Saturday, May 28, 2022

কালু কামার

কালু কামার

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

কালু কামার ৷ কে কালু কামার?  গায়ের রঙ কালো বলে কী কালু কামার?  নাকি কালো পাথরের সাথে ছেনিসঙ্গমে জাগিয়েছে প্রাণ তার জন্যে? যে দেবতারা জীবকে সৃষ্টি করে বলে অহংকৃত মিথমগজ জনারণ্যে দাপিয়ে বেড়ায়,  সেই দেবতার জন্মদাতা কালু কামার? 

এতোবড়ো ধৃষ্টতার জন্যেই ঊনকোটি দেবতারা স্বীকৃতি দেওয়ার সাহস পেলি না তোদের জনককে ৷ 

পরিচয়হীন কালু কামার ৷ মজাদার বাক্যবন্ধের জন্যে বিখ্যাত যে রমাকান্ত কামার ৷ তেমন কেউও হতে পারল না কালু কামার ৷ 

যুগে যুগে  পাহাড় কন্দরে জন্ম ও লালনে দেবতা গড়ে তোলে  তিলে তিলে ঘাম ও রক্তে ৷ 
নিভৃত লুঙ্গায় মশালের আলোয় আর মশার কামড়ের যন্ত্রণা ভুলে যে দেবকুলকে গড়ে তোলে কালু কামার, 

ত্রিভুবনবাসের আভিজাত্যে তারা কালু কামারকে চেনে না ৷ পিতা নেই তাদের ৷ তাদের গোষ্ঠীপতি স্বয়ম্ভুনাথ ৷ ঊনকোটিপতি ৷

কালু কামার আজো সাব অল্টার্ণ একলব্যপ্রতিম ৷

Tuesday, May 24, 2022

স্বপ্নদাদা

স্বপ্নদাদা

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

 এখন অনেক বড়ো হয়ে গেছি । দাদাদের বয়সী । দাদারা কেউ কেউ আছেন । অনেক দাদা নেই । তাঁরা শূন্যটিলায় ফিরে গেছেন । যাঁরা চলে গেছেন তাঁদের আমি দাদা ডাকি । আর যে দাদার রয়েছেন তাঁরা তো দাদাই । বয়সকালে এই দুই দাদারাই দাদাগিরি করতেন । আমি অনুজ সেই দাদাদের অনুকরণ করেছি । একসময় আমিও দাদা হয়ে উঠেছি । আমাকে এখন অনেকেই দাদা ডাকে । আসলে আমি আমি আমার দাদাদের নিয়ে সবসময় ভাবতাম । কিকরে যে তারা দাদা হল । আমি তাদের রাতে ঘুমুলে স্বপ্ন দেখতাম । কখনও কখনও দিনেও স্বপ্ন দেখতাম ।  তাঁরা আমার স্বপ্নদাদা ।

এই স্বপ্নদাদাদের একজন আমার ঘরেও ছিল । তবে আমি তাঁকে দেখিনি । বড়ো হয়ে মা-বাবার মুখে শুনেছি । পাড়া পড়শি সেই দাদার গল্প করত । সেও একদিন আমার স্বপ্নদাদা হয়ে যায় । আমার মা-বাবা নাকি গঙ্গার অভাবে তাকে ব্রহ্মপুত্রে বিসর্জন দিয়েছেন । কারণ সেকালে আমরা ব্রহ্মপুত্রের পারে থাকতাম । আমার ঘরের স্বপ্নদাদাকে তাঁরা কেন বিসর্জন দিয়েছেন তা কেউ জানে না । জানলেও আমাকে বলে না । না মা বাবা । না পড়শিরা । সে ঘটনার বহু পরে নাকি আমি আসি । তখন থেকে সবাই আমাকে দেখে । আমার ঘরোয়া স্বপ্নদাদাকে দেখে না । আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে । কখনও আমাকেও বলে । আমার ব্রহ্মপুত্র দাদাই নাকি আমার শরীর নিয়ে ফিরে এসেছিল মায়ের কাছে । তার সব দাদাগিরিও ভর করেছিল আমার শরীরে । চারদিকে আমার অগণিত অনুজ । গণদাদা আমি । আমার দাদাগিরি আমার এবং তাদের উপর । 

