Monday, March 30, 2026

লোকজীবন ও সাহিত্যে মাতৃ ভাবনা থেকে দেশ ভাবনা : জাতীয়তাবাদের উত্তরণ বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম

লোকজীবন ও সাহিত্যে মাতৃভাবনা থেকে দেশভাবনা : জাতীয়তাবাদের উত্তরণ বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দেমাতরম'

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

মানবসভ্যতার সৃষ্টিকাল থেকেই মাতৃকামূর্তি জীবনধারিনী, উর্বরতাকৃষ্টি ও পৃথিবীর প্রতীক হিসেবে মনুষ্য সমাজে মান্য হয়ে আসছেন । সেজন্যই প্রাচীন বিশ্বে মাতৃকা বা Mother Goddess এর মূর্তি মানবধর্ম ও সংস্কৃতির প্রধানতম প্রতীকগুলির অন্যতম । প্রাচীন প্রস্তরযুগ থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশে মাতৃকা আরাধনার প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায় । প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বিভিন্ন স্থানে মাটির বা পাথরের নারীমূর্তি পাওয়া গেছে । এই মূর্তিগুলি উর্বরতা ও মাতৃত্বের ভাবনা নির্দেশ করে । প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করেন, এগুলি গ্রামদেবী, ভূমিদেবী বা প্রাকশাক্ত আরাধনার আগের রূপ । তারপর পরবর্তীতে হরপ্পা সভ্যতায় শস্য উৎপাদনকারী পৃথিবীমাতার মূর্তি থেকে 'সপ্তমাতৃকা' ও ও 'মহিষাসুরমর্দিনী' দুর্গার মত দেবীরূপ ধারণ করে বিবর্তিত হতে দেখা গেছে । বৈদিক যুগে ঊষা, অদিতি, বিশ্বমাতা ও পরবর্তী যুগের ষোড়শ মাতৃকা, দুর্গা, অম্বা, প্রতিমাদেবী মাতৃকা সংস্কৃতির বিকশিত রূপ । আবার লোকায়ত দেবীরূপে গ্রামদেবী, শীতলা, মনসা এসবেতেই প্রাচীন মাতৃকাচিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে । পরবর্তীকালে যা হিন্দু ধর্মের শাক্ত ধারায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে ।

লোকসংস্কৃতি হল সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি । আদিম মানুষের জীবন, বিশ্বাস, আচার-আচরণ, শিল্পকলা ও বিনোদন থেকে সৃষ্ট সংস্কৃতি যা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতিনীতি, জীবনযাপন প্রণালী তাদের মুখে মুখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ে এবং লোকজীবনকে প্রতিফলিত করে । মাতৃভাবনা বা মাতৃতান্ত্রিকতা হল এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা যেখানে নারী বা মাতাকে কেন্দ্র করে সমাজ পরিচালিত হয় । লোকসংস্কৃতির নানা উপাদানে, যেমন লোকগীতি, লোককথা, প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা, মিথ,নাটক, গান, নৃত্য এবং প্রথাগত বিশ্বাসে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয় মাতৃভাবনা । লোকসংস্কৃতি ও মাতৃভাবনা পরস্পর গভীরভাবে সম্পৃক্ত । প্রাচীন সমাজে নারীর ভূমিকা প্রধান ছিল বলে তাকে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বলা হত । নারীর সামাজিক ভূমিকা, প্রজনন, খাদ্য সংগ্রহ, গৃহরক্ষা প্রভৃতি মাতৃতান্ত্রিক ধারণা সৃষ্টির দরুণ মাতৃভাবনা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে । তাছাড়া কৃষিনির্ভর সভ্যতায় পৃথিবীকে 'মা'-রূপে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও সমাজে মাতৃভাবনার সৃষ্টি হয়েছে । লোকজীবন  তো মাটিতে ঘিরেই কৃষিজ পণ্য উৎপাদনের  মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে । তাই লোকজীবনে মাটির প্রতি এক গভীর মায়া এবং মাটিকে মায়ের মত মনে করা হয়েছে । সেই থেকে সৃষ্ট মাতৃভাবনা মানুষের আদিচেতনা । লোকসঙ্গীতে দেখি–'মোর মা বলে, ধান রে সোনার ধান /তোর গন্ধে ভরা মন প্রাণ ।' লোকসংস্কৃতিতে মা মানে যিনি দুধ দেন, যিনি ফসল ফলান, যিনি নদীর জলে আশীর্বাদ দেন, আর যিনি বিপদে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখেন । গ্রাম বাংলার লোকজীবনে মা শুধু সংসারের নয়, প্রকৃতিরও প্রতিমূর্তি । তিনি ধানের দেবী লক্ষ্মী, পৃথিবীমাতা বা বসুমাতা, নদীমাতা, গঙ্গামাতা ও গোমাতা । এসব নিয়েই বাংলার লোকবিশ্বাস । মাতৃরূপে পুজিতা লোকমাতা ।

বাঙালির লোকজীবনে প্রবাহিত মাতৃকাকৃষ্টি বা মাতৃভাবনা বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন পর্যায়েও তার স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে । বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ । চর্যাপদের কবিতায় সরাসরি মাতৃভাবনার রূপ তেমন দেখা যায় না । কারণ এর মূল বিষয়বস্তু ছিল বৌদ্ধধর্মের আধ্যাত্মিক সাধনা ও গুহ্যতত্ত্ব । তবে চর্যার কিছু কিছু পদে পরোক্ষভাবে নারী ও জননীর প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়, যা সাধনা ও জীবনযাত্রা সম্পর্কিত । এখানে নারীরূপকে সাধনার প্রতিমূর্তি বা 'মাতৃআজ্ঞা' বা মাতৃধারণার মাধ্যমে সন্তান-জননী সম্পর্কে সাধনসঙ্গিনী হিসেবে ভক্তি-শ্রদ্ধার ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়েছে । এখানে জ্ঞানমুদ্রা অর্থে 'হরিণী' বা শবরী অর্থে 'দেবী নৈরাত্মাকে' বোঝানো হয়েছে । জীবন ও জীবিকার নানা ক্ষেত্রে নারীসত্ত্বা দৃঢ়তা, কর্তৃত্ববোধ, স্বাধীন চিন্তা ও মননের পরিচয় বহন করে । মেয়েরা এখানে প্রান্তিক সমাজের জনজীবন ও চেতনার অংশ । ২০ নং চর্যায় কুক্কুরীপাদ নারীর প্রসব যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করেছেন । প্রসবের সময় সন্তানের প্রাণ বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনায় মাতৃহৃদয়ের যন্ত্রণার ছবি এখানে ফুটে উঠেছে । 'পহিল বিয়াণ মোর বাসনয়ুড়া/ নাড়ি বিআরন্তে  সেব বায়ুড়া ।।/ জান জৌবন মোর ভইলেসি পুরা / মূল নখলি বাপ সংঘারা ।।/ ভনথি কুক্কুরীপা এ ভব থিরা ।/ জো এথু বুঝই সো হেথু বীরা ।। (চর্যা-২০)

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মাতৃভাবনার দৃষ্টান্ত মূলত, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি ও শাক্ত পদাবলিতে পাওয়া যায় । মনসামঙ্গলের দেবী মনসা ও বেহুলাকে নিয়ে মা-মায়ের সম্পর্ক, অন্নদামঙ্গলে দেবী অন্নপূর্ণা ও উমাকে কেন্দ্র করে মাতৃস্নেহ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও অন্যান্য পদাবলীতে যশোদা ও শ্রীরাধার মতো মাতৃপ্রতিম চরিত্রগুলির মাধ্যমে স্নেহ, মমতা ও ত্যাগের আদর্শ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যা তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক চিত্র তুলে ধরে । বৃন্দাবনদাসের চৈতন্য ভাগবত ও লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গলে শচীমাতার মাতৃত্ব, বাৎসল্য ও ত্যাগ বৈষ্ণব সাহিত্যে মাতৃ ভাবনার এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত । শচীমায়ের পুত্রকে নিয়ে উদ্বেগ, স্নেহ ও ভক্তি এখানে অতুলনীয় । কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতে শচীমাতা ও অন্যান্য মায়ের বর্ণনা বিশেষত পুত্র-মাতৃ সম্পর্ক ও ভক্তি প্রেমের ধারায় মাতৃভাবনার গভীরতা ফুটে উঠেছে ।

শাক্ত পদাবলীতে মাতৃভাবনা বলতে মূলত জগজ্জননী (দেবী দুর্গা) ও তাঁর লীলারূপের বর্ণনাকে বোঝানো হয়েছে । সেখানে মাকে একদিকে যেমন সর্বশক্তিমান ব্রহ্মময়ীরূপে দেখা যায় তেমনি বাৎসল্যরসের মাধ্যমে এক সাধারণ মাতৃস্নেহের প্রতিমূর্তি (যেমন মেনকা, উমা ) রূপেও চিত্রিত করা হয় ।  আগমনী ও বিজয়া পদের মূল বিষয়ও তাই যেখানে ভক্তের আকুতি, জগত ও জীবনের দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রার্থনা মিশে আছে । শক্তিসাধনা থেকে দেশপ্রেম ও শাক্তসাহিত্যের বিবর্তনের ধারাটিতে দেখা যায়, কিভাবে মাতৃশক্তির উপাসনা (শক্তি) থেকে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটেছে ।  রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের মত সাধক কবিগণ শ্যামাসঙ্গীত ও শাক্ত পদাবলির মাধ্যমে এই মাতৃভাবনাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যেখানে গীতার বর্ণিত জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির দর্শন ও সামাজিক চেতনার সমন্বয় ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তি স্থাপন করে । 'মা' বা 'মাতৃকা' ধারণার গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা শুধু দেবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাতৃভূমির ধারণায় প্রসারিত হয়েছে । শাক্ত পদাবলীর 'মা' বা 'মাতৃদেবী' (যেমন কালি বা দুর্গা)-র রূপটি ধীরে ধীরে দেশের প্রতীক হয়ে ওঠে । দেবীর পূজা ও সাধনা দেশের পূজা ও দেশপ্রেমের রূপ নেয় । শাক্তসাহিত্য ও শক্তিসাধনার এই লোকায়ত ধারা উনিশ শতকের নবজাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে যেখানে দেশমাতার পূজার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ জাগ্রত হয়ে দেশপ্রেমের গভীর চেতনায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং বাংলাসাহিত্য ও জাতীয়তাবাদের এক অবিচ্ছেদ অংশ হয়ে উঠেছে।

উনিশ শতকের নবজাগরণে সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে দেশপ্রেম ছিল এক প্রধান ধারা, যা ভারতীয় সমাজকে আত্মমর্যাদা ও জাতীয় চেতনার পথে চালিত করে । বাংলা কবিগান ও নবনাট্য আন্দোলন বিশেষত স্বদেশী যুগ থেকে দেশমাতৃকার বন্দনা বা দেশাত্মবোধক গান ও নাটকের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামকে তীব্রতা দিয়েছিল । কবিগান ছিল গ্রামীণ ও লোকায়ত ধারার গান । এই গানের মাধ্যমে দেশপ্রেমের বার্তা সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা হত । এই ধারায় দেশমাতৃকাকে মা-রূপে কল্পনা করে তার বন্দনার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হত । কবিগানে 'মালসি গান' নামে এক বিশেষ বন্দনাগীতি পরিবেশন করা হত যার মাধ্যমে দেশমাতৃকাকে বন্দনার পাশাপাশি তার শৃংখলমুক্তির বার্তাটিও নিহিত থাকত । বাংলার নবনাট্য আন্দোলন স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার ঘটায় । নাটকের মাধ্যমে দেশমাতৃকার বন্দনা, শোষণ ও বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা হত । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রমেশ চন্দ্র দত্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ  সাহিত্যিকগণ তাঁদের লেখায় স্বদেশ, স্বজাতীয় ভাষার প্রতি অনুরাগ ফুটিয়ে তোলেন । প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে এক নতুন জাতীয়তাবাদী ভাবধারা তৈরি করে এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিক আন্দোলনকে উদ্বুদ্ধ করে । রামমোহন থেকে শুরু করে পরবর্তী লেখকরা ভারতের ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতিকে নতুন আলোয় দেখতে শুরু করেন যা ছিল আত্মপরিচয়ের সন্ধান । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দের মতো ব্যক্তিত্বরা সমাজ সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশের মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করেন তেমনি ধর্মীয় ও সামাজিক গোড়ামি দূর করে সামগ্রিক উন্নয়নের পথ দেখান যা পরোক্ষভাবে দেশপ্রেমের জন্ম দেয় ।শিবাজী, রানা প্রতাপ এর মত ঐতিহাসিক চরিত্রদের নিয়ে রচনায় দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা যোগানো হয় । চিত্রকলায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা গানে রজনীকান্ত সেনের মতো শিল্পীদের কাজও দেশীয় ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলে দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটানো হয় । বাংলাভাষাকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়কে দৃঢ় করা হয় । বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরানীর মতো উপন্যাস কেবল সাহিত্য হয়ে থাকেনি । এগুলি লক্ষ লক্ষ ভারতবাসীকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছিল এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আদর্শগত ভিত্তি স্থাপন করেছিল ।

উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন একজন বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব যাকে জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু পুনর্জাগরণের বা নবজাগরণের অন্যতম দূত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় । তাঁর লেখনীতে ধর্ম ও জাতীয়তাবোধ ছিল দেশপ্রেম ও শক্তিসাধনার এক অনন্য মিশ্রণ ।  জাতীয়তাবাদ শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন নয় । তাকে ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তির উপর তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তিনি দেশকে মাতৃভূমিরূপে কল্পনা করে 'বন্দেমাতরম' স্লোগানকে জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন । তাঁর আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরানী উপন্যাসের মাধ্যমে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে স্বদেশপ্রেমের ধারণার উন্মেষ ঘটে এবং তা পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে । বঙ্কিমচন্দ্র দেশকে শুধু একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড হিসেবে দেখেননি । তাঁর আনন্দমঠে মাতৃভূমি দেবীরূপে পূজিত হয়েছেন । এখানে দেশকে এক জীবন্ত দেবী 'মা' রূপে ব্যক্ত করা হয়েছে । আর সন্ন্যাসীগণ হলেন তাঁর সন্তান। সন্তানের কাছে যেমন মা দেবীরূপে পূজ্য তেমনি সন্ন্যাসী বিদ্রোহে ব্রতী বিদ্রোহীদের কাছে দেশমাতৃকাও সমান পূজ্য । এই উপন্যাসের ভবানন্দের কথায় আমরা পাই,–
       'আমরা অন্য মা মানি না–জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী । আমরা বলি জন্মভূমিই জননী । আমাদের মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, বন্ধু নাই,– স্ত্রী নাই, পুত্র নাই, ঘর নাই, বাড়ী নাই, আমাদের কাছে আছে কেবল সেই সুজলা, সুফলা, মলয়জসমীরণশীতলা, শস্য শ্যামলা ।'
–এই ধারণাই 'বন্দেমাতরম' এর মূল ভিত্তি যা দেশকে পূজা করার ডাক দেয় । ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ও সামরিক রূপের বিপরীতে বঙ্কিমের জাতীয়তাবাদ ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার গভীরে প্রোথিত । তিনি মাতৃভূমির পূজা করার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয়চেতনার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমকে একীভূত করেছেন । তিনি অনুশীলন সমিতির মতো সংগঠনকে প্রভাবিত করে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং রজোগুণ-র অনুশীলনের মাধ্যমে জাতিকে শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আহ্বান জানান । 'আনন্দমঠ' উপন্যাস ও 'বন্দেমাতরম' সংগীত ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে তাঁর সবচেয়ে বড়ো অবদান । সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে লেখা এই উপন্যাস আনন্দমঠে বঙ্কিমচন্দ্র দেশপ্রেম ও ধর্মকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন । ফলে দেশপ্রেম এক আধ্যাত্মিক ভিত্তি ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় । 'বন্দেমাতরম' কেবল একটি স্লোগান ছিল না । এটি ছিল একটি মন্ত্র যা দেশবাসীকে মাতৃভূমির প্রতি ভক্তি ও দেশপ্রেমের এক নতুন চেতনায় দীক্ষিত করে এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবীদের প্রেরণা জুগিয়েছিল । এই গানটি একটি কবিতামাত্র নয় । এটি ভারতমাতার স্বরূপ বর্ণনার মাধ্যমে দেশকে মা দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী ও অন্যান্য দেবীর রূপক দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে যা ভারতের সমৃদ্ধি সৌন্দর্য ও শক্তির প্রতীক । দেশমাতৃকার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে মায়ের বিভিন্ন রূপের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে । 

বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে তাঁর অমর সৃষ্টি যে 'বন্দেমাতরম' ধ্বনিত হয়েছিল তা ছিল দেশ মাতৃকার প্রতি গভীর ভক্তি ও জাতীয়তাবাদী চেতনার এক মহামন্ত্র । বন্দে মাতরম স্তোত্র আজও প্রতিটি দেশবাসীর হৃদয়ে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের স্পৃহা জাগিয়ে তোলে । এই মহামন্ত্র ভারতের সকল মানুষের মধ্যে জাতীয় গর্ব ও ঐক্যের অনুভূতি তৈরি করেছে যারা সাহিত্য ও ইতিহাস পেরিয়ে জাতীয় পরিচয় এর চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছে ।

কিংবদন্তী ও স্থাননামে পিলাক প্রসঙ্গ

কিংবদন্তী ও স্থাননামে পিলাক প্রসঙ্গ 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

দক্ষিণ ত্রিপুরার জোলাইবাড়ি সন্নিহিত প্রত্নভূমি পিলাক । এই পিলাকের বুকে অসংখ্য গণপতি, বিষ্ণু, সূর্য, শিব ও শক্তি মূর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে । মনে হয় যেন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিংবা বিরুদ্ধচারী কারো হাতে এগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে । দীর্ঘদিন এগুলো লোকচক্ষুর গোচরে আসেনি । ত্রিপুরার রাজন্যইতিহাসের আধার রাজমালা ও এ বিষয়ে নিশ্চুপ । পরবর্তী সময়ে সমরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্মা, প্রিয়ব্রত ভট্টাচার্য, দীপক ভট্টাচার্য, ড. রঞ্জিত দে, আশীষ কুমার বৈদ্য প্রমুখ লেখকদের লিখিত গ্রন্থসমূহে ও অন্যান্য কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন রচনায় এর উপর কিছুটা আলোকপাত হয় । বিস্তৃত গবেষণামূলক কাজ এখনো শুরু হয়নি । আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বর্তমানে এই এলাকায় কিছু খোঁড়াখুড়ি করে বেশ কিছু পরিমাণে প্রাচীন মূর্তি ও টেরাকোটার কাজ ইত্যাদি উদ্ধার করেছেন । বহু আগে থেকেই এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পিলাকের বহু মূর্তিই ইতোমধ্যে উধাও হয়ে গেছে । এখনো অনেক মূর্তি বেওয়ারিশভাবে সারা এলাকার এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । অথচ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে এই মূর্তিসমূহের মূল্য কি অসীম !

