Tuesday, November 28, 2023

মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার হরিনা ও অপারেশন জ্যাকপট

মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার হরিনা ও অপারেশন জ্যাকপট

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক নম্বর সেক্টরের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে । এই এক নম্বর সেক্টর থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন । এই সেক্টর থেকে ২২ হাজারের উপর মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন । তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন গেরিলা যোদ্ধা । এখান থেকে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন । পঁচিশে মার্চ রাতে ঢাকায় পাকবাহিনী নেমে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামের শুরু হয়ে যায় বিদ্রোহ । সমগ্র চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, থেকে ঘোষণা করা হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম । ফলে প্রথমদিকে বেশ কিছুটা সময় চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাক হানাদাররা তাদের দখলদারী কায়েম করতে পারেনি । এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রথমে রামগড় ও পরে হরিণায় স্যাটেলাইট ট্রেনিং সেন্টার খোলা হয়েছিল । রামগড় পাক বাহিনীর দখলে চলে গেলে সাব্রুমের হরিণা হয়ে ওঠে এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার । এখানে মেজর রফিকুল ইসলামের দায়িত্বে ছিলেন গেরিলা যোদ্ধারা । এবং একসময় তিনি এক নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন । তাঁকে তখন সাহায্য করতেন ক্যাপ্টেন এনাম, ক্যাপ্টেন মাহফুজ ও ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া । মেজর জিয়ার দায়িত্বে ছিল জেড ফোর্স । এই জেড ফোর্সের নিজস্ব হাইড আউট ছিল পোয়াংবাড়ির কাছে মামাভাগিনা টিলার নিচে ত্রিপুরার কোনো এক রাজার পরিত্যক্ত রাজবাড়িতে । ১৯৭১ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সেক্টর গঠন করা হলে হরিণাতে এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার করা হয় । এক নম্বর সেক্টটরের ছিল পাঁচটি সাবসেক্টর । এগুলো হলো— ঋষ্যমুখ সাবসেক্টর, শ্রীনগর সাবসেক্টর, মনুঘাট সাবসেক্টর, তবলছড়ি সাবসেক্টর ও ডিমাগিরি সাব সেক্টর।

এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার হরিনা থেকে যে সমস্ত স্মরণযোগ্য অপারেশন চালানো হয় তার মধ্যে নৌবাহিনীর প্রথম ও সফল অভিযান হল 'অপারেশন জ্যাকপট' । মুক্তিযুদ্ধের ১০ নম্বর সেক্টর ছিল নৌবাহিনী । এই নৌবাহিনী ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের ১৩ থেকে ১৬ তারিখ এক দুঃসাহসিক ও সফল অভিযান চালিয়েছিল । বিশ্বের সমরশাস্ত্র বিষয়ক পাঠ্যসূচিতে আজও এই অভিযান তথা 'অপারেশন জ্যাকপট' এর কথা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে । এই অপারেশনে সেদিন একযোগে চট্টগ্রাম ও মংলা দুটি সমুদ্রবন্দর এবং চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ এই দুটি নদীবন্দরে আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তান ও আরও কয়েকটি দেশ থেকে আসা অস্ত্র-খাদ্য ও তেলবাহী ২৬টি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল । চট্টগ্রাম বন্দরের আক্রমণটি সানানো হয়েছিল একনম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার তথা হরিনা ক্যাম্প থেকে ।

১৯৭১ সালের ২৩শে মে ভারতীয় নৌবাহিনীর সহায়তায় পশ্চিমবঙ্গে ভাগীরথী নদীর তীরে ঐতিহাসিক পলাশী স্মৃতিসৌধের পাশে একটি গোপন ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয় । এর সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল C2P । জুন মাসের প্রথমদিকে বিভিন্ন সেক্টর থেকে বাছাই করা শক্তসমর্থ, সাহসী এবং ভালো সাঁতারু ৩০০ জনের একটি দল C2P ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন । নৌকমান্ডোদের ওই প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় নেভাল অফিসার কমান্ডার এম এন সামানত । ট্রেনিং দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জি এম মর্টিশ । এঁদের সঙ্গে ছিলেন আরও ২০জন ভারতীয় প্রশিক্ষক এবং পাকিস্তান নৌ বাহিনীর দলত্যাগী ৮জন বাঙালি সদস্য । ট্রেনিং এর প্রথম অংশে মুক্তিযোদ্ধাদের স্থলযুদ্ধের কৌশল শেখানো হয় । তার মধ্যে ছিল—গ্রেনেড নিক্ষেপ, বিস্ফোরক ব্যবহার, স্টেনগান, রিভলবার চালানো এবং খালি হাতে যুদ্ধ করা ইত্যাদি । দ্বিতীয় ভাগে জলযুদ্ধের ট্রেনিংয়ে ছিল—৫-৬ কেজি ওজনের পাথর বেঁধে সাঁতার, জলের উপরে নাক ভাসিয়ে একটানা অনেকক্ষণ সাঁতার, স্রোতের বিপরীতে সাঁতার, শীত ও বর্ষায় একটানা জলে থাকার অভ্যাস, সাঁতরে গিয়ে কিম্বা ডুব সাঁতার দিয়ে লিমপেট মাইন বাঁধা ইত্যাদি । প্রায় টানা তিন মাস ট্রেনিং করার পর অগাস্টের প্রথম সপ্তাহের দিকে তাঁদের ট্রেনিং পর্ব শেষ হয় । টানা তিনমাস খরস্রোতা ভাগীরথী নদীতে ট্রেনিং করার পর বিমানে করে তাঁরা আগরতলায় আসেন । 

