Tuesday, May 2, 2023

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের প্রথমবার ত্রিপুরায় পদার্পণ : কিছু তথ্য

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের প্রথমবার ত্রিপুরায় পদার্পন  :  কিছু তথ্য


অশোকানন্দ রায়বর্ধন


রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের দীর্ঘকাল ব্যাপী সম্পর্কের ধারাবাহিকতা তৈরি হয় । মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য থেকে শুরু করে তার প্রপৌত্র মহারাজা বীরবিক্রম— ত্রিপুরার এই চার রাজার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল । রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজপরিবারের এই সম্পর্কের সূত্র ধরে ত্রিপুরার সাহিত্যে আধুনিকীকরণের গতির সৃষ্টি হয় । ত্রিপুরার সাহিত্য সৃষ্টি সেই রাজমালার যুগ থেকে চিহ্নিত করা হয় । একসময় পয়ার এবং ত্রিপদী ছন্দের ধরাবাঁধা কাব্যে আটকে ছিল সে সাহিত্য । মহারাজা বীরবিক্রম সেই ধারাকে আধুনিক রূপ দিতে চাইলেন । শুধু নতুন কিছু ছন্দ প্রয়োগে নয় । বিষয়বস্তু নিয়েও এগিয়ে গেলেন । ইতিহাস আর কিংবদন্তির পরিমন্ডল ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ ঘটালেন তাঁর কবিতায় । বীরচন্দ্র রচিত কাব্য 'ঝুলন',  'হোরি',  'অকাল কুসুম',  'উচ্ছ্বাস',  'সোহাগ',  'প্রেম মরীচিকা' ইত্যাদি । রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজপরিবারের সম্পর্কের যখন সূত্রপাত ঘটে তখন মহারাজা বীরচন্দ্র প্রায় প্রৌঢ়বয়স্ক । আর রবীন্দ্রনাথ যখন জীবনের দিনান্তে অবস্থিত তখন ত্রিপুরার সিংহাসনে ছিলেন যুবক রাজা বীরবিক্রম কিশোর  মাণিক্য ।


রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে বীরচন্দ্রের কন্যা অনঙ্গমোহিনী দেবী যে কবিতা সৃষ্টি করেছিলেন তা ছিল অনেক বেশি আধুনিক । অনঙ্গমোহিনী দেবীর কাব্য 'শোকগাথা',  'প্রীতি',  ও 'কণিকা' বিশ শতকের প্রথম দশকে প্রকাশিত হয় । কবিতাগুলিতে রবীন্দ্রপ্রভাব লক্ষ করা গেলেও তাঁর কাব্য বিগত শতকের গোড়ায় আধুনিকতা এনে দিয়েছিল । ত্রিপুরার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানুষজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে রবীন্দ্রনাথ সাতবার ত্রিপুরায় এসেছিলেন । ত্রিপুরার পটভূমিকায় তিনি লিখেছেন 'রাজর্ষি',  'বিসর্জন' এবং 'মুকুট' ।


তরুণ বয়সে রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ভগ্নহৃদয়' কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম অভিনন্দন পেয়েছিলেন ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের কাছ থেকে । 'ভগ্নহৃদয়' কাব্যটি ১২৮৭ বঙ্গাব্দে ধারাবাহিকভাবে ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । পরের বছর অর্থাৎ ১২৮৮ বঙ্গাব্দে বৈশাখ মাসে কাব্যগ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয় তা । প্রকাশিত হবার পরের বছর অর্থাৎ ১২৮৯ বঙ্গাব্দে মহারাজা বীরচন্দ্রের প্রধানা মহিষী ভানুমতী দেবীর জীবনাবসান ঘটে ।‌ শোকসন্তপ্ত হৃদয়ে রাজা তখন বিরহের কবিতা লিখে লিখে শোকভার লাঘব করার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক এই সময়েই মহারাজার হাতে আসে তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথের 'ভগ্নহৃদয়' । এই কাব্যগ্রন্থটি হাতে পেয়ে তিনি যেন বিরাট আশ্রয় পেলেন ।  তাঁর বিরহী অন্তরে নাড়া দেয় এই কাব্যগ্রন্থ । তিনি গভীর উৎসাহ নিয়ে পাঠ করলেন রবীন্দ্রনাথের 'ভগ্নহৃদয়' । তিনি মনে মনে ভাবলেন, এ বোধহয় কোন বয়স্ক কবির লেখা । তাঁর পারিষদবর্গ তাঁকে জানালেন যে, রবীন্দ্রনাথ একজন তরুণ কবি এবং আরো জানালেন যে, এই কবির পরিবারের সঙ্গে অর্থাৎ কবির পিতামহ প্রিন্স দ্বারকনাথ ঠাকুরের সঙ্গে মহারাজার পিতৃদেব কৃষ্ণকিশোর মাণিক্যের নিবিড় সম্পর্ক ছিল তাঁদের একটা পারিবারিক মামলাকে কেন্দ্র করে ।


 'ভগ্নহৃদয়' পাঠের পর পরই মহারাজ বীরচন্দ্র তাঁর নিজস্ব সচিব শ্রদ্ধেয় রাধারমন ঘোষ মহাশয়কে কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে পাঠালেন কবির প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার জন্য । তরুণকবি রবীন্দ্রনাথের অমর সৃষ্টি 'ভগ্নহৃদয়'-র সুর বীরচন্দ্রের বিরহী প্রাণে বিশেষ সাড়া জাগিয়েছিল ।  মুগ্ধ বীরচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে ভূষিত করেন 'কবি' উপাধিতে । রবীন্দ্রনাথের জীবনে এই প্রথম স্বীকৃতি লাভ । সেই প্রথম কোন খেতাবপ্রাপ্তি । জীবনে প্রথম সম্মান লাভের সঙ্গে সঙ্গে 'ত্রিপুরা' শব্দটি সেদিন থেকে রবীন্দ্রনাথের  অন্তরে গেঁথে যায় । তাঁর নোবেল প্রাপ্তির তিন দশক আগেই বিশ্ব যেদিন রবীন্দ্রনাথকে চিনতে পারেনি সেদিন শুধু ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করেছিলেন । চিনেছিলেন তার কাব্যপ্রতিভাকে । সেই সূত্র ধরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রায় ৬০ বছরের সম্পর্ক ছিল ত্রিপুরার ।


সৃজনশীল জীবনের একেবারে উষালগ্নে রবীন্দ্রনাথের 'ভগ্নহৃদয়'কে কেন্দ্র করে তাঁকে যে সম্মান এনে দিয়েছিল তা তিনি জীবনের অন্তিম পর্বেও অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন । ১৯৪১ সালের ২৫শে বৈশাখ ত্রিপুরার রাজদরবারে  সেদিন কবির জন্মদিনের উৎসব পালিত হয়েছিল । এই জন্মদিনের অনুষ্ঠানে মহারাজা বীরবিক্রম ঘোষণা দিলেন শান্তিনিকেতনে গিয়ে বিশ্বকবিকে 'ভারত ভাস্কর' সম্মান প্রদান করা হবে । পাঁচ দিন পর ৩০ বৈশাখ শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণে আয়োজিত হয় সেই বিশেষ অনুষ্ঠান । ত্রিপুরার শেষ মহারাজা বীরবিক্রম কবিকে জীবনের শেষ সম্মান 'ভারত ভাস্কর' প্রদান করলেন । একটি বিশেষ হুইলচেয়ারে বসিয়ে  কবিকে সভাস্থলে আনা হল । ত্রিপুরার মহারাজা বীরবিক্রম সেই অনুষ্ঠানে কবির হাতে তুলে দিলেন  ত্রিপুরার মানুষের পক্ষ থেকে  সম্মান আর অর্ঘ্য ।


'ভগ্নহৃদয়' কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে কবির সঙ্গে ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সূচনা হলেও তা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে তাঁর 'রাজর্ষি' উপন্যাসের ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহের তাগিদে প্রেরিত এক চিঠির মাধ্যমে । একটি 'স্বপ্নলব্ধ' গল্পের ঐতিহাসিক উপাদান চেয়ে মহারাজা বীরচন্দ্রের কাছে পত্র পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ । ১২৯২ বঙ্গাব্দে প্রথম 'বালক' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় রাজর্ষি । আষাঢ় থেকে মাঘ পর্যন্ত প্রকাশিত হয় এর ২৬ টি অধ্যায় । রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলে গেছেন 'এ আমার স্বপ্নলব্ধ গল্প' । রাজর্ষি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ জীবন স্মৃতিতে লিখেছেন—


