মানভূমের ভাষা আন্দোলনের উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ও সাফল্য
অশোকানন্দ রায়বর্ধন
বাংলা ভাষা বাঙালির প্রাণের ভাষা । সারা পৃথিবী জুড়ে বাংলা ভাষা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত । সারা বিশ্ব জুড়ে বাংলা ভাষার জয়গান প্রচারিত । বাংলার মাটিতেই একদিন জন্মেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সৈয়দ মুজতবা আলী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সমরেশ বসু জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, প্রমুখগণের মত বিশ্ববিশ্রুত ব্যক্তিত্ব যারা তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের বাংলা ভাষাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন । এই বাংলাভাষার সঙ্গে বাঙালির আবেগ জড়িত । বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে এই উপমহাদেশে বহুবার ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে । তারমধ্যে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা রাজপথের রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলন বিশ্বের কাছে এক বিস্তৃত পরিচিতি এনে দিয়েছে । বরকত, সালাম, জব্বার, রফিক, সফিদের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতিও পেয়েছে । বাংলাদেশের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি আমাদের দেশেও ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল ১৯৬১ সালের ১৯শে মে । আসামের শিলচরে অনুষ্ঠিত এই ভাষা আন্দোলনে ১১ জন শহিদ হয়েছিলেন সেদিন । সেদিনের সেই শহিদদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে ।
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা । এ ভাষা আমাদের আত্মা আমাদের জীবনধারণের মূল চাবিকাঠি । মাতৃস্তন্য পুষ্ট করে মানব শরীরকে । কিন্তু মাতৃ শরীর থেকে বিচ্যুত হয়েও থেকে যায় নাড়ির টান । মাতৃভাষাই মানুষ এবং মাটিকে বেঁধে রাখে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে । যখন কেউ জোর করে মাতৃভাষার অধিকারকে কেড়ে নিতে চায় তখনই মানুষের বনভূমিতে আলোড়ন সৃষ্টি হয় । বাংলাভাষার জন্য বিভিন্ন সময়ে যে আন্দোলন তা এই সংঘাতেরই ফলশ্রুতি । বাংলা ভাষার মর্যাদার জন্য ঢাকা কিংবা শিলচরে যে আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে তার কথা অনেকেই জানেন । কিন্তু তার পাশাপাশি মাতৃভাষার জন্য মানভুমের বাঙালিদের যে দীর্ঘ আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল সেই আন্দোলনের কথা অনেক বাঙালি জানেন না । মনে রাখা দরকার যে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যতগুলো ভাষা আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলনও এই বাংলার মাটিতেই সংঘটিত হয়েছে এবং সেই আন্দোলন হল মানভূমের ভাষা আন্দোলন। মাতৃভাষা বাংলার জন্য বাংলার একটি অঞ্চলের বাঙালিদের প্রথম ও সুদীর্ঘ লড়াইয়ের কাহিনি শুধুমাত্র ভাষার অধিকারের জন্যে । সেই জেলাটি হল মানভূম । যেখানে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালিদের লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯১২ সালের পহেলা এপ্রিল । আর সুদীর্ঘ ৪৪ বছর পরে তার আংশিক সফলতা এসেছিল আন্দোলন শেষে ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর ।
