Showing posts with label স্থানিক ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label স্থানিক ইতিহাস. Show all posts

Saturday, November 8, 2025

সাবরুমের প্রাচীন জনপদ ছোটখিল

সাব্রুমের প্রাচীন জনপদ ছোটখিল

১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে সংযুক্তির পর থেকে ত্রিপুরা রাজ্যের সর্ব দক্ষিণের শহর সাব্রুম এখন মহকুমা শহর ও এ অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র । কিন্তু অতীত  ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, সাব্রুম মহকুমার যে জনপদটি আজকের নাগরিক রূপ নিতে পারত সেটি আজও নিজস্ব রহস্যের অবগণ্ঠনে নিজেকে ঢেকে নীরবে সাব্রুমকে শহর সৃষ্টিতে লালন করে চলেছে, তার নাম ছোটখিল । সাব্রুম শহর থেকে পশ্চিম দিকে ৬-৭ কিলোমিটার দূরে বর্ধিষ্ণু গ্রাম এটি । একসময় এ জনপদ ছিল কর্মচঞ্চল, ব্যস্ততায় ঘেরা । রাজন্য আমলে ছোটখিল ছিল 'গেটওয়ে টু চিটাগাং হিলট্র্যাক্ট' । রাজপুরুষরা আখাউড়া থেকে ট্রৈনে চড়ে তদানীন্তন নোয়াখালীর মুহুরিগঞ্জ স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে বা হাতিতে ছয় মাইল পূর্বে আমলিঘাটে পৌঁছে নিজেদের রাজত্বে পা রাখতেন । তারপর সেখান থেকে ফেনী নদীর উজান ধরে ছোটখিলে এসে বিশ্রাম নিতেন বা রাত কাটাতেন । এরপর বর্তমান দৌলবাড়ির অধীর সরকারের বাড়ির পাশ দিয়ে সাব্রুম আসতেন । কখনওবা নদী পেরিয়ে রামগড় যেতেন । নদীর তীর ধরে সেই ক্ষীণপথের এখনও কিঞ্চিৎ চিহ্ন রয়েছে । সে সময়ে রাজপুরুষ বা অন্যান্য লোকজনদের আসার কারণে এখানে একটা ছোট্ট হাটের মত ছিল । বর্তমানে রাস্তার উত্তর পাশে যে পুকুরটি আছে ( অধীর বাবুর বাড়ির উল্টোদিকে ) সেটি বহু প্রাচীন । পুরনো হাটগুলোতে এরকম পুকুর থাকতোই ।

ছোটখিলের আদি বাসিন্দাদের মধ্যে মূলত মগ রিয়াং ও ত্রিপুরার প্রধান ছিল । তার পরে মুসলমানরা আসেন । এঁরা সম্ভবত শমসের গাজির সৈন্যদলেরই লোক । শমসের গাজির আত্মগোপনকালে তার সঙ্গে এসে বা পরবর্তী সময়ে শমসেরের মৃত্যুর পর এখানে এসে গা ঢাকা দিয়ে সংসার করেছেন । আমলিঘাতেই ছিল শমসের গাজির কিল্লা । তার নিদর্শন এখনো আছে ।

হিন্দু বাঙালিরা এখানে আসেন অনেক পরে । স্বাধীনতার কিছু আগে পরে । তবে তারও আগে নদীর ভাঙ্গনে রিক্ত ও নিঃস্ব হয়ে বরিশাল থেকে কিছু লোক এখানে এসেছেন । তাদের মূল পেশা ছিল এখানে আস্তানা গেড়ে নোয়াখালি ও চট্টগ্রামের সমতল জনপদে ডাকাতি করা । 

