অরণ্য : সাহিত্যে ও লোকজচেতনায়
অশোকানন্দ রায়বর্ধন
অরণ্য মানব সভ্যতার প্রাচীনতম সহচর । সভ্যতার উষালগ্নে মানুষ অরণ্যের আশ্রয়ে জীবনধারণ করতে শিখেছে । তাই তার স্মৃতি, কল্পনা ও সংস্কৃতির গভীরে অরণ্য এক স্থায়ী ভূমি । বন কেবল গাছপালার সমষ্টি নয় । বন সভ্যতার জন্মভূমি । মানুষের প্রাচীনতম আশ্রয় এবং সংস্কৃতির আদি ঠিকানা । মানবসভ্যতার সূচনালগ্নে মানুষ বনের কোলে আশ্রয় নিয়েই খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং ঔষধের উপকরণ সংগ্রহ করেছে । তাই বন ও সংস্কৃতির সম্পর্ক গভীর ঐতিহাসিক ও অবিচ্ছেদ্য ।
প্রাচীনকালে বন ছিল ঋষি ও মুনিদের জ্ঞান অর্জনের স্থান (আশ্রম বা তপোবন) । ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনে বনের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট । উপনিষদের আরণ্যক অংশ রচিত হয়েছে অরণ্যে বসবাসকারী ঋষিদের দ্বারা । উপনিষদের আরণ্যক অংশ ইঙ্গিত করে বনের শান্ত পরিবেশ ছিল জ্ঞানচর্চার ও তপস্যার স্থান । প্রাচীন সাহিত্যে বন মানেই এক ধরনের অন্তর্জাগরণ ও আত্মশুদ্ধি । বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসেও বনের গুরুত্ব অপরিসীম । বুদ্ধ বোধিলাভ করেন বৃক্ষতলে । আদিবাসী ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাও বনকেন্দ্রিক । তাদের নৃত্য, সংগীত, উৎসব, চিকিৎসাপদ্ধতি, খাদ্যাভ্যাস সবই বনের উপাদানে গড়ে উঠেছে । বহু লোকধর্ম ও উপজাতীয় সংস্কৃতিতে নির্দিষ্ট গাছ বা অরণ্যভূমি পবিত্র বলে মান্য । ফলে বন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যেরও ধারক ।
ভারতীয় সাহিত্যের প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে বন এক গুরুত্বপূর্ণ পরিসর । রামায়ণে অরণ্যবাস কেবল ভৌগোলিক স্থানান্তর নয় । তা নায়ক-নায়িকার চরিত্র গঠনের ত্যাগ ও পরীক্ষার ক্ষেত্র । মহাভারতে অরণ্যপর্ব পান্ডবদের দুর্দশা ও আত্মশক্তি সঞ্চয়ের কাহিনি । মানব জীবনের পরীক্ষা ও রূপান্তরের পর্ব ।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলাসাহিত্যে এবং লোকজচেতনায় অরণ্য কেবল প্রকৃতির অংশ ছিল না । বরং তা ছিল অজানার ভয়, দৈবশক্তি ও জীবন জীবিকার আশ্রয়স্থল । চর্যাপদের পদকর্তারা অরণ্যকে সিদ্ধিলাভ ও যোগসাধনার নির্জনস্থান হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যেখানে প্রকৃতি ও মানবজীবন একীভূত ছিল । চর্যাপদে অরণ্য যেমন (পাবত, কানন) হল সাধনার নিভৃত স্থান, যেখানে আত্মজ্ঞান লাভ করা যায় । বনজগৎ এখানে পার্থিব জীবনের জঞ্জাল থেকে মুক্তির প্রতীক হিসেবে এসেছে । বাংলা মঙ্গলকাব্যে বন এক জীবন্ত বাস্তবতা । মনসামঙ্গলের নদী বনভূমির প্রেক্ষাপট চন্ডীমঙ্গলের দুটি কাহিনিতে ব্যাধ কালকেতুর বনবাস ও দেবী চণ্ডীর বনচর রূপ, বণিকের অরণ্য যাত্রা, ধর্ম মঙ্গলে অরণ্যভূমির বিপদ ও রহস্য, এসব কাহিনিতে বন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার অঙ্গ । সাধারণ মানুষ (ব্যাধ, জেলে, কাঠুরে) অরণ্যের উপর নির্ভরশীল ছিল, যা তাদের জীবন জীবিকার অবিচ্ছেদ অংশ । গ্রামীন সমাজে বন ছিল