Showing posts with label অনুভব. Show all posts
Showing posts with label অনুভব. Show all posts

Monday, August 26, 2024

ধরগো তোরা, হাতে হাতে ধরো...

ধরগো তোরা, হাতে হাতে ধরগো...

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

হড়পা বানের নাম শুনেছিলাম। এবার চাক্ষুষ করলাম আমরা । দেখলাম গোটা রাজ্য কিভাবে তছনচ হয়ে যায় তার ভয়াল তান্ডবে । প্রকৃতির এই উদ্দাম মত্ততায় আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশও উপদ্রুত । কাঁটাতারের ওপার থেকেও ভেসে এসেছে হাহাকার । আমরা জল আর পানিতে ভাগ করি । কিন্তু তার তো কোনো সীমানা নেই । খেপে গেলে সে সসাগরার দখল নিতে চায় । আমরা প্রকৃতিকে চিনি না । প্রকৃতির রুদ্ররোষের খবর জানি না । যে প্রকৃতি আমাদের সবকিছু দেন তাঁকে আমরা ধ্বংস করি । তাঁর বুক টেনে চিরে ফেলি । প্রকৃতি সহ্য করতে করতে একদিন ফুঁসে ওঠেন ক্রোধে । প্রতিশোধের হাতিয়ার নামিয়ে দেন জনপদে । 

পৃথিবীতে যখন মানবতার সংকট দেখা দেয়, যখন মানুষের লোভ গগনচুম্বী হয়ে ওঠে, মনুষ্যত্ব বিপন্ন হয় তখনই প্রকৃতি জেগে ওঠে মানুষকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দেন । মানষের ঘুমিয়ে পড়া বিবেককে জাগানোর জন্য প্রকৃতি মাঝে মাঝে তার আয়ুধ প্রয়োগ করেন । আর তাতে মানুষের বিবেক জাগ্রত হয় । প্রতিবেশিকে আপন মনে হয় । দুঃখে, দুর্দৈবে, দুর্দিনে পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ লাগাতে ইচ্ছে হয় । একে অন্যকে সাহস জাগাতে ইচ্ছা হয় । প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়াতে সাধ জাগে । আবার এসময়ে আসল বান্ধবকেও চেনায় । পরিচয় হয় সৎ প্রিয়জনের সঙ্গে । এবারের বন্যায় প্রকৃতি আমাদের সে পাঠ দিয়ে গেছেন । কিভাবে আর্ত মানুষের পাশে মানুষই দাঁড়িয়ে পড়ে তা আমরা দেখেছি । আর্ত মানুষ এবারে দেখেছেন সাংসদ না থাকুক সজ্জন, সৎ জন, প্রিয়জন তাঁদের পাশে আছেন । একটা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় থেকে আমরা অন্যপ্রদেশের দুর্যোগে আমাদের সাধ্যমতো সম্বল নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছি । আর আমাদের দুর্দিনে সেই প্রিয় প্রতিবেশিদের দেখলাম হিমশীতল প্রতিক্রিয়ায়, মধ্যরাতের নীরবতায় । আবার এমন প্রতিবেশীও দেখলাম যারা অকারণ অন্ধ অজ্ঞ দোষারোপ করে শুধু চিলচিৎকার করে গেছে এই দুঃসময়ে । এরা নিজেদের দুর্দিনেও ত্রাতা হবার যোগ্যতা অর্জন করেনি । একদিন বোধ হবে এদের । এরা নিজের দেশের বিপন্নদের সেবায়ও লাগেনি । শুধু কল্পিত শত্রুর বিরুদ্ধে ফাঁকা আওয়াজ করে গেছে । কারো প্রতি ক্ষোভ নেই আমাদের ।  বরং এইসময়ে আমরা নিজেরা পরস্পর কাছাকাছি হওয়ার সুযোগ পেয়েছি । নিজেরা নিজেদের চিনতে পেরেছি । শুধু একরাশ নীরব অভিমান আর ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়ে আমরা আবার আমাদের সংসার গড়ব ।

জল কমে গেছে অনেকটা। পলিবিছানো প্রলয়ভূমির উপর নিথর হয়ে থাকা বাস্তুভূমিতে কপর্দকহীন অশ্রুসম্বল বন্যার্তরা ফিরছেন । যেন কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত বিষাদভূখন্ডে ফিরছে সর্বহারা ভূমিপুত্রকন্যারা । এবারে সংকট দেখা দেবে খাদ্য ও পানীয় জলের । ঘরে রাখা খাদ্যশস্যসহ সব ফসল মাঠে মারা গেছে । কৃষকের ঘরের আয়ের উৎস শেষ । অপেক্ষা করতে হবে নতুন ফসল আসা পর্যন্ত । 

এই আর্তসময়ে সরকারের নিকট আমার বিনীত আবেদন, আগামী ফসল ঘরে ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি আর্ত পরিবারে বিনামূল্যে রেশনসামগ্রী বিলির ব্যবস্থা করা হোক । ধান ও অন্যান্য শস্যবীজ ও সার-ঔষধের ব্যবস্থা করা হোক বিনামূল্যে। ততদিন পর্যন্ত হাতখরচা হিসেবে নিয়মিত কিছু আর্থিক অনুদান দেওয়া হোক । শিশু, বৃদ্ধ, অসহায় ও অসুস্থদের তালিকাভুক্ত করে তাদের যথাযথ পরিষেবার আওতায় আনা হোক । একা সরকারের পক্ষে সবদিক রক্ষা করা সম্ভব নয় । হৃদয়বানগণ ও সামাজিক সংগঠনের সদস্যরাও আর কটাদিন পাশে থাকুন । বিশ্বাস আমরা আবার শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াবই ।

শিল্পী তাঁর কল্পনা, মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে তাঁর শিল্পকে নান্দনিক করে তোলেন । তাঁর সৃজন বিপর্যস্ত হলে ক্ষুব্ধ হন তিনি । পরিত্যক্ত শিল্পের উপর আবার বোলান তাঁর চারুতুলি । প্রকৃতিও তেমনি । তাঁর এই বিধ্বংসী তান্ডবের অন্তরালেই রয়েছে সৃজনের বীজ । যা তিনি নিয়েছেন দ্বিগুণ করে ফিরিয়ে দেবেন আমাদের । কারণ আমরা প্রকৃতির সন্তান । তিনি শুধু শাসন নয় । সোহাগও আমাদের করবেন ।

Thursday, November 17, 2022

সংকীর্তন

যেথায় আছে সবার অধম দীনের হতে দীন/ সেইখানেতে চরণ তোমার রাজে' – আপনি অরূপের সন্ধান পেয়েছেন নিশ্চিত । কীর্তনের আসর যে শরীর-মন-আত্মাকে একবিন্দুতে নিয়ে সে অনুভব মহার্ঘ । গাঁয়ের পরিশ্রমী মানুষজনের  কীর্তনের আসরের তন্ময়তা ধ‍্যানেরই সহজিয়া রূপ । দূর অতীতের কাহ্নপা-চন্ডিদাস-ভারতচন্দ্র-রামপ্রসাদ-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল যেন একধারায় এসে মেশে এই আসরে । Soumit Basu সৌমিত বসু তার সর্বাধুনিক সংযোজন । ভালো থাকবেন ।

Tuesday, November 8, 2022

অভিরামের দ্বীপচালান

অভিরামের দ্বীপচালান

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আমি একজন দৃঢ়চেতা স্বাধীনতা সংগ্রামীর সন্তান । যিনি তাঁর বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের বিনিময়ে কোনো সাম্মানিক কোনো স্বীকৃতি গ্রহণ করেননি । তাঁর আদর্শেই আমি বেড়ে উঠেছি । প্রতিবাদী মানসিকতা নিয়েই চলি । ফলে এই স্বাধীন দেশের শাসক গোষ্ঠীর রাজনীতির সঙ্গে কিছুতেই নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারিনি । সারাটা জীবন ভুগতে হয়েছে তার জন‍্যে ।   কর্মজীবনে প্রাপ‍্য সুযোগ থেকে । দোরগোড়ায় এসে ফিরে গেছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সম্মান । সে অনেক কথা ।