'...  ... দুই এক  সংখ্যা বালক বাহির হইবার পর একবার দু-একদিনের জন্য দেওঘরে রাজনারায়ণ বাবুকে দেখিতে যাই । কলিকাতায় ফিরিবার সময় রাত্রের গাড়িতে ভিড় ছিল, ভালো করিয়া ঘুম হইতেছিল না— ঠিক চোখের উপরে আলো জ্বলিতেছিল । মনে করিলাম, ঘুম ঘুম যখন হইবেই না তখন এই সুযোগে বালকের জন্য একটা গল্প ভাবিয়া রাখি । গল্প ভাবিবার ব্যর্থ চেষ্টার টানে গল্প আসিল না, ঘুম আসিয়া পড়িল । স্বপ্ন দেখিলাম, কোন্ এক মন্দিরের সিঁড়ির উপর বলির রক্তচিহ্ন দেখিয়া একটি বালিকা অত্যন্ত করুণ ব্যাকুলতার সঙ্গে তাহার বাপকে জিজ্ঞাসা করিতেছে, 'বাবা, একি ! এ যে রক্ত ! বালিকার এই কাতরতায় তাহার বাপ অন্তরে ব্যথিত হইয়া অথচ বাহিরে রাগের ভান করিয়া কোন মতে তাহার প্রশ্নটাকে চাপা দিতে চেষ্টা করিতেছে—জাগিয়া উঠিয়াই মনে হইল এটি আমার স্বপ্নলব্ধ গল্প । এমন স্বপ্নে পাওয়া গল্প এবং অন্য লেখা আমার কাছে আরও আছে । এই স্বপ্নটির সঙ্গে ত্রিপুরার রাজা গোবিন্দ মাণিক্যের পুরাবৃত্ত মিশাইয়া রাজর্ষি গল্প মাসে মাসে লিখিতে লিখিতে 'বালকে' বাহির করিতে লাগিলাম ।'


এই গল্পের ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের কাছে গোবিন্দ মাণিক্যের রাজত্বকালীন ইতিহাস, উদয়পুরের ফটোগ্রাফ ইত্যাদি চেয়েছিলেন । রাজর্ষির আগে ত্রিপুরার ইতিহাসনির্ভর গল্প 'মুকুট' লিখেছিলেন তিনি । মুকুটে রয়েছে রাজা অমর মালিকের রাজত্বকাল, তার পুত্রদের মধ্যে ভ্রাতৃদ্বন্দ, আরাকানরাজের সঙ্গে যুদ্ধ ইত্যাদির কথা । তাতে ধারণা করা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ অনেক আগে থেকেই ত্রিপুরার রাজার সঙ্গে পত্র যোগাযোগের মাধ্যমে ত্রিপুরার বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহ করতেন ।


মহারাজা বীরচন্দ্রের আমলেই কলকাতায় যুবরাজ রাধাকিশোরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ হয়েছিল । তবে সে সময়ে তেমন ঘনিষ্ঠতা হয়নি । সিংহাসনে আরোহণের ( ১৯০০ খ্রি. ) পর প্রথমদিকে তিনি নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিলেন । তার মধ্যেও  রাধাকিশোরের সঙ্গে কবির ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় । রাধাকিশোর মাত্র বারো বছর রাজত্ব করেছিলেন । এই সময়ের মধ্যেই কবির সঙ্গে তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে । কবি ও রাজাকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিষয়ে নানা পরামর্শ দিতেন । 


রাধাকিশোর মাণি এবংক্যের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ সর্বপ্রথম আগরতলায় আসেন । সেসম্বন্ধে 'রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা', রবীন্দ্র শতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থে একটি লেখায় আমরা পাই,


 ''কবি সম্বর্ধনার আয়োজন হইল পুরাতন কুঞ্জবনের সু-উচ্চ টীলায় শ্রীপঞ্চমী উপলক্ষে বসন্তোৎসবে ( ১৩০৬ ) । ত্রিপুরার আদিবাসীদের টঙ্ ঘরের নমুনায় সম্বর্ধনা মঞ্চ তৈরি হইল । মুলি বাঁশের তৈরি মঞ্চের গড়ন ও ফুল পাতায় সজ্জা পরিপাটি শিল্প শোভার নিদর্শন । মঞ্চের উপর হইতে নজর পড়ে চারিদিকে উচ্চ নিচ পাহাড়গুলি থরে থরে ঢেউ খেলিয়া দূর দিগন্তে মিলাইয়া গিয়াছে— আকাশের নীল চন্দ্রাতপ দিগন্ত রেখাকে চুম্বন করিয়া ঋতু উৎসবকে আরো কমনীয় করিয়া তুলিয়াছে । এই প্রাকৃতিক পরিবেষ্টনকে আরো সম্বর্ধিত করিয়াছে দলে দলে নৃত্যগীতরত মণিপুরী শিল্পীবৃন্দ । নগ্ন গাত্র, পরিধানে বাসন্তী রং এর কাপড়, লম্বমান বাসন্তী চাদর গলায়— মাথায় বাসন্তী রঙের পাগড়ী, খোল, মন্দিরা করতালের সমতলে পদবিক্ষেপ ও দেহভঙ্গিমা— দীর্ঘলয়ে কীর্তনের সুর এক মোহময় আবেশ রচনা করিতেছিল । দর্শক যাহারা, তাহারাও স্ত্রীপুরুষ সেই বাসন্তী রং-এর পরিচ্ছদে ভূষিত । এই পরিবেশের মধ্যে কবি ও রাজা মঞ্চোপরি ফরাস বিছানায় আসীন । কালোপযোগী নৃত্যগীত ও পুষ্পসজ্জার উপহার— রাজা প্রজার সমব্যবহার— কবির কবির মনকে এক অভূতপূর্ব আনন্দ ও বিস্ময়ে অভিভূত করিয়া দিল ।" ( ত্রিপুরায় রবীন্দ্রস্মৃতি, সত্যরঞ্জন বসু /  রবীন্দ্রনাত ও ত্রিপুরা, তৃতীয় মুদ্রণ-মে ২০১১, পৃ. ১৫ )  


এছাড়া প্রাগুক্ত গ্রন্থে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের 'রবীন্দ্রজীবনী- ১ম খন্ড থেকে উদ্ধৃতি  দিয়ে প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক দ্বিজেন্দ্রচন্দ্র দত্ত মহোদয় লেখেন—


"বসন্ত সমাগমে ( ১৩০৬ ) সম্ভবত শ্রীপঞ্চমীর সময়, মহারাজের নিমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় সর্বপ্রথম আগমন করেন এবং রাজ অতিথিরূপে কর্নেল মহিম ঠাকুরের জন্য নির্মিত গৃহে অবস্থান করেন । উজ্জয়ন্ত প্রাসাদের নির্মাণকার্য তখনও চলিতেছে । কবির শুভাগমন উপলক্ষে সহরের উপকণ্ঠস্থ পুরান কুঞ্জবনের শৈলশিখরে  কবির সম্মানে বসন্ত উৎসবের ও মনিপুরী নৃত্যগীতাদির মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান আয়োজিত হইল ।" ( তথ্য ক্রমপঞ্জি–শ্রী দ্বিজেন্দ্র দত্ত / রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা, পৃ-১২৫-১২৬ ) ।


১৩০৬ বঙ্গাব্দের বসন্ত পঞ্চমীতে রবীন্দ্রনাথের ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় আগমনের তারিখ সম্বন্ধে পরবর্তী সময়ে মতান্তর দেখা দেয় । সম্ভবত, প্রাগুক্ত দুই লেখক রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের তখনকার মতো প্রামাণ্য গ্রন্থটি অনুসরণ করার কারণেই  এরূপ তথ্য উল্লেখিত হয়েছে । ত্রিপুরা আঞ্চলিক রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী সমিতি, আগরতলা কর্তৃক রবীন্দ্র শতবার্ষিকী স্মারক গ্রন্থ 'রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা' প্রথম প্রকাশিত হয় আশ্বিন ১৩৬৮ বাংলা । পুনর্মুদ্রণ হয় ফাল্গুন ১৩৯৩ বাংলা ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭ ইং এবং তৃতীয় মুদ্রণ হয় বৈশাখ ১৪১৮ বাংলা, মে ২০১১ ইং । এই গ্রন্থের তৃতীয় মুদ্রণের মুখবন্ধের সংযোজনীতে ( ২ ক-খ ) তথ্যসহ উল্লেখ করা হয়েছে যে, রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরায় এসেছিলেন ১৩০৫ বঙ্গাব্দের ১৪ চৈত্র ( ২৭ মার্চ ১৮৯৯ ইংরেজি ) । সেখানে উল্লেখ আছে–


                           মহারাজা রাধাকিশোরের আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথের প্রথম আগরতলা পরিভ্রমণ


