Tuesday, April 18, 2023

ত্রিপুরার শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায়

ত্রিপুরার শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায় 


অতি প্রাচীনকাল থেকেই ত্রিপুরা ছিল একটি প্রভাবশালী স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য । আদিযুগে চন্দ্রবংশীয় রাজারা এখানে রাজত্ব করতেন । ত্রিপুরার অধিবাসীরা খুবই আনন্দপ্রিয় ও উৎসব প্রিয় জাতি । প্রাচীনকালে তাঁরা সর্বপ্রাণবাদীতে ( Animism ) বিশ্বাসী ছিলেন । পরবর্তী সময়ে তাঁরা হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেন । তখন থেকে তাঁরা হিন্দু ধর্মে নানা শাস্ত্রীয় শিষ্টাচারের পাশাপাশি তাঁদের লৌকিক ধর্মাচরণ
গুলিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে আসছেন । বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো নানারকম পূজা পার্বণ এবং সামাজিক অনুষ্ঠান নিয়ে তাঁরা সারা বছর মেতে থাকেন । সেইসব অনুষ্ঠানকে ঘিরে তাঁরা নৃত্য ও সঙ্গীতে মেতে ওঠেন । মূলত লোকনৃত্যই তাঁদের প্রধান ঐতিহ্য । নৃত্য ও সঙ্গীতে পারদর্শিতার কারণে প্রাচীনকাল থেকেই তাঁরা ভারতের বিশিষ্ট নৃত্য পারদর্শী জাতি হিসেবে সমাদৃত । তাঁদের প্রত্যেকটি ধর্মাচরণ ও সামাজিক অনুষ্ঠানের সাথে নৃত্যের ঐতিহ্য নিবিড় ভাবে জড়িয়ে আছে ।

ত্রিপুরা রাজ্যের লোকনৃত্যের ধারা যেমন সাধারণ জনগণের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়েছে তেমনি শাস্ত্রীয় সংগীত ও নৃত্যচর্চা রাজপুরুষদের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে । ত্রিপুরা রাজ্যের সুশীলসমাজে সংস্কৃতি চর্চা তথা নৃত্য-গীত-নাটক ও সাহিত্যচর্চার যে বিস্তার আমরা বর্তমানে দেখতে পাই, তার সূত্রপাত ঘটেছিল ত্রিপুরার রাজদরবারে ও রাজবাড়ির অন্দরমহলে । ত্রিপুরার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চাই হোক, বাউল ভাটিয়ালি সবই রাজপুরুষদের হাত ধরে সর্বসমক্ষে উপস্থাপিত হত । সংগীত, নৃত্য, নাটক বাদ্য, সাহিত্যের সমস্ত ধারার চর্চাই রাজ পরিবারের সংঘটিত হত । নৃত্যের ক্ষেত্রে প্রধানত রাজপুরীতে মনিপুরী নৃত্যের প্রচলন ছিল । তারপরও বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে বা প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে রাজবাড়িতে বাইরে থেকে শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পীরা আসতেন । বিখ্যাত কথক শিল্পী কুলন্দর বক্স, অলকানন্দা, কনিজ, চাঁদাবাইজি, ইমামি বাইজি, গহরজান, মালেকজান প্রমুখগণ সেইসব আসরে অংশগ্রহণ করতেন । রাজপরিবার থেকে শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার সেই ধারা প্রবাহিত হয়ে ক্রমে অভিজাত শ্রেণিরও আগ্রহ ও চর্চায় উৎসাহ সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায় । মূলত রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট  শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চা রাজন্যোত্তর পর্যায়ে  গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কালেও প্রসারিত হয় ।

 একদিকে সাধারণ জনগণের লোকনৃত্যের নিজস্ব ধারা, অন্যদিকে রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতায় শাস্ত্রীয় নৃত্য চর্চার ধারা পাশাপাশি ত্রিপুরায় প্রবাহিত হলেও ভারতভুক্তির পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৭৪ বছর কেটে গেলেও রাজ্যের শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার প্রসার তেমনটা ঘটেনি । কি কারণে শাস্ত্রীয় নৃত্য চর্চা প্রসারের ক্ষেত্রে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে সেই বিষয়গুলি তুলে ধরা হচ্ছে ।

প্রথমত, শাস্ত্রীয় নৃত্য চর্চাকে এ রাজ্যে এখনো অভিজাতদের চর্চার বিষয় বলে মনে করা হয় । এছাড়া সাধারণ দরিদ্র ও মধ্যবিত্তরাই রাজ্যের প্রধান জনগোষ্ঠী । ফলে আর্থিক দৈন্যও এই নৃত্য চর্চার প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে ।

দ্বিতীয়ত, এই রাজ্যের জনগণের এক বৃহৎ অংশই নানা অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করেন । জীবন জীবিকার জন্য লড়াই করতে করতে তাঁরা শাস্ত্রীয়নৃত্যের মতো কলার প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন না । সংগ্রামী জীবনে পারিবারিক দায় দায়িত্ব সামলানোই তাঁদের প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় । ফলে নৃত্যচর্চার জন্য বাড়তি সময় দেবার মতো সুযোগ থাকে না । 

তৃতীয়ত, যেহেতু রাজ্যের মানুষের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবিকার নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা । এই নৃত্য চর্চার মাধ্যমে যদি জীবিকা উপার্জনের সুযোগ না থাকে তাহলে কেউই এই নৃত্যচর্চার প্রতি আকৃষ্ট হবেন না । ত্রিপুরারাজ্যে বহু গুণী নৃত্যশিল্পী রয়েছেন যাঁরা রাজ্যের ও রাজ্যের বাইরে থেকে নৃত্যচর্চায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার পর কোনরকম সরকারি চাকরি পাননি । ফলে চাকুরির প্রতিযোগিতার বাজারে নৃত্যশিল্পীরা মার খেয়ে যান । জীবনযুদ্ধে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তাঁর অধীত বিদ্যাকে বিসর্জন দিয়ে অন্ন জোগাড়ের ধান্দায় নেমে পড়েন ।

চতুর্থত, রাজ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নের ফলেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় । যে কোন রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থা সেখানকার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাকে প্রভাবিত করে থাকে । রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথেই শিল্পীর নৃত্য চর্চার স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও বাধার সৃষ্টি হয় । কোন কারণে যদি কোন শিল্পী শাসক গোষ্ঠীর বিরাগভাজন হন তাহলে তাঁকে তার শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে বেগ পেতে হয় । দেখা গেছে, চাকুরির নির্বাচনের ক্ষেত্রেও শিল্পীর রাজনৈতিক পরিচিতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় । সমাজে কতটা তাঁর অবদান রয়েছে সে বিষয়ে মূল্যায়ন করা হয় না । দেখা যায়, কোন শিল্পী চাকরি পাবার পর তার শিল্পসত্তাকে বিসর্জন দিয়ে জীবিকা নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর ঘর সংসারে মেতে থাকেন । শিল্পচর্চার প্রতি আর আগ্রহী হন না ।

 পঞ্চমত, শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার সঙ্গে যারা জড়িত এবং প্রতিভা সম্পন্ন তাদের বৃহত্তর ও পরিসরে পরিচিত করানোর কোন সুযোগ সরকারি ভাবে থাকে না । ফলে রাজ্যের দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী কোন পরিবারের সন্তানের কাছে শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চা 'ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় / পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি'র মতো। খেলাধূলা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিভাদের স্বীকৃতি ও উন্নয়নের জন্য যে ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক অনুদান থাকে নৃত্যশিল্পীর ক্ষেত্রে তার ছিটেফোঁটাও পরিলক্ষিত হয় না ।

 ষষ্ঠত, ত্রিপুরা রাজ্যের বিদ্যালয়ের শিক্ষা পাঠ্যক্রমে একাদশ-দ্বাদশ স্তরে ২০২০ সালে সংগীত নৃত্যশিক্ষাকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা  হলেও নৃত্যের কোন শিক্ষা পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি । এখানে শুধুমাত্র কন্ঠসঙ্গীত শিক্ষাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয় ।

 সপ্তমত, ত্রিপুরায় নৃত্য শিক্ষার অগ্রনী প্রতিষ্ঠান ত্রিপুরা মিউজিক কলেজের শিক্ষা পাঠ্যক্রমেও সবগুলো শাস্ত্রীয় নৃত্য শিক্ষণের ব্যবস্থা নেই । শুধুমাত্র কথক, ভরতনাট্যম ও মনিপুরী নৃত্যশিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে । তাও কেবলমাত্র স্নাতক স্তরে । আর স্নাতকোত্তর স্তরে শুধুমাত্র কথক নৃত্য ২০১১ সাল থেকে শুরু হয়েছে ।

