Wednesday, December 31, 2025

বেগম খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে দেশের কর্ণধার

বেগম খালেদা জিয়া : গৃহবধূ থেকে দেশের কর্ণধার

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

মনে পড়ছে একাত্তরের ঝড়ো দিনগুলোর কথা । ওপার বাংলায় তখন নতুন দিগন্তরেখা । ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হচ্ছে রক্তিম আলোকচ্ছটায় । স্বাধীনতাকামী আকিশোর-বৃদ্ধ-বণিতা নেমে পড়েছে রাজপথে । ২৫ শে মার্চের পর থেকে সে আন্দোলন আরো সংগঠিত রূপ নেয় । সেদিন আমাদের এই সাব্রুমের অপর প্রান্তে ফেনীনদীর দক্ষিণ পাড়ে রামগড় হাইস্কুলের মাঠে চলেছে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ । প্রশিক্ষণের নেতৃত্বে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান । এক দীর্ঘ সময় রামগড়কে পাক হানাদারমুক্ত রেখে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন । 

একসময় পাকবাহিনী রামগড় দখল করে নিলে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী চলে আসেন সাব্রুম ।সাব্রুমের হরিনা গ্রামসংলগ্ন গরিফা অরণ্যভূমিতে । করা হয় মুক্তিফৌজের ক্যাম্প ও একনম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার । প্রথমদিকে দায়িত্বে ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান । এখানেও তিনি যুবকদের একত্রিত করে ট্রেনিং পরিচালনা করতেন । তারপর মুক্তিবাহিনীকে পাঠাতেন দেশের অভ্যন্তরের লড়াই করার জন্য । এক নম্বর সেক্টরের সবগুলো সাব-সেক্টরের মধ্যে সাব্রুমের শিলাছড়ি, ঘোড়াকাঁপা থেকে শুরু করে ঋষ্যমুখ, মতাই পর্যন্ত তিনি চরকির মতো ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহিত করতেন । রণকৌশল নির্মান করতেন । রণাঙ্গনের নেতৃত্ব দিতেন । কখনো দিনে বা রাতে খেতে আসতেন সাব্রুম-ছোটখিল রোডের মুখে বাঁ-পাশে মাখন দে-র হোটেলে ।

সারাক্ষণ বাংলাদেশকে স্বাধীন করার চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন এই উচ্চপদস্থ সেনানায়ক । এতকিছুর মধ্যেও তাঁর মনে সুখ ছিল না এতোটুকু । তিনি সংবাদ পেয়েছেন তাঁর সহধর্মিনী বেগম জিয়া ও দুই প্রাণপ্রিয় সন্তান ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বন্দি অবস্থায় আছেন । তিনি চঞ্চল হয়ে উঠলেন । নানাভাবে তিনি খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন । খবর পেলেন ২রা জুলাই ঢাকা সিদ্ধেশ্বরীর এক বাসা থেকে পাক সেনারা বেগম জিয়াকে তার দুই সন্তান সহ ধরে নিয়ে গেছে । ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট ২৪ বছর বয়সে যখন তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন ছিলেন । তখন মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী খালেদাকে বিয়ে করেন । এর মধ্যে তাঁদের দুটি সন্তান আসে । মাত্র ১০-১১ বছরের দাম্পত্যজীবন  সেসময় । স্ত্রী ও পুত্রগণের বন্দী হওয়ার সংবাদে তিনি আরো মারমুখী হয়ে উঠেছিলেন । ধ্বংস করছিলেন একের পর এক পাকঘাঁটি । বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণাঞ্চল মুক্ত রাখা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা এনে দিয়েছিল ।

 ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন । ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি পান । বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতা এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ১৯৮১ সালে যখন হত্যা করা হয় সেই প্রেক্ষাপটে বিপর্যস্ত বিএনপিকে টিকিয়ে রাখতে বেগম খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেছিলেন । রাজনীতিতে আসার আগ পর্যন্ত তিনি একজন সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন । দলের সাধারণ সদস্যপদও তাঁর ছিল না । গৃহবধূ থেকে পরবর্তী সময়ে আপোসহীন নেত্রী ও তারপরে দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হন তিনি । ১৯৯১–৯৬ এবং ২০০১–২০০৬ এই দুই মেয়াদে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক পরিপূর্ণতা আসে । তাঁর গৃহীত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গতি দিয়েছে । তিনি বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যে থেকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন । তাঁর সময়েই  পোশাক তৈরি ও রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতির বিস্তার লাভ ঘটে ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অবদান রাখে । শিক্ষা ও গবেষণামূলক কার্যক্রমের প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে । বিশ্বরাজনীতিমহলেও তিনি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।  আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাফল্য আসে । বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব ফেলেছিল তাঁর সরকার অর্থনীতিতে উদারীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করায়,  যার ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন সুযোগ উন্মোচিত হয়েছিল । প্রতিবেশী ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছিল । ভারতের সাথে সাম্যতা রেখে সবার সাথে কানেক্টিভিটি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল । যদিও ভারতের সাথে বিএনপি সরকারের কতটা সুসম্পর্ক ছিল তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে । কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে চলতে থাকা দীর্ঘকালীন সংকট তিন বিঘা করিডোর পালাক্রমে ৬ ঘন্টা করে দুই দেশের জন্য উন্মুক্ত হয়েছিল তাঁর আমলেই ১৯৯২ সালের জুন মাসে । তবে তার সময়ে সুশাসনে ঘাটতিও ছিল প্রচুর । তিনি সবসময় একদল স্তাবক পরিবৃত থাকতেন

তাঁর বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার উত্থান-পতন, মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব, মামলা-মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা, জুলুম, নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন তিনি । স্বামী ও কনিষ্ঠপুত্র আরাফাত রহমানকে হারানোর গভীর শোকজনিত ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও দীর্ঘ শারীরিক জটিলতা ও রোগযন্ত্রণা বয়ে বয়ে তাঁর জীবনের যবনিক নেমে আসে । 

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়ানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে । বর্তমান বাংলাদেশের অস্থির ও অনিশ্চিত সময়ে তাঁর চিরপ্রস্থান সেদেশের সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে ।

Monday, December 22, 2025

পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেই দিন–বক্সনগরে

পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেই দিন–বক্সনগরে

অশোকানন্দ রায়বর্ধন


বাবার সরকারি চাকুরির সুবাদে শৈশব থেকেই শুরু আমাদের পরিযায়ী জীবন । তা থেকে আজও মুক্তি পাইনি । আজ এখানে তো কাল সেখানে । কোথাও থিতু হয়ে বসতে পারলাম না । জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে অতীতের সেই ভাসমান দিনগুলোর কথা প্রায়শই মনে পড়ে । বাবার ছিল বদলির চাকরি । তাই তিনি যেখানে যেতেন সঙ্গে তাঁর পরিবারবর্গকেও নিয়ে যেতেন । ফলে আমাদের সেই দিনগুলোতে ঘরের আসবাব বলতে কিছুই ছিল না । চাকরিতে বদলির সরকারি নির্দেশ আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের রওনা হতে হত পোটলাপুটুলি বেঁধে । একেকবার বদলি হয়ে নতুন জায়গায় গেলেই পেছনে ফেলে আসা সেই ভূমিকে এবং আমার শৈশবের বন্ধু-বান্ধবের কথা বেশ কিছুদিন মনকে খুব নাড়া দিয়ে যেত । যদিও এই অভিজ্ঞতাটা আমার পরবর্তী জীবনের অনেক অমূল্য সম্পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে । আমার সৃষ্টিতেও সেইসব বিষয়গুলো এসেছে । আর এখন জীবন সায়াহ্নে এসে সেই দিনগুলোকে মনে করে এক স্বর্গীয় তৃপ্তি অনুভব করি ।

১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে আমার বাবা পেচারথল পি এইস সি থেকে বদলি হয়ে বক্সনগর দাতব্য চিকিৎসালয় জয়েন করেন । তখনকার দিনে ছোটো আকারের বাসে চড়ে আমরা প্রথম দিন আগরতলায় আসি । সেখানে একরাত্রি বাসের পর পরদিন সকালে আমরা প্রথমে এসে নামি বিশালগড় বাজারে । সেকালের বিশালগড় বাজার এখনকার মতো এত জমজমাট বা ঝাঁ চকচকে ছিল না । রাস্তার দুপাশে ছোটো ছোটো ছন বাঁশের বেড়ার ঘর ছিল । কোনো কোনো দোকানের গদিটা ছিল বাঁশের মাচার । এমনই একটা তরজার ঝাঁপ ফেলা ঘরে ছিল তখনকার সময়ের বাস সিন্ডিকেটের অফিস । আমাদের বাস এসে সেখানে থামে । আমার মনে আছে বাসটার নাম ছিল 'লাকি দুলু' । বাবা আমাদের বাস থেকে নামিয়ে সিন্ডিকেট অফিসে বসিয়ে রাখলেন । তারপর খোঁজ নিয়ে জানলেন বক্সনগরের রাস্তা কতদূর । একটু এগিয়ে গিয়ে ডান দিক ধরে বাজারের ভেতর দিয়ে বক্সনগরের রাস্তাটা গেছে । তখনকার হিসেবে সিন্ডিকেটের মাস্টার জানালেন বক্সনগরের দূরত্ব প্রায় ১২ মাইল । বাবা ভদ্রলোককে তাঁর পরিচয় দিলেন এবং এই ১২ কিলোমিটার রাস্তা তিন শিশুসন্তানকে নিয়ে কিভাবে যাবেন সে বিষয়ে দুশ্চিন্তার কথা তাঁকে জানালেন । সেই ভদ্রলোক তখন দৌড়ঝাঁপ করে খোঁজখবর করতে লাগলেন বক্সনগর থেকে মালামাল নিয়ে কেউ এদিকে এসেছে কিনা । তাহলে তাঁদের ফিরে যাবার সময় আমাদেরকে তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেবেন এবং জিনিসপত্রগুলো তাঁরা বয়ে নিয়ে যাবেন । যাই হোক ভদ্রলোকের সহৃদয় প্রচেষ্টার পরে দুজন লোককে পাওয়া গেল । তাঁরা বক্সনগর থেকে মালামাল নিয়ে এখানে এক ব্যবসায়ীর দোকানে এসেছিলেন । কিছুক্ষণ পরে তাঁরা ফিরে যাবেন । সিন্ডিকেট মাস্টার ভদ্রলোকের নির্দেশ মতো প্রায় দশটার দিকে দুই ভদ্রলোক তাদের হাতে মাল বয়ে নিয়ে যাবার বাঁশের বাঁক ও দড়ি নিয়ে অফিসে এলেন । আমাদের কাছে মালপত্র তেমন কিছু নেই । সামান্য যা কিছু ছিল একজন তাঁর হাতের দড়ি দিয়ে বেঁধে বাঁকের দুপাশে ঝুলিয়ে নিলেন । বাবা ও মা হেঁটেই যাবেন । তাঁদের কোলে থাকবে আমাদের ছোটোভাইটি । সমস্যা হল আমরা বড়ো দুইভাইকে নিয়ে । একজনের বয়স ৮ এবং অন্যজন ৬ বছর মাত্র । কিছুতেই ১২ কিলোমিটার পথ আমাদের পক্ষে হেঁটে পাড়ি দেওয়া সম্ভব নয় । এ নিয়ে সবাই ভাবনায় পড়লেন । সে সময় আমাদের নিতে আসা দুজনের একজন একটা উপায় বার করলেন । তিনি আমাদের দুই ভাইকে তাঁর বাকের দু'পাশে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে বসার ব্যবস্থা করতে পারলে আমাদের বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন বলে জানালেন । আমাদের পোটলাপুটলির মধ্যে সম্বল ছিল দুটো কাঁঠালকাঠের পিঁড়ি । মা বস্তার ভেতরে রাখা পিঁড়ি দুটো বের করে তাদের দিলেন । ভদ্রলোক আমাদের দুজনকে দুটো পিঁড়িতে বসিয়ে তাঁর কাঁধের বাঁকে ঝুলিয়ে রওনা দিলেন । এভাবেই আমরা দুই বিচ্ছু ভাই 'পালকি চলে পালকি চলে / গগন তলে আগুন জ্বলে' ছড়াটি বলতে বলতে বাকের দুলনির সঙ্গে দুলতে দুলতে বক্সনগর চললাম । কিন্তু আমাদের চঞ্চল নড়াচড়ায় বাহক ভদ্রলোকের ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল । তিনি মাঝে মাঝে আমাদের ধমক দিচ্ছিলেন ।

 এভাবে পথে বেশ কয়েকবার জিরিয়ে নিয়ে আমরা বিকেল চারটার দিকে বক্স নগরে এসে পৌঁছাই । সে সময় বক্সনগর দাতব্য হাসপাতালটি বাজারের একেবারে শেষপ্রান্তে নিবারণ সাহার বাড়ি ও দোকানের লাগোয়া ছিল । নিবারণবাবুর বাড়ির পরেই টিলাটা শেষ এবং ঢালু বেয়ে ছরার দিকে চলে গেছে । ওপারে বক্সনগর স্কুল মাঠ ও পুণ্যমতি গ্রাম । হাসপাতালের পেছনে একটি তরজার ছাউনি ও বেড়ার ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হল । পাশের নিবারণবাবুর বাড়ির সদস্যরা এসে আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গেলেন এদিন আর রান্নাবান্না না করার জন্য মাকে অনুরোধ করে গেলেন এবং রাত্রিতে তাদের ঘরে অন্নগ্রহণের আমন্ত্রণ করলেন । সেই থেকে এই পরিবারটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় শুরু এবং যতদিন আমরা বক্সনগর ছিলাম ততদিন তাঁদের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা ছিল । এই পরিবারের বড় দাদাটির নাম ছিল সম্ভবত বিভূতি । তারপরে কানুদা তারপরে সম্ভবত নারায়ণ ও বিজয় । আমার ভুলও হতে পারে । সবার নাম এখন আর মনে পড়ছে না । কানু সাহা অর্থাৎ কানুদা আমাদের চেয়ে বড়ো । তিনি আমাদের ছোটো ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন । এই দিনেই কিছুক্ষণ পরে এসে দেখা করে যান ডাক্তারবাবু হরেন্দ্র চক্রবর্তী । প্রায় আমার বাবার বয়সী তিনিও সপরিবারেই বক্সনগরেই থাকেন । পরদিন এই কানুদার সঙ্গেই আমি ও আমার ভাই অসীমানন্দ বক্সনগর স্কুলে যাই ভর্তি হওয়ার জন্য । ছোটোভাই বিবেকানন্দ তখন কোলের শিশু । দেড় বা দুবছর বয়স । বাবার ডিসপেনসারির সময় থাকায় আমাদের সঙ্গে যেতে পারেননি । তবে সকালবেলায় স্কুলের শিক্ষক মহাশয়দের সঙ্গে তাঁর এক প্রস্থ পরিচয় হয়ে গিয়েছিল । তাঁরাই আমাদের স্কুলে যেতে বলেছিলেন । ধীরে ধীরে স্কুলে আমরা সবার সঙ্গে মানিয়ে নিতে থাকি । যেহেতু আমরা উত্তর ত্রিপুরা থেকে এসেছিলাম তাই আমাদের কথায় একটা সিলেটি টান থাকত । এখানকার মানুষের মুখের ভাষায় ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার টান । ফলে ছোটো বয়সে যা হয়, আমাদের দুই ভাইয়ের কথাবার্তা নিয়ে সহপাঠীরা মশকরা করত । ধীরে ধীরে আমরা তা কাটিয়ে উঠি । আমার সঙ্গে যারা পড়ত তার মধ্যে যতটুকু মনে পড়ে কানুদাদের কোনো এক ভাই নারায়ন বা বিজয়, বিভীষণ বণিক, নিখিল দাস, আবু তাহের, মোখলেসুর রহমান, আব্দুল মোনাফ, সুবোধ নাথ, অমূল্যরতন পাল, ফটিক মজুমদার এবং ডাক্তারবাবুর ছেলে অজিত চক্রবর্তী । ডাক্তারবাবুর বড়ো ছেলে রঞ্জিত আমার একক্লাশ উপরে ছিল । এর মধ্যে আবার ফটিক ভৌমিক ওরা আমাদের পারিবারিক আত্মীয় । ফটিকের বাবা বক্সনগর তহশীল অফিসের তহসিলদার ছিলেন ।  ফটিকের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার সূত্র হলো রাজ্যের একসময়ের বিশিষ্ট সাঁতারু রতনমণি রায়চৌধুরী ছিল তার মাসি এবং রতনমণি রায়চৌধুরী সম্পর্কে আমাদের পিসি হন । এই পিসিদের বড় ভগ্নিপতি ফটিকের মা । ফটিকরা তহশীল অফিসের পিছনে সরকারি কাঁচাঘরে থাকত । সুবোধের বাবা ছিলেন চিকিৎসক । বক্সনগর বাজারে তার ওষুধের দোকান ছিল । বিভীষণের পরিবার সদ্য পাকিস্তান থেকে উঠে আসে । তার দাদা নারায়ণ বণিক বাজারে একটি বাজে মালের দোকান শুরু করেন । আবু তাহেরের বড়ো ভাই বক্সনগর স্কুলের শিক্ষক ছিলেন (তাঁর নামটা এখন আমার আর মনে নেই) । তবে তাঁদের সম্পর্কে একটা ঘটনা এখনো আমার মনকে নাড়া দেয় । অমূল্যরতনরা পরে এখান থেকে চলে গিয়ে আমবাসা বাড়ি করে । কুলাই থাকাকালীন তার পঙ্গে আমার দেখা হত ।

শিক্ষক মহাশয়গণ ছিলেন খুব আন্তরিক । স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন থেকেই তাঁরা আমাদের প্রতি খুব যত্ন নিতেন । প্রধানশিক্ষক ছিলেন নলিনীকান্ত আচার্য । এছাড়া অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বর্ষীয়ান প্রফুল্ল কুমার আচার্য, গৌরাঙ্গ চন্দ্র দাস, তাজুল ইসলাম স্যর, চিত্ত রায়, গুপ্ত স্যর, শাজাহান স্যার এবং রমেশ দাস । আমরা বিদ্যালয়ে পাঠকালীন সময়ে রমেশ দাস স্যার ট্রেনিং নেওয়ার জন্য কাঁকড়াবন চলে যান । কিন্তু কিছুদিন পরেই তাঁর বোধহয় কোনো মানসিক সমস্যা হয় এবং তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন বলে জানা যায় । শৈশবের সেই ঘটনাটি আমার মনে খুব নাড়া দিয়েছিল । এরকম আরো একটি প্রশ্নবোধক ঘটনা আজও আমার মনে মাঝে মাঝে জেগে ওঠে । আমাদের বন্ধু আবু তাহেরের দাদা (তার নামটা আমার মনে নেই) আমাদের শিক্ষক ছিলেন । তিনি এবং শাহজাহান স্যার একসঙ্গে চলাফেরা করতেন । হঠাৎ একদিন আমরা শুনতে পাই এই দুজন স্যারের চাকরি চলে গেছে কোন এক অজ্ঞাত কারণে । দুজন শিক্ষকই ভীষণ ছাত্রবৎসল ছিলেন । তাছাড়া শাজাহান স্যারের বড় মেয়ে সম্ভবত বিউটি নাম আমাদের একক্লাশের সিনিয়র ছিল এবং আমাকে খুব স্নেহ করত । একেবারে সীমান্ত সংলগ্ন তাদের বাড়িতে গিয়ে শৈশবে আমি বড়ই গাছ থেকে বড়ই পেড়ে খেয়েছি । তাঁদের হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া ব্যাপারটা আজও আমার মনে প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ঘোরাফেরা করে ।

বক্সনগরে সে আমল থেকেই হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলিত বসবাস । গ্রামবাসীদের প্রত্যেকের সঙ্গেই ছিল আন্তরিক সম্পর্ক । চিকিৎসায় সুফল পাওয়ার সুবাদে অনেক মুসলমান বয়স্ক মহিলা ও পুরুষ আমার বাবাকে আব্বা এবং মাকে আম্মা বলতে দেখেছি । তারা বয়স্ক হলেও আমাদের ভাইদের ভীষণ আদর করতেন । তাঁদের কেউ কেউ বাড়ি থেকে দুধ, খেতের ফসল, খেজুরের গুড় ইত্যাদি নিয়ে আসতেন । বাবা বকাঝকা করলেও গোপনে মার কাছে গছিয়ে দিয়ে যেতেন ভাইদের খাওয়ানোর জন্য । আজ কারোর নাম মনে নেই । চেহারাও মনে নেই কিন্তু সেদিনের কথাগুলো মনে পড়লে আজও হৃদয়ের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে । তখনকার মানুষের মধ্যে কোনরকম ভেদাভেদ ছিল না আন্তরিকতা ছিল প্রচুর । 

