Wednesday, December 16, 2020

পৌষের পাঁচালি : হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ‍্য ও সংস্কৃতি

পৌষের পাঁচালি  :  হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ‍্য ও সংস্কৃতি 
                                        
                                                  অশোকানন্দ রায়বর্ধন

'কারো পৌষমাস । কারো সর্বনাশ' । এটি একটি প্রচলিত প্রবাদ । তার অর্থ পরিস্ফুট করলেই এই মাসটির বৈশিষ্ট‍্য প্রকাশ পায় । আমাদের ষড়ঋতুবৈচিত্রের মধ‍্যে শীতঋতুর শুরু পৌষমাস থেকে । অঘ্রাণের শেষেই পৌষমাস আসে । হেমন্তের সাথে শীতের পরশ লাগে সর্বত্র । হেমন্তের শেষভাগে কুয়াশা পড়তে শুরু করে । পৌষমাসে তা আরো গাঢ় হয় । সন্ধ‍্যার পর থেকেই কুয়াশায় ঢেকে যায় চারদিক । রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে চারদিক সাদা আস্তরনে ঢেকে যায় । তা প্রায় পরের
দিন সকাল পর্যন্ত থাকে । সকালে ঘাসের বুকে মুক্তোবিন্দুর মতো শিশির জমে থাকে । প্রভাতী সূর্যের রথআলো তার উপর পড়লে ঘাসের বুকে অজস্র হীরকদ‍্যুতিবিন্দুতে মাঠ-ঘাট উজ্জ্বল হয়ে ওঠে । শীতও ধীরে ধীরে সংসার গুছিয়ে নিতে থাকে এই সময়ে । ইংরেজি ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে আসে পৌষমাস ।

     কৃষিপ্রধান আমাদের দেশে বর্ষাকাল থেকে শুরু হয় খেতখামারের কর্মতৎপরতা । আর এই কর্মযজ্ঞের পরিসমাপ্তি ঘটে হেমন্তের শেষে । অর্থাৎ অঘ্রাণের শেষ নাগাদ । এসময়ে কৃষকের পরিশ্রমের ফসল ঘ‍রে আসে । জীবন-জীবিকা নিয়ে সংবৎস‍রের স্বপ্ন ও পরিশ্রম সার্থকতা লাভ করে । গৃহস্থের মন আনন্দে ভরে ওঠে । পৌষমাসব‍্যাপী চলে ধান মাড়াই , ঝাড়াই-বাছাই এবং শুকিয়ে ঘরে তোলার কাজ । সারাবছরের রসদ এবং অর্থনীতি নির্ভর করে এইসময়ে সংগৃহীত ফসলের উপর । যার ঘরে ধান আছে তার সুদিন আছে । আর যার ঘরে ধান নেই, ফসল নেই , কোনো কারণে নষ্ট হয়ে গেছে কঠোর পরিশ্রমে ফলানো ফসল । তার দুঃখের অন্ত নেই । পরবর্তী বছরে ফসল আসা পর্যন্ত তাকে কঠিন অভাব অনটনের মধ‍্য দিয়ে দিন কাটাতে হবে । অনিশ্চিত জীবন তার সামনে । একারণেই প্রাগুক্ত প্রবাদটি ব‍্যবহার করা হত কৃষিভিত্তিক জীবনে । পরবর্তী সময়ে কারো সুখদুঃখের বৈপরীত‍্যের তুলনা করতে এই প্রবাদটি ব‍্যবহার করা হয় । কৃষিজীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ প্রবাদের অর্থবিস্তার ঘটে পরবর্তী সময়ে ।