অষ্টমত, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়ও অনেক সময় শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চার সুযোগকে কাটছাঁট করা হয়ে থাকে । উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করতে পারি যে, এক সময়ে রাজ্যের ব্লক মহকুমাস্তরে ও রাজ্যস্তরে যুব উৎসবে শাস্ত্রীয় নৃত্যে অংশগ্রহণ করার সুযোগ ছিল । প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শ্রেষ্ঠ শিল্পী জাতীয় স্তরে অংশগ্রহণের সুযোগ পেত । কিন্তু বর্তমানে যুব উৎসবে শাস্ত্রীয় নৃত্যে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই । শিল্পীর যোগদানের অপ্রতুলতার কারণ দেখিয়ে বিষয়টাকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে ।

 নবমত, রাজ্যের সাংস্কৃতিক চর্চার ঐতিহ্যগত পরম্পরা ও বাতাবরণ রয়েছে । রাজ্যে বহু ইলেকট্রনিক্স চ্যানেল রয়েছে যেগুলোতে বিনোদনমূলক নানা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয় । কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক এই চ্যানেলগুলো কোনরকম শাস্ত্রীয় নৃত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেন না । এছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মঞ্চে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মন্ত্রী মহোদয়গণ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানকে আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যে নৃত্যের আয়োজন করা হয়ে থাকে । কিন্তু সেখানেও শাস্ত্রীয় নৃত্য ব্রাত্য থেকে যায় ।

এতসব প্রতিকূলতার মধ্যে রাজ্যের শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রসার ঘটাতে গেলে বিশেষ সার্ভের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে সরকারিভাবে ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার এই সাপেক্ষে প্রধানত নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গুলি গ্রহণ করা যেতে পারে —

এক • সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়  গ্রামস্তর পর্যন্ত নৃত্যচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে । ক্ষেত্রপ্রচার দপ্তরের মাধ্যমে গ্রামস্তরে ডকুমেন্টারি ফিল্ম প্রদর্শনের করে সাধারণ জনগণকে আগ্রহী করে তোলা যেতে পারে ।

দুই • সরকারি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে গ্রামেগঞ্জে শাস্ত্রীয় নৃত্যশিক্ষার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলতে হবে । সেখানে উপযুক্ত প্রশিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় নৃত্য শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে । পক্ষান্তরে এজাতীয় পদক্ষেপকে বিদ্যালয় শিক্ষার সঙ্গেও জুড়ে দেওয়া যায় ।

তিন • উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন বেকার নৃত্যশিল্পীদের চাকুরীতে নিয়োগের মাধ্যমে তাদের জীবন জীবিকার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে । হলে তারা নিশ্চিন্তে শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রসারে আত্মনিয়োগ করতে পারবে ।

চার • বিদ্যালয়ে ও ক্লাব স্তরে সরকারি ব্যয়ে নৃত্যশিক্ষকের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রশিক্ষণ শিবির করার ব্যবস্থা করতে হবে । প্রশিক্ষণান্তে শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিল্পপ্রদর্শনের সুযোগ পাবে ।

পাঁচ • মেধা-অন্বেষণ প্রকল্পের মাধ্যমে মেধাবী শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী বাছাই করে তাদের নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা সহ আর্থিক বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে ।

ছয় • রাজ্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরে শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে । ফলে শাস্ত্রীয় নৃত্যের নতুন নতুন শিল্পী উঠে আসবে ।

 সাত • রাজ্যের বাইরে থেকে বিশিষ্ট শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যের দলকে রাজ্যে আমন্ত্রণ করে এনে তাদের রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নৃত্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে । পাশাপাশি রাজ্যের  শাস্ত্রীয় নৃত্যের শিল্পীকেও রাজ্যের বাইরে নৃত্যশৈলী প্রদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে ।

আট • চাকুরিক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক রং যাচাইয়ের বিষয়টিকে প্রাধান্য না দিয়ে শিল্পীর শিল্পসত্তার মূল্যায়ন করতে হবে । পাশাপাশি দুস্থ ও মেধাবী শিল্পীকে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতে হবে ।

এক কথায়, সরকারিস্তরে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিলে রাজ্যের শাস্ত্রীয় নৃত্যকে আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন নেওয়ার যোগ্য করে তোলা যাবে নিশ্চিতই ।

No comments:

Post a Comment