কর্নাটকের নৃত্যশৈলী ও বৈচিত্র্য
অশোকানন্দ রায়বর্ধন
আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রদেশ তাদের নানারকম প্রাদেশিক লোকনৃত্যের জন্য বিখ্যাত । সেরকম কর্নাটকেরও বেশ কিছু লোকনৃত্য রয়েছে । তার মধ্যে ইয়াকষাগানা ( যক্ষগণ ), হাটারি ও কুনিথা ইত্যাদি প্রধান । ব্যাঙ্গালোরে যে জায়গাটায় ছেলের বাসায় আছি তার কাছাকাছি একটা গণেশ মন্দির আছে ।গণেশ পূজাকে কেন্দ্র করে এই চত্বরটা জমজমাট । লোকে লোকারণ্য । রাস্তা ব্লক করে চলছে নাচ-গান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান । পুজোর দিন সন্ধ্যায় প্রসাদ পেলাম । তার স্থানীয় নাম 'পোঙ্গল' । গতকাল সন্ধ্যায় দেখলাম দেওয়ালির মতো বাজি ফুটছে । সান্ধৃভ্রমণে বেরিয়ে গণেশ মন্দিরের কাছাকাছি গিয়ে দেখি আলোর মালা । রাস্তা জুড়ে । বাজি পুড়ছে অঝোরে । আর উল্টোদিকের ফাঁকা একটা জায়গায় দেখলাম লোকে লোকারণ্য । সেখানে বিকট শব্দে ঢাকজাতীয় কিছু বাজছে । কাছে গিয়ে দেখলাম চারদিকে ঘেরা মানুষের মাঝখানে নানারকম পোষাক ও মুখোশ পড়ে কিছু লোক ঘুরে ঘুরে নাচছে । পোষাকের কারণে তাদের বপু আর উচ্চতা সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু বেশি । আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না । ভিড় ঠেলে এগুতে গিয়ে অচেনা ভাষায় গালাগালি শুনলাম । তাতে কি হল । অর্থ যখন বুঝছি না তখন আর আমার চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করলেও গায়ে লাগবে না । যাই হোক, হেসেটেসে এগিয়ে গিয়ে নাচের ভিডিও করলাম । একটু পরেই নাচ শেষ হয়ে গেল ।
নাচ তো দেখলাম । কিন্তু কি নাম এই নাচের ? কেন নাচল ? ইত্যাদি জানার জন্যে মন উশখুশ করতে লাগল । ফেরার পথে রাস্তার উল্টোদিকে দেখলাম একজন নানারকম ফল কুচি কুচি করে বাটিতে সাজিয়ে বিক্রি করছেন । তাঁরা একে বলেন 'ফ্রুটবল' । এটা বুঝতেও আমার বেগ পেতে হয়েছিল । প্রথমদিন শব্দটা আমার কানে লেগেছিল 'ফুটবল' । পরে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় আমার কাছে । ব্যাঙ্গালোরে এরকম কুচো ফলের বাটি এবং ফলের রস রাস্তার মোড়ে মোড়েই পাওয়া যায় । আমি দোকানটাতে গিয়ে একবাটি কুচো ফল নিলাম । ওর পাশেই একটা খালি টুল পেয়ে বসে ফল খেতে খেতে ওর সঙ্গে গল্প জুড়লাম । দুজনেরই মাধ্যম হিন্দি পান্ডিত্যের কথা আর উল্লেখ করলাম না । ওকে বললাম, ভাই উধার এক বড়িয়া ডান্স দেখা ম্যায়নে । বলে ওদিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলাম । ও বলল, ডাল্লু কুনিথা ডানছো ? কেন জানি মনে হল তাঁর কাছ থেকে কিছু জানা যাবে । আমি বললাম, হাঁ হাঁ ভাইয়া, কিঁউ ইতনা ডান্স কিয়া ? বাজা বাজায়া ? তিনি তখন আমাকে টুকটাক যা বললেন সেটাই এই অর্বাচীনের কাছে বড়ো পাওনা হল । কথায় কথায় জানালেন তিনি কলেজ পর্যন্ত পড়েছেন । অর্থাভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেননি । অল্প কিছুক্ষণ সময়ে তিনি যা বললেন তা আমি মনে গেঁথে দ্রুত বাসায় ফিরে এসে প্যাডে নোট করে নিলাম । কিছু কিছু ব্যাখ্যা কন্নড়ি অ্যাকসেন্টে হিন্দি বলায় কিছুই বুঝতে পারিনি । এখানকার ভাষা জানিনা বুঝিনা । তাই যাচাই করার সুযোগ নেই । তাই ফুটপাথের ওই হকারের মুখে যা শুনেছি তাই গুছিয়ে আজই লেখাটা তৈরি করলাম । তথ্যের চাইতে একটা প্রাদেশিক নৃত্যের দর্শনটাই আমার কাছে বিরল প্রাপ্তি । আমার আবেগটাকে প্রাধান্য দিয়ে অভিজ্ঞ পাঠক আমার তথ্যগত ভুলটাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি ।
কর্নাটকে বিশেষ পূজা-পার্বণ উপলক্ষে অনুষ্ঠানমূলক নৃত্যের আয়োজন করা হয়ে থাকে । 'ডল্লু কুনিথা' সেই ধরনের এক বিশেষ নৃত্য । 'ডল্লু কুনিথা' নৃত্যের সঙ্গে শিব-পার্বতীর মিথ জড়িত । বুঝলাম, শিবপরিবারের সদস্য গণেশের পুজো উপলক্ষেই তাহলে এই নৃত্যের আয়োজন । ডল্লু কুনিথা নৃত্যে বিকট শব্দে ড্রাম বাজানো হয় । তার সঙ্গে তালে তালে নানারকম মুখোশ পরে নৃত্যশিল্পীরা ঘুরে ঘুরে দলবদ্ধভাবে নৃত্য করে । শৈব ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এই নৃত্য বিশেষভাবে প্রচলিত । ধর্মীয় অনুষ্ঠানমূলক কুনিথা নৃত্যের আরো প্রকারভেদ আছে । যেমন 'দেবারি থাট্টে কুনিথা', 'ইয়ালেম্মানা কুনিথা', 'সুগ্গি কুনিথা', 'পাটা কুনিথা', 'গৌরাভা কুনিথা' ( উচ্চারণ আমি যতটা বুঝেছি সেই অনুযায়ী লিখলাম ) ইত্যাদি এক একটি দেবদেবীর নামানুসারে প্রচলিত অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক নৃত্য । নৃত্যরত শিল্পীদের পোষাক-মুখোশ দেখে আমার মনে হল, এরা বোধহয় শৈব মিথকল্পের সদস্য ইতর প্রাণী নন্দী, ভৃঙ্গী, বৃষ, মোষ ইত্যাদি চরিত্র রূপায়িত করেছে ।
বিশাল ভারতবর্ষের বহু বৈচিত্র্যের ধারাটি নৃত্যের মধ্যেও বিরাজমান । নানা প্রদেশের নানারকম ধ্রুপদী নৃত্য ও লোকনৃত্যে জড়িয়ে রয়েছে বহু বর্ণময় উপকরণ, আঙ্গিক । যা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে নিরন্তর সমৃদ্ধ করে চলেছে ।বহন করে চলেছে সম্প্রীতির বার্তা ফল্গুধারার মতো ।
ব্যাঙ্গালুরু, ২৫সেপ্টেম্বর,২০২৩
No comments:
Post a Comment