         কৃষিভিত্তিক সাংস্কৃতিক জীবনে পৌষমাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।'ও মা অঘ্রাণে তোর ভরা খেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি' । সেই হাসি পৌষমাসে এসে গৃহস্থের ঘর আলো করে ঝরে পড়ে । উঠোনভর্তি সোনার ধান দেখে গৃহস্থের মনে আনন্দ ধরেনা । আনন্দের আবেশে সারামাস ধরে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলতে থাকে । যার পরিসমাপ্তি ঘটে মাসের শেষদিন অর্থাৎ সংক্রান্তির দিন । কিছুটা ব‍্যস্ততাহীন জীবনে নানাভাবে উপভোগ করা হয় এই মাসটিকে । ঘরে ধান আছে মানে ধনও আছে । অর্থনীতি সচল আছে । ধনের সঙ্গে লক্ষ্মীর সম্পর্ক । লক্ষ্মী ধনের দেবী । ধানেরও দেবী । তাই পৌষমাসকে লক্ষ্মীমাসও বলা হয় ।

      একসময় পৌষের কর্মকান্ড শুরু হয়ে যেত গ়হস্থের উঠোন থেকে । ধানের মরাইয়ে ধানের আঁটি গুছানোর পর উঠোনটাকে মাটি ও গোবরের মিশ্রণ দিয়ে লেপা হত । ধান মাড়াইয়ের পর এই নিকোনো উঠোনেধান শুকোতে দেওয়া হত । ধান শুকিয়ে গোলায় তোলার পর শূন‍্য উঠোনের বুক আবার ভরে উঠত নানা শিল্পকর্মে । ঊঠোনটাকে লেপার সময় সুপারিগাছের ঝরে যাওয়া পাতার খোলটাকে সংগ্রহ ক‍রে  সেই খোলের একদিকে সুন্দর করে বিশেষ সুঁচালোভাবে কেটে তা দিয়ে ভেজা লেপা উঠোনের মাটির বুকে দাগ টেনে বিভিন্ন নকশা ফুটিয়ে তোলা হত । মেটে রঙের এই নকশা উঠোনটাকে একটা আলাদা সৌন্দর্য এনে দিত । এছাড়া নতুন ধান কুটে চাল বের করে সেই চালের গুঁড়ো দিয়ে উঠোনময় আঁকা হত আলপনা । প্রধানত মহিলারাই এই আলপনা দিয়ে থাকে । ক়ষিজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়ের চিত্র থাকত আলপনায় । ধানের ছড়া, ঘট, লক্ষ্মীর পা, ধানের মরাইয়ের চিত্র, পাতা-লতা ইত‍্যাদি ছিল আলপনার বিষয় । এখন আর আগের মতো বড়ো উঠোন নেই । এক পরিবার ভেঙে দশ পরিবার হয়েছে । মাটির বাড়িঘর হয়ে গেছে দালানবাড়ি । ছোট্ট উঠোনেও সিমেন্ট কংক্রিটের ঢালাই ।তাছাড়া এখন বাজারে স্টিকারের মতো আলপনার সিট কিনতে পাওয়া যায় । কাজেই কে আর আলপনার ঝামেলা করতে যাবে ।

