Monday, March 30, 2026

লোকজীবন ও সাহিত্যে মাতৃ ভাবনা থেকে দেশ ভাবনা : জাতীয়তাবাদের উত্তরণ বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম

লোকজীবন ও সাহিত্যে মাতৃভাবনা থেকে দেশভাবনা : জাতীয়তাবাদের উত্তরণ বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দেমাতরম'

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

মানবসভ্যতার সৃষ্টিকাল থেকেই মাতৃকামূর্তি জীবনধারিনী, উর্বরতাকৃষ্টি ও পৃথিবীর প্রতীক হিসেবে মনুষ্য সমাজে মান্য হয়ে আসছেন । সেজন্যই প্রাচীন বিশ্বে মাতৃকা বা Mother Goddess এর মূর্তি মানবধর্ম ও সংস্কৃতির প্রধানতম প্রতীকগুলির অন্যতম । প্রাচীন প্রস্তরযুগ থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশে মাতৃকা আরাধনার প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায় । প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বিভিন্ন স্থানে মাটির বা পাথরের নারীমূর্তি পাওয়া গেছে । এই মূর্তিগুলি উর্বরতা ও মাতৃত্বের ভাবনা নির্দেশ করে । প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করেন, এগুলি গ্রামদেবী, ভূমিদেবী বা প্রাকশাক্ত আরাধনার আগের রূপ । তারপর পরবর্তীতে হরপ্পা সভ্যতায় শস্য উৎপাদনকারী পৃথিবীমাতার মূর্তি থেকে 'সপ্তমাতৃকা' ও ও 'মহিষাসুরমর্দিনী' দুর্গার মত দেবীরূপ ধারণ করে বিবর্তিত হতে দেখা গেছে । বৈদিক যুগে ঊষা, অদিতি, বিশ্বমাতা ও পরবর্তী যুগের ষোড়শ মাতৃকা, দুর্গা, অম্বা, প্রতিমাদেবী মাতৃকা সংস্কৃতির বিকশিত রূপ । আবার লোকায়ত দেবীরূপে গ্রামদেবী, শীতলা, মনসা এসবেতেই প্রাচীন মাতৃকাচিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে । পরবর্তীকালে যা হিন্দু ধর্মের শাক্ত ধারায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে ।

লোকসংস্কৃতি হল সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি । আদিম মানুষের জীবন, বিশ্বাস, আচার-আচরণ, শিল্পকলা ও বিনোদন থেকে সৃষ্ট সংস্কৃতি যা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতিনীতি, জীবনযাপন প্রণালী তাদের মুখে মুখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ে এবং লোকজীবনকে প্রতিফলিত করে । মাতৃভাবনা বা মাতৃতান্ত্রিকতা হল এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা যেখানে নারী বা মাতাকে কেন্দ্র করে সমাজ পরিচালিত হয় । লোকসংস্কৃতির নানা উপাদানে, যেমন লোকগীতি, লোককথা, প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা, মিথ,নাটক, গান, নৃত্য এবং প্রথাগত বিশ্বাসে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয় মাতৃভাবনা । লোকসংস্কৃতি ও মাতৃভাবনা পরস্পর গভীরভাবে সম্পৃক্ত । প্রাচীন সমাজে নারীর ভূমিকা প্রধান ছিল বলে তাকে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বলা হত । নারীর সামাজিক ভূমিকা, প্রজনন, খাদ্য সংগ্রহ, গৃহরক্ষা প্রভৃতি মাতৃতান্ত্রিক ধারণা সৃষ্টির দরুণ মাতৃভাবনা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে । তাছাড়া কৃষিনির্ভর সভ্যতায় পৃথিবীকে 'মা'-রূপে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও সমাজে মাতৃভাবনার সৃষ্টি হয়েছে । লোকজীবন  তো মাটিতে ঘিরেই কৃষিজ পণ্য উৎপাদনের  মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে । তাই লোকজীবনে মাটির প্রতি এক গভীর মায়া এবং মাটিকে মায়ের মত মনে করা হয়েছে । সেই থেকে সৃষ্ট মাতৃভাবনা মানুষের আদিচেতনা । লোকসঙ্গীতে দেখি–'মোর মা বলে, ধান রে সোনার ধান /তোর গন্ধে ভরা মন প্রাণ ।' লোকসংস্কৃতিতে মা মানে যিনি দুধ দেন, যিনি ফসল ফলান, যিনি নদীর জলে আশীর্বাদ দেন, আর যিনি বিপদে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখেন । গ্রাম বাংলার লোকজীবনে মা শুধু সংসারের নয়, প্রকৃতিরও প্রতিমূর্তি । তিনি ধানের দেবী লক্ষ্মী, পৃথিবীমাতা বা বসুমাতা, নদীমাতা, গঙ্গামাতা ও গোমাতা । এসব নিয়েই বাংলার লোকবিশ্বাস । মাতৃরূপে পুজিতা লোকমাতা ।

বাঙালির লোকজীবনে প্রবাহিত মাতৃকাকৃষ্টি বা মাতৃভাবনা বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন পর্যায়েও তার স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে । বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ । চর্যাপদের কবিতায় সরাসরি মাতৃভাবনার রূপ তেমন দেখা যায় না । কারণ এর মূল বিষয়বস্তু ছিল বৌদ্ধধর্মের আধ্যাত্মিক সাধনা ও গুহ্যতত্ত্ব । তবে চর্যার কিছু কিছু পদে পরোক্ষভাবে নারী ও জননীর প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়, যা সাধনা ও জীবনযাত্রা সম্পর্কিত । এখানে নারীরূপকে সাধনার প্রতিমূর্তি বা 'মাতৃআজ্ঞা' বা মাতৃধারণার মাধ্যমে সন্তান-জননী সম্পর্কে সাধনসঙ্গিনী হিসেবে ভক্তি-শ্রদ্ধার ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়েছে । এখানে জ্ঞানমুদ্রা অর্থে 'হরিণী' বা শবরী অর্থে 'দেবী নৈরাত্মাকে' বোঝানো হয়েছে । জীবন ও জীবিকার নানা ক্ষেত্রে নারীসত্ত্বা দৃঢ়তা, কর্তৃত্ববোধ, স্বাধীন চিন্তা ও মননের পরিচয় বহন করে । মেয়েরা এখানে প্রান্তিক সমাজের জনজীবন ও চেতনার অংশ । ২০ নং চর্যায় কুক্কুরীপাদ নারীর প্রসব যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করেছেন । প্রসবের সময় সন্তানের প্রাণ বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনায় মাতৃহৃদয়ের যন্ত্রণার ছবি এখানে ফুটে উঠেছে । 'পহিল বিয়াণ মোর বাসনয়ুড়া/ নাড়ি বিআরন্তে  সেব বায়ুড়া ।।/ জান জৌবন মোর ভইলেসি পুরা / মূল নখলি বাপ সংঘারা ।।/ ভনথি কুক্কুরীপা এ ভব থিরা ।/ জো এথু বুঝই সো হেথু বীরা ।। (চর্যা-২০)

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মাতৃভাবনার দৃষ্টান্ত মূলত, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি ও শাক্ত পদাবলিতে পাওয়া যায় । মনসামঙ্গলের দেবী মনসা ও বেহুলাকে নিয়ে মা-মায়ের সম্পর্ক, অন্নদামঙ্গলে দেবী অন্নপূর্ণা ও উমাকে কেন্দ্র করে মাতৃস্নেহ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও অন্যান্য পদাবলীতে যশোদা ও শ্রীরাধার মতো মাতৃপ্রতিম চরিত্রগুলির মাধ্যমে স্নেহ, মমতা ও ত্যাগের আদর্শ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যা তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক চিত্র তুলে ধরে । বৃন্দাবনদাসের চৈতন্য ভাগবত ও লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গলে শচীমাতার মাতৃত্ব, বাৎসল্য ও ত্যাগ বৈষ্ণব সাহিত্যে মাতৃ ভাবনার এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত । শচীমায়ের পুত্রকে নিয়ে উদ্বেগ, স্নেহ ও ভক্তি এখানে অতুলনীয় । কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতে শচীমাতা ও অন্যান্য মায়ের বর্ণনা বিশেষত পুত্র-মাতৃ সম্পর্ক ও ভক্তি প্রেমের ধারায় মাতৃভাবনার গভীরতা ফুটে উঠেছে ।

শাক্ত পদাবলীতে মাতৃভাবনা বলতে মূলত জগজ্জননী (দেবী দুর্গা) ও তাঁর লীলারূপের বর্ণনাকে বোঝানো হয়েছে । সেখানে মাকে একদিকে যেমন সর্বশক্তিমান ব্রহ্মময়ীরূপে দেখা যায় তেমনি বাৎসল্যরসের মাধ্যমে এক সাধারণ মাতৃস্নেহের প্রতিমূর্তি (যেমন মেনকা, উমা ) রূপেও চিত্রিত করা হয় ।  আগমনী ও বিজয়া পদের মূল বিষয়ও তাই যেখানে ভক্তের আকুতি, জগত ও জীবনের দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রার্থনা মিশে আছে । শক্তিসাধনা থেকে দেশপ্রেম ও শাক্তসাহিত্যের বিবর্তনের ধারাটিতে দেখা যায়, কিভাবে মাতৃশক্তির উপাসনা (শক্তি) থেকে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটেছে ।  রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের মত সাধক কবিগণ শ্যামাসঙ্গীত ও শাক্ত পদাবলির মাধ্যমে এই মাতৃভাবনাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যেখানে গীতার বর্ণিত জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির দর্শন ও সামাজিক চেতনার সমন্বয় ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তি স্থাপন করে । 'মা' বা 'মাতৃকা' ধারণার গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা শুধু দেবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাতৃভূমির ধারণায় প্রসারিত হয়েছে । শাক্ত পদাবলীর 'মা' বা 'মাতৃদেবী' (যেমন কালি বা দুর্গা)-র রূপটি ধীরে ধীরে দেশের প্রতীক হয়ে ওঠে । দেবীর পূজা ও সাধনা দেশের পূজা ও দেশপ্রেমের রূপ নেয় । শাক্তসাহিত্য ও শক্তিসাধনার এই লোকায়ত ধারা উনিশ শতকের নবজাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে যেখানে দেশমাতার পূজার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ জাগ্রত হয়ে দেশপ্রেমের গভীর চেতনায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং বাংলাসাহিত্য ও জাতীয়তাবাদের এক অবিচ্ছেদ অংশ হয়ে উঠেছে।