স্বাধীনতা যুদ্ধে যে দল মুখ‍্য ভূমিকা গ্রহণ করার ইতিহাস তৈরি করেছে । ক্ষমতায় এসে তারা বিরুদ্ধ মতাদর্শের মানুষগুলোকে পদে পদে লাঞ্ছিত করেছেন । বিপ্লবীদের অনেকেই স্বাধীনোত্তরপর্বে রাষ্ট্রশক্তির রক্তচক্ষুর সম্মুখীন হয়েছেন বার বার । তাঁদের অতীতের বৈপ্লবিক কর্মকান্ড, তাঁদের অবদান বেমালুম ভুলে গেছে স্বাধীন দেশের কান্ডারীরা । ইংরেজ আমলের চর ও পুলিশ অফিসারেরা একসময় রাষ্ট্রের হাল ধরে ফেলে । পূর্বশত্রুতার সূত্র ধরে বিপ্লবীদের নাজেহাল করতে ছাড়ে না । নানাভাবে নানা দুর্নীতিতে তারা জড়িয়ে পড়ে । চলমান রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে একসময় বিক্ষোভও হয় । গণতান্ত্রিক নিয়মে পরিবর্তনও আসে । বিক্ষুব্ধ দল ক্ষমতায় এসে শাসকেরই রূপ নেয় । নৃশংসতায় পূর্বসূরীদেরকে পেরিয়ে যায় । হয়তো আবারও বদল হয় । পতন ঘটে এক একটি স্বৈরতান্ত্রিক অধ‍্যায়ের । এই বিষয়গুলো ঘুরে ঘুরে আসতে দেখছি এ দেশে, এ রাজ‍্যে ।

পতনের পর প্রতিটি দলই নবীন সন্ন‍্যাসী হয়ে যায় । ভুলে যায় তাদের পূর্ব কীর্তির কথা । চলমান শাসকের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণ হয়ে কুৎসা  করে আর নতুন করে স্বপ্ন দেখায় মানুষকে । চলমান শাসকেরাও পূর্বতন শাসকের কুশাসনের ক‍্যাসেট বাজিয়ে পূর্বের প্রতিশ্রুতি কবরে পাঠিয়ে নতুন ঠাকুমার ঝুলি নিয়ে আসে । সুযোগসন্ধানীরা দলবদল করে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে । দলবদলের কারণে ফেলে আসা সহযোদ্ধাকে ল‍্যাং মারে । দলে যোগ দেওয়ায় পূর্বশত্রুকে গঙ্গাজলে ধুয়ে গলায় জড়িয়ে নেয় । সবগুলো দলই ক্ষমতায় থাকলে বিরুদ্ধ মতাদর্শের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে যায় । সাধারণ মানুষকে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে । নানাভাবে নির্যাতন করে । দুবেলা পার্টি অফিসে হাজিরা না দিলে, মিছিলে না গেলে, তেলের বাটি নিয়ে নেতাদের বাড়ি না ঘুরলে সে নাগরিকদের রক্ষা নেই ।  

সুযোগসন্ধানীরা সুদিনে যে দলের ব‍্যানারবাহক হয় দিন ফুরোলে রাতারাতি অন‍্যদলের ঝান্ডাবাহিনীর সামনের সৈনিক হয় । যে নাগরিক বিরুদ্ধাচরণ করে তার বিরুদ্ধে মানুষ লেলিয়ে দেওয়া হয় । সে নাগরিকের কোনো নিকটাত্মীয় সরকারী চাকুরে হলে তার উপরেও কোপ আসে রাজনীতির । নিরীহ হলেও রেহাই থাকে না তার । আর কোনো সরকারি কর্মচারী অপছন্দের হলে তো তাকে সাতঘাটের জল খাইয়ে দেওয়া হয় । তাকে সাতবার গাড়ি পাল্টানো জায়গায় বদলি করে দেওয়া হয় । অনেকটা পরাধীন ভারতবর্ষের দ্বীপান্তরের মতো । আবার দলীয় সূত্রে নতুন জায়গায়ও তার পরিচিতি পৌঁছে দেওয়া হয় । সেখানেও তার উপর থাকে শ‍্যেনদৃষ্টি । বৃটিশ আমলে পুলিশের নজরে যেমনটা ছিলেন বিপ্লবীরা । অসুস্থ মা-বাবা, সন্তান প্রিয়জন বিচ্ছিন্ন হয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে শেষ হয় যাওয়া ছাড়া , পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়া ছাড়া আর গত‍্যন্তর থাকে না ।

 রাজনীতির এই নোংরামিগুলোর কথা বলে লাভ নেই । নামে রাজনীতি । রাজার নীতি । নীতির রাজা । কিন্তু এটাকে পেশাগতভাবে কব্জা করে নিয়েছে অর্ধশিক্ষিত ও নোংরা মনের মানুষেরা ও তাদের পোঁধরা সুযোগসন্ধানী মানুষেরা । আমার পেশাগত জীবনে আমি পদে পদে এইসব দুর্ভোগ পেরিয়েছি । আমি বলতে পারিনি সন্তানের মুখ চেয়ে । ছেলেদুটোকে আমার দাঁড় করাতেই হবে । আমার রক্ত তো তাদের শরীরে । তারাও চাকরির জন‍্যে নবরত্ন তেল নিয়ে নেতা-মন্ত্রীর দুয়ারে ঘুরতে পারবে না । বলতে পারিনি পরিজনের ভাবনায় । অন্নচিন্তায় । সেই ফিরিস্তি তুলে ধরলে লেখাটা আত্মকথনে ক্লিষ্ট হয়ে যাবে । আর কারো নাম করে তাঁকে বা তাঁদেরকে সমাজে হেয় করা আমার উচিত হবে না । আমার প্রতি বিরাগভাজন হলেও অন‍্যের হয়তো উপকার করেছেন । তাই দুঃখটা অন্তরেই পুষে রাখলাম । কিন্তু কথা হচ্ছে, আমরা দিন দিন অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছি বলে বড়াই করছি । কিন্তু ঈর্ষা, প্রতিহিংসায় আমরা সেই আগের যায়গাতেই রয়ে গেছি । সাধারণ ছাপোষা কর্মজীবীদের নিয়ে আজও সেই নোংরামি সমানে  চলছে ।

Thursday, October 6, 2022

এবারের পুজো

এবারের পুজোর মরসুমে প্রকৃতিও বৈরী । এই উৎসবের  সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু প্রান্তিক মানুষের জীবিকাও । পুজোর তিনদিন সময়ের আয় দিয়েই পুজোর পরেই পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবার স্বপ্ন দেখেছেন । লিখতে গেলে তা বিশাল হয়ে যাবে । এত এত মানুষের শ্রমে ও শিল্পে সৃষ্ট মন্ডপের নান্দনিক আয়োজন । সব মিলিয়েই তো পুজোর আনন্দ মা ! এবারের আনন্দ কি জলে ভেসে যাবে আনন্দময়ী !

গত কবছর ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে যে, পুজোর সময়েতেই যেন আসল বর্ষাটা নামে । আর শারদোৎসবের সমস্ত আয়োজন মাঠে মারা যায় । বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে আমাদের খন্ডের ঋতুচক্র তছনছ হয়ে গেছে । প্রকৃতি ক্রমশ রুদ্রমূর্তি ধারণ করছে । এটা ক্রমশ বাড়বেই । মূলত ভারতীয় কৃষিজীবন এই এবারের পুজো

এবারের পুজো

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

ঋতুচক্র মেনেই অতিবাহিত হত । বর্ষাবিদায়ের কালে শরতের আগমণে প্রকৃতি ক্রমশ শান্ত হয়ে এলেই হত দেবীর বোধনের আয়োজন । মাঠের ফসল তখন পূর্ণগর্ভা । তার দিকে তাকিয়ে আশায় বুক বাঁধে কৃষক । আর এই কৃষকদের ঘিরেই রয়েছে নানা পেশার মানুষ । যাদের জমি নেই, জিরেত নেই । বীজ বোনা আর ফসল তোলার মাঝখানে তাদের কোনো কাজ থাকে না । একটা টানা অভাবের মধ‍্য দিয়ে তাদের দিনাতিপাত করতে হয় । গ্রামীন অর্থনীতিতে এইসময়টা বন্ধ্যা সময় । আর এই সময়টাতেই হয় দেবীর বোধনের আয়োজন । অকালবোধন । মানে অসময়ের বোধন । দুঃসময়ের বোধন । এসময়ে এই অসময়ে সমাজের নানা প্রান্তিক পেশার মানুষকে যুক্ত করে কাজের বিনিময়ে খাদ‍্যের ব‍্যবস্থা করে দেয়া এই বোধনের আর এক উদ্দেশ‍্য । ভূস্বামীর দয়ায় নয় । অনুদানে নয় । কর্মের মাধ‍্যমে দুঃসময়ের রসদ সংগ্রহ করবেন প্রান্তিক মানুষ । শ্রদ্ধার শ্রমলব্ধ আয় তার জীবিকার দানাপানি । কৃষিভিত্তিক আর্থসামাজিক জীবনে এও ছিল দেবীবোধনের অন্তর্রহস‍্য । সেই ধারা আজও চলে আসছে ।
 
