Showing posts with label ভাষাতত্ত্ব. Show all posts
Showing posts with label ভাষাতত্ত্ব. Show all posts

Tuesday, January 23, 2024

শ্রীরাম ও রামলালা

শ্রীরাম ও রামলালা

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

রাম, রামবিগ্রহ, রামমন্দির নিয়ে গতকাল সারাদেশ এক বিপুল উন্মাদনায় মেতে উঠেছিল । আমরা এতকাল শ্রীরামের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম 'রামচন্দ্র', 'রাঘব', 'রঘুপতি', 'সীতাপতি' ইত্যাদি বহু নামে । কিন্তু এবারে পেলাম নতুন শব্দ 'রামলালা' । আমরা বাঙালিরা এই শব্দটির সঙ্গে খুব একটা পরিচিত নই । কিন্তু কাল এই শব্দটাই মুখে মুখে ঘুরেছে । কিন্তু খুব কম জনই জানতে চেয়েছি এই 'লালা' শব্দের উৎস ও অর্থ । কাল সারাদিন অনেকেই অযোধ্যার পথে হেঁটে রামলালার জন্যে যতটা লালায়িত হয়েছেন, রাম কেন লালা তার খোঁজ মোটেও করেননি। এই অবসরে আমি একটু ভাষাতত্ত্বের আশ্রয়ে গিয়ে খোঁজার চেষ্টা করেছি তার উৎস ও অর্থ । জনিনা কতটা সার্থক বা কতটা সফল আমি ।

মহাকবি তুলসীদাস ( ১৪৯৭ ) ১৫৭৫ সালের চৈত্র মাসের শুক্লা নবমী বা রামনবমী তিথিতে 'রামচরিত মানস' লেখা শুরু করে ১৫৭৭ সালের অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লা পঞ্চমীতে তাঁর রচনা শেষ করেন । গ্রন্থটি তিনি অবধি বা আওয়াবী ভাষায় লিখেছিলেন । অবধি বা আওয়াধি উত্তরপ্রদেশের অবধ অঞ্চলের এবং নেপালের তরাই অঞ্চলের একটি ইন্দো আর্য ভাষা । একে অনেকে হিন্দি উপভাষাও বলেন । অনেকে বলেন পূর্বে হিন্দি । রামের জন্মভূমি অযোধ্যা অবধ ভাষার কেন্দ্রভূমি । হিন্দির আরেকটি উপভাষা হল ব্রজভাষা । এটি পশ্চিম হিন্দি উপভাষা । এই উপভাষাটি শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান প্রাচীন ব্রজভূমির ভাষা । মথুরা এই ব্রজভাষা অঞ্চলের কেন্দ্রভূমি । এই দুই উপভাষাই এসেছে সৌরশেনী প্রাকৃত থেকে ।

সেকালে অবধ ভাষায় রচিত আরো সাহিত্যের নিদর্শন রয়েছে । মালিক মোহাম্মদ জাইসির 'পদুমাবৎ' বা পদ্মাবতী ( ১৫৪০ ) কাব্যও এই অবধি ভাষায় রচিত । তুলসীদাস রামায়ণ সংস্কৃত ভাষায় রচনা না করে অবধি ভাষায় রচনা করেছিলেন, যাতে সাধারণ মানুষ তা পড়তে ও বুঝতে পারে ।

এই অবধ ও ব্রজভাষায় পুত্রসন্তানকে 'লালা' বলা হয় মূলত শব্দটি এসেছে 'লল্লা' থেকে । যার অর্থ আদুরে শিশু ।
যেমন ব্রজ ভাষায় দেখি শ্রীকৃষ্ণ নন্দের শিশুপুত্র অর্থে 'নন্দলালা' । তেমনি অবধ ভাষায় ভক্তরা শ্রীরামকে তাদের শিশুপুত্র হিসাবে মনে করে নাম দিয়েছেন লালা ( স্নেহের শিশু ) । তাছাড়া অযোধ্যার গর্ভগৃহে যে রামে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তা বালক রাম । পঞ্চমবর্ষীয় নাবালক রাম । তাই তিনি রামলালা । এটুকুই আমার সন্ধান । ভুল হলে শুধরে দেবেন প্রাজ্ঞজন ।