এখন মাও নেই । বাবাও নেই । সর্বশেষ যে কজন দাদা ছিলেন তাঁরাও নেই । দাদাগিরির শংসাপত্র হিসেবে বাবা আমাকে বাজারের শূন‍্য থলেটা দিয়ে গেছেন । আমাকে রোজ সেটা ভরে তুলতে হয় । থলেটা শূন্য হয় ।...আবার আমাকেই ভরে তুলতেই হয় ।...
              

Tuesday, May 17, 2022

মিলন হবে কত দিনে...

মিলন হবে কতদিনে

মেলা ভেঙে গেলে মনটা নরম হয়ে যায় । ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে । কেবল শূন‍্যতা । কেবল ভাঙার শব্দ । ভাঙনের আওয়াজ। মেলার মাঠে স্তুপ হয়ে পড়ে থাকে আবর্জনা । ভাঙা বেড়া বাঁশের খুঁটি । পলিপ‍্যাকের টুকরো । হাজার মানুষের পায়ের চাপে ঘাস উঠে যাওয়া ধূসর মাটি । নিঃসঙ্গ বুদ্ধমন্দিরের নীরব গৈরিক চূড়া । বিধ্বস্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চ । প্রতিটি মেলা শেষে সেই পরিচিত চিত্র। 'হৃদয় খুঁড়ে কে আর বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!'

গত রাতে শেষ হয়েছে সাব্রুমের বৈশাখীমেলা। ত্রিপুরার দক্ষিণ সীমান্তিক শহরের প্রাচীনতম মেলা । বহু মানুষের স্বপ্নের মেলা । প্রতি বছরই বহু মানুষের সমাগম হয় এই মেলায় । এই জেলার মানুষজন ছাড়াও বাইরে থেকে বহু মানুষ আসেন এখানে মেলার দিনগুলোতে । আত্মীয়তার সূত্রে । পরিচয়ের সূত্রে । নাম শুনে । পেশাগত কারণে যাঁরা বাইরে থাকেন তাঁরাও বাড়ি ফেরেন মেলাকে কেন্দ্র করে । বাইরে বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েরা বাপের বাড়িতে নাইওর আসেন মেলা উপলক্ষে । প্রায় প্রতি বাড়িতে কদিন হাট-বাজার একটু বেশি করতে হয় এ কদিন । 'অতিথি দেব ভব' ভাবনায় । 

   গত দুই বছর করোনা মহামারীর কারণে মেলা হয়নি । ঘরবন্দী মানুষ দিন গুনেছেন মুক্তির । প্রকৃতিসৃষ্ট হোক বা মনুষ‍্যসৃষ্ট । মানুষকে বেঁধে রাখতে পারেনা কেউই । মানুষ ভেঙে ফেলে বন্দীত্বের শৃঙ্খল । সামাজিক দূরত্বের কারণে সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষ আবার মিলনের উৎসবে সম্মিলিত হয়েছে এই বৈশাখীমেলাকে কেন্দ্র করে । বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আছড়ে পড়েছে মেলার মাঠে । ঝড়-বাদলে প্রকৃতির পরিবর্তন, রাজ‍্য রাজনীতির পরিবর্তন এই মেলাপাগল মানুষের গায়ে কোনো
আঁচ ফেলতে পারেনি । নির্ঝঞ্ঝাট, নিরুপদ্রব আনন্দের অংশীদার হয়েছেন তাঁরা । মেলার পরিধি এবারে অনেক বিস্তৃত হলেও তিলধারণের জায়গা ছিলনা কোথাও । মেলাকে ঘিরে জনপ্লাবন বয়ে গেছে । এতো এতো মানুষের সমাগম । একটাও অপ্রীতিকর ঘটনার উদাহরণ নেই । এটাই এই মেলার বৈশিষ্ট্য। শান্তি, সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলা সাব্রুমের চিরন্তন ঐতিহ‍্য । যার জন‍্যে সাব্রুমবাসী গর্ব করে । আশির দাঙ্গার বীভৎসতা দেখেনি এ মাটি । ঐক‍্য ও সম্প্রীতি সাব্রুমের মুকুটের বৈদুর্যমণি । সদ‍্যসমাপ্ত সেই মেলাতেও সেই ধারা রক্ষিত হয়েছে ।

