Sunday, February 15, 2026

ভিটেমাটি

ভিটেমাটি

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

সীমানার গাছগুলো কাটা হয়ে গেছে । সারা তল্লাটে আর গাছ নেই । এখানেই রাজ্যের পাখিরা বাসা বেঁধেছিল । আজ থেকে আর ওদের বসতঘর নেই । দল বেঁধে উড়ে উড়ে পাড়াময় অসহায় চক্কর দিচ্ছে । আর নানা শব্দে কলকাকলি করছে । বাড়িটা একসময় বিশাল ছিল । অনেকটা জায়গা জুড়ে উঠোন, বাড়িঘর, পুকুর, বাগান, নানা রকমের গাছগাছালি । ধীরে ধীরে পুকুর ভরাট হয়েছে । বাগানের গাছগাছালি কেটে ফেলা হয়েছে । যে বাড়ির নাম ছিল বাগানবাড়ি একটা সময় তার বাগানটাই হারিয়ে গেছে । দেখতে দেখতে ছোটো ছোটো প্লটে ভাগ হয়ে কিছুটা শরিকী ভাগ বাটোয়ারায় গেছে । আর কিছু জমি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে । পুকুরটা বুজিয়ে ফেলার পর অনেকটা জায়গা বেরিয়েছে । বহু পুরনো এই ভুবন ঠাকুরের বাড়ি । এখন ইতিহাস ।

ভুবনঠাকুর কোন ঠাকুর দেবতার নাম নয় । ভুবনমোহন চক্রবর্তী এই অঞ্চলের প্রাচীন বাসিন্দা । ছেচল্লিশের নোয়াখালির দাঙ্গার পর পরই তাঁরা চলে এসেছিলেন এখানে । দেশের বাড়ির বিশাল সম্পদ সব ফেলে রেখে । সেদেশে তাদের মহল্লাটাও ছিল রাজার তালুক । জমিদারি । ঘুরেফিরে সেই রাজার তালুকেই উঠে আসা । প্রায় আশি বছরে ভুবনঠাকুরের তিনপুরুষের বসত হল এখানে । অতীতের ক্ষতগুলো ধীরে ধীরে তাঁরা সারিয়ে তুলে থিতু হয়ে বসেছিলেন এখানে । এই গাঁয়ের অধিকাংশই ভুবনঠাকুরের জ্ঞাতিগোষ্ঠী বা দেশগাঁয়ের প্রতিবেশী । ফলে একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে সবার মধ্যে । পুরনো সব পরিবারের সঙ্গে ।

এখন ভুবনঠাকুরের গ্রামটা আর গ্রাম নেই । অনেক বড়ো হয়েছে । নগর পঞ্চায়েত  হয়েছে পুরনো বিষ্ণুপুর গ্রাম । এখন এ গাঁয়ের অনেক নাম । ভুবনঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিষ্ণু মন্দিরের কারণে । এই মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম । আর তাঁর পুরনো বসতবাড়িটি টুকরো টুকরো হয়ে পঁচিশ-ত্রিশ পরিবারের একটি পাড়া হয়েছে । দুএকটা দালানবাড়িতে দোতলা তিনতলায় ভাড়াটিয়াও রয়েছে । একসময় যে বাড়িতে সবমিলিয়ে ত্রিশজন মানুষ ছিল এখন সেখানে দুশো মানুষের বাস । বনেদি এলাকা । এই মানুষেরাই ইতিহাসকে মনে রেখে পাড়াটার নাম রেখেছে ভুবনপল্লি ।