উনিশ শতকের নবজাগরণে সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে দেশপ্রেম ছিল এক প্রধান ধারা, যা ভারতীয় সমাজকে আত্মমর্যাদা ও জাতীয় চেতনার পথে চালিত করে । বাংলা কবিগান ও নবনাট্য আন্দোলন বিশেষত স্বদেশী যুগ থেকে দেশমাতৃকার বন্দনা বা দেশাত্মবোধক গান ও নাটকের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামকে তীব্রতা দিয়েছিল । কবিগান ছিল গ্রামীণ ও লোকায়ত ধারার গান । এই গানের মাধ্যমে দেশপ্রেমের বার্তা সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা হত । এই ধারায় দেশমাতৃকাকে মা-রূপে কল্পনা করে তার বন্দনার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হত । কবিগানে 'মালসি গান' নামে এক বিশেষ বন্দনাগীতি পরিবেশন করা হত যার মাধ্যমে দেশমাতৃকাকে বন্দনার পাশাপাশি তার শৃংখলমুক্তির বার্তাটিও নিহিত থাকত । বাংলার নবনাট্য আন্দোলন স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার ঘটায় । নাটকের মাধ্যমে দেশমাতৃকার বন্দনা, শোষণ ও বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা হত । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রমেশ চন্দ্র দত্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ  সাহিত্যিকগণ তাঁদের লেখায় স্বদেশ, স্বজাতীয় ভাষার প্রতি অনুরাগ ফুটিয়ে তোলেন । প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে এক নতুন জাতীয়তাবাদী ভাবধারা তৈরি করে এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিক আন্দোলনকে উদ্বুদ্ধ করে । রামমোহন থেকে শুরু করে পরবর্তী লেখকরা ভারতের ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতিকে নতুন আলোয় দেখতে শুরু করেন যা ছিল আত্মপরিচয়ের সন্ধান । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দের মতো ব্যক্তিত্বরা সমাজ সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশের মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করেন তেমনি ধর্মীয় ও সামাজিক গোড়ামি দূর করে সামগ্রিক উন্নয়নের পথ দেখান যা পরোক্ষভাবে দেশপ্রেমের জন্ম দেয় ।শিবাজী, রানা প্রতাপ এর মত ঐতিহাসিক চরিত্রদের নিয়ে রচনায় দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা যোগানো হয় । চিত্রকলায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা গানে রজনীকান্ত সেনের মতো শিল্পীদের কাজও দেশীয় ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলে দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটানো হয় । বাংলাভাষাকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়কে দৃঢ় করা হয় । বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরানীর মতো উপন্যাস কেবল সাহিত্য হয়ে থাকেনি । এগুলি লক্ষ লক্ষ ভারতবাসীকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছিল এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আদর্শগত ভিত্তি স্থাপন করেছিল ।

উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন একজন বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব যাকে জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু পুনর্জাগরণের বা নবজাগরণের অন্যতম দূত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় । তাঁর লেখনীতে ধর্ম ও জাতীয়তাবোধ ছিল দেশপ্রেম ও শক্তিসাধনার এক অনন্য মিশ্রণ ।  জাতীয়তাবাদ শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন নয় । তাকে ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তির উপর তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তিনি দেশকে মাতৃভূমিরূপে কল্পনা করে 'বন্দেমাতরম' স্লোগানকে জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন । তাঁর আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরানী উপন্যাসের মাধ্যমে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে স্বদেশপ্রেমের ধারণার উন্মেষ ঘটে এবং তা পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে । বঙ্কিমচন্দ্র দেশকে শুধু একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড হিসেবে দেখেননি । তাঁর আনন্দমঠে মাতৃভূমি দেবীরূপে পূজিত হয়েছেন । এখানে দেশকে এক জীবন্ত দেবী 'মা' রূপে ব্যক্ত করা হয়েছে । আর সন্ন্যাসীগণ হলেন তাঁর সন্তান। সন্তানের কাছে যেমন মা দেবীরূপে পূজ্য তেমনি সন্ন্যাসী বিদ্রোহে ব্রতী বিদ্রোহীদের কাছে দেশমাতৃকাও সমান পূজ্য । এই উপন্যাসের ভবানন্দের কথায় আমরা পাই,–
       'আমরা অন্য মা মানি না–জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী । আমরা বলি জন্মভূমিই জননী । আমাদের মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, বন্ধু নাই,– স্ত্রী নাই, পুত্র নাই, ঘর নাই, বাড়ী নাই, আমাদের কাছে আছে কেবল সেই সুজলা, সুফলা, মলয়জসমীরণশীতলা, শস্য শ্যামলা ।'
–এই ধারণাই 'বন্দেমাতরম' এর মূল ভিত্তি যা দেশকে পূজা করার ডাক দেয় । ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ও সামরিক রূপের বিপরীতে বঙ্কিমের জাতীয়তাবাদ ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার গভীরে প্রোথিত । তিনি মাতৃভূমির পূজা করার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয়চেতনার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমকে একীভূত করেছেন । তিনি অনুশীলন সমিতির মতো সংগঠনকে প্রভাবিত করে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং রজোগুণ-র অনুশীলনের মাধ্যমে জাতিকে শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আহ্বান জানান । 'আনন্দমঠ' উপন্যাস ও 'বন্দেমাতরম' সংগীত ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে তাঁর সবচেয়ে বড়ো অবদান । সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে লেখা এই উপন্যাস আনন্দমঠে বঙ্কিমচন্দ্র দেশপ্রেম ও ধর্মকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন । ফলে দেশপ্রেম এক আধ্যাত্মিক ভিত্তি ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় । 'বন্দেমাতরম' কেবল একটি স্লোগান ছিল না । এটি ছিল একটি মন্ত্র যা দেশবাসীকে মাতৃভূমির প্রতি ভক্তি ও দেশপ্রেমের এক নতুন চেতনায় দীক্ষিত করে এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবীদের প্রেরণা জুগিয়েছিল । এই গানটি একটি কবিতামাত্র নয় । এটি ভারতমাতার স্বরূপ বর্ণনার মাধ্যমে দেশকে মা দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী ও অন্যান্য দেবীর রূপক দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে যা ভারতের সমৃদ্ধি সৌন্দর্য ও শক্তির প্রতীক । দেশমাতৃকার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে মায়ের বিভিন্ন রূপের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে । 

বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে তাঁর অমর সৃষ্টি যে 'বন্দেমাতরম' ধ্বনিত হয়েছিল তা ছিল দেশ মাতৃকার প্রতি গভীর ভক্তি ও জাতীয়তাবাদী চেতনার এক মহামন্ত্র । বন্দে মাতরম স্তোত্র আজও প্রতিটি দেশবাসীর হৃদয়ে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের স্পৃহা জাগিয়ে তোলে । এই মহামন্ত্র ভারতের সকল মানুষের মধ্যে জাতীয় গর্ব ও ঐক্যের অনুভূতি তৈরি করেছে যারা সাহিত্য ও ইতিহাস পেরিয়ে জাতীয় পরিচয় এর চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছে ।

কিংবদন্তী ও স্থাননামে পিলাক প্রসঙ্গ

কিংবদন্তী ও স্থাননামে পিলাক প্রসঙ্গ 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

দক্ষিণ ত্রিপুরার জোলাইবাড়ি সন্নিহিত প্রত্নভূমি পিলাক । এই পিলাকের বুকে অসংখ্য গণপতি, বিষ্ণু, সূর্য, শিব ও শক্তি মূর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে । মনে হয় যেন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিংবা বিরুদ্ধচারী কারো হাতে এগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে । দীর্ঘদিন এগুলো লোকচক্ষুর গোচরে আসেনি । ত্রিপুরার রাজন্যইতিহাসের আধার রাজমালা ও এ বিষয়ে নিশ্চুপ । পরবর্তী সময়ে সমরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্মা, প্রিয়ব্রত ভট্টাচার্য, দীপক ভট্টাচার্য, ড. রঞ্জিত দে, আশীষ কুমার বৈদ্য প্রমুখ লেখকদের লিখিত গ্রন্থসমূহে ও অন্যান্য কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন রচনায় এর উপর কিছুটা আলোকপাত হয় । বিস্তৃত গবেষণামূলক কাজ এখনো শুরু হয়নি । আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বর্তমানে এই এলাকায় কিছু খোঁড়াখুড়ি করে বেশ কিছু পরিমাণে প্রাচীন মূর্তি ও টেরাকোটার কাজ ইত্যাদি উদ্ধার করেছেন । বহু আগে থেকেই এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পিলাকের বহু মূর্তিই ইতোমধ্যে উধাও হয়ে গেছে । এখনো অনেক মূর্তি বেওয়ারিশভাবে সারা এলাকার এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । অথচ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে এই মূর্তিসমূহের মূল্য কি অসীম !