২ ( ক ) 'রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা' গ্রন্থে ( দ্বিতীয় মুদ্রণ ১৩৯৩ বঙ্গাব্দ পৃষ্ঠা ১৫, ১২৪, ১২৫ ) উল্লেখ রয়েছে যে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের শ্রীপঞ্চমী উপলক্ষে বসন্তোৎসবে কবি প্রথমবার রাধাকিশোরের আমন্ত্রণে আগরতলা এসেছিলেন । পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে যে ১৩০৬ বঙ্গাব্দ এবং শ্রী পঞ্চমী তিথি দুটোর একটাও ঠিক নয় ।


১৩০৬ বঙ্গাব্দের শ্রীপঞ্চমী তিথি ছিল ২২শে মাঘ ( রবিবার ৪ ফেব্রুয়ারি ) । প্রশান্ত পাল লিখেছেন,

 '২২শে মাঘ সরস্বতী পূজার দিন রবীন্দ্রনাথ সংগীত সমাজে যান সারস্বত সম্মিলনে যোগদান করতে... ২৩শে মাঘ ( সোমবার  ৫ ফেব্রুয়ারি ) রবীন্দ্রনাথ আবার প্রিয়নাথ সেনের বাড়ি যান । এই দিনে দিনেন্দ্রনাথের সঙ্গে গগনেন্দ্রনাথের ছোটবোন সুনয়নী দেবীর কন্যা বীণাপাণীর বিবাহ হয়' । ( রবীন্দ্রজীবনী, চতুর্থ খন্ড, চতুর্থ মুদ্রণ, ১৪১৫ বঙ্গাব্দ, পৃষ্ঠা ২৬০ ) । অতএব রবীন্দ্রনাথের সেদিন আগরতলা আগমনের তথ্যটি সঠিক নয় । 


দ্বিতীয় প্রমাণ হিসেবে প্রশান্ত পাল উল্লেখ করেছেন যে–

 "১৩০৫ সালের ৮ ফাল্গুন রবীন্দ্রনাথ শৈলেশচন্দ্র মজুমদারকে লিখেছিলেন, 'চৈত্রমাসের আরম্ভে ত্রিপুরার মহারাজার নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে আমাকে একবার ত্রিপুরায় যেতে হবে ।' সেই হিসেবে ৭ চৈত্র সরকারি কেশবহিতে 'ত্রিপুরার মহারাজাকে দিবার জন্য' উপহার সামগ্রী ক্রয়ের হিসাব রয়েছে । প্রশান্ত পাল সমস্তরকম হিসেব-নিকেশ করে দেখিয়েছেন যে, ১৩০৬ বঙ্গাব্দের শ্রীপঞ্চমী নয়, ১৩০৫ বঙ্গাব্দের দোলপূর্ণিমার দিন অর্থাৎ ১৪ চৈত্র সোমবার ২৭ মার্চ ১৮৯৯ তারিখে সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার ত্রিপুরায় পদার্পন করেন ।" ( রবি জীবনী চতুর্থ খন্ড চতুর্থ মুদ্রণ ১৪১৫ বঙ্গাব্দ পৃষ্ঠা ২০২২ ২২৩ ) ।


২ ( খ ) এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা গ্রন্থের মুদ্রণের ১৪ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে যে, ১৩০৬ সনের গোড়ার দিকে ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অকাল মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথকে একটু স্বস্তিদান করার জন্য রাধাকিশোর বন্ধু রবীন্দ্রনাথকে ত্রিপুরায় আমন্ত্রণ করেছিলেন । ঘটনাটি ঠিক নয় । কেননা বলেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়েছে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ৩ ভাদ্র ( ১৯শে আগস্ট ১৮৯৯ ), আর রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন ১৩০৫ বঙ্গাব্দের ১৪ চৈত্র ( ২৭ মার্চ ১৮৯৯ ইং ) ।


সেবার তিনি রাজঅতিথি হিসেবে কর্নেল মহিম ঠাকুরের বাড়িতে অবস্থান করেন যেহেতু তখনো রাজপ্রাসাদ সম্পূর্ণ নির্মিত হয়নি । কবির প্রথমবার কর্নেল বাড়িতে অবস্থান সম্পর্কে একটি বিশেষ তথ্য পাই বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক শঙ্খ শুভ্র দেববর্মনের মাতা সবিতা দেববর্মনের 'পাতার ভেলা ভাসাই নীরে' গ্রন্থটির একটি প্রবন্ধে । এখানে তিনি তাঁর ঠাকুরমা কর্নেলবাড়ির মেয়ে শশীমঞ্জরী দেবীর কাছ থেকে শৈশবে শোনা বিবরণ তুলে ধরেছেন–


 ''মহারাজ কর্নেলবাড়িতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন । গুরুদেবের আগমন উপলক্ষে ঠাকুরমাসহ সব বোনেরা, বউয়েরা মিলে খুব সুন্দর পুষ্পশিল্পের আয়োজন করেছিলেন । মধুগন্ধে ভরা বিভিন্ন রংবাহারি ফুল দিয়ে ফুলের বিছানা তৈরি করেছিলেন । মাথার বালিশে ফুল দিয়ে সাজিয়েছিলেন । অপূর্ব কারুকার্য করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামটি ফুল দিয়ে লিখিত হয়েছিল । রংবেরঙের ফুল দিয়ে ফুলের পাখা তৈরি করে রেখেছিলেন । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসে বিছানাতে ফুলের আলপনা, বালিশে ফুল দিয়ে নিজের নাম লেখা দেখে শিহরিত, আনন্দিত, অবাক হয়ে বিছানার পাশে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন । শেষে বিছানার পাশে যে চেয়ার ছিল সেই চেয়ারটিতে বসে পড়লেন । সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীও ছিলেন । 


ফুলের পাখা দেখে নাড়াচাড়া করে কে কে এই পাখা তৈরি করেছিলেন । তাদের ডেকে আলাপ পরিচয়ও করেছিলেন । ঠাকুরমার সঙ্গে তখনই পরিচয় হয়েছিল । পুষ্পশিল্পীদের অপূর্ব শিল্প কৌশলের প্রতি মুগ্ধ হয়ে তিনি বসেননি সেই বিছানাতে, এমনকি শয়নও করেননি । এই পুষ্প বিছানার কাছে আরেকটি শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছিল । এরপর থেকে নাকি তিনি ত্রিপুরার পুষ্পশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন ।"

 

কবির শুভাগমন উপলক্ষে শহরের উপকন্ঠে  কুঞ্জবনের শৈলশিখরে  কবির সম্মানে বসন্তোৎসবের ও মণিপুরী রাসনৃত‍্যের আয়োজন যে করা হয়েছিল তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে  ।


