Thursday, June 18, 2026

কর্নাটকের নৃত্যশৈলী ও বৈশিষ্ট্য

 কর্নাটকের নৃত্যশৈলী ও বৈচিত্র্য 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রদেশ তাদের নানারকম প্রাদেশিক লোকনৃত্যের জন্য বিখ্যাত । সেরকম কর্নাটকেরও বেশ কিছু লোকনৃত্য রয়েছে । তার মধ্যে ইয়াকষাগানা ( যক্ষগণ ), হাটারি ও কুনিথা ইত্যাদি প্রধান । ব্যাঙ্গালোরে যে জায়গাটায় ছেলের বাসায় আছি তার কাছাকাছি একটা গণেশ মন্দির আছে ।গণেশ পূজাকে কেন্দ্র করে এই চত্বরটা জমজমাট । লোকে লোকারণ্য । রাস্তা ব্লক করে চলছে নাচ-গান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান । পুজোর দিন সন্ধ্যায় প্রসাদ পেলাম । তার স্থানীয় নাম 'পোঙ্গল' । গতকাল সন্ধ্যায় দেখলাম দেওয়ালির মতো বাজি ফুটছে । সান্ধৃভ্রমণে বেরিয়ে গণেশ মন্দিরের কাছাকাছি গিয়ে দেখি আলোর মালা । রাস্তা জুড়ে । বাজি পুড়ছে অঝোরে । আর উল্টোদিকের ফাঁকা একটা জায়গায় দেখলাম লোকে লোকারণ্য । সেখানে বিকট শব্দে ঢাকজাতীয় কিছু বাজছে । কাছে গিয়ে দেখলাম চারদিকে ঘেরা মানুষের মাঝখানে নানারকম পোষাক ও মুখোশ পড়ে কিছু লোক ঘুরে ঘুরে নাচছে । পোষাকের কারণে  তাদের বপু আর উচ্চতা সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু বেশি । আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না । ভিড় ঠেলে এগুতে গিয়ে অচেনা ভাষায় গালাগালি শুনলাম । তাতে কি হল । অর্থ যখন বুঝছি না তখন আর আমার চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করলেও গায়ে লাগবে না । যাই হোক, হেসেটেসে এগিয়ে গিয়ে নাচের ভিডিও করলাম । একটু পরেই নাচ শেষ হয়ে গেল । 

নাচ তো দেখলাম । কিন্তু কি নাম এই নাচের ? কেন নাচল ? ইত্যাদি জানার জন্যে মন উশখুশ করতে লাগল ।  ফেরার পথে রাস্তার উল্টোদিকে দেখলাম একজন নানারকম ফল কুচি কুচি করে বাটিতে সাজিয়ে বিক্রি করছেন । তাঁরা একে বলেন 'ফ্রুটবল' । এটা বুঝতেও আমার বেগ পেতে হয়েছিল । প্রথমদিন শব্দটা আমার কানে লেগেছিল 'ফুটবল' । পরে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় আমার কাছে । ব্যাঙ্গালোরে এরকম কুচো ফলের বাটি এবং ফলের রস রাস্তার মোড়ে মোড়েই পাওয়া যায় । আমি দোকানটাতে গিয়ে একবাটি কুচো ফল নিলাম । ওর পাশেই একটা খালি টুল পেয়ে বসে ফল খেতে খেতে ওর সঙ্গে গল্প জুড়লাম । দুজনেরই মাধ্যম হিন্দি পান্ডিত্যের কথা আর উল্লেখ করলাম না । ওকে বললাম, ভাই উধার এক বড়িয়া ডান্স দেখা ম্যায়নে । বলে ওদিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলাম । ও বলল,  ডাল্লু কুনিথা ডানছো ?  কেন জানি মনে হল তাঁর কাছ থেকে কিছু জানা যাবে । আমি বললাম, হাঁ হাঁ ভাইয়া, কিঁউ ইতনা ডান্স কিয়া ? বাজা বাজায়া ? তিনি তখন আমাকে টুকটাক যা বললেন সেটাই এই অর্বাচীনের কাছে বড়ো পাওনা হল । কথায় কথায় জানালেন তিনি কলেজ পর্যন্ত পড়েছেন । অর্থাভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেননি । অল্প কিছুক্ষণ সময়ে তিনি যা বললেন তা আমি মনে গেঁথে দ্রুত বাসায় ফিরে এসে প্যাডে নোট করে নিলাম । কিছু কিছু ব্যাখ্যা কন্নড়ি অ্যাকসেন্টে হিন্দি বলায় কিছুই বুঝতে পারিনি । এখানকার ভাষা জানিনা বুঝিনা । তাই যাচাই করার সুযোগ নেই । তাই ফুটপাথের ওই হকারের মুখে যা শুনেছি তাই গুছিয়ে আজই লেখাটা তৈরি করলাম । তথ্যের চাইতে একটা প্রাদেশিক নৃত্যের দর্শনটাই আমার কাছে বিরল প্রাপ্তি । আমার আবেগটাকে প্রাধান্য দিয়ে অভিজ্ঞ পাঠক আমার তথ্যগত ভুলটাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি । 