একথা অনস্বীকার্য যে, পিলাককে কেন্দ্র করে এখানে প্রাচীন সমৃদ্ধ জনপদ ছিল যার প্রাচীনতা এখানকার প্রাপ্ত মূর্তিসমূহেই প্রমাণিত হয় । বৌদ্ধ নিদর্শনসহ হিন্দু ধর্মধারার বিভিন্ন রূপ বিবর্তনের প্রভাব এই ভাস্কর্যসমূহে রয়েছে । সৌর,গণপত্য, বৈষ্ণব শৈব ও শাক্তধারার সঙ্গে বৌদ্ধসংস্কৃতির সমন্বয়ে সৃষ্ট এক মিশ্রসংস্কৃতির নিদর্শন এই পিলাক  সংস্কৃতি । মূলত প্রত্নভূমি পিলাকের ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণ ও এই মিশ্রসংস্কৃতিকে পুষ্ট করতে সহায়তা করেছে । একদিকে বিশাল বঙ্গ সমতট, অন্যদিকে আরাকান, বার্মার সঙ্গে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে যোগাযোগ এখানকার সংস্কৃতিতে ছাপ ফেলেছে ।

পিলাকের ইতিহাস এবং প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয় এ প্রবন্ধের উপজীব্য নয় । এ দুটোই বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে সঠিক তথ্য উদঘাটনে সহায়তা করে । এছাড়াও লোকসংস্কৃতিকেন্দ্রিক কিছু কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে অনেক ঐতিহাসিক উপাদান লুকিয়ে থাকে । সেকারণে লোকসাংস্কৃতিক বিষয়াবলিও অনেক সময় লুপ্ত ইতিহাসকে উদঘাটনে সহায়তা করে । কোন স্থানের প্রাচীন ইতিহাসগত তথ্য আহরণের ক্ষেত্রে সেখানে বসবাসকারী প্রাচীন কোনো অধিবাসীদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিংবদন্তী, পুরাকথা লোককাহিনি, স্থানের নামবিবর্তন, ইত্যাদিকেও অনুষঙ্গ করে অগ্রসর হতে হয় ।

বর্তমান প্রবন্ধে এধরনের সামান্য কিছু লোকসাংস্কৃতিক বিষয়কে আধার করে পিলাকসংস্কৃতির উপর কিঞ্চিৎ আলোকপাতের চেষ্টা করা হচ্ছে । এ অঞ্চলে যে প্রাচীন জনগোষ্ঠী বসবাস করেন তাদের অধিকাংশই স্থানীয়ভাবে 'মগ' নামে পরিচিত । আমাদের প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে 'মগ' নামে একদল ভয়ংকর জলদস্যুর উল্লেখ আছে ।  যারা আরাকান প্রদেশ থেকে বাংলাদেশের সমুদ্র ও নদীতীরবর্তী জনপদ সমূহে অত্যাচার লুণ্ঠন ইত্যাদি কার্য চালিয়ে কুখ্যাত হয়ে আছে । কিন্তু এখানে যাদের 'মগ' বলে অভিহিত করা হয় তাঁরা কিন্তু এ ধরনের ঐতিহাসিক সত্যকেও নস্যাৎ করেন এবং তারা নিজেদেরকে 'মগ' নামে পরিচয় দিতেও অস্বীকার করেন । প্রসঙ্গত, এখানে একটি সত্যি কথা উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ ত্রিপুরা ও ত্রিপুরার অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী যে জনজাতিকে আমরা 'মগ' নামে চিহ্নিত করি তাঁদের মধ্যে ইতিহাসকথিত মগ জলদস্যদের মতো কোনো হিংস্রতার লক্ষণই দেখা যায় না । বরঞ্চ ভগবান তথাগত বুদ্ধের শান্তি, মৈত্রী ও করুণার মন্ত্র দীক্ষিত হয়ে তাঁরা অত্যন্ত সরল সাদাসিধে এবং নিরীহ জীবনযাত্রা অতিবাহিত করেন । এই জনজাতিগোষ্ঠী যেখানেই বাস করছেন সেখানেই বাঙালিসহ অন্য আরো কয়েকটি জনজাতি গোষ্ঠীর লোকও পাশাপাশি বাস করতে আজও দেখা যাচ্ছে ।  বিভিন্ন জনজাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি অবস্থানের এই ইতিহাস ত্রিপুরাতে ঐতিহ্যগতভাবেই প্রাচীন । সম্ভবত আরাকানি জলদস্যদের সঙ্গে দৈহিক সাযুজ্য লক্ষ্য করেই এই জনজাতীয় গোষ্ঠীকে সমতলঅংশের জনগোষ্ঠী 'মগ' বলে অভিহিত করে গুলিয়ে ফেলেছেন অথবা এই জনগোষ্ঠীর লোকেরাও আরাকান থেকে এসেছেন বলে মগ জলদস্যদের সঙ্গে এদের ভাষাগত সামঞ্জস্য থাকার কারণে ও তাদের 'মগ' বলে অভিহিত করা হয়ে থাকতে পারে ।

স্থানীয়ভাবে যাদের 'মগ' বলা হয় তাঁরা নিজেদের আরাকানি বলে পরিচয় দিতে বেশি গর্ববোধ করেন । এই আরাকানিদের বিভিন্ন গোত্র আছে । তাঁদের মধ্যে মূল আরাকানে যারা বাস করেন তাঁরা নিজেদেরকে রখইঙসা বা রখইঁসা বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন । এই রখইঙ থেকে রখইঁ > রখঙ > রাহাঙ > রোসাঙ ও রোহাঙ শব্দের উৎপত্তি । আরাকানের প্রাচীন রাজবংশের নাম রোসাঙ তো বাংলাসাহিত্যের ছাত্রমাত্রই জানেন । এছাড়া তাদের আরেকটি গোত্রের নাম খিয়ঙসা বা খ্যঙসা । খিয়ঙ বা খ্যঙ  শব্দের অর্থ হল নদী এবং সা শব্দের অর্থ সন্তান । অর্থাৎ এই গোত্রের লোকেরা হলেন নদীতীরবাসী । এরকম তাঁরা বিভিন্ন পর্বত নদী ইত্যাদির নাম নামে তাঁদের গোত্রের নাম রাখেন । এই গোত্র সমূহের মধ্যে প্লেঙসা, ক্যেয়ফিয়াসা, রেঙব্রিসা, প্লেঙয়িঁসা ইত্যাদি আরো অনেক গোত্রের নাম পাওয়া যায় । পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে এই জনগোষ্ঠীর লোকেরা বহু প্রাচীনকাল থেকে বসবাস করে আসছেন । পূর্বকথিত মগজলদস্যুদের সঙ্গে এদের এক করে না দেখলে তাদের রাজ্যের আগমন আরো প্রাচীন । একটি ঐতিহাসিক মত থেকে জানা যায় যে প্রাচীন চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরার চন্দ্রবংশীয় রাজারা আরাকানের চেন্দ্রা রাজবংশের সঙ্গে সম্পর্কিত । ১৯৫৪ সালে কুমিল্লার চারপত্রমুড়াতে চন্দ্ররাজাদের তিনটি তাম্রশাসন পাওয়া যায় । তা থেকে চন্দ্রবংশীয় নৃপতিদের পরিচয়ও জানা যায় এ বংশের সাতজন নৃপতি দশম শতক থেকে  একাদশ শতক পর্যন্ত সমতটে রাজত্ব করে গেছেন । তাঁদেরই কোনো গোষ্ঠী ত্রিপুরারাজ্যের দক্ষিণপ্রান্তে তাদের রাজ্যপাট বিস্তার করেও থাকতে পারেন । সাব্রুম ও বিলোনিয়া মহকুমার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বহু প্রাচীনকাল থেকেই এই জাতি গোষ্ঠীর বাস । অনেক প্রাচীন জনপদ তাঁদের হাতেই গড়ে উঠেছে আবার অনেক জনপদ থেকে তাঁরা সরে গিয়ে সেই জনপদকে শূন্য করে দিয়েছেন বা সেইস্থান নতুন জনগোষ্ঠীর আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে । 

সাব্রুম মহকুমা ও তৎসন্নিহিত জোলাইবাড়ি, বাইখোরা ইত্যাদি অঞ্চলে আলোচ্য জনগোষ্ঠীর যে গোত্রের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, জানা গেছে তারা প্লেঙসা গোত্রের । এছাড়া বিলোনিয়া অঞ্চলে যাঁরা আছেন তাঁরা খিয়ঙসা  বা খ্যঙসা গোত্রের এবং বীরচন্দ্র মনু ও তৎসম্নিহিত অঞ্চলে ক্যেয়ফিয়াসা গোত্রের লোকেরা বাস করেন বলে জানা গেছে । এক সময়ে পিলাক অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় মগদের বসবাস ছিল  প্লেঙসা গোত্রভুক্ত মগ রাজাদের রাজধানী ছিল বলেও তাদের মধ্যে কিংবদন্তি আছে । নদীর সঙ্গে বা পাহাড়ের সঙ্গে যেমন এই জনগোষ্ঠীর গোত্রসম্বন্ধ আছে তেমনি এই জনগোষ্ঠীর অধ্যুষিত জনপদের ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের দিকে লক্ষ্য করলেও এই বিষয়ের মধ্যে একটি সুক্ষ্ম সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় । সাব্রুম-বিলোনিয়ার মনুবনকুল, ছোটখিল, দৌলবাড়ি, বৈষ্ণবপুর, পিলাক, দেবদারু, জোলাইবাড়ি, বাইখোরা, লাউগাঙ, বীরচন্দ্র মনু এমনকি লংথরাইভ্যালির কুলাই, আমবাসা, বলরাম প্রভৃতি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাদের ব্যাপক বসবাস লক্ষ্য করা যায় । এইসব অঞ্চলের প্রাকৃতিক গঠন সর্বত্রই সুউচ্চ পাহাড়বেষ্টিত উপত্যকার ন্যায় । এই উপত্যকার মধ্য দিয়ে অবশ্যই একটি বা একাধিক জলধারা প্রবাহমান আছে । ত্রিপুরার প্রায় প্রতিটি মগ অধ্যুষিত পল্লীতে এই সাদৃশ্য চোখে পড়ে । সেই হিসেবে তাদের বাসস্থান বেছে নেওয়ার যে লৌকিক সংস্কার তার সঙ্গে তাদের গোত্রসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায় । এই তথ্যটি থেকে এমন একটি সিদ্ধান্তে আসা যায় যে পিলাক অঞ্চল সুপ্রাচীনকাল থেকেই বিস্তীর্ণ মগ অধ্যুষিত জনপথ ছিল । কারণ পিলাকও চারিদিকে সুউচ্চ পাহাড়বেষ্টিত বিশাল সমতল উপত্যকাভূমি । তাহলে তাদের কিংবদন্তির কিছুটা স্বাক্ষর এখানে পাওয়া যায় ।

