Showing posts with label অশোকানন্দ রায়বর্ধন. Show all posts
Showing posts with label অশোকানন্দ রায়বর্ধন. Show all posts

Friday, April 3, 2026

দক্ষিণ ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন চর্চার ইতিহাস

দক্ষিণ ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন চর্চার ইতিহাস 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

লিটল  ম্যাগাজিন আধুনিক সময়কালের সাহিত্য আন্দোলনের এক তেজস্বী ধারা ৷ এর উৎস নিহিত রয়েছে বাংলা সাময়িকপত্রের প্রবহমান ইতিহাসের বুকে ৷ সেকারণে বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাসকে বাদ দিয়ে বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস রচনার প্রয়াস অসম্পূর্ণ থেকে যায় ৷ সে হিসেবে ' দিগদর্শন'কে প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র হিসেবে ধরে নেওয়া যায় ৷ শ্রীরামপুর মিশনের উদ্যোগে শ্রীরামপুর থেকে ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম এই সাময়িকপত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল ৷ এর সম্পাদক ছিলেন জন ক্লার্ক মার্শম্যান ৷ চার পৃষ্ঠার এই সাময়িকপত্রটি বাংলা- ইংরেজি দ্বিভাষিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশ পেয়েছিল ৷ বাঙালি সম্পাদক কর্তৃক প্রথম প্রকাশিত সংবাদপত্র হল ' বেঙ্গল গেজেট' ৷ এটি প্রকাশিত হয় ১২২৫ বঙ্গাব্দ ৷১৮১৮ সালের মে মাসে শ্রীরামপুর মিশনারিদের দ্বারা প্রকাশিত প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক ' সমাচার দর্পণের প্রায় সমসাময়িক  সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে বেঙ্গল গেজেট প্রকাশিত হয় ৷ সম্পাদক ছিলেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য ৷ এখন পর্যন্ত  বেঙ্গল গেজেট এর কোনো সংখ্যা পাওয়া যায় নি ৷ ফলে এটির সঠিক প্রকাশকাল জানা যায় না ৷ ১৪ মে ১৮১৮ প্রকাশিত বেঙ্গল গেজেট- এর একটি বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায় যে এই সাপ্তাহিকটি ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ৷ প্রথম প্রকাশিত এই পত্রিকাটি সম্ভবত এক বৎসরকাল স্থায়ী হয়েছিল ৷ শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত জন ক্লার্ক মার্শম্যান সম্পাদিত বাংলাভাষার প্রথম সাপ্তাহিক সংবাদপত্র হল ' সমাচার দর্পণ' ( ১৮১৮-১৮৫২) ৷
ব্যতিক্রমী চিন্তাধারার সাহিত্য আন্দোলনকে মুদ্রিত আকারে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সৃষ্টি হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন ভাবনা ৷ উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে ইউরোপ- আমেরিকায় লিটল ম্যাগাজিনের সূত্রপাত ঘটে ৷ Ralph Waldo Emarson  ও Margaret Fuller সম্পাদিত The Dial ( Boston,1840-1844)  এর মাধ্যমে ৷ Emarson এর নব্য দর্শন Transendentalism- এর যাঁরা অনুসারী তাঁরাই Dial ম্যাগাজিনে লিখতেন ৷ লিটল ম্যাগাজিনের প্রথম দিকের আর একটি পত্রিকা ছিল ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত 'Savoy' ৷  ভিক্টোরিয়ান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বিরুদ্ধে সোচ্চার উদারপন্থী ও সাম্যবাদী লেখকদের প্রধান মাধ্যম ছিল লিটল ম্যাগাজিন ৷ সাহিত্যক্ষেত্রে বিশ শতকের শুরুর দিকের সবচাইতে মূল্যবান লিটল ম্যাগাজিন ছিল Poetry:  A Magazine Of Verse (  Chicago-1912) ৷ এই পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন হেরিয়েট মুনরো এবং এজরা পাউন্ড ৷ 
পশ্চিমা ধারায় বাংলাদেশে প্রথম লিটল ম্যাগাজিনের স্রষ্টা প্রমথ চৌধুরী ৷ তাঁর সম্পাদিত ' সবুজপত্র' ( ১৯১৪)-কে  বাংলা আধুনিক লিটল ম্যাগাজিনের প্রথম ফলক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ৷ অবশ্য এ  নিয়ে দ্বিমতও রয়েছে ৷ অনেক সাহিত্য আলোচক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ' বঙ্গদর্শন' ১৮৭২)-কে বাংলাভাষার প্রথম লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে দাবি করেন ৷ পরবর্তীকালে কল্লোল ( ১৯২৩) , শনিবারের চিঠি ( ১৯২৪) , কালিকলম ( ১৯২৭) , প্রগতি ( ১৯২৭) , পূর্বাশা ( ১৯৩২)  এবং কবিতা ( ১৯৩৫)  ইত্যাদি লিটল ম্যাগাজিন প্রবাহে গতিসঞ্চার করে ৷
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ত্রিপুরা থেকে 'ত্রিপুরা জ্ঞান প্রসারিণী' নামে একটি মাসিক সাময়িকপত্র প্রকাশিত হয় ৷ তবে এই পত্রিকাসহ পরবর্তী সময়ের বেশ কিছুটা কাল পত্রিকা প্রকাশের পিছনে রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতা ছিল ৷ এমনি করেই মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের আমলে রাধারমণ ঘোষের সম্পাদনায় 'বার্ষিকী' ( ১৮৭৬)  নামে একটি সাহিত্যপত্র প্রকাশিত হয় ৷ মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্যের আমলে  হাতে লেখা 'পঞ্চপন্ডিত' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয় ৷ তারপর মহারাজকুমার মহেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মার সম্পাদনায় 'ধূমকেতু' ( ১৯০৩) , সুরেন্দ্র দেববর্মা সম্পাদিত 'বঙ্গভাষা' ১৯০৩) , চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদের সম্পাদনায় 'অরুণ' ( ১৯০৫) ,  ভূপেন্দ্রচন্দ্র সেন সম্পাদিত 'সাধনা' ( ১৯১২)  ভারতচন্দ্র দেববর্মা সম্পাদিত 'শিক্ষণ' ( ১৯১২)  ইত্যাদি সাময়িকপত্র প্রকাশিত হয় ৷ ১৯২৪ সালে মহারাজকুমার নরেন্দ্রকিশোর দেববর্মণ সম্পাদিত 'রবি' পত্রিকা সেকালের বাঙালি বিদগ্ধ পাঠকসমাজে বেশ আগ্রহের সঙ্গে স্থান করে নিতে পেরেছিল ৷ ১৯২৬ সালের ১৬ই জানুয়ারি তদানীন্তন কুমিল্লা জেলার সরাইল পরগনার চুন্টা গ্রাম থেকে 'চুন্টা প্রকাশ' নামে একটা পত্রিকা প্রকাশিত হয় যা একসময় বহুল প্রচারিত ছিল । পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন অপূর্বচন্দ্র ভট্টাচার্য । পৃষ্ঠপোষকতা করেন ত্রিপুরার মহারাজকুমার নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মন। এই সময়ে সরাইল থেকে প্রকাশিত হত 'পল্লী প্রদীপ' নামে আরেকটি পত্রিকা । দেশের স্বাধীনতাকালে ত্রিপুরা স্বাধীন রাজ্য ছিল ৷ এই সময়ে বেশ কয়েকটি সাময়িকপত্র ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ৷ পরবর্তী সময়ে অসংখ্য সাময়িকপত্র ও লিটল ম্যাগাজিন ত্রিপুরার সাহিত্যকে পুষ্ট করে আসছে ৷ ত্রিপুরা রাজ্যের ভারতভুক্তির পরবর্তী সময় থেকে আজ পর্যন্ত গান্ধার, জোনাকি, নান্দীমুখ, সৈকত, শাব্দিক, অগ্রণী,গ্রুপ সেঞ্চুরি, বাংলা কবিতা, ভাষা সাহিত্য, জলজ, স্রোত, সময়সংকেত, পাখিসব করে রব,বনতট,দোপাতা, ইত্যাদি প্রতিনিধিস্থানীয় লিটল ম্যাগাজিনগুলো সময়ে আন্দোলন সৃষ্টি করে চলেছে ৷

' জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুঃ' বলে একটা চিরন্তন প্রবাদ রয়েছে ৷ লিটল ম্যাগাজিনের ক্ষেত্রেও যেন এ কথাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য ৷ চরিত্রের দিক দিয়ে সে যতোটা দৃঢ় হোক না কেন, আয়ুষ্কালের ক্ষেত্রে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই ৷ দক্ষিণ ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনগুলোর ভবিষ্যৎও একই খাতে প্রবাহিত ৷ কোনোটা আতুড়ঘরেই কালের গর্ভে চলে গেছে ৷ আবার কোনোটা হাঁটি হাঁটি পা পা করে কিছুটা পথ হয়তো এগিয়েছে ৷ আবার সাম্প্রতিককালের কোনোটা কিছুটা কোমর সোজা করে এগিয়ে চলেছে ৷ বিলোনিয়া,  সাব্রুম ও শান্তিরবাজার এই তিনটি মহকুমা নিয়ে দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলা হিসেবে নবীন হলেও জনপদ হিসেবে যথেষ্ট প্রাচীন ৷ এর মধ্যে বিলোনিয়ার রাজন্য সম্পৃক্ততার একটা ইতিহাসও রয়েছে ৷ অনান্য মহকুমাগুলোর চেয়ে এই মহকুমার বয়স কিছু বেশি ৷ ফলে শিক্ষা- সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চার পরিমন্ডলটি এই মহকুমার কিছুটা বেশি ৷ সাহিত্যচর্চার আঁতুড়ঘর এবং মননচর্চার প্রাথমিক প্ল্যাটফরম  হিসেবে এই জেলার বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহের দেওয়ালপত্রিকা এবং মুখপত্রসমূহ অলক্ষ্যের কারিগর ৷ এই জেলার বিদ্যালয়গুলোর দেওয়ালপত্রিকার এবং মুখপত্রের একটা সমৃদ্ধ ইতিহাসও রয়েছে ৷  বিলোনিয়া সেক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়েই রয়েছে ৷ বৃহত্তর পরিসরে সাহিত্যচর্চার বিশেষ মাধ্যম হল লিটল ম্যাগাজিন ৷ লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমে সাহিত্যচর্চার হাতেখড়ি দিয়েই বিলোনিয়ার প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হরিভূষণ পাল, হরিনারায়ণ সেনগুপ্ত, দুলাল ভৌমিক, রসসিন্ধু ভট্টাচার্য, দুলাল চক্রবর্তী, কুসুমকুমার পাল,  রাখাল মজুমদার, দেবাশিস চক্রবর্তী, দিবাকর দেবনাথ, মাধুরী লোধ, চন্দন পাল, মিঠু মল্লিক বৈদ্য, অজয় বৈদ্য, শংকরীপ্রসাদ বৈদ্য, জগন্নাথ বনিক, শ্রীমান দাস প্রমুখগণ, সাব্রুমের ড. রঞ্জিত দে, কৃষ্ণধন নাথ, ড.ননীগোপাল
চক্রবর্তী, দীপক দাস, অশোকানন্দ রায়বর্ধন, তরুণতম কল্যাণব্রত বসাক ও সঞ্জীব দে, বিজন বোস, শান্তিপ্রিয় ভৌমিক, বিনয় শীল, রতন চক্রবর্তী, সনজিৎ মালাকার,সঞ্জয় দত্ত, জয় দেবনাথ, বিবেকানন্দ রায়বর্ধন, মনীশ কুরী,  রূপন মজুমদার, রূপন সূত্রধর,দুলাল চক্রবর্তী, তপন বৈদ্য, পলাশ শর্মা, আকাশ নাথ প্রমুখগণ, শান্তিরবাজারের অমর মিত্র, তারাপ্রসাদ বনিক, তরুণদের মধ্যে  সুমন পাটারি,অভীককুমার দে ও অমরকান্তি সূত্রধর,সুদর্শন সদাগর, অনামিকা লস্কর ভৌমিক, তাপস দত্ত, লক্ষ্মী পাল প্রমুখ রাজ্যের পরিমন্ডলে  পরিচিত হয়ে উঠে এসেছেন ৷ 

যেহেতু বিলোনিয়া মহকুমার বিলোনিয়া শহর দক্ষিণ ত্রিপুরা তথা রাজ্যেরও প্রাচীন শহরের মধ্যে একটি  সে কারণে জেলার মধ্যে এখানে লিটল ম্যাগাজিন চর্চার সূত্রপাত ঘটেছিল ৷ উল্লেখ্য যে বিলোনিয়া শহরে একসময় ছাপাখানা ছিল না ৷ ফলে শুরুর দিকে দীর্ঘদিন এখানে হাতে লেখা লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হত ৷ হাতে লেখা হলেও এই সংখ্যাগুলোতে বেশ যত্নের ছাপ পরিলক্ষিত হত ৷ এই পত্রিকাগুলো শুধু গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা অন্যান্য রচনায় সমৃদ্ধ ছিল না ৷ দৃষ্টিনন্দন অলঙ্করণ ও ইলাস্ট্রেশনও এগুলোকে অন্যমাত্রায় প্রতিষ্ঠিত করত ৷ দেশবিখ্যাত ভাস্কর শিবপ্রসাদ চৌধুরী বিলোনিয়ার সন্তান ৷ তাঁর শিল্পকর্মের হাতেখড়ি এইসব ম্যাগাজিনে প্রচ্ছদ সহ অভ্যন্তরীণ অলঙ্করণের মাধ্যমে ৷ প্রতিটি সংখ্যার দু-তিনটে কপি করে যথাক্রমে বিলোনিয়া জনগ্রন্থাগার, তথ্যকেন্দ্র ও কোনো কোনো সময় বিলোনিয়া কলেজের লাইব্রেরির রিডিং রুমে রাখা হত ৷ ফলে এইসব লিটল ম্যাগাজিনের পাঠকরা অধিকাংশই ছিলেন স্থানীয় ৷ কর্মসূত্রে কোনো অগ্রহী পাঠক বিলোনিয়ায়  অবস্থান করার সুবাদে তাঁরাও পড়তে পারতেন  এইসব ম্যাগাজিন ৷  কোনো কোনো ম্যাগাজিনের শেষের দিকে পাঠকের মতামত প্রকাশের জন্যে কিছু সাদা পৃষ্ঠা জুড়ে দেওয়া হত ৷ পাঠকগণ সেখানে মতামতও প্রকাশ করতেন ৷

বিলোনিয়া থেকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনের প্রাচীনতার সন্ধান করতে গিয়ে জানা যায় যে, কবি দুলাল ভৌমিক ও রাজ্যের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হরিভূষণ পাল তাঁদের দুটি নিবন্ধে জানিয়েছেন যে, বিলোনিয়ার প্রথম লিটল ম্যাগাজিন হল 'অভিযান' ৷ প্রকাশকাল-১৯৪৫ ৷ শ্রীদুলাল ভৌমিকের মতে তখন সম্পাদক ছিলেন গগন চক্রবর্তী ৷ হরিভূষণ পালের মতে মাণিক গাঙ্গুলি ও জগদীশ বসু ৷ প্রথম প্রকাশিত লিটলম্যাগাজিন হিসেবে এই পত্রিকার পক্ষে প্রাগুক্ত দুইজনের মতকেই সমর্থন করেন বিলোনিয়ার বিশিষ্ট কবি ও সংগঠক হরিনারায়ণ সেনগুপ্ত ৷ অবশ্য এর প্রকাশকাল হিসেবে ১৯৪৩-৪৪ বলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন ৷ সম্ভবত এই পত্রিকার প্রথম দিকে এই দুইজন সম্পাদক ছিলেন ৷ পরবর্তী বৎসরে হয়তো সম্পাদক ছিলেন গগন চক্রবর্তী ৷ মোদ্দা কথা বিলোনিয়ার প্রাচীনতম লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে বিদগ্ধ মহলের কাছে 'অভিযান'ই চিহ্নিত হয়ে আসছে ৷ এই ম্যাগাজিনটি কয়টি সংখ্যা প্রকাশ করেছিল সে বিষয়ে কিছু জানা যায় না ৷ 
   এরপর যতোটুকু জানা যায়, দীপক দে-র সম্পাদনায় 'শ্বেতপত্র' প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে ৷ এই শ্বেতপত্রকে প্রয়াত হরিভূষণ পাল বিলোনিয়ার সাহিত্যপত্র বলে স্বীকৃতি দিতে চান নি ৷ কারণ দীপক দে তখন কোলকাতায় থাকতেন ৷ ম্যাগাজিনটিও সেখান থেকে প্রকাশিত হয় ৷ শুধুমাত্র্ প্রাপ্তিস্থান হিসেবে বিলোনিয়ার নামোল্লেখ ছিল ৷ দুলাল ভৌমিক অবশ্য এটিকে বিলোনিয়ার দ্বিতীয় সাহিত্যপত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন ৷ বিগত শতাব্দীর ছয়ের দশকেই বিলোনিয়ার সুরবিতান থেকে সত্যেন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের সম্পাদনায় 'অশ্লীলপত্র' নামে হাতে লেখা  একটি সাহিত্য পত্র প্রকাশ করা হয়েছিল ৷ হরিভূষণ পাল মহোদয় প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত প্রথম সাহিত্যপত্রিকা হিসেবে দুলাল চক্রবর্তীর সম্পাদনায় প্রকাশিত 'অনির্বান' কে (১৯৬৬)  স্বীকৃতি দেন ৷ এই পত্রিকাটির তিনটি সংখ্যা বের হয়েছিল বলে জানা যায় ৷ শ্রীহরিনারায়ণ সেনগুপ্তের সম্পাদনায় বিলোনিয়া জনগ্রন্থাগার ও তথ্যকেন্দ্র থেকে ১৯৬৭-৬৯এর মধ্যে 'শুক্লপক্ষ' ও 'বিষাণ'  নামে দুইটি হাতে লেখা সাহিত্যপত্র প্রকাশিত হয় ৷ এই সময়েই দুলাল ভৌমিকের সম্পাদনায় সাইক্লোস্টাইল করা সাহিত্যপত্র 'আকাশদুহিতা' প্রকাশিত হয় ৷ 'জোয়ার' তাঁর সম্পাদিত আর একটি সাহিত্যপত্র এই সময়ে প্রকাশিত হয় ৷ এই সময়েই মহিলাদের সংগঠন 'মিতালি' র উদ্যোগে 'তরঙ্গিনী' নামে একটি সাহিত্যপত্র প্রকাশিত হয় ৷ সাতের দশকের শুরুতে আশিসকুমার বৈদ্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় 'ক্রান্তি' ৷ ১৯৭২ এর সেপ্টেম্বর মাসে শ্রী হরিনারায়ণ সেনগুপ্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় হাতে লেখা 'অগ্রণী' পত্রিকা ৷ এর বর্ষপূর্তি সংখ্যা মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হয়েছিল ৷ মুদ্রিত অগ্রণীর তিনটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ৷ তবে হাতে লেখা অগ্রণী পত্রিকা ১৯৭৯ পর্যন্ত বিলোনিয়া জনগ্রন্থাগার ও তথ্যকেন্দ্রে প্রকাশ করা হয়ে আসছিল ৷ পরবর্তী সময়ে হাতে লেখা অগ্রণী রুমা পাল ও মল্লিকা বসুর সম্পাদনায় প্রকাশিত হত ৷ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য মল্লিকা বসু বিলোনিয়ার প্রথম প্রকাশিত সাহিত্যপত্র 'অভিযান' এর অন্যতম সম্পাদক জগদীশ বসুর কন্যা ৷ সে সময়ের অসম্ভব শক্তিশালী গল্পকার রুমা পাল পরবর্তী সময়ে লেখালেখির অঙ্গন থেকে হাত গুটিয়ে নেন ৷ সে সময়ের গল্পকার রুমা পাল সাহিত্যচর্চা চালিয়ে গেলে বাংলা সাহিত্য নিশ্চিতই সমৃদ্ধ হত ৷ অগ্রণী বিলোনিয়ার সাহিত্য পরিমন্ডলে আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছিল ৷ অগ্রণীর সঙ্গে বিলোনিয়ার বাইরের লেখকদেরও নিবিড় যোগাযোগ ছিল ৷ এই পত্রিকায় কবিতা লিখতেন নচিকেতা ভরদ্বাজ ৷ এই সাহিত্যপত্রে পরামর্শ দিয়ে তিনি চিঠিপত্রও লিখতেন এবং তা অগ্রণীতে যত্ন সহকারে প্রকাশও করা হত ৷ 
১৯৭৫ সালে অশোক দাশগুপ্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় 'শৌনিক' এবং কুসুমকুমার পাল ও সুবোধ কংসবণিকের সম্পাদনায় 'কৌষিকী' ৷ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নিভা পালের সম্পাদনায় কৌষিকীর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ৷ এই সময়ে কথাসাহিত্যিক সমরেশ বসু বিলোনিয়ায় এসেছিলেন ৷ এই পত্রিকায় তাঁর ছবিও প্রকাশিত হয়েছিল ৷ সম্ভবত বাবুল দে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ৷ অরূপ রায়বর্মন ও তপন দাসের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় 'কল্লোল' ৷ কমলকৃষ্ণ বণিক ও দিবাকর দেবনাথের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় 'আঞ্চলিক খবর'  স্থানীয় ইয়ুথ ক্লাবের রজত জয়ন্তী বর্ষ উপলক্ষে ৷ আটের দশকের মাঝামাঝি থেকে দেবাশিস চক্রবর্তীর সম্পাদনায় 'দেয়া'  পরপর মোট আটটি সংখ্যা প্রকাশ করে ৷ দেয়া বর্তমানে উদয়পুর থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে । সমর বিশ্বাসের সম্পাদনায় 'আর্য' ১৯৯১ এ প্রকাশিত হয়ে অনিয়মিত হলেও  এখনো বেরুচ্ছে ৷ বিকাশ পালের সম্পাদনায় ১৩৯৬ বাংলায় 'গ্রীণরুম' প্রকাশিত হয় ৷ ২০০৯ সালে পত্রিকাটির দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হয় ৷ ১৯৯৮ সালে তুষারকণা মজুমদারের সম্পাদনায় ' দীপসাহিত্য' প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এখনো চলছে ৷ এটি এখন পর্যন্ত বিলোনিয়ার সর্বাধিক সময় প্রকাশিত সাহিত্যপত্রিকা ৷ ২০০৩ সালে হরিভূষণ পালের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ' মুহুরীতট' ৷ ২০০৫ সালে অজয় তিলকের 'ঐকতান' ৷ ২০০৬ সাল থেকে প্রসেনজিৎ দে ও হরিপ্রসাদ মজুমদার প্রকাশ করেন 'প্রহরী' ৷ ২০০৮ সালে টুটন চক্রবর্তীর 'মুহুরী' প্রকাশিত হয় ৷ ২০০৯ সালে পিণাক দত্তের সম্পাদনায় 'সৃজা' নামে একটি পত্রিকা শুরু হয়ে দু তিনটে সংখ্যা প্রকাশের পর স্তব্ধ হয়ে যায় ৷
বিলোনিয়া শহর ছাড়া মহকুমার আরো কয়েকটি জনপদ থেকে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায় ৷ ১৯৮৫ সালে মতাই থেকে প্রকাশিত হয় রাখাল মজুমদারের সম্পাদনায় 'শব্দছবি' ৷ নলুয়া থেকে বছর দুয়েক ধরে বেরুচ্ছে 'সৃষ্টি' (২০১৩)  এবং কৃষ্ণনগর থেকে বেরুচ্ছে 'উৎস'
৷ শান্তিরবাজার মহকুমার শান্তিরবাজার থেকে আটের দশকে অমর মিত্রের সম্পাদনায় প্রকাশ হত 'অঙ্কুর' ৷ এই মহকুমার বাইখোরা থেকে নয়ের দশকে অর্পন ভৌমিকের সম্পাদনায় বেরুত 'সম্পর্ক ' ৷ ১৯৯৫ এ গৌতম মজুমদারের সম্পাদনায় 'পূজা' ৷ তারাপ্রসাদ বণিকের সম্পাদনায় 'প্রতিবম্ব ' ( ২০০৩)   প্রকাশ হত ৷  অভীককুমার দে ও অমরকান্তি সূত্রধরের সম্পাদনায় ২০১৫ থেকে শুরু হয়েছে 'প্রাণের কথা ' ৷ অভীককুমার দে পরবর্তী সময়ে সম্পাদনা করে প্রকাশ করে চলেছেন 'সমভূমি' । জোলাইবাড়ি থেকে গত কয়েক বছর যাবত বিপ্লব বৈদ্যের সম্পাদনায় বেরুচ্ছে 'পিলাক' ৷ কিছুদিন আগে সুরজিৎ সরকারের সম্পাদনায় শুরু হয়েছে 'দক্ষিণী কথা' ৷
  দক্ষিণ ত্রিপুরার অন্য আর একটি মহকুমা সাব্রুম ৷ এই মহকুমায় লিটল ম্যাগাজিন চর্চার একটা অনিয়মিত ইতিহাস রয়েছে ৷ ১৯৭৫ সালে ত্রিপুরার সরকারি কর্মচারীদের লাগাতর ধর্মঘটের সময় এপ্রিল মাসে  এই প্রতিবেদক ও বিভূতিভূষণ চক্রবর্তীর সম্পাদনায় বেরোয় 'স্পন্দন' নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকা ৷ সেই পত্রিকার প্রচ্ছদে সেইসময়ে আন্দোলনে নিহত যুবনেতা নৃপেন্দ্র দেবনাথের ছবি থাকায় সাব্রুম তথ্যকেন্দ্র থেকে পত্রিকাটি উধাও হয়ে যায় ৷ এতে লেখা ছিল ড. রঞ্জিত দে, ড. ননীগোপাল চক্রবর্তী, কৃষ্ণধন নাথ, অনিল সরকার, নেপাল সেন ও এই প্রাবন্ধিক প্রমুখের ৷ প্রচ্ছদটি এঁকেছিলেন নাট্যজন প্রণব মজুমদার ৷ ১৯৯৩-৯৫ তিন বছর ভারত সংঘের প্রচেষ্টায় প্রকাশিত হয় ' ভারত সংঘ ' ৷ এর পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন ত্রিপুরার প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী প্রয়াত কালিপদ বন্দ্যোপাধ্যায়  ও শংকর দে ৷ ১৯৯০ এর ফেব্রুয়ারিতে রাজ্যের বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতিবিদ ড.রঞ্জিত দে-র সম্পাদনায় ত্রিপুরার একমাত্র লোকসংস্কৃতিবিষয়ক লিটল ম্যাগাজিন 'লোকসংস্কৃতি' ৷ এটি অনিয়মিত ভাবে প্রায় সাত বছর বের করেছিলেন ড.দে সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায়  এবং অর্থব্যয়ে ৷ ২০২৫ সাল থেকে কবি রূপন মজুমদারের সম্পাদনায় পত্রিকাটি আবার প্রকাশিত  হচ্ছে । ২০০১ এ সাব্রুম বইমেলায় এই প্রতিবেদকের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় 'গ্রন্থী' ৷ লিটল ম্যাগাজিনটি  ছাপার ক্ষেত্রে সর্বতোভাবে সহায়তা করেন সাব্রুমের আর এক প্রতিভাধর শিল্পী পুলিন চক্রবর্তী ৷ এখানে স্থানীয় অনেকের ছোটো ছোটো লেখা ছিল ৷ ১৪১৮ বঙ্গাব্দ থেকে এই মহকুমার প্রত্যন্ত জনপদ সোনাই থেকে নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছেন তরুণ কবি সঞ্জীব দে 'বিজয়া ' পত্রিকাটি ৷ ২০১৩ সালে  বৈশাখি মেলা উপলক্ষে সাব্রুম থেকে 'কালিদহ ' এবং ২০১৪ সালে বনকুলের বৌদ্ধ মেলা উপলক্ষে 'মহামুণি'  সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ও অর্থানুকুল্যে এই নিবন্ধকারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ৷ উল্লেখ্য এই প্রতিবেদক সম্পাদিত ম্যাগাজিনগুলোর একটিও আঁতুড়ঘর পেরুতে পারে নি ৷