Tuesday, January 10, 2023

শ্রীমান ও শ্রীমতী

শ্রীমান ও শ্রীমতী

Chayan Saha বাংলা নামের আগে সৌন্দর্যসূচক 'শ্রী' ব্যবহার করা হয় । শ্রী যোগ করা হয় তাই শ্রীযুক্ত । আর এই শ্রী ব্যবহারের মধ্যেও একটা স্তরবিন্যাস রয়েছে । বয়স্কদের ক্ষেত্রে 'শ্রীযুক্ত' ( পুং ), 'শ্রীযুক্তা' ( স্ত্রী ) ব্যবহার করা হয় । সন্তানসম/সমাদের ক্ষেত্রে 'শ্রীমান' ( পুং ), শ্রীমতী ( স্ত্রী ) ব্যবহার করা হয় । পরবর্তীকালে এই 'শ্রীমতী' ব্যবহারের মধ্যে পরিবর্তন আসে । একমাত্র বিবাহিত কন্যা বা মহিলার ক্ষেত্রে 'শ্রীমতী' শব্দটি ব্যবহার হতে থাকে । মূলত অর্থসংকোচের ফলে এই ব্যাপারটি ঘটে । আর অবিবাহিত কন্যা বা মহিলার নামের আগে 'কুমারী' ব্যবহারের রেওয়াজ চলে আসে । কিন্তু অবিবাহিত ছেলে বা পুরুষের বেলায় 'কুমার' বসে না । বলে রাখা ভালো, সব মা-বাবার কাছে সন্তান বুড়ো হয়ে গেলেও সে শিশু । তাই বয়স্করা তাঁদের সন্তানসম বয়স্ক পুরুষকে 'শ্রীমান' অমুক বলেই পরিচয় দেন । শৌভিক স্যর তোমাকে 'শ্রীমান চয়ন' বলেই পরিচয় দেবেন  আরো বহুবছর পরেও । মোদ্দা কথা হল কিশোর বয়সীর ক্ষেত্রে 'শ্রীমান' ও কিশোরীর ক্ষেত্রে 'শ্রীমতী' হবে । তাই তো  আমাদের সাহিত্যের চিরন্তনী নায়িকা ষোড়শী রাইকিশোরী 'শ্রীমতী' রাধিকা । সম্ভবত ভুলটার শুরু এখানেই । ষোড়শী কিশোরী শ্রীমতী রাধারানি বিবাহিতা হওয়ায় কেউ হয়তো ভেবে ফেলেছিলেন শুধুমাত্র বিবাহিতা হলেই নামের আগে 'শ্রীমতী' বসবে । ব্যাকরণগত ভুলটা খেয়াল করেননি । সেটাই প্রচলিত হয়ে গেল ।