পিলাক অঞ্চলের যেসব মুর্তি পাওয়া যায় সেগুলো নাকি 'প্লেঙসা' রাজা করিয়েছেন । এসম্বন্ধে একটি প্রাচীন উপকথা এই গোত্রের মানুষদের কাছে থেকে পাওয়া গেছে । 'প্লেঙ' রাজা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী । তিনি যে সময়ে রাজত্ব করতেন তখন পার্শ্ববর্তী সমতল এলাকায় বিভিন্ন বৌদ্ধধর্মকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল । বাংলাদেশের 'কোলা' রাজাও তাঁর পূর্ববর্তী রাজাদের অনুকরণে বিভিন্ন স্থানে বহু মূর্তি নির্মাণ করেন এবং বৌদ্ধবিহার স্থাপন করেন । প্লেঙরাজা তীর্থ ভ্রমণ থেকে ঘুরে এসে নিজের রাজ্যেও মূর্তিস্থাপন এবং বৌদ্ধবিহার নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন । তিনি জেনে এসেছেন যে কোলারাজ্যে এ বিষয়ে দক্ষ শিল্পী আছে । তিনি কোলা রাজ্যের কাছে মহার্ঘ শ্বেতহস্তী ভেট পাঠিয়ে তাঁর আর্জি পেশ করলেন । তখন কোলারাজ তার রাজ্যের দক্ষ একজন তরুণ ভাস্করকে প্লেঙরাজের রাজ্যে পাঠিয়ে দিলেন। ভাস্কর এসে রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাঁর নির্দেশমতো বিভিন্ন দেবদেবী ও বুদ্ধের বিশাল বিশাল মূর্তি নির্মাণ করতে আরম্ভ করলেন । খেয়ালি রাজা তো নির্দেশ দিয়েই খালাস । তিনি আর খোঁজ নেওয়ারও সময় পেলেন না তরুণ ভাস্কর মূর্তি তৈরি করছে কিনা । একবছর ধরে টানা পরিশ্রম করে ভাস্কর বিশাল মূর্তির ভান্ডার গড়ে তুললেন । সমস্ত মাঠ জুড়ে মুর্তি জড়ো হয়ে গেল । অথচ মূর্তিগুলো কোথাও স্থাপনের ব্যবস্থা হচ্ছে না ।

এদিকে ঘটল আরেক ঘটনা । প্লেঙ রাজার তরুণী কন্যা একদিন ভ্রমণে বের হয়ে মাঠের মধ্যে এই বিশাল পরিমাণ মূর্তি দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন । তিনি দেখতে চাইলেন ভাস্করকে । তাঁর সঙ্গিনী সখীর সঙ্গে তিনি গেলেন যেখানে ভাস্কর ধ্যানমগ্ন হয়ে পাথরের বুকে খোদাই করে চলেছেন অপূর্ব সব মূর্তি । রাজকন্যা ভাস্করের শিল্প সুষমা দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন । প্রাথমিক পরিচয়ের পর রাজকন্যা আবদার করে বসলেন ভাস্করের কাছে,  তাঁর মূর্তি যেন গড়ে দেন ভাস্কর । কাজের ফাঁকেই ভাস্কর চোখ তুলে চাইলেন । তাঁর হাতের ছেনি যেন কেঁপে উঠল !  ভাবছেন তিনি পারবেন কি এই অগ্নিপ্রতিমার প্রতিকৃতি গড়তে ! তিনি নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন রাজকন্যার দিকে । রাজকন্যা বোধহয় লজ্জিতা হলেন । চোখ নামিয়ে নিলেন ভাস্করের চোখ থেকে । তাহলে আমার প্রতিকৃতি গড়বেন না, ভাস্কর ? রাজকন্যা প্রশ্ন করলেন । সম্বিত ফিরে পেয়ে ভাস্কর চোখ নামিয়ে নিলেন । জবাব দিলেন, পারব না কেন, পারব । তবে প্রতিদিন যে আপনাকে এখানে আসতে হবে । আমার কাজের সময় সামনে এসে দাঁড়াতে হবে আপনাকে ।  আপনাকে দেখে দেখে আমি পাথরে খোদাইর কাজ করব । অনেকদিনের পরিশ্রম । সে সময় কি আপনার হবে ? রাজকন্যা বললেন, কি হয়েছে তাতে ।  আমি তো প্রতিদিনই বৈকালিক ভ্রমণে বের হই । সেই সময়টা না হয় আপনার এখানেই কাটাব । রাজি হয়ে গেলেন শিল্পী ।

তারপর শুরু হল প্রতিদিন বিকেলে রাজকন্যার শিল্পীর কাছে আসা । শিল্পীও রাজকন্যার চরণদ্বয় থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বাঙ্গের অনুকরণে পাথরের বুকে ছাপ ফেলতে শুরু করেন । রাজকন্যার নিরাভরণ অঙ্গসৌষ্ঠব ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে আর শিল্পী করে চলেছেন খোদাইকর্ম । ইদানিং শিল্পী এই প্রতিকৃতির দিকেই যেন বেশি নজর দিচ্ছেন । দিনের সারাসময় আর কোনো কাজ করছেন না । যতটুকু কাজ এগোয় সেই নিরাভরণ নগ্ন প্রতিকৃতির দিকে অপলক তাকিয়ে কি যেন ভাবেন শিল্পী ! চঞ্চল হয়ে ওঠে তাঁর মনটা, কখন দিন গড়িয়ে বিকেল হবে । রাজকন্যার মনেও চলে তোলপাড়। শিল্পীর সামনে দাঁড়ানো যেন তাঁর একটা নেশায় পরিণত হয়েছে । বিভিন্ন বিভঙ্গে দাঁড়ানোর জন্য শিল্পী যখন তাঁর অঙ্গ স্পর্শ করেন তখন এক অনাস্বাদিত শিহরণ অনুভব করেন রাজকন্যা ।

সেদিনও এসে দাঁড়িয়েছেন রাজকন্যা শিল্পীর সামনে । অত্যন্ত সূক্ষ্ম তন্তুজালে প্রস্তুত তার পোশাকে দেহের সৌন্দর্য প্রকটিত । শিল্পী কাছে এসে দাঁড়ান । যেন বাঁধভাঙা জ্যোৎস্না নেমে এসেছে মাটিতে । শিল্পী ভাবছেন তিনি কি ফুটিয়ে তুলতে পারবেন এই সৌন্দর্য ? তবুও শিল্পী প্রতিদিনের মতো রাজকন্যাকে স্পর্শ করে শৈল্পিকভাবে স্থাপন করছেন তাঁর বাহুযুগল, গ্রীবাদেশ । রাজকন্যার শরীরে যেন কেমন কম্পন অনুভূত হচ্ছে । স্বেদবিন্দু ফুটে উঠেছে  কপালে । পয়োধর ছোটো পাখির শরীরের মতো তিরতির করছে । মুহূর্তের রাজকন্যা বলে উঠলেন, আহ্, শিল্পী !  আপনার কি অসুবিধে হচ্ছে আমার পোশাকে ? এই আমি সরিয়ে নিলুম পোষাক । রোজ রোজ একটু একটু করে উন্মোচন করার চাইতে আমার সম্পূর্ণ সৌন্দর্যকে আপনি যথেচ্ছ ব্যবহার করুন । সমুদ্রের ঢেউ তুলে সৌন্দর্য যেন আছে পড়ল শিল্পীর সামনে । শিল্পী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না । এক জীবন্ত শিল্পসত্তায় পরিণত হল দুটো শরীর ।

এভাবে শিল্পকর্মের ফাঁকে ফাঁকে আদিম শিল্পকলায় মত্ত হল দুটি মন । তারা পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলল । এদিকে অন্যান্য মূর্তির পাশাপাশি রাজকন্যার নগ্ন প্রতিকৃতিও তৈরি করে ফেললেন শিল্পী । শুধুমাত্র মুখের অংশটি প্রস্তুত করা বাকি । এরই মধ্যে একদিন রাজার মনে পড়ল মূর্তি তৈরির ফরমায়েশের কথা । ভাস্করের কথা । তিনি ছুটে গেলেন পারিষদসহ ভাস্করের কাছে । সারা মাঠময় ভাস্কর্যের নিদর্শনরাশি দেখে তিনি অভিভূত হয়ে গেলেন । কিন্তু এতসব দেবদেবীর প্রতিমার মাঝখানে শিল্পীর গৃহে এক নগ্ন নারী মূর্তি দেখে রাজা বিস্মিত হয়ে গেলেন । রাজা জানতে চাইলেন এর কারণ । শিল্পী বললেন, তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে অবসর সময়ে এই কাজ করেছেন । রাজা নিতে চাইলেন এই প্রতিকৃতিটি । বললেন প্রতিকৃতির মুখ সম্পূর্ণ করার পর যেন এটি তাঁর প্রাসাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শিল্পী ইতস্তত করছেন । রাজা ভাবলেন শিল্পী হয়তো এর জন্য আলাদা পারিশ্রমিক চাইছেন । রাজা তাও দিতে চাইলেন ।  শিল্পী জানালেন, না মহারাজ, তা নয় । এতে আপনার অমঙ্গল হবে । এই প্রতিকৃতি আপনি নেবেন না । রাজা বললেন সে দেখা যাবে । তিনি প্রস্থান করলেন ।