কিন্তু ক্রমশ প্রকৃতি  বৈরী হয়ে উঠছে । আমরা প্রকৃতিকে যথেচ্ছ ব‍্যবহার করেছি এতদিন । প্রকৃতিকে আমরা নিংড়ে নিয়েছি শুধু । লুঠ করেছি তার সব সম্পদ । প্রকৃতিকে দিইনি কিছুই। তাই তার এত ক্ষোভ । এত রুদ্ররোষ । কেড়ে নিচ্ছে আমাদের লোভার্জিত সম্পদ । আমাদের হর্ষ, আনন্দ । উৎসব । আর তাতেই দেবীবোধনের এই সময়টা হুমকির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে । প্রকৃতির কাছে আমরা অসহায় । অথচ বছরের এই সময়টার দিকে মুখ চেয়ে অপেক্ষায় কত শত শান্ত শুষ্ক অসহায় মুখ ! পরের চাঁদায় গড়ে তোলা লাখোয়ারি পুজো জলে ভেসে গেলে বারো ইয়ারের কি আর ক্ষতি । কিন্তু এতে যে একদল অসহায় মানুষের রুটিতে টান পড়ে ।তাদের চোখের জলে বানভাসি হয় ।এভাবে চলতে থাকলে আগামীদিনে কি সম্ভব হবে দেবীর অকালবোধন ? শক্তিরূপা,শক্তিময়ীর কাছে আর্জি রাখা ছাড়া আর কোনো গত‍্যন্তর নেই আমাদের ।

Tuesday, August 16, 2022

কয়েকজন চিত্রশিল্পী, আমি ও মৈত্রীসেতু

গতকাল ( ২৭.৭. ২০২২ ) সকাল নটা নাগাদ আগরতলা থেকে ফোন পাই আমার প্রিয়জন রাজ‍্যের বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী ও সঞ্চালক উদয়শংকর ভট্টাচার্যের কাছ থেকে । তিনজন প্রখ‍্যাত চিত্রশিল্পী সাব্রুম আসছেন । সকালের ট্রেনটা মিস হওয়ার তাঁরা বাসে রওনা হয়েছেন । সাব্রুম শহরটা ঘুরে দেখবে । আমি যেন একটু তাঁদের পাশে থাকি । আমার শরীরটা ভালো না থাকায় বেশ কদিন বাড়ি থেকে বেরুচ্ছিলামনা । পায়ের সমস‍্যাটা কমছেনা । তবুও একে তো নাচনী বুড়ি, তার উপরে ঢোলের বাড়ি । বাইরে বেরুনোর প্রস্তাবে আমার ভেতরটা লাফিয়ে উঠল । বার্ধক‍্যে গুণীজনসঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো যাবে । বাসটা কটার মধ‍্যে সাব্রুম পৌঁছুবে আন্দাজ করে আমি ধীরে সুস্থে তৈরি হতে থাকি । আমি উদয়শংকরদাকে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলাম তাঁরা বাস থেকে কোথায় নামবেন তারপর কোথায় অবস্থান করবেন । সাব্রুমের সঙ্গে যাঁদের সামান‍্য যোগাযোগও আছে তাঁরা সবাই জানেন যে, সাব্রুমের শিক্ষক-কর্মচারী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ক্রীড়াবিদ ও মননশীল মানুষজনের মরুদ্যান হল আমাদের অগ্রজপ্রতিম অশোকদার অর্থাৎ অশোক বসাকের চায়ের দোকান । সংক্ষেপে আমরা বলি এবিসিডি । সারাদিন চুটিয়ে আড্ডা দিয়ে  শুধুমাত্র এককাপ চা সেবন করলেও দোকানের মালিকরা বিরক্ত হন না । অশোকদাও মজাদার মানুষ । উদয়শংকরদাকে এই ঠিকানা দিলাম । যথারীতি দশটার সময়ে তাঁরা ওখানে এসে উপস্থিত হলেন এবং আমাকে ফোন করলেন । আমি একটু সময় নিয়ে হালকা খাবার ও ঔষধ খেয়ে নিয়ে তাঁদের সঙ্গে দেখা করলাম । 

তারপর সৌজন‍্যমূলক কিছু কথাবার্তা বলার পর একটা টোটো নিয়ে বেরুলাম সাব্রুম শহর পরিক্রমায় । শহরের লোকনাথ মন্দির থেকে শুরু করে রামঠাকুর মন্দির, দৈত‍্যেশ্বরী কালিবাড়ি ইত‍্যাদি দেখার ফাঁকে ঢুকলাম গার্লস স্কুলে । এই স্কুলে ঢুকলেই সামনে পড়ে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ । এই সাবেক দালানটাই রাজন‍্য আমলে ছিল মহকুমা শাসকের অফিস । এখানেই ছিল বিচারশালা ।বড়ো হাকিম বসতেন । তাঁর মাথার উপর ছিল টানা পাখা । বছর কুড়ি আগেও কার্নিশের উপর পাখার ভারি কাপড় ও দড়ি গুটানো ছিল । ভারতভুক্তির পরেও প্রায় দুদশক এখানে অফিসটি ছিল । যার দরুণ এখনও এই নাতিউচ্চ টিলাভূমি ও জনবসতিটার নাম পুরাতন অফিস টিলা । স্কুলে বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন আমার ছাত্র সুশীল দে । খবর পেয়ে ছুটে এলেন । সবাইকে অতিথির মতো নিয়ে ক‍্যানটিনে বসিয়ে আপ‍্যায়ণ করলেন । সুশীলবাবুর আতিথেয়তায় মুগ্ধ তাঁরা । শিক্ষক হিসাবে আমি গর্বিত । আমাদের তো এটাই প্রাপ্তি ।

কালীমন্দিরটাও বহু প্রাচীন। পাশেই তহশিল কাছারি । রাজন‍্য আমলে এখানে খাজনা আদায় হত । পুণ‍্যাহ হত । আমি চলতে চলতে সংক্ষেপে তাঁদের এই প্রতিষ্ঠান গুলোর ইতিহাস বলে গেলাম । তাঁরা নদীটা দেখতে চাইছিলেন । তাই টোটোকে বাজারের ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা বললাম । নদীটা দেখালাম । ওপারের পার্বত‍্য চট্টগ্রামের রামগড় শহরের বাড়িঘর দেখালাম । তাঁদের দর্শনের মূল আগ্রহ মৈত্রীসেতু । তাই টোটো ঘুরিয়ে ছোটোখিল রোড হয়ে চললাম মৈত্রীসেতুর দিকে । 

সকালের চড়া রোদ থাকায় বেশ গরম লাগছিল । অনেকক্ষণ কথা হল ফেনীনদীর গতিপথ, দুপারের অর্থনৈতিক অবস্থা ইত‍্যাদি নিয়ে । দুদিকেই জোর নির্মানকাজ চলছে । পণ‍্য আদানপ্রদান না হলেও মানুষজন আসাযাওয়ার কাজ একদুমাসের মধ‍্যে শুরু হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে ।

ফিরে আসার সময় আমি স্বগতোক্তি করলাম, দেখবেন আগামী একবছর পরে এই জায়গা জমজমাট হয়ে যাবে । তাঁরা সমস্বরে জবাব দিলেন । জমজমাট না হলেই ভালো । আমাদের আর ভিড়ঘিঞ্জি ভালো লাগেনা । আমরা এগুলো ছাড়াতে চাইছি । বোঝা গেল সাব্রুমের সৌম‍্য শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশটা তাঁদের আকৃষ্ট করেছে ।

ফেরার পথে আমার এক ছাত্র বিভাস বসাক তাদের সাংগঠনিক প্রয়োজনে টোটোটার সাহায‍্য চাইছিল । আর কাউকে বোধহয় পাচ্ছিলনা । আমি বিষয়টা বুঝে ড্রাইভারকে বললাম আমাদের সাব্রুম বয়েজ স্কুলের সামনে নামিয়ে দিতে । স্কুল কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা হরি চৌমুহুনীতে হেঁটে চলে যাব । সে যেন এইফাঁকে ওদের কাজটা সেরে ফিরে আসে ।