এই ঘটনাটির আরো বিস্তৃত বিবরণ পাই আর একটি লেখায় । সেখানে দেখি–


"........... দাদামহাশয় একবার গুরুদেবের ত্রিপুরা আগমন সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন তা আমার এখনো মনে আছে । মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্যের বিশেষ আমন্ত্রণে ত্রিপুরার বসন্ত উৎসব উপলক্ষে ১৩০৬ সনে তিনি আগরতলায় এসেছিলেন । তখন ভূমিকম্পের ভাঙ্গা ত্রিপুরা মহারাজার প্যালেশের যাবতীয় মালমশলার দান পেয়ে সবেমাত্র দাদা মহাশয়ের নতুন বাড়ি প্রস্তুত হয়েছিল । মহারাজ সে বাড়িতেই তখন গুরুদেবের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন । দাদামহাশয়ের মুখে জ্ঞাত হয়েছিলুম– গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের কর্নেল বাড়িতে আগমন উপলক্ষে আমার এক দিদিমা খুব মনোরম পুষ্পশিল্পের আয়োজন করেছিলেন । তিনি গুরুদেবের সমস্ত শয্যার উপর ও বালিশে অপর্যাপ্ত রঙবেরঙের পুষ্পাভরণের নক্সা পরিকল্পনায় সাজিয়ে দিয়েছিলেন । বিশেষ করে মাথার বালিশটি অপরূপ রঙিন ফুলের শিল্পরসের শোভা বর্দ্ধন করিতেছিল । বালিশের উপর এই আলপনাসংসৃষ্ট শিল্পকীর্তিতে বিশেষ করে বালিশের মধ্যস্থলে 'রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর' নামাঙ্কিত করে অপরূপ পুষ্পশিল্পের সৃজন করেছিলেন । সেদিন গুরুদেব দাদা মহাশয়ের সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমেই সোজা নতুন বাড়ির পশ্চিম কামরায় প্রবেশ করতে যাবেন, ফাল্গুনের অযাচিত মিশ্রিত ফুলের গন্ধে বিভোর হয়ে তিনি দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন এবং দাদামহাশয়কে বলেছিলেন, 'মহিম ঠাকুর,  কী চমৎকার গন্ধ !' তারপর ঘরে প্রবেশ করতেই চারিদিকে আবহাওয়ার পরিবেশে সুবাসিত পুষ্পগন্ধে মুগ্ধ হয়ে বিছানার পাশে যে চেয়ারটি ছিল সেখানে বসে পড়লেন । তাঁর আতিথ্যরসপূর্ণ কক্ষে শয্যার অপরূপ পুষ্পশিল্পের নিদর্শন নিরীক্ষণ করে তিনি খুব আশ্চর্যান্বিত হয়ে গিয়েছিলেন । বিশেষত তাঁর বালিশের রূপসজ্জা দেখে আরো মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং শিল্পী দিদিমার সহিত পরিচয় করবার জন্য দাদামহাশয়ের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন । তখন দিদিমারা সকলেই উপস্থিত ছিলেন । দাদামহাশয় প্রত্যেককে সাক্ষাৎ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন । গুরুদেব পুষ্পশিল্পী দিদিমাকে দেখে তার পুষ্পশিল্পের কারুকৌশলের খুব সুখ্যাতি বর্ণনা করেছিলেন এবং আন্তরিক সাধুবাদ দিয়েছিলেন । তিনি পুষ্পশিল্পীর অপূর্ব শিল্পকৌশলের প্রতি মুগ্ধ হয়ে সে বিছানায় বসেন নাই, এমনকি শয়নও করেন নাই । কেবল বিছানার পাশে আরাম কেদারায় বসে বসে ফুলের গন্ধ ও পুষ্প শিল্পের মাধুর্য হৃদয়ে গ্রহণ করে কৃতার্থ হয়েছিলেন । সেদিন দাদামহাশয়কে আর একটি শয্যার ব্যবস্থা তার পাশেই করে দিতে হয়েছিল । ( রবীতীর্থ স্মৃতি– শ্রী শৈলেশচন্দ্র দেববর্মা, রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা পৃষ্ঠা ১৯৭–১৯৮ ) ।


১৩০৮ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার আগরতলায় আসেন ।এসময় শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মবিদ‍্যালয় স্থাপনের ব‍্যাপারে মহারাজের সঙ্গে আলোচনা হয় । এই বিদ‍্যালয়ের জন‍্য মহারাজ বাৎসরিক একহাজার টাকা মঞ্জুর করেন । এছাড়া মহারাজ ত্রিপুরার অনেক ছাত্রকে ছাত্রবৃত্তি দিয়ে শান্তিনিকেতনে পাঠিয়েছিলেন শিক্ষাগ্রহণের জন‍্য । বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর অর্থ সংগ্রহের ব্যাপারেও কবি মহারাজের সঙ্গে আলোচনা করেন । মহারাজ জগদীশচন্দ্রের জন‍্য দশ হাজার টাকা প্রদানের ঘোষণা দেন এবং কিছুদিন পরে দশ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন । সেবার তিনি জুরি বৈঠকখানায় বসবাস করেন । উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ সংলগ্ন পাশাপাশি দুটো 'কাঁচা বাংলো' নির্মিত হয়েছিল । বর্তমান জগন্নাথ মন্দিরের প্রায় ৩০০ ফুট উত্তরে এ জোড়াবাংলো অবস্থিত ছিল সেদিন ।


১৩১২ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ তৃতীয়বার আগরতলায় আসেন । সেবারও জোড়াবাংলোয় অবস্থান করেছিলেন । সেটা ছিল আষাঢ় মাস । ১৭ আষাঢ় স্থানীয় উমাকান্ত একাডেমি হলে মহারাজ রাধাকিশোরের উপস্থিতিতে ত্রিপুরা সাহিত্য সম্মিলনীর সভায় সভাপতি হিসেবে সুচিন্তিত ও সারগর্ভ 'দেশীয় রাজ্য' প্রবন্ধটি পাঠ করেন কবি ।


১৩১২ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে কবি পুনরায় আগরতলায় আসেন । এবার তিনি ত্রিপুরার নবনিযুক্ত রাজমন্ত্রী রমণীমোহন চট্টোপাধ্যায়ের কর্মভার গ্রহণ উপলক্ষে জগদীন্দ্রনাথ প্রভৃতি সহ চতুর্থবারের মতো এলেন এখানে । 


১৩১২ বঙ্গাব্দেই চৈত্র মাসে পঞ্চমবার পুনরায় রবীন্দ্রনাথ আগরতলায় আসেন । এবারের আসার কারণ হিসেবে জানা যায় চৈত্র মাসে ইস্টার অবকাশের সময় বরিশালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের ( যা এরপর পুলিশি জুলুমে  দক্ষযজ্ঞে পর্যবসিত হয় ) অন্তর্ভুক্ত সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব করবার জন্য । 


১৯১৯ খ্রি. অর্থাৎ ১৩২৬ বঙ্গাব্দে ত্রিপুরদরবারের আমন্ত্রণে কার্তিক মাসে ত্রিপুরার পরম সুহৃদ ও মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী রবীন্দ্রনাথ শিলং থেকে কোলকাতা যাবার পথে ষষ্ঠ বারের মতো ত্রিপুরায় আগমন করেন । কবির মনের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে তাঁর থাকার জন্য এই কুঞ্জবনের এক প্রান্তে  নয়াভিরাম ঘন সবুজ বনানীর কোলে চারিদিকে অজস্র ফুলের মাঝখানে একটি কাঠের ছোট্ট বাংলো তৈরি করা হয় । প্রত্যহ নিত্য নতুন বিহঙ্গের কলকাকলি মুখরিত এই স্থান কবির বড়ই প্রিয় ছিল । এই বাংলোর নাম শিল্পী মহারাজ বীরেন্দ্রকিশোর নামকরণ করেন 'মালঞ্চাবাস' ( মালঞ্চ + আবাস ) । আবাসটি ছিল মোটা উলুছনের ছাউনিযুক্ত চৌচালা ঘর । বাঁশ বেতের অপূর্ব কারু শিল্পের নকশার কাজ করা বেড়া দেওয়া । মেঝেতে কাঠের পাটাতনের উপর সুদৃশ্য কাশ্মীরি কার্পেট বিছানো । রাতে জ্বলত চিনা ঝাড়লন্ঠন । দুদিকে গোলাপ ও কাঁঠালি চাঁপার ঝাড় । কত দূর থেকে ভেসে আসা আদিবাসীদের সুরেলা জাদু কলিজার গানের সুরের সঙ্গে বাজত বাঁশির সুমিষ্ট আওয়াজ যা কবিকে করে রাখত আপ্লুত ।


১৩৩২ বঙ্গাব্দের ১০ই ফাল্গুন মহারাজকুমার ব্রজেন্দ্রকিশোর দেববর্মার আমন্ত্রণে কবি সপ্তম ও শেষবার আগরতলায় আসেন । অল্পবয়স্ক মহারাজ বীরবিক্রম মাণিক‍্যের সঙ্গে মহারাজকুমার বীরেন্দ্রকিশোরের এই আমন্ত্রণ তৎকালীন আগরতলার সাংস্কৃতিক জগতের সুধীমন্ডলীর পরম শ্লাঘার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল । সেবার তিনি কুঞ্জবনপ্রাসাদে অবস্থান করেছিলেন । এই সম্বন্ধে তিনি পরবর্তী সময়ে মন্তব্য করেছিলেন— 


.......''পৃথিবীতে প্রকৃতির লীলা ক্ষেত্র অনেক দেখিয়াছি কিন্তু ত্রিপুরার কুঞ্জবনের শৈল শ্বেত ভবন আমার স্মৃতি হইতে মলিন হইতে পারিতেছে না ।' 


এইসময় প্রতিদিন মণিপুরী নৃত‍্য প্রদর্শিত হত । তাছাড়া মহারাজকুমার ব্রজেন্দ্রকিশোরের বসতবাটিতে এক অনুষ্ঠানে রাজকুমার বুদ্ধিমন্ত সিংহের পরিচালনায় রাজ অন্তঃপুরের কুমারীগণ মণিপুরী নৃত‍্য, বসন্ত উৎসব ও রাসনৃত‍্যে অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায় । স্থানীয় কিশোর সাহিত্য সমাজ তাঁকে ১২ ফাল্গুন তারিখে উমাকান্ত একাডেমী হলে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে ।