জীবিকার উৎস । কাঠ, ফল, ঔষধ, মধু ও পশুপাখির মাংস, বনকে কেন্দ্র করেই অর্থনৈতিক জীবন পরিচালিত হত । এখানে বন শুধু পটভূমি নয় । কখনো দেবতার আবির্ভাব ক্ষেত্র, কখনো মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সূচনাকারক । একারণেই মঙ্গলকাব্যগুলোতে অরণ্যকে কেন্দ্র করে দেবদেবীর মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে । তাই বনদেবী, শীতলা, মনসা প্রভৃতি দেবদেবীর সঙ্গে অরণ্যের সম্পর্ক গভীর । লোকসাহিত্যে অরণ্যের বনদেবী (বনবিবি বা বনকুমারী) ও বাঘ-দেবতা দক্ষিণ রায়ের মতো লৌকিক দেবদেবীর কাহিনীতে অরণ্য ও বনজীবীদের জীবন চিত্র ফুটে উঠেছে । বিশেষ করে ত্রিপুরায় বাঘাইর সিন্নি, বনকমারীর পূজা, বাবা লংতরাইয়ের পূজা বনাঞ্চলকেন্দ্রিক লোককথা, বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানে অরণ্য ও বনজীবীদের সহাবস্থানের এবং বনজ সম্পদ সংগ্রহের আদিম চিত্র পাওয়া যায় । ঘন জঙ্গল হিংস্র পশু এবং অলৌকিক বাধার কারণে মধ্যযুগীয় মানুষের মনে অরণ্য ছিল একপ্রকার ভয়ের জায়গা যা লোকসংগীত অনুষ্ঠান পেয়েছে। বৈষ্ণব পদাবলীতে কুঞ্জবন, নিধুবন, বৃন্দাবন ইত্যাদি বনক্ষেত্র প্রেমলীলা, মিলন ও বিরহের অন্যতম প্রধান স্থান হিসেবে অরণ্যের কোমল ও রোমান্টিক রূপটি তুলে ধরেছে । এসবের মধ্য দিয়ে অরণ্যের প্রতি ভক্তি ও ভয়ের সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ ঘটে । ভক্তিসাহিত্যে অরণ্য ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের স্থান হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছে । বিভিন্ন অঞ্চলে অরণ্য বা পবিত্র বনভূমি সংরক্ষণের প্রথা আজও আছে । যেমন বৌদ্ধ সংস্কৃতিতে বেনুবন, জেতবন প্রকৃতি সংরক্ষিত স্থানের নাম পাওয়া যায় ।
লোককথা, রূপকথা, পালাগানে অরণ্য রহস্যময় স্থান । লোককথায় বন মানেই রাক্ষস-খোক্ষস, বাঘ, ভল্লুক, সাধু ডাকাত, ভূত-প্রেত, জিন-পরি সবাই বনের বাসিন্দা । শিকারবিষয়ক গান, বনভোজনের আচার, বসন্তউৎসব এসবের মধ্যেও বন এক একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র । বৈষ্ণবদের সম্মেলন 'বনবিহার'ও বনকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান । স্থাননামেও বনের প্রভাব রয়েছে । মধুবন, বেতবন, বনকুল, আমতলি, জামতলি, শিমুলতলি, বরইতলি, কাঠালতলি, ইত্যাদি বৃক্ষকেন্দ্রিক নাম, শামুকছড়া, চালতাছড়া, কলাছড়া, নালিছড়া, কুলাইছড়া, আবাঙছড়া, গন্ডাছড়া, ইত্যাদি বহু ছোটো ছোটো স্রোতস্বিনী কেন্দ্রীক মনু, জুরি, গোমতী ইত্যাদি নদীকেন্দ্রিক নামে ও বড়মুড়া, জগহরিমুড়া, সোনামুড়া,পাওরামুড়া হালাইমুড়া, ছবিমুড়া, দেবতামুড়া ইত্যাদি পাহাড় অরণ্য কেন্দ্রিক নামে বনের প্রভাব রয়েছে । অরণ্য প্রায়শই জাদুবিদ্যা, নায়ক-নায়িকার আত্মগোপন বা রোমাঞ্চকর অভিযানের স্থান হিসেবে চিহ্নিত ।
