Saturday, February 21, 2026

বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি : সাব্রুমের মৈত্রীসেতু চালু হওয়া নিয়ে আশার আলো দেখছেন দুপারের জনগণ

বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি : সাব্রুমের মৈত্রীসেতু চালু হওয়া নিয়ে আশার আলো দেখছেন দুপারের জনগণ 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন


 বিএনপি দল বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার পর সাব্রুমে আবার উঠে আসছে মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রসঙ্গ । ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়াউর রহমান পর্যায়ক্রমে ১ নম্বর ও ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন । ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস থেকে জুন পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা নিয়ে গঠিত ১ নম্বর সেক্টরের এবং জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ময়মনসিংহ টাঙ্গাইল (কিশোরগঞ্জ বাদে) এলাকা নিয়ে গঠিত ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন । এছাড়া তিনি জেড ফোর্সেরও সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির উপর বর্বর আক্রমণ চালায় তখন জিয়াউর রহমান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাঁর বাহিনী নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন । ২৬ শে মার্চ রাতে প্রায় আড়াইশো বাঙালির সেনা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মেজর জিয়া । ২৭ শে মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে সকাল ১১ টায় মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি পাঠ করেন । জীবন মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে এই অকুতোভয় সেনানায়ক সেদিন স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে নামেন । আর সেসময় তার স্ত্রী ও সন্তানগণ ছিল ঢাকা সেনানিবাসে বন্দী । তা সত্ত্বেও তিনি জেড ফোর্স গঠন করে মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধকে বেগবান করেন । স্বাধীনতা লাভের পর তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের ও নেতৃত্বের জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করেন । ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষে এবং এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তান বাহিনী চট্টগ্রাম দখল করলে মেজর জিয়াউর রহমান অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের নিয়ে সীমান্ত এলাকার রামগড়ে ঘাঁটি গাড়েন । সেখান থেকে রামগড় স্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং পরিচালনা করেন । এপ্রিলের শুরুর দিকে তিনি তাঁর বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ফেনী নদী পেরিয়ে সাব্রুমের হরিণাতে চলে আসেন এবং সেখান থেকে ভারতের সীমান্ত ব্যবহার করে যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকেন । এ সময় ভারতের বিএসএফের লে. কর্নেল ঘোষ, মেজর প্রধান, ক্যাপ্টেন ঘোষ এবং সাব্রুম পুলিশ স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বীরেন মুখার্জি মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করেন । ২৫ শে জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, মিরসরাই, রামগড়, ফেনী ও নোয়াখালিতে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে একাধিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ।

স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে একসময় মেজর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৮১ সালের ৩০ শে মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক  উত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একনম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পালনের সুবাদে জিয়াউর রহমান সাব্রুমের প্রত্যন্ত অঞ্চল শিলাছড়ি, ঘোড়াকাঁপা, বৈষ্ণবপুর, মনুঘাট, আমলিঘাট শ্রীনগর থেকে শুরু করে বিলোনিয়ার নলুয়া, ঋষ্যমুখ, মতাই ইত্যাদি অঞ্চল চষে বেরিয়েছিলেন সেদিন । এই সীমান্ত অঞ্চলগুলি দিয়েই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে আক্রমণ শানাতেন । ফলে এখানকার জনগণের সঙ্গে তার একটা নিবিড় সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল, ৭১এর সে দিনে সাব্রুমের এক সাধারণ ব্যবসায়ী মাখন দের হোটেলে তিনি খাওয়া-দাওয়া করতেন । নিছক ব্যবসায়িক সম্পর্ক হয়েও জিয়াসাহেব না ফেরা পর্যন্ত তিনি খাওয়াদাওয়া করতেন । এছাড়া এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সেসময়ের সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল ।

গত ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের বিএনপি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করায় বহুবছর পরে আবার জিয়াউর রহমানের নাম সাব্রুম তথা দক্ষিণ ত্রিপুরার পুরনো নাগরিকদের র মুখে মুখে প্রকাশ পাচ্ছে । অনেক বয়স্ক জনেরা তার স্মৃতিচারণ করছেন । অন্যদিকে বিগত সরকারের আমলে সাব্রুমের ফেনী নদীর উপরে মৈত্রীসেতু তৈরি হয়েছিল এবং এই মৈত্রীসেতুকে কেন্দ্র করে দুপাড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাতায়াতের একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল । কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে একেবারে মৈত্রীসেতুর দ্বারদঘাটনের মুখে সেদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাক্রমের পরিণতিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কিছু মানুষ ভারতবিদ্বেষী প্রচারে মেতে ওঠে । ফলে দু দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল । তারা মৈত্রী সেতুকেন্দ্রিক সমগ্র কর্মকান্ডের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় । ফলে প্রকল্পটি সাময়িকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে । এবং এই প্রকল্প প্রায় অন্ধকারে চলে যাচ্ছিল । ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই প্রকল্পের সলিল সমাধি ঘটাতে সচেষ্ট ছিলেন । পাশাপাশি রামগড় ও সাব্রুম এর স্থলবন্দরসহ মীরসরাইয়ের এস ই জেড প্রকল্প তাঁরা স্তব্ধ করে দেন । মীরসরাইয়ের প্রকল্পটি বাতিল করে সেখানে বিদেশের সহায়তায় সমরাস্ত্র প্রস্তুত এর কারখানা গড়ার পরিকল্পনা নেন তাঁরা । সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে বাংলাদেশে বিএনপি দল ভূমিধ্বস জয়লাভ করায় ড. ইউনুস এখন ইতিহাসের পাতায় । ইতোমধ্যে সেদিনের এক নম্বর সেক্টরের সেনানায়ক বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার গঠন করার ফলে সে প্রকল্পে আবার আসার আলো দেখা যাচ্ছে । এই দলটি ক্ষমতায় এসেই ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবন ও গতিশীল রাখার বার্তা দেয় । ভারত সরকারও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ।  দুদেশের ভিসার প্রদানের ব্যাপারে নিয়মকানুন শিথিল কড়ার প্রয়াসও নেওয়া হচ্ছে ।ফেনীনদীর উপর নির্মিত মৈত্রীসেতু যদি চালু হয় তাহলে অতি সহজে চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করে এই অঞ্চলে বাণিজ্যবিস্তারের বিপুল সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে । এর ফলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নও প্রবলভাবে সাধিত হবে । পাল্টে যাবে জীবনযাত্রার মান ও অর্থনৈতিক চিত্র ।  নতুন সরকার আসার ফলে দক্ষিণ ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অর্থাৎ ফেনীনদীর দুই তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ আবার নতুন করে আশার আলো দেখছেন । যদি এখানে মৈত্রী সেতুকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সচল হয়ে ওঠে তাহলে এখানকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র একেবারেই পাল্টে যাবে বলে দুপারের মানুষজনই আশা প্রকাশ করছেন । অনেকে জিয়াউর রহমানের লড়াইয়ের কেন্দ্র একনম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার সাব্রুমের হরিনা পরিদর্শনের ও আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়াকে ।এখন দেখার বিষয় নতুন সরকার ও বিএনপি দলের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা তারেক জিয়া ও তার মন্ত্রিপরিষদ কতটা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন ।

No comments:

Post a Comment