কর্নাটকে বিশেষ পূজা-পার্বণ উপলক্ষে অনুষ্ঠানমূলক নৃত্যের আয়োজন করা হয়ে থাকে । 'ডল্লু কুনিথা' সেই ধরনের এক বিশেষ নৃত্য । 'ডল্লু কুনিথা' নৃত্যের সঙ্গে শিব-পার্বতীর মিথ জড়িত । বুঝলাম, শিবপরিবারের সদস্য গণেশের পুজো উপলক্ষেই তাহলে এই নৃত্যের আয়োজন । ডল্লু কুনিথা নৃত্যে বিকট শব্দে ড্রাম বাজানো হয় । তার সঙ্গে তালে তালে নানারকম মুখোশ পরে নৃত্যশিল্পীরা ঘুরে ঘুরে দলবদ্ধভাবে নৃত্য করে । শৈব ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এই নৃত্য বিশেষভাবে প্রচলিত । ধর্মীয় অনুষ্ঠানমূলক কুনিথা নৃত্যের আরো প্রকারভেদ আছে । যেমন 'দেবারি থাট্টে কুনিথা', 'ইয়ালেম্মানা কুনিথা', 'সুগ্গি কুনিথা', 'পাটা কুনিথা', 'গৌরাভা কুনিথা' ( উচ্চারণ আমি যতটা বুঝেছি সেই অনুযায়ী লিখলাম ) ইত্যাদি এক একটি দেবদেবীর নামানুসারে প্রচলিত অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক নৃত্য । নৃত্যরত শিল্পীদের পোষাক-মুখোশ দেখে আমার মনে হল, এরা বোধহয় শৈব মিথকল্পের সদস্য ইতর প্রাণী নন্দী, ভৃঙ্গী, বৃষ, মোষ ইত্যাদি চরিত্র রূপায়িত করেছে ।

বিশাল ভারতবর্ষের বহু বৈচিত্র্যের ধারাটি নৃত্যের মধ্যেও বিরাজমান ।  নানা প্রদেশের নানারকম ধ্রুপদী নৃত্য ও লোকনৃত্যে জড়িয়ে রয়েছে বহু বর্ণময়  উপকরণ, আঙ্গিক । যা আমাদের  জাতীয় সংস্কৃতিকে নিরন্তর সমৃদ্ধ করে চলেছে ।বহন  করে চলেছে সম্প্রীতির বার্তা ফল্গুধারার মতো ।
ব্যাঙ্গালুরু, ২৫সেপ্টেম্বর,২০২৩

আমাদের বংশলতিকা

আমাদের বংশ লতিকা 
অশোকানন্দ রায়বর্ধন

 গোবিন্দরাম ( চাম্পারাম) —> ভৈরবচন্দ্র ( স্ত্রী-মঙ্গলা )

ভৈরবচন্দ্র+মঙ্গলা ( পুত্রগণ )—>বৈদ্যনাথ,কামিনীকুমার ( স্ত্রী-সরলা ), গগণচন্দ্র, সতীশচন্দ্র

কামিনীকুমার+,সরলার ( পুত্রগণ )—>মহিমচন্দ্র ( স্ত্রী ঊষারানী, প্রমিলা ), মনোরঞ্জন ( স্ত্রী ঊষারানি ), অনিলচন্দ্র ( স্ত্রী......), দুলাল