এই শতাব্দীর দুইয়ের দশক থেকে দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলায় প্রচুর লিটল ম্যাগাজিন আত্মপ্রকাশ করতে থাকে । তারমধ্যে জয় দেবনাথ এর সম্পাদনায় শুরু হয় ওয়েব ম্যাগাজিন 'মনন স্রোত' । সম্ভবত এটি ত্রিপুরার প্রথম ওয়েব ম্যাগাজিন । ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বিজন বোসের সম্পাদনায় প্রকাশিত হচ্ছে 'মনু থেকে ফেনী' । ২০২০ সাল থেকে মিঠু মল্লিক বৈদ্য-র সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়ে আসছে 'দৈনালী' । শান্তিরবাজার থেকে প্রকাশিত হচ্ছে  'দেবদীপ' ।
সম্পাদক অনামিকা লস্কর ভৌমিক ।
প্রকাশকাল ২২ শে ফেব্রুয়ারী, ২০২২ । এ বছরেই কবি বিজন বোসের সম্পাদনায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থানের নামকে স্মরণ করে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন 'গরিফা' । জানুয়ারি ২০২৩ সাল থেকে কবি সংগীত শীলের সম্পাদনায় প্রকাশিত হচ্ছে 'প্রতিলিপি' । সাব্রুমের ফেনী নদীর উপর নির্মিত ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে মার্চ ২০২৪ এ রূপন মজুমদার ও অশোকানন্দ রায়বর্ধনের যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় 'মৈত্রীসেতু' । সাব্রুম মহকুমার পশ্চিম প্রান্তের এবং রাজ্যেরও সর্বশেষ প্রান্তিক জনপদ ফেনীনদীর অববাহিকার সৌন্দর্যমন্ডিত সীমান্তঘেঁষা আমলিঘাটের শিবমন্দির প্রাঙ্গণে ফেনী ভিউ কবিতা উৎসব উপলক্ষে কবি অপাংশু দেবনাথের সম্পাদনায় ২০২৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় 'মেরুকুম' সাহিত্য পত্র । ২০২৬ সালেও 'মেরুকুম' প্রকাশিত হয় অশোকানন্দ রায়বর্ধনের সম্পাদনায় । বছর দুয়েক আগে ঝুটন শর্মার সম্পাদনায় 'জলেফা' নামেও একটি সাহিত্যপত্রের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়।

সরাসরি বড়ো কোন আন্দোলন তৈরি করতে না পারলেও এই জেলায় লিটল ম্যাগাজিন চর্চা ঠিকই হয়ে আসছে ধারাবাহিকভাবে । এখানে কালস্রোতে হারিয়ে যাওয়া কিছু তথ্য সংরক্ষণের প্রয়াস নেওয়া হল মাত্র ৷ সবটা হয়তো সংগ্রহ করাও সম্ভব হয়নি । আগামী প্রজন্ম দায়িত্ব নিলে অনেক কাজ এগিয়ে যাবে ৷ 


ঋণস্বীকার  :
১.বিলোনিয়ার অস্বীকৃত পাতাগুলি - দুলাল ভৌমিক ( শৌনিক - সম্পা.অশোক দাশগুপ্ত - ১৯৭৫)  
২. বিলোনিয়ার সাহিত্য প্রবাহ  : সেকাল একাল- হরিনারায়ণ সেনগুপ্ত ( আর্য - সম্পা. সমর বিশ্বাস,২০১৪ শারদ সংখ্যা)  ৷
৩. জনপদ বিলোনিয়ার ইতিবৃত্ত - হরিভূষণ পাল - 2০০৯
4. চন্দন পাল ( কবি)  বিলোনিয়া, দক্ষিণ ত্রিপুরা ৷
৪.ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন - সন্দীপ দত্ত ( প্রবন্ধ)
৫. ত্রিপুরার লিটল ম্যাগাজিন - শ্যামল ভট্টাচার্য ( প্রবন্ধ)
৬. জয় দেবনাথ, কথাসাহিত্যিক, হরিনা, সাব্রুম
৭. রূপন মজুমদার, কবি, বিজয়নগর , সাব্রুম ।

Monday, December 22, 2025

পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেই দিন–বক্সনগরে

পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেই দিন–বক্সনগরে

অশোকানন্দ রায়বর্ধন


বাবার সরকারি চাকুরির সুবাদে শৈশব থেকেই শুরু আমাদের পরিযায়ী জীবন । তা থেকে আজও মুক্তি পাইনি । আজ এখানে তো কাল সেখানে । কোথাও থিতু হয়ে বসতে পারলাম না । জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে অতীতের সেই ভাসমান দিনগুলোর কথা প্রায়শই মনে পড়ে । বাবার ছিল বদলির চাকরি । তাই তিনি যেখানে যেতেন সঙ্গে তাঁর পরিবারবর্গকেও নিয়ে যেতেন । ফলে আমাদের সেই দিনগুলোতে ঘরের আসবাব বলতে কিছুই ছিল না । চাকরিতে বদলির সরকারি নির্দেশ আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের রওনা হতে হত পোটলাপুটুলি বেঁধে । একেকবার বদলি হয়ে নতুন জায়গায় গেলেই পেছনে ফেলে আসা সেই ভূমিকে এবং আমার শৈশবের বন্ধু-বান্ধবের কথা বেশ কিছুদিন মনকে খুব নাড়া দিয়ে যেত । যদিও এই অভিজ্ঞতাটা আমার পরবর্তী জীবনের অনেক অমূল্য সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে । আমার সৃষ্টিতেও সেইসব বিষয়গুলো এসেছে । আর এখন জীবন সায়াহ্নে এসে সেই দিনগুলোকে মনে করে এক স্বর্গীয় তৃপ্তি অনুভব করি ।

১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে আমার বাবা পেচারথল পি এইস সি থেকে বদলি হয়ে বক্সনগর দাতব্য চিকিৎসালয় জয়েন করেন । তখনকার দিনে ছোটো আকারের বাসে চড়ে আমরা প্রথম দিন আগরতলায় আসি । সেখানে একরাত্রি বাসের পর পরদিন সকালে আমরা প্রথমে এসে নামি বিশালগড় বাজারে । সেকালের বিশালগড় বাজার এখনকার মতো এত জমজমাট বা ঝাঁ চকচকে ছিল না । রাস্তার দুপাশে ছোটো ছোটো ছন বাঁশের বেড়ার ঘর ছিল । কোনো কোনো দোকানের গদিটা ছিল বাঁশের মাচার । এমনই একটা তরজার ঝাঁপ ফেলা ঘরে ছিল তখনকার সময়ের বাস সিন্ডিকেটের অফিস । আমাদের বাস এসে সেখানে থামে । আমার মনে আছে বাসটার নাম ছিল 'লাকি দুলু' । বাবা আমাদের বাস থেকে নামিয়ে সিন্ডিকেট অফিসে বসিয়ে রাখলেন । তারপর খোঁজ নিয়ে জানলেন বক্সনগরের রাস্তা কতদূর । একটু এগিয়ে গিয়ে ডান দিক ধরে বাজারের ভেতর দিয়ে বক্সনগরের রাস্তাটা গেছে । তখনকার হিসেবে সিন্ডিকেটের মাস্টার জানালেন বক্সনগরের দূরত্ব প্রায় ১২ মাইল । বাবা ভদ্রলোককে তাঁর পরিচয় দিলেন এবং এই ১২ কিলোমিটার রাস্তা তিন শিশুসন্তানকে নিয়ে কিভাবে যাবেন সে বিষয়ে দুশ্চিন্তার কথা তাঁকে জানালেন । সেই ভদ্রলোক তখন দৌড়ঝাঁপ করে খোঁজখবর করতে লাগলেন বক্সনগর থেকে মালামাল নিয়ে কেউ এদিকে এসেছে কিনা । তাহলে তাঁদের ফিরে যাবার সময় আমাদেরকে তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেবেন এবং জিনিসপত্রগুলো তাঁরা বয়ে নিয়ে যাবেন । যাই হোক ভদ্রলোকের সহৃদয় প্রচেষ্টার পরে দুজন লোককে পাওয়া গেল । তাঁরা বক্সনগর থেকে মালামাল নিয়ে এখানে এক ব্যবসায়ীর দোকানে এসেছিলেন । কিছুক্ষণ পরে তাঁরা ফিরে যাবেন । সিন্ডিকেট মাস্টার ভদ্রলোকের নির্দেশ মতো প্রায় দশটার দিকে দুই ভদ্রলোক তাদের হাতে মাল বয়ে নিয়ে যাবার বাঁশের বাঁক ও দড়ি নিয়ে অফিসে এলেন । আমাদের কাছে মালপত্র তেমন কিছু নেই । সামান্য যা কিছু ছিল একজন তাঁর হাতের দড়ি দিয়ে বেঁধে বাঁকের দুপাশে ঝুলিয়ে নিলেন । বাবা ও মা হেঁটেই যাবেন । তাঁদের কোলে থাকবে আমাদের ছোটোভাইটি । সমস্যা হল আমরা বড়ো দুইভাইকে নিয়ে । একজনের বয়স ৮ এবং অন্যজন ৬ বছর মাত্র । কিছুতেই ১২ কিলোমিটার পথ আমাদের পক্ষে হেঁটে পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয় । এ নিয়ে সবাই ভাবনায় পড়লেন । সে সময় আমাদের নিতে আসা দুজনের একজন একটা উপায় বার করলেন । তিনি আমাদের দুই ভাইকে তাঁর বাকের দু'পাশে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারলে আমাদের বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন বলে জানালেন । আমাদের পোটলাপুটলির মধ্যে সম্বল ছিল দুটো কাঁঠালকাঠের পিঁড়ি । মা বস্তার ভেতরে রাখা পিঁড়ি দুটো বের করে তাদের দিলেন । ভদ্রলোক আমাদের দুজনকে দুটো পিঁড়িতে বসিয়ে তাঁর কাঁধের বাঁকে ঝুলিয়ে রওনা দিলেন । এভাবেই আমরা দুই বিচ্ছু ভাই 'পালকি চলে পালকি চলে / গগন তলে আগুন জ্বলে' ছড়াটি বলতে বলতে বাকের দুলনির সঙ্গে দুলতে দুলতে বক্সনগর চললাম । কিন্তু আমাদের চঞ্চল নড়াচড়ায় বাহক ভদ্রলোকের ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল । তিনি মাঝে মাঝে আমাদের ধমক দিচ্ছিলেন ।

 এভাবে পথে বেশ কয়েকবার জিরিয়ে নিয়ে আমরা বিকেল চারটার দিকে বক্স নগরে এসে পৌঁছাই । সে সময় বক্সনগর দাতব্য হাসপাতালটি বাজারের একেবারে শেষপ্রান্তে নিবারণ সাহার বাড়ি ও দোকানের লাগোয়া ছিল । নিবারণবাবুর বাড়ির পরেই টিলাটা শেষ এবং ঢালু বেয়ে ছরার দিকে চলে গেছে । ওপারে বক্সনগর স্কুল মাঠ ও পুণ্যমতি গ্রাম । হাসপাতালের পেছনে একটি তরজার ছাউনি ও বেড়ার ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হল । পাশের নিবারণবাবুর বাড়ির সদস্যরা এসে আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গেলেন এদিন আর রান্নাবান্না না করার জন্য মাকে অনুরোধ করে গেলেন এবং রাত্রিতে তাদের ঘরে অন্নগ্রহণের আমন্ত্রণ করলেন । সেই থেকে এই পরিবারটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় শুরু এবং যতদিন আমরা বক্সনগর ছিলাম ততদিন তাঁদের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা ছিল । এই পরিবারের বড় দাদাটির নাম ছিল সম্ভবত বিভূতি । তারপরে কানুদা তারপরে সম্ভবত নারায়ণ ও বিজয় । আমার ভুলও হতে পারে । সবার নাম এখন আর মনে পড়ছে না । কানু সাহা অর্থাৎ কানুদা আমাদের চেয়ে বড়ো । তিনি আমাদের ছোটো ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন । এই দিনেই কিছুক্ষণ পরে এসে দেখা করে যান ডাক্তারবাবু হরেন্দ্র চক্রবর্তী । প্রায় আমার বাবার বয়সী তিনিও সপরিবারেই বক্সনগরেই থাকেন । পরদিন এই কানুদার সঙ্গেই আমি ও আমার ভাই অসীমানন্দ বক্সনগর স্কুলে যাই ভর্তি হওয়ার জন্য । ছোটোভাই বিবেকানন্দ তখন কোলের শিশু । দেড় বা দুবছর বয়স । বাবার ডিসপেনসারির সময় থাকায় আমাদের সঙ্গে যেতে পারেননি । তবে সকালবেলায় স্কুলের শিক্ষক মহাশয়দের সঙ্গে তাঁর এক প্রস্থ পরিচয় হয়ে গিয়েছিল । তাঁরাই আমাদের স্কুলে যেতে বলেছিলেন । ধীরে ধীরে স্কুলে আমরা সবার সঙ্গে মানিয়ে নিতে থাকি । যেহেতু আমরা উত্তর ত্রিপুরা থেকে এসেছিলাম তাই আমাদের কথায় একটা সিলেটি টান থাকত । এখানকার মানুষের মুখের ভাষায় ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার টান । ফলে ছোটো বয়সে যা হয়, আমাদের দুই ভাইয়ের কথাবার্তা নিয়ে সহপাঠীরা মশকরা করত । ধীরে ধীরে আমরা তা কাটিয়ে উঠি । আমার সঙ্গে যারা পড়ত তার মধ্যে যতটুকু মনে পড়ে কানুদাদের কোনো এক ভাই নারায়ন বা বিজয়, বিভীষণ বণিক, নিখিল দাস, আবু তাহের, মোখলেসুর রহমান, আব্দুল মোনাফ, সুবোধ নাথ, অমূল্যরতন পাল, ফটিক মজুমদার এবং ডাক্তারবাবুর ছেলে অজিত চক্রবর্তী । ডাক্তারবাবুর বড়ো ছেলে রঞ্জিত আমার একক্লাশ উপরে ছিল । এর মধ্যে আবার ফটিক ভৌমিক ওরা আমাদের পারিবারিক আত্মীয় । ফটিকের বাবা বক্সনগর তহশীল অফিসের তহসিলদার ছিলেন ।  ফটিকের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার সূত্র হলো রাজ্যের একসময়ের বিশিষ্ট সাঁতারু রতনমণি রায়চৌধুরী ছিল তার মাসি এবং রতনমণি রায়চৌধুরী সম্পর্কে আমাদের পিসি হন । এই পিসিদের বড় ভগ্নিপতি ফটিকের মা । ফটিকরা তহশীল অফিসের পিছনে সরকারি কাঁচাঘরে থাকত । সুবোধের বাবা ছিলেন চিকিৎসক । বক্সনগর বাজারে তার ওষুধের দোকান ছিল । বিভীষণের পরিবার সদ্য পাকিস্তান থেকে উঠে আসে । তার দাদা নারায়ণ বণিক বাজারে একটি বাজে মালের দোকান শুরু করেন । আবু তাহেরের বড়ো ভাই বক্সনগর স্কুলের শিক্ষক ছিলেন (তাঁর নামটা এখন আমার আর মনে নেই) । তবে তাঁদের সম্পর্কে একটা ঘটনা এখনো আমার মনকে নাড়া দেয় । অমূল্যরতনরা পরে এখান থেকে চলে গিয়ে আমবাসা বাড়ি করে । কুলাই থাকাকালীন তার পঙ্গে আমার দেখা হত ।

শিক্ষক মহাশয়গণ ছিলেন খুব আন্তরিক । স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন থেকেই তাঁরা আমাদের প্রতি খুব যত্ন নিতেন । প্রধানশিক্ষক ছিলেন নলিনীকান্ত আচার্য । এছাড়া অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বর্ষীয়ান প্রফুল্ল কুমার আচার্য, গৌরাঙ্গ চন্দ্র দাস, তাজুল ইসলাম স্যর, চিত্ত রায়, গুপ্ত স্যর, শাজাহান স্যার এবং রমেশ দাস । আমরা বিদ্যালয়ে পাঠকালীন সময়ে রমেশ দাস স্যার ট্রেনিং নেওয়ার জন্য কাঁকড়াবন চলে যান । কিন্তু কিছুদিন পরেই তাঁর বোধহয় কোনো মানসিক সমস্যা হয় এবং তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন বলে জানা যায় । শৈশবের সেই ঘটনাটি আমার মনে খুব নাড়া দিয়েছিল । এরকম আরো একটি প্রশ্নবোধক ঘটনা আজও আমার মনে মাঝে মাঝে জেগে ওঠে । আমাদের বন্ধু আবু তাহেরের দাদা (তার নামটা আমার মনে নেই) আমাদের শিক্ষক ছিলেন । তিনি এবং শাহজাহান স্যার একসঙ্গে চলাফেরা করতেন । হঠাৎ একদিন আমরা শুনতে পাই এই দুজন স্যারের চাকরি চলে গেছে কোন এক অজ্ঞাত কারণে । দুজন শিক্ষকই ভীষণ ছাত্রবৎসল ছিলেন । তাছাড়া শাজাহান স্যারের বড় মেয়ে সম্ভবত বিউটি নাম আমাদের একক্লাশের সিনিয়র ছিল এবং আমাকে খুব স্নেহ করত । একেবারে সীমান্ত সংলগ্ন তাদের বাড়িতে গিয়ে শৈশবে আমি বড়ই গাছ থেকে বড়ই পেড়ে খেয়েছি । তাঁদের হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া ব্যাপারটা আজও আমার মনে প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ঘোরাফেরা করে ।