এরপর সাব্রুম স্কুলে প্রধান শিক্ষক দিলীপচন্দ্র দাস মহোদয়ের কক্ষে কিছুক্ষণ কাটিয়ে কথাবার্তা বলে আমাদের ছাত্র বর্তমানে এই বিদ‍্যালয়ের শিক্ষক রতন চক্রবর্তীসহ ছবি তোলা হল । হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম চুমকি হোটেলের সামনে । মিছিল শেষ হওয়ার পর টোটোটা ফিরে এল । 

সেখান থেকে স্টেশনে যাওয়ার পথে তাঁদের কয়েকমিনিট সময় নষ্ট করে আমার বাসাটা দেখিয়ে নিলাম । আমার ঘরে বসে একটু কথা হল । এতক্ষণ আমি কারো নাম ধাম জেনে নিইনি । এখন আমার আর মনে থাকেনা । তাই ডায়েরিতে লিখে নিলাম । যাঁদের নিবিড় সান্নিধ‍্যে কালকের দিনের প্রথমার্ধ স্বর্গপুরীর নন্দনভ্রমণের অনুভব হল, সেই স্বনামধন‍্য চিত্রশিল্পীরা  হলেন–
১. ড. বিবেকানন্দ মুখোপাধ‍্যায়, অধ‍্যাপক- কল‍্যাণী বিশ্ববিদ‍্যালয় ।
২. দেবজিৎ পাল, শিক্ষক- জাশেদপুর পাবলিক স্কুল, জামশেদপুর, ঝাড়খন্ড ।
৩. বিরাজকুমার পাল, অধ‍্যাপক- রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ‍্যালয় ।

অল্পসময়ের জন‍্যে হলেও তাঁদের সান্নিধ্য আমার সুখস্মৃতি হয়ে থাকবে । খুবই খারাপ লাগছিল আমার বাড়ির সামনে থেকে তাঁদের বিদায় জানাতে গিয়ে । আর কবে দেখা হবে, আদৌ দেখা হবে কিনা জানিনা ‌। ভালো থাকুন, আমার শহরের এই ক্ষণিকের অতিথিরা ।

২৮. ৭. ২০২২.

Friday, August 12, 2022

আমার ননীমামু

এবারের কোলকাতা ভ্রমণ যেমন আনন্দদায়ক হয়েছে তেমনি বিষন্নতায় গ্রস্ত হয়েছি প্রবল । আনন্দের বিষয়টা ব‍্যক্তিগত । 
পাশাপাশি একটা দুঃসংবাদ আমার একার এবং নিজস্ব । এতকিছু নিয়ম মেনে চলার পরও ডায়াবেটিসে আমার পদযুগল বৈরী হয়ে গেছে । পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর 'হাই রিস্ক' বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে । সেইসঙ্গে কিছু ঔষধপত্র ও সাবধান বাণী । আঞ্চলিক প্রবাদে আমরা বলি, চরণে জানে মরণের খবর । গুলি মারো 'হাই রিস্ক' ।

দ্বিতীয় বেদনার জন‍্যে আমি প্রস্তুত ছিলামনা । এটা জানলে পাঠকেরও মন নরম হয়ে যাবে । রাজ‍্যের সাহিত‍্যসংস্কৃতিবিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যাঁরা পরিচিত তাঁরা ড. ননীগোপাল চক্রবর্তীর নাম অবশ‍্যই জানেন । আর এই অধমকে নিয়ে ছিল দক্ষিণ ত্রিপুরা থেকে উঠে আসা মামা-ভাগ্নে জুটি । সাব্রুমের ছোটোখিলের সেকালের সংস্কৃতিমনস্ক দামোদরবাড়ির সন্তান ননী । এ গ্রাম রত্নগর্ভা । এ গ্রামের সন্তান কৃষ্ণধন নাথ । এ গ্রামের সন্তান ড. রঞ্জিত দে প্রমুখ । রাজ‍্যের সাহিত‍্যক্ষেত্রের দিকপাল তাঁরা । আরো অনেকে  অনেকভাবে প্রতিষ্ঠিত । একসময়ের রাজ‍্যের বিখ‍্যাত জাদুকর ডিএন গোপাল এ গ্রামের ভারত আমিনের ছেলে । পরে তাঁরা আগরতলা অভয়নগরে চলে যান । গ্রামের মধ‍্যে প্রত‍্যেকে প্রত‍্যেকের আত্মীয় । সেই সুবাদে ড. ননীগোপাল চক্রবর্তী আর আমি মামা-ভাগ্নে । গ্রামে বলে, ধর্ম কুডুম তুন জর্ম কুডুম বড়ো । আমার চাকরি জীবনের প্রথম দিন থেকেই রঞ্জিতদা ও ননীমামুকে বরিষ্ঠ সতীর্থ হিসাবে পেয়েছি । ৯৩-৯৪ সালের দিকে শিক্ষামন্ত্রী কবি অনিল সরকার সাব্রুম স্কুলে এসে হেডমাস্টাররুমে শরৎচন্দ্রের একটা ছবি দেখে এটি কে এঁকেছেন জানতে চান । তখনই ননীমামুকে সামনে এনে হাজির করা হয় । মামুকে কবি আগে থেকেই চিনতেন । অনিল সরকার সাব্রুম এলে দামোদরবাড়িতে উঠতেন । সেসময়ের তরুণ কমরেডদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন । জহুরি জহর চেনে । কবি ও সংস্কৃতিপ্রেমী অনিল সরকার সেসময়ে বহু গুণীজনকে প্রত‍্যন্ত গ্রাম থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন স্ব স্ব ক্ষেত্রে । তাঁর প্রিয় ননীকে তুলে নিয়ে গেলেন আগরতলায় । রাজ‍্যে সাহিত‍্যসংস্কৃতিক্ষেত্রে মফঃস্বল থেকে উঠে এসে আগরতলায় দাপিয়ে বেড়াতে লাগলেন তিনি । রাজ‍্যের হাতে গোনা কয়েকজন লোকসংস্কৃতি গবেষকের অন‍্যতম তিনি । ইতোমধ‍্যে তাঁর টেলিফিল্ম 'ভাঙন' প্রভূত প্রশংসা কুড়িয়েছে । আঞ্চলিক ভাষায় তাঁর লেখা কবিতা মুখে মুখে দেশের পরিমন্ডল পেরিয়ে বাংলাদেশের আবৃত্তিকারদের কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে । দৈনিক সংবাদের সাহিত‍্যের পাতায় ধারাবাহিক বেরিয়েছে 'চেনা মুখ অচেনা মানুষ' । অসাধারণ গল্পের হাত । বেরিয়েছে গল্পগ্রন্থ 'বসুধা' । অসাধারণ কয়েকটি মঞ্চসফল নাটক লিখেছেন তিনি । ত্রিপুরায় নাট‍্যচর্চায় লোক আঙ্গিকের ব‍্যবহারে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী । আকাশবাণীর জন‍্যে লিখেছেন সিরিজ নাটক । তাঁর নেতৃত্বে আমরা দক্ষিণের প্রান্তিক মহকুমা সাব্রুম থেকে ভারত জনবিজ্ঞান জাঠায় অংশগ্রহণ করেছিলাম চলার পথে প্রতিটি জনপদে তাৎক্ষণিক সৃষ্ট পথনাটক ও গানবাজনায় মাতিয়ে দিয়ে । বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রখ‍্যাত সাংবাদিক অনিল ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে যুগান্তর পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে যুদ্ধের রিপোর্টিং করেছেন এক নম্বর সেক্টর থেকে ।  সেই সুবাদে পরবর্তী সময়ে আগরতলায় গিয়ে দৈনিক সংবাদ, আজকের ফরিয়াদ, আরোহন এবং ত্রিপুরা দর্পণে ডেস্কে কাজ করেছেন । 