জুলাই মাসের ২৮ তারিখ ভারতীয় বাহিনীর ডেল্টা সেক্টরের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং এর সঙ্গে চট্টগ্রামের বন্দরে নৌঅভিযানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় । চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশনের জন্য ৬০ জনের একটি শক্তিশালী দল গঠন করা হয় । এই দলের নেতা ছিলেন আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী । তিনি পাকিস্তান নৌবাহিনীর সাবমেরিনার হিসেবে ফ্রান্সে থাকা অবস্থায় পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন । অপারেশন জ্যাকপটে চট্টগ্রামের অপারেশনে নেতৃত্ব দেন তিনি । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একসঙ্গে বীর উত্তম ও বীর বিক্রম খেতাব দেওয়া হয় তাঁকে । প্রতিজন নৌ কমান্ডোকে একটি করে লিমপেট মাইন, একটি ছুরি, একজোড়া সাঁতারের ফিন, আর কিছু বিস্ফোরক ও শুকনো খাবার দেওয়া হয় । প্রতি তিনজনের জন্য একটি করে স্টেনগান এবং এই দলের নেতা সাবমেরিনার ওয়াহেদ চৌধুরীর জন্য ছিল একটি রেডিও । চারটি বন্দরে একযোগে আক্রমণের লক্ষ্যে কমান্ডরদের নির্দেশের জন্য রেডিওতে একটি প্রস্তুতি সংগীত বাজানোর কথা জানানো হয় । সংগীতটি ছিল পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া 'আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান / তার বদলে আমি চাইনি কোন দান ।' এই গানটির অর্থ ছিল আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে আক্রমণ পরিচালনা করতে হবে । অন্য গানটি ছিল একশন সংগীত । গানটি ছিল আরতি মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া 'আমার পুতুল আজকে যাবে প্রথম শ্বশুরবাড়ি' । এই গানটির অর্থ ছিল আক্রমণের জন্য ঘাঁটি ত্যাগ করুন । এই গানগুলো সম্প্রচারের ওয়েভলেংথ এবং ফ্রিকোয়েন্সি কমান্ডারকে জানিয়ে দেওয়া হয় ।

১৩ই আগস্ট ৬০ জনের এই দলটি আবদুল ওয়াহিদ চৌধুরীর নেতৃত্বে হরিণা ক্যাম্পে এসে পৌঁছান । হরিনা ক্যাম্প থেকে যাত্রা করার পর তিনি ৬০ জনের এই দলটিকে ২০ জন করে তিনটি ছোট দলে বিভক্ত করেন । প্রশিক্ষিত ২০ জন করে তিনটি ছোট দলের কমান্ডাররা ছিলেন মাজহার উল্লাহ ( বীরোত্তম )  ডা. শাহ আলম ( বীরোত্তম ) এবং আব্দুল রশিদ । তিনটি দলের সার্বিক কমান্ডার ছিলেন আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী । ১৪ আগস্ট রাতে রশিদ গ্রুপ রামগড় এর পথে, শাহ আলম এবং মাজহার উল্লাহ গ্রুপ বিভূঁইয়া ঘাট দিয়ে এগোতে লাগলেন । এদিকে আব্দুর রশিদ গ্রুপের পথের খবর পেয়ে যায় পাকিস্তানি হানাদারেরা । রশিদ ভেবেছিলেন হানাদারেরা সংখ্যায় কম । তাই লোহারপুলের কাছাকাছি উঁচু পুকুরপাড় থেকে এলএনজিতে ব্রাশ ফায়ার শুরু করলেন । ঘন্টাখানে প্রচন্ড গোলাগুলি চলল । তারপর ফিরে এলেন আবুল কাশেমের বাড়িতে । এতে অপারেশন জ্যাকপট থেকে রশিদের গ্রুপ পিছিয়ে পড়ে । অন্য দুটি দল ভোরে পৌঁছালেন মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া বাজারে । তারপর খানিকটা জিরিয়ে সমিতির হাটের দিকে যাত্রা করেন । সমিতির হাটে যখন তারা পৌছালেন তখনই বেজে উঠলো প্রথম গান— 'আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান / তার বদলে আমি চাই না কোন দান ।' তারপর দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তাঁরা । তারপর কৌশলে পাক আর্মিদের চোখ এড়িয়ে কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে চট্টগ্রাম শহরের হাজিপাড়া সেন্টার, নাসিরাবাদ, কাকলি বিল্ডিংসহ কয়েকটি শেল্টারে পৌঁছান ।  মীরসরাই থেকে মাইন ও অস্ত্রের চালান চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন শেল্টারে পৌঁছানো হয় । এ কাজে মুক্তিযোদ্ধা জানে আলমের বিশাল ভূমিকা ছিল । তিনি একটি গাড়িতে তরকারি বোঝাই গাড়ির মতো সাজিয়ে তাতে মাইনসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র পরিবহন করেছিলেন । তিনি ও তাঁর সহযোগী পাইকারি বিক্রেতা সাজেন এবং শহরে ঢোকার মুখে পাক সেনার জেরায় নিজেদের তরকারি বিক্রেতা প্রমাণ করতে সক্ষম হন ও পার পেয়ে যান । দুটি দল যথাসময়ে যথাস্থানে পৌঁছালেও তৃতীয় দলটি সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি ফলে আক্রমণকারী কমান্ডো সংখ্যা ৪০ এ দাঁড়ায় । ১৪ আগস্ট রাতে প্রথম গানটির সংকেত শোনার পর আব্দুল ওয়াহেদ, মাজহার উল্লাহ, ডা. শাহ  আলমের নেতৃত্বে ৩৯ জনের দলটি কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীর আনোয়ারার লাক্ষার চরে অবস্থান নেন । সব প্রস্তুতি সেরে নেওয়া হলেও বৃষ্টির জন্য শেষ পর্যন্ত ১৪ আগস্ট এর অপারেশন বাতিল করা হয় । ১৫ আগস্ট সকালে ২ নম্বর জেটি থেকে ১৬ নম্বর যেটি পর্যন্ত অবস্থানরত টার্গেট গুলোকে তাঁরা পরিদর্শন করেন ।