একসময় বন্যা ও বন্য শ্বাপদের সঙ্গে যুদ্ধ করে এখানকার মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়েছে । ছোটখিলের রানিরবাজার সংলগ্ন বাগানবাড়িতে এসে রাজারা অবস্থান করতেন এবং এখান থেকে এ অঞ্চলে শিকারে বেরোতেন । বাঘ, হরিণ, শূকর, খরগোস,সজারু, বনমোরগ, বনরুই আর হাতির অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র ছিল এই অঞ্চল । অনেকটা ময়ূরের মতো একধরনের পাখি ছিল । স্থানীয়ভাবে এগুলোর নাম ছিল মথুরা । আজকের প্রজন্ম এর নামও শোনেনি । শিকার, বিনোদন এবং খাজনা আদায়ের জন্য রাজারা এখানে একটা বাগানবাড়ি করেছিলেন । এই বাগানবাড়ির সর্বশেষ দায়িত্বে ছিলেন বৈকুণ্ঠনাথ রায় যাঁকে সাধারণ মানুষ বৈকুণ্ঠ আমিন বলেই ডাকতেন । এছাড়া  এখানকার অধিবাসী আরও দুই সহোদর আমিন ছিলেন । তাঁরা ছিলেন ব্রজেন্দ্র নাথ ও ললিত নাথ । স্থানীয় ভাষায় বড্ডা আমিন ও মাইজ্জা আমিন । চৌকিদার ছিলেন যাত্রামোহন নাথ ও পাথরাই ত্রিপুরা । আমলিঘাটে ছিলেন সতীশ শীল বা সতীশ গার্ড । আব্দুল লতিফ মুহুরী ছিলেন রাজার নিয়োজিত সেরেশতাদের ।প্রসঙ্গত, উল্লেখ করি যে প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকায় সংগৃহীত 'হাতিখেদার গান' পালায় এক জায়গায় সেই সময়ের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও তৎসন্নিহিত হাতিখেদা সমূহের যে বিবরণ আছে তার এক স্থানে পাই–

নলুয়া ছড়ার পারে আছে বন নুনা মাডি ।
খেদা বানায় কনো জনে গাছ গাছড়া কাডি ।।

এই নলুয়া ছড়াটি বর্তমান বটতলা বাজারের দক্ষিণ পশ্চিমে ফেনী নদীর অপর পাড়ে মিশেছে । বলাবাহুল্য এটা বর্তমানে বাংলাদেশে সীমার মধ্যে প্রবাহিত হয়ে ফেনী নদীতে পড়েছে । ত্রিপুরার রাজারা এখান থেকে হাতি শিকার করতেন । বর্তমানে যেখানে তাকিয়াবাড়ি বা মনুটিলা সেখান দিয়ে দলে দলে হাতি চলাফেরা করত । তখন এই অঞ্চলকে বলা হত হাতির দোয়াল । একটি তিনঠেঙে হাতি নিয়ে লোকপ্রচলিত মিথ একসময় এ অঞ্চলে ছিল । এছাড়া ছিল বাঘের উপদ্রব । আজ থেকে ৭০-৮০ বছর আগেও শ্রীনগরের রহমত আলী মিয়া ( রহমত আলী বলী ) ছিলেন বাঘের উপদ্রবের একমাত্র মুশকিল আসান  । তিনি এখানকার গোবিন্দ মাঠ অঞ্চলের বেতবন থেকে প্রচুর বাঘ মেরেছেন । এছাড়া মকবুল হোসেন বা 'মাক্কু হলবান' ( পালোয়ান ) নামে একজনের খালি হাতে বাঘ মারার কথা প্রচলিত ছিল । মাকু হলবানের একমাত্র ছেলে অনেক বছর আগে মনুবাজার স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ছিল । পরবর্তী সময় আর তার সংবাদ জানা যায় না ।

