Showing posts with label প্রবন্ধ ।. Show all posts
Showing posts with label প্রবন্ধ ।. Show all posts

Wednesday, September 7, 2022

দেশভাগের বিভীষিকা : বাঙালি জাতিসত্তার চিরস্থায়ী যন্ত্রণা

দেশভাগের বিভীষিকা : বাঙালি জাতিসত্তার চিরস্থায়ী যন্ত্রণা

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ত্রিখণ্ডিত হয়ে স্বাধীন হলেও তার পেছনে আরো কিছু কারণ রয়ে গেছিল । তার মধ‍্যে দেশের ভেতর দীর্ঘকালীন ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বঞ্চনার ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে । এই অর্থনৈতিক বঞ্চনার ফলে উপনিবেশিক শাসনে আর্থসামাজিক কাঠামোয় গ্রাম বাংলার অধিকাংশ হিন্দু ও মুসলমান জনগণ বিশেষভাবে দারিদ্র্যের শিকার হয়েছিল । অর্থনৈতিক বঞ্চনার কারণে বিভিন্নভাবে উপেক্ষিত এই সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ  জমা হয়ে উঠেছিল । সেই  ধূমায়িত বারুদের স্তুপে অগ্নিসংযোগ এর কাজটি করেছিলেন দুই ধর্মের মৌলবাদী নেতৃবৃন্দ । তার ফলেই সারা দেশব্যাপী ৪০ এর দশকে ছড়িয়ে পড়েছিল হিংসার রাজনীতি এবং এই অবস্থায়ই চল্লিশের দশকের ধর্মীয় হিংসার উত্তাল তরঙ্গমালা দেশভাগের অবস্থা সৃষ্টি করেছিল ।

আপাতদৃষ্টিতে ভারত বিভাগের পশ্চাৎপট হিসেবে ভারতের অভ্যন্তরীণ দাঙ্গা-কলহকে দায়ী করা হলেও Transfer of Power Documents এর ভিত্তিতে মনে করা হয়, "ভারত সাম্রাজ্য বিসর্জন দেবার সঙ্গে সঙ্গে ভারতবিভাগও ব্রিটিশ নীতির অচ্ছেদ‍্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল । ক্রিপস মিশনে আমরা দেখি এই ব্রিটিশনীতির অকালবোধন, ক‍্যাবিনেট মিশনে তার পূজারতি ও মাউন্টব্যাটেন মিশনে তার পূর্ণাভিষেক ( সুকুমার সেন / ভারত বিভাগ : ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ ভাষা ও সাহিত্য, ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ, পৃষ্ঠা- উনিশ ) । 

মাউন্টব্যাটেন মূলত ভারতবর্ষকে ভাগ করার জন্যই এদেশে এসেছিলেন । এটলি মন্ত্রীসভা ১৯৪৭ এর ২০ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ঘোষণা করেন । তখনও হস্তান্তরের দিনক্ষণ ধার্য হয়নি । ২৪শে মার্চ মাউন্টব্যাটেন ভারতে আসেন এবং দেশভাগের কথা ঘোষণা করেন । এভাবে 15 আগস্ট ১৯৪৭ ক্ষমতা হস্তান্তরের দিনক্ষণ স্থির হয়ে যায় । ৮ই জুলাই ইংল্যান্ড থেকে প্রাক্তন ইংরেজ বিচারক সিরিল র‍্যাডক্লিফ ভারতে আসেন সীমানা কমিশনের চেয়ারম্যান হয়ে । তিনি এর আগে কোনোদিন ভারতবর্ষে আসেননি । মানচিত্র পাঠ করার ( cartographic knowledge )  প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতাও তাঁর ছিলনা । ভারতবর্ষের মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ভাষা ও সামাজিক রীতিনীতি সম্বন্ধেও কিছুই জানেন না ।তিনি এলেন  ভারতবর্ষকে ভাগ করার দায়িত্ব নিয়ে । তিনি সরেজমিনে তদন্তেও গেলেন না । টেবিলে বসেই মানচিত্রের উপর কলম চালালেন । তিনি মাউন্টব‍্যাটেনের কাছ থেকে মাত্র পাঁচ সপ্তাহ সময় পেয়েছিলেন । এদিকে জওহরলাল নেহেরু ও মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ দেশটাকে যতটা সম্ভব দ্রুত ভাগ করার জন্য চাপাচাপি শুরু করেন । ( দেশ ভাগ- দেশত‍্যাগ, অনুষ্টুপ, প্রথম প্রকাশ-১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দ, বর্তমান সংস্করণ- ২০০৭ পৃষ্ঠা-২২ ; লিওনার্দো মোসলে 'দি লাস্ট দেজ অফ দি ব্রিটিশ রাজ'– পৃষ্ঠা ২২১) । এই তাড়াহুড়োর ফল ভয়াবহ হল । দেশের দুইটা অঞ্চলের বুকে নেমে এলো অনিশ্চয়তা আর বিপর্যয় । দুইটা প্রদেশের মানুষের নতুন পরিচয় হলো 'উদ্বাস্তু'। তাদের ছেড়ে যেতে হলো পূর্বপুরুষের বসতি, নদী, মাঠ , প্রান্তর । আশৈশব হেঁটে যাওয়া পরিচিত বনবাদাড় । পেছনে পড়ে রইল স্বজনের  শ্মশান ও কবর । অসহায় অজস্র মানুষের স্থান হল রিফিউজি ক্যাম্প, ফুটপাত আর রেলস্টেশন ‌কিংবা খোলা আকাশ । কারো কারো স্থান হল আন্দামানে কিংবা দণ্ডকারণ্যে ।

মাউন্টব্যাটেন, জওহরলাল ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তৎপরতায় ১৫ই আগস্ট মধ্যরাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয় । বাংলা ও পাঞ্জাবের উপর দিয়ে এই কয়দিন রক্তগঙ্গা প্রবাহিত হয়েছিল । এই কয়দিন শুধু মৃতদেহ নিয়ে ট্রেনগুলি পারাপার করেছিল । বাংলা সীমান্ত দিয়ে লক্ষ লক্ষ হিন্দু।নর-নারী, বৃদ্ধ ও শিশু উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় প্রবেশ করে । অন‍্যদিকে সামান্য সংখ্যক মুসলমান ধর্মাবলম্বী মানুষ পশ্চিমবঙ্গ ত্যাগ করে পূর্ববঙ্গে বা পূর্ব পাকিস্তানের চলে যায় । ব্রিটিশ নীতির দূরভিসন্ধি ও কংগ্রেস-লীগের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে দেশের দু প্রান্তের দুটি জাতি তাদের জাতিসত্তা চিরতরে হারিয়ে খন্ডিত ও রক্তাক্ত স্বাধীনতা লাভ করে ।

 ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে অখন্ড বাংলা ও পাঞ্জাবের মানুষের ভাগ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্যোগ নেমে এসেছিল । মান-সম্মান ও ধর্মনাশের ভয়ে পূর্ববঙ্গ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ নবসৃষ্ট পশ্চিমবঙ্গে, সংলগ্ন আসাম ও ত্রিপুরায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় । পাকিস্তানের অন্তর্গত মানুষ ভারতে অন্তর্ভুক্ত পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও দিল্লিতে আশ্রয় নেয় । ১৯৪৭ সালের ১৪ এবং ১৫ আগস্ট দ্বিখন্ডিত স্বাধীনতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের দুই প্রান্তের  দুটি জাতির নিজস্ব সত্তা ও দ্বিখন্ডিত হয়। ভারতের পশ্চিম প্রান্তে সেদিন রক্তাক্ত স্বাধীনতা প্রত্যক্ষ করেছিল । আর পূর্ব প্রান্তের বাঙালির জাতিসত্তা চিরতরে দ্বিখন্ডিত হয়ে গিয়েছিল । এর ফলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ভারতে গিয়ে যারা আশ্রয় নিয়েছিল তাদের নাম দেওয়া হয় 'মোহাজের' । আর পূর্বপাকিস্তান থেকে যে সমস্ত মানুষ পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের বলা হলো 'উদ্বাস্তু' বা 'বাস্তুহারা' । আবার কোথাও কোথাও এদের নাম দেওয়া হলো 'পাকিস্তানি' কোথাও বা 'ভাটিয়া' বা 'বাঙাল' নামে  স্থানীয় জনগণের তাচ্ছিল্যের শিকার হয় । 

পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্বপাকিস্তানের স্থানীয় মানুষের কাছে এক নতুন মানবগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছিল । যেন তারা মানুষ নয় । যে নামে তারা পরিচিতি পাক না কেন এদের সবার ভাগ্যে উপেক্ষা, অবহেলা,অনাদর ছাড়া যেন আর কোন প্রাপ্তি থাকার কথা ছিলনা । তবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যারা পূর্ব পাকিস্তানে গিয়েছিল তারা ততটা উপেক্ষা অবহেলা বা অনটনের শিকার হয়নি । পূর্ব পাঞ্জাব থেকে যারা পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়েছিল তাদের ভাগ্যেও বেশি দুর্দশা ঘটেনি। ত্রিপুরা, আসাম, পশ্চিমবঙ্গে যারা ধর্ম হারাবার ভয়ে বা প্রাণভয়ে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের পরিচয় দেওয়ার জন্য উল্লেখ করা যেতে পারে, 'সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবাংলার ভূখন্ডে ঢুকল ওরা চোরের মতো । ছিন্নমূল নিঃস্ব মানুষ পিতৃপুরুষের বাস্তুভিটার মায়া কাটিয়ে ছুটেছিল এপার বাংলায় । সব হারানোর বোবা যন্ত্রণা, পৈশাচিক নির্যাতনের নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা আর সামনে ছিল অনুষ্ঠিত ভবিষ্যৎ । যে মাটি ছিল মায়ের মতো, যার ফসলে ওদের জন্মগত অধিকার, সেখানে ওরা পরবাসী । এপারে ঝোপেঝাড়ে, বিলে, অনাবাদি ভূখণ্ডে গড়ে উঠলো নতুন বসতি । যেসব জমি আগাছা ভরা, পরিত্যক্ত, যেখানে কোনদিন ভুল করেও যায়নি মানুষ, বর্ষা ডেকে আনে প্রাণঘাতী বন্যা, সেখানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল বসতি । সরকারি অনুদানের ছিটে ফোঁটা জুটল কপালে । কিন্তু বেঁচে থাকতে, মাটির উপর শক্ত দুপায়ে দাঁড়াতে তার ভূমিকা ছিল নগণ্য । যারা এল দান হাতে, ভাগ্য ফিরল তাদেরই, মানুষকে মানুষ বঞ্চিত করে, না খাইয়ে হাত-পা বেঁধে ঠান্ডা মাথায় খুন করে, তার ইতিহাস রক্তাক্ত না হলেও মর্মান্তিক । একটি জাতিকে নিষ্ঠুরভাবে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র কত যে নিখুঁতভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল তার প্রমাণ সেদিনের অন্ধকারময় ইতিহাস । বাঙালিকে সেদিন ছিঁড়ে খেয়েছে বাঙালি-অবাঙালি সবাই । তাদের পরিণত করা হয় একটি জড়পিন্ডে । অক্ষম অপদার্থ অলস এক জেনারেশনে ! যাদের কোনো ভূমিকা নেই ! মানুষের যাবতীয় সদগুণকে পিষে মারা হল ‌। ওদের পরিচয় হলো 'উদ্বাস্তু' ( কমল চৌধুরী : বাংলায় গণ আন্দোলনের ছয় দশক ( দ্বিতীয় খন্ড ), পত্র ভারতী, এপ্রিল ২০০৯, পৃষ্ঠা-৮৫ ) । এই দীর্ঘ উদ্ধৃতিতে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, আগত উদ্বাস্তু সম্বন্ধে যা যা বলা হয়েছে সন্নিহিত রাজ‍্যগুলির ক্ষেত্রেও  তা বিন্দুমাত্র অতিকথন নয় । পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাঙালি হিন্দুরা উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমবঙ্গ এবং সংলগ্ন আসাম, ত্রিপুরায় কিভাবে কত দুঃখ লাঞ্ছনা আর উপেক্ষা সহ্য করে কোনক্রমে প্রাণধারণ করেছে, কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে তার তুলনা বাঙালির ইতিহাসে সম্ভবত অনুল্লেখিত থেকে যাবে ।