       পৌষমাস এলে, ঘরে ধান উঠলে  পিঠে পায়েস পুলির তৈরির ধুম লেগে যেত গ্রামের ঘরে ঘরে । গভীর রাত পর্যন্ত ঢেঁকিতে চাল কুটে গুঁড়ি তৈরি করা হত । অনেকরাত পর্যন্ত ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ার শব্দ রাতের নিস্তব্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করে দিত । 'ও ধান ভানো রে ভানো রে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া ।ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া'―এইসব গান গেয়ে মেয়েরা ঢেঁকিতে চালের গুঁড়ি করত । এ নিয়ে প্রতিবেশিনীর সঙ্গে চলত প্রতিযোগিতাও । ঢেঁকির যে অংশে মেয়েরা পা দিয়ে চাপ দিত  সেখানটায় ঢেঁকির নিচে একটা পিঁড়ি পেতে রাখা হত । পাড় দেওয়ার সময় ঢেঁকিটা পিঁড়িতে লাগলে জোরালো শব্দ হত । এতে করে তারা পাড়াময় জানান দিত যে তারা ঢেঁকিতে চাল কুটছে । আজকের প্রজন্মের কাছে ঢেঁকি শুধু গল্পকথা । সকাল হতেই গ্রামের প্রতি ঘরে শুরু হয়ে যেত পিঠে বানানো । বাড়ির মেয়েরা চালের গুঁড়ির সঙ্গে নানা উপাদান মিশিয়ে তৈরি করত নানারকমের উপাদেয় পিঠে । ভাঁপা পিঠে, চিতই পিঠে,  মালপোয়া, পাটিসাপটা, পুলি, ঝালপিঠে এবং পায়েস ইত‍্যাদি । পিঠে সুগন্ধযুক্ত ও সুস্বাদু করার জন‍্যে ব‍্যবহার করা হত  গোবিন্দভোগ বা খাসার চাল ।  তার মধ‍্যে কালিখাসা বা তিলককচুরির চাল সর্বোত্তম । ধনেপাতা বাটা, পুদিনাপাতা বাটা, সর্ষে বাটা অথবা সিদলের ঝাল ভর্তা দিয়ে চিতই পিঠে মুখে দিলে ঝালের চোটে কান গরম হয়ে গা থেকে শীত ছেড়ে যেত । আজকের দিনের তরুণ-তরুণীরা মোমো, বার্গার, পিজা,পকোড়া ইত‍্যাদির মধ‍্যে কসমোপলিটন খাবারের স্বাদ পায় ঠিকই কিন্তু পিঠে, পায়েসের মিস্টি গন্ধযুক্ত স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয় । আজকের দিনে মা-বোনেরাও তেমন আগ্রহ ও নিষ্ঠার সঙ্গে এতোসব পিঠেপুলি বানায়না ।

      পৌষ এসেছে আর খেজুরের রস থাকবেনা, 'রাব' বা 'লালি' থাকবেনা তা কখনো হতনা । খেজুর গাছে রসের হাঁড়ি  এই সময়ের একটা স্বাভাবিক দৃশ‍্য । গ্রামদেশে সকাল হলেই  খেজুর গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামানোর দৃশ‍্য চোখে পড়ে এইসময় । গাছিরা নিপুণভাবে গাছ কেটে এই রস সংগ্রহ করে । সারা রাত খেজুরের রস জমা হয় হাঁড়িতে । সন্ধ‍্যাবেলার রসকে বলা হয় 'সন্ধ‍্যারস' । এই রসের স্বাদ অপূর্ব । সারারাত টুপ টুপ করে ঝরে পড়ে এই রস ,হাঁড়িতে জমা হয় । মেয়েরা এই রস জ্বাল দিয়ে ঘন করে পিঠের উপকরণ হিসেবে ব‍্যবহার করে । রসসংগ্রাহক সকালবেলা গ্রামে বেরিয়ে যেত রস বিক্রির জন‍্যে । খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে তা থেকে 'রাব' বা 'লালি' এবং 'তক্তিগুড়' অর্থাৎ নলেনগুড় তৈরি হয় । আজ আর পৌষমাসে গ্রামেগঞ্জে খেজুরের রসের সেই রমরমা ও তাকে নিয়ে অর্থনীতি ও কর্মব‍্যস্ততা দেখাই যায়না । খেজুরগাছও তেমন  নেই আর নেই কুশলী গাছ কাটার লোক । যার ফলে আজকের প্রজন্ম সুস্বাদু এই পানীয় এবং তার উপজাত দ্রব‍্যের আস্বাদ থেকে বঞ্চিত ।