      তার পরেও মেলা শেষ হয় । বিষাদ নেমে আসে প্রান্তর জুড়ে । ফাঁকা ফাঁকা লাগে কোথায় যেন । ঘরে ফেরা মানুষের পায়ের ধুলো ওড়ে বাতাসে । আকাশেও মেঘ গুড় গুড় করে যেন বিসর্জনের বাজনা বাজায় । ক্লান্ত মানুষ ঘরে ফেরে । ফেরে যার যার সধ‍্যমতো তৈজসপত্র নিয়ে । ফেরে মিলনের বার্তা নিয়ে । প্রিয়জনের হাত ধরে ঘুম জড়ানো চোখে হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকে, আবার 'মিলন হবে কত দিনে...' ।

Monday, May 16, 2022

স্বপ্ন ও চাঁদ

স্বপ্ন ও চাঁদ

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

ঠাকুমার স্বপ্নবোনা চাঁদ ঘরে ঢুকে পড়েছে ভেবে 
আমপাতা জামপাতায় সাজাই ভাঙা ঘরের চারধার
 উঠোনে দু'চারটে বিদেশি ফুলের চারা টবে বাড়ে
 আম্রপালি আম গাছ বেড়েছে জলে ও জৈব সারে 

বছরের পর বছর শরৎ আর বসন্ত যায় চাকা বেয়ে
 গাছেদের মত বেড়ে ওঠে স্বপ্ন ডালপালা নিয়ে 
ঘরে বাড়ে আধার কার্ড, রেশন কার্ড, আরও কত কি 
বারবার দিতে হয় অকাট‍্য প্রমাণ নাগরিক পরিচয়ের
এখন আর তারাদের মিছিলে তাকানোর সময় হয়না 
উপরের জগৎটা বন্দি হয়ে যায় করপোরেট চুক্তিতে ।

অভায়ারণ্যে পর্যটনে গেলে অপেক্ষার পর দেখা যায় 
বাঘ আসে, বাঘ গেলে  সিংহ আসে, সিংহের পর গন্ডার
 যে যায় কিংবা আসে হিংস্রতার হেরফের হয় না
 তবুও অভয়ারণ্যের  জন‍্যে বের করতে হয় উইক এন্ড ।

ভোট এলেই স্বপ্নেরা উড়ে আসে গাছের ডালে ও পাতায়
স্থবির গাছেরাও হওয়ায় দুলে ওঠে পাতাদের নাচায় 
ভোটের পরে ছিটেফোঁটা নিয়েও গাছেদের দিন গুজরান 
ছাপ্পা ভোটের কোনো ঝুঁকি নেই সবটাই বিজয় ।

লাইটপোস্ট থেকে নেমে আসে দাগি কালোবাজারি 
মই বেয়ে । সে মই বেয়ে আকাশে উঠে যায় তেলের দাম 
নিত্যদিন জিনিসের দাম বাড়লেও কর্পোরেট দুনিয়া 
নতুন শিবালিক পর্বত গড়ে ভঙ্গিল মানুষ নিয়ে
 দূরে যায় স্বপ্ন ও চাঁদ, ঠাকুমার শোলকের আঁচল ।

পরিচয়

পরিচয়

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

কালের ধারা বহুদূর চলে গেলেও
 তুমি রয়ে গেছ স্থির স্থায়ী ইমারত ।
 ধরে রেখেছে মানুষ মানুষ অন্তহীন বুকের গভীরে ।
সুপ্রিয় স্মৃতিটির  চিরন্তন কথার মতো স্থায়ী হয়ে আছে ।
ব‍্যর্থ মানুষ আজও দিনান্তের অন্ধকারে আশ্রয় খুঁজে পায় 
তোমার শব্দের ভান্ডারে, কবিতার কথায়, সঙ্গীতসুরে ।