দেশভাগের পরের প্রথম নয় বছরেই পূর্ববঙ্গ থেকে ভারতে চলে এসেছিলেন ২১ লক্ষেরও বেশি মানুষ । ডিসেম্বর ১৯৪৯ এ খুলনা এবং ১৯৫০ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি বরিশাল ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হবার পর এক লাখের কাছাকাছি মানুষ ভারতে চলে আসেন ১৯৫০ সালের ১৮ই এপ্রিল 'নেহেরু-লিয়াকত চুক্তি: বা :দিল্লি চুক্তি: সম্পাদিত হয় । দেশভাগের পরে বিভিন্ন সময়ে পূর্ব বাংলা থেকে কতজন উদ্বাস্তু এপারে এসেছিলেন সে বিষয়ে সঠিকভাবে বলা যায় না । তবে একটা পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৫১ সালে পূর্ববঙ্গ থেকে এপার বাংলা এসেছিলেন ২১ লক্ষ ৪ হাজার ২৪২জন । ১৯৬১ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৩০ লক্ষ ৬৮ হাজার ৭৫০ জন । ১৯৭১ সালে সংখ্যাটি দাঁড়িয়ে ছিল ৪২ লক্ষ ৯৩ হাজার জন । ফলে এই বিরাট সংখ্যার জনগণ একপ্রকার নিঃস্বভাবেই ভিটেমাটি ছেড়ে এদেশে এসেছিলেন । 'নেহেরু লিয়াকত চুক্তি' বা দিল্লি চুক্তি' ১৮ এপ্রিল ১৯৫০ উদ্বাস্তু সমস্যা সম্পূর্ণ সমাধান করতে পারেনি । শরণার্থী আগমনের সংখ্যা কিছুটা কমলেও ৪৭ এর পর পঞ্চাশে, ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরে হযরত বাল মসজিদের দাঙ্গার সময়, ৬৫ তে পাক-ভারত যুদ্ধের প্রাক্কালে, এবং একাত্তরের যুদ্ধের সময় পর্যন্ত অনবরত শরণার্থীরা ভারতে আসতে থাকে । এরা পূর্ববঙ্গ বা বর্তমান বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া মানুষ । চোরাগোপ্তাভাবে সেই স্রোত আজও অব‍্যাহত রয়েছে ।

দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে অনেক বেশি সংখ্যক উদ্বাস্তু আগমন ঘটেছিল । কিন্তু বাস্তবে উদ্বাস্ত আগমনের চাপ পাঞ্জাব অপেক্ষা পশ্চিমবঙ্গ ও সন্নিহিত রাজ্যসমূহে অনেক বেশি ছিল। এর কারণগুলি প্রথমত, পাঞ্জাবের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা আয়তনে অনেক ছোট প্রদেশ । দ্বিতীয়ত, লোক বিনিময়ের ফলে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের উদ্বাস্তুরা লাভবান হয়েছিল । দেশভাগের ফলে পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে যে সংখ্যক উদ্বাস্তু পূর্ব পাঞ্জাবে এসেছিল তার থেকে অনেক বেশি মানুষ পূর্ব পাঞ্জাব থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল। হলে তাদের ফেলে আসা সম্পত্তি বাড়িঘর উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে ব্যবহৃত হয়েছিল । 

দাঙ্গা ও দেশভাগ নামক বিপর্যয়ের ফলে যেসব মানুষ তাদের পূর্বপুরুষের বাস্তুভিটা থেকে উৎখাত হয়ে আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের  বিভিন্ন জেলায় আশ্রয় নিয়েছিল তারা সরকারি সাহায্য ততটা পায়নি, যতটা পেয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তুরা । পশ্চিমবঙ্গের  সরকারের আমলা থেকে শুরু করে স্থানীয় মানুষ সবার কাছে শুধু প্রতারণা আর ঘৃণায় পেয়েছিল । উপরন্তু তাদের ভাগ্যে জুটেছিল অলস ও নিষ্কর্মা অপবাদ । পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তুরা নানাভাবে প্রত্যাখ‍্যাত ও প্রতারিত হয়ে ক্যাম্প গুলিতে মনুষ‍্যেতর জীবন যাপনে বাধ্য হয়েছিল । জন্ম, মৃত্যু তথা প্রাত্যহিক জীবনযাপনে কোন প্রকার আব্রু ছিল না । কিন্তু তারপরও এসব মানুষ এদেশের মাটিতে এদেশে জন সমাজে শেকড়ের সন্ধানে  নিরন্তর নিয়োজিত ছিল । উদ্বাস্তুদের ক্রমাগত আগমনে স্থানীয় সরকার গুলো যেমন অসহায় তেমনি কেন্দ্রীয় সরকার ও উদাসীন ফলে এদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় তেমন কোন কার্যকরী পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ভারতে আগত উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের সমস্যা মিটে গিয়েছিল ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে । কিন্তু ত্রিপুরা, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে আগত উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের সমস্যা আজও মেটেনি । পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার মতো ছোট রাজ্যে স্থান সংকুলনের অভাবে উদ্বাস্তুরা কখনো আন্দামানে, কখনো দণ্ডকারণ্যে নির্বাসনের শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে । নদী-নালা দেশের মানুষ এইসব উদ্বাস্তুদের পক্ষে আন্দামান বা দণ্ডকারণ্য নির্বাসনে তুলল শাস্তি । আন্দামান বা দণ্ডকারণ্যে এই অসহায় মানুষগুলি স্বেচ্ছায় যায়নি তাদের একরকম জোর করে সেখানে পাঠানো হয়েছিল । সেখানেও পরিকাঠামোর অভাবে সরকারি সাহায্যের অপ্রতুলতার কারণে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন আরেকপ্রস্থ প্রহসনে রূপান্তরিত হয়েছিল । শরণার্থী শিবিরগুলোতে নিম্নতম জীবন যাপন করতে বাধ‍্য হয় । শরনার্থী শিবিরের দিনযাপনে নিদারুণ যন্ত্রণা ও গ্লানি থেকে বাঁচার জন্য অনেকেই স্বেচ্ছায় শিবিরগুলো ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম, শহরাঞ্চল ও শহরতলিগুলিতে নিজেদের বাঁচার পথ খুঁজতে থাকে । আর একেবারে নিরুপায় যারা তারা রয়ে যায় । কিন্তু সেই সংখ্যাটি নেহাত কম নয় ।

 প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধানে স্বাধীনতার পর প্রথম পাঁচ বছরে উদ্বাস্তুদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের উপর জোর দেন । তাই ভারতের ইতিহাসে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরবর্তী পাঁচ বছর 'পুনর্বাসনের যুগ' নামে অভিহিত হয় । ভাষাগত সমস্যা না থাকায় পাঞ্জাবের পাঞ্জাবি ও সিন্ধ্রি উদ্বাস্তুরা, দিল্লি, হরিয়ানা হিমাচল প্রদেশ, রাজস্থান ও উত্তরপ্রদেশে নির্দ্বিধায় আশ্রয় নিয়ে সেখানে তারা তাদের বাসস্থান গড়ে তোলে । কিন্তু বাঙালি উদ্বাস্তুরা ভাষাগত সমস্যা ও অন্যান্য কারণে পশ্চিমবঙ্গ ত্রিপুরা ও আসামে আশ্রয় নিতে বাধ‍্য হয় । পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা শরনার্থীদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে নেহরু সরকার উদাসীন দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন । কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের পুনর্বাসনের উদ‍্যোগে যথেষ্ট তৎপরতা দেখা গিয়েছিল । এই প্রয়াস শুরু থেকেই  সুপরিকল্পিত ও সুসংহতভাবে পরিচালিত হয় । কিন্তু পূর্বপাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের জন‍্য সেই আন্তরিকতা ছিল না । পূর্বপাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের সেদেশে তাদের সম্পত্তির অধিকার রয়েছে বলে অজুহাত খাড়া করে তাদের সমপরিমান ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা হয় । অথচ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের তাদের ক্য়ক্ষতির সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় । এই বৈষম‍্যমূলক আচরণের ফলে বাঙালি উদ্বাস্তুরা একদল কায়িক শ্রমজীবীতে রূপান্তরিত হয় । নবসৃষ্ট এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্দশা আজও ঘুচেনি । দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই দরিদ্র মানুষগুলো আজও বিদেশী, বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত।  তাদেরকে আজ 'সন্দেহজনক বিদেশী' বলে সনাক্ত করে, আটক করে 'নো ম‍্যানস ল‍্যান্ডে নির্বাসনে কাটাতে হচ্ছে । পূর্ববাংলা থেকে আগত এই মানুষগুলো ও তাদের উত্তরপ্রজন্মের উপর অমানবিক আচরণ ও  নির্যাতন ও অবিচার চলতে দেওয়া যায় না । পূর্বসূরিদের ভুলভ্রান্তি সংশোধন করে তাদের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটানোর সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার । তাদের জন‍্যে সম্মানজনক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা প্রদান করার জন‍্যে সরকারি স্তরে পদক্ষেপ নেওয়াও দরকার।

দেশভাগের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষ ও তার উত্তরপ্রজন্ম হয়তো স্বপ্ন দেখেন জাতিসত্তার পুনর্মিলনের । কিন্তু এ আর তো হবার নয় । বরং এই উপমহাদেশের মধ‍্যে কোনো ঐক‍্যবদ্ধ সংগঠন সৃষ্টির মাধ‍্যমে একদিকে যেমন পারস্পরিক প্রতিবেশী সুলভ সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ‍্যমে শান্তি-সম্প্রীতি নিবিড় বাতাবরণ সৃষ্টি করা যায় তেমনি পিতৃ-পিতামহের দেশটার স্মৃতিকেও বুকের গভীরে আঁকড়ে ধরে রাখা যায় ।

Saturday, September 11, 2021

পান নিয়ে পাঁচালি : লোকসংস্কংতি ও লোকসাহিত‍্যে

পান নিয়ে পাঁচালি : লোকসংস্কৃতি ও সাহিত‍্যে

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আমাদের প্রতিদিনের জীবনে পূজা পার্বণ থেকে শুরু করে নানাবিধ ঔষধি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে পানের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে । আনুমানিক প্রায় ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে সমগ্র বাংলা তথা ভারতবর্ষের পান খাওয়া নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল । সেই ধারা আজও প্রবহমান রয়েছে । আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্যের 'চিরঞ্জীব বনৌষধি' এবং অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, বৈদিক যুগ থেকে বাংলাদেশের পান এর ব্যবহার চলে আসছে । জাতকের গল্পে ও একাধিক পালি গ্রন্থেও তাম্বুল বা পানের ব্যবহার এর উল্লেখ পাওয়া যায় । হিতোপদেশেও পানের ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে । প্রায় ২ হাজার বছর পূর্বে  আয়ুর্বেদ গ্রন্থকার সুশ্রুত রচিত 'সুশ্রুত সংহিতা'য় আহার্য খাদ্যদ্রব্য পরিপাকের বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,গুরু ভোজনের পরে যেকোনো কোষ্ঠকারক বা কটু স্বাদযুক্ত ফল কিংবা সুপারি কর্পূর জায়ফল লবঙ্গ প্রভৃতি সহযোগে যেন তাম্বুল চর্বন করেন । পানের উপকরণের এই তালিকা থেকে বোঝা যায় সুশ্রুতের কালে পান খাওয়া বিলাসিতায় পরিণত হয়েছিল এবং তা কতখানি পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল । পণ্ডিতেরা প্রাচীনকালে আরও যেসব গ্রন্থে তাম্বুল বা পানের উদাহরণ পেয়েছেন তার মধ্যে 'চরক সংহিতা' ও কালিদাসের বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ।

পান পিপুল পরিবারের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের একপ্রকার লতাজাতীয় গাছের পাতা । আর্য ও আরবগণ পান কে তাম্বুল নামে অভিহিত করতেন। নিঃশ্বাস সুরভিত করা ও ঠোঁট ও জিহ্বা কে লাল করার জন্য মানুষ পান খায় । পান একটি গাছের নাম । এর পাতাকে পান বলা হয় । সংস্কৃত 'পর্ণ' শব্দ থেকে পানের উৎপত্তি । যার অর্থ পাতা । পান খাওয়ার ফলে এক ধরনের তাম্রবর্ণের রসের সৃষ্টি হয় মুখের লালার সঙ্গে মিশে । 'তাম্র' থেকে হয়েছে 'তাম্বুল' । পানের সঙ্গে সুপারি দেওয়া হয় । অনেকে সুপারি ছাড়াও পান খেয়ে থাকেন । ভোজের অনুষ্ঠানের শেষে নানাবিধ সুগন্ধিসহ পান পরিবেশন করে অতিথি কে প্রস্থানের ইঙ্গিত করা হয় । আমাদের নানা উৎসব- অনুষ্ঠান ও মাঙ্গলিক আচারে পান এর ব্যবহার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে রয়ে গেছে । মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর 'চণ্ডীমঙ্গল'-এ ধনপতি সওদাগরের বিবাহ উপলক্ষে পান-সুপারির উল্লেখ রয়েছে– 'তৈল সিন্দুর পান গুয়া /বাটা ভরি গন্ধ চুয়া / আম্র দাড়িম্বপাকা কাঁচা/ পাটে ভরি নিল খই / ঘড়া ভরি ঘৃত দই / সাজায়‍্যা সুরঙ্গ নিল বাছা ।' পান পরিবেশনের জন্য নানা বিধ সরঞ্জামের ব্যবহারও দেখা যায় । সে গুলোকে পানদানি বা 'বাটা' বলা হয় ।ঘুম পাড়ানি গানে শোনা যায় 'ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি মোদের বাড়ি যেও / বাটা ভরা পান দেব গাল পুরে খেও।'

পান ও পানের ব্যবহারের উৎস ও এদেশে আগমনের ইতিহাস সন্ধানে জানা যায় যে পান অস্ট্রো-এশিয়াটিক । পন্ডিতদের মতে পানের ব্যবহার ও  প্রসারণটি অস্ট্রোনেশীয় জনগণের নিওলিথ সম্প্রসারণের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত । এটি প্রাগৈতিহাসিক সময়ে ইন্দো- প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে । দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় পৌঁছে ছিল ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত  । আদি ঠিকানা– ফিলিপিনস, কিংবা জাভা, বোর্নিও । তবে ভারতীয়দের ধারণা, পান একান্তই এ দেশের নিজস্ব সম্পদ ।

পানের জন্ম সম্বন্ধে বহু লৌকিক পৌরাণিক ও ধর্মীয় কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে । মহাভারতের উৎস থেকে জানা যায় যে, অশ্বমেধ যজ্ঞের সময় পানের জন্য পাণ্ডবরা সারা দুনিয়া তোলপাড় করে ফেলেন । শেষ পর্যন্ত পানের সন্ধান পাওয়া যায় পাতালপুরীতে, সাপের আবাসে । তখন বাসুকি তাদের অনুসন্ধানে সন্তুষ্ট হয়ে উপহার দেন তাঁর হাতের কনিষ্ঠা অঙ্গুলি । সেই আঙ্গুল মাটিতে পোঁতার পরে তা থেকে জন্মায় পানের বল্লরী । সে গাছে ফুল নেই, ফল নেই । কেবল সবুজ পাতা । একারণেই সংস্কৃতে পানের আরেক নাম 'নাগবল্লরী' । এ ছাড়া আর একটি পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায় যে, সমুদ্র মন্থনের ফলে উঠেছিল হলাহল । সেই বিষ নিয়ে দেবতারা প্রচন্ড সমস্যায় পড়ে যান । শেষে সেই বিষ গলায় ধারণ করে দেবাদিদেব মহেশ্বর নীলকন্ঠ হলেন । বিষের জ্বালায় তিনি মূর্ছিত হয়ে পড়েন । তখন তার কপালের ঘাম ও শরীরের ময়লা সংগ্রহ করে একটি তামার পাত্রে রাখা হয় । সেই মিশ্রণ থেকে জন্মায় এক সুদর্শন পুরুষ । নারায়ন তার নাম রাখেন 'তাম্বুলপুত্র' । জন্মানোর পর সে যায় নাগলোকে । তার রূপে মুগ্ধ হয়ে যায় নাগকন্যা । সেখানে দুজনের বিয়ে হয় । তাদের ঔরসে জন্মগ্রহণ করে পানরূপী 'নাগবল্লরী' । অনেকে আবার মনে করেন যে অর্জুন স্বর্গ থেকে পানের চারা চুরি করে এনেছিলেন । সেটি তিনি হস্তিনাপুরের রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে লাগিয়েছিলেন । সেই থেকেই মর্তে পানের ব্যবহারের প্রচলন হয় । শ্রীকৃষ্ণের প্রণয়ঘটিত আরেকটি কাহিনি থেকে জানা যায় যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একবার গোপনে বিজেতার ঘরে যান । শ্রীকৃষ্ণকে হাতেনাতে ধরার জন্য শ্রীমতি রাধারানি বিজেতার গৃহে উপস্থিত হন । অন্তর্যামী শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পেরে স্বয়ং সুপারি গাছের রূপ  ও বিজেতা পান গাছের রূপ ধরে লতার মতো তাঁকে জড়িয়ে থাকেন । এ কারণে পানসুপারি দেবতার প্রসাদ হিসাবে গণ্য হয় । এছাড়াও কথিত আছে যে, দেবর্ষি নারদ বৈকুণ্ঠ থেকে এই সুপারি পৃথিবীতে মানুষের ভোগের জন্য এনেছিলেন । শাস্ত্রমতে ব্রহ্মা তুষ্ট সুপারিতে, বিষ্ণু পানে এবং মহাদেব চুনে । পানের খিলিতে বাস করেন ত্রিদেব বা ত্রিনাথ । পানের আরেক নাম সপ্তশির । যেকোনো ধরনের পানে সাতটি শিরা আছে ।

মার্কণ্ডেয় পুরাণে পান খাওয়ার বিধিও বর্ণনা করা হয়েছে । বলা হয়েছে পানের অগ্রভাগে পরমায়ু, মূল ভাগে যশ, এবং মধ্যে লক্ষীর অবস্থান । এ কারণে এই তিন অংশ ফেলে তারপর পান খাওয়া উচিত । মূল ভাগ খেলে কঠিন রোগ, অগ্রভাগ খেলে পাপের ভাগী, কমবে আয়ু আর পানের বোঁটা খেলে নষ্ট হবে বুদ্ধি । পিকও ফেলতে হবে নিয়ম মেনে । পান, সুপারি, মশলায় তৈরি পান চিবানোর পর সৃষ্ট প্রথম রস বিষের মত, দ্বিতীয় রস রেচন, ও তৃতীয় রস অমৃত । এই কারণে প্রথম দুবার এরস খাওয়া চলবে না । শুধু পানই নয় । রয়েছে পান মশলা খাওয়ার নিয়মও । সকালের পানে থাকবে বেশি সুপারি । দুপুরের পানে খয়ের এবং রাতে চুন । সুপারি ছাড়া পান খাওয়া মহাপাপ । এই  পাপস্খালনের জন্য করতে হবে গঙ্গা স্নান ।

আমাদের সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্যে পান এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বিবাহে । বিবাহ অনুষ্ঠান শুরু হয় পানের খিলি দিয়ে । বিবাহ সংক্রান্ত প্রাথমিক নিমন্ত্রণকে বলা হয় 'পানচিনি' নিমন্ত্রণ । বিবাহের জন্য পাত্র কন্যার বাড়িতে রওনা হওয়ার সময় নিয়ে যায় 'যাত্রার' পানসুপারি  । মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গলে আছে ধনপতি বিবাহ উপলক্ষে পানগুয়া নিয়ে যাওয়ার কথা– 'তৈল সিন্দুর পানগুয়া / বাটা ভরি গন্ধ চুয়া  / আম্র দাড়িম্ব পাকা কাঁচা । /পাটে ভরি নিল খই / ঘড়া ভরি ঘৃত দই / সাজায়‍্যা নিল বাছা ।' বিবাহে পান-সুপারির ব্যবহার বংশবৃদ্ধির প্রতীক । কারণ এগুলির প্রচুর ফলন হয় । বিবাহের মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে এগুলোর ব্যবহারে ভাবি দাম্পত্য জীবনকে সফল ও ফলবানরূপে দেখার কামনা-বাসনার প্রতিফলন ঘটে । 'কুলাসাজানো' বা বরণডালা, অধিবাস, গায়ে হলুদ  সর্বত্রই থাকে পান আর সুপারির অবস্থান । জামাই বরণ এর সময় এর ব্যবহার রয়েছে । মুকুন্দরাম তার চন্ডীমঙ্গল কাব্যের কালকেতু উপাখ্যানে কালকেতু ফুল্লরার বিবাহ  সভায় উপস্থিত হয়ে জামাতাকে যথাযথ সম্মান দেখিয়ে শিরে ধান দূর্বা 'নিছিয়া' পান ফেলে এবং গলায় মালা পরিয়ে প্রচলিত আচারের মাধ্যমে বরণ করতে দেখা যায় । 'করিয়া বিরল স্থান/ জামাতারে করে মান/ প্রেমবতী ব‍্যাধের অবলা । / শিরে দিয়া দূর্বা ধান /  নিছিয়া ফেলিল পান / গলে দিল বনফুল মালা ।' অথবা বিবাহের সাত পাকের অনুষঙ্গ হিসেবে চন্ডীমঙ্গল কাব্যে শিব গৌরী বিবাহে পাই– 'শিবে প্রদক্ষিণ গৌরী কৈল সাতবার । / নিছিল পান কৈল নমস্কার ।।

বাঙালির বিবাহের আনন্দঘন অনুষ্ঠান বাসর ঘর সংক্রান্ত আচার । বাসর ঘর বরবধূর কাঙ্খিত ও আনন্দময় অনুষ্ঠানস্থল । বাসরঘরে নতুন বরকে নিয়ে নানাবিধ ও কৌতুক আনন্দের আসর করা হয় । বরপক্ষ কন্যাপক্ষ দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে পরস্পর নানা প্রতিযোগিতা ও হাসি ঠাট্টায় মেতে ওঠে । বাসর ঘরে কন্যাপক্ষ পাত্র পক্ষের জন্য পান সাজিয়ে রাখে । পানের মধ্যে ঝাল লঙ্কা ঢুকিয়ে নতুন জামাইকে বিব্রত করতে দেখা যায় শালিকা কিংবা কনের বান্ধবীকে । সতর্ক বর পানের খিলি খুলে তবে মুখে দেয় । আবার এই পান খাওয়ার আগে পাত্রপক্ষকে কন্যা পক্ষের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় । সেখানেও থাকে পানকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের ধাঁধা । এরকম একটি প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক ধাঁধা যেখানে পানের জন্মকথা জানতে চাওয়া হয় ।  প্রতিবেদকের সংগৃহীত এরকম একটি প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক ধাঁধা নিচে তুলে ধরা হলো–প্রশ্ন :  :পান খাও পন্ডিত ভাই কথা কও লা রে / পানের জন্ম কোন অবতারে? / যদি না কইবা পানের  কথা / ছাগল অই খাইবা হর্বার পাতা ।'পাত্র পক্ষের একজন উত্তরের বিনিময়ে অসম্ভব কিছু দাবি করে বসে–'আগে আন ছ'মন খই  ন'মন দই / তই যাই পানের কথা কই ।' সবশেষে একজন আবার ছড়া কেটে ধাঁধার উত্তর দিয়ে দেয়– 'লঙ্কায় জর্মিছিল পানগুয়া রাবণের দেশে / ছিরাম গেছিল যন সীতার তালাইশে /   পোপনপুত্র হনুমান গেছিল তার সাথে / হারি আইনছিল চারা রামের অজ্ঞাতে / সাত মুড়া হব্বতে আনি ছাড়ি দিল /  বারইয়ে পাই তারে যতন করি ছিল / টেকনাফের গুয়া রে ভাই মইশখালির পান / বারইয়ে জানে এই পানির সন্ধান / নিদাইন্না বৈশাখে গুয়ায় ছাড়ে ছড়া / বাইষ‍্যাকালে বরের মাঝে পানের লতা ধরা / এক কান করি ছিঁড়ে  আর বিড়া করি রাখে / বারইয়ার ঘরে ঘরে এই পান থাকে / চাইরগায় এক গন্ডা আডারো গন্ডায় বিড়া / বাজার তুন কিনবা পান ভিতর খাইবা ছিঁড়া ।'

প্রবাদ, প্রবচন, লোকসংগীত, ছড়া ইত্যাদি লোকসংস্কৃতির বহু উপাদান এর মধ্যে প্রাণের উপস্থিতি পাওয়া যায় । প্রবাদের মধ্যে যেমন উল্লেখ পাওয়া যায়–'ভালোবাসার এমন গুণ / পানের সঙ্গে যেমন চুন / বেশি হইলে পুড়ে গাল /কম অইলে লাগে ঝাল ।'  'ছাগলের মুখে পড়ল পান/  পান বলে গেল মোর জান ।' 'খাবায় ভাত না খাবে পান / হেই ভাতের কিবা মান ।' অর্থাৎ নেমন্তন্নের পর পানের ব্যবস্থা না করলে সেই নেমন্তন্নের কদরই থাকেনা । খনার বচনে পান চাষের পদ্ধতি সম্বন্ধে উল্লেখ রয়েছে–'ষোল চাষে মূলা / তার অর্ধেক তুলা / তার অর্ধেক ধান / বিনা চাষে পান ।' বাংলা লোক সংগীতেও দেখা যায় পান প্রসঙ্গ । 'সুজন মাঝি কই যাও / একখান কথা কইয়া যাও / ঘাটে লাগাইয়া ডিঙ্গা / পান খাইয়া যাও ।'  ছড়ায় পাওয়া যায়– 'কিবা দেশে আইলাম রে ভাই কিবা দেশের গুন / একই গাছে পান-সুপারি একই গাছে চুন ।' 'পান খাইও রসিক জামাই, কথা কইও ঠারে ।'

প্রাচীন বাংলা কাব্য চর্যাপদ ও মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য গুলো লোকসংস্কৃতির উপাদানে পরিপূর্ণ । এই সাহিত্যসমূহে বাঙালির লৌকিক জীবন  যতটা আন্তরিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তা মধ্যযুগের আর কোন আঙ্গিকে লক্ষ্য করা যায় না । বাঙালির দৈনন্দিন জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার অনুষ্ঠান এবং নিজস্ব বিশ্বাস, সংস্কার বিধিনিষেধ প্রায় প্রতিটি মঙ্গলকাব্যে ফুটে উঠেছে চর্যার ২৮ নম্বর পদে পাই– 'হিঅ তাঁবোলা মহাসুহে কাপুর খাই / সুন নৈরামণি কন্ঠে লইয়া মহাসুহে রাতি পোহাই ।' অর্থাৎ–শবর তাম্বুল কর্পুর খায় 
, শূন‍্য নৈরামণি আলিঙ্গনে মহা সুখে রাত ভোর করে । ময়নামতির গানে নায়িকা ময়না যে পান খেতেন তার উপকরণ ছিল গুয়ামুরি, ধনিয়া, জৈষ্ঠমধু, লং, জায়ফল, এলাচ, দারুচিনি ও কর্পুর । শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে তো তাম্বুল খন্ড নামে একটি অধ্যায়ই রয়েছে । বড়াই এর কাছে রাধিকার রূপবর্ণনা শুনে তাঁর রূপে মোহিত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ বড়াই এর হাতে ফল তাম্বুল পাঠিয়ে রাধার কাছে প্রেমের প্রস্তাব পাঠান । এখানে বলা হয়েছে–'কথা খানি কহিল বড়ায়ি / বসিয়া রাধার পাশে ।/ কর্পূর তাম্বুল দিয়া রাধাক বিমূখ বদনে হাসে ।' কবিকঙ্কন এর চন্ডীমঙ্গলে আছে, রাজার নির্দেশে ধনপতি নৌকা নিয়ে যাত্রা করেন সিংহলের উদ্দেশ্যে । কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম লিখেছেন– 'নানা আভরণ পরি / ডালি করে নিলো ঝারি/ বাস করে তাম্বুল সাঁপুরা /' চন্ডীমঙ্গলে দেখা যায় ভাঁড়ু দত্তের পেটে ভাত না জুটলেও পান খাওয়া চাই । 'অধরে না চিনে অধরে না চিনে অন্ন, তাম্বুল পান মুখে' । আবার মনসামঙ্গলে লক্ষিন্দরের বিবাহ পালায় কবি লিখেছেন–'ধর ধর। বলাধিক খাও গুয়া পান /  লখাইর সঙ্গে কটক যাইবে যাইবে সাজাইয়া আন ।' এছাড়া আরও লক্ষ করা যায়–১) দাসীতে যোগায় পান গালে গোটা গুয়া ( ধর্মমঙ্গল ) ২)পান বিনা পদ্মিনীর মুখে ওড়ে মাছি ( বিদ্যাসুন্দর ) ৩)তাম্বুল রাতুল হইল অধর পরশে ( পদ্মাবতী– আলাওল ) ৪) আধ মুখে ভাঙ্গ ধুতুরা ভক্ষণ / আধই তাম্বুল পুরিরে ( অন্নদামঙ্গল ) ৫)ভোজন করেন রাম পরম হরিষে/  দধি দুগ্ধ দিল রাজা ভোজনের শেষে ।। সুতৃপ্ত হইল সবে করে আচমন / কর্পূর তাম্বুল করে মুখের শোধন  রামায়ণ) ৬)সুবাসিত কর্পূর তাম্বুল পুষ্প নিয়া / যজ্ঞ পূর্ণ করে বেদ উচ্চারিয়া । ( মহাভারত ) ৭)সিদ্ধান্ত যোগী পান নাহি খায় / পানের বদলে তারা হরতকি চাবায় ।  (গোপীচন্দ্রের গান)৮) আচমন করিয়া প্রভু বসে সিংহাসনে/  কর্পূর তাম্বুল জোগায় প্রিয় ভক্তগণে ।( চৈতন্যচরিতামৃত) । ৯)হাথক দরপণ/ মাথক ফুল / নয়নক অঞ্জন/ মুখক তাম্বুল ( বিদ্যাপতি)১০) খেজুর পাতা হলদি মেঘ নাম জলদি / এক বিরা পান ঝুপ ঝুপাইয়া নাম ( ময়মনসিংহ গীতিকা )১১)জলপূর্ণ ঘটে সিঁদুরের ফোটা / আমের পল্লব দেবে তাহে এক গোটা / আসন সাজায়ে দিবে তাতে গুয়া পান / সিঁদুর গুলিয়া দিবে ব্রতের বিধান ।(লক্ষ্মীর পাঁচালি )১২)কৃষ্ণ তন্ডুলেতে মিশাইবে গুড়/ সন্দেশ শর্করা আর তাম্বুল কর্পূর ( শনির পাঁচালি ) ।