        পৌষের সকালে ঘুম থেকে উঠে খড়কুটো, নাড়া, লতাপাতা, লাকড়ি জ্বালিয়ে উঠোনে গোল হয়ে বসে আগুন পোহানো বা নিজেদের শরীর গরম করার ফাঁকে ফাঁকে প্রভাতী আড্ডা চলত পৌষের ভোরে । আর আজকের দিনে সেই অলস সময়যাপনের ক্ষণটি কোথায় ? ভোর হতেই ছেলেমেয়েরা পিঠে বইয়ের বোঝা নিয়ে ছুটছে মাস্টারবাড়ি । আর একদল ছুটছে স্কুলবাস ধরতে প্রভাতী বিদ‍্যালয়ে যাবার জন‍্যে । ব‍্যস্ততম জীবনে ক‍্যারিয়ারের পেছনে দৌড়ুতে হচ্ছে এই প্রজন্মকে । অথবা, লেপকম্বলের নিচে হালকা ওমের মধ‍্যে  অলস সকালটা কাটানোর সৌভাগ‍্য নেই আর তাদের ।

     পৌষ এলেই শুরু হয়ে যায় বনভোজনপর্ব । ধানকাটা ফাঁকা মাঠের মাটিতে উনুন তৈরি করে সেখানে  চড়ুইভাতির আয়োজন । পৌষমাসের বনভোজন তাই নাম পোষলা । চড়ুইভাতি মানে চড়ুইপাখির মতো অল্প অল্প সংগ্রহের সম্মিলিত প্রয়াসে হত এই বনভোজন । প্রত‍্যেকের বাড়ি থেকে চাল, ডাল, সব্জি, কারো পুকুরের মাছ, ঘরে পোষা হাঁস,মুরগি ইত‍্যাদি এনে করা হত এই বনভোজন বা চড়ূইভাতি । এই খাদ‍্যদ্রব‍্যসমূহ সংগ্রহ থেকে শুরু করে রান্নাবান্না ও ভোজন সমাধা পর্যন্ত  শিশুকিশোরদের সে কী উন্মাদনা, সে কী আনন্দ তা আজকের দিনে পার্কে আয়োজিত ক‍্যাটারার পরিবেশিত পিকনিক তার ধারে কাছেও আসেনা ।
 পৌষমাসে ছিল কিছু ধর্মীয়সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও । পৌষমাসের শেষদিন অর্থাৎ সংক্রান্তির দিনের উৎসবের জন‍্যে প্রস্তুতি চলে সারামাস । পৌষসংক্রান্তির ভোররাতে কোনো জলাশয়ের ধারে আগেরদিন তৈরি করা কুঁড়ে ঘরে আগুন দিয়ে আগুন পোহাত একসময় ছেলের দল ।  একে বলা হয় 'ভেড়ার ঘর' বা 'মেড়ার ঘর' পোড়ানো । ধানকাটা মাঠের নাড়া বা খড় দিয়ে আগের দিন এই ঘর বানানো , পোড়ানো আর আগুন পোহানোর সেই সম্মিলিত উন্মাদনা এখন আর  নেই । মা-বাবারাও এখন আর তাঁদের ছেলেমেয়েদের শীতের রাতে এজাতীয় অ্যাক্টিভিটিতে ছেড়ে দেননা ।
      সংক্রান্তির দিন প্রতি ঘরে তৈরি হত  নানারকমের পিঠেপুলি ও খাবার । ভোরবেলা স্নানাদি সেরে সূর্যকে পিঠে নিবেদন করার পর চলত নিজেদের খাওয়া দাওয়ার পালা ।  এখনো সেই অনুষ্ঠান কোনো কোনো পরিবারে পালিত হলেও নমো নমো করে সারা হয়  ।আগেকার সেই এলাহি কান্ডকারখানা আর দেখা যায়না এখন আর । পৌষসংক্রান্তির দিন কীর্তনের দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে কীর্তন করে ফল-বাতাসা -কদমা-তিলাইর লুট দিত গৃহস্থের উঠোনে ।  কিঞ্চিৎ নিজেদের ভান্ডে নিয়ে নিত কীর্তনের দল । সন্ধ‍্যার সময় বিশেষ কোনো দৈবী গাছতলায় মিলিত হয়ে কীর্তনের শেষে  সংগৃহীত দ্রব‍্যগুলো প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হত ।  আজকাল আর সেই কীর্তন দেখা যায়না ।