এখনো পরাজিত মানুষ আবার উঠে দাঁড়ায়
 শিরদাঁড়া সোজা করে তোমার কবিতায়
 এখনো তোমার গানের ভেতর অলৌকিক জাদু
 সর্বাঙ্গে তোলপাড় করে সুরের আলাপ
 জাগায় নতুন ইন্ধন । সুরে সুরে ভেসে যায় পাপের কালিমা ।
 রাত ভেঙে নতুন ভোর আসে চিরকালীন নিয়মে ।

যারা রোদ্দুরের আশায় সুর্যোদয় দেখে প্রতিদিন 
পেছন থাকে তোমার দীর্ঘ ছায়া ঐতিহ্যের বিস্তার
ছয় ঋতুময় তুমি জেগে থাকো তোমার গানে ও কবিতায় ।

 শিশিরে লাগা সূর্যবিন্দু যেমন মুক্তোর হাসি ছড়ায়
তেমনি তুমি সমুজ্জ্বল বিভায় থাকো অনন্ত কাল।
এই আকাশছোঁয়া অবয়ব আমার পরিচয় ।

Sunday, May 8, 2022

রাঙিয়ে দিয়ে যাও

রাঙিয়ে দিয়ে যাও গো

ত্রিপুরার সৃজনক্ষেত্রে আজ অস্থিরতা ৷ অবিশ্বাসের অশনিনির্ঘোষ ৷এই বিষবৃক্ষের বীজ অনেক আগেই পোঁতা হয়েছিল ৷ আজ সে গাছে ফল ধরেছে ৷ তার বিষক্রিয়ায় আজ আমরা সবাই লক্ষীন্দর ৷ ত্রিপুরা রাজ্যে আমরা যারা সুন্দরের আরাধনাকে জীবনের আর দশটা নিজস্ব কর্মের সঙ্গে জুড়ে নিয়েছি তারা কেউই ব্যক্তিগত লাভালাভের মোহে সেটা করছিনা ৷ কর্মক্ষেত্রে পরিচিতির পদমর্যাদার স্তরবিন্যাস থাকলেও সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে সে ব্যবধান থাকেনা ৷ সেখানে সবাই একে অন্যের সতীর্থের মতো একাত্মতা অনুভব করি ৷ আমরা জানি আমাদের এই প্রান্তিক ভুবনের সৃজন বৃহত্তর বঙ্গসংস্কৃতির অঙ্গনে স্থায়ী দাগ রাখার মতো সৃষ্টি এখনও করে উঠতে পারিনি ৷ কিন্তু আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস রয়েছে স্থান নেবার জন্যে ৷ সেকারণেই আমরা একে অন্যের সৃষ্টিকে তুলে ধরার প্রয়াসী হই ৷ এভাবেই ত্রিপুরার প্রত্যন্ত প্রান্ত থেকেও আজ উঠে এসেছেন সৃজনকর্মীরা ৷ সমৃদ্ধ হয়েছে আমাদের দীন আঙিনা ৷ কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো উদ্যোগ নিলে শরিক হবার বা পাশে দাঁড়াবার সুযোগ নিই ৷ কিন্তু আমরা এও লক্ষ্য করেছি, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো উদ্যোগ নিলে অন্য আর একদল সেটাকে পাশ কেটে যান ৷ অনুষ্ঠানের ধারে কাছে থাকেননা কিন্তু বাইরে থেকে শলা নাড়েন ৷ উপযাচক হয়ে আগত অতিথিদের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠেন ৷ উদ্যোক্তাদের নির্ধারিত পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটান ৷ বাংলাদেশ থেকে আগত অতিথি যেমন এখানে নৈশভোজের আসরে লাঞ্ছিত হয়েছেন তেমনি আমাদের রাজ্যের প্রিয় কবিদের বিরুদ্ধে ওদেশের কেউ সোস্যাল মিডিয়ায় বিশ্রী স্ট্যাটাস দেয় তখন এরাজ্যেরই কোনো সম্মানিত ব্যক্তিত্ব মুহূর্তে সেই স্ট্যাটাসকে ছড়িয়ে দিয়ে সেই নোংরামিকে উসকানি দেন ৷ আর নিজেদের মধ্যে ফেসবুকে ল্যাং মারামারি, কাউকে ছাগদুগ্ধ সেবনের পরামর্শ, কারো