Sunday, July 31, 2022

মায়াতাঁতের অসমাপ্ত বয়নশিল্পী

মায়াতাঁতের অসমাপ্ত বয়নশিল্পী

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

'আমার মৃত্যুর পর যেন কোন শোকসভা না হয় প্রদীপ,
 অবনমিত মেধার শহর ছেড়ে অভিমানে কেউ কেউ 
রাতারাতি চলে গেছে কুয়াশাবৃত শীতের পাহাড়ি স্টেশনে। ( ইচ্ছাপত্র–প্রবুদ্ধসুন্দর কর )

 না, প্রবুদ্ধ কোন কৃষ্ণপথ রেখে যান নি শোক প্রস্তাবের জন্য । পার্থিবপ্রস্থানের আগে ছিল তাঁর ছিল আশাময় পুলওভার । হাসপাতালের  বিছানায় শুয়ে অনুভব করেন, 'আরোগ‍্যের পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার রাস্তাটুকু বেহেশ্ ত । নিজেকে যিনি তাঁরই দেহসচিব বলে আমৃত্যু ঘোষণা দিয়ে গেছেন তিনি তাঁর চিকিৎসাশয্যায় স্বনাম নিয়ে করছেন রসিকতা । লিখেছেন– 'আমি প্রবুদ্ধসুন্দর কর নই । আমি গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে ৬৫২ এ । প্রচন্ড নৈসর্গিক বিশ্বাস রেখেছেন তার শল‍্যচিকিৎসকের উপর যার ছুরি জাদুবিভায় মৃত্যু কেটে ফালা ফালা করে জীবন ছিনিয়ে আনবে । জন্মছকের বিশ্লেষণের প্রতিও তাঁর একসাগর আস্থা জীবনের উপরেই তো আলো ফেলে হে কবি ! পার্থিব পরিমণ্ডল আর এই আলো হাওয়ার বাউন্ডুলে পরিক্রমণের আর্তিই প্রতীক হয়ে আসে বারংবার । কিন্তু যে আত্মশবরক্ষক, সেই বুঝতে পারে এক রিক্ততার আলোকবর্ষের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত তাকে মহাজগতের চক্রবালের আলোপ্রান্তরের দিকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে । ক্রমশ সরে যাচ্ছে প্রিয়জনের যৌথস্বর,  কবিতার কোলাহল । সামনে শুধু নীল উপত্যকা । পায়ে পায়ে উড়ছে ডার্করুম মঘানক্ষত্র, ইন্দ্রজাল কমিকস, মায়াতাঁত, নৈশশিস, আত্মবিষ, যক্ষের প্রতিভূমিকা, অসুস্থ শহর থেকে,এসিড বাল্ব আর স্বনির্বাচিত কবিতার পাতা ।

কফি হাউসের সেই আড্ডা থেকে উঠে আসা 'রমেন্দ্রকুমার থেকে প্রবুদ্ধসুন্দর'ই জানান দিয়েছে শিরোনামে যাকে ধরেছ সেই শিরোপা ধারণ করবে আগত কবিতাকনভোকেশনে । 'বাংলাকবিতা' যার জন্মদানের জন্য উন্মুখ হয়েছিল বহুকাল । তীক্ষ্ণ শ্লেষ আর আত্মকশা, সুতীব্র নাগরিক বয়ান যার, তার সমূহ উচ্চারণ অমোঘ হয়ে ওঠে বাংলাকবিতায় । প্রবুদ্ধসুন্দরকে নিয়ে বারবার আত্মরতিতে মাতেন কবি প্রবুদ্ধসুন্দর । 