১৫ আগস্ট রাতে প্রত্যেক যোদ্ধার বুকে সাড়ে পাঁচ কেজি ওজনের একটি করে লিম পেড মাইন বেঁধে দেওয়া হয় । একটি করে ছুরিও দেওয়া হয় । জাহাজের গায়ের শ্যাওলা পরিষ্কার করার জন্য । সবার পায়ে সাঁতার সহায়ক হিনস পরিয়ে দেওয়া হয় । রাত  বারোটা বাজলো । রেডিওতে বেজে উঠল, 'আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুর বাড়ি ।' অন্ধকার নিস্তব্ধ কর্ণফুলীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল যোদ্ধারা । একে একে সকলে পাকসেনাদের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে যার যার টার্গেট জাহাজে মাইন বসিয়ে নিজ নিজ অবস্থানে পৌঁছায় । ১৫ই আগস্ট রাত ১টা ৪০মিনিটে চট্টগ্রাম বন্দর বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ।  বিকট শব্দে মাইনগুলো পরপর বিস্ফোরিত হতে শুরু করে । চট্টগ্রাম বন্দরে এই সময় এম. ভি. হরমুজ এবং এম. ভি. আল আব্বাস দুটি জাহাজ নোঙর করা ছিল । এগুলোতে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য সমরাস্ত্র বহন করা হয়েছিল । প্রথমটিতে ৯৯৯০ টন এবং দ্বিতীয়টিতে ১০৪১৮ টন সমরসম্ভার ছিল । এছাড়া বন্দরে ফিস হারবার জেটির সামনে ৬২৭৬ টন অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে ওরিয়েন্ট বার্জ নামে আরেকটি জাহাজ অবস্থান করছিল । অন্যান্য জেটিতেও কিছু জাহাজ ও বার্জ নেভাল জেটিতে দুটি গান বোট এবং একটি বার্জ বাঁধা ছিল । অপারেশনের ফলে সরাসরি সবগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ডুবে যায় । পাশাপাশি ওই একই সময়ে অন্য তিনটি বন্দরে ও বিস্ফোরণ শুরু হয়ে যায় ।

এই অভিযান সফল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেদিনের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘুরে গিয়েছিল । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও বহির বিশ্বে ব্যাপক প্রচার লাভ করে ছিল । বিদেশি এতগুলো জাহাজ ধ্বংস হওয়ার ফলে যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে খবর প্রকাশিত হয় তখন পাকিস্তান সরকারের পক্ষে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম চলছে না, সেখানে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে ্ বলে অপপ্রচারের ফানুসটিও ফুটো হয়ে যায় । সর্বোপরি এই আত্মঘাতী গেরিলা যুদ্ধে একজনও মুক্তিযোদ্ধা আহত বা নিহত হয়নি কিংবা পাক বাহিনীর হাতে বন্দিও হয়নি । মুক্তিযুদ্ধের দামাল নৌকমান্ডো বাহিনীর বিজয়ের সঙ্গে এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ত্রিপুরা রাজ্যের হরিনার নামও স্বর্ণাক্ষরে খোদিত থাকবে ।

 সহায়ক বইপত্র :

১. মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস–মুহম্মদ জাফর ইকবাল
২. লক্ষ্য প্রাণের বিনিময়ে–রফিকুল ইসলাম বীরোত্তম
৩. মুক্তিযুদ্ধে নৌ অভিযান–খলিলুর রহমান

Monday, November 6, 2023

মোষ

মোষ 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

মোষেরা ভীষণ ক্ষ্যাপা হয় । শিং দিয়ে সংহার করে । 
সেই বেয়াড়া মোষকে বাগ এনে পিঠে সওয়ার হওয়ার 
গল্পটা সাদামাটা নয় । বাহিনী নিয়ে রীতিমতো 
লড়াই করতে হয় । দুনিয়ার তাবত ভদ্রতাকে 
অলংকার পরিয়ে  নিয়ে
মোষকে ঘিরে ধরার কৌশল ব্যবহার করতে হয় ।

একগুঁয়ে স্বভাবের মোষ প্রায়শই তেড়ে ফুঁড়ে ওঠে, 
বিশাল দেহে তার ক্রোধই সম্বল । একমাত্র রক্ষাকবচ ।
তার মাথায় ঘিলু বলতে কিছু নেই, ধারালো শিং ছাড়া ।
এই মোষের পিঠে চড়ার স্বপ্ন যে দেখেছে একবার 
সে তার সমস্ত মেধা ও চাতুরি খরচ করতে থাকে,
খ্যাপা মোষকে বাগে আনার জন্য তাকে শোনায়
 ঘুমপাড়ানি গান আর রাজপাটের শোলোক ।

