Thursday, April 26, 2018

যমকীর্তন ও হটিকীর্তন

ঊনকোটি জেলা ও উত্তর ত্রিপুরায় বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে গীত হয় শ্রীকৃষ্ণের গোষ্ঠ লীলাকীর্তন।
শ্রাদ্ধবাসরে হওয়ায় এই কীর্তনের নাম 'যমকীর্তন' ৷
দক্ষিণ ত্রিপরায়ও শ্রাদ্ধবাসরে এধরণের কীর্তন হয় ৷ নোয়াখালি চট্টগ্রাম থেকে উঠে এ অঞ্চলের হিন্দু ও বৌদ্ধ ( বড়ুয়া ) জনগণের সংস্কৃতিতে এই বিষয়টা রয়েছে ৷ এই কীর্তনকে এই অঞ্চলে বলা হয় 'হটি' কীর্তন ৷ হিন্দুবাড়িতে 'নিমাই সন্ন্যাস',  'হরিশ্চন্দ্রের শ্মশানমিলন',  বৌদ্ধদের অনুষ্ঠানে 'বুদ্ধ সন্ন্যাস' কীর্তন করা হয় ৷

ঊনকোটি জেলা ও উত্তর ত্রিপুরার যমকীর্তন আর আমাদের হটিকীর্তন দুটোরই পরিবেশন প্রক্রিয়া ভিন্ন ৷ কিন্তু একই উদ্দেশ্য ফল্গুধারার মতো অলক্ষ্যে প্রবাহিত ৷ গোষ্টলীলার বিষয়বস্তুতে যেমন মায়ের সঙ্গে সন্তানের ক্ষণিক বিচ্ছেদবেদনার আবহ রয়েছে তেমনি নিমাইয়ের সন্ন্যাসযাত্রাও এক বিচ্ছেদবিধূর কাহিনি ৷ তেমনি ভাগ্যদোষে রাজা হরিশ্চন্দ্রেরও স্ত্রীপুত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শ্মশানচন্ডালের জীবিকায় দিনযাপনও বেদনাঘন ৷ শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে এই পালাগুলো নির্বাচনের মধ্যেও অনির্দেশের পথে চলে যাওয়া প্রিয়জনের জন্যে বেদনার সুরটিই ধ্বনিত ৷ সেই বেদনার প্রকাশের প্রতীকী রূপ এই জাতীয় সংগীত ৷ স্থান ভেদে প্রকাশভঙ্গি হয়তো আলাদা কিন্তু অভিপ্রায় এক ৷

Wednesday, April 25, 2018

উ পা য় বলো না

সমালোচনাটা বড্ডো প্রয়োজন ৷পরিণতি ও পূর্ণতার জন্যে ৷ সমালোচনা না হলে সৃজনকর্মীর সঠিক দিশাও আসেনা ৷ সমালোচনার দ্বারা লালিত না হলে একজন সৃজনকর্মী হারিয়ে যেতে বাধ্য ৷ এগোলেও ধুঁকতে ধুঁকতে এগোবে ৷ ফলত সৃষ্টিভুবনও পিছিয়ে পড়ে দক্ষ সৈনিকের অভাবে ৷ এ আমার জীবন অভিজ্ঞতা ৷ দীর্ঘকাল এই চারণভূমিতে আছি নিষ্ঠার সঙ্গে,  কোথাও তার ছাপ রাখতে পারলামনা ৷ আসলে আমি এই চারণক্ষেত্রে সাহিত্য নামক তৃণ আহরণ করেছি কী ভোজন করেছি কিছুই জানতে পারিনি ৷ ঢাউস ঢাউস সমালোচনা গ্রন্থ, পাতার পর পাতা আলোচিতপৃষ্ঠায় এ অধম অনালোচিত ৷ একারণেই আমার সৃজনের ভরাডুবি ঘটেছে, শুধু কয়েক পংক্তির সমালোচনার হরিণতৃষ্ণায় ৷ এজন্যেই আমি উত্তরপ্রজন্মের সৃজনের গঠনাত্মক সমালোচনা করি ৷ এঁদের সৃজন যেন পথ না হারায় ৷আমার মতো ৷ পিঠ চুলকাইনা ৷ পিঠ চুলকানো সমালোচনা কদিন থাকে ৷ হয় সমালোচিতের লেজ মোটা হয়ে যায় ৷ সৃজনের বারোটা বাজে ৷ অথবা সৃজনভূমি থেকে হারিয়ে যায় ৷ কিংবা কিঞ্চিৎ মতান্তরও সহ্য করতে পারেনা ৷ সর্বতোভাবেই সৃজনক্ষেত্রই লাভে মূলে সব হারায়

Friday, April 20, 2018

ঘু ঙু র


ঘুুুুঙুর


রাতঘুঙুরের সুরবাহারি শিসে জেগে ওঠে সুপ্ত তারা
মেঘের জমাট জীবাশ্মের শরীর ছুঁয়ে হেঁটে যাই নিঝুম
স্নায়ুর ভেতর বেজে ওঠে বুনো মাদল দুরন্ত আওয়াজে
হরিনীরা ঈশ্বরীর মতো ঘুরে বেড়ায় জোছনার ঘাসবনে


