Showing posts with label ফিচার. Show all posts
Showing posts with label ফিচার. Show all posts

Saturday, May 2, 2026

'এসো হে বৈশাখ' : নববর্ষের ভাবনা

'এসো হে বৈশাখ' : নববর্ষের ভাবনা

চৈত্রসংক্রান্তির পর দিনেই আসে পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ নববর্ষের প্রথম দিন । এটি কেবল বর্ষপঞ্জির একটি পরিবর্তন নয় । বরং বাঙালির চিরন্তন সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ । এই দিনে মানুষ নতুন পোশাক পরে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটান, দেখা-সাক্ষাৎ করেন  এবং আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন ।সেইসঙ্গে নানাধরনের উপাদেয় খাওয়াদাওয়ায় মেতে ওঠেন ।  ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা শুরু করেন ।‌ যার নাম 'হালখাতা' । মহাজনের গদিতে এদিন সিদ্ধিদাতা গণেশ, গন্ধেশ্বরী কিংবা লক্ষ্মীপূজা দেওয়া হয় । পুরোনো দেনাপাওনা চুকিয়ে নতুন সূচনার প্রতীক এই 'হালখাতা' । সারা বছরের ক্রেতারা এদিন ব্যবসায়ীর দোকানে বা গদিতে আসেন এবং মিষ্টিমুখে আপ্যায়িত হন । সেই সঙ্গে খদ্দের পুরনো বকেয়ার আংশিক বা সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি ঘটান । গৃহস্থবাড়িতে হয় গৃহদেবতার পূজা । অনেকে মন্দিরে গিয়ে পূজা দিয়ে পারিবারিক সুখ সমৃদ্ধি জন্য প্রার্থনা করেন । গুরুজনদের প্রণাম জানান । ছোটোদের স্নেহাশীর্বাদ করেন । মুসলিমদের মধ্যেও এদিন নামাজ আদায়ের রীতিনীতি প্রচলিত রয়েছে । ত্রিপুরার জনজাতিদের মধ্যেও চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষের শুরুতে 'বিজু', 'বুইসু', বিসিকাতাল ও 'সাংগ্রেই' উৎসব পালনের রীতি রয়েছে ।

এক সময় বাঙালি জীবনঅর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর । সেকারণে কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতি ছিল জীবনের কেন্দ্রে । এই বর্ষগণনা পদ্ধতি ও কৃষিকে নির্ভর করেই নিরূপণ করা হয় । 'মেষোদয়ো দ্বদশৈতে মাসাস্তৈরেব বৎসরঃ' । অর্থাৎ বৈশাখ থেকে চৈত্রমাস মেষাদিক্রমে দ্বাদশ রাশির বসতি । পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জি উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত । কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ কমই । মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন । পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা পাওনার হিসাব মেটানো । বিশ্বের বড়ো বড়ো উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক বা জাতিকেন্দ্রিক । এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম বাঙালির পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজন । বাংলা সনে প্রথম দিন সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) কর আদায়ের সুবিধার্থে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এই 'ফসলি সন' প্রবর্তন করেছিলেন, যা কাল ক্রমে 'বাংলা সন' নামে পরিচিতি লাভ করে । মূলত জমিদার ও কৃষকদের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয় ।

বাংলা নববর্ষকে আবেগপূর্ণ করে তোলার ক্ষেত্রে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল অসীম । উনিশ শতকে তিনি এই পহেলা বৈশাখকে আনুষ্ঠানিকতায় রূপদান করেছিলেন, । রবীন্দ্রনাথও তাঁর জমিদারিতে 'পুণ্যাহ' বা খাজনা আদায়ের উৎসব হিসেবে নববর্ষের সূচনা করেছিলেন । রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন–'সেদিন ছিল যাকে বলে জমিদারি সেরেস্তার 'পুণ্যাহ', হোক খাজনা আদায়ের প্রথম দিন । কাজটা নিতান্তই বিষয়-কাজ । কিন্তু জমিদারি মহলে সেটা হয়ে উঠেছে একটি পার্বণ ।  সবাই খুশি । যে খাজনা দেয় সেও, আর যে খাজনা বাক্সতে ভর্তি করে সেও । এর মধ্যে হিসেব মিলিয়ে দেখার গন্ধ ছিল না । যে যা দিতে পারে তাই দেয়, প্রাপ্য নিয়ে কোন তকরার হয় না । খুব ধুমধাম পাড়াগেঁয়ে সানাই অত্যন্ত বেসুরে আকাশ মাতিয়ে তোলে । নতুন কাপড় পরে প্রজারা কাছারিতে সেলাম দিতে আসে ।' সেকালে জমিদারি মহলে এই পুণ্যাহ একটা পার্বণে পর্যবসিত হত । এই উপলক্ষে জমিদারদের ব্যয়ের বহরও ছিল বিশাল । যতটা না আয় হত অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি ব্যয় হতো তবুও তাঁরা এবং প্রজারা খুশি থাকতেন । সে কারণেই 'খাজনা থেকে বাজনা বেশি' প্রবাদটির উৎপত্তি ।