বক্সনগরে সে আমল থেকেই হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত বসবাস । গ্রামবাসীদের প্রত্যেকের সঙ্গেই ছিল আন্তরিক সম্পর্ক । চিকিৎসায় সুফল পাওয়ার সুবাদে অনেক মুসলমান বয়স্ক মহিলা ও পুরুষ আমার বাবাকে আব্বা এবং মাকে আম্মা বলতে দেখেছি । তারা বয়স্ক হলেও আমাদের ভাইদের ভীষণ আদর করতেন । তাঁদের কেউ কেউ বাড়ি থেকে দুধ, খেতের ফসল, খেজুরের গুড় ইত্যাদি নিয়ে আসতেন । বাবা বকাঝকা করলেও গোপনে মার কাছে গছিয়ে দিয়ে যেতেন ভাইদের খাওয়ানোর জন্য । আজ কারোর নাম মনে নেই । চেহারাও মনে নেই কিন্তু সেদিনের কথাগুলো মনে পড়লে আজও হৃদয়ের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে । তখনকার মানুষের মধ্যে কোনরকম ভেদাভেদ ছিল না আন্তরিকতা ছিল প্রচুর । 

ছোট্ট বক্সনগরে সে সময়ে দুর্গাপূজা করতেন ধীরেন্দ্র সাহা নামে এক তরুণ ব্যবসায়ী ।  তাঁরা অল্প কিছুদিন আগে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে এখানে এসে বসতি ঘরে ছিলেন । সেখানকার বর্ধিষ্ণু পরিবার এখানে জমিজমা বদল করে আসায় তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল খুবই । তাঁদের সঙ্গে তাঁদের গ্রামের এবং আত্মীয়স্বজন অনেকেই বক্সনগর এসে এভাবে বসতি করেছিলেন । ফলে দেশ বাড়ির সম্পর্কের বাঁধনটা রয়ে গিয়েছিল । ধীরেন্দ্রবাবুর ভাই  সুনীল সাহা শিক্ষক ছিলেন । বড় ভাই তাঁকে পড়াশোনা করিয়ে বিয়েথা করিয়েছিলেন । আমরা সেই বিয়ের নিমন্তন্ন খেয়েছিলাম । পুজোর সময় ধীরেন্দ্র সাহার বাড়িতে গ্রামের সব মানুষ অংশগ্রহণ করতেন । একবার পুজোর সময় ধীরেন্দ্র সাহার বাড়িতে কোন একটা অশৌচকালীন সংস্কার পালনন চলছিল । অশৌচের মধ্যে দুর্গাপুজো করার নিয়ম নেই । তখন তাঁর প্রতিমা তৈরি প্রায় শেষ । সে অবস্থায় তিনি আমার বাবার উপর পুজোর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন । ধীরেন্দ্র সাহা নিজেই প্রতিমা গড়তেন । তাঁর প্রতিমা ছিল সাবেকি ধরনের । একবার তিনি বড়ো কাঠামের পাশাপাশি ছোটো আকারের একটি দুর্গামূর্তি গড়েন এবং সেই মূর্তির সামনে পূজারত রামচন্দ্রেরও একটি মূর্তি করেছিলেন । বাজারের উপরে বাচাই ঘরেই তিনি মূর্তি করতেন আমরা স্কুলে যাওয়া আসার সময় বেশ কিছুটা সময় তার মূর্তি নির্মাণকৌশল অবাক হয়ে দেখতাম । বাজারের একপাশে সবসময় একটি রথ দাঁড়ানো থাকত । রথের সময় এটা টানা হত । তারও উদ্যোক্তা ধীরেন্দ্র সাহাই । পুজো করার পাশাপাশি ধীরেন্দ্র সাহা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও জড়িত ছিলেন । পুজোর সময় তাঁর উদ্যোগে যাত্রা অনুষ্ঠান হত । সেই যাত্রাপালায় তখনকার সময়ে বক্সনগরের থানা তহসিল, স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য সরকারি অফিসের কর্মচারীগণসহ বক্সনগরের বিশিষ্ট হিন্দু-মুসলমানগণ অংশগ্রহণ করতেন । তখনকার সময়ে প্রায় সারারাত ধরেই যাত্রাপালা হত । 'শেষ নামাজ' নামে একটা যাত্রাপালার কথা আমার এখনো মনে আছে । এছাড়া পৌরাণিক যাত্রাপালাও তাঁরা করতেন । সেই যাত্রাপালায় আমার বাবা একবার সূর্যদেবের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছিলেন । বক্সনগরে শ্রাবণমাস জুড়ে মনসামংগলের গান বা পদ্মাপুরাণ পাঠ হত প্রায় প্রতি বাড়িতে । এ গ্রামে দু তিনটে মনসামঙ্গল পাঠের দল ছিল । পাঁচনাইল্লা থেকে একটা মনসামঙ্গলের দল আসত । পৌষ সংক্রান্তির আগের রাত্রে হত বেড়ার ঘর তৈরি এবং সেখানে রাত্রিবাস ও বনভোজন । ভোরবেলা স্নান করে সেই ঘরে আগুন দেওয়া হত এবং সুর করে ছেলেরা নানারকম ছড়া আওড়াত । বাজারের টিলাটার এক প্রান্তে থানা অবস্থিত হওয়ায় এর নাম ছিল থানার টিলা । আর উল্টোদিকে ছড়ার ওপারে গ্রাম হল পুণ্যমতি । সংক্রান্তির দিন ভোরবেলা দুই পাড়ের ছেলেরা একে অন্যকে উক্তি করে ছড়া কাটত  এই বেড়ার ঘর পোড়ানোর সময় । তেমন একটি ছড়া এখনো আমার মনে আছে । যেমন থানা টিলার ছেলেরা বলত, 'গাঙ্গে দিয়া ভাইস্যা গেল আইট্টা কলার থুর, / হগল গাঁইয়ায় সাক্ষী আছে পুণ্যমতি চুর' । সেরকম পুণ্যমতির ছেলেরাও ছড়া কেটে উল্টো থানার টিলার দোষারোপ করত ।  বসন্তে দোলপূর্ণিমায় হত দোল উৎসব । ধীরেন্দ্র সাহার বাড়িতে দোল ও ঝুলন দুটোই পালিত হত । দোলের সময় হোলির গান গেয়ে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে সবাই রঙের উৎসবে মাততেন । সেকালে থানার একজন দারোগা ছিলেন যিনি নাকি ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সদস্য । তাকে সবাই কর্তা বলে ডাকতেন । তিনি খুব সুন্দর হোলির গান গাইতে পারতেন । গানের দলে তিনি ছিলেন মধ্যমণি । চৈত্র সংক্রান্তিতে বাজারের উল্টোদিকে হরিমঙ্গল ছরার ওপারে ধান খেতে হত চড়ক গাছঘুরানি । একে কেন্দ্র করে হত প্রচুর লোকসমাগম ও মেলা বসত । তখনকার সময়ে বাজারের আশেপাশে বসতির মানুষের স্নানের ও পানীয়জলের উৎস ছিল এই হরিমংগল ছরা । কিছুদূর গিয়ে ছরাটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে । ছরাটিতে সেকালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত । ছোটোদের সাঁতার ও জলকেলির স্থান ছিল এই ছরা । বর্ষাকালে স্রোতের বেগও ভীষণ বেড়ে যেত ।

 বক্সনগর দাতব্য হাসপাতালে আমার বাবার সহকর্মী একজন ছিলেন শচীন্দ্র চক্রবর্তী । সে সময়ে বয়সে তরুণ শচীন্দ্র মামা এলাকার সবার প্রিয়পাত্র ছিলেন । তিনি তাঁর কারিগরি জ্ঞানের সহায়তায় পুরোনো রেডিওর স্পিকার খুলে মাইক্রোফোন বানিয়ে সেসময়ের নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পর্কে বাজারে ঘোষণা দিতেন এবং তিনি নিজেও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন । বক্সনগর স্কুলেও ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হত । গোডাউনটি তখন খোলামেলা ছিল । নাট্যানুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সেখানে হত ।শিক্ষকদের মধ্যে গৌরাঙ্গ স্যার এসব ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিতেন । অন্য শিক্ষকরা তাঁকে সহায়তা করতেন । ছোটো ছেলেরা খেলাধূলার মধ্যে লাডুমখেলা, গুল্লি খেলা, দাগ্গি খেলা, পিছলাগুটি দিয়ে বন্দুকবাজিসহ কাবাডি, ফুটবল, দাইরাবান্দা ইত্যাদি নিয়ে মেতে উঠত । বক্সনগর মাঠে বড় ফুটবল খেলার ম্যাচ হত । এই ম ঠের পাশে একবার একটি বাঘ মারা পড়েছিল । আমরা গিয়ে দেখি কিছু মানুষ তার চামড়া সংগ্রহ করছে । 

সেকালে সবার মধ্যে একটা মধুর সম্পর্ক ছিল ।  মাঝে মাঝে বনভোজন হত সবাই মিলে । ১৯৬৪ সালের মে মাসে গরমের ছুটিতে সবাই মিলে বনভোজনের আয়োজন হয় । উদ্যোক্তা ছিলেন অলরাউন্ডার শচীন্দ্র মামা । সবাই মিলে জিনিসপত্র নিয়ে রওনা হই ভেলুয়ার চর । সঙ্গে বিনোদনের সরঞ্জাম হল রেডিও এবং গ্রামোফোন । রান্নাবান্নার উদ্যোগ চলছে । হঠাৎ রেডিওতে ভেসে এল দুঃসংবাদ । প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রয়াত হয়েছেন । কিসের বনভোজন কিসের কি ! সবাই শোকাহত । স্থগিত হয়ে গেল বনভোজন । সবাইকে ফিরে আসতে হল । দিনটি ছিল ২৭শে মে । সেটাও আমার মনে থাকবে চিরদিন ।

বক্সনগরের চারদিকে সে সময়ে প্রচুর খালি জায়গা ছিল । এই থানার টিলার উপরে যেখানে একটি বড়ো গোডাউন আছে তার পাশের লুঙ্গাটি লম্বালম্বি অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত । একদিকে ছরা ও তার পাশের রাস্তা আর অন্যদিকে থানার কোয়ার্টার্স পর্যন্ত ছিল তার বিস্তৃতি । গোডাউনটার ঠিক পাশেই এই লুঙ্গার মধ্যে বন কেটে এখান থেকে ছনবাঁশ সংগ্রহ করে আমরা এবং ডাক্তারবাবুর পরিবার দুটি ছনের বেড়া ও ছনের ছাউনি দেওয়া ঘর তৈরি করে পাশাপাশি বসবাস করতাম । ছনের বেড়া গোবর মাটি দিয়ে লেপে দেওয়া হত । তাতে আর ফাঁকফোঁকর থাকত না এবং শীতকালে ঠান্ডাও লাগত না । ঘরের পাশেই ছিল দুটি বড়ো বড়ো কাঁঠালগাছ । প্রচুর কাঁঠাল ধরত । খুব সুস্বাদু কাঁঠালগুলি আমরা খেয়ে শেষ করতে পারতাম না । বাড়ির আশেপাশে খেতকৃষি করার মতো প্রচুর খালি জায়গা ছিল । আমাদের দুই পরিবার সেখানে যার যার প্রয়োজনীয় ক্ষেতের ফসল ফলাতাম । ফলে কাঁচা তরিতরকারি আমাদের কিনতে হত না । সেসময় এ অঞ্চলে ছিল প্রচুর খেজুরগাছ । আমাদের বাসস্থানের পাশেই ছিল বেশ কিছুটা জমি । সেখানে স্থানীয়রা চাষ করতেন । জমি পেরোলেই টিলা । সেখানে ছিল প্রচুর আম, জাম ইত্যাদি ফলের গাছ । জমিতে চাষ দেওয়ার সময় জমির মালিকরা আমাদের ডাকতেন । কারণ তাঁদের হালের বা মইয়ের পেছনে হাঁটলে সেসময় প্রচুর নানা ধরনের ছোটোমাছ, কাঁকড়া ও ছোটো কচ্ছপ পাওয়া যেত । আমরা সেই মাছ সংগ্রহ করে আনলে মা রান্না করে দিতেন । তখনকার সময়ে খেতে পাওয়া সেই মাছের কি অপূর্ব স্বাদ ছিল । 

বক্সনগরের অধিকাংশ হিন্দুরা সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান থেকে উঠে এসে এখানে বসতি গড়ছেন । কেউ কেউ দেশের জমিজমা বদল করে এসেছেন । কেউবা কপর্দকশূন্য অবস্থায় উঠে এসে নতুনভাবে জীবন গড়ার প্রয়াস নিচ্ছেন । মুসলমানরা ছিলেন প্রাচীন বাসিন্দা এবং তাঁরা বর্ধিষ্ণু ও সম্পদশালী ছিলেন । কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করার জন্য আনতেন । তখনকার সময়ের জিনিসপত্রের দর ছিল খুবই কম । মেট্রিক পদ্ধতিতে পরিমাপ তখনো সেই বাজারে চালু হয়নি । চালের সের ছিল চার আনা । তাও অনেকের কেনার সাধ্য ছিল না । এই চালের সের যেবার চার আনা থেকে পাঁচ আনা হল সেবার বাবা ও অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠরা বলাবলি করতে শুরু করলেন যে ছেলেমেয়েদের আর বাঁচাতে পারবেন না । ছোটোমাছ বড়জোর আট আনা সের । রুই, কাতলা, কালিবাউশ ২ টাকা সের । শিং-মাগুরের দর আট আনা বেশি থাকত । যে কোনো শুঁটকি ১ টাকা সের । তবে নোনা ইলিশ চোরাই পথে পাকিস্তান থেকে আসত । তার সের ছিল ২ টাকা । ডিমের হালি দু আনা । কাঁচা সবজির মধ্যে আলু, মূলো, ঝিঙে, ধুন্দুল, ঢেঁড়স ইত্যাদির সের চার পাঁচ পয়সার বেশি ছিল না । আম জাম কাঁঠাল পেয়ারা কলা বেল ইত্যাদি কোন ফলই বাজারে বিক্রির চল ছিল না । প্রতি বাড়িতেই নানা ফলের গাছ ছিল । কারো বাড়িতে না থাকলেও অসুবিধে ছিল না । একে অন্যের বাড়ি থেকে চেয়ে চিনতে নেওয়া যেত । শীতকালে আট আনা সের প্রচুর খেজুরের রাব বা লালি পাওয়া যেত । খেজুরের রস ছিল পাঁচ পয়সা সের । বাজে মালের মধ্যে ডাল আট আনা/দশ আনা, দেশলাই বাক্স ৫ পয়সা চারমিনার সিগারেট ১২ পয়সা প্যাকেট, কেরোসিন তেল কুড়ি পয়সা, সাদা কাগজ চার আনা দিস্তা, ব্রিটানিয়া থিন এরারুট ১০ পয়সা প্যাকেট, ছোটো বিস্কিটের প্যাকেট ৫ পয়সা, চকলেট প্রতিটি এক পয়সা ।

এত সুখ, স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেও রাত নেমে এলেই বক্সনগরের বুকে ছড়িয়ে পড়ত অজানা আতঙ্ক । সেসময়ে প্রতিরাতেই বক্সনগরে ডাকাতি হত । পাকিস্তান থেকে সশস্ত্র ডাকাতদল এসে এপারের জনপদে ডাকাতি করত । পেছনে ইপিআরের ইন্ধন থাকত । রাত নামলেই গৃহস্থরা ঘরের দরজা জানালা শক্তপোক্ত করে বেঁধে রাখত । অনেকসময় গোয়ালঘরের গোরুগুলিকেও নিজেদের থাকার ঘরে নিয়ে আসত । তারপরেও রেহাই ছিল না । ডাকাতদল সঙ্ঘবদ্ধভাবে ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গৃহস্থের বাড়ি আক্রমণ করত এবং তাদের ধনসম্পদ ও গবাদি পশু লুঠ করে নিয়ে যেত । টের পেলে গ্রামবাসীদের মধ্যে প্রতিরোধও হত এবং ঢাকার দলের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটত প্রায়শই । গ্রামবাসীর হাতে একবার এক ডাকাত মারা পড়েছিল । তার লাশ বাজারের বাচাইতে এনে ফেলে রাখা হয় ।  তখনকার সময় ঝড়ের খুব তান্ডব হত । পাকিস্তান থেকে উঠে আসা মানুষজন আর্থিক দুরবস্থার কারণে তেমন মজবুত ঘর করতে পারতেন না । চৌষট্টি সালে পুজোর আগে বিধ্বংসী ঝড়ে গ্রামে বহু বাড়িঘর বিধ্বংসী ঝড়ে ভূপতিত হয়ে গিয়েছিল । আমরাও অন্যান্যদের সঙ্গে তখনকার তহশিল কাছারির দালানে আশ্রয় নিয়েছিলাম । সারারাত তান্ডবের পর ভোরের দিকে ঝড় থামে । বাইরে বেরিয়ে মনে হয় যেন প্রলয় হয়ে গেছে চারদিকে । এছাড়া সাপের ও বিষাক্ত কীটের ভীষণ প্রাদুর্ভাব ছিল । এখন যেখানটায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য হয়েছে সেটা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এবং সাপ, গুইল, বনরুই আর সজারুর আড্ডা । সেইসঙ্গে মনসমঙ্গলবিষয়ক কিংবদন্তী জড়িয়ে থাকায় মানুষ ভয়ে সেদিকে যেতই না ।বাড়িঘরে প্রায়ই সাপ ঢুকে পড়ত । খেলার সময় আমরো ছোটোরা একবার একটা কেউটে সাপ মেরেছিলাম ।

৬৫ সালে আবার বাবার বদলির কাগজ আসে । বাবা বক্সনগরে থাকাকালীন সময়ে যে সুনাম অর্জন করেছিলেন তার দরুন এলাকার মানুষ তাঁকে ছাড়তে চাইছিল না । ফটিকের বাবা তহশীলদার হওয়ার সুবাদে আমরা যে জায়গাটায় ঘর করে থাকতাম তা বাবার নামে বন্দোবস্ত করে দেওয়ারও প্রস্তাব দেন তিনি । গ্রামের বিশিষ্টজনেরা দরবার করে বাবার বদলি রদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবা যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিকূলতার কারণে এবং অনবরত ডাকাতির ভয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার চিন্তায় এই বদলি মেনে নেন । কিন্তু পরবর্তীকালে বাবা কোনো সংকটপূর্ণকালে বক্সনগরের দিনগুলোর কথা প্রায়ই স্মৃতিচারণ করতেন । বলতেন, বক্সনগর ছাড়া তাঁর ভুল হয়েছিল । আমরা তখন তো নেহাতই ছোটো । ভালোমন্দের কিইবা বুঝি । আমরা যেদিন হাঁটাপথে বক্সনগর ছাড়ি সেদিন বহু অশ্রুসজল মানুষ আমাদের পেছনে পেছনে অনেকদূর এসেছিলেন । বাবা তাঁদের বারবার আর না আসার জন্যে অনুরোধ করছিলেন । আগেরদিন আমরা দুভাই স্কুলে গিয়ে সব ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করি ও শিক্ষকমহাশয়দের প্রণাম করি । ক্লাসে আমার সব বন্ধুদের দেখা পাই । তাদের একটি করে কলম উপহার দিয়েছিলাম সেদিন । তবে সেদিন আমার প্রিয়বন্ধু ক্লাসের প্রতিদ্বন্দ্বী নিখিল স্কুলে আসেনি । তারপর সারাজীবন তাকে খুঁজে ফিরেছিলাম । বক্সনগরের কাউকে পেলেই তার কথা বলতাম । একবার জানলাম রাজ্যের এক গুণী ব্যক্তিত্ব স্বপনকুমার দাসকে । বক্সনগরের সন্তান জেনে তাঁকে কথাটা জানিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় লিখতেই নিখিলের আবির্ভাব ঘটে । তারপর দুজনে বহু কথা হয় অনলাইনে। কদিন আগে সন্ধ্যায় বটতলায় ও আমাকে দেখে চিনে ফেলে ।  নিখিল ওর বাড়িতে যাওয়ার আমন্ত্রণ দেয় । আমি বারবার কথার খেলাপ করি । আমার এই স্মৃতিচারণমূলক লেখা নিখিলের ক্রমাগত চাপেই লেখা ।

Wednesday, October 22, 2025

ঊনবিংশ শতকের যুবসমাজ ও দেবী কালিকা

🌺 ঊনবিংশ শতাব্দীর যুবসমাজের উপর মা কালীর প্রভাব

ভূমিকা–

ঊনবিংশ শতাব্দী ছিল বাংলার সমাজজীবনের এক নবজাগরণের যুগ। সমাজে একদিকে যেমন পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে জন্ম নিল এক নতুন চিন্তাধারা, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল যুক্তি, বিজ্ঞান ও মানবতাবাদ। অন্যদিকে তেমনি সমাজের অন্তরাত্তায় জেগে উঠেছিল জাতীয়তাবোধ ধর্ম চেতনা ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান । এই আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে বাঙালির এক মহান প্রতীক রূপে উদ্ভাসিত হন মা কালিকা । এই সময়ের যুবকরা পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদী চিন্তার মুখোমুখি হয়ে নিজেদের জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে ভাবতে শুরু করেন ইংরেজ শাসনের ফলে দমিত জাতির চেতনায় মা কালী হয়ে ওঠেন প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার প্রতীক । কালীর রুদ্র ভয়ংকর অথচ মাতৃত্বময় রূপ যুবকদের মনে জাগিয়ে তোলে এক অন্তর্গত শক্তি তারা অনুভব করেন মা কালী ধ্বংস করেন কেবল অশুভকে অন্যায়কে । তিনি যেন তাঁদেরও সাহস যোগান অন্যায় ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে ।সংহার ও সৃষ্টির মিলিত শক্তির দেবী । কিন্তু এই নববোধের ভেতরেই এক গভীর মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল— আধুনিকতার আকর্ষণ ও ঐতিহ্যের টান। উনবিংশ শতাব্দীতে মা কালীর পূজা বাঙালি যুব সমাজের মধ্যেও জনপ্রিয়তা লাভ করে মূলত বিভিন্ন জমিদার ও ধনী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় এর প্রচলন শুরু হয় রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও রামপ্রসাদের মত ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে এই পূজা আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং এই সময়ের যুবকেরা মায়ের মাতৃরূপকে ভক্তির সাথে উপাসনা করে ।
এই যুগের যুবসমাজ, যারা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছিল, তারা নিজের জাতীয় ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক খুঁজতে গিয়ে ফিরে তাকায় মা কালিকা-র দিকে।
তিনি তাঁদের কাছে হয়ে ওঠেন আত্মশক্তির মূর্তি, জাতীয় গৌরবের প্রতীক ও নবজাগরণের মাতৃরূপ।