দুর্গোৎসবের সময় দশমীর দিন দুর্গাকে সিঁদুরে রাঙিয়ে, মিষ্টিমুখ করিয়ে, পান, ধান, দূর্বা দিয়ে বিদায় জানানোর রীতি-রেওয়াজ রয়েছে । পান চাষের ক্ষেত অর্থাৎ পানের বরে স্ত্রীলোকের প্রবেশ নিষেধ রয়েছে । এতে নাকি পান নষ্ট হয়ে যায় । ছোটো শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্যের দরুন মলত্যাগে অসুবিধা হলে গুহ্যদ্বারে পানের বোঁটা দিয়ে রাখলে সুফল পাওয়া যায় এছাড়া পেট ব্যথা করলে পান পাতায় ঘি মাখিয়ে গরম করে পেটে সেঁক দিলে ব্যথা কমে । এছাড়া পানের আরো লোকওষধি গুণ রয়েছে ‌। ১)পান পাচনশক্তি বাড়ায় ।২)গলার আওয়াজ পরিষ্কার করতে পান উপকারী ৩)রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পান সাহায্য করে ৪)পান খেলে মুখের স্বাদ ফিরে আসে ৫)হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করে ৬)পান খেলে পেট পরিষ্কার হয় ৭)সর্দি কাশি হলে পানের সাথে মধু মিশিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায় ৮)পানের সাথে গোলমরিচ লবঙ্গ মিশিয়ে খেলে কাশি কমে ৯)মুখে ঘা হলে পানের মধ্যে কর্পূর দিয়ে চিবিয়ে খেয়ে বারবার পিক ছেলে ফেললে সুফল পাওয়া যায় ১০)পানের মধ্যে থাকা গুলকন্দ কর্মক্ষমতা বাড়ায় ।

পান খাওয়া একটি বিলাসিতার অঙ্গ । যথার্থ পানরসিক সাজিয়ে গুছিয়ে পান খেতে বসেন । পান খাওয়ারও তাই নানা সরঞ্জাম রয়েছে ।পানের বাটা, পানদানি, পানের ডিবি, চুনের কৌটো, পিকদানি, জাঁতি ইত্যাদি । বয়স্কদের জন্য পান চূর্ণ করে পরিবেশন করার জন্য রয়েছে হামানদিস্তা । এইসব সরঞ্জামের গঠনশৈলীতে রয়েছে নানা কারুকাজ, নানা নকশা । কাঠের,লোহার, রুপার কিংবা পিতলের হয়ে থাকে এসব সরঞ্জাম ।পান সাজার মধ্যেও রয়েছে নির্মাণ কুশলতা ।নানা আকারে দৃষ্টিনন্দন করে তৈরি করা হয় পানের খিলি । এককথায় এর মধ্যে বাংলার লোকশিল্প শিল্পের নিদর্শনটি স্পষ্ট ।

পান নানা আভিচারিক ক্রিয়ায়ও ব্যবহার হয় । যেমন পান বশীকরণ মন্ত্রের প্রধান উপাদান । যাকে বশ করা হবে শনি কিংবা মঙ্গলবারে তার কাছ থেকে একখিলি পান সংগ্রহ করে আনলে গুনিন তা দিয়ে তার যাদু-টোনা করেন । এরকম অন্য আভিচারিক ক্রিয়ায় একদমে বাজার থেকে পান কিনে আনতে হয় ।

পান যেমন সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে আছে তার ব্যবহারিক গুণে তেমনি পানকে কেন্দ্র করে ভয়ঙ্কর ঘটনাও ঘটে যেতে পারে । ইতিহাসের উদাহরণ থেকে সংগ্রহ করা ঘটনাটি বিবৃত করে এই প্রবন্ধের সমাপ্তি টানব । পানে বিষ মিশিয়ে শত্রু বা অনাকাঙ্ক্ষিত জনকে হত্যা করার কাহিনি ইতিহাসে রয়ে গেছে । ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ের সে কাহিনী বর্ণনা করেছেন । মুঘল আমলে আগত ইউরোপীয় পর্যটকদের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত ছিলেন ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার  (১৬২০- ১৬৮৮) । ১৬৫৮ সালে যুবরাজ দারাশিকোর অনুরোধে তিনি শাহজাহানের চিকিৎসক হিসেবে দিল্লিতে এসেছিলেন ফ্রান্সে ফিরে তিনি ভয়েজেস (১৬৭০)নামে একটি ভ্রমণ কাহিনি লেখেন । তার লেখা বিবরণে জানা যায়, সম্রাট শাহজাহান একসময় সন্দেহ করতে শুরু করেন যে, তার বড় মেয়ে জাহানারা নজর খাঁ নামে এক সুপুরুষ যুবকের সঙ্গে প্রণয়ে লিপ্ত । সম্রাট প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে যুবককে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন । একদিন তিনি সভাস্থলে নিজ হাতে ওই যুবককে একটি পানের খিলি উপহার দিলেন । যুবক তার প্রেমের সফলতার স্বপ্নে মশগুল হয়ে সম্রাটের দেওয়া পানের খিলি নিঃসন্দেহে গ্রহণ করল । পানটি খেয়ে দরবার ছেড়ে বাড়ির পথ ধরার জন্য পালকিতে উঠলো । কিন্তু তীব্র বিষক্রিয়ায় যুবকটি পথেই প্রাণ ত্যাগ করল ।