এদিকে রাজঅন্তঃপুরে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে । রাজকন্যা অন্তঃস্বত্ত্বা হয়েছেন । কুমারী অবস্থায় অন্তঃস্বত্ত্বা  ? সাংঘাতিক ব্যাপার ! রাজপরিবারের মান-সম্মান যায় । কথাটা মহারানীর কান হয়ে রাজার কানেও এসে পৌঁছেছে । রাজা তাঁর অনুচরদের নির্দেশ দিলেন এর উৎস সন্ধানের । কারণ রাজকন্যাকে জিজ্ঞেস করে কোন সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না ।

এরই মধ্যে শিল্পীর বিদায়ের সময় এল। দীর্ঘদিন তিনি প্রবাসে কাটিয়েছেন । ঘরে ফেরার জন্য মন কেঁদে উঠছে অথচ রাজকন্যার কথা ভাবলে তিনি নিজেকে সামলে রাখতে পারেন না । রাজকন্যাও এখন আর নিয়মিত আসতে পারেন না । লোকচক্ষুর আড়ালে মাঝেমধ্যে তাদের দেখাসাক্ষাৎ হয় । তাঁদের গোপন প্রণয়ের কথা এখনও কেউ না জানলেও রাজকন্যা যে মা হতে চলেছেন তা নিয়ে রাজ্য জুড়ে তোলপাড় চলছে । রাজকন্যা সে সংবাদ দিতেও ভুলেন না শিল্পীকে ।

রাজা একদিন শিল্পীর কাছে লোকজন পাঠালেন এই নগ্নিকা মূর্তিটি রাজসভায় উপস্থিত করার জন্য । রাজাদেশ । কি আর করা যাবে । বাধ্য হয়ে শিল্পী মূর্তিটি পাঠালেন রাজসভায় । তবে তিনি মূর্তির মুখটি ভালো করে ঢেকে দিলেন । রাজসভায় আনার পর মূর্তিটির গঠনশৈলী নিয়ে রাজসভার বিদগ্ধ মহলে উচ্চ প্রশংসার ঝড় বয়ে গেল । সকলের অনুরোধে রাজা স্বয়ং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিকৃতির মুখের আবরণ উন্মোচন করলেন । মুহূর্তের সমস্ত রাজ্যসভা চিৎকার করে উঠল, এ যে আমাদের রাজকন্যা ! অসম্ভব ক্রোধে লজ্জায় ঘৃণায় রাজা মুখ ঢাকলেন । চিৎকার করে উঠলেন, সরিয়ে নাও এটাকে ।

রাজা ও রাজসভার বুঝতে বাকি রইল না রাজকন্যার অন্তঃস্বত্ত্বা হওয়ার অন্তরালের কাহিনি । রাজা বিচারসভায় বসলেন রাজ্যের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে । তাঁদের বিচারে ভিনদেশী শিল্পী দোষী সাব্যস্ত হলেন । তাঁদের সমাজের নিয়ম অন্য জনগোষ্ঠীর মানুষের দ্বারা তাদের নারীর ইজ্জত লুণ্ঠিত হলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড । শাস্তির ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দিল । এই তরুণ এখন যে তাঁদের অতিথি । তাঁরা বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত । অতিথিকে আরাধ্য দেবতা জ্ঞান করেন । তা বলে অতিথির অন্যায় তো সহ্য করা যায় না । কেউ কেউ আপত্তি তুললেন । ফলে সিদ্ধান্ত হল, মৃত্যুদণ্ড নয় । শিল্পীর দুটো হাত কেটে দেওয়া হবে । যাতে তিনি জীবনে আর ওই শিল্পকর্ম করতে না পারেন । রাজকন্যা আড়াল থেকে সব শুনলেন । তিনি ছুটে গেলেন শিল্পীর কাছে বললেন, তুমি পালাও, শিল্পী ! শিল্পী অনিচ্ছা প্রকাশ করলেন । বললেন, না আমি যাব না তোমাকে ফেলে । যা হবার হোক । তাছাড়া আমাদের অনাগত সন্তানের কথা মনে করেও আমি কোথাও যাব না । রাজকন্যা জানালেন, আমার জন্য তুমি এমন করে বিপদ ডেকে এনো না । তোমার শিল্পীজীবন শেষ করে দিও না । তুমি চলে যাও তুমি শিল্পচর্চা করো । জগত তোমার শিল্পের প্রশংসা করুক । তোমার শিল্পের মধ্যেই আমরা বেঁচে থাকব ।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখের জলে বিদায় নিলেন শিল্পী । অজানা অচেনা পথে বেরুলেন । লএদিকে রাজার লোক নির্দিষ্ট জায়গায় শিল্পীকে না পেয়ে খুঁজতে বেরুলো চারিদিকে । সমস্ত সীমান্তপথ বন্ধ করে দেয়া হল । পথ ভুলে যাওয়ায় শিল্পীকে ধরে ফেলল রাজার লোকেরা । তারা হাজির করল তাকে বিচারসভায় । সংবাদ পেয়ে রাজকন্যা ছুটে এলেন রাজসভায় । কাতর প্রার্থনা জানালেন শিল্পীকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য । কিন্তু কেউ তাঁর কথা শুনলেন না । দুটো হাত কেটে শিল্পীকে বের করে দেওয়া হল রাজ্য থেকে ।

এদিকে শিল্পী কোলারাজ্যে ফিরে গেলে শিল্পীর এই দশা দেখে কোলারাজ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন । তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন প্লেঙরাজার বিরুদ্ধে । ভয় পেয়ে প্লেঙরাজা তাঁর সমস্ত প্রজাদের নিয়ে প্লেঙনদীর উজানে গভীর অরণ্যে আশ্রয় নিলেন । কোলারাজার সৈন্যবাহিনী এই রাজ্যে এসে কাউকে দেখতে না পেয়ে সবকিছু ভাঙচুর লণ্ডভণ্ড করতে লাগল । ভেঙে ফেলা হল শিল্পীর গড়া মূর্তিসমূহও । সারা রাজ্যজুড়ে তারা তাণ্ডব চালিয়ে যেতে লাগল ।

এদিকে প্লেঙ রাজাও বসেছিলেন না । তাঁরা পালিয়ে গিয়ে নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে রেখেছিলেন । কোলারাজার লোকজন যখন তাঁদের রাজ্যজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছেন তখন প্লেঙ রাজা হঠাৎ করে নদীর বাঁধ কেটে দিলেন । জলের তোড়ে সমস্ত জনপদ ভেসে গেল । ভেসে গেল কোলারাজের সৈন্যসামন্ত । পাহাড় থেকে পলি এসে ঢেকে ফেলল সমস্ত জনপদ । আর কথিত আছে প্লেঙ রাজার সঙ্গে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া তাঁর কন্যাটিও একদিন সুযোগ বুঝে সেই বাঁধভাঙা জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবিসর্জন করেন ।

এই অশ্রুসজল প্রণয়কাহিনি এখনো কোন কোন বয়োবৃদ্ধ মগরমণী এক বিশেষধরনের করুণ সুর করে গেয়ে থাকেন । আজকের তরুণতরুণীরা অনেকেই এই কাহিনি জানেন না । ধীরে ধীরে হয়তো লুপ্ত হয়ে যাবে তাদের লোকসংস্কৃতির ভান্ডার । কারণ মগ জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে সংরক্ষণের কোনোরকমের প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত নেই ।

যদিও এটি একটি লোককাহিনি তবুও এ কাহিনি থেকে একটি ঐতিহাসিক সূত্র খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে । প্রথমত, এ অঞ্চলের যে 'পিলাক' নাম তার একটি সূত্র এখান থেকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে । এখানে যে গোত্রের রাজারা বসবাস করতেন তারা 'প্লেঙসা' নামে পরিচিত । এই প্লেঙসা শব্দটির বিবর্তিত রূপ প্লেঙ>প্লেক>পেলেক>পেলাক>পিলাক নামে পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে । নদীটির নামও হয়তো 'প্লেঙ' ছিল যা বর্তমানে পিলাকছড়া নামে পরিচিত । এই নদী হয়তো একসময় প্রবল স্রোতস্বিনী ছিল । কালক্রমে ভূবিবর্তনের ফলে হয়তো তা প্রসারতা ও গতি হারিয়েছে ।

'পিলাক' নামটি যে মগ শব্দ সে বিষয়ে আর সন্দেহের কোন অবকাশ থাকে না । তাছাড়া এই অঞ্চলের আরো কিছু স্থাননামেও এই লক্ষণ ধরা পড়ে । যেমন বর্তমান জোলাইবাড়িকে মগ জনগোষ্ঠীর লোকেরা বলে থাকেন জোলা-জি । 'জি' শব্দের দ্বারা বাজার বোঝায় । সাক-রুঁ অর্থাৎ বর্তমান সাব্রুম । চাকমা জাতির লোকদের তাঁরা সাক বলে থাকেন । অর্থাৎ এখানে চাকমাদের বাসভূমি । সেইরূপ মগরুঁ । অন্যদের ভাষায় মগ জনবসতি । বর্তমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও একসময় তাদের অবস্থান ছিল কিছু কিছু নামে তার হদিস পাওয়া যায় । যেমন ফুলগাজি (ফুলগা-জি ) । মগ সম্প্রদায়ের লোকেরা বাঙালিদের 'কোলা' বলে অভিহিত করেন । বাংলাদেশের নোয়াখালি অঞ্চলে একটি স্থান আছে যার নাম কোলাপাড়া । দক্ষিণ ত্রিপুরায়ও পিলাকসংলগ্ন একটি স্থান কলসি । আসলে কোলা-সি অর্থাৎ বঙ্গসন্তান বা বঙ্গজনপদ । এই জনগোষ্ঠীর লোকেরা বাঙ্গালিদের যে 'কোলা' নামে অভিহিত করে থাকেন সেই সূত্র ধরে একটি ঐতিহাসিক উপাদানের উপর ক্ষীণ আলোকপাত করে প্রবন্ধের শেষ করব ।