ব্যক্তিগত বিষয় উন্মোচন এসবতো আকছারই ঘটেছে ৷ যাঁর অনুষ্ঠান সম্পর্কে কোনো অতিথি ব্যক্তিত্ব ফিরে গিয়ে বিষোদ্গার করেন, তাঁর পাশে কেউ প্রতিবাদ করার পর দেখা যায় কোনো এক উজ্জ্বল ভোরে দেখা যায় সাপে নেউলে একসাথে সেলফিশোভন হাসি বিতরণ করেন ৷ এও এক আজব আচার ৷ ফারাকটা হলো একসময়ে অঘটনগুলোর কর্তারা স্বনামেই কাজগুলো করেছেন ৷ আর আর আজকে মুখটাকে 'চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা' করে পরিচিতিকে অর্ধনারীশ্বর করে বেদনাদায়ক ঘটনাগুলো করছেন ৷ এখানে আমি কারু সাহসের বা ভীরুতার তুলনা করছিনা ৷ পুরীষ উভয়েই ঘাঁটছেন ৷ কেউ কেউ কানকথায়ও প্রিয়জনকে ভুল বুঝছেন ৷ বেদনাহত হচ্ছি প্রিয়জনের লাঞ্ছনায়, মানসিক যন্ত্রণায় ৷ 
 অবসান ঘটানো যায়না কী এই কন্টকাকীর্ণ পরিবেশের ৷ এই অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্বের ৷ আসুন না, তরুণ কিংবা বরিষ্ঠজনেরা ৷ বসুন না সামনাসামনি ৷ রাগ অভিমান ঝেড়ে ফেলে এই কিরাতভূমির সৃজনকে সম্মিলিতভাবে তুলে ধরি বৃহতের আঙিনায় ৷ জীবনের যে সিঁড়িতে এসে পৌঁছেছি ৷ যে কোনদিনই পুষ্পস্তবক আমার জন্যে খুঁজে রাখতে হতে পারে ৷ আসুন না এই ভূমি আর তার প্রকৃতি ও মানুষকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিই ৷ সেই বিরাটপুরুষের জন্মদিনে এই বোধটাই ছড়িয়ে দিই সকল প্রাণে ৷

Tuesday, May 3, 2022

মেলাবেন তিনি মেলাবেন

মেলাবেন তিনি মেলাবেন

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

বাংলার ধর্ম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ‍্যে সমন্বয়ধর্মীতার ধারাটি বহু প্রাচীন । সেই ধারাকেই অনুসরণ করে আউল বাউল পীর ফকিরদের ধর্মধারাটি প্রবাহিত হয়ে এসেছে । তাদের আচরিত ধর্মে মানুষের, মানবতার জয়গানই উচ্চারিত হয়েছে বারবার । সেই ধারা বিভিন্নভাবে আজও বহমান । আজ পাশাপাশি অবস্থানকারী দুই ধর্মের জনগোষ্ঠীর দুটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিন । হিন্দুদের অক্ষয় তৃতীয়া ও মুসলমানদের ঈদ-উল-ফিতর । বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে রোহিণী নক্ষত্রযুক্ত হলে তাকে অক্ষয় তৃতীয়া বলে । অক্ষয় অর্থ হল যার ক্ষয় নাই ।  মানুষের মনে বিশ্বাস এই তিথিতে কোন সম্পদ সৃষ্টি করলে তা অক্ষয় থাকে । এছাড়াও হিন্দু ধর্মীয় বিধি অনুসারে নানা আনুষ্ঠানিকতা জড়িয়ে আছে এই তিথিকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে মুসলমানদের রমজান মাসে দীর্ঘ একমাস ব্যাপী কৃচ্ছ্রসাধনের পর আসে ঈদ । ঈদ মানে উৎসব । ঈদ-উল- ফিতরের এই উৎসবে মুসলমান জনগণ আনন্দে মেতে ওঠেন এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে এই দিনটি পালন করেন  ।

