Monday, October 30, 2017

ঝড়ের কাছাকাছি

আকাশে এই মেঘ আসে ৷ এই মেঘ যায় ৷ আরতির দিনগুলোও তেমনি কেটে যায় ৷ বুকে তার চেপে বসা ব্যথা ৷পুরোনো হয়ে যায় সে ব্যথা ৷ চরম অপমানের ব্যথা ৷ তিরিশ বছরের উপর হয়ে গেল ৷ কাউকে বলা যায় না ৷ মনে বেঁধে রেখেছে ক্রোধেও ঘৃণায় ৷ সংসার করতে করতে সবাইকে বুঝিয়েছে ৷ চিনিয়েছে গিরগিটির মতো মানুষগুলোকে ৷ ওরা আপন না পর ৷ তবুও টানাটানির সংসার ৷ আলো আসে ৷ ছায়া আসে ৷ মাঝে মাঝে মরীচিকা ঢুকে পড়ে ৷ হাতছানি দেয় ৷ মায়ায় ভুল করে পরিবারের লোকজন ৷ কারা কারা আসে লিস্টি নিয়ে ৷ কাগজ নিয়ে ৷ দিন পাল্টানোর কথা বলে ৷ দল পাল্টানোর কথা বলে ৷ স্বপ্নের ব্যাপারি সব ৷ ভুলে যায় আরতির ছেলে সুমন ৷ আঠাশ বছর বয়স ৷সে দেখে নি তিরিশ বছর আগের আকাশ ৷ রক্তে ভেজা মাটি ৷ তবুও আরতি বোঝায় সবাইকে ৷ বলে সেদিনের সিঁদুরে মেঘের কথা ৷ অন্যের নাম করে তার উপর বয়ে যাওয়া ঝড়ের কিস্সা  শোনায় ৷ বোঝে না ওরা ৷ তার সংসারের মানুষগুলো ৷ ওদের সামনে অলীক স্বপ্নের হাতছানি ৷

পুরোনো মেঘ আবার ফিরে আসে ৷ আকাশ জুড়ে ৷ সেই মানুষগুলো আবার আসে ৷ সেইদলে তার তিরিশ  বছর আগে দেখা মানুষগুলোও আছে ৷ এদেরকে মানুষ মনে হয় না আরতির ৷ ওদের গায়ে যেন হিংস্র পশুর পোষাক ৷ আরতির সঙ্গে চোখাচোখি হলে ওরা সরে যায় ৷ তার সামনে দাঁড়ায় না ৷ ছেলেকে আর তার বাবাকে রাজি করায় ৷ সব শোনায় আরতি রান্নাঘর থেকে ৷ আগামী সোমবার  মিছিল ৷ ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাবে ৷ ওরাও যেন যায় ৷ আরতির বুক সাগরের মতো তোলপাড় করে ৷ পাক দিতে থাকে ৷ ঝড়ের প্রস্তুতি নেয় ৷ শেষ প্রতিরোধেরও ৷

দূরে একটা হল্লা শোনা যায় ৷ মিছিলের আওয়াজ ৷ আরতির বুকে ঝড় ৷ সুমন বেরুবে ৷ আরতির চোখে মুখে ক্রোধ ৷ ছেলে মিছিলে যাবে ৷ মিছিল এগিয়ে আসে ৷ আরতি আরো দৃঢ় হয় ৷  ওদের বাড়ির আরো কাছাকাছি আসে মিছিল ৷ একটা বিশৃঙ্খল জটলা রাস্তা জুড়ে এগিয়ে আসে ৷ থমকে যায় সে ৷ মিছিলের সামনে ওটা কে? অচিন্যা?  অচিন সাউ !  হাজার ডঙ্কা বেজে ওঠে তার শরীরে ৷ মুহূর্তে ঘরে ঢুকে যায় সে ৷ বেরিয়ে আসে ধারালো ছেনিটা নিয়ে ৷ ছেলে পা বাড়ায় মিছিলের দিকে ৷ এই সুমন, এক পাঅ বাড়াইবি না কইতাছি ৷ ঘরঅ ঢুক ৷ নইলে আজগা তরে কাইট্টা আমিঅ আত্মঘাতী অয়াম ৷ আচমকা মায়ের অচেনা মূর্তি দেখে থমকে যায় সুমন ৷ এ কি রূপ তার মায়ের!  ভয়ে ঘরে ঢুকে যায় সুমন ৷ বেগতিক দেখে মিছিলটা দ্রুত তাদের ঘাটা পেরিয়ে যায় ৷

সুমনের মাও ঢুকে পড়ে ঘরে ৷ ছেনিটা নিয়ে সুমনের সামনে দাঁড়ায় ৷ ছুঁড়ে ফেলে দেয় ছেনিটা ৷ একটা ধাতব আওয়াজ ওঠে ৷ আর নিজেকে ছুঁড়ে ফেলে তক্তাপোশের উপর ৷ মেঘভাঙা বৃষ্টির মতো ঝাঁপিয়ে কান্নায় ভাসে সে ৷ তিরিশ বছর আগে সেদিনও এমন মিছিল চলে গিয়েছিল তার শরীরের উপর দিয়ে ৷ সেদিনও সামনে ছিল এই অচিন্যা ৷ ছেলেকে বলতে পারে না ৷  শুধু চোখের জলে ভাসে আরতি ৷