প্রাচীনবঙ্গের ইতিহাসে বঙ্গ ও সমতটের পাশাপাশি হরিকেল নামে বাংলাদেশের পূর্বপ্রান্তিক অঞ্চলে একটি প্রাচীন রাজ্যের নাম পাই । এই রাজ্যের পরিধি সম্বন্ধে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে বহুমত আছে । তবে এই রাজ্য প্রথমে ক্ষুদ্র থাকলেও পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম থেকে শ্রীহট্ট পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ঘটেছিল । কেউ কেউ বঙ্গ ও হরিকেলকে এক করেও দেখেছেন । চৈনিক পরিব্রাজক ই-চিং এর বর্ণনায় প্রথম হরিকেলের উপস্থিতি পাওয়া যায় । হরিকেল নামটি হরিকেলি, হরিকেলা বা হরিকোলা ইত্যাদি নামে ইতিহাসে উল্লেখিত হয়ে আসছে । শেষোক্ত 'হরিকোলা' শব্দটি থেকে 'কোলা' শব্দটির উদ্ভব হওয়া অসম্ভব নয় । প্রাগোক্ত লোককাহিনিটিতে যে কোলা বা বঙ্গ জনপদের রাজার কথা বলা হয়েছে তা হরিকেল রাজ্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় । হরিকেল রাজ্যের অধিবাসীরাই তাদের ভাষায় 'কোলা' । কাহিনিটি থেকে জানা যায়, তাদের রাজ্যও একসময় কোলারাজের অধীন অর্থাৎ হরিকেল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় । এই পিলাক অঞ্চলে হরিকেল মুদ্রা পাওয়া গেছে । এই মুদ্রাতে 'পিরক', 'বেরক' ইত্যাদি শব্দ লেখা আছে । মনে করা হচ্ছে এই নামগুলি পিলাক শব্দেরই রূপান্তর । 

যাই হোক, পুরাকাহিনি তো ইতিহাস নয় । তবে তার মধ্যে নিহিত ইতিহাসের উপাদানের ক্ষীণ সূত্র লুকিয়ে থাকতেও পারে । কালস্রোতে তার মধ্যে অনেক বিবর্তন পরিবর্তন ঘটে যাওয়া অসম্ভব নয়। যথাযথ গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান এবং বিশ্লেষণের দ্বারা পিলাকের বহু অনালোকিত তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব । আর এজন্যই এই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড় সাংস্কৃতিক যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন ।

( পিলাক উৎসব-২০০২, ২৯–৩১ শে জানুয়ারি,স্মরণিকায় প্রকাশিত ও পরবর্তীসময়ে কিঞ্চিৎ পরিবর্ধিত । )

Tuesday, March 17, 2026

MY PENSION FROM APRIL : 26

FROM FEB21 : BP
=40500 DA=00 ঞঞCOMM=6300 FMA= 500 NET = 34700



FROM MAR21 : BP= 40500 DA( 3% )=1225 REC=00 COMM=6300 DIS=00 IR=00 OLD=00 FMA=500 TDS=00 NET।=35925 PNBHOGBD

FROM JULY22 : BP=40500 :।ন DA (8% )=3240 REC=00😂
COMM=6300 DID=00 IR=00 OLD=00 FMA=500 TDS=00 ।
40500 -6300 = 34200+ 500 + 38240 ( 8% DA ) =37940

FROM DEC22 : BP=4এ0500 : DA ( 12% )= 8100 REC = 
00 COMM = 6300😭 DID = 00 IR = 00 OLD = m00 FM 500 TDS = 00 NETন = 42800
40500 - 6300 = 34200 + 500 + 8100 ( 20% DA ) = 42800

FROM JAN24 : BP=40500 : DA ( 25% )= 10125 REC =<00 COMM = 6300 DID=00 IR = 00 OLD = 00 FMA= 500 TDS = 00 NET = 44825

FROM NOV24 : B = 40500 : DA ( 30% ) = 12150 : REV = 00 COMM : 6300 DID = 00 IR = 00 OLD = 00 FMA = 500 TDS = 00 NET = 46850

FROM APRL25 : BP = 40500 : DA ( 33% ) = 13365 : REV = 00 COMM : 6300 : DID = 00 : IR = 00 : OLD = 00 : FMA = 500 : TDS = 00 : NET = 48065/-

FROM OCT25 : BP = 40500 : DA (36%) = 14580
REV = 00 COMN : 6300 : DID = 00 : IR = 00 : OLD = 00 : FMA = 500 : TDS = 00 : NET = 49280

FROM APRL26 : BP = 40500 : DA (41%) = 16605 (17% behind from Central DA)
 REV = 00 COMN : 6300 : DID = 00 : IR : 00 : OLD : 00
: FMA : 500 : TDS : 00 : NET : 51305

Monday, March 16, 2026

বাংলা ভাষা, সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে অস্মিতার বিবর্তন

বাংলা ভাষা, সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে  অস্মিতার বিবর্তন 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

Abstract

The Evolution of Culture and Identity in Bengali Language and Literature

Asokananda Raybardhan

India is a unique example of a multilingual and multicultural social system. In such a society, language is not merely a medium of communication; rather, it serves as an important carrier of the cultural unity, heritage, and self-identity of a community. The Indian languages embody centuries of social experience, religious beliefs, folk knowledge, and historical evidence. Among them, the Bengali language and literature constitute one of the principal foundations of Bengali ethnic identity. Language and literature are not only means of expression; they also contain within them the history, culture, beliefs, social experiences, and consciousness of identity of a community.
Across different periods of Bengali literature, reflections of the Bengali people's way of life, religious beliefs, social relationships, and cultural transformations can be observed. This research paper analyzes, from the Charyapada to modern Bengali literature, how the development and expression of Bengali culture and identity have been manifested in literary traditions. Through discussions of medieval Mangal-kavya, Vaishnava Padavali, Shakta Padavali, folk literature, the nineteenth-century Bengal Renaissance, the writings of Rabindranath Tagore and Kazi Nazrul Islam, and various streams of modern Bengali literature, the study demonstrates that Bengali literature has played a crucial role in shaping the national and cultural identity of the Bengali people.

Keywords:
Bengali language, literature, culture, identity, folk literature, Renaissance, language movement, Bengali ethnic identity.



আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে 
আমি তো এসেছি সওদাগরেরর ডিঙার বহর থেকে 
আমি তো এসেছি কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম থেকে 
আমি তো এসেছি পালযুগের নামে চিত্রকলার থেকে 

এসেছি বাঙালি পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহার থেকে 
এসেছি বাঙালি জোর বাংলার মন্দির বেদি থেকে 
এসেছি বাঙালি বরেন্দ্রভূমে সোনা মসজিদ থেকে 
এসেছি বাঙালি আউল-বাউল মাটির দেউল থেকে 
(আমার পরিচয়–সৈয়দ শামসুল হক)

ভারতবর্ষ প্রাচীনকাল থেকেই ভাষা ও সংস্কৃতির মিলন ভূমি । এই উপমহাদেশে সহস্রাধিক বছর ধরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সহ অবস্থান ঘটেছে । ফলে এখানে ভাষা ও সংস্কৃতির এক বিস্ময়কর বৈচিত্র্য ঘটেছে । ভারতের সংবিধানে বর্তমানে ২২ টি ভাষা স্বীকৃত হলেও বাস্তবে এখানে শতাধিক ভাষা ও হাজারেরও বেশি উপভাষা প্রচলিত রয়েছে । এই ভাষাগত বৈচিত্রের মধ্যেই ভারতীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন রূপ বিকশিত হয়েছে । ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হলেও এর ভূমিকা আরও গভীর । ভাষার মধ্যেই একটি সমাজের ইতিহাস, বিশ্বাস, আচার, লোকজ জ্ঞান এবং জীবন দর্শন সংরক্ষিত থাকে । ফলে ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও অস্মিতার বাহক ।

সংস্কৃতি বলতে সাধারণত একটি সমাজের জীবনধারা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস, শিল্পকলা, সাহিত্য, সংগীত ও লোকাচারের সমষ্টিকে বোঝায় । অন্যদিকে অস্মিতা বলতে বোঝায় সেই আত্মপরিচয় বা স্বাতন্ত্র্যবোধ যার মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠী নিজেদের পৃথক সত্তা সম্পর্কে সচেতন হয় । ভাষা এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে । ভাষার মাধ্যমে মানুষ তার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং সংস্কৃতিক চিহ্ন রক্ষা করে । ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন 'language is the chief vehicle of culture.' এছাড়া নৃতাত্ত্বিক ক্লিফোর্ড গিয়ার্টজ সংস্কৃতি সম্পর্কে লিখেছিলেন– 'Culture is the web of meaning through which human beings interpret they are experiences.' অর্থাৎ ভাষা ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ।

বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ভাষা । প্রায় এক সহস্রাব্দব্যাপী সাহিত্যিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ক্রমাগত বিকশিত হয়েছে । এই দীর্ঘ যাত্রায় বাঙালি সমাজের জীবনধারা, ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিফলন দেখা যায় । সাহিত্য ইতিহাসবিদ সুকুমার সেন বলেছেন যে, বাংলাসাহিত্য মূলত বাঙালি সমাজের জীবন ও সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক দলিল ।

বাংলা ভাষা সংস্কৃতি ও অস্মিতা : তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট 

