Wednesday, December 31, 2025

বেগম খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে দেশের কর্ণধার

বেগম খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে দেশের কর্ণধার

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

মনে পড়ছে একাত্তরের ঝড়ো দিনগুলোর কথা । ওপার বাংলায় তখন নতুন দিগন্তরেখা । ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হচ্ছে রক্তিম আলোকচ্ছটায় । স্বাধীনতাকামী আকিশোর-বৃদ্ধ-বণিতা নেমে পড়েছে রাজপথে । ২৫ শে মার্চের পর থেকে সে আন্দোলন আরো সংগঠিত রূপ নেয় । সেদিন আমাদের এই সাব্রুমের অপর প্রান্তে ফেনীনদীর দক্ষিণ পাড়ে রামগড় হাইস্কুলের মাঠে চলেছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ । প্রশিক্ষণের নেতৃত্বে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান । এক দীর্ঘ সময় রামগড়কে পাক হানাদারমুক্ত রেখে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন । 

একসময় পাকবাহিনী রামগড় দখল করে নিলে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী চলে আসেন সাব্রুম ।সাব্রুমের হরিনা গ্রামসংলগ্ন গরিফা অরণ্যভূমিতে । করা হয় মুক্তিফৌজের ক্যাম্প ও একনম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার । প্রথমদিকে দায়িত্বে ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান । এখানেও তিনি যুবকদের একত্রিত করে ট্রেনিং পরিচালনা করতেন । তারপর মুক্তিবাহিনীকে পাঠাতেন দেশের অভ্যন্তরের লড়াই করার জন্য । এক নম্বর সেক্টরের সবগুলো সাব-সেক্টরের মধ্যে সাব্রুমের শিলাছড়ি, ঘোড়াকাঁপা থেকে শুরু করে ঋষ্যমুখ, মতাই পর্যন্ত তিনি চরকির মতো ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহিত করতেন । রণকৌশল নির্মান করতেন । রণাঙ্গনের নেতৃত্ব দিতেন । কখনো দিনে বা রাতে খেতে আসতেন সাব্রুম-ছোটখিল রোডের মুখে বাঁ-পাশে মাখন দে-র হোটেলে ।

সারাক্ষণ বাংলাদেশকে স্বাধীন করার চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন এই উচ্চপদস্থ সেনানায়ক । এতকিছুর মধ্যেও তাঁর মনে সুখ ছিল না এতোটুকু । তিনি সংবাদ পেয়েছেন তাঁর সহধর্মিনী বেগম জিয়া ও দুই প্রাণপ্রিয় সন্তান ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বন্দি অবস্থায় আছেন । তিনি চঞ্চল হয়ে উঠলেন । নানাভাবে তিনি খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন । খবর পেলেন ২রা জুলাই ঢাকা সিদ্ধেশ্বরীর এক বাসা থেকে পাক সেনারা বেগম জিয়াকে তার দুই সন্তান সহ ধরে নিয়ে গেছে । ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট ২৪ বছর বয়সে যখন তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন ছিলেন । তখন মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী খালেদাকে বিয়ে করেন । এর মধ্যে তাঁদের দুটি সন্তান আসে । মাত্র ১০-১১ বছরের দাম্পত্যজীবন  সেসময় । স্ত্রী ও পুত্রগণের বন্দী হওয়ার সংবাদে তিনি আরো মারমুখী হয়ে উঠেছিলেন । ধ্বংস করছিলেন একের পর এক পাকঘাঁটি । বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণাঞ্চল মুক্ত রাখা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা এনে দিয়েছিল ।

 ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন । ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি পান । বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ১৯৮১ সালে যখন হত্যা করা হয় সেই প্রেক্ষাপটে বিপর্যস্ত বিএনপিকে টিকিয়ে রাখতে বেগম খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেছিলেন । রাজনীতিতে আসার আগ পর্যন্ত তিনি একজন সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন । দলের সাধারণ সদস্যপদও তাঁর ছিল না । গৃহবধূ থেকে পরবর্তী সময়ে আপোসহীন নেত্রী ও তারপরে দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হন তিনি । ১৯৯১–৯৬ এবং ২০০১–২০০৬ এই দুই মেয়াদে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক পরিপূর্ণতা আসে । তাঁর গৃহীত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গতি দিয়েছে । তিনি বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে থেকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন । তাঁর সময়েই  পোশাক তৈরি ও রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতির বিস্তার লাভ ঘটে ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অবদান রাখে । শিক্ষা ও গবেষণামূলক কার্যক্রমের প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে । বিশ্বরাজনীতিমহলেও তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।  আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাফল্য আসে । বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব ফেলেছিল তাঁর সরকার অর্থনীতিতে উদারীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করায়,  যার ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন সুযোগ উন্মোচিত হয়েছিল । প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছিল । ভারতের সাথে সাম্যতা রেখে সবার সাথে কানেক্টিভিটি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল । যদিও ভারতের সাথে বিএনপি সরকারের কতটা সুসম্পর্ক ছিল তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে । কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে চলতে থাকা দীর্ঘকালীন সংকট তিন বিঘা করিডোর পালাক্রমে ৬ ঘন্টা করে দুই দেশের জন্য উন্মুক্ত হয়েছিল তাঁর আমলেই ১৯৯২ সালের জুন মাসে । তবে তার সময়ে সুশাসনে ঘাটতিও ছিল প্রচুর । তিনি সবসময় একদল স্তাবক পরিবৃত থাকতেন

তাঁর বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার উত্থান-পতন, মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব, মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা, জুলুম, নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন তিনি । স্বামী ও কনিষ্ঠপুত্র আরাফাত রহমানকে হারানোর গভীর শোকজনিত ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও দীর্ঘ শারীরিক জটিলতা ও রোগযন্ত্রণা বয়ে বয়ে তাঁর জীবনের যবনিক নেমে আসে । 

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়ানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে । বর্তমান বাংলাদেশের অস্থির ও অনিশ্চিত সময়ে তাঁর চিরপ্রস্থান সেদেশের সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে ।

Monday, December 22, 2025

পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেই দিন–বক্সনগরে

পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেই দিন–বক্সনগরে

অশোকানন্দ রায়বর্ধন


বাবার সরকারি চাকুরির সুবাদে শৈশব থেকেই শুরু আমাদের পরিযায়ী জীবন । তা থেকে আজও মুক্তি পাইনি । আজ এখানে তো কাল সেখানে । কোথাও থিতু হয়ে বসতে পারলাম না । জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে অতীতের সেই ভাসমান দিনগুলোর কথা প্রায়শই মনে পড়ে । বাবার ছিল বদলির চাকরি । তাই তিনি যেখানে যেতেন সঙ্গে তাঁর পরিবারবর্গকেও নিয়ে যেতেন । ফলে আমাদের সেই দিনগুলোতে ঘরের আসবাব বলতে কিছুই ছিল না । চাকরিতে বদলির সরকারি নির্দেশ আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের রওনা হতে হত পোটলাপুটুলি বেঁধে । একেকবার বদলি হয়ে নতুন জায়গায় গেলেই পেছনে ফেলে আসা সেই ভূমিকে এবং আমার শৈশবের বন্ধু-বান্ধবের কথা বেশ কিছুদিন মনকে খুব নাড়া দিয়ে যেত । যদিও এই অভিজ্ঞতাটা আমার পরবর্তী জীবনের অনেক অমূল্য সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে । আমার সৃষ্টিতেও সেইসব বিষয়গুলো এসেছে । আর এখন জীবন সায়াহ্নে এসে সেই দিনগুলোকে মনে করে এক স্বর্গীয় তৃপ্তি অনুভব করি ।

