Thursday, March 14, 2019

চালচুলো

        তার পর ভীষণ হাল্কা লাগছিল নিজেকে ৷ আমার আমিটাকে দেখতে পারছিলামনা ৷ কিন্তু আমিটা যে আছে আমার সঙ্গেই সেটা বুঝতে পারছি ৷ আমার কোনো কিছুর জন্যে কোনো ভাবনা করতে হয়না ৷ আমার মাথায় কোনো চুল ছিলনা ৷ টেকো মাথা ছিলাম আমি ৷ চব্বিশ কিংবা পঁচিশের মধ্যেই আমার মাথাটা পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল ৷ তার জন্যে গত ক'বছর ভীষণ দুশ্চিন্তায় কাটাচ্ছিলাম ৷ বাজারে যতোরকম কেশবর্ধক তেল, দাওয়াই, টোটকা ছিল, সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি কিনে লাগাবার ৷ কবিরাজি, হোমিও যেখানে যে সন্ধান পেতাম ছুটে যেতাম ৷ সব গুলে খেয়েছি ৷ কিস্যুটি হয়নি ৷ পাড়ায় আমার কেশসংকটের কথা সবাই জেনে গিয়েছিল ৷ পথে ঘাটে, ঘরোয়া আড্ডায় কিংবা একান্তে আমাকে পেলেই কেশসংক্রান্ত পরামর্শ,খোঁজখবর ইত্যাদি দেওয়ার জন্যে উদগ্রীব হয়ে থাকত ৷ অনেকে আবার ফলো আপও নিত, পেলে কিছু? উপকার হচ্ছে তো ইত্যাদি, ইত্যাদি ৷ আমার চেয়ে ওদেরই মাথাব্যথা যেন বেশি ৷ কেউ কেউ আবার রটিয়ে দিয়েছে, আমার নাকি ম্যানিয়া সব ৷ কেউ কেউ আবার আসল শব্দটা না বলে তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠকে বিশেষ মুদ্রায় সংযুক্ত করে একটু মোচড়় দিয়ে ইঙ্গিত করে আমার নাকি ওইরকম একটা লক্ষণ প্রকট হয়েছে ৷ বাড়িঘরে বিশেষ চিন্তিত হয়ে পড়ে সবাই ৷ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় ৷ ওরাই সব বলে ৷ আমাকে কিছু বলতে দিতে চায়না ৷ আমি কিছু বলতে চাইলেই ধমক মারে ৷ আবার সহানুভূতিও দেখায় কেউ কেউ, তুমি চুপ করে থাকো ৷ আমরা আছি তো ৷ ডাক্তারবাবু দেখছেন তো যত্ন করে ৷ তুমি ভালো হয়ে যাবে ৷ বলে কী ! সুস্থ মানুষটাকে বলে ভালো হয়ে যাবে ! আমার ভীষণ রাগ হতে থাকে ৷ আমি গা ঝাড়া দিয়ে ডাক্তারবাবুকে বলি, ডাক্তারবাবু আমার  চু....ল...৷ ডাক্তারবাবু কী বোঝেন ৷ হেসে ওঠেন ৷ আশ্বাস দেন ৷ আরে চুলোয় যাক ৷ কিস্যু ভেবোনা ৷ কী ভাবব ! ভাবছি, কোথায় চুল ৷ আর কোথায় চুলো ৷ কোথাকার জল কোথায় গড়াচ্ছে ৷ ভাবছি আমি পাগল হলাম, না এরা সব পাগল হল ৷ একটা চাপ অনুভব হচ্ছে মাথায় ৷ নিতে পারছিনা ৷ ডাক্তারবাবু প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দিলেন ৷ বললেন, চিন্তার কিছু নেই ৷ ওষুধটা ঠিকমতো খাওয়ান ৷ ঘুমোলে ঠিক হয়ে যাবে ৷

আমি ডাক্তারবাবুর কথামতো ঔষধ খেয়ে নিয়েছিলাম সব ৷ আমার ভীষণ ঘুম হয়েছিল তারপর ৷ গাঢ় ঘুম ৷ ঘুমের ভেতর স্বপ্ন ৷ আমার মাথা নেই ৷ হাত নেই ৷ পা নেই ৷ কোনো প্রত্যঙ্গই নেই ৷ শূন্যে ভাসছি আমি ৷ চুলহীন ৷ চালচুলোহীন ৷

No comments:

Post a Comment