রবীন্দ্রনাথের ত্রিপুরায় পদার্পনের শুরুর দিন থেকে গণনা করে হিসেব করলে আজ তা একশো পঁচিশ বছরের সূচনা করল । এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে রাজ্যে ইতোমধ্যে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে । আশা করা যাচ্ছে এই প্রয়াস গোটা বছরব্যাপীই জারি রেখেই রাজ্যে রবীন্দ্রপ্রণামের ধারাবাহিকতায় নবসংযোজন ঘটবে । রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ত্রিপুরার নিবিড় সম্পর্কের কথা বর্তমান প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনটিও ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব পাবে ।


সহায়ক গ্রন্থ :


১.  রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা–রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ, ত্রিপুরা আঞ্চলিক রবীন্দ্রশতবার্ষিকী সমিতি, আগরতলা, ত্রিপুরা সরকারী মুদ্রণালয় ।

২. আধুনিক ত্রিপুরা, প্রসঙ্গ বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য– ড. দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ গোস্বামী / অক্ষর পাবলিকেশানস্, আগরতলা

৩. অন্য রবীন্দ্রনাথ–ড. দেবব্রত দেবরায়, স্রোত প্রকাশনা, ত্রিপুরা

৪. পাতার ভেলা ভাসাই নীরে– স্রোত প্রকাশনী, ত্রিপুরা

কবিতায় রোমান্টিক ভাবনা

কবিতায় রোমান্টিক ভাবনা

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

কবিতার মধ্যেই  ফুটে উঠে কবির কাব্যব্যক্তিত্ব । কবি তাঁর কল্পনার পরিধিবিস্তারের মাধ্যমে তাঁর কাব্যপ্রতিভার স্বকীয়তাকে প্রকাশ করেন । এই প্রকাশের মূলে রয়েছে কবির ভাবনার সুদূরপ্রসারের ক্ষমতা । যার দ্বারা কবি নিজেকে অন্য কবির থেকে আলাদা করে নির্মাণ করেন । এই আশ্চর্য কল্পনাপ্রবণতাকে সাহিত্যের ভাষায় রোমান্টিকতা বা রোমান্টিজম বলে । রোমান্টিকতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অধ্যাপক হার্বাট বলেছেন, an extraordinary development of imaginative sensibility. কল্পনাপ্রবণতার ব্যতিক্রমী উন্নয়ন হল রোমান্টিজম । ওয়াটস ডাল্টন যেটাকে বলেন, Renascnce of wonder. অর্থাৎ বিস্ময়ের আবির্ভাব । রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, 'বিস্ময়ে তাই জাগে আমার প্রাণ ।' 

 বাংলা কাব্যের প্রথমদিকের গীতিকবিদের কাব্য ভাবনা রোমান্টিকতায় আচ্ছন্ন । পরবর্তী সময়ে বাংলা কাব্যপ্রবাহ অনেক দূর এগিয়ে গেছে । রোমান্টিকতা কবিতার প্রধান উপজীব্য হলেও তার প্রকাশভঙ্গিতে বহু পরিবর্তন হয়ে গেছে । পরিবর্তনই হল আধুনিকতা । প্রকাশভঙ্গির আধুনিকতায় কবিকে স্বকীয়তায় চিহ্নিত করে । 

কবি মায়া মজুমদার একজন সহজ সরল গ্রাম্য গৃহবধূ । জীবনের দীর্ঘসময় কর্মব্যস্ততায় নিজের সংসারের বেড়াজালে আবদ্ধ থেকেছেন এবং সমাজসেবা মধ্যে মগ্ন থেকেও দীর্ঘদিন নীরবে কাব্যচর্চা চালিয়ে গেছেন ।জীবনের শেষ পর্বে এসে তাঁর কবিতাকে বৃহত্তর পরিসরে প্রকাশের  প্রতি ঝুঁকেছেন । এই শতাব্দীর প্রথম দশকের শেষার্ধ থেকে তিনি রাজ্যের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কবিতা প্রকাশে মনোনিবেশ করেছেন । সর্বাধুনিক সময়কালে বসে কবিতা রচিত হলেও তাঁর কবিতা কিন্তু সেই অনুযায়ী সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না । এখনো তাঁর কবিতা প্রাক-আধুনিক কবিদের গীতিকবিতার লক্ষণাক্রান্ত বলা যেতে পারে । কিন্তু তাঁর অন্তর্মুখী নিভৃত সৃষ্টিতে তিনি বিরত নেই সেটাই বড়ো কথা ।

সময়ের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও দীর্ঘকালব্যাপী কবির কাব্যচর্চার নিরন্তর প্রয়াসের ফলশ্রুতিতেই ইতোমধ্যে তাঁর তিন তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে গেছে । তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ যথাক্রমে 'এই তো জীবন' এবং 'নীল মেঘের বেদনা' প্রকাশিত হয়েছে ২০২১ সালের আগরতলা বইমেলাতে এবং তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ 'থমকে যাওয়া মন' প্রকাশিত হয়েছে জানুয়ারি ২০২২ এ । তাঁর প্রতিটি কাব্যগ্রন্থে ছাপ্পান্নটি করে কবিতা রয়েছে । সংসারের সমস্ত দায়দায়িত্ব নির্বাহ করে বহু লিখিত কবিতা থেকে ঝাড়াই বাছাই করে একশো আটষট্টিটি কবিতা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করা একজন গৃহবধূর পক্ষে অসাধ্যসাধনই বলা যেতে পারে নিরন্তর সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে । একারণে কবির এই দুরূহ প্রয়াসকে সাধুবাদ জানাতেই হয় । তাঁর কবিতাগুলোর প্রায় সব কয়টি একটি নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে । আলাদা করে নাম না করেও বলা যায় যে, তাঁর কবিতায় প্রধানত যে ভাবনাগুলো উঠে এসেছে তা হল–

১. কবিতায় তাঁর নিজস্ব ভালোলাগা মন্দলাগার প্রকাশ
২. জীবনের বাস্তবতাকে নির্মমভাবে প্রত্যক্ষ করে নিজের অতৃপ্তি ও অসন্তোষের প্রকাশ
৩. প্রকৃতির সজীব ও চৈতন্যময় সত্তার স্ফুরণ
৪. আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের উপাসনা
৫. কখনো কখনো বিষন্নতা ও নিঃসঙ্গবোধ

 তিনটি কাব্যগ্রন্থ পাঠের মাধ্যমেই কবিকে স্বতন্ত্রতায় চিহ্নিত করা যাবে । আলোচিত তিনটি কাব্যগ্রন্থই অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় রচিত এবং পড়ে ভালো লাগবে । প্রতিটি গ্রন্থ ই প্রকাশিত হয়েছে ত্রিপুরার বিশিষ্ট প্রকাশন সংস্থা 'মৌমিতা প্রকাশনী', আগরতলা থেকে ।

কেসহিস্ট্রি আর কথাসাহিত্যে সমাজসমস্যার প্রকাশ

কেসহিস্ট্রি আর কথাসাহিত্যে সমাজসমস্যার প্রকাশ

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

 মামলায় জড়িয়ে পড়লে বোঝা যায় তার মধ্যে কি জট আর জটিলতা । আইন ও বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল বিষয় । মানুষ সুবিচারের জন্য আদালতে যান । এক্ষেত্রে আইনজীবীর বিশেষ ভূমিকা থাকে । অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়ের উপর তাঁকে নজর রাখতে হয় । আইনজীবী তাঁর মক্কেলের পক্ষে বিভিন্ন রকম তথ্য উপাত্ত বিচারকের কাছে তুলে ধরেন । সে ক্ষেত্রে সাক্ষ্য বা তথ্য উপস্থাপনের সামান্য ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলে বা অসাবধানতাবশত দৃষ্টি এড়িয়ে গেলে তা অনেক সময় বিচার প্রার্থীর বিপক্ষে যেতে পারে । আইনজীবীর বিচক্ষণতা ও স্পষ্ট মনোভাবের ফলে মক্কেল মামলায় সঠিক বিচার পায় । আবার আইনজীবীর শুধুমাত্র ব্যক্তিগত লাভালাভের বিষয়কে প্রাধান্য দিলে তখন বিচার ব্যবস্থা মার খায় ।

দেবরঞ্জন চৌধুরী পেশায় আইনজীবী । তার পিতাও একসময় আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন । ফলে বিচারালয়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের একটা যোগাযোগ রয়েছে । বিচার ব্যবস্থার নাড়িনক্ষত্র সম্বন্ধে তিনি বিশেষভাবে অবগত আছেন । বিচার ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে বহু ঘটনার সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত । বিচারকার্য পরিচালনা করতে গেলে বিচারক আইনজীবী এবং মামলার বাদী-বিবাদী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বহু খুঁটিনাটি দিকের উপর নজর রাখতে হয় ।