মুখ


চাঁদের মানচিত্রে তোমার মুখ আঁকা হয়ে যাবার পর
আমি কেবল শঙ্খউতল বিছানার ছবি দেখি
সেখানে কৌমার্যচিহ্ন লুকিয়ে থাকে বাটিক শিল্পের আড়ালে তছনচ বেডশিট আর দুমড়ানো বালিশের খোল
অনেক গোপন রমনের প্রত্নভাষা ও সাক্ষ্যচিহ্ন ধরে রাখে সন্ধ্যা ভাষায়
শুধু তোমার নির্বিবাদী আঁচল সমস্ত দুঃখ ডুবিয়ে রাখে তার কালো জমিনে

বার্তা



সাঁকোটা না নাড়ানোর জন্যে বাতুলকে অনুরোধ করাও এক অর্বাচীন প্রগলভতা ৷

সার কথা, এতে মনোরোগীর জাগরণ ঘটে অপকর্মটি করার জন্যে ৷তা তার কাছে উল্লাসও বটে ৷

সেই সাঁকোতে পা রাখার আগে জেনে নেওয়া যেতে পারে তার নির্মানশৈলীর প্রকৌশলগত সততার উপকথা ৷

যথাযথ প্রকরণ না মেনে কিংবা আস্থাব্যঞ্জক খসড়াবিহীন যে কোন প্রকল্প হুমড়ি খেয়েই পড়ে ৷
সে সময় কাগজ-কলম আর হাজার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ সমস্ত সৎ প্রতিবাদী কণ্ঠকে পুরো অসহায় করে দেয় ৷

শূন্যের উপরের নির্মানকে বার বার নিরস্ত করেছেন পল্লীবাউল ৷

আটঘাট বেঁধে লড়াইয়ের এও এক ব্রাত্য বার্তা ৷

উড়াল



প্রকৃতিকে আমরা নিংড়ে নিচ্ছি বলে
মাঝে মাঝে দখিন সমুদ্রের গর্ভগৃহ থেকে
পাঠানো মিঠে মরুতের সঙ্গে আসে আগুনআঁচ
অগণিত রেণুর সৃজনকাল উড়ে যায়
চূর্ণ হয়ে বৃক্ষহীন পাহড়ের দিকে

হৃদয়ের ভাষাজ্ঞান আহরণের জন্য
যে পাখিদের পাঠালাম নালন্দার ছাত্রাবাসে
ফিরে আর এলো না সে পাখিশাবকের দল
করপোরেট দানাপানির আশায় উড়াল
দেয় আরো দূর দূরান্তের আয়নানগরে

তথাগত



কলিঙ্গবিজয়ের অশুভ স্বপ্নে শুধু শবসাধনা আর
রক্তজমা প্রান্তরের শীর্ষে খন্ডগিরির ধবল দেউল

তারও পরে শরণ নিলাম তথাগতের চরণে
শ্বেত পতাকা আর কপোতের উড্ডয়নস্পৃহা
যুগ যুগ নিভৃত সাক্ষী থেকে কী প্রেম ছড়ালে
গৌতম থেকে গুরুদেব এক দীর্ঘ দেশার্ত সীমা

কিরাতভূমির বিলীয়মান  জনপদের মুখোমুখি
সর্বোচ্চ টিলার মাথায় প্রশস্তিপত্রের ন্যায় গোপনে
চক্ষুদান করে কোন এক
ধ্যানবিন্দু অনুশীলনরত কিরাতবালক

শাক্যসিংহের হাসির ছটা সূর্যালোকের মতো
বিচ্ছুরিত হয় জনপদের শরীরে ৷

পূরবীমায়া



মশারির ব্যবধান দ্বীপের দূরত্ব গড়ে তোলে
গোচারণের অনন্তমাঠ সবুজ ঘাস হারালেও
অবুঝ বিষ্ণুপ্রতিমগণ গৈরিক অসুখী মাঠেই
জীবনের চাঁদোয়াতলায় দিনলিপি লিখে রাখে
রক্তাক্ত দাঁতের অক্ষরে ৷
ভিটের বুকে গোপন কোন মুদ্রা সঞ্চিত না থাকলেও
ঘুঘু যেমন চরে যায় প্রবাদের সূত্র অনুসারে

তেমনি জিওল মাছের মতো বেঁচে থাকা শুধু
আত্মজনের খুনমজ্জায় যেহেতু নিজেরও
রক্তদানের গোপন প্রত্নশ্লোক নিহিত রয়েছে

সেইজন্যেই প্রতি ভোরের পুণ্যস্নান আর সন্ধ্যার পুরবীমায়া ৷

নিদকুমারীর প্রতি



আয়নামহলের রাজকন্যের সাংকেতিক বার্তা
দূরপ্রান্তরের দুয়োরানির মাণিকের পৈঠায় পৌঁছুলে
টিপরাই বাঁশিতে সুর ওঠে জাদুকলিজার

মহলের পালঙ্কে কী বিরহী কন্যে ঘুমে অচেতন থাকে
সোনার কাঠি আর রূপোর কাঠির রূপকথা সূত্রে? 

কে সে?  কোন দানোটা ঘুম পাড়িয়ে রাখে আরশিনগরের একাকী মেয়েটার?

এইসব ভেবে ভেবে টিলার ওপরের টংঘরের নিষাদসন্তান
তার বাঁশিতে নতুন সুর বেঁধে হওয়ায় ভাসিয়ে দেয়
মহলবন্দী রাজকুমারীর ঘুমভাঙানোর গান ৷

আঁধারগড় চুরমার করে ভোরের হাসিকে সঙ্গী করে
সেই গান পৌঁছে যাবে ঘুমকুমারীর নিদমহলে ৷


*  ' জাদুকলিজা ' ত্রিপুরার বরক জনজাতির নিজস্ব সঙ্গীত ঘরানা ৷