আধুনিক সাহিত্যে বন নতুন অর্থ বহন করে । রবীন্দ্রনাথের রচনায় বনপ্রকৃতি সৌন্দর্য ও মানবমনের নিবিড়তার প্রতীক । এখানে বন মানবমনের গভীর স্তরের সঙ্গে যুক্ত এক নান্দনিক অভিজ্ঞতা । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় অরণ্য কেবল প্রাকৃতিক দৃশ্যের অংশ নয় । তা এক গভীর নন্দনবোধ, আধ্যাত্মিকতা এবং মানবমনের অন্তর্জাগরণের প্রতীক । তার কাব্যচেতনার ভিতর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক একটি প্রধান সুর । আর সেই প্রকৃতির প্রাণময় রূপগুলোর মধ্যে অরণ্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে । রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারতের অরণ্যকেন্দ্রিক সভ্যতাকে জ্ঞান ও সাধনার আদর্শ বলে মনে করতেন । 'চৈতালি'কাব্যের কাব্যের 'তপোবন' কবিতায় এই বিশাল অরণ্যের ছায়ায় সাধনার ছবি ফুটে উঠেছে । তিনি কেবল কবিতায় অরণ্য বন্দনা করেননি, শান্তিনিকেতনে 'বনমহোৎসব', 'বৃক্ষরোপণ' ও 'হলকর্ষণ' উৎসবের মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতার বাস্তব প্রয়োগ করেছিলেন তিনি । অরণ্যসংরক্ষণে সপক্ষে তিনি উচ্চারণ করেন–
দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর
লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর
হে নব সভ্যতা নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী
দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি ।
রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যে দেখা গেছে অরণ্যপ্রীতি । 'বাল্মিকী প্রতিভা' এবং 'কালমৃগয়া' গীতিনাট্যদুটিতে তপোবনের চিত্রের বর্ণনায় রয়েছে গভীর পরিবেশ ও প্রকৃতি বোধের নিদর্শন । বাল্মিকী প্রতিভাতে দস্যুদল আর কালমৃগয়াতে শিকারিদলের দাপটে যখন অরণ্যের গাছপালা পশুপাখির অস্তিত্ব বিপন্ন তখন এই দুটি গীতিনাট্যেই তপোবনের শান্তিরক্ষা ও সর্বোপরি অরণ্যরক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করেছেন বনদেবতা ও বনদেবীগণের হাতে । রবীন্দ্রসাহিত্যে অরণ্যভাবনা নিছক প্রকৃতিপ্রেম নয় । বরং এটি অরণ্যসংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও পরিবেশচেতনার গভীর মেলবন্ধন । বিভূতিভূষণের 'আরণ্যক' উপন্যাসে অরণ্য কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য নয় । বরং সভ্যতার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক নৈতিক প্রশ্ন । জীবনানন্দ দাশের কবিতায় অরণ্য স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা ও চিরন্তনতার অনুভব জাগায় । এখানে অরণ্য মানুষের অন্তর্লোকের প্রতিবিম্ব ।
কিন্তু আধুনিকতার চাপে বন উজাড় হচ্ছে দ্রুত । নগরায়ণ শিল্পায়ন ও ভোগবাদী মানসিকতা বনকে সংকুচিত করছে । এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি লোকঐতিহ্যও হারিয়ে যাচ্ছে । বন ধ্বংস মানে কেবল পরিবেশের ক্ষতি নয়, একটি সংস্কৃতির বিলুপ্তি । সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য তাই বন সংরক্ষণ অপরিহার্য । অতএব বনকে রক্ষা করা মানে কেবল প্রকৃতিকে রক্ষা করা নয় । মানব সভ্যতার স্মৃতি বিশ্বাস শিল্প ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করা । বন আমাদের সংস্কৃতির শিকড় । সেই শিকড় সুস্থ থাকলেই সভ্যতার বৃক্ষ সবল থাকবে ।
No comments:
Post a Comment