 আদালতের অলিন্দে দীর্ঘকাল পদচারণার ফলে বিশিষ্ট আইনজীবী দেবরঞ্জন চৌধুরী বিচার প্রক্রিয়াকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন । সুবিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে মক্কেলকে মামলা করার জন্য উৎসাহিত করার পাশাপাশি আইনজীবীরা যে পেশাগত দায়িত্বের উর্ধ্বে উঠে সামাজিক দায়িত্ব পালনেও ভূমিকা নিতে হয়, সে দিকটিও লক্ষ্য রাখতে হয় সে ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ।

লেখক তাঁর 'বিচারালয়ের অভিজ্ঞতা' ( প্রকাশক মৌমিতা প্রকাশনী, বইমেলা ২০০৩ ) গ্রন্থে বিচারব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত তাঁর সারা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কিছু ঘটনা তুলে ধরেছেন । বৈঠকি ঢঙে বর্ণনা করা তাঁর কেস হিস্ট্রিগুলো পড়লে জানা যায়, কিভাবে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনজীবীর গভীর অনুসন্ধানী পদক্ষেপের ফলে সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মক্কেল সুবিচার পায় । আবার ত্রুটিপূর্ণ জবাবের কারণে এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি এক্সিবিট করার ক্ষেত্রে গাফিলতি থাকার ফলে 'বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে' । একেবারে সহজ সরল ভাষায় লেখক ছোটো ছোটো কেসহিস্ট্রি তুলে ধরে অত্যন্ত সুখপাঠ্য করে তুলেছেন বইটি । আইনঘটিত বিষয় হলেও আইনি কচকচি নেই বইটিতে । তাই পাঠক খুব আগ্রহের সঙ্গে বইটি পড়বেন । বাদী বিবাদীর নাম উল্লেখ না থাকলেও বর্ণিত মামলা সংক্রান্ত ঘটনা স্মরণ করে  এই গ্রন্থের মাধ্যমে রাজ্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার ইতিহাস ও জানতে পারবেন পাঠক । এটা একটা বাড়তি পাওনা ।

'দীপ শিখা' দেবরঞ্জন চৌধুরীর দ্বিতীয় গ্রন্থ । এই গ্রন্থেরও প্রকাশক মৌমিতা প্রকাশনী, আগরতলা । প্রকাশকাল বইমেলা ২০২৩ উপন্যাস না বলে এটিকে একটি বড় গল্প  বলা যেতে পারে । গল্পের মূল দুটি চরিত্র দীপ ও শিখা  কৈশোরের বন্ধুত্ব থেকে যৌবন সমাগমে পরস্পরের অজান্তে একে অন্যকে ভালোবেসে ফেলে । একসঙ্গে কলেজে পড়াশোনা করতে করতে শিখাকে একদিন রাজ্যান্তরী হতে হয় । মা-বাবা ও অন্যান্য অভিভাবকদের চাপে পড়াশোনায় মেধাবী ও অন্যান্য গুণে গুণান্বিতা এই মেয়েকে তারা বিয়ে দিয়ে দেয় । কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ভালো ঘরে বিয়ে হলেও একদিন গাড়ি দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হয় শিখা, তার স্বামী ও দুই সন্তান । দুদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে মারা যায় শিখার স্বামী । দুই অসহায় সন্তান নিয়ে তার স্বামীর গৃহে স্থান হয় । এদিকে দীপ চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে কলকাতার ডাক্তার নীলরতন সরকার হাসপাতালে কর্মজীবন শুরু করে । ভাগ্যক্রমে দীপের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলে শিখার । একসময় তারা পরস্পরকে চিনতে পারে ।  গভীর অন্তর্দ্বন্দ্বে দীর্ণ হয় উভয়ের মন । কিন্তু একদিন শিখাকে সুস্থ করে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয় দীপ ।

তারপর বহুদিন পর তাদের বাল্যবন্ধু গল্পের কথক আবার যোগাযোগ তৈরি করতে পারে দীপ ও শিখার সঙ্গে । সেদিন দেখা যায়  দীপ বার্ধক্যে জর্জরিত । শিখা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে । ছেলেও প্রতিষ্ঠিত । মেয়ে ও জামাই যাদবপুরে থাকে । মেয়ের বাড়িতে এলে শিখা দীপকে দেখে যায় । উভয়ের ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত হলেও কৈশোরের কাছাকাছি আসা দুটি মন এক হতে পারেনি কোনোদিন । 'ওদের কাছে তাই তাদের বাল্য জীবনের ভালোবাসা যেন জীবনের সমস্ত কিছু বলার মধ্যেও যেন অপূর্ণতা ও অভিশাপ
 ।'

এই হল গল্পের বিষয়বস্তু । নিটোল প্রেম ও অপূর্ণতার গল্প হলেও আজ থেকে ষাট সত্তর বছর আগের সামাজিক অবস্থার প্রতিই মূলত তিনি ইঙ্গিত করেছেন তাঁর গল্পে । এ প্রসঙ্গে লেখক নিজেই তাঁর গল্পের ভূমিকায় লিখেছেন, "আইনজীবী প্রফেশন থেকে নিজেকে আইনের গণ্ডির মধ্যে বেঁধে রেখে মনে হল সমাজের বিভিন্ন প্রতিকূলতা এবং অজ্ঞতা আজও সার্বিকভাবে আমাদের সমাজের উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে । তারই উদাহরণ নীরমহলের স্থপতি রাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের একটি বিশেষ কীর্তি যেটিকে নষ্ট করে দেওয়ার মানসিকতা এবং আজও আমাদের সমাজের বিভিন্ন কুসংস্কার মেয়েদের জীবনের এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হয়ে আছে । তারই প্রকাশ করার ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র ।" 

গল্পের আড়ালে সমকালের একটি সমস্যাকে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছেন লেখক তাঁর লেখার নিপুন বাঁধুনিতে । গল্পটি পড়ার পর পাঠককে ভাবাবে ।

Saturday, April 29, 2023

স্থাননাম দমদমা



স্থাননাম দমদমা


অশোকানন্দ রায়বর্ধন


দমদমা ( বিশেষ্য পদ ) মানে উঁচু জায়গা বা টিলা । আরবি শব্দ 'দম্দমহ্' থেকে পরিবর্তিত হয়ে শব্দটি বাংলায় এসেছে । খ্রিস্টিয় ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত সম্রাট আকবরের প্রশাসনের বর্ণনাসমৃদ্ধ নথি আবুল ফজলের 'আইন ই আকবরী'তে এই শব্দটি পাওয়া যায় । মূলত, পলি, কাঁকড়, নুড়ি ও বালি মিশ্রিত ভূভাগ দেখা যায় দমদমায় । 


আবার কোথাও কোথাও দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী ভূভাগ বা জমির মাটি একদম নরম হতে দেখা যায় । পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা জল এইভূমিতে এসে জড়ো হয়ে নিচের মাটিকে নরম করে রাখে । উপর থেকে যা বোঝা যায় না । ওই ভূমিতে পা দিলেই পাসহ শরীর সেখানে ডুবে যেতে থাকে । স্থানীয়ভাবে এই ভূভাগকেও 'উৎলা' বা 'দলদলি' বা 'দমদমা বলে থাকেন । অনেকসময় গৃহপালিত পশুরা সেখানে আটকে পড়ে । একসময় ত্রিপুরার সর্বত্রই এই ধরনের জমি ছিল । রাজন্য আমলে এই জাতীয় জমিকে ঘিরে হাতি ধরার ফাঁদ পাতা হত । একে 'খেদা' বলে । বুনো হাতি একবার এখানে এসে পড়লে তার বিশাল শরীর নিয়ে আর উঠতে পারত না ।


দমদমা শব্দের আরেকটি অর্থ  সামরিক ব্যবস্থাপনায় পাওয়া যায় । সৈন্যদের বন্দুকচালনার প্রশিক্ষণ চলাকালীন নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে আঘাত করার কৌশলগত দক্ষতা অর্জন করার জন্য উঁচু মাটির ঢিবি তৈরি করা হত । সে অর্থে 'উঁচু জায়গা' মানে 'দমদমা' । আবার এও হতে পারে, যেখান থেকে সেনাবাহিনীর গুলির আওয়াজ দ..ম দ..ম শোনা যেত সেই জায়গাটি দমদমা । আগরতলা শহরেরে সন্নিকটে চানমারি ও দমদমিয়া নামে দুটি জায়গা রয়েছে । কোলকাতার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন স্থান দমদম বিখ্যাত জায়গা । সেখানেও সেনানিবাসের উদাহরণ রয়েছে । যেহেতু সেনানিবাস ছিল তাহলে সৈখানে একসময় চানমারিও ছিল ।