ত্রিপুরার রাজপরিবারের এই তালুকটি সঙ্গে রাজপরিবারের অনেকের নাম জড়িত বিস্তীর্ণ এলাকার চারটি গ্রাম বিজয়নগর, ব্রজেন্দ্রনগর, কল্যাণনগর ও রমেন্দ্রনগর নামের চারটি জনপদের সঙ্গে রাজপুরুষদের নাম জড়িত । গোটা পরগনাটির প্রাচীন নাম প্রভাবতীপুর পরগনা । চা বাগানটির নাম লীলাগড় টি এস্টেট । এই চা বাগানের মালিক ছিলেন লালুকর্তা অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্যধন্য ব্রজেন্দ্রকিশোর দেববর্মন । রবীন্দ্রনাথই তাঁকে সাব্রুমের এই তালুকটি আবাদ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন । চাবাগান সংলগ্ন তখনকার সময়ের একমাত্র হাটটির নাম ছিল রানীগঞ্জ বাজার বা রানির বাজার । এভাবে রাজঅন্তঃপুরের নারীদের নামও জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের নামের সঙ্গে । রানির বাজার একসময় ত্রিপুরার দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ বাজার ছিল । এখানে অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা কেন্দ্র খুলে বসে ছিলেন । ভারতের অন্য অংশ থেকে বিমানযোগে বিলোনিয়ার মাইছড়া বিমান ঘাঁটিতে পণ্য নিয়ে এসে এখান থেকে সংগ্রহ করে এই বাজারে  আনা হত । আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে প্রধান ছিল বস্ত্র ও নানা ধরনের মসলা, পাতার বিড়ি ইত্যাদি । এছাড়া রানির বাজারে ছিল বিরাট গরুর বাজার । ভারত ভুক্তির পর সীমান্ত কড়াকড়ির ফলে এবং এই বাজারে পরপর কয়েকবার আগুন লাগার ফলে সমৃদ্ধশালী ব্যবসায়ীরা একেবারে পথে বসে যান এবং তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন অনেকে আবার আগরতলা বা অন্যত্র তাদের ব্যবসা সরিয়ে নেন । আগরতলাস্থিত লক্ষ্মী বস্ত্রালয়ের মালিকের একসময় এই রানীর বাজারে বিরাট ব্যবসা ছিল ।

গত শতাব্দীর শুরুর দিকের হিসেব অনুযায়ী জানা যায় যে, সে সময়ে এ অঞ্চলে 'বাতেমা' নামে এক ধরনের কচু এবং সরিষার খুব ফলন হত । ফেনী ও মুহুরিগঞ্জ বাজারে এগুলো বিক্রি হত । এখানকার জমিতে উৎপাদিত কৃষিজ ফসল ও বনের বাঁশ, ছন ও অন্যান্য সামগ্রী এবং জুমের ফসল নদীপথে ভাটি অঞ্চলের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হত । সাবরুমের মনুঘাট থেকে মোষের দুধের দই যেত রামগড় বাজারে । ১০০ বছর আগে এখানে আখের গুড়ের মন ছিল দু টাকা । 

একসময় এ অঞ্চলে প্রচুর জলা জায়গা বা ঢেবা ছিল । ফেনী নদীর বারবার গতি পরিবর্তনের ফলে এই ঢেবাগুলোর সৃষ্টি । মূলত এগুলো ফেনী নদীর মধ্যগতি অঞ্চলে সৃষ্ট অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ সব । বছর পঞ্চাশেক আগে পর্যন্ত মাগুর শিঙয়ের অফুরন্ত ভান্ডার ছিল এই ঢেবাগুলো । এছাড়া ফেনী নদীতে ছিল নানা ধরনের অজস্র মাছ । বিশেষ করে এই নদীতে এককালে ইলিশ এবং গলদা চিংড়ি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত । এক সময় আমরিঘাট পর্যন্ত জোয়ার আসতো জোয়ারের জলে ভেসে প্রচুর সামুদ্রিক মাছ এখানে পাওয়া যেত । পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুহুরী প্রজেক্ট গড়ে তোলার জন্যে বাদ দেওয়ার ফলে নদীর এই অংশে জোয়ার ভাঁটার অবসান ঘটে । নানা রকমের মাছও আর পাওয়া যায় না ।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে এত বিশাল স্মৃতি নিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে আছে যে জনপদ তার নাম ছোটখিল কেন ? খুলে দেখা যাক এর নামমাহাত্ম্য । স্থানীয় ভাষায় 'খিল' শব্দের অর্থ পতিত বা খালি । বিরল জনবসতির কারণে বা বন্যার কারণে ছোট্ট এই রাজতালুকটি প্রায়ই খিল বা পতিত থাকত । সেই কারণেই এর নাম ছোটখিল হতে পারে । এছাড়া এর একটা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা খোঁজারও চেষ্টা করা যেতে পারে । 'কিল্লা' শব্দের অর্থ দুর্গ । চট্টগ্রামী বাংলা উচ্চারণ প্রভাবে স্থানীয় উচ্চারণে শ্বাসঘাতের ফলে তা 'খিল্লা' হতে পারে । সেই হিসেবে শমসের গাজীর আমলিঘাটের মূল দুর্গ বা কিল্লার পরে এখানে হয়তো একটা ছোট কিল্লা ছিল । যেখানে তিনি আত্মগোপন করতেন । বর্তমান রানিরবাজার এবং বটতলা বাজারের মাঝামাঝি এলাকায় রাস্তার বা পাশে পঞ্চায়েত অফিসের আগে রক্ষিতদের ঢেবার পাড়ে বহু আগে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদটি আসলে একটি দুর্গ ছিল  । এর গর্ভগৃহটি পরবর্তী সময়ে মুসলমানরা কবর হিসেবে ব্যবহার করতেন । সেটা থেকেও ছোটকিল্লা>ছোটখিল্লা>ছোটখিল হতে পারে ।