মোষকে বশ করে যে জন তার পিঠে উঠে বসে
 সে আর নামতেই চায় না এই নাদুস শরীর থেকে ।
 যতক্ষণ না তাকে টেনে হিঁচড়ে নামানো হয়
 ততক্ষণ সে যম রাজার প্রতিরূপ একজন ।

সৌরবিগ্রহ

সৌরবিগ্রহ

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

যে সূত্রে জেগে উঠেছিলাম এক আঁধারকালো জঠরভুবনে
 তিনিই আমার মায়ের শরীর । আজীবন এক বিজয়ের অহং
 তিনি লালন করেছেন তাঁর রহস্যময় গর্ভদেয়াল  ঘিরে। 
আমার মনে নেই সেইসব । আমাকে মুক্তমঞ্চে
 একা ফেলে রেখে তিনি চলে গেছেন বলে 
এক বিষন্ন অভিমান আমি হৃদয়ে পুষে বেঁচে আছি ।

মাকে আমি খুঁজে ফিরছি অনন্তসময়ের কোলাহলপথে । 
প্রতিদিনের পথচলা আমাকে দূরের এক
 ছায়াবিগ্রহের কাছে এগিয়ে নিয়ে যায় ক্রমাগত । 
যত এগিয়ে যাই আমি আকুল হয়ে দেখি সেই 
অস্পষ্ট চারুশরীর । দেখি আমার মাকে সেই সৌরবিগ্রহে । 
এক বিস্ময়প্রতিমা ! সমস্ত অন্ধকারের কেন্দ্র তিনি । 
আর তাঁর আলোগোলাঘরের আলোকদানা ছড়িয়ে দেন 
সারা পৃথিবীর শরীরে । আমি দেখি আমার 
হারিয়ে যাওয়া মা সেই আলোর কেন্দ্রে এসে দাঁড়ান । 

আমার তৃষ্ণার্ত নরজীবন গলে গলে মিশে যায় 
সেই প্রতিমারপদ্মময় চরণডোবানো জলাধারে ।

কোজাগরী

কোজাগরী

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

 হারানো পরম মুহূর্তগুলো সযত্নে তুলে
 রাখে কোজাগরী রাত ।
 সাঁঝবাতি নিভে গেলেই তার শরীর বেয়ে
 উপচে পড়ে আলো আর আলো । 
সে আলোর আছে মাদক আকর্ষণ ।  
আলোর ভাঁজে ভাঁজে সে তার নগ্ন
 শরীর মেলে ধরে । নগ্নতার মাঝে 
কোনো মিথ্যাচার থাকে না । 
কোনো ছলাকলাও নয় । আলোময়তা 
শরীরকে সুন্দর করে নাকি শরীর
 সুন্দর করে আলোকে ?  লাখ টাকার প্রশ্ন 
বাঁচিয়ে রাখে কোনো অতীতকথা ।
মৃতসঞ্জীবনী  অনুভব মৃদু মন্দিরার শব্দে
 এপাশ ওপাশ হেলে ঢলে পড়ে ।

ভোর না হওয়া পর্যন্ত কোজাগরীর 
দায় থাকে জেগে থাকার । 
ক্ষণিকের বিভ্রমে নষ্ট হয়ে যেতে পারে
 চাঁদের নগ্নতার পোষাক ।

সংকেত

সংকেত

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

চাঁদের উদয় হয় । অস্তগমন তার আছে কিনা 
জানা নেই । মাঝরাতে চুপ হয়ে থাকা জলের ভেতর 
ঘরসংসার পাতে পূর্ণিমা ছেড়ে যাওয়া চাঁদ । কালো জলের শরীরে একাকী গৌরবদন
 চুম্বনের চিহ্ন রাখে । ঢেউ এলে সে পিরিতের পদাবলি 
মুছে যায় । শুধু চাঁদপানা মুখ জলের তালে 
কেঁপে কেঁপে ডিঙা বায় ।

এমনই প্রাচীন শোলোক মিথ হয়ে গিয়েছিল 
যমুনার জলে । আজো তাদের নিয়ে গান হয় । 
হালফিলের তরুণী বৌ-ঝি পালিয়ে যায় 
মোবাইলের সংকেতে । 

এ সবই অস্তগামী চাঁদের গূঢ় ইঙ্গিত ।

সূর্যাস্তকাল

সূর্যাস্তকাল

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

সূর্যাস্ত নিপুণ হলে সুদর্শন হয় কোন সন্ধ্যাতারা
আকাশের অন্ধকার বিস্তারে তোমার মুখ ভাসে না ।
ভালোবাসব বলে পরিপাটি হৃদয় রেখেছি তাই
তুমি কি ঘোর কাপালিক নাকি অন্য কোনো তন্ত্রে
তোমার বিছানো আঁচলে যানজট গড়ে রেখেছে বলো ?

হঠাৎ কুয়াশাভোর এলে শরতকালের কথা মনে পড়ে
যে ভোরে আমার মা নক্সিকরা চটের ব্যাগ হাতে নিয়ে
বাপের বাড়ি নাইওর যাবেন বলে ঘাটে বসে থাকতেন
সম্পর্কিত দেওর মাঝির অপেক্ষায় ।  জারুল গাছের ছায়ায় শীতল হয়ে পানের খিলি বানাতেন ।

এখন তোমার আকাশে সেসব আলপনা ভাসে না আর
এখন চন্দ্রকথা আর চন্দ্রাবলি ছেড়ে চলে গেছে 
শোলোকের মামাবাড়ির চেনা সেইসব চিত্রকথা ।
ঘাট পেরুবার সেই মাতৃমঙ্গল শাঁখাভরা হাত নেই আর
তুমি আমি এখন অনেক অনেক বড়ো হয়ে গেছি