আমাদের গ্রামাঞ্চলে প্রাচীন রীতিতে যে মাটির বা ছনবাঁশের ঘর রয়েছে তার ছাদের অংশকেও স্থানীয় বাংলায়  দমদমা বলা হয় । ঘরের ভিতরে উপরে টিনের চালের নিচে বাঁশের বেড়া দিয়ে ছাদ ঢেকে দেওয়া হতো । তার দুটো উদ্দেশ্য । এক, রৌদ্রের তাপ থেকে ঘরের ভেতরের অংশ রক্ষা করা । দুই, কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী যত্নে রেখে দেওয়া । আগের দিনে গাছ থেকে সুপারি পাড়া হলে তা দমদমায় বিছিয়ে রাখা হত । ছাদের গরমে সুপারির খোলসটি দ্রুত শুকিয়ে যেত । অনেকে আগুনের উৎপাত থেকে ঘরের সামগ্রী রক্ষা করার জন্য দমদমার উপরে পুরু মাটির আস্তরণ দিয়ে রাখতেন ।


এবারে আসা যাক, সাব্রুমের দমদমার কথায় । সাব্রুম ও তার আশপাশ এলাকার মধ্যে এই স্থানটি অপেক্ষাকৃত উঁচু । তাই তার নাম দমদমা হতে পারে । সাব্রুমের প্রাচীন ইতিহাস অনুযায়ী জানা যায়, এখানে একসময় ত্রিপুরার রাজার সেনানিবাস ছিল । হয়তো তাদের চাঁদমারি ছিল এই দমদমায় । তা থেকেও দমদমা হতে পারে । 


স্বাধীনতাপরবর্তী ও ত্রিপুরা রাজ্যের ভারতভুক্তির পরে বাংলাদেশের নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলা থেকে বহু মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে এসে এখানে বসতি গড়েছেন । নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের বাংলায় বহু আরবি ফারসি শব্দ প্রবেশ করেছে । মূলত, বহু প্রাচীনকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আরব ও অন্যান্য দেশের বণিকগণ আসা-যাওয়ার ফলে তাদের শব্দ সেই অঞ্চলের বাংলা ভাষায় ঢুকে গেছে । তাছাড়া বাংলাদেশের চট্টগ্রামের মিরশ্বরাই এর কাছে দমদমা নামেএকটি গ্রাম আছে । সেখানকার কোন মানুষ পরবর্তী সময়ে এখানে এসে বসবাস করার ফলে পূর্ব স্মৃতি ধরে রাখতে তার নাম দমদমা রাখতে পারেন । 


বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা-আসাম-এ বহু স্থাননাম দমদম, দমদমা, দমদমিয়া ইত্যাদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে । এরকম বহু স্থাননামের সঙ্গে আমাদের প্রাচীন আঞ্চলিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি জড়িয়ে আছে । 

ছবি : নেট থেকে সংগৃহীত ।

Sunday, April 23, 2023

আ ড্ডা ম ন্ত্র

আড্ডা শব্দকর্মীদের অক্সিজেন । আড্ডা চলুক আরো আরো । আমি সংসারের ঝক্কি ঝামেলায় হাঁপিয়ে উঠলে ইতিউতি ও আগরতলার পরিযায়ী ঠেকে নিজেকে ঝালাই করে আসি । তারপর কলম নিয়ে বসলে দু চারটে হাবিজাবি লেখা বেরিয়ে যায় । আর আমি আত্মসন্তুষ্টির ঢেঁকুর তুলি ।

Tuesday, April 18, 2023

ত্রিপুরার শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায়

ত্রিপুরার শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায় 


অতি প্রাচীনকাল থেকেই ত্রিপুরা ছিল একটি প্রভাবশালী স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য । আদিযুগে চন্দ্রবংশীয় রাজারা এখানে রাজত্ব করতেন । ত্রিপুরার অধিবাসীরা খুবই আনন্দপ্রিয় ও উৎসব প্রিয় জাতি । প্রাচীনকালে তাঁরা সর্বপ্রাণবাদীতে ( Animism ) বিশ্বাসী ছিলেন । পরবর্তী সময়ে তাঁরা হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেন । তখন থেকে তাঁরা হিন্দু ধর্মে নানা শাস্ত্রীয় শিষ্টাচারের পাশাপাশি তাঁদের লৌকিক ধর্মাচরণ
গুলিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে আসছেন । বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো নানারকম পূজা পার্বণ এবং সামাজিক অনুষ্ঠান নিয়ে তাঁরা সারা বছর মেতে থাকেন । সেইসব অনুষ্ঠানকে ঘিরে তাঁরা নৃত্য ও সঙ্গীতে মেতে ওঠেন । মূলত লোকনৃত্যই তাঁদের প্রধান ঐতিহ্য । নৃত্য ও সঙ্গীতে পারদর্শিতার কারণে প্রাচীনকাল থেকেই তাঁরা ভারতের বিশিষ্ট নৃত্য পারদর্শী জাতি হিসেবে সমাদৃত । তাঁদের প্রত্যেকটি ধর্মাচরণ ও সামাজিক অনুষ্ঠানের সাথে নৃত্যের ঐতিহ্য নিবিড় ভাবে জড়িয়ে আছে ।

ত্রিপুরা রাজ্যের লোকনৃত্যের ধারা যেমন সাধারণ জনগণের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়েছে তেমনি শাস্ত্রীয় সংগীত ও নৃত্যচর্চা রাজপুরুষদের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে । ত্রিপুরা রাজ্যের সুশীলসমাজে সংস্কৃতি চর্চা তথা নৃত্য-গীত-নাটক ও সাহিত্যচর্চার যে বিস্তার আমরা বর্তমানে দেখতে পাই, তার সূত্রপাত ঘটেছিল ত্রিপুরার রাজদরবারে ও রাজবাড়ির অন্দরমহলে । ত্রিপুরার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চাই হোক, বাউল ভাটিয়ালি সবই রাজপুরুষদের হাত ধরে সর্বসমক্ষে উপস্থাপিত হত । সংগীত, নৃত্য, নাটক বাদ্য, সাহিত্যের সমস্ত ধারার চর্চাই রাজ পরিবারের সংঘটিত হত । নৃত্যের ক্ষেত্রে প্রধানত রাজপুরীতে মনিপুরী নৃত্যের প্রচলন ছিল । তারপরও বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে বা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে রাজবাড়িতে বাইরে থেকে শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পীরা আসতেন । বিখ্যাত কথক শিল্পী কুলন্দর বক্স, অলকানন্দা, কনিজ, চাঁদাবাইজি, ইমামি বাইজি, গহরজান, মালেকজান প্রমুখগণ সেইসব আসরে অংশগ্রহণ করতেন । রাজপরিবার থেকে শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার সেই ধারা প্রবাহিত হয়ে ক্রমে অভিজাত শ্রেণিরও আগ্রহ ও চর্চায় উৎসাহ সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায় । মূলত রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট  শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চা রাজন্যোত্তর পর্যায়ে  গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কালেও প্রসারিত হয় ।

 একদিকে সাধারণ জনগণের লোকনৃত্যের নিজস্ব ধারা, অন্যদিকে রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতায় শাস্ত্রীয় নৃত্য চর্চার ধারা পাশাপাশি ত্রিপুরায় প্রবাহিত হলেও ভারতভুক্তির পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৭৪ বছর কেটে গেলেও রাজ্যের শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার প্রসার তেমনটা ঘটেনি । কি কারণে শাস্ত্রীয় নৃত্য চর্চা প্রসারের ক্ষেত্রে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে সেই বিষয়গুলি তুলে ধরা হচ্ছে ।

প্রথমত, শাস্ত্রীয় নৃত্য চর্চাকে এ রাজ্যে এখনো অভিজাতদের চর্চার বিষয় বলে মনে করা হয় । এছাড়া সাধারণ দরিদ্র ও মধ্যবিত্তরাই রাজ্যের প্রধান জনগোষ্ঠী । ফলে আর্থিক দৈন্যও এই নৃত্য চর্চার প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে ।

দ্বিতীয়ত, এই রাজ্যের জনগণের এক বৃহৎ অংশই নানা অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করেন । জীবন জীবিকার জন্য লড়াই করতে করতে তাঁরা শাস্ত্রীয়নৃত্যের মতো কলার প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন না । সংগ্রামী জীবনে পারিবারিক দায় দায়িত্ব সামলানোই তাঁদের প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় । ফলে নৃত্যচর্চার জন্য বাড়তি সময় দেবার মতো সুযোগ থাকে না । 