পিতৃসত্বা তাঁর জীবনজিন ।তিনি বলেন, ভাদুঘর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে ভৈরববাজার / শুনেছি বাবার দৌড় এটুকুই ছিল । / আমি ঢাকা অব্দি গেছি । / বাবাকে পেরিয়ে যাওয়ার উদাহরন / এ জীবনে আর কিছু নেই । ( উদাহরণ ) । ছিন্নমূল বাবার জীবনসংগ্রামকে দেখেছেন অন্তর দিয়ে । 'উনিশ শো একান্ন সালে যে গাছটি/ আখাউড়া স্টেশন পেরিয়ে প‍্যারীবাবুর বাগানের / সামনের রাস্তা ধ‍রে হেঁটে এসেছিল / সেই গাছটি আমার বাবা । / আজও মূলত্রাণ উল্টে ধরলে দেখা যায় / বাবা পায়ের পাতায় ম‍রা রক্ত জমে / কেমন কালচে হয়ে আছে । আর যে আশ্রয়ভূখন্ডে বাবার স্থিতিবাসনা তাকে নিয়েই গর্বে তিনি উচ্চারণ করেন 'দূরদর্শনের টাওয়ারটি আমাদের আইফেল / বটতলা শ্মশানটি আমাদের মহানিমতলা / পাশে বয়ে যাওয়া নদী সেই গ্রিক পুরাণের লিথি / ধলেশ্বরে্য মিশনই আমাদের বেলূড়ের মঠ / জম্পুই হিলসই আমাদের ছোটো ভূস্বর্গ কাশ্মীর / সর্বোচ্চ বেতলিংসিব আমাদের শৃঙ্গ এভারেস্ট' ( শ্লাঘা ) । এক মর্মসচেতন রসানুভূতি রেখেই কবি অনায়াসে বলে যান– 'যে পা গুলো একদিন প্রণামের যোগ্য মনে হয়েছিল/সেগুলো শয়তানের খুর হয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে  ( জ্যোতিষবচন ) । সৃজনের পরও যেন তৃপ্ত নন কবি । এজন্মের অসম্পূর্ণ প্রণয়ের সংক্ষোভে বলেন, 'পরজন্ম বলে যদি সত্যি কিছু হয় / সমুদ্রমন্থন শেষে রাহুর কবন্ধ আমি / অমরত্ব নয়, চাই, চাঁদের প্রণয় ( পরজন্ম ) । চন্দ্রলুব্ধ কাঙ্খায় ভরে আছে কবির পরজন্মের স্বপ্ন । স্বপ্ন নিয়েই অন্তরার পথে এগোতে এগোতে কবি জীবনের কাছে আহ্বান জানান–'শুধু এগিয়ে দেয়ার পথে নিচু স্বরে বোলো / দরজা ভেজানো থাকবে / টোকা দেওয়ার দরকার নেই / আলতো ঠেলে দিলেই কপাট খুলে যাবে ( দরজা ) ।
 জীবন ও অতিজীবনের মাঝখানে কবিতার তাঁবুতে যাপন আপনার । অবাধ বিচরণ না হলে এই গোষ্ঠের কী অনুপুঙ্খ বর্ণনাসফল  হয় হে 'নীল উপত‍্যকার রাখাল' ! আপনিই পেরেছেন মায়াবি পরিভ্রমণের ধারাভাষ‍্যে তুলে দিতে 'সন্ধ‍্যার সেই শান্ত উপহার' । আপনার পর্যবেক্ষণে ও বাচনবিভঙ্গে সমগ্র কাব‍্যজগৎ রক্তেপ্রবাহের বাঁকে বাঁকে জোছনার আলোছায়া গড়ে । সীমান্তবর্তী এই পার্বতীভূগোলের কবিতায় এক অত‍্যুজ্জ্বল বাঁক আপনি যা কালের মানচিত্রে চিহ্নিত হয়ে গেছে । অমরত্বের পথিক কবি আপনি তবু বলেন–
আমার মৃত্যুর পর যেন কোন শোক সভা না হয়, পল্লব 
আমি চাই না,পাপেট ও বামন, শিরদাঁড়াহীন সুশীলেরা সভায় বলুক এসে মূলস্রোতে নয়,আত্মহননের পথ
 বেছে নিয়েছিল প্রবুদ্ধসুন্দর ( ইচ্ছাপত্র ) ।