প্রাচীন ঘরের সব দরোজায় শেকল টেনে বেঁধে রেখে
আত্মপ্রসাদে নিশ্চিন্ত হই কাঁটাতারের আড়ালে
বিষাগোধূলির ভদ্রাসন ভুলে পর্ণমোচী সুখের ইসারায়
জমি- জিরেত, পুকুর-কুটুম্ব ফেলে যাই ৷ গ্রস্ত হই নিকষ আঁধারে ৷


শতাব্দীপ্রবীন ভূভাগের বুক জুড়ে যখন কান্নার সুর বাজে
দেখি যতো পিতৃপুরুষেরা গান ধরেন বিচ্ছেদী উঠোনে
আমরা পরস্পর চোখে চোখ রাখতে পারি না কেন যে
চেয়ে থাকি দিগন্তের দিকে কখন ভেসে উঠবে আলোকের গান


মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙে ৷ প্রাগৈতিহাসিক ঘুম টুটে আমাদের ৷
তখন হৃদয়ে আলোড়ন তুলি, আমরা সব কাতর কবিয়াল ৷


ঘে রা ও

পেছনে শত্রুরা ব্যুহ রচনা করে ফেলেছে
তই ফিরে যেতে গেলে সাহস লাগে, প্রয়োজন সহযোদৃমন্ডলের পেশি ও অস্ত্র
যে রসায়নে এগিয়েছি তীব্র বীরত্বে ও শৌর্যে
ফেরার পথে সর্বহারার শূন্যতা গাঢ়
দুর্বল স্নায়ু ও উরুর দৃঢ়দম্ভ

এভাবে কী আর পেছন ফেরা যায়!
এগিয়ে গেলেও কী ঝুলবে রাষ্ট্রীয় মাদল
আর মহার্ঘ মোহর?

Wednesday, April 18, 2018

ধ র্ম

অনুক্ষণ ভিজতে থাকি সৃষ্টির তরলে

চিরকাল চেপে রাখি দুঃখের
গরলে৷

তোমার চোখের উপর রাখলে চোখ
কোথায় মিলায় আমার সব তাপশোক

জীবন জীবনকে খোঁজে এই সারকথা
জীবনের কোলে মাথা রেখে বাঁচে সততা

সতত এই ধর্ম জাগে নিশি আর দিন
সুধাময় সব কর্ম হবে  হৃদয়ে বিলীন

Friday, April 13, 2018

দে দোল, দে দোল

আমাদের দেশে হাতে গোনা যে কয়টি উৎসব প্রায় সব প্রদেশেই অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্যে একটি হল দোল উৎসব ৷ এটি প্রদেশভেদে নানা নামে প্রচলিত ৷ তার মধ্যে দোল ও হোলি সর্বাধিক  প্রচলিত ৷ এটি মূলত রঙের উৎসব ৷ ঋতুর উৎসব ৷ বসন্তোৎসব ৷ বসন্তের দখিন সমীরণে দোলায় প্রিয়জনকে মনের রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার জন্যে সমাজশৃঙ্খলার কিঞ্চিৎ শৈথিল্যের সদ্ব্যবহার করেন তরুণ তরুণীরা ৷ নবযৌবনপ্রাপ্ত নরনারীর মদনোৎসবের সমাজস্বীকৃতির নিদর্শন এই অনুষ্ঠান ৷ এক অর্থে প্রাচীন কৌমসমাজের যৌনাচারমূলক অনুষ্ঠানও এই হোলি ৷ কালক্রমে রাধাকৃষ্ণের প্রণয়োপাখ্যানে উল্লিখিত অনুষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হয়ে বৈষ্ণবীয় অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়ে গেছে ৷ দোল বা হোলিকে কেন্দ্র করে দু তিনটি পৌরাণিক কাহিনি প্রচলিত আছে ৷ প্রথমটি দোলযাত্রার পূর্বদিন পালিত বহ্ন্যুৎসব বা হোলিকা দহন ৷ দ্বিতীয়টি ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে পালিত রাধাকৃষ্ণের দোলযাত্রা ৷

স্কন্দপুরাণের ফাল্গুনমাহাত্ম্য অংশে হোলিকা ও প্রহ্লাদের উপাখ্যান রয়েছে ৷  হোলিকা ছিলেন মহর্ষি কশ্যপ ও তাঁর স্ত্রী দিতির পুত্র হিরণ্যকশিপুর ভগ্নী ৷ দেবতার বরে হিরণ্যকশিপু দেব ও মানববিজয়ী হয়ে দেবতাদের অবজ্ঞা করতে শুরু করলেন ৷ তাঁর পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন বিষ্ণুভক্ত ৷তিনি বিষ্ণুকে পিতার উপরে স্থান দেন ৷ এতে ক্ষিপ্ত হয়ে হিরণ্যকশিপু পুত্র প্রহ্লাদকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার আদেশ দেন ৷ দাদার আদেশে ভগ্নী হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে প্রবেশ করেন ৷ বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ বেঁচে যান কিন্তু হোলিকা অগ্নিতে দগ্ধ হয়ে যান ৷ হোলিকার আগুনে দগ্ধ হবার কাহিনি অবলম্বনে হোলির আগের দিন বহ্ন্যুৎসব ' হোলিকা দহন' বা 'মেড়া পোড়ানো' হয় ৷