১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে আমার বাবা পেচারথল পি এইস সি থেকে বদলি হয়ে বক্সনগর দাতব্য চিকিৎসালয় জয়েন করেন । তখনকার দিনে ছোটো আকারের বাসে চড়ে আমরা প্রথম দিন আগরতলায় আসি । সেখানে একরাত্রি বাসের পর পরদিন সকালে আমরা প্রথমে এসে নামি বিশালগড় বাজারে । সেকালের বিশালগড় বাজার এখনকার মতো এত জমজমাট বা ঝাঁ চকচকে ছিল না । রাস্তার দুপাশে ছোটো ছোটো ছন বাঁশের বেড়ার ঘর ছিল । কোনো কোনো দোকানের গদিটা ছিল বাঁশের মাচার । এমনই একটা তরজার ঝাঁপ ফেলা ঘরে ছিল তখনকার সময়ের বাস সিন্ডিকেটের অফিস । আমাদের বাস এসে সেখানে থামে । আমার মনে আছে বাসটার নাম ছিল 'লাকি দুলু' । বাবা আমাদের বাস থেকে নামিয়ে সিন্ডিকেট অফিসে বসিয়ে রাখলেন । তারপর খোঁজ নিয়ে জানলেন বক্সনগরের রাস্তা কতদূর । একটু এগিয়ে গিয়ে ডান দিক ধরে বাজারের ভেতর দিয়ে বক্সনগরের রাস্তাটা গেছে । তখনকার হিসেবে সিন্ডিকেটের মাস্টার জানালেন বক্সনগরের দূরত্ব প্রায় ১২ মাইল । বাবা ভদ্রলোককে তাঁর পরিচয় দিলেন এবং এই ১২ কিলোমিটার রাস্তা তিন শিশুসন্তানকে নিয়ে কিভাবে যাবেন সে বিষয়ে দুশ্চিন্তার কথা তাঁকে জানালেন । সেই ভদ্রলোক তখন দৌড়ঝাঁপ করে খোঁজখবর করতে লাগলেন বক্সনগর থেকে মালামাল নিয়ে কেউ এদিকে এসেছে কিনা । তাহলে তাঁদের ফিরে যাবার সময় আমাদেরকে তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেবেন এবং জিনিসপত্রগুলো তাঁরা বয়ে নিয়ে যাবেন । যাই হোক ভদ্রলোকের সহৃদয় প্রচেষ্টার পরে দুজন লোককে পাওয়া গেল । তাঁরা বক্সনগর থেকে মালামাল নিয়ে এখানে এক ব্যবসায়ীর দোকানে এসেছিলেন । কিছুক্ষণ পরে তাঁরা ফিরে যাবেন । সিন্ডিকেট মাস্টার ভদ্রলোকের নির্দেশ মতো প্রায় দশটার দিকে দুই ভদ্রলোক তাদের হাতে মাল বয়ে নিয়ে যাবার বাঁশের বাঁক ও দড়ি নিয়ে অফিসে এলেন । আমাদের কাছে মালপত্র তেমন কিছু নেই । সামান্য যা কিছু ছিল একজন তাঁর হাতের দড়ি দিয়ে বেঁধে বাঁকের দুপাশে ঝুলিয়ে নিলেন । বাবা ও মা হেঁটেই যাবেন । তাঁদের কোলে থাকবে আমাদের ছোটোভাইটি । সমস্যা হল আমরা বড়ো দুইভাইকে নিয়ে । একজনের বয়স ৮ এবং অন্যজন ৬ বছর মাত্র । কিছুতেই ১২ কিলোমিটার পথ আমাদের পক্ষে হেঁটে পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয় । এ নিয়ে সবাই ভাবনায় পড়লেন । সে সময় আমাদের নিতে আসা দুজনের একজন একটা উপায় বার করলেন । তিনি আমাদের দুই ভাইকে তাঁর বাকের দু'পাশে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারলে আমাদের বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন বলে জানালেন । আমাদের পোটলাপুটলির মধ্যে সম্বল ছিল দুটো কাঁঠালকাঠের পিঁড়ি । মা বস্তার ভেতরে রাখা পিঁড়ি দুটো বের করে তাদের দিলেন । ভদ্রলোক আমাদের দুজনকে দুটো পিঁড়িতে বসিয়ে তাঁর কাঁধের বাঁকে ঝুলিয়ে রওনা দিলেন । এভাবেই আমরা দুই বিচ্ছু ভাই 'পালকি চলে পালকি চলে / গগন তলে আগুন জ্বলে' ছড়াটি বলতে বলতে বাকের দুলনির সঙ্গে দুলতে দুলতে বক্সনগর চললাম । কিন্তু আমাদের চঞ্চল নড়াচড়ায় বাহক ভদ্রলোকের ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল । তিনি মাঝে মাঝে আমাদের ধমক দিচ্ছিলেন ।

 এভাবে পথে বেশ কয়েকবার জিরিয়ে নিয়ে আমরা বিকেল চারটার দিকে বক্স নগরে এসে পৌঁছাই । সে সময় বক্সনগর দাতব্য হাসপাতালটি বাজারের একেবারে শেষপ্রান্তে নিবারণ সাহার বাড়ি ও দোকানের লাগোয়া ছিল । নিবারণবাবুর বাড়ির পরেই টিলাটা শেষ এবং ঢালু বেয়ে ছরার দিকে চলে গেছে । ওপারে বক্সনগর স্কুল মাঠ ও পুণ্যমতি গ্রাম । হাসপাতালের পেছনে একটি তরজার ছাউনি ও বেড়ার ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হল । পাশের নিবারণবাবুর বাড়ির সদস্যরা এসে আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গেলেন এদিন আর রান্নাবান্না না করার জন্য মাকে অনুরোধ করে গেলেন এবং রাত্রিতে তাদের ঘরে অন্নগ্রহণের আমন্ত্রণ করলেন । সেই থেকে এই পরিবারটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় শুরু এবং যতদিন আমরা বক্সনগর ছিলাম ততদিন তাঁদের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা ছিল । এই পরিবারের বড় দাদাটির নাম ছিল সম্ভবত বিভূতি । তারপরে কানুদা তারপরে সম্ভবত নারায়ণ ও বিজয় । আমার ভুলও হতে পারে । সবার নাম এখন আর মনে পড়ছে না । কানু সাহা অর্থাৎ কানুদা আমাদের চেয়ে বড়ো । তিনি আমাদের ছোটো ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন । এই দিনেই কিছুক্ষণ পরে এসে দেখা করে যান ডাক্তারবাবু হরেন্দ্র চক্রবর্তী । প্রায় আমার বাবার বয়সী তিনিও সপরিবারেই বক্সনগরেই থাকেন । পরদিন এই কানুদার সঙ্গেই আমি ও আমার ভাই অসীমানন্দ বক্সনগর স্কুলে যাই ভর্তি হওয়ার জন্য । ছোটোভাই বিবেকানন্দ তখন কোলের শিশু । দেড় বা দুবছর বয়স । বাবার ডিসপেনসারির সময় থাকায় আমাদের সঙ্গে যেতে পারেননি । তবে সকালবেলায় স্কুলের শিক্ষক মহাশয়দের সঙ্গে তাঁর এক প্রস্থ পরিচয় হয়ে গিয়েছিল । তাঁরাই আমাদের স্কুলে যেতে বলেছিলেন । ধীরে ধীরে স্কুলে আমরা সবার সঙ্গে মানিয়ে নিতে থাকি । যেহেতু আমরা উত্তর ত্রিপুরা থেকে এসেছিলাম তাই আমাদের কথায় একটা সিলেটি টান থাকত । এখানকার মানুষের মুখের ভাষায় ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার টান । ফলে ছোটো বয়সে যা হয়, আমাদের দুই ভাইয়ের কথাবার্তা নিয়ে সহপাঠীরা মশকরা করত । ধীরে ধীরে আমরা তা কাটিয়ে উঠি । আমার সঙ্গে যারা পড়ত তার মধ্যে যতটুকু মনে পড়ে কানুদাদের কোনো এক ভাই নারায়ন বা বিজয়, বিভীষণ বণিক, নিখিল দাস, আবু তাহের, মোখলেসুর রহমান, আব্দুল মোনাফ, সুবোধ নাথ, অমূল্যরতন পাল, ফটিক মজুমদার এবং ডাক্তারবাবুর ছেলে অজিত চক্রবর্তী । ডাক্তারবাবুর বড়ো ছেলে রঞ্জিত আমার একক্লাশ উপরে ছিল । এর মধ্যে আবার ফটিক ভৌমিক ওরা আমাদের পারিবারিক আত্মীয় । ফটিকের বাবা বক্সনগর তহশীল অফিসের তহসিলদার ছিলেন ।  ফটিকের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার সূত্র হলো রাজ্যের একসময়ের বিশিষ্ট সাঁতারু রতনমণি রায়চৌধুরী ছিল তার মাসি এবং রতনমণি রায়চৌধুরী সম্পর্কে আমাদের পিসি হন । এই পিসিদের বড় ভগ্নিপতি ফটিকের মা । ফটিকরা তহশীল অফিসের পিছনে সরকারি কাঁচাঘরে থাকত । সুবোধের বাবা ছিলেন চিকিৎসক । বক্সনগর বাজারে তার ওষুধের দোকান ছিল । বিভীষণের পরিবার সদ্য পাকিস্তান থেকে উঠে আসে । তার দাদা নারায়ণ বণিক বাজারে একটি বাজে মালের দোকান শুরু করেন । আবু তাহেরের বড়ো ভাই বক্সনগর স্কুলের শিক্ষক ছিলেন (তাঁর নামটা এখন আমার আর মনে নেই) । তবে তাঁদের সম্পর্কে একটা ঘটনা এখনো আমার মনকে নাড়া দেয় । অমূল্যরতনরা পরে এখান থেকে চলে গিয়ে আমবাসা বাড়ি করে । কুলাই থাকাকালীন তার পঙ্গে আমার দেখা হত ।

শিক্ষক মহাশয়গণ ছিলেন খুব আন্তরিক । স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন থেকেই তাঁরা আমাদের প্রতি খুব যত্ন নিতেন । প্রধানশিক্ষক ছিলেন নলিনীকান্ত আচার্য । এছাড়া অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বর্ষীয়ান প্রফুল্ল কুমার আচার্য, গৌরাঙ্গ চন্দ্র দাস, তাজুল ইসলাম স্যর, চিত্ত রায়, গুপ্ত স্যর, শাজাহান স্যার এবং রমেশ দাস । আমরা বিদ্যালয়ে পাঠকালীন সময়ে রমেশ দাস স্যার ট্রেনিং নেওয়ার জন্য কাঁকড়াবন চলে যান । কিন্তু কিছুদিন পরেই তাঁর বোধহয় কোনো মানসিক সমস্যা হয় এবং তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন বলে জানা যায় । শৈশবের সেই ঘটনাটি আমার মনে খুব নাড়া দিয়েছিল । এরকম আরো একটি প্রশ্নবোধক ঘটনা আজও আমার মনে মাঝে মাঝে জেগে ওঠে । আমাদের বন্ধু আবু তাহেরের দাদা (তার নামটা আমার মনে নেই) আমাদের শিক্ষক ছিলেন । তিনি এবং শাহজাহান স্যার একসঙ্গে চলাফেরা করতেন । হঠাৎ একদিন আমরা শুনতে পাই এই দুজন স্যারের চাকরি চলে গেছে কোন এক অজ্ঞাত কারণে । দুজন শিক্ষকই ভীষণ ছাত্রবৎসল ছিলেন । তাছাড়া শাজাহান স্যারের বড় মেয়ে সম্ভবত বিউটি নাম আমাদের একক্লাশের সিনিয়র ছিল এবং আমাকে খুব স্নেহ করত । একেবারে সীমান্ত সংলগ্ন তাদের বাড়িতে গিয়ে শৈশবে আমি বড়ই গাছ থেকে বড়ই পেড়ে খেয়েছি । তাঁদের হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া ব্যাপারটা আজও আমার মনে প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ঘোরাফেরা করে ।