    আর একটি বিরল অনুষ্ঠান করা হত পৌষসংক্রান্তির দিন । গৃহস্থের উঠোনে যে বাঁশের খুঁটি পুঁতে তার সঙ্গে দড়ি দিয়ে গোরু বেঁধে চক্রাকারে ঘুরিয়ে ধান মাড়াইর কাজ করা হত তাকে বলা হয় 'মেহির পালা/খুঁটা' বা 'মেইর পালা/খুঁটা' । এই খুঁটির চারপাশ লেপে পুঁছে  তাকে কেন্দ্র করে আঁকা হত আলপনা । ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে খুঁটির সামনে রাখা হত সারা মরসুমে ব‍্যবহার করা কৃষিযন্ত্রপাতিসমূহ । এই খুঁটি পুজোর পর তাকে তুলে ফেলা হত । পরবর্তী বছরের জন‍্যে । গোলায় তোলা হত সংগৃহীত শুকনো ধান ।  আজ আর তেমন গৃহস্থও নেই । সেই অনুষ্ঠানও আর ,তে দেখা যায়না । 'মেহির পালা বা খুঁটি আজকের প্রজন্মের কাছে অজানা শব্দ । এখন ধান মাড়াই হয় ট্রাক্টর দিয়ে কিংবা অটোরিক্সাকে উঠোনে বিছানো ধানের উপর চালিয়ে দিয়ে অথবা ধানমাড়াই মেশিনের সাহায‍্যে । গোরু দিয়ে ধান মাড়ানো আজ ইতিহাস ।

এখনও বছর ঘুরে পৌষ আসে পৌষ যায় । পৌষের মাসব‍্যাপী জৌলুস এখন আর নেই । ধান‍্যলক্ষ্মী আজ গৃহস্থঘর থেকে বেরিয়ে কর্পোরেট ধনতেরাসে আশ্রয় নিয়েছে । প্রয়াত সংগীতশিল্পী মান্না দে-র কন্ঠের একটি গানে সে আক্ষেপ আজ ভেসে বেড়ায়―

'পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেইদিন
ফিরে আর আসবেনা কখনো
খুশি আর লজ্জার মাঝামাঝি সেই হাসি
তুমি আর হাসবে কী কখনো.....'

Friday, November 27, 2020

সে আমার ছোটো বোন

সে আমার ছোটো বোন

কলম চলছেনা কিছুতেই । শব্দ খুঁজে পাচ্ছিনা কিছুতেই । গত সন্ধ‍্যায় সংবাদটা পাওয়ার পর থেকে যেন স্থবির হয়ে গেছি । আমার শিক্ষকতা জীবনের একেবারে শুরুর দিকের ছাত্রী রীতা । রীতা কর । সাব্রুম উচ্চতর মাধ‍্যমিক বিদ‍্যালয়ে সাতের দশকের শেষ বছর অল্প কয়েকদিনের ব‍্যবধানে শিক্ষকতায় যোগ দিই অগ্রজপ্রতিম দীপক দাস (স্বপন স‍্যর ) ও আমি । তখন রীতা গার্লস স্কুলে পড়ত । সেখান থেকে মাধ‍্যমিক পাশ করার পর আমাদের স্কুলে এসে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয় । আমি আর স্বপনদা সেসময়ে ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ দেখে তদ্বির করে স্কুলে বাণিজ‍্য বিভাগ চালু করালাম । শ্রীনগর থেকে এসে সদ্য জয়েন করলেন নেপাল সরকার । তিনজন মিলে শুরু করলাম একাদশ দ্বাদশ শ্রেণির বাণিজ্য বিভাগের ক্লাশ । সাব্রুম হায়ার সেকেন্ডারির তখন সোনালি দিন । ডাকসাইটে শিক্ষকরা সব আছেন এখানে । সবাই এ স্কুলে পড়তে চায় । তখন কেবল একাদশ দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে মেয়েরা পড়তে পারত । গার্লস স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ না থাকায় । 