মনে পড়ে উচ্চ মাধ‍্যমিকের খাতা কাটার সময় বাংলার শিক্ষকদের তরফে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনে তাঁর ভূমিকা । খাতা কাটার ফাঁকে ফাঁকে প্রত‍্যেকের হাতে হাতে চিরকুট ঘুরে ছড়ার মালা তৈরি । সবশেষে প্রধান পরীক্ষক পর্যন্ত পৌঁছে যেত তা । মফঃস্বল থেকে যে সব পরীক্ষকরা খাতা কাটতে আসতেন তাদের থাকতে দেওয়া হত বিভিন্ন স্কুলের হোস্টেলের ফ্লোরে । চূড়ান্ত অব‍্যবস্থার মধ‍্যে । একবার উমাকান্ত স্কুলের অস্থায়ী শিবিরের পরিবেশের ছবি তুলে মামা-ভাগ্নে মিলে তখনকার ভাবী ভারত পত্রিকার প্রথম পাতায় বিশাল লিড নিউজ করে দিয়েছিলাম । পরদিন সকালে পত্রিকা বেরুনোর সঙ্গে সঙ্গে ত্রিপুরা মধ‍্যশিক্ষা পর্ষদের ভিত কেঁপে উঠেছিল সেদিন । অন‍্যদিকে উদয়পুরের বর্তমান পুরপিতা শীতলচন্দ্র মজুমদারের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল উত্তরপত্র মূল‍্যায়নের সাম্মানিক বৃদ্ধির আন্দোলন । আমরা পত্রিকায় সংবাদ করি । কর্তৃপক্ষ মাথা নোয়ায় সেবার । আরো বহু বহু ভাবনার ফসল বেরিয়েছে আমাদের দুজনের মাথা থেকে সেদিন । আগরতলায় চলে যাওয়ার পরও আমার যোগাযোগ ছিল তাঁর সঙ্গে । আগরতলায় গেলে যত রাত হোক আমার ঠিকানা ছিল তাঁর সরকারি আবাস । কি ছিল না সেখানে ।পুরো খেতকৃষিতে ভরে রেখেছিলেন সামনের উঠোনটা । চাকরির পর জগৎপুরে একটা ছোটো ছিমছাম বাড়ি করেন ।

কোভিডের সময়কাল থেকে আর তাঁর যোগাযোগ রাখা যাচ্ছিল না। অনেক খোঁজখবর করে নাট‍্যজন সুভাষ দাসের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম তিনি ভীষণ অসুস্থ । ছেলে রানা এসে কোলকাতা নিয়ে  গেছে । ফোন নম্বর নিয়ে মাঝে মধ‍্যে কথা বলেছি । মামি ফোন ধরতেন । কুশল সংবাদ জানাতেন । এবারে কোলকাতা যাওয়ার সুযোগে ভাবলাম দেখা করে আসব । সেইভাবে মামির সঙ্গে কথাও বলে নিয়েছি । বাড়ির লোকেশানটাও জেনে নিয়েছি । কিন্তু আমার হঠাৎ অসুস্থতা, ডাক্তার দেখানো, নতুনমা, নতুন কুটুম্বদের আতিথেয়তা সব মিলিয়ে সময় করে উঠতে পারছিলামনা । এর মধ‍্যে গত শুক্রবার রাতে মামি ফোন করলেন । ভাইগনা, আইবা কইছিলা । আইলানা দেহি । কন্ঠে অভিমানের সুর । বুঝতে পেরে প‍রদিন সকালে যাব মন স্থির করলাম  । কিন্তু ছেলের কাজ পড়ে যাওয়ায় দুপুরের খাওয়ার পর রওনা হলাম দমদম ছাতাকলের ঠিকানায় । রানা এসে এগিয়ে নিয়ে গেল । সিঁড়িতে আমার গলা শুনেই অতি কষ্টে দরজার চৌকাঠে চলে এলেন । কথাবার্তায় সেই আগের মতোই উইট আছে । নিজের অসুস্থতা নিয়ে নিয়ে নিজেই মজা করছেন । আমি নির্বিকার চেয়ে দেখছি তাঁর দিকে । কাকে দেখছি আমি ! এই কি অসম্ভব ঈর্ষনীয় সৌন্দর্যের অধিকারী ননী চক্রবর্তী ? চিত্রাঙ্গদা নাটকের অর্জুন ? ডাকসাইটে এনসিসি কমিশনড অফিসার ননীগোপাল চক্রবর্তী? বাংলাসাহিত‍্যের শিক্ষক ননীস‍্যর ? আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে ফ্ল‍্যাশব‍্যাকের ধামাকায় । পা ফুলে আছে হাঁটু অব্দি । স্ট্রোকে মুখটা বেঁকে গেছে । মুখে জড়তা এসে গেছে । অনেকক্ষণ না শুনলে কি বলছেন বোঝা যায়না । তবু আমার শ্রীমান নাতির সঙ্গে মজা করছেন শরীরের কষ্ট ভুলে । মাঝে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন । আমি মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে অতীতের স্বর্ণালী দিনগুলোর কথা টেনে আনন্দ নিতে চাইলাম । রানা বলল, তাঁর বাড়ির প্রতি বড়ো টান । মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়তে চান বাড়ি ফেরার জন‍্যে । আমি আশ্বাস দিই, বাড়ি তো যাবেনই । আগরতলায় এসে আবার নাটক করবেন, লিখবেন । কে জানত, আরো এক বিপন্ন বিস্ময় আমার জন‍্যে অপেক্ষা করছে । কথায় কথায় মামি বললেন তাঁর নিজের কেমো চলছে । ছেলেটার কষ্ট হচ্ছে এই ছোট্ট আবাসে তাঁদের সামলাতে । কিন্ত তাঁর নাকি শরীরের কোনো কষ্ট হচ্ছেনা । মামার জন‍্যে, সন্ততির জন‍্যে তিনি ভাবছেন । আহা ! সর্বংসহা মামি আমার !

একসময় উজ্জ্বল ইতিহাসকে ফেলে আমায় উঠতেই হল আমার সন্তানকে নিয়ে । আমার চোখে দেখা বাস্তবের নায়ক আজ বিধ্বস্ত কিং লিয়রের মতো । এদিকে একপশলা বৃষ্টি আমার হয়ে কেঁদে নিয়েছে । আমি চাইছি আমার ননীমামু-মামি ফিরে আসুন সুস্থ হয়ে ।

২০ জুলাই, ২০২২.

Tuesday, May 17, 2022

মিলন হবে কত দিনে...

মিলন হবে কতদিনে

মেলা ভেঙে গেলে মনটা নরম হয়ে যায় । ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে । কেবল শূন‍্যতা । কেবল ভাঙার শব্দ । ভাঙনের আওয়াজ। মেলার মাঠে স্তুপ হয়ে পড়ে থাকে আবর্জনা । ভাঙা বেড়া বাঁশের খুঁটি । পলিপ‍্যাকের টুকরো । হাজার মানুষের পায়ের চাপে ঘাস উঠে যাওয়া ধূসর মাটি । নিঃসঙ্গ বুদ্ধমন্দিরের নীরব গৈরিক চূড়া । বিধ্বস্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চ । প্রতিটি মেলা শেষে সেই পরিচিত চিত্র। 'হৃদয় খুঁড়ে কে আর বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!'

গত রাতে শেষ হয়েছে সাব্রুমের বৈশাখীমেলা। ত্রিপুরার দক্ষিণ সীমান্তিক শহরের প্রাচীনতম মেলা । বহু মানুষের স্বপ্নের মেলা । প্রতি বছরই বহু মানুষের সমাগম হয় এই মেলায় । এই জেলার মানুষজন ছাড়াও বাইরে থেকে বহু মানুষ আসেন এখানে মেলার দিনগুলোতে । আত্মীয়তার সূত্রে । পরিচয়ের সূত্রে । নাম শুনে । পেশাগত কারণে যাঁরা বাইরে থাকেন তাঁরাও বাড়ি ফেরেন মেলাকে কেন্দ্র করে । বাইরে বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েরা বাপের বাড়িতে নাইওর আসেন মেলা উপলক্ষে । প্রায় প্রতি বাড়িতে কদিন হাট-বাজার একটু বেশি করতে হয় এ কদিন । 'অতিথি দেব ভব' ভাবনায় । 

   গত দুই বছর করোনা মহামারীর কারণে মেলা হয়নি । ঘরবন্দী মানুষ দিন গুনেছেন মুক্তির । প্রকৃতিসৃষ্ট হোক বা মনুষ‍্যসৃষ্ট । মানুষকে বেঁধে রাখতে পারেনা কেউই । মানুষ ভেঙে ফেলে বন্দীত্বের শৃঙ্খল । সামাজিক দূরত্বের কারণে সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষ আবার মিলনের উৎসবে সম্মিলিত হয়েছে এই বৈশাখীমেলাকে কেন্দ্র করে । বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আছড়ে পড়েছে মেলার মাঠে । ঝড়-বাদলে প্রকৃতির পরিবর্তন, রাজ‍্য রাজনীতির পরিবর্তন এই মেলাপাগল মানুষের গায়ে কোনো
আঁচ ফেলতে পারেনি । নির্ঝঞ্ঝাট, নিরুপদ্রব আনন্দের অংশীদার হয়েছেন তাঁরা । মেলার পরিধি এবারে অনেক বিস্তৃত হলেও তিলধারণের জায়গা ছিলনা কোথাও । মেলাকে ঘিরে জনপ্লাবন বয়ে গেছে । এতো এতো মানুষের সমাগম । একটাও অপ্রীতিকর ঘটনার উদাহরণ নেই । এটাই এই মেলার বৈশিষ্ট্য। শান্তি, সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলা সাব্রুমের চিরন্তন ঐতিহ‍্য । যার জন‍্যে সাব্রুমবাসী গর্ব করে । আশির দাঙ্গার বীভৎসতা দেখেনি এ মাটি । ঐক‍্য ও সম্প্রীতি সাব্রুমের মুকুটের বৈদুর্যমণি । সদ‍্যসমাপ্ত সেই মেলাতেও সেই ধারা রক্ষিত হয়েছে ।