এই তিথিতে শ্রীশ্রীরামঠাকুর মাতৃদেহে প্রবেশ করেন । আবার এই তিথিতে তিনি তিরোহিত হন । এই অক্ষয় তৃতীয়া তিথিতেই তিনি সূক্ষ্ম ও অতীন্দ্রিয় প্রক্রিয়ায় গুরু মন্ত্র লাভ করেন । তিনি তাঁর সুদীর্ঘ প্রায় নব্বই বছরের জীবনে সবধরনের বৈষম্যহীন কুসংস্কার মুক্ত সমাজগঠনে জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানবতার জাগরণের মধ্য দিয়ে মানবের আধ্যাত্বিক মুক্তির উপায় সন্ধান করেছেন । তিনি প্রকৃত অর্থে ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানব সম্প্রদায়ের ধর্মের প্রচার করেছিলেন । জাতি-ধর্ম-বর্ণ সূচি অশুচির কোনো ভেদ তাঁর ধর্মাদর্শে ছিলনা ।

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় সমাজ জীবনে কুসংস্কার, ব্রিটিশ রাজশক্তির সৃষ্টি করা বিভেদনীতি ও ধর্মীয় দাঙ্গার বিরুদ্ধে শুধু আধ্যাত্মিক চেতনায় মানুষকে বলিয়ান করাই নয় পাশাপাশি সমাজ সংস্কারের এক সার্থক রূপকার ছিলেন শ্রী শ্রীশ্রীরাম ঠাকুর ।
আধ্যাত্মিকতার পীঠস্থান বাংলাদেশে ধর্ম সমন্বয়ের একটি প্রাচীন ধারা বিদ্যমান । এই সমন্বয়ধর্মীতার ফলে এখানে বাঙালি হিন্দুর লৌকিক দেবী বনদেবী, ওলাইচন্ডী পরিণত হয়েছে মুসলমানের বনবিবি ও ওলাবিবি রূপে । শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্রদেব ভারতের এই সুপ্রাচীন ধর্মসমন্বয়ের ধারাটিকে তাঁর আধ্যাত্মিকতাবাদ  প্রচারের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন । তিনি এখানে দেবতা হিসেবে সত্যনারায়ণ পূজার প্রবর্তন করছেন । সত্যনারায়নকে তিনি বলছেন সত্যপীর । তার হস্তলিখিত সত্যনারায়ণের পাঁচালিতে প্রথমেই উল্লেখ করেছেন– 'সত্য সত্য সত্য পীর সর্ব সিদ্ধি দাতা / বাঞ্ছা বড় বাড়িল বর্ণিতে ব্রত কথা ।' এই সত্যপীর ইসলাম এবং স্থানীয় লৌকিকধর্মের সংমিশ্রণে সৃষ্ট এক আধ‍্যাত্মিক পুরুষ যাকে বাংলার লোকধর্মের ধারার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় । বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে মুসলিম সত্যপীর এবং হিন্দু সত্যনারায়ন একই বিশ্বাস এবং আচারের প্রতিনিধিত্ব করে । বাংলাদেশ সুফিবাদ যখন প্রাধান্য লাভ করে সেই সময়ে বাংলাসহ সংলগ্ন রাজ্য উড়িষ্যায় তার জনপ্রিয়তা অর্জন করে । এই সত্যপীর ঐতিহ্যকে মান্য করে আজও হিন্দুরা সত্যনারায়ন ও পীরকে একসঙ্গে পূজা করেন । শ্রীশ্রীরামঠাকুর আমাদের ধর্মীয় সমন্বয়ের প্রতিভূ এই ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে তাঁর ধর্মসাধনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন । তার