এই সুদীর্ঘ সময়ের আন্দোলনের পেছনে কিছু ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম রয়ে গিয়েছিল যার পরিপ্রেক্ষিতে এই অঞ্চলে বাংলা ভাষা আন্দোলন ধীরে ধীরে বিস্তৃত রূপ ধারণ করে । এই আন্দোলনের পশ্চাদপট জানতে হলে আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয় । ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দিল্লির বাদশাহের কাছ থেকে সুবা বাংলার দেওয়ানি পায় । জরিপের পর ১৭৬৭ থেকে খাজনা আদায় শুরু হয় । দক্ষিণ-পশ্চিমবাংলার চারটি রাজ্য শিখরভূম, মানভূম, বরাহভূম আর ধল ভূম ও সামন্তভূমের কিছু অংশ মিলে মানভূম রাজ্য । যার সরকার নিয়ন্ত্রিত হত কামারপুকুর সংলগ্ন মান্দারণ থেকে । তবে রাজ্যের অধিকাংশই পঞ্চকোট রাজার অধীন ছিল । ১৭৬৫ পর্যন্ত পঞ্চকোট রাজা খাজনা দিতেন দিল্লিশ্বরকে । এই রাজ্যের জনজাতি আদিবাসী সম্প্রদায় কিন্তু 'কোম্পানি' নামের এই বিদেশী মালিকানাকে মেনে নিতে পারল না । তারা খাজনা দিতে অস্বীকার করল । এই নিয়ে শুরু হল বিরোধ । চলতে থাকল এক দীর্ঘকাল ব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম যা 'চুয়াড় বিদ্রোহ' নামে প্রসিদ্ধ । বরাহভূমের রাজা বিবেকনারায়ণের প্রচ্ছন্ন মদতে ১৭৬৭ থেকে ১৮৩২ পর্যন্ত চলে এই বিদ্রোহ । কোম্পানি অঞ্চলগুলিকে ভাঙাগড়া করে ১৮০৫ সালে 'জঙ্গলমহল' জেলা গঠন করেও এই বিদ্রোহ থামাতে পারেনি । চুয়াড় বিদ্রোহের শেষ পর্বে ১৮৩২ সালে নেতা বরাভূমের রাজবংশজাত গঙ্গানারায়ণ সিংয়ের পরাজয় ও মৃত্যু হয় । এই বিদ্রোহের ফলশ্রুতিতে ১৮৩৩ সালে গঠিত হয় মানভূম জেলা, বর্তমান পুরুলিয়া, ধানবাদ আর সিংভূমের সরাইকেলা অঞ্চলের মোট ৭৮ ৯৬ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে । ১৮৩৭ সালে ব্রিটিশ সরকার অকারণে ফারসির বদলে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যার ফলে দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠনের দাবি উঠে । ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে খানিকটা ভিন্ন খাতে ঘুরিয়ে দিতে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ বলে অনেকে মনে করেন । তারা উর্দুর বদলে হিন্দি আর আরবির বদলে সংস্কৃত ভাষা চালু করার ফরমান জারি করে । এখান থেকে বিভিন্ন ভাষাভাষী বিশেষত বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বাংলা প্রদেশের প্রতি এক নিবিড় যোগ ধরে রাখার স্বপ্ন দেখে । এদিকে মানভূমের জন্য আরও বড় শাস্তি অপেক্ষা করছিল ১৮৮৯ সালে কোম্পানি জেলাটিকে ভেঙে টুকরো করে মাত্র ৪১০০ বর্গমাইলে সীমিত করে দেয় । ভাষা ও ভূমি বিভাজনের এই নীতিকে কেন্দ্র করে চলতে থাকা ধিকি ধিকি আগুনে ঘৃতাহূতি লাভ করে ব্রিটিশের বাংলা ভাঙার চক্রান্তে । ১৯০৫ সালে উনিশে জুলাই সরকারিভাবে বাংলা প্রেসিডেন্সি ভাগের বিজ্ঞপ্তি জারি করেন লর্ড কার্জন । ভাগ হয়ে যায় বাংলা । ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, মালদহ, পার্বত্য ত্রিপুরা ও অসমকে নিয়ে গঠিত হয় পূর্ববঙ্গ ও অসম । যার রাজধানী হয় ঢাকা । অবশিষ্ট বাংলা, বিহার, উড়িষ্যাকে নিয়ে গঠিত হয় বাংলা প্রদেশ । যার রাজধানী হয় কলকাতা । ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সেদিন কলকাতাসহ সংলগ্ন অঞ্চলের বাঙালি মধ্যবিত্ত ও একাংশ প্রতিবাদে উত্তাল হয় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলমে সেদিন উঠে আসে 'বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল, পুণ্য হউক পুণ্য হউক পুণ্য হউক হে ভগবান' । রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে পালিত হয় রাখিবন্ধন উৎসব। হিন্দু মুসলিম বাঙালি জাতিসত্তা ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের বার্তা দেয় । সেদিনের উত্তাল আন্দোলনের তরঙ্গে বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে হয় ইংরেজকে । তীব্র আন্দোলনের ফলে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবার উৎসবে ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ বাংলাভূমিকে ভাগের যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছিল তা বাতিল করেন । কিন্তু একই দিনে তিনি এও ঘোষণা করেন বাংলা প্রেসিডেন্সিকে দুই ভাগে বিভাজন করে এক অংশ হবে পূর্ববঙ্গ । যার রাজধানী হবে কলকাতা । এবং অপর অংশ হবে বিহার ও উড়িষ্যা প্রদেশ । যার রাজধানী হবে পাটনা । এবং এই বিহার উড়িষ্যা প্রদেশের সঙ্গেই যুক্ত করে দেওয়া হয় বাংলাভাষী সমগ্র মানভূম ও ধলভূম অঞ্চলকে (৭০০০ বর্গ কিলোমিটারের অধিক অঞ্চল ) । বাংলা ভাষাভাষী এলাকাকে কেন বিহার উড়িষ্যার সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হবে সে নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে । তখন থেকে শুরু হয় মানভুমের ভাষা আন্দোলন । কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের সাফল্যের আনন্দ এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন সামনে থাকায় মানভূমের ভাষা আন্দোলন তখনও জমে ওঠেনি । এসময় আন্দোলনের ব্যাপক প্রসার না হলেও বাংলা ভাষার উপর হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলতে থাকে । বিহার সরকার যখন অফিস আদালত শিক্ষার মাধ্যমে তথা দাপ্তরিক কাজে হিন্দি ভাষাকে চালু করেন এবং মানভূমের বাংলা ভাষাভাষীকেও হিন্দি ব্যবহার করতে নির্দেশ দেন তখন মানভূমের সচেতন ও ভাষাপ্রেমী বাঙালি জনগণ প্রিয় বাংলাভাষার উপর হিন্দির আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন ।
১৯১২ সালের ১লা এপ্রিল থেকে মানভূমের শুরু হয় সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি আন্দোলন । এই আন্দোলন মাতৃভাষা বাংলার জন্যে । বঙ্গভূমিতে প্রত্যাবর্তনের জন্যে । মানুষ এ পর্যন্ত আন্দোলন করেছে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-সুরক্ষা-সার্বভৌমত্ব-স্বাধীনতার জন্যে । ভারতের মানুষ এই প্রথম দেখলেন মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ভূখণ্ডকে আন্দোলন করতে । মানভূমকে বিহার উড়িষ্যা থেকে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় পুরুলিয়া কোর্টের আইনজীবী রজনীকান্ত সরকার শরৎচন্দ্র সেন প্রমুখদের নেতৃত্বে । তবে ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের আঁচ লাগে মানভুমের জনমনেও । ১৯২১ সালে পুরুলিয়ায় তৈরি হয় মানভূম জেলা কংগ্রেস কমিটি । মানভূমকেশরী শ্রীঅতুলচন্দ্র ঘোষ সম্পাদক নির্বাচিত হন । পুরুলিয়া ইতিহাস গবেষক দিলীপ কুমার গোস্বামীর মতে, "প্রতিবাদের স্বর উঠলেও সে সময় স্বাধীনতার আন্দোলনেই ছিল মুখ্য তাই ভাষা আন্দোলন তত্ত্বটা প্রচার পায়নি তবে তলে তলে আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি হচ্ছিল ।"
এই আন্দোলনের যুক্তিসংগত কারণ হল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে বিহার সরকারের পদক্ষেপ গ্রহণ । ১৯৩১ এর আদমশুমারিতে এই প্রদেশে বাংলা ভাষাভাষী জনগণের সংখ্যায় বেশি দেখা যায় অর্থাৎ ১৮ লাখ ১০ হাজার ৮৯০ জনের মধ্যে ১২ লাখ ২২ হাজার ৮৮৯ জন বাংলা ভাষাভাষী১৯৪১এর আদমশুমারি হিসাব অনুযায়ী ২০,৩২,১৪৬ জনের মধ্যে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ২৮৪ বাংলা ভাষাভাষী অর্থাৎ ১০ বছরে বাঙালি জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ লাখ৩৪,৩৯৫ জন । বাকিদের মধ্যে সাঁওতাল হিন্দি আর কিছু আদিবাসী ভাষাভাষী মানুষ ছিলেন । তাদের মাথাব্যথার কারণ ছিল ১৯৩৬ সালে ওড়িশা পৃথক রাজ্য হলে বিহার প্রদেশের কংগ্রেস নেতাদের বড় অংশ মনে করতে থাকেন যে মানভূম ও ভাষার কারণে বিহার থেকে আলাদা হয়ে যাবে । এতে ধানবাদ বিস্তীর্ণ খনি ও শিল্পাঞ্চল হাতছাড়া হয়ে যাবে । এই