      তার পরেও মেলা শেষ হয় । বিষাদ নেমে আসে প্রান্তর জুড়ে । ফাঁকা ফাঁকা লাগে কোথায় যেন । ঘরে ফেরা মানুষের পায়ের ধুলো ওড়ে বাতাসে । আকাশেও মেঘ গুড় গুড় করে যেন বিসর্জনের বাজনা বাজায় । ক্লান্ত মানুষ ঘরে ফেরে । ফেরে যার যার সধ‍্যমতো তৈজসপত্র নিয়ে । ফেরে মিলনের বার্তা নিয়ে । প্রিয়জনের হাত ধরে ঘুম জড়ানো চোখে হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকে, আবার 'মিলন হবে কত দিনে...' ।

Sunday, May 8, 2022

রাঙিয়ে দিয়ে যাও

রাঙিয়ে দিয়ে যাও গো

ত্রিপুরার সৃজনক্ষেত্রে আজ অস্থিরতা ৷ অবিশ্বাসের অশনিনির্ঘোষ ৷এই বিষবৃক্ষের বীজ অনেক আগেই পোঁতা হয়েছিল ৷ আজ সে গাছে ফল ধরেছে ৷ তার বিষক্রিয়ায় আজ আমরা সবাই লক্ষীন্দর ৷ ত্রিপুরা রাজ্যে আমরা যারা সুন্দরের আরাধনাকে জীবনের আর দশটা নিজস্ব কর্মের সঙ্গে জুড়ে নিয়েছি তারা কেউই ব্যক্তিগত লাভালাভের মোহে সেটা করছিনা ৷ কর্মক্ষেত্রে পরিচিতির পদমর্যাদার স্তরবিন্যাস থাকলেও সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে সে ব্যবধান থাকেনা ৷ সেখানে সবাই একে অন্যের সতীর্থের মতো একাত্মতা অনুভব করি ৷ আমরা জানি আমাদের এই প্রান্তিক ভুবনের সৃজন বৃহত্তর বঙ্গসংস্কৃতির অঙ্গনে স্থায়ী দাগ রাখার মতো সৃষ্টি এখনও করে উঠতে পারিনি ৷ কিন্তু আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস রয়েছে স্থান নেবার জন্যে ৷ সেকারণেই আমরা একে অন্যের সৃষ্টিকে তুলে ধরার প্রয়াসী হই ৷ এভাবেই ত্রিপুরার প্রত্যন্ত প্রান্ত থেকেও আজ উঠে এসেছেন সৃজনকর্মীরা ৷ সমৃদ্ধ হয়েছে আমাদের দীন আঙিনা ৷ কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো উদ্যোগ নিলে শরিক হবার বা পাশে দাঁড়াবার সুযোগ নিই ৷ কিন্তু আমরা এও লক্ষ্য করেছি, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো উদ্যোগ নিলে অন্য আর একদল সেটাকে পাশ কেটে যান ৷ অনুষ্ঠানের ধারে কাছে থাকেননা কিন্তু বাইরে থেকে শলা নাড়েন ৷ উপযাচক হয়ে আগত অতিথিদের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠেন ৷ উদ্যোক্তাদের নির্ধারিত পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটান ৷ বাংলাদেশ থেকে আগত অতিথি যেমন এখানে নৈশভোজের আসরে লাঞ্ছিত হয়েছেন তেমনি আমাদের রাজ্যের প্রিয় কবিদের বিরুদ্ধে ওদেশের কেউ সোস্যাল মিডিয়ায় বিশ্রী স্ট্যাটাস দেয় তখন এরাজ্যেরই কোনো সম্মানিত ব্যক্তিত্ব মুহূর্তে সেই স্ট্যাটাসকে ছড়িয়ে দিয়ে সেই নোংরামিকে উসকানি দেন ৷ আর নিজেদের মধ্যে ফেসবুকে ল্যাং মারামারি, কাউকে ছাগদুগ্ধ সেবনের পরামর্শ, কারো ব্যক্তিগত বিষয় উন্মোচন এসবতো আকছারই ঘটেছে ৷ যাঁর অনুষ্ঠান সম্পর্কে কোনো অতিথি ব্যক্তিত্ব ফিরে গিয়ে বিষোদ্গার করেন, তাঁর পাশে কেউ প্রতিবাদ করার পর দেখা যায় কোনো এক উজ্জ্বল ভোরে দেখা যায় সাপে নেউলে একসাথে সেলফিশোভন হাসি বিতরণ করেন ৷ এও এক আজব আচার ৷ ফারাকটা হলো একসময়ে অঘটনগুলোর কর্তারা স্বনামেই কাজগুলো করেছেন ৷ আর আর আজকে মুখটাকে 'চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা' করে পরিচিতিকে অর্ধনারীশ্বর করে বেদনাদায়ক ঘটনাগুলো করছেন ৷ এখানে আমি কারু সাহসের বা ভীরুতার তুলনা করছিনা ৷ পুরীষ উভয়েই ঘাঁটছেন ৷ কেউ কেউ কানকথায়ও প্রিয়জনকে ভুল বুঝছেন ৷ বেদনাহত হচ্ছি প্রিয়জনের লাঞ্ছনায়, মানসিক যন্ত্রণায় ৷ 
 অবসান ঘটানো যায়না কী এই কন্টকাকীর্ণ পরিবেশের ৷ এই অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্বের ৷ আসুন না, তরুণ কিংবা বরিষ্ঠজনেরা ৷ বসুন না সামনাসামনি ৷ রাগ অভিমান ঝেড়ে ফেলে এই কিরাতভূমির সৃজনকে সম্মিলিতভাবে তুলে ধরি বৃহতের আঙিনায় ৷ জীবনের যে সিঁড়িতে এসে পৌঁছেছি ৷ যে কোনদিনই পুষ্পস্তবক আমার জন্যে খুঁজে রাখতে হতে পারে ৷ আসুন না এই ভূমি আর তার প্রকৃতি ও মানুষকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিই ৷ সেই বিরাটপুরুষের জন্মদিনে এই বোধটাই ছড়িয়ে দিই সকল প্রাণে ৷

Tuesday, October 19, 2021

ঘরে ঘরে ডাক পাঠাল

ঘরে ঘরে ডাক পাঠালো......
******************************
মাটির প্রদীপের শিখা মাটির বুকে তির তির করে জ্বলতে থাকুক কিংবা অট্টালিকার কার্নিশে কার্নিশে সমবেত বৃন্দশিখায় মেতে উঠুক তাদের সম্মিলিত কুচকাওয়াজ এই ধরণীকে মাতিয়ে তোলার জন্যেই নিবেদিত ৷ ভুবনপুরের অন্ধকার দূর করার জন্যেই নিবেদিত প্রাণ নিভৃতে তৈলাধারে সংরক্ষিত রসদকে পাথেয় করে আলোকবন্দনায় রত ৷ যে রাতকীটসমূহ তাদের পক্ষবিধূননের মাধ্যমে বাধার সৃষ্টি করে আলোকযাত্রার সুরম্য উপাসনার, তার কোনো প্রতিবাদ করে না আলোকদল ৷ আজ যে আলোকোৎসবের ক্ষণ ৷ আজ শুধু আলোদান আর আলোকিত হওয়ারই ব্রতক্ষণ ৷ সমবেত আলোবিতরণে নিজেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে আলোপ্রদীপ ৷ অপরকলঙ্ক বিকশিত করা  আজ আলোকাভিসারীর অভীষ্ট নয় ৷ তিমিরনিশার কলঙ্ক ঘুচানোর, আলোকস্নানে স্নিগ্ধ করার সপ্রদীপ মহড়়া এরাতের লক্ষ্য ৷ অন্তহীন অন্ধকার পথযাত্রীর হাতে আলোকবর্তিকা তুলে দেওয়ার মাঝে পবিত্র হওয়ার যে কুম্ভস্নান সেই স্নানে সিক্ত হয়ে দূরীভূত হয় অন্তরের তমসা ৷ সেই মহাহোমের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশীদার হলেও এক পরম তৃপ্তি পরমানন্দ ৷ আলোর দীপালিকা সেই চিরানন্দের বার্তাবাহক ৷ পবিত্র স্নাতক ৷ আসুন আলোকস্নাত হই অফুরন্ত আলোকুম্ভে ৷