যাক এ অঞ্চলের ইতিহাস ধরে রাখার কোন প্রচেষ্টা কোন কালই হয়ে ওঠেনি তাই কালো স্রোতে অনেক কিছুই ভেসে গেছে হারিয়ে গেছে যথার্থ গবেষণার ফলে আগামী দিনে অনেক তথ্য উঠে আসবে অতীত কথা বলে উঠবে তার জন্য দরকার উত্তম উদ্যোগ আর উৎসাহ ।

Saturday, January 25, 2025

আমলিঘাট ও সন্নিহিত অঞ্চলের কিংবদন্তী ও ইতিহাস

আমলিঘাট ও সন্নিহিত অঞ্চলের কিংবদন্তী ও ইতিহাস 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আনুমানিক ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ শিক পরগনার কৈয়রা গ্রামে শমসের গাজীর জন্ম হয় । ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরারাজ্যের রাজধানী শমসের গাজির অধিকারভুক্ত হয় । তখন থেকে ১২ বছর তিনি ত্রিপুরারাজ্যের সর্বময় কর্তা ছিলেন । শমসের গাজির জীবনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর মৃত্যুর পর শেখ মনুহর গাজি নামে এক পল্লীকবি রচনা করেন গাজীনামা । ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে নোয়াখালির সেরেস্তাদার মৌলবি খবির মুদ্রিত করেন এই গাজীনামা । ত্রিপুরার ইতিহাসাশ্রিত কাব্যগ্রন্থ গাজীনামায়  শমসের গাজির গড় জগন্নাথ-সোনাপুর গ্রামের বর্ণনায় পাই, 'দক্ষিনে ফেনী নন্দী / পূর্বে গিরি মুড়াবন্দি / উত্তরেতে এহেন জলধি । /  পশ্চিমে মলয়া পানি / তার মধ্যে ভদ্রাখানি / মধ্যে যেন খিরুদের দধি ।।

 এখানেও শমসের গাজীর গড়বন্দী গ্রামের সীমার উল্লেখ রয়েছে । ফেনীপাড়ের এই বিদ্রোহী বীরের উত্থানে সেদিন ত্রিপুরার রাজসিংহাসন কেঁপে উঠেছিল । ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে শমসের গাজীর কিল্লা এবং বিশাল দিঘিটি আজও দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমার পশ্চিম প্রান্তস্থ সীমান্ত গ্রাম আমলিঘাটে বিদ্যমান । আমলিঘাট থেকেই ফেনীনদীর নিম্নগতির শুরু এবং প্রশস্ত জলপ্রবাহের রূপ ধরে দক্ষিণাভিমুখী হয়ে বাংলাদেশের সমতল ক্ষেত্রে উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে ।

ফেনী নদীপ্রবাহের ভারত ভূখণ্ডের শেষ প্রান্তিক জনপদ আমলিঘাট । সাব্রুম মহকুমার প্রত্যন্ত গ্রাম । একসময় আমলিঘাট বর্ধিষ্ণু জনপদ ছিল । ত্রিপুরার প্রায় প্রতিটি নদীপ্রবাহের সীমান্ত অঞ্চলে রাজআমলে গড়ে উঠেছিল বনকর ঘাট । ফেনীনদীর ঘাটের ইজারার সুবাদে আমলিঘাটে গড়ে উঠেছিল ফেনীঘাট নামে বনকর ঘাট । আর তাকে কেন্দ্র করে তহশীল অফিস । ১৮৮৮ সালের আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ ও ত্রিপুরার যৌথ সরকারের তরফে একজন অফিসার এই ঘাটের তদারকি করতেন । বনজ সম্পদ আহরণের উপর ত্রিপুরার রাজা ও ব্রিটিশ সরকার ১০ আনা : ৬ আনা হারে কর আদায় করতেন । ১৮৭১ সালে ফেনীঘাটের ইজারা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব ২০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১২০০০ টাকা হয়েছিল । রিয়াং ও চাকমা গোষ্ঠীর লোকেরা তখন 'কোন্দা' এবং 'লং' নামে বিশেষ ধরনের নৌকা দিয়ে ফেনী ও গোমতী দিয়ে সমতল ত্রিপুরায় পণ্য পাঠাতেন । এসব কারণেই আমলিঘাটের গুরুত্ব ছিল । ১৯১৬ সালে সাব্রুম থেকে আমলিঘাটের রাস্তা তৈরির কাজ শুরু হয় ।