পরিপ্রেক্ষিতে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের (১৮৮৪-১৯৬৩) সভাপতিত্বে মানভূম বিহারী সমিতি গঠিত হয় । হিন্দি ভাষা প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে স্কুল তৈরির কাজ শুরু হয় । তখন হিন্দি ভাষা আগ্রাসনের যে কৌশলগত অবস্থান তার প্রতিরোধ নির্মাণে পুরুলিয়ার ব্যারিস্টার দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ভাই পি আর দাসের সভাপতিত্বে হিন্দিভাষী নেতৃবৃন্দের পাল্টা জবাব এবং বাংলা ভাষার উপর হিন্দি ভাষার আধিপত্যকে ঠেকাতে গিয়ে বাংলা ভাষা প্রচার ও প্রসার এবং স্কুল নির্মাণের জন্য গড়ে ওঠে মানভূম বাঙালি সমিতি । বিহার সরকার আদিবাসী ও জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রাথমিক স্তরের বিদ্যালয় খুলতে শুরু করলে বাঙালিরা ও বাংলা স্কুল খুলতে তৎপর হয়ে পড়েন । এই সময় সতীশচন্দ্র সিংহ রাঁচি, পালামৌ, সিংভূম, হাজারিবাগ ও মানভূম জেলা নিয়ে ছোটনাগপুর নামক এক নতুন প্রদেশ গঠন বা বাংলা সঙ্গে পুনরায় সংযুক্তির প্রস্তাব করেন । চলতে থাকে টানা পোড়েন । তার মুখপাত্র হিসেবে ১৯৩৫ সালে 'মানভূম বাঙালি সমিতির ' 'মুক্তি' নামে একটি পত্রিকা চালু করা হয় । রাজ্যস্তরে গঠিত হয় 'বিহার বাঙালি সমিতি' ।এভাবে চলতে থাকে বাংলা ভাষা আন্দোলন । ক্ষিতিমোহন সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানভূমবাসীর এই ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন করেন । ১৯৩৭ সালে বিহারের কংগ্রেস মন্ত্রিসভা ডোমিসাইল সার্টিফিকেট প্রথার মাধ্যমে বাংলাভাষীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিককে পরিণত করলে ভাষা আন্দোলন আরও জোরালো হয় । ভাষা আন্দোলন তখনকার মতো ভাষার জন্য লড়াই রূপে থেকে গেলেও স্বাধীনতার পরে তা জোরদার মাতৃভাষা আন্দোলনের রূপ নেয় । ১৯৩৮-এ কংগ্রেসের রঘুনাথপুর অধিবেশনে বাঙালি নেতৃত্ব মানভূমকে বঙ্গপ্রদেশে যুক্ত করার দাবি তোলে ।
৪৭ এর দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে শুরু হল মানভূমের ভাষা সংক্রান্ত দ্বিতীয় আন্দোলন । দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই অখিল ভারতীয় কংগ্রেস কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ গ্রহণ করা হবে । স্বাধীনতার পরে সেই বিষয়টিকে সামনে রেখে শুরু হয় দ্বিতীয় আন্দোলন । এই অঞ্চল বাংলা ভাষাভাষী হলেও বিহারের হিন্দি আগ্রাসনের শিকার হচ্ছিলেন এই এলাকার মানুষজন । যেসব দাবিকে ঘিরে মানভূম ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধে সেগুলো হল বাংলা ভাষায় কথা বলা, বাংলা ভাষায় লেখা, স্কুল কলেজে হিন্দি ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করা ।
১৯৪৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জয়পুর অধিবেশনে ভাষানীতির উপরে আলোচনা হলেও মানভূমের ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয়নি । কারণ, স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভারত বিভাজনের সময় বিহার প্রদেশের বাংলাভাষী অঞ্চলকে পশ্চিমবঙ্গে আনার দাবিকে জাতীয় নেতারা 'সেপারেশন মুভমেন্ট' হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন । স্বাধীনতার চারদিনের মাথায় জামশেদপুরে 'বিহার বাঙালি সমিতি'র বাৎসরিক সভা হয় । সেখানে উদ্বোধনী ভাষণে নগেন্দ্রনাথ রক্ষিত ছিন্নবিচ্ছিন্ন বাংলার বাঙালি জাতিকে তার গৌরবময় ঐতিহ্য নিয়ে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলতে সিংভূম, মানভূম, সাঁওতাল পরগনা ও ভাগলপুরের বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল ও পূর্ণিয়া জেলাকে বাংলার অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান । ওই সভায় প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘোষসহ বহু ভাষাকর্মী বিহারীদের দ্বারা আক্রান্ত হন । এর সঙ্গে শুরু হয় সরকারি দমন পীড়নও । ১৯৪৮ সালে বিহার বিধানসভা হিন্দি ভাষার পক্ষে সুপারিশ করে এবং মানভূম জেলা শিক্ষা দপ্তর বিদ্যালয়গুলিতে দুটি সার্কুলার জারি করে যা কালাকানুন ছাড়া আর কিছু ছিল না বলে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বিদ্রোহ করেন । হিন্দি ভাষা বাধ্যতামূলকভাবে চালু করার লক্ষ্যে স্কুলগুলিতে হিন্দিশিক্ষা না দিলে স্কুলের অনুদান বন্ধের নোটিশ জারি হয় । আদিবাসী স্কুলগুলিকে হিন্দি স্কুলের পরিণত করতে নির্দেশ দেওয়া হয় । ৭২ টি আদিবাসী স্কুলে হিন্দি ভাষায় পঠন-পাঠন শুরু না হলে সরকারি অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে সার্কুলার পাঠানো হয় । ১৯৪৮-এ এমন ৩০০টি স্কুল পরিবর্তিত হয় । ২৩টি স্কুলের অনুমোদন বাতিল হয় । বাংলা মাধ্যমে পড়ালে শিক্ষকদের শাস্তির বিধান দেওয়া হয়। বাঙালির মানভূমে তখন থেকেই শুরু হল একরকম 'হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ' । একের পর এক বাংলা স্কুল পরিণত হল হিন্দি স্কুলে । মানভূম অঞ্চলের সমস্ত বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকে বাংলা ভাষায় পরিদর্শকদের সরিয়ে দেওয়া হয় । প্রতিটি স্কুলে হিন্দিতে স্কুলের নাম লেখা সাইনবোর্ড টাঙাতে হবে এবং রামধুন গীত বাধ্যতামূলক করা এই মর্মে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় । ১৯৪৮ থেকে মাধ্যমিক স্তরের সমস্ত বই পত্র বাংলায় ছাপা বন্ধ করে দেয় সরকারের শিক্ষা বিভাগ । আদিবাসী সাঁওতাল ছেলেমেয়েরা যাদের দ্বিতীয়ভাষা বাংলা হঠাৎ করে হিন্দিতে পড়াশোনা চালাতে ব্যর্থ হয়। এবং স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয় । মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পরীক্ষার খাতাপত্র হিন্দিতে লেখা না হলে সরকারি অনুমোদন স্থগিত বা বাতিল করে দেওয়া হতে থাকে । হিন্দিভাষী পরিদর্শকরা মানভূমের স্কুলগুলির পরিদর্শনে এসে স্কুলগুলিকে 'ভাটিখানা' এবং শিক্ষকদের 'অযোগ্য' ও 'মিথ্যাবাদী' বলে অপমান করতে থাকেন । হিন্দিতে কথা বলতেও লিখতে না পারা শিক্ষকদের তারা অশিক্ষিত বলে হেনস্থা করতেন । বিহার সরকার শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক হিন্দি শিখতে হবে এই মর্মে ফতোয়া জারি করে । পোস্ট-অফিসসহ সমস্ত সরকারি দপ্তরে হিন্দি বাধ্যতামূলক করা হল । সমস্ত আবেদন পত্র দলিল দস্তাবেজ এবং সরকারী আদেশ শুধুমাত্র হিন্দিতে লিখলেই গ্রাহ্য হবে বলে ফরমান জারি হয় । এমনকি ঘোষণা করা হয় উনিশে আগস্ট ১৯৪৮ থেকে বাংলায় লেখা জমির বা সম্পত্তির দলিল সরকারি দপ্তরের গৃহীত হবে না । মানভূমের মহকুমা শহর ধানবাদে বাংলাভাষায় কথা বলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করাও সমস্যার জনক হয়ে ওঠে । বিহারীরা বাঙালিদের মানভূমে বহিরাগত বলে অপপ্রচার চালাতে শুরু করেন । মানুষকে বিভ্রান্ত করতে তারা মানভূমের আদি ভাষা 'খোট্টা ভাষা' বলে প্রচার চালান । আদিবাসী ভূমিজ, মাহাতোদের ভাষিক পরিচয় বাংলা থেকে বের করে আনার চেষ্টাও করে বিহারী সমিতি । এর বিরুদ্ধে মানভূমের ভাষা আন্দোলন গর্জে উঠে । লক্ষ লক্ষ বাঙালি শিক্ষা ও প্রশাসনিক স্তরে তাদের মাতৃভাষা বাংলাকে স্বীকৃতির জন্য শুরু করে আন্দোলন । বিহার সরকার মানভূমে বাংলার ব্যবহার সীমিত করার জন্য কঠোর হতে শুরু করে । এক সময় পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায় যে ভাষা আন্দোলনকারীরা বুঝতে পারেন কংগ্রেসের থেকে ভাষা স্বাধিকারের দাবি