বাংলা ভাষা সংস্কৃতি ও অস্মিতা হাজার বছরের বিবর্তিত ও সংকর ঐতিহ্যের ফসল । প্রাচীন মাগধী প্রাকৃত থেকে উদ্ভুত হয়ে এই ভাষা চর্যাপদ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ধ্রুপদী ও লোকজ উপাদান ধারণ করেছে, যেখানে সাহিত্য, বৈষ্ণব ও শাক্তপদাবলি, বাউল গান এবং ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে । বাঙালি জাতি আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয় সহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে গঠিত । এই মিশ্রণেই বাঙালিকে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা দিয়েছে, যা তার সাহিত্যেও প্রতিফলিত । বাঙালির অস্মিতা কেবল ভাষা নয় বরং পোশাক, আহার, উৎসব এবং জীবনযাত্রার এক অনন্য সংমিশ্রণ যা সময়ের সাথে সাথে নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে চলেছে ।

চর্যাপদ ও বাঙালির আত্মপরিচয় 

চর্যাপদ (আনুমানিক নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন যা বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক আত্ম পরিচয়ের মূল দলিল । ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এটি নেপালের রাজদরবার থেকে আবিষ্কার করেন । চর্যাপদের ভাষা (সন্ধ্যাভাষা) ও পদগুলি তৎকালীন বাংলার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সমাজ, ধর্ম, প্রকৃতি, উৎসব ও সঙ্গীতের চিত্র ফুটে উঠে যা বাঙালির নিজস্ব পরিচয়কে নিশ্চিত করে । চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা যা বর্তমান বাংলা ভাষার আদিরূপ । এর মাধ্যমে বাঙালির স্বতন্ত্র ভাষা ও ভাষাগত আত্মপরিচয় সুস্পষ্টই হয় । চর্যাপদে ডোম, শবর, তাঁতি, নৌকাচালক, ব্যাধ ইত্যাদি সাধারণ মানুষের কথা পেশা, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাকের উল্লেখ রয়েছে যা তৎকালীন বাংলার সমাজ চিত্র তুলে ধরে । চর্যায় এক জায়গায় উল্লেখ রয়েছে–'আজি ভুসুকু বঙালি
ভৈলি' । এটাও বাঙালির অস্মিতা । চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের সাধন সঙ্গীত । এই সাধনতত্ত্বের মাধ্যমে বাঙালির আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক চেতনার প্রাচীন রূপ প্রকাশ পায়। পদগুলোতে বাংলার প্রকৃতি, নদী, নৌকা, মাছ, গাছপালা, নিঝুম রাত, গ্রামীণ জীবন চিত্রিত হয়েছে, যা বাঙালির ভূমিজ পরিচয় বহন করে । লুইপাকে চর্যাপদের আদি কবি ও প্রথম বাঙালি কবি বলে গণ্য করা হয় । এটি বাঙালি হিসেবে আত্মআবিষ্কারের পথকে প্রশস্ত করে । চর্যাপদ শুধু প্রাচীন সাহিত্যই নয়, বাঙালির আত্মপরিচয় শিল্প ও সাহিত্য ও সংস্কৃতির শিকড়ের আমূল আকর ।

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ও সমাজ বাস্তবতা 

১২০১–১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্যযুগীয় বাংলাসাহিত্য ছিল মূলত ধর্মকেন্দ্রিক, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ও আখ্যানকাব্য নির্ভর । তুর্কি আক্রমণের পরবর্তী এই যুগে হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির মিশ্রণ, বৈষ্ণব পদাবলি, শাক্ত পদাবলি, মঙ্গলকাব্য, এবং ফারসি থেকে অনুদিত রোমান্টিক কাব্যগুলো সমসাময়িক গ্রামীণ সমাজ, কুসংস্কার, প্রেম ও ভক্তি আন্দোলনের সমাজ বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলে । মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ও সমাজ বাস্তবতার প্রধান দিকগুলো এখানে আলোচনা করা হল–
১. সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট–১২০৪ সালে তুর্কি আক্রমণের পর বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে । সমাজ ধীরে ধীরে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে একটি নতুন সমন্বিত সংস্কৃতি গড়ে তোলে । ১২০১ থেকে ১৩৫০ পর্যন্ত সময়কে সাধারণত সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলা হয় কারণ এই সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সাহিত্যচর্চা বিরল ছিল ।
২. সাহিত্যের প্রধান ধারা ও বাস্তবতা– বৈষ্ণব পদাবলি (চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি) রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনি বা বৈষ্ণব পদাবলিতে মানুষের মানবিক প্রেম, বিরহ ও ভক্তির আধ্যাত্মিক রূপ ফুটে উঠেছে । শাক্তপদাবলীতে বাংলার সাধারণ মানুষের মাতৃ আরাধনার রূপ প্রকাশ পায় । এই দুই ধারা বাংলার সাধারণ মানুষের আবেগ অনুভূতিকে কেন্দ্র করে রচিত । মঙ্গলকাব্য (মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল) গুলো (যেমন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল) সেসময়ের গ্রামীণ জীবনের ভয়, কুসংস্কার, দারিদ্র্য, এবং বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবীর পূজাপার্বণ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তুলে ধরে । রোমান্টিক প্রণয় উপাখ্যান (শাহ মোহাম্মদ সগীর) মধ্যযুগীয় কবিরা ফারসি ও আরবি থেকে কাহিনি নিয়ে 'ইউসুফ জোলেখা'র মতো রোমান্টিক কাব্য রচনা করেন, যেখানে মানবিক প্রেম উপজীব্য ছিল । অনুবাদ সাহিত্য (কৃত্তিবাস ওঝা) রামায়ণ ও মহাভারতের অনুবাদ সামাজিক নৈতিকতা ও ভক্তিবাদের প্রচার হিসেবে কাজ করেছিল ।
৩. সমাজ বাস্তবতা–কাব্যগুলো মূলত দেবদেবী বা অলৌকিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে রচিত হলেও সেগুলোর অন্তরালে মানুষের বাস্তব জীবন দুঃখ-কষ্ট ও আশা-আকাঙ্ক্ষার চিত্র পাওয়া যায় । মঙ্গলকাব্যে বেহুলার মতো দৃঢ় নারীচরিত্র থাকলেও সামগ্রিকভাবে সমাজ ছিল পুরুষতান্ত্রিক এবং নারীদের অবস্থান ছিল অনেকটা নিয়ন্ত্রিত । রোমান্টিক কাব্যগুলোতে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মানুষের মানবিক প্রেম ও আবেগ প্রাধান্যষ পেয়েছে ।
৪. পৃষ্ঠপোষকতা–মধ্যযুগের সাহিত্যে সুলতান ও স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা সাহিত্যিকদের কাব্য রচনা উৎসাহিত করেছিল । মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্য ছিল গ্রামীণ সমাজ, লৌকিক বিশ্বাস, এবং মানবিক অনুভূতির এক অপূর্ব মিশ্রণ যা আজকের বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় এর ভিত্তি স্থাপন করেছিল ।

উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ ও সাংস্কৃতিক চেতনায় বাঙালির আত্মপরিচয়

উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষা যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদের প্রভাবে বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতিতে এক আমল বৌদ্ধিক পরিবর্তন যা বাঙালির আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে সংগায়িত করে রাজা রামমোহন রায় বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের নেতৃত্বে কুসংস্কার দূরীকরণ নারী শিক্ষা ও বাংলা গদ্যের বিকাশের মাধ্যমে একটি আত্মসচেতন আধুনিক ও উদারনৈতিক বাঙালি জাতিসত্তার ভিত্তি স্থাপিত হয় যা একই সাথে ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য জ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটায় ।

নবজাগরণে বাঙালির আত্মপরিচয় সৃষ্টির মূল দিকসমূহ–
যৌক্তিক ও সমাজ সংস্কারক মনোভাব রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রোধ এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রবর্তন সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করে একটি মানবিক ও আধুনিকষ বাঙালি সমাজ গঠনের পথ প্রশস্ত করেন ।
শিক্ষা ও বাংলা ভাষার পুনর্জাগরণ হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা (১৮১৭) এবং বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মধুসূদন দত্ত বাঙালির মধ্যে জ্ঞান তৃষ্ণা ও নিজস্ব ভাষা প্রতি অনুরাগ তৈরি করে । মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাত ধরে ইউরোপীয় ধারা প্রবর্তন এবং বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনীতে আধুনিক 'আমি'র বোধ ও বাঙালি পরিচয় এর অনুসন্ধান শুরু হয় । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রাচীন ভারতীয় বিদ্যার সাথে পাশ্চাত্য দর্শনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাঙালিকে নিজস্ব শিকড়ের সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেন ।
রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনা ১৯ শতকের শেষার্ধে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ও বিপিনচন্দ্র পালের মতো নেতাদের হাত ধরে রাজনৈতিক সচেতনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবি জোরালো হয় যা বাঙালির আত্মপরিচয়কে আরো মজবুত করে ।
নারী শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন নারী শিক্ষাকে অগ্রগণ্য করে নারী পুরুষের সমতা ও আধুনিক পারিবারিক কাঠামো তৈরীর উদ্যোগ নেওয়া হয় । এই সময়কালে কেবল সমাজ সংস্কারী নয় শিল্প ও সাহিত্য যেমন মাইকেলের বঙ্গভাষার স্তুতি ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষের মাধ্যমে বাঙালিরা নিজেদের কেবল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেনি বরং একটি আধুনিক শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী বাঙালি জাতির ভিত্তি স্থাপন করেছিল এটি ছিল মধ্যযুগীয় অন্ধকারের অবসানে এবং আত্ম দর্শন ও আত্ম প্রতিষ্ঠার নতুন যুগ ।