নবজাগরণ ও যুবসমাজের মানসিক পরিবর্তন

ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজে নানা সামাজিক কুসংস্কার জাতপাত অন্ধবিশ্বাস ও নারী নির্যাতন চলছিল । শুরুতে বাংলা সমাজে একদিকে রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে যুক্তিবাদী চিন্তার উত্থান, অন্যদিকে সমাজে গভীর কুসংস্কার, জাতিভেদ ও অন্ধবিশ্বাসের প্রভাব ছিল প্রবল।
এই বৈপরীত্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছিল সেই সময়ের যুবসমাজ।
তারা একদিকে যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত, অন্যদিকে নিজের শিকড়ের সন্ধানে ব্যাকুল। এই প্রেক্ষাপটে মা কালীর অনুমুক্ত নির্ভীক ও রক্তমাখা রূপ সমাজের চোখে হয়ে ওঠে সংস্কার ভাঙ্গা শক্তির প্রতীক রূপ । যেমন স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, 'আমাদের চাই না ভীরু ভক্তি চাই কালীর মতো শক্তি ও সাহস ।' এই আহ্বান যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছিল আত্মবিশ্বাসে ন্যায় ও সত্যের সংগ্রামে ।
এই সন্ধানেই তারা আবিষ্কার করে মা কালিকা-র রূপে নিজের ঐতিহ্য, শক্তি ও আত্মমর্যাদার প্রতীককে।

 মা কালিকা : শক্তি ও জাগরণের দেবী–

মা কালিকা শাক্তধর্মে শক্তির চূড়ান্ত রূপ।
তিনি একাধারে ভয়ংকর ও করুণাময়ী, বিনাশিনী ও জননী।
তাঁর রূপের মধ্যে নিহিত আছে সৃষ্টি ও ধ্বংসের এক অদ্বিতীয় দ্বন্দ্ব—
যা জীবনদর্শনকেই প্রতিফলিত করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ও বিংশ শতাব্দীর সূচনা লগ্নে মা কালী হয়ে ওঠেন বিপ্লবীদের আদর্শ দেবী । শোনা যায় অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর, এমনকি ছোটো ছোটো যুবগোষ্ঠীর অনেক যুবক গোপনে কালীপূজার আসরে অস্ত্র প্রতিজ্ঞা নিতেন দেশের স্বাধীনতার জন্য । ধুপের ধোঁয়া, প্রদীপের আলো, ঢাকের শব্দে মিশে যেত শপথের ধ্বনি । সেই পবিত্র অন্ধকারে জেগে উঠত আগুন । যা পরে জ্বালিয়ে দিত সাম্রাজ্যের শেকল । তাঁদের কাছে কালী মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ন্যায় শক্তি । এই সময় যুবকরা মায়ের মাতৃরূপকে ভক্তি ও ভালবাসার সাথে পূজা করতেন যা তাদের আধ্যাত্মিক চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল । যুবকরা নিজেদের মুক্তি সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনায় কালীর কাছে প্রার্থনা করতেন। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর কবিতা, গান ও নাটকে কালীর প্রতীকী উপস্থিতি সমাজ চেতনার প্রতিফলন ঘটিয়েছিল । বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম সংগীতেও মাতৃভূমি কল্পিত হয়েছে দেবী মূর্তি রূপে । পরবর্তীকালে এই ভাবনা বিকশিত হয়ে কালীমূর্তিতে জাতীয় মাতার রূপ ধারণ করে । কালী সাধক কবিরাজ রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্তের গানে কালী শুধু ভক্তির দেবী নন । তিনি এক দার্শনিক চিন্তার কেন্দ্র । তাঁদের গানের যেমন আছে ভক্তির আবেগ তেমনি আছে অস্তিত্বের প্রশ্ন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ।কালী পূজা বাঙালি যুব সমাজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল । যার ফলস্বরূপ অনেক সাহিত্য ও সংগীত তৈরি হয়েছিল সে সময়ে ।

রামপ্রসাদ সেন তাঁর গানে লিখেছিলেন– 
> “কালো তোমার রূপ রে কালী, তাতে যে আলো ঝরে।”

এই ‘কালো’ রূপের মধ্যে যে আলো, সেই আলোই ঊনবিংশ শতাব্দীর তরুণদের চিন্তায় আনল আত্মপ্রত্যয়ের জ্যোতি।
তারা বুঝল, কালী মানে কেবল অন্ধকার নয়—অন্ধকার ভেদ করা আলোর শক্তি। এই সময়ের সাহিত্য ও সমাজে নারীর প্রতিচ্ছবি নতুন করে দেখা হচ্ছিল । মা কালীর চিত্র, যিনি একাধারে ভয়ংকরী ও মমতাময়ী, যুবসমাজকে শেখান নারীর শক্তিকে শ্রদ্ধা করতে । তাকে দেবীরূপে নয় । শক্তির প্রেরণার উৎস রূপে দেখতে । এর মধ্য দিয়ে সমাজে নারী পুরুষের সমতার ভাবনা জন্ম নেয় । এই ভাবনাই পড়ে নারী মুক্তি আন্দোলনের দর্শনকে প্রভাবিত করে ।

স্বামী বিবেকানন্দের কালীভাবনা ও যুবচেতনা–

ঊনবিংশ শতাব্দীর যুবসমাজের উপর মা কালীর প্রভাব সবচেয়ে গভীরভাবে দেখা যায় স্বামী বিবেকানন্দ-এর দর্শনে।
তাঁর কাছে কালী ছিলেন ভয়ের নয়, বরং শক্তির দেবী।
তিনি বলেছিলেন—

> “যে কালীকে তুমি ভয় পাও, সেই কালীই শক্তির মূর্তি। তাঁর পূজা মানে নিজের মধ্যে সেই শক্তির জাগরণ।”

বিবেকানন্দের আহ্বান ছিল স্পষ্ট—

 যুবকরা যেন নিজেদের ভিতরে লুকিয়ে থাকা শক্তিকে চিনতে শেখে, নিজের জাতি ও সমাজের মুক্তির জন্য সেই শক্তিকে কাজে লাগায়।
এই ভাবনা যুবসমাজকে দার্শনিক শক্তির পাশাপাশি কর্মের অনুপ্রেরণাও দিয়েছিল।

 বঙ্কিমচন্দ্র ও দেশমাতার কালীরূপ–

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর চিন্তায় মা কালিকা এক নতুন অর্থে উদ্ভাসিত হন।
তাঁর “বন্দে মাতরম্‌” কবিতায় মাতৃভূমিকে কালীস্বরূপ কল্পনা করা হয়েছে—
তিনি অন্নদা, করুণাময়ী, কিন্তু প্রয়োজনে ভয়ংকর রণদুর্গা।
এভাবেই কালী দেবী হয়ে উঠলেন দেশমাতার প্রতীক।

এই ভাবনা ঊনবিংশ শতাব্দীর যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করেছিল দেশপ্রেমে, জাতীয়তাবাদে ও আত্মবিসর্জনের চেতনায়।
মা কালিকা এখানে ধর্মীয় সত্তা নয়, বরং এক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি।

 অরবিন্দ ঘোষ ও বিপ্লবী চেতনা–

শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ-এর চিন্তায় কালী রূপান্তরিত হন বিপ্লবের দেবী হিসেবে।
তিনি লিখেছিলেন—

> “যখন জাতি নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তখন কালী আসেন ধ্বংস করতে, যাতে নতুন সৃষ্টি সম্ভব হয়।”

এই ভাবনাই পরবর্তী বিপ্লবী আন্দোলনের যুবকদের মনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
তারা কালীকে দেখেছিল অন্যায় ও দাসত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণাদাত্রী হিসেবে।

কালীপূজা : সমাজসংহতি ও আত্মচেতনা–

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কালীপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল সামাজিক সংহতির প্রতীক।
শিক্ষিত যুবকরা নিজের পাড়ায়, সমাজে একত্রিত হয়ে কালীপূজার আয়োজন করত।
এই মিলনই জাতিগত ঐক্যের এক প্রতীক হয়ে ওঠে।
কালীপূজার আধ্যাত্মিকতা থেকে জন্ম নেয় সমষ্টিগত আত্মশক্তির ধারণা।

                       নারীশক্তি ও কালীভাবনা–

মা কালিকা নারী হয়েও সর্বশক্তিময়—এই ভাবনা ঊনবিংশ শতাব্দীর যুবসমাজকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায় নারীর মর্যাদা নিয়ে।
এই সময়েই নারীশিক্ষা ও নারীসমতার আন্দোলন শুরু হয়, যার পেছনে ছিল শক্তিস্বরূপা কালীচেতনার প্রভাব।
নারী আর দুর্বল নয়—তিনি সৃষ্টি, করুণা ও সাহসের প্রতীক।

মানসিক ও নৈতিক প্রভাব–

যুবসমাজ মা কালিকার ভক্তি থেকে শুধু ধর্মীয় আশ্রয় নয়, পেয়েছিল মানসিক দৃঢ়তাও।
কালী তাঁদের শিখিয়েছিলেন—
ভয় নয়, আত্মবিশ্বাসই জীবনের মূলমন্ত্র।
অতএব, কালীভক্তি হয়ে উঠেছিল তাদের কাছে এক নৈতিক পুনর্জাগরণের পথ।

উপসংহার–

ঊনবিংশ শতাব্দীর যুবসমাজের উপর মা কালীর প্রভাব ছিল বহুমাত্রিক—
আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক, ও রাজনৈতিক।
তিনি ছিলেন একাধারে ভক্তির দেবী ও কর্মের অনুপ্রেরণা, জাতীয়তাবাদের মাতা ও ব্যক্তিসত্তার শক্তি।

বিবেকানন্দের ভাষায়—

> “শক্তি যদি জাগে, তবেই জাতি বাঁচে।”

মা কালিকার উপাসনার মধ্য দিয়েই এই যুগের যুবসমাজ সেই শক্তি খুঁজে পেয়েছিল—
যা তাদের আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছিল, জাতীয় চেতনা জ্বালিয়েছিল,
এবং বাঙালির নবজাগরণের ভিত রচনা করেছিল। উনবিংশ শতাব্দীর যুব সমাজের কাছে মা কালী ছিলেন শুধু উপাস্য দেবী নন, বরং চেতনার প্রতীক, শক্তির উৎস ও বিপ্লবের প্রেরণা । তাঁর রুদ্ররূপে সেসময়ের যুবক দেখেছিলেন সংস্কার ভাঙা ও প্রতিবাদের শক্তি । তাঁর মাতৃরূপে পেয়েছিলেন সান্তনা ও মমতা ।

 সংক্ষেপে বলা যায়,
ঊনবিংশ শতাব্দীর যুবসমাজের উপর মা কালীর প্রভাব ছিল
আত্মশক্তির জাগরণ, দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা, এবং নবজাগরণের আত্মা। মা কালী হয়ে উঠেছিলেন এক যুগের মানসিক মুক্তির প্রতীক যা পরবর্তীকালের জাতীয়তাবাদ ও সাংস্কৃতিক জাগরণের পথ প্রশস্ত করে ।

অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কালীপূজা

অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কালীপূজা 

   ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অগ্নিযুগ শব্দটি এসেছে সেই সময়ের বিপ্লবী যুবকদের আত্মোৎসর্গ ও অনলস দেশপ্রেমের জন্য । এটি মূলত ১৯০৫ থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত সময়কে নির্দেশ করে । যখন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর বাংলার যুবসমাজ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয় । এই বিপ্লবীদের মানসিক জগতের গভীরে যে শক্তি কাজ করেছিল তার অন্যতম উৎস ছিল মা কালিকা । সংহার, শক্তি ও মুক্তির চিরন্তন প্রতীক । তিনি রুদ্ররূপে ধ্বংস করেন অন্যায় । আবার মাতৃত্বের রক্ষা করেন সৃষ্টিকে । বিপ্লবীরা এই রূপেই দেখেছিলেন তাঁদের আদর্শ দেবীকে । যিনি অন্যায়ের বিনাশে অনুমোদন দেন, দাসত্বের বন্ধন ছিন্ন করার সাহস যোগান । তাঁরা বিশ্বাস করতেন যেমন কালী অসুর বধ করেন তেমনি পরাধীনতার অশুভ শক্তিকেও বিনাশ করতে প্রেরণা দেন ।

শোনা যায়, অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর, এমনকি ছোটো ছোটো যুব বিপ্লবীগোষ্ঠী কালীপূজার রাতেই গোপনে অস্ত্র স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করতেন । মেদিনীপুর শহরের কর্নেলগোলা কালীমন্দিরেই দীক্ষা নিয়েছিলেন বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। ধুপের ধোঁয়া, প্রদীপের আলো, ঢাকের শব্দে মিশে যেত শপথের ধ্বনি । সেই পবিত্র অন্ধকারে জেগে উঠত আগুন । যা পরে জ্বালিয়ে দিত সাম্রাজ্যের শেকল ।

আজও যখন অন্যায় দেখি, নিপীড়ন দেখি, দুর্নীতি দেখি, তখন মনে হয় আমাদের দরকার সেই আগুন, সেই সাহস যা একদিন অগ্নিযুগের যুবকদের জাগিয়েছিল মা কালিকার আহ্বানে।

 হে চেতনার যোদ্ধাগণ, চলুন আমরা আজও সেই মন্ত্র জাগি–

এলো আঁধার দিন ফুরালো, দীপালিকায় জ্বালাও আলো, 
জ্বালাও আলো, আপন আলো, জয় করো এই তামসীরে ।।

প্রাচীন ত্রিপুরার প্রাচীন কালীমন্দির

প্রাচীন ত্রিপুরার প্রাচীন কালীমন্দির 

ত্রিপুরার উদয়পুরে অবস্থিত মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির একটি প্রাচীন কালীমন্দির । ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা ধন্য মানিক্য এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন । তবে ত্রিপুরারাজ্যে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠার আরো প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে । আমরা জানি যে, প্রাচীনকালে ত্রিপুরা রাজ্যের সীমা আরও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । সেই হিসেবে কুমিল্লা ও একসময় ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের চূড়ায় চন্ডীমন্দির বা চন্ডীমুড়া মন্দির নামে একটি প্রাচীন মন্দির রয়েছে । চন্ডীমুড়ায় দুটি মন্দির পাশাপাশি অবস্থিত । দক্ষিণ পাশের মন্দিরটি চন্ডী মন্দির ও উত্তর পাশের মন্দিরটি শিব মন্দির । চন্ডী মন্দিরটি দেবী কালিকার উদ্দেশ্যে নিবেদিত । এই চন্ডীমন্দির সম্বন্ধে একটি পুরাণ কাহিনি প্রচলিত রয়েছে । দেবী চন্ডী যখন শুম্ভ নিশুম্ভ নামক দুই অসুরের সাথে যুদ্ধ করছিলেন তখন বেশ কিছু অসুর জঙ্গলে ঘেরা এই জায়গায় পালিয়ে আসে । দেবী তখন এখানে অসুরদের বধ করেন । দেবীর দেহতাপের ফলে পাহাড়ের মাটির রং লাল হয় । ফলে এই পাহাড়ের নাম লালমাই পাহাড় হয় ।

সপ্তম শতাব্দীর খড়্গবংশীয় মহারাজ দেবখড়্গ তাঁর রানি প্রভাবতীর ইচ্ছাতে এই মন্দির ও একটি শিব মন্দির নির্মাণ করেন । তিনি নিজে বৌদ্ধ ও তার রানি হিন্দু ছিলেন । তিনি নিজে বৌদ্ধ হয়েও মা চন্ডীর উপাসনা করতেন । বৌদ্ধরাজ দেবখড়্গের স্ত্রী প্রভাবতী দেবী অমর কীর্তি স্থাপনে বদ্ধপরিকর হয়ে এখানে দুটি মন্দির স্থাপন করেন । একটি চন্ডীমন্দির ও অপরটি শিব মন্দির চন্ডীমন্দিরে অষ্টভুজা সর্বানী মহাসরস্বতী । অপরটিতে শিবমূর্তি স্থাপন করেন । এরপর সময়ের সাথে মন্দির দুটি হারিয়ে যায় । ত্রিপুরার যুবরাজ চম্পক রায় দেওয়ানের ভগ্নী দ্বিতীয়া দেবী এই মন্দিরের পুনর্নির্মাণ করেন । তিনি পাহাড়ের দক্ষিণ পূর্বে একটি দিঘি খনন করেন । যার নাম দুতিয়ার দিঘি ।

জয় মা । সবাইকে দীপাবলির শুভেচ্ছা ।

গাড়ুই ব্রত

 গাড়ুই ব্রত

           গাড়ুই ব্রত লৌকিক ব্রত । এর প্রতি পরতে পরতে লোকজীবনের ছাপ রয়েছে ।ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ধানের অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায় নব্য প্রস্তর যুগে ( ৭০০০-৬০০০ খ্রি.পূ. ) ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে । এরপর সিন্ধু সভ্যতায় (৩০০০-২৫০০ খ্রি. পূ.) ধান চাষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন । এটি একটি গ্রীষ্মকালীন ফসল হিসেবে চাষ করা হত । প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র সমূহের উপর সর্বশেষ গবেষণায় জানা গেছে যে, সিন্ধুসভ্যতায় ধারণার চেয়েও আগে থেকেই ধান চাষ হত । গবেষণা আরও জানাচ্ছে যে, সিন্ধুসভ্যতার মানুষেরা মিশ্রকৃষির ক্ষেত্রেও অগ্রগণ্য ছিল । তারা গ্রীষ্মকালে ধান, মিলিট ও শিম্ব জাতীয় শস্য উৎপাদন করত এবং শীতকালে গম, বার্লি ও ডাল জাতীয় শস্য উৎপাদন করত ।

প্রাচীন ভারতীয় ধর্মগ্রন্থসমূহে ধানকে 'ব্রীহি' বলা হত । ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদসহ বিভিন্ন বৈদিক গ্রন্থে এটিকে একটি প্রধান খাদ্যশস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে । বৈদিক যুগে ধানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য বিবেচনা করা হত এবং ব্যাপকভাবে চাষ করা হত । বৈদিক ধর্মীয় ভাবাপন্ন হওয়ার আগে কৌম মানুষেরা লৌকিক দেবদেবীর পূজার্চনা করত । সেখানে বৈদিক ব্রাহ্মণের প্রবেশ ঘটেনি । পরবর্তীসময়ে এইসব ব্রাত্য দেবদেবীরা দেবদেবীতে রূপান্তরিত হয়ে গেছেন । বাংলার লোকধর্মীয় পূজাপদ্ধতিতে নৈবেদ্য বা পূজার উপকরণ হিসাবে গৃহস্থের উৎপাদিত ফসলের অংশ বা প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত সহজলভ্য উপকরণগুলোকেই নিবেদন করতে দেখা যায় । এরকম পূজায় বা আচার অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত অনেক বিষয়ের মধ্যেই আমাদের অতিক্রম করে আসা প্রাচীন সভ্যতার কিছু কিছু বিষয় অজান্তেই থেকে যায় । এরকম শিলনোড়ার ব্যবহার প্রস্তরযুগের নিদর্শন, পূজার সামগ্রী কোশাকুশি তাম্রযুগের স্মৃতিবাহক । গাড়ুই ব্রতে জুমের চালের ব্যবহার বাঙালির কৌমজীবনের অধ্যায়ের ক্ষীণ নিদর্শন । বাঙালি যতই জাতের বড়াই করুক । আদিতে তারা কৌম ও সংকর জাতি । বিবর্তনের সেই অধ্যায়টা অজানা বলে আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই করে মরি । পূজার উপকরণ আমাদের অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয় যাতে আমরা বুঝি ।

Tuesday, October 7, 2025

ভাষাবিহীন ভালোবাসার বিশ্ববিদ্যালয়

ভাষাবিহীন ভালোবাসার বিশ্ববিদ্যালয় 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

গত পরশুদিন আমরা গেছি ব্যাঙ্গালোর শহর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চিক্কাবাল্লাপুর পাহাড়ে ঈশা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত আদিযোগী শিবমূর্তি দেখার জন্যে । বিশাল পাহাড়কে পেছনে রেখে দিগন্ত খোলা আকাশ এবং বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মাঝখানে বিশাল ধ্যানমগ্ন শিবমূর্তি । সমস্ত চরাচর জুড়ে এক নীরব নিস্তব্ধ প্রসন্নতা বিরাজ করে এখানে । প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় আদিযোগী মূর্তিকে কেন্দ্র করে শুরু হয় আলো ও শব্দের যুগলবন্দী মোহময় ধারাভাষ্য । সঙ্গে সদগুরুর প্রবচন । প্রায় ১৫ মিনিটের এই অনুষ্ঠান অন্ধকার প্রান্তরে মৌনতার মাঝখানে যেন দৈববাণী ও আলোর বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে এক অনৈসর্গিক পরিবেশ সৃষ্টি করে । মেঘে ঢাকা অন্ধকার আকাশ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিদ্যুতের ঝলকানির সঙ্গে সঙ্গে যোগেশ্বর শিবের মিথসমূহ একে একে উন্মোচিত হয় আলো ও শব্দের মোহজালে তখন সমগ্র চত্বরে মহাবিশ্বের ঐন্দ্রজালিক পরিবেশ জড়িয়ে ধরে যেন সমস্ত সত্তাকে । মৌনী যোগেন্দ্রর সঙ্গে একাত্মবোধ জেগে ওঠে । ভারতের নানাপ্রদেশের মানুষের ছায়ামিশ্রণের এক প্রান্তর । এখানে হিংসাবিদ্বেষ নেই । পরিচয়হীন আত্মপরিচয়ে এক । 'আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়' ।

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর ফেরার পথে ছেলে ও বৌমা আমাদের নিয়ে এল সেই চত্বরের বাইরে একটা বড়ো খাবারের দোকানে । কি সুন্দর দৃষ্টিনন্দন রেস্টুরেন্ট। পাহাড়ের ঢাল কেটে ধাপে ধাপে গ্রাহকদের বসার জায়গা করা হয়েছে অনেকটা গ্যালারির মতো । আলো ঝলমল ও খোলামেলা, গাছগাছালিতে ভরপুর ।  পাহাড়ের উপরের অংশটা নিয়ে দোতলা । সেখানেও পরিপাটি বসে খাওয়ার ব্যবস্থা । এককথায় পাহাড়ের ঢালটাকে কি সুন্দরভাবে কাজে লাগানো হয়েছে । আমরা হলে টিলা কেটে সমান করতাম । এখানকার মানুষ প্রকৃতিচেতনায় সমৃদ্ধ । সারা ব্যাঙ্গালোরে এতো বিশাল বিশাল ইটকাঠের ইমারত টাওয়ার থাকলেও বন কিন্তু চোখে পড়ার মতো । একটু পরপরই গাছগাছালিতে ঘেরা পার্ক রয়েছে । সর্বক্ষণ একটা মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে।  রেস্টুরেন্টে ঢোকার পরপরই এখানে কর্মরত কয়েকটি ছেলেকে দেখে আমার রক্তের ভেতর একটা দোলা দিয়ে গেল । ছেলেগুলো আমাদের খাবার পরিবেশন করল । বাসনপত্র নিয়ে গেল ধোয়ার জন্যে । সবাই মিলে কাজ করছে এখানে । 

একটা ছেলে একটু দূরে বসে কাজের ফাঁকে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল আনমনে । আমি আমার খাওয়া সেরে তার পাশে বসলাম । পরিবারের সবাই আমাকে লক্ষ করছে । আমি ছেলেটার কাছে গিয়ে বললাম, ভাই, তূমহারা ঘর কাঁহা ? ও বলল, ত্রিপুরা। নুং বরক দে ? আমি প্রশ্ন করলাম । সঙ্গে সঙ্গে ও চোখ বড়ো বড়ো করে জবাব দিল,  ইঁ , নুং ? আমাকে প্রশ্ন করল । আং ব ত্রিপুরা হা নি । আমি বললাম । প্রশ্ন করলাম নিনি নক বিয়াং । বলল, মনুঘাট । আমবাসানি কান্দার' । আং সাব্রুমনি সে ।  আমিও আমার স্থাননাম বললাম । আমার আধভাঙা ককবরক শুনে মনে হল সে খুশি । দেববর্মা দে নুং । ইঁহি । ত্রিপুরা। তাম' নিনি মুং । চিকনিয়া ত্রিপুরা । ও বলল । 

চিকনিয়া জানাল কয়েকমাস যাবত এখানে কাজ করছে । বেতন মাসে সতেরো হাজার টাকা । দুবেলা খাবার ও থাকার জায়গা মালিকের দেওয়া । সে নাকি সাব্রুমেও ছিল কিছুদিন । মাগরুমে একটি ব্রিজ  তৈরির কাজ করেছিল কিছুদিন । আমি বললাম, তোমাদের দেখেই আমি আমার পরিবারকে বলেছি এরা ত্রিপুরার হবে । ছেলেটি হাসল । সারল্যের হাসি । আপনার সঙ্গে কথা বলে আমার খুব ভালো লাগছে । ঘরের মানুষের সঙ্গে যেমন কথা বলছি । আপনি বাঙালি আমি ত্রিপুরা কিছু মনে হচ্ছে না । সুন্দর বাংলা বলে ছেলেটা । আমাকে পেয়ে আরও বলল, এখানে কাজ করছি ভালোই। কিন্তু ওরা কানাড়ায় কথা বলে । আমরা না বুঝলে গালাগাল দেয় । এছাড়া আর সবই ভালো । আমি বললাম, চলো একটা ছবি নিই দুজনে । সঙ্গে সঙ্গে ও খুশি । আমার পাশে এসে বসল । সেলফি তুললাম । তারপরেই তার ডাক পড়ল । সে উঠে চলে গেল কাজে । 

আমি মহেশ্বর শিবের মতো স্থানু হয়ে তার দিকে চেয়ে রইলাম । আমার রক্তের ভেতর যেন ইতিহাসের কোন অনাদিকালের নেগ্রিটো, অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয় রক্তের মিশ্রণের এক ফল্গুর কল্লোল উঠছে । আমিও সেই । আদিযোগী ।

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৬ )

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৬ )

আজ বিজয়া দশমী । দেবী দুর্গার বিসর্জনের দিন । ভারতের অন্য সব প্রান্তে এই দিনটি দশেরা উৎসব হিসেবে শ্রদ্ধা ভক্তির সঙ্গে পালিত হয় । রামায়ণ মহাকাব্যে বর্ণিত রামচন্দ্র কর্তৃক রাবণ বিজয়ের এই দিনটিকে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয় হিসেবে পালিত হয় । কর্ণাটক রাজ্যের মহীশূরে চামুন্ডেশ্বরী মন্দির, কুর্গের মাদিকেরীসহ সর্বত্র এই দশেরা উৎসব জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয় । দশেরাকে কর্নাটকের আঞ্চলিক উৎসবও বলা হয় । নবরাত্রির দিন থেকে এই উৎসব শুরু হয় । আজ ব্যাঙ্গালোর জুড়েই দেখলাম দশেরার প্রস্তুতি । বাজারে প্রচুর ফুল ফল ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে । সবাই সাধ্যমত ফুল, ফল, ফুলের মালা, আমের পল্লব, কলার চারা নিয়ে যাচ্ছেন । সকাল থেকেই বাড়িঘর সাজানো হয়েছে ফুল ও ফুলের মালায় । সদর দরজার দুপাশে লাগানো হয়েছে কলার চারা । মাঝখানে আলপনা । প্রতিটি বাড়ির সামনে বড়ো বড়ো চালকুমড়ো ও নারকেল ফাটিয়ে রাখা হয়েছে । অনেকটা আমাদের দক্ষিণ ত্রিপুরায় চৈত্র সংক্রান্তির দিনের আমের কুশি কেটে সত্তুরওড়ানোর মতো । যানবাহনগুলোকে ফুলের মালায় সাজানো হয়েছে । এদিকে বাঙালিদের পুজো প্যান্ডেলে বিজয়া দশমীর বিদায়ের সুর । সর্বত্র একটা নীরবতা । আনন্দ ও বেদনার পাশাপাশি অবস্থান । কি অদ্ভুত রসায়ন ! জীবনটাও এমনই ।

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৫ )

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালি দুর্গাপুজো (৫ )

এবারে আমি পরপর দুটি এপিসোডে বর্তমানে যেখানে আছি অর্থাৎ আমার বড়ো ছেলের ফ্ল্যাটের কাছাকাছি এলাকার একটা বড়ো দুর্গাপূজোর বিষয়ে কিছু জানিয়ে এবং তারপরে এখানকার স্থানীয় সংস্কৃতির একটি বিষয় যার সঙ্গে আমাদের দুর্গোৎসবের কিঞ্চিত সম্পর্ক রয়েছে তার উল্লেখ করে ব্যাঙ্গালোরের পূজা পরিক্রমা শেষ করব ।

দুর্গাপুজোর থিমে অনেক সময় চলচ্চিত্র বা সিনেমার বিষয় উঠে এসেছে । বিশেষ করে কলকাতা ও আগরতলার বড়ো বড়ো বারোয়ারি পুজোকমিটিও থিম পুজোগুলিতে।

এরকম কয়েকটি দৃষ্টান্ত:

1. সত্যজিৎ রায় স্মরণে থিম –

অনেক পুজো কমিটি “পথের পাঁচালী”, “অপু ট্রিলজি”, বা “গুপী গাইন বাঘা বাইন”–এর দৃশ্য দিয়ে থিম সাজিয়েছে।
বিশেষত ২০১৯-এ সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একাধিক পুজো তাঁকে কেন্দ্র করে থিম নিয়েছিল।
2. বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগ –
কিছু পূজায় ৫০–৬০–৭০-এর দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের পোস্টার, গান, সেট, দৃশ্য ব্যবহার করে প্যান্ডেল সাজানো হয়েছে।
যেমন: উত্তম-সুচিত্রার জনপ্রিয় ছবি সাগরিকা, হারানো সুর, পিকনিক ইত্যাদির আবহ।
3. বলিউড ও বিশ্বসিনেমা থিম –
মাঝে মাঝে “শোলে”, “মুঘল-এ-আজম”, এমনকি “হ্যারি পটার” বা “অ্যাভেঞ্জার্স”-এর চরিত্র নিয়ে থিম তৈরি হয়েছে।
তবে এসব সাধারণত আকর্ষণ করার জন্য, আধ্যাত্মিকতার সাথে মেলানোর চেষ্টা করা হয়।
4. সামাজিক বার্তা মূলক সিনেমা –
“পথের পাঁচালী” বা “মেঘে ঢাকা তারা”-র মতো সিনেমার দারিদ্র্য, সংগ্রাম, সমাজ-বাস্তবতার দিক তুলে ধরা হয়েছে।
থিমের মাধ্যমে বলা হয়, দেবী শক্তি শুধু পুজো নয়, বাস্তব জীবনের সংগ্রামে পাশে থাকার প্রতীক।

তেমনি একটি চলচ্চিত্রের থিমকে নিয়ে পুজোর আয়োজন করেছেন ব্যাঙ্গালুরুর আরোহন সোসিও কালচারাল এসোসিয়েশন। কাঠগুড়ির পাশে বেলাথুরে তাঁদের পুজোমণ্ডপের এবারের থিম 'দুর্গেশগড়ের দেবীদ্বার' । থিমটি নেয়া হয়েছে 2019 সালের হিট বাংলা ছায়াছবি 'দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন' এর বিষয়েকে নিয়ে । কাহিনি ইতিহাসের একটা ঘটনার সঙ্গে কল্পনা মিশিয়ে থ্রিলারধর্মী করে তোলা হয়েছে । কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পর জগৎ শেঠের কাছ থেকে প্রচুর ধনসম্পদ উপঢৌকন পেয়েছিলেন । সেই সম্পদ যাতে ইংরেজের হাতে না পড়ে সেজন্যে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সেগুলো দুর্গেশগড়ের দেবীদ্বার মন্দিরে লুকিয়ে রেখেছিলেন । তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম সেই রহস্যময় সম্পদ খুঁজে পায়নি । ইতিহাসের অধ্যাপক সুবর্ণ সেন, ভাইপো আবির এবং তাঁর বন্ধু ঝিনুককে নিয়ে সেই রহস্য উন্মোচনের জন্য সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন । কাহিনির সেই দেবীদ্বারের আদলে তৈরি তাঁদের মন্ডপ । প্রতিমাও দৃষ্টিনন্দন । মন্ডপের ভেতরের সৌন্দর্যায়ন করেছেন সংগঠনেরই একঝাঁক শিল্পী । ভক্তি-শ্রদ্ধার সঙ্গে পুজো ও প্রতিদিন মধ্যাহ্নে সবার জন্যে প্রসাদের ব্যবস্থা করেছেন । বিনোদনের ব্যবস্থাও ছিল জমাটি । প্রতি সন্ধ্যায় বহিরাগত শিল্পীরা ও সংগঠনের সদস্যগণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন । অষ্টমীর রাতে বরিষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে এক অভিনব ফ্যাশন শোএর আয়োজন করেছেন উদ্যোক্তারা । ব্যাঙ্গালোরে সব পুজো প্যান্ডেলে দেখলাম বয়স্ক নাগরিকদের বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখা হয় । পঁচাত্তর-ছিয়াত্তর বছরের বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শারীরিক অসুস্থতা, ডায়ালিসিসের কষ্ট সহ্য করেও অনেকে মঞ্চে ক্যাট ওয়াক করেছেন । এই ফ্যাশন শোএর বিষয় নেওয়া হয়েছে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সাজপোষাক ।

উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণের কালে জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের সদস্যরা সাহিত্য ও শিল্পকলা, সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন । সেই পরিবারের পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও আধুনিকতায় এগিয়েছিলেন । এই পরিবারের জ্ঞানদানন্দিনী দেবী বাঙালিদের আধুনিক কায়দায় শাড়ি পরাতে শিখিয়েছিলেন । ঠাকুরবাড়ির বউদের শাড়ি পরার ধরনই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাঙালি রমণীদের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায় । পাশাপাশি এই পরিবারের সদস্য সদস্যারা অভিনয়েও অংশগ্রহণ করেছিলেন । ঠাকুর পরিবারের প্রথিতযশা পুরুষ ও রমণীদের চরিত্রাভিনয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এই ফ্যাশন শো । বিষয়টি অভিনব ও গবেষণালব্ধ । আধুনিক অঙ্গনে একটা সময়কে তুলে ধরা হয়েছে । এই সংগঠনের তরুণ সদস্যরাও কম যান কিসে ? তাঁরাও দল বেঁধে ধুতি পাঞ্জাবি পরে বাঙালিবাবুটি সেজে মঞ্চে উঠেছিলেন এই সন্ধ্যায় । গত ত্রিশে সেপ্টেম্বরের আনন্দবাজা পত্রিকার পাঁচের পাতায় আরোহন কালচারাল এসোসিয়েশনের প্রতিমার ছবি ছাপা হয়েছে যত্নের সঙ্গে ।

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৪ )

প্রবাসে দেবীর বশে :  ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৪ )

সার্জাপুরের এক প্রান্তে ন্যাশনাল পাবলিক স্কুল কূডলুর পাশেই হচ্ছে বর্ষা বেঙ্গলি এসোসিয়েশনের পূজো । অসাধারণ সৌন্দর্যমন্ডিত তাদের এই পুজো মণ্ডপ । বাংলা এবং কর্নাটকের সংস্কৃতির মধ্যে এক আশ্চর্য মেলবন্ধনকে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছেন তাঁরা । তাঁদের মণ্ডপসজ্জায় তাঁদের এবছরের পূজা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যে ভাবনাটি তুলে ধরেছেন তার নাম দিয়েছেন 'চিত্রাগাণা' । বাংলা এবং কর্ণাটকের দুইটি বিশিষ্ট লোককথাভিত্তিক চিত্রকলার সংমিশ্রণ এখানে ঘটিয়েছেন । তাঁদের মন্ডপের সামনের দিকটাতেই এই থিম এর মাধ্যমে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পটচিত্র ছৌ মুখোশ এবং কর্নাটকের 'যক্ষগাণা'  ( Yakshagana ) চিত্রশৈলীর মুখোশের নিদর্শন রেখে দুটি প্রদেশের শিল্পমাধ্যমের মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছেন উদ্যোক্তারা । পুরো মন্ডপ জুড়ে কর্ণাটকী লোককথা 'যক্ষগাণা' ও বাংলার ছৌ নৃত্যের মুখোশ । মন্ডপের ভেতরেও অসাধারণ সব কাজ ।পুজোর মাধ্যমে কর্নাটকের ও বাংলার ঐতিহ্য, শিল্প ও সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণ ঘটিয়েছেন তাঁরা । এই সার্জাপুরের আর একটি পুজো করছেন SORRBA. তাঁরা এই পুজোর মাধ্যমে পঞ্চদুর্গা ও দশেরা  উদযাপন করছেন । প্রতিমাটি খুবই সুন্দর । কাঠখোদাই কাজের ধরনের । চারদিকের প্রাকৃতিক পরিবেশও মনোরম ।

ব্যাঙ্গালোর তথ্যপ্রযুক্তির মহানগর । ইলেকট্রনিক সিটি । কাজেই এখানকার পুজোতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারিক চমক তো থাকবেই । ইস্ট বেঙ্গালুরু কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন ( EBCA ) এর এবারের পুজোর থিম "প্রযুক্তির আলোয় প্রথাগত পূজা"  । এবছর তাঁরা তাঁদের পুজোয় আলোড়ন সৃষ্টিকারী ভাবনা নিয়ে এসেছেন । এবার তাদের ভাবনা হল ত্রিমাত্রিক নবদুর্গা যা শুধু ভারতবর্ষে নয়, সারা পৃথিবীতেও আর কেউ কখনো উপস্থাপন করেনি বলে উদ্যোক্তারা দাবি করছেন । পূজা মন্ডপে নবদুর্গার নয়টি বিশেষ  প্রতিমার উপরের দিকে একটা করে কিউ আর কোড লাগানো আছে । পূজা মন্ডপে আগত দর্শণার্থীরা এখানে এসে তাদের মোবাইলে নবদুর্গার এই প্রতিকৃতিগুলির স্ক্যান করতে পারছেন এবং এই বিগ্রহ সমূহ তাদের মোবাইলের পর্দায় জীবন্ত দেখতে পারছেন । পরিবেশবান্ধব এই পুজোমণ্ডপ এবং দেবীপ্রতিমা নির্মাণ করেছেন কৃষ্ণনগরের এক শিল্পী কৌশিক দাঁ । ঠিক এমনই উত্তরণ সর্বজন সমন্বয়ের পুজোয় প্রতিমা তৈরি হয়েছে শিল্পী পৃথ্বীরাজ চৌধুরীর এক বিখ্যাত মা দুর্গার পেইন্টিংকে ভিত্তি করে চিত্রকরের 2D চিত্রকে 3D রূপে এখানে তুলে ধরা হচ্ছে প্রথমবার । আর সেই চিত্রকে মাথায় রেখে এবছর তাদের থিম হচ্ছে "কালীঘাটের চিত্রশিল্প"  । গুঞ্জুর লেক-এর উল্টোদিকে এস আর অক্ষতা প্যলেসে ( S R AKSHATA PALACE ) হচ্ছে ব্যাঙ্গালুরু সিলেটি কালচারাল এসোসিয়েশনের পুজো । এখানে  উত্তরপূর্বের শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, পাথারকান্দি ও ত্রিপুরার ধর্মনগর, খোয়াই, কৈলাশহর ও কমলপুরের অনেকেই এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত আছেন । তাঁরা সবাই কর্মসূত্রে এখানে আছেন । কেউ স্থায়ী আবাস করে নিয়েছেন ।  বয়স্ক মাবাবাকে নিয়ে এসেছেন ।কেউ বছরে এক দুবার বাড়ি যান । এককথায় উত্তরপূর্বের এই বিস্তীর্ণ সিলেটি ভাষাভাষী মানুষ এখানে সম্মিলিত হন পুজোকে কেন্দ্র করে । সিলেটি সংস্কৃতি খুবই সমৃদ্ধ । তারই প্রতিফলন রয়েছে তাদের পুজোয় । তাদের পুজোর ব্যানারে সিলেটি নাগরী লিপির নিদর্শন রেখেছেন । যথাযথ নিয়মে হোম যজ্ঞ সহকারে এখানে তাঁরা পুজোর আয়োজন করেন । সেই সঙ্গে থাকে ঢালাও প্রসাদের ব্যবস্থাও । 
এছাড়া আরো অনেক পুজো সারা ব্যাঙ্গালোর জুড়ে রয়েছে । ভক্তি নিষ্ঠা থিম মিলিয়ে কোনোটাই এড়িয়ে যাবার মতো নয় । কিন্তু সব মন্ডপই  অনেক দূরে দূরে একটা দুটো দেখতে গেলেই দিনের একাংশ চলে যায় ।

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৩ )

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৩ )

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসব । বাংলার প্রতিটি গ্রাম নগরে দুর্গোৎসব পালিত হয়ে আসছে বহু প্রাচীনকাল থেকে । সে ধারা আজও বহমান । আজ ভুবনায়নের যুগে বাঙালি মায়ের আঁচল ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছেন বিশ্বময় । বাঙালি যেখানেই গেছেন তাঁদের সংস্কৃতিকে বয়ে নিয়ে গেছেন। সমস্ত রকমের সামাজিক অনুষ্ঠানসহ পূজাপার্বণ ও পালন করে আসছেন অত্যন্ত ভক্তি শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সঙ্গে । সেইমতো আজ দুর্গোৎসব হচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে এবং বিদেশেও । দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্যকে তাঁরা ফুটিয়ে তুলছেন নানাভাবে । যখন যেখানে থাকছেন সেখানকার সংস্কৃতিকেও ধারণ করছেন আবার তার সাথে নিজেদের সংস্কৃতিকে মিশিয়ে এক মোহনায় নিয়ে আসছেন সৃষ্টিশীলতায় ও নিষ্ঠায় ।

হুগলির গুপ্তিপাড়াতে ১৭৯০ সালে ১২ জন বন্ধু মিলে যে জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন তাই 'বারো ইয়ারি' বা 'বারোয়ারি' পূজা নামে পরিচিত হয় । প্রথমদিকে দুর্গাপুজো করতেন রাজরাজড়ারা, ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ বা জমিদারগণ । সেখানে সবার প্রবেশাধিকার ছিল না । বারোয়ারি পুজো শুরু হওয়ার পর থেকে দুর্গাপুজো সর্বজনীন রূপ নেয় । সেই থেকে বাঙালি যেখানেই গেছেন সেখানেই তাঁরা সমবেতভাবে দুর্গোৎসব পালন করছেন । ।

ভারতের বড়ো বড়ো শহরের মধ্যে ব্যাঙ্গালুরু অন্যতম । এই শহরে বাস করেন বহু বাঙালি । পিতৃমাতাভূমি ছেড়ে এসে এই প্রজন্মের অনেকে এখানে স্থায়ী বসত গড়ে নিয়েছেন । অনেকে রুটিরুজির প্রশ্নে এখানে এসে থাকছেন । যেখানে বাঙালি রয়েছে সেখানেই রয়েছে বাঙালি সমিতি, সংগঠন । তাঁরা শরৎকালে দুর্গোৎসবে মেতে উঠেন । সংবৎসর অন্যান্য পুজো, অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন । ঐতিহ্যের অনুসারী হন । সেই সঙ্গে বাঙালি খোঁজেন তাঁদের আত্মপরিচয়ের শেকড় । সেই শেকড়ে ভর করেই তাঁরা পা বাড়ান আরেক ভবিষ্যতের দিকে । সে কারণেই ব্যাঙ্গালুরুর রামমূর্তিনগরের শ্রীহট্ট সম্মিলনী এবছর তাঁদের পুজোর ভাবনা রেখেছেন 'অস্তিত্ব' । তাঁরা দেবীপুজোর মাধ্যমে তাঁদের অস্তিত্বকে জানান দেন এবং এই নতুন ভূখণ্ডকে আপন করে নেওয়ার ভাবনায় ক্যাপশন দেন– "বাড়ি ছাইড়া বাসাত আইলাম / বাসারে আমার ঘর বানাইলাম" । স্মৃতিকাতারতা আর বাস্তবতার স্বীকারোক্তি এই উচ্চারণ ।

যতটুকু জানা যায়, ১৯৫০ সালে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের কয়েকজন অধ্যাপক সম্মিলিত উদ্যোগে ব্যাঙ্গালুরুতে প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপুজোর সূচনা করেন । মূলত এই পুজো থেকেই বাঙালিরা এখানে নানা পুজোপার্বণ ও সামাজিক অনুষ্ঠান শুরু করেন । ১৯৬৯ সালে ব্যাঙ্গালুরুতে অল ইন্ডিয়া কনফারেন্সের মাধ্যমে বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন তার কাজ শুরু করে এখানে । তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি । ব্যাঙ্গালুরুর নানা প্রান্তে শুরু হয় বাঙালিদের নানা সংগঠন, পুজো ও সামাজিক অনুষ্ঠান ।

কোলকাতা, আগরতলার পুজোতে যেমন দুর্গাপুজোর মন্ডপে ফুটে উঠে বিষয়ভাবনা তেমনি ব্যাঙ্গালোরের পুজোতেও জাঁকিয়ে বসেছে এই থিম । এখানে কদর রয়েছে থিম মেকারদেরও । পুজোর আগে পশ্চিমবঙ্গ থেকে থিম মেকার ও শিল্পীরা এসে মন্ডপ সাজিয়ে দেন । এখানে বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের এবারের থিম শোভাবাজারের রাজবাড়ি । ১৭৫৭সালে ইংরেজদের হাতে শোভাবাজারের পতন ঘটার পর বিজয়োৎসবের আনন্দে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় কোলকাতার শোভাবাজারের জমিদার নবকৃষ্ণ দেবের পুজোর মধ্য দিয়ে দুর্গাপুজোর সূচনা করা হয় । তাঁদের এবছরের মন্ডপ শোভাবাজারের রাজবাড়ির আদলে ।এবছর তাঁদের পুজো ৭৫ বছরে পড়ল ।

ব্যাঙ্গালুরুর প্রাচীন পুজোর মধ্যে এ বছর একাত্তরে পা দিল জয়মহল কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের দুর্গাপুজো । তাদের এ বছরের থিম হারিয়ে যাওয়া শৈশব ( Lost Childhood ) ।

আরটি নগর প্যালেস গ্রাউন্ডে কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের থিম 'মুক্তি' । মণ্ডপসজ্জায় রয়েছে বর্তমান জটিল জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার আকুতি । কর্পোরেট জীবন যেভাবে মানুষের ব্যক্তিগত সময়, আনন্দ, সুখ ও বিনোদনকে কেড়ে নিচ্ছে তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার আর্তি রয়েছে এই মন্ডপের ভিতরের শিল্পকলায় । এই চত্বরেরই আর একটি পুজো ব্যাঙ্গালুরু কালচারাল এসোসিয়েশন নারী ক্ষমতায়নের থিমকে মাথায় রেখে নারী জাতিকে সম্মান জানাতে পুজো পরিচালনা, পুরোহিত ও ঢাকের বাজনায় অংশ নিয়েছেন একদল মহিলা । গ্রীন গ্লেন লেআউট অ্যাসোসিয়েশনের এবারের পূজোর থিম 'নটরাজ' । বর্তমানে চলা সারা বিশ্বময় অস্থিরতা, ধ্বংস, তান্ডবকে মাথায় রেখে তাঁরা বিশ্ববাসীর কাছে এই সংকটময় মুহূর্ত থেকে পরিত্রাণের বার্তা পৌঁছে দিতে চান । নটরাজের তাণ্ডব হিংসার বিরুদ্ধে শান্তির জয়বার্তা ঘোষণা করছে । কোরমঙ্গলার সারথি সোসিও কালচারাল এর পুজোর ২৩ তম বছরের থিম 'মিলে সুর তুমহারা হামারা' । বেশ কিছু বছর আগে দূরদর্শনে বিভিন্ন ভাষায় এই গানটি প্রচারিত হত । সেই ভাবনাকে নিয়ে নানা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের সম্প্রীতির চিত্র ফুটে উঠেছে এখানে । পূর্ব ব্যাঙ্গালোরে কেটিপিও গার্ডেনে পূর্বা ব্যাঙ্গালুরু কালচারাল এসোসিয়েশনের পুজোয় সাবেকিয়ানার ছাপ রয়েছে । বিশাল চত্বর নিয়ে তাঁদের পূজো মন্ডপে প্রতিদিন প্রচুর দর্শনার্থীর ভিড় হচ্ছে । জনভোগের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে ।  বরিষ্ঠ নাগরিকদের প্রতি তাঁদের যত্ন লক্ষণীয় ।

ইন্দিরানগর ঐক্যতান হেব্বেল কালচারাল সোসাইটি তাঁদের এবারের সাতান্নতম বর্ষের দুর্গোৎসবে দর্শন ও আধ্যাত্মিকতাকে ভগবত গীতার মাধ্যমে তুলে ধরতে চান । তাঁরা মনে করেন গীতার বাণীর মাধ্যমে ব্যক্ত শিক্ষা বা বোধ আজকের দিনে খুবই অর্থবোধক যেখানে সম্প্রীতি ও শান্তি প্রশ্নের সম্মুখীন । মন্ডপসজ্জায় গীতা  থেকে উদ্ধৃত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে সেই সময়ের পরিবেশকে স্পষ্ট করা হয়েছে । সারা প্যান্ডেল জুড়েই গীতার শ্লোকের মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণী দর্শকের সামনে মেলে ধরা হয়েছে । নেল্লুরহাল্লি, হোয়াইট ফিল্ড কালচারাল এসোসিয়েশন তাদের মন্ডপ করেছেন কেদারনাথ মন্দিরের আদলে । এরকম বিবিএসইটির এ বছরের থিম হল পশ্চিম ভারতের রাজকীয় রাজস্থান । রাজস্থানের ঐতিহ্য প্রাচীন দুর্গ ইত্যাদি প্রদর্শন রয়েছে এখানে । তেমনি পূর্ব ভারতকেও তুলে আনা হয়েছে ব্যাঙ্গালুরুর পূজামন্ডপে । সাউথ ইস্ট ব্যাঙ্গালুরু বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের পুজোর থিম 'পুরাতন বাংলার রাজবাড়ীর দুর্গোৎসব' । নর্থ বেঙ্গালুরু কালচারাল সমিতি এ বছর তাঁদের আয়োজিত দুর্গোৎসবের থিম করেছেন ভারতের ধ্রুপদী ইনডোর গেম দাবাকে কেন্দ্র করে দাবার জগৎ ( World Of Chess ) । তাঁরা এবছর সমস্ত গ্র্যান্ড মাস্টারদের স্মরণ করতে চাইছেন । এই পুজোর মাধ্যমে উদ্যোক্তারা দাবার ৬৪ ঘর বা ঘুঁটির সঙ্গে শক্তির ৬৪ রূপ, মায়ের ৬৪ যোগিনীর সম্পর্ক নির্ণয় করতে চাইছেন । তারা বলতে চাইছেন দাবা শক্তিরই অভিন্ন রূপ ।

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপূজা ( ২ )

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্পুগাজো ( ২ )

ছেলে এবং বৌমা আজ আমাদের নিয়ে বেরুল ব্যঙ্গালোরে পুজো দেখার জন্যে । আজ দেখলাম দুটো পুজো । আরটিনগর সোসিও কালচারাল এসোসিয়েশন এবং হোয়াইট ফিল্ডের পিবিসিএতে  ( Purba Cultural Association ) । ব্যাঙ্গালোরে এবার ছোটো বড়ো মিলে পুজো হচ্ছে ২৭২ টির মতো । পুজো মন্ডপগুলো অনেক দূরে দূরে । তাই শরীরের উপর চোট না দিয়ে বড়ো শ্রীমান তার গাড়ি নিয়ে যে কয়টা পুজো পারে দেখাবে ।

এখানকার পুজোতে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরার মতো প্রবল উন্মাদনা না থাকলেও আন্তরিকতা ও একতা আছে । লক্ষ্যণীয় দুএকটি বিষয়ের মধ্যে  আরটিনগরের পুজোতে দেখলাম ঢালাও ভরপেট খাবারের আয়োজন । খাবারে ছিল ফ্রায়েড রাইস, লুচি, ছোলার ডাল, কাশ্মীরী আলুর দম,চাটনি ও মিস্টি । প্রতিমা সুন্দর । থিমও আকর্ষণীয় । মনে রাখার মতো ব্যাপার হল বরিষ্ঠ নাগরিকদের জন্য প্রসাদ গ্রহণের আলাদা লাইন, বিশ্রামের বিশেষ ব্যবস্থা নজর কেড়েছে । 

ব্যাঙ্গালোরের পুজো কেবলমাত্র ভক্তি, শ্রদ্ধা, উৎসব আর আনন্দ নয় । বিনোদনের পাশাপাশি বিপননও জমজমাট । বিশাল জায়গা জুড়ে পুজো মন্ডপ । প্রায় প্রতিটি মন্ডপেই রয়েছে । নানারকমের খাবারের দোকান, কাপড়ের বিশাল সম্ভার, ব্যাংক, ইন্সিওরেন্স, হাউজিং নির্মান সংস্থার প্রতিনিধিরা, ঘরগেরস্থালির সামগ্রীর দোকান, শিশুদের খেলনার দোকান, তাদের বিনোদনের দোলনা, টয়ট্রেন, ইত্যাদি মিলিয়ে এককথায় ছোটদের বিনোদনের ব্যবস্থাসহ একটা ছোটোখাটো মেলার মতো এলাহি ব্যবস্থাপনা ।  এসবের প্রতিনিধিরা মেলায় স্টল খুলে ব্যবসা করার জন্যে স্পনশরশিপ নিতে হয় । তার জন্যে পুজো কমিটিকে ভালো টাকা দিতে হয় । এটাই পুজো কমিটির একটা বড়ো আয় । সদস্য চাঁদা ছাড়া এই আয় দিয়েই তাদের পুজোর খরচাপাতি, সাংস্কৃতিক  অনুষ্ঠান, জনকল্যাণমূলক কাজকর্মসহ সমস্ত আয়োজন সারা হয়ে যায় । আমাদের অঞ্চলের মতো চাঁদাবাজির দুর্নাম কুড়োতে হয়না । আমাদের অঞ্চলের পুজোতেও এই পদক্ষেপ অনায়াসেই নেওয়া যায় । আইডিয়াটা দারুণ । আজ এটুকুই । সবাইকে শারদ শুভেচ্ছা‌।

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপূজো ( ১ )

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপূজো ( ১ )

প্রাচীন ভারতে দেবীপূজার সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে । দক্ষিণের রাজ্য কর্ণাটকেও দেবী পূজার বহু প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে । মহীশূরের চামিন্ডা পাহাড়ে অবস্থিত চামুন্ডেশ্বরী মন্দির অন্যতম শক্তিপীঠ । দেবী এখানে মহিষাসুর বধরতা মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গারূপে বিরাজিতা । কিংবদন্তি অনুযায়ী মহিষাসুর মহীশূর রাজ্যের রাজা ছিলেন মহীশূর নামটি এসেছে প্রাচীন কন্নড় শব্দ  মহীশূরু থেকে । 'মহীশূরু' শব্দের অর্থ মহিষাসুরের গ্রাম । বহু শতাব্দী ধরে দেবী চামুন্ডেশ্বরী মহীশূর রাজ্যের রক্ষাকর্ত্রী দেবী  হিসেবে পূজা পেয়ে আসছেন। এই দেবী চামুন্ডা মহাশক্তির ভয়াল রূপ । তিনি অতি ভীষণা ও শক্তিশালী দেবী । তিনি আদ্যাশক্তি বা সর্বপ্রথম সৃষ্টিকর্তা নারীত্বের প্রতীক । তাঁকে মহাদেবী দুর্গার এক রূপ হিসেবে গণ্য করা হয় । আবার তিনি মা কালীর অবতার রূপেও পূজিতা । কথিত আছে, চন্ড ও মুন্ড নামে দুই দুর্ধর্ষ অসুরকে বধ করার ফলে তিনি 'চামুন্ডা' নামে পরিচিত । আবার মহিষাসুরকে নিধন করার জন্যে তিনিই আবার 'মহিষাসুরমর্দিনী'। তিনি চামুণ্ডা, চামুন্ডী, চামুন্ডেশ্বরী ও চর্চিকা নামেও পরিচিতা । হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন–এই তিন ধর্মেই তাঁর ভিন্ন ভিন্ন রূপে পূজা প্রচলিত আছে । চামুন্ডা দেবী তান্ত্রিক শক্তিরও গূঢ় আধ্যাত্মিকতার মূর্ত প্রতীক । মৃত্যু ধ্বংস, জরা ও অসুস্থতার দেবী রূপেও তিনি পূজিত হন । অন্যদিকে তিনি প্রতিকূলতা, অন্ধকার ও দুষ্টশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়েরও প্রতীক।

চামুন্ডা অত্যন্ত প্রাচীন মাতৃকা । সিন্ধুসভ্যতায় প্রাপ্ত প্রত্নফলক অনুযায়ী, একজন বৃক্ষবাসিনী মাতৃকার সামনে ছাগবলি হত। সেই বলি গ্রহণ করতে সপ্তমাতৃকা উপস্থিত থাকতেন । এই সপ্তমাতৃকার  অন্যতম ছিলেন চামুন্ডা । প্রাচীন হরপ্পা সভ্যতার অবসানের দীর্ঘ আড়াই হাজার পরে পৌরাণিক যুগেও দেবী চামুন্ডা সপ্তমাতৃকার একজন হিসাবে পূজিতা হতে দেখা যায় । বর্তমান সময়ের দুর্গাপূজায়ও নবপত্রিকার নব আভরণের অন্যতম মানপত্রে বা মানকচুতে দেবী চামুন্ডার আধিষ্ঠান কল্পিত হয় ।

দুর্গাপূজায় অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে দেবী দুর্গা চামুন্ডা রূপে আবির্ভূতা হন । এই ক্ষণটাই মহাশক্তির সর্বোচ্চ প্রকাশ । সন্ধিপূজার সময় দেবীকে নিবেদন করা হয় ১০৮ টি পদ্ম ও ১০৮ টি প্রদীপ । পদ্ম ভক্তির প্রতীক । দীপ জ্ঞানের প্রতীক । এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় নৈবেদ্যের থালা, সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উপাচার, সবচেয়ে গভীর আরাধনা সবই নিবেদিত হয় দেবীর চরণে । এই ক্ষণে দেবীর প্রণাম মন্ত্র–

ওঁ দংষ্ট্রাকরালবদনে শিরোমালা বিভূষণে ।
চামুন্ডে মুন্ডমথনে নারায়ণী নমোহস্তু তে ।
দেবী চামুন্ডা তথা মহিষাসুরমর্দিনীকে কেন্দ্র করে মহীশূরসহ সমগ্র কর্ণাটকে নবরাত্রি ও দশেরা উপলক্ষ্যে উৎসব পালিত হয় ।

দুর্গাপূজায় লৌকিকতা ও সামাজিকতা : অতীত ও বর্তমান

দুর্গাপূজায় লৌকিকতা ও সামাজিকতা : অতীত ও বর্তমান 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

বাঙালি হিন্দুদের প্রধানতম উৎসব ও শ্রেষ্ঠ পূজা হল দুর্গাপূজা । পুরাণ শাস্ত্রকারদের মতে দেবী দুর্গা আদ্যাশক্তি মহামায়া, উমা, চন্ডী, ভগবতী, ভবানী, অম্বিকা, পার্বতী, শিবানী, কাত্যায়নী, মহিষাসুরমর্দিনী, অদ্রিজা প্রভৃতি বহু নামে পরিচিত ও পূজিত হন । ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, কালিকাপুরাণ, দেবীপুরাণ, দেবী ভাগবত ইত্যাদি গ্রন্থে কিছু কিছু পার্থক্য থাকলেও দেবী দুর্গার কাহিনী ও লীলা বর্ণনা সর্বত্রই দেখতে পাওয়া যায় ।

দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে শুধু দেবীআরাধনেই নয় । এটি বাঙালির প্রাণের উৎসব । এর মধ্যে যেমন আছে পৌরাণিক বিশ্বাস, মিথ তেমনি রয়েছে শিল্প-সংস্কৃতি, লোকাচার ও সামাজিকতার গভীর মেলবন্ধন । সুদূর প্রাচীনকাল থেকে বাঙালির জীবনে উৎসব এবং শ্রেষ্ঠতম পূজা হিসেবে দুর্গাপূজার প্রচলন রয়েছে । বাংলার অন্যতম প্রাচীন দুর্গাপূজা হল বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের মৃন্ময়ী মন্দিরের পূজা । দেবী মৃন্ময়ী ছিলেন মল্লভূম রাজ্যের রাজরাজেশ্বরী মল্ল রাজবংশের কুলদেবী । মল্লরাজ জগৎমল্ল ৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে এই পূজার প্রবর্তন করেন । মল্লরাজবাড়ীর পূজায় দেবীপটের যে ব্যবহার দেখা যায় তা অনেকটা ভিন্ন প্রকৃতির । বাংলার সাধারণ দুর্গাপূজায় এমন পটের ব্যবহার দেখা যায় না ।

 দুর্গাপূজার সূচনা কাল নিয়ে বহু মত থাকলেও বাংলায় ষোড়শ শতাব্দীতে সম্রাট আকবরের শাসনামলে প্রথম পূজা শুরু হয় বলে অনেকে মনে করেন । ১৫৮২ সালে রাজশাহীর তাহেরপুরের জমিদার বাংলার বারো ভুঁইয়ার অন্যতম কংসনারায়ণ রায় তাঁর মনোবাসনা পূরণের লক্ষ্যে রাজসূয় ও অশ্বমেধ যজ্ঞের বিকল্প হিসেবে মার্কন্ডেয় পুরাণের দুর্গাপূজার প্রবর্তন করেন । তিনি সেসময়ে দুর্গাপূজায় ৮ লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন বলে জানা যায় । ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব রবার্ট ক্লাইভ এর সম্মানে দুর্গাপূজার মাধ্যমে বিজয় উৎসবের আয়োজন করেছিলেন । সেকালে পূজা ও অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয় হত বলে প্রথম দিকে মূলত রাজরাজড়া ও জমিদারদের মধ্যে দুর্গাপূজার আয়োজন সীমাবদ্ধ ছিল । ধীরে ধীরে বাঙালি জমিদারদের মধ্যে এই দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয় ।

 সাম্প্রতিককালে প্রচলিত দুর্গাপূজা দুই ভাবে হয়ে থাকে । ব্যক্তিগতভাবে পারিবারিক কাঠামোতে যেখানে পূজার শাস্ত্রীয় বিধান নিয়মনিষ্ঠা অধিক পালন করা হয় । এবং বারোয়ারি বা সর্বজনীনভাবে এলাকায় ভিত্তিক দুর্গোৎসব আয়োজন করা হয়ে থাকে । ১৭৯০ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ার ১২ জন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করে । ১২ ইয়ার বা ১২ বন্ধুর পূজা নামে পরিচিত এই পূজা একসময় বারোয়ারী নামে প্রতিষ্ঠা পায় । ১৮৩২ সালে কাশিমবাজারের রাজা হরিনাথ বারো ইয়ারের এই পূজা পদ্ধতি কলকাতা শুরু করেন । পরবর্তীতে উচ্চবর্ণীয় হিন্দু জমিদারদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বারোইয়ারী পূজা । ১৯১০ সালে সনাতন ধর্মীয় উৎসাহিণী সভা, ভবানীপুর বলরাম বসু ঘাট লেনে, রামধন মিত্র লেন ও সিকদার বাগানে বারোয়ারী পূজা হয় । অনেকের মতে একদিন দুর্গোৎসবের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতাকে অস্তমিত করার উৎসব পালিত হয়েছিল । আবার স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দুর্গাপূজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা যায়  ১৯২৬ সালে অতীন্দ্রনাথ বোসের দুর্গোৎসবে । তিনি জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে দুর্গাপূজার উৎসবে আমন্ত্রণ জানান । স্বাধীনতা সংগ্রামে দুর্গা পূজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল । কবি নজরুলের 'আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতা এবং বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দেমাতরম' সংগীত যার গুরুত্ব অপরিসীম । সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র বন্দেমাতরম গানটি দেবী দুর্গার ভাবনা থেকেই রচনা করেছিলেন যা একসময় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছিল ।

 শরৎকালে যে দুর্গাপূজা হয় সেক্ষেত্রে পৌরাণিক কাহিনি বা রীতি রেওয়াজ থাকলেও বাঙালি জনজীবনে তা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ । সেকালের বাঙালিজীবনের ক্ষেত্রে দেখা যেত, এই সময়টা ফসল তোলার প্রাকমুহূর্তের অবসরকাল । মাঝে মাঝে তখন সবুজ ধানের ক্ষেতে ফসলের পুষ্টতা এসেছে । প্রকৃতি ও অপরূপ সাজে সজ্জিত । নীল আকাশে হালকা হালকা সাদা মেঘের আনাগোনা । নদীর চড়ায় বালির স্তুপে কাশফুলের দোলা । ইত্যাদি মিলে প্রকৃতি তার বর্ষণঋতু অতিক্রম করছে । এই সময় শ্রমজীবী মানুষের বিশ্রামের মধ্যে কিছুটা বিনোদনের উৎস খুঁজে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে । সেই হিসেবে শরৎঋতুর এই দুর্গোৎসব বাঙালির জীবনের অবসরের শূন্যতাকে পূরণ করে ।

দুর্গাপূজার শুরুর কাল থেকেই এই পূজার মধ্যে একটা সর্বজনীনতা ছিল । সেকালে এই পূজা উপলক্ষে সাধারণ জনগণ এবং রাজা ও জমিদারবর্গের পরিবারের সদস্যরা কাছাকাছি আসার সুযোগ পেত । দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে রাজা ও প্রজাদের মধ্যে বিরাজ করা ভীতি ও দূরত্ব তখন অপসারিত হয়ে যেত । সেকালে বাঙালি জীবনে সামাজিক সম্প্রীতির সূচনার ক্ষেত্রে দুর্গাপূজার মুখ্য ভূমিকা ছিল । অর্থনৈতিক কারণে দুর্গাপূজা বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত ধনী ও অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল ।
সাধারণ মানুষের আর্থিক সংগতি না থাকলেও বিভিন্নভাবে তারা তাদের বিভিন্ন পেশার মাধ্যমে দুর্গাপূজার বিশাল কর্মকান্ডের অংশীদার হওয়ার সুযোগ ছিল । প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা ইত্যাদিতে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে শিল্পীরা অংশগ্রহণ করতেন । সেকালের দুর্গাপূজা ছিল মূলত পরিবারের সম্প্রদায়ের ও স্থানীয় জনগণের নিজস্ব উদ্যোগে সম্মিলিত আয়োজন । গ্রামের জমিদার এবং অভিজাত সম্প্রদায় দুর্গাপূজার প্রাক্কালে তার প্রজাদের উদার আহ্বান জানাতেন এই বিরাট কর্মযজ্ঞে সহায়তা করার জন্য । ফলে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই গ্রামের জমিদার ও বর্ধিষ্ণু ব্যক্তিত্বের বাড়িতে লোকসমাগম হত । গ্রামের দুর্গাপুজায় কয়েকদিন ধরে পুজামণ্ডপে ঢোলের বাজনা, আরতি, শঙ্খ, উলুধ্বনি, ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা ইত্যাদিতে মুখরিত থাকত । এছাড়াও সেই পূজাকে কেন্দ্র করে কীর্তন, রামায়ণ গান, যাত্রাপালা ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম থাকত । এইসব বিনোদনমূলক আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখত । দেবী দুর্গার পূজায় যেমন আছে ভক্তি ও পৌরাণিক তাৎপর্য তেমনি আছে লৌকিক আনন্দ, সামাজিক ঐক্য ও মানবিক সহমর্মিতা এবং সেবার বহুমুখী দিক । দেবী দুর্গা যেন গ্রাম বাংলারই কোন গৃহস্থ পরিবারের কন্যা যাকে দূর দেশে বিবাহ দেওয়া হয়েছে । এই ঘরের মেয়ে পূজার সময় সন্তান-সন্ততি সহ শ্বশুরঘর ছেড়ে বাপের বাড়িতে যান । দশমীতে সকলকে কাঁদিয়ে মেয়ে আবার কৈলাসে তার স্বামীর বাড়িতে ফিরে আসেন । গ্রামীন সংস্কৃতিতে পূজার কয়েক দিন বিবাহিতা কন্যাকে বাপের বাড়িতে নাইওর আনার রীতি রেওয়াজ এখনও রয়েছে । প্রসঙ্গত বলে রাখা যায়, মা দুর্গার চালচিত্রের যে বর্তমান রূপ সেখানে দেবী তার চার সন্তান–লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক গণেশসহ বিরাজমান । এর মধ্য দিয়েও দেবীপ্রতিমায় এক পারিবারিক রূপের প্রকাশ ঘটে । এই পূজার আনন্দেরই অঙ্গ হিসেবে দশমীর দিন গৃহস্থ ঘরে ভালো খাবার দাবারের আয়োজন করার রীতিও রয়েছে । সংবৎসরের পরিশ্রমী কৃষিজীবী মানুষ কাজের তাড়ায় ভালো কিছু খাওয়ার সুযোগ পান না বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য আসেনা । পুজোর এই কয়দিন আনন্দের ফাঁকে তাঁরা রসনার তৃপ্তি করে থাকেন এই উৎসবের মাধ্যমে । গ্রামের পূজোয় দেবীর পূজারমন্ডপ তৈরি, প্রতিমানির্মাণ থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি কাজেই গ্রামের সমস্ত মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্পন্ন করে থাকেন ।