অর্জন করা সম্ভব নয় । ১৯৪৮ এর ৩০ শে এপ্রিল থেকে ৫ই মে মানভূম কংগ্রেসের বান্দোয়ান অধিবেশনে মানভূম সভাপতি ভাষাগত অত্যাচার নিয়ে আলোচনা করলেন, নিষ্ফল হল সে আলোচনা । অথচ কোন মন্ত্রবলে তার এক মাসের মধ্যেই পুরুলিয়ার শিল্পাশ্রমে একটি বৈঠকে 'মানভূমের ভাষা বাংলা' এই প্রস্তাব ৪৩-৫৫ ভোটে পরাস্ত হল । মূলত এই কারণে অতুলচন্দ্র ঘোষ, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, অরুণচন্দ্র ঘোষ, বিভূতিভূষণ দাশগুপ্তসহ ৩৭ জন নেতা কংগ্রেসের জেলা কমিটি থেকে পদত্যাগ করে 'লোক সেবক সংঘ' গঠন করেন । এই সংঘ বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করে । অগত্যা ব্রিটিশরা যা করেনি স্বাধীন ভারতের সরকার এই বর্ষিয়ান স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাকে গ্রেফতার করে ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের দণ্ডিত করে । তারপর চক্রান্ত করে শীতের রাত্রে খোলা ট্রাকে চাপিয়ে হাজারীবাগের জেলে পাঠায় এটা জেনেও যে, তিনি তখন প্লুরিসিতে ভুগছিলেন । ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে লড়াইয়ে ফিরে আসেন । এরপর রাষ্ট্রপতি ডাক্তার রাজেন্দ্র প্রসাদ তাকে রাজ্যপাল পদের প্রস্তাব দেন । শর্ত–যদি তিনি এই আন্দোলন পরিত্যাগ করেন । বলাবাহুল্য তিনি সে ফাঁদে পা দেন নি ।
মানভূমের ভাষা আন্দোলন প্রকৃত অর্থেই ছিল বাংলা ভাষার আন্দোলন । তার সাথে ঝাড়খণ্ডে বাংলাভাষী মানুষ যুক্ত ছিলেন সামনের সারিতে । কেননা এই আন্দোলনে লোকসংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম যে টুসু গান তার ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মাধ্যমে । বিশেষভাবে বঙ্গ সত্যাগ্রহ, কৃষক সংগ্রাম, খাদ্য সত্যাগ্রহ বা হাল জোয়াল সত্যাগ্রহের মাধ্যমে মানভূমের ভাষা আন্দোলন চলতে থাকে । যার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে টুসু গান । বিহার সরকারের অরাজকতার বিরুদ্ধে ১১ ডিসেম্বর ১৯৪৯ সালে ভাষা আন্দোলনের বীজ অঙ্কুরিত হল ছাত্র ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে । ফলস্বরূপ আন্দোলনকারীদের উপর নানারকম নিপীড়ন নির্যাতন চালানো হতে থাকে । ১৯৫৪-তে মানভূমে মাতৃভাষা অধিকার রক্ষার দাবিতে শুরু হয় 'টুসু সত্যাগ্রহ'। একমাস ধরে চলা এই সত্যাগ্রহ এক জনজাগরণের রূপ নেয় । লোকগান, লোকনৃত্যে মাতৃভাষা বাংলাকে দমন করার চক্রান্তের কথা উঠে আসে । মুখে মুখে সেই গান ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র । টুসু গান বিহার সরকারের ঘুম কেড়ে নেয় । টুসু গান গাইলে দলে দলে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করা হয় । পুলিশ একজন টুসুগায়ক ১০ বছরের অন্ধ বালক বাবুলালকে গ্রেফতার করে ভাগলপুর জেলে পাঠায় ।
মানভূম ভাষা আন্দোলনে নারীবাহিনীর ভূমিকা ছিল অপ্রতিরোধ্য । জননেত্রী লাবণ্যপ্রভা দেবীকে পুলিশ ও রাজনৈতিক গুন্ডারা চুলের মুঠি ধরে ঘর থেকে বের করে, সঙ্গে চলে অকথ্য নির্যাতন ও সম্ভ্রমহানি । শবর নেত্রী রেবতী ভট্টাচার্যকে পিটিয়ে জঙ্গলের মধ্যে মৃতপ্রায় অবস্থায় ফেলে রেখে যায় বিহারী পুলিশ । জননেত্রী ভাবিনী মাহাতোর উপর অকথ্য নির্যাতন করা হয় । এই সময় বিহারের জননিরাপত্তা আইনের ধারায় লোকসভা সংঘের কর্ণধার অতুলচন্দ্র ঘোষ, লোকসভা সদস্য ভজহরি মাহাতো, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, অরুণচন্দ্র ঘোষ, অশোক চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয় । এই সময় ভজহরি মাহাতোর লেখা– "শুন বিহারী ভাই /তোরা রাখতে লারবি ডাং দেখাই /তোরা আপন তোরে ভেদ বাড়ালি /বাংলা ভাষায় দিলি ছাই । ভাইকে ভুল্যে করলি বড় /বাংলা বিহার বুদ্ধিটাই ।।/বাঙালী বিহারী সবাই /এক ভারতের আপন তাই ।/বাঙ্গালীকে মারলি তবু /বিষ ছড়ালি হিন্দি চাই /বাংলা ভাষার দাবিতে ভাই"– মানভূমের বাংলাভাষীদের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয়েছিল । ইতোমধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করে টুসু সত্যাগ্রহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ।