আমলীঘাট ও তার পার্শ্ববর্তী লোকালয় ঘিরে বেশ কিছু প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন ও লোককাহিনি জড়িয়ে আছে । এখানে অবস্থিত শমসের গাজির দিঘি ও কেল্লাটি আজ জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে । দিঘির বৃহত্তর অংশই কাঁটাতারের ওপারে, যার একাংশ বর্তমানে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত । দিঘিটির তেমন সংস্কার নেই । পাড় কেটে অনেকে চাষের জমি বানিয়ে ফেলেছে । এই দিঘিকে কেন্দ্র করে লোককাহিনিও প্রচলিত ছিল একসময় লোকমুখে । দিঘির পাড়ে তালিকা রেখে মানত করলে নাকি বাসনকোশন পাওয়া যেত উৎসব অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণের কাজ সমাধা করার জন্য । দিঘির এক কোনা থেকে একটা সুড়ঙ্গপথ শমসের গাজির কেল্লা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে যা এখন বনজঙ্গল ঘেরা এবং বাদুড়, চামচিকে, সরীসৃপের আবাসস্থল । লোকপ্রচলিত কথা আছে, এই সুড়ঙ্গপথ দিয়ে শমসের গাজির কেল্লার অভ্যন্তরের পর্দানশীন মহিলারা দিঘির জলে স্নান করতে যেতেন । 