 তাইতো কবি, আপনার অনির্দেশ যাত্রার পথে আমরা থামাবো না আপনার অনন্তরথ । কোন শোকসভাও নয় । শুধু আপনার শব্দের বিছানার এক প্রান্তে রেখে যাব এক স্বয়ংক্রিয় নির্দেশশলাকা । যার সংকেতে 'সন্ধ‍্যা নেমে এলে সমূহ মনোবেদনা নিয়ে জ্বলে উঠে একটি নক্ষত্র / বিষাদস্পৃষ্ট তোমার মুখ / কোনও একদিন যদি স্পষ্ট হয়ে ওঠে /  বোঝা যাবে সেই নক্ষত্রের আলো /  পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে সামান্য আগে ( আলো ) ।

Monday, July 25, 2022

তোমার ঘরে...

তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা

বিসমিল্লার মানে তোরে বলবো কী । বীজে তে বিসমিল্লা আছে শুনেছি সাধুর মুখে সাধুর মুখে । বীজরূপে দেহে বিসমিল্লা বসত করেন । সে বড়ো আজব কুদরতি । আঠারো মোকামের মাঝে জ্বলছে এক রূপের বাতি । এই বাতিই আমার পরমেশ্বর । আত্মারাম । বাতিরূপ বিসমিল্লার নূর অর্থাৎ পরমেশ্বরের আলোতে আমি আলোকিত । জগৎও আলোকিত । এই না দেহে আছে রে মন গোলোক বৃন্দাবন । আর বৃন্দাবনে  বিহার করেন গোলোকবিহারী অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ । বড়ো কঠিন তত্বকথা । দেহতত্বের সার কথা এটি ।

Wednesday, June 15, 2022

সাত্তাই বা হাত্তাই ব্রত

'সাত্তাই' বা 'হাত্তাই' পূর্ববঙ্গের কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের বিশেষ ব্রত বা বর্ত । জৈষ্ঠ‍্যমাসের শেষদিন অর্থাৎ সংক্রান্তির দিন এই বর্ত পালন করা হয় । এই বর্তের মূল উপাদান ছাতু । এই ছাতু তৈরি হয় চালভাজা, খই, বিভিন্ন রকমের ডাল ইত‍্যাদির মিহি গুড়ো দিয়ে । সেকালে ঢেঁকিতে কুটে এসব গুড়ো করা হত । মূলত এদিনটি এই ছাতু খাওয়ারই অনুষ্ঠান ‌। সকালবেলা মায়েরা স্নান সেরে আলতাসিঁদুর পরে এই বর্ত করতে বসতেন । বর্তের সময় ছাইতরানি/ছাইত্তানি মতান্তরে ছাতুকুমারীর নামে একটি জলপূর্ণ ঘট আম্রপল্লবসহ বসানো হত । পুজোর জন‍্যে কোনো বৈদিকবিধি নেই । নৈবেদ‍্যের উপকরণ হিসেবেও থাকত ছাতু , কলা ও কাঁচা দুধ । ভোগ নিবেদনের পর ব্রতীদের একজন পূর্বোক্ত লৌকিক দেবীর ব্রতকথা বলতেন ‌। অন‍্য ব্রতীগণ গলবস্ত্র হয়ে ব্রতকথাটি শুনতেন । ব্রতকথা সমাপ্তির পর উলুধ্বনির মাধ‍্যমেই ব্রতসাঙ্গ হত । প্রণামের সময় ব্রতীগণ বাংলা ছড়ার ঢংএ দেবীর কাছে বলবুদ্ধি বৃদ্ধি, আয়ু বৃদ্ধি,ছিরি বৃদ্ধির কামনা করতেন । তারপর ছাতুসহ পুজোর অন‍্যান‍্য উপকরণ প্রসাদ হিসাবে সবার মধ‍্যে বিলি করা হত । তবে শিশুদের মধ‍্যে সর্বাগ্রে প্রসাদ বিতরণ করার নিয়ম ছিল ।
 এই বর্ত প্রাচীন কৌম জনগোষ্ঠীর উর্বরতাকৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত । ছাতুর মূল উপাদান হল বীজ । বীজের রয়েছে সৃজনক্ষমতা । এই বীজ সরাসরি গ্রহণের চিন্তার মধ‍্য দিয়ে আদিম মানুষ নিজেকে উর্বর করার বা উৎপাদন করার জাদুবিশ্বাসে প্রভাবিত হতেন । সংস্কৃত 'শক্তু' শব্দ থেকে এসেছে ছাতু । ছাতুর সঙ্গে নামসাদৃশ‍্যে শক্ত ও শত্রুর একটা সম্পর্ক রয়েছে । ছাতুভক্ষণের মধ‍্য দিয়ে শক্ত হওয়া ও নিজদেহে শক্তিধারণের কৌমচেতনায় সমৃদ্ধ হতেন আদিম মানুষ ।  সেসময়ে শত্রুকে প্রতিহত করার জন‍্য দৈহিক শক্তিশালী হওয়ার প্রয়োজন ছিল মানুষের । হাত্তাইর দিন আর একটি আচার পালন করত শিশুকিশোররা । এদিন তারা লাটিম বা লাডুমখেলা বা লাডুমঘুরানিতে মেতে উঠত । লাডুম দিয়ে পরস্পরকে ঘায়েল করার প্রতিযোগিতা হত । এই লোকক্রীড়াও শত্রুর সঙ্গে লড়াই করার একটা প্রতীকী অনুষ্ঠান। এদিন স্নান করে উপুড় হয়ে দুপায়ের ফাঁক দিয়ে পেছনের দিকে ছাতু উড়িয়ে দেওয়ার মাধ‍্যমে শত্রুকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার চেতনা কাজ করে । পায়ের তলা দিয়ে উড়ানো মানে শত্রুকে একেবারে তাচ্ছিল্য করার প্রতীক ।
 হাত্তাই বা সাত্তাই এককথায় কৌমজনগণের শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিক শক্তি অর্জনের অনুষ্ঠান । কারণ আদিমজীবনে গোষ্ঠীসংঘর্ষ ছিল নিত‍্যদিনের ঘটনা ।

Tuesday, June 14, 2022

ভাবনা

সময়ের সঙ্গে সবকিছুরই তো আপডেট হয় । কুশপুতুল দহনের পর কুশপুতুল পদাঘাত । ভাবনার উন্নয়ন ঐতিহাসিক ঘটনা । গিনেস বুকে তোলার মতো । এরপরে হয়তো আসবে কুশপুতুলে মলত‍্যাগ । কার ভাগ‍্যে আছে জানিনা । বোধহয় সেটাও অচিরেই দেখা যাবে । দহন, পদাঘাতকে মান‍্যতা দিলে এই সংযোজনকেও মানতেই হবে ।

Wednesday, June 1, 2022

জয়মৃদঙ্গ

জয়মৃদঙ্গ

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

পিরিতির ভাইলভাট্টা জানার কোন দরকার নেই
নেই কোনো ডুবস্নানের কৌশলকলার উদ্যম
শুধুই নরম ও লোভনীয় প্রত্যঙ্গগুলো খুবলে খাবার
রাক্ষুসে ক্ষুধাকে ঐতরেয় নষ্টামিতে ভরে চলেছি

সভ্যতার সমস্ত অলঙ্কারে গাঁথা গর্বিত প্রজন্ম
শুধু পশুচর্ম গায়ে তুলতে বাকি রেখেছো 

অহো  ! মানব তোমার জয়মৃদঙ্গ বাজে বাতাসে  !

Saturday, May 28, 2022

কালু কামার

কালু কামার

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

কালু কামার ৷ কে কালু কামার?  গায়ের রঙ কালো বলে কী কালু কামার?  নাকি কালো পাথরের সাথে ছেনিসঙ্গমে জাগিয়েছে প্রাণ তার জন্যে? যে দেবতারা জীবকে সৃষ্টি করে বলে অহংকৃত মিথমগজ জনারণ্যে দাপিয়ে বেড়ায়,  সেই দেবতার জন্মদাতা কালু কামার? 

এতোবড়ো ধৃষ্টতার জন্যেই ঊনকোটি দেবতারা স্বীকৃতি দেওয়ার সাহস পেলি না তোদের জনককে ৷ 

পরিচয়হীন কালু কামার ৷ মজাদার বাক্যবন্ধের জন্যে বিখ্যাত যে রমাকান্ত কামার ৷ তেমন কেউও হতে পারল না কালু কামার ৷ 

যুগে যুগে  পাহাড় কন্দরে জন্ম ও লালনে দেবতা গড়ে তোলে  তিলে তিলে ঘাম ও রক্তে ৷ 
নিভৃত লুঙ্গায় মশালের আলোয় আর মশার কামড়ের যন্ত্রণা ভুলে যে দেবকুলকে গড়ে তোলে কালু কামার, 

ত্রিভুবনবাসের আভিজাত্যে তারা কালু কামারকে চেনে না ৷ পিতা নেই তাদের ৷ তাদের গোষ্ঠীপতি স্বয়ম্ভুনাথ ৷ ঊনকোটিপতি ৷

কালু কামার আজো সাব অল্টার্ণ একলব্যপ্রতিম ৷

Tuesday, May 24, 2022

স্বপ্নদাদা

স্বপ্নদাদা

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

 এখন অনেক বড়ো হয়ে গেছি । দাদাদের বয়সী । দাদারা কেউ কেউ আছেন । অনেক দাদা নেই । তাঁরা শূন্যটিলায় ফিরে গেছেন । যাঁরা চলে গেছেন তাঁদের আমি দাদা ডাকি । আর যে দাদার রয়েছেন তাঁরা তো দাদাই । বয়সকালে এই দুই দাদারাই দাদাগিরি করতেন । আমি অনুজ সেই দাদাদের অনুকরণ করেছি । একসময় আমিও দাদা হয়ে উঠেছি । আমাকে এখন অনেকেই দাদা ডাকে । আসলে আমি আমি আমার দাদাদের নিয়ে সবসময় ভাবতাম । কিকরে যে তারা দাদা হল । আমি তাদের রাতে ঘুমুলে স্বপ্ন দেখতাম । কখনও কখনও দিনেও স্বপ্ন দেখতাম ।  তাঁরা আমার স্বপ্নদাদা ।

এই স্বপ্নদাদাদের একজন আমার ঘরেও ছিল । তবে আমি তাঁকে দেখিনি । বড়ো হয়ে মা-বাবার মুখে শুনেছি । পাড়া পড়শি সেই দাদার গল্প করত । সেও একদিন আমার স্বপ্নদাদা হয়ে যায় । আমার মা-বাবা নাকি গঙ্গার অভাবে তাকে ব্রহ্মপুত্রে বিসর্জন দিয়েছেন । কারণ সেকালে আমরা ব্রহ্মপুত্রের পারে থাকতাম । আমার ঘরের স্বপ্নদাদাকে তাঁরা কেন বিসর্জন দিয়েছেন তা কেউ জানে না । জানলেও আমাকে বলে না । না মা বাবা । না পড়শিরা । সে ঘটনার বহু পরে নাকি আমি আসি । তখন থেকে সবাই আমাকে দেখে । আমার ঘরোয়া স্বপ্নদাদাকে দেখে না । আর নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে । কখনও আমাকেও বলে । আমার ব্রহ্মপুত্র দাদাই নাকি আমার শরীর নিয়ে ফিরে এসেছিল মায়ের কাছে । তার সব দাদাগিরিও ভর করেছিল আমার শরীরে । চারদিকে আমার অগণিত অনুজ । গণদাদা আমি । আমার দাদাগিরি আমার এবং তাদের উপর । 

এখন মাও নেই । বাবাও নেই । সর্বশেষ যে কজন দাদা ছিলেন তাঁরাও নেই । দাদাগিরির শংসাপত্র হিসেবে বাবা আমাকে বাজারের শূন‍্য থলেটা দিয়ে গেছেন । আমাকে রোজ সেটা ভরে তুলতে হয় । থলেটা শূন্য হয় ।...আবার আমাকেই ভরে তুলতেই হয় ।...