বক্সনগরে সে আমল থেকেই হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত বসবাস । গ্রামবাসীদের প্রত্যেকের সঙ্গেই ছিল আন্তরিক সম্পর্ক । চিকিৎসায় সুফল পাওয়ার সুবাদে অনেক মুসলমান বয়স্ক মহিলা ও পুরুষ আমার বাবাকে আব্বা এবং মাকে আম্মা বলতে দেখেছি । তারা বয়স্ক হলেও আমাদের ভাইদের ভীষণ আদর করতেন । তাঁদের কেউ কেউ বাড়ি থেকে দুধ, খেতের ফসল, খেজুরের গুড় ইত্যাদি নিয়ে আসতেন । বাবা বকাঝকা করলেও গোপনে মার কাছে গছিয়ে দিয়ে যেতেন ভাইদের খাওয়ানোর জন্য । আজ কারোর নাম মনে নেই । চেহারাও মনে নেই কিন্তু সেদিনের কথাগুলো মনে পড়লে আজও হৃদয়ের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে । তখনকার মানুষের মধ্যে কোনরকম ভেদাভেদ ছিল না আন্তরিকতা ছিল প্রচুর । 

ছোট্ট বক্সনগরে সে সময়ে দুর্গাপূজা করতেন ধীরেন্দ্র সাহা নামে এক তরুণ ব্যবসায়ী ।  তাঁরা অল্প কিছুদিন আগে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে এখানে এসে বসতি ঘরে ছিলেন । সেখানকার বর্ধিষ্ণু পরিবার এখানে জমিজমা বদল করে আসায় তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল খুবই । তাঁদের সঙ্গে তাঁদের গ্রামের এবং আত্মীয়স্বজন অনেকেই বক্সনগর এসে এভাবে বসতি করেছিলেন । ফলে দেশ বাড়ির সম্পর্কের বাঁধনটা রয়ে গিয়েছিল । ধীরেন্দ্রবাবুর ভাই  সুনীল সাহা শিক্ষক ছিলেন । বড় ভাই তাঁকে পড়াশোনা করিয়ে বিয়েথা করিয়েছিলেন । আমরা সেই বিয়ের নিমন্তন্ন খেয়েছিলাম । পুজোর সময় ধীরেন্দ্র সাহার বাড়িতে গ্রামের সব মানুষ অংশগ্রহণ করতেন । একবার পুজোর সময় ধীরেন্দ্র সাহার বাড়িতে কোন একটা অশৌচকালীন সংস্কার পালনন চলছিল । অশৌচের মধ্যে দুর্গাপুজো করার নিয়ম নেই । তখন তাঁর প্রতিমা তৈরি প্রায় শেষ । সে অবস্থায় তিনি আমার বাবার উপর পুজোর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন । ধীরেন্দ্র সাহা নিজেই প্রতিমা গড়তেন । তাঁর প্রতিমা ছিল সাবেকি ধরনের । একবার তিনি বড়ো কাঠামের পাশাপাশি ছোটো আকারের একটি দুর্গামূর্তি গড়েন এবং সেই মূর্তির সামনে পূজারত রামচন্দ্রেরও একটি মূর্তি করেছিলেন । বাজারের উপরে বাচাই ঘরেই তিনি মূর্তি করতেন আমরা স্কুলে যাওয়া আসার সময় বেশ কিছুটা সময় তার মূর্তি নির্মাণকৌশল অবাক হয়ে দেখতাম । বাজারের একপাশে সবসময় একটি রথ দাঁড়ানো থাকত । রথের সময় এটা টানা হত । তারও উদ্যোক্তা ধীরেন্দ্র সাহাই । পুজো করার পাশাপাশি ধীরেন্দ্র সাহা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও জড়িত ছিলেন । পুজোর সময় তাঁর উদ্যোগে যাত্রা অনুষ্ঠান হত । সেই যাত্রাপালায় তখনকার সময়ে বক্সনগরের থানা তহসিল, স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য সরকারি অফিসের কর্মচারীগণসহ বক্সনগরের বিশিষ্ট হিন্দু-মুসলমানগণ অংশগ্রহণ করতেন । তখনকার সময়ে প্রায় সারারাত ধরেই যাত্রাপালা হত । 'শেষ নামাজ' নামে একটা যাত্রাপালার কথা আমার এখনো মনে আছে । এছাড়া পৌরাণিক যাত্রাপালাও তাঁরা করতেন । সেই যাত্রাপালায় আমার বাবা একবার সূর্যদেবের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছিলেন । বক্সনগরে শ্রাবণমাস জুড়ে মনসামংগলের গান বা পদ্মাপুরাণ পাঠ হত প্রায় প্রতি বাড়িতে । এ গ্রামে দু তিনটে মনসামঙ্গল পাঠের দল ছিল । পাঁচনাইল্লা থেকে একটা মনসামঙ্গলের দল আসত । পৌষ সংক্রান্তির আগের রাত্রে হত বেড়ার ঘর তৈরি এবং সেখানে রাত্রিবাস ও বনভোজন । ভোরবেলা স্নান করে সেই ঘরে আগুন দেওয়া হত এবং সুর করে ছেলেরা নানারকম ছড়া আওড়াত । বাজারের টিলাটার এক প্রান্তে থানা অবস্থিত হওয়ায় এর নাম ছিল থানার টিলা । আর উল্টোদিকে ছড়ার ওপারে গ্রাম হল পুণ্যমতি । সংক্রান্তির দিন ভোরবেলা দুই পাড়ের ছেলেরা একে অন্যকে উক্তি করে ছড়া কাটত  এই বেড়ার ঘর পোড়ানোর সময় । তেমন একটি ছড়া এখনো আমার মনে আছে । যেমন থানা টিলার ছেলেরা বলত, 'গাঙ্গে দিয়া ভাইস্যা গেল আইট্টা কলার থুর, / হগল গাঁইয়ায় সাক্ষী আছে পুণ্যমতি চুর' । সেরকম পুণ্যমতির ছেলেরাও ছড়া কেটে উল্টো থানার টিলার দোষারোপ করত ।  বসন্তে দোলপূর্ণিমায় হত দোল উৎসব । ধীরেন্দ্র সাহার বাড়িতে দোল ও ঝুলন দুটোই পালিত হত । দোলের সময় হোলির গান গেয়ে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে সবাই রঙের উৎসবে মাততেন । সেকালে থানার একজন দারোগা ছিলেন যিনি নাকি ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সদস্য । তাকে সবাই কর্তা বলে ডাকতেন । তিনি খুব সুন্দর হোলির গান গাইতে পারতেন । গানের দলে তিনি ছিলেন মধ্যমণি । চৈত্র সংক্রান্তিতে বাজারের উল্টোদিকে হরিমঙ্গল ছরার ওপারে ধান খেতে হত চড়ক গাছঘুরানি । একে কেন্দ্র করে হত প্রচুর লোকসমাগম ও মেলা বসত । তখনকার সময়ে বাজারের আশেপাশে বসতির মানুষের স্নানের ও পানীয়জলের উৎস ছিল এই হরিমংগল ছরা । কিছুদূর গিয়ে ছরাটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে । ছরাটিতে সেকালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত । ছোটোদের সাঁতার ও জলকেলির স্থান ছিল এই ছরা । বর্ষাকালে স্রোতের বেগও ভীষণ বেড়ে যেত ।

 বক্সনগর দাতব্য হাসপাতালে আমার বাবার সহকর্মী একজন ছিলেন শচীন্দ্র চক্রবর্তী । সে সময়ে বয়সে তরুণ শচীন্দ্র মামা এলাকার সবার প্রিয়পাত্র ছিলেন । তিনি তাঁর কারিগরি জ্ঞানের সহায়তায় পুরোনো রেডিওর স্পিকার খুলে মাইক্রোফোন বানিয়ে সেসময়ের নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পর্কে বাজারে ঘোষণা দিতেন এবং তিনি নিজেও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন । বক্সনগর স্কুলেও ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হত । গোডাউনটি তখন খোলামেলা ছিল । নাট্যানুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সেখানে হত ।শিক্ষকদের মধ্যে গৌরাঙ্গ স্যার এসব ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিতেন । অন্য শিক্ষকরা তাঁকে সহায়তা করতেন । ছোটো ছেলেরা খেলাধূলার মধ্যে লাডুমখেলা, গুল্লি খেলা, দাগ্গি খেলা, পিছলাগুটি দিয়ে বন্দুকবাজিসহ কাবাডি, ফুটবল, দাইরাবান্দা ইত্যাদি নিয়ে মেতে উঠত । বক্সনগর মাঠে বড় ফুটবল খেলার ম্যাচ হত । এই ম ঠের পাশে একবার একটি বাঘ মারা পড়েছিল । আমরা গিয়ে দেখি কিছু মানুষ তার চামড়া সংগ্রহ করছে । 

সেকালে সবার মধ্যে একটা মধুর সম্পর্ক ছিল ।  মাঝে মাঝে বনভোজন হত সবাই মিলে । ১৯৬৪ সালের মে মাসে গরমের ছুটিতে সবাই মিলে বনভোজনের আয়োজন হয় । উদ্যোক্তা ছিলেন অলরাউন্ডার শচীন্দ্র মামা । সবাই মিলে জিনিসপত্র নিয়ে রওনা হই ভেলুয়ার চর । সঙ্গে বিনোদনের সরঞ্জাম হল রেডিও এবং গ্রামোফোন । রান্নাবান্নার উদ্যোগ চলছে । হঠাৎ রেডিওতে ভেসে এল দুঃসংবাদ । প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রয়াত হয়েছেন । কিসের বনভোজন কিসের কি ! সবাই শোকাহত । স্থগিত হয়ে গেল বনভোজন । সবাইকে ফিরে আসতে হল । দিনটি ছিল ২৭শে মে । সেটাও আমার মনে থাকবে চিরদিন ।