বাঙালি সত্তা, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতিরঅনুষ্ঠান

বাঙালিসত্তা, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির অনুষ্ঠান

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

গত ২০ এপ্রিল বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকায় বিশ্ব বাঙালি সংসদের উদ্যোগে ৪৯ নিউ ইস্কাটনস্থ আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হল বিশ্ব বাঙালি সম্মেলন–২০২৪ । সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের জাতিসত্তার কবি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মুহম্মদ নুরুল হুদা । উদ্বোধক ছিলেন উপসচিব উপ-পরিচালক আঞ্চলিক লোক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ঢাকা, ডঃ শফিকুল ইসলাম । পুরো অনুষ্ঠানটি তিনটি পর্যায়ে  ভাগ করা হয় । প্রথম পর্যায়ে 'বাঙালির সম্প্রীতি বাঙালির সংস্কৃতি' শীর্ষক আলোচনার শুরুতে প্রধান অতিথি দুইদেশের বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিকদের এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা প্রদান করে তাঁর আলোচনার সূত্রপাত করেন । তাঁর আলোচনায় সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে নান্দনিক সৌন্দর্য ও মনের শান্তির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন । বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালির অবদান, লড়াই, তার যাত্রাপথ, তার বিশ্বময় ব্যপ্তির কথা তুলে ধরেন । সবশেষে তিনি পাঠ করেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা 'যতদূর বাংলা ভাষা ততদূর এই বাংলাদেশ' কবিতাটি । এরপর আলোচনার শীর্ষককে অনুসরণ করে বক্তব্য রাখেন ত্রিপুরার লোকগবেষক ও প্রাবন্ধিক অশোকানন্দ রায়বর্ধন । তিনি তাঁর আলোচনায় বাঙালি জাতির অতীত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সূত্র ধরে বর্তমান সময় ও সেই সংস্কৃতিকে লালন করার ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরেন । সীমান্তের বিভাজন থাকলেও বাঙালি জাতিসত্তার অভিন্নতার কথা উল্লেখ করেন তিনি । আসামের সাময়িক প্রসঙ্গ পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক মিলন লস্কর তাঁর আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধে বরাক অঞ্চলের মানুষের অবদানের অনালোকিত অধ্যায় তুলে ধরেন । এছাড়াও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন কথাসাহিত্যিক চেয়ারম্যান প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র,
মিজ রোকেয়া ইসলাম । বাংলাদেশ জাতীয় কবিতা পরিষদের দপ্তর সম্পাদক বিজ্ঞানকবি বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদি । বাঙালি জাতিসত্তার মেলবন্ধন ও সম্প্রীতির কথা তাঁর আলোচনায় তুলে ধরেন । বিশ্ব বাঙালি সংসদের সভাপতি কবি লোকমান হোসেন পলা এই সংগঠনের ভূমিকা ও কর্ম প্রণালী সভার সামনে তুলে ধরেন এবং উপস্থিত সকলকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন । অনুষ্ঠানের সভাপতি ডঃ শাহাদাত হোসেন নিপু কবি ও বাচিক শিল্পী, পরিচালক বাংলা একাডেমি তাঁর আলোচনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আলোকে ভারত বাংলাদেশের মৈত্রী সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন । সম্প্রীতির স্বার্থে এই বিষয়গুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি ।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ছিল 'হাসনাইন সাজ্জাদীর বিজ্ঞান কবিতার ধারনা' শীর্ষক সেমিনার । এই পর্যায়ে আলোচনাকালে অধ্যাপক মাহবুবা বেগম, আবু সাঈদ তুলু, নাভেদ আফ্রিদী প্রমুখগণ বাংলাকবিতার এই বিশেষ প্রবণতাটি সম্পর্কে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তৃত বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করেন । এই পর্বের প্রধান অতিথি পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কবি অধ্যাপক ড. চন্দন বাঙ্গাল বাংলাকবিতার বিভিন্ন আন্দোলনের ধারাবাহিকতার ইতিহাস তুলে ধরেন । পাশাপাশি হাসনাইন সাজ্জাদীর এই নতুন ভাবনা বাংলাকবিতায় নতুনতর আলোকসম্পাতের কথা স্পষ্ট করে দেন । বিজ্ঞান কবিতার ধারনার স্থায়িত্বের বিষয়টি তিনি সময়ের উপর ছেড়ে দেন । সবশেষে 'কবিতা ও কথামালা'য় দুইদেশের পঞ্চাশজনের অধিক কবি কবিতা পাঠ করেন ।
ঢাকা, ২২এপ্রিল, ২০২৪