আজ বিশ্বায়নের কালে বাঙালির কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বনিয়াদ পরিবর্তিত হয়ে গেছে । গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহর মুখে হচ্ছেন । রোজগার এবং কর্মের কারণে বাঙালি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে । তারপরও আজও বাঙালি যেখানে গেছে সেখানেই এই দুদিনের উৎসবকে ঘটা করে পালন করার প্রচেষ্টা দেখা যায় । এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ঐতিহ্য ও জীবন দর্শনের এক অনন্য প্রতিফলন পুরনো কে বিদায় জানিয়ে নতুনকে বরণ করার এই চিরন্তন প্রক্রিয়ায় বাঙালি জীবনের গতিশীলতাকে ধরে রেখেছে । অর্থনৈতিক কারণেই এখন আর রাত জেগে বাড়ি বাড়ি গাজন নৃত্য দেখা যায় না । পাশাপাশি একান্নবর্তী পরিবারগুলোও ভেঙে যাওয়ার ফলে অনেক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও এখন কমে গেছে । ফলে আজকের বাঙালি সমাজ অনেকটা শেকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন । আর শেকড় থেকে ছিন্ন হলে একটা জাতি তার অস্তিত্বের সংকটে পড়ে । সে কারণেই বাঙালি আজ সংকটাপন্ন জাতি । বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের সংস্কৃতির উত্তরাধিকার পুনরায় অর্জন করতে হলে তাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে । লালন করতে হবে নিজস্ব সংস্কৃতিকে । রবীন্দ্রনাথ বাঙালির এই সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিলেন । তিনি শুরু করেছিলেন বর্ষবরণ, হলকর্ষণ, বর্ষাবরণ, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি নানা অনুষ্ঠান । তাঁর সাহিত্যে, গানে, কবিতায় বর্ষশেষ এবং নতুন বর্ষকে নিয়ে অনেক কথা তিনি বলেছেন । আজীবন তিনি বিশ্ব প্রকৃতির অখন্ডতাকে অনুভব করেছেন । রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'চৈতালি' কাব্যগ্রন্থের 'বর্ষশেষ' কবিতার এক জায়গায় লিখেছেন–

'পাখিরা জানে না কেহ আজি বর্ষ শেষ,
বকবৃদ্ধ কাছে নাহি শুনে উপদেশ ।
যতদিন এ আকাশে এ জীবন আছে,
বরষের শেষ নাহি তাহাদের কাছে ।
মানুষ আনন্দহীন নিশিদিন ধরি, 
আপনার এই ভাগ করে শতভাগ করি ।'

কবিতায় নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশ করেছেন তিনি । সত্য রূপকে শিল্পরূপ দান করেছেন এই কবিতায় এক অনবদ্য ভাষায় । মানুষ খন্ড, বিশ্বপ্রকৃতি অখন্ড–এই বোধ, এই চেতনায় বর্ষশেষের ভাবনাকে অভিনব শিল্পরূপ প্রদান করেছেন রবীন্দ্রনাথ । বর্ষশেষ এবং নববর্ষের মধ্যে রয়েছে এক অদ্ভুত মিল সে মিল হল মানুষের কল্যাণচেতনা এবং মানুষের মঙ্গলভাবনার যুগলবন্দী ।

শুভ নববর্ষ । প্রীতি ও শুভেচ্ছা সকলের জন্যে ।

Saturday, February 21, 2026

বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি : সাব্রুমের মৈত্রীসেতু চালু হওয়া নিয়ে আশার আলো দেখছেন দুপারের জনগণ

বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি : সাব্রুমের মৈত্রীসেতু চালু হওয়া নিয়ে আশার আলো দেখছেন দুপারের জনগণ 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন


 বিএনপি দল বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার পর সাব্রুমে আবার উঠে আসছে মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রসঙ্গ । ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জিয়াউর রহমান পর্যায়ক্রমে ১ নম্বর ও ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন । ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস থেকে জুন পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা নিয়ে গঠিত ১ নম্বর সেক্টরের এবং জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ময়মনসিংহ টাঙ্গাইল (কিশোরগঞ্জ বাদে) এলাকা নিয়ে গঠিত ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন । এছাড়া তিনি জেড ফোর্সেরও সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ।

১৯৭১ এর ২৫ শে মার্চ গন্ডগোলের পর ২৬ শে মার্চ ১৯৭১ এ রামগড় ও উত্তাল হয়ে উঠে,সীমান্ত এলাকায় ই পি আর ক্যাস্পগুলো আক্রান্ত হয়,সুদ্ধী অভিযান চলে, বাঙ্গালী ই পি আর সদস্যরা জনগনের সহায়তায় সম্মীলিত প্রচেষ্টায় পাঠান পাঞ্জাবী  সৈনিকদের নির্মুল করে,তখন মিঃ এন কে সিংহের রেশনসপের (এম আর ডিলার/ জি ই ডিলার) কাছে হাজার হাজার শরনার্থী বিভিন্ন স্থান থেকে রামগড়ে জড়ো হতে থাকে,তাদের কে রেশানিং সাপোর্ট দিতেন দায়িত্বপ্রাপ্ত বরুণ বনিক, কমমুল্যে  রেশন পেতো,পরে ফেনী নদী অতিক্রম করে ভারতের সাব্রুম সাবডিভিশন হয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িযে পড়তো,তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান হরিনায় ১ নং সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন,তখন রামগড় থানার ওসি হান্নান চৌধুরী,ওসি এল এস ডি করিম চৌধুরী,,ও রামগড় সাবডিভিশনের সকল কর্মকর্তা সহ  ড. আনিসুজ্জামান, সাহিত্যিক বিপ্রদাস বড়ুয়া, অভিনেতা আলী জাকেরসহ অনেক দামী নামী ব্যাক্তিবর্গ প্রতিদিন রামগড় দিয়েই ভারতে প্রবেশ করতেন । মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ ও তাঁর সহযোগী শাহ আলম পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রনে যাবার  মুহুর্ত্বেই সব কিচু ছেড়ে দিয়ে ভারতে চলে যান,চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চেন্সেলর ডঃ এম আর খাঁন,কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের মালিকের স্ত্রী পুত্র,চিত্রনায়িকা কবরী তার তৎকালীন স্বামী চিত্ত চৌধুরীসহ বহু লোক রামগড় সীমান্তের ফেনীনদী  পেরিয়ে ভারতের সাব্রুম চলে যান ।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির উপর বর্বর আক্রমণ চালায় তখন জিয়াউর রহমান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাঁর বাহিনী নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন । ২৬ শে মার্চ রাতে প্রায় আড়াইশো বাঙালির সেনা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মেজর জিয়া । ২৭ শে মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে সকাল ১১ টায় মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি পাঠ করেন । জীবন মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে এই অকুতোভয় সেনানায়ক সেদিন স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে নামেন । আর সেসময় তার স্ত্রী ও সন্তানগণ ছিল ঢাকা সেনানিবাসে বন্দী । তা সত্ত্বেও তিনি জেড ফোর্স গঠন করে মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধকে বেগবান করেন । স্বাধীনতা লাভের পর তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদানের ও নেতৃত্বের জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করেন । ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষে এবং এপ্রিলের শুরুতে পাকিস্তান বাহিনী চট্টগ্রাম দখল করলে মেজর জিয়াউর রহমান অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের নিয়ে সীমান্ত এলাকার রামগড়ে ঘাঁটি গাড়েন । সেখান থেকে রামগড় স্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং পরিচালনা করেন । এপ্রিলের শুরুর দিকে তিনি তাঁর বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ফেনী নদী পেরিয়ে সাব্রুমের হরিণাতে চলে আসেন এবং সেখান থেকে ভারতের সীমান্ত ব্যবহার করে যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকেন । এ সময় ভারতের বিএসএফের লে. কর্নেল ঘোষ, মেজর প্রধান, ক্যাপ্টেন ঘোষ এবং সাব্রুম পুলিশ স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বীরেন মুখার্জি মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করেন । ২৫ শে জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, মিরসরাই, রামগড়, ফেনী ও নোয়াখালিতে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে একাধিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ।

স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে একসময় মেজর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৮১ সালের ৩০ শে মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক  উত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একনম্বর সেক্টরের দায়িত্ব পালনের সুবাদে জিয়াউর রহমান সাব্রুমের প্রত্যন্ত অঞ্চল শিলাছড়ি, ঘোড়াকাঁপা, বৈষ্ণবপুর, মনুঘাট, আমলিঘাট শ্রীনগর থেকে শুরু করে বিলোনিয়ার নলুয়া, ঋষ্যমুখ, মতাই ইত্যাদি অঞ্চল চষে বেরিয়েছিলেন সেদিন । এই সীমান্ত অঞ্চলগুলি দিয়েই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে আক্রমণ শানাতেন । ফলে এখানকার জনগণের সঙ্গে তার একটা নিবিড় সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল, ৭১এর সে দিনে সাব্রুমের এক সাধারণ ব্যবসায়ী মাখন দের হোটেলে তিনি খাওয়া-দাওয়া করতেন । নিছক ব্যবসায়িক সম্পর্ক হয়েও জিয়াসাহেব না ফেরা পর্যন্ত তিনি খাওয়াদাওয়া করতেন । এছাড়া এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সেসময়ের সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল ।

গত ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের বিএনপি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করায় বহুবছর পরে আবার জিয়াউর রহমানের নাম সাব্রুম তথা দক্ষিণ ত্রিপুরার পুরনো নাগরিকদের র মুখে মুখে প্রকাশ পাচ্ছে । অনেক বয়স্ক জনেরা তার স্মৃতিচারণ করছেন । অন্যদিকে বিগত সরকারের আমলে সাব্রুমের ফেনী নদীর উপরে মৈত্রীসেতু তৈরি হয়েছিল এবং এই মৈত্রীসেতুকে কেন্দ্র করে দুপাড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাতায়াতের একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল । কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে একেবারে মৈত্রীসেতুর দ্বারদঘাটনের মুখে সেদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাক্রমের পরিণতিতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কিছু মানুষ ভারতবিদ্বেষী প্রচারে মেতে ওঠে । ফলে দু দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল । তারা মৈত্রী সেতুকেন্দ্রিক সমগ্র কর্মকান্ডের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় । ফলে প্রকল্পটি সাময়িকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে । এবং এই প্রকল্প প্রায় অন্ধকারে চলে যাচ্ছিল । ডঃ মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই প্রকল্পের সলিল সমাধি ঘটাতে সচেষ্ট ছিলেন । পাশাপাশি রামগড় ও সাব্রুম এর স্থলবন্দরসহ মীরসরাইয়ের এস ই জেড প্রকল্প তাঁরা স্তব্ধ করে দেন । মীরসরাইয়ের প্রকল্পটি বাতিল করে সেখানে বিদেশের সহায়তায় সমরাস্ত্র প্রস্তুত এর কারখানা গড়ার পরিকল্পনা নেন তাঁরা । সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে বাংলাদেশে বিএনপি দল ভূমিধ্বস জয়লাভ করায় ড. ইউনুস এখন ইতিহাসের পাতায় । ইতোমধ্যে সেদিনের এক নম্বর সেক্টরের সেনানায়ক বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার গঠন করার ফলে সে প্রকল্পে আবার আসার আলো দেখা যাচ্ছে । এই দলটি ক্ষমতায় এসেই ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পুনরুজ্জীবন ও গতিশীল রাখার বার্তা দেয় । ভারত সরকারও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ।  দুদেশের ভিসার প্রদানের ব্যাপারে নিয়মকানুন শিথিল কড়ার প্রয়াসও নেওয়া হচ্ছে ।ফেনীনদীর উপর নির্মিত মৈত্রীসেতু যদি চালু হয় তাহলে অতি সহজে চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করে এই অঞ্চলে বাণিজ্যবিস্তারের বিপুল সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে । এর ফলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নও প্রবলভাবে সাধিত হবে । পাল্টে যাবে জীবনযাত্রার মান ও অর্থনৈতিক চিত্র ।  নতুন সরকার আসার ফলে দক্ষিণ ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অর্থাৎ ফেনীনদীর দুই তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ আবার নতুন করে আশার আলো দেখছেন । যদি এখানে মৈত্রী সেতুকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সচল হয়ে ওঠে তাহলে এখানকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র একেবারেই পাল্টে যাবে বলে দুপারের মানুষজনই আশা প্রকাশ করছেন । অনেকে জিয়াউর রহমানের লড়াইয়ের কেন্দ্র একনম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার সাব্রুমের হরিনা পরিদর্শনের ও আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়াকে ।এখন দেখার বিষয় নতুন সরকার ও বিএনপি দলের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা তারেক জিয়া ও তার মন্ত্রিপরিষদ কতটা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন ।

Wednesday, December 31, 2025

বেগম খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে দেশের কর্ণধার

বেগম খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে দেশের কর্ণধার

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

মনে পড়ছে একাত্তরের ঝড়ো দিনগুলোর কথা । ওপার বাংলায় তখন নতুন দিগন্তরেখা । ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হচ্ছে রক্তিম আলোকচ্ছটায় । স্বাধীনতাকামী আকিশোর-বৃদ্ধ-বণিতা নেমে পড়েছে রাজপথে । ২৫ শে মার্চের পর থেকে সে আন্দোলন আরো সংগঠিত রূপ নেয় । সেদিন আমাদের এই সাব্রুমের অপর প্রান্তে ফেনীনদীর দক্ষিণ পাড়ে রামগড় হাইস্কুলের মাঠে চলেছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ । প্রশিক্ষণের নেতৃত্বে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান । এক দীর্ঘ সময় রামগড়কে পাক হানাদারমুক্ত রেখে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন । 

একসময় পাকবাহিনী রামগড় দখল করে নিলে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী চলে আসেন সাব্রুম ।সাব্রুমের হরিনা গ্রামসংলগ্ন গরিফা অরণ্যভূমিতে । করা হয় মুক্তিফৌজের ক্যাম্প ও একনম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার । প্রথমদিকে দায়িত্বে ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান । এখানেও তিনি যুবকদের একত্রিত করে ট্রেনিং পরিচালনা করতেন । তারপর মুক্তিবাহিনীকে পাঠাতেন দেশের অভ্যন্তরের লড়াই করার জন্য । এক নম্বর সেক্টরের সবগুলো সাব-সেক্টরের মধ্যে সাব্রুমের শিলাছড়ি, ঘোড়াকাঁপা থেকে শুরু করে ঋষ্যমুখ, মতাই পর্যন্ত তিনি চরকির মতো ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহিত করতেন । রণকৌশল নির্মান করতেন । রণাঙ্গনের নেতৃত্ব দিতেন । কখনো দিনে বা রাতে খেতে আসতেন সাব্রুম-ছোটখিল রোডের মুখে বাঁ-পাশে মাখন দে-র হোটেলে ।

সারাক্ষণ বাংলাদেশকে স্বাধীন করার চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন এই উচ্চপদস্থ সেনানায়ক । এতকিছুর মধ্যেও তাঁর মনে সুখ ছিল না এতোটুকু । তিনি সংবাদ পেয়েছেন তাঁর সহধর্মিনী বেগম জিয়া ও দুই প্রাণপ্রিয় সন্তান ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বন্দি অবস্থায় আছেন । তিনি চঞ্চল হয়ে উঠলেন । নানাভাবে তিনি খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন । খবর পেলেন ২রা জুলাই ঢাকা সিদ্ধেশ্বরীর এক বাসা থেকে পাক সেনারা বেগম জিয়াকে তার দুই সন্তান সহ ধরে নিয়ে গেছে । ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট ২৪ বছর বয়সে যখন তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন ছিলেন । তখন মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী খালেদাকে বিয়ে করেন । এর মধ্যে তাঁদের দুটি সন্তান আসে । মাত্র ১০-১১ বছরের দাম্পত্যজীবন  সেসময় । স্ত্রী ও পুত্রগণের বন্দী হওয়ার সংবাদে তিনি আরো মারমুখী হয়ে উঠেছিলেন । ধ্বংস করছিলেন একের পর এক পাকঘাঁটি । বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণাঞ্চল মুক্ত রাখা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা এনে দিয়েছিল ।

 ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন । ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি পান । বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ১৯৮১ সালে যখন হত্যা করা হয় সেই প্রেক্ষাপটে বিপর্যস্ত বিএনপিকে টিকিয়ে রাখতে বেগম খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেছিলেন । রাজনীতিতে আসার আগ পর্যন্ত তিনি একজন সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন । দলের সাধারণ সদস্যপদও তাঁর ছিল না । গৃহবধূ থেকে পরবর্তী সময়ে আপোসহীন নেত্রী ও তারপরে দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হন তিনি । ১৯৯১–৯৬ এবং ২০০১–২০০৬ এই দুই মেয়াদে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক পরিপূর্ণতা আসে । তাঁর গৃহীত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গতি দিয়েছে । তিনি বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে থেকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন । তাঁর সময়েই  পোশাক তৈরি ও রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতির বিস্তার লাভ ঘটে ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অবদান রাখে । শিক্ষা ও গবেষণামূলক কার্যক্রমের প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে । বিশ্বরাজনীতিমহলেও তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।  আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাফল্য আসে । বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব ফেলেছিল তাঁর সরকার অর্থনীতিতে উদারীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করায়,  যার ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন সুযোগ উন্মোচিত হয়েছিল । প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছিল । ভারতের সাথে সাম্যতা রেখে সবার সাথে কানেক্টিভিটি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল । যদিও ভারতের সাথে বিএনপি সরকারের কতটা সুসম্পর্ক ছিল তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে । কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে চলতে থাকা দীর্ঘকালীন সংকট তিন বিঘা করিডোর পালাক্রমে ৬ ঘন্টা করে দুই দেশের জন্য উন্মুক্ত হয়েছিল তাঁর আমলেই ১৯৯২ সালের জুন মাসে । তবে তার সময়ে সুশাসনে ঘাটতিও ছিল প্রচুর । তিনি সবসময় একদল স্তাবক পরিবৃত থাকতেন

তাঁর বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার উত্থান-পতন, মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব, মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা, জুলুম, নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন তিনি । স্বামী ও কনিষ্ঠপুত্র আরাফাত রহমানকে হারানোর গভীর শোকজনিত ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও দীর্ঘ শারীরিক জটিলতা ও রোগযন্ত্রণা বয়ে বয়ে তাঁর জীবনের যবনিক নেমে আসে । 

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়ানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে । বর্তমান বাংলাদেশের অস্থির ও অনিশ্চিত সময়ে তাঁর চিরপ্রস্থান সেদেশের সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে ।

Monday, February 26, 2024

ব ইয়ের ফাঁদ পাতা ভুবনে ভুবনে

বইয়ের ফাঁদ পাতা ভুবনে ভুবনে

কবিতা ছাপানো আর কবিতা পাঠের সুযোগ দেওয়ার নামে টাকা কামানোর ধান্দা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে । মফস্বলের, ভিনরাজ্যের এমন লিখতে আসা বহু তরুণ-তরুণী এদের পাল্লায় পড়ে লাগাতর ঠকে যাচ্ছেন । আপনি সময়োপযোগী এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন । তরুণ লিখিয়েরা এত কিছু জানে না বোঝে না । শুধু নিজের নামটা ছাপার অক্ষরে দেখার জন্যে এদের পাল্লায় পড়ে প্রতারিত হয় । এই প্রতারকরা আবার নানা সাহিত্যসংগঠন করে অর্থের বিনিময়ে প্রতিদিন অনলাইন কবিতা প্রতিযোগিতা ও শংসাপত্র প্রদান করে । গাঁটের কড়ি খসিয়ে কবিতাভ্রমণে নিয়ে যায় । সাহিত্যাঙ্গনে নানা কায়দায় এরা প্রতারণার ফাঁদ পেতে রেখেছে ।

কবিতাফাঁদ

 কবিতাফাঁদ

কবিতা ছাপানো আর কবিতা পাঠের সুযোগ দেওয়ার নামে টাকা কামানোর ধান্দা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে । মফস্বলের, ভিনরাজ্যের এমন লিখতে আসা বহু তরুণ-তরুণী এদের পাল্লায় পড়ে লাগাতর ঠকে যাচ্ছেন । আপনি সময়োপযোগী এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন । তরুণ লিখিয়েরা এত কিছু জানে না বোঝে না । শুধু নিজের নামটা ছাপার অক্ষরে দেখার জন্যে এদের পাল্লায় পড়ে প্রতারিত হয় । এই প্রতারকরা আবার নানা সাহিত্যসংগঠন করে অর্থের বিনিময়ে প্রতিদিন অনলাইন কবিতা প্রতিযোগিতা ও শংসাপত্র প্রদান করে । গাঁটের কড়ি খসিয়ে কবিতাভ্রমণে নিয়ে যায় । সাহিত্যাঙ্গনে নানা কায়দায় এরা প্রতারণার ফাঁদ পেতে রেখেছে ।

Sunday, February 25, 2024

বই নিয়ে আশার আকাশপ্রদীপ

বই নিয়ে আশার আকাশপ্রদীপ

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আগরতলা বইমেলা দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে আজ একটি সম্মানজনক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে । বিশ্বের অন্যান্য বড়ো বড়ো বইমেলার সঙ্গে আগরতলার বইমেলার নাম আজ একসঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে । হাঁটি হাঁটি পা পা করে রবীন্দ্রভবনের প্রাঙ্গনে শুরু হওয়া বইমেলা আজ হাঁপানিয়া প্রাঙ্গণের বিশাল পরিসরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে । সৌন্দর্যের আন্তরিকতায় এই মেলা আজ পবিত্র ভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছে । আগরতলা বইমেলার সুবাদে বইমেলার সঙ্গে জড়িত প্রকাশনা শিল্পের সৌজন্যে ত্রিপুরার সাহিত্য আজ বহির্ত্রিপুরা ও বিশ্বের গুণীজন সমাজের কাছে সুপরিচিত । ত্রিপুরার লেখালেখি আজ সসম্মানে সর্বত্র সমাদৃত । ত্রিপুরার কবি সাহিত্যিকদের নাম আজ মূলধারার সঙ্গে সমানভাবে উচ্চারিত হয় । 

এই বইমেলার শুরুর দিনে যাঁরা ছিলেন তরুণ । আজ তাঁরা অনেকেই বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছেন । অনেকে জীবন-মৃত্যুর সীমানা পেরিয়ে গেছেন দূরের ঠিকানায় । প্রয়াতজন ও প্রবীনদের লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে রাজ্যের সাহিত্যভবন । আর এখন তো বইমেলা জুড়ে তারুণ্যের প্রবাহ । এই সময়ে সপ্তশ্রী কর্মকার, প্রিয়াঙ্কা দেবনাথ, সঞ্জয় দত্ত, নয়ন দে, সঙ্গীতা দাস, সুধীর দাস, জগন্নাথ বণিক, শহিদুল ইসলাম, সংহিতা চৌধুরী, মন্দিরা লস্কর, আব্দুল হালিম, বিদ্যুৎ হোসেন, বিধর্ণা মজুমদার এর মত তরুণ তরুণীরা এগিয়ে এসেছেন সাহিত্যের অঙ্গনে । এঁরা অনেক বেশি প্রাণবন্ত অনেক বেশি সংগঠিত । আর সময়ের কারণে তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে তাঁদের লেখা অতি দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে পাঠকের সামনে সামাজিক মাধ্যমের সৌজন্যে । মুহূর্তে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে তরুণ প্রজন্মের সৃজন । তাঁদের সৃষ্টির গুণমান সম্বন্ধেও অতি দ্রুত প্রতিক্রিয়া পাচ্ছেন তাঁরা । ফলে তাঁদের দ্রুতগতিতে পরিশীলিত হওয়ার সুযোগ থাকছে । হতেও হচ্ছে । তাঁদেরই মধ্যে একদল নিজেদের নিয়োজিত রাখছেন নিবিড় পাঠের মধ্যে । বিশ্বের নানাভাষার ও বাংলাভাষার ধ্রুপদী সৃষ্টিসম্ভারকে তাঁরা অন্তরে আহরণ করে চলেছেন । এরাই আগামী দিনে রাজ্যের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করবেন ।

 আর একদল আছেন যাঁরা সাহিত্যচর্চার নামে রাজ্যের সাহিত্যের অঙ্গনে আবর্জনা স্তূপ তৈরি করে চলেছেন । যাঁরা শুধু লেখেন । পড়েন না । সমকালের সাহিত্যের সঙ্গে যাঁদের কোনো যোগাযোগ নেই তাঁদের মধ্যে কবিরাই সংখ্যায় বেশি । এঁরা এখনো শব্দচয়নে, ভাষা ব্যবহারে গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক অতিক্রম করতে পারেননি । তাঁরা বাংলা কবিতার অগ্রজ কবিদের কবিতার সঙ্গে পরিচিত নন । সমকালে বাংলা কবিতা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে তাও জানেন না । এই সময়ের সমগ্র বাংলাকবিতা তো দূর অস্ত,  আমাদের রাজ্যের কাব্য ও কথাসাহিত্যের গতিপ্রকৃতি সম্বন্ধে তাঁরা অন্ধকারে । তাঁরা পড়েননি আমাদের রূপন মজুমদার, শান্তনু মজুমদার, পঙ্কজ কান্তি মালাকার, রাহুল শীল, সংগীত শীল, রুবেল হোসেন, পান্থ দাস, গোপাল দে, গোপাল বনিক, দেবব্রত চক্রবর্তী প্রমুখদের কবিতা । এঁরা তরুণতম কবি ভবানী বিশ্বাসের সাড়া জাগানো 'দিদার সুরলা গান'-র খবর রাখেন না । এরা বইমেলায় যান । লিটল ম্যাগাজিন স্টলে প্রবেশ করেন না । এঁরা অনলাইনে প্রতিদিন পুরস্কৃত হন । আর তার ছবি পোস্ট করেন সোশ্যাল মিডিয়ায় । এঁরা সাহিত্যের কাগজও করেন যা মোটেই লিটল ম্যাগাজিন পদবাচ্য নয় । অথচ এঁরা জানেন না ঘাটের পয়সা খরচা করে কি অসাধারণ সব লিটল ম্যাগাজিন করে চলেছেন জয় দেবনাথ, চয়ন সাহা, দীপেন নাথশর্মা, মিঠু মল্লিক বৈদ্য, অনামিকা লস্কর, সৈকত মজুমদার, দীপ্সি দে, উর্মি সাহাড. ঝর্ণা বনিক, গীতশ্রী ভৌমিক, শাশ্বতী দাস প্রমুখরা । এঁরা দেশ-বিদেশে সাহিত্যের চড়ুইভাতিতে যান । ত্রিপুরার প্রতিনিধিত্ব করেন । দীর্ঘবছরের বইমেলাতেও এঁদের কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি ।

বইমেলাকে অনেকেই বিনোদনের মেলা হিসেবে আজও মনে করে চলেছেন । এঁরা বইমেলায় যান । সপরিবারেই যান । সরকারি পরিবহনের সুযোগ নিয়ে বিনি পয়সায় মেলা পরিক্রমা করেন । ফুচকা খান, ফাস্টফুড খান । আচার খান । যতটা হুমড়ি খেয়ে পড়েন খাবারের দোকানে, তার দশমাংশও বইয়ের স্টল গুলোতে নয় । এঁরা খালি হাতে মেলায় ঢোকেন । খালি হাতে বেরিয়ে যান । সরকারি যান ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বাড়ি ফেরেন । ভিড় বা ট্রাফিক জ্যামের কারণে গাড়িটি তাদের বাড়ির স্টপেজ থেকে দশ হাত এগিয়ে দাঁড়ালেও বিরক্ত হন দশ কদম পেছনে হাঁটতে হবে বলে ।

আর এই প্রতিকূলতার মাঝেও থাকে আলোর স্ফুরণ । বড়ো হয় লিটিল ম্যাগাজিনের প্যাভেলিয়ান যেখানে আজও অতন্দ্র প্রহরী ৭৫ উত্তীর্ণ তরুণ নকুল রায় । আজও প্রকাশকরা যত্ন সহকারে প্রকাশ করে চলেছেন নতুন নতুন গ্রন্থ । এসে যোগ  দিচ্ছেন শিক্ষিত তরুণ প্রকাশক । ধ্রুপদী ও নান্দনিক সৃষ্টি নিয়ে । জন্ম নেয় তরুণদের নতুন প্রকাশন সংস্থা । প্রকাশনার পাশাপাশি তাঁরা আয়োজন করেন নানা সাহিত্য অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ করেন দেশের ও দেশের বাইরে গুণীজনদের । বইমেলা ঘিরে রাজ্যের সাহিত্যের কর্মকাণ্ড উত্তরোত্তর বাড়তেই থাকে । এখানেই আগরতলা বইমেলার সফলতা । সার্থকতা ।

Saturday, April 1, 2023

বসন্তে মেধা ও মননের মেলা, বইমেলা

বসন্তে মেধা ও মননের মেলা, বই মেলা

 অশোকানন্দ রায় বর্ধন 

বইমেলা । আর দশটা মেলার মতো নয় এই মেলা । সংবৎসর আর সব মেলা হয় যেখানে থাকে ব্যসনের সামগ্রী । বৈভবের সমাহার । বিত্ত বাসনা নিবৃত্তির উপকরণ । মনোহারি সব সরঞ্জামের সমাবেশ । বইমেলা এসব থেকে পুরোটাই আলাদা । হ্যাঁ বইমেলারও একটা আলাদা আকর্ষণ রয়েছে । এ টেনে নেয় গুণীজনকে । মননশীলতাকে । ঐতিহ্যের প্রতিও দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে বইমেলা তার পারিপার্শ্বিকতায় । বইয়ের প্রতি প্রণয় আত্মার আকর্ষণ । বিশ্বকে আপন করে নেবার প্রক্রিয়ায় কালো অক্ষরের আনন্দযজ্ঞ । ইতিহাস সংস্কৃতিকে ভালোবাসা । তার টানেই বইমেলায় সামিল হওয়া । অজান্তেই মন বলে ওঠে– বইমেলা, 'এই কি তোমার প্রেম ওগো হৃদয়হরণ ?' তেমনি এক হার্দ্য বইমেলার নাম আগরতলা বইমেলা । বিশ্বের বঙ্গভাষী অঞ্চলের তৃতীয় বৃহত্তম বইমেলা । আজ ছত্রিশ বছরে পড়ল এই বইমেলা । ১৯৮১ সালের তিরিশে মার্চ মাত্র ২৪ টি স্টল নিয়ে আগরতলা রবীন্দ্রভবন প্রাঙ্গনে শুরু হয়েছিল এই বইমেলা । তারপর জুরি-দেও-মনু-হাওড়া-গোমতী-মুহুরী-ফেনীর বুক দিয়ে বয়ে গেছে বহু জলস্রোত  । শৈশব পেরিয়ে কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনের শ্যামল গরিমায় পৌঁছে গেছে আগরতলা বইমেলা । আজ বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ জেনে গেছে আগরতলা বইমেলার নাম মাহাত্ম্য । আজই যখন দিবসের দাবদাহ ক্রমশ শীতল হয়ে আসবে, চৈতালি হওয়ার বাসন্তী আমেজে যখন অপরাহ্ন ভরে উঠবে কোমল মায়ায়, সেখানে উদ্বোধন হবে আগরতলা বইমেলার । রাজ্যের মননের উৎসবমালার প্রধান মন্ডপের ।

বই মানুষের সভ্যতার অপরিহার্য জীবনবীজ । মানব ইতিহাস সৃষ্টির ধারক ও বাহক । বইমেলাকে কেন্দ্র করে মানুষ পরস্পর মননের আনন্দ ভাগ করে নেন । আগরতলা বইমেলাও সেজে উঠেছে সেই নেশায় । সেই আকর্ষণে । রাত দিন খাটাখাটনির পর চলছে শেষ তুলির টান । নির্মীয়মান অস্থায়ী মঞ্চের অলংকরণ । বইমেলাকে কেন্দ্র করে আগরতলা শহর জুড়ে বইপ্রকাশের উন্মাদনা । ইতোমধ্যে হইচই বাঁধিয়ে অনুষ্ঠান করে এক ঝাঁক বই প্রকাশ করে ফেলেছেন নীহারিকা, ত্রিপুরাবাণী প্রকাশনী, ভাষা, তুলসী পাবলিশিং হাউস এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো । মফস্বল শহর কুমারঘাট থেকে এসে আগরতলা শহরে গ্রন্থপ্রকাশ উৎসব সেরে ফেলেছেন স্রোত প্রকাশনীর মত বনেদি প্রতিষ্ঠান । কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগেও বই প্রকাশ করছেন । মেলা চলাকালীন হবে আরো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বহিঃপ্রকাশ অনুষ্ঠান । এই মননের আনন্দে বসে নেই আজকের তারুণ্যও । সরকারি কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের একঝাঁক ছাত্র-ছাত্রী । তাঁরা কদিন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে আলপনায় আলপনায় দৃষ্টিনন্দন করে তুলছেন বইমেলার প্রবেশপথ । আমাদের চিরন্তন সাংস্কৃতি ঐতিহ্যের সঙ্গে যে 'পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি' । সময় এগিয়ে গেলেও, চারদিকে বিশ্বায়নের থাবা বিস্তৃত হলেও, মূল্যবোধের অবক্ষয় প্রকট রূপ নেওয়া সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যে জাতির সংস্কৃতির গভীরে প্রবাহিত হয়, বইমেলার অভিমুখে এই পথশিল্প তারই ইঙ্গিতবাহী । আগামী কদিন আগরতলা বইমেলা জ্ঞান চর্চার পাশাপাশি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির লালনের পীঠস্থান হয়ে উঠুক ।

স্যন্দন পত্রিকা, ২ এপ্রিল, ২০১৮

Wednesday, March 29, 2023

খোলা হাওয়ায় বইমেলা, তবুও

খোলা হাওয়ায় বইমেলা, তবুও

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

বই সভ্যতার প্রতীক । আর বইমেলা সভ্যতার অগ্রগতির প্রতীক । মেলা বহু প্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীর সমস্ত জনগোষ্ঠীর লোকজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে । ধর্মকে কেন্দ্র করে কিংবা কোন গোষ্ঠীর উৎসব-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে প্রাচীন মানুষেরা মেলার আয়োজন করতেন । এতে একটি বিশেষ উৎসব অনুষ্ঠানের দিনে সমস্ত মানুষ এক জায়গায় মিলিত হওয়ার সুযোগ পেতেন । তার মূল উদ্দেশ্য ছিল পারস্পরিক মিলন ও কুশল বিনিময় । মেলাতে এক জায়গায় মিলিত হওয়ার পাশাপাশি ছিল একে অন্যের মধ্যে উপহার বিনিময় । এই উপহার মূলত ঘর-গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় উপকরণ । এই উপকরণসমূহ বিনিময়ের মাধ্যমে একে অপরের প্রয়োজন মেটানোর দিকটির প্রতি লক্ষ্য রাখতেন । একজনের কাছে যে দ্রব্যটি নেই অন্যজন তা প্রিয়জনের হাতে তুলে দিতেন । এভাবেই ক্রমে সমাজে চলে আসে বিনিময় প্রথাটি । পরে সমাজব্যবস্থায় অর্থনীতির বিষয় প্রভাব ফেললেই বিক্রয়ের পদ্ধতির প্রচলন ঘটে । মেলাকে কেন্দ্র করে গ্রামীন অর্থনীতি ও একসময় চাঙ্গা হয়ে উঠত । সমাজের নানা পেশার মানুষ তাঁদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে মেলায় পসরা সাজিয়ে বসতেন ।  গৃহস্থরাও তাঁদের সংবৎসরের প্রয়োজনীয় অনেক সামগ্রী মেলা থেকেই সংগ্রহ করতেন ।

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বা সম্পদের অভাববোধ থেকে যেমন গ্রামীণ মেলার সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি জ্ঞানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করার অভাববোধ থেকে শুরু হয়েছে বইমেলা । তার মধ্যে যতটা না অর্থনীতি জড়িয়ে থাকে তার চেয়ে বেশি থাকে জ্ঞানপিপাসা । বইমেলা সেই জ্ঞানপিপাসা মেটানোর একটা মাধ্যম । আদিম সংস্কৃতির উদাহরণ হল গ্রাম্যমেলা । আর নাগরিক সংস্কৃতির উদাহরণ বইমেলা । উভয়ের উদ্দেশ্য একটাই । মিলন । গ্রামজীবনে মিলন ধর্ম ও সামাজিক উৎসবকে কেন্দ্র করে । সঙ্গে থাকে গ্রামীন অর্থনীতি । নাগরিক জীবনের মিলন মেধা, মনন ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে । জ্ঞানপিপাসুরা জ্ঞানান্বেষণে এই মেলায় মিলিত হন । মেলার মূল বৈশিষ্ট্য মিলন ব্যাপারটা এখানেও থাকে । পৃথিবীর সমস্ত দেশেই জ্ঞানচর্চা বিকাশের কেন্দ্রে রয়েছে বইমেলা । দুনিয়ার সমস্ত রাষ্ট্রেরই বড় বড় শহরে হয়ে থাকে বইমেলা । আন্তর্জাতিক মেলাসমূহের বিস্তৃতিও থাকে অনেক বেশি লক্ষ্যণীয় ।

আগরতলা বইমেলার বয়স বেশিদিনের নয় । গত শতাব্দীর একাশি সাল থেকে রবীন্দ্রভবনের প্রাঙ্গনে শুরু হয় আগরতলা বইমেলা । একসময় স্থান সংকলনের অভাব হওয়াতে পরবর্তী সময়ে তা শিশুদ্যানে সরিয়ে নেওয়া হয় । আজ ছয় বছর হলো এই মেলা শহরের দক্ষিণ প্রান্তে হাপানিয়া আন্তর্জাতিক মেলা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে । প্রথম দিনের তুলনায় আজ তার পরিসর অনেক বেড়েছে । অনেক জৌলুস, আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে । স্টল সংখ্যা বেড়েছে ।  মঞ্চ ও পারিপার্শ্বিক অলংকরণে এসেছে আধুনিকতা । প্রযুক্তির ব্যবহার । এখন অনেক খোলামেলাভাবে বইমেলায় ঘোরাঘুরি করা যায় । বই বাছাই করা যায় । এ বছরে লিটল ম্যাগাজিনের প্যাভিলিয়ানটাও বেশ বড়ো করা হয়েছে । তবুও আশির দশকের বইমেলার সেই প্রাণ সেই উচ্ছলতা যেন পাইনা এখন । বয়সের জন্য কিনা জানিনা । 

বইমেলায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেলে বিশ্রামের জন্য ছনবাসের গোলঘর তৈরি করে দেওয়া হত । প্রথম দিকে তো বইমেলায় প্রকাশক বিক্রেতার পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকেও দশ শতাংশ ভর্তুকির ব্যবস্থা ছিল । কি জমাট আড্ডা বসত সেদিন বইমেলার মাঠে । গান, কবিতাপাঠ, কে কি বই কিনেছে তা নিয়ে আলোচনা । কোন প্রয়োজনীয় বইটা কোথায় পাওয়া যাবে, বড়দের কাছ থেকে তার সুলুক সন্ধান । মাঠের মাঝখানে ঘাসের বিছানায় ডাঁই করা মুড়ি-চানাচুর, বাদামের খোলস ছাড়িয়ে জমিয়ে আড্ডা বসত । কোথায় হারালো সেসব ! 

এখন মেলায় বই কিনুন । বাড়ি চলে যান । সেই গোলঘর নেই । আড্ডার ঠেকও নেই । এককালে পাড়ার চায়ের দোকানে যেমন বেঞ্চ পাতা থাকত ।  আড্ডা দেওয়া যেত সময় না মেপে ।  শুধুমাত্র এক কাপ চায়ের বিনিময়ে ।  পরবর্তী সময়ে সেই চায়ের দোকানেও পরিবর্তন এসে গেছে । একটা টেবিলের উপর কেটলিতে চা ফুটছে । কয়েকটা বয়ামে বিস্কুট জাতীয় খাবার আছে । চা নিন । খাবার নিন । চলে যান । বসার ব্যবস্থা নেই । বসার ব্যবস্থা নেই বলেই এখন বইমেলায় জিরিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় সামনের অনুষ্ঠান মঞ্চের দর্শক আসনগুলো । মঞ্চে হয়তো কোন গুরুগম্ভীর আলোচনা বা কবিতা পাঠ চলছে । হঠাৎ তার মধ্যে বিশ্রমরত একজন কারো উদ্দেশ্যে তারস্বরে চিৎকার করে ওঠেন । মঞ্চের অনুষ্ঠানের ছন্দপতন ঘটে । দর্শকরা সব পিছনের দিকে তাকান । মঞ্চে কি চলছে তার খবর কে রাখে ! এই অবস্থাটার একটু পরিবর্তন আনা দরকার । মেলার্থীদের জন্য একটু বসার ছাউনি দরকার । গাছগাছালিহীন মেলাচত্বরে যা গরম ! মাথার ঠিক থাকার কথাও না । 

বইপত্রে অনেক নতুনত্ব থাকলেও আগের মতো ধ্রুপদী বইগুলো আর আসে না । আর যা দাম ধরলেই যেন ছ্যাঁকা লাগে । সরকার যদি আবার ভর্তুকীর বিষয়টা চালু করেন তাহলে বই পুনরায় মধ্যবিত্তের কিছুটা নাগালের মধ্যে আসবে । অন্যথায় সাধ থাকলেও সবার সাধ্যে কুলবেনা । 

আর একটা কথা বলে শেষ করছি । আগরতলা বইমেলা রাজ্যের বৃহত্তম বইমেলা । রাজ্যের ও রাজ্যের বাইরের, দেশের বাইরের বহু প্রকাশক এখানে আসেন । রাজ্যের বাইরের নামী প্রকাশকরা এরপর ফিরে যান । মফস্বলের মেলাগুলোতে খুব একটা যান না । ফলে অনেক মূল্যবান বই মফস্বলের পাঠকরা প্রকাশকের কাছ থেকে সরাসরি কিনতে পারেন না । মফস্বলের বইপ্রেমীদের আরো বেশি করে আগরতলা বইমেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যে বিনি পয়সায় গাড়ির ব্যবস্থা নয় । আগরতলা থেকে অন্তত রাত আটটার দিকে রাজ্যের উত্তরে ও দক্ষিণে ফেরার জন্যে দুটো বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয় । তাহলে আগরতলা বইমেলার আরো শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে আরো উপচে পড়বে বইপ্রেমী মানুষের ভিড় ।