বক্সনগরের চারদিকে সে সময়ে প্রচুর খালি জায়গা ছিল । এই থানার টিলার উপরে যেখানে একটি বড়ো গোডাউন আছে তার পাশের লুঙ্গাটি লম্বালম্বি অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত । একদিকে ছরা ও তার পাশের রাস্তা আর অন্যদিকে থানার কোয়ার্টার্স পর্যন্ত ছিল তার বিস্তৃতি । গোডাউনটার ঠিক পাশেই এই লুঙ্গার মধ্যে বন কেটে এখান থেকে ছনবাঁশ সংগ্রহ করে আমরা এবং ডাক্তারবাবুর পরিবার দুটি ছনের বেড়া ও ছনের ছাউনি দেওয়া ঘর তৈরি করে পাশাপাশি বসবাস করতাম । ছনের বেড়া গোবর মাটি দিয়ে লেপে দেওয়া হত । তাতে আর ফাঁকফোঁকর থাকত না এবং শীতকালে ঠান্ডাও লাগত না । ঘরের পাশেই ছিল দুটি বড়ো বড়ো কাঁঠালগাছ । প্রচুর কাঁঠাল ধরত । খুব সুস্বাদু কাঁঠালগুলি আমরা খেয়ে শেষ করতে পারতাম না । বাড়ির আশেপাশে খেতকৃষি করার মতো প্রচুর খালি জায়গা ছিল । আমাদের দুই পরিবার সেখানে যার যার প্রয়োজনীয় ক্ষেতের ফসল ফলাতাম । ফলে কাঁচা তরিতরকারি আমাদের কিনতে হত না । সেসময় এ অঞ্চলে ছিল প্রচুর খেজুরগাছ । আমাদের বাসস্থানের পাশেই ছিল বেশ কিছুটা জমি । সেখানে স্থানীয়রা চাষ করতেন । জমি পেরোলেই টিলা । সেখানে ছিল প্রচুর আম, জাম ইত্যাদি ফলের গাছ । জমিতে চাষ দেওয়ার সময় জমির মালিকরা আমাদের ডাকতেন । কারণ তাঁদের হালের বা মইয়ের পেছনে হাঁটলে সেসময় প্রচুর নানা ধরনের ছোটোমাছ, কাঁকড়া ও ছোটো কচ্ছপ পাওয়া যেত । আমরা সেই মাছ সংগ্রহ করে আনলে মা রান্না করে দিতেন । তখনকার সময়ে খেতে পাওয়া সেই মাছের কি অপূর্ব স্বাদ ছিল । 

বক্সনগরের অধিকাংশ হিন্দুরা সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান থেকে উঠে এসে এখানে বসতি গড়ছেন । কেউ কেউ দেশের জমিজমা বদল করে এসেছেন । কেউবা কপর্দকশূন্য অবস্থায় উঠে এসে নতুনভাবে জীবন গড়ার প্রয়াস নিচ্ছেন । মুসলমানরা ছিলেন প্রাচীন বাসিন্দা এবং তাঁরা বর্ধিষ্ণু ও সম্পদশালী ছিলেন । কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করার জন্য আনতেন । তখনকার সময়ের জিনিসপত্রের দর ছিল খুবই কম । মেট্রিক পদ্ধতিতে পরিমাপ তখনো সেই বাজারে চালু হয়নি । চালের সের ছিল চার আনা । তাও অনেকের কেনার সাধ্য ছিল না । এই চালের সের যেবার চার আনা থেকে পাঁচ আনা হল সেবার বাবা ও অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠরা বলাবলি করতে শুরু করলেন যে ছেলেমেয়েদের আর বাঁচাতে পারবেন না । ছোটোমাছ বড়জোর আট আনা সের । রুই, কাতলা, কালিবাউশ ২ টাকা সের । শিং-মাগুরের দর আট আনা বেশি থাকত । যে কোনো শুঁটকি ১ টাকা সের । তবে নোনা ইলিশ চোরাই পথে পাকিস্তান থেকে আসত । তার সের ছিল ২ টাকা । ডিমের হালি দু আনা । কাঁচা সবজির মধ্যে আলু, মূলো, ঝিঙে, ধুন্দুল, ঢেঁড়স ইত্যাদির সের চার পাঁচ পয়সার বেশি ছিল না । আম জাম কাঁঠাল পেয়ারা কলা বেল ইত্যাদি কোন ফলই বাজারে বিক্রির চল ছিল না । প্রতি বাড়িতেই নানা ফলের গাছ ছিল । কারো বাড়িতে না থাকলেও অসুবিধে ছিল না । একে অন্যের বাড়ি থেকে চেয়ে চিনতে নেওয়া যেত । শীতকালে আট আনা সের প্রচুর খেজুরের রাব বা লালি পাওয়া যেত । খেজুরের রস ছিল পাঁচ পয়সা সের । বাজে মালের মধ্যে ডাল আট আনা/দশ আনা, দেশলাই বাক্স ৫ পয়সা চারমিনার সিগারেট ১২ পয়সা প্যাকেট, কেরোসিন তেল কুড়ি পয়সা, সাদা কাগজ চার আনা দিস্তা, ব্রিটানিয়া থিন এরারুট ১০ পয়সা প্যাকেট, ছোটো বিস্কিটের প্যাকেট ৫ পয়সা, চকলেট প্রতিটি এক পয়সা ।

এত সুখ, স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেও রাত নেমে এলেই বক্সনগরের বুকে ছড়িয়ে পড়ত অজানা আতঙ্ক । সেসময়ে প্রতিরাতেই বক্সনগরে ডাকাতি হত । পাকিস্তান থেকে সশস্ত্র ডাকাতদল এসে এপারের জনপদে ডাকাতি করত । পেছনে ইপিআরের ইন্ধন থাকত । রাত নামলেই গৃহস্থরা ঘরের দরজা জানালা শক্তপোক্ত করে বেঁধে রাখত । অনেকসময় গোয়ালঘরের গোরুগুলিকেও নিজেদের থাকার ঘরে নিয়ে আসত । তারপরেও রেহাই ছিল না । ডাকাতদল সঙ্ঘবদ্ধভাবে ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গৃহস্থের বাড়ি আক্রমণ করত এবং তাদের ধনসম্পদ ও গবাদি পশু লুঠ করে নিয়ে যেত । টের পেলে গ্রামবাসীদের মধ্যে প্রতিরোধও হত এবং ঢাকার দলের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটত প্রায়শই । গ্রামবাসীর হাতে একবার এক ডাকাত মারা পড়েছিল । তার লাশ বাজারের বাচাইতে এনে ফেলে রাখা হয় ।  তখনকার সময় ঝড়ের খুব তান্ডব হত । পাকিস্তান থেকে উঠে আসা মানুষজন আর্থিক দুরবস্থার কারণে তেমন মজবুত ঘর করতে পারতেন না । চৌষট্টি সালে পুজোর আগে বিধ্বংসী ঝড়ে গ্রামে বহু বাড়িঘর বিধ্বংসী ঝড়ে ভূপতিত হয়ে গিয়েছিল । আমরাও অন্যান্যদের সঙ্গে তখনকার তহশিল কাছারির দালানে আশ্রয় নিয়েছিলাম । সারারাত তান্ডবের পর ভোরের দিকে ঝড় থামে । বাইরে বেরিয়ে মনে হয় যেন প্রলয় হয়ে গেছে চারদিকে । এছাড়া সাপের ও বিষাক্ত কীটের ভীষণ প্রাদুর্ভাব ছিল । এখন যেখানটায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য হয়েছে সেটা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এবং সাপ, গুইল, বনরুই আর সজারুর আড্ডা । সেইসঙ্গে মনসমঙ্গলবিষয়ক কিংবদন্তী জড়িয়ে থাকায় মানুষ ভয়ে সেদিকে যেতই না ।বাড়িঘরে প্রায়ই সাপ ঢুকে পড়ত । খেলার সময় আমরো ছোটোরা একবার একটা কেউটে সাপ মেরেছিলাম ।

৬৫ সালে আবার বাবার বদলির কাগজ আসে । বাবা বক্সনগরে থাকাকালীন সময়ে যে সুনাম অর্জন করেছিলেন তার দরুন এলাকার মানুষ তাঁকে ছাড়তে চাইছিল না । ফটিকের বাবা তহশীলদার হওয়ার সুবাদে আমরা যে জায়গাটায় ঘর করে থাকতাম তা বাবার নামে বন্দোবস্ত করে দেওয়ারও প্রস্তাব দেন তিনি । গ্রামের বিশিষ্টজনেরা দরবার করে বাবার বদলি রদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবা যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিকূলতার কারণে এবং অনবরত ডাকাতির ভয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার চিন্তায় এই বদলি মেনে নেন । কিন্তু পরবর্তীকালে বাবা কোনো সংকটপূর্ণকালে বক্সনগরের দিনগুলোর কথা প্রায়ই স্মৃতিচারণ করতেন । বলতেন, বক্সনগর ছাড়া তাঁর ভুল হয়েছিল । আমরা তখন তো নেহাতই ছোটো । ভালোমন্দের কিইবা বুঝি । আমরা যেদিন হাঁটাপথে বক্সনগর ছাড়ি সেদিন বহু অশ্রুসজল মানুষ আমাদের পেছনে পেছনে অনেকদূর এসেছিলেন । বাবা তাঁদের বারবার আর না আসার জন্যে অনুরোধ করছিলেন । আগেরদিন আমরা দুভাই স্কুলে গিয়ে সব ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করি ও শিক্ষকমহাশয়দের প্রণাম করি । ক্লাসে আমার সব বন্ধুদের দেখা পাই । তাদের একটি করে কলম উপহার দিয়েছিলাম সেদিন । তবে সেদিন আমার প্রিয়বন্ধু ক্লাসের প্রতিদ্বন্দ্বী নিখিল স্কুলে আসেনি । তারপর সারাজীবন তাকে খুঁজে ফিরেছিলাম । বক্সনগরের কাউকে পেলেই তার কথা বলতাম । একবার জানলাম রাজ্যের এক গুণী ব্যক্তিত্ব স্বপনকুমার দাসকে । বক্সনগরের সন্তান জেনে তাঁকে কথাটা জানিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় লিখতেই নিখিলের আবির্ভাব ঘটে । তারপর দুজনে বহু কথা হয় অনলাইনে। কদিন আগে সন্ধ্যায় বটতলায় ও আমাকে দেখে চিনে ফেলে ।  নিখিল ওর বাড়িতে যাওয়ার আমন্ত্রণ দেয় । আমি বারবার কথার খেলাপ করি । আমার এই স্মৃতিচারণমূলক লেখা নিখিলের ক্রমাগত চাপেই লেখা ।

