Showing posts with label অশোকানন্দ রায়বর্ধন. Show all posts
Showing posts with label অশোকানন্দ রায়বর্ধন. Show all posts

Wednesday, June 24, 2026

শিক্ষার্থীর কল্পনার বিকাশে সাহিত্যের ভূমিকা তাত্ত্বিক ভিত্তি পদ্ধতি ও সক্রিয়তা ভিত্তিক শিক্ষণ

শিক্ষার্থীর কল্পনার বিকাশে সাহিত্যের ভূমিকা: তাত্ত্বিক ভিত্তি, পদ্ধতি ও সক্রিয়তা-ভিত্তিক শিক্ষণ

অশোকানন্দ রায়বর্ধন, অবসরপ্রাপ্ত বিদ্যালয় পরিদর্শক ( বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক )

Abstract—Imagination is a foundational cognitive ability that shapes creativity, empathy, and flexible thinking, and literature offers one of its most effective training grounds. This study explores how literary forms—poetry, stories, drama, and travel writing—nurture imaginative growth among learners. Literature stimulates creative imagination by encouraging students to visualize alternative possibilities beyond lived experience. Through metaphor and symbol, it expands abstract thinking and the capacity to interpret multilayered meanings. Literary narratives initiate cognitive simulation, enabling readers to mentally experience emotions, actions, and perspectives of fictional characters. Moreover, rhythmic poetry and stories strengthen sensory imagery and narrative awareness, while travel literature broadens spatial imagination and cultural understanding. The paper argues that activity-based literary pedagogy—creative writing, dramatic enactment, and imaginative mapping—significantly deepens learners’ imaginative capacity and promotes holistic intellectual growth.

Keywords: কল্পনার প্রসার (Imagination Development), সাহিত্য(Literature), রূপক ও প্রতীক (Metaphor and Symbol), জ্ঞানগত প্রতিরূপ (Cognitive Simulation), সক্রিয়তা-ভিত্তিক শিক্ষা (Activity-Based Learning).


ভূমিকা:-

সাহিত্যের প্রধান ভূমিকা হল মানুষের কল্পনার শক্তিকে প্রসারিত করা । সাহিত্যচর্চা মানুষের সংবেদনশীলতা, আবেগ, চিন্তা-প্রক্রিয়া এবং কল্পনার শক্তিকে গঠনমূলকভাবে বিকশিত করার এক অসীম শক্তিধর সরঞ্জাম ।  সাহিত্যপাঠ মানুষের অভ্যন্তরীণ মানসিক কাঠামোকে পুনর্গঠিত করে এবং সৃজনশীলতাকে উদ্দীপ্ত করে । তাতে নতুন চিন্তার দিগন্ত খুলে দেয় । অ্যাকাডেমিক, মানসিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত–সব ক্ষেত্রেই সাহিত্য একটি কার্যকরী জ্ঞান-মাধ্যম । আধুনিক মনোবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান, কগনিটিভ লিঙ্গুয়িস্টিক্স ও ন্যারেটিভ স্টাডিজ–সব ক্ষেত্রেই সাহিত্যকে মানবচেতনা বিকাশে অপরিহার্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় । শিক্ষাব্যবস্থায় সাহিত্যকে কৌশলগতভাবে যুক্ত করলে শিক্ষার্থীদের আবেগ, বুদ্ধিমত্তা, গভীর চিন্তা, মননশীলতা, সহমর্মিতা ও সৃজনশীল কল্পনা সমস্ত বৃদ্ধি পায় যা কেবল বিনোদন নয় বরং মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অপরিহার্য অঙ্গ । 

কল্পনা মানুষের মানসিক বিকাশের অন্যতম মৌলিক শক্তি । সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন, সমস্যার সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভাষা-আয়ত্ত এমনকি সামাজিক দক্ষতাও মূলত কল্পনাশক্তির উপর নির্ভরশীল । সাহিত্য হল এই কল্পনাশক্তি বিকাশের প্রাচীনতম পরীক্ষিত ও সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম । গল্প, কবিতা, নাটক, রূপক, প্রতীক কিংবা ভ্রমণ সাহিত্য সবই পাঠকের মনোজগতে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন চিত্র, নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে । সাহিত্য পাঠককে এমন এক জগতে নিয়ে যায় যা হয়তো বাস্তবে নেই এটি পাঠকের নতুন পরিস্থিতি চরিত্র ও ধারণা নিয়ে ভাবতে সাহায্য করে । জ্ঞান অভিজ্ঞতার সঙ্গে সৃজনশীল চিন্তার জন্ম দেয় । বাস্তব জীবনের জ্ঞান অভিজ্ঞতা কে নতুনভাবে সাজাতেও বুঝতে সাহায্য করে । সাহিত্যপাঠ–বিশেষ করে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক ও ভ্রমণ সাহিত্য মানুষকে এমন পরিস্থিতিতে নিয়ে যায় যা বাস্তবে আছে বা নেই, কিন্তু মানসিকভাবে কার্যকর । কল্পনার মনোপ্রক্রিয়ায় চরিত্র, দৃশ্য, সময়-পরিসর তৈরি হয় (internal visualisation) । সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা জায়গায় (future thinking) । রূপক ও প্রতীককে মানসিক চিত্রে রূপান্তরিত করে (symbolic processing) । 'হঠাৎ যদি আমায় কোন ছলে'– অবাস্তব  চিন্তার সৃষ্টি করে (counterfactual thinking) ।

মানবজ্ঞান গঠনে কল্পনা :-
 (Imagination) একটি মৌলিক ক্ষমতা। দার্শনিক কান্ট, মনোবিজ্ঞানী ভিগোৎস্কি এবং সাহিত্যতাত্ত্বিক উইলিয়াম এম্পসন– সকলেই কল্পনাকে মানবচিন্তার কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কল্পনা ব্যক্তি-মানুষের সৃজনশীলতা, সমস্যা-বুঝতে পারা, সামাজিক সংবেদনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বোধকে সমৃদ্ধ করে। সাহিত্য—গল্প, কবিতা, নাটক, ছড়া কিংবা ভ্রমণবৃত্তান্ত—এই কল্পনাশক্তির অনুশীলনের জন্য সবচেয়ে সক্রিয় ও প্রাকৃতিক পরিসর। সাহিত্য পাঠের মধ্য দিয়ে পাঠক একদিকে নিজের অভিজ্ঞতার সীমানা ভাঙেন, অন্যদিকে চরিত্র, প্রতীক, রূপক, সংগীতবোধ, নাট্য-ক্রিয়াশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার মনের ভেতর জ্ঞানগত প্রতিরূপ (cognitive simulation) প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সাহিত্যভিত্তিক অনুশীলন, প্রজেক্ট ও সৃজনধর্মী কাজ কল্পনার বিকাশে বিশেষ সহায়ক।

শিক্ষার্থীর কল্পনার বিকাশে সাহিত্য এমন একটি সেতু হিসেবে কাজ করে যা তাকে বাস্তবে সীমানা ছাড়িয়ে অসীমের পানে নিয়ে যায় এবং তাকে আরও সংবেদনশীল ও সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে । এখানে  শিক্ষার্থীর উপযোগী কিছু সক্রিয়তা-ভিত্তিক শিখন(Activity-based) পদ্ধতির উল্লেখ করা হল।

১. সৃজনশীল কল্পনা (Creative Imagination) ও সাহিত্য

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা– সাহিত্য সামাজিক সাংস্কৃতিক সংকেতের মাধ্যম, যা শিশুর চিন্তার উচ্চতর স্তর তৈরি করে। সৃজনশীল কল্পনা সক্রিয় হয় যখন ব্যক্তি বাস্তব অভিজ্ঞতার বাইরেও সম্ভাব্যতা, ভবিষ্যৎ  কল্পনা করে ( যেমন কল্পবিজ্ঞান ), আবার কখনো সম্পূর্ণ অবাস্তব ও রূপকথার জগত সৃষ্টি করে উভয়ই কল্পনার ভিন্ন ভিন্ন দিককে বিকশিত করে । বিকল্প পরিণতি বা নতুন রূপ কল্পনা করতে শেখে। বৈজ্ঞানিক গল্প কাহিনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী ধারণা সম্পর্কে ভাবতে অনুপ্রাণিত করে যা সৃজনশীল চিন্তা কে উদ্দীপিত করে । এক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায়ের 'প্রফেসর শঙ্কু' সিরিজ শিক্ষার্থীর পাঠের বিষয় হতে পারে ।
সাহিত্য এই ‘সম্ভাব্যতার অঞ্চল’ তৈরির চর্চা করায়—কখনও অবাস্তব ও ফ্যান্টাসিকে বাস্তবের সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা–“একটি বাক্য থেকে গল্প”
শিক্ষার্থীদের একটি সাধারণ বাক্য দিন ।

যেমন: “আগামীকাল তুমি স্কুলে আসবে না।” অথবা 'আগামী শতাব্দীতে মানুষ কোন গ্রহে বাস করবে'
এই  দুটি বাক্যের যে কোনো একটি নিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের কল্পনায় গল্প তৈরি করবে।
এতে divergent thinking, narrative imagination উভয়ই বিকশিত হয়।

২. রূপক (Metaphor) ও প্রতীকের (Symbol) ভূমিকা:-

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা–সাহিত্য বিমূর্ত ধারণা গুলিকে মৌখিক উপস্থাপনার মাধ্যমে বোধগম্য করে তোলে যা শিক্ষার্থীদের কে রূপক ও প্রতি কিভাবে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে । রূপক শুধু ভাষার অলংকার নয়—এটি ভাবনার সংগঠক। প্রতীক মানুষের অচেতন চিন্তাকে ভাষা দেয় । সাহিত্যে রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার পাঠকের মনকে একাধিক স্তরে ভাবতে শেখায়। পরোক্ষ অর্থ ধরে নেওয়ার ক্ষমতা কল্পনাকে তীক্ষ্ণ করে।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা—“রূপক খোঁজা ও তৈরি”

একটি কবিতা—যেমন যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের “হাট”—দিয়ে শিক্ষার্থীদের রূপক চিহ্নিত করতে বলা।
তারপর তাদের নিজস্ব প্রতীক তৈরি করতে বলা—
যেমন “হাট” = 'বিকালবেলা', “গাঁটের কড়ি”  ইত্যাদি। অথবা কালিদাস রায়ের 'ছাত্রধারা' কবিতার মতো জীবনের বহমান ধারার মতো চিরন্তন কিছু বিষয় চিহ্নিত করা ।

৩. কগনিটিভ সিমুলেশন (Cognitive Simulation)

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা–সাহিত্য পাঠের সময় পাঠকের মস্তিষ্ক চরিত্র, স্থান, অনুভূতি ও দৃশ্যকে ‘simulate’ করে—অর্থাৎ নিজের ভেতরে ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা তৈরি করে। এটি নিউরোসায়েন্সে “embodied simulation” নামে পরিচিত ( Gallese & Wojciehowski, 2011)। বিভিন্ন চরিত্রের জীবন তাদের সুখ দুঃখ সংগ্রাম ইত্যাদি পাঠ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থী অন্যের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে পারে । বই পড়ার পর শিক্ষার্থী গল্পের চরিত্র এবং পরিবেশের মানসিক চিত্র তৈরি করে যা তাদের কল্পনার জন্য একটি অনুশীলন ।
এতে সহানুভূতি, সামাজিক কল্পনা ও মানসিক নমনীয়তা বৃদ্ধি পায়। মানবিক সম্পর্ক বোঝার ক্ষমতা বাড়ায় ।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা—“চরিত্র-হয়ে ওঠা”

গল্পের চরিত্র হয়ে শিক্ষার্থীদের ছোটো নাট্য-উপস্থাপনা করতে বলা।ধ
যেমন—“ক্ষুধিত পাষাণ” এর মেহের আলী,  “কাবুলিওয়ালা”র রহমৎ বা মিনি, বিভূতিভূষণের “অপু, দুর্গা”—কোন চরিত্র কী ভাবছে, কী সিদ্ধান্ত নেবে, তারা enact করবে।

৪. ছড়া ও কবিতার ভূমিকা:-

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা—ছড়া ও কবিতা
শিশুমনে ছন্দ, শব্দচিত্র, অর্ধেক-অসমাপ্ত চিত্র—সব মিলিয়ে কল্পনার ভুবন নির্মাণ করে। গবেষণা দেখায়—rhyme & rhythm auditory imagination উন্নত করে; চিত্রকল্প visual imagination জাগায়। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে সৃজনশীল চিন্তার জন্ম দেয় । শিক্ষার্থীদের কল্পনার শক্তি এবং আত্মবিশ্বাস বিকাশের সাহায্য করে ।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা–“নিজের ছড়া লেখা”

যেখানে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ দেওয়া হবে—যেমন “ফুল”, “পাখি”, “চাঁদ”—ইত্যাদি শব্দ বা বিষয় দিয়ে ছড়া রচনা। অথবা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'পাল্কির গান' কবিতার বিভিন্ন দৃশ্যগুলোর বর্ণনা করা । এটি ভাষাবোধ, চিত্রকল্পবোধ ও সংবেদনশীল কল্পনাকে বাড়ায়।

৫. গল্প ও নাটকের ভূমিকা:-

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা–গল্প মানুষের মানসিক কাঠামো গঠনের প্রধান মাধ্যম। নাটক এতে আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়—কারণ এতে কল্পনা ও শরীরী অভিজ্ঞতা এক সঙ্গে কাজ করে। চরিত্র-নির্মাণ, সংলাপ, মঞ্চস্থকরণ—সবকিছু শিক্ষার্থীদের কল্পনাপদ্ধতিকে বহুমাত্রিক করে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক চরিত্র, অতীত সম্পর্কে ধারনা এবং কল্পনা প্রসূতভাবে সেই সময়ের ঘটনাগুলো উপলব্ধি করতে সাহায্য করে । নাটকের উল্লেখিত দূরবর্তী স্থান সংস্কৃতি এবং ভিন্ন জীবনধারা সম্পর্কে জানতে শিক্ষার্থীকে উৎসাহিত করে ।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা–"গল্প-রূপান্তর”

একটি গল্প দিয়ে সেটিকে নাটকে রূপান্তর করতে বলা। যেমন—রবীন্দ্রনাথের “ছুটি” গল্পকে কিংবা শরৎচন্দ্রের 'অভাগীর স্বর্গ' গল্প অবলম্বনে ছোটো নাটিকা বানানো ।

৬. ভ্রমণসাহিত্যের ভূমিকা:-

তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা—ভ্রমণসাহিত্য পাঠকের মনের সামনে ভূগোল, ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষ—সব মিলিয়ে এক বিস্তৃত ‘অন্য জগত’ খুলে দেয়। unfamiliarity → curiosity → imaginative mapping: এটাই এর মূল প্রক্রিয়া।
শিক্ষার্থীরা মানচিত্র, ছবি, শব্দচিত্র, অতীত-বর্তমান মিলিয়ে একটি নতুন অভিজ্ঞতা গড়ে তোলে। বিভূতিভূষণের 'আরণ্যক' পাঠ করানো যেতে পারে । প্রবোধকুমার সান্যালের মহাপ্রস্থানের পথে, শঙ্কু মহারাজের 'বিগলিত করুণা জাহ্নবি যমুনা' ইত্যাদি ভ্রমণসাহিত্য পাঠের মাধ্যমে  স্থানিক সংস্কৃতি, প্রকৃতি, জীবনযাত্রা শিক্ষার্থীর মনকে এমন ভাবে প্রভাবিত করে যা তার কল্পনার জগতকে সমৃদ্ধ করে । পাশাপাশি ভাষার নান্দনিকতাও উপলব্ধি করতে শেখে ।

শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা–“কাল্পনিক ভ্রমণবৃত্তান্ত”

বিভূতিভূষণের 'চাঁদের পাহাড়' পড়ানোর পর শিক্ষার্থীদের বলা—
“তোমরা এমন একটি জায়গায় ভ্রমণ করতে গেলে  যা আদৌ নেই—এমন একটি ভ্রমণের বিবরণ দাও।”
এতে শিক্ষার্থীর ভুবননির্মাণ (world-building) দক্ষতা বৃদ্ধি পায় ।

৭. উপসংহার:-

সাহিত্য মানুষের ‘সম্ভাবনামূলক চেতনা’ (potential consciousness) গঠনের অন্যতম শক্তি। সৃজনশীল কল্পনা, প্রতীকী ধারণা, কগনিটিভ সিমুলেশন, ছন্দ-সংগীত, কাহিনি কিংবা ভ্রমণের মানসিক বিস্তার—সব মিলিয়ে সাহিত্য পাঠ এক গভীর মানবিক, বৌদ্ধিক ও সৃজনশীল অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। সক্রিয়তা-ভিত্তিক শিক্ষণ (Activity-based) পদ্ধতি কার্যকর করে তুলতে পারে। ফলে সাহিত্য হয় শুধু পাঠ্যবস্তু নয়—মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া । সাহিত্য কখনো শুধু লেখা নয়—এটি চিন্তার দরজা। শিক্ষার্থীদের কল্পনা, সৃজনশীলতা, মানবিকতা—সবই এই সাহিত্যের অনুশীলনের মাধ্যমে গঠিত হয়। সক্রিয়তা-ভিত্তিক সাহিত্য-শিক্ষা তাদের মনের মধ্যে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তি দেয়। কেবল পাঠ নয়—সাহিত্য আমাদের মানুষ হতে শেখায়, স্বপ্ন দেখতে শেখায় । জীবন গঠনেও সহায়ক ।


সহায়ক গ্রন্থ:-

১. শিক্ষাশ্রয়ী মনোবিজ্ঞান– সুশীল রায়।
২.  শিক্ষা মনোবিদ্যা– অধ্যাপক সার্থক     মন্ডল
৩. ভাষা শিক্ষণ পদ্ধতি, বাংলা–ড. সুবিমল মিশ্র, শুচিস্মিতা বিশ্বাস
৪. বাংলা শিক্ষা পদ্ধতি : তত্ত্ব ও প্রয়োগ– ড. মহুয়া বন্ধু চ্যাটার্জী
৫. প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষণে বাংলা শিক্ষণ পদ্ধতি–ড. সুবিমল মিশ্র 
৬. প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষণে বাংলা ভাষা বিষয় ও পদ্ধতি–ড. কৌশিক চট্টোপাধ্যায়

Thursday, June 18, 2026

কর্নাটকের নৃত্যশৈলী ও বৈশিষ্ট্য

 কর্নাটকের নৃত্যশৈলী ও বৈচিত্র্য 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রদেশ তাদের নানারকম প্রাদেশিক লোকনৃত্যের জন্য বিখ্যাত । সেরকম কর্নাটকেরও বেশ কিছু লোকনৃত্য রয়েছে । তার মধ্যে ইয়াকষাগানা ( যক্ষগণ ), হাটারি ও কুনিথা ইত্যাদি প্রধান । ব্যাঙ্গালোরে যে জায়গাটায় ছেলের বাসায় আছি তার কাছাকাছি একটা গণেশ মন্দির আছে ।গণেশ পূজাকে কেন্দ্র করে এই চত্বরটা জমজমাট । লোকে লোকারণ্য । রাস্তা ব্লক করে চলছে নাচ-গান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান । পুজোর দিন সন্ধ্যায় প্রসাদ পেলাম । তার স্থানীয় নাম 'পোঙ্গল' । গতকাল সন্ধ্যায় দেখলাম দেওয়ালির মতো বাজি ফুটছে । সান্ধৃভ্রমণে বেরিয়ে গণেশ মন্দিরের কাছাকাছি গিয়ে দেখি আলোর মালা । রাস্তা জুড়ে । বাজি পুড়ছে অঝোরে । আর উল্টোদিকের ফাঁকা একটা জায়গায় দেখলাম লোকে লোকারণ্য । সেখানে বিকট শব্দে ঢাকজাতীয় কিছু বাজছে । কাছে গিয়ে দেখলাম চারদিকে ঘেরা মানুষের মাঝখানে নানারকম পোষাক ও মুখোশ পড়ে কিছু লোক ঘুরে ঘুরে নাচছে । পোষাকের কারণে  তাদের বপু আর উচ্চতা সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু বেশি । আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না । ভিড় ঠেলে এগুতে গিয়ে অচেনা ভাষায় গালাগালি শুনলাম । তাতে কি হল । অর্থ যখন বুঝছি না তখন আর আমার চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করলেও গায়ে লাগবে না । যাই হোক, হেসেটেসে এগিয়ে গিয়ে নাচের ভিডিও করলাম । একটু পরেই নাচ শেষ হয়ে গেল । 

নাচ তো দেখলাম । কিন্তু কি নাম এই নাচের ? কেন নাচল ? ইত্যাদি জানার জন্যে মন উশখুশ করতে লাগল ।  ফেরার পথে রাস্তার উল্টোদিকে দেখলাম একজন নানারকম ফল কুচি কুচি করে বাটিতে সাজিয়ে বিক্রি করছেন । তাঁরা একে বলেন 'ফ্রুটবল' । এটা বুঝতেও আমার বেগ পেতে হয়েছিল । প্রথমদিন শব্দটা আমার কানে লেগেছিল 'ফুটবল' । পরে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় আমার কাছে । ব্যাঙ্গালোরে এরকম কুচো ফলের বাটি এবং ফলের রস রাস্তার মোড়ে মোড়েই পাওয়া যায় । আমি দোকানটাতে গিয়ে একবাটি কুচো ফল নিলাম । ওর পাশেই একটা খালি টুল পেয়ে বসে ফল খেতে খেতে ওর সঙ্গে গল্প জুড়লাম । দুজনেরই মাধ্যম হিন্দি পান্ডিত্যের কথা আর উল্লেখ করলাম না । ওকে বললাম, ভাই উধার এক বড়িয়া ডান্স দেখা ম্যায়নে । বলে ওদিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলাম । ও বলল,  ডাল্লু কুনিথা ডানছো ?  কেন জানি মনে হল তাঁর কাছ থেকে কিছু জানা যাবে । আমি বললাম, হাঁ হাঁ ভাইয়া, কিঁউ ইতনা ডান্স কিয়া ? বাজা বাজায়া ? তিনি তখন আমাকে টুকটাক যা বললেন সেটাই এই অর্বাচীনের কাছে বড়ো পাওনা হল । কথায় কথায় জানালেন তিনি কলেজ পর্যন্ত পড়েছেন । অর্থাভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেননি । অল্প কিছুক্ষণ সময়ে তিনি যা বললেন তা আমি মনে গেঁথে দ্রুত বাসায় ফিরে এসে প্যাডে নোট করে নিলাম । কিছু কিছু ব্যাখ্যা কন্নড়ি অ্যাকসেন্টে হিন্দি বলায় কিছুই বুঝতে পারিনি । এখানকার ভাষা জানিনা বুঝিনা । তাই যাচাই করার সুযোগ নেই । তাই ফুটপাথের ওই হকারের মুখে যা শুনেছি তাই গুছিয়ে আজই লেখাটা তৈরি করলাম । তথ্যের চাইতে একটা প্রাদেশিক নৃত্যের দর্শনটাই আমার কাছে বিরল প্রাপ্তি । আমার আবেগটাকে প্রাধান্য দিয়ে অভিজ্ঞ পাঠক আমার তথ্যগত ভুলটাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি । 

