংশিক বা সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি ঘটান । গৃহস্থবাড়িতে হয় গৃহদেবতার পূজা । অনেকে মন্দিরে গিয়ে পূজা দিয়ে পারিবারিক সুখ সমৃদ্ধি জন্য প্রার্থনা করেন । গুরুজনদের প্রণাম জানান । ছোটোদের স্নেহাশীর্বাদ করেন । মুসলিমদের মধ্যেও এদিন নামাজ আদায়ের রীতিনীতি প্রচলিত রয়েছে । ত্রিপুরার জনজাতিদের মধ্যেও চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষের শুরুতে 'বিজু', 'বুইসু', বিসিকাতাল ও 'সাংগ্রেই' উৎসব পালনের রীতি রয়েছে ।

এক সময় বাঙালি জীবনঅর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর । সেকারণে কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতি ছিল জীবনের কেন্দ্রে । এই বর্ষগণনা পদ্ধতি ও কৃষিকে নির্ভর করেই নিরূপণ করা হয় । 'মেষোদয়ো দ্বদশৈতে মাসাস্তৈরেব বৎসরঃ' । অর্থাৎ বৈশাখ থেকে চৈত্রমাস মেষাদিক্রমে দ্বাদশ রাশির বসতি । পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জি উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত । কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ কমই । মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন । পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা পাওনার হিসাব মেটানো । বিশ্বের বড়ো বড়ো উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক বা জাতিকেন্দ্রিক । এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম বাঙালির পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজন । বাংলা সনে প্রথম দিন সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) কর আদায়ের সুবিধার্থে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এই 'ফসলি সন' প্রবর্তন করেছিলেন, যা কাল ক্রমে 'বাংলা সন' নামে পরিচিতি লাভ করে । মূলত জমিদার ও কৃষকদের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয় ।

বাংলা নববর্ষকে আবেগপূর্ণ করে তোলার ক্ষেত্রে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল অসীম । উনিশ শতকে তিনি এই পহেলা বৈশাখকে আনুষ্ঠানিকতায় রূপদান করেছিলেন, । রবীন্দ্রনাথও তাঁর জমিদারিতে 'পুণ্যাহ' বা খাজনা আদায়ের উৎসব হিসেবে নববর্ষের সূচনা করেছিলেন । রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন–'সেদিন ছিল যাকে বলে জমিদারি সেরেস্তার 'পুণ্যাহ', হোক খাজনা আদায়ের প্রথম দিন । কাজটা নিতান্তই বিষয়-কাজ । কিন্তু জমিদারি মহলে সেটা হয়ে উঠেছে একটি পার্বণ ।  সবাই খুশি । যে খাজনা দেয় সেও, আর যে খাজনা বাক্সতে ভর্তি করে সেও । এর মধ্যে হিসেব মিলিয়ে দেখার গন্ধ ছিল না । যে যা দিতে পারে তাই দেয়, প্রাপ্য নিয়ে কোন তকরার হয় না । খুব ধুমধাম পাড়াগেঁয়ে সানাই অত্যন্ত বেসুরে আকাশ মাতিয়ে তোলে । নতুন কাপড় পরে প্রজারা কাছারিতে সেলাম দিতে আসে ।' সেকালে জমিদারি মহলে এই পুণ্যাহ একটা পার্বণে পর্যবসিত হত । এই উপলক্ষে জমিদারদের ব্যয়ের বহরও ছিল বিশাল । যতটা না আয় হত অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি ব্যয় হতো তবুও তাঁরা এবং প্রজারা খুশি থাকতেন । সে কারণেই 'খাজনা থেকে বাজনা বেশি' প্রবাদটির উৎপত্তি ।

আজ বিশ্বায়নের কালে বাঙালির কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বনিয়াদ পরিবর্তিত হয়ে গেছে । গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহর মুখে হচ্ছেন । রোজগার এবং কর্মের কারণে বাঙালি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে । তারপরও আজও বাঙালি যেখানে গেছে সেখানেই এই দুদিনের উৎসবকে ঘটা করে পালন করার প্রচেষ্টা দেখা যায় । এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ঐতিহ্য ও জীবন দর্শনের এক অনন্য প্রতিফলন পুরনো কে বিদায় জানিয়ে নতুনকে বরণ করার এই চিরন্তন প্রক্রিয়ায় বাঙালি জীবনের গতিশীলতাকে ধরে রেখেছে । অর্থনৈতিক কারণেই এখন আর রাত জেগে বাড়ি বাড়ি গাজন নৃত্য দেখা যায় না । পাশাপাশি একান্নবর্তী পরিবারগুলোও ভেঙে যাওয়ার ফলে অনেক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও এখন কমে গেছে । ফলে আজকের বাঙালি সমাজ অনেকটা শেকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন । আর শেকড় থেকে ছিন্ন হলে একটা জাতি তার অস্তিত্বের সংকটে পড়ে । সে কারণেই বাঙালি আজ সংকটাপন্ন জাতি । বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের সংস্কৃতির উত্তরাধিকার পুনরায় অর্জন করতে হলে তাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে । লালন করতে হবে নিজস্ব সংস্কৃতিকে । রবীন্দ্রনাথ বাঙালির এই সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিলেন । তিনি শুরু করেছিলেন বর্ষবরণ, হলকর্ষণ, বর্ষাবরণ, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি নানা অনুষ্ঠান । তাঁর সাহিত্যে, গানে, কবিতায় বর্ষশেষ এবং নতুন বর্ষকে নিয়ে অনেক কথা তিনি বলেছেন । আজীবন তিনি বিশ্ব প্রকৃতির অখন্ডতাকে অনুভব করেছেন । রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'চৈতালি' কাব্যগ্রন্থের 'বর্ষশেষ' কবিতার এক জায়গায় লিখেছেন–

'পাখিরা জানে না কেহ আজি বর্ষ শেষ,
বকবৃদ্ধ কাছে নাহি শুনে উপদেশ ।
যতদিন এ আকাশে এ জীবন আছে,
বরষের শেষ নাহি তাহাদের কাছে ।
মানুষ আনন্দহীন নিশিদিন ধরি, 
আপনার এই ভাগ করে শতভাগ করি ।'

কবিতায় নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশ করেছেন তিনি । সত্য রূপকে শিল্পরূপ দান করেছেন এই কবিতায় এক অনবদ্য ভাষায় । মানুষ খন্ড, বিশ্বপ্রকৃতি অখন্ড–এই বোধ, এই চেতনায় বর্ষশেষের ভাবনাকে অভিনব শিল্পরূপ প্রদান করেছেন রবীন্দ্রনাথ । বর্ষশেষ এবং নববর্ষের মধ্যে রয়েছে এক অদ্ভুত মিল সে মিল হল মানুষের কল্যাণচেতনা এবং মানুষের মঙ্গলভাবনার যুগলবন্দী ।

শুভ নববর্ষ । প্রীতি ও শুভেচ্ছা সকলের জন্যে ।

No comments:

Post a Comment