Tuesday, December 16, 2025

শঙ্খপল্লব ও দেবব্রত

সম্রাট শঙ্খপল্লব এবং সময় কুকুরের পান্ডুলিপি 

'ভালোথাকার খাসাবাসা'-জবুথবু জীবন, জন্মগহ্বরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠের ক্লেদাক্ত ভ্রূণবাস আর হৃদয়হীন সমাজের অবক্ষয়িত শরীর অন্বেষণের বিপরীতে নিরাসক্ত সমাজদৃষ্টি নিয়ে অন্যতর আস্বাদ এনেছেন শব্দের ব্যঞ্জনায় । কবি শঙ্খপল্লব আদিত্য নিজেই বলেছেন, 'আমার শব্দের রন্ধনপ্রণালী আমি আমারই কাছে রেখে দিয়েছি,/একেই কখনো বানিয়েছি রাইফেল কখনো পলির গঙ্গাজল ।' দীর্ণ সময়ের তীক্ষ্ণ শূন্যতায়ও সচেতন থেকে শব্দের তীব্র কটাক্ষে ধ্বস্ত করেছেন ছলজীবনকে । জীবনব্রতে তিনি খুঁজে ফিরেছেন ভালোবাসাকে । ভালোবাসাই তার অন্তর্লোকের গোপন 'যুদ্ধাস্ত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা' । কথা বলার নিজস্ব মুদ্রায় তিনি আমাদেরও বিমূঢ় করে তোলেন । তিনি কবিতায় সম্রাট । কিন্তু তাঁর সংলাপ অস্থির সন্ন্যাসের, যেখানে ঐতিহ্যের ছায়াপাত ঘটে । আলখাল্লার বুননে ভেসে ওঠে রিয়াং পল্লীর নিবিড় টংয়ের সামিয়ানার নিচে, 'অপূর্ব আন্তরিক রমণীয় মানুষের কোমর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বোতল নাচ'-র চারুশৈলী । কবির দিব্যবীক্ষা কতটা গভীরভাবে ছায়া ফেললে এমন লোকপ্রতিম শব্দের চয়ন হয় নিজস্ব বাচনে ! সে তো শঙ্খপল্লবই জানেন । তাঁর চেতনা সীমাবদ্ধতায় বন্দি থাকে না । তির্যক বাক্যবন্ধ হলেও প্রজন্মে প্রবাহিত গাঢ় বিষণ্নতা নগ্ন করে দেখায় তাঁর শব্দবোধ, 'ভেতর ঘরে বিষের গুহা বাইরে কোঁচার ইস্ত্রি ঠাট'-এর ব্যর্থ সওদাগরি । শচীন দেববর্মনের কন্ঠে ভাটিয়ালি গান ছাড়া জীবন অচল হলেও তাঁকে চলে যেতে হয় নির্জন ডোমের শবশকটে । স্বজনের শূন্যে দৃষ্টি ফেলে হা-হুতাস, 'জয় কিংবা পরাজয়' কিছুই কবিকে স্পর্শ করে না । 'লৌকিক কোরাসহীন' বিদায় জানাতেই হল কবিকে । 'ভালোবাসা ও ভালোবাসার' সম্মিলিত হৃদয়ের অর্ঘ্য কবিকে ।

কোলাহল পৃথিবী থেকে দূরের এক দেবশিশু 

কখনও কখনও জাগতিক ঘটনাকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে অসহায় বিস্ময়ে বাকরহিত হতে হয় । এমনটাই হয় যেমনটা মানুষ চায় না ।  কেউ কেউ চলে গেলে মননস্রোত ঘোলাটে হয়ে যায় । কারো কারো কবিতা অসময়ে গেঁথে যায় শেষপাতায় । যোদ্ধাযৌবনকেও হেরে যেতে হয় কখনও বা । অনাকাঙ্ক্ষিত স্তব্ধতা শুধু রেখে যায় সরল দেবশিশুর প্রাণকথা । কবি দেবব্রত চক্রবর্তীর পায়ের ছাপ, কলমের দাগ এমনই অসময়ে থমকে যায় । অথচ তাঁর চেতনা ঘিরে ছিল এই জগতের প্রতি গভীর আসক্তি । আসন্ন সময়কে দৃঢ়তায় মাড়িয়ে দিয়ে জীবনমাধুর্য ছড়িয়ে যান মুখমন্ডলে । তাঁর ঊনজীবনেই তিনি ধরে ফেলতে পেরেছিলেন সমাজের সমূহ অসুখ । 'বাড়ন্ত শৈশব মুক্তমন আবদ্ধ হল / মোবাইল গেইমে, শেয়ার মার্কেট, ট্রেডিং কোডিং আর জুয়ার ইনকামে । দিন শেষে সব কিছু বিসর্জন দিয়ে হতাশ যৌবন খুঁজে মাদক । / সুস্থ বিনোদন না পেয়ে মানুষ দিন দিন অমানুষ হয়ে যাচ্ছে (সমকাল) । সময়ের ভাষায় কবির নিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ জাতগোখরোর পরিচায়ক। সিতরাত অতিক্রমের স্বপ্ন ছিল এই কবির মননচর্চায় । পৃথিবীকে কলুষিত হতে দেখেছেন এই মিতসময়ে । কলুষবিনাশের আহ্বান কবিতায় কবিতায় ছড়িয়ে দেওয়ার আগেই দিগন্তে বিলীন হয়ে গেলেন দেবব্রত । চিরবিছানায় যাবার আগে তাঁর স্বপ্ন ছিল 'কুঁড়েঘর'কে ঘিরে । স্বপ্ন ছিল এই কুঁড়েঘরে একদিন তৈরি হবে শব্দের স্বপ্নইমারত । স্বপ্নমুখর ছেলেটির প্রস্থানকথা আর স্বপ্নকাঙাল কবির নীরবতা আজ সমার্থক । দুস্তর সাগরের নিকষ অন্ধকারের মধ্যে উপাসনাজীবী কবির মুখরতা অমোঘ মৃত্যুর প্রতীকে ও অনির্ধারিত বাস্তবতায় প্রতিভাসিত । 'চির শায়িত আছো আজ / পুষ্পিত বিছানায় / কোলাহল হারিয়েছ / নিঝুম নিরালায় ।'–হে দেবব্রত, হে কবি, তুমি জেগে থেকো প্রতিবাদ আর বাংলাকবিতায় ।

Thursday, December 11, 2025

৮ডিসেম্বর ১৯৭১ রামগড়মুক্ত দিবস

৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ রামগড়মুক্ত দিবস

 ৮ডিসেম্বর ১৯৭১ রামগড় পাক হানাদারমুক্ত  হওয়ার দিন আজ । কিন্তু নিস্তরঙ্গ আজ  ফেনীর জল আর দুপারের  সাব্রুম ও রামগড় ।