বাংলা লোকগানের উদ্ভব ও ভাটিয়ালি গানের সৃষ্টি

বাংলা লোকগানের উদ্ভব ও ভাটিয়ালি গানের সৃষ্টি 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

চর্যাপদ শুধু বাংলাসাহিত্যের নিদর্শন নয়, প্রাচীন বাংলাগানেরও সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে  । চর্যাপদগুলি প্রকৃতপক্ষে গানই । সেকারণেই অনিবার্যভাবে প্রতিটি পদের শুরুতে রাগ, তাল ও প্রতি জোড়পদে 'ধ্রুব' শব্দের উল্লেখ রয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, এগুলো তখন গাওয়া হত । চর্চা গীতিগুলো পটমঞ্জরী, মাল্লারী, গুর্জরী, কামোদ, বরাড়ী, ভৈরবী, গবরা, দেশাখ, রামক্রী, শবরী, অরু, ইন্দ্রতাল, দেবক্রী, ধানশ্রী, মালসী, মালসী-গবড়া ও বঙ্গাল রাগে দেখতে পাওয়া যায় । চর্যার কবিরা ছিলেন পূর্বভারত ও নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী। কেউ পূর্ববঙ্গ, কেউ উত্তরবঙ্গ, কেউবা রাড়ের অধিবাসী ছিলেন । কেউ কেউ মিথিলা ( বিহার ), কেউ উড়িষ্যা, কেউ আবার অসম বা কামরূপের বাসিন্দাও ছিলেন । 

চর্যাপদের তিনজন বাঙালি কবি ছিলেন । তাঁরা হলেন লুইপা, শবরপা ও ভুসুকুপা । ভুসুকুপা নিজেও তাঁর পদে 'আজি ভুসুকু বঙ্গালি ভৈলি' বলে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন । ভুসুকু নিজেকে 'রাউতু ভুসুকু' অর্থাৎ 'রাজপুত ভুসুকু' বা 'অশ্বারোহী যুদ্ধ ব্যবসায়ী' বংশের সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন । ভুসুকুপা যোগী সাধক ছিলেন । তিনি জয়দেবের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন । তিনি নিজের কুটিরে সর্বক্ষণ গোপনে অধ্যয়ন করতেন । ভিক্ষুরা মনে করত যে, তিনি সর্বদা আহার ও নিদ্রায় সময় কাটান । এজন্য ভিক্ষুরা তাঁকে ভুসুকু ( ভু = ভক্ষণ, সু = সুপ্তি, কু = কুটির ) নামে ডাকতেন । চর্যাপদে ভুসুকুপার পদ আটটি ( ৬, ২১, ২৩, ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩, ৪৯ ) । শক্তিমান চর্যাকার ভুসুকুর গানে পদ্মাখালে নৌযাত্রার যে চিত্র ( ৪৯ নং ) দেখি তাতে তিনি  বঙ্গদেশের বলেই মনে হয় ।

 'আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভৈলী / নিঅ ঘরিণী চন্ডালী লেলী' ( ৪৯ নং ) বর্ণিত চন্ডাল/ চন্ডালী  নামটি বাঙালিদের আদি পরিচয় । একটি বল-বীর্য সমন্বিত অর্থদ্যোতক শব্দ । চন্ডের সঙ্গে জাতিসূচক 'আল' প্রত্যয় যোগ করে হয়ন চন্ডাল । অনুরূপভাবে লাঙ্গল, জোঙ্গাল ( জোয়াল ), জঙ্গল, জাঙ্গাল, বহাল, খেড়ওয়াল, সাঁওতাল, বঙ্গাল প্রভৃতি আদি অস্ট্রাল শব্দগুলির ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ করলেই শব্দগুলোর গুণগত ও অর্থগত অভিব্যক্তিটি যথার্থ প্রতিভাত হয়ে ওঠে । চন্ডাল, বঙ্গাল প্রভৃতি সেযুগের কঠোর পরিশ্রমী, সর্বকর্মে পারদর্শী । তারা নৌচালনা, মৎস্যশিকার, যুদ্ধবিদ্যা, কৃষিবাণিজ্য, বাস্তুবিদ্যা ও চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী ছিল ।  ভুসুকুর 'সহজ মহাতরু ফরিঅ এ  তৈলোএ / খসমসভাবে রে বা ণ মুকা কোএ ( ৪৩ নং ) পদটি 'বঙ্গাল' রাগে গীত । সেকালে 'বঙ্গাল', 'চন্ডাল' প্রভৃতি শ্রেণির মানুষেরা অভিজাতদের কাছে অন্ত্যজ বলে চিহ্নিত ছিলেন । এইসব ভূমিপুত্র অন্ত্যজ শ্রেণির শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গীতের রাগও তাদের নামেই হওয়া স্বাভাবিক ।