Tuesday, February 8, 2022

বাংলাভাষায় দ্রাবিড় শব্দের প্রভাব

বাংলাভাষায় দ্রাবিড় শব্দের প্রভাব


 কর্জ্যেণিটক র সরকারী ভাষা কন্নড় ৷ বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারে প্রচুর কন্নড় শব্দ রয়েছে ৷ সে বিষয়ে যাবার আগে একটু পেছন ফিরে তাকাতে হবে ৷ ভারতবর্ষ বহু জাতিগোষ্ঠীর বাস ৷ তাদের ভাষা- সংষ্কৃতিতেও বিভিন্নতা রয়েছে ৷ ভারতের জাতিগোষ্ঠীর প্রধান দুটি ভাগ ৷ ইন্দো-আর্য ও দ্রাবিড় ৷আর্য জাতি উত্তর ভারতে দ্রাবিড়রা দক্ষিণ ভারতে বসবাস করেন ৷ এই দ্রাবিড়রা ভারতের প্রাচীনতম অধিবাসী ৷ খ্রি. পূ.2500 শতকে এই জাতি সিন্ধু নদের উপত্যকায় এক উন্নত সভ্যতা গড়ে তুলেছিলেন ৷ আর্যরা ভারতবর্ষে পা রাখার আগে সমগ্র ভারত উপমহাদেশে দ্রাবিড়দের বসতি ছিল ৷ পরবর্তীকালে আর্যদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে দ্রাবিড়গণ ক্রমশ দক্ষিণে সরে যান ৷ দ্রাবিড় জাতির ভাষার নামও দ্রাবিড় ৷ দক্ষিণ ভারতে দ্রাবিড় গোত্রের প্রধান চারটি ভাষা হলো - কন্নড়, মালয়ালি, তামিল ও তেলেগু ৷
বাংলায় একসময় এই দ্রাবিড় জাতিরও বাস ছিলো ৷ বাংলার প্রাচীন অধিবাসীরা হলো অস্ট্রিকভাষী আদি-অস্ট্রোলিয়রা ৷ এরা এবং তাদের সমসাময়িক মঙ্গোলয়েড গোত্রের কিরাতরাও ছিল সে সময় ৷ আর্যরা তাদের সাহিত্যে এই দুই জাতিকে হীনার্থে নিষাদ নামে পরিচিত করে ৷ অস্ট্রিক ও কিরাতদের পরে বাংল দেশে আসেন দ্রাবিড়রা ৷ প্রাচীন বাংলায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মিশ্রণে যে সংকর জাতির সৃষ্টি হয়েছিলো তারাই বাঙালি ৷ বালার ভাষা-সংষ্কৃতি-ধর্মে দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর গভীর প্রভাব রয়েছে ৷
বাংলাভাষায় অস্ট্রিক শব্দের পাশাপাশি অনেক দ্রাবিড় শব্দও বাংলা শব্দভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে ৷একসময়ে সারা উপমহাদেশে দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর প্রাধান্যের ফলেই বাংলা ভাষায় দ্রাবিড় শব্দের প্রবেশ ঘটে ৷দ্রাবিড় ভাষার কাল (সময়) ,কলা, পুষ্প, মুকুল, পূজা, গণ, কোণ, নীল, ফল, উলু, অটবী, আড়ম্বর, তন্ডুল, কুন্ড, খড়্গ, দন্ড, বিল, ময়ূর, কাক কাজল, কোদাল, বালা, পল্লী, বেল, তাল, চুম্বন, কুটির, খাট, ঘুণ, কুটুম্ব, ডালিম্ব, নীল, মীন ইত্যাদি ৷ বাংলার বগুড়া, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি ইত্যাদি ড়া, গুড়ি-যুক্ত স্থাননামে দ্রাবিড় প্রভাব রয়েছে ৷ এছাড়া উর, পুর, খিল তালক, পাঠক এগুলোও দ্রাবিড় শব্দ প্রভাবিত ৷ বাংলা ব্যাকরণের অনেক নিয়ম দ্রাবিড় ভাষাতত্ত্বের ভিতের উপর গড়ে উঠেছে ৷
ধর্মীয় ক্ষেত্রেও বাংলার উপরে দ্রাবিড় প্রভাব অত্যন্ত গভীরভাবে রয়েছে ৷ বাংলার দেবাদিদেব মহাদেব তো দ্রাবিড় পশুপতিনাথ শিব ৷ আর শৈবসাধনা হলো যোগসাধনা ৷ দ্রাবিড়দের এই সাধনপদ্ধতি বাংলার আধ্যাত্মিক জীবনের গভীরে প্রোথিত ৷ এভাবেই দ্রাবিড় অনার্য দেবদেবীদের মধ্যে চান্ডী(চন্ডী), মঞ্চাম্মা (মনসা) প্রভৃতি এবং উমা, বিষ্ণু, জগন্নাথ,বাসুদেব, শক্তি, শীতলা, বৃক্ষপূজা, যগলমূর্তি পূজার প্রচলন এসেছে ৷
দ্রাবিড়রা নগরজীবনের পাশাপাশি কৃষিজীবনেও পারদর্শী ছিলেন ৷ সংষ্কৃত ব্রীহি ও তন্ডুল অর্থে ধান্য বোঝায় ৷ এদুটিই দ্রাবিড় ভাষা ৷ এতেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে দ্রাবিড়রা প্রাচীন ধান চাষও করতেন ৷ এককথায় দ্রাবিড়রা বহুভাবেই প্রাচীন বাংলার জনজীবনকে সমৃদ্ধ করেছিলেন ৷