কর্নাটকে বিশেষ পূজা-পার্বণ উপলক্ষে অনুষ্ঠানমূলক নৃত্যের আয়োজন করা হয়ে থাকে । 'ডল্লু কুনিথা' সেই ধরনের এক বিশেষ নৃত্য । 'ডল্লু কুনিথা' নৃত্যের সঙ্গে শিব-পার্বতীর মিথ জড়িত । বুঝলাম, শিবপরিবারের সদস্য গণেশের পুজো উপলক্ষেই তাহলে এই নৃত্যের আয়োজন । ডল্লু কুনিথা নৃত্যে বিকট শব্দে ড্রাম বাজানো হয় । তার সঙ্গে তালে তালে নানারকম মুখোশ পরে নৃত্যশিল্পীরা ঘুরে ঘুরে দলবদ্ধভাবে নৃত্য করে । শৈব ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এই নৃত্য বিশেষভাবে প্রচলিত । ধর্মীয় অনুষ্ঠানমূলক কুনিথা নৃত্যের আরো প্রকারভেদ আছে । যেমন 'দেবারি থাট্টে কুনিথা', 'ইয়ালেম্মানা কুনিথা', 'সুগ্গি কুনিথা', 'পাটা কুনিথা', 'গৌরাভা কুনিথা' ( উচ্চারণ আমি যতটা বুঝেছি সেই অনুযায়ী লিখলাম ) ইত্যাদি এক একটি দেবদেবীর নামানুসারে প্রচলিত অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক নৃত্য । নৃত্যরত শিল্পীদের পোষাক-মুখোশ দেখে আমার মনে হল, এরা বোধহয় শৈব মিথকল্পের সদস্য ইতর প্রাণী নন্দী, ভৃঙ্গী, বৃষ, মোষ ইত্যাদি চরিত্র রূপায়িত করেছে ।

বিশাল ভারতবর্ষের বহু বৈচিত্র্যের ধারাটি নৃত্যের মধ্যেও বিরাজমান ।  নানা প্রদেশের নানারকম ধ্রুপদী নৃত্য ও লোকনৃত্যে জড়িয়ে রয়েছে বহু বর্ণময়  উপকরণ, আঙ্গিক । যা আমাদের  জাতীয় সংস্কৃতিকে নিরন্তর সমৃদ্ধ করে চলেছে ।বহন  করে চলেছে সম্প্রীতির বার্তা ফল্গুধারার মতো ।
ব্যাঙ্গালুরু, ২৫সেপ্টেম্বর,২০২৩

আমাদের বংশলতিকা

আমাদের বংশ লতিকা 
অশোকানন্দ রায়বর্ধন

 গোবিন্দরাম ( চাম্পারাম) —> ভৈরবচন্দ্র ( স্ত্রী-মঙ্গলা )

ভৈরবচন্দ্র+মঙ্গলা ( পুত্রগণ )—>বৈদ্যনাথ,কামিনীকুমার ( স্ত্রী-সরলা ), গগণচন্দ্র, সতীশচন্দ্র

কামিনীকুমার+,সরলার ( পুত্রগণ )—>মহিমচন্দ্র ( স্ত্রী ঊষারানী, প্রমিলা ), মনোরঞ্জন ( স্ত্রী ঊষারানি ), অনিলচন্দ্র ( স্ত্রী......), দুলাল

বাঙালি সত্তা, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতিরঅনুষ্ঠান

বাঙালিসত্তা, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির অনুষ্ঠান

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

গত ২০ এপ্রিল বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকায় বিশ্ব বাঙালি সংসদের উদ্যোগে ৪৯ নিউ ইস্কাটনস্থ আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হল বিশ্ব বাঙালি সম্মেলন–২০২৪ । সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের জাতিসত্তার কবি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মুহম্মদ নুরুল হুদা । উদ্বোধক ছিলেন উপসচিব উপ-পরিচালক আঞ্চলিক লোক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ঢাকা, ডঃ শফিকুল ইসলাম । পুরো অনুষ্ঠানটি তিনটি পর্যায়ে  ভাগ করা হয় । প্রথম পর্যায়ে 'বাঙালির সম্প্রীতি বাঙালির সংস্কৃতি' শীর্ষক আলোচনার শুরুতে প্রধান অতিথি দুইদেশের বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিকদের এবং সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা প্রদান করে তাঁর আলোচনার সূত্রপাত করেন । তাঁর আলোচনায় সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে নান্দনিক সৌন্দর্য ও মনের শান্তির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন । বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালির অবদান, লড়াই, তার যাত্রাপথ, তার বিশ্বময় ব্যপ্তির কথা তুলে ধরেন । সবশেষে তিনি পাঠ করেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা 'যতদূর বাংলা ভাষা ততদূর এই বাংলাদেশ' কবিতাটি । এরপর আলোচনার শীর্ষককে অনুসরণ করে বক্তব্য রাখেন ত্রিপুরার লোকগবেষক ও প্রাবন্ধিক অশোকানন্দ রায়বর্ধন । তিনি তাঁর আলোচনায় বাঙালি জাতির অতীত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সূত্র ধরে বর্তমান সময় ও সেই সংস্কৃতিকে লালন করার ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরেন । সীমান্তের বিভাজন থাকলেও বাঙালি জাতিসত্তার অভিন্নতার কথা উল্লেখ করেন তিনি । আসামের সাময়িক প্রসঙ্গ পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক মিলন লস্কর তাঁর আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধে বরাক অঞ্চলের মানুষের অবদানের অনালোকিত অধ্যায় তুলে ধরেন । এছাড়াও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন কথাসাহিত্যিক চেয়ারম্যান প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র,
মিজ রোকেয়া ইসলাম । বাংলাদেশ জাতীয় কবিতা পরিষদের দপ্তর সম্পাদক বিজ্ঞানকবি বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদি । বাঙালি জাতিসত্তার মেলবন্ধন ও সম্প্রীতির কথা তাঁর আলোচনায় তুলে ধরেন । বিশ্ব বাঙালি সংসদের সভাপতি কবি লোকমান হোসেন পলা এই সংগঠনের ভূমিকা ও কর্ম প্রণালী সভার সামনে তুলে ধরেন এবং উপস্থিত সকলকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন । অনুষ্ঠানের সভাপতি ডঃ শাহাদাত হোসেন নিপু কবি ও বাচিক শিল্পী, পরিচালক বাংলা একাডেমি তাঁর আলোচনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আলোকে ভারত বাংলাদেশের মৈত্রী সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন । সম্প্রীতির স্বার্থে এই বিষয়গুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি ।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ছিল 'হাসনাইন সাজ্জাদীর বিজ্ঞান কবিতার ধারনা' শীর্ষক সেমিনার । এই পর্যায়ে আলোচনাকালে অধ্যাপক মাহবুবা বেগম, আবু সাঈদ তুলু, নাভেদ আফ্রিদী প্রমুখগণ বাংলাকবিতার এই বিশেষ প্রবণতাটি সম্পর্কে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তৃত বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করেন । এই পর্বের প্রধান অতিথি পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কবি অধ্যাপক ড. চন্দন বাঙ্গাল বাংলাকবিতার বিভিন্ন আন্দোলনের ধারাবাহিকতার ইতিহাস তুলে ধরেন । পাশাপাশি হাসনাইন সাজ্জাদীর এই নতুন ভাবনা বাংলাকবিতায় নতুনতর আলোকসম্পাতের কথা স্পষ্ট করে দেন । বিজ্ঞান কবিতার ধারনার স্থায়িত্বের বিষয়টি তিনি সময়ের উপর ছেড়ে দেন । সবশেষে 'কবিতা ও কথামালা'য় দুইদেশের পঞ্চাশজনের অধিক কবি কবিতা পাঠ করেন ।
ঢাকা, ২২এপ্রিল, ২০২৪

বাংলা লোকগানের উদ্ভব ও ভাটিয়ালি গানের সৃষ্টি

বাংলা লোকগানের উদ্ভব ও ভাটিয়ালি গানের সৃষ্টি 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

চর্যাপদ শুধু বাংলাসাহিত্যের নিদর্শন নয়, প্রাচীন বাংলাগানেরও সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে  । চর্যাপদগুলি প্রকৃতপক্ষে গানই । সেকারণেই অনিবার্যভাবে প্রতিটি পদের শুরুতে রাগ, তাল ও প্রতি জোড়পদে 'ধ্রুব' শব্দের উল্লেখ রয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, এগুলো তখন গাওয়া হত । চর্চা গীতিগুলো পটমঞ্জরী, মাল্লারী, গুর্জরী, কামোদ, বরাড়ী, ভৈরবী, গবরা, দেশাখ, রামক্রী, শবরী, অরু, ইন্দ্রতাল, দেবক্রী, ধানশ্রী, মালসী, মালসী-গবড়া ও বঙ্গাল রাগে দেখতে পাওয়া যায় । চর্যার কবিরা ছিলেন পূর্বভারত ও নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী। কেউ পূর্ববঙ্গ, কেউ উত্তরবঙ্গ, কেউবা রাড়ের অধিবাসী ছিলেন । কেউ কেউ মিথিলা ( বিহার ), কেউ উড়িষ্যা, কেউ আবার অসম বা কামরূপের বাসিন্দাও ছিলেন । 

চর্যাপদের তিনজন বাঙালি কবি ছিলেন । তাঁরা হলেন লুইপা, শবরপা ও ভুসুকুপা । ভুসুকুপা নিজেও তাঁর পদে 'আজি ভুসুকু বঙ্গালি ভৈলি' বলে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন । ভুসুকু নিজেকে 'রাউতু ভুসুকু' অর্থাৎ 'রাজপুত ভুসুকু' বা 'অশ্বারোহী যুদ্ধ ব্যবসায়ী' বংশের সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন । ভুসুকুপা যোগী সাধক ছিলেন । তিনি জয়দেবের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন । তিনি নিজের কুটিরে সর্বক্ষণ গোপনে অধ্যয়ন করতেন । ভিক্ষুরা মনে করত যে, তিনি সর্বদা আহার ও নিদ্রায় সময় কাটান । এজন্য ভিক্ষুরা তাঁকে ভুসুকু ( ভু = ভক্ষণ, সু = সুপ্তি, কু = কুটির ) নামে ডাকতেন । চর্যাপদে ভুসুকুপার পদ আটটি ( ৬, ২১, ২৩, ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩, ৪৯ ) । শক্তিমান চর্যাকার ভুসুকুর গানে পদ্মাখালে নৌযাত্রার যে চিত্র ( ৪৯ নং ) দেখি তাতে তিনি  বঙ্গদেশের বলেই মনে হয় ।

 'আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভৈলী / নিঅ ঘরিণী চন্ডালী লেলী' ( ৪৯ নং ) বর্ণিত চন্ডাল/ চন্ডালী  নামটি বাঙালিদের আদি পরিচয় । একটি বল-বীর্য সমন্বিত অর্থদ্যোতক শব্দ । চন্ডের সঙ্গে জাতিসূচক 'আল' প্রত্যয় যোগ করে হয়ন চন্ডাল । অনুরূপভাবে লাঙ্গল, জোঙ্গাল ( জোয়াল ), জঙ্গল, জাঙ্গাল, বহাল, খেড়ওয়াল, সাঁওতাল, বঙ্গাল প্রভৃতি আদি অস্ট্রাল শব্দগুলির ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ করলেই শব্দগুলোর গুণগত ও অর্থগত অভিব্যক্তিটি যথার্থ প্রতিভাত হয়ে ওঠে । চন্ডাল, বঙ্গাল প্রভৃতি সেযুগের কঠোর পরিশ্রমী, সর্বকর্মে পারদর্শী । তারা নৌচালনা, মৎস্যশিকার, যুদ্ধবিদ্যা, কৃষিবাণিজ্য, বাস্তুবিদ্যা ও চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী ছিল ।  ভুসুকুর 'সহজ মহাতরু ফরিঅ এ  তৈলোএ / খসমসভাবে রে বা ণ মুকা কোএ ( ৪৩ নং ) পদটি 'বঙ্গাল' রাগে গীত । সেকালে 'বঙ্গাল', 'চন্ডাল' প্রভৃতি শ্রেণির মানুষেরা অভিজাতদের কাছে অন্ত্যজ বলে চিহ্নিত ছিলেন । এইসব ভূমিপুত্র অন্ত্যজ শ্রেণির শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গীতের রাগও তাদের নামেই হওয়া স্বাভাবিক ।

প্রাচীন বাংলার সাংগীতিক ঐতিহ্য চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন হয়ে সাম্প্রতিক সময়ের বহমান ধারার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত । 'ভাটি' বলতে নিম্নাঞ্চল, নিম্নপ্রবাহ, নিম্নমুখ ইত্যাদি বোঝায় । সাধারণত নদীর স্রোতের শেষপ্রান্তের ভাগকে বোঝায় । সেই 'ভাটি'র সঙ্গে বিশেষণ বাচক তদ্ধিত প্রত্যয় 'আল' বা 'আলি' প্রত্যয় যুক্ত হয়ে 'ভাটিয়াল' বা 'ভাটিয়ালি' শব্দ সৃষ্টি হয়েছে । 'উজান বাঁকে যায় রে ভাইটাল বাঁকে ঘর' । হলায়ুধ মিশ্র রচিত 'সেক সুভোদয়া' সংস্কৃত গ্রন্থে 'ভাটিয়ালি রাগেন গীয়তে' বলে একটি ছড়া সংগীতের উল্লেখ আছে । নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের গানই ভাটিয়ালি গান । ভাটির দিকে নৌকা ছেড়ে দিয়ে মাঝিরা অবসর সময়ে নৌকায় বসে যে গান গায় তাই ভাটিয়ালি গান এটা শ্রমজীবী মানুষেরই গান ।

ভাটিয়ালি গান কবে কিভাবে রচিত হয়েছিল তার ইতিহাস জানা না গেলেও বাংলাদেশের সংগীতের প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে আমরা চর্যাপদকেই মান্য করি । খ্রিস্টীয় নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশে চর্যার পদগুলি রচিত হয়েছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন । এই চর্যাপদের আলোচনায় গবেষকগণ চর্যাপদের কবি ভুসুকুপার রচিত ৪৩ সংখ্যক পদের বঙ্গাল রাগটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন । এই রাগটির সূত্র ধরেই গবেষকগণ ভুসুকুপাকে 'বঙ্গাল' বা বাংলাদেশের লোক বলে চিহ্নিত করেন । সেই সঙ্গে চর্যাপদে উল্লেখিত 'বঙ্গাল' রাগকে ভাটিয়ালি বলে মনে করেন ।

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ নদীর সাথে এদেশের মানুষের যুগসূত্র নিবিড় তাই ভাটিয়ালি গানও এদেশের মানুষের প্রাণের গভীর চেতনা থেকে উৎসারিত একটি বিশেষ ধারা । নদীর মাঝি বা নদী পাড়ের মানুষের জীবনে এই গানের অধিক প্রচলন দেখা যায় । নদীর ধারা যেভাবে ক্রমাগত প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায় তেমনি মানবজীবনও ক্রমাগত অতিক্রান্ত হয়ে একসময় মৃত্যুতে তার সমাপ্তি ঘটে । নদীর গতির সঙ্গে মানুষের জীবনের গতির এই অদ্ভুত মিলকে উপজীব্য করে লোকো কবিরা যে গান গেয়ে থাকেন তাই ভাটিয়ালি নদী যেমন উজান থেকে মাটির দিকে যায় মানুষের জীবনের শুরু সে রকম ক্রমান্বয়ে সমাপ্তির দিকে অগ্রসর হয় । চর্যাপদের বিভিন্ন গানের পদগুলিতে সেই সময়ের মানুষের জীবনধারাই প্রতিফলিত হয়ে উঠত । সেসময়েও মানুষ নদীকেন্দ্রিক জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল । তাই চর্যায় বঙ্গাল রাগে গীত ৪৩ সংখ্যক পদ ছাড়াও আরো কিছু কিছু পদের কথায় ভাটিয়ালি গানের আভাস পাওয়া যায় চর্যাপদের যে সকল গানে ভাটিয়ালির বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায় সেগুলো হল– ৫,৮,১০, ১৩,১৪,৩৮, ও ৪৯ সংখ্যক পদ । এই সমস্ত পদে নদী তীরবর্তী মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিরহ, বেদনা, নৈরাশ্য ও অন্তহীন জীবনজিজ্ঞাসার কথা বর্ণনা করা হয়েছে । চর্যাপদে ৫সংখ্যক পদে চাটিলপা বলছেন– 'ভব নঈ গহণ গম্ভীর বেগেঁ বাহী /  দূআন্তে চিখিল মাঝেঁ না থাহী । ( ভবনদী গহন এবং গম্ভীর বেগে তা প্রবাহিত হচ্ছে । দুই ধারে তার কাদা মাঝখানে থই পাওয়া যায় না ) ।৮সংখ্যক পদে কম্বলাম্বরপা বলছেন–'সোনে ভরিলী করুণা ণাবী ।/  রূপা থোই নাহিক ঠাবী । ( সোনায় পরিপূর্ণ আমার করুণা নৌকা রুপাদের রাখব তার জায়গা নেই ) । ১৪সংখ্যক পদে ডোম্বীপা লিখেছেন–'গঙ্গা জঊনা মাঝেঁ রে বহই নাঈ /  তহি বুড়িলী মাতঙ্গ যোইয়া লীলে পার করেই । ( গঙ্গা যমুনার মাঝখানে ওরে নৌকা বাওয়া হয়, তাতে নিমজ্জিত মাতঙ্গী যোগীকে অবহেলায় পার করে নেয় ) । ৩৮সংখ্যক পদে সরহপা বলেছেন–'কাঅ ণাবড়ী খান্ডি-মন কেড়ুআল / সদগুরু বঅনে ধর পতবাল ( কায়ারূপ নৌকা, মন রূপ বৈঠা, সদগুরুর বচনেতে হাল ধরে থাকো, পরপারে যেতে ) । ৪৯সংখ্যক পদে ভুসুকুপা উল্লেখ করেছেন–'বাজ ণাব পাড়ি, পঁউআ খালে বাহিউ / অদঅ বঙ্গালে দেশ লুড়িউ । ( বজ্র নৌকা পাড়ি দিয়ে পদ্মা খেলে বাওয়া হল । নির্দয় বঙ্গালে দেশ লুট করে নিয়ে গেল ) ।

মধ্যযুগীয় বাংলাকবিতায় গীতিসাহিত্যের অপূর্ব নিদর্শন বড়ু চন্ডিদাসের 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্যেও 'ভাটিয়ালি' নামের একটি রাগের উল্লেখ পাওয়া যায় । শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটি চর্যাপদের পর তথা ১৩০০ থেকে ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়েছিল । শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ভাটিয়ালি রাগ অনেকগুলি গানের শিরোদেশে নির্দেশিত ছিল । এই গানগুলির প্রত্যেকটির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভাটিয়ালি গানের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে । পূর্ব বাংলার ভাটিয়ালি গানে যেমন বিরহ বিচ্ছেদ ও বেদনার আবহ থাকে তেমনি শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেও 'রাধাবিরহ' খন্ডে অধিকসংখ্যক ভাটিয়ালি রাগের উল্লেখ রয়েছে । শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের প্রায় ১৮টি গান ভাটিয়ালি রাগের অন্তর্গত ।

 চর্যাপদের গানগুলোতে যেমন জীবনযাত্রার চিত্রের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক সাধনার বার্তা রয়ে গেছে তেমনি ভাটিয়াল গানেও দেখি নদী জীবনের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক জীবনে অপূর্ণতার কথাই পক্ষান্তরে উল্লিখিত হয়ে থাকে । যেমন–'মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না / সারা জনম উজান বাইলাম ভাটির নাগাল পাইলাম না ।' অর্থাৎ, সারাজীবন ধরে সংসারধর্মই করা হয়েছে । অন্তিমে যাঁর শরণ নেওয়ার কথা তাঁকে ভাবার সুযোগ হল না ।  কালের বিবর্তনের নিয়মে বহু পরিবর্তন এলেও বাংলা ভাটিয়ালি সংগীতের মূল সূত্রটি যে চর্যাপদেই নিহিত তা অনায়াসেই বোঝা যায় । এছাড়া চর্যায় উল্লিখিত অনেক রাগ পরবর্তীসময়েও বাংলাগানে স্থান করে নিয়েছে।

Monday, May 4, 2026

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক ও দুই নম্বর সেক্টরের সম্মিলিত লড়াই

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক ও দুই  নম্বর সেক্টরের সম্মিলিত লড়াই

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

-সেক্টর কমান্ডার: ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা বাচ্চু

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: পরশুরাম, দেবপুর, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, অনন্তপুর, সোনাপুর, কোলাপাড়া, মনতলা, মোহাম্মদপুর, আমজাদহাট, মুন্সীরহাট, পূর্বদেবপুর, পূর্বমধুগ্রাম, দক্ষিণ যশপুর, মহামায়া, মোকামিয়াম, রাধানগর, শুভপুর, গুতুমা, গোপাল, কাশীপুর ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: গুতুমা রেইড (১৬ জুলাই), বাগার বাজার রাজাকার ক্যাম্প ও দেবপুর অ্যামবুশ (৩১ জুলাই), করেরহাট-ফেনী-ছাগলনাইয়া অপারেশন (৪-৬ আগস্ট), চাঁদগাজী বাজার এলাকা অ্যামবুশ (১৮ আগস্ট), চম্পকনগর বিওপি আক্রমণ (২০ সেপ্টেম্বর), চম্পকনগর বিওপি আক্রমণ (২২ সেপ্টেম্বর), ফেনী-বিলোনিয়া সড়কে রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস (২৫ সেপ্টেম্বর), মুহুরী নদীসকাশে রণাঙ্গন (৩ অক্টোবর), মদুনাঘাট বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ধ্বংস (৬ অক্টোবর), ছাগলনাইয়া-বিলোনিয়া সড়কে ব্রিজ ধ্বংস (৭ অক্টোবর), সলিয়াদীঘি যুদ্ধ (৭ নভেম্বর), দক্ষিণ বিলোনিয়া মুক্তকরণ (২১ নভেম্বর), করিমাটিলায় সংঘর্ষ (৩ ডিসেম্বর)।

শ্রীনগর সাব-সেক্টর: 

আয়তনে ছোট হলেও এই সাব-সেক্টরটি বেশ গুরুত্ববহ ছিল। কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রেলসড়ক এই সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়েই প্রবেশ করেছে। এর কেবল উত্তরাংশ ভারতের সাথে যুক্ত। এখানে প্রাথমিক প্রতিরোধ যুদ্ধ ও সর্বপ্রথম ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। ফেনী নদী এই সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে।

আয়তন: ৫টি সাব-সেক্টরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে ছোট ছিল; প্রায় ২০০ বর্গ কিলোমিটার।

সাব-সেক্টর কমান্ডার: প্রথমে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, পরে কিছুদিন ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং শেষে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: করেরহাট, জোরারগঞ্জ, হিঙ্গুলী, ধুম, কাটাছড়া, ওসমানপুর ও দুর্গাপুর।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: এখানে সংঘর্ষ তেমন একটা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রটি ছিল করেরহাট (নভেম্বর)।

তবলছড়ি সাব-সেক্টর

অবস্থানগত দিক বিশ্লেষণপূর্বক দেখা যায় যে, এই অঞ্চলে একইসাথে পাহাড় ও সমতল ভূমি রয়েছে। ’৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর ১নং সেক্টরে প্রবেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নাজুক করতে এই সাব-সেক্টরের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। উত্তাল মার্চের শেষলগ্নে কুমিরায় এক দুর্ধর্ষ প্রতিরোধযুদ্ধ হয় যা কিনা এই সাব-সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। তবে চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই ও সীতাকুণ্ড থানার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত এই এলাকাটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেকটা বিপদজনক ছিল, কারণ ভারত সীমান্তে খুব তাড়াতাড়ি চলে যাওয়ার কোনো রাস্তা ছিল না এখানে। এই অঞ্চলের একদিক ছিল সন্দ্বীপ প্রণালীর সাথে যুক্ত।

আয়তন: ৭০০ বর্গ কিলোমিটার

সাব-সেক্টর কমান্ডার: সুবেদার আলী হোসেন।

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা, মীরসরাই, পানছড়ি ও লক্ষ্মীছড়ি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: সীতাকুণ্ড, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা ও মীরসরাই।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: কুমিরার প্রতিরোধ যুদ্ধ (২৬-২৮ মার্চ), বড়তাকিয়া ও মীরসরাই অপারেশন (২৩ জুলাই), পাতাকোট অ্যামবুশ (১০ আগস্ট), সুফিয়া রোডের যুদ্ধ (১০ আগস্ট), মীরসরাই রেললাইন অপারেশন (২৮ আগস্ট), ওসমানপুর-লোহারপুলের যুদ্ধ (১৭ অক্টোবর), চামলাশিয়া অ্যামবুশ (১২ নভেম্বর), মীরসরাই রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ (২৪ নভেম্বর), কাটিরহাটে যুদ্ধ (৪ ডিসেম্বর)।

ডিমাগিরি সাব-সেক্টর

৫টি সাব-সেক্টরের ভিতর যে তিনটি চট্টগ্রামের মধ্যে ছিল তার অন্যতম ছিল উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই ডিমাগিরি সাব-সেক্টর। এখানের বাগানবাজার ও অন্যান্য দু’একটি স্থানে বিওপির ঘাঁটি ছিল। ফলে এর বাগানবাজার অংশটি (উত্তরাংশ) কেবল ভারত সংলগ্ন ছিল।

আয়তন: ১,০০০ বর্গ কিলোমিটার।

সাব-সেক্টর কমান্ডার: জনৈক সুবেদার।

দায়িত্বপূর্ণ এলাকা: ফটিকছড়ি, নাজিরহাট, রাউজান, বাগানবাজার ও হাটহাজারী।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ: সুলতানপুর, রাউজান, ফটিকছড়ি, সোয়াবিল, বাগানবাজার ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ: মদনঘাটের বিদ্যুৎ স্টেশন ধ্বংস (১১ সেপ্টেম্বর), বাগানবাজার রেইড (১১ অক্টোবর), আন্ধারমানিক রেইড (৫ নভেম্বর), ফটিকছড়ি পুলিশ স্টেশন রেইড (১৭ নভেম্বর), নাজিরহাট যুদ্ধ (৯ ডিসেম্বর) ইত্যাদি।

মনুঘাট সাব-সেক্টর :

বাংলাদেশের সর্ব পূর্বে অবস্থিত এই সাব-সেক্টরের সমগ্র পশ্চিমাংশ ভারত লাগোয়া ছিল । ফলে মুক্তিযোদ্ধারা সুযোগ বুঝে ভারতীয় ভূখণ্ডে চলে যেতে পারত । এ অঞ্চলটি পাহাড়-পর্বতের আধিক্যহেতু গেরিলা যুদ্ধের উপযোগী ছিল । এছাড়া চেঙ্গী নদীর অবস্থানের কারণে মুক্তিযোদ্ধারা বেশ সুবিধা পেত । 
আয়তন :-পাঁচটি সাব-সেক্টরের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়ো । প্রায় ১২০০বর্গ কিলোমিটার । 
সাব-সেক্টর কমান্ডার :- যথাক্রমে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান, ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট ফজলুর রহমান 
দায়িত্বপূর্ণ এলাকা :-  রামগড়, হেঁয়াকো, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি, মানিকছড়ি ও মাটিরাঙ্গা । 
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রসমূহ :- রামগড়, হেঁয়াকো, মহালছড়ি, মানিকছড়ি, ভাইবোনছড়া, পানছড়ি ইত্যাদি।
 উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ :- হেঁয়াকোর যুদ্ধ ( ২৭ জুলাই ), রামগড় আক্রমণ ( ১৩- 15 আগস্ট ), বিলাইছড়ি ও পানছড়ি এম্বুস যথাক্রমে ( ১–২নভেম্বর ), ভাইবোনছড়া ও পানছড়ি মুক্তকরণ ( ১০ ডিসেম্বর )
 এক নম্বর সেক্টরে মাত্র ৫ টি সাব সেক্টর গঠন করা হলেও এ অঞ্চলের কিছু এলাকা সাবসেক্টর বহির্ভূত ছিল । এসব এলাকাতেও কিন্তু যুদ্ধ হয়েছে। এ সকল এলাকায় যুদ্ধ করেছেন মূলত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাগণ এবং পরবর্তীতে কিছু বিএলএফ-এর সদস্যরা। যেসব এলাকা এমন ছিল সেগুলো হল- কক্সবাজার ও রাঙামাটি জেলার প্রায় সমস্ত এলাকা, চট্টগ্রাম জেলার ১৪টির মধ্যে প্রায় ৯টি থানা।" ( বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক–মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত, বাংলাদেশ )


মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের পাশেই ছিল দুই নম্বর সেক্টর  । "এই ২ নম্বর সেক্টর বৃহত্তর ঢাকা ( প্রধানত ঢাকা শহরসহ ঢাকা জেলার দক্ষিণাংশ )-কুমিল্লা ( আখাউড়া-আশুগঞ্জ রেললাইনের উত্তরাংশ বাদে ) ফরিদপুরের পূর্বাংশ ও নোয়াখালীর অংশবিশেষ ( মুহুরী নদীর পূর্বাংশ ) নিয়ে গঠিত হয় । ২ নম্বর সেক্টরের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী এলাকা, দক্ষিণ-পূর্বে ১ নম্বর সেক্টর, পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্য, উত্তরে ৩ নম্বর সেক্টর, উত্তর-পশ্চিমে যমুনা নদী ও ৭ নম্বর সেক্টর, পশ্চিমে ৮ নম্বর সেক্টর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে ৯নম্বর সেক্টরের সীমানা । দুই নম্বর সেক্টরের আয়তন প্রায় ১৮,৫২৬ বর্গ কিলোমিটার । কোথাও কোথাও এই সেক্টরের আয়তনকে ১৭৬৫৮ বর্গ কিলোমিটার বলে অনুমান করা হয়েছে । ২ নম্বর সেক্টর ৪-ইস্ট বেঙ্গল, কুমিল্লা-নোয়াখালী ইপিয়ার বাহিনী নিয়ে গঠিত হয় এই সেক্টরটি । সদর দপ্তর ছিল মেলাঘরে । মেজর খালেদ মোশাররফ ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমান্ডার পদে নিযুক্ত ছিলেন । পরে মেজর এটিএম হায়দার সে বছর ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন ।

দুই নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর ও কমান্ডার 

১. গঙ্গাসাগর, আখাউড়া ও কসবা– কমান্ডারদের নাম :-  লেফটেন্যান্ট মাহবুব, লেফটেন্যান্ট ফারুক ও লেফটেন্যান্ট হুমায়ুন কবির  উল্লেখ্য ।

 ২.মন্দাভাগ– 
কমান্ডার:- ক্যাপ্টেন গফফার 

৩. শালদা নদী-
কমান্ডার:- মেজর আব্দুস সালেক চৌধুরী 

৪.মতিনগর–
কমান্ডার:-  লেফটেন্যান্ট দিদারুল আলম 
৫. নির্ভয়পুর–
কমান্ডার:-  ক্যাপ্টেন আকবর হোসেন, লেফটেন্যান্ট মাহবুব 
৬. রাজনগর–
কমান্ডার:- ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম, ক্যাপ্টেন শহীদ লেফটেন্যান্ট ইমামুজ্জামান ।

এই সেক্টরের উল্লেখযোগ্য হাসপাতালটির নাম ছিল বাংলাদেশ হাসপাতাল । এটি প্রথমে ছিল সোনামুড়ায় । পরবর্তী সময়ে বিশ্রামগঞ্জস্থিত হাবুল ব্যানার্জীর বাগানে সরিয়ে নেওয়া হয় । দুশো শয্যার এই হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার ছিলেন ক্যাপটেন আকতার আহমেদ,ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডা. মবিন প্রমুখ । সেইসময়ে চিকিৎসাবিদ্যায় পাঠরত বহু ছাত্রছাত্রী আহত ও অসুস্থ মুক্তযোদ্ধাদের অক্লান্ত সেবা দিয়ে গিয়েছিলেন ।

এক নম্বর ও দুই নম্বর সেক্টরের যৌথ লড়াই :-

ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক  ৬ নম্বর সাব-সেক্টরের মধ্য দিয়ে চলে গেছে । অন্যদিকে ঢাকার সাথে চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগের একমাত্র পথটিও এই অঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করেছে । ত্রিপুরা রাজ‍্যের দক্ষিণ জেলার উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত এই এলাকা ।এই এলাকায় ৪-ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্রাভো তথা 'বি' কোম্পানি, ইপিআর এর 'এক্স' কোম্পানি গণবাহানীর সদস‍্যরা যুদ্ধ করেছিলেন । এই সাবসেক্টরের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ।
সাব-সেক্টর কমান্ডার :-ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম । তাঁকে সহায়তার জন্য ছিলেন ক‍্যাপ্টেন শহিদ ও লেফটেন্যান্ট ইমাম-উজ-জামান ।
 দায়িত্বপূর্ণ এলাকা :- বিলোনিয়ার পশ্চিমাঞ্চল লাকসামের দক্ষিণাঞ্চল, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট, ফেনীর আংশিক অঞ্চল ও নোয়াখালীর কিছু অংশ।
উল্লেখযোগ্য আক্রমণ, অ্যাম্বুশ ও যুদ্ধসমূহ :- নবাবপুরের যুদ্ধ ( ২৮ জুলাই ) গোপালপুর যুদ্ধ (১০আগস্ট ) সোনাপুর যুদ্ধ (৮ সেপ্টেম্বর ) কল‍্যাণদীর অপারেশন  (১৮ সেপ্টেম্বর )রাজগঞ্জের যুদ্ধ ( ২১সেপ্টেম্বর ) বিলোনিয়ার যুদ্ধ ও বিজয় ( অক্টোবর-নভেম্বর ) ওদারহাটের যুদ্ধ (৩০ অক্টোবর )শালধর ও লেমুয়ার যুদ্ধ  ( ১০ নভেম্বর )বেতিয়ারা গ্রামের যুদ্ধ ( ১১ নভেম্বর ) নোয়াপুর এর যুদ্ধ ( ডিসেম্বর ) ইত্যাদি ।"( তথ‍্য : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই– মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত, বাংলাদেশ )।

স্বাধীনতা যুদ্ধে ফেনীর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ফেনী বিলোনিয়া সীমান্তের যুদ্ধ ছিল  মুক্তিবাহিনী ও পাক হানাদার বাহিনীর জন‍্যে সামরিক দিক থেকে অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উভয়ের জন‍্যে ছিল মর্যাদার লড়াই । কারণ ফেনীর উপর দিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের যোগাযোগ রক্ষা হত । বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের উপর কর্তৃত্ব রাখতে হলেও ফেনী ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ । আর দক্ষিণ দিক ছাড়া পরশুরাম ও বিলোনিয়ার তিনদিকেই ভারতীয় সীমান্ত হওয়ায় স্থানটিতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের কৌশল নেয় পাকিস্তানি বাহিনী ।‌ তাদের প্রতিহত করার জন্যই এক নম্বর ও দুই নম্বর সেক্টর থেকেও সম্মিলিতভাবে এই অঞ্চল দখলের লড়াই চালানো হয় । এক নম্বর সেক্টরের ঋষ‍্যমুখ সাব-সেক্টর, শ্রীনগর সাব-সেক্টর এবং দুই নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টর পাশাপাশি  ছিল । ফলে এই তিনটি সাব-সেক্টরের  আওতাধীন পুরো নোয়াখালী এলাকা ছিল অর্থাৎ ফেনীর উত্তরাংশ ছিল রাজনগর সেক্টরের আওতাধীন এবং দক্ষিণাংশ ছিল ঋষ‍্যমুখ ও শ্রীনগর সেক্টরের আওতাধীন । ফলে ফেনী এলাকায় সেসময় তিন দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমণ  সংঘটিত হয়েছিল । এখানে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আক্রমণ এম্বুস ও যুদ্ধ সংঘটিত হয় ।
মুক্তিযুদ্ধে ফেনী সীমান্তে যে কয়টি লড়াই হয় তার মধ্যে শুভপুর ও বিলোনিয়া যুদ্ধ অন‍্যতম । এই যুদ্ধে এক নম্বর সেক্টরের ঋষ‍্যমুখ ও শ্রীনগর এই দুটি সাব-সেক্টর এবং দুই নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব্-সেক্টরের মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনী যৌথভাবে আক্রমণ শানিয়ে ফেনী জেলাকে মুক্ত করেন ।

শুভপুর যুদ্ধ :

ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার অন্তর্গত শুভপুর মধুগ্রাম অংশটি শুভ পূর্ব রাধানগর ইউনিয়ন এর অন্তর্গত শুভপুর-মধুগ্রাম মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর তীরে অবস্থিত এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে গুরুত্বপূর্ণ শুভপুর রেলওয়ে ও সড়ক ব্রিজটি এখানে অবস্থিত। শুভপুর ব্রিজকে নিজেদের  দখলে রাখার তাগিদে  মুক্তিবাহিনী এবং পাক হানাদার বাহিনীর মধ‍্যে দফায় দফায় যুদ্ধ হয়েছিল । মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাই এই স্থানের গুরুত্ব । চট্টগ্রামে অবস্থিত একমাত্র সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তান বাহিনীর অস্ত্র-সরঞ্জামাদি ঢাকা চট্টগ্রাম রোড ধরে এবং পরবর্তী সময়ে সারাদেশে সরবরাহ করা হত । তাই এর রণকৌশলগত গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত বেশি । তৎকালীন সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রামে যাতায়াতের এবং যোগাযোগের পথ ছিল ছাগলনাইয়ার শুভপুর হয়ে । মুক্তিযোদ্ধারা স্থির করলেন শুভপুর ব্রিজ ভেঙে দেওয়া গেলে পাকিস্তানি বাহিনী ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এ ব্রিজ অতিক্রম করে ঢাকা-চট্টগ্রামে প্রবেশ ও যোগাযোগ করতে পারবে না । সেজন্য মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজটি ধ্বংসের চেষ্টা চালায় । তেমনি ব্রিজটিও দখলে রাখার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয় হানাদার বাহিনী । শুভপুর ব্রিজ এর যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বলে স্বীকৃত । চট্টগ্রামের যত মুক্তিযোদ্ধা ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণও আশ্রয় নেন তারা এই শুভপুর ব্রিজ অতিক্রম করে গিয়েছিলেন । ভারতীয় বি এস এফের সহযোগিতায় ব্রিজের ১০ নম্বর পিলারের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলে এ অংশ হানাদার মুক্ত হয় । এপ্রিল ও মে মাসে বাংলাদেশ বাহিনী শুভপুর ব্রিজ শক্ত ঘাঁটি গেড়ে ছিল পাকিস্তান বাহিনী রামগড় দখল নেওয়ার পর শুভপুর ব্রিজ এর দক্ষিণ তীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতছাড়া হয়ে যায় । ৩ মে ১৯৭১ হরিনায় এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয় । তারপরেই এখানে স্যাটেলাইট ট্রেনিং সেন্টারও খোলা হয় । চট্টগ্রামের হাজার হাজার মানুষ যুদ্ধ করার জন্য শ্রীনগর, আমলিঘাট, সাব্রুম সীমান্তসহ অন‍্যান‍্য সীমান্ত দিয়ে হরিনা আসেন । এসব ভলান্টিয়ারদের দুসপ্তাহের ট্রেনিং দেওয়া হয় ত্রিপুরার হরিনা ইয়ুথ ক‍্যাম্পে, বগাফা ও অম্পিনগর সেনানিবাসে, আসামের হাফলং, তেজপুরে ও লায়লাপুরে, মেঘালয়ের তুরাসহ আরো কয়েকটি স্থানে । মুক্তিযোদ্ধারা শর্ট কোর্সে অটোমেটিক রাইফেল এল এম জি, এস এম জি, গ্রেনেড ও ২ ইঞ্চ মর্টার চালনা ও বিস্ফোরক ট্রেনিং নিয়ে জুন মাসে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন । জুন মাস থেকে মেজর রফিক গেরিলাদের দায়িত্ব নেন ও ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হন । তাঁকে সাহায্য করেন ক্যাপ্টেন এনাম, ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক‍্যাপ্টেন এম সুবিদ আলী ভুঁইয়া  (যিনি পরবর্তীকালে 'মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন )। সেসময় মেজর জিয়ার দায়িত্বে ছিল সম্মুখযুদ্ধের কোম্পানি জেড ফোর্স । জেড ফোর্সে ছিলেন শওকত আলী,ক‍্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন ওলি,ক‍্যাপ্টেন হামিদ ,ক্যাপটেন শামসুর রহমান, ল‍্যাফটেনান্ট খালিদ, ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট মিলে ৩০০ এর কাছাকাছি সৈনিক একটি স্টুডেন্ট প্ল‍্যাটুন ( ছাত্রলীগের বিএলএফ বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট ) জেড ফোর্স এর নিজস্ব হাইড-আউট ( হেডকোয়ার্টার ) ছিল  ত্রিপুরার এক রাজার পরিত্যক্ত বাড়ি 'পোয়াংবাড়ি'তে ।
১৯৭১সালের ২০ এপ্রিল ক্যাপ্টেন অলি আহমদের নেতৃত্বে শুভপুর ব্রিজ এর পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকবাহিনীর প্রচন্ড লড়াই হয় যুদ্ধে পাক বাহিনীর প্রায় ১০০ জন সৈন্য নিহত হয় ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান অবস্থান ছিল কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট । তারা বিভিন্ন ছোট ছোট উপদলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হত । তাদের পরিকল্পনা ছিল শুভপুর ব্রিজ পার হয়ে সামনে কোথাও তারা অবস্থান নেবে । মুক্তিবাহিনী ও স্থির করে রেখেছিল পাকিস্তানি বাহিনী যখন ব্রিজ অতিক্রম করবে তখনই তাদের বাধা দেওয়া হবে । তারা ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে কয়েকটি স্থানে অবস্থান নেয় । চারটে খন্ড খন্ড দলের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মাহফুজ, ক্যাপ্টেন এনাম, সুবেদার জালাল ও সুবেদার আবুল হোসেন । ১৮ জুলাই পাকিস্তানি বাহিনী ২টি কোম্পানি ও বেশকিছু যানবাহনসহ শুভপুর ব্রিজ পার হয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকে । সকাল ১০ টার দিকে তারা শুভপুর ব্রিজ অতিক্রম করে যখনই  ব্রিজের কাছে পৌঁছায় মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে তাদের আক্রমণ করে । হঠাৎ আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ১০ থেকে ১২ জন সদস্য নিহত হয় । ভয়ে তারা পালিয়ে যায় । পরদিন তারা পুনরায় অধিক শক্তি নিয়ে ফিরে আসে । মুক্তিবাহিনী পুরো রাস্তা জুড়ে মাইন পেতে রেখেছিল । মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের সামনে পড়ে তারা ব্যাপক ধ্বংসের সম্মুখীন হয় । তবুও তারা এগোতে থাকে । এক সময় পাকিস্তানী বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর দূরত্ব দাঁড়ায় মাত্র ৫০০ গজ । এই অবস্থায় ২০ দিন পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই চলে । যুদ্ধে পাকবাহিনীর ৬০ জন সদস্য নিহত হয় । তাদের ১০ টি যানবাহন ধ্বংস হয় । যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনী অধিকৃত গাড়ি থেকে প্রচুর খাদ্য সামগ্রী অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য মালামাল দখল করে । মুক্তি বাহিনীর পক্ষে ৫-৬ জন শহিদ হন । যুদ্ধের ফলে পাকিস্তানি বাহিনী ওই অঞ্চলে তাদের অবস্থান সুসংহত করতে পারেনি । ১৬ ডিসেম্বরও মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী শুভপুর ব্রিজের উপর দিয়ে লড়াই করে এগিয়ে চট্টগ্রাম দখলে নেন ।

বিলোনিয়ার প্রথম  যুদ্ধ :