 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাব্রুমের এক বিশেষ অবদান রয়েছে । প্রথমত উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল সাব্রুম সন্নিহিত হরিনাতে । এই এক নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী জেলার অংশবিশেষ অর্থাৎ মুহুরী নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত । ২৫ শে মার্চের পর প্রথম দিকে রামগড়ে মুক্তিবাহিনী তাদের ঘাঁটি গেড়ে পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ শানাতে আরম্ভ করে । রামগড় স্কুলের মাঠে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং হত । তারপর ২মে পাকবাহিনী প্রথম রামগড়ে হানা দেয় এবং তারা রামগড় তাদের দখলে নিয়ে নেয় । এরপরই মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রধান কার্যালয় সাব্রুমের হরিনাতে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়ে অপারেশন চালানো হয় । এরপর থেকেই বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজারে শরণার্থী সাব্রুমে আশ্রয় গ্রহণ করে । পঁচিশে মার্চ রাতে ধরপাকড় শুরু হওয়ার পর রামগড়ের সুলতান আহমেদ, বাগান বাজারের সেকান্তর মিয়া ওপার থেকে এম আর সিদ্দিকী জহুর আহমেদ ডক্টর নুরুল হাসান সহ আরো দুজনকে সঙ্গে নিয়ে রামগড় বাজার ঘাট দিয়ে ফেনীনদী পেরিয়ে সাব্রুমের সে সময়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী ও কালিপদ ব্যানার্জির সঙ্গে যোগাযোগ করেন । পরে তারা বিষয়টি তদানিন্তন মুখ‍্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহকে জানালে তিনি দিল্লীতে যোগাযোগের ব্যবস্থা করেন । সেই অনুযায়ী তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বাংলাদেশ যুদ্ধে ভারতের পক্ষে অস্ত্রশস্ত্র ও সৈন্যবল দিয়ে সাহায্য করার বার্তা দেওয়া হয় । রামগড় ও সাব্রুমের মাঝখানে সাব্রুম বাজারঘাট ও রামগড় থানার মধ্যবর্তী স্থানে ফেনী নদীর উপর সে সময়ে একটা অস্থায়ী সেতু তৈরি করে দেওয়া হয় । সেই সেতু দিয়ে এপার থেকে ভারতীয় সৈন‍্যের যুদ্ধের গাড়ি, সৈন্য এবং  মুক্তিবাহিনী সে দেশের অভ‍্যন্তরে গিয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শানাত । মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রথমদিকে দায়িত্বে ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান । তিনিই প্রথম রামগড় মাঠে ও পরে হরিনা ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেন । তাঁর অধীনের সৈন্যদলের নাম ছিল 'জেড ফোর্স' । তাঁর পর পুরোপুরি দায়িত্বে আসেন মেজর রফিকুল ইসলাম বীরোত্তম । এই এক নম্বর সেক্টরটি আবার পাঁচটি সাব-সেক্টরে   ছিল । ঋষ‍্যমুখ সেক্টর, শ্রীনগর সেক্টর, মনুঘাট সেক্টর, তবলছড়ি সেক্টর এবং দেমাগ্রী সেক্টর। একনম্বর সেক্টর থেকে করেরহাট অপারেশন, করিমাটিলা সংঘর্ষ, বড়তাকিয়া ও মিরসরাই অপারেশন, পাতাকোট অ্যাম্বুশ, বাগান বাজার রেইড ও আমলীঘাট যুদ্ধ ইত্যাদি সংঘটিত হয় । এক নম্বর সেক্টর থেকে যুদ্ধে অংশ নেয় প্রায় ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা । যেখানে ইপিআর, পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌ বাহিনী ও বিমান বাহিনীর প্রায় ২০০০ সৈন্য ছাড়াও প্রায় ৮ হাজারের মতো মুক্তিবাহিনী লড়াই করেছেন । এই বাহিনীর গেরিলাদের অধীনে গ্রুপ নাম্বার ৯১ ৯২ ৯৩  ৯৪ এবং ৯৫ কে সংযুক্ত করা হয়েছিল । এক নম্বর সেক্টরের আওতায় সর্বপ্রথম ৫ মে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন করা হয়েছিল এই দল গঠনের নেতৃত্বে ছিলেন হেমদারঞ্জন ত্রিপুরা । ৭ ডিসেম্বর নয়টা পঁচিশ মিনিটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর তিনটি জেট বিমান রামগড়ের উপর বোমাবর্ষণ করে এরপর ৮ডিসেম্বর ৯:৫০ এ পুনরায় দুটি বিমান পাক ঘাঁটির উপর বোমাবর্ষণ করে । রামগড় এবং সাব্রুম থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম  লড়াইয়ের সে ইতিহাস সঠিকভাবে মূল্যায়ন হয়নি । কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই হরিনা ক্যাম্পের ধারেকাছেও ।

 ৮ ডিসেম্বর বিকেলের দিকে পাকবাহিনী রামগড় ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিপ্রাপ্ত জনগণ সেদিন রামগড়ে বাংলাদেশ পতাকা উড়িয়ে দেন । সেদিন দুপুর থেকেই সারা সাব্রুমে প্রচন্ড উল্লাসের বাতাবরণ বয়ে যায় । মুহূর্তে স্কুল-অফিস-কাছারি ছুটি হয়ে যায় । বাজি পটকা ফুটতে শুরু করে । তখন সাব্রুম বাজার ছিল ছোটো । দোকানপাট কম ছিল । যে কয়টা বাজেমালের দোকান ছিল সবগুলো থেকে খুঁজে পেতে কয়েক বস্তা সবুজ আবির যোগাড় করা হয় । শরণার্থী শিবির গুলো থেকে খুঁজে আনা হয় বাংলাদেশের পতাকা । মাইকে বাজতে থাকে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি এবং 'শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে ওঠে রণি' গানদুটি আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সাতই মার্চের রমনা ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণের রেকর্ড । রাজপথে শুরু হয়ে যায় আবির নিয়ে মাখামাখি । সারা রাস্তায়, নদীর পাড়ে মানুষ গিজগিজ করছে । কে শরণার্থী, কে স্থানীয় বোঝার উপায় নেই । লোকে লোকরণ‍্য । মানুষ ওপারে যেতে চাইছে । বি এস এফ বাধা দিচ্ছে । কে শোনে কার কথা !  ফেনী নদীর উপর রামগড় থানা ও সাব্রুম বাজার বরাবর যে অস্থায়ী সেতু ছিল, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একবার পাক হানাদাররা সেটা ভেঙে দিয়েছিল । পরে তা আবার মেরামত করা হয় । রামগড় মুক্ত হওয়ার  বার্তা পেয়ে কাতারে কাতারে মানুষ সব বাধা ঠেলে সেতু পেরিয়ে, নদীর উপর দিয়ে হেঁটে ওপারে গিয়ে ওঠেন । একদল উৎসাহী এপার থেকে ঢাক বাজাতে বাজাতে ওপারে গিয়ে রামগড়ের আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলেছিলেন । সেদিনের সাব্রুমের তরুণ-কিশোরদের অধিকাংশই সেদিন ফেনী নদী পেরিয়ে রামগড় পৌছেছিলেন । স্কুল ছুটির পর ছাত্ররা বাই-সাইকেল নিয়ে হেঁটে নদী পেরিয়ে সারা রামগড় চক্কর দিয়েছিল । যাদের বাড়ি সাব্রুম শহরের পশ্চিমদিকের গ্রাম ছোটোখিল, মনুঘাট ছিল তারা আনন্দের আতিশয‍্যে সাইকেলে চড়ে রামগড় পাকা সড়ক ধরে বাগানবাজারে গিয়ে নদী পেরিয়ে এপারের রানিরবাজার ঘাটে উঠে বাড়ির পথ ধরেছিল । ছাত্রদের এই অ্যাডভেঞ্চার পরবর্তী বেশ কিছুদিন জারি ছিল । বয়স্করাও কিছুদিন বাজারসদাইও করেছিলেন রামগড় বাজার থেকে । 

৮ ডিসেম্বর বিকেলে রামগড়ে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয় সে সময় সেসময় ভারতের পক্ষে তদানীন্তন ব্লক কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী, উদয়পুরের  সাংবাদিক সেসময়ের ছাত্র সংগঠন ছাত্রপরিষদের জেলা সভাপতি স্বপন ভট্টাচার্য উপস্থিত ছিলেন। তিনি ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মান'-এ ভূষিত হন । তারপর ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশ বিজয় লাভ করে । সেই প্রতিবছরই এই দিনটি রামগড়ে ঘটা করে পালিত হত । সাব্রুম থেকে তার শব্দ শোনা যেত ।

কিন্তু না । ফেনীর ওপাড়ে এবারের রামগড় ছিল আজ সুনসান । রামগড় বিজয়ের পূর্তি দিবস আজ সময়ের আস্তাকুঁড়ে চলে গেছে । সেদিনগুলোতে সাব্রুমবাসীর কৃচ্ছ্রতার ফলাফল শূন্য। ইতিহাসের সেই অতীতের মিথিলার রাজা আদিশূরের নবম পুত্র বিশ্বম্ভরের মতো এই অঞ্চলে কি আবার ও উচ্চারিত হবে 'ভুল হুয়া', ' ভুল হুয়া' ?

Monday, November 24, 2025

শীতের পত্র

শীতের পত্র

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

শীত পা রেখেছে আমার এই না শহরে এখন 
দ্রুতরাত নামে । দোকানের সাটারের ধাতব পতন 
ঘরে ফেরার সংকেত । উত্তরের হাওয়া তীব্র শীতের 
ঝটকায় উড়ে চলে যায় । তপন রায়ের বন্ধ দোকানের 
সামনে পাতাহারা কাঁঠালগাছটিতে নিয়ন আলো পড়ে 
কঙ্কাল মনে হয় । নিচে শুকনো পাতারা বিছানা গড়ে ।

মনে হচ্ছে শহরে ছড়ানো ভালোবাসার যত পিগিব্যাংক 
রাতের আঁধারে কেউ এই শহর থেকে নিচ্ছে লুঠ করে ।
ওদের কালো পোশাক আর মুখোশ সিসিক্যামে ব্ল্যাংক–
সফল অভিযান শেষে কালো পোশাক ফিরে যায় ঘরে ।
তখনই কোন প্রিয়জন বর্ষাবাসে গেলে মনে হয়– 
এই শীত, এই হিমরাত আমাদের মন খারাপের সময় ।

শীত এলেই কি আমাদের প্রত্যেকের মন খারাপ হয় ?
অথবা কেবল মন খারাপের দোহার এই শীতের সময় !
স্বজনের কাছে যে সুজন এসেছিলেন বসন্তে বা বৈশাখে, 
মন খারাপের রয়্যাপারে ঘিরে রাখতে চাই তাঁকে ।
থাকুন তিনি উষ্ণ আবেগে থাকুন হৃদয় জুড়ে,
কর্মের দুনিয়ায় যেখানেই থাকুন কাছে কিংবা দূরে ।