রবীন্দ্রনাথ নজরুল ও বাঙালি সংস্কৃতির অস্মিতা 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালির সাংস্কৃতিক অস্মিতা বা আত্মপরিচয়ের প্রধান দুই স্তম্ভ রবীন্দ্রনাথ যেখানে বিশ্বজনীনতা ও মানবতাবাদ ও শিল্পকলা দিয়ে বাঙালিকে আধুনিক মননে সাজিয়েছেন নজরুল সেখানে সাম্যবাদ বিদ্রোহ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা দিয়ে বাঙালিকে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলেছেন তাদের মিলিত সাহিত্য ও সুর বাঙালির জাতিসত্তা গড়েছে ।

 রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল : অস্মিতা গঠনের ধারা 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংস্কৃতির ধ্রুপদী রূপ রবীন্দ্রসাহিত্য গান রবীন্দ্র সংগীত ও দর্শন বাঙালির ভদ্রলোক সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার মূল ভিত্তি যা আমাদের বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে ।
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহ ও সাম্য নজরুলের কবিতা ও গান বিশেষ করে বিদ্রোহী বাঙালিকে শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত করেছে ।
রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ এবং নজরুলের অসাম্প্রদায়িক বিদ্রোহ উভয়েই বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ যা আমাদের স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় গঠন করেছে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির হৃদয়ের কোমলতা ও শিল্পবোধ অন্যদিকে নজরুল বাঙালির সূর্য ও প্রতিবাদের প্রতীক তাদের সম্মিলিত রচনাশৈলী বাঙালির আত্মপরিচয় কে সমৃদ্ধ ও সম্পূর্ণ করেছে ।

বাংলার সংস্কৃতির প্রতীক : নদী ও প্রকৃতি– নদী ও প্রকৃতি বাংলার জনজীবন, অর্থনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ । নদীমাতৃক জীবনযাত্রা, উৎসব, লোকসংগীত ও সাহিত্য যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির ছন্দে আবর্তিত । রবীন্দ্রনাথের লেখনী থেকে লালন, হাসন রাজা, রাধারমণের গানে নদীতীরবর্তী মানুষের প্রেম, বিরহ,  জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক সাধনার গভীর প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে । নদী কেবল জলধারা নয়, এটি জীবনের গতিময়তা জন্ম ও বিলয়ের প্রতীক । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গীতাঞ্জলি' ও বিভিন্ন উপন্যাসে নদীপ্রেমও আত্মসমর্পণের রূপক । 'মাছে ভাতে বাঙালি' ধারণার মূলে রয়েছে নদীকেন্দ্রিক কৃষি ও মাছের উৎপাদন নদীগুলো জনপদ জীবন ও সংস্কৃতির ধারক ।
সাংস্কৃতিক উৎসব–পহেলা বৈশাখ, লোক সাহিত্যের ছড়া, ধাঁধা, রূপকথা ও উপকথার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখ ও সামাজিক অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয় । লোকসংগীত ও বাউলদর্শন, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি, কবিগান বাঙালি সংস্কৃতি অবিচ্ছেদ্য অংশ যা মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও আধ্যাত্মিকতা তুলে ধরে । যাত্রাপালা, এবং দুর্গোৎসব নবান্ন পৌষ পার্বণ, পিঠেপুলি, আলপনা মৃৎশিল্প এবং বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবীর পূজা (যেমন, মনসা ও চন্ডী) বাংলার নিজস্ব জাতিসত্তার পরিচয় বহন করে ।  উৎসবগুলি বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ । মাছ-ভাত, পিঠে-পুলি এবং ধুতি-শাড়ি পাঞ্জাবির মতো বিষয়গুলো বাঙালিরশ হাজার বছরের অস্মিতা । বঙ্গ রাঢ ় ১৫বর্ধন থেকে শুরু করে সুলতানি আমলের সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ বাংলার নিজস্ব অস্মিতা বা সত্তা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে । বাংলাসাহিত্য ও সংস্কৃতির এই বিবর্তনই বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে একটি স্বতন্ত্র ও প্রগতিশীল জাতি হিসেবে তুলে ধরেছে ।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বাঙালির অস্মিতা

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালির অস্মিতা

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিসরে বাঙালির অস্মিতা বা আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন নতুনভাবে উত্থাপিত হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন, নগরায়ন, বিশ্বায়ন—এসব ঘটনাপ্রবাহ বাঙালির জীবন ও মানসিকতায় গভীর প্রভাব ফেলে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। ফলে বাংলা সাহিত্য শুধু নন্দনতাত্ত্বিক সৃষ্টির ক্ষেত্র নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয় নির্মাণ ও সংকটেরও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে ওঠে।
১. দেশভাগ ও বাঙালি অস্মিতার সংকট
১৯৪৭ সালের দেশভাগ বাংলা সমাজে এক গভীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক অভিঘাত সৃষ্টি করে। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভক্ত বাস্তবতা লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু জীবনের জন্ম দেয়। হারানো ভিটেমাটি, বিচ্ছিন্নতা, স্মৃতি ও বেদনার অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যকে নতুন বিষয়বস্তুর দিকে পরিচালিত করে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, দেবেশ রায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ প্রমুখ লেখকের রচনায় উদ্বাস্তু জীবন, সামাজিক পরিবর্তন ও পরিচয়ের সংকট গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এই সাহিত্যিক সৃষ্টিতে বাঙালির অস্মিতা একদিকে স্মৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গঠিত।
২. ভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনা
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ভাষা বাঙালি অস্মিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। পূর্ববাংলায় (পরবর্তীকালে বাংলাদেশে) ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষাকে জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে স্থাপন করে।
এই আন্দোলনের প্রভাব বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাসে ভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার বোধ নতুনভাবে প্রকাশিত হয়। বাংলা ভাষা তখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং জাতিসত্তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. নগরজীবন, আধুনিকতা ও মধ্যবিত্ত মানস
স্বাধীনতার পর কলকাতা ও অন্যান্য শহরে দ্রুত নগরায়নের ফলে মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট, একাকিত্ব, কর্মসংস্থানের সমস্যা এবং সামাজিক পরিবর্তন বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ প্রমুখ কবির কবিতায় আধুনিক নগরজীবনের নিঃসঙ্গতা, হতাশা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন গভীরভাবে প্রকাশ পায়। অন্যদিকে মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্য প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামকে সামনে নিয়ে আসে, যা বাঙালি অস্মিতাকে আরও বিস্তৃত ও মানবিক মাত্রা প্রদান করে।
৪. লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কার
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সংস্কৃতিতে লোকঐতিহ্য, গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক ইতিহাসের প্রতি নতুন আগ্রহ দেখা যায়। সাহিত্য, সংগীত ও গবেষণায় বাউল, ভাটিয়ালি, পালাগান, মঙ্গলকাব্যের ঐতিহ্য নতুনভাবে আলোচিত হয়।
এই পুনরাবিষ্কার বাঙালির সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে আধুনিকতার সংযোগ স্থাপন করে। ফলে বাঙালি অস্মিতা কেবল আধুনিক নগরসংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গ্রামীণ ও লোকঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত থাকে।
৫. সমকালীন সময় ও বহুমাত্রিক অস্মিতা
বর্তমান সময়ে বিশ্বায়ন, প্রযুক্তি, অভিবাসন ও গণমাধ্যমের প্রভাবে বাঙালি সমাজে নতুন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছে। বাংলা সাহিত্যে এখন নারী-চেতনা, দলিত সাহিত্য, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও পরিচয়-রাজনীতির প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফলে বাঙালির অস্মিতা এখন বহুস্বরিক ও পরিবর্তনশীল—যেখানে ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং সমকালীন অভিজ্ঞতা একত্রে মিলিত হয়ে নতুন আত্মপরিচয় নির্মাণ করছে ।

বাঙালির আত্মপরিচয়ের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণের উপায় 

বিশ্বায়নের যুগে প্রযুক্তির প্রসার ও সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের ফলে বাঙালি সংস্কৃতিকে অপসংস্কৃতির প্রভাব বেড়েছে । ফলে নিজস্ব ভাষা, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যকে হুমকির মুখে ফেলে আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করেছে । পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক পরিচ্ছদে পরিবর্তন এবং প্রজন্ম শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে ।

বিশ্বায়ন ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট : প্রধান দিকসমূহ 

বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বব্যাপী একটি সমজাতীয় সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছে যা স্থানীয় সংস্কৃতির অনন্যতা নষ্ট করছে । বাঙালি ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের জায়গা নিচ্ছে অপসংস্কৃতি । বিশ্বায়ন প্রতিযোগিতার যুগে বাংলাভাষার ব্যবহার কমে যাচ্ছে এবং অপপ্রয়োগ বাড়ছে । ভাষার অবমাননা বাঙালিরশ মূল পরিচয়কে সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে । বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতি মানুষের রুচি ও জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে । ফলে আত্মপরিচয়ের চেয়ে বিলাসিতা ও ভোগবাদ প্রধান হয়ে উঠেছে । ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্ন সংস্কৃতির অবাধ্য প্রবেশ পারিবারিক ও সামাজিক আচার-আচরণে পরিবর্তন এনেছে । বিশ্বায়নের প্রভাবে অনেকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ধারণ করছে । এরই নাম 'সংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা' ।

এই সংকট কাটিয়ে উডঠতে হলে নিজেদের শিকড় ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করার পাশাপাশি বিশ্বায়নের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করতে হবে । নিজস্ব ঐতিহ্যের চর্চা এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক গণজাগরণ সৃষ্টি করা প্রয়োজন । আধুনিকতা বিশ্বায়ন, ভোগবাদ ও মুক্তবাজারের জটিল আবর্তে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ঘুরপাক খেলেও তার নিজস্ব শক্তি দিয়েই বাঙালি জাতি তার আত্মপরিচয়কে তুলে ধরবে । কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী এজন্যই দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, 
'যে কেড়েছে বাস্তুভিটা সে কেড়েছে ভয় 
আকাশ জুড়ে লেখা আমার
আত্মপরিচয় ।