এরই মধ্যে শুরু হয় সীমা কমিশনের কাজ । সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের তৎকালীন দুই মুখ্যমন্ত্রীর ( বিধানচন্দ্র রায় ও শ্রীকৃষ্ণ সিংহ ) তরফে বঙ্গবিহার যুক্ত প্রদেশ গঠন করার প্রস্তাব আসে । মানভূমবাসী বাংলা বিহার সংযুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে মিছিলে শামিল হয় । তাঁরা অনুভব করেন এই পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেলে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে । ১৯৫৬-র ২০শে এপ্রিল মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদার দাবি নিয়ে পুরুলিয়ার পুঞ্চার পাকবিড়রা থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে ৩০০ নারীসহ ১০০৫ জন ভাষা আন্দোলনকারীর দশটি দল । নারীদের বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন বাসন্তী রায় । পদযাত্রা বাঁকুড়া, বেলিয়াতোড়, সোনামুখী, পাত্রসায়র, খণ্ডঘোষ, বর্ধমান, রসুলপুর, মেমারি, পান্ডুয়া, মগরা, চুঁচুড়া, চন্দননগর, গোদোলপাড়া, শ্রীরামপুর, উত্তরপাড়া, হাওড়া পেরিয়ে ১৬ দিন পর ৬ই মে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ পায়ে পায়ে অতিক্রম করে তারা এসে পৌঁছান কলকাতায় । কন্ঠে ছিল 'বন্দেমাতরম' ধ্বনি আর 'বাংলার মাটি বাংলার জল', 'বাংলা ভাষা প্রানের ভাষা রে' ইত্যাদি গান ধলভূমকে বাংলার অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে গড়া মুক্তি পরিষদের ১৭৫ জন আন্দোলনকারী বঙ্কিমচন্দ্র চক্রবর্তী ও কিশোরী মোহন উপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ধলভূম থেকে পদযাত্রা শুরু করে ৫ই মে কলকাতা পৌঁছে হাজরা পার্কে সভা করেন । নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ীর সভাপতিত্বে ঐ সভায় সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, সাতকড়ি রায় বক্তব্য রাখেন । ডালহৌসী স্কয়ারে পা রাখতেই তাঁদের গ্রেপ্তার করে বাংলার কংগ্রেস সরকার। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরিশ্রমে অসুস্থ হয়ে পড়েন অনেকে ।
মানভূমবাসীর এই লং মার্চ ব্যর্থ হয়নি । ব্যর্থ হয়নি ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষা স্বাধিকারের লড়াই । কলকাতাতেও মানভূম ভাষা আন্দোলনের সংহতিতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে । কলকাতাবাসীর পক্ষ থেকে হেমন্ত কুমার, জ্যোতি বসু, মোহিত মৈত্র, সুরেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত বিশিষ্ট নাগরিকগণসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন । সমাবেশ যেন না হতে পারে এজন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার আগে থেকে ১৪৪ ধারা জারি করে রেখেছিল ফলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দায়ে পুলিশ ৯৬৫ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করে বন্দীদের পাঠানো হয় কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেল আলিপুর সেন্ট্রাল জেল ও আলিপুর স্পেশাল জেলে । ১২ দিন পর তারা মুক্তি পান । একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য স্থানে প্রায় ৩৩০০ আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করা