Thursday, November 20, 2025

জ্যোতির্ময় শিবের থানে অশোকপুষ্পের অঞ্জলি

জ্যোতির্ময় শিবের থানে অশোকপুষ্পের অঞ্জলি

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আমার বাবার সরকারি চাকরিসূত্রে ও পরবর্তীতে আমারও পেশাগত কারণে স্থানান্তরের অভিজ্ঞতা ও বহু বেদনাবিধুর স্মৃতিভার রয়েছে । স্বল্পকালীন হলেও সাময়িক বাসভূমিকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হয় । স্থানিক প্রকৃতি ও মানুষজনকে স্বজন ও সুজন মনে হয় । সেইখানের প্রকৃতির সান্নিধ্যে এলে, মানুষের সাথে মিশলে, তাঁরাও বেঁধে নেন আত্মিক বন্ধনে । প্রস্থানবেদনায় সকলেরই পরান পোড়ে স্যর । আপনার মতো আমরাও বেদনাতুর । আপনার বেদনার বিনিময়ে আমরা আমাদের বেদনাকেই ফিরিয়ে দিতে পারি আমরা । আর আমি শুধু বেদনা নয় মধুময় স্মৃতির মৌচাক বয়ে বেড়াব বুকের ভেতর যতদিন বসুমাতার বুকে আছি । আমাকে দেখলেই আপনার সেই মায়াভরা চাহনি আর সমস্ত প্রটোকল ভেঙে বুকে জড়িয়ে ধরা, আলিঙ্গন করা আমার বিরলতম প্রাপ্তি । সন্তানসম হয়েও পিতার নিরাপত্তায় যেন আমাকে বেষ্টন করে রেখেছিলেন আপনি । আমার জীবনে দেশে ও বিদেশে বহু সম্মান ও বহু পুরস্কার আমি পেয়েছি । কিন্তু নিজের মাটিতে নিজের শহরে সরকারিস্তরে মহকুমা প্রশাসন আয়োজিত দুহাজার চব্বিশ সালের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে মাঠভর্তি মানুষের সামনে বিরল সম্মানটি আপনিই আমার হাতে তুলে দিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন ।

মনে পড়ে, দুবছর আগে বন্যায় যখন আমার ভদ্রাসনটিসহ আমার গ্রাম ছোটখিল জলের তলায় ডুবে যাচ্ছিল, সেসময়, আমি মাঝরাতে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানিয়েছিলাম দাসপাড়ায় বাঁধের উপর কজন মানুষ আটকে আছেন । আপনি দ্রুত ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে  নৌকা পাঠিয়ে তাদের উদ্ধার করে প্রিয়জনদের কাছে শিবিরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন । আর্তজীবনরক্ষায় আপনার সেদিনগুলোর অনিদ্র ভূমিকার কথা আর কজনই বা জানেন । 

সাব্রুমের ধর্মপ্রাণ মানুষের পীঠভূমি দৈত্যেশ্বরী মন্দিরের উন্নয়নে, রাজ্যের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক মানচিত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে দেওয়ায় আপনার ভূমিকা অপরিসীম। মাতা দৈত্যেশ্বরী মন্দিরের সুপ্রাচীনতার প্রামান্য ইতিহাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে আমার গবেষণাপত্রটি আপনি ভাষান্তর করে যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছেন । যার সুফলেই আজ দৈত্যশ্বরী মন্দির রাজ্যের এক বিশিষ্ট ঐতিহ্যঅঙ্গন । শিব তাঁর তৃতীয় নয়নের জ্যোতিপ্রবাহে যে কর্মকান্ডের সুরুয়াত করে গেলেন তা আগামীদিনে বহধাবিস্তৃত হবে । বহুবছর আগে এই মহকুমার আরেকজন সর্বোচ্চ কর্মকর্তা মানিক গাঙ্গুলি এ মন্দিরের প্রাথমিক সংস্কারের কাজটি করেছিলেন । আর এই প্রজন্মের নবীন প্রতিনিধি আপনি এই মন্দিরের উন্নয়নের সিঁড়িটা মজবুত করে দিয়ে গেলেন । ইতিহাস ও ঐতিহ্য এভাবেই ফিরে ফিরে আসে।

সাব্রুমের ঐতিহ্যবাহী বৈশাখীমেলা, এই জনপদের মানুষের প্রাণের মেলাকে আপনি নবনান্দনিক রূপদান করলেন আপনি । কবিসম্মেলন, চিত্রাংকন সমারোহ, স্মরণিকা 'শ্রীচরণেষু'র প্রকাশ ইত্যাদি শুভকর্মযজ্ঞ সারা ত্রিপুরার নন্দনচর্চার মানুষমানুষীদের এক মঞ্চে এক মহামিলনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন । 'শ্রীচরণেষু' আসলে দেবী দৈত্যেশ্বরী মায়ের শ্রীচরণে ও গণদেবতার ওই আসনতলে মাটির পরে আপনার ও আমাদের সম্মিলিত প্রণাম । 

আপনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। আপনি একাধারে গল্পকার, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পী । ফটোগ্রাফিতেও আপনার নান্দনিক দৃষ্টির প্রকাশ ঘটান আপনি । আপনি ধুলোমুঠি ধরলে সোনামুঠি হয়ে ওঠে । আপনার নিবিড় সান্নিধ্যে থেকে আপনার প্রশাসনিকসহ নানাবিধ কর্মবিস্তৃতির যেটুকু জেনেছি তা বিশাল হিমশৈলের অগ্রভাগ মাত্র । আপনাকে জানা আমাদের ফুরাবে না । 

আপনার এগিয়ে যাবার বেলায় আর পিছুডাক নয় । বরং শাঁখ বাজিয়ে জানিয়ে দেব এই শঙ্খধ্বনির মতো বিশাল আমাদের সম্মিলিত হৃদয় জুড়ে আপনি আছেন । থাকবেন আরো বহুদিন । আপনার কর্মময় জীবন আরো বিস্তৃত হোক । আপনার লেখনী, আপনার শিল্পীসত্তা আরো আরো গতিশীল হোক স্রোতস্বিনীর মতো জীবনের বাঁকে বাঁকে। নতুন কর্মস্থল ও আপনার আপন ঠিকানা হয়ে উঠুক ।আপনি আগের মতোই সাব্রুমবাসী কারো বিপদে আপদে পাশে দাঁড়াবেন এই আশা রাখি ।  আপনার দীর্ঘজীবন, সুস্বাস্থ্য ও সার্বিক কুশল কামনা‌ করি ।❤️

Saturday, November 8, 2025

সাবরুমের প্রাচীন জনপদ ছোটখিল

সাব্রুমের প্রাচীন জনপদ ছোটখিল

১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে সংযুক্তির পর থেকে ত্রিপুরা রাজ্যের সর্ব দক্ষিণের শহর সাব্রুম এখন মহকুমা শহর ও এ অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র । কিন্তু অতীত  ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, সাব্রুম মহকুমার যে জনপদটি আজকের নাগরিক রূপ নিতে পারত সেটি আজও নিজস্ব রহস্যের অবগণ্ঠনে নিজেকে ঢেকে নীরবে সাব্রুমকে শহর সৃষ্টিতে লালন করে চলেছে, তার নাম ছোটখিল । সাব্রুম শহর থেকে পশ্চিম দিকে ৬-৭ কিলোমিটার দূরে বর্ধিষ্ণু গ্রাম এটি । একসময় এ জনপদ ছিল কর্মচঞ্চল, ব্যস্ততায় ঘেরা । রাজন্য আমলে ছোটখিল ছিল 'গেটওয়ে টু চিটাগাং হিলট্র্যাক্ট' । রাজপুরুষরা আখাউড়া থেকে ট্রৈনে চড়ে তদানীন্তন নোয়াখালীর মুহুরিগঞ্জ স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে বা হাতিতে ছয় মাইল পূর্বে আমলিঘাটে পৌঁছে নিজেদের রাজত্বে পা রাখতেন । তারপর সেখান থেকে ফেনী নদীর উজান ধরে ছোটখিলে এসে বিশ্রাম নিতেন বা রাত কাটাতেন । এরপর বর্তমান দৌলবাড়ির অধীর সরকারের বাড়ির পাশ দিয়ে সাব্রুম আসতেন । কখনওবা নদী পেরিয়ে রামগড় যেতেন । নদীর তীর ধরে সেই ক্ষীণপথের এখনও কিঞ্চিৎ চিহ্ন রয়েছে । সে সময়ে রাজপুরুষ বা অন্যান্য লোকজনদের আসার কারণে এখানে একটা ছোট্ট হাটের মত ছিল । বর্তমানে রাস্তার উত্তর পাশে যে পুকুরটি আছে ( অধীর বাবুর বাড়ির উল্টোদিকে ) সেটি বহু প্রাচীন । পুরনো হাটগুলোতে এরকম পুকুর থাকতোই ।

ছোটখিলের আদি বাসিন্দাদের মধ্যে মূলত মগ রিয়াং ও ত্রিপুরার প্রধান ছিল । তার পরে মুসলমানরা আসেন । এঁরা সম্ভবত শমসের গাজির সৈন্যদলেরই লোক । শমসের গাজির আত্মগোপনকালে তার সঙ্গে এসে বা পরবর্তী সময়ে শমসেরের মৃত্যুর পর এখানে এসে গা ঢাকা দিয়ে সংসার করেছেন । আমলিঘাতেই ছিল শমসের গাজির কিল্লা । তার নিদর্শন এখনো আছে ।

হিন্দু বাঙালিরা এখানে আসেন অনেক পরে । স্বাধীনতার কিছু আগে পরে । তবে তারও আগে নদীর ভাঙ্গনে রিক্ত ও নিঃস্ব হয়ে বরিশাল থেকে কিছু লোক এখানে এসেছেন । তাদের মূল পেশা ছিল এখানে আস্তানা গেড়ে নোয়াখালি ও চট্টগ্রামের সমতল জনপদে ডাকাতি করা । 