পাড়ার মুখেই ভুবন ঠাকুরের নাতি বিশ্বরূপের বাড়ি । দু'গন্ডার মধ্যে চারতলা বাড়ি । বাড়ির চারপাশে সীমানা ঘেঁষে কিছু পুরনো গাছ রয়েছে । আর ছাদে বাগান । কিছুটা শান্ত সৌম্য পরিবেশ । এখানে মানুষ এখন এই বাড়িটাকেই ভুবনঠাকুরের বাড়ি হিসেবে চেনে । বিশ্বরূপবাবু অধ্যাপনা করতেন । রিটায়ার করেছেন ছবছর হল । বাড়িতে গিন্নিসহ একা থাকেন । দুজনেই অসুস্থ ও বয়সের ভারে দুর্বল । এক ছেলে এক মেয়ে । মেয়ে বড়ো । বিয়ে হয়ে গেছে । বরসহ অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে থাকে । ছেলে ছোটো । সেও রোবোটিক্স নিয়ে মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্পেশালাইজেশন করেছে । এ রাজ্যে তার চাকরি নেই । ব্যাঙালোরে মনিপাল হাসপাতালে জব করে । বাড়ি আসার একদম সুযোগ নেই । প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি । মালিক যতটা পারে নিংড়ে নেয় । বছরে একবার মা-বাবাকে নিয়ে যায় । ডাক্তার দেখানো, ঘোরাঘুরি, মন্দির দর্শন এসব করে দু-তিন মাস কাছে রেখে দেয় । এবার সে বাবাকে প্রস্তাব দেয় বাড়িটা বেচে দিতে । ব্যাঙালোরে সে একটা ফ্ল্যাট খুঁজছে ।  থ্রি বিএইচকে হলে বাবা মাকে এনে রাখতে পারবে । এই কবছর চাকরি করে যা জমিয়েছে তাতে বাড়ি কেনা দুঃসাধ্য । কিছু টাকা লোন নিলে আর বাড়িটা বিক্রি করে বাকি টাকা জোগাড় করলে শহর থেকে দূরে হলেও ভালো জায়গাতে একটা ফ্ল্যাট হয়ে যাবে । দিন দিন দাম তো বেড়েই চলেছে ফ্ল্যাটের । পরে আর হাত দেওয়া যাবে না । অন্যদিকে এই শহরের পরিধিও বাড়ছে ।

নতুন মালিক বাড়িটা বুঝে নিয়েছেন কদিন আগে । বিশ্বরূপবাবুরা চলে যাবেন ছেলের কাছে । এ কদিন নিচতলায় দুটো ঘর নিয়ে থাকছেন । নতুন মালিক সীমানার সব গাছ কেটে ফেলেছে । বলছে, প্রতিবেশীর সঙ্গে যাতে দুকথা না হয় তার জন্য এই ব্যবস্থা । বিশ্বরূপবাবুর অতি পরিচিত গাছগুলোর নিধনযজ্ঞে বুক ভেঙে গেলেও কিছু করার নেই । বাড়ি তো এখন আর তাঁর নয়। । কদিন ধরেই পরিচিতরা এসে দেখা করে যাচ্ছেন । কাউকে কাউকে ঘরের আসবাবপত্রের কিছু কিছু স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিলিয়ে দিয়েছেন । 

পাড়ার রাস্তার বা প্রতিবেশীর কারো একটা কুকুর আর একটা বিড়াল রোজই আসত বাড়িতে । এসে হাঁকডাক করত । বিশ্বরূপবাবু বা তাঁর গিন্নি কিছু খেতে দিলে তা খেয়েই উধাও হয়ে যেত । ও দুটোও আজ কদিন মনমরা । গেটের সামনে বসে বাড়িটার দিকে চেয়ে থাকে । কিছু শব্দ না করে । নতুন মালিক উপরতলাগুলোতে রং করাচ্ছে । গেটের সামনে গাড়ি এসে পড়েছে । দুপুর দুটোয় ফ্লাইট । এখান থেকে অনেকটা পথ । একটু সময় হাতে নিয়ে বের হতে চাইছেন তিনি ।

জিনিসপত্র তেমন নেই । দুটো বড়ো লাগেজ আর দুটো হাতব্যাগ । গাড়িতে উঠানো হল । যারা বিদায় জানাতে এসেছিলেন সবার সঙ্গে কথা বলে নিলেন শেষবারের মতো । কর্তা গিন্নি দুজনের চোখেই জল । কুকুর আর বিড়াল দুটো আজ তাঁদের পায়ের কাছে এসে অজানা ভাষায় চিৎকার করতে লাগল । বিশ্বরূপবাবু কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন । গিন্নি বেড়ালটাকে কোলে তুলে একটুক্ষণ আদর করলেন । বিশ্বরূপবাবুরা গাড়িতে উঠে বসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চিৎকার আরো বেড়ে গেল । গাড়ি ছেড়ে দিল । বিশ্বরূপ বাবু ও তাঁর গিন্নি সবার দিকে শেষবারের মতো হাত নাড়লেন । কুকুরটা আর বেড়ালটা চিৎকার করতে করতে গাড়ির পেছন পেছন ছুটতে লাগল । বিশ্বরূপবাবু, তাদের দিকেও হাত নাড়তে লাগলেন । একসময় ও দুটোও দৃষ্টির অগোচরে চলে গেল ।

No comments:

Post a Comment