Monday, October 23, 2023

'মাস্তুলে মেঘের পতাকা' অনিশ্চয়চেতনার প্রতীকী নির্মান

'মাস্তুলে মেঘের পতাকা'  অনিশ্চয়চেতনার প্রতীকী নির্মান

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

জীবন ও নদী পরস্পর সম্পর্কযুক্ত । জীবনের সঙ্গে নদীর তুলনা, নদী জীবনের উপমা একটি সাধারন আলংকারিক বিষয় । কাব্যেও নদী ও জীবনকে পাশাপাশি চলতে লক্ষ্য করা যায় । নদীর যেমন রয়েছে নাব্যতা তেমনি জীবনের রয়েছে চলিষ্ণুতা । নদীর গতির পক্ষে চলে যে জলযান সে শুধু ভাটির দেশ আর মোহনার গতিপথ চেনে । গন্তব্য তার নির্ধারিত । সে জলযান উজান চেনেনা । পার্বত্য জলঘূর্ণি তার অজানা । সংঘাত সংকুল নদীর বিপরীতের চলনলড়াইয়ের  অভিজ্ঞতা তার থাকে না । জীবন ও তেমনি অভিজ্ঞতাময় ।

"আমার দাদু বলতেন নদীর পাড়ে এই শীতে 
কচ্ছপের মতো হয়ে যারা পড়ে আছে
 তারা একেক জন আহত সৈনিক
 অনেক ঝড় জলে ডোবা ভাষার দুঃসাহসের উপকথা 
তারা জানে
 তাদের কাছে এখনো মানুষের প্রথমদিনের
তরঙ্গলিপির মগ্ন চিরকুট রয়েছে 
তারাই প্রথম কলসি-কাঁখে মেয়েদের গান শুনেছিল 
বৌ-ঝিদের নাইয়র নিয়ে তারাই গিয়েছিল 
বিল পেরিয়ে দূর কোনো গ্রামে
 আকাশের দুরন্ত মেঘ তারাই প্রথম বশ
 মানিয়ে তাদের মাস্তুলে বেঁধেছিল
 ওই যে শঙ্খচিল তাদের ইঙ্গিতেই ঘুরপাক খায় 
আর জলের উপর শুকনো মাছের আঁশটে গন্ধ ছড়ায়" ( মাস্তুলে মেঘের পতাকা ) ।

 গড়পড়টা জীবনের মত একঘেয়ে গতিতে চললে জীবনের বৈচিত্র্য আসে না । জন্ম, বেড়ে ওঠা, আহার, নিদ্রা, মৈথুন আর মৃত্যুর গৎ বাঁধা নিয়মেই জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে । জীবনের দুঃসহ দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের অভিজ্ঞতায় বাঁচতে চাইলে চলমান প্রবাহের বিপরীতে পা বাড়াতে হবে । সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অসাম্যের বিরুদ্ধে, মানবতার লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে, নির্যাতনের বিরুদ্ধে, বিপরীত অভিযাত্রায় গড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে জীবনকে । চেতনার ভেতর জাগিয়ে তুলতে হবে সেই বোধব্রহ্ম । কবির কবিতার শরীরের চিত্রকল্পে আসবে সে অনুষঙ্গ । উপমায় আসবে তেমনি সুদৃঢ় বেস্টনী ।

বিপরীত বহমানতার জন্যে, হাওয়ার পক্ষে চলার জন্যে, সংক্ষুব্ধ স্রোতের প্রতিকূলে চলার জন্য নৌকার থাকে শক্ত খুঁটি । তার নাম মাস্তুল । সেই মাস্তুলে পাল খাটানো হয়ে থাকে স্রোতের অনুকূলে বা প্রতিকূলে হাওয়া প্রবাহিত হলে মাস্তুলে বাঁধা পাল হাওয়ার চাপে নৌকাকে  নির্ধারিত পথেই তরতরিয়ে নিয়ে যায় । অনুকূলের পথ তো ভবিতব্য । তার মধ্যে কোন বৈচিত্র থাকে না । আর স্রোতের বিপরীতে যখন নৌযান চালানো হয় তখন বিপরীতমুখী স্রোতের বেগের সঙ্গে বিপরীত হাওয়া থাকলে মাস্তুলে বাঁধা পাল নৌকার সংঘাতশক্তিকে অনেকটা সহায়তা করে । নৌকাকে বিপরীত প্রবাহমানতার সংঘাতশক্তি যোগায় প্রকৃতিনির্ভর বায়ু প্রবাহ । অনুকূল হলে পালের শক্তি প্রকাশ পায়। মানব যাপনের সংঘাতেও সংহতির চেতনার দ্যোতক হল গতিমান বায়ুপ্রবাহ । বায়ুপ্রবাহ নৌযানের যে কাজটি করে মানবের সংহতিচেতনাও তেমনি গতানুগতিকতার বিপরীতে প্রতিবাদমুখর করে নদীর বুকে পালখাটা নৌকা আর প্রবহমান জীবনের বুকে মানুষের সংহতিচেতনা সমস্ত অশুভের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় । সে জায়গায় কবি যখন তাঁর কবিতার বা কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম দেন 'মাস্তুলে মেঘের পতাকা' তখনই থমকে যেতে হয় পাঠককে ।