একসময় বন্যা ও বন্য শ্বাপদের সঙ্গে যুদ্ধ করে এখানকার মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়েছে । ছোটখিলের রানিরবাজার সংলগ্ন বাগানবাড়িতে এসে রাজারা অবস্থান করতেন এবং এখান থেকে এ অঞ্চলে শিকারে বেরোতেন । বাঘ, হরিণ, শূকর, খরগোস,সজারু, বনমোরগ, বনরুই আর হাতির অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র ছিল এই অঞ্চল । অনেকটা ময়ূরের মতো একধরনের পাখি ছিল । স্থানীয়ভাবে এগুলোর নাম ছিল মথুরা । আজকের প্রজন্ম এর নামও শোনেনি । শিকার, বিনোদন এবং খাজনা আদায়ের জন্য রাজারা এখানে একটা বাগানবাড়ি করেছিলেন । এই বাগানবাড়ির সর্বশেষ দায়িত্বে ছিলেন বৈকুণ্ঠনাথ রায় যাঁকে সাধারণ মানুষ বৈকুণ্ঠ আমিন বলেই ডাকতেন । এছাড়া  এখানকার অধিবাসী আরও দুই সহোদর আমিন ছিলেন । তাঁরা ছিলেন ব্রজেন্দ্র নাথ ও ললিত নাথ । স্থানীয় ভাষায় বড্ডা আমিন ও মাইজ্জা আমিন । চৌকিদার ছিলেন যাত্রামোহন নাথ ও পাথরাই ত্রিপুরা । আমলিঘাটে ছিলেন সতীশ শীল বা সতীশ গার্ড । আব্দুল লতিফ মুহুরী ছিলেন রাজার নিয়োজিত সেরেশতাদের ।প্রসঙ্গত, উল্লেখ করি যে প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকায় সংগৃহীত 'হাতিখেদার গান' পালায় এক জায়গায় সেই সময়ের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও তৎসন্নিহিত হাতিখেদা সমূহের যে বিবরণ আছে তার এক স্থানে পাই–

নলুয়া ছড়ার পারে আছে বন নুনা মাডি ।
খেদা বানায় কনো জনে গাছ গাছড়া কাডি ।।

এই নলুয়া ছড়াটি বর্তমান বটতলা বাজারের দক্ষিণ পশ্চিমে ফেনী নদীর অপর পাড়ে মিশেছে । বলাবাহুল্য এটা বর্তমানে বাংলাদেশে সীমার মধ্যে প্রবাহিত হয়ে ফেনী নদীতে পড়েছে । ত্রিপুরার রাজারা এখান থেকে হাতি শিকার করতেন । বর্তমানে যেখানে তাকিয়াবাড়ি বা মনুটিলা সেখান দিয়ে দলে দলে হাতি চলাফেরা করত । তখন এই অঞ্চলকে বলা হত হাতির দোয়াল । একটি তিনঠেঙে হাতি নিয়ে লোকপ্রচলিত মিথ একসময় এ অঞ্চলে ছিল । এছাড়া ছিল বাঘের উপদ্রব । আজ থেকে ৭০-৮০ বছর আগেও শ্রীনগরের রহমত আলী মিয়া ( রহমত আলী বলী ) ছিলেন বাঘের উপদ্রবের একমাত্র মুশকিল আসান  । তিনি এখানকার গোবিন্দ মাঠ অঞ্চলের বেতবন থেকে প্রচুর বাঘ মেরেছেন । এছাড়া মকবুল হোসেন বা 'মাক্কু হলবান' ( পালোয়ান ) নামে একজনের খালি হাতে বাঘ মারার কথা প্রচলিত ছিল । মাকু হলবানের একমাত্র ছেলে অনেক বছর আগে মনুবাজার স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ছিল । পরবর্তী সময় আর তার সংবাদ জানা যায় না ।

ত্রিপুরার রাজপরিবারের এই তালুকটি সঙ্গে রাজপরিবারের অনেকের নাম জড়িত বিস্তীর্ণ এলাকার চারটি গ্রাম বিজয়নগর, ব্রজেন্দ্রনগর, কল্যাণনগর ও রমেন্দ্রনগর নামের চারটি জনপদের সঙ্গে রাজপুরুষদের নাম জড়িত । গোটা পরগনাটির প্রাচীন নাম প্রভাবতীপুর পরগনা । চা বাগানটির নাম লীলাগড় টি এস্টেট । এই চা বাগানের মালিক ছিলেন লালুকর্তা অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্যধন্য ব্রজেন্দ্রকিশোর দেববর্মন । রবীন্দ্রনাথই তাঁকে সাব্রুমের এই তালুকটি আবাদ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন । চাবাগান সংলগ্ন তখনকার সময়ের একমাত্র হাটটির নাম ছিল রানীগঞ্জ বাজার বা রানির বাজার । এভাবে রাজঅন্তঃপুরের নারীদের নামও জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের নামের সঙ্গে । রানির বাজার একসময় ত্রিপুরার দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ বাজার ছিল । এখানে অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা কেন্দ্র খুলে বসে ছিলেন । ভারতের অন্য অংশ থেকে বিমানযোগে বিলোনিয়ার মাইছড়া বিমান ঘাঁটিতে পণ্য নিয়ে এসে এখান থেকে সংগ্রহ করে এই বাজারে  আনা হত । আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে প্রধান ছিল বস্ত্র ও নানা ধরনের মসলা, পাতার বিড়ি ইত্যাদি । এছাড়া রানির বাজারে ছিল বিরাট গরুর বাজার । ভারত ভুক্তির পর সীমান্ত কড়াকড়ির ফলে এবং এই বাজারে পরপর কয়েকবার আগুন লাগার ফলে সমৃদ্ধশালী ব্যবসায়ীরা একেবারে পথে বসে যান এবং তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন অনেকে আবার আগরতলা বা অন্যত্র তাদের ব্যবসা সরিয়ে নেন । আগরতলাস্থিত লক্ষ্মী বস্ত্রালয়ের মালিকের একসময় এই রানীর বাজারে বিরাট ব্যবসা ছিল ।

গত শতাব্দীর শুরুর দিকের হিসেব অনুযায়ী জানা যায় যে, সে সময়ে এ অঞ্চলে 'বাতেমা' নামে এক ধরনের কচু এবং সরিষার খুব ফলন হত । ফেনী ও মুহুরিগঞ্জ বাজারে এগুলো বিক্রি হত । এখানকার জমিতে উৎপাদিত কৃষিজ ফসল ও বনের বাঁশ, ছন ও অন্যান্য সামগ্রী এবং জুমের ফসল নদীপথে ভাটি অঞ্চলের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হত । সাবরুমের মনুঘাট থেকে মোষের দুধের দই যেত রামগড় বাজারে । ১০০ বছর আগে এখানে আখের গুড়ের মন ছিল দু টাকা । 

একসময় এ অঞ্চলে প্রচুর জলা জায়গা বা ঢেবা ছিল । ফেনী নদীর বারবার গতি পরিবর্তনের ফলে এই ঢেবাগুলোর সৃষ্টি । মূলত এগুলো ফেনী নদীর মধ্যগতি অঞ্চলে সৃষ্ট অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ সব । বছর পঞ্চাশেক আগে পর্যন্ত মাগুর শিঙয়ের অফুরন্ত ভান্ডার ছিল এই ঢেবাগুলো । এছাড়া ফেনী নদীতে ছিল নানা ধরনের অজস্র মাছ । বিশেষ করে এই নদীতে এককালে ইলিশ এবং গলদা চিংড়ি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত । এক সময় আমরিঘাট পর্যন্ত জোয়ার আসতো জোয়ারের জলে ভেসে প্রচুর সামুদ্রিক মাছ এখানে পাওয়া যেত । পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুহুরী প্রজেক্ট গড়ে তোলার জন্যে বাদ দেওয়ার ফলে নদীর এই অংশে জোয়ার ভাঁটার অবসান ঘটে । নানা রকমের মাছও আর পাওয়া যায় না ।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে এত বিশাল স্মৃতি নিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে আছে যে জনপদ তার নাম ছোটখিল কেন ? খুলে দেখা যাক এর নামমাহাত্ম্য । স্থানীয় ভাষায় 'খিল' শব্দের অর্থ পতিত বা খালি । বিরল জনবসতির কারণে বা বন্যার কারণে ছোট্ট এই রাজতালুকটি প্রায়ই খিল বা পতিত থাকত । সেই কারণেই এর নাম ছোটখিল হতে পারে । এছাড়া এর একটা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা খোঁজারও চেষ্টা করা যেতে পারে । 'কিল্লা' শব্দের অর্থ দুর্গ । চট্টগ্রামী বাংলা উচ্চারণ প্রভাবে স্থানীয় উচ্চারণে শ্বাসঘাতের ফলে তা 'খিল্লা' হতে পারে । সেই হিসেবে শমসের গাজীর আমলিঘাটের মূল দুর্গ বা কিল্লার পরে এখানে হয়তো একটা ছোট কিল্লা ছিল । যেখানে তিনি আত্মগোপন করতেন । বর্তমান রানিরবাজার এবং বটতলা বাজারের মাঝামাঝি এলাকায় রাস্তার বা পাশে পঞ্চায়েত অফিসের আগে রক্ষিতদের ঢেবার পাড়ে বহু আগে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদটি আসলে একটি দুর্গ ছিল  । এর গর্ভগৃহটি পরবর্তী সময়ে মুসলমানরা কবর হিসেবে ব্যবহার করতেন । সেটা থেকেও ছোটকিল্লা>ছোটখিল্লা>ছোটখিল হতে পারে ।

যাক এ অঞ্চলের ইতিহাস ধরে রাখার কোন প্রচেষ্টা কোন কালই হয়ে ওঠেনি তাই কালো স্রোতে অনেক কিছুই ভেসে গেছে হারিয়ে গেছে যথার্থ গবেষণার ফলে আগামী দিনে অনেক তথ্য উঠে আসবে অতীত কথা বলে উঠবে তার জন্য দরকার উত্তম উদ্যোগ আর উৎসাহ ।