শমশের গাজির এই দিঘিটির চারধারে যে উর্বর নিম্নসমভূমি রয়েছে এবং যা বর্তমানে বাংলাদেশের অংশের চাষের ভূখণ্ড তার নাম 'কালিদহ' । এই কালিদহকে কেন্দ্র করেও একটি পুরানো লোককথা প্রচলিত রয়েছে । সেই অনুযায়ী জানা যায় যে, এই কালিদহে নাকি চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা ডুবেছিল । বছর ৪০ এর আগেও এখানকার ভূমিতে প্রোথিত নৌকার গলুইয়ের মত কিছু একটার উর্ধ্বভাগ দেখা যেত। এটাকে ধারণা করা হত চাঁদ সওদাগরের ডুবে যাওয়া নৌকার গলুইয়ের অংশবিশেষ । এই বস্তুটি ১৯৭৪ সালে এই প্রতিবেদক এবং ত্রিপুরার বিশিষ্ট লোকগবেষক ড. রঞ্জিত দে প্রত্যক্ষ করেছেন । গ্রাম্য ললনারা এখানে দীর্ঘদিন ধূপ দীপ জ্বালাতেন । পাশের বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্গত গ্রামটির নাম 'চম্পকনগর' ।  বলা হয় এখানে চাঁদ সওদাগরের বাড়ি ছিল । আমলিঘাটের প্রায় এক দেড় কিলোমিটার দূরে ফেনীনদীর উজানের দিকে একটি গভীর খাত রয়েছে । এখানে বিশাল এলাকা জুড়ে জলঘূর্ণির সৃষ্টি হয় । জলের এই পাকের মধ্যে কিছু এসে পড়লে কুন্ডলি পাকিয়ে জল তা অনেক দূরে নিয়ে ফেলে । এই স্থানটিতে জলের গভীরতাও প্রচুর । ৫০-৬০ হাত লম্বা বাঁশ ফেলেও ঠাঁই পাওয়া যায় না । এখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যায় বলে মৎস্যশিকারিদের জন্য লোভনীয় স্থান এটি । এই জায়গাটির নাম 'মেরুকুম' । সন্নিহিত জনপদের নাম মেরুপাড়া ।  ত্রিপুরার দক্ষিণপ্রান্তের শেষ ভূখন্ড বলেই হয়তো ভৌগোলিক 'মেরু' শব্দটি এখানে ব্যবহৃত হয়েছে । এখানে বিস্তৃত চরভূমি রয়েছে । মেরুকুমের এই চরভূমিতে দাঁড়িয়ে দেখা বিকেলবেলা সূর্যাস্তের দৃশ্য অত্যন্ত নয়নমুগ্ধকর । লোকশ্রুতি আছে, এখানেই নাকি মনসামঙ্গল খ্যাত বেহুলার বাবা সায়বেনের বাড়ি ছিল। একসময় এই মেরুকুম পর্যন্ত সমুদ্রের জোয়ারের জল আসত । ফেনীনদীর বাঁকে অবস্থিতএই মেরুকুম-আমলিঘাট-কালিদহ-চম্পকনগর ও তৎসন্নিহিত অঞ্চল নিয়ে সত্যিই মনসামঙ্গলে বর্ণিত কাব্যিক পরিবেশ সৃষ্টি করে । এই আমলীঘাটের পাশেই ফেনীনদীর পাড়ে একটি নাতিউচ্চ পাহাড়ে রয়েছে একটি প্রাচীন শিবমন্দির । এই পাহাড়টিকে বলা হয় সন্ন্যাসী টিলা । বহুকাল আগে এই টিলাতে একজন সন্ন্যাসী একাকী বাস করতেন বলে এর নাম সন্ন্যাসী টিলা হয়েছে । এখানকার শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করেও রয়েছে মিথ । কথিত আছে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের বিখ্যাত শৈবতীর্থে যাওয়ার আগে ভক্তরা এখানে বিশ্রাম করতেন । এই পাহাড়টায় প্রচুর বেলগাছ রয়েছে । বলা হয় এই বেলগাছ আপনাতেই গজায় । কেউ লাগাতে হয় না । কেউ কেউ বলেন, এখানে শিবপার্বতী বিশ্রাম করেন । প্রতিবছর শিবচতুর্দশীতে এখানে বিরাট মেলা বসে । এটিও চন্দ্রনাথ শিবতীর্থের ক্ষুদ্র রূপ । মধ্যযুগীয় বাংলাকাব্য দ্বিজ রতিদেবের 'মৃগলুব্ধ'তে যে শিকারির কাহিনি রয়েছে তাতে উল্লেখিত রঘুনন্দন পাহাড়ের শেষ প্রান্ত হল এই সন্ন্যাসী টিলা । মৃগলুব্ধ কাব্যের বর্ণনা অনুযায়ী এই সন্ন্যাসী টিলার সঙ্গে কিছু মিল পাওয়া যায় । কালের গ্রাসে বহু কিছু হারিয়ে গেছে । হয়তো দ্বিজ রতিদেব কোন কারণে এই অঞ্চল পরিভ্রমণ করে গিয়ে তাঁর মৃগলুব্ধ কাব্য লিখে থাকবেন । সে দিক দিয়েও এ স্থানটির মাহাত্ম্য রয়েছে । ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ও আমলিঘাটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল । এক কথায় আমলিঘাটকে ঘিরে পর্যটনক্ষেত্র গড়ে তোলার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে । সরকার এ ব্যাপারে সহৃদয় দৃষ্টি দিতে পারেন ।

সহায়ক গ্রন্থ :

১. রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস–কৈলাস চন্দ্র সিংহ
    ২. গাজিনামা–শেখ মনোহর গাজী
     ৩. ত্রিপুরার ইতিহাস–ড. জগদীশগণ চৌধুরী
     ৪. ত্রিপুরা ও চট্টগ্রাম–ড. রঞ্জিত দে
      ৫. ত্রিপুরার লোক সাহিত্য ও জনজীবন–ড. রঞ্জিত দে 
      ৬. ত্রিপুরার লোকসমাজ ও সংস্কৃতি–অশোকানন্দ রায়বর্ধন
      ৭. সাব্রুমের ইতিহাস ও সংস্কৃতি–অশোকানন্দ রায়বর্ধন
      ৮. মানিক্যশাসনাধীন ত্রিপুরা–নলিনীরঞ্জন রায়চৌধুরী