''আকাশের ওই সাদা মেঘগুলো মাস্তুলে জুড়ে দিয়ে
 আমি চেয়েছিলাম গোলুইয়ের ঢেউয়ের শব্দ শুনি
 ঢেউগুলো নৌকার তলপেট ছুঁয়ে সরে যাচ্ছে 
আর নৌকা সেই ঢেউ ভেঙে ভেঙে
 ঢেউয়ের উপর গড়িয়ে গড়িয়ে 
কাঞ্চন মালার দেশে পাড়ি জমাচ্ছে" ( মাস্তুলে মেঘের পতাকা ) ।

যে কাজ করবে মাস্তুলের মাথায় বাঁধা পতাকার মতো পাল সে জায়গায় নিশ্চিন্ত পালের বদলে মেঘকে বেঁধে দিলে কি সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে ? কাব্যনাম কেমন যেন এক বিরোধাভাসের সৃষ্টি করে এখানে । মেঘ তো পালের মতো দৃঢ় দৃশ্যমান নয় । এক ধোঁয়াশার উপর তার কাল্পনিক উপস্থিতি তাছাড়া মেঘকে বেঁধে রাখা যায় না । তার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ও নিশ্চিন্ত নয় । কবি নিজেও তার এই কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাতেই এই অনিশ্চয়তার কথা পরপর দুবার উল্লেখ করেছেন—
ক) কেন জানি কাল রাতে 
      একটিও মেঘ আসেনি । এবং
খ) সারারাত জেগে ছিল সে 
    তবু একটি ও মেঘ নামেনি । ( মেঘ শিকার ) ।
আবার কবি বলছেন–
 "আমার পূর্বপুরুষের বিয়ে হয়েছিল কোন এক নদীর সাথে 
সেই নদীর সন্তানেরাই মাস্তুলে মেঘের পতাকা উড়িয়েছিল 
তারাই দূর দ্বীপের ঘাটে ঋতুমতী মেয়েদের 
আয়ত চোখের কোলে প্রেমের কাজল এঁকেছিল
 নদীর জলে তাদের গান আজও 
মনসার করণ্ডি মতো ভাসে 
নদীর ভিজে বাতাস এখনও তাদের
 গায়ের ঘাম মুছিয়ে দেয়"

কবি দিলীপ দাসের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থে "মাস্তুলে মেঘের পতাকা"র অভ্যন্তরবাসী চব্বিশটি কবিতায় কোনো না কোনো ভাবে এই অনিশ্চয়তার চেতনা দ্বন্দ্বমুখর হয়ে প্রতিফলিত হয়েছে । অনিশ্চিত জীবনকে বয়ে বয়ে কবির চেতনায় জন্ম নিয়েছে অতৃপ্তির অসহায়তা—
"আমি শ্যাওলার জীবন চাইনি কখনো
 ঝড়ের মুখে হাল ভাঙা নৌকা হলে
 অনুতাপ হতো না কোন পাথরে ছোবল মেরে 
বিচূর্ণ হবার সাধ সারা জীবন অপূর্ণ রয়ে গেল—"( ভুল করে বড়ো আগে চলে এসেছি ) । 
তিনি লক্ষ্য করেছেন–
 "সৃজন ও ধ্বংসের সময়টুকু উন্মাদ
 নদীর মতো । আর তালডোঙার মধ্যবর্তী ছায়ার
নির্জীব কাল শুধু হিজড়ের জীবনযাপন
 শুধু পত্রহীন ডালে বসে কামার্ত কূজন" ( ওই ) ।

কবির মানসদ্বন্দ্বের বীজ নিহিত রয়েছে পূর্বপুরুষের চিরকালীন নদীসংসার ছেড়ে, ভদ্রাসন ছেড়ে অজানার পথে পাড়ি দেওয়া জীবনের যন্ত্রণায়, দেশভাগের যন্ত্রণায় । দেশভাগ, বঙ্গবিভাজন বহু মানুষের জীবনকে উথাল-পাতাল করে দিয়েছে । উৎখাত করে দিয়েছে চিরায়ত শেকড় থেকে । এই বেদনা তিনি জানান আরেক বিখ্যাত জীবনকে, অগ্রজ কবি অনিল সরকারকে—
বিক্ষুব্ধ বেদনায় তার বুক 
ভাঙা নৌকার মতো উপুড়
 হয়ে আছে । হৃদয় ভরে আছে দ্রব
 অভিমানে । তবু এই অভিমানের গভীরে
 এক টলটলে জলের পুকুর 
নিজের দুঃখের দরজায় কড়া নাড়ে
 অমাবস্যার ভোর— ( অমাবস্যার ভোর )  ।
দেশভাগ নিয়ে কবির অনুভব–
" তুমি আমায় দিয়েছ
 শ্যাওলার ভাসমান জল 
উদ্বাস্তু জীবন 
আর প্রত্যহের শেকড়হীনতার 
জীর্ণ রামধনু ।
তুমি দিয়েছ এক খঞ্জ পিঞ্জরের
 আকাশ ঝরোকা 
কাঁটাতারে ঝরে যাওয়া দ্বিখন্ড দুপুর ( স্বাধীনতা–৫০ ) ।
দেশভাগের পরিস্থিতিতে কবি সংক্ষুব্ধ । ক্ষোভ ও অভিমানে কবি এই পরিণতিকে ইঙ্গিত করে বলেন—
" তুই নিয়েছিস তুই নিয়েছিস তুই নিয়েছিস তুই 
আমার নদী শাপলা বিল সরষে হলুদ ভুঁই
 তুই নিয়েছিস তুই 