কমার্স খোলায় দুটি মেয়ে এসে ভর্তি হল । একজন রীতা কর । অন‍্যজন পন্ডিতমশাই যশোদাজীবন গোস্বামী স‍্যরের মেয়ে । দুবছর পড়েছিল সে আমাদের স্কুলে । পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধূলায়ও ভালো ছিল রীতা । থ্রোয়িং ইভেন্টে সে ছিল দক্ষ খেলোয়াড় । মাত্র দুবছরের হলেও গোটা জীবন ছাত্রী-শিক্ষকের সম্পর্কে জড়িয়ে রেখেছিল রীতা । কলেজে যাওয়ার পর ছাত্ররাজনীতিতে যোগ দেয় । সেসময় আগরতলা মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ছিল তার দাপট । সুস্বাস্থ‍্যের অধিকারীণী রীতার ভয়ে মহিলা কলেজের সামনে রোমিওদের ঘুরঘুর করা একদম থেমে গিয়েছিল সেসময়ে । কলেজ থেকে বেরিয়ে এসে সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দেয় রীতা । সাংগঠনিক দক্ষতার জোরে দলের একেবারে প্রথম সারিতে চলে আসে ।  আমার বহু ছাত্রছাত্রী আজ দেশবিদেশে প্রতিষ্ঠিত । তাদের অনেকের সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা হয় । যোগাযোগ হয় । একদম কাছ থেকে উঠে আসতে দেখেছি রীতাকে । 
এই মহকুমায় আমার বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রী রয়েছে যারা রাজনীতির অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত তাদের সাংগঠনিক দক্ষতার জন‍্যে । রীতা কর, অরুণ ত্রিপুরা, শান্তিপ্রিয় ভৌমিক, তাপস লোধ,দীপক দে, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী  সহ আরো অনেকে বিভিন্ন ফ্রন্টে । সবার সঙ্গেই আমার সুসম্পর্ক । যেকারণে আমি প্রত‍্যক্ষ রাজনীতিতে জড়াইনা । রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দিতা থাকে । থাকে কালি ছেটানোর প্রতিযোগিতা । কিন্তু আমি লক্ষ করেছি রাজনীতিবিদদের একটা বড়ো অংশই কিন্তু ব্যক্তিগত লাভালাভ বা প্রতিষ্ঠার চাইতে সমাজের কল‍্যাণের জন্যে রাজনীতিতে আসে । তাই রাজনীতির মানুষদের আমি শ্রদ্ধা করি । সে যে দলেরই হোক । রীতার ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার আমি প্রায় প্রত‍্যক্ষদর্শী । একসময় সাব্রুম নগর পঞ্চায়েতের চেয়ারপার্সন হল । তারপর দুইবার বিধানসভার সদস‍্যা । চাকুরিসূত্রে ভোটগণনার দায়িত্ব পেতাম । দুবারই জেতার পর কাউন্টিং হলের ভেতর সে আমাকে প্রণাম করে আশীর্বাদ চেয়েছে । 

শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ছিল ওর ছিল দারুণ আগ্রহ । একবার ত্রিপুরা রবীন্দ্রপরিষদের শাখা খোলার চেষ্টা করা হল । বিলোনিয়া রবীন্দ্রপরিষদের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল দাশ এলেন । কথাবার্তা হল, সভা হল । কিন্তু একটা অদৃশ‍্য শক্তির সন্দেহের কারণে তা ভেস্তে গেল। কদিন আগেও এক আলাপচারিতায় সে কথাটা তুলেছিল । এ দুঃখটা তার আজীবন রয়ে গিয়েছিল ।
 তার নিজের বাড়িতে সে একটা নার্সারি স্কুল খোলে । তার একটা শাখা আনন্দপাড়াতে খোলা হয় । সেখানে এখন প্রাইমারির ক্লাশ হয় ।
 মেলা,উৎসব , সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিল্পীদের ডাকা, বাইরের শিল্পীদের আনা, রাত জেগে তাদের তদ্বির করা, বৈশাখিমেলায় সারা রাজ্য থেকে কবিদের আমন্ত্রণ করে এনে কবিসম্মেলন করা রীতার সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বিরল নজির । একবার বাংলাদেশের মহাকাল নাট‍্যদল এসেছিল সাব্রুমে । রীতার আন্তরিক ও মিশুকে স্বভাব এবং প্রটোকলের ধারে কাছেও না থাকায় ওরা প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি যে সে রাজ্য বিধানসভার সদস‍্য । দুই পিজির বাইকে চড়ে সারা নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়িয়ে জনসংযোগ রক্ষা করা, দুর্যোগে ছুটে যাওয়া রীতাই পারত । একারণেই রীতা রীতাদি, রীতাপিসি, রীতামাসি হয়ে উঠেছিল । সাব্রুমে নির্মীয়মান মৈত্রীসেতুর পরিকল্পনার প্রথমদিকে তা বানচাল করার চক্রান্তকে কীভাবে নস‍্যাৎ করা হয়েছিল সেদিন তা সাব্রুমের কয়েকজন সাংবাদিক আর রীতা ছাড়া বিশেষ কেউ জানেননা । 

    রীতা শুধু আমার ছাত্রী নয় । বোন । নিজে অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও আমার শরীরের খোঁজ খবর নিত । পরামর্শ দিত । একবার সীমান্ত হাটে যাওয়ার পথে আমিও সঙ্গী হয়েছিলাম । এই হাটটি চালু করার ক্ষেত্রে তার বিরাট ভূমিকা ছিল সেদিন ।পথে শ্রীনগরের এক কৃষকের সঙ্গে দেখা হয় । তিনি রীতাকে একটা বড়ো তরমুজ দিয়ে আপ‍্যায়ণ করেন। সুগারের রোগি রীতা টপাটপ দুতিন টুকরো তরমুজ খেয়ে আমাকে সাবধান করে, স‍্যর বেশি খাইয়েননা । আন্নের সুগার ।

 গতমাসের শুরুতে আমরা সপরিবারে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম । কে কার যত্ন করবে । কে কাকে রেঁধে খাওয়াবে । সবাইকে আইসোলেশনে থাকতে হয়েছে । রীতা জানতে পেরে টানা দশদিন দুবেলা খাবার পাঠিয়ে গেছে আমার বাড়িতে ।

  ফুল খুব ভালো বাসত রীতা । বাড়িতে আছে বাহারি ফুলের গাছ । উঠোনের একটা হাস্নুহানার কথা খুব বলত । আমন্ত্রণ করেছিল বৌদিকে নিয়ে জোছনারাতে তার বারান্দায় বসে হাস্নুহানার গন্ধ নেওয়ার জন‍্যে । আমাকে এবছর অনেকগুলো ফুলের চারা দেয় ও । প্ল্যান হত তিমিরদাদের বাড়ি গিয়ে ফুলের চারা আনার । আমার উঠোন থেকে কয়েকরকম  ছোটো ফুলগাছের চারা দেওয়ার কথা ছিল । সে আর হয়ে ওঠেনি । 

এই প্রকৃতির মানুষ, পাখি, ফুল আর প্রিয়জনকে ছেড়ে অসময়ে পাড়ি দিল রীতা অনন্তকাননের পথে । চিরশান্তিতে থাকো আমার স্নেহের ছাত্রী, রীতা বোন আমার ।

Thursday, November 5, 2020

ছাঁ। টা ই

ছাঁটাই

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

এভাবেই মুছে যাই, মুছে যেতে হয়
যারা ভালোবাসে আর কাছে টেনে নেয়
তাদেরই কেউ কেউ মুছে ফেলে আমাকে 
আর অন্য যারা ভাসমান দোনামনায় আছে
তারাও অবসরবিনোদনের কালে পাঁজিপুথি দেখে
খুঁজছে মাহেন্দ্র কিংবা অমৃতযোগ
কখন ছেঁটে ফেলা যায় আমাকে