একথা অনস্বীকার্য যে, পিলাককে কেন্দ্র করে এখানে প্রাচীন সমৃদ্ধ জনপদ ছিল যার প্রাচীনতা এখানকার প্রাপ্ত মূর্তিসমূহেই প্রমাণিত হয় । বৌদ্ধ নিদর্শনসহ হিন্দু ধর্মধারার বিভিন্ন রূপ বিবর্তনের প্রভাব এই ভাস্কর্যসমূহে রয়েছে । সৌর,গণপত্য, বৈষ্ণব শৈব ও শাক্তধারার সঙ্গে বৌদ্ধসংস্কৃতির সমন্বয়ে সৃষ্ট এক মিশ্রসংস্কৃতির নিদর্শন এই পিলাক  সংস্কৃতি । মূলত প্রত্নভূমি পিলাকের ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণ ও এই মিশ্রসংস্কৃতিকে পুষ্ট করতে সহায়তা করেছে । একদিকে বিশাল বঙ্গ সমতট, অন্যদিকে আরাকান, বার্মার সঙ্গে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে যোগাযোগ এখানকার সংস্কৃতিতে ছাপ ফেলেছে ।

পিলাকের ইতিহাস এবং প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয় এ প্রবন্ধের উপজীব্য নয় । এ দুটোই বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে সঠিক তথ্য উদঘাটনে সহায়তা করে । এছাড়াও লোকসংস্কৃতিকেন্দ্রিক কিছু কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে অনেক ঐতিহাসিক উপাদান লুকিয়ে থাকে । সেকারণে লোকসাংস্কৃতিক বিষয়াবলিও অনেক সময় লুপ্ত ইতিহাসকে উদঘাটনে সহায়তা করে । কোন স্থানের প্রাচীন ইতিহাসগত তথ্য আহরণের ক্ষেত্রে সেখানে বসবাসকারী প্রাচীন কোনো অধিবাসীদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিংবদন্তী, পুরাকথা লোককাহিনি, স্থানের নামবিবর্তন, ইত্যাদিকেও অনুষঙ্গ করে অগ্রসর হতে হয় ।

বর্তমান প্রবন্ধে এধরনের সামান্য কিছু লোকসাংস্কৃতিক বিষয়কে আধার করে পিলাকসংস্কৃতির উপর কিঞ্চিৎ আলোকপাতের চেষ্টা করা হচ্ছে । এ অঞ্চলে যে প্রাচীন জনগোষ্ঠী বসবাস করেন তাদের অধিকাংশই স্থানীয়ভাবে 'মগ' নামে পরিচিত । আমাদের প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে 'মগ' নামে একদল ভয়ংকর জলদস্যুর উল্লেখ আছে ।  যারা আরাকান প্রদেশ থেকে বাংলাদেশের সমুদ্র ও নদীতীরবর্তী জনপদ সমূহে অত্যাচার লুণ্ঠন ইত্যাদি কার্য চালিয়ে কুখ্যাত হয়ে আছে । কিন্তু এখানে যাদের 'মগ' বলে অভিহিত করা হয় তাঁরা কিন্তু এ ধরনের ঐতিহাসিক সত্যকেও নস্যাৎ করেন এবং তারা নিজেদেরকে 'মগ' নামে পরিচয় দিতেও অস্বীকার করেন । প্রসঙ্গত, এখানে একটি সত্যি কথা উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ ত্রিপুরা ও ত্রিপুরার অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী যে জনজাতিকে আমরা 'মগ' নামে চিহ্নিত করি তাঁদের মধ্যে ইতিহাসকথিত মগ জলদস্যদের মতো কোনো হিংস্রতার লক্ষণই দেখা যায় না । বরঞ্চ ভগবান তথাগত বুদ্ধের শান্তি, মৈত্রী ও করুণার মন্ত্র দীক্ষিত হয়ে তাঁরা অত্যন্ত সরল সাদাসিধে এবং নিরীহ জীবনযাত্রা অতিবাহিত করেন । এই জনজাতিগোষ্ঠী যেখানেই বাস করছেন সেখানেই বাঙালিসহ অন্য আরো কয়েকটি জনজাতি গোষ্ঠীর লোকও পাশাপাশি বাস করতে আজও দেখা যাচ্ছে ।  বিভিন্ন জনজাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি অবস্থানের এই ইতিহাস ত্রিপুরাতে ঐতিহ্যগতভাবেই প্রাচীন । সম্ভবত আরাকানি জলদস্যদের সঙ্গে দৈহিক সাযুজ্য লক্ষ্য করেই এই জনজাতীয় গোষ্ঠীকে সমতলঅংশের জনগোষ্ঠী 'মগ' বলে অভিহিত করে গুলিয়ে ফেলেছেন অথবা এই জনগোষ্ঠীর লোকেরাও আরাকান থেকে এসেছেন বলে মগ জলদস্যদের সঙ্গে এদের ভাষাগত সামঞ্জস্য থাকার কারণে ও তাদের 'মগ' বলে অভিহিত করা হয়ে থাকতে পারে ।

স্থানীয়ভাবে যাদের 'মগ' বলা হয় তাঁরা নিজেদের আরাকানি বলে পরিচয় দিতে বেশি গর্ববোধ করেন । এই আরাকানিদের বিভিন্ন গোত্র আছে । তাঁদের মধ্যে মূল আরাকানে যারা বাস করেন তাঁরা নিজেদেরকে রখইঙসা বা রখইঁসা বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন । এই রখইঙ থেকে রখইঁ > রখঙ > রাহাঙ > রোসাঙ ও রোহাঙ শব্দের উৎপত্তি । আরাকানের প্রাচীন রাজবংশের নাম রোসাঙ তো বাংলাসাহিত্যের ছাত্রমাত্রই জানেন । এছাড়া তাদের আরেকটি গোত্রের নাম খিয়ঙসা বা খ্যঙসা । খিয়ঙ বা খ্যঙ  শব্দের অর্থ হল নদী এবং সা শব্দের অর্থ সন্তান । অর্থাৎ এই গোত্রের লোকেরা হলেন নদীতীরবাসী । এরকম তাঁরা বিভিন্ন পর্বত নদী ইত্যাদির নাম নামে তাঁদের গোত্রের নাম রাখেন । এই গোত্র সমূহের মধ্যে প্লেঙসা, ক্যেয়ফিয়াসা, রেঙব্রিসা, প্লেঙয়িঁসা ইত্যাদি আরো অনেক গোত্রের নাম পাওয়া যায় । পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে এই জনগোষ্ঠীর লোকেরা বহু প্রাচীনকাল থেকে বসবাস করে আসছেন । পূর্বকথিত মগজলদস্যুদের সঙ্গে এদের এক করে না দেখলে তাদের রাজ্যের আগমন আরো প্রাচীন । একটি ঐতিহাসিক মত থেকে জানা যায় যে প্রাচীন চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরার চন্দ্রবংশীয় রাজারা আরাকানের চেন্দ্রা রাজবংশের সঙ্গে সম্পর্কিত । ১৯৫৪ সালে কুমিল্লার চারপত্রমুড়াতে চন্দ্ররাজাদের তিনটি তাম্রশাসন পাওয়া যায় । তা থেকে চন্দ্রবংশীয় নৃপতিদের পরিচয়ও জানা যায় এ বংশের সাতজন নৃপতি দশম শতক থেকে  একাদশ শতক পর্যন্ত সমতটে রাজত্ব করে গেছেন । তাঁদেরই কোনো গোষ্ঠী ত্রিপুরারাজ্যের দক্ষিণপ্রান্তে তাদের রাজ্যপাট বিস্তার করেও থাকতে পারেন । সাব্রুম ও বিলোনিয়া মহকুমার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বহু প্রাচীনকাল থেকেই এই জাতি গোষ্ঠীর বাস । অনেক প্রাচীন জনপদ তাঁদের হাতেই গড়ে উঠেছে আবার অনেক জনপদ থেকে তাঁরা সরে গিয়ে সেই জনপদকে শূন্য করে দিয়েছেন বা সেইস্থান নতুন জনগোষ্ঠীর আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে । 

সাব্রুম মহকুমা ও তৎসন্নিহিত জোলাইবাড়ি, বাইখোরা ইত্যাদি অঞ্চলে আলোচ্য জনগোষ্ঠীর যে গোত্রের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, জানা গেছে তারা প্লেঙসা গোত্রের । এছাড়া বিলোনিয়া অঞ্চলে যাঁরা আছেন তাঁরা খিয়ঙসা  বা খ্যঙসা গোত্রের এবং বীরচন্দ্র মনু ও তৎসম্নিহিত অঞ্চলে ক্যেয়ফিয়াসা গোত্রের লোকেরা বাস করেন বলে জানা গেছে । এক সময়ে পিলাক অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় মগদের বসবাস ছিল  প্লেঙসা গোত্রভুক্ত মগ রাজাদের রাজধানী ছিল বলেও তাদের মধ্যে কিংবদন্তি আছে । নদীর সঙ্গে বা পাহাড়ের সঙ্গে যেমন এই জনগোষ্ঠীর গোত্রসম্বন্ধ আছে তেমনি এই জনগোষ্ঠীর অধ্যুষিত জনপদের ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের দিকে লক্ষ্য করলেও এই বিষয়ের মধ্যে একটি সুক্ষ্ম সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় । সাব্রুম-বিলোনিয়ার মনুবনকুল, ছোটখিল, দৌলবাড়ি, বৈষ্ণবপুর, পিলাক, দেবদারু, জোলাইবাড়ি, বাইখোরা, লাউগাঙ, বীরচন্দ্র মনু এমনকি লংথরাইভ্যালির কুলাই, আমবাসা, বলরাম প্রভৃতি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাদের ব্যাপক বসবাস লক্ষ্য করা যায় । এইসব অঞ্চলের প্রাকৃতিক গঠন সর্বত্রই সুউচ্চ পাহাড়বেষ্টিত উপত্যকার ন্যায় । এই উপত্যকার মধ্য দিয়ে অবশ্যই একটি বা একাধিক জলধারা প্রবাহমান আছে । ত্রিপুরার প্রায় প্রতিটি মগ অধ্যুষিত পল্লীতে এই সাদৃশ্য চোখে পড়ে । সেই হিসেবে তাদের বাসস্থান বেছে নেওয়ার যে লৌকিক সংস্কার তার সঙ্গে তাদের গোত্রসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায় । এই তথ্যটি থেকে এমন একটি সিদ্ধান্তে আসা যায় যে পিলাক অঞ্চল সুপ্রাচীনকাল থেকেই বিস্তীর্ণ মগ অধ্যুষিত জনপথ ছিল । কারণ পিলাকও চারিদিকে সুউচ্চ পাহাড়বেষ্টিত বিশাল সমতল উপত্যকাভূমি । তাহলে তাদের কিংবদন্তির কিছুটা স্বাক্ষর এখানে পাওয়া যায় ।

পিলাক অঞ্চলের যেসব মুর্তি পাওয়া যায় সেগুলো নাকি 'প্লেঙসা' রাজা করিয়েছেন । এসম্বন্ধে একটি প্রাচীন উপকথা এই গোত্রের মানুষদের কাছে থেকে পাওয়া গেছে । 'প্লেঙ' রাজা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী । তিনি যে সময়ে রাজত্ব করতেন তখন পার্শ্ববর্তী সমতল এলাকায় বিভিন্ন বৌদ্ধধর্মকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল । বাংলাদেশের 'কোলা' রাজাও তাঁর পূর্ববর্তী রাজাদের অনুকরণে বিভিন্ন স্থানে বহু মূর্তি নির্মাণ করেন এবং বৌদ্ধবিহার স্থাপন করেন । প্লেঙরাজা তীর্থ ভ্রমণ থেকে ঘুরে এসে নিজের রাজ্যেও মূর্তিস্থাপন এবং বৌদ্ধবিহার নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন । তিনি জেনে এসেছেন যে কোলারাজ্যে এ বিষয়ে দক্ষ শিল্পী আছে । তিনি কোলা রাজ্যের কাছে মহার্ঘ শ্বেতহস্তী ভেট পাঠিয়ে তাঁর আর্জি পেশ করলেন । তখন কোলারাজ তার রাজ্যের দক্ষ একজন তরুণ ভাস্করকে প্লেঙরাজের রাজ্যে পাঠিয়ে দিলেন। ভাস্কর এসে রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাঁর নির্দেশমতো বিভিন্ন দেবদেবী ও বুদ্ধের বিশাল বিশাল মূর্তি নির্মাণ করতে আরম্ভ করলেন । খেয়ালি রাজা তো নির্দেশ দিয়েই খালাস । তিনি আর খোঁজ নেওয়ারও সময় পেলেন না তরুণ ভাস্কর মূর্তি তৈরি করছে কিনা । একবছর ধরে টানা পরিশ্রম করে ভাস্কর বিশাল মূর্তির ভান্ডার গড়ে তুললেন । সমস্ত মাঠ জুড়ে মুর্তি জড়ো হয়ে গেল । অথচ মূর্তিগুলো কোথাও স্থাপনের ব্যবস্থা হচ্ছে না ।

এদিকে ঘটল আরেক ঘটনা । প্লেঙ রাজার তরুণী কন্যা একদিন ভ্রমণে বের হয়ে মাঠের মধ্যে এই বিশাল পরিমাণ মূর্তি দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন । তিনি দেখতে চাইলেন ভাস্করকে । তাঁর সঙ্গিনী সখীর সঙ্গে তিনি গেলেন যেখানে ভাস্কর ধ্যানমগ্ন হয়ে পাথরের বুকে খোদাই করে চলেছেন অপূর্ব সব মূর্তি । রাজকন্যা ভাস্করের শিল্প সুষমা দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন । প্রাথমিক পরিচয়ের পর রাজকন্যা আবদার করে বসলেন ভাস্করের কাছে,  তাঁর মূর্তি যেন গড়ে দেন ভাস্কর । কাজের ফাঁকেই ভাস্কর চোখ তুলে চাইলেন । তাঁর হাতের ছেনি যেন কেঁপে উঠল !  ভাবছেন তিনি পারবেন কি এই অগ্নিপ্রতিমার প্রতিকৃতি গড়তে ! তিনি নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন রাজকন্যার দিকে । রাজকন্যা বোধহয় লজ্জিতা হলেন । চোখ নামিয়ে নিলেন ভাস্করের চোখ থেকে । তাহলে আমার প্রতিকৃতি গড়বেন না, ভাস্কর ? রাজকন্যা প্রশ্ন করলেন । সম্বিত ফিরে পেয়ে ভাস্কর চোখ নামিয়ে নিলেন । জবাব দিলেন, পারব না কেন, পারব । তবে প্রতিদিন যে আপনাকে এখানে আসতে হবে । আমার কাজের সময় সামনে এসে দাঁড়াতে হবে আপনাকে ।  আপনাকে দেখে দেখে আমি পাথরে খোদাইর কাজ করব । অনেকদিনের পরিশ্রম । সে সময় কি আপনার হবে ? রাজকন্যা বললেন, কি হয়েছে তাতে ।  আমি তো প্রতিদিনই বৈকালিক ভ্রমণে বের হই । সেই সময়টা না হয় আপনার এখানেই কাটাব । রাজি হয়ে গেলেন শিল্পী ।

তারপর শুরু হল প্রতিদিন বিকেলে রাজকন্যার শিল্পীর কাছে আসা । শিল্পীও রাজকন্যার চরণদ্বয় থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বাঙ্গের অনুকরণে পাথরের বুকে ছাপ ফেলতে শুরু করেন । রাজকন্যার নিরাভরণ অঙ্গসৌষ্ঠব ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে আর শিল্পী করে চলেছেন খোদাইকর্ম । ইদানিং শিল্পী এই প্রতিকৃতির দিকেই যেন বেশি নজর দিচ্ছেন । দিনের সারাসময় আর কোনো কাজ করছেন না । যতটুকু কাজ এগোয় সেই নিরাভরণ নগ্ন প্রতিকৃতির দিকে অপলক তাকিয়ে কি যেন ভাবেন শিল্পী ! চঞ্চল হয়ে ওঠে তাঁর মনটা, কখন দিন গড়িয়ে বিকেল হবে । রাজকন্যার মনেও চলে তোলপাড়। শিল্পীর সামনে দাঁড়ানো যেন তাঁর একটা নেশায় পরিণত হয়েছে । বিভিন্ন বিভঙ্গে দাঁড়ানোর জন্য শিল্পী যখন তাঁর অঙ্গ স্পর্শ করেন তখন এক অনাস্বাদিত শিহরণ অনুভব করেন রাজকন্যা ।

সেদিনও এসে দাঁড়িয়েছেন রাজকন্যা শিল্পীর সামনে । অত্যন্ত সূক্ষ্ম তন্তুজালে প্রস্তুত তার পোশাকে দেহের সৌন্দর্য প্রকটিত । শিল্পী কাছে এসে দাঁড়ান । যেন বাঁধভাঙা জ্যোৎস্না নেমে এসেছে মাটিতে । শিল্পী ভাবছেন তিনি কি ফুটিয়ে তুলতে পারবেন এই সৌন্দর্য ? তবুও শিল্পী প্রতিদিনের মতো রাজকন্যাকে স্পর্শ করে শৈল্পিকভাবে স্থাপন করছেন তাঁর বাহুযুগল, গ্রীবাদেশ । রাজকন্যার শরীরে যেন কেমন কম্পন অনুভূত হচ্ছে । স্বেদবিন্দু ফুটে উঠেছে  কপালে । পয়োধর ছোটো পাখির শরীরের মতো তিরতির করছে । মুহূর্তের রাজকন্যা বলে উঠলেন, আহ্, শিল্পী !  আপনার কি অসুবিধে হচ্ছে আমার পোশাকে ? এই আমি সরিয়ে নিলুম পোষাক । রোজ রোজ একটু একটু করে উন্মোচন করার চাইতে আমার সম্পূর্ণ সৌন্দর্যকে আপনি যথেচ্ছ ব্যবহার করুন । সমুদ্রের ঢেউ তুলে সৌন্দর্য যেন আছে পড়ল শিল্পীর সামনে । শিল্পী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না । এক জীবন্ত শিল্পসত্তায় পরিণত হল দুটো শরীর ।

এভাবে শিল্পকর্মের ফাঁকে ফাঁকে আদিম শিল্পকলায় মত্ত হল দুটি মন । তারা পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলল । এদিকে অন্যান্য মূর্তির পাশাপাশি রাজকন্যার নগ্ন প্রতিকৃতিও তৈরি করে ফেললেন শিল্পী । শুধুমাত্র মুখের অংশটি প্রস্তুত করা বাকি । এরই মধ্যে একদিন রাজার মনে পড়ল মূর্তি তৈরির ফরমায়েশের কথা । ভাস্করের কথা । তিনি ছুটে গেলেন পারিষদসহ ভাস্করের কাছে । সারা মাঠময় ভাস্কর্যের নিদর্শনরাশি দেখে তিনি অভিভূত হয়ে গেলেন । কিন্তু এতসব দেবদেবীর প্রতিমার মাঝখানে শিল্পীর গৃহে এক নগ্ন নারী মূর্তি দেখে রাজা বিস্মিত হয়ে গেলেন । রাজা জানতে চাইলেন এর কারণ । শিল্পী বললেন, তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে অবসর সময়ে এই কাজ করেছেন । রাজা নিতে চাইলেন এই প্রতিকৃতিটি । বললেন প্রতিকৃতির মুখ সম্পূর্ণ করার পর যেন এটি তাঁর প্রাসাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শিল্পী ইতস্তত করছেন । রাজা ভাবলেন শিল্পী হয়তো এর জন্য আলাদা পারিশ্রমিক চাইছেন । রাজা তাও দিতে চাইলেন ।  শিল্পী জানালেন, না মহারাজ, তা নয় । এতে আপনার অমঙ্গল হবে । এই প্রতিকৃতি আপনি নেবেন না । রাজা বললেন সে দেখা যাবে । তিনি প্রস্থান করলেন ।

এদিকে রাজঅন্তঃপুরে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে । রাজকন্যা অন্তঃস্বত্ত্বা হয়েছেন । কুমারী অবস্থায় অন্তঃস্বত্ত্বা  ? সাংঘাতিক ব্যাপার ! রাজপরিবারের মান-সম্মান যায় । কথাটা মহারানীর কান হয়ে রাজার কানেও এসে পৌঁছেছে । রাজা তাঁর অনুচরদের নির্দেশ দিলেন এর উৎস সন্ধানের । কারণ রাজকন্যাকে জিজ্ঞেস করে কোন সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না ।

এরই মধ্যে শিল্পীর বিদায়ের সময় এল। দীর্ঘদিন তিনি প্রবাসে কাটিয়েছেন । ঘরে ফেরার জন্য মন কেঁদে উঠছে অথচ রাজকন্যার কথা ভাবলে তিনি নিজেকে সামলে রাখতে পারেন না । রাজকন্যাও এখন আর নিয়মিত আসতে পারেন না । লোকচক্ষুর আড়ালে মাঝেমধ্যে তাদের দেখাসাক্ষাৎ হয় । তাঁদের গোপন প্রণয়ের কথা এখনও কেউ না জানলেও রাজকন্যা যে মা হতে চলেছেন তা নিয়ে রাজ্য জুড়ে তোলপাড় চলছে । রাজকন্যা সে সংবাদ দিতেও ভুলেন না শিল্পীকে ।

রাজা একদিন শিল্পীর কাছে লোকজন পাঠালেন এই নগ্নিকা মূর্তিটি রাজসভায় উপস্থিত করার জন্য । রাজাদেশ । কি আর করা যাবে । বাধ্য হয়ে শিল্পী মূর্তিটি পাঠালেন রাজসভায় । তবে তিনি মূর্তির মুখটি ভালো করে ঢেকে দিলেন । রাজসভায় আনার পর মূর্তিটির গঠনশৈলী নিয়ে রাজসভার বিদগ্ধ মহলে উচ্চ প্রশংসার ঝড় বয়ে গেল । সকলের অনুরোধে রাজা স্বয়ং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিকৃতির মুখের আবরণ উন্মোচন করলেন । মুহূর্তের সমস্ত রাজ্যসভা চিৎকার করে উঠল, এ যে আমাদের রাজকন্যা ! অসম্ভব ক্রোধে লজ্জায় ঘৃণায় রাজা মুখ ঢাকলেন । চিৎকার করে উঠলেন, সরিয়ে নাও এটাকে ।