Tuesday, September 24, 2019

ভেঙে মোর ঘরের চাবি

গতকাল সন্ধ্যায় আগরতলা চেকপোস্টের সর্বশেষ বাধা অতিক্রম করে যখন বাইরে এসে দাঁড়ালেন বাংলাদেশের সম্মাননীয় অতিথিবর্গ তখন আপনমনেই বলে উঠলেন  এই সময়ের শক্তিমান কথাকার, জলজীবনের নিবিড় উন্মোচক শ্রদ্ধেয় হরিশংকর জলদাস , 'ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে' ৷ ভাবছিলাম, হঠাৎ করেই কী এই রবীন্দ্রসূক্ত উচ্চারিত হল তাঁর ওষ্ঠদ্বয়ে ? স্বীয় ভূখন্ড পেরিয়ে এসে আর এক ভূমিতে চরণচিহ্ন দিয়েই তিনি যেন অনুভব করলেন বৃহতের আহ্বান ৷ আবহমানকাল ধরে  প্রবাহিত যে রক্তধারা, যে সংস্কৃতির স্রোতস্বী পুরুষানুক্রমে তিনি বহন করে চলেছেন তারই প্রতিফলন যেন এই অমোঘগোধূলির মায়াঅন্ধকারে এই ভূমিভাগেও চিরবিচ্ছুরণ ঘটছে ৷ এখানেই নিজেকে হৃদয় উজাড় করে মেলে ধরা যায় ৷ এখানে তাঁর অন্তর্গত ভদ্রাসন থেকে বেরিয়ে এসে বৃহদালয়ে প্রবেশের কাঙ্ক্ষার তীব্র আর্তি উৎসারিত ৷ মানুষের জীবনের প্রতিমুহূর্তের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে, প্রতিপলের  সুখ আহ্লাদের সঙ্গে ও তার বিপরীতে মানবিতার চরম অসম্মানের দগ্ধক্ষণের সঙ্গে  নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থেকে সাহিত্য ও সংস্কৃতির  বিশাল ভুবনের মকরন্দের আস্বাদটি যাঁরা নেন তাঁদের কাছে আপননিলয়টি অনেক পেছনে পড়ে থাকে ৷ এক তীব্র যন্ত্রণা থাকে অসীমের মহালয়ের সঙ্গে মিলনের ৷ আরো আরো বড়ো জগৎটার সঙ্গে মিলিত হবার ৷ একজন জীবনসন্ধানী নিজেকে ভেঙে আসার আকুতি আজীবন বয়ে চলেন ৷ একজীবনভর খুঁজে ফেরেন সেই সত্যপিরকে যিনি ক্ষুদ্রকায় প্রায়ান্ধকার অলিন্দ থেকে তাঁকে বিশ্বপ্রাসাদের বিরাট আঙিনায় পোঁছে দিতে পারেন ৷ আর সেই মধুঅঙ্গনের সঙ্গে বহুপরিচিত 'মোর ঘরের' সাথে কোনো মিল থাকেনা ৷ সেখানেই তো জীবনের আসল আনন্দযজ্ঞ ৷ অকৃত্রিম প্রতিবেশ ৷ জীবনসন্ধানী সে পথ দিয়েই পায়ে পায়ে এগিয়ে যান ৷ তার জন্যে কম্পাস সেই অন্তর্পুরুষ ৷ যিনি পারেন ঘরছাড়া করাতে প্রতিটি সৃজনকর্মীকে ৷

সেপ্টেম্বর একুশ, দুহাজার আঠারো

Wednesday, August 1, 2018

নিজের কথা

অনেকদিন পরে যেন ঘরে ফিরলাম বিধ্বস্ত সৈনিকের মতো । আসলে কী ফিরলাম ঘরে ? দু হাজার আটে পদোন্নতির ফলে সাব্রুম দ্বাদশ শ্রেণি বিদ্যালয়ের উঁচু ক্লাসে পড়ানোর পাঠ চুকিয়ে গিয়েছিলাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সর্দারি করতে । ভাগ্যের প্রথমটা আশাহত হয়েছিলাম । পরে জেদ চেপে বসে , কিছু করে দেখাতে হবে। প্রত্যন্ত মিশ্র জনবসতি এলাকায় জয়কুমার রোয়াজা পাড়া স্কুলে ঢুকেই হাত দিলাম কাজে ।সকল সহকর্মীর মধ্যে নিয়মানুবর্তিতা আনা দরকার । নিজেকে দিয়েই শুরু হোক । দুর্গম এলাকায় সময়মতো গাড়ির অভাবে স্কুলে পৌঁছাতে কষ্ট হতো । উপায়ান্তর না দেখে জিপিএফ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা তুলে একটা লাল বাইক কিনলাম । এই লালুকে নিয়ে স্কুলসহ হাজারো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লাম । পর পর আই এস হিসেবে যাঁদের পেয়েছি রণজিত মজুমদার , অর্জুন শর্মা , সমরেন্দ্রনাথ দাস এবং বর্তমানের সঞ্জিত মালাকার সবাই আমার অনুজপ্রতিম । স্কুলের উন্নয়নে যখন যা দরকার আবদার করেছি কেউ ফেরান নি আমাকে । যার ফলে স্কুলটাকে রাজ্যের মধ্যে একটা জায়গায় দাঁড় করাতে পেরেছি । অনুজ ও সন্তানপ্রতিম কজন তরুণ শিক্ষককে পেয়েছি যাঁরা আমাকে সর্বক্ষণ সাহচর্য দিয়ে গেছেন । টিমওয়ার্ক যে কীভাবে গঠনমূলক চিন্তাকে ফলপ্রসূ করতে পারে তার উদাহরণ ৷ ( 2. 8. 2014. তে লেখা আমার দিনলিপি)

Wednesday, July 11, 2018

মোটেই গল্পও না ৷ বানিয়েও বলা না ৷ এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমিও হয়েছি বার কয়েক ৷ একদিন দুপুরে মিড ডে মিল খাওয়ার একটি মেয়ে এসে বলল, ছার বাই খাইছেনা ৷ আমি যতোটা বুঝতে পারি ওর কথা ৷ বলি, তোমার ভাই না খাইলে খাওয়াইয়া লও ৷ কি হইসে ৷ ভাত দিছে না তারে?  না ছার, হেতে ত' গরে আছে?  আমি রেগে গিয়ে বলেও ফেললাম,  তারে কী বাড়িত গিয়া ভাত খাওয়াইয়া আইতে অইবো নি?  স্কুলে আইছেনা কেরে?  ছোটো মেয়েটি যতটুকু পারে বুঝিয়ে বলল, ভাত খাইছেনা ছার ৷ এলাইগা স্কুলে আইত পারেনা ৷ আমি সম্বিত ফিরে পেলাম ৷ বুঝলাম ব্যাপারটা ৷ একটা পলিপ্যাক যোগাড় করে রান্নার মহিলাদের বলে ওর ভাইয়ের জন্যে ভাত তরকারির ব্যবস্থা করে পাঠালাম ৷ শিক্ষকতার জীবনে এমন বহু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় ৷ অনুভবের হৃদয় লাগে ৷ শুধুমাত্র চাকরি করতে গেলে এইসব যন্ত্রণা চোখে পড়েনা ৷