শহরের দুর্গাপূজা অনেক বেশি আধুনিক এবং ব্যয়বহুল । সেখানে দুর্গাপূজায় থিমভিত্তিক প্যান্ডেল, আলো ও প্রতিমার চমকপ্রদ উপস্থাপনা লক্ষ্য করা যায় । প্রতিমানির্মানে ও মন্ডপসজ্জায় যেমন সৃজনশীলতার ছোঁয়া থাকে তেমনি সামাজিক বার্তা ও সমসাময়িক বিষয়ও উঠে আসে । দেবী দুর্গা এখানে শুধু মহিষমর্দিনী, অসুর বিনাশিনী নন । তিনি নারীশক্তির প্রতীক । সমাজের অন্যায়, অবিচার, বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা ইত্যাদি বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবেও উপস্থাপিত হন । পূজা-ভাবনা বা দেবীভাবনার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন বাঙালির চিন্তাভাবনার বিবর্তনের সুকুমার দিকটাকে তুলে ধরে । আজকের দিনের দুর্গাপূজায় সঙ্গীতানুষ্ঠান, শিশুদের মধ্যে চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, সমাজ সচেতনতামূলক সিনেমা প্রদর্শনী ও নানারকম সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় । এর মাধ্যমে পূজায় ধর্মীয় দিকটা পালনের পাশাপাশি বিনোদনের ক্ষেত্রেও আজকের দিনে গুরুত্ব দেওয়া হয় । বর্তমান সময়ে দুর্গাপূজা প্রাঙ্গণে রক্তদান শিবির, বস্ত্র দান, দুস্থ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষণসামগ্রী বিতরণ, স্বাস্থ্যপরীক্ষা ইত্যাদি সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে দুর্গাপূজাকে আরো বেশি করে মানবসেবার উৎসব হিসেবেও পরিগণিত করার প্রয়াস নেওয়া হয় । দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে সাহিত্যচর্চা, বইমেলা, শারদসংখ্যা প্রকাশ আজকের দিনের নিয়মিত চর্চার বিষয় । পূজার সময় বিভিন্ন পূজা কমিটি শারদোৎসব উপলক্ষে বিশেষ স্মরণিকা প্রকাশ করে থাকেন । তাতে পাড়ার খুদে লেখকলেখিকা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের লেখালেখি প্রকাশ করার একটা সুযোগ থাকে । পূজাকে কেন্দ্র করে  সাহিত্যসংস্কৃতিচর্চার আবহ সৃষ্টির এই দিকটিও অনেক মূল্যবান ।

দেবীপূজা বা দেবীভাবনার এই বিবর্তনকে লক্ষ্য করলে দেখি যে, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে দুর্গোৎসব আজ এই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে । দুর্গাপূজা আজ শুধু বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে নয়, পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাঙালিরা আছেন সেখানেই তা যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে । ইতিহাসবিদরা মনে করেন যে প্রায় ২২ হাজার বছর পূর্বে ভারতের প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠীর হাতেই দেবী পূজার প্রচলন হয় হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সভ্যতা তথা সিন্ধু সভ্যতায় এসে তা আরো গ্রহণযোগ্য ও বিস্তৃত হয় । মাতৃ তান্ত্রিক দ্রাবিড় সভ্যতায় বিভিন্ন মাতৃ দেবীর পূজার প্রচলন ছিল । তারই ক্রম বিবর্তন আজকের দুর্গোৎসব । অতীত ও বর্তমানের দুর্গাপূজার মধ্যে বেশ কিছু ফারাক থাকলেও তার মূল স্রোত কিন্তু একই ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমাজের বিবর্তন দুর্গাপূজার রূপকে বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষিতে পরিবর্তিত করছে এবং নতুন ভাবে উপস্থাপন করছে । দেবীপূজার পাশাপাশি বাঙালির মননেও চিন্তা ভাবনায় নানা কল্যাণকর ভাবনা যে রূপ পাচ্ছে এবং তা নতুন নতুন ভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে সেটাই হল পূজার আধুনিকতা । দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে এক চিরন্তন উৎসব যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাহিত হয়ে চলছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রূপ পরিগ্রহ করছে । ফলে দুর্গাপূজা শুধুমাত্র দেবী আরাধনা নয় নানাবিধ নতুন নতুন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দুর্গাপূজা মানবসেবার উৎসবে পরিণত হচ্ছে এবং প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে আলো ঝলমলে শহরে প্যান্ডেলের সর্বত্রই দুর্গাপূজা একতা ও সম্প্রীতির বাণী প্রকাশ করছে ।

Friday, February 7, 2025

আমার কুম্ভস্নান ও অগণিত রত্নঢেউ

        

Saturday, January 25, 2025

আমার কুম্ভস্নান ও অগণিত রত্নঢেউ

আমার কুম্ভস্নান ও অগণিত রত্নঢেউ । 

আজ কুম্ভস্নানতিথি । মহাকুম্ভস্নানের ক্ষণ ।  আমার কুম্ভস্নান । বইমেলা আমার কুম্ভমেলা । এই মেলার শুরুর দিন থেকে প্রতিবছর অগণিত জনসমুদ্রে অবগাহন করে এসেছি । আজ এল আমার সেই মহালগ্ন । পূর্ণ আমার অমৃতকুম্ভের সন্ধান । আমার জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তে মনে পড়ছে আমার পিতৃদেবকে । যিনি আমার শৈশবের কোন একদিন আমাদের পারিবারিক আরাধ্য দেবতাবর্গের পটের সামনে বসিয়ে হালকা আবির রঙের এক পাখির পালক দোয়াতে ডুবিয়ে কলাপাতায় হাতেখড়ি দিয়েছিলেন । তারপর ক্রমান্বয়ে আমি খাগের কলম, বাঁশের কঞ্চির কলম,স্লেটপেন্সিল,  কাঠপেন্সিল, ফাউন্টেন পেন বলপেন ও আজকের দিনের মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপে অক্ষর সাজিয়ে চলেছি । আমার অক্ষর বিন্যাসের মহড়ায় শৈশব থেকে আমাকে নিয়ত লালন করে গেছেন বহু শ্রদ্ধেয়জন । আজ কুম্ভজলের প্রতিটি ঢেউয়ের আলোড়নে অমার অন্তরাত্মা বারবার উচ্চারণ করছে তাঁদের নাম যাঁরা আমার জীবনের নানাক্ষেত্রে আমাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন । শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন প্রধানশিক্ষক প্রমোদরঞ্জন দে, পূর্ণেন্দুবিকিশ দত্ত, সন্তোষ ভট্টাচার্য, ও লালকৃষ্ণ দাশসহ সুনীল বর্মন, নিখিল চৌধুরী, গোপাল চক্রবর্তী,  দীপংকর নাথ, সত্যজিৎ ভট্টাচার্য, প্রদ্যোৎ পাল, বিক্রমজিৎ দেব, নিকুঞ্জবিহারী নাথ, দেবলমোহন ভট্টাচার্য, সুখেন্দুবিকাশ চৌধুরী, নিখিল চৌধুরী, অমিয়প্রভা চৌধুরী, স্বপ্না ভট্টাচার্য, সুরেশ দত্ত, প্রাণতোষ কর্মকার, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক দেবতোষ চৌধুরী ও মানিক চক্রবর্তী ( গল্পকার ), কাশীনাথ দাস  প্রমুখ সেকালের দিকপাল শিক্ষকরা । শৈশব কৈশোরে বাবার চাকুরিসূত্রে কাটিয়েছি কুলাইতে । সে স্কুলের গ্রন্থাগারটিও ছিল সেযুগে সমৃদ্ধ । পড়ার বইয়ের বাইরে অনেক বই পড়ার সুযোগ পেয়েছি সেখানে । কুলাই হাসপাতালে চিকিৎসক দম্পতি ছিলেন ড. এম এল বোস এবং ড. লীলা বোস । তাঁদের একমাত্র সন্তান কুশল আমার বাল্যবন্ধু । তাদের একটা পারিবারিক লাইব্রেরি ছিল । সেখানে আমি গোগ্রাসে পড়েছি আগকার দিনের সেই পূজাবার্ষিকীগুলো, দেশ, অমৃত, শুকতারা, নবকল্লোল, প্রসাদ, উল্টোরথ, সিনেমা জগৎসহ, টারজান, নন্টে-ফন্টে, ইন্দ্রজাল কমিকস, স্বপনকুমার সিরিজসহ বিশ্বসাহিত্যের বহু অনুবাদগ্রন্থ ।  কুশল অর্থাৎ শিবাজী বসুর দিদি ভাস্বতী বসু রত্নাদির সঙ্গে আমার বইপড়ার প্রতিযোগিতা চলত ।  পিসিমা ড. লীলা বসু বেশ উৎসাহ দিতেন আমাদের । ওরা সবাই এখন কলকাতাবাসী । সাব্রুম মহকুমায় আমি সাহচর্য পেয়েছি ড. ননীগোপাল চক্রবর্তী, ড. রঞ্জিত দে, কৃষ্ণধন নাথ, তিমিরবরণ চাকমা, গোপীরঞ্জন বসাক, কানাইলাল নাথ, জয়দেব বসাক, প্রদীপ চৌধুরী, দীপক দাস রতন চক্রবর্তী, থেঙ্গাফ্রু মগ, সঞ্জিৎ মালাকার প্রমুখগণের । সাব্রুম উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সূত্রে আমি সেই বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের দায়িত্বে ছিলাম দীর্ঘদিন । এখানে আমি পড়েছি প্রচুর । সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি শ্রদ্ধাস্পদ প্রধান শিক্ষক লালকৃষ্ণ দাস, স্বপন মুখার্জী ও ব্যোমকেশসখা দেবনাথ, পন্ডিতমশাই যশোদাজীবন গোস্বামী, মানিকলাল ব্যানার্জী, সুভাষ  দাস, রমণীমোহন নাথ, রণজিৎ দেবনাথ, গোপাল দেবনাথ, ড. রঞ্জিত দে, ড. ননীগোপাল চক্রবর্তী, শংকর বনিক, শম্ভু চৌধুরী, শিখা ভট্টাচার্য, শম্ভুনাথ সাহা আলপনা চক্রবর্তী, বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য, সুব্রতা দে, অর্জুন শর্মা, সাধন মজুমদার, টুটুল মজূমদার, গণেশ কর, রাখাল সোম, সাধন পাল, সাধন মজুমদার, পার্থ দেব, পার্থ সাহা, গীতা চক্রবর্তী, রণজিৎ চক্রবর্তী  প্রমুখ দিকপাল শিক্ষক শিক্ষিকাদের । বিলোনিয়া মহাবিদ্যালয় পড়ার সময় নিবিড় সান্নিধ্য পেয়েছি অধ্যাপক অরূপরতন মুখোপাধ্যায়, কালিপদ হুই, প্রাণকৃষ্ণ মন্ডল, পরিতোষ সরকার ( ভাষাতাত্ত্বিক ডক্টর পবিত্র সরকার এর অনুজ ), রণজিৎ দত্তকে এবং হরিনারায়ণ সেনগুপ্ত, হরিভূষণ পাল, অশোক দাশগুপ্ত, কুসুমকুমার পাল, ভূপাল সিনহা প্রমুখ সেকালের বিলোনিয়ার অগ্রজ সাহিত্যসেবীগণের । গত শতকের সাতের দশকের শেষ দিকে আমার দুর্দিনে আমাকে মরুদ্যানপ্রতিম সাহচর্য দিয়েছেন প্রয়াত কবি অরুণ বনিক । তিনি আমাকে বিশ্বসাহিত্যের বিশিষ্ট লেখকদের সঙ্গে পরিচয় করান সেদিন । ছোটোখিলের মতো প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আমার কবিতা নিয়ে গ্রুপ সেঞ্চুরির উদ্যোগে আয়োজিত আগরতলা পোস্ট অফিসের সামনে অনুষ্ঠানে পাঠ করে শোনান । এই দশকেই জাগরণ সাহিত্য বাসরের সৌজন্যে আমার পরিচয় হয় রাজ্যের বরিষ্ঠ কবি নকুল রায় ও মানস পালের সঙ্গে । এই দুজন আমাকে ফুটে ওঠার জন্য তুমুল ভাবে উত্তাপ দিয়ে যাচ্ছেন । তাঁদের মাধ্যমেই পরিচিত হয়েছি সে যুগের দিকপাল সব সাহিত্যিকদের সঙ্গে । আগরতলায় বন্ধুবর কবি কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর  বাড়িতে আসত নানাধরনের বই ম্যাগাজিন । আসতেন রাজ্যের দিকপাল সাহিত্যসেবীরা । সেখানে নিবিড় অধ্যয়নের পাশাপাশি আমি পরিচিত হয়েছি তাঁদের সাথে । আশির দশকের শুরুতে বইমেলা যেন আমাকে সাগর সঙ্গমে নিয়ে এল । সেদিন যাদের অভিভাবকত্বে আমি বেড়ে উঠেছিলাম তাঁরা হলেন ভীষ্মদেব ভট্টাচার্য, বিমল চৌধুরী, কালিপদ চক্রবর্তী, অসীম দত্তরায়, ননী কর, দিব্যেন্দু নাগ, পূর্ণেন্দু গুপ্ত, সমরজিৎ সিংহ, রামেশ্বর ভট্টাচার্য, দিলীপ দাস, সুজিতরঞ্জন দাস করুণাময় শর্মা । আরো অনেকেই আমাকে লালন করেছিলেন সেদিন যাদের নাম আমি আজ আর মনে করতে পারছি না । আমার সময়ে কৃত্তিবাস চক্রবর্তী, বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, সন্তোষ রায় লক্ষ্মণ বণিক, সমর চক্রবর্তী, প্রত্যুষরঞ্জন দেব, মাধব বনিক প্রমুখগণ আমাকে ক্রমাগত উৎসাহিত করেছেন । আমার পরবর্তী প্রজন্মের দেবাশিস চক্রবর্তী, পার্থপ্রতিম চক্রবর্তী, আকবর আহমেদ, অশোক দেব, প্রবুদ্ধসুন্দর কর, মিলনকান্তি দত্ত, গোবিন্দ ধর অপাংশু দেবনাথ, গোপেশ চক্রবর্তী, তারাপ্রসাদ বনিক, অভীককুমার দে, বিজন বোস থেকে শুরু করে আজকের দিনের সপ্তশ্রী কর্মকার, মিঠু মল্লিক বৈদ্য, অনামিকা লস্কর, শংকর সাহা, গোপা সাহা, টিঙ্কুরঞ্জন দাস, অর্ধেন্দু ভৌমিক সাচীরাম মানিক, রুপন মজুমদার, রাহুল শীল, ভবানী বিশ্বাস তাদের সৌহার্দ্যবলয়ে আমাকে ঘিরে রেখেছেন । জীবনের সাঁঝবেলা হলেও নবীন প্রজন্মের সাথে আমি পা মিলিয়ে চলেছি আলোপথে । কালের কাছে আমার প্রার্থনা, আরো আরো সময় দাও আমাকে হে! আরো বেশি করে যেন খুঁজতে পারি সাহিত্যের মণি-মানিক । আমার এই সাহিত্যসম্মান ত্রিপুরার সমস্ত সাহিত্যপ্রাণ মানুষের জন্য উৎসর্গ করছি ।
১৪ জানুয়ারি, ২০২৫
আগরতলা বইমেলা প্রাঙ্গন ।

No comments:

Thursday, November 17, 2022

সংকীর্তন

যেথায় আছে সবার অধম দীনের হতে দীন/ সেইখানেতে চরণ তোমার রাজে' – আপনি অরূপের সন্ধান পেয়েছেন নিশ্চিত । কীর্তনের আসর যে শরীর-মন-আত্মাকে একবিন্দুতে নিয়ে সে অনুভব মহার্ঘ । গাঁয়ের পরিশ্রমী মানুষজনের  কীর্তনের আসরের তন্ময়তা ধ‍্যানেরই সহজিয়া রূপ । দূর অতীতের কাহ্নপা-চন্ডিদাস-ভারতচন্দ্র-রামপ্রসাদ-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল যেন একধারায় এসে মেশে এই আসরে । Soumit Basu সৌমিত বসু তার সর্বাধুনিক সংযোজন । ভালো থাকবেন ।

Saturday, November 12, 2022

নেই কেন সেই গোলা নেই কেন

নেই কেন সেই গোলা নেই কেন

অশোকানন্দ রায়বর্ধন ।

বাঙালির জীবনপ্রণালী একসময় মূলত কৃষির উপর নির্ভরশীল । ছয় ঋতুকে ঘিরে কৃষিকর্মের মধ‍্য দিয়েই সংবৎসরের আহার্য সংগ্রহ করা হত । গ্রীষ্মের দাবদাহের পর বর্ষার বৃষ্টিজলে ভিজে যে ফসল ফলানো হত , শরৎ পেরিয়ে হেমন্তের শেষদিকে সে ফসল ঘরে আসত । কার্তিক এবং অগ্রহায়ণ দুই মাস হেমন্তকাল । হেমন্তের দুটি রূপ । কার্তিক মাসটি ছিল অভাব অনটনের মাস । এইসময় বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ‍্যাভাব দেখা দিত । সারাবছরের অন্নসংস্থান করার জন‍্য যে খাদ‍্যশস‍্য জমিয়ে রাখা হত সেই ধান-চাল কার্তিকে এসে ফুরিয়ে যেত । ধান-চালের ভান্ডার খালি হয়ে যেত । তাই কার্তিকমাসের একটা দুর্নাম ছিল । এই মাসকে বলা হত 'মরা কার্তিক' । রবীন্দ্রনাথের কবিতায়ও মন্দাক্রান্ত কার্তিকের ইঙ্গিত পাওয়া যায় । আর অগ্রহায়ণমাসে পাওয়া যায় এর বিপরীত চিত্র। এই সময় মাঠে মাঠে সোনালি ফসলে ভরে যায় । শুরু হয় ফসল কাটা । ঘরে ঘরে শুরু হয় ব‍্যস্ততা । চলে নবান্নের আয়োজন । কৃষাণী বধূ উঠোন নিকানোর কাজ শুরু করে । চলে ধান মাড়াই, পাকা ধান শুকানোর কাজ । একসময় পাকা ধানে কৃষকের গোলা ভরে ওঠে ।

একসময় গ্রামে বর্ধিষ্ণু কৃষকের প্রতীক ছিল ধানের গোলা । ধানের গোলা বাঙালির গ্রামীন শস‍্যগুদাম । বাঙালির সংসার বলতেই একটা কথা প্রচলিত ছিল 'গোয়ালভরা গোরু, পুকুরভরা মাছ আর গোলাভরা ধান' । গ্রাম বাংলার সমৃদ্ধির প্রতীক ছিল এই ধানের গোলা । সম্পন্ন গৃহস্থরা ধান রাখার জন‍্যে এই গোলার ব‍্যবহার করতেন । অতীতদিনে বাড়িতে ধানের গোলা না থাকলে  গৃহস্থরা সেই বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিতেন না । নোয়াখালি অঞ্চলের একটা প্রবাদে পাই 'হোলা বিয়া করাইবা জাত চাই /  মাইয়া বিয়া দিবা ভাত চাই' । কৃষকের ধানের গোলার সঙ্গে ধনের দেবী লক্ষীর নিবিড় সম্পর্ক । লক্ষ্মীপুজোর আলপনায় ধানের গোলার চিত্রও অংকন করা হয় আজো । বিয়ের পর নববধূ শ্বশুরবাড়িতে এলে তাকে ধানের গোলা দেখানোর লোকাচার দক্ষিণ ত্রিপুরায় আজো রয়েছে ।

গ্রামদেশে শস‍্য সংরক্ষণের লোকজ প্রযুক্তি এই ধানের গোলা । গোলাঘরে ধান, বীজ রাখলে সেগুলো ভালো থাকে । শোবার ঘরে বা অন‍্যত্র ধান বা শস‍্যাদি রাখলে ইঁদুর ও সাপের প্রকোপ বেড়ে যায় । তাই গোলাঘরে ধান-বীজ সংরক্ষণ নিরাপদ । আগের দিনে বাড়িঘর নির্মানেও বাস্তুশাস্ত্র বা স্বাস্থ‍্যনীতি মেনে চলা হত । বলা হত ' দক্ষিণদুয়ারী ঘরের রাজা / পুবদুয়ারী তার প্রজা / উত্তরদুয়ারীর ভাত নাই / পশ্চিমদুয়ারীর কপালে ছাই' ।  আগেরদিনে বাড়িঘরের দক্ষিণদিক খোলা রাখা হত । সেই দিক দিয়ে বাড়ির প্রবেশপথ থাকত । গৃহস্থবাড়ির ঐশ্বর্যসূচক এই গোলাঘর দক্ষিণদিকেই একপাশে থাকত । যাতে বহিরাগতরা এই গৃহস্থের ঐশ্বর্যের অনুমান করতে পারতেন । প্রবাদেও তেমনি রয়েছে 'পুবে হাঁস, পশ্চিমে বাঁশ / উত্তরে কলা আর দক্ষিণে খোলা / গোলা' ।

এই ধানের গোলা নির্মানে লৌকিক প্রযুক্তির ব‍্যবহার ও ছিল সেইসময় । ধানের গোলা তৈরির জন‍্যে দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন । তখনকার দিনে দশগ্রামে হয়তো দুচারজন গোলা তৈরির দক্ষ শ্রমিক পাওয়া যেত । তাদের খবর দেওয়া হলে তারা এসে স্থান নির্বাচন করত । তারপর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম যোগাড় হলে গোলা তৈরির কাজ শুরু হত ।  অপেক্ষাকৃত ধনাঢ‍্যরা বেশ শক্তপোক্ত গোলাঘর তৈরি করতেন । তারা পুরোটা বাঁশবেতের সাহায‍্যে করতেন । বাঁশ, বাঁশের পিঠের অংশের বেত,বাঁশ কেটে শক্ত কঞ্চি, বেত ইত‍্যাদি দিয়ে গোলাকার কাঠামো তৈরি করা হত । এরপর তার গায়ে ভেতরে ও বাইরে বেশ পুরু করে এঁটেল মাটির আস্তরণ লাগানো হত । চোর-ডাকাতের হাত থেকে বাঁচবার জন‍্যে গোলার মুখ রাখা হত অনেক উপরে । বন‍্যা ও ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন‍্যে ধানের গোলা অনেক উঁচুতে বসানো হত । নির্মিত গোলার মাথায় বাঁশ, ছন বা খড়ের ছাউনি থাকত । ধনী গৃহস্থরা কেউ কেউ টিনের ছানিও দিতেন ।