প্রাচীন বাংলার সাংগীতিক ঐতিহ্য চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন হয়ে সাম্প্রতিক সময়ের বহমান ধারার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত । 'ভাটি' বলতে নিম্নাঞ্চল, নিম্নপ্রবাহ, নিম্নমুখ ইত্যাদি বোঝায় । সাধারণত নদীর স্রোতের শেষপ্রান্তের ভাগকে বোঝায় । সেই 'ভাটি'র সঙ্গে বিশেষণ বাচক তদ্ধিত প্রত্যয় 'আল' বা 'আলি' প্রত্যয় যুক্ত হয়ে 'ভাটিয়াল' বা 'ভাটিয়ালি' শব্দ সৃষ্টি হয়েছে । 'উজান বাঁকে যায় রে ভাইটাল বাঁকে ঘর' । হলায়ুধ মিশ্র রচিত 'সেক সুভোদয়া' সংস্কৃত গ্রন্থে 'ভাটিয়ালি রাগেন গীয়তে' বলে একটি ছড়া সংগীতের উল্লেখ আছে । নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের গানই ভাটিয়ালি গান । ভাটির দিকে নৌকা ছেড়ে দিয়ে মাঝিরা অবসর সময়ে নৌকায় বসে যে গান গায় তাই ভাটিয়ালি গান এটা শ্রমজীবী মানুষেরই গান ।

ভাটিয়ালি গান কবে কিভাবে রচিত হয়েছিল তার ইতিহাস জানা না গেলেও বাংলাদেশের সংগীতের প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে আমরা চর্যাপদকেই মান্য করি । খ্রিস্টীয় নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশে চর্যার পদগুলি রচিত হয়েছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন । এই চর্যাপদের আলোচনায় গবেষকগণ চর্যাপদের কবি ভুসুকুপার রচিত ৪৩ সংখ্যক পদের বঙ্গাল রাগটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন । এই রাগটির সূত্র ধরেই গবেষকগণ ভুসুকুপাকে 'বঙ্গাল' বা বাংলাদেশের লোক বলে চিহ্নিত করেন । সেই সঙ্গে চর্যাপদে উল্লেখিত 'বঙ্গাল' রাগকে ভাটিয়ালি বলে মনে করেন ।

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ নদীর সাথে এদেশের মানুষের যুগসূত্র নিবিড় তাই ভাটিয়ালি গানও এদেশের মানুষের প্রাণের গভীর চেতনা থেকে উৎসারিত একটি বিশেষ ধারা । নদীর মাঝি বা নদী পাড়ের মানুষের জীবনে এই গানের অধিক প্রচলন দেখা যায় । নদীর ধারা যেভাবে ক্রমাগত প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায় তেমনি মানবজীবনও ক্রমাগত অতিক্রান্ত হয়ে একসময় মৃত্যুতে তার সমাপ্তি ঘটে । নদীর গতির সঙ্গে মানুষের জীবনের গতির এই অদ্ভুত মিলকে উপজীব্য করে লোকো কবিরা যে গান গেয়ে থাকেন তাই ভাটিয়ালি নদী যেমন উজান থেকে মাটির দিকে যায় মানুষের জীবনের শুরু সে রকম ক্রমান্বয়ে সমাপ্তির দিকে অগ্রসর হয় । চর্যাপদের বিভিন্ন গানের পদগুলিতে সেই সময়ের মানুষের জীবনধারাই প্রতিফলিত হয়ে উঠত । সেসময়েও মানুষ নদীকেন্দ্রিক জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল । তাই চর্যায় বঙ্গাল রাগে গীত ৪৩ সংখ্যক পদ ছাড়াও আরো কিছু কিছু পদের কথায় ভাটিয়ালি গানের আভাস পাওয়া যায় চর্যাপদের যে সকল গানে ভাটিয়ালির বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায় সেগুলো হল– ৫,৮,১০, ১৩,১৪,৩৮, ও ৪৯ সংখ্যক পদ । এই সমস্ত পদে নদী তীরবর্তী মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিরহ, বেদনা, নৈরাশ্য ও অন্তহীন জীবনজিজ্ঞাসার কথা বর্ণনা করা হয়েছে । চর্যাপদে ৫সংখ্যক পদে চাটিলপা বলছেন– 'ভব নঈ গহণ গম্ভীর বেগেঁ বাহী /  দূআন্তে চিখিল মাঝেঁ না থাহী । ( ভবনদী গহন এবং গম্ভীর বেগে তা প্রবাহিত হচ্ছে । দুই ধারে তার কাদা মাঝখানে থই পাওয়া যায় না ) ।৮সংখ্যক পদে কম্বলাম্বরপা বলছেন–'সোনে ভরিলী করুণা ণাবী ।/  রূপা থোই নাহিক ঠাবী । ( সোনায় পরিপূর্ণ আমার করুণা নৌকা রুপাদের রাখব তার জায়গা নেই ) । ১৪সংখ্যক পদে ডোম্বীপা লিখেছেন–'গঙ্গা জঊনা মাঝেঁ রে বহই নাঈ /  তহি বুড়িলী মাতঙ্গ যোইয়া লীলে পার করেই । ( গঙ্গা যমুনার মাঝখানে ওরে নৌকা বাওয়া হয়, তাতে নিমজ্জিত মাতঙ্গী যোগীকে অবহেলায় পার করে নেয় ) । ৩৮সংখ্যক পদে সরহপা বলেছেন–'কাঅ ণাবড়ী খান্ডি-মন কেড়ুআল / সদগুরু বঅনে ধর পতবাল ( কায়ারূপ নৌকা, মন রূপ বৈঠা, সদগুরুর বচনেতে হাল ধরে থাকো, পরপারে যেতে ) । ৪৯সংখ্যক পদে ভুসুকুপা উল্লেখ করেছেন–'বাজ ণাব পাড়ি, পঁউআ খালে বাহিউ / অদঅ বঙ্গালে দেশ লুড়িউ । ( বজ্র নৌকা পাড়ি দিয়ে পদ্মা খেলে বাওয়া হল । নির্দয় বঙ্গালে দেশ লুট করে নিয়ে গেল ) ।

মধ্যযুগীয় বাংলাকবিতায় গীতিসাহিত্যের অপূর্ব নিদর্শন বড়ু চন্ডিদাসের 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্যেও 'ভাটিয়ালি' নামের একটি রাগের উল্লেখ পাওয়া যায় । শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটি চর্যাপদের পর তথা ১৩০০ থেকে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়েছিল । শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ভাটিয়ালি রাগ অনেকগুলি গানের শিরোদেশে নির্দেশিত ছিল । এই গানগুলির প্রত্যেকটির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভাটিয়ালি গানের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে । পূর্ব বাংলার ভাটিয়ালি গানে যেমন বিরহ বিচ্ছেদ ও বেদনার আবহ থাকে তেমনি শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেও 'রাধাবিরহ' খন্ডে অধিকসংখ্যক ভাটিয়ালি রাগের উল্লেখ রয়েছে । শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের প্রায় ১৮টি গান ভাটিয়ালি রাগের অন্তর্গত ।

 চর্যাপদের গানগুলোতে যেমন জীবনযাত্রার চিত্রের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক সাধনার বার্তা রয়ে গেছে তেমনি ভাটিয়াল গানেও দেখি নদী জীবনের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক জীবনে অপূর্ণতার কথাই পক্ষান্তরে উল্লিখিত হয়ে থাকে । যেমন–'মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না / সারা জনম উজান বাইলাম ভাটির নাগাল পাইলাম না ।' অর্থাৎ, সারাজীবন ধরে সংসারধর্মই করা হয়েছে । অন্তিমে যাঁর শরণ নেওয়ার কথা তাঁকে ভাবার সুযোগ হল না ।  কালের বিবর্তনের নিয়মে বহু পরিবর্তন এলেও বাংলা ভাটিয়ালি সংগীতের মূল সূত্রটি যে চর্যাপদেই নিহিত তা অনায়াসেই বোঝা যায় । এছাড়া চর্যায় উল্লিখিত অনেক রাগ পরবর্তীসময়েও বাংলাগানে স্থান করে নিয়েছে।