Saturday, May 20, 2017

বার্তা

আগামীকল্য গোলোকস্থ বাণিজ্যদপ্তরের প্রধানা অধিশ্বরী শ্রীমতী লক্ষ্মীদেবী কমলা তাঁর ধনভান্ডারের সুবর্ণকলস লইয়া সিন্ধুজল ( মর্ত্যের ফেনবতী নদী) হইতে উত্থিত হইবার দিনক্ষণ পূর্বাহ্নেই পঞ্জীকৃত হইয়া আছে ৷ এতোদ্দেশে দেবীর অনুগত ও টঙ্কাপ্রসাদার্থী বণিকগণ পূর্বাহ্নেই নদীতীরবর্তী ভূতপূর্ব চরভূমিতে সাতিশয় আগ্রহে শিবির স্থাপন করিয়া বিগত তৃতীয় দিবসাধিক কাল যাবত তথায় অবস্থান করিতেছেন ৷ অপরদিকে ফেনবতী নদীর দুই তীরবর্তী জনপদের শ্রীশ্রী ব্রহ্মানন্দ গিরি মহারাজের আশীর্বাদধন্য মনুর সন্তানবর্গ এতদিন যে ' ওই পারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস ' এইরূপ বিলাপ করিয়া আক্ষেপ করিতেছিলেন তাহা প্রশমনের সুবর্ণ সুযোগ প্রাপ্তির আশায় পরস্পর বিপরীত তীরবর্তী জনপদে পদার্পন করিয়া চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন করিবার প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছেন ৷এবম্বিধ বার্তা গত সায়াহ্ণে দেবরাজ ইন্দ্রের দপ্তরে পৌঁছাইবামাত্র ইন্দ্রপ্রস্থে সাজ সাজ রব পড়িয়া গিয়াছে ৷ মহারাজ ইন্দ্রদেবের নির্দেশ ইতিমধ্যে অস্ত্রাগার হইতে কয়েক শকট বজ্র নামক মিসাইল রওনা হইয়া গিয়াছে ৷ স্বর্গভূমির জলসম্পদ দপ্তরের প্রধানাধিপতি বরুণদেবকে তলব করিয়া প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়াছেন ইন্দ্রদেব ৷ স্বর্গের গোলোকধাম ও নন্দনকাননকে সমুহ আক্রমন হইতে রক্ষা করার লক্ষে বিদ্যুৎসকলকে ইতিমধ্যে মর্ত্যলোকের কাজকর্ম গুটাইয়া তথায় ব্যুহরচনার কাজে নিয়োজিত করা হইয়াছে ৷ সর্বশেষ প্রাপ্ত সংবাদে জানা গিয়াছে ফেনবতী নদীর উজানে ও উত্তরাংশে বজ্র নিক্ষেপসহিত আগামীদিবসে তাঁহার পার্বন হইলেও রাজাদেশ শিরোধার্য মনে করিয়া বরুণদেব নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁহার কর্মতৎপরতা শুরু করিয়া দিয়াছেন ৷ ফলে আগামী দিবসে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ যারপর নাই ক্ষতির সম্মুখীন হইবেন বলিয়া আশঙ্কা করিতেছেন ৷

Friday, May 19, 2017

শিক্ষক সমাচার


যথার্থ শিক্ষকের পাওয়ার কিছুই থাকে না যদি সমাজ না দেয় ৷ আর সমাজেরও এমন কোন জাবেদা খাতা নেই যেখানে যথার্থ শিক্ষকের প্রতিদিনের ক্ষরণ লিপিবদ্ধ থাকে ৷আজীবন দহনতৃপ্ত শিক্ষক দিনান্তে কিছুই চান না ৷ কামনাহীন প্রস্থানপ্রস্তুতি নেন ৷ আশা করেন শেষশিখায়ও যেন সন্ততিপ্রতিম শিক্ষার্থীর জন্যে উৎসর্গায়ন হয় ৷ আর শেষগমন হয় যেন আজন্ম শিক্ষার্থীর মতো স্বীয় শিক্ষকগণের পদাঙ্কধূলিতে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম ও প্রাণায়ামের মুগ্ধমুদ্রায় ৷

Wednesday, May 10, 2017

অন্য অশোক


গত পরশুদিন সাব্রুম বইমেলায় আয়োজন করা হয়েছিল কবি সম্মেলনের ৷ অনুষ্ঠান শুরুর আগে কবিদের নিয়ে বসেছিলাম আমাদের প্রিয় দাদা অশোক বসাকের দোকানে ৷ ইংরেজীতে ভাষান্তর করে তাঁর দোকানের নামে একটা মুন্ডমাল শব্দ সবাই মজা করে ব্যবহার করে ৷ ABCD অর্থাৎ অশোক বসাকের চায়ের দোকান ৷ আবার তাঁর দোকানের ল্যান্ড ফোন নম্বরও মজাদার সংখ্যার ৷ আমার বড়ো ছেলে রুশো এবং তার কিছু বিটকেল বন্ধু মিলে স্কুলে পড়ার সময় আমাদের ল্যান্ড ফোন থেকে অশোক জ্যেঠুর চারশো বিশ নম্বরে ফোন করে তাঁকে জ্বালাত ৷ আমাদের অশোকদাও বিষয়টা স্পোর্টিংলিই নিতেন ৷ জেনেছিলাম এরকম অনেক দুষ্টু ছেলেই এই মজাটা নিত ৷ তাঁকে খেপাতে না পারায় একসময় তারা রণে ভঙ্গ দেয় ৷ যাই হোক এই ছোট্টো মহকুমা শহরের ধমনীতে এই দোকানটা অক্সিজেন জুগিয়ে চলেছে ৷ ABCDকে সাব্রুমের  কফি হাউস বা মিনি প্রেসক্লাবও বলা যেতে পারে ৷ আমরা টুকটাক লেখালেখি করি, অনেকেই লেখার রসদ এখান থেকেই পেয়ে যাই ৷ আড্ডা দিতে বসে হঠাৎ একটা সংবাদের ক্লু পেয়ে কোনো তরুণ সাংবাদিক বাইক নিয়ে ধাঁই কিরি কিরি বেরিয়ে গেলেন সংবাদশিকারে ৷ তাছাড়া তাঁর দোকানের রসগোল্লা বিখ্যাত ৷ যাঁরা একবার এর স্বাদ একবার পেয়েছেন তাঁকে বার বার টানবে এই রসগোল্লা ৷ কোথায় লাগে বাগবাজার! বাইরে থেকে যাঁরা কার্যকারণে সাব্রুমে এসে এ দোকানের রসগোল্লার স্বাদ নিয়েছেন তিনিই এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ ৷ অনেক বিখ্যাত লোক অশোকদার রসগোল্লার প্রেমে মজেছেন ৷ তার রেকর্ড অশোকদার কাছে আছে ৷ ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডায়ও অশোকদা বিরক্ত হন না ৷ সামনের বারান্দায় একটা টেবিল আর চারটে চেয়ার বরাদ্দ রয়েছে আড্ডারুদের জন্যে ৷ দোকানের সামনে কদিন আগেও মাঝারি সাইজের একটা  আমগাছ ছিল ৷ জাতীয় সড়কের কলেবর বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় গাছটা উন্নয়নের যূপকাষ্ঠে নিবেদিত হয়েছে ৷ ফলে বিকেলের দিকে দোকানটায় পশ্চিমের রোদের আক্রমণ ঘটে ৷ আড্ডাশিল্পীদের গায়ে যাতে রোদ না লাগে তার জন্যে ঢাউস এক সামিয়ানা কাম পর্দা তৈরি করেছেন ৷ বিকেলের দিকে সেটা ছাদের কোণ থেকে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেন ৷ বোঝা যায় তিনি অন্তর থেকে সংস্কৃতিকে লালন করেন ৷ শুনেছি ছাত্রাবস্থায় তিনি ছিলেন স্কুলের এন সি সির ডাকসাইটে ট্রুপ কমান্ডার ৷ তখন এ মহকুমায় একমাত্র হাইস্কুলটি ছিল সাব্রুমেই ৷ কাজেই সে সময়ে তরুণদের লিডার ছিলেন তিনিই ৷
যে কথাটা বলছিলাম ৷ এদিন বিকেলবেলা আকাশটা গোমড়ামুখো থাকায় অনুষ্ঠানটা শুরু হতে দেরি হচ্ছিল ৷ মেলার মাঠে খোলা আকাশের নিচে বসাও যাচ্ছিল না ৷ অন্য মহকুমার কবিরা এসেছেন ৷ কোথায়  নিয়ে বসাই ৷ এতোজনকে নিয়ে দাদার দোকানে বেশিক্ষণ বসে থাকাও ঠিক হবে না ৷ তাঁর ব্যবসার ক্ষতি হবে ৷ আমাদের ফিসফিস আলোচনা হলেও তাঁর কানে গেল ৷ এগিয়ে এসে বললেন,  ছাদে চলে যাও ৷ উঠতে একটু কষ্ট হবে ৷ বলে তিনি নিজেই সবাইকে ছাদে পৌঁছে দিয়ে বসার চেয়ার পেতে দিয়ে তবে নিচে নামলেন ৷ এই হলেন আমাদের অশোকদা ৷ তাঁর দোকানের ছাদে প্রথমবার উঠে সাব্রুম শহরের মেঘমাখা আকাশটা দেখে ভাবছিলাম ব্যবসায়ী দাদা অশোক বসাকের হৃদয়টাও কী এমনই আর্দ্র!