১৯৭১ এর ১ জুন ১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের তিনটি কোম্পানির সমন্বয়ে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে  ত্রিপুরার মতাই এলাকা দিয়ে বাংলাদেশের বিলোনিয়াতে প্রবেশ করে  সীমান্ত থেকে মুহুরী নদী পর্যন্ত দক্ষিণ মুখী হয়ে অবস্থান গ্রহণ করে । এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ ( মুহুরী নদী সংলগ্ন এলাকায় ), ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমান ( মাঝখানে ) এবং ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান ( ভারত সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ) । একই সময়ে ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারাও চারটি কোম্পানিতে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তে নোয়াপুর-জাম্বুরা হয়ে বিলোনিয়ায় প্রবেশ করে । এখানে মুহুরী নদীর তীর থেকে সীমান্ত পর্যন্ত বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন যথাক্রমে মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান, ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম, ক্যাপ্টেন গফফার হালদার এবং লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম চৌধুরী । দুই নম্বর সেক্টরের সার্বিক নেতৃত্বে ছিলেন মেজর এম আমিনুল হক । ১৯৭১ সালের ৩ জূনের মধ্যে ১ও ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা বিলোনিয়া অবস্থানের সমস্ত প্রস্তুতি শেষ করেন । পাকিস্তানি বাহিনী বন্দুয়া-দৌলতপুর ও ছাগলনাইয়া থেকে অগ্রসর হলে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পড়ে । এতে ৬০-৭০ জন পাকসেনা নিহত হয় । ফলে তারা পিছু হটে যায় । ১৯৭১ সালের ৭ জুন ভোরে আবারো পাকবাহিনী অগ্রসর হতে থাকে । কিছুদুর এগোবার পর তারা আবার মুক্তি বাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়ে । এই আক্রমণে পাকিস্তানি সৈন্যদের ৫০-৬০ জন নিহত হয় । ৯ জুন পাকিস্তানী বাহিনী তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে এগোনোর চেষ্টা করে । মুক্তি বাহিনী তাদের এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় । পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালালে মুক্তিবাহিনী পাল্টা জবাব দেয় । এভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২১ জুন পর্যন্ত দফায় দফায় মুক্তিবাহিনীর উপর ১১ বার ব‍্যর্থ আক্রমন চালায় । কিন্তু তারা মুক্তিবাহিনীর হাতে পর্যুদস্ত  হয় বারবার । এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ১৫ বেলুচ রেজিমেন্ট, ২৪ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স এবং ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সের বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে এককভাবে লড়াই করে মুক্তিবাহিনী ।
পরবর্তীতে ২১ জুন সন্ধ্যায় পাকবাহিনী তিনটি এসআই-৮ হ‍্যালিকপ্টার দিয়ে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানের প্রায় পাঁচশো গজ পেছনে দুই দফায় সৈন‍্য অবতরণ করায় । ফলে মুক্তিবাহিনী কিছুটা বেকায়দায় পড়ে যায় । মেজর খালেদ মোশাররফ রণাঙ্গনে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেন বাহিনীকে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে অবস্থান নেওয়ার । ফলে ২৪ জুন রাতে মুক্তিযোদ্ধারা ভারতে আশ্রয় নেয় । এভাবে বিলোনিয়া প্রথম যুদ্ধের অবসান ঘটে ।

বিলোনিয়া দ্বিতীয় যুদ্ধ :

বিলোনিয়ার দ্বিতীয় যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি মাইলফলক । বিশ্বের সামরিক কলেজের 'ব্যাটেল অফ বিলোনিয়া বালজ' অর্থাৎ 'বিলোনিয়ার যুদ্ধ' পড়ানো হয় ।
এই যুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টর থেকে মেজর মাহফুজুর রহমান ও ২ নম্বর সেক্টর থেকে ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম দায়িত্ব নিয়ে মুহুরী নদী বরাবর পূর্ব পশ্চিম দিকে ২ টি সেক্টরে ভাগ করে বাহিনী নিয়ে অবস্থান নেন। ৫ নভেম্বর ৫.৩০ মিনিটে এ তারা বিলোনিয়াতে প্রবেশ করেন । ২ রাজপুতের একটি প্ল‍্যাটুন ও আর্টিলারি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ছিল ৫, ৬ ও ৭ তারিখ উভয়পক্ষে তুমুল লড়াই হয় । ৮ তারিখ পরশুরাম ও বিলোনিয়া   মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে ‌। ৯ নভেম্বর বিকাল ৩.৩০ মিনিটে তিনটি পাক বিমান মুক্তিবাহিনীর উপর বোমাবর্ষণ করে । একজন মুক্তিযোদ্ধা ঘটনাস্থলেই মারা যান । ১০ নভেম্বর শত্রুপক্ষ চিতলিয়া ও কাপ্তান বাজার থেকে আক্রমণ চালায় । এ দিন বিকাল ৩.৩০ এ পাক বাহিনীর চারটি বিমান দিয়ে আবারও আক্রমণ চালানো হয়  মুক্তিবাহিনীর উপর । মুক্তিযোদ্ধারা সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ প্রতিহত করে । ১২ নভেম্বর  পাকিস্তানী সেনারা।ওই এলাকা ত্যাগ করে । ২ রাজপুতের লেফটেনান্ট কর্নেল দত্ত ও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিক মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন । এই যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ৬ জাঠ, ৩২ মাহার, ৮ বিহার, ৩ ডোগরা  রেজিমেন্ট, ১১ পঞ্জাব রেজিমেন্ট এর জওয়ানগণ, ব্রিগেডিয়ার আনন্দস্বরূপ, ব্রিগেডিয়ার সান্ধু, লে. কর্নেল বিশলা, ক‍্যাপ্টেন বাজওয়া, ল‍্যাফ. কর্নেল ওমপ্রকাশ শর্মা, ল‍্যাফ. কর্নেল হিম্মৎ সিং, ল‍্যাফ. কর্নেল ভিড়ক, ল‍্যাফ. জেনারেল সাগাত সিং, ল‍্যাফ. কর্নেল হরগোবিন্দ সিং, মেজর জেনারেল হীরা, ক‍্যাপ্টেন পি কে ঘোষ ও মেজর গুরুং প্রত‍্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিলেন ।
এরপর মুক্তিবাহিনী দ্রুত ফেনীর দিকে অগ্রসর হতে থাকে । পথে পথে পাক বাহিনীর ছোটো ছোটো দলের সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকে । ক্রমশ তাদের মনোবল ভেঙে পড়তে থাকে ।
একসময় ফেনীও হানাদারমুক্ত হয়ে পড়ে । মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের রাজনগর সাব-সেক্টরের কমান্ডার যুদ্ধের প্রত‍্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন–
'ফেনী পাক হানাদারমুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর। ’৭১-এর এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ সমরে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ফেনীর মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ে । ফেনী অঞ্চলের মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত আমি তৎকালীন ক্যাপ্টেন জাফর ইমাম (পরবর্তীতে লে. কর্নেল) ভারতের বিলোনিয়া ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল থেকে ১০ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অভিযান চালিয়ে বিলোনিয়া, পরশুরাম, মুন্সীরহাট, ফুলগাজী হয়ে যুদ্ধ করতে করতে এগোতে থাকলে পর্যুদস্ত হয়ে ফেনীর পাক হানাদার বাহিনীর একটি অংশ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী হয়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের রাস্তায় এবং অন্য অংশ শুভপুর ব্রিজের ওপর দিয়ে চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধে ফেনীর অনেক রণাঙ্গনের মধ্যে মুন্সীরহাটের মুক্তারবাড়ি ও বন্ধুয়ার প্রতিরোধের যুদ্ধ ইতিহাসখ্যাত হয়ে আছে। প্রথম বিলোনিয়া যুদ্ধে মুন্সীরহাটে পাক বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে প্রথম শহীদ হন হাবিলদার নূরুল ইসলাম। এ যুদ্ধে পাকিস্তানের প্রায় ৩০০ সেনা হতাহত হয়েছিল। হাবিলদার নূরুল ইসলাম বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। বিধ্বস্ত নূরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা দেখে যেতে পারলাম না। স্যার, আপনারা চালিয়ে যান। আমাদের রক্ত যেন বৃথা না যায়। ’ কালিমা পড়ে জয় বাংলা বলে আমাদের থেকে বিদায় নেন নূরুল ইসলাম । { দেখেছি আনন্দাশ্রু, স্বজন হারানোর বেদনা–কর্নেল জাফর ইমাম ( অব. )বীরবিক্রম– Feni Online, Dec. 6.2018 } 

ফেনী ও নোয়াখালির এমন  বহু যুদ্ধেই ১ নম্বর সেক্টরের সৈন‍্যগণ, সীমান্তসংলগ্ন বি এস এফ পোস্টে কর্মরত সৈনিকগণ, বগাফা বি এস এফ ক‍্যাম্পের সৈনিকগণ  প্রত‍্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন । সেসময়ের বিলোনিয়ার ও সাব্রুমের ছাত্র যুব নেতারাও বিভিন্ন ভাবে ছাত্রলীগের বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টকে সাহায্য করেছিলেন ।

দুংখের বিষয় মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ও মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণকেন্দ্র আজ বিস্মৃতির অতলতলে হারিয়ে গেছে । এখানকার কবরে শায়িত মুক্তিযোদ্ধারা সামান‍্য একটু স্বীকৃতির জন‍্যে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন ।

Saturday, May 2, 2026

'এসো হে বৈশাখ' : নববর্ষের ভাবনা

'এসো হে বৈশাখ' : নববর্ষের ভাবনা

চৈত্রসংক্রান্তির পর দিনেই আসে পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ নববর্ষের প্রথম দিন । এটি কেবল বর্ষপঞ্জির একটি পরিবর্তন নয় । বরং বাঙালির চিরন্তন সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ । এই দিনে মানুষ নতুন পোশাক পরে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটান, দেখা-সাক্ষাৎ করেন  এবং আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন ।সেইসঙ্গে নানাধরনের উপাদেয় খাওয়াদাওয়ায় মেতে ওঠেন ।  ব্যবসায়ীরা পুরনো বছরের হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা শুরু করেন ।‌ যার নাম 'হালখাতা' । মহাজনের গদিতে এদিন সিদ্ধিদাতা গণেশ, গন্ধেশ্বরী কিংবা লক্ষ্মীপূজা দেওয়া হয় । পুরোনো দেনাপাওনা চুকিয়ে নতুন সূচনার প্রতীক এই 'হালখাতা' । সারা বছরের ক্রেতারা এদিন ব্যবসায়ীর দোকানে বা গদিতে আসেন এবং মিষ্টিমুখে আপ্যায়িত হন । সেই সঙ্গে খদ্দের পুরনো বকেয়ার আংশিক বা সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি ঘটান । গৃহস্থবাড়িতে হয় গৃহদেবতার পূজা । অনেকে মন্দিরে গিয়ে পূজা দিয়ে পারিবারিক সুখ সমৃদ্ধি জন্য প্রার্থনা করেন । গুরুজনদের প্রণাম জানান । ছোটোদের স্নেহাশীর্বাদ করেন । মুসলিমদের মধ্যেও এদিন নামাজ আদায়ের রীতিনীতি প্রচলিত রয়েছে । ত্রিপুরার জনজাতিদের মধ্যেও চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষের শুরুতে 'বিজু', 'বুইসু', বিসিকাতাল ও 'সাংগ্রেই' উৎসব পালনের রীতি রয়েছে ।

এক সময় বাঙালি জীবনঅর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর । সেকারণে কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতি ছিল জীবনের কেন্দ্রে । এই বর্ষগণনা পদ্ধতি ও কৃষিকে নির্ভর করেই নিরূপণ করা হয় । 'মেষোদয়ো দ্বদশৈতে মাসাস্তৈরেব বৎসরঃ' । অর্থাৎ বৈশাখ থেকে চৈত্রমাস মেষাদিক্রমে দ্বাদশ রাশির বসতি । পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জি উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত । কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ কমই । মূলত কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে ঘিরে এর প্রচলন । পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা পাওনার হিসাব মেটানো । বিশ্বের বড়ো বড়ো উৎসব ধর্মকেন্দ্রিক বা জাতিকেন্দ্রিক । এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম বাঙালির পহেলা বৈশাখের নানা আয়োজন । বাংলা সনে প্রথম দিন সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) কর আদায়ের সুবিধার্থে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এই 'ফসলি সন' প্রবর্তন করেছিলেন, যা কাল ক্রমে 'বাংলা সন' নামে পরিচিতি লাভ করে । মূলত জমিদার ও কৃষকদের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয় ।

বাংলা নববর্ষকে আবেগপূর্ণ করে তোলার ক্ষেত্রে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ছিল অসীম । উনিশ শতকে তিনি এই পহেলা বৈশাখকে আনুষ্ঠানিকতায় রূপদান করেছিলেন, । রবীন্দ্রনাথও তাঁর জমিদারিতে 'পুণ্যাহ' বা খাজনা আদায়ের উৎসব হিসেবে নববর্ষের সূচনা করেছিলেন । রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন–'সেদিন ছিল যাকে বলে জমিদারি সেরেস্তার 'পুণ্যাহ', হোক খাজনা আদায়ের প্রথম দিন । কাজটা নিতান্তই বিষয়-কাজ । কিন্তু জমিদারি মহলে সেটা হয়ে উঠেছে একটি পার্বণ ।  সবাই খুশি । যে খাজনা দেয় সেও, আর যে খাজনা বাক্সতে ভর্তি করে সেও । এর মধ্যে হিসেব মিলিয়ে দেখার গন্ধ ছিল না । যে যা দিতে পারে তাই দেয়, প্রাপ্য নিয়ে কোন তকরার হয় না । খুব ধুমধাম পাড়াগেঁয়ে সানাই অত্যন্ত বেসুরে আকাশ মাতিয়ে তোলে । নতুন কাপড় পরে প্রজারা কাছারিতে সেলাম দিতে আসে ।' সেকালে জমিদারি মহলে এই পুণ্যাহ একটা পার্বণে পর্যবসিত হত । এই উপলক্ষে জমিদারদের ব্যয়ের বহরও ছিল বিশাল । যতটা না আয় হত অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি ব্যয় হতো তবুও তাঁরা এবং প্রজারা খুশি থাকতেন । সে কারণেই 'খাজনা থেকে বাজনা বেশি' প্রবাদটির উৎপত্তি ।

আজ বিশ্বায়নের কালে বাঙালির কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বনিয়াদ পরিবর্তিত হয়ে গেছে । গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহর মুখে হচ্ছেন । রোজগার এবং কর্মের কারণে বাঙালি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে । তারপরও আজও বাঙালি যেখানে গেছে সেখানেই এই দুদিনের উৎসবকে ঘটা করে পালন করার প্রচেষ্টা দেখা যায় । এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ঐতিহ্য ও জীবন দর্শনের এক অনন্য প্রতিফলন পুরনো কে বিদায় জানিয়ে নতুনকে বরণ করার এই চিরন্তন প্রক্রিয়ায় বাঙালি জীবনের গতিশীলতাকে ধরে রেখেছে । অর্থনৈতিক কারণেই এখন আর রাত জেগে বাড়ি বাড়ি গাজন নৃত্য দেখা যায় না । পাশাপাশি একান্নবর্তী পরিবারগুলোও ভেঙে যাওয়ার ফলে অনেক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও এখন কমে গেছে । ফলে আজকের বাঙালি সমাজ অনেকটা শেকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন । আর শেকড় থেকে ছিন্ন হলে একটা জাতি তার অস্তিত্বের সংকটে পড়ে । সে কারণেই বাঙালি আজ সংকটাপন্ন জাতি । বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের সংস্কৃতির উত্তরাধিকার পুনরায় অর্জন করতে হলে তাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে । লালন করতে হবে নিজস্ব সংস্কৃতিকে । রবীন্দ্রনাথ বাঙালির এই সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিলেন । তিনি শুরু করেছিলেন বর্ষবরণ, হলকর্ষণ, বর্ষাবরণ, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি নানা অনুষ্ঠান । তাঁর সাহিত্যে, গানে, কবিতায় বর্ষশেষ এবং নতুন বর্ষকে নিয়ে অনেক কথা তিনি বলেছেন । আজীবন তিনি বিশ্ব প্রকৃতির অখন্ডতাকে অনুভব করেছেন । রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'চৈতালি' কাব্যগ্রন্থের 'বর্ষশেষ' কবিতার এক জায়গায় লিখেছেন–

'পাখিরা জানে না কেহ আজি বর্ষ শেষ,
বকবৃদ্ধ কাছে নাহি শুনে উপদেশ ।
যতদিন এ আকাশে এ জীবন আছে,
বরষের শেষ নাহি তাহাদের কাছে ।
মানুষ আনন্দহীন নিশিদিন ধরি, 
আপনার এই ভাগ করে শতভাগ করি ।'

কবিতায় নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশ করেছেন তিনি । সত্য রূপকে শিল্পরূপ দান করেছেন এই কবিতায় এক অনবদ্য ভাষায় । মানুষ খন্ড, বিশ্বপ্রকৃতি অখন্ড–এই বোধ, এই চেতনায় বর্ষশেষের ভাবনাকে অভিনব শিল্পরূপ প্রদান করেছেন রবীন্দ্রনাথ । বর্ষশেষ এবং নববর্ষের মধ্যে রয়েছে এক অদ্ভুত মিল সে মিল হল মানুষের কল্যাণচেতনা এবং মানুষের মঙ্গলভাবনার যুগলবন্দী ।

শুভ নববর্ষ । প্রীতি ও শুভেচ্ছা সকলের জন্যে ।

Friday, May 1, 2026

পূর্ববাংলা : রবীন্দ্রসৃজনের ভূগোল, জীবন ও জল-হাওয়া

পূর্ববাংলা : রবীন্দ্রসৃজনের ভূগোল, জীবন ও জল-হাওয়া

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

রবীন্দ্রনাথ ১৮৮৯–১৯০১ সাল পর্যন্ত শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ও কালিগঞ্জ অঞ্চলে কবির জীবনের ২৮ থেকে ৪০ বছর সময়কালের ১২ বছর অতিবাহিত করেন । পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথকে বিয়ের দুদিন আগে ২২ অগ্রাহায়ন ১২৯০ বঙ্গাব্দে একটি চিঠিতে তার পূর্ববঙ্গের জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব অর্পণ করেন । সেই চিঠিতে তিনি লেখেন–'এইক্ষণে তুমি জমিদারীর কার্য পর্যবেক্ষণ করবার জন্য প্রস্তুত হও; প্রথমে সদর কাছারিতে নিয়মিত রূপে বসিয়া সদর আমিনের নিকট হইতে জমা ওয়াশিল বাকি ও জমাখরচ দেখিতে থাক এবং প্রতিদিনের আমদানি রপ্তানি পত্র সকল দেখিয়া তাহার সারমর্ম নোট করিয়া রাখ ।' ( রবিজীবনী, তৃতীয় খন্ড, কলকাতা : আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. ২০০৯ । পৃষ্ঠা ১১৯ ) । তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স মাত্র ২২ বৎসর সেই থেকে ক্রমে রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতার জমিদারি সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে থাকেন । রবীন্দ্রনাথের জীবনপঞ্জি অনুযায়ী দেখা যায় যে আরও প্রায় ছয় বছর পরে তার আঠাশ বছর বয়সে ১৮৮৯ সালের ২৮শে নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের জমিদারির দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন । ( তদেব ) ।

রবীন্দ্রনাথের জীবনে শিলাইদহপর্ব তাঁর কল্পনার জগতকে সমৃদ্ধিদানের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করেছে । এই পর্ব রবীন্দ্র সাহিত্যের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল সময় । কলকাতার নাগরিক পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে পূর্ববঙ্গের খোলা প্রকৃতি ও সহজ মানুষের সংস্পর্শে এসে তার ভাষা সহজ হয়েছে দৃষ্টি মানবিক হয়েছে সুর লোকায়ত হয়েছে । শিলাইদহ, পতিসর, শাহজাদপুর ও কালীগঞ্জে রবীন্দ্রনাথ লেখালেখির উৎকর্ষতার সুযোগ পান । রবীন্দ্রনাথের এই পর্বের সৃষ্টিকে গবেষকগণ শিলাইদহপর্ব বলে আখ্যায়িত করেন । এখানে এসে তিনি পরিচিত হন গ্রাম বাংলার উদার শ্যামল প্রকৃতির সঙ্গে । জমিদারি দেখাশোনার সূত্রে তিনি গ্রাম বাংলার নদী মাঠ মানুষ ও ভাষার একেবারে ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলেন সেই অভিজ্ঞতাই তার সাহিত্য গান ও চিন্তায় গভীর ছাপ ফেলেছে । এখানকার পদ্মা, গড়াই, আত্রাই, নাগর, বড়াল ও ইছামতি নদী তাঁকে প্রতিনিয়ত হাতছানি দিয়ে ডেকেছে । সর্বোপরি এখানকার দরিদ্র চাষি জনগণের জীবন দেখেছেন তিনি খুব কাছে থেকে । তাদের চিরক্রন্দনময় জীবন দেখে তিনি চঞ্চল হয়ে উঠেছেন । তিনি লিখেছেন–'কেবলই ভাবছি আমাদের দেশজোড়া চাষীদের দুঃখের কথা । আমার যৌবনের আরম্ভ কাল থেকেই বাংলাদেশের পল্লীগ্রামের সঙ্গে আমার নিকট পরিচয় হয়েছে । তখন চাষীদের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ ছিল দেখাশোনা–ওদের সব নালিশ উঠেছে আমার কানে । আমি জানি ওদের মতো নিঃসহায় জীব অল্পই আছে, ওরা সমাজের যে তলায় তলিয়ে সেখানে জ্ঞানের আলো অল্পই পৌছয়, প্রাণের হাওয়া বয় না বললেই হয় ।' ( রাশিয়ার চিঠি, রবীন্দ্ররচনাবলী, পৃষ্ঠা ৬৮৩ ) । জমিদার হয়েও তিনি প্রজাদের দুঃখ, খাজনার চাপ, মহাজনের শোষণ সম্বন্ধে লিখেছেন । দুই বিঘা জমি, সমাপ্তি, হৈমন্তী গল্পে পূর্ববঙ্গের কৃষি জীবনের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে ।

পূর্ববঙ্গের সঙ্গে কবির সম্পর্ক ছিল অবিনাশী । পদ্মা, ইছামতি, গড়াই এই নদীগুলো তার সাহিত্যে বারবার ফিরে আসে । পদ্মার তরঙ্গ-বিভঙ্গে নৌকায় ভেসে ভেসে তিনি নিবিড়ভাবে অবলোকন করেছেন এ অঞ্চলের শান্ত শ্যামল পল্লীপ্রকৃতি ও সহজ সরল প্রজাসাধারণ ও তাদের জীবনযাত্রা । রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ পর্বে সৃষ্টি হয়েছে সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কথা, কাহিনী, কল্পনা, কণিকা, ক্ষণিকা, নৈবেদ্য ইত্যাদি ঐশ্বর্যময় কাব্য সম্ভার । 'সোনার তরী' কাব্যে পদ্মার তীর, বর্ষার বন্যা, নৌকা, চর ক্ষেতের ফসল, চাষির জীবন, নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি । 'সোনার তরী' কবিতায় ১) গান গেয়ে তুলিবে কে আসে পারে দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে ২ ) রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা ৩ ) পরপারে দেখি আঁকা তরু-ছায়া মুসলিম মাখা, গ্রামখানি মেঘে ঢাকা প্রভাতবেলায় ৪ ) ভরা নদী ক্ষুরধারা খর পরশা  ইত্যাদি পংক্তিতে ঔপদ্মাতীরের নয়নমুগ্ধকর চিত্র ফুটে উঠে । তাঁর 'নৌকাডুবি' উপন্যাসে নদী শুধু পটভূমি নয় । চরিত্রের মতো । নদীর ভাঙাগড়া, বন্যা, মাঝি-জেলের জীবন সবই তিনি কাছে থেকে দেখেছেন । 

'চিত্রা' কাব্যের বিষয়বস্তু সৌন্দর্যবোধ হলেও গ্রামীন চাষিজীবনের সংকট ফুটে উঠেছে 'এবার ফেরাও মোরে' কবিতায় । দরিদ্র চাষিদের সংকটমোচনের জন্য তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন–'এইসব মূঢ় ম্লান মুখ মুখে / দিতে হবে ভাষা–এইসব শান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা–' । 'চৈতালি' কাব্যে পদ্মাকে নিয়ে রয়েছে কবিতা, 'হে পদ্মা আমার /তোমায় আমায় দেখা শত শত বার ।' 'কথা' ও 'কাহিনী' কাব্যে বারবার এসেছে পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের কথা । 'দুই বিঘা জমি'র উপেন মিথ হয়ে আছে । এর কাহিনি নাকি রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফল । এই কবিতায় তিনি পূববাংলার পল্লীপ্রকৃতির একটি চিত্র তুলে ধরেন–'ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি / পল্লব ঘন আম্রকানন রাখালের খেলা গেহ / স্তব্ধ অতল দিঘি কালো জল নিশীথ শীতল স্নেহ / বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে / মা বলিতে প্রাণ করে আনচান চোখে আসে জল ভরে ।' ক্ষণিকা কাব্যেও রয়েছে নিসর্গ ও মানুষ । পূর্ববঙ্গের বর্ষা শরৎ কাশফুল শালিক দোয়েল তার গানে কবিতায় অজস্রবার এসেছে । 'আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে' ও 'ও আমার দেশের মাটি' এই গানগুলো পূর্ববঙ্গের মাটির গন্ধ মাখা । 'আষাঢ়' ও 'নববর্ষা' কবিতায় বর্ষার গুরুগম্ভীর রূপ প্রকাশ পেয়েছে । 'নৈবেদ্য' কাব্য প্রকাশের সময় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে বসবাস শুরু করেন । নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থে ঈশ্বরোপলব্ধির ভূমিকা প্রধান থাকলেও বাংলার দিগন্তপ্রসারী উদার প্রকৃতির প্রভাবও রয়ে গেছে তাঁর সৃষ্টিতে ।

রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের ৯৪টি গল্পের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি গল্প তিনি রচনা করেছেন শিলাইদহ ও শাহজাদপুরে অবস্থানকালে । গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনের অন্তর্নিহিত সুখদুঃখ, আশানিরাশা, কৃষ্টিসংস্কৃতির জীবন্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় তাঁর ছোটোগল্পসমূহে । আঞ্চলিক শব্দ ও বাগধারা, পূর্ববঙ্গের লোকমুখের শব্দ রবীন্দ্রনাথের গদ্য ও কবিতায় উঠে এসেছে । শিলাইদহপর্বের ছোটোগল্প পোস্টমাস্টার, সমাপ্তি, ছুটি, অতিথি এসবে পূর্ববঙ্গের গ্রামের মানুষের মুখের ভাষার স্বাভাবিক ছন্দ পাওয়া যায় । অতিরিক্ত সংস্কৃত ভাষা শব্দের বদলে সহজ সরল প্রাণবন্ত গদ্য উঠে এসেছে তাঁর লেখায় । পূর্ববাংলায় বসে লেখা তাঁর গল্পগুলোতে বাংলাদেশের শ্যামল সুন্দর প্রকৃতি, অজ্ঞ, অসহায়, অশিক্ষিত ও দরিদ্র জনগণের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি জমিদারি শাসনের নেতিবাচক শৃংখলে পর্যুদস্ত জীবনচিত্র ও প্রতিফলিত হয়েছে । তাঁর রচিত 'ছুটি', 'পোস্টমাস্টার', 'সমাপ্তি', 'দেনা পাওনা' 'রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা', 'খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন' ইত্যাদি গল্পে কৃষক, গৃহিণী, দরিদ্র প্রজা, জমিদারের কর্মচারী, এমনকি গ্রামীন বালকের জীবন সংগ্রাম দুঃখ-কষ্ট নিঃসঙ্গতা ও নীরব অভিমান অত্যন্ত সুনিপুণভাবে উঠে এসেছে । পূর্ববঙ্গের গৃহবধূ, কিশোরী, বিধবার যে অবরুদ্ধ জীবন তিনি দেখেছেন তা স্ত্রীর পত্র, নষ্টনীড় ও যোগাযোগ উপন্যাসে উঠে এসেছে । 'পোস্টমাস্টার' গল্পে গ্রামীন জনপদের নিঃসঙ্গ পোস্টমাস্টার ও ছোটো রতনের মধ্যে আবেগময় সম্পর্কের মানবিকতা, 'ছুটি' গল্পে ফটিক চরিত্রের মাধ্যমে গ্রামীণ বালকের জীবনযুদ্ধ, 'দেনা পাওনা'য় পণপ্রথা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নারীর অসহায়ত্ব,  'সমাপ্তি' গল্পে গ্রামীন শিক্ষকের সহজ জীবন ও স্বাভাবিক প্রেমের বিকাশ এগুলো শুধু শিল্প সুষমায় সমৃদ্ধ নয় বরং গ্রামবাংলার ইতিহাস, জীবনপ্রবাহ ও সংস্কৃতির অনন্য দলিল ।

পূর্ববাংলার নদীমাতৃক প্রকৃতি লোকজ  জীবনধারা, নদী, নৌকা, কৃষিজীবন ও লোকসংগীত রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে । তিনি বাংলার লোকসংস্কৃতি ও লোকগানের সহজ সরল আবেগপ্রবণ ধারাকে আধুনিক সাহিত্যে ও সঙ্গীতে ব্যবহার করে নতুন মাত্রা দিয়েছেন । বাউল, ভাটিয়ালি, কীর্তনের সুর ও শব্দবন্ধ তার গানে মিশে গেছে । 'গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ', 'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে'– এসব গানের দেহতত্ত্ব ও সুরের শিকড় পূর্ববঙ্গের লোকজীবনে ।  নদী ও নৌকার সঙ্গে সম্পর্কিত ভাটিয়ালি গানের সুর ও ছন্দ রবীন্দ্রসংগীতে অনেকবার ব্যবহৃত হয়েছে । 'এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে জয় মা বলে ভাসা তরী' এই জাতীয় গানের উদাহরণ । লোকগানে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দ, সহজ, সরল, ভাষাব্যবহার ও চিত্রকল্প রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায় সাবলীলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে । ফলে তাঁর সৃষ্টি সর্বজনগ্রাহ্য আবেদন এনে দিয়েছে । তিনি লোকসংগীতের ঢঙে নতুন নতুন সুর সৃষ্টি করেছেন । আবার কখনো সরাসরি লোকসুর ব্যবহার করেও গান রচনা করেছেন । রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালের শ্রাবণ ( ৭ই আগস্ট ) রচনা করেছিলেন 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' গানটি । এই গানটি গগন হরকরার 'আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে' গানটির সুরে রচিত । এই গানটি এতটা জনপ্রিয় হয়েছিল যে ৭১এ বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে মুখে ফিরত । পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রূপে গানটি গৃহীত হয় । লোকসংগীতের মধ্যে যে আধ্যাত্মিক আবেদন রয়েছে তেমনি রবীন্দ্রনাথের অনেক গান ও কবিতার মধ্যে ঈশ্বরোপলব্ধি বা জীবনের গভীর সত্যের অনুসন্ধান লক্ষ্য করা যায় । 'রূপ সাগরে ডুব দিয়েছি অরূপ রতন আশা করে',  'তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলেই থাকি',  'তাই তোমার আনন্দ আমার পর তুমি তাই এসেছ নিচে /তোমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর আমার প্রেম হতো যে মিছে' গানগুলো এ প্হঙ্গে উল্লেখ করা যায় ।' শিলাইদহে বাউলদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নিবিড় পরিচয় ঘটে । এখানে অবস্থানকালে গগন হরকরা, কাঙাল হরিনাথ, গোঁসাই রামলাল, গোসাই গোপাল, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী, লালনের শিষ্যসামন্তদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখাসাক্ষাৎ ও আলোচনা হত । শিলাইদহ ও ছেঁউড়িয়া থেকে তিনি লালন ফকির ও গগন হরকরার গান সংগ্রহ করে বিদগ্ধ মহলে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন । রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত গানগুলো 'বাউল' নামে গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়েছিল । তিনি তাঁর কয়েকটি নাটকেও বাউল গান ব্যবহার করেছেন । 'মানুষের ধর্ম' গ্রন্থে ঔপনিষদীয় আত্মতত্ত্ব ও বাউল দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা তিনি করেছেন । তাঁর চিত্রাঙ্গদা ও চন্ডালিকা নাটকে লোকজ আঙ্গিক এবং নারীচেতনার দেশজ স্বরূপ প্রকাশ পেয়েছে । এই নাটক দুটিতে সমাজের নারী, জাতপাত ও মূল্যবোধের জটিলতাকে শিল্পিত ও মানবিক রূপে উপস্থাপন করেছেন ।

রবীন্দ্রনাথের গদ্য ও পদ্যে বহুবার পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক শব্দ, ধ্বনি ও বাক্যবন্ধ ব্যবহৃত হয়েছে । যেমন সাজু, লাউ, চাষা, নাও, মাঝি, ডিঙি, পাল, খাল, বিল, ডাঙা, গাঙ, জোয়াল, তালগাছ ইত্যাদি শব্দ তাঁর রচনায় দেখা যায় । শিলাইদহে থাকাকালীন তাঁর ভ্রাতুস্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে লেখা পত্রসমূহ 'ছিন্নপত্রে' যেমন পূর্ববঙ্গের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের বর্ণনা রয়েছে তেমনি সেখানকার মানুষের মুখের ভাষা ও উচ্চারণের ছাপ স্পষ্ট । তার উদাহরণ, 'চাষার ভাষায়, মহারাজ ফসল ভালো হয় নাই, তবে আল্লার কৃপা হইলে বাঁচুম ।' এই জাতীয় সংলাপ তাঁর জীবন ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের উদাহরণ ।

তাঁর বিসর্জন, ডাকঘর, মালিনী নাটকে সহজিয়া ভাষাব্যবহারের ছাপ রয়েছে । সংলাপে গানে আঞ্চলিক শব্দ ও লোকজ ভাষাভঙ্গের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় । যেমন–রে !ওরে !হে দাদা ! বাপু তুমি না কেমন করো না রে ! তুই বড় গেঁয়ো জাতীয় শব্দ নাটকের চরিত্রদের সংলাপে ব্যবহৃত হয়েছে । 'চন্ডালিকা' নাটকের একটি সংলাপে দেখি–'তুমি তো জাতের লোক, আমি তো চন্ডালের মেয়ে ' জাতপাতের লোকজ দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব । 'মুকুট' নাটকে 'ওগো রে ! মুকুট যে মাথার উপর বসে সেই জানে ওটা কত ভারী ।' প্রবাদপ্রতিম বাক্যে একদিকে দার্শনিকতা আবার অন্যদিকে লোকজবোধের প্রকাশ ঘটে । নবান্ন, পৌষমেলা, নৌকাবাইচ, বারোয়ারি পুজো, এসবের বর্ণনা তাঁর ছিন্নপত্র ও প্রবন্ধ সমূহে রয়েছে । শান্তিনিকেতনের পৌষমেলার ধারণাও এসেছে পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ মেলা থেকে । রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী গড়ার পেছনেও এই গ্রামজীবনের শিক্ষা কাজ করেছে । 'যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন'– এই বোধ তিনি পদ্মারপাড় থেকেই পেয়েছিলেন । ভূত-প্রেত, পির, ফকির, ব্রতকথা এসব তিনি কুসংস্কার হিসেবে না দেখে মানুষের মনোজগতের অংশ হিসেবে ধরেছেন । কঙ্কাল, ক্ষুধিত পাষাণ গল্পে এর ছায়া রয়েছে ।

১৯০১ সালের পর রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ থেকে গিয়ে শান্তিনিকেতনে বসবাস করলেও পরবর্তী সময়ে বহুবার শিলাইদহ এসেছেন । এখান থেকেই তিনি সংগ্রহ করেছেন তাঁর সারাজীবনের সৃজনের সঞ্চয় । এ প্রসঙ্গে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ তাঁর 'পিতৃস্মৃতি' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন–'আমার ধারণা বাবার গদ্য ও পদ্য দু'রকম লেখারই উৎস যেমন খুলে গিয়েছিল শিলাইদহে, একদিনের জন্য কলম বন্ধ হয়নি । শিলাইদহের যে রূপবৈচিত্র তার মধ্যেই পেয়েছিলেন তিনি লেখার অনুকূল পরিবেশ ' । এই পূর্ববাংলার জল, মাটি, হাওয়া, নদী ও মানুষের মধ্যেই রবীন্দ্রমানসের, রবীন্দ্রমননের সূচনা হয় । রবীন্দ্রনাথের পরবর্তীজীবনে আঁকা চিত্রসম্ভারেও শিলাইদহ তথা পূর্ব বাংলার প্রভাব নিহিত ছিল । রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতরণি একদিন পূর্ববঙ্গেরই সোনার ধানে ভরে গিয়েছিল ।

Wednesday, April 22, 2026

ব্যাগার্তা > ব্যাহার্তা (আঞ্চলিক শব্দ)

ব্যাগার্তা > ব্যাহার্তা
মূল শব্দ : ব্যগ্রতা (ব্যাকুলতা)
সমার্থক শব্দ : অনুরোধ-উপরোধ/কাকুতি-মিনতি ।
 কোনো কিছু পাওয়ার জন্য বা করার জন্য প্রবল আকাঙ্ক্ষা বা অস্থিরতা প্রকাশকে বোঝায় । তবে কুমিল্লা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লৌকিক ব্যবহারে এই শব্দ পরিবর্তিত ও বিপরীত অর্থে ব্যবহার হচ্ছ । এখানে অর্থান্তর ঘটেছে ।

Friday, April 3, 2026

নাকা-চেকিং

নাকা-চেকিং
এটি একটি মিশ্র শব্দ । নাক থেকে নাকা (বাং) । চেকিং মানে পরীক্ষা করা (ইং) । সাধারণত গবাদিপশুকে বশে রাখার জন্যে তাদের নাকে দড়ির একধরনের ফাঁস লাগিয়ে দেওয়া হয়। এতে গতিবিধির রাশ টানা হয় । আবার সে ফসলাদিতে মুখ দিয়ে ফসলও নষ্ট করতে পারে না । নাকা চেকিংও এমন একটি পদ্ধতি যেখান লম্বা বাঁশের আগার দিকে লম্বা দড়ি বাঁধা হয় । গোড়ার দিকটায় ভারি বোঝা তুলে দিয়ে রাস্তার একপাশে আড়াআড়ি ঢেঁকির মত বেঁধে রাখা হয়।  গোড়ায় বোঝা থাকায় বাঁশের অগ্রভাগ ঢেঁকির মতো উপরে উঠে যেতে চায় । দড়ি ধরে টেনে নামিয়ে যান-বাহন পরীক্ষার জন্যে রাস্তা আটকে রাখা হয় । রাস্তায় আড়াআড়ি বাঁশের বাধা থাকায় যানবাহন অতিক্রম করতে পারে না । নির্ধারিত চেকিংয়ের পর দড়ির ফাঁস আলগা করে দিলে বাঁশের মাথা উপরে উঠে যায়। তখন যানবাহন পেরুতে পারে । গবাদিপশুর নাকে দড়ি বেঁধে রাশ টানার অনুরূপ এই পদ্ধতিকে নাক-চেকিং বলা হয় ।

Monday, March 30, 2026

লোকজীবন ও সাহিত্যে মাতৃ ভাবনা থেকে দেশ ভাবনা : জাতীয়তাবাদের উত্তরণ বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম

লোকজীবন ও সাহিত্যে মাতৃভাবনা থেকে দেশভাবনা : জাতীয়তাবাদের উত্তরণ বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দেমাতরম'

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

মানবসভ্যতার সৃষ্টিকাল থেকেই মাতৃকামূর্তি জীবনধারিনী, উর্বরতাকৃষ্টি ও পৃথিবীর প্রতীক হিসেবে মনুষ্য সমাজে মান্য হয়ে আসছেন । সেজন্যই প্রাচীন বিশ্বে মাতৃকা বা Mother Goddess এর মূর্তি মানবধর্ম ও সংস্কৃতির প্রধানতম প্রতীকগুলির অন্যতম । প্রাচীন প্রস্তরযুগ থেকে শুরু করে ভারতীয় উপমহাদেশে মাতৃকা আরাধনার প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায় । প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বিভিন্ন স্থানে মাটির বা পাথরের নারীমূর্তি পাওয়া গেছে । এই মূর্তিগুলি উর্বরতা ও মাতৃত্বের ভাবনা নির্দেশ করে । প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করেন, এগুলি গ্রামদেবী, ভূমিদেবী বা প্রাকশাক্ত আরাধনার আগের রূপ । তারপর পরবর্তীতে হরপ্পা সভ্যতায় শস্য উৎপাদনকারী পৃথিবীমাতার মূর্তি থেকে 'সপ্তমাতৃকা' ও ও 'মহিষাসুরমর্দিনী' দুর্গার মত দেবীরূপ ধারণ করে বিবর্তিত হতে দেখা গেছে । বৈদিক যুগে ঊষা, অদিতি, বিশ্বমাতা ও পরবর্তী যুগের ষোড়শ মাতৃকা, দুর্গা, অম্বা, প্রতিমাদেবী মাতৃকা সংস্কৃতির বিকশিত রূপ । আবার লোকায়ত দেবীরূপে গ্রামদেবী, শীতলা, মনসা এসবেতেই প্রাচীন মাতৃকাচিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে । পরবর্তীকালে যা হিন্দু ধর্মের শাক্ত ধারায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে ।

লোকসংস্কৃতি হল সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি । আদিম মানুষের জীবন, বিশ্বাস, আচার-আচরণ, শিল্পকলা ও বিনোদন থেকে সৃষ্ট সংস্কৃতি যা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতিনীতি, জীবনযাপন প্রণালী তাদের মুখে মুখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ে এবং লোকজীবনকে প্রতিফলিত করে । মাতৃভাবনা বা মাতৃতান্ত্রিকতা হল এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা যেখানে নারী বা মাতাকে কেন্দ্র করে সমাজ পরিচালিত হয় । লোকসংস্কৃতির নানা উপাদানে, যেমন লোকগীতি, লোককথা, প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা, মিথ,নাটক, গান, নৃত্য এবং প্রথাগত বিশ্বাসে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয় মাতৃভাবনা । লোকসংস্কৃতি ও মাতৃভাবনা পরস্পর গভীরভাবে সম্পৃক্ত । প্রাচীন সমাজে নারীর ভূমিকা প্রধান ছিল বলে তাকে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বলা হত । নারীর সামাজিক ভূমিকা, প্রজনন, খাদ্য সংগ্রহ, গৃহরক্ষা প্রভৃতি মাতৃতান্ত্রিক ধারণা সৃষ্টির দরুণ মাতৃভাবনা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে । তাছাড়া কৃষিনির্ভর সভ্যতায় পৃথিবীকে 'মা'-রূপে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও সমাজে মাতৃভাবনার সৃষ্টি হয়েছে । লোকজীবন  তো মাটিতে ঘিরেই কৃষিজ পণ্য উৎপাদনের  মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে । তাই লোকজীবনে মাটির প্রতি এক গভীর মায়া এবং মাটিকে মায়ের মত মনে করা হয়েছে । সেই থেকে সৃষ্ট মাতৃভাবনা মানুষের আদিচেতনা । লোকসঙ্গীতে দেখি–'মোর মা বলে, ধান রে সোনার ধান /তোর গন্ধে ভরা মন প্রাণ ।' লোকসংস্কৃতিতে মা মানে যিনি দুধ দেন, যিনি ফসল ফলান, যিনি নদীর জলে আশীর্বাদ দেন, আর যিনি বিপদে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখেন । গ্রাম বাংলার লোকজীবনে মা শুধু সংসারের নয়, প্রকৃতিরও প্রতিমূর্তি । তিনি ধানের দেবী লক্ষ্মী, পৃথিবীমাতা বা বসুমাতা, নদীমাতা, গঙ্গামাতা ও গোমাতা । এসব নিয়েই বাংলার লোকবিশ্বাস । মাতৃরূপে পুজিতা লোকমাতা ।

বাঙালির লোকজীবনে প্রবাহিত মাতৃকাকৃষ্টি বা মাতৃভাবনা বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন পর্যায়েও তার স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে । বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ । চর্যাপদের কবিতায় সরাসরি মাতৃভাবনার রূপ তেমন দেখা যায় না । কারণ এর মূল বিষয়বস্তু ছিল বৌদ্ধধর্মের আধ্যাত্মিক সাধনা ও গুহ্যতত্ত্ব । তবে চর্যার কিছু কিছু পদে পরোক্ষভাবে নারী ও জননীর প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়, যা সাধনা ও জীবনযাত্রা সম্পর্কিত । এখানে নারীরূপকে সাধনার প্রতিমূর্তি বা 'মাতৃআজ্ঞা' বা মাতৃধারণার মাধ্যমে সন্তান-জননী সম্পর্কে সাধনসঙ্গিনী হিসেবে ভক্তি-শ্রদ্ধার ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়েছে । এখানে জ্ঞানমুদ্রা অর্থে 'হরিণী' বা শবরী অর্থে 'দেবী নৈরাত্মাকে' বোঝানো হয়েছে । জীবন ও জীবিকার নানা ক্ষেত্রে নারীসত্ত্বা দৃঢ়তা, কর্তৃত্ববোধ, স্বাধীন চিন্তা ও মননের পরিচয় বহন করে । মেয়েরা এখানে প্রান্তিক সমাজের জনজীবন ও চেতনার অংশ । ২০ নং চর্যায় কুক্কুরীপাদ নারীর প্রসব যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করেছেন । প্রসবের সময় সন্তানের প্রাণ বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনায় মাতৃহৃদয়ের যন্ত্রণার ছবি এখানে ফুটে উঠেছে । 'পহিল বিয়াণ মোর বাসনয়ুড়া/ নাড়ি বিআরন্তে  সেব বায়ুড়া ।।/ জান জৌবন মোর ভইলেসি পুরা / মূল নখলি বাপ সংঘারা ।।/ ভনথি কুক্কুরীপা এ ভব থিরা ।/ জো এথু বুঝই সো হেথু বীরা ।। (চর্যা-২০)

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মাতৃভাবনার দৃষ্টান্ত মূলত, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি ও শাক্ত পদাবলিতে পাওয়া যায় । মনসামঙ্গলের দেবী মনসা ও বেহুলাকে নিয়ে মা-মায়ের সম্পর্ক, অন্নদামঙ্গলে দেবী অন্নপূর্ণা ও উমাকে কেন্দ্র করে মাতৃস্নেহ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও অন্যান্য পদাবলীতে যশোদা ও শ্রীরাধার মতো মাতৃপ্রতিম চরিত্রগুলির মাধ্যমে স্নেহ, মমতা ও ত্যাগের আদর্শ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যা তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক চিত্র তুলে ধরে । বৃন্দাবনদাসের চৈতন্য ভাগবত ও লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গলে শচীমাতার মাতৃত্ব, বাৎসল্য ও ত্যাগ বৈষ্ণব সাহিত্যে মাতৃ ভাবনার এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত । শচীমায়ের পুত্রকে নিয়ে উদ্বেগ, স্নেহ ও ভক্তি এখানে অতুলনীয় । কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতে শচীমাতা ও অন্যান্য মায়ের বর্ণনা বিশেষত পুত্র-মাতৃ সম্পর্ক ও ভক্তি প্রেমের ধারায় মাতৃভাবনার গভীরতা ফুটে উঠেছে ।

শাক্ত পদাবলীতে মাতৃভাবনা বলতে মূলত জগজ্জননী (দেবী দুর্গা) ও তাঁর লীলারূপের বর্ণনাকে বোঝানো হয়েছে । সেখানে মাকে একদিকে যেমন সর্বশক্তিমান ব্রহ্মময়ীরূপে দেখা যায় তেমনি বাৎসল্যরসের মাধ্যমে এক সাধারণ মাতৃস্নেহের প্রতিমূর্তি (যেমন মেনকা, উমা ) রূপেও চিত্রিত করা হয় ।  আগমনী ও বিজয়া পদের মূল বিষয়ও তাই যেখানে ভক্তের আকুতি, জগত ও জীবনের দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রার্থনা মিশে আছে । শক্তিসাধনা থেকে দেশপ্রেম ও শাক্তসাহিত্যের বিবর্তনের ধারাটিতে দেখা যায়, কিভাবে মাতৃশক্তির উপাসনা (শক্তি) থেকে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটেছে ।  রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের মত সাধক কবিগণ শ্যামাসঙ্গীত ও শাক্ত পদাবলির মাধ্যমে এই মাতৃভাবনাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যেখানে গীতার বর্ণিত জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির দর্শন ও সামাজিক চেতনার সমন্বয় ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তি স্থাপন করে । 'মা' বা 'মাতৃকা' ধারণার গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা শুধু দেবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাতৃভূমির ধারণায় প্রসারিত হয়েছে । শাক্ত পদাবলীর 'মা' বা 'মাতৃদেবী' (যেমন কালি বা দুর্গা)-র রূপটি ধীরে ধীরে দেশের প্রতীক হয়ে ওঠে । দেবীর পূজা ও সাধনা দেশের পূজা ও দেশপ্রেমের রূপ নেয় । শাক্তসাহিত্য ও শক্তিসাধনার এই লোকায়ত ধারা উনিশ শতকের নবজাগরণ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে বিরাট ভূমিকা রেখেছে যেখানে দেশমাতার পূজার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ জাগ্রত হয়ে দেশপ্রেমের গভীর চেতনায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং বাংলাসাহিত্য ও জাতীয়তাবাদের এক অবিচ্ছেদ অংশ হয়ে উঠেছে।

উনিশ শতকের নবজাগরণে সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে দেশপ্রেম ছিল এক প্রধান ধারা, যা ভারতীয় সমাজকে আত্মমর্যাদা ও জাতীয় চেতনার পথে চালিত করে । বাংলা কবিগান ও নবনাট্য আন্দোলন বিশেষত স্বদেশী যুগ থেকে দেশমাতৃকার বন্দনা বা দেশাত্মবোধক গান ও নাটকের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামকে তীব্রতা দিয়েছিল । কবিগান ছিল গ্রামীণ ও লোকায়ত ধারার গান । এই গানের মাধ্যমে দেশপ্রেমের বার্তা সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা হত । এই ধারায় দেশমাতৃকাকে মা-রূপে কল্পনা করে তার বন্দনার মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হত । কবিগানে 'মালসি গান' নামে এক বিশেষ বন্দনাগীতি পরিবেশন করা হত যার মাধ্যমে দেশমাতৃকাকে বন্দনার পাশাপাশি তার শৃংখলমুক্তির বার্তাটিও নিহিত থাকত । বাংলার নবনাট্য আন্দোলন স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসার ঘটায় । নাটকের মাধ্যমে দেশমাতৃকার বন্দনা, শোষণ ও বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা হত । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রমেশ চন্দ্র দত্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ  সাহিত্যিকগণ তাঁদের লেখায় স্বদেশ, স্বজাতীয় ভাষার প্রতি অনুরাগ ফুটিয়ে তোলেন । প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে এক নতুন জাতীয়তাবাদী ভাবধারা তৈরি করে এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিক আন্দোলনকে উদ্বুদ্ধ করে । রামমোহন থেকে শুরু করে পরবর্তী লেখকরা ভারতের ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতিকে নতুন আলোয় দেখতে শুরু করেন যা ছিল আত্মপরিচয়ের সন্ধান । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দের মতো ব্যক্তিত্বরা সমাজ সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণের মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশের মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করেন তেমনি ধর্মীয় ও সামাজিক গোড়ামি দূর করে সামগ্রিক উন্নয়নের পথ দেখান যা পরোক্ষভাবে দেশপ্রেমের জন্ম দেয় ।শিবাজী, রানা প্রতাপ এর মত ঐতিহাসিক চরিত্রদের নিয়ে রচনায় দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা যোগানো হয় । চিত্রকলায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা গানে রজনীকান্ত সেনের মতো শিল্পীদের কাজও দেশীয় ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলে দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটানো হয় । বাংলাভাষাকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়কে দৃঢ় করা হয় । বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরানীর মতো উপন্যাস কেবল সাহিত্য হয়ে থাকেনি । এগুলি লক্ষ লক্ষ ভারতবাসীকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছিল এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আদর্শগত ভিত্তি স্থাপন করেছিল ।

উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন একজন বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব যাকে জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু পুনর্জাগরণের বা নবজাগরণের অন্যতম দূত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় । তাঁর লেখনীতে ধর্ম ও জাতীয়তাবোধ ছিল দেশপ্রেম ও শক্তিসাধনার এক অনন্য মিশ্রণ ।  জাতীয়তাবাদ শুধু রাজনৈতিক আন্দোলন নয় । তাকে ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তির উপর তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তিনি দেশকে মাতৃভূমিরূপে কল্পনা করে 'বন্দেমাতরম' স্লোগানকে জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন । তাঁর আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরানী উপন্যাসের মাধ্যমে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে স্বদেশপ্রেমের ধারণার উন্মেষ ঘটে এবং তা পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে । বঙ্কিমচন্দ্র দেশকে শুধু একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড হিসেবে দেখেননি । তাঁর আনন্দমঠে মাতৃভূমি দেবীরূপে পূজিত হয়েছেন । এখানে দেশকে এক জীবন্ত দেবী 'মা' রূপে ব্যক্ত করা হয়েছে । আর সন্ন্যাসীগণ হলেন তাঁর সন্তান। সন্তানের কাছে যেমন মা দেবীরূপে পূজ্য তেমনি সন্ন্যাসী বিদ্রোহে ব্রতী বিদ্রোহীদের কাছে দেশমাতৃকাও সমান পূজ্য । এই উপন্যাসের ভবানন্দের কথায় আমরা পাই,–
       'আমরা অন্য মা মানি না–জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী । আমরা বলি জন্মভূমিই জননী । আমাদের মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, বন্ধু নাই,– স্ত্রী নাই, পুত্র নাই, ঘর নাই, বাড়ী নাই, আমাদের কাছে আছে কেবল সেই সুজলা, সুফলা, মলয়জসমীরণশীতলা, শস্য শ্যামলা ।'
–এই ধারণাই 'বন্দেমাতরম' এর মূল ভিত্তি যা দেশকে পূজা করার ডাক দেয় । ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ও সামরিক রূপের বিপরীতে বঙ্কিমের জাতীয়তাবাদ ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার গভীরে প্রোথিত । তিনি মাতৃভূমির পূজা করার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয়চেতনার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমকে একীভূত করেছেন । তিনি অনুশীলন সমিতির মতো সংগঠনকে প্রভাবিত করে কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং রজোগুণ-র অনুশীলনের মাধ্যমে জাতিকে শক্তিশালী ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আহ্বান জানান । 'আনন্দমঠ' উপন্যাস ও 'বন্দেমাতরম' সংগীত ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশে তাঁর সবচেয়ে বড়ো অবদান । সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে লেখা এই উপন্যাস আনন্দমঠে বঙ্কিমচন্দ্র দেশপ্রেম ও ধর্মকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন । ফলে দেশপ্রেম এক আধ্যাত্মিক ভিত্তি ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় । 'বন্দেমাতরম' কেবল একটি স্লোগান ছিল না । এটি ছিল একটি মন্ত্র যা দেশবাসীকে মাতৃভূমির প্রতি ভক্তি ও দেশপ্রেমের এক নতুন চেতনায় দীক্ষিত করে এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবীদের প্রেরণা জুগিয়েছিল । এই গানটি একটি কবিতামাত্র নয় । এটি ভারতমাতার স্বরূপ বর্ণনার মাধ্যমে দেশকে মা দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী ও অন্যান্য দেবীর রূপক দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে যা ভারতের সমৃদ্ধি সৌন্দর্য ও শক্তির প্রতীক । দেশমাতৃকার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে মায়ের বিভিন্ন রূপের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে । 

বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে তাঁর অমর সৃষ্টি যে 'বন্দেমাতরম' ধ্বনিত হয়েছিল তা ছিল দেশ মাতৃকার প্রতি গভীর ভক্তি ও জাতীয়তাবাদী চেতনার এক মহামন্ত্র । বন্দে মাতরম স্তোত্র আজও প্রতিটি দেশবাসীর হৃদয়ে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের স্পৃহা জাগিয়ে তোলে । এই মহামন্ত্র ভারতের সকল মানুষের মধ্যে জাতীয় গর্ব ও ঐক্যের অনুভূতি তৈরি করেছে যারা সাহিত্য ও ইতিহাস পেরিয়ে জাতীয় পরিচয় এর চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছে ।

কিংবদন্তী ও স্থাননামে পিলাক প্রসঙ্গ

কিংবদন্তী ও স্থাননামে পিলাক প্রসঙ্গ 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

দক্ষিণ ত্রিপুরার জোলাইবাড়ি সন্নিহিত প্রত্নভূমি পিলাক । এই পিলাকের বুকে অসংখ্য গণপতি, বিষ্ণু, সূর্য, শিব ও শক্তি মূর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে । মনে হয় যেন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিংবা বিরুদ্ধচারী কারো হাতে এগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে । দীর্ঘদিন এগুলো লোকচক্ষুর গোচরে আসেনি । ত্রিপুরার রাজন্যইতিহাসের আধার রাজমালা ও এ বিষয়ে নিশ্চুপ । পরবর্তী সময়ে সমরেন্দ্র চন্দ্র দেববর্মা, প্রিয়ব্রত ভট্টাচার্য, দীপক ভট্টাচার্য, ড. রঞ্জিত দে, আশীষ কুমার বৈদ্য প্রমুখ লেখকদের লিখিত গ্রন্থসমূহে ও অন্যান্য কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন রচনায় এর উপর কিছুটা আলোকপাত হয় । বিস্তৃত গবেষণামূলক কাজ এখনো শুরু হয়নি । আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বর্তমানে এই এলাকায় কিছু খোঁড়াখুড়ি করে বেশ কিছু পরিমাণে প্রাচীন মূর্তি ও টেরাকোটার কাজ ইত্যাদি উদ্ধার করেছেন । বহু আগে থেকেই এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পিলাকের বহু মূর্তিই ইতোমধ্যে উধাও হয়ে গেছে । এখনো অনেক মূর্তি বেওয়ারিশভাবে সারা এলাকার এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । অথচ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে এই মূর্তিসমূহের মূল্য কি অসীম !

একথা অনস্বীকার্য যে, পিলাককে কেন্দ্র করে এখানে প্রাচীন সমৃদ্ধ জনপদ ছিল যার প্রাচীনতা এখানকার প্রাপ্ত মূর্তিসমূহেই প্রমাণিত হয় । বৌদ্ধ নিদর্শনসহ হিন্দু ধর্মধারার বিভিন্ন রূপ বিবর্তনের প্রভাব এই ভাস্কর্যসমূহে রয়েছে । সৌর,গণপত্য, বৈষ্ণব শৈব ও শাক্তধারার সঙ্গে বৌদ্ধসংস্কৃতির সমন্বয়ে সৃষ্ট এক মিশ্রসংস্কৃতির নিদর্শন এই পিলাক  সংস্কৃতি । মূলত প্রত্নভূমি পিলাকের ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণ ও এই মিশ্রসংস্কৃতিকে পুষ্ট করতে সহায়তা করেছে । একদিকে বিশাল বঙ্গ সমতট, অন্যদিকে আরাকান, বার্মার সঙ্গে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে যোগাযোগ এখানকার সংস্কৃতিতে ছাপ ফেলেছে ।

পিলাকের ইতিহাস এবং প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয় এ প্রবন্ধের উপজীব্য নয় । এ দুটোই বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে সঠিক তথ্য উদঘাটনে সহায়তা করে । এছাড়াও লোকসংস্কৃতিকেন্দ্রিক কিছু কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে অনেক ঐতিহাসিক উপাদান লুকিয়ে থাকে । সেকারণে লোকসাংস্কৃতিক বিষয়াবলিও অনেক সময় লুপ্ত ইতিহাসকে উদঘাটনে সহায়তা করে । কোন স্থানের প্রাচীন ইতিহাসগত তথ্য আহরণের ক্ষেত্রে সেখানে বসবাসকারী প্রাচীন কোনো অধিবাসীদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিংবদন্তী, পুরাকথা লোককাহিনি, স্থানের নামবিবর্তন, ইত্যাদিকেও অনুষঙ্গ করে অগ্রসর হতে হয় ।

বর্তমান প্রবন্ধে এধরনের সামান্য কিছু লোকসাংস্কৃতিক বিষয়কে আধার করে পিলাকসংস্কৃতির উপর কিঞ্চিৎ আলোকপাতের চেষ্টা করা হচ্ছে । এ অঞ্চলে যে প্রাচীন জনগোষ্ঠী বসবাস করেন তাদের অধিকাংশই স্থানীয়ভাবে 'মগ' নামে পরিচিত । আমাদের প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে 'মগ' নামে একদল ভয়ংকর জলদস্যুর উল্লেখ আছে ।  যারা আরাকান প্রদেশ থেকে বাংলাদেশের সমুদ্র ও নদীতীরবর্তী জনপদ সমূহে অত্যাচার লুণ্ঠন ইত্যাদি কার্য চালিয়ে কুখ্যাত হয়ে আছে । কিন্তু এখানে যাদের 'মগ' বলে অভিহিত করা হয় তাঁরা কিন্তু এ ধরনের ঐতিহাসিক সত্যকেও নস্যাৎ করেন এবং তারা নিজেদেরকে 'মগ' নামে পরিচয় দিতেও অস্বীকার করেন । প্রসঙ্গত, এখানে একটি সত্যি কথা উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ ত্রিপুরা ও ত্রিপুরার অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী যে জনজাতিকে আমরা 'মগ' নামে চিহ্নিত করি তাঁদের মধ্যে ইতিহাসকথিত মগ জলদস্যদের মতো কোনো হিংস্রতার লক্ষণই দেখা যায় না । বরঞ্চ ভগবান তথাগত বুদ্ধের শান্তি, মৈত্রী ও করুণার মন্ত্র দীক্ষিত হয়ে তাঁরা অত্যন্ত সরল সাদাসিধে এবং নিরীহ জীবনযাত্রা অতিবাহিত করেন । এই জনজাতিগোষ্ঠী যেখানেই বাস করছেন সেখানেই বাঙালিসহ অন্য আরো কয়েকটি জনজাতি গোষ্ঠীর লোকও পাশাপাশি বাস করতে আজও দেখা যাচ্ছে ।  বিভিন্ন জনজাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি অবস্থানের এই ইতিহাস ত্রিপুরাতে ঐতিহ্যগতভাবেই প্রাচীন । সম্ভবত আরাকানি জলদস্যদের সঙ্গে দৈহিক সাযুজ্য লক্ষ্য করেই এই জনজাতীয় গোষ্ঠীকে সমতলঅংশের জনগোষ্ঠী 'মগ' বলে অভিহিত করে গুলিয়ে ফেলেছেন অথবা এই জনগোষ্ঠীর লোকেরাও আরাকান থেকে এসেছেন বলে মগ জলদস্যদের সঙ্গে এদের ভাষাগত সামঞ্জস্য থাকার কারণে ও তাদের 'মগ' বলে অভিহিত করা হয়ে থাকতে পারে ।

স্থানীয়ভাবে যাদের 'মগ' বলা হয় তাঁরা নিজেদের আরাকানি বলে পরিচয় দিতে বেশি গর্ববোধ করেন । এই আরাকানিদের বিভিন্ন গোত্র আছে । তাঁদের মধ্যে মূল আরাকানে যারা বাস করেন তাঁরা নিজেদেরকে রখইঙসা বা রখইঁসা বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন । এই রখইঙ থেকে রখইঁ > রখঙ > রাহাঙ > রোসাঙ ও রোহাঙ শব্দের উৎপত্তি । আরাকানের প্রাচীন রাজবংশের নাম রোসাঙ তো বাংলাসাহিত্যের ছাত্রমাত্রই জানেন । এছাড়া তাদের আরেকটি গোত্রের নাম খিয়ঙসা বা খ্যঙসা । খিয়ঙ বা খ্যঙ  শব্দের অর্থ হল নদী এবং সা শব্দের অর্থ সন্তান । অর্থাৎ এই গোত্রের লোকেরা হলেন নদীতীরবাসী । এরকম তাঁরা বিভিন্ন পর্বত নদী ইত্যাদির নাম নামে তাঁদের গোত্রের নাম রাখেন । এই গোত্র সমূহের মধ্যে প্লেঙসা, ক্যেয়ফিয়াসা, রেঙব্রিসা, প্লেঙয়িঁসা ইত্যাদি আরো অনেক গোত্রের নাম পাওয়া যায় । পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে এই জনগোষ্ঠীর লোকেরা বহু প্রাচীনকাল থেকে বসবাস করে আসছেন । পূর্বকথিত মগজলদস্যুদের সঙ্গে এদের এক করে না দেখলে তাদের রাজ্যের আগমন আরো প্রাচীন । একটি ঐতিহাসিক মত থেকে জানা যায় যে প্রাচীন চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরার চন্দ্রবংশীয় রাজারা আরাকানের চেন্দ্রা রাজবংশের সঙ্গে সম্পর্কিত । ১৯৫৪ সালে কুমিল্লার চারপত্রমুড়াতে চন্দ্ররাজাদের তিনটি তাম্রশাসন পাওয়া যায় । তা থেকে চন্দ্রবংশীয় নৃপতিদের পরিচয়ও জানা যায় এ বংশের সাতজন নৃপতি দশম শতক থেকে  একাদশ শতক পর্যন্ত সমতটে রাজত্ব করে গেছেন । তাঁদেরই কোনো গোষ্ঠী ত্রিপুরারাজ্যের দক্ষিণপ্রান্তে তাদের রাজ্যপাট বিস্তার করেও থাকতে পারেন । সাব্রুম ও বিলোনিয়া মহকুমার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বহু প্রাচীনকাল থেকেই এই জাতি গোষ্ঠীর বাস । অনেক প্রাচীন জনপদ তাঁদের হাতেই গড়ে উঠেছে আবার অনেক জনপদ থেকে তাঁরা সরে গিয়ে সেই জনপদকে শূন্য করে দিয়েছেন বা সেইস্থান নতুন জনগোষ্ঠীর আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে । 

সাব্রুম মহকুমা ও তৎসন্নিহিত জোলাইবাড়ি, বাইখোরা ইত্যাদি অঞ্চলে আলোচ্য জনগোষ্ঠীর যে গোত্রের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, জানা গেছে তারা প্লেঙসা গোত্রের । এছাড়া বিলোনিয়া অঞ্চলে যাঁরা আছেন তাঁরা খিয়ঙসা  বা খ্যঙসা গোত্রের এবং বীরচন্দ্র মনু ও তৎসম্নিহিত অঞ্চলে ক্যেয়ফিয়াসা গোত্রের লোকেরা বাস করেন বলে জানা গেছে । এক সময়ে পিলাক অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় মগদের বসবাস ছিল  প্লেঙসা গোত্রভুক্ত মগ রাজাদের রাজধানী ছিল বলেও তাদের মধ্যে কিংবদন্তি আছে । নদীর সঙ্গে বা পাহাড়ের সঙ্গে যেমন এই জনগোষ্ঠীর গোত্রসম্বন্ধ আছে তেমনি এই জনগোষ্ঠীর অধ্যুষিত জনপদের ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের দিকে লক্ষ্য করলেও এই বিষয়ের মধ্যে একটি সুক্ষ্ম সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় । সাব্রুম-বিলোনিয়ার মনুবনকুল, ছোটখিল, দৌলবাড়ি, বৈষ্ণবপুর, পিলাক, দেবদারু, জোলাইবাড়ি, বাইখোরা, লাউগাঙ, বীরচন্দ্র মনু এমনকি লংথরাইভ্যালির কুলাই, আমবাসা, বলরাম প্রভৃতি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাদের ব্যাপক বসবাস লক্ষ্য করা যায় । এইসব অঞ্চলের প্রাকৃতিক গঠন সর্বত্রই সুউচ্চ পাহাড়বেষ্টিত উপত্যকার ন্যায় । এই উপত্যকার মধ্য দিয়ে অবশ্যই একটি বা একাধিক জলধারা প্রবাহমান আছে । ত্রিপুরার প্রায় প্রতিটি মগ অধ্যুষিত পল্লীতে এই সাদৃশ্য চোখে পড়ে । সেই হিসেবে তাদের বাসস্থান বেছে নেওয়ার যে লৌকিক সংস্কার তার সঙ্গে তাদের গোত্রসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায় । এই তথ্যটি থেকে এমন একটি সিদ্ধান্তে আসা যায় যে পিলাক অঞ্চল সুপ্রাচীনকাল থেকেই বিস্তীর্ণ মগ অধ্যুষিত জনপথ ছিল । কারণ পিলাকও চারিদিকে সুউচ্চ পাহাড়বেষ্টিত বিশাল সমতল উপত্যকাভূমি । তাহলে তাদের কিংবদন্তির কিছুটা স্বাক্ষর এখানে পাওয়া যায় ।