এই উৎসবের উৎস প্রসঙ্গে রাধাকৃষ্ণের কাহিনিটিও সুপ্রচলিত ৷ শ্রীকৃষ্ণ একদিন বৃন্দাবনে শ্রীরাধা ও তাঁর সখীগণের সঙ্গে খেলা করছিলেন ৷ সে সময় অকস্মাৎ শ্রীমতী রাধা রজস্বলা হয়ে পড়েন ৷ ঘটনার আকস্মিকতায় রাধা সখীদের ও ব্রজবালকদের সামনে যাতে বিব্রত বোধ না করেন সেজন্যে রাধার লজ্জ্বা ঢাকতে শ্রীকৃষ্ণ বুদ্ধি করে সখীদের সঙ্গে অাবির খেলতে শুরু করেন ৷ এই ঘটনাকে স্মরণ করে হোলি উৎসব পালন করা হয় ৷ অন্যদিকে বসন্তপূর্ণিমার এই দিনে শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামে অসুরকে বধ করেন ৷ কোথাও অরিষ্টাসুরকে বধ করার কথা আছে ৷কোথাও আবার পুতনা রাক্ষসীকে বধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ৷ আবার এই তিথিতে চৈতন্য মহাপ্রভু জন্মগ্রহণ করেন বলে এই তিথিকে গৌরপূর্ণিমা বলে ৷
প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে হোলির বহু বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে ৷ শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণে বসন্তরাসের বর্ণনা আছে ৷ অন্যত্র 'রঙ্গ' নামক উৎসবের বর্ণনা পাওয়া যায় ৷ হর্ষের প্রিয়দর্শিকা ও রত্নাবলী এবং কালিদাসের কুমারসম্ভব ও মালবিকাগ্নিমিত্রম্ এ ও বসন্তোৎসবের উল্লেখ আছে ৷ কালিদাসের ঋতুসংহার এ পুরো একটি সর্গে বসন্তোৎসবের বিবরণ রয়েছে ৷ ভারবি, মাঘ এবং অন্য কয়কজন কবিও কাব্যে বসন্ত বর্ণনা করেন ৷ নারদপুরাণ, ভবিষ্যপুরাণ ও জৈমিনী মীমাংসায় রঙের উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায় ৷ তিন শো খ্রিস্টাব্দের এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক হোলিকোৎসব পালনের উল্লেখ পাওয়া যায় ৷ আল বেরুনির বিবরণে জানা যায় মধ্যযুগে কোনো কোনো অঞ্চলে মুসলমানরাও হোলিকোৎসবে সামিল হতেন ৷
কবি বিদ্যাপতি থেকে শুরু করে সুরদাস, রহিম,পদ্মাকর,জায়সী,মীরাবাই,কবীর এবং বিহারী, কেশব,ঘনানন্দ প্রমুখ অনেক কবির প্রিয় বিষয় ছিল বসন্ত ৷ মহাকবি সুরদাস বসন্ত ও হোলির উপর আটাত্তরটির মতো পদ রচনা করেছিলেন ৷ এ ছাড়া সুফি সন্ত হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া, আমির খসরু এবং বাহাদুর শাহ জাফর প্রভৃতি মুসলমান কবিগণও হোলিবিষয়ক সুন্দর পদ রচনা করেন ৷ এ থেকে অনুভব করা যায় যে দোলযাত্রা একটি ধর্মনিরপেক্ষ অনুষ্ঠানও বটে ৷আর এক্ষেত্রে অনুষ্ঠানটিকে আধুনিকতায় নিয়ে দাঁড় করান কবি সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালন প্রবর্তন করে ৷ যৌবনোচ্ছ্বল উল্লাসের পাশাপাশি সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে তুলে ধরার এক অনন্য অনুষ্ঠান ও উৎসব এই হোলি ৷

বি রা ন

প্রতিটি স্নিগ্ধ সকালের গচ্ছিত রাখি আমার দৈনন্দিন সুখ ৷ পাহাড়ের গ্রীবার কাছে আমি মুখ রেখে সকল পংক্তি সাজাই কাব্যিক আকারে ৷ সেতুবন্ধের যে গান রচনার কথা ভেবে সাজাই কাগজ ও কলম, সেতুভঙ্গে ছিন্ন হয় দুপারের ভালোবাসার জড়োয়া অলঙ্কার ৷ স্বপ্নভাঙা  নদী বেয়ে জল যায় মহামিছিলের মতোন ৷ আর দুখি মানুষজন লুকিয়ে চুরিয়ে অশ্রু মিশিয়ে নোনা করে জল ৷ আমিও নোনাজলে স্নান করে বিবর্ণ হই ৷

আমার গীতল কথামালা ছন্নছাড়া পোড়া টিলার মতো আগামী জুমফসলের আশায় বিরান হয়ে যায় ৷