রাজা ও রাজসভার বুঝতে বাকি রইল না রাজকন্যার অন্তঃস্বত্ত্বা হওয়ার অন্তরালের কাহিনি । রাজা বিচারসভায় বসলেন রাজ্যের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে । তাঁদের বিচারে ভিনদেশী শিল্পী দোষী সাব্যস্ত হলেন । তাঁদের সমাজের নিয়ম অন্য জনগোষ্ঠীর মানুষের দ্বারা তাদের নারীর ইজ্জত লুণ্ঠিত হলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড । শাস্তির ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দিল । এই তরুণ এখন যে তাঁদের অতিথি । তাঁরা বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত । অতিথিকে আরাধ্য দেবতা জ্ঞান করেন । তা বলে অতিথির অন্যায় তো সহ্য করা যায় না । কেউ কেউ আপত্তি তুললেন । ফলে সিদ্ধান্ত হল, মৃত্যুদণ্ড নয় । শিল্পীর দুটো হাত কেটে দেওয়া হবে । যাতে তিনি জীবনে আর ওই শিল্পকর্ম করতে না পারেন । রাজকন্যা আড়াল থেকে সব শুনলেন । তিনি ছুটে গেলেন শিল্পীর কাছে বললেন, তুমি পালাও, শিল্পী ! শিল্পী অনিচ্ছা প্রকাশ করলেন । বললেন, না আমি যাব না তোমাকে ফেলে । যা হবার হোক । তাছাড়া আমাদের অনাগত সন্তানের কথা মনে করেও আমি কোথাও যাব না । রাজকন্যা জানালেন, আমার জন্য তুমি এমন করে বিপদ ডেকে এনো না । তোমার শিল্পীজীবন শেষ করে দিও না । তুমি চলে যাও তুমি শিল্পচর্চা করো । জগত তোমার শিল্পের প্রশংসা করুক । তোমার শিল্পের মধ্যেই আমরা বেঁচে থাকব ।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখের জলে বিদায় নিলেন শিল্পী । অজানা অচেনা পথে বেরুলেন । লএদিকে রাজার লোক নির্দিষ্ট জায়গায় শিল্পীকে না পেয়ে খুঁজতে বেরুলো চারিদিকে । সমস্ত সীমান্তপথ বন্ধ করে দেয়া হল । পথ ভুলে যাওয়ায় শিল্পীকে ধরে ফেলল রাজার লোকেরা । তারা হাজির করল তাকে বিচারসভায় । সংবাদ পেয়ে রাজকন্যা ছুটে এলেন রাজসভায় । কাতর প্রার্থনা জানালেন শিল্পীকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য । কিন্তু কেউ তাঁর কথা শুনলেন না । দুটো হাত কেটে শিল্পীকে বের করে দেওয়া হল রাজ্য থেকে ।

এদিকে শিল্পী কোলারাজ্যে ফিরে গেলে শিল্পীর এই দশা দেখে কোলারাজ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন । তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন প্লেঙরাজার বিরুদ্ধে । ভয় পেয়ে প্লেঙরাজা তাঁর সমস্ত প্রজাদের নিয়ে প্লেঙনদীর উজানে গভীর অরণ্যে আশ্রয় নিলেন । কোলারাজার সৈন্যবাহিনী এই রাজ্যে এসে কাউকে দেখতে না পেয়ে সবকিছু ভাঙচুর লণ্ডভণ্ড করতে লাগল । ভেঙে ফেলা হল শিল্পীর গড়া মূর্তিসমূহও । সারা রাজ্যজুড়ে তারা তাণ্ডব চালিয়ে যেতে লাগল ।

এদিকে প্লেঙ রাজাও বসেছিলেন না । তাঁরা পালিয়ে গিয়ে নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে রেখেছিলেন । কোলারাজার লোকজন যখন তাঁদের রাজ্যজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছেন তখন প্লেঙ রাজা হঠাৎ করে নদীর বাঁধ কেটে দিলেন । জলের তোড়ে সমস্ত জনপদ ভেসে গেল । ভেসে গেল কোলারাজের সৈন্যসামন্ত । পাহাড় থেকে পলি এসে ঢেকে ফেলল সমস্ত জনপদ । আর কথিত আছে প্লেঙ রাজার সঙ্গে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া তাঁর কন্যাটিও একদিন সুযোগ বুঝে সেই বাঁধভাঙা জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবিসর্জন করেন ।

এই অশ্রুসজল প্রণয়কাহিনি এখনো কোন কোন বয়োবৃদ্ধ মগরমণী এক বিশেষধরনের করুণ সুর করে গেয়ে থাকেন । আজকের তরুণতরুণীরা অনেকেই এই কাহিনি জানেন না । ধীরে ধীরে হয়তো লুপ্ত হয়ে যাবে তাদের লোকসংস্কৃতির ভান্ডার । কারণ মগ জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে সংরক্ষণের কোনোরকমের প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত নেই ।

যদিও এটি একটি লোককাহিনি তবুও এ কাহিনি থেকে একটি ঐতিহাসিক সূত্র খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে । প্রথমত, এ অঞ্চলের যে 'পিলাক' নাম তার একটি সূত্র এখান থেকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে । এখানে যে গোত্রের রাজারা বসবাস করতেন তারা 'প্লেঙসা' নামে পরিচিত । এই প্লেঙসা শব্দটির বিবর্তিত রূপ প্লেঙ>প্লেক>পেলেক>পেলাক>পিলাক নামে পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে । নদীটির নামও হয়তো 'প্লেঙ' ছিল যা বর্তমানে পিলাকছড়া নামে পরিচিত । এই নদী হয়তো একসময় প্রবল স্রোতস্বিনী ছিল । কালক্রমে ভূবিবর্তনের ফলে হয়তো তা প্রসারতা ও গতি হারিয়েছে ।

'পিলাক' নামটি যে মগ শব্দ সে বিষয়ে আর সন্দেহের কোন অবকাশ থাকে না । তাছাড়া এই অঞ্চলের আরো কিছু স্থাননামেও এই লক্ষণ ধরা পড়ে । যেমন বর্তমান জোলাইবাড়িকে মগ জনগোষ্ঠীর লোকেরা বলে থাকেন জোলা-জি । 'জি' শব্দের দ্বারা বাজার বোঝায় । সাক-রুঁ অর্থাৎ বর্তমান সাব্রুম । চাকমা জাতির লোকদের তাঁরা সাক বলে থাকেন । অর্থাৎ এখানে চাকমাদের বাসভূমি । সেইরূপ মগরুঁ । অন্যদের ভাষায় মগ জনবসতি । বর্তমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও একসময় তাদের অবস্থান ছিল কিছু কিছু নামে তার হদিস পাওয়া যায় । যেমন ফুলগাজি (ফুলগা-জি ) । মগ সম্প্রদায়ের লোকেরা বাঙালিদের 'কোলা' বলে অভিহিত করেন । বাংলাদেশের নোয়াখালি অঞ্চলে একটি স্থান আছে যার নাম কোলাপাড়া । দক্ষিণ ত্রিপুরায়ও পিলাকসংলগ্ন একটি স্থান কলসি । আসলে কোলা-সি অর্থাৎ বঙ্গসন্তান বা বঙ্গজনপদ । এই জনগোষ্ঠীর লোকেরা বাঙ্গালিদের যে 'কোলা' নামে অভিহিত করে থাকেন সেই সূত্র ধরে একটি ঐতিহাসিক উপাদানের উপর ক্ষীণ আলোকপাত করে প্রবন্ধের শেষ করব ।

প্রাচীনবঙ্গের ইতিহাসে বঙ্গ ও সমতটের পাশাপাশি হরিকেল নামে বাংলাদেশের পূর্বপ্রান্তিক অঞ্চলে একটি প্রাচীন রাজ্যের নাম পাই । এই রাজ্যের পরিধি সম্বন্ধে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে বহুমত আছে । তবে এই রাজ্য প্রথমে ক্ষুদ্র থাকলেও পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম থেকে শ্রীহট্ট পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ঘটেছিল । কেউ কেউ বঙ্গ ও হরিকেলকে এক করেও দেখেছেন । চৈনিক পরিব্রাজক ই-চিং এর বর্ণনায় প্রথম হরিকেলের উপস্থিতি পাওয়া যায় । হরিকেল নামটি হরিকেলি, হরিকেলা বা হরিকোলা ইত্যাদি নামে ইতিহাসে উল্লেখিত হয়ে আসছে । শেষোক্ত 'হরিকোলা' শব্দটি থেকে 'কোলা' শব্দটির উদ্ভব হওয়া অসম্ভব নয় । প্রাগোক্ত লোককাহিনিটিতে যে কোলা বা বঙ্গ জনপদের রাজার কথা বলা হয়েছে তা হরিকেল রাজ্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় । হরিকেল রাজ্যের অধিবাসীরাই তাদের ভাষায় 'কোলা' । কাহিনিটি থেকে জানা যায়, তাদের রাজ্যও একসময় কোলারাজের অধীন অর্থাৎ হরিকেল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় । এই পিলাক অঞ্চলে হরিকেল মুদ্রা পাওয়া গেছে । এই মুদ্রাতে 'পিরক', 'বেরক' ইত্যাদি শব্দ লেখা আছে । মনে করা হচ্ছে এই নামগুলি পিলাক শব্দেরই রূপান্তর । 

যাই হোক, পুরাকাহিনি তো ইতিহাস নয় । তবে তার মধ্যে নিহিত ইতিহাসের উপাদানের ক্ষীণ সূত্র লুকিয়ে থাকতেও পারে । কালস্রোতে তার মধ্যে অনেক বিবর্তন পরিবর্তন ঘটে যাওয়া অসম্ভব নয়। যথাযথ গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান এবং বিশ্লেষণের দ্বারা পিলাকের বহু অনালোকিত তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব । আর এজন্যই এই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড় সাংস্কৃতিক যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন ।

( পিলাক উৎসব-২০০২, ২৯–৩১ শে জানুয়ারি,স্মরণিকায় প্রকাশিত ও পরবর্তীসময়ে কিঞ্চিৎ পরিবর্ধিত । )

Tuesday, March 17, 2026

MY PENSION FROM APRIL : 26

FROM FEB21 : BP
=40500 DA=00 ঞঞCOMM=6300 FMA= 500 NET = 34700



FROM MAR21 : BP= 40500 DA( 3% )=1225 REC=00 COMM=6300 DIS=00 IR=00 OLD=00 FMA=500 TDS=00 NET।=35925 PNBHOGBD

FROM JULY22 : BP=40500 :।ন DA (8% )=3240 REC=00😂
COMM=6300 DID=00 IR=00 OLD=00 FMA=500 TDS=00 ।
40500 -6300 = 34200+ 500 + 38240 ( 8% DA ) =37940

FROM DEC22 : BP=4এ0500 : DA ( 12% )= 8100 REC = 
00 COMM = 6300😭 DID = 00 IR = 00 OLD = m00 FM 500 TDS = 00 NETন = 42800
40500 - 6300 = 34200 + 500 + 8100 ( 20% DA ) = 42800

FROM JAN24 : BP=40500 : DA ( 25% )= 10125 REC =<00 COMM = 6300 DID=00 IR = 00 OLD = 00 FMA= 500 TDS = 00 NET = 44825

FROM NOV24 : B = 40500 : DA ( 30% ) = 12150 : REV = 00 COMM : 6300 DID = 00 IR = 00 OLD = 00 FMA = 500 TDS = 00 NET = 46850

FROM APRL25 : BP = 40500 : DA ( 33% ) = 13365 : REV = 00 COMM : 6300 : DID = 00 : IR = 00 : OLD = 00 : FMA = 500 : TDS = 00 : NET = 48065/-

FROM OCT25 : BP = 40500 : DA (36%) = 14580
REV = 00 COMN : 6300 : DID = 00 : IR = 00 : OLD = 00 : FMA = 500 : TDS = 00 : NET = 49280

FROM APRL26 : BP = 40500 : DA (41%) = 16605 (17% behind from Central DA)
 REV = 00 COMN : 6300 : DID = 00 : IR : 00 : OLD : 00
: FMA : 500 : TDS : 00 : NET : 51305

Monday, March 16, 2026

বাংলা ভাষা, সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে অস্মিতার বিবর্তন

বাংলা ভাষা, সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে  অস্মিতার বিবর্তন 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

Abstract

The Evolution of Culture and Identity in Bengali Language and Literature

Asokananda Raybardhan

India is a unique example of a multilingual and multicultural social system. In such a society, language is not merely a medium of communication; rather, it serves as an important carrier of the cultural unity, heritage, and self-identity of a community. The Indian languages embody centuries of social experience, religious beliefs, folk knowledge, and historical evidence. Among them, the Bengali language and literature constitute one of the principal foundations of Bengali ethnic identity. Language and literature are not only means of expression; they also contain within them the history, culture, beliefs, social experiences, and consciousness of identity of a community.
Across different periods of Bengali literature, reflections of the Bengali people's way of life, religious beliefs, social relationships, and cultural transformations can be observed. This research paper analyzes, from the Charyapada to modern Bengali literature, how the development and expression of Bengali culture and identity have been manifested in literary traditions. Through discussions of medieval Mangal-kavya, Vaishnava Padavali, Shakta Padavali, folk literature, the nineteenth-century Bengal Renaissance, the writings of Rabindranath Tagore and Kazi Nazrul Islam, and various streams of modern Bengali literature, the study demonstrates that Bengali literature has played a crucial role in shaping the national and cultural identity of the Bengali people.

Keywords:
Bengali language, literature, culture, identity, folk literature, Renaissance, language movement, Bengali ethnic identity.



আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে 
আমি তো এসেছি সওদাগরেরর ডিঙার বহর থেকে 
আমি তো এসেছি কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম থেকে 
আমি তো এসেছি পালযুগের নামে চিত্রকলার থেকে 

এসেছি বাঙালি পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহার থেকে 
এসেছি বাঙালি জোর বাংলার মন্দির বেদি থেকে 
এসেছি বাঙালি বরেন্দ্রভূমে সোনা মসজিদ থেকে 
এসেছি বাঙালি আউল-বাউল মাটির দেউল থেকে 
(আমার পরিচয়–সৈয়দ শামসুল হক)

ভারতবর্ষ প্রাচীনকাল থেকেই ভাষা ও সংস্কৃতির মিলন ভূমি । এই উপমহাদেশে সহস্রাধিক বছর ধরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সহ অবস্থান ঘটেছে । ফলে এখানে ভাষা ও সংস্কৃতির এক বিস্ময়কর বৈচিত্র্য ঘটেছে । ভারতের সংবিধানে বর্তমানে ২২ টি ভাষা স্বীকৃত হলেও বাস্তবে এখানে শতাধিক ভাষা ও হাজারেরও বেশি উপভাষা প্রচলিত রয়েছে । এই ভাষাগত বৈচিত্রের মধ্যেই ভারতীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন রূপ বিকশিত হয়েছে । ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হলেও এর ভূমিকা আরও গভীর । ভাষার মধ্যেই একটি সমাজের ইতিহাস, বিশ্বাস, আচার, লোকজ জ্ঞান এবং জীবন দর্শন সংরক্ষিত থাকে । ফলে ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও অস্মিতার বাহক ।

সংস্কৃতি বলতে সাধারণত একটি সমাজের জীবনধারা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস, শিল্পকলা, সাহিত্য, সংগীত ও লোকাচারের সমষ্টিকে বোঝায় । অন্যদিকে অস্মিতা বলতে বোঝায় সেই আত্মপরিচয় বা স্বাতন্ত্র্যবোধ যার মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠী নিজেদের পৃথক সত্তা সম্পর্কে সচেতন হয় । ভাষা এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে । ভাষার মাধ্যমে মানুষ তার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং সংস্কৃতিক চিহ্ন রক্ষা করে । ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন 'language is the chief vehicle of culture.' এছাড়া নৃতাত্ত্বিক ক্লিফোর্ড গিয়ার্টজ সংস্কৃতি সম্পর্কে লিখেছিলেন– 'Culture is the web of meaning through which human beings interpret they are experiences.' অর্থাৎ ভাষা ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ।

বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ভাষা । প্রায় এক সহস্রাব্দব্যাপী সাহিত্যিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ক্রমাগত বিকশিত হয়েছে । এই দীর্ঘ যাত্রায় বাঙালি সমাজের জীবনধারা, ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিফলন দেখা যায় । সাহিত্য ইতিহাসবিদ সুকুমার সেন বলেছেন যে, বাংলাসাহিত্য মূলত বাঙালি সমাজের জীবন ও সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক দলিল ।

বাংলা ভাষা সংস্কৃতি ও অস্মিতা : তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট 

বাংলা ভাষা সংস্কৃতি ও অস্মিতা হাজার বছরের বিবর্তিত ও সংকর ঐতিহ্যের ফসল । প্রাচীন মাগধী প্রাকৃত থেকে উদ্ভুত হয়ে এই ভাষা চর্যাপদ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ধ্রুপদী ও লোকজ উপাদান ধারণ করেছে, যেখানে সাহিত্য, বৈষ্ণব ও শাক্তপদাবলি, বাউল গান এবং ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে । বাঙালি জাতি আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয় সহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে গঠিত । এই মিশ্রণেই বাঙালিকে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা দিয়েছে, যা তার সাহিত্যেও প্রতিফলিত । বাঙালির অস্মিতা কেবল ভাষা নয় বরং পোশাক, আহার, উৎসব এবং জীবনযাত্রার এক অনন্য সংমিশ্রণ যা সময়ের সাথে সাথে নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে চলেছে ।

চর্যাপদ ও বাঙালির আত্মপরিচয় 

চর্যাপদ (আনুমানিক নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন যা বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক আত্ম পরিচয়ের মূল দলিল । ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এটি নেপালের রাজদরবার থেকে আবিষ্কার করেন । চর্যাপদের ভাষা (সন্ধ্যাভাষা) ও পদগুলি তৎকালীন বাংলার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সমাজ, ধর্ম, প্রকৃতি, উৎসব ও সঙ্গীতের চিত্র ফুটে উঠে যা বাঙালির নিজস্ব পরিচয়কে নিশ্চিত করে । চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা যা বর্তমান বাংলা ভাষার আদিরূপ । এর মাধ্যমে বাঙালির স্বতন্ত্র ভাষা ও ভাষাগত আত্মপরিচয় সুস্পষ্টই হয় । চর্যাপদে ডোম, শবর, তাঁতি, নৌকাচালক, ব্যাধ ইত্যাদি সাধারণ মানুষের কথা পেশা, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাকের উল্লেখ রয়েছে যা তৎকালীন বাংলার সমাজ চিত্র তুলে ধরে । চর্যায় এক জায়গায় উল্লেখ রয়েছে–'আজি ভুসুকু বঙালি
ভৈলি' । এটাও বাঙালির অস্মিতা । চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের সাধন সঙ্গীত । এই সাধনতত্ত্বের মাধ্যমে বাঙালির আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক চেতনার প্রাচীন রূপ প্রকাশ পায়। পদগুলোতে বাংলার প্রকৃতি, নদী, নৌকা, মাছ, গাছপালা, নিঝুম রাত, গ্রামীণ জীবন চিত্রিত হয়েছে, যা বাঙালির ভূমিজ পরিচয় বহন করে । লুইপাকে চর্যাপদের আদি কবি ও প্রথম বাঙালি কবি বলে গণ্য করা হয় । এটি বাঙালি হিসেবে আত্মআবিষ্কারের পথকে প্রশস্ত করে । চর্যাপদ শুধু প্রাচীন সাহিত্যই নয়, বাঙালির আত্মপরিচয় শিল্প ও সাহিত্য ও সংস্কৃতির শিকড়ের আমূল আকর ।