এইসব মোছামুছি আর ঘষাঘষির ফলে
আমার শরীরে এখন চুম্বনচিহ্নের মতো
শুধু ফ্যাকাশে ইরেজারের ঘষটানো দাগ

Saturday, October 31, 2020

নী ল চাঁ দ

নীল চাঁদ

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

ভোরের আজানের ধ্বনির আগেই 
আকাশের পশ্চিম প্রান্তের সিঁড়ি বেয়ে
নেমে যায় কোজাগরীক্লান্ত নীল চাঁদ ।

পুরোনো ধাবার পাশে বহুকাল ধরে 
পড়ে থাকা মালিকবিহীন নষ্ট গাড়িটির সারা শরীরে
আগাছা আর জঞ্জালের সাম্রাজ‍্য ।
ক্রমশ বিলীন হয়ে যায় তার নম্বরপ্লেট,
এই অরণ‍্যসংকুল সময়ে পরিচয় হারিয়ে যায়,
যেমন এই নিরেট গাড়িটির জঞ্জালের আড়ালে
দুর্বল হয়ে পড়ে যেন ব‍্যক্তি ও স্বদেশ।

দুঃসময়ে যার নিবিড় লালনের আশায় থাকে
পরিযায়ী কিংবা প্রতারিত মানুষ।
তারাও যাজকের অদ্ভুত হাসিতে মায়াজাল ছড়ায়,
দুখি ও পেটখোলা মানুষের স্বপ্ন ভাঙে ।
বেতালা কাঁসা ঘন্টার বেয়াড়া আওয়াজে
তাতে কী আর উপোসী পেট ভরে ?

Wednesday, October 28, 2020

কা লো মে য়ে

কালো মেয়ে

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আলোরাতের কালো মেয়ে লো  হৈমন্তী ঘ্রাণ তোর গায়ে 
কুয়াশার দীঘল রুমালে তুই  রেখেছিস জড়ায়ে

 লিপিদাগ শীতের আমন্ত্রণের  বিরল টেরাকোটা
লিখেছিস অমোঘ আখরে কালোবরণ ফোঁটা

যতোই জানি তোর ঠিকানা এই যে আঁধারমায়াগলি 
ততোবারই ভুলে যাই আমার কষ্ট গেরস্থালি

  এত কাল অবলীলায় মেখে নিলি তুই অঙ্গে
 তোর আলো বিলিয়ে দিলি তোর রূপটানেরই সঙ্গে ৷
মুগ্ধ

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

তুমি সবখানেতেই দেয়াল তোলো
লজ্জাবতী ছোঁয়ার বারণ
বেলা-অবেলায় আমার ভালোবাসা
তুমি চাও অকারণ ।

তোমার বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ
তাও কী আমার দায় ?
তোমার ইঙ্গিতে উঠব আর বসব
আমার এমন মোহ, হায় !

বা তা স

বাতাস

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

নদীরেখা বরাবর যে পর্যটনক্ষেত্রের সংকেত
তার পাশেই থাকে প্রাদেশিক অশ্বশালার ফসিল
নিঃস্ব ধাবার নির্জনতা থেকে যে বাতাস আসে
তা কোনো একান্ত যুগলের পরিতাপ নেভায়না ।

আদিম সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আগেই
আগুনে হাত সেঁকে নেওয়ার রীতি রেওয়াজ ছিল
এখন বিজয়ীজন গণরায় শেষ হলেই
দস্তানায় লেগে থাকা সমস্ত প্রতিশ্রুতি ধুয়ে মুছে ফেলেন

আর্ত জনপদ থেকে গুমরে ওঠা হা-হুতাশ
দিনযাপনের ব‍্যস্ত ঘূর্ণনে একঘেয়ে মরসুমি সুতো ।