হয় যারা প্রধানত লোকসেবক সংঘ অথবা বাম দলগুলোর কর্মী ছিলেন । পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে একপ্রকার বাধ্য হয়েই বাংলা-বিহার সংযুক্তির প্রস্তাব রদ করে সরকার । দ্রুত পাশ হয় "বঙ্গ বিহার ভূমি হস্তান্তর আইন" । তারপর সীমা কমিশনের রিপোর্টে সরকারি নানা স্তরের ফাঁস, ষড়যন্ত্র পেরিয়ে ১৯৫৬ সালের মানভূমকে তিন টুকরো করে বাংলা অধ্যুসিত ১৬ টি থানা অঞ্চল জুড়ে জন্ম নেয় পুরুলিয়া জেলা । অন্তর্ভুক্ত হল পশ্চিমবঙ্গের । দিনটা ছিল ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর । সীমা কমিশনের রিপোর্ট লোকসভা হয়ে সিলেক্ট কমিটির ও আরো নানা স্তর পেরিয়ে ২৪০৭ বর্গমাইল এলাকার ১১ লক্ষ ৬৯ হাজার ৯৭ জন মানুষকে নিয়ে জন্ম নেয় আজকের পুরুলিয়া । সম্পূর্ণ ধানবাদ মহাকুমা বিহার রাজ্যে রয়ে যায় । মানভূমবাসীরা কয়েক দশক পরে আবার অন্তর্ভুক্ত হন পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলায় । বাংলা ভাষায় কথা বলা, ভাব প্রকাশ, শিক্ষালাভ, এককথায় বৃহত্তর জীবনচর্চার ভাষিক অধিকার পেলেন মানভূমবাসী । টুসু গান নিয়ে আবারো আনন্দে মাতোয়ারা হলেন তাঁরা । এ যেন মানভূমের স্বাধীনতা দিবস ।
আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ে লাখ লাখ মানুষকে নানা প্রকার অন্যায় অবিচার বঞ্চনা অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে জেল জুলুম আর পুলিশি নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে । মানভূমের ভাষা আন্দোলন মানভূমবাসীর জন্য যেমন গৌরবের বিষয় তেমনি সারা পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী মানুষও এই গৌরবের অংশীদার । সময়ের মাপকাঠিতে ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন মানভূমের মাতৃভাষা অধিকার আন্দোলন । টুসু গায়কদের সেই ভাষা আন্দোলন আজ জনমানসে বিস্মৃতপ্রায় হলেও ইতিহাসের দলিলে তা উজ্জ্বল হয়ে আছে । সময়ের বিবর্তনে মানভূমের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস মোটামুটি সাধারণের জানার বাইরে চলে গেছে । বাংলাদেশ তো দূরে থাক, পুরুলিয়ার বাইরে খোদ পশ্চিমবঙ্গেও সরকারি বা বেসরকারিভাবে মানভূমের ভাষা আন্দোলন নিয়ে বার্ষিক কোনো অনুষ্ঠান বা আলোচনা হয় না । পুরুলিয়ার সিধো -কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে মানভূমের ভাষা আন্দোলন অন্তর্ভুক্ত হলেও সেটা গোটা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষায়তন গুলির পাঠ্য পুস্তকের স্থান পায়নি । অতুলচন্দ্র ঘোষ, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, অরুণচন্দ্র ঘোষ, বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত, ভজহরি মাহাতো, ভাবিনি মাহাতোদের মতো শত শত ভাষা সৈনিক তাদের প্রাপ্য মর্যাদা পাননি । পরবর্তীকালে যে ভাষা আন্দোলনসমূহ সংঘটিত হয়েছে তার বীজ এই মানভূম ভাষা আন্দোলনের মধ্যে নিহিত ছিল । মানভূম ভাষা অধিকার সংগ্রামের এক আলোক উজ্জ্বল নাম । জানিনা পৃথিবীতে আর কোন ভাষার জন্য এমন বারবার নানা জায়গায় নানা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়তে হয়েছে কিনা । আজ যখন এক ভিন্ন বাস্তবতায় নিজেদের ঘরে ও বাইরে কোনঠাসা হচ্ছে বাংলা ভাষা তখন এই আন্দোলন আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তার দৃঢ় সংগ্রাম মানসিকতার কথা নতুন প্রজন্মের কাছে । ঐতিহাসিক মানভূম ভাষা আন্দোলনের কথা প্রচার করতে হবে বাঙালি ভাষার জন্য প্রাণ দিতে পারে বাংলা ভাষা বড় প্রিয় আমাদের বাংলা ভাষা বাঁচাতে ও বাঙালির অধিকার আদায় করতে মানভূম ভাষা আন্দোলনের কথা বারবার স্মরণ করতে হবে ।
No comments:
Post a Comment