পিলাক অঞ্চলের যেসব মুর্তি পাওয়া যায় সেগুলো নাকি 'প্লেঙসা' রাজা করিয়েছেন । এসম্বন্ধে একটি প্রাচীন উপকথা এই গোত্রের মানুষদের কাছে থেকে পাওয়া গেছে । 'প্লেঙ' রাজা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী । তিনি যে সময়ে রাজত্ব করতেন তখন পার্শ্ববর্তী সমতল এলাকায় বিভিন্ন বৌদ্ধধর্মকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল । বাংলাদেশের 'কোলা' রাজাও তাঁর পূর্ববর্তী রাজাদের অনুকরণে বিভিন্ন স্থানে বহু মূর্তি নির্মাণ করেন এবং বৌদ্ধবিহার স্থাপন করেন । প্লেঙরাজা তীর্থ ভ্রমণ থেকে ঘুরে এসে নিজের রাজ্যেও মূর্তিস্থাপন এবং বৌদ্ধবিহার নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন । তিনি জেনে এসেছেন যে কোলারাজ্যে এ বিষয়ে দক্ষ শিল্পী আছে । তিনি কোলা রাজ্যের কাছে মহার্ঘ শ্বেতহস্তী ভেট পাঠিয়ে তাঁর আর্জি পেশ করলেন । তখন কোলারাজ তার রাজ্যের দক্ষ একজন তরুণ ভাস্করকে প্লেঙরাজের রাজ্যে পাঠিয়ে দিলেন। ভাস্কর এসে রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাঁর নির্দেশমতো বিভিন্ন দেবদেবী ও বুদ্ধের বিশাল বিশাল মূর্তি নির্মাণ করতে আরম্ভ করলেন । খেয়ালি রাজা তো নির্দেশ দিয়েই খালাস । তিনি আর খোঁজ নেওয়ারও সময় পেলেন না তরুণ ভাস্কর মূর্তি তৈরি করছে কিনা । একবছর ধরে টানা পরিশ্রম করে ভাস্কর বিশাল মূর্তির ভান্ডার গড়ে তুললেন । সমস্ত মাঠ জুড়ে মুর্তি জড়ো হয়ে গেল । অথচ মূর্তিগুলো কোথাও স্থাপনের ব্যবস্থা হচ্ছে না ।

এদিকে ঘটল আরেক ঘটনা । প্লেঙ রাজার তরুণী কন্যা একদিন ভ্রমণে বের হয়ে মাঠের মধ্যে এই বিশাল পরিমাণ মূর্তি দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন । তিনি দেখতে চাইলেন ভাস্করকে । তাঁর সঙ্গিনী সখীর সঙ্গে তিনি গেলেন যেখানে ভাস্কর ধ্যানমগ্ন হয়ে পাথরের বুকে খোদাই করে চলেছেন অপূর্ব সব মূর্তি । রাজকন্যা ভাস্করের শিল্প সুষমা দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন । প্রাথমিক পরিচয়ের পর রাজকন্যা আবদার করে বসলেন ভাস্করের কাছে,  তাঁর মূর্তি যেন গড়ে দেন ভাস্কর । কাজের ফাঁকেই ভাস্কর চোখ তুলে চাইলেন । তাঁর হাতের ছেনি যেন কেঁপে উঠল !  ভাবছেন তিনি পারবেন কি এই অগ্নিপ্রতিমার প্রতিকৃতি গড়তে ! তিনি নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন রাজকন্যার দিকে । রাজকন্যা বোধহয় লজ্জিতা হলেন । চোখ নামিয়ে নিলেন ভাস্করের চোখ থেকে । তাহলে আমার প্রতিকৃতি গড়বেন না, ভাস্কর ? রাজকন্যা প্রশ্ন করলেন । সম্বিত ফিরে পেয়ে ভাস্কর চোখ নামিয়ে নিলেন । জবাব দিলেন, পারব না কেন, পারব । তবে প্রতিদিন যে আপনাকে এখানে আসতে হবে । আমার কাজের সময় সামনে এসে দাঁড়াতে হবে আপনাকে ।  আপনাকে দেখে দেখে আমি পাথরে খোদাইর কাজ করব । অনেকদিনের পরিশ্রম । সে সময় কি আপনার হবে ? রাজকন্যা বললেন, কি হয়েছে তাতে ।  আমি তো প্রতিদিনই বৈকালিক ভ্রমণে বের হই । সেই সময়টা না হয় আপনার এখানেই কাটাব । রাজি হয়ে গেলেন শিল্পী ।

তারপর শুরু হল প্রতিদিন বিকেলে রাজকন্যার শিল্পীর কাছে আসা । শিল্পীও রাজকন্যার চরণদ্বয় থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বাঙ্গের অনুকরণে পাথরের বুকে ছাপ ফেলতে শুরু করেন । রাজকন্যার নিরাভরণ অঙ্গসৌষ্ঠব ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে আর শিল্পী করে চলেছেন খোদাইকর্ম । ইদানিং শিল্পী এই প্রতিকৃতির দিকেই যেন বেশি নজর দিচ্ছেন । দিনের সারাসময় আর কোনো কাজ করছেন না । যতটুকু কাজ এগোয় সেই নিরাভরণ নগ্ন প্রতিকৃতির দিকে অপলক তাকিয়ে কি যেন ভাবেন শিল্পী ! চঞ্চল হয়ে ওঠে তাঁর মনটা, কখন দিন গড়িয়ে বিকেল হবে । রাজকন্যার মনেও চলে তোলপাড়। শিল্পীর সামনে দাঁড়ানো যেন তাঁর একটা নেশায় পরিণত হয়েছে । বিভিন্ন বিভঙ্গে দাঁড়ানোর জন্য শিল্পী যখন তাঁর অঙ্গ স্পর্শ করেন তখন এক অনাস্বাদিত শিহরণ অনুভব করেন রাজকন্যা ।

সেদিনও এসে দাঁড়িয়েছেন রাজকন্যা শিল্পীর সামনে । অত্যন্ত সূক্ষ্ম তন্তুজালে প্রস্তুত তার পোশাকে দেহের সৌন্দর্য প্রকটিত । শিল্পী কাছে এসে দাঁড়ান । যেন বাঁধভাঙা জ্যোৎস্না নেমে এসেছে মাটিতে । শিল্পী ভাবছেন তিনি কি ফুটিয়ে তুলতে পারবেন এই সৌন্দর্য ? তবুও শিল্পী প্রতিদিনের মতো রাজকন্যাকে স্পর্শ করে শৈল্পিকভাবে স্থাপন করছেন তাঁর বাহুযুগল, গ্রীবাদেশ । রাজকন্যার শরীরে যেন কেমন কম্পন অনুভূত হচ্ছে । স্বেদবিন্দু ফুটে উঠেছে  কপালে । পয়োধর ছোটো পাখির শরীরের মতো তিরতির করছে । মুহূর্তের রাজকন্যা বলে উঠলেন, আহ্, শিল্পী !  আপনার কি অসুবিধে হচ্ছে আমার পোশাকে ? এই আমি সরিয়ে নিলুম পোষাক । রোজ রোজ একটু একটু করে উন্মোচন করার চাইতে আমার সম্পূর্ণ সৌন্দর্যকে আপনি যথেচ্ছ ব্যবহার করুন । সমুদ্রের ঢেউ তুলে সৌন্দর্য যেন আছে পড়ল শিল্পীর সামনে । শিল্পী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না । এক জীবন্ত শিল্পসত্তায় পরিণত হল দুটো শরীর ।

এভাবে শিল্পকর্মের ফাঁকে ফাঁকে আদিম শিল্পকলায় মত্ত হল দুটি মন । তারা পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলল । এদিকে অন্যান্য মূর্তির পাশাপাশি রাজকন্যার নগ্ন প্রতিকৃতিও তৈরি করে ফেললেন শিল্পী । শুধুমাত্র মুখের অংশটি প্রস্তুত করা বাকি । এরই মধ্যে একদিন রাজার মনে পড়ল মূর্তি তৈরির ফরমায়েশের কথা । ভাস্করের কথা । তিনি ছুটে গেলেন পারিষদসহ ভাস্করের কাছে । সারা মাঠময় ভাস্কর্যের নিদর্শনরাশি দেখে তিনি অভিভূত হয়ে গেলেন । কিন্তু এতসব দেবদেবীর প্রতিমার মাঝখানে শিল্পীর গৃহে এক নগ্ন নারী মূর্তি দেখে রাজা বিস্মিত হয়ে গেলেন । রাজা জানতে চাইলেন এর কারণ । শিল্পী বললেন, তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে অবসর সময়ে এই কাজ করেছেন । রাজা নিতে চাইলেন এই প্রতিকৃতিটি । বললেন প্রতিকৃতির মুখ সম্পূর্ণ করার পর যেন এটি তাঁর প্রাসাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শিল্পী ইতস্তত করছেন । রাজা ভাবলেন শিল্পী হয়তো এর জন্য আলাদা পারিশ্রমিক চাইছেন । রাজা তাও দিতে চাইলেন ।  শিল্পী জানালেন, না মহারাজ, তা নয় । এতে আপনার অমঙ্গল হবে । এই প্রতিকৃতি আপনি নেবেন না । রাজা বললেন সে দেখা যাবে । তিনি প্রস্থান করলেন ।

এদিকে রাজঅন্তঃপুরে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে । রাজকন্যা অন্তঃস্বত্ত্বা হয়েছেন । কুমারী অবস্থায় অন্তঃস্বত্ত্বা  ? সাংঘাতিক ব্যাপার ! রাজপরিবারের মান-সম্মান যায় । কথাটা মহারানীর কান হয়ে রাজার কানেও এসে পৌঁছেছে । রাজা তাঁর অনুচরদের নির্দেশ দিলেন এর উৎস সন্ধানের । কারণ রাজকন্যাকে জিজ্ঞেস করে কোন সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না ।

এরই মধ্যে শিল্পীর বিদায়ের সময় এল। দীর্ঘদিন তিনি প্রবাসে কাটিয়েছেন । ঘরে ফেরার জন্য মন কেঁদে উঠছে অথচ রাজকন্যার কথা ভাবলে তিনি নিজেকে সামলে রাখতে পারেন না । রাজকন্যাও এখন আর নিয়মিত আসতে পারেন না । লোকচক্ষুর আড়ালে মাঝেমধ্যে তাদের দেখাসাক্ষাৎ হয় । তাঁদের গোপন প্রণয়ের কথা এখনও কেউ না জানলেও রাজকন্যা যে মা হতে চলেছেন তা নিয়ে রাজ্য জুড়ে তোলপাড় চলছে । রাজকন্যা সে সংবাদ দিতেও ভুলেন না শিল্পীকে ।

রাজা একদিন শিল্পীর কাছে লোকজন পাঠালেন এই নগ্নিকা মূর্তিটি রাজসভায় উপস্থিত করার জন্য । রাজাদেশ । কি আর করা যাবে । বাধ্য হয়ে শিল্পী মূর্তিটি পাঠালেন রাজসভায় । তবে তিনি মূর্তির মুখটি ভালো করে ঢেকে দিলেন । রাজসভায় আনার পর মূর্তিটির গঠনশৈলী নিয়ে রাজসভার বিদগ্ধ মহলে উচ্চ প্রশংসার ঝড় বয়ে গেল । সকলের অনুরোধে রাজা স্বয়ং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিকৃতির মুখের আবরণ উন্মোচন করলেন । মুহূর্তের সমস্ত রাজ্যসভা চিৎকার করে উঠল, এ যে আমাদের রাজকন্যা ! অসম্ভব ক্রোধে লজ্জায় ঘৃণায় রাজা মুখ ঢাকলেন । চিৎকার করে উঠলেন, সরিয়ে নাও এটাকে ।

রাজা ও রাজসভার বুঝতে বাকি রইল না রাজকন্যার অন্তঃস্বত্ত্বা হওয়ার অন্তরালের কাহিনি । রাজা বিচারসভায় বসলেন রাজ্যের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে । তাঁদের বিচারে ভিনদেশী শিল্পী দোষী সাব্যস্ত হলেন । তাঁদের সমাজের নিয়ম অন্য জনগোষ্ঠীর মানুষের দ্বারা তাদের নারীর ইজ্জত লুণ্ঠিত হলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড । শাস্তির ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দিল । এই তরুণ এখন যে তাঁদের অতিথি । তাঁরা বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত । অতিথিকে আরাধ্য দেবতা জ্ঞান করেন । তা বলে অতিথির অন্যায় তো সহ্য করা যায় না । কেউ কেউ আপত্তি তুললেন । ফলে সিদ্ধান্ত হল, মৃত্যুদণ্ড নয় । শিল্পীর দুটো হাত কেটে দেওয়া হবে । যাতে তিনি জীবনে আর ওই শিল্পকর্ম করতে না পারেন । রাজকন্যা আড়াল থেকে সব শুনলেন । তিনি ছুটে গেলেন শিল্পীর কাছে বললেন, তুমি পালাও, শিল্পী ! শিল্পী অনিচ্ছা প্রকাশ করলেন । বললেন, না আমি যাব না তোমাকে ফেলে । যা হবার হোক । তাছাড়া আমাদের অনাগত সন্তানের কথা মনে করেও আমি কোথাও যাব না । রাজকন্যা জানালেন, আমার জন্য তুমি এমন করে বিপদ ডেকে এনো না । তোমার শিল্পীজীবন শেষ করে দিও না । তুমি চলে যাও তুমি শিল্পচর্চা করো । জগত তোমার শিল্পের প্রশংসা করুক । তোমার শিল্পের মধ্যেই আমরা বেঁচে থাকব ।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও চোখের জলে বিদায় নিলেন শিল্পী । অজানা অচেনা পথে বেরুলেন । লএদিকে রাজার লোক নির্দিষ্ট জায়গায় শিল্পীকে না পেয়ে খুঁজতে বেরুলো চারিদিকে । সমস্ত সীমান্তপথ বন্ধ করে দেয়া হল । পথ ভুলে যাওয়ায় শিল্পীকে ধরে ফেলল রাজার লোকেরা । তারা হাজির করল তাকে বিচারসভায় । সংবাদ পেয়ে রাজকন্যা ছুটে এলেন রাজসভায় । কাতর প্রার্থনা জানালেন শিল্পীকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য । কিন্তু কেউ তাঁর কথা শুনলেন না । দুটো হাত কেটে শিল্পীকে বের করে দেওয়া হল রাজ্য থেকে ।

এদিকে শিল্পী কোলারাজ্যে ফিরে গেলে শিল্পীর এই দশা দেখে কোলারাজ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন । তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করলেন প্লেঙরাজার বিরুদ্ধে । ভয় পেয়ে প্লেঙরাজা তাঁর সমস্ত প্রজাদের নিয়ে প্লেঙনদীর উজানে গভীর অরণ্যে আশ্রয় নিলেন । কোলারাজার সৈন্যবাহিনী এই রাজ্যে এসে কাউকে দেখতে না পেয়ে সবকিছু ভাঙচুর লণ্ডভণ্ড করতে লাগল । ভেঙে ফেলা হল শিল্পীর গড়া মূর্তিসমূহও । সারা রাজ্যজুড়ে তারা তাণ্ডব চালিয়ে যেতে লাগল ।

এদিকে প্লেঙ রাজাও বসেছিলেন না । তাঁরা পালিয়ে গিয়ে নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে রেখেছিলেন । কোলারাজার লোকজন যখন তাঁদের রাজ্যজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছেন তখন প্লেঙ রাজা হঠাৎ করে নদীর বাঁধ কেটে দিলেন । জলের তোড়ে সমস্ত জনপদ ভেসে গেল । ভেসে গেল কোলারাজের সৈন্যসামন্ত । পাহাড় থেকে পলি এসে ঢেকে ফেলল সমস্ত জনপদ । আর কথিত আছে প্লেঙ রাজার সঙ্গে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া তাঁর কন্যাটিও একদিন সুযোগ বুঝে সেই বাঁধভাঙা জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবিসর্জন করেন ।

এই অশ্রুসজল প্রণয়কাহিনি এখনো কোন কোন বয়োবৃদ্ধ মগরমণী এক বিশেষধরনের করুণ সুর করে গেয়ে থাকেন । আজকের তরুণতরুণীরা অনেকেই এই কাহিনি জানেন না । ধীরে ধীরে হয়তো লুপ্ত হয়ে যাবে তাদের লোকসংস্কৃতির ভান্ডার । কারণ মগ জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে সংরক্ষণের কোনোরকমের প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত নেই ।

যদিও এটি একটি লোককাহিনি তবুও এ কাহিনি থেকে একটি ঐতিহাসিক সূত্র খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে । প্রথমত, এ অঞ্চলের যে 'পিলাক' নাম তার একটি সূত্র এখান থেকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে । এখানে যে গোত্রের রাজারা বসবাস করতেন তারা 'প্লেঙসা' নামে পরিচিত । এই প্লেঙসা শব্দটির বিবর্তিত রূপ প্লেঙ>প্লেক>পেলেক>পেলাক>পিলাক নামে পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে । নদীটির নামও হয়তো 'প্লেঙ' ছিল যা বর্তমানে পিলাকছড়া নামে পরিচিত । এই নদী হয়তো একসময় প্রবল স্রোতস্বিনী ছিল । কালক্রমে ভূবিবর্তনের ফলে হয়তো তা প্রসারতা ও গতি হারিয়েছে ।

'পিলাক' নামটি যে মগ শব্দ সে বিষয়ে আর সন্দেহের কোন অবকাশ থাকে না । তাছাড়া এই অঞ্চলের আরো কিছু স্থাননামেও এই লক্ষণ ধরা পড়ে । যেমন বর্তমান জোলাইবাড়িকে মগ জনগোষ্ঠীর লোকেরা বলে থাকেন জোলা-জি । 'জি' শব্দের দ্বারা বাজার বোঝায় । সাক-রুঁ অর্থাৎ বর্তমান সাব্রুম । চাকমা জাতির লোকদের তাঁরা সাক বলে থাকেন । অর্থাৎ এখানে চাকমাদের বাসভূমি । সেইরূপ মগরুঁ । অন্যদের ভাষায় মগ জনবসতি । বর্তমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও একসময় তাদের অবস্থান ছিল কিছু কিছু নামে তার হদিস পাওয়া যায় । যেমন ফুলগাজি (ফুলগা-জি ) । মগ সম্প্রদায়ের লোকেরা বাঙালিদের 'কোলা' বলে অভিহিত করেন । বাংলাদেশের নোয়াখালি অঞ্চলে একটি স্থান আছে যার নাম কোলাপাড়া । দক্ষিণ ত্রিপুরায়ও পিলাকসংলগ্ন একটি স্থান কলসি । আসলে কোলা-সি অর্থাৎ বঙ্গসন্তান বা বঙ্গজনপদ । এই জনগোষ্ঠীর লোকেরা বাঙ্গালিদের যে 'কোলা' নামে অভিহিত করে থাকেন সেই সূত্র ধরে একটি ঐতিহাসিক উপাদানের উপর ক্ষীণ আলোকপাত করে প্রবন্ধের শেষ করব ।

প্রাচীনবঙ্গের ইতিহাসে বঙ্গ ও সমতটের পাশাপাশি হরিকেল নামে বাংলাদেশের পূর্বপ্রান্তিক অঞ্চলে একটি প্রাচীন রাজ্যের নাম পাই । এই রাজ্যের পরিধি সম্বন্ধে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে বহুমত আছে । তবে এই রাজ্য প্রথমে ক্ষুদ্র থাকলেও পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম থেকে শ্রীহট্ট পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ঘটেছিল । কেউ কেউ বঙ্গ ও হরিকেলকে এক করেও দেখেছেন । চৈনিক পরিব্রাজক ই-চিং এর বর্ণনায় প্রথম হরিকেলের উপস্থিতি পাওয়া যায় । হরিকেল নামটি হরিকেলি, হরিকেলা বা হরিকোলা ইত্যাদি নামে ইতিহাসে উল্লেখিত হয়ে আসছে । শেষোক্ত 'হরিকোলা' শব্দটি থেকে 'কোলা' শব্দটির উদ্ভব হওয়া অসম্ভব নয় । প্রাগোক্ত লোককাহিনিটিতে যে কোলা বা বঙ্গ জনপদের রাজার কথা বলা হয়েছে তা হরিকেল রাজ্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় । হরিকেল রাজ্যের অধিবাসীরাই তাদের ভাষায় 'কোলা' । কাহিনিটি থেকে জানা যায়, তাদের রাজ্যও একসময় কোলারাজের অধীন অর্থাৎ হরিকেল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় । এই পিলাক অঞ্চলে হরিকেল মুদ্রা পাওয়া গেছে । এই মুদ্রাতে 'পিরক', 'বেরক' ইত্যাদি শব্দ লেখা আছে । মনে করা হচ্ছে এই নামগুলি পিলাক শব্দেরই রূপান্তর । 

যাই হোক, পুরাকাহিনি তো ইতিহাস নয় । তবে তার মধ্যে নিহিত ইতিহাসের উপাদানের ক্ষীণ সূত্র লুকিয়ে থাকতেও পারে । কালস্রোতে তার মধ্যে অনেক বিবর্তন পরিবর্তন ঘটে যাওয়া অসম্ভব নয়। যথাযথ গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান এবং বিশ্লেষণের দ্বারা পিলাকের বহু অনালোকিত তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব । আর এজন্যই এই প্রাচীন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড় সাংস্কৃতিক যোগাযোগ গড়ে তোলা প্রয়োজন ।

( পিলাক উৎসব-২০০২, ২৯–৩১ শে জানুয়ারি,স্মরণিকায় প্রকাশিত ও পরবর্তীসময়ে কিঞ্চিৎ পরিবর্ধিত । )

Monday, March 16, 2026

বাংলা ভাষা, সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে অস্মিতার বিবর্তন

বাংলা ভাষা, সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে  অস্মিতার বিবর্তন 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

Abstract

The Evolution of Culture and Identity in Bengali Language and Literature

Asokananda Raybardhan

India is a unique example of a multilingual and multicultural social system. In such a society, language is not merely a medium of communication; rather, it serves as an important carrier of the cultural unity, heritage, and self-identity of a community. The Indian languages embody centuries of social experience, religious beliefs, folk knowledge, and historical evidence. Among them, the Bengali language and literature constitute one of the principal foundations of Bengali ethnic identity. Language and literature are not only means of expression; they also contain within them the history, culture, beliefs, social experiences, and consciousness of identity of a community.
Across different periods of Bengali literature, reflections of the Bengali people's way of life, religious beliefs, social relationships, and cultural transformations can be observed. This research paper analyzes, from the Charyapada to modern Bengali literature, how the development and expression of Bengali culture and identity have been manifested in literary traditions. Through discussions of medieval Mangal-kavya, Vaishnava Padavali, Shakta Padavali, folk literature, the nineteenth-century Bengal Renaissance, the writings of Rabindranath Tagore and Kazi Nazrul Islam, and various streams of modern Bengali literature, the study demonstrates that Bengali literature has played a crucial role in shaping the national and cultural identity of the Bengali people.

Keywords:
Bengali language, literature, culture, identity, folk literature, Renaissance, language movement, Bengali ethnic identity.



আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে 
আমি তো এসেছি সওদাগরেরর ডিঙার বহর থেকে 
আমি তো এসেছি কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম থেকে 
আমি তো এসেছি পালযুগের নামে চিত্রকলার থেকে 

এসেছি বাঙালি পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহার থেকে 
এসেছি বাঙালি জোর বাংলার মন্দির বেদি থেকে 
এসেছি বাঙালি বরেন্দ্রভূমে সোনা মসজিদ থেকে 
এসেছি বাঙালি আউল-বাউল মাটির দেউল থেকে 
(আমার পরিচয়–সৈয়দ শামসুল হক)

ভারতবর্ষ প্রাচীনকাল থেকেই ভাষা ও সংস্কৃতির মিলন ভূমি । এই উপমহাদেশে সহস্রাধিক বছর ধরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সহ অবস্থান ঘটেছে । ফলে এখানে ভাষা ও সংস্কৃতির এক বিস্ময়কর বৈচিত্র্য ঘটেছে । ভারতের সংবিধানে বর্তমানে ২২ টি ভাষা স্বীকৃত হলেও বাস্তবে এখানে শতাধিক ভাষা ও হাজারেরও বেশি উপভাষা প্রচলিত রয়েছে । এই ভাষাগত বৈচিত্রের মধ্যেই ভারতীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন রূপ বিকশিত হয়েছে । ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হলেও এর ভূমিকা আরও গভীর । ভাষার মধ্যেই একটি সমাজের ইতিহাস, বিশ্বাস, আচার, লোকজ জ্ঞান এবং জীবন দর্শন সংরক্ষিত থাকে । ফলে ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও অস্মিতার বাহক ।

সংস্কৃতি বলতে সাধারণত একটি সমাজের জীবনধারা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস, শিল্পকলা, সাহিত্য, সংগীত ও লোকাচারের সমষ্টিকে বোঝায় । অন্যদিকে অস্মিতা বলতে বোঝায় সেই আত্মপরিচয় বা স্বাতন্ত্র্যবোধ যার মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠী নিজেদের পৃথক সত্তা সম্পর্কে সচেতন হয় । ভাষা এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে । ভাষার মাধ্যমে মানুষ তার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং সংস্কৃতিক চিহ্ন রক্ষা করে । ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন 'language is the chief vehicle of culture.' এছাড়া নৃতাত্ত্বিক ক্লিফোর্ড গিয়ার্টজ সংস্কৃতি সম্পর্কে লিখেছিলেন– 'Culture is the web of meaning through which human beings interpret they are experiences.' অর্থাৎ ভাষা ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ।

বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ভাষা । প্রায় এক সহস্রাব্দব্যাপী সাহিত্যিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ক্রমাগত বিকশিত হয়েছে । এই দীর্ঘ যাত্রায় বাঙালি সমাজের জীবনধারা, ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিফলন দেখা যায় । সাহিত্য ইতিহাসবিদ সুকুমার সেন বলেছেন যে, বাংলাসাহিত্য মূলত বাঙালি সমাজের জীবন ও সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক দলিল ।

বাংলা ভাষা সংস্কৃতি ও অস্মিতা : তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট 

বাংলা ভাষা সংস্কৃতি ও অস্মিতা হাজার বছরের বিবর্তিত ও সংকর ঐতিহ্যের ফসল । প্রাচীন মাগধী প্রাকৃত থেকে উদ্ভুত হয়ে এই ভাষা চর্যাপদ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ধ্রুপদী ও লোকজ উপাদান ধারণ করেছে, যেখানে সাহিত্য, বৈষ্ণব ও শাক্তপদাবলি, বাউল গান এবং ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে । বাঙালি জাতি আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয় সহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মিশ্রণে গঠিত । এই মিশ্রণেই বাঙালিকে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা দিয়েছে, যা তার সাহিত্যেও প্রতিফলিত । বাঙালির অস্মিতা কেবল ভাষা নয় বরং পোশাক, আহার, উৎসব এবং জীবনযাত্রার এক অনন্য সংমিশ্রণ যা সময়ের সাথে সাথে নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখে চলেছে ।

চর্যাপদ ও বাঙালির আত্মপরিচয় 

চর্যাপদ (আনুমানিক নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন যা বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক আত্ম পরিচয়ের মূল দলিল । ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এটি নেপালের রাজদরবার থেকে আবিষ্কার করেন । চর্যাপদের ভাষা (সন্ধ্যাভাষা) ও পদগুলি তৎকালীন বাংলার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সমাজ, ধর্ম, প্রকৃতি, উৎসব ও সঙ্গীতের চিত্র ফুটে উঠে যা বাঙালির নিজস্ব পরিচয়কে নিশ্চিত করে । চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা যা বর্তমান বাংলা ভাষার আদিরূপ । এর মাধ্যমে বাঙালির স্বতন্ত্র ভাষা ও ভাষাগত আত্মপরিচয় সুস্পষ্টই হয় । চর্যাপদে ডোম, শবর, তাঁতি, নৌকাচালক, ব্যাধ ইত্যাদি সাধারণ মানুষের কথা পেশা, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাকের উল্লেখ রয়েছে যা তৎকালীন বাংলার সমাজ চিত্র তুলে ধরে । চর্যায় এক জায়গায় উল্লেখ রয়েছে–'আজি ভুসুকু বঙালি
ভৈলি' । এটাও বাঙালির অস্মিতা । চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের সাধন সঙ্গীত । এই সাধনতত্ত্বের মাধ্যমে বাঙালির আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক চেতনার প্রাচীন রূপ প্রকাশ পায়। পদগুলোতে বাংলার প্রকৃতি, নদী, নৌকা, মাছ, গাছপালা, নিঝুম রাত, গ্রামীণ জীবন চিত্রিত হয়েছে, যা বাঙালির ভূমিজ পরিচয় বহন করে । লুইপাকে চর্যাপদের আদি কবি ও প্রথম বাঙালি কবি বলে গণ্য করা হয় । এটি বাঙালি হিসেবে আত্মআবিষ্কারের পথকে প্রশস্ত করে । চর্যাপদ শুধু প্রাচীন সাহিত্যই নয়, বাঙালির আত্মপরিচয় শিল্প ও সাহিত্য ও সংস্কৃতির শিকড়ের আমূল আকর ।

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ও সমাজ বাস্তবতা 

১২০১–১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্যযুগীয় বাংলাসাহিত্য ছিল মূলত ধর্মকেন্দ্রিক, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ও আখ্যানকাব্য নির্ভর । তুর্কি আক্রমণের পরবর্তী এই যুগে হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির মিশ্রণ, বৈষ্ণব পদাবলি, শাক্ত পদাবলি, মঙ্গলকাব্য, এবং ফারসি থেকে অনুদিত রোমান্টিক কাব্যগুলো সমসাময়িক গ্রামীণ সমাজ, কুসংস্কার, প্রেম ও ভক্তি আন্দোলনের সমাজ বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলে । মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ও সমাজ বাস্তবতার প্রধান দিকগুলো এখানে আলোচনা করা হল–
১. সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট–১২০৪ সালে তুর্কি আক্রমণের পর বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে । সমাজ ধীরে ধীরে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে একটি নতুন সমন্বিত সংস্কৃতি গড়ে তোলে । ১২০১ থেকে ১৩৫০ পর্যন্ত সময়কে সাধারণত সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলা হয় কারণ এই সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সাহিত্যচর্চা বিরল ছিল ।
২. সাহিত্যের প্রধান ধারা ও বাস্তবতা– বৈষ্ণব পদাবলি (চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি) রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনি বা বৈষ্ণব পদাবলিতে মানুষের মানবিক প্রেম, বিরহ ও ভক্তির আধ্যাত্মিক রূপ ফুটে উঠেছে । শাক্তপদাবলীতে বাংলার সাধারণ মানুষের মাতৃ আরাধনার রূপ প্রকাশ পায় । এই দুই ধারা বাংলার সাধারণ মানুষের আবেগ অনুভূতিকে কেন্দ্র করে রচিত । মঙ্গলকাব্য (মনসামঙ্গল, চন্ডীমঙ্গল) গুলো (যেমন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল) সেসময়ের গ্রামীণ জীবনের ভয়, কুসংস্কার, দারিদ্র্য, এবং বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবীর পূজাপার্বণ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তুলে ধরে । রোমান্টিক প্রণয় উপাখ্যান (শাহ মোহাম্মদ সগীর) মধ্যযুগীয় কবিরা ফারসি ও আরবি থেকে কাহিনি নিয়ে 'ইউসুফ জোলেখা'র মতো রোমান্টিক কাব্য রচনা করেন, যেখানে মানবিক প্রেম উপজীব্য ছিল । অনুবাদ সাহিত্য (কৃত্তিবাস ওঝা) রামায়ণ ও মহাভারতের অনুবাদ সামাজিক নৈতিকতা ও ভক্তিবাদের প্রচার হিসেবে কাজ করেছিল ।
৩. সমাজ বাস্তবতা–কাব্যগুলো মূলত দেবদেবী বা অলৌকিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে রচিত হলেও সেগুলোর অন্তরালে মানুষের বাস্তব জীবন দুঃখ-কষ্ট ও আশা-আকাঙ্ক্ষার চিত্র পাওয়া যায় । মঙ্গলকাব্যে বেহুলার মতো দৃঢ় নারীচরিত্র থাকলেও সামগ্রিকভাবে সমাজ ছিল পুরুষতান্ত্রিক এবং নারীদের অবস্থান ছিল অনেকটা নিয়ন্ত্রিত । রোমান্টিক কাব্যগুলোতে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মানুষের মানবিক প্রেম ও আবেগ প্রাধান্যষ পেয়েছে ।
৪. পৃষ্ঠপোষকতা–মধ্যযুগের সাহিত্যে সুলতান ও স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা সাহিত্যিকদের কাব্য রচনা উৎসাহিত করেছিল । মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্য ছিল গ্রামীণ সমাজ, লৌকিক বিশ্বাস, এবং মানবিক অনুভূতির এক অপূর্ব মিশ্রণ যা আজকের বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় এর ভিত্তি স্থাপন করেছিল ।

উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ ও সাংস্কৃতিক চেতনায় বাঙালির আত্মপরিচয়

উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষা যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদের প্রভাবে বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতিতে এক আমল বৌদ্ধিক পরিবর্তন যা বাঙালির আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে সংগায়িত করে রাজা রামমোহন রায় বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের নেতৃত্বে কুসংস্কার দূরীকরণ নারী শিক্ষা ও বাংলা গদ্যের বিকাশের মাধ্যমে একটি আত্মসচেতন আধুনিক ও উদারনৈতিক বাঙালি জাতিসত্তার ভিত্তি স্থাপিত হয় যা একই সাথে ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য জ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটায় ।

নবজাগরণে বাঙালির আত্মপরিচয় সৃষ্টির মূল দিকসমূহ–
যৌক্তিক ও সমাজ সংস্কারক মনোভাব রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রোধ এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রবর্তন সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করে একটি মানবিক ও আধুনিকষ বাঙালি সমাজ গঠনের পথ প্রশস্ত করেন ।
শিক্ষা ও বাংলা ভাষার পুনর্জাগরণ হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা (১৮১৭) এবং বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মধুসূদন দত্ত বাঙালির মধ্যে জ্ঞান তৃষ্ণা ও নিজস্ব ভাষা প্রতি অনুরাগ তৈরি করে । মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাত ধরে ইউরোপীয় ধারা প্রবর্তন এবং বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনীতে আধুনিক 'আমি'র বোধ ও বাঙালি পরিচয় এর অনুসন্ধান শুরু হয় । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রাচীন ভারতীয় বিদ্যার সাথে পাশ্চাত্য দর্শনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাঙালিকে নিজস্ব শিকড়ের সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেন ।
রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনা ১৯ শতকের শেষার্ধে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ও বিপিনচন্দ্র পালের মতো নেতাদের হাত ধরে রাজনৈতিক সচেতনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবি জোরালো হয় যা বাঙালির আত্মপরিচয়কে আরো মজবুত করে ।
নারী শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন নারী শিক্ষাকে অগ্রগণ্য করে নারী পুরুষের সমতা ও আধুনিক পারিবারিক কাঠামো তৈরীর উদ্যোগ নেওয়া হয় । এই সময়কালে কেবল সমাজ সংস্কারী নয় শিল্প ও সাহিত্য যেমন মাইকেলের বঙ্গভাষার স্তুতি ও জাতীয়তাবাদের উন্মেষের মাধ্যমে বাঙালিরা নিজেদের কেবল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেনি বরং একটি আধুনিক শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী বাঙালি জাতির ভিত্তি স্থাপন করেছিল এটি ছিল মধ্যযুগীয় অন্ধকারের অবসানে এবং আত্ম দর্শন ও আত্ম প্রতিষ্ঠার নতুন যুগ ।

রবীন্দ্রনাথ নজরুল ও বাঙালি সংস্কৃতির অস্মিতা 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালির সাংস্কৃতিক অস্মিতা বা আত্মপরিচয়ের প্রধান দুই স্তম্ভ রবীন্দ্রনাথ যেখানে বিশ্বজনীনতা ও মানবতাবাদ ও শিল্পকলা দিয়ে বাঙালিকে আধুনিক মননে সাজিয়েছেন নজরুল সেখানে সাম্যবাদ বিদ্রোহ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা দিয়ে বাঙালিকে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলেছেন তাদের মিলিত সাহিত্য ও সুর বাঙালির জাতিসত্তা গড়েছে ।

 রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল : অস্মিতা গঠনের ধারা 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংস্কৃতির ধ্রুপদী রূপ রবীন্দ্রসাহিত্য গান রবীন্দ্র সংগীত ও দর্শন বাঙালির ভদ্রলোক সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার মূল ভিত্তি যা আমাদের বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে ।
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহ ও সাম্য নজরুলের কবিতা ও গান বিশেষ করে বিদ্রোহী বাঙালিকে শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত করেছে ।
রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ এবং নজরুলের অসাম্প্রদায়িক বিদ্রোহ উভয়েই বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ যা আমাদের স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় গঠন করেছে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির হৃদয়ের কোমলতা ও শিল্পবোধ অন্যদিকে নজরুল বাঙালির সূর্য ও প্রতিবাদের প্রতীক তাদের সম্মিলিত রচনাশৈলী বাঙালির আত্মপরিচয় কে সমৃদ্ধ ও সম্পূর্ণ করেছে ।

বাংলার সংস্কৃতির প্রতীক : নদী ও প্রকৃতি– নদী ও প্রকৃতি বাংলার জনজীবন, অর্থনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ । নদীমাতৃক জীবনযাত্রা, উৎসব, লোকসংগীত ও সাহিত্য যুগ যুগ ধরে প্রকৃতির ছন্দে আবর্তিত । রবীন্দ্রনাথের লেখনী থেকে লালন, হাসন রাজা, রাধারমণের গানে নদীতীরবর্তী মানুষের প্রেম, বিরহ,  জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক সাধনার গভীর প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে । নদী কেবল জলধারা নয়, এটি জীবনের গতিময়তা জন্ম ও বিলয়ের প্রতীক । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গীতাঞ্জলি' ও বিভিন্ন উপন্যাসে নদীপ্রেমও আত্মসমর্পণের রূপক । 'মাছে ভাতে বাঙালি' ধারণার মূলে রয়েছে নদীকেন্দ্রিক কৃষি ও মাছের উৎপাদন নদীগুলো জনপদ জীবন ও সংস্কৃতির ধারক ।
সাংস্কৃতিক উৎসব–পহেলা বৈশাখ, লোক সাহিত্যের ছড়া, ধাঁধা, রূপকথা ও উপকথার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখ ও সামাজিক অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয় । লোকসংগীত ও বাউলদর্শন, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি, কবিগান বাঙালি সংস্কৃতি অবিচ্ছেদ্য অংশ যা মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও আধ্যাত্মিকতা তুলে ধরে । যাত্রাপালা, এবং দুর্গোৎসব নবান্ন পৌষ পার্বণ, পিঠেপুলি, আলপনা মৃৎশিল্প এবং বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবীর পূজা (যেমন, মনসা ও চন্ডী) বাংলার নিজস্ব জাতিসত্তার পরিচয় বহন করে ।  উৎসবগুলি বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ । মাছ-ভাত, পিঠে-পুলি এবং ধুতি-শাড়ি পাঞ্জাবির মতো বিষয়গুলো বাঙালিরশ হাজার বছরের অস্মিতা । বঙ্গ রাঢ ় ১৫বর্ধন থেকে শুরু করে সুলতানি আমলের সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ বাংলার নিজস্ব অস্মিতা বা সত্তা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে । বাংলাসাহিত্য ও সংস্কৃতির এই বিবর্তনই বাঙালিকে বিশ্বের দরবারে একটি স্বতন্ত্র ও প্রগতিশীল জাতি হিসেবে তুলে ধরেছে ।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বাঙালির অস্মিতা

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালির অস্মিতা

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিসরে বাঙালির অস্মিতা বা আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন নতুনভাবে উত্থাপিত হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন, নগরায়ন, বিশ্বায়ন—এসব ঘটনাপ্রবাহ বাঙালির জীবন ও মানসিকতায় গভীর প্রভাব ফেলে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। ফলে বাংলা সাহিত্য শুধু নন্দনতাত্ত্বিক সৃষ্টির ক্ষেত্র নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয় নির্মাণ ও সংকটেরও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে ওঠে।
১. দেশভাগ ও বাঙালি অস্মিতার সংকট
১৯৪৭ সালের দেশভাগ বাংলা সমাজে এক গভীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক অভিঘাত সৃষ্টি করে। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভক্ত বাস্তবতা লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু জীবনের জন্ম দেয়। হারানো ভিটেমাটি, বিচ্ছিন্নতা, স্মৃতি ও বেদনার অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যকে নতুন বিষয়বস্তুর দিকে পরিচালিত করে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, দেবেশ রায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ প্রমুখ লেখকের রচনায় উদ্বাস্তু জীবন, সামাজিক পরিবর্তন ও পরিচয়ের সংকট গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এই সাহিত্যিক সৃষ্টিতে বাঙালির অস্মিতা একদিকে স্মৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গঠিত।
২. ভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনা
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ভাষা বাঙালি অস্মিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। পূর্ববাংলায় (পরবর্তীকালে বাংলাদেশে) ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষাকে জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে স্থাপন করে।
এই আন্দোলনের প্রভাব বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। কবিতা, গান, গল্প ও উপন্যাসে ভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার বোধ নতুনভাবে প্রকাশিত হয়। বাংলা ভাষা তখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং জাতিসত্তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. নগরজীবন, আধুনিকতা ও মধ্যবিত্ত মানস
স্বাধীনতার পর কলকাতা ও অন্যান্য শহরে দ্রুত নগরায়নের ফলে মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট, একাকিত্ব, কর্মসংস্থানের সমস্যা এবং সামাজিক পরিবর্তন বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ প্রমুখ কবির কবিতায় আধুনিক নগরজীবনের নিঃসঙ্গতা, হতাশা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন গভীরভাবে প্রকাশ পায়। অন্যদিকে মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্য প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামকে সামনে নিয়ে আসে, যা বাঙালি অস্মিতাকে আরও বিস্তৃত ও মানবিক মাত্রা প্রদান করে।
৪. লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কার
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সংস্কৃতিতে লোকঐতিহ্য, গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক ইতিহাসের প্রতি নতুন আগ্রহ দেখা যায়। সাহিত্য, সংগীত ও গবেষণায় বাউল, ভাটিয়ালি, পালাগান, মঙ্গলকাব্যের ঐতিহ্য নতুনভাবে আলোচিত হয়।
এই পুনরাবিষ্কার বাঙালির সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে আধুনিকতার সংযোগ স্থাপন করে। ফলে বাঙালি অস্মিতা কেবল আধুনিক নগরসংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে গ্রামীণ ও লোকঐতিহ্যের সঙ্গেও যুক্ত থাকে।
৫. সমকালীন সময় ও বহুমাত্রিক অস্মিতা
বর্তমান সময়ে বিশ্বায়ন, প্রযুক্তি, অভিবাসন ও গণমাধ্যমের প্রভাবে বাঙালি সমাজে নতুন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছে। বাংলা সাহিত্যে এখন নারী-চেতনা, দলিত সাহিত্য, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও পরিচয়-রাজনীতির প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফলে বাঙালির অস্মিতা এখন বহুস্বরিক ও পরিবর্তনশীল—যেখানে ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং সমকালীন অভিজ্ঞতা একত্রে মিলিত হয়ে নতুন আত্মপরিচয় নির্মাণ করছে ।

বাঙালির আত্মপরিচয়ের সাম্প্রতিক সংকট ও উত্তরণের উপায় 

বিশ্বায়নের যুগে প্রযুক্তির প্রসার ও সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের ফলে বাঙালি সংস্কৃতিকে অপসংস্কৃতির প্রভাব বেড়েছে । ফলে নিজস্ব ভাষা, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যকে হুমকির মুখে ফেলে আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করেছে । পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক পরিচ্ছদে পরিবর্তন এবং প্রজন্ম শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে ।

বিশ্বায়ন ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট : প্রধান দিকসমূহ 

বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বব্যাপী একটি সমজাতীয় সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছে যা স্থানীয় সংস্কৃতির অনন্যতা নষ্ট করছে । বাঙালি ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের জায়গা নিচ্ছে অপসংস্কৃতি । বিশ্বায়ন প্রতিযোগিতার যুগে বাংলাভাষার ব্যবহার কমে যাচ্ছে এবং অপপ্রয়োগ বাড়ছে । ভাষার অবমাননা বাঙালিরশ মূল পরিচয়কে সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে । বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতি মানুষের রুচি ও জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে । ফলে আত্মপরিচয়ের চেয়ে বিলাসিতা ও ভোগবাদ প্রধান হয়ে উঠেছে । ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিন্ন সংস্কৃতির অবাধ্য প্রবেশ পারিবারিক ও সামাজিক আচার-আচরণে পরিবর্তন এনেছে । বিশ্বায়নের প্রভাবে অনেকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ধারণ করছে । এরই নাম 'সংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা' ।

এই সংকট কাটিয়ে উডঠতে হলে নিজেদের শিকড় ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করার পাশাপাশি বিশ্বায়নের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করতে হবে । নিজস্ব ঐতিহ্যের চর্চা এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক গণজাগরণ সৃষ্টি করা প্রয়োজন । আধুনিকতা বিশ্বায়ন, ভোগবাদ ও মুক্তবাজারের জটিল আবর্তে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ঘুরপাক খেলেও তার নিজস্ব শক্তি দিয়েই বাঙালি জাতি তার আত্মপরিচয়কে তুলে ধরবে । কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী এজন্যই দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, 
'যে কেড়েছে বাস্তুভিটা সে কেড়েছে ভয় 
আকাশ জুড়ে লেখা আমার
আত্মপরিচয় ।