সাধারণ গৃহস্থরা অল্প খরচে ধানের গোলা তৈরি করতেন । এই গোলা তৈরির প্রধান উপকরণ হল ধান মাড়াই শেষে উদ্বৃত্ত খড় । ধানের খড় দিয়ে দড়ির মতো লম্বা বিনুনি পাকানো হত ।  খড়ের গাদা থেকে খড় টেনে একজন বিনুনি পাকানো শুরু করতেন ।আরেকজন সহযোগী পাকের সঙ্গে সঙ্গে খড় সরবরাহ করে যেতেন । এভাবে খড়ের সাথে খড় জুড়ে জুড়ে দীর্ঘ বিনুনি তৈরি করা হয় । এই লম্বা দড়িকে  গোলার জন‍্য নির্মিত বাঁশে কাঠামোর মধ‍্যে বৃত্তাকারে স্তরে সাজিয়ে একটা নির্দিষ্ট জায়গা ঘিরে ফেলা হত । এরপর এটার বাইরে ভেতরে গোবর-মাটি-তুষের মিশ্রণ পুরু করে লেপে দেওয়া হলেই শক্তপোক্ত মড়াই তৈরি হয়ে যায় ।

কালক্রমে দক্ষ শ্রমিকের অভাবে একসময় গোলাঘরে ব‍্যবহার কমে আসে । গোলাঘর নির্মানের অভাবে কৃষকরা বাঁশের তৈরি ছোটো আকারের জালাতে ধান রাখতে শুরু করেন । এগুলোকে 'ডোল' বলে । উত্তর ত্রিপুরার সিলেটিরা বলেন 'টাইল' । একসময় বাঁশের তৈরি ডোল বা টাইল  সারা পূর্ববাংলায় ও ত্রিপুরার সর্বত্র ব‍্যবহার হত । চট্টগ্রাম, পার্বত‍্য চট্টগ্রাম ও ত্রিপুরা বনে প্রাপ্ত 'ডলুবাঁশ' নামে এক প্রজাতির বাঁশ দিয়ে বাঙালি ও উপজাতি কামলারা এই ডোল বানাতেন । ত্রিপুরার বাঙালি ও উপজাতিদের অনেকেই এই ডোল নির্মানে দক্ষ ছিলেন । তাঁদের নির্মিত ডোল কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসে গ্রাম‍্য বাজারগুলিতে বিক্রির জন‍্য তোলা হত ।  বাজারের বিরাট অংশ জুড়ে থাকা সারি সারি ডোলের এ দৃশ‍্য এখন আর দেখা যায় না । সেই কামলারাও নেই । বন উজাড় হয়ে যাওয়ায় ডলুবাঁশ ও এখন দুর্লভ ।  বাঁশবেতের এই লৌকিক শিল্পটি এখন বিলুপ্তপ্রায় । প্রসঙ্গত উল্লেখ‍্য, ত্রিপুরার মগ জনগোষ্ঠীর মানুষেরা বুদ্ধ পূর্ণিমার সময় যে আকাশবাতি ওড়ান তার গঠন ডোলের আকৃতির হওয়ায় দক্ষিণ ত্রিপুরার বাঙালিরা এই আকাশবাতিকে 'ডোলবাত্তি'ও বলেন । এই ধানের ডোল নিয়ে দক্ষিণ ত্রিপুরার একটি প্রচলিত ধাঁধা হল 'রাজার বাড়ির মেনা গাই মেনমেনাইয়া চায় / হাজার টাকার ধান খাইয়া আরো খাইতো চায়' । লৌকিক ছড়াতে যেমন রয়েছে 'ছেলে ঘুমিওনা পাড়া জুড়াবেনা / বর্গী আছে দেশে / ধানের গোলা শেষ হয়ে যাবে / খড় কুড়াবে শেষে' । তেমনি আধুনিক কবির কবিতায়ও রয়েছে ধানের গোলার প্রসঙ্গ– 'ভাঙছ প্রদেশ ভাঙছ জেলা / ভাঙছ ঘর বাড়ি / পাটের আড়ত ধানের গোলা / কারখানা আর রেলগাড়ি ( তেলের শিশি-অন্নদাশংকর রায় ) । রবীন্দ্রনাথও তাঁর কবিতায় উল্লেখ করেছেন, 'রাখি হাটখোলা নন্দীর গোলা মন্দির করি পাছে / তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু শেষে আমার বাড়ির কাছে  ( দুই বিঘা জমি- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ) ।

সময়ের গতির সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা আজ হারিয়ে গেছে । বর্তমান প্রজন্মের কাছে তা রূপকথার মতো শোনাবে আজ । বর্তমানে ইট, বালি, সিমেন্ট দিয়ে তৈরি গুদামঘরে ধান রাখা হয় । বাড়িঘরে পাট প্লাস্টিক ইত‍্যাদির বস্তায়ই আজকাল ধান মজুত করা হয় । এখন আর সেই বর্ধিষ্ণু পরিবার নেই । গ্রামীন চাষপদ্ধতিতেও এসেছে আধুনিকতা । ছোটো ছোটো পরিবার হয়ে ভেঙে গেছে বাঙালির একান্নবর্তী পরিবার । স্থান সংকুলানের অভাবেও গোলাঘরকে বিদায় জানাতে হয়েছে । যেমন বিদায় জানিয়েছে বাঙালি তার বহুবিধ লৌকিক সংস্কৃতিকে ।

Tuesday, November 8, 2022

অভিরামের দ্বীপচালান

অভিরামের দ্বীপচালান

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আমি একজন দৃঢ়চেতা স্বাধীনতা সংগ্রামীর সন্তান । যিনি তাঁর বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের বিনিময়ে কোনো সাম্মানিক কোনো স্বীকৃতি গ্রহণ করেননি । তাঁর আদর্শেই আমি বেড়ে উঠেছি । প্রতিবাদী মানসিকতা নিয়েই চলি । ফলে এই স্বাধীন দেশের শাসক গোষ্ঠীর রাজনীতির সঙ্গে কিছুতেই নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারিনি । সারাটা জীবন ভুগতে হয়েছে তার জন‍্যে ।   কর্মজীবনে প্রাপ‍্য সুযোগ থেকে । দোরগোড়ায় এসে ফিরে গেছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সম্মান । সে অনেক কথা ।

স্বাধীনতা যুদ্ধে যে দল মুখ‍্য ভূমিকা গ্রহণ করার ইতিহাস তৈরি করেছে । ক্ষমতায় এসে তারা বিরুদ্ধ মতাদর্শের মানুষগুলোকে পদে পদে লাঞ্ছিত করেছেন । বিপ্লবীদের অনেকেই স্বাধীনোত্তরপর্বে রাষ্ট্রশক্তির রক্তচক্ষুর সম্মুখীন হয়েছেন বার বার । তাঁদের অতীতের বৈপ্লবিক কর্মকান্ড, তাঁদের অবদান বেমালুম ভুলে গেছে স্বাধীন দেশের কান্ডারীরা । ইংরেজ আমলের চর ও পুলিশ অফিসারেরা একসময় রাষ্ট্রের হাল ধরে ফেলে । পূর্বশত্রুতার সূত্র ধরে বিপ্লবীদের নাজেহাল করতে ছাড়ে না । নানাভাবে নানা দুর্নীতিতে তারা জড়িয়ে পড়ে । চলমান রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে একসময় বিক্ষোভও হয় । গণতান্ত্রিক নিয়মে পরিবর্তনও আসে । বিক্ষুব্ধ দল ক্ষমতায় এসে শাসকেরই রূপ নেয় । নৃশংসতায় পূর্বসূরীদেরকে পেরিয়ে যায় । হয়তো আবারও বদল হয় । পতন ঘটে এক একটি স্বৈরতান্ত্রিক অধ‍্যায়ের । এই বিষয়গুলো ঘুরে ঘুরে আসতে দেখছি এ দেশে, এ রাজ‍্যে ।

পতনের পর প্রতিটি দলই নবীন সন্ন‍্যাসী হয়ে যায় । ভুলে যায় তাদের পূর্ব কীর্তির কথা । চলমান শাসকের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণ হয়ে কুৎসা  করে আর নতুন করে স্বপ্ন দেখায় মানুষকে । চলমান শাসকেরাও পূর্বতন শাসকের কুশাসনের ক‍্যাসেট বাজিয়ে পূর্বের প্রতিশ্রুতি কবরে পাঠিয়ে নতুন ঠাকুমার ঝুলি নিয়ে আসে । সুযোগসন্ধানীরা দলবদল করে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে । দলবদলের কারণে ফেলে আসা সহযোদ্ধাকে ল‍্যাং মারে । দলে যোগ দেওয়ায় পূর্বশত্রুকে গঙ্গাজলে ধুয়ে গলায় জড়িয়ে নেয় । সবগুলো দলই ক্ষমতায় থাকলে বিরুদ্ধ মতাদর্শের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে যায় । সাধারণ মানুষকে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে । নানাভাবে নির্যাতন করে । দুবেলা পার্টি অফিসে হাজিরা না দিলে, মিছিলে না গেলে, তেলের বাটি নিয়ে নেতাদের বাড়ি না ঘুরলে সে নাগরিকদের রক্ষা নেই ।  

সুযোগসন্ধানীরা সুদিনে যে দলের ব‍্যানারবাহক হয় দিন ফুরোলে রাতারাতি অন‍্যদলের ঝান্ডাবাহিনীর সামনের সৈনিক হয় । যে নাগরিক বিরুদ্ধাচরণ করে তার বিরুদ্ধে মানুষ লেলিয়ে দেওয়া হয় । সে নাগরিকের কোনো নিকটাত্মীয় সরকারী চাকুরে হলে তার উপরেও কোপ আসে রাজনীতির । নিরীহ হলেও রেহাই থাকে না তার । আর কোনো সরকারি কর্মচারী অপছন্দের হলে তো তাকে সাতঘাটের জল খাইয়ে দেওয়া হয় । তাকে সাতবার গাড়ি পাল্টানো জায়গায় বদলি করে দেওয়া হয় । অনেকটা পরাধীন ভারতবর্ষের দ্বীপান্তরের মতো । আবার দলীয় সূত্রে নতুন জায়গায়ও তার পরিচিতি পৌঁছে দেওয়া হয় । সেখানেও তার উপর থাকে শ‍্যেনদৃষ্টি । বৃটিশ আমলে পুলিশের নজরে যেমনটা ছিলেন বিপ্লবীরা । অসুস্থ মা-বাবা, সন্তান প্রিয়জন বিচ্ছিন্ন হয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে শেষ হয় যাওয়া ছাড়া , পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়া ছাড়া আর গত‍্যন্তর থাকে না ।

 রাজনীতির এই নোংরামিগুলোর কথা বলে লাভ নেই । নামে রাজনীতি । রাজার নীতি । নীতির রাজা । কিন্তু এটাকে পেশাগতভাবে কব্জা করে নিয়েছে অর্ধশিক্ষিত ও নোংরা মনের মানুষেরা ও তাদের পোঁধরা সুযোগসন্ধানী মানুষেরা । আমার পেশাগত জীবনে আমি পদে পদে এইসব দুর্ভোগ পেরিয়েছি । আমি বলতে পারিনি সন্তানের মুখ চেয়ে । ছেলেদুটোকে আমার দাঁড় করাতেই হবে । আমার রক্ত তো তাদের শরীরে । তারাও চাকরির জন‍্যে নবরত্ন তেল নিয়ে নেতা-মন্ত্রীর দুয়ারে ঘুরতে পারবে না । বলতে পারিনি পরিজনের ভাবনায় । অন্নচিন্তায় । সেই ফিরিস্তি তুলে ধরলে লেখাটা আত্মকথনে ক্লিষ্ট হয়ে যাবে । আর কারো নাম করে তাঁকে বা তাঁদেরকে সমাজে হেয় করা আমার উচিত হবে না । আমার প্রতি বিরাগভাজন হলেও অন‍্যের হয়তো উপকার করেছেন । তাই দুঃখটা অন্তরেই পুষে রাখলাম । কিন্তু কথা হচ্ছে, আমরা দিন দিন অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছি বলে বড়াই করছি । কিন্তু ঈর্ষা, প্রতিহিংসায় আমরা সেই আগের যায়গাতেই রয়ে গেছি । সাধারণ ছাপোষা কর্মজীবীদের নিয়ে আজও সেই নোংরামি সমানে  চলছে ।

Tuesday, November 1, 2022

সব পথ শেষে......

সব পথ শেষে.....

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম । চাকুরির শেষের কদিন আধিকারিক পদেও ছিলাম । ফলে অনেক ছাত্রের সান্নিধ্যে এসেছি তেমনি বহু গুণী শিক্ষকের সান্নিধ্যেও এসেছি ।আর তেমনি এসেছি  শিক্ষাবিভাগীয় কিছু আপদ ঊর্ধতন কর্মকর্তাদেরও । যারা দলগুণে ওই পদগুলোতে বসে সাধারণ শিক্ষকদের সঙ্গে অবিরাম অভব‍্য ব‍্যবহার করতেই অভ‍্যস্ত । কোনোরকম সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেই আনন্দিত । চাকরিজীবনের শেষদিন পর্যন্ত প্রাপ্ত সেইসব লাঞ্ছনাগুলো ভুলে থেকেছি শুধু এই মহান ঈশ্বর পেশায় শিক্ষক হতে আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন বলে । আর অগণিত ছাত্র-শিক্ষকের,অভিভাবকদের ও সমাজের দেওয়া সম্মানকে মাথায় রেখেছি বলে । নইলে নাম করে বলে দিতে পারি, কোন আপদের কাছ থেকে কখন কি ব‍্যবহার পেয়েছিলাম এই আমি । বেশ কবছর হল, এই মহান পেশা থেকে অবসরে চলে এসেছি । এখনও শিক্ষক বলে সম্মান পাই । ছাত্রের কাছ থেকে । ছাত্রের বন্ধুজনের কাছ থেকেও শিক্ষকের মর্যাদা পাই । পূর্বপেশার পরিচয় পেয়েও অনেকে শিক্ষকের মর্যাদা দেন । এই প্রাপ্তিই আমার শেষ পারানির কড়ি । এ নিয়েই ওপারের ডাক এলেই পেরিয়ে যাব বুক ফুলিয়ে ।

শিক্ষক শব্দটাকে আমি মনেপ্রাণে নামাবলির মতো জড়িয়ে নিয়েছি আমার চেতনায় । তাই শিক্ষকের অমর্যাদা, শিক্ষকের লাঞ্ছনায়, শিক্ষকের গ্লানিতে আমার প্রাণ কেঁদে ওঠে সবসময় । আজ কয়েকবছর হয়ে গেল আমাদের রাজ‍্যের এক বিরাট সংখ‍্যক শিক্ষক নিত‍্যদিন দারিদ্র‍্য, বুভুক্ষা, অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়ছেন । একটা বিশাল অংশের শিক্ষক-শিক্ষিকা হতাশায়, অনাহারে, রোগজর্জরিত হয়ে চিকিৎসার অভাবে চিরবিদায় নিয়ে গেছেন । তাদের নিয়ে শুধু দলবাজি হয়েছে । ভোটবাণিজ‍্য হয়েছে । কিছুদিন ভুল তথ‍্য দিয়ে একদল অবুঝকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে । বলা হয়েছে এরা শিক্ষকের যোগ‍্য নয় । যখন এই বঞ্চিত শিক্ষকদের মধ‍্যে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত একজন আত্মহননের পথ বেছে নেন তখনই সবার সম্বিত ফেরে । এখনও যাঁরা লড়ে যাচ্ছেন তাঁদের মধ‍্যে এমন যোগ‍্যতার অধিকারী বেশ কজন আছেন । বেশ কজন আছেন প্রশাসনের অন‍্য যোগ‍্য পদে না গিয়ে শিক্ষকতার পেশায় এসেছেন । বেশ কজন কর্পোরেট সেক্টরের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজের রাজ‍্যে এসে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন শুধু এই মহান ব্রতটাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার জন‍্যে । আর এখানে এসে তাঁরা আজ পদে পদে লাঞ্ছিত হয়েছেন, আজও হচ্ছেন ।

 ১০৩২৩শিক্ষকদের সমস‍্যা আজ রাজ‍্যের জ্বলন্ত সমস‍্যা । চাকরি হারিয়ে আজ তাঁরা পরিবার পরিজন নিয়ে দিশাহারা । আমার চাকুরিকালীন সময়েই তাঁরা কাজে যোগ দিয়েছিলেন । কাজেই তাঁদের নিয়োগপ্রক্রিয়া থেকে কর্মচ‍্যুতি সবটা সম্বন্ধেই আমার স্পষ্ট ধারণা রয়েছে । চাকুরির সুবাদে এই শিক্ষকদের একটা বড়ো অংশের সঙ্গে আমার প্রত‍্যক্ষ ও পরোক্ষ পরিচয় রয়েছে । এঁদের অনেকে আমার ছাত্র, আমার একসময়ের সহকর্মী, অনেককে শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মশালা, প্রোগ্রামে পেয়েছি, অনেককে ডি এল এড-এ পড়িয়েছি । কাজেই তাদের যোগ‍্যতা, মেধা ও মনন সম্বন্ধে আমার সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে । সেকারণেই তাদের দুঃখে ও লাঞ্ছনায় আমার কলম আমাকে তাড়িত করে তাদের জন‍্যে লিখতে । আমার আর কি এমন যোগ‍্যতা রয়েছে । আমাদের রাজ‍্যে তো কত শিক্ষকই তো জাতীয় স্তরে, রাজ‍্যস্তরে সম্মানিত হয়েছেন । রাষ্ট্রপতির হাত থেকে রাজ‍্যপালের হাত থেকে সম্মাননা গ্রহণ করেছেন । অনেকেই শিক্ষাবিভাগীয় অনেক পদ সামলেছেন । তাঁরা সম্মানের সব সর ননী খেয়ে মোহন্ত হয়ে বসে আছেন । এই অবহেলিত শিক্ষকদের জন‍্যে একটা কাশিও দেননা তাঁরা । এই শিক্ষকরা যখন রুটি রুজি ফিরে পাওয়ার জন‍্যে রাজপথে নেমে রাষ্ট্রশক্তির দ্বারা নির্যাতিত হন তখনই আমার প্রাণ কেঁদে ওঠে কিছু লেখার জন‍্যে । আমার সেইসব লেখা সোস‍্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়ায় । লিখে যে শুধু বাহবা পাই তা না । আমার কোনো বক্তব‍্য যদি  একাধিক গ্রুপে বিভক্ত এই শিক্ষকদের কোনো গ্রুপের সামান‍্য মনঃপূতও না হয় তাহলে আমার চোদ্দোপুরুষ তুলে গালাগাল করতে ছাড়েন না । তুই-তোকারি থেকে শুরু করে ভাষাব‍্যবহারে তাঁরা যে শিক্ষক সেই চিহ্নটুকুও মুছে ফেলেন । আমি নীরবে হজম করি । প্রথমত ভাবি, তাদের বিষয়ে নাক গলানোর তো আমার অধিকার নেই । দ্বিতীয়ত, তাদের মতো অবস্থায় থাকলে আমারও হয়তো হিতাহিত জ্ঞান থাকত না । তাঁদের অস্তিত্বের সংকটই তাঁদের ক্ষুব্ধ করে তোলে । কমেন্টগুলোর স্ক্রিনশট রেখে মাঝে মাঝে দেখি আর চোখের জলে ভাসি । তবুও কেন জানি বেহায়ার মতো লিখে ফেলি ।

 এই শিক্ষকরা বড়ো বেশি আবেগপ্রবণ ।  তাই তাঁদেরকে সবাই খেলার পুতুল ভাবে । রাজনীতির দাবার বোড়ে করে । সর্প হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়ফুঁক করে । ওদের উপদলে ভাগ করে আন্দোলনকে দুর্বল করে । ওরাও একদল অবস্থান করলে আর একদল যায় না । একদল লাঠিপেটা জলকামানে বিধ্বস্ত হলে আর একদল টুঁ শব্দটি করে না । ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করতে গেলে একদল আর একদলকে লুকিয়ে যায় । একদল ক-এর ছত্রচ্ছায়ায় থাকে তো আর একদল ব-এর তোষামোদে কার্যোদ্ধারের স্বপ্ন দেখে । তারপরেও একসময় মোহভঙ্গ হয় কারো কারো । যাদুকরের মায়াজাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চায় কেউ কেউ ।

এই দুখি শিক্ষকদের একাংশ সবশেষে তাদের আন্দোলনের অভিমুখ ঘুরিয়ে দিয়েছেন সম্প্রতি । তাঁরা তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেবার দাবিতে আমরণ অনশনের পথ বেছে নিয়েছেন । এযাবত নেওয়া তাঁদের সমস্ত প্রয়াস ব‍্যর্থ হয়েছে ভেবেই তাঁরা এই দুঃখজনক পথ বেছে নিয়েছেন । না খেয়ে খেয়ে একদল মানুষ প্রকাশ‍্যে অসুস্থ হয়ে পড়বেন, মৃত‍্যুর কোলে ঢলে পড়বেন একি কাম‍্য ! একজন সাধারণ নাগরিক কি এদৃশ‍্য সহ‍্য করতে পারবেন ?।আজ তাদের আন্দোলন ত্রয়োদশ দিনে পড়ল । প্রতিদিন অনশনকারীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন । যে কোনো সময় দুঃখজনক ঘটনা ঘটে যেতে পারে । এদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন‍্যে, প্রবোধ দেওয়ার জন‍্যে কেউ কাছে ভিড়ছেন না । সমাধানের ক্ষেত্রেও অহেতুক বহু কালহরণ হয়ে গেছে । পাষন্ড শিক্ষাবিভাগীয় অফিসারদের কথা শুরুতেই বলেছি ।ওদের কাছ থেকে মানবিকতা আশা করা সোনার পাথরবাটি । যদি বোধোদয় হয় তো তা সুস্বাগত । রাজনৈতিক দলগুলো এখন জল মাপবে । কারণ সামনে নির্বাচন । এই সংকটময় সময়ে সাধারণ মানুষ তাদের পাশে এগিয়ে আসা ছাড়া আর কোনো পথ নেই । এই অসহায় শিক্ষকদের সামনে সত‍্যিই আর দ্বিতীয় পথ নেই । নেই আর ।