তৃতীয়ত, যেহেতু রাজ্যের মানুষের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবিকার নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা । এই নৃত্য চর্চার মাধ্যমে যদি জীবিকা উপার্জনের সুযোগ না থাকে তাহলে কেউই এই নৃত্যচর্চার প্রতি আকৃষ্ট হবেন না । ত্রিপুরারাজ্যে বহু গুণী নৃত্যশিল্পী রয়েছেন যাঁরা রাজ্যের ও রাজ্যের বাইরে থেকে নৃত্যচর্চায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার পর কোনরকম সরকারি চাকরি পাননি । ফলে চাকুরির প্রতিযোগিতার বাজারে নৃত্যশিল্পীরা মার খেয়ে যান । জীবনযুদ্ধে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তাঁর অধীত বিদ্যাকে বিসর্জন দিয়ে অন্ন জোগাড়ের ধান্দায় নেমে পড়েন ।

চতুর্থত, রাজ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নের ফলেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় । যে কোন রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থা সেখানকার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাকে প্রভাবিত করে থাকে । রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথেই শিল্পীর নৃত্য চর্চার স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও বাধার সৃষ্টি হয় । কোন কারণে যদি কোন শিল্পী শাসক গোষ্ঠীর বিরাগভাজন হন তাহলে তাঁকে তার শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে বেগ পেতে হয় । দেখা গেছে, চাকুরির নির্বাচনের ক্ষেত্রেও শিল্পীর রাজনৈতিক পরিচিতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় । সমাজে কতটা তাঁর অবদান রয়েছে সে বিষয়ে মূল্যায়ন করা হয় না । দেখা যায়, কোন শিল্পী চাকরি পাবার পর তার শিল্পসত্তাকে বিসর্জন দিয়ে জীবিকা নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর ঘর সংসারে মেতে থাকেন । শিল্পচর্চার প্রতি আর আগ্রহী হন না ।

 পঞ্চমত, শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার সঙ্গে যারা জড়িত এবং প্রতিভা সম্পন্ন তাদের বৃহত্তর ও পরিসরে পরিচিত করানোর কোন সুযোগ সরকারি ভাবে থাকে না । ফলে রাজ্যের দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী কোন পরিবারের সন্তানের কাছে শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চা 'ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় / পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি'র মতো। খেলাধূলা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিভাদের স্বীকৃতি ও উন্নয়নের জন্য যে ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক অনুদান থাকে নৃত্যশিল্পীর ক্ষেত্রে তার ছিটেফোঁটাও পরিলক্ষিত হয় না ।

 ষষ্ঠত, ত্রিপুরা রাজ্যের বিদ্যালয়ের শিক্ষা পাঠ্যক্রমে একাদশ-দ্বাদশ স্তরে ২০২০ সালে সংগীত নৃত্যশিক্ষাকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা  হলেও নৃত্যের কোন শিক্ষা পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি । এখানে শুধুমাত্র কন্ঠসঙ্গীত শিক্ষাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয় ।

 সপ্তমত, ত্রিপুরায় নৃত্য শিক্ষার অগ্রনী প্রতিষ্ঠান ত্রিপুরা মিউজিক কলেজের শিক্ষা পাঠ্যক্রমেও সবগুলো শাস্ত্রীয় নৃত্য শিক্ষণের ব্যবস্থা নেই । শুধুমাত্র কথক, ভরতনাট্যম ও মনিপুরী নৃত্যশিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে । তাও কেবলমাত্র স্নাতক স্তরে । আর স্নাতকোত্তর স্তরে শুধুমাত্র কথক নৃত্য ২০১১ সাল থেকে শুরু হয়েছে ।

অষ্টমত, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়ও অনেক সময় শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার সুযোগকে কাটছাঁট করা হয়ে থাকে । উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করতে পারি যে, এক সময়ে রাজ্যের ব্লক মহকুমাস্তরে ও রাজ্যস্তরে যুব উৎসবে শাস্ত্রীয় নৃত্যে অংশগ্রহণ করার সুযোগ ছিল । প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শ্রেষ্ঠ শিল্পী জাতীয় স্তরে অংশগ্রহণের সুযোগ পেত । কিন্তু বর্তমানে যুব উৎসবে শাস্ত্রীয় নৃত্যে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই । শিল্পীর যোগদানের অপ্রতুলতার কারণ দেখিয়ে বিষয়টাকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে ।

 নবমত, রাজ্যের সাংস্কৃতিক চর্চার ঐতিহ্যগত পরম্পরা ও বাতাবরণ রয়েছে । রাজ্যে বহু ইলেকট্রনিক্স চ্যানেল রয়েছে যেগুলোতে বিনোদনমূলক নানা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয় । কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক এই চ্যানেলগুলো কোনরকম শাস্ত্রীয় নৃত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেন না । এছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মঞ্চে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মন্ত্রী মহোদয়গণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানকে আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে নৃত্যের আয়োজন করা হয়ে থাকে । কিন্তু সেখানেও শাস্ত্রীয় নৃত্য ব্রাত্য থেকে যায় ।

এতসব প্রতিকূলতার মধ্যে রাজ্যের শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রসার ঘটাতে গেলে বিশেষ সার্ভের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে সরকারিভাবে ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার এই সাপেক্ষে প্রধানত নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গুলি গ্রহণ করা যেতে পারে —

এক • সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়  গ্রামস্তর পর্যন্ত নৃত্যচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে । ক্ষেত্রপ্রচার দপ্তরের মাধ্যমে গ্রামস্তরে ডকুমেন্টারি ফিল্ম প্রদর্শনের করে সাধারণ জনগণকে আগ্রহী করে তোলা যেতে পারে ।

দুই • সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে গ্রামেগঞ্জে শাস্ত্রীয় নৃত্যশিক্ষার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলতে হবে । সেখানে উপযুক্ত প্রশিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় নৃত্য শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে । পক্ষান্তরে এজাতীয় পদক্ষেপকে বিদ্যালয় শিক্ষার সঙ্গেও জুড়ে দেওয়া যায় ।

তিন • উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন বেকার নৃত্যশিল্পীদের চাকুরীতে নিয়োগের মাধ্যমে তাদের জীবন জীবিকার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে । হলে তারা নিশ্চিন্তে শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রসারে আত্মনিয়োগ করতে পারবে ।

চার • বিদ্যালয়ে ও ক্লাব স্তরে সরকারি ব্যয়ে নৃত্যশিক্ষকের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রশিক্ষণ শিবির করার ব্যবস্থা করতে হবে । প্রশিক্ষণান্তে শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিল্পপ্রদর্শনের সুযোগ পাবে ।

পাঁচ • মেধা-অন্বেষণ প্রকল্পের মাধ্যমে মেধাবী শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী বাছাই করে তাদের নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা সহ আর্থিক বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে ।

ছয় • রাজ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরে শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে । ফলে শাস্ত্রীয় নৃত্যের নতুন নতুন শিল্পী উঠে আসবে ।

 সাত • রাজ্যের বাইরে থেকে বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যের দলকে রাজ্যে আমন্ত্রণ করে এনে তাদের রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নৃত্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে । পাশাপাশি রাজ্যের  শাস্ত্রীয় নৃত্যের শিল্পীকেও রাজ্যের বাইরে নৃত্যশৈলী প্রদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে ।

আট • চাকুরিক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক রং যাচাইয়ের বিষয়টিকে প্রাধান্য না দিয়ে শিল্পীর শিল্পসত্তার মূল্যায়ন করতে হবে । পাশাপাশি দুস্থ ও মেধাবী শিল্পীকে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতে হবে ।

এক কথায়, সরকারিস্তরে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিলে রাজ্যের শাস্ত্রীয় নৃত্যকে আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন নেওয়ার যোগ্য করে তোলা যাবে নিশ্চিতই ।

Monday, April 17, 2023

'পুঙ্গির' পুত- উৎস

'পুঙ্গির পুত'-র উৎস

বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের বার্মিজ ভাষায় 'ফুঙ্গি' বলা হয় । অনুশাসন মান্যকারী সেই সন্ন্যাসী যদি পুত্রসন্তানের জন্মদাতা হন তবে সেই অবৈধ সন্তানকে ' ফুঙ্গির পুত'> পুঙ্গির পুত বলা হয় ।  চট্টগ্রামী বাংলায় 'প'কে 'ফ' উচ্চারণ করা হয় । পূর্ববঙ্গের অন্যত্র 'ফ' বর্ণটি অল্পপ্রাণতা পেয়ে 'প' উচ্চারিত হয় ।এই অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী আরাকান বংশোদ্ভুত মগ বা বা মার্মা জনগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে । তাদের একটা অংশ দক্ষিণ ত্রিপুরা ও ত্রিপুরার অন্যত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন ।