Monday, February 16, 2026

ইতিহাসের ঘাট : আমলিঘাট ও মনুঘাট

ইতিহাসের ঘাট : আমলিঘাট ও মনুঘাট

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

গতবছর দ্বিতীয় আমলীঘাট ফেনী ভিউ কবিতা উৎসব ২০২৫ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা 'মেরুকুম'-এ আমি আমলিঘাট সম্বন্ধে একটা চিত্র তুলে ধরেছিলাম । এবারে এই প্রসঙ্গেই একটি অন্য বিষয়ের অবতারণা করছি ।

ফেনী নদীপ্রবাহের ভারত ভূখণ্ডের শেষ প্রান্তিক জনপদ আমলিঘাট সাবরুম মহকুমার প্রত্যন্ত গ্রাম । একসময় আমলিঘাট বর্ধিষ্ণু জনপদ ছিল । ত্রিপুরার প্রায় প্রতিটি নদীপ্রবাহের সীমান্ত অঞ্চলে রাজআমলে গড়ে উঠেছিল বনকর ঘাট । ফেনীনদীর ঘাটের ইজারার সুবাদে আমলিঘাটে গড়ে উঠেছিল ফেনীঘাট নামে বনকর ঘাট । আর তাকে কেন্দ্র করে তহশীল অফিস ও বনদপ্তরের অফিস । ১৮৮৮ সালের আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ ও ত্রিপুরার যৌথ সরকারের তরফে একজন অফিসার এই ঘাটের তদারকি করতেন । বনজ সম্পদ আহরণের উপর ত্রিপুরার রাজা ও ব্রিটিশ সরকার ১০ আনা : ৬ আনা হারে কর আদায় করতেন । ১৮৭১ সালে ফেনীঘাটের ইজারা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব ২০০০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১২০০০ টাকা হয়েছিল ।

 রিয়াং ও চাকমা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা প্রাচীনকালে 'কোন্দা' এবং 'লং' নামে বিশেষ ধরনের নৌকা দিয়ে ফেনী, মনু ও গোমতী দিয়ে সমতল ত্রিপুরায় পণ্য পাঠাতেন । এই নৌকাগুলোর বৈশিষ্ট্য হল এগুলো এক কাঠের তৈরি । অর্থাৎ বিশাল বেড়সম্পন্ন বড়ো গাছকে কেটে সাইজ মত করে তার অভ্যন্তরে ছেনি বাটালি দিয়ে খোদাই করে নৌকার খোল তৈরি করা হত । ফলে এই জাতীয় নৌকায় কোন জোড়া ছিল না । মোটা গাছ কুঁদে এই নৌকা তৈরি করা হত বলে এইজাতীয় নৌকার নাম 'কোন্দা'  । অত্যন্ত টেকসই কাঠ দিয়ে এই নৌকা তৈরি হত ।

 অতীতকালে ত্রিপুরার এই অঞ্চলের অরণ্যে বিশাল আকৃতির শাল, সেগুন গর্জন, করই, গামাই, চামল ইত্যাদি মূল্যবান গাছ পাওয়া যেত । এই গাছের কাঠ দিয়ে নৌকা ও অন্যান্য মূল্যবান গৃহসামগ্রী বানানো হত । অনেক বাড়িও নির্মাণ হত বনের এই মূল্যবান গাছ দিয়ে । রাজন্য আমলে আমলিঘাটে বনবিভাগের যে ডাকবাংলাটি ছিল তাও সম্পূর্ণ দামি কাঠের খুঁটি ও কাঠামোর উপর তৈরি করা হয়েছিল । বাংলোটির গড়ন অনেকটা জনজাতিদের টংঘরের মতো ছিল । মোটা মোটা মূল্যবান গাছ দিয়ে ঘরের খুঁটি তৈরি করা হয়েছিল । কাঠের মাচার উপর ঘরটি প্রায় দোতলা সমান উঁচু ছিল । গত শতাব্দীর সাতের দশক পর্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় এই ডাকবাংলাটি দৃশ্যমান ছিল । 

ফেনীনদীর পাড়ে আমলিঘাট বাজারের পাশেই এই ফরেস্ট বাংলোটি ছিল রাজপুরুষদের আশ্রয়স্থল । রাজন্য আমলাদের ঘাট বলেই হয়তো এই ঘাটের নাম হয়েছে 'আমলিঘাট' । রাজধানী আগরতলা থেকে আখাউড়া রেলস্টেশনে পৌঁছে, ট্রেনে চড়ে মুহুরীগঞ্জে এসে নামতেন তাঁরা । সেখান থেকে আমলিঘাট । এই একই পথে সেকালে আগরতলা থেকে সরকারি ডাকব্যবস্থাও পরিচালিত হত । আমলিঘাট পর্যন্ত আসার পর ডাক হরকরার মাধ্যমে তা মনুঘাট হয়ে সাব্রুম শহরে পৌঁছাত । সেখানে থেকে সাবরুম, বিষ্ণুপুর, শিলাছড়ি পর্যন্ত বেশ কয়েকজন ডাক হরকরা ছিলেন একজন ডাক হরকরার নাম ছিল প্রকাশ বিশ্বাস । তিনি রাজন্য আমল থেকে ডাক হরকরার দায়িত্বে ছিলেন । গত শতাব্দীর আটের দশক থেকে তাঁর ছেলে নিতাই বিশ্বাস এই দায়িত্ব পালন করে ।  রাজন্য আমলে একবার ডাকাতদল আমলিঘাট-মনুঘাট পথে ডাক হরকরাকে কেটে ফেলে ডাকের ব্যাগ চুরি করে নিয়ে যায় । এই ডাকাতদলের সর্দার ছিলেন ছোটখিলে বসবাসকারী প্রাচীন বাঙালি এক নামকরা পরিবারের সন্তান । ডাকাতির পর ডাকাতদলের নামে রাজার হুলিয়া বেরুলে দলের সর্দার বর্মায় পালিয়ে যান । ভারতভুক্তির পর তিনি ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন । তাঁর এক সন্তান এখনও বর্তমান আছেন । পরিবারে মর্যাদার দিকে লক্ষ্য রেখে সেই ডাকাতসর্দারের নামোল্লেখ থেকে বিরত থাকলাম ।

আমলিঘাটে রাজন্য আমলের শেষ দিকে ফরেস্ট গার্ড ছিলেন সতীশ শীল । তাঁকে সতীশগার্ড নামেই সবাই চিনত । তিনি এলাকার প্রতাপশালী ব্যক্তি ছিলেন । তাঁর ছেলে হীরালাল শীলশর্মা আগরতলাস্থিত বি এড কলেজের অধ্যাপক ছিলেন । আমলিঘাটের পুরনো পোস্টমাস্টার ছিলেন শশাঙ্ক চৌধুরী । তাঁর পূর্বপুরুষরা একসময় এই এলাকার জমিদার ছিলেন । এই গ্রামেরই আর একজন মেধাবী সন্তান হারাধন মল্ল আগরতলাসহ ত্রিপূরার বিভিন্ন মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন । অল্প কিছুদিন আগে তিনি প্রয়াত হয়েছেন ।

সেকালে আমলিঘাট বাঁশ ও ছনের কারবারের জন্য বিখ্যাত ছিল । স্বাধীনতার পর ওপার থেকে উঠে আসা অনেক ছিন্নমূল মানুষের সেদিনের বেঁচে থাকার একমাত্র মাধ্যম ছিল বাঁশব্যবসা । এই বাঁশব্যবসায় ফেনীনদী সন্নিহিত দুপারের মানুষই জড়িত ছিল ।

১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে সংযুক্তির পর থেকে ত্রিপুরারাজ্যের সর্ব দক্ষিণের শহর সাব্রুম এখন মহকুমা শহর ও এই অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র । কিন্তু অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, সাব্রুম মহকুমার যে জনপদটি আজকের নাগরিক রূপ নিতে পারত সেটি আজও রহস্যের অবগুন্ঠনে নিজেকে ঢেকে রেখে নীরবে সাব্রুম শহর সৃষ্টিতে লালন করে চলেছে । তার নাম ছোটখিল । শহর থেকে পশ্চিম দিকে ৬–৭ কিলোমিটার দূরে বর্ধিষ্ণু গ্রাম এটি । একসময় এই জনপদ ছিল কর্মচঞ্চল, ব্যস্ততায় ঘেরা । রাজন্যআমলে ছোটখিল ছিল 'গেট ওয়ে টু চিটাগাং হিল ট্র্যাক্ট' ।

সে আমলে রাজপুরুষরা আখাউড়া থেকে ট্রেনে চড়ে তদানিন্তন চাকলা রোশনাবাদের নোয়াখালির মুহুরিগঞ্জ স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে, হাতির পিঠে চড়ে, কিংবা নৌকাযোগে ছয় মাইল পূর্বে আমলিঘাটে পৌঁছে নিজেদের রাজত্বে পা রাখতেন । তারপর সেখান থেকে ফেনীনদীর উজান ধরে অনেকটা এগিয়ে রমেন্দ্রনগরের শেষপ্রান্তে ফেনী-মনুর সঙ্গমস্থল থেকে অভ্যন্তর দিকে আসতেন । সঙ্গমস্থল থেকে মনুনদীর উজান বেয়ে কিছুটা এগোলে একটা জায়গার নাম মনুঘাট । মনুনদীর তীরবর্তী ঘাট । তাই মনুঘাট । এখানে রাজন্যআমল থেকে বনদপ্তরের একটি বিট অফিস ছিল । এই মনুনদী বেয়ে উজান থেকে আসত বাঁশ, ছন, কাঠ, বেত ইত্যাদি বনজ সম্পদ ও ধান, তিল, তিসি, পাট, সরিষা, কার্পাস ইত্যাদি নানারকম কৃষি সামগ্রী । বনজসম্পদগুলি ভাটি অঞ্চলে পরিবহন করে নেওয়ার জন্য এখান থেকে বনদপ্তরের অনুমতিপত্র বা 'উজান টুকা' নেওয়া হত । ফলে এই পণ্য রপ্তানি ও পরিবহনকে কেন্দ্র করে এখানে একটা ছোটো বাজারের মতো গড়ে ওঠে । এই বাজারের নাম মনুঘাট বাজার । 

এই বাজারে ক্রেতাবিক্রেতা আসাযাওয়ার জন্য নদীতে নৌকার ব্যবস্থা থাকত । রাজআমলে রাজার নিয়োজিত কর্মচারী মাঝির দায়িত্বে থাকতেন । জনসাধারণ, সরকারি কর্মী ও রাজপুরুষদের পারাপারের জন্য । ভারতভুক্তির পর এই নৌকাঘাটটি নিলাম ডাকের মাধ্যমে কেউ নৌ পরিবহনের দায়িত্ব নিতেন । রাজন্য আমলের শেষ দিকে ফেনীনদী ও মনুনদীর এই অঞ্চলের জন্য দুজন দক্ষ মাঝি ছিলেন । তাঁদের নাম নগেন্দ্র মাঝি ও বেনু মাঝি । রাজার নৌকা চালনা করার দায়িত্ব প্রাপ্তির কারণে তাঁরা নিজেদের গর্বিত অনুভব করতেন । রাজার শাসন শেষ হওয়ার পরও অনেকদিন তারা নিলাম ডাকের মাধ্যমে এই ঘাটের ইজারা নিয়ে রোজগারের পথ বেছে নেন । পরবর্তীকালে মনুনদীর উপর সেতু হয়ে গেলে ইজারা প্রথা উঠে যায় । 

এই মনুঘাটের উপর দিয়ে একসময় সারাবছর নানা বনজ সম্পদ পরিবহন করা হত । উজান থেকে মনুনদীপথে বনজ পণ্য এনে ফেনীনদীতে নিয়ে তারপর ভাটির দিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হত । বাঁশ সরবরাহকারী শ্রমিকদের মনুঘাট বাজারবার শনি ও মঙ্গলবারে মহাজনরা বেতন প্রদান করতেন । সে কারণেই এই দুদিন মনুঘাট বাজার খুব জমজমাট থাকত । এখন আর সেই বাঁশ ও বনজ সম্পদের কারবার নেই । সেই কর্মীরাও নেই । এখন মনুঘাট বাজার আগের চেয়ে অনেক জমজমাট হয়েছে । পরিবহনব্যবস্থা ভালো হয়েছে । বাজারসংলগ্ন স্থানে একটা গাড়ির স্ট্যান্ডও রয়েছে । আধুনিকতার ছোঁয়া সর্বত্র । নৌকাঘাট না থাকলেও মনুঘাট নামটি আজ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে ।

No comments:

Post a Comment