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ও সমাজ বাস্তবতা 

১২০১–১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্যযুগীয় বাংলাসাহিত্য ছিল মূলত ধর্মকেন্দ্রিক, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ও আখ্যানকাব্য নির্ভর । তুর্কি আক্রমণের পরবর্তী এই যুগে হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির মিশ্রণ, বৈষ্ণব পদাবলি, শাক্ত পদাবলি, মঙ্গলকাব্য, এবং ফারসি থেকে অনুদিত রোমান্টিক কাব্যগুলো সমসাময়িক গ্রামীণ সমাজ, কুসংস্কার, প্রেম ও ভক্তি আন্দোলনের সমাজ বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলে । মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ও সমাজ বাস্তবতার প্রধান দিকগুলো এখানে আলোচনা করা হল–
১. সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট–১২০৪ সালে তুর্কি আক্রমণের পর বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে । সমাজ ধীরে ধীরে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে একটি নতুন সমন্বিত সংস্কৃতি গড়ে তোলে । ১২০১ থেকে ১৩৫০ পর্যন্ত সময়কে সাধারণত সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলা হয় কারণ এই সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সাহিত্যচর্চা বিরল ছিল ।
২. সাহিত্যের প্রধান ধারা ও বাস্তবতা– বৈষ্ণব পদাবলি (চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি) রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনি বা বৈষ্ণব পদাবলিতে মানুষের মানবিক প্রেম, বিরহ ও ভক্তির আধ্যাত্মিক রূপ ফুটে উঠেছে । শাক্তপদাবলীতে বাংলার সাধারণ মানুষের মাতৃ আরাধনার রূপ প্রকাশ পায় । এই দুই ধারা বাংলার সাধারণ মানুষের আবেগ অনুভূতিকে কেন্দ্র করে রচিত । মঙ্গলকাব্য (মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল) গুলো (যেমন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল) সেসময়ের গ্রামীণ জীবনের ভয়, কুসংস্কার, দারিদ্র্য, এবং বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবীর পূজাপার্বণ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তুলে ধরে । রোমান্টিক প্রণয় উপাখ্যান (শাহ মোহাম্মদ সগীর) মধ্যযুগীয় কবিরা ফারসি ও আরবি থেকে কাহিনি নিয়ে 'ইউসুফ জোলেখা'র মতো রোমান্টিক কাব্য রচনা করেন, যেখানে মানবিক প্রেম উপজীব্য ছিল । অনুবাদ সাহিত্য (কৃত্তিবাস ওঝা) রামায়ণ ও মহাভারতের অনুবাদ সামাজিক নৈতিকতা ও ভক্তিবাদের প্রচার হিসেবে কাজ করেছিল ।
৩. সমাজ বাস্তবতা–কাব্যগুলো মূলত দেবদেবী বা অলৌকিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে রচিত হলেও সেগুলোর অন্তরালে মানুষের বাস্তব জীবন দুঃখ-কষ্ট ও আশা-আকাঙ্ক্ষার চিত্র পাওয়া যায় । মঙ্গলকাব্যে বেহুলার মতো দৃঢ় নারীচরিত্র থাকলেও সামগ্রিকভাবে সমাজ ছিল পুরুষতান্ত্রিক এবং নারীদের অবস্থান ছিল অনেকটা নিয়ন্ত্রিত । রোমান্টিক কাব্যগুলোতে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মানুষের মানবিক প্রেম ও আবেগ প্রাধান্যষ পেয়েছে ।
৪. পৃষ্ঠপোষকতা–মধ্যযুগের সাহিত্যে সুলতান ও স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা সাহিত্যিকদের কাব্য রচনা উৎসাহিত করেছিল । মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্য ছিল গ্রামীণ সমাজ, লৌকিক বিশ্বাস, এবং মানবিক অনুভূতির এক অপূর্ব মিশ্রণ যা আজকের বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় এর ভিত্তি স্থাপন করেছিল ।

উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ ও সাংস্কৃতিক চেতনায় বাঙালির আত্মপরিচয়

উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষা যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদের প্রভাবে বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতিতে এক আমল বৌদ্ধিক পরিবর্তন যা বাঙালির আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে সংগায়িত করে রাজা রামমোহন রায় বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের নেতৃত্বে কুসংস্কার দূরীকরণ নারী শিক্ষা ও বাংলা গদ্যের বিকাশের মাধ্যমে একটি আত্মসচেতন আধুনিক ও উদারনৈতিক বাঙালি জাতিসত্তার ভিত্তি স্থাপিত হয় যা একই সাথে ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য জ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটায় ।

নবজাগরণে বাঙালির আত্মপরিচয় সৃষ্টির মূল দিকসমূহ–
যৌক্তিক ও সমাজ সংস্কারক মনোভাব রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রোধ এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রবর্তন সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করে একটি মানবিক ও আধুনিকষ বাঙালি সমাজ গঠনের পথ প্রশস্ত করেন ।
শিক্ষা ও বাংলা ভাষার পুনর্জাগরণ হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা (১৮১৭) এবং বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মধুসূদন দত্ত বাঙালির মধ্যে জ্ঞান তৃষ্ণা ও নিজস্ব ভাষা প্রতি অনুরাগ তৈরি করে । মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাত ধরে ইউরোপীয় ধারা প্রবর্তন এবং বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনীতে আধুনিক 'আমি'র বোধ ও বাঙালি পরিচয় এর অনুসন্ধান শুরু হয় । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রাচীন ভারতীয় বিদ্যার সাথে পাশ্চাত্য দর্শনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাঙালিকে নিজস্ব শিকড়ের সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেন ।
রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনা ১৯ শতকের শেষার্ধে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ও বিপিনচন্দ্র পালের মতো নেতাদের হাত ধরে রাজনৈতিক সচেতনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবি জোরালো হয় যা বাঙালির আত্মপরিচয়কে আরো মজবুত করে ।
নারী শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন নারী শিক্ষাকে অগ্রগণ্য করে নারী পুরুষের সমতা ও আধুনিক পারিবারিক কাঠামো তৈরীর উদ্যোগ নেওয়া হয় । এই সময়কালে কেবল সমাজ সংস্কারী নয় শিল্প ও সাহিত্য যেমন মাইকেলের বঙ্গভাষার স্তুতি ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষের মাধ্যমে বাঙালিরা নিজেদের কেবল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেনি বরং একটি আধুনিক শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী বাঙালি জাতির ভিত্তি স্থাপন করেছিল এটি ছিল মধ্যযুগীয় অন্ধকারের অবসানে এবং আত্ম দর্শন ও আত্ম প্রতিষ্ঠার নতুন যুগ ।

রবীন্দ্রনাথ নজরুল ও বাঙালি সংস্কৃতির অস্মিতা 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালির সাংস্কৃতিক অস্মিতা বা আত্মপরিচয়ের প্রধান দুই স্তম্ভ রবীন্দ্রনাথ যেখানে বিশ্বজনীনতা ও মানবতাবাদ ও শিল্পকলা দিয়ে বাঙালিকে আধুনিক মননে সাজিয়েছেন নজরুল সেখানে সাম্যবাদ বিদ্রোহ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা দিয়ে বাঙালিকে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলেছেন তাদের মিলিত সাহিত্য ও সুর বাঙালির জাতিসত্তা গড়েছে ।

 রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল : অস্মিতা গঠনের ধারা 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংস্কৃতির ধ্রুপদী রূপ রবীন্দ্রসাহিত্য গান রবীন্দ্র সংগীত ও দর্শন বাঙালির ভদ্রলোক সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার মূল ভিত্তি যা আমাদের বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে ।
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহ ও সাম্য নজরুলের কবিতা ও গান বিশেষ করে বিদ্রোহী বাঙালিকে শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত করেছে ।
রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ এবং নজরুলের অসাম্প্রদায়িক বিদ্রোহ উভয়েই বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ যা আমাদের স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় গঠন করেছে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির হৃদয়ের কোমলতা ও শিল্পবোধ অন্যদিকে নজরুল বাঙালির সূর্য ও প্রতিবাদের প্রতীক তাদের সম্মিলিত রচনাশৈলী বাঙালির আত্মপরিচয় কে সমৃদ্ধ ও সম্পূর্ণ করেছে ।

বাংলার সংস্কৃতির প্রতীক : নদী ও প্রকৃতি– নদী ও প্রকৃতি বাংলার জনজীবন, অর্থনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ । নদীমাতৃক জীবনযাত্রা, উৎসব, লোকসংগীত ও সাহিত্য যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির ছন্দে আবর্তিত । রবীন্দ্রনাথের লেখনী থেকে লালন, হাসন রাজা, রাধারমণের গানে নদীতীরবর্তী মানুষের প্রেম, বিরহ,  জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক সাধনার গভীর প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে । নদী কেবল জলধারা নয়, এটি জীবনের গতিময়তা জন্ম ও বিলয়ের প্রতীক । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গীতাঞ্জলি' ও বিভিন্ন উপন্যাসে নদীপ্রেমও আত্মসমর্পণের রূপক । 'মাছে ভাতে বাঙালি' ধারণার মূলে রয়েছে নদীকেন্দ্রিক কৃষি ও মাছের উৎপাদন নদীগুলো জনপদ জীবন ও সংস্কৃতির ধারক ।
সাংস্কৃতিক উৎসব–পহেলা বৈশাখ, লোক সাহিত্যের ছড়া, ধাঁধা, রূপকথা ও উপকথার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখ ও সামাজিক অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয় । লোকসংগীত ও বাউলদর্শন, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি, কবিগান বাঙালি সংস্কৃতি অবিচ্ছেদ্য অংশ যা মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও আধ্যাত্মিকতা তুলে ধরে । যাত্রাপালা, এবং দুর্গোৎসব নবান্ন পৌষ পার্বণ, পিঠেপুলি, আলপনা মৃৎশিল্প এবং বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবীর পূজা (যেমন, মনসা ও চন্ডী) বাংলার নিজস্ব জাতিসত্তার পরিচয় বহন করে ।  উৎসবগুলি বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ । মাছ-ভাত, পিঠে-পুলি এবং ধুতি-শাড়ি পাঞ্জাবির মতো বিষয়গুলো বাঙালিরশ হাজার বছরের অস্মিতা । বঙ্গ রাঢ ় ১৫বর্ধন থেকে শুরু করে সুলতানি আমলের সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ বাংলার নিজস্ব অস্মিতা বা সত্তা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে । বাংলাসাহিত্য ও সংস্কৃতির এই বিবর্তনই বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে একটি স্বতন্ত্র ও প্রগতিশীল জাতি হিসেবে তুলে ধরেছে ।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বাঙালির অস্মিতা

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালির অস্মিতা

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিসরে বাঙালির অস্মিতা বা আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন নতুনভাবে উত্থাপিত হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন, নগরায়ন, বিশ্বায়ন—এসব ঘটনাপ্রবাহ বাঙালির জীবন ও মানসিকতায় গভীর প্রভাব ফেলে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। ফলে বাংলা সাহিত্য শুধু নন্দনতাত্ত্বিক সৃষ্টির ক্ষেত্র নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয় নির্মাণ ও সংকটেরও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে ওঠে।
১. দেশভাগ ও বাঙালি অস্মিতার সংকট
১৯৪৭ সালের দেশভাগ বাংলা সমাজে এক গভীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক অভিঘাত সৃষ্টি করে। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভক্ত বাস্তবতা লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু জীবনের জন্ম দেয়। হারানো ভিটেমাটি, বিচ্ছিন্নতা, স্মৃতি ও বেদনার অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যকে নতুন বিষয়বস্তুর দিকে পরিচালিত করে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, দেবেশ রায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ প্রমুখ লেখকের রচনায় উদ্বাস্তু জীবন, সামাজিক পরিবর্তন ও পরিচয়ের সংকট গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এই সাহিত্যিক সৃষ্টিতে বাঙালির অস্মিতা একদিকে স্মৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গঠিত।
২. ভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনা
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ভাষা বাঙালি অস্মিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। পূর্ববাংলায় (পরবর্তীকালে বাংলাদেশে) ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষাকে জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে স্থাপন করে।
এই আন্দোলনের প্রভাব বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাসে ভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার বোধ নতুনভাবে প্রকাশিত হয়। বাংলা ভাষা তখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং জাতিসত্তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. নগরজীবন, আধুনিকতা ও মধ্যবিত্ত মানস
স্বাধীনতার পর কলকাতা ও অন্যান্য শহরে দ্রুত নগরায়নের ফলে মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট, একাকিত্ব, কর্মসংস্থানের সমস্যা এবং সামাজিক পরিবর্তন বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ প্রমুখ কবির কবিতায় আধুনিক নগরজীবনের নিঃসঙ্গতা, হতাশা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন গভীরভাবে প্রকাশ পায়। অন্যদিকে মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্য প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামকে সামনে নিয়ে আসে, যা বাঙালি অস্মিতাকে আরও বিস্তৃত ও মানবিক মাত্রা প্রদান করে।
৪. লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কার
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সংস্কৃতিতে লোকঐতিহ্য, গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক ইতিহাসের প্রতি নতুন আগ্রহ দেখা যায়। সাহিত্য, সংগীত ও গবেষণায় বাউল, ভাটিয়ালি, পালাগান, মঙ্গলকাব্যের ঐতিহ্য নতুনভাবে আলোচিত হয়।
এই পুনরাবিষ্কার বাঙালির সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে আধুনিকতার সংযোগ স্থাপন করে। ফলে বাঙালি অস্মিতা কেবল আধুনিক নগরসংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গ্রামীণ ও লোকঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত থাকে।
৫. সমকালীন সময় ও বহুমাত্রিক অস্মিতা
বর্তমান সময়ে বিশ্বায়ন, প্রযুক্তি, অভিবাসন ও গণমাধ্যমের প্রভাবে বাঙালি সমাজে নতুন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছে। বাংলা সাহিত্যে এখন নারী-চেতনা, দলিত সাহিত্য, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও পরিচয়-রাজনীতির প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফলে বাঙালির অস্মিতা এখন বহুস্বরিক ও পরিবর্তনশীল—যেখানে ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং সমকালীন অভিজ্ঞতা একত্রে মিলিত হয়ে নতুন আত্মপরিচয় নির্মাণ করছে ।

বাঙালির আত্মপরিচয়ের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণের উপায় 

বিশ্বায়নের যুগে প্রযুক্তির প্রসার ও সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের ফলে বাঙালি সংস্কৃতিকে অপসংস্কৃতির প্রভাব বেড়েছে । ফলে নিজস্ব ভাষা, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যকে হুমকির মুখে ফেলে আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করেছে । পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক পরিচ্ছদে পরিবর্তন এবং প্রজন্ম শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে ।

বিশ্বায়ন ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট : প্রধান দিকসমূহ 

বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বব্যাপী একটি সমজাতীয় সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছে যা স্থানীয় সংস্কৃতির অনন্যতা নষ্ট করছে । বাঙালি ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের জায়গা নিচ্ছে অপসংস্কৃতি । বিশ্বায়ন প্রতিযোগিতার যুগে বাংলাভাষার ব্যবহার কমে যাচ্ছে এবং অপপ্রয়োগ বাড়ছে । ভাষার অবমাননা বাঙালিরশ মূল পরিচয়কে সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে । বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতি মানুষের রুচি ও জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে । ফলে আত্মপরিচয়ের চেয়ে বিলাসিতা ও ভোগবাদ প্রধান হয়ে উঠেছে । ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্ন সংস্কৃতির অবাধ্য প্রবেশ পারিবারিক ও সামাজিক আচার-আচরণে পরিবর্তন এনেছে । বিশ্বায়নের প্রভাবে অনেকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ধারণ করছে । এরই নাম 'সংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা' ।

এই সংকট কাটিয়ে উডঠতে হলে নিজেদের শিকড় ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করার পাশাপাশি বিশ্বায়নের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করতে হবে । নিজস্ব ঐতিহ্যের চর্চা এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক গণজাগরণ সৃষ্টি করা প্রয়োজন । আধুনিকতা বিশ্বায়ন, ভোগবাদ ও মুক্তবাজারের জটিল আবর্তে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ঘুরপাক খেলেও তার নিজস্ব শক্তি দিয়েই বাঙালি জাতি তার আত্মপরিচয়কে তুলে ধরবে । কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী এজন্যই দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, 
'যে কেড়েছে বাস্তুভিটা সে কেড়েছে ভয় 
আকাশ জুড়ে লেখা আমার
আত্মপরিচয় ।

Tuesday, February 24, 2026

অরণ্য : সাহিত্য ও লোকজচেতনায়

অরণ্য : সাহিত্যে ও লোকজচেতনায় 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

অরণ্য মানব সভ্যতার প্রাচীনতম সহচর । সভ্যতার উষালগ্নে মানুষ অরণ্যের আশ্রয়ে জীবনধারণ করতে শিখেছে । তাই তার স্মৃতি, কল্পনা ও সংস্কৃতির গভীরে অরণ্য এক স্থায়ী ভূমি । বন কেবল গাছপালার সমষ্টি নয় । বন সভ্যতার জন্মভূমি । মানুষের প্রাচীনতম আশ্রয় এবং সংস্কৃতির আদি ঠিকানা । মানবসভ্যতার সূচনালগ্নে মানুষ বনের কোলে আশ্রয় নিয়েই খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং ঔষধের উপকরণ সংগ্রহ করেছে । তাই বন ও সংস্কৃতির সম্পর্ক গভীর ঐতিহাসিক ও অবিচ্ছেদ্য ।

প্রাচীনকালে বন ছিল ঋষি ও মুনিদের জ্ঞান অর্জনের স্থান (আশ্রম বা তপোবন) । ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনে বনের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট । উপনিষদের আরণ্যক অংশ রচিত হয়েছে অরণ্যে বসবাসকারী ঋষিদের দ্বারা । উপনিষদের আরণ্যক অংশ ইঙ্গিত করে বনের শান্ত পরিবেশ ছিল জ্ঞানচর্চার ও তপস্যার স্থান । প্রাচীন সাহিত্যে বন মানেই এক ধরনের অন্তর্জাগরণ ও আত্মশুদ্ধি । বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসেও বনের গুরুত্ব অপরিসীম । বুদ্ধ বোধিলাভ করেন বৃক্ষতলে । আদিবাসী ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাও বনকেন্দ্রিক । তাদের নৃত্য, সংগীত, উৎসব, চিকিৎসাপদ্ধতি, খাদ্যাভ্যাস সবই বনের উপাদানে গড়ে উঠেছে । বহু লোকধর্ম ও উপজাতীয় সংস্কৃতিতে নির্দিষ্ট গাছ বা অরণ্যভূমি পবিত্র বলে মান্য । ফলে বন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যেরও ধারক ।

ভারতীয় সাহিত্যের প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে বন এক গুরুত্বপূর্ণ পরিসর । রামায়ণে অরণ্যবাস কেবল ভৌগোলিক স্থানান্তর নয় । তা নায়ক-নায়িকার চরিত্র গঠনের ত্যাগ ও পরীক্ষার ক্ষেত্র । মহাভারতে অরণ্যপর্ব পান্ডবদের দুর্দশা ও আত্মশক্তি সঞ্চয়ের কাহিনি । মানব জীবনের পরীক্ষা ও রূপান্তরের পর্ব ।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলাসাহিত্যে এবং লোকজচেতনায় অরণ্য কেবল প্রকৃতির অংশ ছিল না । বরং তা ছিল অজানার ভয়, দৈবশক্তি ও জীবন জীবিকার আশ্রয়স্থল । চর্যাপদের পদকর্তারা অরণ্যকে সিদ্ধিলাভ ও যোগসাধনার নির্জনস্থান হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যেখানে প্রকৃতি ও মানবজীবন একীভূত ছিল । চর্যাপদে অরণ্য যেমন (পাবত, কানন) হল সাধনার নিভৃত স্থান, যেখানে আত্মজ্ঞান লাভ করা যায় । বনজগৎ এখানে পার্থিব জীবনের জঞ্জাল থেকে মুক্তির প্রতীক হিসেবে এসেছে । বাংলা মঙ্গলকাব্যে বন এক জীবন্ত বাস্তবতা । মনসামঙ্গলের নদী বনভূমির প্রেক্ষাপট চন্ডীমঙ্গলের দুটি কাহিনিতে ব্যাধ কালকেতুর বনবাস ও দেবী চণ্ডীর বনচর রূপ, বণিকের অরণ্য যাত্রা, ধর্ম মঙ্গলে অরণ্যভূমির বিপদ ও রহস্য, এসব কাহিনিতে বন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার অঙ্গ । সাধারণ মানুষ (ব্যাধ, জেলে, কাঠুরে) অরণ্যের উপর নির্ভরশীল ছিল, যা তাদের জীবন জীবিকার অবিচ্ছেদ অংশ । গ্রামীন সমাজে বন ছিল জীবিকার উৎস । কাঠ, ফল, ঔষধ, মধু ও পশুপাখির মাংস, বনকে কেন্দ্র করেই অর্থনৈতিক জীবন পরিচালিত হত । এখানে বন শুধু পটভূমি নয় । কখনো দেবতার আবির্ভাব ক্ষেত্র, কখনো মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সূচনাকারক । একারণেই মঙ্গলকাব্যগুলোতে অরণ্যকে কেন্দ্র করে দেবদেবীর মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে । তাই বনদেবী, শীতলা, মনসা প্রভৃতি দেবদেবীর সঙ্গে অরণ্যের সম্পর্ক গভীর । লোকসাহিত্যে অরণ্যের বনদেবী (বনবিবি বা বনকুমারী) ও বাঘ-দেবতা দক্ষিণ রায়ের মতো লৌকিক দেবদেবীর কাহিনীতে অরণ্য ও বনজীবীদের জীবন চিত্র ফুটে উঠেছে । বিশেষ করে ত্রিপুরায় বাঘাইর সিন্নি, বনকমারীর পূজা, বাবা লংতরাইয়ের পূজা বনাঞ্চলকেন্দ্রিক লোককথা, বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানে  অরণ্য ও বনজীবীদের সহাবস্থানের এবং বনজ সম্পদ সংগ্রহের আদিম চিত্র পাওয়া যায় । ঘন জঙ্গল হিংস্র পশু এবং অলৌকিক বাধার কারণে মধ্যযুগীয় মানুষের মনে অরণ্য ছিল একপ্রকার ভয়ের জায়গা যা লোকসংগীত অনুষ্ঠান পেয়েছে। বৈষ্ণব পদাবলীতে কুঞ্জবন, নিধুবন, বৃন্দাবন ইত্যাদি বনক্ষেত্র প্রেমলীলা, মিলন ও বিরহের অন্যতম প্রধান স্থান হিসেবে অরণ্যের কোমল ও রোমান্টিক রূপটি তুলে ধরেছে । এসবের মধ্য দিয়ে অরণ্যের প্রতি ভক্তি ও ভয়ের সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ ঘটে । ভক্তিসাহিত্যে অরণ্য ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের স্থান হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছে । বিভিন্ন অঞ্চলে অরণ্য বা পবিত্র বনভূমি সংরক্ষণের প্রথা আজও আছে । যেমন বৌদ্ধ সংস্কৃতিতে বেনুবন, জেতবন প্রকৃতি সংরক্ষিত স্থানের নাম পাওয়া যায় । 

লোককথা, রূপকথা, পালাগানে অরণ্য রহস্যময় স্থান । লোককথায় বন মানেই রাক্ষস-খোক্ষস, বাঘ, ভল্লুক, সাধু ডাকাত, ভূত-প্রেত, জিন-পরি সবাই বনের বাসিন্দা । শিকারবিষয়ক গান, বনভোজনের আচার, বসন্তউৎসব এসবের মধ্যেও বন এক একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র । বৈষ্ণবদের সম্মেলন 'বনবিহার'ও বনকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান । স্থাননামেও বনের প্রভাব রয়েছে । মধুবন, বেতবন, বনকুল, আমতলি, জামতলি, শিমুলতলি, বরইতলি, কাঠালতলি, ইত্যাদি বৃক্ষকেন্দ্রিক নাম, শামুকছড়া, চালতাছড়া, কলাছড়া, নালিছড়া, কুলাইছড়া, আবাঙছড়া, গন্ডাছড়া, ইত্যাদি বহু ছোটো ছোটো স্রোতস্বিনী কেন্দ্রীক মনু, জুরি, গোমতী ইত্যাদি নদীকেন্দ্রিক নামে ও বড়মুড়া, জগহরিমুড়া, সোনামুড়া,পাওরামুড়া হালাইমুড়া, ছবিমুড়া, দেবতামুড়া ইত্যাদি পাহাড় অরণ্য কেন্দ্রিক নামে বনের প্রভাব রয়েছে । অরণ্য প্রায়শই জাদুবিদ্যা, নায়ক-নায়িকার আত্মগোপন বা রোমাঞ্চকর অভিযানের স্থান হিসেবে চিহ্নিত ।

আধুনিক সাহিত্যে বন নতুন অর্থ বহন করে । রবীন্দ্রনাথের রচনায় বনপ্রকৃতি সৌন্দর্য ও মানবমনের নিবিড়তার প্রতীক । এখানে বন মানবমনের গভীর স্তরের সঙ্গে যুক্ত এক নান্দনিক অভিজ্ঞতা । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় অরণ্য কেবল প্রাকৃতিক দৃশ্যের অংশ নয় । তা এক গভীর নন্দনবোধ, আধ্যাত্মিকতা এবং মানবমনের অন্তর্জাগরণের প্রতীক । তার কাব্যচেতনার ভিতর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক একটি প্রধান সুর । আর সেই প্রকৃতির প্রাণময় রূপগুলোর মধ্যে অরণ্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে । রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারতের অরণ্যকেন্দ্রিক সভ্যতাকে জ্ঞান ও সাধনার আদর্শ বলে মনে করতেন । 'চৈতালি'কাব্যের কাব্যের 'তপোবন' কবিতায় এই বিশাল অরণ্যের ছায়ায় সাধনার ছবি ফুটে উঠেছে । তিনি কেবল কবিতায় অরণ্য বন্দনা করেননি, শান্তিনিকেতনে 'বনমহোৎসব', 'বৃক্ষরোপণ' ও 'হলকর্ষণ' উৎসবের মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতার বাস্তব প্রয়োগ করেছিলেন তিনি । অরণ্যসংরক্ষণে সপক্ষে তিনি উচ্চারণ করেন–
                    দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর 
                   লও যত লৌহ লোষ্ট্র  কাষ্ঠ ও প্রস্তর
                   হে নব সভ্যতা নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী
                   দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি ।

রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যে দেখা গেছে অরণ্যপ্রীতি । 'বাল্মিকী প্রতিভা' এবং 'কালমৃগয়া' গীতিনাট্যদুটিতে তপোবনের চিত্রের বর্ণনায় রয়েছে গভীর পরিবেশ ও প্রকৃতি বোধের নিদর্শন । বাল্মিকী প্রতিভাতে দস্যুদল আর কালমৃগয়াতে শিকারিদলের দাপটে যখন অরণ্যের গাছপালা পশুপাখির অস্তিত্ব বিপন্ন তখন এই দুটি গীতিনাট্যেই তপোবনের শান্তিরক্ষা ও সর্বোপরি অরণ্যরক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করেছেন বনদেবতা ও বনদেবীগণের হাতে । রবীন্দ্রসাহিত্যে অরণ্যভাবনা নিছক প্রকৃতিপ্রেম নয় । বরং এটি অরণ্যসংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও পরিবেশচেতনার গভীর মেলবন্ধন । বিভূতিভূষণের 'আরণ্যক' উপন্যাসে অরণ্য কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য নয় । বরং সভ্যতার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক নৈতিক প্রশ্ন । জীবনানন্দ দাশের কবিতায় অরণ্য স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা ও চিরন্তনতার অনুভব জাগায় । এখানে অরণ্য মানুষের অন্তর্লোকের প্রতিবিম্ব ।

কিন্তু আধুনিকতার চাপে বন উজাড় হচ্ছে দ্রুত । নগরায়ণ শিল্পায়ন ও ভোগবাদী মানসিকতা বনকে সংকুচিত করছে । এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি লোকঐতিহ্যও হারিয়ে যাচ্ছে । বন ধ্বংস মানে কেবল পরিবেশের ক্ষতি নয়, একটি সংস্কৃতির বিলুপ্তি । সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য তাই বন সংরক্ষণ অপরিহার্য । অতএব বনকে রক্ষা করা মানে কেবল প্রকৃতিকে রক্ষা করা নয় । মানব সভ্যতার স্মৃতি বিশ্বাস শিল্প ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করা । বন আমাদের সংস্কৃতির শিকড় । সেই শিকড় সুস্থ থাকলেই সভ্যতার বৃক্ষ সবল থাকবে ।

Sunday, February 22, 2026

বঙ্গ থেকে বাঙলা

বাংলার প্রাচীন জনগোষ্ঠী অস্ট্রিক জাতির উপাস্য দেবতা বোঙ্গা>বোঙা থেকে বোঙ্গাল> বঙ্গাল>বাঙ্গাল> বাঙাল> বাঙালি ও তাদের দেশ বাঙলাদেশ, ভাষা বাঙলাভাষা হয়েছে ।

Saturday, February 21, 2026

বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি : সাব্রুমের মৈত্রীসেতু চালু হওয়া নিয়ে আশার আলো দেখছেন দুপারের জনগণ

বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি : সাব্রুমের মৈত্রীসেতু চালু হওয়া নিয়ে আশার আলো দেখছেন দুপারের জনগণ 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন


 বিএনপি দল বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার পর সাব্রুমে আবার উঠে আসছে মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রসঙ্গ । ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়াউর রহমান পর্যায়ক্রমে ১ নম্বর ও ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন । ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস থেকে জুন পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা নিয়ে গঠিত ১ নম্বর সেক্টরের এবং জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ময়মনসিংহ টাঙ্গাইল (কিশোরগঞ্জ বাদে) এলাকা নিয়ে গঠিত ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন । এছাড়া তিনি জেড ফোর্সেরও সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির উপর বর্বর আক্রমণ চালায় তখন জিয়াউর রহমান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাঁর বাহিনী নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন । ২৬ শে মার্চ রাতে প্রায় আড়াইশো বাঙালির সেনা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মেজর জিয়া । ২৭ শে মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে সকাল ১১ টায় মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি পাঠ করেন । জীবন মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে এই অকুতোভয় সেনানায়ক সেদিন স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে নামেন । আর সেসময় তার স্ত্রী ও সন্তানগণ ছিল ঢাকা সেনানিবাসে বন্দী । তা সত্ত্বেও তিনি জেড ফোর্স গঠন করে মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধকে বেগবান করেন । স্বাধীনতা লাভের পর তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের ও নেতৃত্বের জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করেন । ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষে এবং এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তান বাহিনী চট্টগ্রাম দখল করলে মেজর জিয়াউর রহমান অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের নিয়ে সীমান্ত এলাকার রামগড়ে ঘাঁটি গাড়েন । সেখান থেকে রামগড় স্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং পরিচালনা করেন । এপ্রিলের শুরুর দিকে তিনি তাঁর বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ফেনী নদী পেরিয়ে সাব্রুমের হরিণাতে চলে আসেন এবং সেখান থেকে ভারতের সীমান্ত ব্যবহার করে যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকেন । এ সময় ভারতের বিএসএফের লে. কর্নেল ঘোষ, মেজর প্রধান, ক্যাপ্টেন ঘোষ এবং সাব্রুম পুলিশ স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বীরেন মুখার্জি মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করেন । ২৫ শে জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, মিরসরাই, রামগড়, ফেনী ও নোয়াখালিতে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে একাধিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ।

স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে একসময় মেজর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৮১ সালের ৩০ শে মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক  উত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একনম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পালনের সুবাদে জিয়াউর রহমান সাব্রুমের প্রত্যন্ত অঞ্চল শিলাছড়ি, ঘোড়াকাঁপা, বৈষ্ণবপুর, মনুঘাট, আমলিঘাট শ্রীনগর থেকে শুরু করে বিলোনিয়ার নলুয়া, ঋষ্যমুখ, মতাই ইত্যাদি অঞ্চল চষে বেরিয়েছিলেন সেদিন । এই সীমান্ত অঞ্চলগুলি দিয়েই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে আক্রমণ শানাতেন । ফলে এখানকার জনগণের সঙ্গে তার একটা নিবিড় সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল, ৭১এর সে দিনে সাব্রুমের এক সাধারণ ব্যবসায়ী মাখন দের হোটেলে তিনি খাওয়া-দাওয়া করতেন । নিছক ব্যবসায়িক সম্পর্ক হয়েও জিয়াসাহেব না ফেরা পর্যন্ত তিনি খাওয়াদাওয়া করতেন । এছাড়া এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সেসময়ের সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল ।

গত ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের বিএনপি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করায় বহুবছর পরে আবার জিয়াউর রহমানের নাম সাব্রুম তথা দক্ষিণ ত্রিপুরার পুরনো নাগরিকদের র মুখে মুখে প্রকাশ পাচ্ছে । অনেক বয়স্ক জনেরা তার স্মৃতিচারণ করছেন । অন্যদিকে বিগত সরকারের আমলে সাব্রুমের ফেনী নদীর উপরে মৈত্রীসেতু তৈরি হয়েছিল এবং এই মৈত্রীসেতুকে কেন্দ্র করে দুপাড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাতায়াতের একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল । কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে একেবারে মৈত্রীসেতুর দ্বারদঘাটনের মুখে সেদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাক্রমের পরিণতিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কিছু মানুষ ভারতবিদ্বেষী প্রচারে মেতে ওঠে । ফলে দু দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল । তারা মৈত্রী সেতুকেন্দ্রিক সমগ্র কর্মকান্ডের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় । ফলে প্রকল্পটি সাময়িকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে । এবং এই প্রকল্প প্রায় অন্ধকারে চলে যাচ্ছিল । ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই প্রকল্পের সলিল সমাধি ঘটাতে সচেষ্ট ছিলেন । পাশাপাশি রামগড় ও সাব্রুম এর স্থলবন্দরসহ মীরসরাইয়ের এস ই জেড প্রকল্প তাঁরা স্তব্ধ করে দেন । মীরসরাইয়ের প্রকল্পটি বাতিল করে সেখানে বিদেশের সহায়তায় সমরাস্ত্র প্রস্তুত এর কারখানা গড়ার পরিকল্পনা নেন তাঁরা । সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে বাংলাদেশে বিএনপি দল ভূমিধ্বস জয়লাভ করায় ড. ইউনুস এখন ইতিহাসের পাতায় । ইতোমধ্যে সেদিনের এক নম্বর সেক্টরের সেনানায়ক বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার গঠন করার ফলে সে প্রকল্পে আবার আসার আলো দেখা যাচ্ছে । এই দলটি ক্ষমতায় এসেই ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবন ও গতিশীল রাখার বার্তা দেয় । ভারত সরকারও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ।  দুদেশের ভিসার প্রদানের ব্যাপারে নিয়মকানুন শিথিল কড়ার প্রয়াসও নেওয়া হচ্ছে ।ফেনীনদীর উপর নির্মিত মৈত্রীসেতু যদি চালু হয় তাহলে অতি সহজে চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করে এই অঞ্চলে বাণিজ্যবিস্তারের বিপুল সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে । এর ফলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নও প্রবলভাবে সাধিত হবে । পাল্টে যাবে জীবনযাত্রার মান ও অর্থনৈতিক চিত্র ।  নতুন সরকার আসার ফলে দক্ষিণ ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অর্থাৎ ফেনীনদীর দুই তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ আবার নতুন করে আশার আলো দেখছেন । যদি এখানে মৈত্রী সেতুকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সচল হয়ে ওঠে তাহলে এখানকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র একেবারেই পাল্টে যাবে বলে দুপারের মানুষজনই আশা প্রকাশ করছেন । অনেকে জিয়াউর রহমানের লড়াইয়ের কেন্দ্র একনম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার সাব্রুমের হরিনা পরিদর্শনের ও আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়াকে ।এখন দেখার বিষয় নতুন সরকার ও বিএনপি দলের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা তারেক জিয়া ও তার মন্ত্রিপরিষদ কতটা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন ।

রবীন্দ্রসৃষ্টিতে পূর্ববাংলার ভাষা, জীবন ও কৃষ্টিসংস্কৃতির প্রভাব

রবীন্দ্রসৃষ্টিতে পূর্ববাংলার ভাষা, জীবন ও কৃষ্টিসংস্কৃতির প্রভাব

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

রবীন্দ্রনাথ ১৮৮৯–১৯০১ সাল পর্যন্ত শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ও কালিগঞ্জ অঞ্চলে কবির জীবনের ২৮ থেকে ৪০ বছর সময়কালের ১২ বছর অতিবাহিত করেন । পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথকে বিয়ের দুদিন আগে ২২ অগ্রাহায়ন ১২৯০ বঙ্গাব্দে একটি চিঠিতে তার পূর্ববঙ্গের জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব অর্পণ করেন । সেই চিঠিতে তিনি লেখেন–'এইক্ষণে তুমি জমিদারীর কার্য পর্যবেক্ষণ করবার জন্য প্রস্তুত হও; প্রথমে সদর কাছারিতে নিয়মিত রূপে বসিয়া সদর আমিনের নিকট হইতে জমাওয়াশিল বাকি ও জমাখরচ দেখিতে থাক এবং প্রতিদিনের আমদানি রপ্তানি পত্র সকল দেখিয়া তাহার সারমর্ম নোট করিয়া রাখ ।' ( রবিজীবনী, তৃতীয় খন্ড, কলকাতা : আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. ২০০৯ । পৃষ্ঠা ১১৯ ) । তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স মাত্র ২২ বৎসর সেই থেকে ক্রমে রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতার জমিদারি সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে থাকেন । রবীন্দ্রনাথের জীবনপঞ্জি অনুযায়ী দেখা যায় যে আরও প্রায় ছয় বছর পরে তার আঠাশ বছর বয়সে ১৮৮৯ সালের ২৮শে নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের জমিদারির দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন । ( তদেব ) ।

রবীন্দ্রনাথের জীবনে শিলাইদহপর্ব তাঁর কল্পনার জগতকে সমৃদ্ধিদানের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করেছে । শিলাইদহ, পতিসর, শাহজাদপুর ও কালীগঞ্জে রবীন্দ্রনাথ লেখালেখির উৎকর্ষতার সুযোগ পান । রবীন্দ্রনাথের এই পর্বের সৃষ্টিকে গবেষকগণ শিলাইদহপর্ব বলে আখ্যায়িত করেন । এখানে এসে তিনি পরিচিত হন গ্রাম বাংলার উদার শ্যামল প্রকৃতির সঙ্গে । এখানকার পদ্মা, গড়াই, আত্রাই, নাগর, বড়াল ও ইছামতি নদী তাঁকে প্রতিনিয়ত হাতছানি দিয়ে ডেকেছে । সর্বোপরি এখানকার দরিদ্র চাষি জনগণের জীবন দেখেছেন তিনি খুব কাছে থেকে । তাদের চিরক্রন্দনময় জীবন দেখে তিনি চঞ্চল হয়ে উঠেছেন । তিনি লিখেছেন–'কেবলই ভাবছি আমাদের দেশজোড়া চাষীদের দুঃখের কথা । আমার যৌবনের আরম্ভ কাল থেকেই বাংলাদেশের পল্লীগ্রামের সঙ্গে আমার নিকট পরিচয় হয়েছে । তখন চাষীদের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ ছিল দেখাশোনা–ওদের সব নালিশ উঠেছে আমার কানে । আমি জানি ওদের মতো নিঃসহায় জীব অল্পই আছে, ওরা সমাজের যে তলায় তলিয়ে সেখানে জ্ঞানের আলো অল্পই পৌছয়, প্রাণের হাওয়া বয় না বললেই হয় ।' ( রাশিয়ার চিঠি, রবীন্দ্ররচনাবলী, পৃষ্ঠা ৬৮৩ ) ।

পূর্ববঙ্গের সঙ্গে কবির সম্পর্ক ছিল অবিনাশী । পদ্মার তরঙ্গ-বিভঙ্গে নৌকায় ভেসে ভেসে তিনি নিবিড়ভাবে অবলোকন করেছেন এ অঞ্চলের শান্ত শ্যামল পল্লীপ্রকৃতি ও সহজ সরল প্রজাসাধারণ ও তাদের জীবনযাত্রা । রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ পর্বে সৃষ্টি হয়েছে সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কথা, কাহিনী, কল্পনা, কণিকা, ক্ষণিকা, নৈবেদ্য ইত্যাদি ঐশ্বর্যময় কাব্য সম্ভার । 'সোনার তরী' কাব্যে পদ্মার তীর, বর্ষার বন্যা, নৌকা, চর ক্ষেতের ফসল, চাষির জীবন, নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি । 'সোনার তরী' কবিতায় ১) গান গেয়ে তুলিবে কে আসে পারে দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে ২ ) রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা ৩ ) পরপারে দেখি আঁকা তরু-ছায়া মুসলিম মাখা, গ্রামখানি মেঘে ঢাকা প্রভাতবেলায় ৪ ) ভরা নদী ক্ষুরধারা খর পরশা  ইত্যাদি পংক্তিতে পদ্মাতীরের নয়নমুগ্ধকর চিত্র ফুটে উঠে ।

'চিত্রা' কাব্যের বিষয়বস্তু সৌন্দর্যবোধ হলেও গ্রামীন চাষিজীবনের সংকট ফুটে উঠেছে 'এবার ফেরাও মোরে' কবিতায় । দরিদ্র চাষিদের সংকটমোচনের জন্য তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন–'এইসব মূঢ় ম্লান মুখ মুখে / দিতে হবে ভাষা–এইসব শান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা–' । 'চৈতালি' কাব্যে পদ্মাকে নিয়ে রয়েছে কবিতা, 'হে পদ্মা আমার /তোমায় আমায় দেখা শত শত বার ।' 'কথা' ও 'কাহিনী' কাব্যে বারবার এসেছে পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের কথা । 'দুই বিঘা জমি'র উপেন মিথ হয়ে আছে । এর কাহিনি নাকি রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফল । এই কবিতায় তিনি পূববাংলার পল্লীপ্রকৃতির একটি চিত্র তুলে ধরেন–'ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি / পল্লব ঘন আম্রকানন রাখালের খেলা গেহ / স্তব্ধ অতল দিঘি কালো জল নিশীথ শীতল স্নেহ / বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে / মা বলিতে প্রাণ করে আনচান চোখে আসে জল ভরে ।' ক্ষণিকা কাব্যেও রয়েছে নিসর্গ ও মানুষ । 'আষাঢ়' ও 'নববর্ষা' কবিতায় বর্ষার গুরুগম্ভীর রূপ প্রকাশ পেয়েছে । 'নৈবেদ্য' কাব্য প্রকাশের সময় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে বসবাস শুরু করেন । নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থে ঈশ্বরোপলব্ধির ভূমিকা প্রধান থাকলেও বাংলার দিগন্তপ্রসারী উদার প্রকৃতির প্রভাবও রয়ে গেছে তাঁর সৃষ্টিতে ।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের ৯৪টি গল্পের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি গল্প তিনি রচনা করেছেন শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে অবস্থানকালে । গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনের অন্তর্নিহিত সুখদুঃখ, আশানিরাশা, কৃষ্টিসংস্কৃতির জীবন্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় তাঁর ছোটোগল্পসমূহে । পূর্ববাংলায় বসে লেখা তাঁর গল্পগুলোতে বাংলাদেশের শ্যামল সুন্দর প্রকৃতি, অজ্ঞ, অসহায়, অশিক্ষিত ও দরিদ্র জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি জমিদারি শাসনের নেতিবাচক শৃংখলে পর্যুদস্ত জীবনচিত্র ও প্রতিফলিত হয়েছে । তাঁর রচিত 'ছুটি', 'পোস্টমাস্টার', 'সমাপ্তি', 'দেনা পাওনা' 'রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা', 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন' ইত্যাদি গল্পে কৃষক, গৃহিণী, দরিদ্র প্রজা, জমিদারের কর্মচারী, এমনকি গ্রামীন বালকের জীবন সংগ্রাম দুঃখ-কষ্ট নিঃসঙ্গতা ও নীরব অভিমান অত্যন্ত সুনিপুণভাবে উঠে এসেছে । 'পোস্টমাস্টার' গল্পে গ্রামীন জনপদের নিঃসঙ্গ পোস্টমাস্টার ও ছোটো রতনের মধ্যে আবেগময় সম্পর্কের মানবিকতা, 'ছুটি' গল্পে ফটিক চরিত্রের মাধ্যমে গ্রামীণ বালকের জীবনযুদ্ধ, 'দেনা পাওনা'য় পণপ্রথা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীর অসহায়ত্ব,  'সমাপ্তি' গল্পে গ্রামীন শিক্ষকের সহজ জীবন ও স্বাভাবিক প্রেমের বিকাশ এগুলো শুধু শিল্প সুষমায় সমৃদ্ধ নয় বরং গ্রামবাংলার ইতিহাস, জীবনপ্রবাহ ও সংস্কৃতির অনন্য দলিল ।

পূর্ববাংলার নদীমাতৃক প্রকৃতি লোকজ  জীবনধারা, নদী, নৌকা, কৃষিজীবন ও লোকসংগীত রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে । তিনি বাংলার লোকসংস্কৃতি ও লোকগানের সহজ সরল আবেগপ্রবণ ধারাকে আধুনিক সাহিত্যে ও সঙ্গীতে ব্যবহার করে নতুন মাত্রা দিয়েছেন । নদী ও নৌকার সঙ্গে সম্পর্কিত ভাটিয়ালি গানের সুর ও ছন্দ রবীন্দ্রসংগীতে অনেকবার ব্যবহৃত হয়েছে । 'এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে জয় মা বলে ভাসা তরী' এই জাতীয় গানের উদাহরণ । লোকগানে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দ, সহজ, সরল, ভাষাব্যবহার ও চিত্রকল্প রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায় সাবলীলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে । ফলে তাঁর সৃষ্টি সর্বজনগ্রাহ্য আবেদন এনে দিয়েছে । তিনি লোকসংগীতের ঢঙে নতুন নতুন সুর সৃষ্টি করেছেন । আবার কখনো সরাসরি লোকসুর ব্যবহার করেও গান রচনা করেছেন । রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালের শ্রাবণ ( ৭ই আগস্ট ) রচনা করেছিলেন 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' গানটি । এই গানটি গগন হরকরার 'আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে' গানটির সুরে রচিত । এই গানটি এতটা জনপ্রিয় হয়েছিল যে ৭১এ বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে মুখে ফিরত । পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রূপে গানটি গৃহীত হয় । লোকসংগীতের মধ্যে যে আধ্যাত্মিক আবেদন রয়েছে তেমনি রবীন্দ্রনাথের অনেক গান ও কবিতার মধ্যে ঈশ্বরোপলব্ধি বা জীবনের গভীর সত্যের অনুসন্ধান লক্ষ্য করা যায় । 'রূপ সাগরে ডুব দিয়েছি অরূপ রতন আশা করে',  'তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি',  'তাই তোমার আনন্দ আমার পর তুমি তাই এসেছ নিচে /তোমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর আমার প্রেম হতো যে মিছে' গানগুলো এ প্হঙ্গে উল্লেখ করা যায় ।' শিলাইদহে বাউলদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিবিড় পরিচয় ঘটে । এখানে অবস্থানকালে গগন হরকরা, কাঙাল হরিনাথ, গোঁসাই রামলাল, গোসাই গোপাল, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী, লালনের শিষ্যসামন্তদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখাসাক্ষাৎ ও আলোচনা হত । শিলাইদহ ও ছেঁউড়িয়া থেকে তিনি লালন ফকির ও গগন হরকরার গান সংগ্রহ করে বিদগ্ধ মহলে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন । রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত গানগুলো 'বাউল' নামে গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়েছিল । তিনি তাঁর কয়েকটি নাটকেও বাউল গান ব্যবহার করেছেন । 'মানুষের ধর্ম' গ্রন্থে ঔপনিষদীয় আত্মতত্ত্ব ও বাউল দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা তিনি করেছেন । তাঁর চিত্রাঙ্গদা ও চন্ডালিকা নাটকে লোকজ আঙ্গিক এবং নারীচেতনার দেশজ স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে । এই নাটক দুটিতে সমাজের নারী, জাতপাত ও মূল্যবোধের জটিলতাকে শিল্পিত ও মানবিক রূপে উপস্থাপন করেছেন ।

রবীন্দ্রনাথের গদ্য ও পদ্যে বহুবার পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক শব্দ, ধ্বনি ও বাক্যবন্ধ ব্যবহৃত হয়েছে । যেমন সাজু, লাউ, চাষা, নাও, মাঝি, ডিঙি, পাল, গাঙ, জোয়াল, তালগাছ ইত্যাদি শব্দ তাঁর রচনায় দেখা যায় । শিলাইদহে থাকাকালীন তাঁর ভ্রাতুস্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে লেখা পত্রসমূহ 'ছিন্নপত্রে' যেমন পূর্ববঙ্গের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের বর্ণনা রয়েছে তেমনি সেখানকার মানুষের মুখের ভাষা ও উচ্চারণের ছাপ স্পষ্ট । তার উদাহরণ, 'চাষার ভাষায়, মহারাজ ফসল ভালো হয় নাই, তবে আল্লার কৃপা হইলে বাঁচুম ।' এই জাতীয় সংলাপ তাঁর জীবন ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের উদাহরণ ।

তাঁর বিসর্জন, ডাকঘর, মালিনী নাটকে সহজিয়া ভাষাব্যবহারের ছাপ রয়েছে । সংলাপে গানে আঞ্চলিক শব্দ ও লোকজ ভাষাভঙ্গের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় । যেমন–রে !ওরে !হে দাদা ! বাপু তুমি না কেমন করো না রে ! তুই বড় গেঁয়ো জাতীয় শব্দ নাটকের চরিত্রদের সংলাপে ব্যবহৃত হয়েছে । 'চন্ডালিকা' নাটকের একটি সংলাপে দেখি–'তুমি তো জাতের লোক, আমি তো চন্ডালের মেয়ে ' জাতপাতের লোকজ দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব । 'মুকুট' নাটকে 'ওগো রে ! মুকুট যে মাথার উপর বসে সেই জানে ওটা কত ভারী ।' প্রবাদপ্রতিম বাক্যে একদিকে দার্শনিকতা আবার অন্যদিকে লোকজবোধের প্রকাশ ঘটে ।

১৯০১ সালের পর রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ থেকে গিয়ে শান্তিনিকেতনে বসবাস করলেও পরবর্তী সময়ে বহুবার শিলাইদহ এসেছেন । এখান থেকেই তিনি সংগ্রহ করেছেন তাঁর সারাজীবনের সৃজনের সঞ্চয় । এ প্রসঙ্গে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ তাঁর 'পিতৃস্মৃতি' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন–'আমার ধারণা বাবার গদ্য ও পদ্য দু'রকম লেখারই উৎস যেমন খুলে গিয়েছিল শিলাইদহে, একদিনের জন্য কলম বন্ধ হয়নি । শিলাইদহের যে রূপবৈচিত্র তার মধ্যেই পেয়েছিলেন তিনি লেখার অনুকূল পরিবেশ ' । এই পূর্ববাংলার জল, মাটি, হাওয়া, নদী ও মানুষের মধ্যেই রবীন্দ্রমানসের, রবীন্দ্রমননের সূচনা হয় । রবীন্দ্রনাথের পরবর্তীজীবনে আঁকা চিত্রসম্ভারেও শিলাইদহ তথা পূর্ব বাংলার প্রভাব নিহিত ছিল । রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতরণি একদিন পূর্ববঙ্গেরই সোনার ধানে ভরে গিয়েছিল ।

মানভূমের ভাষা আন্দোলনের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও সাফল্য

মানভূমের ভাষা আন্দোলনের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও সাফল্য 


অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

বাংলা ভাষা বাঙালির প্রাণের ভাষা । সারা পৃথিবী জুড়ে বাংলা ভাষা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত । সারা বিশ্ব জুড়ে বাংলা ভাষার জয়গান প্রচারিত । বাংলার মাটিতেই একদিন জন্মেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সৈয়দ মুজতবা আলী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সমরেশ বসু জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, প্রমুখগণের মত বিশ্ববিশ্রুত ব্যক্তিত্ব যারা তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের বাংলা ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন । এই বাংলাভাষার সঙ্গে বাঙালির আবেগ জড়িত । বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে এই উপমহাদেশে বহুবার ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে । তারমধ্যে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা রাজপথের রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলন বিশ্বের কাছে এক বিস্তৃত পরিচিতি এনে দিয়েছে । বরকত, সালাম, জব্বার, রফিক, সফিদের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতিও পেয়েছে । বাংলাদেশের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি আমাদের দেশেও ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল ১৯৬১ সালের ১৯শে মে । আসামের শিলচরে অনুষ্ঠিত এই ভাষা আন্দোলনে ১১ জন শহিদ হয়েছিলেন সেদিন । সেদিনের সেই শহিদদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে । 

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা । এ ভাষা আমাদের আত্মা আমাদের জীবনধারণের মূল চাবিকাঠি । মাতৃস্তন্য  পুষ্ট করে মানব শরীরকে । কিন্তু মাতৃ শরীর থেকে বিচ্যুত হয়েও থেকে যায় নাড়ির টান । মাতৃভাষাই মানুষ এবং মাটিকে বেঁধে রাখে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে । যখন কেউ জোর করে মাতৃভাষার অধিকারকে কেড়ে নিতে চায় তখনই মানুষের বনভূমিতে আলোড়ন সৃষ্টি হয় । বাংলাভাষার জন্য বিভিন্ন সময়ে যে আন্দোলন তা এই সংঘাতেরই ফলশ্রুতি । বাংলা ভাষার মর্যাদার জন্য ঢাকা কিংবা শিলচরে যে আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে তার কথা অনেকেই জানেন । কিন্তু তার পাশাপাশি মাতৃভাষার জন্য মানভুমের বাঙালিদের যে দীর্ঘ আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল সেই আন্দোলনের কথা অনেক বাঙালি জানেন না । মনে রাখা দরকার যে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যতগুলো ভাষা আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলনও এই বাংলার মাটিতেই সংঘটিত হয়েছে এবং সেই আন্দোলন হল মানভূমের ভাষা আন্দোলন। মাতৃভাষা বাংলার জন্য বাংলার একটি অঞ্চলের বাঙালিদের প্রথম ও সুদীর্ঘ লড়াইয়ের কাহিনি শুধুমাত্র ভাষার অধিকারের জন্যে । সেই জেলাটি হল মানভূম । যেখানে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালিদের লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯১২ সালের পহেলা এপ্রিল । আর সুদীর্ঘ ৪৪ বছর পরে তার আংশিক সফলতা এসেছিল আন্দোলন শেষে ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর । 

এই সুদীর্ঘ সময়ের আন্দোলনের পেছনে কিছু ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম রয়ে গিয়েছিল যার পরিপ্রেক্ষিতে এই অঞ্চলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ধীরে ধীরে বিস্তৃত রূপ ধারণ করে । এই আন্দোলনের পশ্চাদপট জানতে হলে আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয় । ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দিল্লির বাদশাহের কাছ থেকে সুবা বাংলার দেওয়ানি পায় । জরিপের পর ১৭৬৭ থেকে খাজনা আদায় শুরু হয় । দক্ষিণ-পশ্চিমবাংলার চারটি রাজ্য শিখরভূম, মানভূম, বরাহভূম আর ধল ভূম ও সামন্তভূমের কিছু অংশ মিলে মানভূম রাজ্য । যার সরকার নিয়ন্ত্রিত হত কামারপুকুর সংলগ্ন মান্দারণ থেকে । তবে রাজ্যের অধিকাংশই পঞ্চকোট রাজার অধীন ছিল । ১৭৬৫ পর্যন্ত পঞ্চকোট রাজা খাজনা দিতেন দিল্লিশ্বরকে । এই রাজ্যের জনজাতি আদিবাসী সম্প্রদায় কিন্তু 'কোম্পানি' নামের এই বিদেশী মালিকানাকে মেনে নিতে পারল না । তারা খাজনা দিতে অস্বীকার করল । এই নিয়ে শুরু হল বিরোধ । চলতে থাকল এক দীর্ঘকাল ব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম যা 'চুয়াড় বিদ্রোহ' নামে প্রসিদ্ধ । বরাহভূমের রাজা বিবেকনারায়ণের প্রচ্ছন্ন মদতে ১৭৬৭ থেকে ১৮৩২ পর্যন্ত চলে এই বিদ্রোহ । কোম্পানি অঞ্চলগুলিকে ভাঙাগড়া করে ১৮০৫ সালে 'জঙ্গলমহল' জেলা গঠন করেও এই বিদ্রোহ থামাতে পারেনি । চুয়াড় বিদ্রোহের শেষ পর্বে ১৮৩২ সালে নেতা বরাভূমের রাজবংশজাত গঙ্গানারায়ণ সিংয়ের পরাজয় ও মৃত্যু হয় । এই বিদ্রোহের ফলশ্রুতিতে ১৮৩৩ সালে গঠিত হয় মানভূম জেলা, বর্তমান পুরুলিয়া, ধানবাদ আর সিংভূমের সরাইকেলা অঞ্চলের মোট ৭৮ ৯৬ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে । ১৮৩৭ সালে ব্রিটিশ সরকার অকারণে ফারসির বদলে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যার ফলে দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠনের দাবি উঠে । ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে খানিকটা ভিন্ন খাতে ঘুরিয়ে দিতে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ বলে অনেকে মনে করেন । তারা উর্দুর বদলে হিন্দি আর আরবির বদলে সংস্কৃত ভাষা চালু করার ফরমান জারি করে । এখান থেকে বিভিন্ন ভাষাভাষী বিশেষত বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বাংলা প্রদেশের প্রতি এক নিবিড় যোগ ধরে রাখার স্বপ্ন দেখে । এদিকে মানভূমের জন্য আরও বড় শাস্তি অপেক্ষা করছিল ১৮৮৯ সালে কোম্পানি জেলাটিকে ভেঙে টুকরো করে মাত্র ৪১০০ বর্গমাইলে সীমিত করে দেয় । ভাষা ও ভূমি বিভাজনের এই নীতিকে কেন্দ্র করে চলতে থাকা ধিকি ধিকি আগুনে ঘৃতাহূতি লাভ করে ব্রিটিশের বাংলা ভাঙার চক্রান্তে । ১৯০৫ সালে উনিশে জুলাই সরকারিভাবে বাংলা প্রেসিডেন্সি ভাগের বিজ্ঞপ্তি জারি করেন লর্ড কার্জন । ভাগ হয়ে যায় বাংলা । ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, মালদহ, পার্বত্য ত্রিপুরা ও অসমকে নিয়ে গঠিত হয় পূর্ববঙ্গ ও অসম । যার রাজধানী হয় ঢাকা । অবশিষ্ট বাংলা, বিহার, উড়িষ্যাকে নিয়ে গঠিত হয় বাংলা প্রদেশ । যার রাজধানী হয় কলকাতা । ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সেদিন কলকাতাসহ সংলগ্ন অঞ্চলের বাঙালি মধ্যবিত্ত ও একাংশ প্রতিবাদে উত্তাল হয় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলমে সেদিন উঠে আসে 'বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল, পুণ্য হউক পুণ্য হউক পুণ্য হউক হে ভগবান' । রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে পালিত হয় রাখিবন্ধন উৎসব। হিন্দু মুসলিম বাঙালি জাতিসত্তা ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের বার্তা দেয় । সেদিনের উত্তাল আন্দোলনের তরঙ্গে  বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে হয় ইংরেজকে । তীব্র আন্দোলনের ফলে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবার উৎসবে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ বাংলাভূমিকে ভাগের যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছিল তা বাতিল করেন । কিন্তু একই দিনে তিনি এও ঘোষণা করেন বাংলা প্রেসিডেন্সিকে দুই ভাগে বিভাজন করে এক অংশ হবে পূর্ববঙ্গ । যার রাজধানী হবে কলকাতা । এবং অপর অংশ হবে বিহার ও উড়িষ্যা প্রদেশ । যার রাজধানী হবে পাটনা । এবং এই বিহার উড়িষ্যা প্রদেশের সঙ্গেই যুক্ত করে দেওয়া হয় বাংলাভাষী সমগ্র মানভূম ও ধলভূম অঞ্চলকে (৭০০০ বর্গ কিলোমিটারের অধিক অঞ্চল ) । বাংলা ভাষাভাষী এলাকাকে কেন বিহার উড়িষ্যার সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হবে সে নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে । তখন থেকে শুরু হয় মানভুমের ভাষা আন্দোলন । কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের সাফল্যের আনন্দ এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সামনে থাকায় মানভূমের ভাষা আন্দোলন তখনও জমে ওঠেনি । এসময় আন্দোলনের ব্যাপক প্রসার না হলেও বাংলা ভাষার উপর হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলতে থাকে । বিহার সরকার যখন অফিস আদালত শিক্ষার মাধ্যমে তথা দাপ্তরিক কাজে হিন্দি ভাষাকে চালু করেন এবং মানভূমের বাংলা ভাষাভাষীকেও হিন্দি ব্যবহার করতে নির্দেশ দেন তখন মানভূমের সচেতন ও ভাষাপ্রেমী বাঙালি জনগণ প্রিয় বাংলাভাষার উপর হিন্দির আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন ।

১৯১২ সালের ১লা এপ্রিল থেকে মানভূমের শুরু হয় সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি আন্দোলন । এই আন্দোলন মাতৃভাষা বাংলার জন্যে । বঙ্গভূমিতে প্রত্যাবর্তনের জন্যে । মানুষ এ পর্যন্ত আন্দোলন করেছে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-সুরক্ষা-সার্বভৌমত্ব-স্বাধীনতার জন্যে । ভারতের মানুষ এই প্রথম দেখলেন মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ভূখণ্ডকে আন্দোলন করতে । মানভূমকে বিহার উড়িষ্যা থেকে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় পুরুলিয়া কোর্টের আইনজীবী রজনীকান্ত সরকার শরৎচন্দ্র সেন প্রমুখদের নেতৃত্বে । তবে ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের আঁচ লাগে মানভুমের জনমনেও । ১৯২১ সালে পুরুলিয়ায় তৈরি হয় মানভূম জেলা কংগ্রেস কমিটি । মানভূমকেশরী শ্রীঅতুলচন্দ্র ঘোষ সম্পাদক নির্বাচিত হন । পুরুলিয়া ইতিহাস গবেষক দিলীপ কুমার গোস্বামীর মতে, "প্রতিবাদের স্বর উঠলেও সে সময় স্বাধীনতার আন্দোলনেই ছিল মুখ্য তাই ভাষা আন্দোলন তত্ত্বটা প্রচার পায়নি তবে তলে তলে আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি হচ্ছিল ।"

এই আন্দোলনের যুক্তিসংগত কারণ হল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে বিহার সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ । ১৯৩১ এর আদমশুমারিতে এই প্রদেশে বাংলা ভাষাভাষী জনগণের সংখ্যায় বেশি দেখা যায় অর্থাৎ ১৮ লাখ ১০ হাজার ৮৯০ জনের মধ্যে ১২ লাখ ২২ হাজার ৮৮৯ জন বাংলা ভাষাভাষী১৯৪১এর আদমশুমারি হিসাব অনুযায়ী ২০,৩২,১৪৬ জনের মধ্যে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ২৮৪ বাংলা ভাষাভাষী অর্থাৎ ১০ বছরে বাঙালি জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ লাখ৩৪,৩৯৫ জন । বাকিদের মধ্যে সাঁওতাল হিন্দি আর কিছু আদিবাসী ভাষাভাষী মানুষ ছিলেন । তাদের মাথাব্যথার কারণ ছিল ১৯৩৬ সালে ওড়িশা পৃথক রাজ্য হলে বিহার প্রদেশের কংগ্রেস নেতাদের বড় অংশ মনে করতে থাকেন যে মানভূম ও ভাষার কারণে বিহার থেকে আলাদা হয়ে যাবে । এতে ধানবাদ বিস্তীর্ণ খনি ও শিল্পাঞ্চল হাতছাড়া হয়ে যাবে । এই পরিপ্রেক্ষিতে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের (১৮৮৪-১৯৬৩) সভাপতিত্বে মানভূম বিহারী সমিতি গঠিত হয় । হিন্দি ভাষা প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে স্কুল তৈরির কাজ শুরু হয় । তখন হিন্দি ভাষা আগ্রাসনের যে কৌশলগত অবস্থান তার প্রতিরোধ নির্মাণে পুরুলিয়ার ব্যারিস্টার দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ভাই পি আর দাসের সভাপতিত্বে  হিন্দিভাষী নেতৃবৃন্দের পাল্টা জবাব এবং বাংলা ভাষার উপর হিন্দি ভাষার আধিপত্যকে ঠেকাতে গিয়ে বাংলা ভাষা প্রচার ও প্রসার এবং স্কুল নির্মাণের জন্য গড়ে ওঠে মানভূম বাঙালি সমিতি । বিহার সরকার আদিবাসী ও জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রাথমিক স্তরের বিদ্যালয় খুলতে শুরু করলে বাঙালিরা ও বাংলা স্কুল খুলতে তৎপর হয়ে পড়েন । এই সময় সতীশচন্দ্র সিংহ রাঁচি, পালামৌ, সিংভূম, হাজারিবাগ ও মানভূম জেলা নিয়ে ছোটনাগপুর নামক এক নতুন প্রদেশ গঠন বা বাংলা সঙ্গে পুনরায় সংযুক্তির প্রস্তাব করেন । চলতে থাকে টানা পোড়েন ।  তার মুখপাত্র হিসেবে ১৯৩৫ সালে 'মানভূম বাঙালি সমিতির ' 'মুক্তি' নামে একটি পত্রিকা চালু করা হয় । রাজ্যস্তরে গঠিত হয় 'বিহার বাঙালি সমিতি' ।এভাবে চলতে থাকে বাংলা ভাষা আন্দোলন । ক্ষিতিমোহন সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানভূমবাসীর এই ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন করেন । ১৯৩৭ সালে বিহারের কংগ্রেস মন্ত্রিসভা ডোমিসাইল সার্টিফিকেট প্রথার মাধ্যমে বাংলাভাষীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিককে পরিণত করলে ভাষা আন্দোলন আরও জোরালো হয় । ভাষা আন্দোলন তখনকার মতো ভাষার জন্য লড়াই রূপে থেকে গেলেও স্বাধীনতার পরে তা জোরদার মাতৃভাষা আন্দোলনের রূপ নেয় । ১৯৩৮-এ কংগ্রেসের রঘুনাথপুর অধিবেশনে বাঙালি নেতৃত্ব মানভূমকে বঙ্গপ্রদেশে যুক্ত করার দাবি তোলে ।

৪৭ এর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে শুরু হল মানভূমের ভাষা সংক্রান্ত দ্বিতীয় আন্দোলন । দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই অখিল ভারতীয় কংগ্রেস কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ গ্রহণ করা হবে । স্বাধীনতার পরে সেই বিষয়টিকে সামনে রেখে শুরু হয় দ্বিতীয় আন্দোলন । এই অঞ্চল বাংলা ভাষাভাষী হলেও বিহারের হিন্দি আগ্রাসনের শিকার হচ্ছিলেন এই এলাকার মানুষজন । যেসব দাবিকে ঘিরে মানভূম ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধে সেগুলো হল বাংলা ভাষায় কথা বলা, বাংলা ভাষায় লেখা, স্কুল কলেজে হিন্দি ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করা ।

১৯৪৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জয়পুর অধিবেশনে ভাষানীতির উপরে আলোচনা হলেও মানভূমের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়নি । কারণ, স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারত বিভাজনের সময় বিহার প্রদেশের বাংলাভাষী অঞ্চলকে পশ্চিমবঙ্গে আনার দাবিকে জাতীয় নেতারা 'সেপারেশন মুভমেন্ট' হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন । স্বাধীনতার চারদিনের মাথায় জামশেদপুরে 'বিহার বাঙালি সমিতি'র বাৎসরিক সভা হয় । সেখানে উদ্বোধনী ভাষণে নগেন্দ্রনাথ রক্ষিত ছিন্নবিচ্ছিন্ন বাংলার বাঙালি জাতিকে তার গৌরবময় ঐতিহ্য নিয়ে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলতে সিংভূম, মানভূম, সাঁওতাল পরগনা ও ভাগলপুরের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল ও পূর্ণিয়া জেলাকে বাংলার অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান । ওই সভায় প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘোষসহ বহু ভাষাকর্মী বিহারীদের দ্বারা আক্রান্ত হন । এর সঙ্গে শুরু হয় সরকারি দমন পীড়নও । ১৯৪৮ সালে বিহার বিধানসভা হিন্দি ভাষার পক্ষে সুপারিশ করে এবং মানভূম জেলা শিক্ষা দপ্তর বিদ্যালয়গুলিতে দুটি সার্কুলার জারি করে যা কালাকানুন ছাড়া আর কিছু ছিল না বলে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বিদ্রোহ করেন । হিন্দি ভাষা বাধ্যতামূলকভাবে চালু করার লক্ষ্যে স্কুলগুলিতে হিন্দিশিক্ষা না দিলে স্কুলের অনুদান বন্ধের নোটিশ জারি হয় । আদিবাসী স্কুলগুলিকে হিন্দি স্কুলের পরিণত করতে নির্দেশ দেওয়া হয় । ৭২ টি আদিবাসী স্কুলে হিন্দি ভাষায় পঠন-পাঠন শুরু না হলে সরকারি অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে সার্কুলার পাঠানো হয় । ১৯৪৮-এ এমন ৩০০টি স্কুল পরিবর্তিত হয় । ২৩টি স্কুলের অনুমোদন বাতিল হয় । বাংলা মাধ্যমে পড়ালে শিক্ষকদের শাস্তির বিধান দেওয়া হয়। বাঙালির মানভূমে তখন থেকেই শুরু হল একরকম 'হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ' । একের পর এক বাংলা স্কুল পরিণত হল হিন্দি স্কুলে । মানভূম অঞ্চলের সমস্ত বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকে বাংলা ভাষায় পরিদর্শকদের সরিয়ে দেওয়া হয় । প্রতিটি স্কুলে হিন্দিতে স্কুলের নাম লেখা সাইনবোর্ড টাঙাতে হবে এবং রামধুন গীত বাধ্যতামূলক করা এই মর্মে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় । ১৯৪৮ থেকে মাধ্যমিক স্তরের সমস্ত বই পত্র বাংলায় ছাপা বন্ধ করে দেয় সরকারের শিক্ষা বিভাগ । আদিবাসী সাঁওতাল ছেলেমেয়েরা যাদের দ্বিতীয়ভাষা বাংলা হঠাৎ করে হিন্দিতে পড়াশোনা চালাতে ব্যর্থ হয়। এবং স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয় । মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পরীক্ষার খাতাপত্র হিন্দিতে লেখা না হলে সরকারি অনুমোদন স্থগিত বা বাতিল করে দেওয়া হতে থাকে । হিন্দিভাষী পরিদর্শকরা মানভূমের স্কুলগুলির পরিদর্শনে এসে স্কুলগুলিকে 'ভাটিখানা' এবং শিক্ষকদের 'অযোগ্য' ও 'মিথ্যাবাদী' বলে অপমান করতে থাকেন । হিন্দিতে কথা বলতেও লিখতে না পারা শিক্ষকদের তারা অশিক্ষিত বলে হেনস্থা করতেন । বিহার সরকার শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক হিন্দি শিখতে হবে এই মর্মে ফতোয়া জারি করে । পোস্ট-অফিসসহ সমস্ত সরকারি দপ্তরে হিন্দি বাধ্যতামূলক করা হল । সমস্ত আবেদন পত্র দলিল দস্তাবেজ এবং সরকারী আদেশ শুধুমাত্র হিন্দিতে লিখলেই গ্রাহ্য হবে বলে ফরমান জারি হয় । এমনকি ঘোষণা করা হয় উনিশে আগস্ট ১৯৪৮ থেকে বাংলায় লেখা জমির বা সম্পত্তির দলিল সরকারি দপ্তরের গৃহীত হবে না । মানভূমের মহকুমা শহর ধানবাদে বাংলাভাষায় কথা বলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করাও সমস্যার জনক হয়ে ওঠে । বিহারীরা বাঙালিদের মানভূমে বহিরাগত বলে অপপ্রচার চালাতে শুরু করেন । মানুষকে বিভ্রান্ত করতে তারা মানভূমের আদি ভাষা 'খোট্টা ভাষা' বলে প্রচার চালান । আদিবাসী ভূমিজ, মাহাতোদের ভাষিক পরিচয় বাংলা থেকে বের করে আনার চেষ্টাও করে বিহারী সমিতি । এর বিরুদ্ধে মানভূমের ভাষা আন্দোলন গর্জে উঠে । লক্ষ লক্ষ বাঙালি শিক্ষা ও প্রশাসনিক স্তরে তাদের মাতৃভাষা বাংলাকে স্বীকৃতির জন্য শুরু করে আন্দোলন । বিহার সরকার মানভূমে বাংলার ব্যবহার সীমিত করার জন্য কঠোর হতে শুরু করে । এক সময় পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় যে ভাষা আন্দোলনকারীরা বুঝতে পারেন কংগ্রেসের থেকে ভাষা স্বাধিকারের দাবি অর্জন করা সম্ভব নয় । ১৯৪৮ এর ৩০ শে এপ্রিল থেকে ৫ই মে মানভূম কংগ্রেসের বান্দোয়ান অধিবেশনে মানভূম সভাপতি ভাষাগত অত্যাচার নিয়ে আলোচনা করলেন, নিষ্ফল হল সে আলোচনা । অথচ কোন মন্ত্রবলে তার এক মাসের মধ্যেই পুরুলিয়ার শিল্পাশ্রমে একটি বৈঠকে 'মানভূমের ভাষা বাংলা' এই প্রস্তাব ৪৩-৫৫ ভোটে পরাস্ত হল । মূলত এই কারণে অতুলচন্দ্র ঘোষ, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, অরুণচন্দ্র ঘোষ, বিভূতিভূষণ দাশগুপ্তসহ ৩৭ জন নেতা কংগ্রেসের জেলা কমিটি থেকে পদত্যাগ করে 'লোক সেবক সংঘ' গঠন করেন । এই সংঘ বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করে । অগত্যা ব্রিটিশরা যা করেনি স্বাধীন ভারতের সরকার এই বর্ষিয়ান স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাকে গ্রেফতার করে ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের দণ্ডিত করে । তারপর চক্রান্ত করে শীতের রাত্রে খোলা ট্রাকে চাপিয়ে হাজারীবাগের জেলে পাঠায় এটা জেনেও যে, তিনি তখন প্লুরিসিতে ভুগছিলেন । ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে লড়াইয়ে ফিরে আসেন । এরপর রাষ্ট্রপতি ডাক্তার রাজেন্দ্র প্রসাদ তাকে রাজ্যপাল পদের প্রস্তাব দেন । শর্ত–যদি তিনি এই আন্দোলন পরিত্যাগ করেন । বলাবাহুল্য তিনি সে ফাঁদে পা দেন নি ।

মানভূমের ভাষা আন্দোলন প্রকৃত অর্থেই ছিল বাংলা ভাষার আন্দোলন । তার সাথে ঝাড়খণ্ডে বাংলাভাষী মানুষ যুক্ত ছিলেন সামনের সারিতে । কেননা এই আন্দোলনে লোকসংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম যে টুসু গান তার ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল  সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মাধ্যমে । বিশেষভাবে বঙ্গ সত্যাগ্রহ, কৃষক সংগ্রাম, খাদ্য সত্যাগ্রহ বা হাল জোয়াল সত্যাগ্রহের মাধ্যমে মানভূমের ভাষা আন্দোলন চলতে থাকে । যার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে টুসু গান । বিহার সরকারের অরাজকতার বিরুদ্ধে ১১ ডিসেম্বর ১৯৪৯ সালে ভাষা আন্দোলনের বীজ অঙ্কুরিত হল ছাত্র ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে । ফলস্বরূপ আন্দোলনকারীদের উপর নানারকম নিপীড়ন নির্যাতন চালানো হতে থাকে । ১৯৫৪-তে মানভূমে মাতৃভাষা অধিকার রক্ষার দাবিতে শুরু হয় 'টুসু সত্যাগ্রহ'। একমাস ধরে চলা এই সত্যাগ্রহ এক জনজাগরণের রূপ নেয় । লোকগান, লোকনৃত্যে মাতৃভাষা বাংলাকে দমন করার চক্রান্তের কথা উঠে আসে । মুখে মুখে সেই গান ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র । টুসু গান বিহার সরকারের ঘুম কেড়ে নেয় । টুসু গান গাইলে দলে দলে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করা হয় । পুলিশ একজন টুসুগায়ক ১০ বছরের অন্ধ বালক বাবুলালকে গ্রেফতার করে ভাগলপুর জেলে পাঠায় । 

মানভূম ভাষা আন্দোলনে নারীবাহিনীর ভূমিকা ছিল অপ্রতিরোধ্য । জননেত্রী লাবণ্যপ্রভা দেবীকে পুলিশ ও রাজনৈতিক গুন্ডারা চুলের মুঠি ধরে ঘর থেকে বের করে, সঙ্গে চলে অকথ্য নির্যাতন ও সম্ভ্রমহানি । শবর নেত্রী রেবতী ভট্টাচার্যকে পিটিয়ে জঙ্গলের মধ্যে মৃতপ্রায় অবস্থায় ফেলে রেখে যায় বিহারী পুলিশ । জননেত্রী ভাবিনী মাহাতোর উপর অকথ্য নির্যাতন করা হয় । এই সময় বিহারের জননিরাপত্তা আইনের ধারায় লোকসভা সংঘের কর্ণধার অতুলচন্দ্র ঘোষ, লোকসভা সদস্য ভজহরি মাহাতো, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, অরুণচন্দ্র ঘোষ, অশোক চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয় । এই সময় ভজহরি মাহাতোর লেখা– "শুন বিহারী ভাই /তোরা রাখতে লারবি ডাং দেখাই /তোরা আপন তোরে ভেদ বাড়ালি /বাংলা ভাষায় দিলি ছাই । ভাইকে ভুল্যে করলি বড় /বাংলা বিহার বুদ্ধিটাই ।।/বাঙালী বিহারী সবাই /এক ভারতের আপন তাই ।/বাঙ্গালীকে মারলি তবু /বিষ ছড়ালি হিন্দি চাই /বাংলা ভাষার দাবিতে ভাই"– মানভূমের বাংলাভাষীদের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয়েছিল । ইতোমধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করে টুসু সত্যাগ্রহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ।

এরই মধ্যে শুরু হয় সীমা কমিশনের কাজ । সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের তৎকালীন দুই মুখ্যমন্ত্রীর ( বিধানচন্দ্র রায় ও শ্রীকৃষ্ণ সিংহ ) তরফে বঙ্গবিহার যুক্ত প্রদেশ গঠন করার প্রস্তাব আসে । মানভূমবাসী বাংলা বিহার সংযুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে মিছিলে শামিল হয় । তাঁরা অনুভব করেন এই পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেলে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে । ১৯৫৬-র ২০শে এপ্রিল মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদার দাবি নিয়ে পুরুলিয়ার পুঞ্চার পাকবিড়রা থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে ৩০০ নারীসহ ১০০৫ জন ভাষা আন্দোলনকারীর দশটি দল । নারীদের বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন বাসন্তী রায় । পদযাত্রা বাঁকুড়া, বেলিয়াতোড়, সোনামুখী, পাত্রসায়র, খণ্ডঘোষ, বর্ধমান, রসুলপুর, মেমারি, পান্ডুয়া, মগরা, চুঁচুড়া, চন্দননগর, গোদোলপাড়া, শ্রীরামপুর, উত্তরপাড়া, হাওড়া পেরিয়ে ১৬ দিন পর ৬ই মে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ পায়ে পায়ে অতিক্রম করে তারা এসে পৌঁছান কলকাতায় । কন্ঠে ছিল 'বন্দেমাতরম' ধ্বনি আর 'বাংলার মাটি বাংলার জল', 'বাংলা ভাষা প্রানের ভাষা রে' ইত্যাদি গান ধলভূমকে বাংলার অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে গড়া মুক্তি পরিষদের ১৭৫ জন আন্দোলনকারী বঙ্কিমচন্দ্র চক্রবর্তী ও কিশোরী মোহন উপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ধলভূম থেকে পদযাত্রা শুরু করে ৫ই মে কলকাতা পৌঁছে হাজরা পার্কে সভা করেন । নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ীর সভাপতিত্বে ঐ সভায় সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, সাতকড়ি রায় বক্তব্য রাখেন । ডালহৌসী স্কয়ারে পা রাখতেই তাঁদের গ্রেপ্তার করে বাংলার কংগ্রেস সরকার। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরিশ্রমে অসুস্থ হয়ে পড়েন অনেকে । 

মানভূমবাসীর এই লং মার্চ ব্যর্থ হয়নি । ব্যর্থ হয়নি ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষা স্বাধিকারের লড়াই । কলকাতাতেও মানভূম ভাষা আন্দোলনের সংহতিতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে । কলকাতাবাসীর পক্ষ থেকে হেমন্ত কুমার, জ্যোতি বসু, মোহিত মৈত্র, সুরেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত বিশিষ্ট নাগরিকগণসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন । সমাবেশ যেন না হতে পারে এজন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার আগে থেকে ১৪৪ ধারা জারি করে রেখেছিল ফলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দায়ে পুলিশ ৯৬৫ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করে বন্দীদের পাঠানো হয় কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেল আলিপুর সেন্ট্রাল জেল ও আলিপুর স্পেশাল জেলে । ১২ দিন পর তারা মুক্তি পান । একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য স্থানে প্রায় ৩৩০০ আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করা হয় যারা প্রধানত লোকসেবক সংঘ অথবা বাম দলগুলোর কর্মী ছিলেন । পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে একপ্রকার বাধ্য হয়েই বাংলা-বিহার সংযুক্তির প্রস্তাব রদ করে সরকার । দ্রুত পাশ হয় "বঙ্গ বিহার ভূমি হস্তান্তর আইন" । তারপর সীমা কমিশনের রিপোর্টে সরকারি নানা স্তরের ফাঁস, ষড়যন্ত্র পেরিয়ে ১৯৫৬ সালের মানভূমকে তিন টুকরো করে বাংলা অধ্যুসিত ১৬ টি থানা অঞ্চল জুড়ে জন্ম নেয় পুরুলিয়া জেলা । অন্তর্ভুক্ত হল পশ্চিমবঙ্গের । দিনটা ছিল ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর । সীমা কমিশনের রিপোর্ট লোকসভা হয়ে সিলেক্ট কমিটির ও আরো নানা স্তর পেরিয়ে ২৪০৭ বর্গমাইল এলাকার ১১ লক্ষ ৬৯ হাজার ৯৭ জন মানুষকে নিয়ে জন্ম নেয় আজকের পুরুলিয়া । সম্পূর্ণ ধানবাদ মহাকুমা বিহার রাজ্যে রয়ে যায় । মানভূমবাসীরা কয়েক দশক পরে আবার অন্তর্ভুক্ত হন পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলায় । বাংলা ভাষায় কথা বলা, ভাব প্রকাশ, শিক্ষালাভ, এককথায় বৃহত্তর জীবনচর্চার ভাষিক অধিকার পেলেন মানভূমবাসী । টুসু গান নিয়ে আবারো আনন্দে মাতোয়ারা হলেন তাঁরা । এ যেন মানভূমের স্বাধীনতা দিবস ।

আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ে লাখ লাখ মানুষকে নানা প্রকার অন্যায় অবিচার বঞ্চনা অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে জেল জুলুম আর পুলিশি নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে । মানভূমের ভাষা আন্দোলন মানভূমবাসীর জন্য যেমন গৌরবের বিষয় তেমনি সারা পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী মানুষও এই গৌরবের অংশীদার । সময়ের মাপকাঠিতে ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন মানভূমের মাতৃভাষা অধিকার আন্দোলন । টুসু গায়কদের সেই ভাষা আন্দোলন আজ জনমানসে বিস্মৃতপ্রায় হলেও ইতিহাসের দলিলে তা উজ্জ্বল হয়ে আছে । সময়ের বিবর্তনে মানভূমের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস মোটামুটি সাধারণের জানার বাইরে চলে গেছে । বাংলাদেশ তো দূরে থাক, পুরুলিয়ার বাইরে খোদ পশ্চিমবঙ্গেও সরকারি বা বেসরকারিভাবে মানভূমের ভাষা আন্দোলন নিয়ে বার্ষিক কোনো অনুষ্ঠান বা আলোচনা হয় না । পুরুলিয়ার সিধো -কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে মানভূমের ভাষা আন্দোলন অন্তর্ভুক্ত হলেও সেটা গোটা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষায়তন গুলির পাঠ্য পুস্তকের স্থান পায়নি । অতুলচন্দ্র ঘোষ, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, অরুণচন্দ্র ঘোষ, বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত, ভজহরি মাহাতো, ভাবিনি মাহাতোদের মতো শত শত ভাষা সৈনিক তাদের প্রাপ্য মর্যাদা পাননি । পরবর্তীকালে যে ভাষা আন্দোলনসমূহ সংঘটিত হয়েছে তার বীজ এই মানভূম ভাষা আন্দোলনের মধ্যে নিহিত ছিল । মানভূম ভাষা অধিকার সংগ্রামের এক আলোক উজ্জ্বল নাম । জানিনা পৃথিবীতে আর কোন ভাষার জন্য এমন বারবার নানা জায়গায় নানা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়তে হয়েছে কিনা । আজ যখন এক ভিন্ন বাস্তবতায় নিজেদের ঘরে ও বাইরে কোনঠাসা হচ্ছে বাংলা ভাষা তখন এই আন্দোলন আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তার দৃঢ় সংগ্রাম মানসিকতার কথা নতুন প্রজন্মের কাছে । ঐতিহাসিক মানভূম ভাষা আন্দোলনের কথা প্রচার করতে হবে বাঙালি ভাষার জন্য প্রাণ দিতে পারে বাংলা ভাষা বড় প্রিয় আমাদের বাংলা ভাষা বাঁচাতে ও বাঙালির অধিকার আদায় করতে মানভূম ভাষা আন্দোলনের কথা বারবার স্মরণ করতে হবে ।

Monday, February 16, 2026

শিক্ষাক্ষেত্রে ও সাংবাদিকতায় গণমাধ্যম সাক্ষরতা

শিক্ষাক্ষেত্রে ও সাংবাদিকতায় গণমাধ্যম সাক্ষরতা 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

বাংলা মাধ্যম শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ মিডিয়াম (medium) । গণমাধ্যম শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ মাস মিডিয়া (mass media) ।  অধিকাংশ ক্ষেত্রে বর্তমানে  গণমাধ্যম বোঝাতে মাস মিডিয়ার (mass media) পরিবর্তে মিডিয়া (media) শব্দটি ব্যবহার করা হয় । গণমাধ্যমের আধুনিক ক্রমোন্নয়নের ফলে এখন তথ্য আমাদের মুঠোবন্দী । বিশেষ করে প্রযুক্তিক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবস্থা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংযুক্তির ফলে শিল্পক্ষেত্রে চতুর্থ বিপ্লব ঘটে গেছে । এখন প্রযুক্তি যার সংবাদমাধ্যম তার ।  ইন্টারনেট প্রযুক্তি তথ্যের ক্ষেত্রে মানুষের প্রবেশযোগ্যতা (access) অনেক গুণ বেড়ে গেছে । তথ্যে প্রবেশযোগ্যতার সঙ্গে সঙ্গে বার্তা তৈরির ক্ষেত্রেও মানুষ নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে । ফলে নির্ভরযোগ্য বার তার পাশাপাশি অনির্ভর বা ভুয়া বার্তাও ছড়িয়ে পড়ছে । এছাড়া গণমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ ও নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে তথ্যের সম্প্রচারে প্রভাব বিস্তার করছে । যার কারনে সঠিক তথ্য যাচাই-বাছাই করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে । প্রতিদিন গণমাধ্যমের কারিগরি কুশলতা বেড়েই চলেছে ।  তার সাথে পাল্লা দিতে গেলে গণমাধ্যম কর্মীকেও কুশলতা অর্জন করতে হবে । এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলকে এবং জনসাধারণকে সক্রিয় করে তোলার লক্ষ্যে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতার প্রয়োজন ।

গণমাধ্যম সাক্ষরতা (Media Literacy) হল বিভিন্ন গণমাধ্যমের বার্তা প্রবেশগম্যতা (access), বিশ্লেষণ (analysis), মূল্যায়ন (evauation) ও সৃজন (creation) এর মাধ্যমে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার একটি দক্ষতা, যা কেবল পঠন-পাঠনের বাইরে গিয়ে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়ার প্রভাব, উদ্দেশ্য ও কাঠামো বোঝার মাধ্যমে ডিজিটাল সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে সাহায্য করে । এর মূল লক্ষ্য হল ভুল তথ্য সনাক্তকরণ এবং দায়িত্বশীলভাবে মিডিয়া ব্যবহার ও তৈরি করতে পারা । এটি প্রচলিত সাক্ষরতার ধারণাকে প্রসারিত করে, যেখানে কেবল পাঠ ও লেখার ক্ষমতা নয় বরং বিভিন্ন ফরমেট এর (টেক্সট, অডিও ভিস্যুয়াল) বার্তা বোঝা ও তৈরি করার ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত । গণমাধ্যম কিভাবে কাজ করে এর অন্তর্নিহিত বার্তা কি এবং কিভাবে পক্ষপাতগ্রস্থ ও ভুল তথ্য প্রচার করা হয় তা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তৈরি করা এর অন্যতম প্রধান দিক । এটি কেবল দর্শক হিসেবে মিডিয়া গ্রহণ নয় বরং একটি সক্রিয় অবস্থানে থেকে মিডিয়া ব্যবহার ও নিজস্ব বার্তা তৈরি করার প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করে । এটি সংবাদপত্র, চলচ্চিত্র, সোশ্যাল মিডিয়া, স্ট্রিমিং সার্ভিসসহ সকল ধরনের মিডিয়ার (প্রিন্ট, ডিজিটাল, তারবিহীন) জ্ঞান প্রদান করে । ডিজিটাল পরিবেশে নিজেকে রক্ষা করতে এবং সুস্থভাবে যুক্ত থাকতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সচেতনতা প্রদান করে । গণমাধ্যম সাক্ষরতার মূল উপাদান হল বিভিন্ন গণমাধ্যম ও তার আধেয়(content) খুঁজে বের করার ক্ষমতা অর্জন এবং সেখানে প্রবেশগম্যতা (access), বার্তা গঠন, উদ্দেশ্য ও প্রভাব বিশ্লেষণ (analysis) করা সেইসঙ্গে বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভুলতা যাচাই করা পক্ষপাত সনাক্ত করা ও মূল্যায়ন (evaluation) এবং কার্যকর ভাবে বার্তা তৈরি ও প্রকাশ করা(creation) । গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা হল ডিজিটাল বিশ্বের একজন সচেতন, সমালোচনামূলক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার একটি অপরিহার্য দক্ষতা ।

উদ্দেশ্যমূলক, পক্ষপাতমূলক, ভ্রান্ত তথ্য সাধারণের আচরণ পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় অথবা প্রচার করা হয় । রাজনৈতিক নেতা, ধর্মপ্রচারক, নিম্নমানের বাভেজাল প্রোডাক্ট বিক্রেতা কিংবা ভিন্ন আদর্শের প্রচারক বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে প্রচারণা (Propaganda) করে থাকে । এই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাকে সাধারণ মানুষ গভীরভাবে ভেবে দেখেন না । ডিজিটাল বিশ্বের ভুয়া খবর ও ভুল তথ্য সনাক্ত করা অপরিহার্য । কারণ ভুয়া খবরও ভুল তথ্যের প্রভাব সুদূরপ্রসারী, যা সমাজে বিভ্রান্তি,  অবিশ্বাস, মেরুকরণ এমনকি সহিংসতার সৃষ্টি করে । এটি গণতন্ত্রের ক্ষতি করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে ভোটারকে বিভ্রান্ত করে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ায় যা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর আস্থা হীনতা তৈরি করে । ভুল তথ্য সমাজে বিভেদ সন্দেহ ও শত্রুতা বাড়াতে পারে যা দাঙ্গা বা সংঘাতের ইন্ধন যোগায় । ভুল তথ্যের প্রভাবে বিরক্ত মানুষ মূলধারার সংবাদমাধ্যমকেও অবিশ্বাস করতে শুরু করে কারণ ভুয়া খবর প্রায়শই যাচাই না করে প্রচার করা হয় । ভুয়া খবর ও ভুল তথ্য মানুষের স্মৃতিকে বিকৃত করে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে ভুলপথে চালিত করে । শিশু ও তরুণদের মধ্যে ভুল তথ্য উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং বিভ্রান্তি তৈরি করে মানসিক বিকাশ ও তাদের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যা তাদের মধ্যে উদ্যোগ ও ভুল বিশ্বাস তৈরি করতে পারে । এর ফলে মানুষের বিদ্যমান বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে এবং তাদের (biases) বা পক্ষপাতিত্বকে উসকে দেয় যা সমাজকেও বিভ্রান্ত করে তোলে । ভুল তথ্যের কারণে মানুষ স্ক্যামের শিকার হতে পারে । যার ফলে আর্থিক ক্ষতি বা ডেটা চুরির মত ঘটনা ঘটে । ভুল স্বাস্থ্যতথ্য বা 'লাইফ হ্যাকস' অনুসরণ করে বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ বা ভুল চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে ।

গণমাধ্যম সাক্ষরতা সাংবাদিকদের সঠিক, নিরপেক্ষ ও নৈতিক সাংবাদিকতা করতে এবং সাধারণ মানুষকে ভুল তথ্য থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে । সাংবাদিকতা গণমাধ্যম সাক্ষরতার ভিত্তি স্থাপন করে, জনগণকে তথ্য সরবরাহ করে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করে । তাই এই দুটিকে একে অপরের পরিপূরক এবং একটি সচেতন সমাজ গঠনে দুটি অপরিহার্য । সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে জনগণের মধ্যে সঠিক জনমত গঠনের সাহায্য করেন, যা গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য । সরকার ও তার ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য প্রকাশ করে সাংবাদিকরা জবাবদিহিতা নিশ্চিন্ত করেন এবং সমাজের সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন । গণমাধ্যম সাক্ষরতা বাড়াতে সাংবাদিকরা নিজেরাই সহায়ক ভূমিকা পালন করেন । তারা তথ্যের উৎস যাচাই করার কৌশল দেখান এবং ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করেন । সংকটকালে সাংবাদিকতা জাতির বিবেক হিসেবে কাজ করে এবং জনগণের সম্মিলিত কন্ঠস্বর তুলে ধরে । গণমাধ্যম সাক্ষরতা যেমন সাংবাদিকদের উন্নত ও দায়িত্বশীল হতে সাহায্য করে তেমনি সাংবাদিকরাও সাক্ষরতা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন । গণমাধ্যম সাক্ষরতা ও সাংবাদিকতা উভয়ে একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য । কারণ এটি একটি সুস্থ ও সচেতন নাগরিক সমাজ তৈরি করে । 

গণমাধ্যম সাক্ষরতাকে বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে তার সামনে অনেকগুলি চ্যালেঞ্জও এসে দাঁড়ায় । তার মধ্যে হল ভুল তথ্যের বিস্তার অর্থাৎ ভুয়া খবর, প্রোপাগান্ডা এবং ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়াএকটি বড় সমস্যা যা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে । সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম কিভাবে তথ্য ফিল্টার করে এবং ব্যবহারকারীর কাছে উপস্থাপন করে তা বোঝা কঠিন । ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি (cyber harassment), ডিজিটাল সহিংসতা(cyber bulling), অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন (cyber intimidation), অনলাইন ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ সংগঠিত করা (cyber terrorism), অনলাইন ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ (cyber stalking) ইত্যাদির শিকার হওয়া এবং এর প্রতিরোধে অক্ষমতা, প্রযুক্তি ও তথ্যে সবার সমান প্রবেশাধিকার না থাকা যা সাক্ষরতার সুযোগকে সীমিত করে, নতুন নতুন অ্যাপ, সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল টুলস এর সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য ক্রমাগত শেখার সীমিত সুযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং অনলাইন পরিচিতি (Digital Identity) রক্ষা করা বিষয়ে জ্ঞানের অভাব, শিক্ষক গণমাধ্যম কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রমের অভাব, তথ্যের ভিড়ে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য তা বেছে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, অতিরিক্ত মিডিয়ার ব্যবহার এবং এর নেতিবাচক মানসিক প্রভাব আসক্তি ও ভুল ধারণার সৃষ্টি করে ।

শিক্ষাক্ষেত্রে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে গণমাধ্যম ব্যবহার সম্বন্ধে সচেতন ও অভিজ্ঞ করে তোলা যায় । স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে গণমাধ্যম সাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যেখানে বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন এবং বার্তা তৈরির দক্ষতা শেখানো হবে । শিক্ষকদের গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যাতে তাঁরা শিক্ষার্থীদের কার্যকর ভাবে শেখাতে পারেন । শেখানোর পদ্ধতি ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শিক্ষাদান পদ্ধতি (যেমন দলগত কাজ আলোচনা ইত্যাদি) গ্রহণ করা যেতে পারে । শিক্ষার্থীদের যদি গণমাধ্যম সাক্ষরতা জ্ঞান দেওয়া হয় তাহলে তারা গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা বৃদ্ধি করে তাদের তথ্যসমৃদ্ধ ডিজিটাল সমাজে অংশগ্রহণ করতে সমৃদ্ধ করে এবং নিজস্ব সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করে সচেতন ও সক্রিয় পাঠক ও নির্মাতা (creator) হিসেবে গড়ে তোলে । শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের গণমাধ্যম বার্তা সংবাদ বিজ্ঞাপন সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে শেখাবেন বার্তার উদ্দেশ্য পক্ষপাতিত্ব এবং বার্তা কিভাবে তৈরি হয়েছে তা বুঝতে সাহায্য করবেন এবং স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারিং সিস্টেমের ব্যবহারে উৎসাহিত করবেন । নিজের মিডিয়া পছন্দ নিয়ে চিন্তা করতে এবং স্পন্সর করা বিষয়বস্তু (sponsored content) চিহ্নিত করতে শেখাবেন । গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো স্বচ্ছ করার দাবি জানানো যাতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে সে বিষয়ে শিক্ষা দান করবেন । শিক্ষার্থীদের কেবল ভোক্তা নয় বরং দায়িত্বশীল নির্মাতা হিসেবে গড়ে তোলা যাতে তারা নিজেরাই মানসম্মত মিডিয়া কন্টেন্ট তৈরি করতে পারে । গণমাধ্যম বার্তা থেকে নিজস্ব অর্থ বের করে আনার এবং দায়িত্বশীলভাবে অংশগ্রহণের দক্ষতা বৃদ্ধি করা শেখানোও শিক্ষকের দায়িত্ব ।

গণমাধ্যম সাক্ষরতা শিক্ষার্থীদের শেখায় কিভাবে সংবাদ বিজ্ঞাপন বা সোশ্যাল মিডিয়ার বার্তাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়, তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে হয় এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হয়, যা তাদের ভুল তথ্য থেকে রক্ষা করে । গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা শিক্ষার্থীদের গণমাধ্যম বার্তাগুলোর অন্তর্নিহিত পক্ষপাতিত্ব ও এজেন্ডা বুঝতে সাহায্য করে । তাদের প্রশ্ন করতে এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো বিবেচনা করতে উৎসাহিত করে । সাক্ষরতা শুধু নয় এই শিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে বার্তা তৈরির দক্ষতাও শেখায় । যার ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের চিন্তাভাবনা ও ধারণাগুলো কার্যকর ভাবে প্রকাশ করতে পারে এবং নিজস্ব মিডিয়া সামগ্রী তৈরি করতে পারে (যেমন ভিডিও ব্লগ বডকাস্ট পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন ইত্যাদি) । আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্য অনুসন্ধান, সৃষ্টি, যোগাযোগ এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে । সংবাদপত্র, টেলিভিশন ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি গণমাধ্যম শিক্ষার পরিধি বাড়িয়ে শিক্ষার প্রসারে সহায়তা করতে পারে । বিশেষ করে দূরবর্তী ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষের কাছে জ্ঞান পৌঁছে দিতে এই মাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । গণমাধ্যম সাক্ষরতা শিক্ষার্থীদের সমাজের বিভিন্ন সমস্যা  ও অসংগতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে এবং তাদের ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করে । গণমাধ্যম সাক্ষরতা শিক্ষার্থীদের কেবল তথ্যের ভোক্তা নয় বরং তথ্য যাচাইকারী, সমালোচনাকারী এবং সৃজনশীল উৎপাদক হিসেবে প্রস্তুত করে তোলে যা তাদের আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অপরিহার্য ।

শিক্ষাক্ষেত্রে ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে গণমাধ্যম স্বাক্ষরতার বিস্তার ঘটালে দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে মানুষ প্রযুক্তি ও প্লাটফর্মের সঙ্গে তাল মেলাতে, নানারকম ডিজিটাল প্রতিবন্ধকতা ও হয়রানি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত  রাখতে পারবে । পাশাপাশি গণমাধ্যম সম্বন্ধে কৌতুহলের ও নিবৃত্তি ঘটবে । সেইহঙ্গে গণমাধ্যমে কাজ করার দক্ষতা দ্রুত আয়ত্বে আসবে ও বিভিন্ন বিষয়কে অত্যাধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করতে পারবে । ফলে ডিজিটাল সমাজে আরও সচেতন, সমালোচনামূলক এবং সক্রিয় নাগরিক হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারবে ।

সহায়ক গ্রন্থ :

১. জার্নালিজমের সহজ পাঠ–কৌশিক ভট্টাচার্য, পারুল প্রকাশনী, আগরতলা ।
২. সংবাদ সাংবাদিক সাংবাদিকতা–সুজিত রায়, দে পাবলিকেশন, কলকাতা 
৩. সংবাদ ও সাংবাদিকতা–অনুপম অধিকারী, পাত্র বুক হাউজ, কলকাতা 
৪. সাংবাদিকতা ও সংবাদ পাঠ–সন্তোষ দেবনাথ, দীপ প্রকাশন, কলকাতা 
৫. গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা সহজপাঠ–শুভ কর্মকার, পিআইবি, বাংলাদেশ 
     ৬.  ইন্টারনেট থেকে নেওয়া তথ্য