তুই নিয়েছিস কলমি দাম বিলের পানকৌড়ি 
শুশুকভাসা বিকেল আর ভাটিয়ালি সারী 

তুই নিয়েছিস মেঘনা তিতাস দত্তখলার চর 
সহজ সুখ সহজ জীবন গান শালিখের ঘর 

তুই নিয়েছিস তুই 
আমার নদী শাপলা বিল সরষে হলুদ ভুঁই ( তুই নিয়েছিস ) ।
ভিটেছাড়া, ছন্নছাড়া কবি অনেক প্রত্যাশা নিয়েএক নতুন স্বাধীন দেশে এসে প্রতারিতই হয়েছেন শুধু । যে স্বপ্ন জন্মেছিল স্বাধীন দেশকে নিয়ে তাঁর বুকের ভেতর, সেটা তাঁর কাছে ' মনে হয় এ শুধু কথার খেলাপ' । যে—
 "কথা ছিল ল্যাম্পপোস্টগুলো হবে হাওলার ফাঁসির খুঁটি 
গডম্যানরা সব যাবে জেলখানায় 
ইঁদুরের গর্তে আর জমবে না বেনামী ফসল 
কথা ছিল সব চাষা ভুমি পাবে সব জেলে জাল
 মজুরের হাতে রবে কারখানার রশি
 ভিখারি উধাও হবে রাজপথ থেকে,
 কোনদিন আসবেনা গেস্টাপোর সকাল
 মসজিদের আযান হবে মন্দিরের ঝকঝকে চূড়ো" (প্রতারণার পঞ্চাশ বছর ) । "সব কথা আজ নেড়ি কুকুরের মত রাস্তায় গড়ায়" । আর স্বাধীনোত্তর দেশে–
"বিখ্যাত খুনিদের জন্য সবাই জানে
 ফাঁসির দড়ি তৈরি হয় না । এ অহিংসার দেশে তাদের জন্য রাজকীয় উপঢৌকন— অশোক চক্রের মেহগনি চেয়ার —
 তাদের জন্য বাতাসে উড়ে নিলামবালা ছ'আনা ভোটের টিকিট 
পত্রিকার পাতায় উছলে উঠে কামাতুর উচ্ছ্বাস
 স্বাধীনতা দিবসে তাদের জন্যই মখমল তাকিয়া" ( খুনীর হাত ) ।

দেশজুড়ে ধান্দাবাজ সুযোগসন্ধানীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে । খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে দখল নিতে চায় সমস্ত সম্পদের । এরা শামুকের মতো ।
"শামুকেরা সব খায় 
আইনস্টাইনের মজ্জা খায় 
ইতিহাসের পাতা খায়,
 মানুষের উত্থান খায়, মেধার উজ্জ্বল খায় 
রঁদার ভাস্কর্যে কাদামাখা হাত বাড়ায়
 ব্রেখটের বই পোড়ায় 

শামুকেরা যেদিকে যায় পেছনে পুরাণ-শাণিত দাঁতের অন্ধ চিহ্ন 
ঘাসের পোড়া বুকে একে যায় ( শামুক ) ।
আর এদের হাতে নিহত হয় আমাদের অন্নদাতা, সভ্যতার সঞ্চালক কৃষকেরা ।
 "পাঁচ হাজার বছর ধরে আমাদের অন্নের রক্ষক
 যাদের রক্তের ফোঁটায় ভরে ওঠে শস্যের গোলা 
নিখিল মানব শিশু যার স্নেহের কাঙাল
 তাকে কাল খুন করা হয়েছে—

সসাগরা পৃথিবীর মুখে যিনি ভাত তুলে দেন 
সেই অন্নের রক্ষক 
হাজার আলোয় উদ্ভাসিত এ দেশের এক করুণ অন্ধকারে 
কাল একগাছা দড়িতে নিজেকেই খুন করেছেন" ( অন্নের রক্ষক ) । জীবনানন্দীয় শব্দবন্ধে গভীর মর্মবেদনা প্রকাশ করেন কবি এই অসহায়তায় । 
এখন শুধু ক্ষমতাধর এর দাপাদাপি বীরভোগ্যা বসুন্ধরার মত ক্ষমতার কাছাকাছি যারা পৌঁছতে পারে তারাই জীবনের সব সুখ এবং সম্পদের অধিকারী । আজ 'ক্ষমতার প্রকাশ আকাশে বাতাসে অন্তরীক্ষে' । কবির দূরদৃষ্টি সম্পন্ন অন্তরাত্মা তাই আওয়াজ তোলেন—
"বৎস শোনো, ক্ষমতা মানুষের শুভ্র হৃদয়ে 
দুরারোগ্য ক্ষতির মতো । ক্ষমতা
 সেই দুর্গন্ধযুক্ত ঘাম 
যার কাছে কোন নিরীহ মনুষ্য বেশিক্ষণ থাকতে পারে না । কিন্তু এই 
ঘামের কাছে লেপ্টে থাকে উন্নাসিক,
 ক্ষমতা এবং অ-ক্ষমতার মাঝে নির্জীব থাকে অতি সাধারণ,
 আর ক্ষমতাহীন কিন্তু ক্ষমতার লুব্ধরা হয় রাজনীতিক । 
ক্ষমতা অর্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী 
কিন্তু ক্ষমতা লিপ্সু অর্থ-দাস ( ক্ষমতা বিষয়ে দু চার পংক্তি ) । এই যে ক্ষমতার লোভ ও তার পরিণতিতে অস্ত্রের ঝংকার ও নিরীহ মানুষের নির্যাতন অসহায়তা শুধু এদেশেই নয় সারা পৃথিবী জুড়েই এই অবস্থা চলছে । ক্ষমতার কারণে যুদ্ধ ও সংঘাত এবং তার ফলশ্রুতিতে নিরীহ মানুষের বাস্তুচ্যুত পরিযায়ণ, উদ্বাস্ত জীবন কবি নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন । উদ্বাস্তুযন্ত্রণা সে কারণেই তাঁর অন্তরের অনুভূতি। এই অনিশ্চিত জীবন সম্বন্ধে তাঁর সংক্ষোভবিধুর আর্তি । সে কারণেই কখনো নির্ভরতার পাল হয়ে যায় ধোঁয়াশাময় মেঘের মতন । নিশ্চয়তা থেকে অনিশ্চিত জীবনের পটপরিবর্তনের সংশয়াকুল যাত্রা । সে কারণেই অনিশ্চিত উদ্বাস্তু জীবন পেরিয়ে নিশ্চিন্তে অবস্থানের আর্তি—
আমি আর কোথাও যাবো না ।
বনের আলু খেয়ে যারা এখানে বাঁচে
 তারা তো আমাকে যেতে বলে না 
ব্যাধের ভয়ে আমি কেন পালাবো ?