আসল উদ্দেশ্য হিন্দু এবং মুসলমান ধর্মাবলম্বী জনগণের মধ্যে শাসক শ্রেষ্ঠ যে বিভেদ রয়েছে তাকে  দূরীভূত করা এবং পাশাপাশি আধ্যাত্মিক উপাসনার পদ্ধতি অনুসরণ করা । ফলে দুই ধর্মের পারস্পরিক সহাবস্থান ও ধর্মাচরণ এই যুগসন্ধিক্ষণের দুই ধর্মের মানুষকে একসূত্রে গাঁথার একটা প্রয়াস সেতু তৈরি করবে । সত্যনারায়ণ পূজায় যে সিন্নি ব্যবহার করা হয়– দুধ, কলা' আটা / ময়দা কিংবা চাল' নারকেল ও অন্যান্য হল ফলপসারযুক্ত যে ভোগ নৈবেদ্য তা মুসলিম সংস্কৃতি থেকেই পাওয়া । ডক্টর গিরীন্দ্রনাথ দাসের মতে–''পীর' শব্দের আভিধানিক অর্থ 'বৃদ্ধ' বা প্রাচীন এবং ভাবার্থ আধ্যাত্মিক গুরু । শব্দটি ফারসি থেকে আগত । ফারসি 'পীর' শব্দের ন‍্যায় বৌদ্ধগণ কর্তৃক ব্যবহৃত  'থের' শব্দের অর্থ বৃদ্ধ । সংস্কৃত 'স্থবির' শব্দের একটি অর্থ বৃদ্ধ ।পীরগণ ছিলেন ইসলাম ধর্ম প্রচারক ।'' ( বাংলা পীর সাহিত‍্যের কথা ) । তাঁরা সুফি নামে অভিহিত ।  সুফি শব্দটি আরবি  'তসাওফ'  বা 'সুফ' শব্দ থেকে এসেছে । রাজা গণেশ ( শাসনকাল ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দ ) বা সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ( শাসনকাল ১৪৯৪ থেকে ১৫১৯ খ্রি) আমলে সমাজের সত্যপীর পূজার প্রচার করেন বলে অনেকে অনুমান করেন । ( যাই হোক এই বিষয়ে পরবর্তী সময়ে আলোচনা করা যাবে । ) এখানে লক্ষণীয় যে শ্রীশ্রী রামঠাকুর শুধু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বই ছিলেন না সমাজের সংকটময় মুহূর্তে সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে যেখানে ছোঁয়াছুঁয়ির নামে শুচিবায়ুগ্রস্ত মনোভাব, বর্ণবৈষম্য এবং ধর্মান্ধতার মত কুপ্রথার প্রভাব ছিল সেখানে সমাজ সংস্কারের এক সার্থক রূপকার হিসেবে শ্রীশ্রীরামচন্দ্রদেব তাঁর ধর্মীয় আদর্শ প্রচার করে গেছেন । ফলে তাঁর বহু মুসলমান শিষ‍্যও রয়েছেন ।

আজ এমনই একটা দিন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলমানরা ও তাদের ঈদ উৎসব পালন করে আসছেন । আদিকালের কৃষিউৎসবই যে পর্যায়ক্রমে ঈদ উৎসবে রূপান্তরিত  এবং সে সময়ে মানুষ আজকের মত ধর্মীয় বিভিন্নতা  মধ্যে জীবনযাপন করতেন না ‌। পরবর্তী  সময়ে ধর্মীয়চিন্তা এসেছে । হিন্দু মুসলমান ইত্যাদি নানা ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে ।  মূলত এই সত্যপীর বা সত্যনারায়ন সেই একই সত্তারই প্রতীক । 
 আজও যেন সেই বাঙালির চিরঐতিহ্য এক সূত্রে এসে মিলিত হয়েছে । আজও সমস্বরে উচ্চারিত হোক, আমাদের ধর্মীয় সমন্বয়ধর্মীতার  জয় হোক । জয় হোক মানবতার ।