ছোট্ট বক্সনগরে সে সময়ে দুর্গাপূজা করতেন ধীরেন্দ্র সাহা নামে এক তরুণ ব্যবসায়ী ।  তাঁরা অল্প কিছুদিন আগে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে এখানে এসে বসতি ঘরে ছিলেন । সেখানকার বর্ধিষ্ণু পরিবার এখানে জমিজমা বদল করে আসায় তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল খুবই । তাঁদের সঙ্গে তাঁদের গ্রামের এবং আত্মীয়স্বজন অনেকেই বক্সনগর এসে এভাবে বসতি করেছিলেন । ফলে দেশ বাড়ির সম্পর্কের বাঁধনটা রয়ে গিয়েছিল । ধীরেন্দ্রবাবুর ভাই  সুনীল সাহা শিক্ষক ছিলেন । বড় ভাই তাঁকে পড়াশোনা করিয়ে বিয়েথা করিয়েছিলেন । আমরা সেই বিয়ের নিমন্তন্ন খেয়েছিলাম । পুজোর সময় ধীরেন্দ্র সাহার বাড়িতে গ্রামের সব মানুষ অংশগ্রহণ করতেন । একবার পুজোর সময় ধীরেন্দ্র সাহার বাড়িতে কোন একটা অশৌচকালীন সংস্কার পালনন চলছিল । অশৌচের মধ্যে দুর্গাপুজো করার নিয়ম নেই । তখন তাঁর প্রতিমা তৈরি প্রায় শেষ । সে অবস্থায় তিনি আমার বাবার উপর পুজোর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন । ধীরেন্দ্র সাহা নিজেই প্রতিমা গড়তেন । তাঁর প্রতিমা ছিল সাবেকি ধরনের । একবার তিনি বড়ো কাঠামের পাশাপাশি ছোটো আকারের একটি দুর্গামূর্তি গড়েন এবং সেই মূর্তির সামনে পূজারত রামচন্দ্রেরও একটি মূর্তি করেছিলেন । বাজারের উপরে বাচাই ঘরেই তিনি মূর্তি করতেন আমরা স্কুলে যাওয়া আসার সময় বেশ কিছুটা সময় তার মূর্তি নির্মাণকৌশল অবাক হয়ে দেখতাম । বাজারের একপাশে সবসময় একটি রথ দাঁড়ানো থাকত । রথের সময় এটা টানা হত । তারও উদ্যোক্তা ধীরেন্দ্র সাহাই । পুজো করার পাশাপাশি ধীরেন্দ্র সাহা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও জড়িত ছিলেন । পুজোর সময় তাঁর উদ্যোগে যাত্রা অনুষ্ঠান হত । সেই যাত্রাপালায় তখনকার সময়ে বক্সনগরের থানা তহসিল, স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য সরকারি অফিসের কর্মচারীগণসহ বক্সনগরের বিশিষ্ট হিন্দু-মুসলমানগণ অংশগ্রহণ করতেন । তখনকার সময়ে প্রায় সারারাত ধরেই যাত্রাপালা হত । 'শেষ নামাজ' নামে একটা যাত্রাপালার কথা আমার এখনো মনে আছে । এছাড়া পৌরাণিক যাত্রাপালাও তাঁরা করতেন । সেই যাত্রাপালায় আমার বাবা একবার সূর্যদেবের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছিলেন । বক্সনগরে শ্রাবণমাস জুড়ে মনসামংগলের গান বা পদ্মাপুরাণ পাঠ হত প্রায় প্রতি বাড়িতে । এ গ্রামে দু তিনটে মনসামঙ্গল পাঠের দল ছিল । পাঁচনাইল্লা থেকে একটা মনসামঙ্গলের দল আসত । পৌষ সংক্রান্তির আগের রাত্রে হত বেড়ার ঘর তৈরি এবং সেখানে রাত্রিবাস ও বনভোজন । ভোরবেলা স্নান করে সেই ঘরে আগুন দেওয়া হত এবং সুর করে ছেলেরা নানারকম ছড়া আওড়াত । বাজারের টিলাটার এক প্রান্তে থানা অবস্থিত হওয়ায় এর নাম ছিল থানার টিলা । আর উল্টোদিকে ছড়ার ওপারে গ্রাম হল পুণ্যমতি । সংক্রান্তির দিন ভোরবেলা দুই পাড়ের ছেলেরা একে অন্যকে উক্তি করে ছড়া কাটত  এই বেড়ার ঘর পোড়ানোর সময় । তেমন একটি ছড়া এখনো আমার মনে আছে । যেমন থানা টিলার ছেলেরা বলত, 'গাঙ্গে দিয়া ভাইস্যা গেল আইট্টা কলার থুর, / হগল গাঁইয়ায় সাক্ষী আছে পুণ্যমতি চুর' । সেরকম পুণ্যমতির ছেলেরাও ছড়া কেটে উল্টো থানার টিলার দোষারোপ করত ।  বসন্তে দোলপূর্ণিমায় হত দোল উৎসব । ধীরেন্দ্র সাহার বাড়িতে দোল ও ঝুলন দুটোই পালিত হত । দোলের সময় হোলির গান গেয়ে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে সবাই রঙের উৎসবে মাততেন । সেকালে থানার একজন দারোগা ছিলেন যিনি নাকি ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সদস্য । তাকে সবাই কর্তা বলে ডাকতেন । তিনি খুব সুন্দর হোলির গান গাইতে পারতেন । গানের দলে তিনি ছিলেন মধ্যমণি । চৈত্র সংক্রান্তিতে বাজারের উল্টোদিকে হরিমঙ্গল ছরার ওপারে ধান খেতে হত চড়ক গাছঘুরানি । একে কেন্দ্র করে হত প্রচুর লোকসমাগম ও মেলা বসত । তখনকার সময়ে বাজারের আশেপাশে বসতির মানুষের স্নানের ও পানীয়জলের উৎস ছিল এই হরিমংগল ছরা । কিছুদূর গিয়ে ছরাটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে । ছরাটিতে সেকালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত । ছোটোদের সাঁতার ও জলকেলির স্থান ছিল এই ছরা । বর্ষাকালে স্রোতের বেগও ভীষণ বেড়ে যেত ।

 বক্সনগর দাতব্য হাসপাতালে আমার বাবার সহকর্মী একজন ছিলেন শচীন্দ্র চক্রবর্তী । সে সময়ে বয়সে তরুণ শচীন্দ্র মামা এলাকার সবার প্রিয়পাত্র ছিলেন । তিনি তাঁর কারিগরি জ্ঞানের সহায়তায় পুরোনো রেডিওর স্পিকার খুলে মাইক্রোফোন বানিয়ে সেসময়ের নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পর্কে বাজারে ঘোষণা দিতেন এবং তিনি নিজেও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন । বক্সনগর স্কুলেও ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হত । গোডাউনটি তখন খোলামেলা ছিল । নাট্যানুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সেখানে হত ।শিক্ষকদের মধ্যে গৌরাঙ্গ স্যার এসব ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিতেন । অন্য শিক্ষকরা তাঁকে সহায়তা করতেন । ছোটো ছেলেরা খেলাধূলার মধ্যে লাডুমখেলা, গুল্লি খেলা, দাগ্গি খেলা, পিছলাগুটি দিয়ে বন্দুকবাজিসহ কাবাডি, ফুটবল, দাইরাবান্দা ইত্যাদি নিয়ে মেতে উঠত । বক্সনগর মাঠে বড় ফুটবল খেলার ম্যাচ হত । এই ম ঠের পাশে একবার একটি বাঘ মারা পড়েছিল । আমরা গিয়ে দেখি কিছু মানুষ তার চামড়া সংগ্রহ করছে । 

সেকালে সবার মধ্যে একটা মধুর সম্পর্ক ছিল ।  মাঝে মাঝে বনভোজন হত সবাই মিলে । ১৯৬৪ সালের মে মাসে গরমের ছুটিতে সবাই মিলে বনভোজনের আয়োজন হয় । উদ্যোক্তা ছিলেন অলরাউন্ডার শচীন্দ্র মামা । সবাই মিলে জিনিসপত্র নিয়ে রওনা হই ভেলুয়ার চর । সঙ্গে বিনোদনের সরঞ্জাম হল রেডিও এবং গ্রামোফোন । রান্নাবান্নার উদ্যোগ চলছে । হঠাৎ রেডিওতে ভেসে এল দুঃসংবাদ । প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রয়াত হয়েছেন । কিসের বনভোজন কিসের কি ! সবাই শোকাহত । স্থগিত হয়ে গেল বনভোজন । সবাইকে ফিরে আসতে হল । দিনটি ছিল ২৭শে মে । সেটাও আমার মনে থাকবে চিরদিন ।

বক্সনগরের চারদিকে সে সময়ে প্রচুর খালি জায়গা ছিল । এই থানার টিলার উপরে যেখানে একটি বড়ো গোডাউন আছে তার পাশের লুঙ্গাটি লম্বালম্বি অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত । একদিকে ছরা ও তার পাশের রাস্তা আর অন্যদিকে থানার কোয়ার্টার্স পর্যন্ত ছিল তার বিস্তৃতি । গোডাউনটার ঠিক পাশেই এই লুঙ্গার মধ্যে বন কেটে এখান থেকে ছনবাঁশ সংগ্রহ করে আমরা এবং ডাক্তারবাবুর পরিবার দুটি ছনের বেড়া ও ছনের ছাউনি দেওয়া ঘর তৈরি করে পাশাপাশি বসবাস করতাম । ছনের বেড়া গোবর মাটি দিয়ে লেপে দেওয়া হত । তাতে আর ফাঁকফোঁকর থাকত না এবং শীতকালে ঠান্ডাও লাগত না । ঘরের পাশেই ছিল দুটি বড়ো বড়ো কাঁঠালগাছ । প্রচুর কাঁঠাল ধরত । খুব সুস্বাদু কাঁঠালগুলি আমরা খেয়ে শেষ করতে পারতাম না । বাড়ির আশেপাশে খেতকৃষি করার মতো প্রচুর খালি জায়গা ছিল । আমাদের দুই পরিবার সেখানে যার যার প্রয়োজনীয় ক্ষেতের ফসল ফলাতাম । ফলে কাঁচা তরিতরকারি আমাদের কিনতে হত না । সেসময় এ অঞ্চলে ছিল প্রচুর খেজুরগাছ । আমাদের বাসস্থানের পাশেই ছিল বেশ কিছুটা জমি । সেখানে স্থানীয়রা চাষ করতেন । জমি পেরোলেই টিলা । সেখানে ছিল প্রচুর আম, জাম ইত্যাদি ফলের গাছ । জমিতে চাষ দেওয়ার সময় জমির মালিকরা আমাদের ডাকতেন । কারণ তাঁদের হালের বা মইয়ের পেছনে হাঁটলে সেসময় প্রচুর নানা ধরনের ছোটোমাছ, কাঁকড়া ও ছোটো কচ্ছপ পাওয়া যেত । আমরা সেই মাছ সংগ্রহ করে আনলে মা রান্না করে দিতেন । তখনকার সময়ে খেতে পাওয়া সেই মাছের কি অপূর্ব স্বাদ ছিল । 

বক্সনগরের অধিকাংশ হিন্দুরা সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান থেকে উঠে এসে এখানে বসতি গড়ছেন । কেউ কেউ দেশের জমিজমা বদল করে এসেছেন । কেউবা কপর্দকশূন্য অবস্থায় উঠে এসে নতুনভাবে জীবন গড়ার প্রয়াস নিচ্ছেন । মুসলমানরা ছিলেন প্রাচীন বাসিন্দা এবং তাঁরা বর্ধিষ্ণু ও সম্পদশালী ছিলেন । কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করার জন্য আনতেন । তখনকার সময়ের জিনিসপত্রের দর ছিল খুবই কম । মেট্রিক পদ্ধতিতে পরিমাপ তখনো সেই বাজারে চালু হয়নি । চালের সের ছিল চার আনা । তাও অনেকের কেনার সাধ্য ছিল না । এই চালের সের যেবার চার আনা থেকে পাঁচ আনা হল সেবার বাবা ও অন্যান্য বয়োজ্যেষ্ঠরা বলাবলি করতে শুরু করলেন যে ছেলেমেয়েদের আর বাঁচাতে পারবেন না । ছোটোমাছ বড়জোর আট আনা সের । রুই, কাতলা, কালিবাউশ ২ টাকা সের । শিং-মাগুরের দর আট আনা বেশি থাকত । যে কোনো শুঁটকি ১ টাকা সের । তবে নোনা ইলিশ চোরাই পথে পাকিস্তান থেকে আসত । তার সের ছিল ২ টাকা । ডিমের হালি দু আনা । কাঁচা সবজির মধ্যে আলু, মূলো, ঝিঙে, ধুন্দুল, ঢেঁড়স ইত্যাদির সের চার পাঁচ পয়সার বেশি ছিল না । আম জাম কাঁঠাল পেয়ারা কলা বেল ইত্যাদি কোন ফলই বাজারে বিক্রির চল ছিল না । প্রতি বাড়িতেই নানা ফলের গাছ ছিল । কারো বাড়িতে না থাকলেও অসুবিধে ছিল না । একে অন্যের বাড়ি থেকে চেয়ে চিনতে নেওয়া যেত । শীতকালে আট আনা সের প্রচুর খেজুরের রাব বা লালি পাওয়া যেত । খেজুরের রস ছিল পাঁচ পয়সা সের । বাজে মালের মধ্যে ডাল আট আনা/দশ আনা, দেশলাই বাক্স ৫ পয়সা চারমিনার সিগারেট ১২ পয়সা প্যাকেট, কেরোসিন তেল কুড়ি পয়সা, সাদা কাগজ চার আনা দিস্তা, ব্রিটানিয়া থিন এরারুট ১০ পয়সা প্যাকেট, ছোটো বিস্কিটের প্যাকেট ৫ পয়সা, চকলেট প্রতিটি এক পয়সা ।

এত সুখ, স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেও রাত নেমে এলেই বক্সনগরের বুকে ছড়িয়ে পড়ত অজানা আতঙ্ক । সেসময়ে প্রতিরাতেই বক্সনগরে ডাকাতি হত । পাকিস্তান থেকে সশস্ত্র ডাকাতদল এসে এপারের জনপদে ডাকাতি করত । পেছনে ইপিআরের ইন্ধন থাকত । রাত নামলেই গৃহস্থরা ঘরের দরজা জানালা শক্তপোক্ত করে বেঁধে রাখত । অনেকসময় গোয়ালঘরের গোরুগুলিকেও নিজেদের থাকার ঘরে নিয়ে আসত । তারপরেও রেহাই ছিল না । ডাকাতদল সঙ্ঘবদ্ধভাবে ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গৃহস্থের বাড়ি আক্রমণ করত এবং তাদের ধনসম্পদ ও গবাদি পশু লুঠ করে নিয়ে যেত । টের পেলে গ্রামবাসীদের মধ্যে প্রতিরোধও হত এবং ঢাকার দলের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটত প্রায়শই । গ্রামবাসীর হাতে একবার এক ডাকাত মারা পড়েছিল । তার লাশ বাজারের বাচাইতে এনে ফেলে রাখা হয় ।  তখনকার সময় ঝড়ের খুব তান্ডব হত । পাকিস্তান থেকে উঠে আসা মানুষজন আর্থিক দুরবস্থার কারণে তেমন মজবুত ঘর করতে পারতেন না । চৌষট্টি সালে পুজোর আগে বিধ্বংসী ঝড়ে গ্রামে বহু বাড়িঘর বিধ্বংসী ঝড়ে ভূপতিত হয়ে গিয়েছিল । আমরাও অন্যান্যদের সঙ্গে তখনকার তহশিল কাছারির দালানে আশ্রয় নিয়েছিলাম । সারারাত তান্ডবের পর ভোরের দিকে ঝড় থামে । বাইরে বেরিয়ে মনে হয় যেন প্রলয় হয়ে গেছে চারদিকে । এছাড়া সাপের ও বিষাক্ত কীটের ভীষণ প্রাদুর্ভাব ছিল । এখন যেখানটায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য হয়েছে সেটা ছিল জঙ্গলাকীর্ণ এবং সাপ, গুইল, বনরুই আর সজারুর আড্ডা । সেইসঙ্গে মনসমঙ্গলবিষয়ক কিংবদন্তী জড়িয়ে থাকায় মানুষ ভয়ে সেদিকে যেতই না ।বাড়িঘরে প্রায়ই সাপ ঢুকে পড়ত । খেলার সময় আমরো ছোটোরা একবার একটা কেউটে সাপ মেরেছিলাম ।

৬৫ সালে আবার বাবার বদলির কাগজ আসে । বাবা বক্সনগরে থাকাকালীন সময়ে যে সুনাম অর্জন করেছিলেন তার দরুন এলাকার মানুষ তাঁকে ছাড়তে চাইছিল না । ফটিকের বাবা তহশীলদার হওয়ার সুবাদে আমরা যে জায়গাটায় ঘর করে থাকতাম তা বাবার নামে বন্দোবস্ত করে দেওয়ারও প্রস্তাব দেন তিনি । গ্রামের বিশিষ্টজনেরা দরবার করে বাবার বদলি রদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাবা যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিকূলতার কারণে এবং অনবরত ডাকাতির ভয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার চিন্তায় এই বদলি মেনে নেন । কিন্তু পরবর্তীকালে বাবা কোনো সংকটপূর্ণকালে বক্সনগরের দিনগুলোর কথা প্রায়ই স্মৃতিচারণ করতেন । বলতেন, বক্সনগর ছাড়া তাঁর ভুল হয়েছিল । আমরা তখন তো নেহাতই ছোটো । ভালোমন্দের কিইবা বুঝি । আমরা যেদিন হাঁটাপথে বক্সনগর ছাড়ি সেদিন বহু অশ্রুসজল মানুষ আমাদের পেছনে পেছনে অনেকদূর এসেছিলেন । বাবা তাঁদের বারবার আর না আসার জন্যে অনুরোধ করছিলেন । আগেরদিন আমরা দুভাই স্কুলে গিয়ে সব ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দেখা করি ও শিক্ষকমহাশয়দের প্রণাম করি । ক্লাসে আমার সব বন্ধুদের দেখা পাই । তাদের একটি করে কলম উপহার দিয়েছিলাম সেদিন । তবে সেদিন আমার প্রিয়বন্ধু ক্লাসের প্রতিদ্বন্দ্বী নিখিল স্কুলে আসেনি । তারপর সারাজীবন তাকে খুঁজে ফিরেছিলাম । বক্সনগরের কাউকে পেলেই তার কথা বলতাম । একবার জানলাম রাজ্যের এক গুণী ব্যক্তিত্ব স্বপনকুমার দাসকে । বক্সনগরের সন্তান জেনে তাঁকে কথাটা জানিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় লিখতেই নিখিলের আবির্ভাব ঘটে । তারপর দুজনে বহু কথা হয় অনলাইনে। কদিন আগে সন্ধ্যায় বটতলায় ও আমাকে দেখে চিনে ফেলে ।  নিখিল ওর বাড়িতে যাওয়ার আমন্ত্রণ দেয় । আমি বারবার কথার খেলাপ করি । আমার এই স্মৃতিচারণমূলক লেখা নিখিলের ক্রমাগত চাপেই লেখা ।

Tuesday, December 16, 2025

শঙ্খপল্লব ও দেবব্রত

সম্রাট শঙ্খপল্লব এবং সময় কুকুরের পান্ডুলিপি 

'ভালোথাকার খাসাবাসা'-জবুথবু জীবন, জন্মগহ্বরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠের ক্লেদাক্ত ভ্রূণবাস আর হৃদয়হীন সমাজের অবক্ষয়িত শরীর অন্বেষণের বিপরীতে নিরাসক্ত সমাজদৃষ্টি নিয়ে অন্যতর আস্বাদ এনেছেন শব্দের ব্যঞ্জনায় । কবি শঙ্খপল্লব আদিত্য নিজেই বলেছেন, 'আমার শব্দের রন্ধনপ্রণালী আমি আমারই কাছে রেখে দিয়েছি,/একেই কখনো বানিয়েছি রাইফেল কখনো পলির গঙ্গাজল ।' দীর্ণ সময়ের তীক্ষ্ণ শূন্যতায়ও সচেতন থেকে শব্দের তীব্র কটাক্ষে ধ্বস্ত করেছেন ছলজীবনকে । জীবনব্রতে তিনি খুঁজে ফিরেছেন ভালোবাসাকে । ভালোবাসাই তার অন্তর্লোকের গোপন 'যুদ্ধাস্ত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা' । কথা বলার নিজস্ব মুদ্রায় তিনি আমাদেরও বিমূঢ় করে তোলেন । তিনি কবিতায় সম্রাট । কিন্তু তাঁর সংলাপ অস্থির সন্ন্যাসের, যেখানে ঐতিহ্যের ছায়াপাত ঘটে । আলখাল্লার বুননে ভেসে ওঠে রিয়াং পল্লীর নিবিড় টংয়ের সামিয়ানার নিচে, 'অপূর্ব আন্তরিক রমণীয় মানুষের কোমর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বোতল নাচ'-র চারুশৈলী । কবির দিব্যবীক্ষা কতটা গভীরভাবে ছায়া ফেললে এমন লোকপ্রতিম শব্দের চয়ন হয় নিজস্ব বাচনে ! সে তো শঙ্খপল্লবই জানেন । তাঁর চেতনা সীমাবদ্ধতায় বন্দি থাকে না । তির্যক বাক্যবন্ধ হলেও প্রজন্মে প্রবাহিত গাঢ় বিষণ্নতা নগ্ন করে দেখায় তাঁর শব্দবোধ, 'ভেতর ঘরে বিষের গুহা বাইরে কোঁচার ইস্ত্রি ঠাট'-এর ব্যর্থ সওদাগরি । শচীন দেববর্মনের কন্ঠে ভাটিয়ালি গান ছাড়া জীবন অচল হলেও তাঁকে চলে যেতে হয় নির্জন ডোমের শবশকটে । স্বজনের শূন্যে দৃষ্টি ফেলে হা-হুতাস, 'জয় কিংবা পরাজয়' কিছুই কবিকে স্পর্শ করে না । 'লৌকিক কোরাসহীন' বিদায় জানাতেই হল কবিকে । 'ভালোবাসা ও ভালোবাসার' সম্মিলিত হৃদয়ের অর্ঘ্য কবিকে ।

কোলাহল পৃথিবী থেকে দূরের এক দেবশিশু 

কখনও কখনও জাগতিক ঘটনাকম্পের তীব্র ঝাঁকুনিতে অসহায় বিস্ময়ে বাকরহিত হতে হয় । এমনটাই হয় যেমনটা মানুষ চায় না ।  কেউ কেউ চলে গেলে মননস্রোত ঘোলাটে হয়ে যায় । কারো কারো কবিতা অসময়ে গেঁথে যায় শেষপাতায় । যোদ্ধাযৌবনকেও হেরে যেতে হয় কখনও বা । অনাকাঙ্ক্ষিত স্তব্ধতা শুধু রেখে যায় সরল দেবশিশুর প্রাণকথা । কবি দেবব্রত চক্রবর্তীর পায়ের ছাপ, কলমের দাগ এমনই অসময়ে থমকে যায় । অথচ তাঁর চেতনা ঘিরে ছিল এই জগতের প্রতি গভীর আসক্তি । আসন্ন সময়কে দৃঢ়তায় মাড়িয়ে দিয়ে জীবনমাধুর্য ছড়িয়ে যান মুখমন্ডলে । তাঁর ঊনজীবনেই তিনি ধরে ফেলতে পেরেছিলেন সমাজের সমূহ অসুখ । 'বাড়ন্ত শৈশব মুক্তমন আবদ্ধ হল / মোবাইল গেইমে, শেয়ার মার্কেট, ট্রেডিং কোডিং আর জুয়ার ইনকামে । দিন শেষে সব কিছু বিসর্জন দিয়ে হতাশ যৌবন খুঁজে মাদক । / সুস্থ বিনোদন না পেয়ে মানুষ দিন দিন অমানুষ হয়ে যাচ্ছে (সমকাল) । সময়ের ভাষায় কবির নিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ জাতগোখরোর পরিচায়ক। সিতরাত অতিক্রমের স্বপ্ন ছিল এই কবির মননচর্চায় । পৃথিবীকে কলুষিত হতে দেখেছেন এই মিতসময়ে । কলুষবিনাশের আহ্বান কবিতায় কবিতায় ছড়িয়ে দেওয়ার আগেই দিগন্তে বিলীন হয়ে গেলেন দেবব্রত । চিরবিছানায় যাবার আগে তাঁর স্বপ্ন ছিল 'কুঁড়েঘর'কে ঘিরে । স্বপ্ন ছিল এই কুঁড়েঘরে একদিন তৈরি হবে শব্দের স্বপ্নইমারত । স্বপ্নমুখর ছেলেটির প্রস্থানকথা আর স্বপ্নকাঙাল কবির নীরবতা আজ সমার্থক । দুস্তর সাগরের নিকষ অন্ধকারের মধ্যে উপাসনাজীবী কবির মুখরতা অমোঘ মৃত্যুর প্রতীকে ও অনির্ধারিত বাস্তবতায় প্রতিভাসিত । 'চির শায়িত আছো আজ / পুষ্পিত বিছানায় / কোলাহল হারিয়েছ / নিঝুম নিরালায় ।'–হে দেবব্রত, হে কবি, তুমি জেগে থেকো প্রতিবাদ আর বাংলাকবিতায় ।

Thursday, December 11, 2025

৮ডিসেম্বর ১৯৭১ রামগড়মুক্ত দিবস

৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ রামগড়মুক্ত দিবস

 ৮ডিসেম্বর ১৯৭১ রামগড় পাক হানাদারমুক্ত  হওয়ার দিন আজ । কিন্তু নিস্তরঙ্গ আজ  ফেনীর জল আর দুপারের  সাব্রুম ও রামগড় ।

 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাব্রুমের এক বিশেষ অবদান রয়েছে । প্রথমত উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল সাব্রুম সন্নিহিত হরিনাতে । এই এক নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী জেলার অংশবিশেষ অর্থাৎ মুহুরী নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত । ২৫ শে মার্চের পর প্রথম দিকে রামগড়ে মুক্তিবাহিনী তাদের ঘাঁটি গেড়ে পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ শানাতে আরম্ভ করে । রামগড় স্কুলের মাঠে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং হত । তারপর ২মে পাকবাহিনী প্রথম রামগড়ে হানা দেয় এবং তারা রামগড় তাদের দখলে নিয়ে নেয় । এরপরই মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রধান কার্যালয় সাব্রুমের হরিনাতে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়ে অপারেশন চালানো হয় । এরপর থেকেই বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজারে শরণার্থী সাব্রুমে আশ্রয় গ্রহণ করে । পঁচিশে মার্চ রাতে ধরপাকড় শুরু হওয়ার পর রামগড়ের সুলতান আহমেদ, বাগান বাজারের সেকান্তর মিয়া ওপার থেকে এম আর সিদ্দিকী জহুর আহমেদ ডক্টর নুরুল হাসান সহ আরো দুজনকে সঙ্গে নিয়ে রামগড় বাজার ঘাট দিয়ে ফেনীনদী পেরিয়ে সাব্রুমের সে সময়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী ও কালিপদ ব্যানার্জির সঙ্গে যোগাযোগ করেন । পরে তারা বিষয়টি তদানিন্তন মুখ‍্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহকে জানালে তিনি দিল্লীতে যোগাযোগের ব্যবস্থা করেন । সেই অনুযায়ী তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বাংলাদেশ যুদ্ধে ভারতের পক্ষে অস্ত্রশস্ত্র ও সৈন্যবল দিয়ে সাহায্য করার বার্তা দেওয়া হয় । রামগড় ও সাব্রুমের মাঝখানে সাব্রুম বাজারঘাট ও রামগড় থানার মধ্যবর্তী স্থানে ফেনী নদীর উপর সে সময়ে একটা অস্থায়ী সেতু তৈরি করে দেওয়া হয় । সেই সেতু দিয়ে এপার থেকে ভারতীয় সৈন‍্যের যুদ্ধের গাড়ি, সৈন্য এবং  মুক্তিবাহিনী সে দেশের অভ‍্যন্তরে গিয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শানাত । মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টরের প্রথমদিকে দায়িত্বে ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান । তিনিই প্রথম রামগড় মাঠে ও পরে হরিনা ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেন । তাঁর অধীনের সৈন্যদলের নাম ছিল 'জেড ফোর্স' । তাঁর পর পুরোপুরি দায়িত্বে আসেন মেজর রফিকুল ইসলাম বীরোত্তম । এই এক নম্বর সেক্টরটি আবার পাঁচটি সাব-সেক্টরে   ছিল । ঋষ‍্যমুখ সেক্টর, শ্রীনগর সেক্টর, মনুঘাট সেক্টর, তবলছড়ি সেক্টর এবং দেমাগ্রী সেক্টর। একনম্বর সেক্টর থেকে করেরহাট অপারেশন, করিমাটিলা সংঘর্ষ, বড়তাকিয়া ও মিরসরাই অপারেশন, পাতাকোট অ্যাম্বুশ, বাগান বাজার রেইড ও আমলীঘাট যুদ্ধ ইত্যাদি সংঘটিত হয় । এক নম্বর সেক্টর থেকে যুদ্ধে অংশ নেয় প্রায় ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা । যেখানে ইপিআর, পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌ বাহিনী ও বিমান বাহিনীর প্রায় ২০০০ সৈন্য ছাড়াও প্রায় ৮ হাজারের মতো মুক্তিবাহিনী লড়াই করেছেন । এই বাহিনীর গেরিলাদের অধীনে গ্রুপ নাম্বার ৯১ ৯২ ৯৩  ৯৪ এবং ৯৫ কে সংযুক্ত করা হয়েছিল । এক নম্বর সেক্টরের আওতায় সর্বপ্রথম ৫ মে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন করা হয়েছিল এই দল গঠনের নেতৃত্বে ছিলেন হেমদারঞ্জন ত্রিপুরা । ৭ ডিসেম্বর নয়টা পঁচিশ মিনিটে ভারতীয় বিমানবাহিনীর তিনটি জেট বিমান রামগড়ের উপর বোমাবর্ষণ করে এরপর ৮ডিসেম্বর ৯:৫০ এ পুনরায় দুটি বিমান পাক ঘাঁটির উপর বোমাবর্ষণ করে । রামগড় এবং সাব্রুম থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম  লড়াইয়ের সে ইতিহাস সঠিকভাবে মূল্যায়ন হয়নি । কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই হরিনা ক্যাম্পের ধারেকাছেও ।

 ৮ ডিসেম্বর বিকেলের দিকে পাকবাহিনী রামগড় ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিপ্রাপ্ত জনগণ সেদিন রামগড়ে বাংলাদেশ পতাকা উড়িয়ে দেন । সেদিন দুপুর থেকেই সারা সাব্রুমে প্রচন্ড উল্লাসের বাতাবরণ বয়ে যায় । মুহূর্তে স্কুল-অফিস-কাছারি ছুটি হয়ে যায় । বাজি পটকা ফুটতে শুরু করে । তখন সাব্রুম বাজার ছিল ছোটো । দোকানপাট কম ছিল । যে কয়টা বাজেমালের দোকান ছিল সবগুলো থেকে খুঁজে পেতে কয়েক বস্তা সবুজ আবির যোগাড় করা হয় । শরণার্থী শিবির গুলো থেকে খুঁজে আনা হয় বাংলাদেশের পতাকা । মাইকে বাজতে থাকে আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি এবং 'শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে ওঠে রণি' গানদুটি আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সাতই মার্চের রমনা ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণের রেকর্ড । রাজপথে শুরু হয়ে যায় আবির নিয়ে মাখামাখি । সারা রাস্তায়, নদীর পাড়ে মানুষ গিজগিজ করছে । কে শরণার্থী, কে স্থানীয় বোঝার উপায় নেই । লোকে লোকরণ‍্য । মানুষ ওপারে যেতে চাইছে । বি এস এফ বাধা দিচ্ছে । কে শোনে কার কথা !  ফেনী নদীর উপর রামগড় থানা ও সাব্রুম বাজার বরাবর যে অস্থায়ী সেতু ছিল, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একবার পাক হানাদাররা সেটা ভেঙে দিয়েছিল । পরে তা আবার মেরামত করা হয় । রামগড় মুক্ত হওয়ার  বার্তা পেয়ে কাতারে কাতারে মানুষ সব বাধা ঠেলে সেতু পেরিয়ে, নদীর উপর দিয়ে হেঁটে ওপারে গিয়ে ওঠেন । একদল উৎসাহী এপার থেকে ঢাক বাজাতে বাজাতে ওপারে গিয়ে রামগড়ের আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলেছিলেন । সেদিনের সাব্রুমের তরুণ-কিশোরদের অধিকাংশই সেদিন ফেনী নদী পেরিয়ে রামগড় পৌছেছিলেন । স্কুল ছুটির পর ছাত্ররা বাই-সাইকেল নিয়ে হেঁটে নদী পেরিয়ে সারা রামগড় চক্কর দিয়েছিল । যাদের বাড়ি সাব্রুম শহরের পশ্চিমদিকের গ্রাম ছোটোখিল, মনুঘাট ছিল তারা আনন্দের আতিশয‍্যে সাইকেলে চড়ে রামগড় পাকা সড়ক ধরে বাগানবাজারে গিয়ে নদী পেরিয়ে এপারের রানিরবাজার ঘাটে উঠে বাড়ির পথ ধরেছিল । ছাত্রদের এই অ্যাডভেঞ্চার পরবর্তী বেশ কিছুদিন জারি ছিল । বয়স্করাও কিছুদিন বাজারসদাইও করেছিলেন রামগড় বাজার থেকে । 

৮ ডিসেম্বর বিকেলে রামগড়ে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয় সে সময় সেসময় ভারতের পক্ষে তদানীন্তন ব্লক কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী, উদয়পুরের  সাংবাদিক সেসময়ের ছাত্র সংগঠন ছাত্রপরিষদের জেলা সভাপতি স্বপন ভট্টাচার্য উপস্থিত ছিলেন। তিনি ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মান'-এ ভূষিত হন । তারপর ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশ বিজয় লাভ করে । সেই প্রতিবছরই এই দিনটি রামগড়ে ঘটা করে পালিত হত । সাব্রুম থেকে তার শব্দ শোনা যেত ।

কিন্তু না । ফেনীর ওপাড়ে এবারের রামগড় ছিল আজ সুনসান । রামগড় বিজয়ের পূর্তি দিবস আজ সময়ের আস্তাকুঁড়ে চলে গেছে । সেদিনগুলোতে সাব্রুমবাসীর কৃচ্ছ্রতার ফলাফল শূন্য। ইতিহাসের সেই অতীতের মিথিলার রাজা আদিশূরের নবম পুত্র বিশ্বম্ভরের মতো এই অঞ্চলে কি আবার ও উচ্চারিত হবে 'ভুল হুয়া', ' ভুল হুয়া' ?

Monday, November 24, 2025

শীতের পত্র

শীতের পত্র

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

শীত পা রেখেছে আমার এই না শহরে এখন 
দ্রুতরাত নামে । দোকানের সাটারের ধাতব পতন 
ঘরে ফেরার সংকেত । উত্তরের হাওয়া তীব্র শীতের 
ঝটকায় উড়ে চলে যায় । তপন রায়ের বন্ধ দোকানের 
সামনে পাতাহারা কাঁঠালগাছটিতে নিয়ন আলো পড়ে 
কঙ্কাল মনে হয় । নিচে শুকনো পাতারা বিছানা গড়ে ।

মনে হচ্ছে শহরে ছড়ানো ভালোবাসার যত পিগিব্যাংক 
রাতের আঁধারে কেউ এই শহর থেকে নিচ্ছে লুঠ করে ।
ওদের কালো পোশাক আর মুখোশ সিসিক্যামে ব্ল্যাংক–
সফল অভিযান শেষে কালো পোশাক ফিরে যায় ঘরে ।
তখনই কোন প্রিয়জন বর্ষাবাসে গেলে মনে হয়– 
এই শীত, এই হিমরাত আমাদের মন খারাপের সময় ।

শীত এলেই কি আমাদের প্রত্যেকের মন খারাপ হয় ?
অথবা কেবল মন খারাপের দোহার এই শীতের সময় !
স্বজনের কাছে যে সুজন এসেছিলেন বসন্তে বা বৈশাখে, 
মন খারাপের রয়্যাপারে ঘিরে রাখতে চাই তাঁকে ।
থাকুন তিনি উষ্ণ আবেগে থাকুন হৃদয় জুড়ে,
কর্মের দুনিয়ায় যেখানেই থাকুন কাছে কিংবা দূরে ।

Thursday, November 20, 2025

জ্যোতির্ময় শিবের থানে অশোকপুষ্পের অঞ্জলি

জ্যোতির্ময় শিবের থানে অশোকপুষ্পের অঞ্জলি

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

আমার বাবার সরকারি চাকরিসূত্রে ও পরবর্তীতে আমারও পেশাগত কারণে স্থানান্তরের অভিজ্ঞতা ও বহু বেদনাবিধুর স্মৃতিভার রয়েছে । স্বল্পকালীন হলেও সাময়িক বাসভূমিকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হয় । স্থানিক প্রকৃতি ও মানুষজনকে স্বজন ও সুজন মনে হয় । সেইখানের প্রকৃতির সান্নিধ্যে এলে, মানুষের সাথে মিশলে, তাঁরাও বেঁধে নেন আত্মিক বন্ধনে । প্রস্থানবেদনায় সকলেরই পরান পোড়ে স্যর । আপনার মতো আমরাও বেদনাতুর । আপনার বেদনার বিনিময়ে আমরা আমাদের বেদনাকেই ফিরিয়ে দিতে পারি আমরা । আর আমি শুধু বেদনা নয় মধুময় স্মৃতির মৌচাক বয়ে বেড়াব বুকের ভেতর যতদিন বসুমাতার বুকে আছি । আমাকে দেখলেই আপনার সেই মায়াভরা চাহনি আর সমস্ত প্রটোকল ভেঙে বুকে জড়িয়ে ধরা, আলিঙ্গন করা আমার বিরলতম প্রাপ্তি । সন্তানসম হয়েও পিতার নিরাপত্তায় যেন আমাকে বেষ্টন করে রেখেছিলেন আপনি । আমার জীবনে দেশে ও বিদেশে বহু সম্মান ও বহু পুরস্কার আমি পেয়েছি । কিন্তু নিজের মাটিতে নিজের শহরে সরকারিস্তরে মহকুমা প্রশাসন আয়োজিত দুহাজার চব্বিশ সালের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে মাঠভর্তি মানুষের সামনে বিরল সম্মানটি আপনিই আমার হাতে তুলে দিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন ।

মনে পড়ে, দুবছর আগে বন্যায় যখন আমার ভদ্রাসনটিসহ আমার গ্রাম ছোটখিল জলের তলায় ডুবে যাচ্ছিল, সেসময়, আমি মাঝরাতে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানিয়েছিলাম দাসপাড়ায় বাঁধের উপর কজন মানুষ আটকে আছেন । আপনি দ্রুত ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে  নৌকা পাঠিয়ে তাদের উদ্ধার করে প্রিয়জনদের কাছে শিবিরে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন । আর্তজীবনরক্ষায় আপনার সেদিনগুলোর অনিদ্র ভূমিকার কথা আর কজনই বা জানেন । 

সাব্রুমের ধর্মপ্রাণ মানুষের পীঠভূমি দৈত্যেশ্বরী মন্দিরের উন্নয়নে, রাজ্যের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক মানচিত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে দেওয়ায় আপনার ভূমিকা অপরিসীম। মাতা দৈত্যেশ্বরী মন্দিরের সুপ্রাচীনতার প্রামান্য ইতিহাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে আমার গবেষণাপত্রটি আপনি ভাষান্তর করে যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছেন । যার সুফলেই আজ দৈত্যশ্বরী মন্দির রাজ্যের এক বিশিষ্ট ঐতিহ্যঅঙ্গন । শিব তাঁর তৃতীয় নয়নের জ্যোতিপ্রবাহে যে কর্মকান্ডের সুরুয়াত করে গেলেন তা আগামীদিনে বহধাবিস্তৃত হবে । বহুবছর আগে এই মহকুমার আরেকজন সর্বোচ্চ কর্মকর্তা মানিক গাঙ্গুলি এ মন্দিরের প্রাথমিক সংস্কারের কাজটি করেছিলেন । আর এই প্রজন্মের নবীন প্রতিনিধি আপনি এই মন্দিরের উন্নয়নের সিঁড়িটা মজবুত করে দিয়ে গেলেন । ইতিহাস ও ঐতিহ্য এভাবেই ফিরে ফিরে আসে।

সাব্রুমের ঐতিহ্যবাহী বৈশাখীমেলা, এই জনপদের মানুষের প্রাণের মেলাকে আপনি নবনান্দনিক রূপদান করলেন আপনি । কবিসম্মেলন, চিত্রাংকন সমারোহ, স্মরণিকা 'শ্রীচরণেষু'র প্রকাশ ইত্যাদি শুভকর্মযজ্ঞ সারা ত্রিপুরার নন্দনচর্চার মানুষমানুষীদের এক মঞ্চে এক মহামিলনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন । 'শ্রীচরণেষু' আসলে দেবী দৈত্যেশ্বরী মায়ের শ্রীচরণে ও গণদেবতার ওই আসনতলে মাটির পরে আপনার ও আমাদের সম্মিলিত প্রণাম । 

আপনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। আপনি একাধারে গল্পকার, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পী । ফটোগ্রাফিতেও আপনার নান্দনিক দৃষ্টির প্রকাশ ঘটান আপনি । আপনি ধুলোমুঠি ধরলে সোনামুঠি হয়ে ওঠে । আপনার নিবিড় সান্নিধ্যে থেকে আপনার প্রশাসনিকসহ নানাবিধ কর্মবিস্তৃতির যেটুকু জেনেছি তা বিশাল হিমশৈলের অগ্রভাগ মাত্র । আপনাকে জানা আমাদের ফুরাবে না । 

আপনার এগিয়ে যাবার বেলায় আর পিছুডাক নয় । বরং শাঁখ বাজিয়ে জানিয়ে দেব এই শঙ্খধ্বনির মতো বিশাল আমাদের সম্মিলিত হৃদয় জুড়ে আপনি আছেন । থাকবেন আরো বহুদিন । আপনার কর্মময় জীবন আরো বিস্তৃত হোক । আপনার লেখনী, আপনার শিল্পীসত্তা আরো আরো গতিশীল হোক স্রোতস্বিনীর মতো জীবনের বাঁকে বাঁকে। নতুন কর্মস্থল ও আপনার আপন ঠিকানা হয়ে উঠুক ।আপনি আগের মতোই সাব্রুমবাসী কারো বিপদে আপদে পাশে দাঁড়াবেন এই আশা রাখি ।  আপনার দীর্ঘজীবন, সুস্বাস্থ্য ও সার্বিক কুশল কামনা‌ করি ।❤️

Saturday, November 8, 2025

সাবরুমের প্রাচীন জনপদ ছোটখিল

সাব্রুমের প্রাচীন জনপদ ছোটখিল

১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে সংযুক্তির পর থেকে ত্রিপুরা রাজ্যের সর্ব দক্ষিণের শহর সাব্রুম এখন মহকুমা শহর ও এ অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র । কিন্তু অতীত  ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, সাব্রুম মহকুমার যে জনপদটি আজকের নাগরিক রূপ নিতে পারত সেটি আজও নিজস্ব রহস্যের অবগণ্ঠনে নিজেকে ঢেকে নীরবে সাব্রুমকে শহর সৃষ্টিতে লালন করে চলেছে, তার নাম ছোটখিল । সাব্রুম শহর থেকে পশ্চিম দিকে ৬-৭ কিলোমিটার দূরে বর্ধিষ্ণু গ্রাম এটি । একসময় এ জনপদ ছিল কর্মচঞ্চল, ব্যস্ততায় ঘেরা । রাজন্য আমলে ছোটখিল ছিল 'গেটওয়ে টু চিটাগাং হিলট্র্যাক্ট' । রাজপুরুষরা আখাউড়া থেকে ট্রৈনে চড়ে তদানীন্তন নোয়াখালীর মুহুরিগঞ্জ স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে বা হাতিতে ছয় মাইল পূর্বে আমলিঘাটে পৌঁছে নিজেদের রাজত্বে পা রাখতেন । তারপর সেখান থেকে ফেনী নদীর উজান ধরে ছোটখিলে এসে বিশ্রাম নিতেন বা রাত কাটাতেন । এরপর বর্তমান দৌলবাড়ির অধীর সরকারের বাড়ির পাশ দিয়ে সাব্রুম আসতেন । কখনওবা নদী পেরিয়ে রামগড় যেতেন । নদীর তীর ধরে সেই ক্ষীণপথের এখনও কিঞ্চিৎ চিহ্ন রয়েছে । সে সময়ে রাজপুরুষ বা অন্যান্য লোকজনদের আসার কারণে এখানে একটা ছোট্ট হাটের মত ছিল । বর্তমানে রাস্তার উত্তর পাশে যে পুকুরটি আছে ( অধীর বাবুর বাড়ির উল্টোদিকে ) সেটি বহু প্রাচীন । পুরনো হাটগুলোতে এরকম পুকুর থাকতোই ।

ছোটখিলের আদি বাসিন্দাদের মধ্যে মূলত মগ রিয়াং ও ত্রিপুরার প্রধান ছিল । তার পরে মুসলমানরা আসেন । এঁরা সম্ভবত শমসের গাজির সৈন্যদলেরই লোক । শমসের গাজির আত্মগোপনকালে তার সঙ্গে এসে বা পরবর্তী সময়ে শমসেরের মৃত্যুর পর এখানে এসে গা ঢাকা দিয়ে সংসার করেছেন । আমলিঘাতেই ছিল শমসের গাজির কিল্লা । তার নিদর্শন এখনো আছে ।

হিন্দু বাঙালিরা এখানে আসেন অনেক পরে । স্বাধীনতার কিছু আগে পরে । তবে তারও আগে নদীর ভাঙ্গনে রিক্ত ও নিঃস্ব হয়ে বরিশাল থেকে কিছু লোক এখানে এসেছেন । তাদের মূল পেশা ছিল এখানে আস্তানা গেড়ে নোয়াখালি ও চট্টগ্রামের সমতল জনপদে ডাকাতি করা । 

একসময় বন্যা ও বন্য শ্বাপদের সঙ্গে যুদ্ধ করে এখানকার মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়েছে । ছোটখিলের রানিরবাজার সংলগ্ন বাগানবাড়িতে এসে রাজারা অবস্থান করতেন এবং এখান থেকে এ অঞ্চলে শিকারে বেরোতেন । বাঘ, হরিণ, শূকর, খরগোস,সজারু, বনমোরগ, বনরুই আর হাতির অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র ছিল এই অঞ্চল । অনেকটা ময়ূরের মতো একধরনের পাখি ছিল । স্থানীয়ভাবে এগুলোর নাম ছিল মথুরা । আজকের প্রজন্ম এর নামও শোনেনি । শিকার, বিনোদন এবং খাজনা আদায়ের জন্য রাজারা এখানে একটা বাগানবাড়ি করেছিলেন । এই বাগানবাড়ির সর্বশেষ দায়িত্বে ছিলেন বৈকুণ্ঠনাথ রায় যাঁকে সাধারণ মানুষ বৈকুণ্ঠ আমিন বলেই ডাকতেন । এছাড়া  এখানকার অধিবাসী আরও দুই সহোদর আমিন ছিলেন । তাঁরা ছিলেন ব্রজেন্দ্র নাথ ও ললিত নাথ । স্থানীয় ভাষায় বড্ডা আমিন ও মাইজ্জা আমিন । চৌকিদার ছিলেন যাত্রামোহন নাথ ও পাথরাই ত্রিপুরা । আমলিঘাটে ছিলেন সতীশ শীল বা সতীশ গার্ড । আব্দুল লতিফ মুহুরী ছিলেন রাজার নিয়োজিত সেরেশতাদের ।প্রসঙ্গত, উল্লেখ করি যে প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকায় সংগৃহীত 'হাতিখেদার গান' পালায় এক জায়গায় সেই সময়ের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও তৎসন্নিহিত হাতিখেদা সমূহের যে বিবরণ আছে তার এক স্থানে পাই–

নলুয়া ছড়ার পারে আছে বন নুনা মাডি ।
খেদা বানায় কনো জনে গাছ গাছড়া কাডি ।।

এই নলুয়া ছড়াটি বর্তমান বটতলা বাজারের দক্ষিণ পশ্চিমে ফেনী নদীর অপর পাড়ে মিশেছে । বলাবাহুল্য এটা বর্তমানে বাংলাদেশে সীমার মধ্যে প্রবাহিত হয়ে ফেনী নদীতে পড়েছে । ত্রিপুরার রাজারা এখান থেকে হাতি শিকার করতেন । বর্তমানে যেখানে তাকিয়াবাড়ি বা মনুটিলা সেখান দিয়ে দলে দলে হাতি চলাফেরা করত । তখন এই অঞ্চলকে বলা হত হাতির দোয়াল । একটি তিনঠেঙে হাতি নিয়ে লোকপ্রচলিত মিথ একসময় এ অঞ্চলে ছিল । এছাড়া ছিল বাঘের উপদ্রব । আজ থেকে ৭০-৮০ বছর আগেও শ্রীনগরের রহমত আলী মিয়া ( রহমত আলী বলী ) ছিলেন বাঘের উপদ্রবের একমাত্র মুশকিল আসান  । তিনি এখানকার গোবিন্দ মাঠ অঞ্চলের বেতবন থেকে প্রচুর বাঘ মেরেছেন । এছাড়া মকবুল হোসেন বা 'মাক্কু হলবান' ( পালোয়ান ) নামে একজনের খালি হাতে বাঘ মারার কথা প্রচলিত ছিল । মাকু হলবানের একমাত্র ছেলে অনেক বছর আগে মনুবাজার স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ছিল । পরবর্তী সময় আর তার সংবাদ জানা যায় না ।

ত্রিপুরার রাজপরিবারের এই তালুকটি সঙ্গে রাজপরিবারের অনেকের নাম জড়িত বিস্তীর্ণ এলাকার চারটি গ্রাম বিজয়নগর, ব্রজেন্দ্রনগর, কল্যাণনগর ও রমেন্দ্রনগর নামের চারটি জনপদের সঙ্গে রাজপুরুষদের নাম জড়িত । গোটা পরগনাটির প্রাচীন নাম প্রভাবতীপুর পরগনা । চা বাগানটির নাম লীলাগড় টি এস্টেট । এই চা বাগানের মালিক ছিলেন লালুকর্তা অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্যধন্য ব্রজেন্দ্রকিশোর দেববর্মন । রবীন্দ্রনাথই তাঁকে সাব্রুমের এই তালুকটি আবাদ করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন । চাবাগান সংলগ্ন তখনকার সময়ের একমাত্র হাটটির নাম ছিল রানীগঞ্জ বাজার বা রানির বাজার । এভাবে রাজঅন্তঃপুরের নারীদের নামও জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের নামের সঙ্গে । রানির বাজার একসময় ত্রিপুরার দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ বাজার ছিল । এখানে অনেক বড় বড় ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা কেন্দ্র খুলে বসে ছিলেন । ভারতের অন্য অংশ থেকে বিমানযোগে বিলোনিয়ার মাইছড়া বিমান ঘাঁটিতে পণ্য নিয়ে এসে এখান থেকে সংগ্রহ করে এই বাজারে  আনা হত । আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে প্রধান ছিল বস্ত্র ও নানা ধরনের মসলা, পাতার বিড়ি ইত্যাদি । এছাড়া রানির বাজারে ছিল বিরাট গরুর বাজার । ভারত ভুক্তির পর সীমান্ত কড়াকড়ির ফলে এবং এই বাজারে পরপর কয়েকবার আগুন লাগার ফলে সমৃদ্ধশালী ব্যবসায়ীরা একেবারে পথে বসে যান এবং তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন অনেকে আবার আগরতলা বা অন্যত্র তাদের ব্যবসা সরিয়ে নেন । আগরতলাস্থিত লক্ষ্মী বস্ত্রালয়ের মালিকের একসময় এই রানীর বাজারে বিরাট ব্যবসা ছিল ।

গত শতাব্দীর শুরুর দিকের হিসেব অনুযায়ী জানা যায় যে, সে সময়ে এ অঞ্চলে 'বাতেমা' নামে এক ধরনের কচু এবং সরিষার খুব ফলন হত । ফেনী ও মুহুরিগঞ্জ বাজারে এগুলো বিক্রি হত । এখানকার জমিতে উৎপাদিত কৃষিজ ফসল ও বনের বাঁশ, ছন ও অন্যান্য সামগ্রী এবং জুমের ফসল নদীপথে ভাটি অঞ্চলের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হত । সাবরুমের মনুঘাট থেকে মোষের দুধের দই যেত রামগড় বাজারে । ১০০ বছর আগে এখানে আখের গুড়ের মন ছিল দু টাকা । 

একসময় এ অঞ্চলে প্রচুর জলা জায়গা বা ঢেবা ছিল । ফেনী নদীর বারবার গতি পরিবর্তনের ফলে এই ঢেবাগুলোর সৃষ্টি । মূলত এগুলো ফেনী নদীর মধ্যগতি অঞ্চলে সৃষ্ট অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ সব । বছর পঞ্চাশেক আগে পর্যন্ত মাগুর শিঙয়ের অফুরন্ত ভান্ডার ছিল এই ঢেবাগুলো । এছাড়া ফেনী নদীতে ছিল নানা ধরনের অজস্র মাছ । বিশেষ করে এই নদীতে এককালে ইলিশ এবং গলদা চিংড়ি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত । এক সময় আমরিঘাট পর্যন্ত জোয়ার আসতো জোয়ারের জলে ভেসে প্রচুর সামুদ্রিক মাছ এখানে পাওয়া যেত । পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুহুরী প্রজেক্ট গড়ে তোলার জন্যে বাদ দেওয়ার ফলে নদীর এই অংশে জোয়ার ভাঁটার অবসান ঘটে । নানা রকমের মাছও আর পাওয়া যায় না ।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে এত বিশাল স্মৃতি নিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে আছে যে জনপদ তার নাম ছোটখিল কেন ? খুলে দেখা যাক এর নামমাহাত্ম্য । স্থানীয় ভাষায় 'খিল' শব্দের অর্থ পতিত বা খালি । বিরল জনবসতির কারণে বা বন্যার কারণে ছোট্ট এই রাজতালুকটি প্রায়ই খিল বা পতিত থাকত । সেই কারণেই এর নাম ছোটখিল হতে পারে । এছাড়া এর একটা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা খোঁজারও চেষ্টা করা যেতে পারে । 'কিল্লা' শব্দের অর্থ দুর্গ । চট্টগ্রামী বাংলা উচ্চারণ প্রভাবে স্থানীয় উচ্চারণে শ্বাসঘাতের ফলে তা 'খিল্লা' হতে পারে । সেই হিসেবে শমসের গাজীর আমলিঘাটের মূল দুর্গ বা কিল্লার পরে এখানে হয়তো একটা ছোট কিল্লা ছিল । যেখানে তিনি আত্মগোপন করতেন । বর্তমান রানিরবাজার এবং বটতলা বাজারের মাঝামাঝি এলাকায় রাস্তার বা পাশে পঞ্চায়েত অফিসের আগে রক্ষিতদের ঢেবার পাড়ে বহু আগে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদটি আসলে একটি দুর্গ ছিল  । এর গর্ভগৃহটি পরবর্তী সময়ে মুসলমানরা কবর হিসেবে ব্যবহার করতেন । সেটা থেকেও ছোটকিল্লা>ছোটখিল্লা>ছোটখিল হতে পারে ।

যাক এ অঞ্চলের ইতিহাস ধরে রাখার কোন প্রচেষ্টা কোন কালই হয়ে ওঠেনি তাই কালো স্রোতে অনেক কিছুই ভেসে গেছে হারিয়ে গেছে যথার্থ গবেষণার ফলে আগামী দিনে অনেক তথ্য উঠে আসবে অতীত কথা বলে উঠবে তার জন্য দরকার উত্তম উদ্যোগ আর উৎসাহ ।

Wednesday, October 22, 2025

ঊনবিংশ শতকের যুবসমাজ ও দেবী কালিকা

🌺 ঊনবিংশ শতাব্দীর যুবসমাজের উপর মা কালীর প্রভাব

ভূমিকা–

ঊনবিংশ শতাব্দী ছিল বাংলার সমাজজীবনের এক নবজাগরণের যুগ। সমাজে একদিকে যেমন পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে জন্ম নিল এক নতুন চিন্তাধারা, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল যুক্তি, বিজ্ঞান ও মানবতাবাদ। অন্যদিকে তেমনি সমাজের অন্তরাত্তায় জেগে উঠেছিল জাতীয়তাবোধ ধর্ম চেতনা ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান । এই আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে বাঙালির এক মহান প্রতীক রূপে উদ্ভাসিত হন মা কালিকা । এই সময়ের যুবকরা পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদী চিন্তার মুখোমুখি হয়ে নিজেদের জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে ভাবতে শুরু করেন ইংরেজ শাসনের ফলে দমিত জাতির চেতনায় মা কালী হয়ে ওঠেন প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার প্রতীক । কালীর রুদ্র ভয়ংকর অথচ মাতৃত্বময় রূপ যুবকদের মনে জাগিয়ে তোলে এক অন্তর্গত শক্তি তারা অনুভব করেন মা কালী ধ্বংস করেন কেবল অশুভকে অন্যায়কে । তিনি যেন তাঁদেরও সাহস যোগান অন্যায় ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে ।সংহার ও সৃষ্টির মিলিত শক্তির দেবী । কিন্তু এই নববোধের ভেতরেই এক গভীর মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল— আধুনিকতার আকর্ষণ ও ঐতিহ্যের টান। উনবিংশ শতাব্দীতে মা কালীর পূজা বাঙালি যুব সমাজের মধ্যেও জনপ্রিয়তা লাভ করে মূলত বিভিন্ন জমিদার ও ধনী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় এর প্রচলন শুরু হয় রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও রামপ্রসাদের মত ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে এই পূজা আরো বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং এই সময়ের যুবকেরা মায়ের মাতৃরূপকে ভক্তির সাথে উপাসনা করে ।
এই যুগের যুবসমাজ, যারা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছিল, তারা নিজের জাতীয় ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক খুঁজতে গিয়ে ফিরে তাকায় মা কালিকা-র দিকে।
তিনি তাঁদের কাছে হয়ে ওঠেন আত্মশক্তির মূর্তি, জাতীয় গৌরবের প্রতীক ও নবজাগরণের মাতৃরূপ।

নবজাগরণ ও যুবসমাজের মানসিক পরিবর্তন

ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজে নানা সামাজিক কুসংস্কার জাতপাত অন্ধবিশ্বাস ও নারী নির্যাতন চলছিল । শুরুতে বাংলা সমাজে একদিকে রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে যুক্তিবাদী চিন্তার উত্থান, অন্যদিকে সমাজে গভীর কুসংস্কার, জাতিভেদ ও অন্ধবিশ্বাসের প্রভাব ছিল প্রবল।
এই বৈপরীত্যের মধ্যে বেড়ে উঠেছিল সেই সময়ের যুবসমাজ।
তারা একদিকে যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত, অন্যদিকে নিজের শিকড়ের সন্ধানে ব্যাকুল। এই প্রেক্ষাপটে মা কালীর অনুমুক্ত নির্ভীক ও রক্তমাখা রূপ সমাজের চোখে হয়ে ওঠে সংস্কার ভাঙ্গা শক্তির প্রতীক রূপ । যেমন স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, 'আমাদের চাই না ভীরু ভক্তি চাই কালীর মতো শক্তি ও সাহস ।' এই আহ্বান যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছিল আত্মবিশ্বাসে ন্যায় ও সত্যের সংগ্রামে ।
এই সন্ধানেই তারা আবিষ্কার করে মা কালিকা-র রূপে নিজের ঐতিহ্য, শক্তি ও আত্মমর্যাদার প্রতীককে।

 মা কালিকা : শক্তি ও জাগরণের দেবী–

মা কালিকা শাক্তধর্মে শক্তির চূড়ান্ত রূপ।
তিনি একাধারে ভয়ংকর ও করুণাময়ী, বিনাশিনী ও জননী।
তাঁর রূপের মধ্যে নিহিত আছে সৃষ্টি ও ধ্বংসের এক অদ্বিতীয় দ্বন্দ্ব—
যা জীবনদর্শনকেই প্রতিফলিত করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ও বিংশ শতাব্দীর সূচনা লগ্নে মা কালী হয়ে ওঠেন বিপ্লবীদের আদর্শ দেবী । শোনা যায় অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর, এমনকি ছোটো ছোটো যুবগোষ্ঠীর অনেক যুবক গোপনে কালীপূজার আসরে অস্ত্র প্রতিজ্ঞা নিতেন দেশের স্বাধীনতার জন্য । ধুপের ধোঁয়া, প্রদীপের আলো, ঢাকের শব্দে মিশে যেত শপথের ধ্বনি । সেই পবিত্র অন্ধকারে জেগে উঠত আগুন । যা পরে জ্বালিয়ে দিত সাম্রাজ্যের শেকল । তাঁদের কাছে কালী মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ন্যায় শক্তি । এই সময় যুবকরা মায়ের মাতৃরূপকে ভক্তি ও ভালবাসার সাথে পূজা করতেন যা তাদের আধ্যাত্মিক চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল । যুবকরা নিজেদের মুক্তি সমৃদ্ধি ও মঙ্গল কামনায় কালীর কাছে প্রার্থনা করতেন। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর কবিতা, গান ও নাটকে কালীর প্রতীকী উপস্থিতি সমাজ চেতনার প্রতিফলন ঘটিয়েছিল । বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম সংগীতেও মাতৃভূমি কল্পিত হয়েছে দেবী মূর্তি রূপে । পরবর্তীকালে এই ভাবনা বিকশিত হয়ে কালীমূর্তিতে জাতীয় মাতার রূপ ধারণ করে । কালী সাধক কবিরাজ রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্তের গানে কালী শুধু ভক্তির দেবী নন । তিনি এক দার্শনিক চিন্তার কেন্দ্র । তাঁদের গানের যেমন আছে ভক্তির আবেগ তেমনি আছে অস্তিত্বের প্রশ্ন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ।কালী পূজা বাঙালি যুব সমাজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল । যার ফলস্বরূপ অনেক সাহিত্য ও সংগীত তৈরি হয়েছিল সে সময়ে ।

রামপ্রসাদ সেন তাঁর গানে লিখেছিলেন– 
> “কালো তোমার রূপ রে কালী, তাতে যে আলো ঝরে।”

এই ‘কালো’ রূপের মধ্যে যে আলো, সেই আলোই ঊনবিংশ শতাব্দীর তরুণদের চিন্তায় আনল আত্মপ্রত্যয়ের জ্যোতি।
তারা বুঝল, কালী মানে কেবল অন্ধকার নয়—অন্ধকার ভেদ করা আলোর শক্তি। এই সময়ের সাহিত্য ও সমাজে নারীর প্রতিচ্ছবি নতুন করে দেখা হচ্ছিল । মা কালীর চিত্র, যিনি একাধারে ভয়ংকরী ও মমতাময়ী, যুবসমাজকে শেখান নারীর শক্তিকে শ্রদ্ধা করতে । তাকে দেবীরূপে নয় । শক্তির প্রেরণার উৎস রূপে দেখতে । এর মধ্য দিয়ে সমাজে নারী পুরুষের সমতার ভাবনা জন্ম নেয় । এই ভাবনাই পড়ে নারী মুক্তি আন্দোলনের দর্শনকে প্রভাবিত করে ।

স্বামী বিবেকানন্দের কালীভাবনা ও যুবচেতনা–

ঊনবিংশ শতাব্দীর যুবসমাজের উপর মা কালীর প্রভাব সবচেয়ে গভীরভাবে দেখা যায় স্বামী বিবেকানন্দ-এর দর্শনে।
তাঁর কাছে কালী ছিলেন ভয়ের নয়, বরং শক্তির দেবী।
তিনি বলেছিলেন—

> “যে কালীকে তুমি ভয় পাও, সেই কালীই শক্তির মূর্তি। তাঁর পূজা মানে নিজের মধ্যে সেই শক্তির জাগরণ।”

বিবেকানন্দের আহ্বান ছিল স্পষ্ট—

 যুবকরা যেন নিজেদের ভিতরে লুকিয়ে থাকা শক্তিকে চিনতে শেখে, নিজের জাতি ও সমাজের মুক্তির জন্য সেই শক্তিকে কাজে লাগায়।
এই ভাবনা যুবসমাজকে দার্শনিক শক্তির পাশাপাশি কর্মের অনুপ্রেরণাও দিয়েছিল।

 বঙ্কিমচন্দ্র ও দেশমাতার কালীরূপ–

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর চিন্তায় মা কালিকা এক নতুন অর্থে উদ্ভাসিত হন।
তাঁর “বন্দে মাতরম্‌” কবিতায় মাতৃভূমিকে কালীস্বরূপ কল্পনা করা হয়েছে—
তিনি অন্নদা, করুণাময়ী, কিন্তু প্রয়োজনে ভয়ংকর রণদুর্গা।
এভাবেই কালী দেবী হয়ে উঠলেন দেশমাতার প্রতীক।

এই ভাবনা ঊনবিংশ শতাব্দীর যুবসমাজকে অনুপ্রাণিত করেছিল দেশপ্রেমে, জাতীয়তাবাদে ও আত্মবিসর্জনের চেতনায়।
মা কালিকা এখানে ধর্মীয় সত্তা নয়, বরং এক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি।

 অরবিন্দ ঘোষ ও বিপ্লবী চেতনা–

শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ-এর চিন্তায় কালী রূপান্তরিত হন বিপ্লবের দেবী হিসেবে।
তিনি লিখেছিলেন—

> “যখন জাতি নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তখন কালী আসেন ধ্বংস করতে, যাতে নতুন সৃষ্টি সম্ভব হয়।”

এই ভাবনাই পরবর্তী বিপ্লবী আন্দোলনের যুবকদের মনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
তারা কালীকে দেখেছিল অন্যায় ও দাসত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণাদাত্রী হিসেবে।

কালীপূজা : সমাজসংহতি ও আত্মচেতনা–

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কালীপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল সামাজিক সংহতির প্রতীক।
শিক্ষিত যুবকরা নিজের পাড়ায়, সমাজে একত্রিত হয়ে কালীপূজার আয়োজন করত।
এই মিলনই জাতিগত ঐক্যের এক প্রতীক হয়ে ওঠে।
কালীপূজার আধ্যাত্মিকতা থেকে জন্ম নেয় সমষ্টিগত আত্মশক্তির ধারণা।

                       নারীশক্তি ও কালীভাবনা–

মা কালিকা নারী হয়েও সর্বশক্তিময়—এই ভাবনা ঊনবিংশ শতাব্দীর যুবসমাজকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায় নারীর মর্যাদা নিয়ে।
এই সময়েই নারীশিক্ষা ও নারীসমতার আন্দোলন শুরু হয়, যার পেছনে ছিল শক্তিস্বরূপা কালীচেতনার প্রভাব।
নারী আর দুর্বল নয়—তিনি সৃষ্টি, করুণা ও সাহসের প্রতীক।

মানসিক ও নৈতিক প্রভাব–

যুবসমাজ মা কালিকার ভক্তি থেকে শুধু ধর্মীয় আশ্রয় নয়, পেয়েছিল মানসিক দৃঢ়তাও।
কালী তাঁদের শিখিয়েছিলেন—
ভয় নয়, আত্মবিশ্বাসই জীবনের মূলমন্ত্র।
অতএব, কালীভক্তি হয়ে উঠেছিল তাদের কাছে এক নৈতিক পুনর্জাগরণের পথ।

উপসংহার–

ঊনবিংশ শতাব্দীর যুবসমাজের উপর মা কালীর প্রভাব ছিল বহুমাত্রিক—
আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক, ও রাজনৈতিক।
তিনি ছিলেন একাধারে ভক্তির দেবী ও কর্মের অনুপ্রেরণা, জাতীয়তাবাদের মাতা ও ব্যক্তিসত্তার শক্তি।

বিবেকানন্দের ভাষায়—

> “শক্তি যদি জাগে, তবেই জাতি বাঁচে।”

মা কালিকার উপাসনার মধ্য দিয়েই এই যুগের যুবসমাজ সেই শক্তি খুঁজে পেয়েছিল—
যা তাদের আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছিল, জাতীয় চেতনা জ্বালিয়েছিল,
এবং বাঙালির নবজাগরণের ভিত রচনা করেছিল। উনবিংশ শতাব্দীর যুব সমাজের কাছে মা কালী ছিলেন শুধু উপাস্য দেবী নন, বরং চেতনার প্রতীক, শক্তির উৎস ও বিপ্লবের প্রেরণা । তাঁর রুদ্ররূপে সেসময়ের যুবক দেখেছিলেন সংস্কার ভাঙা ও প্রতিবাদের শক্তি । তাঁর মাতৃরূপে পেয়েছিলেন সান্তনা ও মমতা ।

 সংক্ষেপে বলা যায়,
ঊনবিংশ শতাব্দীর যুবসমাজের উপর মা কালীর প্রভাব ছিল
আত্মশক্তির জাগরণ, দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা, এবং নবজাগরণের আত্মা। মা কালী হয়ে উঠেছিলেন এক যুগের মানসিক মুক্তির প্রতীক যা পরবর্তীকালের জাতীয়তাবাদ ও সাংস্কৃতিক জাগরণের পথ প্রশস্ত করে ।

অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কালীপূজা

অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কালীপূজা 

   ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অগ্নিযুগ শব্দটি এসেছে সেই সময়ের বিপ্লবী যুবকদের আত্মোৎসর্গ ও অনলস দেশপ্রেমের জন্য । এটি মূলত ১৯০৫ থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত সময়কে নির্দেশ করে । যখন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর বাংলার যুবসমাজ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয় । এই বিপ্লবীদের মানসিক জগতের গভীরে যে শক্তি কাজ করেছিল তার অন্যতম উৎস ছিল মা কালিকা । সংহার, শক্তি ও মুক্তির চিরন্তন প্রতীক । তিনি রুদ্ররূপে ধ্বংস করেন অন্যায় । আবার মাতৃত্বের রক্ষা করেন সৃষ্টিকে । বিপ্লবীরা এই রূপেই দেখেছিলেন তাঁদের আদর্শ দেবীকে । যিনি অন্যায়ের বিনাশে অনুমোদন দেন, দাসত্বের বন্ধন ছিন্ন করার সাহস যোগান । তাঁরা বিশ্বাস করতেন যেমন কালী অসুর বধ করেন তেমনি পরাধীনতার অশুভ শক্তিকেও বিনাশ করতে প্রেরণা দেন ।

শোনা যায়, অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর, এমনকি ছোটো ছোটো যুব বিপ্লবীগোষ্ঠী কালীপূজার রাতেই গোপনে অস্ত্র স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করতেন । মেদিনীপুর শহরের কর্নেলগোলা কালীমন্দিরেই দীক্ষা নিয়েছিলেন বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। ধুপের ধোঁয়া, প্রদীপের আলো, ঢাকের শব্দে মিশে যেত শপথের ধ্বনি । সেই পবিত্র অন্ধকারে জেগে উঠত আগুন । যা পরে জ্বালিয়ে দিত সাম্রাজ্যের শেকল ।

আজও যখন অন্যায় দেখি, নিপীড়ন দেখি, দুর্নীতি দেখি, তখন মনে হয় আমাদের দরকার সেই আগুন, সেই সাহস যা একদিন অগ্নিযুগের যুবকদের জাগিয়েছিল মা কালিকার আহ্বানে।

 হে চেতনার যোদ্ধাগণ, চলুন আমরা আজও সেই মন্ত্র জাগি–

এলো আঁধার দিন ফুরালো, দীপালিকায় জ্বালাও আলো, 
জ্বালাও আলো, আপন আলো, জয় করো এই তামসীরে ।।

প্রাচীন ত্রিপুরার প্রাচীন কালীমন্দির

প্রাচীন ত্রিপুরার প্রাচীন কালীমন্দির 

ত্রিপুরার উদয়পুরে অবস্থিত মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির একটি প্রাচীন কালীমন্দির । ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা ধন্য মানিক্য এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন । তবে ত্রিপুরারাজ্যে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠার আরো প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে । আমরা জানি যে, প্রাচীনকালে ত্রিপুরা রাজ্যের সীমা আরও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । সেই হিসেবে কুমিল্লা ও একসময় ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল । কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের চূড়ায় চন্ডীমন্দির বা চন্ডীমুড়া মন্দির নামে একটি প্রাচীন মন্দির রয়েছে । চন্ডীমুড়ায় দুটি মন্দির পাশাপাশি অবস্থিত । দক্ষিণ পাশের মন্দিরটি চন্ডী মন্দির ও উত্তর পাশের মন্দিরটি শিব মন্দির । চন্ডী মন্দিরটি দেবী কালিকার উদ্দেশ্যে নিবেদিত । এই চন্ডীমন্দির সম্বন্ধে একটি পুরাণ কাহিনি প্রচলিত রয়েছে । দেবী চন্ডী যখন শুম্ভ নিশুম্ভ নামক দুই অসুরের সাথে যুদ্ধ করছিলেন তখন বেশ কিছু অসুর জঙ্গলে ঘেরা এই জায়গায় পালিয়ে আসে । দেবী তখন এখানে অসুরদের বধ করেন । দেবীর দেহতাপের ফলে পাহাড়ের মাটির রং লাল হয় । ফলে এই পাহাড়ের নাম লালমাই পাহাড় হয় ।

সপ্তম শতাব্দীর খড়্গবংশীয় মহারাজ দেবখড়্গ তাঁর রানি প্রভাবতীর ইচ্ছাতে এই মন্দির ও একটি শিব মন্দির নির্মাণ করেন । তিনি নিজে বৌদ্ধ ও তার রানি হিন্দু ছিলেন । তিনি নিজে বৌদ্ধ হয়েও মা চন্ডীর উপাসনা করতেন । বৌদ্ধরাজ দেবখড়্গের স্ত্রী প্রভাবতী দেবী অমর কীর্তি স্থাপনে বদ্ধপরিকর হয়ে এখানে দুটি মন্দির স্থাপন করেন । একটি চন্ডীমন্দির ও অপরটি শিব মন্দির চন্ডীমন্দিরে অষ্টভুজা সর্বানী মহাসরস্বতী । অপরটিতে শিবমূর্তি স্থাপন করেন । এরপর সময়ের সাথে মন্দির দুটি হারিয়ে যায় । ত্রিপুরার যুবরাজ চম্পক রায় দেওয়ানের ভগ্নী দ্বিতীয়া দেবী এই মন্দিরের পুনর্নির্মাণ করেন । তিনি পাহাড়ের দক্ষিণ পূর্বে একটি দিঘি খনন করেন । যার নাম দুতিয়ার দিঘি ।

জয় মা । সবাইকে দীপাবলির শুভেচ্ছা ।

গাড়ুই ব্রত

 গাড়ুই ব্রত

           গাড়ুই ব্রত লৌকিক ব্রত । এর প্রতি পরতে পরতে লোকজীবনের ছাপ রয়েছে ।ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ধানের অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায় নব্য প্রস্তর যুগে ( ৭০০০-৬০০০ খ্রি.পূ. ) ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে । এরপর সিন্ধু সভ্যতায় (৩০০০-২৫০০ খ্রি. পূ.) ধান চাষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন । এটি একটি গ্রীষ্মকালীন ফসল হিসেবে চাষ করা হত । প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্র সমূহের উপর সর্বশেষ গবেষণায় জানা গেছে যে, সিন্ধুসভ্যতায় ধারণার চেয়েও আগে থেকেই ধান চাষ হত । গবেষণা আরও জানাচ্ছে যে, সিন্ধুসভ্যতার মানুষেরা মিশ্রকৃষির ক্ষেত্রেও অগ্রগণ্য ছিল । তারা গ্রীষ্মকালে ধান, মিলিট ও শিম্ব জাতীয় শস্য উৎপাদন করত এবং শীতকালে গম, বার্লি ও ডাল জাতীয় শস্য উৎপাদন করত ।

প্রাচীন ভারতীয় ধর্মগ্রন্থসমূহে ধানকে 'ব্রীহি' বলা হত । ঋগ্বেদ ও যজুর্বেদসহ বিভিন্ন বৈদিক গ্রন্থে এটিকে একটি প্রধান খাদ্যশস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে । বৈদিক যুগে ধানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য বিবেচনা করা হত এবং ব্যাপকভাবে চাষ করা হত । বৈদিক ধর্মীয় ভাবাপন্ন হওয়ার আগে কৌম মানুষেরা লৌকিক দেবদেবীর পূজার্চনা করত । সেখানে বৈদিক ব্রাহ্মণের প্রবেশ ঘটেনি । পরবর্তীসময়ে এইসব ব্রাত্য দেবদেবীরা দেবদেবীতে রূপান্তরিত হয়ে গেছেন । বাংলার লোকধর্মীয় পূজাপদ্ধতিতে নৈবেদ্য বা পূজার উপকরণ হিসাবে গৃহস্থের উৎপাদিত ফসলের অংশ বা প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত সহজলভ্য উপকরণগুলোকেই নিবেদন করতে দেখা যায় । এরকম পূজায় বা আচার অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত অনেক বিষয়ের মধ্যেই আমাদের অতিক্রম করে আসা প্রাচীন সভ্যতার কিছু কিছু বিষয় অজান্তেই থেকে যায় । এরকম শিলনোড়ার ব্যবহার প্রস্তরযুগের নিদর্শন, পূজার সামগ্রী কোশাকুশি তাম্রযুগের স্মৃতিবাহক । গাড়ুই ব্রতে জুমের চালের ব্যবহার বাঙালির কৌমজীবনের অধ্যায়ের ক্ষীণ নিদর্শন । বাঙালি যতই জাতের বড়াই করুক । আদিতে তারা কৌম ও সংকর জাতি । বিবর্তনের সেই অধ্যায়টা অজানা বলে আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই করে মরি । পূজার উপকরণ আমাদের অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয় যাতে আমরা বুঝি ।

Tuesday, October 7, 2025

ভাষাবিহীন ভালোবাসার বিশ্ববিদ্যালয়

ভাষাবিহীন ভালোবাসার বিশ্ববিদ্যালয় 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন 

গত পরশুদিন আমরা গেছি ব্যাঙ্গালোর শহর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চিক্কাবাল্লাপুর পাহাড়ে ঈশা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত আদিযোগী শিবমূর্তি দেখার জন্যে । বিশাল পাহাড়কে পেছনে রেখে দিগন্ত খোলা আকাশ এবং বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মাঝখানে বিশাল ধ্যানমগ্ন শিবমূর্তি । সমস্ত চরাচর জুড়ে এক নীরব নিস্তব্ধ প্রসন্নতা বিরাজ করে এখানে । প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় আদিযোগী মূর্তিকে কেন্দ্র করে শুরু হয় আলো ও শব্দের যুগলবন্দী মোহময় ধারাভাষ্য । সঙ্গে সদগুরুর প্রবচন । প্রায় ১৫ মিনিটের এই অনুষ্ঠান অন্ধকার প্রান্তরে মৌনতার মাঝখানে যেন দৈববাণী ও আলোর বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে এক অনৈসর্গিক পরিবেশ সৃষ্টি করে । মেঘে ঢাকা অন্ধকার আকাশ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিদ্যুতের ঝলকানির সঙ্গে সঙ্গে যোগেশ্বর শিবের মিথসমূহ একে একে উন্মোচিত হয় আলো ও শব্দের মোহজালে তখন সমগ্র চত্বরে মহাবিশ্বের ঐন্দ্রজালিক পরিবেশ জড়িয়ে ধরে যেন সমস্ত সত্তাকে । মৌনী যোগেন্দ্রর সঙ্গে একাত্মবোধ জেগে ওঠে । ভারতের নানাপ্রদেশের মানুষের ছায়ামিশ্রণের এক প্রান্তর । এখানে হিংসাবিদ্বেষ নেই । পরিচয়হীন আত্মপরিচয়ে এক । 'আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়' ।

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর ফেরার পথে ছেলে ও বৌমা আমাদের নিয়ে এল সেই চত্বরের বাইরে একটা বড়ো খাবারের দোকানে । কি সুন্দর দৃষ্টিনন্দন রেস্টুরেন্ট। পাহাড়ের ঢাল কেটে ধাপে ধাপে গ্রাহকদের বসার জায়গা করা হয়েছে অনেকটা গ্যালারির মতো । আলো ঝলমল ও খোলামেলা, গাছগাছালিতে ভরপুর ।  পাহাড়ের উপরের অংশটা নিয়ে দোতলা । সেখানেও পরিপাটি বসে খাওয়ার ব্যবস্থা । এককথায় পাহাড়ের ঢালটাকে কি সুন্দরভাবে কাজে লাগানো হয়েছে । আমরা হলে টিলা কেটে সমান করতাম । এখানকার মানুষ প্রকৃতিচেতনায় সমৃদ্ধ । সারা ব্যাঙ্গালোরে এতো বিশাল বিশাল ইটকাঠের ইমারত টাওয়ার থাকলেও বন কিন্তু চোখে পড়ার মতো । একটু পরপরই গাছগাছালিতে ঘেরা পার্ক রয়েছে । সর্বক্ষণ একটা মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে।  রেস্টুরেন্টে ঢোকার পরপরই এখানে কর্মরত কয়েকটি ছেলেকে দেখে আমার রক্তের ভেতর একটা দোলা দিয়ে গেল । ছেলেগুলো আমাদের খাবার পরিবেশন করল । বাসনপত্র নিয়ে গেল ধোয়ার জন্যে । সবাই মিলে কাজ করছে এখানে । 

একটা ছেলে একটু দূরে বসে কাজের ফাঁকে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিল আনমনে । আমি আমার খাওয়া সেরে তার পাশে বসলাম । পরিবারের সবাই আমাকে লক্ষ করছে । আমি ছেলেটার কাছে গিয়ে বললাম, ভাই, তূমহারা ঘর কাঁহা ? ও বলল, ত্রিপুরা। নুং বরক দে ? আমি প্রশ্ন করলাম । সঙ্গে সঙ্গে ও চোখ বড়ো বড়ো করে জবাব দিল,  ইঁ , নুং ? আমাকে প্রশ্ন করল । আং ব ত্রিপুরা হা নি । আমি বললাম । প্রশ্ন করলাম নিনি নক বিয়াং । বলল, মনুঘাট । আমবাসানি কান্দার' । আং সাব্রুমনি সে ।  আমিও আমার স্থাননাম বললাম । আমার আধভাঙা ককবরক শুনে মনে হল সে খুশি । দেববর্মা দে নুং । ইঁহি । ত্রিপুরা। তাম' নিনি মুং । চিকনিয়া ত্রিপুরা । ও বলল । 

চিকনিয়া জানাল কয়েকমাস যাবত এখানে কাজ করছে । বেতন মাসে সতেরো হাজার টাকা । দুবেলা খাবার ও থাকার জায়গা মালিকের দেওয়া । সে নাকি সাব্রুমেও ছিল কিছুদিন । মাগরুমে একটি ব্রিজ  তৈরির কাজ করেছিল কিছুদিন । আমি বললাম, তোমাদের দেখেই আমি আমার পরিবারকে বলেছি এরা ত্রিপুরার হবে । ছেলেটি হাসল । সারল্যের হাসি । আপনার সঙ্গে কথা বলে আমার খুব ভালো লাগছে । ঘরের মানুষের সঙ্গে যেমন কথা বলছি । আপনি বাঙালি আমি ত্রিপুরা কিছু মনে হচ্ছে না । সুন্দর বাংলা বলে ছেলেটা । আমাকে পেয়ে আরও বলল, এখানে কাজ করছি ভালোই। কিন্তু ওরা কানাড়ায় কথা বলে । আমরা না বুঝলে গালাগাল দেয় । এছাড়া আর সবই ভালো । আমি বললাম, চলো একটা ছবি নিই দুজনে । সঙ্গে সঙ্গে ও খুশি । আমার পাশে এসে বসল । সেলফি তুললাম । তারপরেই তার ডাক পড়ল । সে উঠে চলে গেল কাজে । 

আমি মহেশ্বর শিবের মতো স্থানু হয়ে তার দিকে চেয়ে রইলাম । আমার রক্তের ভেতর যেন ইতিহাসের কোন অনাদিকালের নেগ্রিটো, অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয় রক্তের মিশ্রণের এক ফল্গুর কল্লোল উঠছে । আমিও সেই । আদিযোগী ।

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৬ )

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৬ )

আজ বিজয়া দশমী । দেবী দুর্গার বিসর্জনের দিন । ভারতের অন্য সব প্রান্তে এই দিনটি দশেরা উৎসব হিসেবে শ্রদ্ধা ভক্তির সঙ্গে পালিত হয় । রামায়ণ মহাকাব্যে বর্ণিত রামচন্দ্র কর্তৃক রাবণ বিজয়ের এই দিনটিকে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয় হিসেবে পালিত হয় । কর্ণাটক রাজ্যের মহীশূরে চামুন্ডেশ্বরী মন্দির, কুর্গের মাদিকেরীসহ সর্বত্র এই দশেরা উৎসব জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয় । দশেরাকে কর্নাটকের আঞ্চলিক উৎসবও বলা হয় । নবরাত্রির দিন থেকে এই উৎসব শুরু হয় । আজ ব্যাঙ্গালোর জুড়েই দেখলাম দশেরার প্রস্তুতি । বাজারে প্রচুর ফুল ফল ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে । সবাই সাধ্যমত ফুল, ফল, ফুলের মালা, আমের পল্লব, কলার চারা নিয়ে যাচ্ছেন । সকাল থেকেই বাড়িঘর সাজানো হয়েছে ফুল ও ফুলের মালায় । সদর দরজার দুপাশে লাগানো হয়েছে কলার চারা । মাঝখানে আলপনা । প্রতিটি বাড়ির সামনে বড়ো বড়ো চালকুমড়ো ও নারকেল ফাটিয়ে রাখা হয়েছে । অনেকটা আমাদের দক্ষিণ ত্রিপুরায় চৈত্র সংক্রান্তির দিনের আমের কুশি কেটে সত্তুরওড়ানোর মতো । যানবাহনগুলোকে ফুলের মালায় সাজানো হয়েছে । এদিকে বাঙালিদের পুজো প্যান্ডেলে বিজয়া দশমীর বিদায়ের সুর । সর্বত্র একটা নীরবতা । আনন্দ ও বেদনার পাশাপাশি অবস্থান । কি অদ্ভুত রসায়ন ! জীবনটাও এমনই ।

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৫ )

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালি দুর্গাপুজো (৫ )

এবারে আমি পরপর দুটি এপিসোডে বর্তমানে যেখানে আছি অর্থাৎ আমার বড়ো ছেলের ফ্ল্যাটের কাছাকাছি এলাকার একটা বড়ো দুর্গাপূজোর বিষয়ে কিছু জানিয়ে এবং তারপরে এখানকার স্থানীয় সংস্কৃতির একটি বিষয় যার সঙ্গে আমাদের দুর্গোৎসবের কিঞ্চিত সম্পর্ক রয়েছে তার উল্লেখ করে ব্যাঙ্গালোরের পূজা পরিক্রমা শেষ করব ।

দুর্গাপুজোর থিমে অনেক সময় চলচ্চিত্র বা সিনেমার বিষয় উঠে এসেছে । বিশেষ করে কলকাতা ও আগরতলার বড়ো বড়ো বারোয়ারি পুজোকমিটিও থিম পুজোগুলিতে।

এরকম কয়েকটি দৃষ্টান্ত:

1. সত্যজিৎ রায় স্মরণে থিম –

অনেক পুজো কমিটি “পথের পাঁচালী”, “অপু ট্রিলজি”, বা “গুপী গাইন বাঘা বাইন”–এর দৃশ্য দিয়ে থিম সাজিয়েছে।
বিশেষত ২০১৯-এ সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে একাধিক পুজো তাঁকে কেন্দ্র করে থিম নিয়েছিল।
2. বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগ –
কিছু পূজায় ৫০–৬০–৭০-এর দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের পোস্টার, গান, সেট, দৃশ্য ব্যবহার করে প্যান্ডেল সাজানো হয়েছে।
যেমন: উত্তম-সুচিত্রার জনপ্রিয় ছবি সাগরিকা, হারানো সুর, পিকনিক ইত্যাদির আবহ।
3. বলিউড ও বিশ্বসিনেমা থিম –
মাঝে মাঝে “শোলে”, “মুঘল-এ-আজম”, এমনকি “হ্যারি পটার” বা “অ্যাভেঞ্জার্স”-এর চরিত্র নিয়ে থিম তৈরি হয়েছে।
তবে এসব সাধারণত আকর্ষণ করার জন্য, আধ্যাত্মিকতার সাথে মেলানোর চেষ্টা করা হয়।
4. সামাজিক বার্তা মূলক সিনেমা –
“পথের পাঁচালী” বা “মেঘে ঢাকা তারা”-র মতো সিনেমার দারিদ্র্য, সংগ্রাম, সমাজ-বাস্তবতার দিক তুলে ধরা হয়েছে।
থিমের মাধ্যমে বলা হয়, দেবী শক্তি শুধু পুজো নয়, বাস্তব জীবনের সংগ্রামে পাশে থাকার প্রতীক।

তেমনি একটি চলচ্চিত্রের থিমকে নিয়ে পুজোর আয়োজন করেছেন ব্যাঙ্গালুরুর আরোহন সোসিও কালচারাল এসোসিয়েশন। কাঠগুড়ির পাশে বেলাথুরে তাঁদের পুজোমণ্ডপের এবারের থিম 'দুর্গেশগড়ের দেবীদ্বার' । থিমটি নেয়া হয়েছে 2019 সালের হিট বাংলা ছায়াছবি 'দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন' এর বিষয়েকে নিয়ে । কাহিনি ইতিহাসের একটা ঘটনার সঙ্গে কল্পনা মিশিয়ে থ্রিলারধর্মী করে তোলা হয়েছে । কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পর জগৎ শেঠের কাছ থেকে প্রচুর ধনসম্পদ উপঢৌকন পেয়েছিলেন । সেই সম্পদ যাতে ইংরেজের হাতে না পড়ে সেজন্যে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সেগুলো দুর্গেশগড়ের দেবীদ্বার মন্দিরে লুকিয়ে রেখেছিলেন । তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম সেই রহস্যময় সম্পদ খুঁজে পায়নি । ইতিহাসের অধ্যাপক সুবর্ণ সেন, ভাইপো আবির এবং তাঁর বন্ধু ঝিনুককে নিয়ে সেই রহস্য উন্মোচনের জন্য সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন । কাহিনির সেই দেবীদ্বারের আদলে তৈরি তাঁদের মন্ডপ । প্রতিমাও দৃষ্টিনন্দন । মন্ডপের ভেতরের সৌন্দর্যায়ন করেছেন সংগঠনেরই একঝাঁক শিল্পী । ভক্তি-শ্রদ্ধার সঙ্গে পুজো ও প্রতিদিন মধ্যাহ্নে সবার জন্যে প্রসাদের ব্যবস্থা করেছেন । বিনোদনের ব্যবস্থাও ছিল জমাটি । প্রতি সন্ধ্যায় বহিরাগত শিল্পীরা ও সংগঠনের সদস্যগণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন । অষ্টমীর রাতে বরিষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে এক অভিনব ফ্যাশন শোএর আয়োজন করেছেন উদ্যোক্তারা । ব্যাঙ্গালোরে সব পুজো প্যান্ডেলে দেখলাম বয়স্ক নাগরিকদের বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখা হয় । পঁচাত্তর-ছিয়াত্তর বছরের বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শারীরিক অসুস্থতা, ডায়ালিসিসের কষ্ট সহ্য করেও অনেকে মঞ্চে ক্যাট ওয়াক করেছেন । এই ফ্যাশন শোএর বিষয় নেওয়া হয়েছে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সাজপোষাক ।

উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণের কালে জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের সদস্যরা সাহিত্য ও শিল্পকলা, সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন । সেই পরিবারের পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও আধুনিকতায় এগিয়েছিলেন । এই পরিবারের জ্ঞানদানন্দিনী দেবী বাঙালিদের আধুনিক কায়দায় শাড়ি পরাতে শিখিয়েছিলেন । ঠাকুরবাড়ির বউদের শাড়ি পরার ধরনই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাঙালি রমণীদের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায় । পাশাপাশি এই পরিবারের সদস্য সদস্যারা অভিনয়েও অংশগ্রহণ করেছিলেন । ঠাকুর পরিবারের প্রথিতযশা পুরুষ ও রমণীদের চরিত্রাভিনয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এই ফ্যাশন শো । বিষয়টি অভিনব ও গবেষণালব্ধ । আধুনিক অঙ্গনে একটা সময়কে তুলে ধরা হয়েছে । এই সংগঠনের তরুণ সদস্যরাও কম যান কিসে ? তাঁরাও দল বেঁধে ধুতি পাঞ্জাবি পরে বাঙালিবাবুটি সেজে মঞ্চে উঠেছিলেন এই সন্ধ্যায় । গত ত্রিশে সেপ্টেম্বরের আনন্দবাজা পত্রিকার পাঁচের পাতায় আরোহন কালচারাল এসোসিয়েশনের প্রতিমার ছবি ছাপা হয়েছে যত্নের সঙ্গে ।

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৪ )

প্রবাসে দেবীর বশে :  ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৪ )

সার্জাপুরের এক প্রান্তে ন্যাশনাল পাবলিক স্কুল কূডলুর পাশেই হচ্ছে বর্ষা বেঙ্গলি এসোসিয়েশনের পূজো । অসাধারণ সৌন্দর্যমন্ডিত তাদের এই পুজো মণ্ডপ । বাংলা এবং কর্নাটকের সংস্কৃতির মধ্যে এক আশ্চর্য মেলবন্ধনকে তুলে ধরার প্রয়াস নিয়েছেন তাঁরা । তাঁদের মণ্ডপসজ্জায় তাঁদের এবছরের পূজা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যে ভাবনাটি তুলে ধরেছেন তার নাম দিয়েছেন 'চিত্রাগাণা' । বাংলা এবং কর্ণাটকের দুইটি বিশিষ্ট লোককথাভিত্তিক চিত্রকলার সংমিশ্রণ এখানে ঘটিয়েছেন । তাঁদের মন্ডপের সামনের দিকটাতেই এই থিম এর মাধ্যমে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পটচিত্র ছৌ মুখোশ এবং কর্নাটকের 'যক্ষগাণা'  ( Yakshagana ) চিত্রশৈলীর মুখোশের নিদর্শন রেখে দুটি প্রদেশের শিল্পমাধ্যমের মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছেন উদ্যোক্তারা । পুরো মন্ডপ জুড়ে কর্ণাটকী লোককথা 'যক্ষগাণা' ও বাংলার ছৌ নৃত্যের মুখোশ । মন্ডপের ভেতরেও অসাধারণ সব কাজ ।পুজোর মাধ্যমে কর্নাটকের ও বাংলার ঐতিহ্য, শিল্প ও সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণ ঘটিয়েছেন তাঁরা । এই সার্জাপুরের আর একটি পুজো করছেন SORRBA. তাঁরা এই পুজোর মাধ্যমে পঞ্চদুর্গা ও দশেরা  উদযাপন করছেন । প্রতিমাটি খুবই সুন্দর । কাঠখোদাই কাজের ধরনের । চারদিকের প্রাকৃতিক পরিবেশও মনোরম ।

ব্যাঙ্গালোর তথ্যপ্রযুক্তির মহানগর । ইলেকট্রনিক সিটি । কাজেই এখানকার পুজোতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারিক চমক তো থাকবেই । ইস্ট বেঙ্গালুরু কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন ( EBCA ) এর এবারের পুজোর থিম "প্রযুক্তির আলোয় প্রথাগত পূজা"  । এবছর তাঁরা তাঁদের পুজোয় আলোড়ন সৃষ্টিকারী ভাবনা নিয়ে এসেছেন । এবার তাদের ভাবনা হল ত্রিমাত্রিক নবদুর্গা যা শুধু ভারতবর্ষে নয়, সারা পৃথিবীতেও আর কেউ কখনো উপস্থাপন করেনি বলে উদ্যোক্তারা দাবি করছেন । পূজা মন্ডপে নবদুর্গার নয়টি বিশেষ  প্রতিমার উপরের দিকে একটা করে কিউ আর কোড লাগানো আছে । পূজা মন্ডপে আগত দর্শণার্থীরা এখানে এসে তাদের মোবাইলে নবদুর্গার এই প্রতিকৃতিগুলির স্ক্যান করতে পারছেন এবং এই বিগ্রহ সমূহ তাদের মোবাইলের পর্দায় জীবন্ত দেখতে পারছেন । পরিবেশবান্ধব এই পুজোমণ্ডপ এবং দেবীপ্রতিমা নির্মাণ করেছেন কৃষ্ণনগরের এক শিল্পী কৌশিক দাঁ । ঠিক এমনই উত্তরণ সর্বজন সমন্বয়ের পুজোয় প্রতিমা তৈরি হয়েছে শিল্পী পৃথ্বীরাজ চৌধুরীর এক বিখ্যাত মা দুর্গার পেইন্টিংকে ভিত্তি করে চিত্রকরের 2D চিত্রকে 3D রূপে এখানে তুলে ধরা হচ্ছে প্রথমবার । আর সেই চিত্রকে মাথায় রেখে এবছর তাদের থিম হচ্ছে "কালীঘাটের চিত্রশিল্প"  । গুঞ্জুর লেক-এর উল্টোদিকে এস আর অক্ষতা প্যলেসে ( S R AKSHATA PALACE ) হচ্ছে ব্যাঙ্গালুরু সিলেটি কালচারাল এসোসিয়েশনের পুজো । এখানে  উত্তরপূর্বের শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, পাথারকান্দি ও ত্রিপুরার ধর্মনগর, খোয়াই, কৈলাশহর ও কমলপুরের অনেকেই এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত আছেন । তাঁরা সবাই কর্মসূত্রে এখানে আছেন । কেউ স্থায়ী আবাস করে নিয়েছেন ।  বয়স্ক মাবাবাকে নিয়ে এসেছেন ।কেউ বছরে এক দুবার বাড়ি যান । এককথায় উত্তরপূর্বের এই বিস্তীর্ণ সিলেটি ভাষাভাষী মানুষ এখানে সম্মিলিত হন পুজোকে কেন্দ্র করে । সিলেটি সংস্কৃতি খুবই সমৃদ্ধ । তারই প্রতিফলন রয়েছে তাদের পুজোয় । তাদের পুজোর ব্যানারে সিলেটি নাগরী লিপির নিদর্শন রেখেছেন । যথাযথ নিয়মে হোম যজ্ঞ সহকারে এখানে তাঁরা পুজোর আয়োজন করেন । সেই সঙ্গে থাকে ঢালাও প্রসাদের ব্যবস্থাও । 
এছাড়া আরো অনেক পুজো সারা ব্যাঙ্গালোর জুড়ে রয়েছে । ভক্তি নিষ্ঠা থিম মিলিয়ে কোনোটাই এড়িয়ে যাবার মতো নয় । কিন্তু সব মন্ডপই  অনেক দূরে দূরে একটা দুটো দেখতে গেলেই দিনের একাংশ চলে যায় ।

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৩ )

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপুজো ( ৩ )

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসব । বাংলার প্রতিটি গ্রাম নগরে দুর্গোৎসব পালিত হয়ে আসছে বহু প্রাচীনকাল থেকে । সে ধারা আজও বহমান । আজ ভুবনায়নের যুগে বাঙালি মায়ের আঁচল ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছেন বিশ্বময় । বাঙালি যেখানেই গেছেন তাঁদের সংস্কৃতিকে বয়ে নিয়ে গেছেন। সমস্ত রকমের সামাজিক অনুষ্ঠানসহ পূজাপার্বণ ও পালন করে আসছেন অত্যন্ত ভক্তি শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সঙ্গে । সেইমতো আজ দুর্গোৎসব হচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে এবং বিদেশেও । দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্যকে তাঁরা ফুটিয়ে তুলছেন নানাভাবে । যখন যেখানে থাকছেন সেখানকার সংস্কৃতিকেও ধারণ করছেন আবার তার সাথে নিজেদের সংস্কৃতিকে মিশিয়ে এক মোহনায় নিয়ে আসছেন সৃষ্টিশীলতায় ও নিষ্ঠায় ।

হুগলির গুপ্তিপাড়াতে ১৭৯০ সালে ১২ জন বন্ধু মিলে যে জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন তাই 'বারো ইয়ারি' বা 'বারোয়ারি' পূজা নামে পরিচিত হয় । প্রথমদিকে দুর্গাপুজো করতেন রাজরাজড়ারা, ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ বা জমিদারগণ । সেখানে সবার প্রবেশাধিকার ছিল না । বারোয়ারি পুজো শুরু হওয়ার পর থেকে দুর্গাপুজো সর্বজনীন রূপ নেয় । সেই থেকে বাঙালি যেখানেই গেছেন সেখানেই তাঁরা সমবেতভাবে দুর্গোৎসব পালন করছেন । ।

ভারতের বড়ো বড়ো শহরের মধ্যে ব্যাঙ্গালুরু অন্যতম । এই শহরে বাস করেন বহু বাঙালি । পিতৃমাতাভূমি ছেড়ে এসে এই প্রজন্মের অনেকে এখানে স্থায়ী বসত গড়ে নিয়েছেন । অনেকে রুটিরুজির প্রশ্নে এখানে এসে থাকছেন । যেখানে বাঙালি রয়েছে সেখানেই রয়েছে বাঙালি সমিতি, সংগঠন । তাঁরা শরৎকালে দুর্গোৎসবে মেতে উঠেন । সংবৎসর অন্যান্য পুজো, অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন । ঐতিহ্যের অনুসারী হন । সেই সঙ্গে বাঙালি খোঁজেন তাঁদের আত্মপরিচয়ের শেকড় । সেই শেকড়ে ভর করেই তাঁরা পা বাড়ান আরেক ভবিষ্যতের দিকে । সে কারণেই ব্যাঙ্গালুরুর রামমূর্তিনগরের শ্রীহট্ট সম্মিলনী এবছর তাঁদের পুজোর ভাবনা রেখেছেন 'অস্তিত্ব' । তাঁরা দেবীপুজোর মাধ্যমে তাঁদের অস্তিত্বকে জানান দেন এবং এই নতুন ভূখণ্ডকে আপন করে নেওয়ার ভাবনায় ক্যাপশন দেন– "বাড়ি ছাইড়া বাসাত আইলাম / বাসারে আমার ঘর বানাইলাম" । স্মৃতিকাতারতা আর বাস্তবতার স্বীকারোক্তি এই উচ্চারণ ।

যতটুকু জানা যায়, ১৯৫০ সালে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের কয়েকজন অধ্যাপক সম্মিলিত উদ্যোগে ব্যাঙ্গালুরুতে প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপুজোর সূচনা করেন । মূলত এই পুজো থেকেই বাঙালিরা এখানে নানা পুজোপার্বণ ও সামাজিক অনুষ্ঠান শুরু করেন । ১৯৬৯ সালে ব্যাঙ্গালুরুতে অল ইন্ডিয়া কনফারেন্সের মাধ্যমে বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন তার কাজ শুরু করে এখানে । তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি । ব্যাঙ্গালুরুর নানা প্রান্তে শুরু হয় বাঙালিদের নানা সংগঠন, পুজো ও সামাজিক অনুষ্ঠান ।

কোলকাতা, আগরতলার পুজোতে যেমন দুর্গাপুজোর মন্ডপে ফুটে উঠে বিষয়ভাবনা তেমনি ব্যাঙ্গালোরের পুজোতেও জাঁকিয়ে বসেছে এই থিম । এখানে কদর রয়েছে থিম মেকারদেরও । পুজোর আগে পশ্চিমবঙ্গ থেকে থিম মেকার ও শিল্পীরা এসে মন্ডপ সাজিয়ে দেন । এখানে বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের এবারের থিম শোভাবাজারের রাজবাড়ি । ১৭৫৭সালে ইংরেজদের হাতে শোভাবাজারের পতন ঘটার পর বিজয়োৎসবের আনন্দে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় কোলকাতার শোভাবাজারের জমিদার নবকৃষ্ণ দেবের পুজোর মধ্য দিয়ে দুর্গাপুজোর সূচনা করা হয় । তাঁদের এবছরের মন্ডপ শোভাবাজারের রাজবাড়ির আদলে ।এবছর তাঁদের পুজো ৭৫ বছরে পড়ল ।

ব্যাঙ্গালুরুর প্রাচীন পুজোর মধ্যে এ বছর একাত্তরে পা দিল জয়মহল কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের দুর্গাপুজো । তাদের এ বছরের থিম হারিয়ে যাওয়া শৈশব ( Lost Childhood ) ।

আরটি নগর প্যালেস গ্রাউন্ডে কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের থিম 'মুক্তি' । মণ্ডপসজ্জায় রয়েছে বর্তমান জটিল জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার আকুতি । কর্পোরেট জীবন যেভাবে মানুষের ব্যক্তিগত সময়, আনন্দ, সুখ ও বিনোদনকে কেড়ে নিচ্ছে তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার আর্তি রয়েছে এই মন্ডপের ভিতরের শিল্পকলায় । এই চত্বরেরই আর একটি পুজো ব্যাঙ্গালুরু কালচারাল এসোসিয়েশন নারী ক্ষমতায়নের থিমকে মাথায় রেখে নারী জাতিকে সম্মান জানাতে পুজো পরিচালনা, পুরোহিত ও ঢাকের বাজনায় অংশ নিয়েছেন একদল মহিলা । গ্রীন গ্লেন লেআউট অ্যাসোসিয়েশনের এবারের পূজোর থিম 'নটরাজ' । বর্তমানে চলা সারা বিশ্বময় অস্থিরতা, ধ্বংস, তান্ডবকে মাথায় রেখে তাঁরা বিশ্ববাসীর কাছে এই সংকটময় মুহূর্ত থেকে পরিত্রাণের বার্তা পৌঁছে দিতে চান । নটরাজের তাণ্ডব হিংসার বিরুদ্ধে শান্তির জয়বার্তা ঘোষণা করছে । কোরমঙ্গলার সারথি সোসিও কালচারাল এর পুজোর ২৩ তম বছরের থিম 'মিলে সুর তুমহারা হামারা' । বেশ কিছু বছর আগে দূরদর্শনে বিভিন্ন ভাষায় এই গানটি প্রচারিত হত । সেই ভাবনাকে নিয়ে নানা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের সম্প্রীতির চিত্র ফুটে উঠেছে এখানে । পূর্ব ব্যাঙ্গালোরে কেটিপিও গার্ডেনে পূর্বা ব্যাঙ্গালুরু কালচারাল এসোসিয়েশনের পুজোয় সাবেকিয়ানার ছাপ রয়েছে । বিশাল চত্বর নিয়ে তাঁদের পূজো মন্ডপে প্রতিদিন প্রচুর দর্শনার্থীর ভিড় হচ্ছে । জনভোগের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে ।  বরিষ্ঠ নাগরিকদের প্রতি তাঁদের যত্ন লক্ষণীয় ।

ইন্দিরানগর ঐক্যতান হেব্বেল কালচারাল সোসাইটি তাঁদের এবারের সাতান্নতম বর্ষের দুর্গোৎসবে দর্শন ও আধ্যাত্মিকতাকে ভগবত গীতার মাধ্যমে তুলে ধরতে চান । তাঁরা মনে করেন গীতার বাণীর মাধ্যমে ব্যক্ত শিক্ষা বা বোধ আজকের দিনে খুবই অর্থবোধক যেখানে সম্প্রীতি ও শান্তি প্রশ্নের সম্মুখীন । মন্ডপসজ্জায় গীতা  থেকে উদ্ধৃত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে সেই সময়ের পরিবেশকে স্পষ্ট করা হয়েছে । সারা প্যান্ডেল জুড়েই গীতার শ্লোকের মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাণী দর্শকের সামনে মেলে ধরা হয়েছে । নেল্লুরহাল্লি, হোয়াইট ফিল্ড কালচারাল এসোসিয়েশন তাদের মন্ডপ করেছেন কেদারনাথ মন্দিরের আদলে । এরকম বিবিএসইটির এ বছরের থিম হল পশ্চিম ভারতের রাজকীয় রাজস্থান । রাজস্থানের ঐতিহ্য প্রাচীন দুর্গ ইত্যাদি প্রদর্শন রয়েছে এখানে । তেমনি পূর্ব ভারতকেও তুলে আনা হয়েছে ব্যাঙ্গালুরুর পূজামন্ডপে । সাউথ ইস্ট ব্যাঙ্গালুরু বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের পুজোর থিম 'পুরাতন বাংলার রাজবাড়ীর দুর্গোৎসব' । নর্থ বেঙ্গালুরু কালচারাল সমিতি এ বছর তাঁদের আয়োজিত দুর্গোৎসবের থিম করেছেন ভারতের ধ্রুপদী ইনডোর গেম দাবাকে কেন্দ্র করে দাবার জগৎ ( World Of Chess ) । তাঁরা এবছর সমস্ত গ্র্যান্ড মাস্টারদের স্মরণ করতে চাইছেন । এই পুজোর মাধ্যমে উদ্যোক্তারা দাবার ৬৪ ঘর বা ঘুঁটির সঙ্গে শক্তির ৬৪ রূপ, মায়ের ৬৪ যোগিনীর সম্পর্ক নির্ণয় করতে চাইছেন । তারা বলতে চাইছেন দাবা শক্তিরই অভিন্ন রূপ ।

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপূজা ( ২ )

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্পুগাজো ( ২ )

ছেলে এবং বৌমা আজ আমাদের নিয়ে বেরুল ব্যঙ্গালোরে পুজো দেখার জন্যে । আজ দেখলাম দুটো পুজো । আরটিনগর সোসিও কালচারাল এসোসিয়েশন এবং হোয়াইট ফিল্ডের পিবিসিএতে  ( Purba Cultural Association ) । ব্যাঙ্গালোরে এবার ছোটো বড়ো মিলে পুজো হচ্ছে ২৭২ টির মতো । পুজো মন্ডপগুলো অনেক দূরে দূরে । তাই শরীরের উপর চোট না দিয়ে বড়ো শ্রীমান তার গাড়ি নিয়ে যে কয়টা পুজো পারে দেখাবে ।

এখানকার পুজোতে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরার মতো প্রবল উন্মাদনা না থাকলেও আন্তরিকতা ও একতা আছে । লক্ষ্যণীয় দুএকটি বিষয়ের মধ্যে  আরটিনগরের পুজোতে দেখলাম ঢালাও ভরপেট খাবারের আয়োজন । খাবারে ছিল ফ্রায়েড রাইস, লুচি, ছোলার ডাল, কাশ্মীরী আলুর দম,চাটনি ও মিস্টি । প্রতিমা সুন্দর । থিমও আকর্ষণীয় । মনে রাখার মতো ব্যাপার হল বরিষ্ঠ নাগরিকদের জন্য প্রসাদ গ্রহণের আলাদা লাইন, বিশ্রামের বিশেষ ব্যবস্থা নজর কেড়েছে । 

ব্যাঙ্গালোরের পুজো কেবলমাত্র ভক্তি, শ্রদ্ধা, উৎসব আর আনন্দ নয় । বিনোদনের পাশাপাশি বিপননও জমজমাট । বিশাল জায়গা জুড়ে পুজো মন্ডপ । প্রায় প্রতিটি মন্ডপেই রয়েছে । নানারকমের খাবারের দোকান, কাপড়ের বিশাল সম্ভার, ব্যাংক, ইন্সিওরেন্স, হাউজিং নির্মান সংস্থার প্রতিনিধিরা, ঘরগেরস্থালির সামগ্রীর দোকান, শিশুদের খেলনার দোকান, তাদের বিনোদনের দোলনা, টয়ট্রেন, ইত্যাদি মিলিয়ে এককথায় ছোটদের বিনোদনের ব্যবস্থাসহ একটা ছোটোখাটো মেলার মতো এলাহি ব্যবস্থাপনা ।  এসবের প্রতিনিধিরা মেলায় স্টল খুলে ব্যবসা করার জন্যে স্পনশরশিপ নিতে হয় । তার জন্যে পুজো কমিটিকে ভালো টাকা দিতে হয় । এটাই পুজো কমিটির একটা বড়ো আয় । সদস্য চাঁদা ছাড়া এই আয় দিয়েই তাদের পুজোর খরচাপাতি, সাংস্কৃতিক  অনুষ্ঠান, জনকল্যাণমূলক কাজকর্মসহ সমস্ত আয়োজন সারা হয়ে যায় । আমাদের অঞ্চলের মতো চাঁদাবাজির দুর্নাম কুড়োতে হয়না । আমাদের অঞ্চলের পুজোতেও এই পদক্ষেপ অনায়াসেই নেওয়া যায় । আইডিয়াটা দারুণ । আজ এটুকুই । সবাইকে শারদ শুভেচ্ছা‌।

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপূজো ( ১ )

প্রবাসে দেবীর বশে : ব্যাঙ্গালোরে বাঙালির দুর্গাপূজো ( ১ )

প্রাচীন ভারতে দেবীপূজার সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে । দক্ষিণের রাজ্য কর্ণাটকেও দেবী পূজার বহু প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে । মহীশূরের চামিন্ডা পাহাড়ে অবস্থিত চামুন্ডেশ্বরী মন্দির অন্যতম শক্তিপীঠ । দেবী এখানে মহিষাসুর বধরতা মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গারূপে বিরাজিতা । কিংবদন্তি অনুযায়ী মহিষাসুর মহীশূর রাজ্যের রাজা ছিলেন মহীশূর নামটি এসেছে প্রাচীন কন্নড় শব্দ  মহীশূরু থেকে । 'মহীশূরু' শব্দের অর্থ মহিষাসুরের গ্রাম । বহু শতাব্দী ধরে দেবী চামুন্ডেশ্বরী মহীশূর রাজ্যের রক্ষাকর্ত্রী দেবী  হিসেবে পূজা পেয়ে আসছেন। এই দেবী চামুন্ডা মহাশক্তির ভয়াল রূপ । তিনি অতি ভীষণা ও শক্তিশালী দেবী । তিনি আদ্যাশক্তি বা সর্বপ্রথম সৃষ্টিকর্তা নারীত্বের প্রতীক । তাঁকে মহাদেবী দুর্গার এক রূপ হিসেবে গণ্য করা হয় । আবার তিনি মা কালীর অবতার রূপেও পূজিতা । কথিত আছে, চন্ড ও মুন্ড নামে দুই দুর্ধর্ষ অসুরকে বধ করার ফলে তিনি 'চামুন্ডা' নামে পরিচিত । আবার মহিষাসুরকে নিধন করার জন্যে তিনিই আবার 'মহিষাসুরমর্দিনী'। তিনি চামুণ্ডা, চামুন্ডী, চামুন্ডেশ্বরী ও চর্চিকা নামেও পরিচিতা । হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন–এই তিন ধর্মেই তাঁর ভিন্ন ভিন্ন রূপে পূজা প্রচলিত আছে । চামুন্ডা দেবী তান্ত্রিক শক্তিরও গূঢ় আধ্যাত্মিকতার মূর্ত প্রতীক । মৃত্যু ধ্বংস, জরা ও অসুস্থতার দেবী রূপেও তিনি পূজিত হন । অন্যদিকে তিনি প্রতিকূলতা, অন্ধকার ও দুষ্টশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়েরও প্রতীক।

চামুন্ডা অত্যন্ত প্রাচীন মাতৃকা । সিন্ধুসভ্যতায় প্রাপ্ত প্রত্নফলক অনুযায়ী, একজন বৃক্ষবাসিনী মাতৃকার সামনে ছাগবলি হত। সেই বলি গ্রহণ করতে সপ্তমাতৃকা উপস্থিত থাকতেন । এই সপ্তমাতৃকার  অন্যতম ছিলেন চামুন্ডা । প্রাচীন হরপ্পা সভ্যতার অবসানের দীর্ঘ আড়াই হাজার পরে পৌরাণিক যুগেও দেবী চামুন্ডা সপ্তমাতৃকার একজন হিসাবে পূজিতা হতে দেখা যায় । বর্তমান সময়ের দুর্গাপূজায়ও নবপত্রিকার নব আভরণের অন্যতম মানপত্রে বা মানকচুতে দেবী চামুন্ডার আধিষ্ঠান কল্পিত হয় ।

দুর্গাপূজায় অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে দেবী দুর্গা চামুন্ডা রূপে আবির্ভূতা হন । এই ক্ষণটাই মহাশক্তির সর্বোচ্চ প্রকাশ । সন্ধিপূজার সময় দেবীকে নিবেদন করা হয় ১০৮ টি পদ্ম ও ১০৮ টি প্রদীপ । পদ্ম ভক্তির প্রতীক । দীপ জ্ঞানের প্রতীক । এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় নৈবেদ্যের থালা, সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উপাচার, সবচেয়ে গভীর আরাধনা সবই নিবেদিত হয় দেবীর চরণে । এই ক্ষণে দেবীর প্রণাম মন্ত্র–

ওঁ দংষ্ট্রাকরালবদনে শিরোমালা বিভূষণে ।
চামুন্ডে মুন্ডমথনে নারায়ণী নমোহস্তু তে ।
দেবী চামুন্ডা তথা মহিষাসুরমর্দিনীকে কেন্দ্র করে মহীশূরসহ সমগ্র কর্ণাটকে নবরাত্রি ও দশেরা উপলক্ষ্যে উৎসব পালিত হয় ।

দুর্গাপূজায় লৌকিকতা ও সামাজিকতা : অতীত ও বর্তমান

দুর্গাপূজায় লৌকিকতা ও সামাজিকতা : অতীত ও বর্তমান 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

বাঙালি হিন্দুদের প্রধানতম উৎসব ও শ্রেষ্ঠ পূজা হল দুর্গাপূজা । পুরাণ শাস্ত্রকারদের মতে দেবী দুর্গা আদ্যাশক্তি মহামায়া, উমা, চন্ডী, ভগবতী, ভবানী, অম্বিকা, পার্বতী, শিবানী, কাত্যায়নী, মহিষাসুরমর্দিনী, অদ্রিজা প্রভৃতি বহু নামে পরিচিত ও পূজিত হন । ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, কালিকাপুরাণ, দেবীপুরাণ, দেবী ভাগবত ইত্যাদি গ্রন্থে কিছু কিছু পার্থক্য থাকলেও দেবী দুর্গার কাহিনী ও লীলা বর্ণনা সর্বত্রই দেখতে পাওয়া যায় ।

দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে শুধু দেবীআরাধনেই নয় । এটি বাঙালির প্রাণের উৎসব । এর মধ্যে যেমন আছে পৌরাণিক বিশ্বাস, মিথ তেমনি রয়েছে শিল্প-সংস্কৃতি, লোকাচার ও সামাজিকতার গভীর মেলবন্ধন । সুদূর প্রাচীনকাল থেকে বাঙালির জীবনে উৎসব এবং শ্রেষ্ঠতম পূজা হিসেবে দুর্গাপূজার প্রচলন রয়েছে । বাংলার অন্যতম প্রাচীন দুর্গাপূজা হল বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের মৃন্ময়ী মন্দিরের পূজা । দেবী মৃন্ময়ী ছিলেন মল্লভূম রাজ্যের রাজরাজেশ্বরী মল্ল রাজবংশের কুলদেবী । মল্লরাজ জগৎমল্ল ৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে এই পূজার প্রবর্তন করেন । মল্লরাজবাড়ীর পূজায় দেবীপটের যে ব্যবহার দেখা যায় তা অনেকটা ভিন্ন প্রকৃতির । বাংলার সাধারণ দুর্গাপূজায় এমন পটের ব্যবহার দেখা যায় না ।

 দুর্গাপূজার সূচনা কাল নিয়ে বহু মত থাকলেও বাংলায় ষোড়শ শতাব্দীতে সম্রাট আকবরের শাসনামলে প্রথম পূজা শুরু হয় বলে অনেকে মনে করেন । ১৫৮২ সালে রাজশাহীর তাহেরপুরের জমিদার বাংলার বারো ভুঁইয়ার অন্যতম কংসনারায়ণ রায় তাঁর মনোবাসনা পূরণের লক্ষ্যে রাজসূয় ও অশ্বমেধ যজ্ঞের বিকল্প হিসেবে মার্কন্ডেয় পুরাণের দুর্গাপূজার প্রবর্তন করেন । তিনি সেসময়ে দুর্গাপূজায় ৮ লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন বলে জানা যায় । ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব রবার্ট ক্লাইভ এর সম্মানে দুর্গাপূজার মাধ্যমে বিজয় উৎসবের আয়োজন করেছিলেন । সেকালে পূজা ও অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয় হত বলে প্রথম দিকে মূলত রাজরাজড়া ও জমিদারদের মধ্যে দুর্গাপূজার আয়োজন সীমাবদ্ধ ছিল । ধীরে ধীরে বাঙালি জমিদারদের মধ্যে এই দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয় ।

 সাম্প্রতিককালে প্রচলিত দুর্গাপূজা দুই ভাবে হয়ে থাকে । ব্যক্তিগতভাবে পারিবারিক কাঠামোতে যেখানে পূজার শাস্ত্রীয় বিধান নিয়মনিষ্ঠা অধিক পালন করা হয় । এবং বারোয়ারি বা সর্বজনীনভাবে এলাকায় ভিত্তিক দুর্গোৎসব আয়োজন করা হয়ে থাকে । ১৭৯০ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ার ১২ জন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করে । ১২ ইয়ার বা ১২ বন্ধুর পূজা নামে পরিচিত এই পূজা একসময় বারোয়ারী নামে প্রতিষ্ঠা পায় । ১৮৩২ সালে কাশিমবাজারের রাজা হরিনাথ বারো ইয়ারের এই পূজা পদ্ধতি কলকাতা শুরু করেন । পরবর্তীতে উচ্চবর্ণীয় হিন্দু জমিদারদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বারোইয়ারী পূজা । ১৯১০ সালে সনাতন ধর্মীয় উৎসাহিণী সভা, ভবানীপুর বলরাম বসু ঘাট লেনে, রামধন মিত্র লেন ও সিকদার বাগানে বারোয়ারী পূজা হয় । অনেকের মতে একদিন দুর্গোৎসবের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতাকে অস্তমিত করার উৎসব পালিত হয়েছিল । আবার স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দুর্গাপূজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা যায়  ১৯২৬ সালে অতীন্দ্রনাথ বোসের দুর্গোৎসবে । তিনি জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে দুর্গাপূজার উৎসবে আমন্ত্রণ জানান । স্বাধীনতা সংগ্রামে দুর্গা পূজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল । কবি নজরুলের 'আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতা এবং বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দেমাতরম' সংগীত যার গুরুত্ব অপরিসীম । সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র বন্দেমাতরম গানটি দেবী দুর্গার ভাবনা থেকেই রচনা করেছিলেন যা একসময় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছিল ।

 শরৎকালে যে দুর্গাপূজা হয় সেক্ষেত্রে পৌরাণিক কাহিনি বা রীতি রেওয়াজ থাকলেও বাঙালি জনজীবনে তা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ । সেকালের বাঙালিজীবনের ক্ষেত্রে দেখা যেত, এই সময়টা ফসল তোলার প্রাকমুহূর্তের অবসরকাল । মাঝে মাঝে তখন সবুজ ধানের ক্ষেতে ফসলের পুষ্টতা এসেছে । প্রকৃতি ও অপরূপ সাজে সজ্জিত । নীল আকাশে হালকা হালকা সাদা মেঘের আনাগোনা । নদীর চড়ায় বালির স্তুপে কাশফুলের দোলা । ইত্যাদি মিলে প্রকৃতি তার বর্ষণঋতু অতিক্রম করছে । এই সময় শ্রমজীবী মানুষের বিশ্রামের মধ্যে কিছুটা বিনোদনের উৎস খুঁজে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে । সেই হিসেবে শরৎঋতুর এই দুর্গোৎসব বাঙালির জীবনের অবসরের শূন্যতাকে পূরণ করে ।

দুর্গাপূজার শুরুর কাল থেকেই এই পূজার মধ্যে একটা সর্বজনীনতা ছিল । সেকালে এই পূজা উপলক্ষে সাধারণ জনগণ এবং রাজা ও জমিদারবর্গের পরিবারের সদস্যরা কাছাকাছি আসার সুযোগ পেত । দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে রাজা ও প্রজাদের মধ্যে বিরাজ করা ভীতি ও দূরত্ব তখন অপসারিত হয়ে যেত । সেকালে বাঙালি জীবনে সামাজিক সম্প্রীতির সূচনার ক্ষেত্রে দুর্গাপূজার মুখ্য ভূমিকা ছিল । অর্থনৈতিক কারণে দুর্গাপূজা বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত ধনী ও অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল ।
সাধারণ মানুষের আর্থিক সংগতি না থাকলেও বিভিন্নভাবে তারা তাদের বিভিন্ন পেশার মাধ্যমে দুর্গাপূজার বিশাল কর্মকান্ডের অংশীদার হওয়ার সুযোগ ছিল । প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা ইত্যাদিতে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে শিল্পীরা অংশগ্রহণ করতেন । সেকালের দুর্গাপূজা ছিল মূলত পরিবারের সম্প্রদায়ের ও স্থানীয় জনগণের নিজস্ব উদ্যোগে সম্মিলিত আয়োজন । গ্রামের জমিদার এবং অভিজাত সম্প্রদায় দুর্গাপূজার প্রাক্কালে তার প্রজাদের উদার আহ্বান জানাতেন এই বিরাট কর্মযজ্ঞে সহায়তা করার জন্য । ফলে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই গ্রামের জমিদার ও বর্ধিষ্ণু ব্যক্তিত্বের বাড়িতে লোকসমাগম হত । গ্রামের দুর্গাপুজায় কয়েকদিন ধরে পুজামণ্ডপে ঢোলের বাজনা, আরতি, শঙ্খ, উলুধ্বনি, ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা ইত্যাদিতে মুখরিত থাকত । এছাড়াও সেই পূজাকে কেন্দ্র করে কীর্তন, রামায়ণ গান, যাত্রাপালা ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম থাকত । এইসব বিনোদনমূলক আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখত । দেবী দুর্গার পূজায় যেমন আছে ভক্তি ও পৌরাণিক তাৎপর্য তেমনি আছে লৌকিক আনন্দ, সামাজিক ঐক্য ও মানবিক সহমর্মিতা এবং সেবার বহুমুখী দিক । দেবী দুর্গা যেন গ্রাম বাংলারই কোন গৃহস্থ পরিবারের কন্যা যাকে দূর দেশে বিবাহ দেওয়া হয়েছে । এই ঘরের মেয়ে পূজার সময় সন্তান-সন্ততি সহ শ্বশুরঘর ছেড়ে বাপের বাড়িতে যান । দশমীতে সকলকে কাঁদিয়ে মেয়ে আবার কৈলাসে তার স্বামীর বাড়িতে ফিরে আসেন । গ্রামীন সংস্কৃতিতে পূজার কয়েক দিন বিবাহিতা কন্যাকে বাপের বাড়িতে নাইওর আনার রীতি রেওয়াজ এখনও রয়েছে । প্রসঙ্গত বলে রাখা যায়, মা দুর্গার চালচিত্রের যে বর্তমান রূপ সেখানে দেবী তার চার সন্তান–লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক গণেশসহ বিরাজমান । এর মধ্য দিয়েও দেবীপ্রতিমায় এক পারিবারিক রূপের প্রকাশ ঘটে । এই পূজার আনন্দেরই অঙ্গ হিসেবে দশমীর দিন গৃহস্থ ঘরে ভালো খাবার দাবারের আয়োজন করার রীতিও রয়েছে । সংবৎসরের পরিশ্রমী কৃষিজীবী মানুষ কাজের তাড়ায় ভালো কিছু খাওয়ার সুযোগ পান না বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য আসেনা । পুজোর এই কয়দিন আনন্দের ফাঁকে তাঁরা রসনার তৃপ্তি করে থাকেন এই উৎসবের মাধ্যমে । গ্রামের পূজোয় দেবীর পূজারমন্ডপ তৈরি, প্রতিমানির্মাণ থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি কাজেই গ্রামের সমস্ত মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্পন্ন করে থাকেন ।

শহরের দুর্গাপূজা অনেক বেশি আধুনিক এবং ব্যয়বহুল । সেখানে দুর্গাপূজায় থিমভিত্তিক প্যান্ডেল, আলো ও প্রতিমার চমকপ্রদ উপস্থাপনা লক্ষ্য করা যায় । প্রতিমানির্মানে ও মন্ডপসজ্জায় যেমন সৃজনশীলতার ছোঁয়া থাকে তেমনি সামাজিক বার্তা ও সমসাময়িক বিষয়ও উঠে আসে । দেবী দুর্গা এখানে শুধু মহিষমর্দিনী, অসুর বিনাশিনী নন । তিনি নারীশক্তির প্রতীক । সমাজের অন্যায়, অবিচার, বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা ইত্যাদি বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবেও উপস্থাপিত হন । পূজা-ভাবনা বা দেবীভাবনার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন বাঙালির চিন্তাভাবনার বিবর্তনের সুকুমার দিকটাকে তুলে ধরে । আজকের দিনের দুর্গাপূজায় সঙ্গীতানুষ্ঠান, শিশুদের মধ্যে চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, সমাজ সচেতনতামূলক সিনেমা প্রদর্শনী ও নানারকম সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় । এর মাধ্যমে পূজায় ধর্মীয় দিকটা পালনের পাশাপাশি বিনোদনের ক্ষেত্রেও আজকের দিনে গুরুত্ব দেওয়া হয় । বর্তমান সময়ে দুর্গাপূজা প্রাঙ্গণে রক্তদান শিবির, বস্ত্র দান, দুস্থ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষণসামগ্রী বিতরণ, স্বাস্থ্যপরীক্ষা ইত্যাদি সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে দুর্গাপূজাকে আরো বেশি করে মানবসেবার উৎসব হিসেবেও পরিগণিত করার প্রয়াস নেওয়া হয় । দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে সাহিত্যচর্চা, বইমেলা, শারদসংখ্যা প্রকাশ আজকের দিনের নিয়মিত চর্চার বিষয় । পূজার সময় বিভিন্ন পূজা কমিটি শারদোৎসব উপলক্ষে বিশেষ স্মরণিকা প্রকাশ করে থাকেন । তাতে পাড়ার খুদে লেখকলেখিকা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের লেখালেখি প্রকাশ করার একটা সুযোগ থাকে । পূজাকে কেন্দ্র করে  সাহিত্যসংস্কৃতিচর্চার আবহ সৃষ্টির এই দিকটিও অনেক মূল্যবান ।

দেবীপূজা বা দেবীভাবনার এই বিবর্তনকে লক্ষ্য করলে দেখি যে, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে দুর্গোৎসব আজ এই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে । দুর্গাপূজা আজ শুধু বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে নয়, পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাঙালিরা আছেন সেখানেই তা যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে । ইতিহাসবিদরা মনে করেন যে প্রায় ২২ হাজার বছর পূর্বে ভারতের প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠীর হাতেই দেবী পূজার প্রচলন হয় হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সভ্যতা তথা সিন্ধু সভ্যতায় এসে তা আরো গ্রহণযোগ্য ও বিস্তৃত হয় । মাতৃ তান্ত্রিক দ্রাবিড় সভ্যতায় বিভিন্ন মাতৃ দেবীর পূজার প্রচলন ছিল । তারই ক্রম বিবর্তন আজকের দুর্গোৎসব । অতীত ও বর্তমানের দুর্গাপূজার মধ্যে বেশ কিছু ফারাক থাকলেও তার মূল স্রোত কিন্তু একই ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমাজের বিবর্তন দুর্গাপূজার রূপকে বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষিতে পরিবর্তিত করছে এবং নতুন ভাবে উপস্থাপন করছে । দেবীপূজার পাশাপাশি বাঙালির মননেও চিন্তা ভাবনায় নানা কল্যাণকর ভাবনা যে রূপ পাচ্ছে এবং তা নতুন নতুন ভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে সেটাই হল পূজার আধুনিকতা । দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে এক চিরন্তন উৎসব যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাহিত হয়ে চলছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রূপ পরিগ্রহ করছে । ফলে দুর্গাপূজা শুধুমাত্র দেবী আরাধনা নয় নানাবিধ নতুন নতুন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দুর্গাপূজা মানবসেবার উৎসবে পরিণত হচ্ছে এবং প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে আলো ঝলমলে শহরে প্যান্ডেলের সর্বত্রই দুর্গাপূজা একতা ও সম্প্রীতির বাণী প্রকাশ করছে ।

Wednesday, September 24, 2025

My Pension From OCT 25

FOR FEB21 : BP=40500 DA=00 COMM=6300 FMA= 500 NET = 34700



FROM MAR21 : BP= 40500 DA( 3% )=1225 REC=00 COMM=6300 DIS=00 IR=00 OLD=00 FMA=500 TDS=00 NET=35925 PNBHOGBD

FROM JULY22 : BP=40500 : DA (8% )=3240 REC=00
COMM=6300 DID=00 IR=00 OLD=00 FMA=500 TDS=00 NET=37940
40500 -6300 = 34200+ 500 + 38240 ( 8% DA ) =37940

FROM DEC22 : BP=40500 : DA ( 12% )= 8100 REC = 00 COMM = 6300 DID = 00 IR = 00 OLD = m00 FM 500 TDS = 00 NET = 42800
40500 - 6300 = 34200 + 500 + 8100 ( 20% DA ) = 42800

FROM JAN24 : BP=40500 : DA ( 25% )= 10125 REC =<00 COMM = 6300 DID=00 IR = 00 OLD = 00 FMA= 500 TDS = 00 NET = 44825

FROM NOV24 : BP = 40500 : DS ( 30% ) = 12150 REV = 00 COMM : 6300 DID = 00 IR = 00 OLD = 00 FMA = 500 TDS = 00 NET = 46950

FROM APRL25 : BP = 40500 : DS ( 33% ) = 13365 REV = 00 : COMN : 6300 DID = 00 : IR : 00 OLD = 00 FMA = 500 TDS = 00 NET = ( 53865 - 6300 +500 ) = 48065

FROM OCT25 : BP = 40500 : DS ( 36% ) = 14580 REV = 00 : COMN : 6300 DID = 00 : IR : 00 OLD = 00 FMA = 500 TDS = 00 : NET : ( 55080 - 6300 +500 ) = 49280


Thursday, September 18, 2025

দুর্গাপূজায় লৌকিকতা ও সামাজিকতা : অতীত ও বর্তমান

দুর্গাপূজায় লৌকিকতা ও সামাজিকতা : অতীত ও বর্তমান 

অশোকানন্দ রায়বর্ধন

বাঙালি হিন্দুদের প্রধানতম উৎসব ও শ্রেষ্ঠ পূজা হল দুর্গাপূজা । পুরাণ শাস্ত্রকারদের মতে দেবী দুর্গা আদ্যাশক্তি মহামায়া, উমা, চন্ডী, ভগবতী, ভবানী, অম্বিকা, পার্বতী, শিবানী, কাত্যায়নী, মহিষাসুরমর্দিনী, অদ্রিজা প্রভৃতি বহু নামে পরিচিত ও পূজিত হন । ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, কালিকাপুরাণ, দেবীপুরাণ, দেবী ভাগবত ইত্যাদি গ্রন্থে কিছু কিছু পার্থক্য থাকলেও দেবী দুর্গার কাহিনী ও লীলা বর্ণনা সর্বত্রই দেখতে পাওয়া যায় ।

দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে শুধু দেবীআরাধনেই নয় । এটি বাঙালির প্রাণের উৎসব । এর মধ্যে যেমন আছে পৌরাণিক বিশ্বাস, মিথ তেমনি রয়েছে শিল্প-সংস্কৃতি, লোকাচার ও সামাজিকতার গভীর মেলবন্ধন । সুদূর প্রাচীনকাল থেকে বাঙালির জীবনে উৎসব এবং শ্রেষ্ঠতম পূজা হিসেবে দুর্গাপূজার প্রচলন রয়েছে । বাংলার অন্যতম প্রাচীন দুর্গাপূজা হল বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের মৃন্ময়ী মন্দিরের পূজা । দেবী মৃন্ময়ী ছিলেন মল্লভূম রাজ্যের রাজরাজেশ্বরী মল্ল রাজবংশের কুলদেবী । মল্লরাজ জগৎমল্ল ৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে এই পূজার প্রবর্তন করেন । মল্লরাজবাড়ীর পূজায় দেবীপটের যে ব্যবহার দেখা যায় তা অনেকটা ভিন্ন প্রকৃতির । বাংলার সাধারণ দুর্গাপূজায় এমন পটের ব্যবহার দেখা যায় না ।

 দুর্গাপূজার সূচনা কাল নিয়ে বহু মত থাকলেও বাংলায় ষোড়শ শতাব্দীতে সম্রাট আকবরের শাসনামলে প্রথম পূজা শুরু হয় বলে অনেকে মনে করেন । ১৫৮২ সালে রাজশাহীর তাহেরপুরের জমিদার বাংলার বারো ভুঁইয়ার অন্যতম কংসনারায়ণ রায় তাঁর মনোবাসনা পূরণের লক্ষ্যে রাজসূয় ও অশ্বমেধ যজ্ঞের বিকল্প হিসেবে মার্কন্ডেয় পুরাণের দুর্গাপূজার প্রবর্তন করেন । তিনি সেসময়ে দুর্গাপূজায় ৮ লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন বলে জানা যায় । ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব রবার্ট ক্লাইভ এর সম্মানে দুর্গাপূজার মাধ্যমে বিজয় উৎসবের আয়োজন করেছিলেন । সেকালে পূজা ও অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয় হত বলে প্রথম দিকে মূলত রাজরাজড়া ও জমিদারদের মধ্যে দুর্গাপূজার আয়োজন সীমাবদ্ধ ছিল । ধীরে ধীরে বাঙালি জমিদারদের মধ্যে এই দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয় ।

 সাম্প্রতিককালে প্রচলিত দুর্গাপূজা দুই ভাবে হয়ে থাকে । ব্যক্তিগতভাবে পারিবারিক কাঠামোতে যেখানে পূজার শাস্ত্রীয় বিধান নিয়মনিষ্ঠা অধিক পালন করা হয় । এবং বারোয়ারি বা সর্বজনীনভাবে এলাকায় ভিত্তিক দুর্গোৎসব আয়োজন করা হয়ে থাকে । ১৭৯০ সালে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ার ১২ জন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করে । ১২ ইয়ার বা ১২ বন্ধুর পূজা নামে পরিচিত এই পূজা একসময় বারোয়ারী নামে প্রতিষ্ঠা পায় । ১৮৩২ সালে কাশিমবাজারের রাজা হরিনাথ বারো ইয়ারের এই পূজা পদ্ধতি কলকাতা শুরু করেন । পরবর্তীতে উচ্চবর্ণীয় হিন্দু জমিদারদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বারোইয়ারী পূজা । ১৯১০ সালে সনাতন ধর্মীয় উৎসাহিণী সভা, ভবানীপুর বলরাম বসু ঘাট লেনে, রামধন মিত্র লেন ও সিকদার বাগানে বারোয়ারী পূজা হয় । অনেকের মতে একদিন দুর্গোৎসবের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতাকে অস্তমিত করার উৎসব পালিত হয়েছিল । আবার স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দুর্গাপূজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা যায়  ১৯২৬ সালে অতীন্দ্রনাথ বোসের দুর্গোৎসবে । তিনি জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে দুর্গাপূজার উৎসবে আমন্ত্রণ জানান । স্বাধীনতা সংগ্রামে দুর্গা পূজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল । কবি নজরুলের 'আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতা এবং বঙ্কিমচন্দ্রের 'বন্দেমাতরম' সংগীত যার গুরুত্ব অপরিসীম । সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র বন্দেমাতরম গানটি দেবী দুর্গার ভাবনা থেকেই রচনা করেছিলেন যা একসময় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছিল ।

 শরৎকালে যে দুর্গাপূজা হয় সেক্ষেত্রে পৌরাণিক কাহিনি বা রীতি রেওয়াজ থাকলেও বাঙালি জনজীবনে তা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ । সেকালের বাঙালিজীবনের ক্ষেত্রে দেখা যেত, এই সময়টা ফসল তোলার প্রাকমুহূর্তের অবসরকাল । মাঝে মাঝে তখন সবুজ ধানের ক্ষেতে ফসলের পুষ্টতা এসেছে । প্রকৃতি ও অপরূপ সাজে সজ্জিত । নীল আকাশে হালকা হালকা সাদা মেঘের আনাগোনা । নদীর চড়ায় বালির স্তুপে কাশফুলের দোলা । ইত্যাদি মিলে প্রকৃতি তার বর্ষণঋতু অতিক্রম করছে । এই সময় শ্রমজীবী মানুষের বিশ্রামের মধ্যে কিছুটা বিনোদনের উৎস খুঁজে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে । সেই হিসেবে শরৎঋতুর এই দুর্গোৎসব বাঙালির জীবনের অবসরের শূন্যতাকে পূরণ করে ।

দুর্গাপূজার শুরুর কাল থেকেই এই পূজার মধ্যে একটা সর্বজনীনতা ছিল । সেকালে এই পূজা উপলক্ষে সাধারণ জনগণ এবং রাজা ও জমিদারবর্গের পরিবারের সদস্যরা কাছাকাছি আসার সুযোগ পেত । দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে রাজা ও প্রজাদের মধ্যে বিরাজ করা ভীতি ও দূরত্ব তখন অপসারিত হয়ে যেত । সেকালে বাঙালি জীবনে সামাজিক সম্প্রীতির সূচনার ক্ষেত্রে দুর্গাপূজার মুখ্য ভূমিকা ছিল । অর্থনৈতিক কারণে দুর্গাপূজা বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত ধনী ও অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল ।
সাধারণ মানুষের আর্থিক সংগতি না থাকলেও বিভিন্নভাবে তারা তাদের বিভিন্ন পেশার মাধ্যমে দুর্গাপূজার বিশাল কর্মকান্ডের অংশীদার হওয়ার সুযোগ ছিল । প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা ইত্যাদিতে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে শিল্পীরা অংশগ্রহণ করতেন । সেকালের দুর্গাপূজা ছিল মূলত পরিবারের সম্প্রদায়ের ও স্থানীয় জনগণের নিজস্ব উদ্যোগে সম্মিলিত আয়োজন । গ্রামের জমিদার এবং অভিজাত সম্প্রদায় দুর্গাপূজার প্রাক্কালে তার প্রজাদের উদার আহ্বান জানাতেন এই বিরাট কর্মযজ্ঞে সহায়তা করার জন্য । ফলে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই গ্রামের জমিদার ও বর্ধিষ্ণু ব্যক্তিত্বের বাড়িতে লোকসমাগম হত । গ্রামের দুর্গাপুজায় কয়েকদিন ধরে পুজামণ্ডপে ঢোলের বাজনা, আরতি, শঙ্খ, উলুধ্বনি, ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা ইত্যাদিতে মুখরিত থাকত । এছাড়াও সেই পূজাকে কেন্দ্র করে কীর্তন, রামায়ণ গান, যাত্রাপালা ইত্যাদি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম থাকত । এইসব বিনোদনমূলক আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতিকে জীবন্ত রাখত । দেবী দুর্গার পূজায় যেমন আছে ভক্তি ও পৌরাণিক তাৎপর্য তেমনি আছে লৌকিক আনন্দ, সামাজিক ঐক্য ও মানবিক সহমর্মিতা এবং সেবার বহুমুখী দিক । দেবী দুর্গা যেন গ্রাম বাংলারই কোন গৃহস্থ পরিবারের কন্যা যাকে দূর দেশে বিবাহ দেওয়া হয়েছে । এই ঘরের মেয়ে পূজার সময় সন্তান-সন্ততি সহ শ্বশুরঘর ছেড়ে বাপের বাড়িতে যান । দশমীতে সকলকে কাঁদিয়ে মেয়ে আবার কৈলাসে তার স্বামীর বাড়িতে ফিরে আসেন । গ্রামীন সংস্কৃতিতে পূজার কয়েক দিন বিবাহিতা কন্যাকে বাপের বাড়িতে নাইওর আনার রীতি রেওয়াজ এখনও রয়েছে । প্রসঙ্গত বলে রাখা যায়, মা দুর্গার চালচিত্রের যে বর্তমান রূপ সেখানে দেবী তার চার সন্তান–লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক গণেশসহ বিরাজমান । এর মধ্য দিয়েও দেবীপ্রতিমায় এক পারিবারিক রূপের প্রকাশ ঘটে । এই পূজার আনন্দেরই অঙ্গ হিসেবে দশমীর দিন গৃহস্থ ঘরে ভালো খাবার দাবারের আয়োজন করার রীতিও রয়েছে । সংবৎসরের পরিশ্রমী কৃষিজীবী মানুষ কাজের তাড়ায় ভালো কিছু খাওয়ার সুযোগ পান না বা অর্থনৈতিক সামর্থ্য আসেনা । পুজোর এই কয়দিন আনন্দের ফাঁকে তাঁরা রসনার তৃপ্তি করে থাকেন এই উৎসবের মাধ্যমে । গ্রামের পূজোয় দেবীর পূজারমন্ডপ তৈরি, প্রতিমানির্মাণ থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি কাজেই গ্রামের সমস্ত মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্পন্ন করে থাকেন ।

শহরের দুর্গাপূজা অনেক বেশি আধুনিক এবং ব্যয়বহুল । সেখানে দুর্গাপূজায় থিমভিত্তিক প্যান্ডেল, আলো ও প্রতিমার চমকপ্রদ উপস্থাপনা লক্ষ্য করা যায় । প্রতিমানির্মানে ও মন্ডপসজ্জায় যেমন সৃজনশীলতার ছোঁয়া থাকে তেমনি সামাজিক বার্তা ও সমসাময়িক বিষয়ও উঠে আসে । দেবী দুর্গা এখানে শুধু মহিষমর্দিনী, অসুর বিনাশিনী নন । তিনি নারীশক্তির প্রতীক । সমাজের অন্যায়, অবিচার, বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা ইত্যাদি বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবেও উপস্থাপিত হন । পূজা-ভাবনা বা দেবীভাবনার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন বাঙালির চিন্তাভাবনার বিবর্তনের সুকুমার দিকটাকে তুলে ধরে । আজকের দিনের দুর্গাপূজায় সঙ্গীতানুষ্ঠান, শিশুদের মধ্যে চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, সমাজ সচেতনতামূলক সিনেমা প্রদর্শনী ও নানারকম সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় । এর মাধ্যমে পূজায় ধর্মীয় দিকটা পালনের পাশাপাশি বিনোদনের ক্ষেত্রেও আজকের দিনে গুরুত্ব দেওয়া হয় । বর্তমান সময়ে দুর্গাপূজা প্রাঙ্গণে রক্তদান শিবির, বস্ত্র দান, দুস্থ শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষণসামগ্রী বিতরণ, স্বাস্থ্যপরীক্ষা ইত্যাদি সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে দুর্গাপূজাকে আরো বেশি করে মানবসেবার উৎসব হিসেবেও পরিগণিত করার প্রয়াস নেওয়া হয় । দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে সাহিত্যচর্চা, বইমেলা, শারদসংখ্যা প্রকাশ আজকের দিনের নিয়মিত চর্চার বিষয় । পূজার সময় বিভিন্ন পূজা কমিটি শারদোৎসব উপলক্ষে বিশেষ স্মরণিকা প্রকাশ করে থাকেন । তাতে পাড়ার খুদে লেখকলেখিকা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের লেখালেখি প্রকাশ করার একটা সুযোগ থাকে । পূজাকে কেন্দ্র করে  সাহিত্যসংস্কৃতিচর্চার আবহ সৃষ্টির এই দিকটিও অনেক মূল্যবান ।

দেবীপূজা বা দেবীভাবনার এই বিবর্তনকে লক্ষ্য করলে দেখি যে, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে দুর্গোৎসব আজ এই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে । দুর্গাপূজা আজ শুধু বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে নয়, পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাঙালিরা আছেন সেখানেই তা যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে । ইতিহাসবিদরা মনে করেন যে প্রায় ২২ হাজার বছর পূর্বে ভারতের প্যালিওলিথিক জনগোষ্ঠীর হাতেই দেবী পূজার প্রচলন হয় হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সভ্যতা তথা সিন্ধু সভ্যতায় এসে তা আরো গ্রহণযোগ্য ও বিস্তৃত হয় । মাতৃ তান্ত্রিক দ্রাবিড় সভ্যতায় বিভিন্ন মাতৃ দেবীর পূজার প্রচলন ছিল । তারই ক্রম বিবর্তন আজকের দুর্গোৎসব । অতীত ও বর্তমানের দুর্গাপূজার মধ্যে বেশ কিছু ফারাক থাকলেও তার মূল স্রোত কিন্তু একই ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমাজের বিবর্তন দুর্গাপূজার রূপকে বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষিতে পরিবর্তিত করছে এবং নতুন ভাবে উপস্থাপন করছে । দেবীপূজার পাশাপাশি বাঙালির মননেও চিন্তা ভাবনায় নানা কল্যাণকর ভাবনা যে রূপ পাচ্ছে এবং তা নতুন নতুন ভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে সেটাই হল পূজার আধুনিকতা । দুর্গাপূজা বাঙালির কাছে এক চিরন্তন উৎসব যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাহিত হয়ে চলছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রূপ পরিগ্রহ করছে । ফলে দুর্গাপূজা শুধুমাত্র দেবী আরাধনা নয় নানাবিধ নতুন নতুন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দুর্গাপূজা মানবসেবার উৎসবে পরিণত হচ্ছে এবং প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে আলো ঝলমলে শহরে প্যান্ডেলের সর্বত্রই দুর্গাপূজা একতা ও সম্প্রীতির বাণী প্রকাশ করছে ।

Friday, September 12, 2025

লোকসংসকৃতির উন্নিদ্র প্রহরী ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুমের একজন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব থেঙ্গাফ্রু মগ । তিনি ১৯৫৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সাব্রুমের মনুবাজারের দক্ষিণ কালাপানিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর বাবার নাম প্রয়াত অংগিয় মগ ও মা প্রয়াতা নিবাইফ্রু মগ । তিনি মনু এইচএস স্কুলের প্রাথমিক বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেন এবং এই বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে দ্বিতীয় বিভাগে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন । ১৯৭৮ সালে সাব্রুম উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন । ১৯৮৩ সালে বিলোনিয়া কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে বিএ পাস করেন । ১৯৯১ সালে ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন । ১৯৭৮ সালের ১৬ জুন একজন প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে তিনি ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের শিক্ষাদপ্তরে চাকরিতে যোগদান করে ক্রমান্বয়ে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করে ২০০২ সালে প্রধান শিক্ষক পদে উন্নীত হন । দীর্ঘদিন সুনামের সাথে শিক্ষকতা করার পর ২০১৯ সালের ৩০ শে নভেম্বর মনু উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন । তাঁর অসাধারণ কণ্ঠসুষমার জন্য তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি সংগীতের ক্ষেত্রে ও বিশেষ সুনাম অর্জন করেন । রাজ্যের ও রাজ্যের বাইরে তিনি সংগীত পরিবেশন করে ভুয়সী প্রশংসা অর্জন করেছেন । মগ জনজাতির সংগীত, নৃত্য ও লোকসংস্কৃতির একজন বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব তিনি । তাঁর নিজের সৃষ্ট প্রতিষ্ঠান 'ফোক কালচারাল একাডেমি'র মাধ্যমে তিনি লোকনৃত্য, মনিপুরী নৃত্য ইত্যাদির চর্চা ও প্রসার ঘটিয়ে চলেছেন । ঐতিহ্যবাহী মগ লোকনৃত্যকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রেও তাঁর বিরাট ভূমিকা রয়েছে । তাঁর গুরু নীরেন্দ্রনাথ আচার্জির মতো তাঁরও অসংখ্য গুনমুগ্ধ শিক্ষার্থী রয়েছে । জীবনসায়াহ্নে এসে তিনি সংগীত ও নৃত্য চর্চার মাধ্যমেই সুকুমারচর্চা করে দিন যাপন করছেন ।

Thursday, September 4, 2025

'ত্র্যহস্পর্শ'– লুপ্ত 'অ'

'ত্র্যহস্পর্শ' শব্দের উচ্চারণ

উচ্চারণটা হবে 'ত্রঅস্পর্শ' (ত্রয়স্পর্শ ) ।  মূল শব্দটি ত্র্যহস্পর্শ । এখানে সন্ধির নিয়মের মাধ্যমে শব্দটি গঠিত হয়েছে । ত্রি+ অহ+ স্পর্শ = ত্র্যহস্পর্শ । তিনটি তিথি যেখানে স্পর্শ করেছে । স্বরসন্ধির নিয়ম অনুসারে পূর্বপদের 'ই' ও পরপদের 'অ' মিলে 'য' ফলা হয়েছে । বাংলা উচ্চারণে 'য' ফলাটি উহ্য হয়ে যায় । সংস্কৃত শব্দ বাংলা লিপিতে হ এর মতো একটি বর্ণ লেখা হয় এবং এই 'হ' বর্ণটি লুপ্ত 'অ' বর্ণ বলে পরিচিত হয়েছে । যেমন- 'সোহহম' ( সোঅহম ) । লুপ্ত 'অ' বর্ণটি অর্ধমাত্রাযুক্ত হ বর্ণ দিয়ে বোঝানো হয় । এটিকে হ এর মতো উচ্চারণ করা ঠিক হবে না । বাংলাবর্ণমালায় এই বর্ণটি নেই । তবে সংস্কৃত বর্ণমালায় রয়েছে এবং তার ব্যবহারও রয়েছে । এই লুপ্ত 'অ' এর উচ্চারণ 'হ' উচ্চারণ করতে যতটা জোর বা শ্বাসাঘাত হয় ততটা হয় না । অনেকটা 'অ' এর মতো বা তার চেয়ে কম জোর দেওয়া হয় ।

Wednesday, September 3, 2025

অশোকানন্দ রায়বর্ধনের পরিচয়পঞ্জী

আমার সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জী ও সাহিত্যকর্ম
১) নাম : অশোকানন্দ রায়বর্ধন
২) বাবাi ও মার নাম : প্রয়াত মনোরঞ্জন বর্ধন, ঊষারানি বর্ধন
৩) জন্মের তারিখ : ১১ জানুয়ারি, ১৯৫৬

৫) পেশা : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি বিদ্যালয় পরিদর্শক
৬) শিক্ষাগত যোগ্যতা : বাংলা
ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ও বিএড 
৭) সংক্ষিপ্ত পরিচয় :
জীবনের প্রথম পাঠ শুরু ডিব্রুগড় শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ প্রতিষ্ঠিত অখণ্ডমণ্ডলেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে । পরবর্তী সময়ে বাবার চাকরির সুবাদে ত্রিপুরার পেচার‌থল, বক্সনগর,কুলাইসহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন ধলাই জেলার কুলাই হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে ষষ্ঠ থেকে একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন  ( ১৯৭৩ )। বিলোনিয়া মহাবিদ্যালয় ( অধুনা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাবিদ্যালয় ) থেকে ১৯৭৬ সালে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেছেন । ১০৭৯ সালে সহকারী শিক্ষক হিসাবে সাব্রুম উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয় যোগদান করেন । পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি পেয়ে প্রধানশিক্ষক পদে দায়িত্ব পালন করেন জয়কুমার রোয়াজা পাড়া উচ্চ বুনিয়াদি বিদ্যালয় এবং উত্তর দৌলবাড়ি উচ্চ বনিয়াদী বিদ্যালয়ে । ২০১৫ সালে বিদ্যালয়ের পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি পান এবং সরাসরি বিদ্যালয় পরিদর্শক পদে যথেষ্ট  নিষ্ঠার সাথে কাজ করে ২০১৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন ।


৮ ) সাহিত্যকর্ম : 

সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় বিদ্যালয়ের মুখপত্র 'আন্তর'-এ কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর লেখালেখি শুরু । নবম শ্রেণিতে পাঠকালীন বিদ্যাiukলয়ের মুখপত্রের সম্পাদনার দায়িত্ব পান । কবি হিসেবে পরিচিতি শুরু হলেও তিনি রাজ্যের একজন সাহিত্যসমালোচনা ও সমাজবিষয়ক প্রবন্ধরচনাকার । লোকসংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ইতিহাসবিষয়ক গবেষণাকর্মে রত ।ইতোমধ্যে তাঁর বহু কবিতা, গল্প ও গবেষণামূলক প্রবন্ধ দেশের ও দেশের বাইরে নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে । অনেকগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনারে তিনি তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধ পাঠ করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছেন । ইন্টারনেট ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার ফলে ইতোমধ্যে ভারতে ও ভারতের বাইরের বিভিন্ন স্থানের বেশ কয়েকটি  সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ক ওয়েবিনারে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি । এই বয়সেও সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক 
ইতিহাস নিয়ে নিরন্তর গবেষণা ও লেখালেখিতে রত আছেন। নিজের গবেষণা সংক্রান্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও রাজ্যের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট গবেষকের গবেষণাপত্র রচনা ক্ষেত্রে ক্ষেত্রসমীক্ষা ও অন্যান্য বিষয়ে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি ।সংশ্লিষ্ট গবেষকগণও তাঁদের গবেষণাপত্রে তাঁর সাহচর্য বিষয়ে বেশ যত্ন সহকারে উল্লেখ্য করেছেন । সেই সুবাদে সম্প্রতি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষিকা ইশিতা ভৌমিকের গবেষণাপত্রের সহতত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব ও পালন করেছেন তিনি । 
তিনি নাটক লেখা ও অভিনয়েও দক্ষ ।জীবনে বহু নাটকে অভিনয় করেছেন । নাটক লিখেছেন । নাট্যকর্মশালায় প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পালন করেছেন । 'ভাঙন' ও 'রাঙামাটির পথে' নামে ত্রিপুরার দুটি টেলিফিল্মে অভিনয় করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন ।
রেছেন ।বর্তমানে তিনি বেশ কয়েকটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছেন । তিনি ত্রিপুরা ওয়ার্কিং জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের রাজ্য কমিটির উপদেষ্টামন্ডলীরও অন্যতম সদস্য । সামাজিক কাজকর্ম, সাহিত্যসৃষ্টি ও গবেষণাকর্মের মধ্যে ডুবে থেকেই তিনি তাঁর বর্তমান অবসর জীবন অতিবাহিত করছেন ।

৯) প্রকাশিত গ্রন্থের তালিকা :

    ক) ত্রিপুরার লোকসমাজ ও সংস্কৃতি ( প্রবন্ধ ), ভাষা, আগরতলা ২০০২ 
    খ) বিনীত চুম্বন ( কবিতা ),  89স্রোত, কুমারঘাট, ২০০৭ 
     গ) ত্রিপুরার লোকসংস্কৃতির তত্ত্বরূপ সন্ধান ও বিষয়বিন্যাস ও বিষয় বিন্যাস (প্রবন্ধ ), স্রোত, কুমারঘাট ২০১৩ 
      ঘ) ত্রিপুরার মগ জনজাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি ( প্রবন্ধ সম্পাদনা ), স্রোত, কুমারঘাট, ২০১৬
i        চ ) জোছনার হাওরে বলিরেখা ( কবিতা ), ত্রিধারা, ২০২২ 
        ছ )  অন্তরে দহন অনন্ত ( মুক্তগদ্য ), ত্রিধারা, ২০২৩ 
         জ ) কুসুমে কুসুমে রেখে যাওয়া চরণচিহ্ন :99 ত্রিপুরায় রবীন্দ্র পদার্পণের ১২৫ বছর ( প্রবন্ধ ), স্রোত, ২০২৩ 
          ঝ ) ফেনী নদীর প্রত্নকথা ও মানুষের উপখ্যান ( আঞ্চলিক ইতিহাস ), স্রোত, ২০২৩ 
          ঞ ) ত্রিপুরার লোক ধর্ম ও লোকাচার ( প্রবন্ধ ) অন্যপাঠ , ২০২৩

১০)  সম্মান,পুরস্কার ও স্বীকৃতি :

           ক ) অগ্রণী পুরস্কার, বিলোনিয়া, ত্রিপুরা ১৯৭৫
           খ ) সংবাদ সাহিত্য পুরস্কার, আগরতলা, ১৯৯৫ 
            গ ) লোকসংস্কৃতি সম্মাননা, মনুবাজার,২০১৫
             ঘ ) সাহিত্য সম্মান– তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, ত্রিপুরা সরকার ২০১৭
            ঙ ) সমভূমি সাহিত্য সম্মান, বাইখোরা,  দ. ত্রিপুরা ২০১৭
             চ ) সৃজন সাহিত্য সম্মান, ইসলামপুর, উত্তর দিনাlজপুর, প. বঙ্গ, ২০১৮
             ছ ) স্রোত রজতজয়ন্তী প্রকাশনা উৎসব সম্মাননা, সুকান্ত একাডেমি আগরতলা, ২০১৯ 
             জ ) বনতট সাহিত্য সম্মান, কাঞ্চনপুর, উত্তর ত্রিপুরা ২০২০ 
             ঝ ) দেবদ্বীপ সম্মান, শান্তির বাজার, ২০২২ 
              ঞ ) গবেষক সংবর্ধনা, ত্রিপুরা রবীন্দ্র পরিষদ, উদয়পুর ২০২৩
              চ ) বরিষ্ঠ সাংবাদিক সম্মাননা, ত্রিপুরা ওয়ার্কিং জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন, আগরতলা, ২০২৪
               ছ )ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মাননা, বিশ্ব বাঙালি সংসদ বাংলাদেশ, ঢাকা ২০২৪
               জ) সৃষ্টি সাহিত্য সম্মান ২০২৪, সৃষ্টি সাহিত্য পত্রিকা, নলুয়া বিলোনিয়া ।
               সলিলকৃষ্ণ দেববর্মণ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার ( ত্রিপুরা সরকার ) ২০২৪

এছাড়া জাতীয় শিশু বিজ্ঞান কংগ্রেসের 'প্রজেক্ট গাইড' হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মান ২০০৩ প্রাপক ।