আমি এখানেই থাকবো ।
এই টিলা-লুঙ্গা-ছড়ার কিনারে 
বয়ে যাওয়া ছোট নদীটির মত তিরতির
 যদি পারি খরার দিনগুলোতে 
এক অঞ্জলি তৃষ্ণার জল দিয়ে যাবো—
 সেইসব ভূমিপুত্রদের বলে দাও 
সেইসব ব্যাধ আর খোঁয়াড় ব্যবসায়ীদের বলে দাও 
আমি এখানেই থাকবো—
 এই ছড়া–এই টিলা–এই লুঙ্গা–এই বাঁশবন 
আমায় যতদিন না ছাড়ে 

যারা যেতে চায় তারা চলে যাক ।
আমি আর কোথাও যাবো না ( উদ্বাস্তু সংলাপ ) ।

নতুন দেশে নতুন জীবনকে অতি আপনার করে নিতে চান কবি ।তার পরেও অতিবাহিত জীবনের মাঝে ফ্ল্যাশব্যাকের মত হাজির হয় অতীত জীবনের কথা । অতীত ভূখণ্ডের কথা । যে ভূমিতে কবি বেড়ে উঠেছেন । কবির আলোকদর্শন ঘটেছে সেই বাংলাদেশের কথা ।
 "দরগারঘাট পেরোলেই মাশাউড়ার মঠ
 আদিগন্ত জলে এক পায়ে দাঁড়িয়ে বিচ্ছিন্ন স্বদেশ
 তার পাশে দূরদর্শী এক তালগাছ
 সারাদিন নিজের ছায়ায় 
খুঁজে মরে স্মৃতির অতল প্রদেশ ।

 এইখানে একদিন বিলের চিকন রোদে
 পুটি মাছের পাখনা ঝিকমিক রুপো ছড়াত
 তখনও চালের কেজি কুড়ি টাকা নয়
 জীবন শাঁসহীন শামুকের 
খোলের মতো তখন ভাসমান ছিল না
 তখনও শুয়োরের বুনো চিতকার এমন উৎকট ছিল না, যুবতী রোদ্দুর গিলে খায়নি রাতের শামুক 

সেই সব অপাংশু দিনের কথা
 আমি যখন বলি আমার তরুণ বন্ধুরা, যাদের বয়স খুব বেশি নয় 
চোখে নিষ্পৃহ উদাসীন রেখে 
আমাকে দ্যাখে 
যেন নস্টালজিক এক বুড়ো বটগাছ । এমনতো 
ছিল না আমার জন্মভূমি ? 'উদ্ভট উটের পিঠে' কোথায় চলেছ তুমি ?" ( বাংলাদেশ- ৯৫ ) ।
 অতীতের স্মৃতিভরা প্রিয় দেশের অস্থিরতায় তিনি চঞ্চল হয়ে ওঠেন । প্রশ্ন তোলেন —"
একটা যুদ্ধ যদি তিরিশ লাখ মানুষের
 রক্ত ও শেষ না হয় তাহলে আরো 
কত লাখ মানুষের রক্ত চাই 
বলতে পারেন শামসুর ভাই ?" ( ঐ ) ।

আসলে জীবনের পরতে পরতে ঘাত প্রতিঘাত সংঘাত পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কারণে কবির বোধের ভেতর গভীর আলোড়ন তোলে । আর সে আলোড়ন থেকেই সৃষ্টি হয় মননদ্বন্দ্বের । দ্বান্দ্বিক জীবনে তাই দৃঢ় সংহত পাল হয়ে যায় পলকা, অস্থায়ী আর অস্পষ্ট মেঘের প্রতীকে । এই অস্পষ্টতার মধ্যেও কবির মনে আশার অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়—
"আকাশে যারা সাদা পাল তুলেছে 
আমি তাদের কথা আর কতটুকু জানি
 আমি এক নদীহীন মানুষ—
 পরম্পরাহীন এক অপটু নাবিক 
তবুও আমি চেয়েছিলাম 
আকাশের সাদা মেঘগুলো মাস্তুলে জুড়ে দিয়ে 
গলিয়ে ঢেউয়ের শব্দ শুনি— ( মাস্তুলে মেঘের পতাকা ) । এই ঢেউয়ের শব্দ আসলে জীবনের শব্দ । জীবনের বৃন্দগান । মাস্তুলের মেঘ সেই সঙ্গীতকেই বয়ে নিয়ে যাবে বলে কবি বিশ্বাস করেন ।